মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ১১তম সংখ্যা, আগস্ট ২০২২ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত
প্রবন্ধ – রঁওযা বা মাজার জিয়ারত ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযায় গিয়ে কিভাবে মুনাজাত করবে সে সম্পর্কে “সিফাউস সেকাম” কিতাবের ৪৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, আবু মনছুর মুহাম্মদ ইবনে মোকাররম করমানী তাঁর “মনাসেক”-এর মধ্যে এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাহ্মুদ “শরহুল মুখ্তার” কিতাবের মধ্যে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাবে বর্ণনা দিয়েছেন এবং “ফাতাওয়া আবুল লাইস সমরকন্দী”- এর মধ্যে হাসান ইবনে যিয়াদের রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি বলেছেন, “হাজীদের এটাই উত্তম যে, প্রথমে সে মক্কায় যাবে। সেখানকার আরকান (কার্যসমূহ) আদায় করার পর মদিনায় যাবে। আর যদি প্রথমেই মদিনা হয়ে আসে, তবে সেটাও জায়েজ। মদিনায় পৌঁছে রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের পবিত্র রঁওযায় যাবে। কেবলা এবং রঁওযার মাঝখানে এমনভাবে দাঁড়াবে যে, তার মুখ রঁওযার দিকে থাকবে। এরপর হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের উপর ছালাত ও ছালাম পড়বে এবং হযরত আবু বকর এবং ওমরের উপরও ছালাম পড়বে এবং তাদের জন্য রহমতের দোয়া করবে।
আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আস্ সাম্রী আল্ হাম্বলী তাঁর কিতাব “আল্ মুস্তাওয়াব”- এর মধ্যে বলেছেন, “যখন মদিনাতুর রাছুলে উপস্থিত হবে, তখন তার জন্যে মুস্তাহাব কাজ হচ্ছে, মদিনায় প্রবেশের সময় গোসল করা। তারপর মসজিদে নব্বীতে যাবে এবং প্রবেশের সময় প্রথমে ডান পা প্রবেশ করাবে। এরপর রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারকের দেয়ালের নিকটে পৌঁছে এমনভাবে দাঁড়াবে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারক সামনে থাকবে এবং কেবলা থাকবে পিছনের দিকে, আর নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের মিম্বর থাকবে বাম দিকে। তারপর ছালাত, ছালাম পড়বে এবং নিজের জন্য দোয়া করবে। এরপর এটাও যেন বলে, তুমি তোমার কিতাবে বলেছ, “সুম্মা জাউকা ইয়াহলেফূনা, বিল্লাহে ইন্ আরাদ্না ইল্লা ইহসানাও ওয়া তাওফিকান্”। অর্থাৎ অতঃপর তারা তোমার নিকট এসে আল্লাহর নামে শপথ করবে (এবং বলবে) আমরা তো সম্প্রীতি এবং সুন্দর ব্যতীত অন্য কিছুই ইচ্ছা করিনি (সুরা আন নিসা-৬২ আয়াত)। “ওয়া লাও আন্নাহুম ইজ্জালামু আন্ফুসাহুম্ জাউকা ফাস্তাগ্ফারুল্লাহা ওয়াস তাগ্ফারা লাহুমুর রাছুলু। লাওয়াজাদুল্ লাহা তাওয়্যার্বা রাহিমান্”। এবং যদি তারা তাদের নফসের উপর জুলুম করে এবং তোমার নিকট ফিরে এসে (এবং) আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং রাছুলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন তা হলে তারা আল্লাহকে পরম ক্ষমাশীল (এবং) পরম রাহিম (দয়ালু) রূপে পাবে (সুরা আন-নিসা- ৬৪ আয়াত)। এবং বলে, “এখন আমি তোমার নবীর নিকট মাগফেরাত চাওয়ার জন্য উপস্থিত হয়েছি এবং তোমার নিকট আবেদন করছি, অতএব তুমি তোমার মাগফেরাত আমার জন্য ছাবিত করে দাও, যেভাবে তুমি তাদের জন্য মাগফেরাত ছাবিত বা পুরা করে দিয়েছ যারা তাদের জীবদ্দশায় মাগফেরাতের জন্য এসেছে। হে আল্লাহ! আমি তোমার নবীর উছিলা দিয়ে তোমার দিকে মুতাওয়াজ্জাহ (মুখ ফিরিয়েছি বা উপস্থিত) হয়েছি। তারপর যখন ফিরে আসার ইচ্ছা করবে তখন আবারও নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের পবিত্র রঁওযা মোবারকে উপস্থিত হয়ে তাঁর নিকট হতে বিদায় নিবে”। তাছাড়া লোক মারফত মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের নিকট (রঁওযা মোবারকের নিকট) ছালাম পৌঁছানোর নিয়মও শরিয়ত সম্মত বলে সাব্যস্ত আছে। যেমন, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ শাম (সিরিয়া) থেকে শুধু নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওয়া মোবারকে ছালাম পেশ করার জন্য কাসেদ (বাণী বাহক) পাঠাতেন। এ কাজ শুধু ছালামের উদ্দেশ্যেই করা হতো।
কাজী আয়ায তাঁর “আশ্ শিফা” কিতাবের মধ্যে সনদসহ উল্লেখ করেছেন যে, খলিফা আবু জাফরের সঙ্গে হযরত ইমাম মালেক রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হির মসজিদে নব্বীতে কথাবার্তা হলো। ইমাম মালেক রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি বললেন, “আমিরুল মুমিনীন, এ মসজিদে উচ্চস্বরে কথা বলবেন না। কারণ, আল্লাহপাক বলেছেন, “ইয়া আইয়্যুহাল্লাজীনা আমানু লা তারফা’উ আসওয়াতাকুম্ ফাওক্বা সাওতিন্ নাবিয়্যি ওয়ালা তাজ্বহারু লাহু বিল্ক্বাওলি কাজ্বাহ্রি বা’দ্বিকুম্ লিবা’দ্বিন আন্ তাহ্বাত্বা আ’মালুকুম্ ওয়া আন্তুম লা তাশউরূন” অর্থাৎ হে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা তোমাদের কণ্ঠস্বরকে নবীর কণ্ঠস্বরের উপর উঁচু করো না, তোমরা একে অপরের ন্যায় তাঁর সঙ্গে উচ্চঃস্বরে কথা বলো না; এতে তোমাদের আমল তোমাদের অজান্তেই নিস্ফল হয়ে যাবে। (সুরা হুজরাত-২ আয়াত)। এবং প্রশংসা করে বললেন, “ইন্নাল্লাজীনা ইয়াগুদ্বদ্বুনা আসওয়াতাহুম্ ইন্দা রাছুলিল্লাহি উলাইকাল্ লাযীনাম্ তাহানাল্লাহু কুলুবাহুম লিত্তাকওয়া; লাহুম্ মাগ্ফিরাতুও ওয়া আজ্বরুন্ আজীম্” অর্থাৎ নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর রাছুলের সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নিচু করে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য বিশুদ্ধ করে দিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে বিরাট ক্ষমা ও মহা প্রতিদান (হুজরাত-৩ আয়াত)। এবং যারা উচুঁ স্বরে ডাকে তাদের নিন্দা করতে গিয়ে বলেছেন, “ইন্নান্লাজীনা ইউনাদূনাকা মিও ওরাইল হুজুরাতি আক্ছারুহুম লা ই’য়াকিলূন” অর্থাৎ নিশ্চয়ই যারা আপনাকে হুজরার বাহির হতে চিৎকার করে আহ্বান করে তাদের অধিকাংশই নির্বোধ। (হুজরাত-৪ আয়াত)।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামকে এহতেরাম করা যেভাবে তাঁর জীবদ্দশায় জরুরী ছিলো তাঁর ওফাতের পরও সেভাবেই জরুরী রয়েছে। একথার পর খলিফা আবু জাফর লজ্জিত হয়ে গেলেন এবং বললেন, “হে আবু আবদুল্লাহ! আমি কেবলার ইস্তেক্বাল করার পর (স্বাগত জানানোর পর) হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারকের নিকট দোয়া করবো বা স্বাগত জানাবো”। ইমাম মালেক রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি বললেন, “হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারক হতে কেনো মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ যখন রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের পবিত্র জাত তোমার এবং তোমার পিতা হযরত আদম আলায়হিস সালামের কেয়ামতের দিন আল্লাহর জন্যে উছিলা হবে? তাঁর দিকে মুখ করো এবং তাঁর মাধ্যমে শাফায়াত কামনা করো। আল্লাহপাক তার শাফায়াত কবুল করবেন। আল্লাহপাকের নির্দেশ রয়েছে, “ওয়ামা আরসালনা মির রাছুলিন্ ইল্লা লেইউতাআ বেইজ্নিল্লাহ” অর্থাৎ এবং আমরা রাছুলগণকে এ জন্যে পাঠিয়েছি যে, তাঁরা আল্লাহর জন্য নির্দেশ (হুকুম) অনুসারে তার আনুগত্য করবে। “ওয়া লাও আন্নাহুম্ ইজ্জালামু আনফুসাহুম জাউকা ফাস্তাগ্ফারুল্লাহা ওয়াস্ তাগ্ফারা লাহুমুর রাছুলু” অর্থাৎ এবং যদি তারা তাদের নফসের উপর জুলুম করে এবং তোমার নিকট ফিরে আসে (এবং) আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং রাছুলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। “লাওয়াজাদুল্ লাহা তাওয়্যার্বা রাহিমান” অর্থাৎ তা হলে তারা আল্লাহকে পরম ক্ষমাশীল (এবং) পরম রাহিম (দয়ালু) রূপে পাবে (সুরা নেসা-৬৪ আয়াত)।
মাজার জিয়ারত করা হলো সুন্নাত। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম, আওলাদে রাছুলগণ এবং সাহাবায়ে কেরামগণ মাজার জিয়ারত করেছেন এবং মাজার জিয়ারতের হুকুম করেছেন। রাছুল করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম প্রথম দিকে মুসলমানদের আলাদা কবরস্থান না থাকায় এবং আল্লাহর হুকুম না পাওয়ায় কবর বা মাজার যিয়ারত নিষেধ করেছিলেন। (সাহাবাগণ কামালতধারী বিধায় তাঁরা আল্লাহর অলি এবং তাদের সমাধিগুলো হলো রঁওযা বা মাজার)। কিন্তু পরবর্তীতে মুসলমানদের পৃথক কবরস্থান যখন হলো, তখন জিয়ারতের হুকুম দিলেন। সাধারণ মানুষের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্য হলো তাদের নফসের মাগফেরাত কামনা করা এবং এ উদ্দেশ্যেই দান খয়রাত করা। আর তাতে জিয়ারতকারীর দীল নরম হয়, চোখে অশ্রু ঝরায় এবং পরকালকে স্মরণ করায়। আর আল্লাহর অলির মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্য হলো তাদের সাথে আত্মিক নিছবত ও ফায়েজ বরকত লাভ করা, এবং অলিগণের উছিলা দিয়ে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করা। তাতে স্বীয় মকসুদ আল্লাহপাক তাঁর অলির উছিলায় পূর্ণ করেন এবং এ উদ্দেশ্যেই ওরশ শরীফ পালন করা হয়।
এ সম্পর্কে কতিপয় দলিল পেশ করা হলো –
১। নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলেছেন, “আমি তোমাদেরকে প্রথম দিকে কবর জিয়ারত নিষেধ করছিলাম। এখন তোমরা জিয়ারত করো। কেননা, কবর জিয়ারত কলবকে নরম করে, চোখে অশ্রু ঝরায় এবং পরকালকে স্মরণ করায় (মুসলিম শরীফ, মেশকাত শরীফ ও বায়হাকী শরীফ)।
উক্ত হাদিসের আরবী এবারতে “ফাজুরুহা” একটি শব্দ রয়েছে এবং এর দ্বারা কবর জিয়ারতের হুকুম করা হয়েছে বিধায় জিয়ারত সুন্নত প্রমাণিত হলো। আর এ হুকুম নারী-পুরুষ সবার সাধারণ ভাবে জন্যে প্রযোজ্য। কারণ, অবস্থা বিশেষ মেয়েদের শর্তও জড়িত হতে পারে, যদি সমস্যা থাকে। কবর বা মাজার জিয়ারত সুন্নত হলে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফরও অবশ্যই সুন্নত হবে এবং এ হুকুম “জা’আল হক” এবং “আহকামুল মাজার” কিতাবে বিধৃত আছে। কবর জিয়ারতের হুকুম নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম হুকুম দিয়েছেন অথচ তার জন্যে সফরের হুকুম দিবেন না এ ধরনের অবাস্তব নির্দেশ রাছুল করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের দ্বারা কখনো সম্ভব নয়। আজমীর শরীফ, বাগদাদ শরীফ বা অন্যান্য দূরবর্তী মাজার সমূহ সফর ব্যতীত জিয়ারত সম্ভব নয়। কাজেই জিয়ারত ও সফর উভয়ই হলো সুন্নত। উক্ত হাদিসে জিয়ারতের সাথে অবশ্যই সফর কথাটাও বৈধ প্রমাণিত।
২। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা বর্ণনা করেছেন, “নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম শেষ রাত্রে মদীনা শরীফের “বাকিউল গারকাদ” বা জান্নাতুল বাকী নামক কবরস্থানে গমন করে স্বীয় পরিজনদের মাজার জিয়ারত করতেন। তিনি পরলোকগত সাহাবীগণকে এভাবে ছালাম দিতেন এবং দোয়া করতেন, “হে পরকালের মুমিন বান্দাগণ; তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। তোমাদের সাথে কৃত ওয়াদা তোমরা আগামীতে পেয়ে যাবে। তোমরা আমাদের পূর্বে গমন করেছ। আমরাও ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই তোমাদের সাথে মিলিত হবো। হে আল্লাহ! বাকিউল গারকাদ কবরস্থানের বাসিন্দাদের তুমি ক্ষমা করে দাও” (মুসলিম শরীফ)।
৩। ১০ হিজরীতে নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম একলাখ চব্বিশ হাজার সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে মক্কায় হজ্জ করতে আসলেন, তখন একদিন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহাকে সাথে নিয়ে জান্নাতুল মোয়াল্লা’তে (পূর্বনাম “হাজুন”) হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহার মাজার জিয়ারত করতে গেলেন। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা গাধার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম জিয়ারত কালে প্রথমে খুব কাঁদলেন, পরে হাসলেন। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা এর কারণ জানতে চাইলে হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বললেন, “আমার পিতা-মাতাকে আল্লাহপাক জীবিত করে আমার সামনে হাজির করলেন। তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করে পূনরায় ইন্তেকাল করলেন। আমি পিতা-মাতাকে দেখে খুশী হয়েছি”। এ ঘটনাটি ইমাম সোহায়লীর বরাত দিয়ে আল্লামা ইবনে কাসির তার বিখ্যাত কিতাব “আল বেদায়া ওয়ান নেহায়ার” মধ্যে বিধৃত করেছেন।
যেহেতু রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম খাতামুন আম্বিয়া, সাইয়্যেদুল মুরছালীন, রাহমাতাল্লিল আলামীন তাই তিনি তাঁর আলে রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম এবং সাহাবাগণের মাজার জিয়ারত করে তাদের জন্য দোয়া করেছেন এবং সমস্ত সৃষ্টিই তাঁর রহমতের প্রত্যাশী; তিনি হলেন রহমতের বন্টনকারী। তাই রাছুল করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারক জিয়ারতের সময় নবীজির জন্য দোয়া করা চরম বেয়াদবী ছাড়া কিছুই নয়, যা মুনাফেক ওহাবীগণ করে থাকে। সমস্ত মানুষকেই রাছুল করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারক জিয়ারত করার সময় তাঁর নূরী ফায়েজ বরকত ও দয়া পাওয়ার আকাক্সিক্ষত থাকতে হবে আজিজি, নম্রতা ও আদবের মাধ্যমে। নবুয়তে যাদেরকে নবী-রাছুল বলা হয়, বেলায়েতে তাদেরকেই বলা হয় অলি- আউলিয়া। বিধায় ঠিক তেমনি, আল্লাহর অলিদের মাজার জিয়ারতের সময়ও আদব-নম্রতার মাধ্যমে তার নিছবত ও ফয়েজ বরকত কামনা করতে হবে। বেআদবের মত তাদের জন্য শুধু দোয়া করা উচিত নয়। কোরানে বলা হয়েছে, “ওয়ালিল্ললাহি ইজ্জাতো ওয়া লি রাছুলিহি ওয়ালিল মুমিনীনা ওয়া লাকিন্নাল মুনাফেকিনা লাইয়া লামুন” অর্থাৎ এবং সম্মান আল্লাহর জন্য এবং রাছুলের জন্য এবং মুমিগণের জন্য কিন্তু মুনাফেকগণ তা বুঝে না। আত্মশুদ্ধি ও আত্মপরিচয়ের মাধ্যমে যিনি আল্লাহকে চিনেছেন তিনিই মুমিন তথা ইনছানি আত্মার অধিকারী ব্যক্তিই হলেন মুমিন। কাজেই মুমিনকে যারা আমানু বা মুত্তাকী বা সাধারণ মানুষের মতো ধারণা করে বা তাদের মর্যাদার সমান মনে করে কোরানুল কারিমে তাদেরকে মুনাফেক বলা হয়েছে।
৪। হযরত মাওলা আলী ইবনে আবি তালিব আলায়হিস সালাম তাঁর মাতা হযরত ফাতেমা বিনতে আসাদ রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহার ওফাতের পর রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম তাঁর লাশ কবরে রেখে দোয়া করলেন, “আল্লাহ জীবিত করেন এবং মৃত্যু দান করেন। তিনি চিরঞ্জীব, কখনো মরেন না। হে আল্লাহ, আমার মা ফাতেমা বিনতে আসাদকে ক্ষমা করুন এবং তাঁর প্রবেশ পথ প্রশস্ত করুন, আমার এবং আমার পূর্ববর্তী সকল নবীর উছিলায়। নিশ্চয় আপনি সর্বাধিক দয়ালু।” সেখানে হযরত আব্বাস ও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুম ও সঙ্গে ছিলেন।
৫। ফতোয়ায়ে শামীর প্রথম খন্ডের “জিয়ারাতুল কবর” অধ্যায়ে হযরত ইবনে আবি শাইরাবাহ রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে, “রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম প্রতি বৎসর উহুদ যুদ্ধে শহীদানদের মাজারে জিয়াতের জন্য উপস্থিত হতেন এবং তাঁদের জন্য দোয়া করতেন। এ বর্ণনাটি “সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ” ২য় খন্ডের ১৯৩ পৃষ্ঠায়ও বর্ণিত আছে। এ হাদিসে রাছুল কারিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম জিয়ারতের জন্য সফর করতেন বলে প্রমাণিত হলো।
৬। খুলাফা-ই রাশেদাসহ সাহাবা-ই কেরামগণও এরূপ জিয়ারত করতেন বলে “তাফসীরে কবির” ও “দুররে মনসুরে” উল্লেখ আছে। আরো বর্ণিত আছে “ফতোয়ায়ে সফরুচ্ছায়াদাতের” ১১ পৃষ্ঠায় এবং “আহকামুল মাজার” কিতাবে।
৭। শায়েখ আবদুল হক মোহাদ্দেস দেহলবী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হির বিখ্যাত কিতাব “জজবুল কুলুব ইলা দিয়ারিল মাহবুব”- এর ২য় খন্ডের ১৯৮ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, ‘মা ফাতেমা আলায়হিস সালাম হযরত আমীর হামযা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর মাজার জিয়ারত করতেন এবং মাজার সংস্কার করতেন। তিনি ২/৩ দিন পর পর শহীদানদের মাজার জিয়ারত করতেন। জিয়ারতের জন্য হযরত মা ফাতেমা শহীদানদের মাজারে সফর করতেন ইহাতে প্রমাণিত।
“আল বাছায়ের ও গাউছুল ইবাদ” কিতাবের সূত্রে “আহকামুল মাজার” কিতাবের ৩৫-৩৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে, হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা প্রতি বৎসর তাঁর ভাই হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুর মাজার শরীফ জিয়ারত করার জন্য মদীনা হতে মক্কায় সফর করতেন। এখানেও মেয়েদের জিয়ারতের প্রমাণ হলো এবং জিয়ারতের জন্য সফর করাও প্রমাণ হলো।
৮। “মাদারেজুন নবুয়াত” কিতাবের ৩য় খন্ডের ৯৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, এক রমণী হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহার নিকট এসে বললেন, দয়া করে একটি বার রঁওযা মোবারকের দরজাটি খুলে দিন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা রঁওযার মোবারকের দরজা খুলে দিলেন। মেয়ে লোকটি রওযা শরীফ দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। একটানা কেঁদেই চললেন তিনি। কান্না থামলে দেখা গেলো রমণীটি মারা গিয়েছে।
৯। অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা আবদুল জলিল সাহেব তাঁর “আহকামুল মাজার” কিতাবে “ফতোয়ায়ে শামীর” মোকাদ্দমায় “ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহ আলাইহির মাহাত্ম্য” অধ্যায় হতে ইমাম শাফেয়ীর একটি বক্তব্য তুলে ধরেছেন, তা হলো, “আমি (ইমাম শাফেয়ী) বরকত লাভের উদ্দেশ্যে ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হির মাজারে আগমন করে থাকি। যদি কোনো বিষয়ে সমাধান প্রয়োজন হতো, তখন আমি দু’রাকাত নামাজ পড়ে তাঁর মাজারে গিয়ে খোদার কাছে (তাঁর উছিলা ধরে) প্রার্থনা করতাম। সাথে সাথে আমার সে মকসুদ পূর্ণ হয়ে যেতো। তাহলে ইমাম শাফেয়ীও জিয়ারতের জন্য সফর করতেন বলে এ ঘটনার দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো।
১০। “আনোয়ারে আউলিয়া” কিতাবের ৩১ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, হযরত বায়েজীদ বোস্তমী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি প্রতি বৎসর “ধনছান” নামক স্থানে তাশরীফ নিতেন এবং শহীদানদের মাজার জিয়ারত করতেন। এখানেও সফরের প্রমাণ নিশ্চিত হলো।
১১। “সৌভাগ্যের পরশমণি” বিখ্যাত কিতাবের ৩য় খন্ডের ৬৫১ পৃষ্ঠায় ইমাম গায্যালী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি বলেছেন হজ্জ ও জেহাদ করার জন্য, নবী-রাছুল, সাহাবা, তাবেঈন অলি-আউলিয়া বা পীর-মুর্শিদ প্রভৃতি মহাত্মাগণের রঁওযা মোবারক বা মাজার মোবারক দর্শনের জন্য এবং আলেম ও ধার্মিক লোকদের দর্শন লাভের জন্য দেশ ভ্রমন করা বা সফর করা আবশ্যক। তদ্রুপ মহাপুরুষদিগের আশির্বাদ হতে মহা-কল্যাণ পাওয়া যায়। তাদেরকে দর্শনে যে সকল ফল লাভ হয়, তন্মধ্যে ইহাও এক লাভ যে, তাদেরকে দর্শন করতে গেলে, তাদের আচার ব্যবহার ও কার্যের অনুকরণ করতে স্বভাবতঃ ইচ্ছা জন্মে। এ জন্য ওফাতপ্রাপ্ত মহাপুরুষগণের রঁওযা বা মাজার এবং জীবিত মহাত্মাদের দর্শনকে এবাদতের অন্তর্গত ধরা হয়। আবার উহা এবাদতের বীজ স্বরূপ ধরা হয়ে থাকে। এই কারণে শহীদগণের গোরস্থান ও জ্ঞানীলোকের মাজার জিয়ারত করতে যাওয়া ভালো। কল্যাণ লাভের মানসে পীর-মুর্শিদ বা অলি- আউলিয়া-আম্বিয়াগণের মাজার বা রঁওযা মোবারক দর্শনে সফরে যাওয়া অবশ্যই জায়েজ।
১২। ইমাম গায্যালী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি উক্ত কিতাবে আরো বলেছেন, যখন কোনো শহরে প্রবেশ করবে তখন এরূপ সংকল্প করবে যে, তথাকার সাধু ও জ্ঞানী লোকের মাজার দর্শন করবে এবং তথায় পরিপক্ক পীরের অনুসন্ধান করবে এবং তাদের প্রত্যেক হতে উপকার নিবে।
প্রবন্ধ – আহলে বাইতের নামের শেষে আ. ব্যাবহার
লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হুসাইন চিশতী
আহলে বাইত পাক পাঞ্জাতন, তাঁদের নামের শেষে আলাইহিস সালাম সংক্ষেপে (আ.) ব্যবহার নিয়ে মতভেদ বিদ্যমান। এক শ্রেণীর লোকদের অভিমত আলাইহিস সালাম কেবল নবী-রাসুলগণের নামের শেষে ব্যবহার করা জায়েজ। কিন্তু কোরআন হাদীস দ্বারা প্রমানিত যে, আহলে বাইতগণের নামের শেষে (আ.) ব্যবহার করা জায়েজ।
‘আহল’ অর্থ অধিবাসী এবং ‘বাইত’ অর্থ ঘর। তাহলে “আহলে বাইত” অর্থ মহানবী (স.) এর ঘরের অধিবাসী। ‘পাক’ অর্থ পবিত্র বা পরিশুদ্ধ এবং ‘পাঞ্জাতন’ অর্থ পাঁচটি শরীর। কাজেই পাক পাঞ্জাতন মানে পবিত্র পাঁচটি শরীর বা ব্যক্তি তথা হযরত মুহাম্মদ (স.), হযরত আলী (আ.), হযরত ফাতেমা (আ.), হযরত ইমাম হাসান (আ.) ও হযরত ইমাম হোসাইন (আ.)। (আয়াতে তাৎহির)। সৃষ্টির মূল ধারক বাহক হলো পাক পাঞ্জাতন এবং তাঁর নবুয়তী ছুরত হলো উক্ত পাঁচজন। তাদের বেলায়তি রূপ সমগ্র সৃষ্টিব্যাপী স্থিত আছে এবং তাঁদের সেই স্থিতাবস্থা হতে উপস্থিত রূপ হলো নবুয়তি সুরত। যাদেরকে ভালবাসা হলো ঈমানের মূল ভিত্তি (সুরা শুরা-২৩ আয়াত)।
“আলাইহিস সালাম” শব্দের অর্থ তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক। ইহা একটি উত্তম প্রার্থনা। যেমন আমরা (মুসলমান) সবাই একে অপরকে সালাম দিয়ে থাকি। এখন আলাইহিস সালাম যদি শুধুমাত্র নবী রাসুলগণের নামের পাশেই ব্যবহার জায়েজ ,অন্য কারোর জন্যে জায়েজ না থাকতো, তাহলে হযরত হাওয়া (আ.) হযরত মরিয়ম (আ.), হযরত খিজির (আ.), হযর লোকমান (আ.), ইমাম মাহাদী (আ.) এবং জিবরাইল, মিকাইল, ইসরাফিল ও আজরাইল তিনাদের নামের শেষে (আ.) শব্দটি ব্যবহার করা হতো না, কেননা উনারা কেউই নবী রাসুল নন। ইমাম মেহেদী (আ.) শুধু নবীবংশের হওয়ার কারণে যদি তাঁর নামের শেষে (আ.) ব্যবহার করা হয়, তাহলে আহলে বাইয়াতদের নামের শেষে (আ.) ব্যবহার করা হবে না কেনো? প্রমাণ হলো নবী রাসুল ছাড়াও অন্যান্যদের নামের শেষে (আ.) ব্যবহার বৈধ বা জায়েজ।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক, মুমিন, পরহেজগার ও বেহেশতীদের সালাম দিয়েছেন। যেমন- সুরা ইয়াসিন ৫৮, সুরা ত্বহা ৪৭, সুরা আরাফ ৪৬ নং আয়াত দ্রষ্টব্য। আমরা সালাতে তাশাহুদ বৈঠকে দরূদ শরীফ পাঠকালে আলে মোহাম্মদ অর্থাৎ আহলে বাইত পাক পাঞ্জাতনকে সালাম দিচ্ছি (বুখারী শরীফ কিতাবুত তাফসীর ৪৪৩৪ নং হাদিস)। সকল মাযহাব অনুসারীগণ ইমাম মাহদী (আ.) এর নামের শেষে আলাইহিস সালাম লিখা বা বলা জায়েজ এতে একমত পোষণ করেছেন। কিছু দলিল তুলে ধরছি।
১। বুখারী শরীফ (৩৭/৬২নং অধ্যায়) হযরত ফাতিমার নামের শেষে (আ.)।
২। কিতাব নম্বর ৫০ বাব নম্বর ৬১ তিরমিজি শরীফ।
৩। তিরমিজি শরিফের মানাক্বিব আল হাসান ওয়াল হুসাইন আলাইহিম ওয়াসাল্লাম।
৪। মানাক্বিবে ফাতেমা। পৃষ্ঠা নং – ৪৬, ৮, ১১, ১৭, ২১, ও ২৪।
৫। রাহাতুল কুলুব। পৃষ্ঠা নং – ২৮, ১০৭, ১৬১, ১৮৪ ও ১৯৪।
৬। মাদারেজুন নবুয়ত – ২য় খন্ড ৫৪৫ নং পৃষ্ঠা।
৭। ফাতওয়ায়ে আজিজি – ১ম খন্ড ৮৪ ও ২৩৪ নং পৃষ্ঠা।
৮। তারিখে তাবারি – ৬ষ্ঠ খন্ড ১৯৪, ২১৬, ২৩৩, ও ২৬৯ নং পৃষ্ঠা।
৯। সহীহ আল বুখারী ৫ম খন্ড – হাদিস নং ৫৫ ও ৯১।
১০। সফরনামা। পৃষ্ঠা নং ১২০, ১৬১, ১৮৪ ও ১৯৪।
১১। হযরত আলী (আ.) এর নামের সাথে (আ.)। তাফসীরে মাজহারি।
১২। আল মোস্তাদরাক ৫ম খন্ড ১৭৬৩ পৃষ্ঠা।
সুতরাং প্রমাণ হলো, আহলে বাইতের নামের শেষে আলাইহিস সালাম বলা জায়েজ।
আশুরা বিষয়ক উক্তি সংকলন
সংকলক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.) এর আত্মত্যাগ যুগে যুগে প্রেরণা যুগিয়েছে সত্যান্বেষী দের। ইমাম হুসাইন (আ.) প্রসঙ্গে কিছু মনীষীর উক্তি তুলে ধরা হলো।
বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক ও ঐতিহাসিক টমাস কার্লাইল বলেন, ‘যেখানে সত্য ও মিথ্যা মুখোমুখি, সেখানে সংখ্যা কোনো বিষয় না। ইমাম হুসাইন (আ.) মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে নিয়ে যে বিজয় অর্জন করেছেন, তা আমাকে বিস্মিত করেছে।’
বিখ্যাত ইংরেজ সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্স বলেন, ‘যদি ইমাম হুসাইন পার্থিব কামনা বাসনার জন্য যুদ্ধ করতেন, তাহলে তিনি স্ত্রী সন্তানদেরকে সঙ্গে আনতেন না। তিনি শুধু ইসলামের জন্যই ত্যাগ স্বীকার করেছেন।’
ইংরেজ ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গিবন বলেন, ‘সেই সুদূর অতীতের পরিবেশে ইমাম হুসাইনের মৃত্যুর করুণ দৃশ্য পাষাণতম পাঠকের হৃদয়েও জাগিয়ে তোলে সহানুভূতি।’
বিখ্যাত ইংরেজ প্রাচ্যবিদ এডওয়ার্ড ব্রাউন বলেন, ‘এমনকি কোনো অমুসলিমও নেই যে এই যুদ্ধকে ও তাঁর পতাকাতলে যে পবিত্রতা সাধিত হয়েছে তা অস্বীকার করতে পারে।’
মার্কিন ঐতিহাসিক ওয়াশিংটন আরভিং বলেন, ‘শুষ্ক মরু প্রান্তরে প্রখর সূর্য তাপের নিচে এবং আরবের উত্তপ্ত বালুকারাশির মাঝে হোসাইনের আত্মা অবিনশ্বর হয়ে আছে।’
বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক টমাস মাসারিক বলেন, ‘ইমাম হোসাইনের শোকের বিপরীতে ঈসা (আ.) এর শোক যেন বিশালদেহী এক পর্বতের সামনে ক্ষুদ্র এক খড়কুটোর সমান।’
বিখ্যাত ইংরেজ লেখক মরিস ডু কিবরি বলেন, ‘তাই আসুন, আমরাও ইমাম হুসাইন (আ.) এর এ পন্থাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি। সম্মানের মৃত্যুকে অবমাননাকর জীবনের ওপর প্রাধান্য দিই।’
জার্মান প্রাচ্যবিদ মরবিন বলেন, ‘ইমাম হুসাইন (আ.) প্রিয়তম স্বজনদেরকে উৎসর্গ করে নিজ অসহায়ত্ব ও সত্য পন্থাকে প্রমাণিত করার মাধ্যমে দুনিয়াকে ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের শিক্ষা দিয়েছেন।’
ইংরেজ প্রাচ্যবিদ পার্সি সয়েক্স বলেন, ‘হাতে গোনা কয়েকজন সাহসী পুরুষ কারবালার প্রতিরক্ষাকারীদের মতো নিজেদের সমুন্নত নামকে চিরকালের জন্য অক্ষয় করে গেছেন।’
খ্রিষ্টান গবেষক অ্যান্টন বারা বলেন, ‘যদি হুসাইন (আ.) খ্রিষ্টান হতেন, তাহলে প্রত্যেক দেশেই তাঁর জন্য পতাকা ওড়াতাম।’
ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান নেতা মাহাত্মা গান্ধী বলেন, ‘ইসলাম তরবারীর জোরে নয়, ইমাম হুসাইন (আ.) এর চরম আত্মত্যাগের ফলেই বিকশিত হয়েছে।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, ‘ইমাম হুসাইন (আ.) শীতলতম হৃদয়কেও উষ্ণ করেন। ইমাম হুসাইন (আ.) এর আত্মত্যাগ আধ্যাত্মিক স্বাধীনতাকে তুলে ধরে।’
প্রবন্ধ – শোকের মাস মহররম
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
৪র্থ হিজরীর ৩রা শাবান। ৬ মাস মাতৃগর্ভে থেকে মদিনা শরীফে জগত জননী (আ.) এর কোল আলোকিত করে ভুমিষ্ঠ হলেন এক জ্যোতির্ময় শিশু। খবর শুনেই রাসুল পাক (সা.) ছুটে গেলেন মা ফাতিমা (আ) এর ঘরে। “তাড়াতাড়ি আমার সন্তানকে আমার কাছে নিয়ে এসো” বললেন ধাত্রীকে। নবজাতককে আনা হলেই রাসুল পাক (সা.) তুলে নিলেন কোলে। ঘোষণা করলেন, “এ শিশু চির পবিত্র। আল্লাহপাক এঁকে পাক পবিত্র করে দিয়েছেন।
নিজেই নাম রাখলেন “আল হুসাইন আলাইহিস সালাম।”
হুসাইন (আ.)। যার সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, “হুসাইন আমা হতে এবং আমি হুসাইন হতে; যে কেহ হুসাইনকে মহব্বত করে, আল্লাহ তাকে মহব্বত করেন; হুসাইন স্বয়ংই একটি বংশ; হুসাইনকে যে ভালোবাসলো, সে আমাকে ভালোবাসলো; দুই ইমাম জগতের আমার দুটি সুগন্ধ পুষ্প; জান্নাতীদের সর্দার; হুসাইনের কান্না আমাকে কষ্ট দেয়; হুসাইন আমার উদারতা ও বীরত্ব উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করবে; ইত্যাদি।
ইমাম হুসাইন (আ.)। যিনি দ্বীনে মোহাম্মদীর ধারক ও বাহক। বর্ণনা করে যার গুণাবলী উল্লেখ করা অসম্ভব। যার সম্পর্কে যথোপযুক্ত উক্তি করেছেন ভারতবর্ষে দ্বীনে মোহাম্মদীর বিজয়কেতন উড্ডয়ণকারী গরীবে নেওয়াজ হযরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতী (র.)। তিনি বলেছেন, “আমি নিজেকে ইমাম হুসাইনের ঘোড়ার পদধূলি বলতেও লজ্জাবোধ করি”। ইমাম হোসাইন (আ.) দ্বীনের সবচাইতে কঠিনতম কাজটি সম্পাদন করেছেন। সমস্ত পরিবার পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, সুহৃদ-বন্ধুদের সাথে আপন মস্তককেও হাসিমুখে উৎসর্গ করেছেন কারবালার মাঠে। ইনছানিয়াতকে প্রতিষ্ঠিত করার যুগধর্মের এ সংগ্রামে, শত যন্ত্রণাকে অবলীলায় অতিক্রম করে রুখে দিয়েছেন হায়ানাতের দূর্ভেদ্য প্রাচীরকে। কারবালায় মুয়াবিয়া-এজিদ গংদের বিরুদ্ধে আপন জীবন, পরিবার-পরিজন সহ শিবিরের সকলের জিবনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সত্যধর্মকে। মোহাম্মদী ফুল বাগিচায় এনেছেন বসন্ত!
রাসুলে পাক (সা.) এর ধর্ম বিধান কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে অবৈধভাবে মসনদ দখলকারী কুট-কৌশলী মুয়াবিয়া তার লম্পট, চরিত্রহীন, কান্ডজ্ঞানহীন, ধর্মভয় বিবর্জিত, মদ্যপ কুপুত্র ইয়াজিদ কে ক্ষমতায় অভিষিক্ত করেন এবং অবৈধভাবে দখল করা ক্ষমতাকে কি করে কন্টকমুক্ত করা যাবে তার সাম্ভাব্য সকল পথ-পদ্ধতি তার কুপুত্রকে বাতলে যান। যার পথ ধরেই ইয়াজিদ পিতার মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই সকল জনগণ থেকে এমনকি ইমাম হুসাইন (আ.) সহ আহলে বাইয়াতের অনুসারী সকল ব্যক্তিবর্গের নিকট থেকে আনুগত্যের বাইয়াত দাবী করে। ইমাম হুসাইন (আ.) এ অযৌক্তিক দাবীর উত্তরে বলে দিলেন, “ইসলাম বিদায় হয়ে যাবে যদি উম্মত ইয়াজিদের ফাঁদে পরে”।
ইয়াজিদ নিজেকে মুসলিম জগতের একমাত্র খলিফা ঘোষণা করে উন্মত্তপ্রায় হয়ে উঠলো ইমাম হুসাইন (আ.) এর বাইয়াত আদায়ের জন্য। তৎকালীণ মদিনার গভর্নর ওয়ালিদ ইবনে ওতবা কে জানিয়ে দেয়া হলো, “যে কোনো উপায়ে ইমাম হুসাইন (আ.) থেকে বাইয়াত আদায় করতে হবে। অবাধ্য হলে তাঁকে হত্যা করে মস্তক দামেস্কে পাঠিয়ে দিবে।” ওয়ালিদ ইয়াজিদের ঘোষণা এবং পরিণতির হুমকি ইমাম হুসাইন (আ.) কে জানিয়ে দিলেন। কিন্তু দ্বীনে মোহাম্মদীর ধারক, মানবজাতির মুক্তির দিশারী ইমাম হুসাইন (আ.) এর পক্ষে ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত নেয়া মানেই ধর্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া, যেটা কখনোই সম্ভব নয়।
ইয়াজিদ অটল থাকলো তার পরিকল্পনায়। যে করেই হোক ইমাম হুসাইন (আ.) এর বাইয়াত আদায় করতেই হবে। এদিকে ইমাম হুসাইন (আ.) ও ভাবছেন, ইয়াজিদ তার পিছু ছাড়বে না। হুসাইন (আ.) এর ইচ্ছা হলো তিনি মদিনা ত্যাগ করে চলে যাবেন। এমনিতেই মদিনাতে তাঁর অনেক শত্রু ছিল যারা ইয়াজিদ কর্তৃক নিযুক্ত ছিল। দ্বীনে মোহাম্মদীকে প্রাণের বিনিময়ে হলেও রক্ষা করতে হবে। চারদিকে শত্রু। অবশেষে ৩রা শাবান তিনি অশ্রু বিগলিত চিত্তে মদিনা ছেড়ে মক্কার দিকে রওয়ানা হলেন।
মক্কাবাসীগণ সাদরে গ্রহণ করলেন ইমাম হুসাইন (আ.) কে। মক্কায় পৈতৃক বাড়িতে ইমাম হুসাইন (আ.) তার বৈমাত্রেয় ভাই মোহাম্মদ হানিফ, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর তাদের সাথে বাস করতে লাগলেন।
থেমে থাকলো না ইয়াজিদের কু-প্রচেষ্টা। ইমাম হুসাইনের বাইয়াত অথবা হত্যা, এমন পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে থাকলো স্বার্থান্ধ ইয়াজিদ। মক্কাও ধীরে ধীরে অনিরাপদ এবং শত্রু বেষ্টিত হয়ে উঠলো ইমাম হুসাইন (আ.) এর জন্য। ওদিকে মারওয়ানের কুটকৌশলে কুফার অস্থিরচিত্ত জনগণ ইমাম হুসাইন (আ.) কে আহ্বান করে শত শত চিঠি পাঠাতে লাগলো মক্কায়। কুফার তৎকালীণ গভর্নর আহলে বাইয়াতের অনুসারী নোমান বিন বশির সহ কুফার জনগণ জিবনের বিনিময়ে ইমাম হোসাইন (আ.) কে রক্ষা করবে এমন প্রতিজ্ঞা করে তাঁকে কুফায় আহ্বান করতে লাগলেন।
ইমাম হোসাইন (আ.) এর সম্মুখে দুটি পথ খোলা। ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত তো অসম্ভব। এখন হয় মক্কায় বসে থেকে ইয়াজিদের আক্রমণের দিন গুনতে হবে, অথবা কুফাবাসীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে কুফায় গমন করতে হবে।
কুফায় যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন ইমাম হুসাইন (আ.)। কিন্তু কুফাবাসীর অস্থিরচিত্ততার কথা তিনি জানতেন। তাই প্রথমে চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকীলকে পরিস্থিতি বিবেচনার জন্য কূফায় পাঠালেন ইমাম হুসাইন (আ.)। মুসলিম বিন আকীল কূফায় পৌঁছামাত্র দলে দলে কূফাবাসী এসে মুসলিম বিন আকীলের নিকট ইমাম হুসাইন (আ.) এর নামে বাইয়াত গ্রহণ করতে লাগলো। জানা যায়, ১৮ হাজার মানুষ মুসলিম বিন আকীলের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেছিল। মুসলিম বিন আকীল কূফাবাসীর আগ্রহ, ভক্তি আর দৃঢ়তা দেখে ইমাম হুসাইন (আ.) কে সবিস্তারে বর্ণনা করে কূফায় আসতে বলে চিঠি লিখেন।
ওদিকে কূফায় মুসলিম বিন আকীলের ইমাম হুসাইনের নামে বাইয়াত গ্রহণের কথা জানিয়ে ইয়াজিদ কে পত্র লিখলো কূফার ইয়াজিদ মিত্র আবদুল্লাহ বিন মুসলিম বিন রাবিয়া হাযরামি। একই ধরণের চিঠি ইয়াজিদ কে লিখলো আম্মারাহ বিন উকবাহ এবং ওমর বিন সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস। পত্র পেয়ে মস্তক ঘুরে গেলো ইয়াজিদের। সাথে সাথে কূফার গভর্নর নোমান বিন বশীর কে সরিয়ে তার অনুগত ধর্মভয় বিবর্জিত পাষন্ড জিন্দিক ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ (আবু সুফিয়ানের অবৈধ সন্তান) কে কূফার গভর্নর করে কূফায় পাঠিয়ে দিলো। জিয়াদের প্রতি হুকুম দেয়া হলো, মুসলিমের বায়াত বন্ধ করো, প্রয়োজনে তাকে হত্যা করো। যদি হুসাইন কূফায় আসে, তাকেও বন্দী করো অথবা মস্তক কেটে দামেষ্কে পাঠিয়ে দাও।
ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ কূফার গভর্নর হয়ে এসেই মুসলিম বিন আকীল কে বন্দী করলেন। জিয়াদের ভয়ে কূফার অনুকূল পরিবেশ মুহুর্তেই প্রতিকূল হয়ে উঠলো। যারা বাইয়াত নিয়েছিল, সবাই জিয়াদের ভয়ে আত্মগোপন করলো। মুসলিম বিন আকীল বন্দী। তখন মুসলিম বিন আকিলের একটাই ভাবনা। ইমাম হুসাইন (আ.) কে তো অনুকূল পরিবেশ দেখে আসতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন তো পরিবেশ পুরোটাই প্রতিকূল। এখন কে ইমামকে এ সংবাদ পৌঁছে দিবে?
ওদিকে কূফার উদ্দেশ্যে ছোট্ট একটি কাফেলা নিয়ে রওয়ানা হলেন ইমাম হুসাইন (আ.)। আত্মীয়, ভক্ত, স্ত্রী-সন্তানদের একটি ছোট্ট কাফেলা। চলতে হবে আটশত মাইল পথ! পথে নামলো নবী বংশের এ ছোট্ট কাফেলাটি।
মুসলিম বিন আকীল কে হত্যা করলো ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ। ইরাকের কাছাকাছি পৌঁছে সেই সংবাদ কর্ণগোচর হলো ইমাম হুসাইন (আ.) এর। মর্মাহত হলেন তিঁনি। তবু দ্বীনে মোহাম্মদীকে জগতের বুকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে কাফেলা নিয়ে এগিয়ে চললেন ইরাকের দিকে। কূফার দিকে।
অভিশপ্ত ইয়াজিদ ও জিয়াদের বাহিনী ইমাম হুসাইন (আ.) কে বাধা দেয়ার জন্য কূফার সকল পথে সৈন্য নিয়োগ করে রেখেছিল। ইমাম হুসাইন (আ.) মহররম মাসের ১ তারিখ ইরাক সীমান্তের ‘শাফার’ নামক স্থানে পৌঁছান। আর সম্ভব নয় পেছন ফেরা। সামনে অভিশপ্ত ইয়াজিদ জিয়াদের উন্মুক্ত তরবারী; ঈমানের বলে বলীয়ান, ঐশী শক্তিতে শক্তিশালী, প্রভুপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ইমাম হোসাইন (আ.) এগিয়ে চললেন কারবালার পথে। মহাজীবনের পথে!
যখন ইমাম হুসাইন ইরাকের ‘শারাফ’ নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন সেনাপতি হুর বিন ইয়াজিদ তামিমির নেতৃত্বাধীন ১ হাজার ঘোরসওয়ার সেনা এসে হুসাইন (আ.) এর তাবু ঘেরাও করলো। দিনে রাতে, আলোয় অন্ধকারে চলতে থাকে তাবু। চারদিকে এজিদি সৈন্য। ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর ছোট্ট কাফেলা। চলতে চলতে কাফেলা এসে থামে বিরাট এক উন্মুক্ত প্রান্তরে। ইমাম হুসাইন (আ.) প্রান্তরের নাম জানতে চাইলে তাঁকে জানানো হলে এ স্থানটির নাম মারিয়া (কারবালার অপর নাম)। চমকে উঠলেন হুসাইন (আ.)।
ইতোমধ্যে জিয়াদের অপর সেনাপতি ওমর বিন সাদ অসংখ্য সৈন্যসহ ঘেরাও করলো ইমাম হুসাইন (আ.) এর ছোট্ট কাফেলাকে। ইয়াজিদের নির্দেশ, হয় বাইয়াত নয়তো মস্তক। জিয়াদের সৈন্য আসতেই থাকলো কারবালার দিকে যতক্ষন না তাদের সংখ্যা ত্রিশ হাজারে উপনীত হয়।
ফোরাত নদীর কূলে তাবু স্থাপন করতে দেয়া হলো না ইমাম পরিবারকে। নদী থেকে তিন মাইল দূরে তাবু স্থাপন করলেন তারা। খাদ্য বিহীন, পানি বিহীন। পিপাসার আর্তি উঠতে লাগলো ইমাম শিবির থেকে। পরিস্থিতি বিবেচনায় যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠলো। যুদ্ধ যখন অনিবার্য, তখন ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর তাবুর অন্যান্য আত্মীয় বন্ধুদের অন্যত্র সরে যাবার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু যারা সরে যাবার ছিল, তারা পূর্বেই সরে গিয়েছিল। এখন তাবুতে যারা আছেন, তারা প্রত্যেকেই মূর্তিমান হোসাইন। দ্বীনের জন্য, সত্যের জন্য, ন্যায়ের জন্য সবাই জিবন দিতে প্রস্তত। ইমাম হুসাইন (আ.) শেষবারের মতো রক্তারক্তি এড়ানোর জন্য তিনটি প্রস্তাব পেশ করলেন ইয়াজিদের সেনাপতির নিকট। ১. হয় আমাকে মদিনায় ফিরে যেতে দেয়া হোক, ২. নয়তো আমাকে ইয়াজিদের নিকট যেতে দেয়া হোক। আমি তার সাথে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করবো, ৩. অথবা আমাকে অন্য কোনো মুসলিম আশ্রয় নিতে দেয়া হোক।
শর্ত শুনে ওবায়দুল্লাহ জিয়াদ শিমার ইবনে যিলজোশান এর নেতৃত্বে হুসাইন (আ.) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এবং হুসাইন (আ.) কে হত্যা করার জন্য প্রচুর সৈন্যসহ কারবালায় পাঠায়। শিমার কারবালায়
এসেই যুদ্ধ অনিবার্য এবং ত্বরান্বিত করে তোলে।
৯ই মহররমের রাত কে বলা হয় আশুরার রাত। একটু তন্দ্রালু হয়ে পড়েছিলেন ইমাম হুসাইন (আ.)। স্বপ্নে দেখলেন, রাসুল পাক (সা.) বলছেন, “হে বৎস! তোমাদের আমার নিকট আসার সময় হয়েছে।” চিৎকার দিয়ে জেগে উঠলেন ইমাম হুসাইন (আ.)। সবাইকে জানালেন স্বপ্নের কথা। ভাবকাতর আবহ তৈরী হলো ইমাম তাবুতে। কেঁদে বুক ভাসালেন জয়নব। এমনি সময়ে, আত্মত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনে প্রস্তুত ইমাম শিবিরে অবমুক্ত হলো ধর্মবোধ তথা সত্যবোধের এক সুউচ্চ মাকাম। জিবন দেয়ার এ অসম লড়াইয়ে আপন দ্বীন কে জয়ী করতে বদ্ধপরিকর হলো ইমাম শিবির। তাবুর নিকট এসে হুংকার ছাড়লো নরপিশাচ শিমার ইবনে যিলজোশান। বন্দী নবী পরিবার হতে জানিয়ে দেয়া হলো, আজ রাত আমরা ইবাদত বন্দেগীতে কাটাবো। আগামী কাল যুদ্ধ হবে।
১০ই মহররম। দ্বীনে মোহাম্মদীর মূর্তমান রূপ মাওলা ইমাম হুসাইন (আ.) তার সঙ্গী-সাথী, আত্মীয়-স্বজন, ভক্তদের নিয়ে প্রস্তুত হলেন কারবালার মাঠে। দ্বীনে মোহাম্মদীর শাশ্বত পতাকা বুকে ধরে তৈরী হলেন আত্মবলিদানের জন্য। ৩২ জন অশ্বারোহী আর চল্লিশজন পদাতিক সৈন্য নিয়ে তৈরী হলেন এ অসম যুদ্ধের জন্য। অপরদিকে ইয়াজিদের গভর্নর ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের নেতৃত্বে ওমর বিন সাদ, শিমার বিন যিলজোশানের ত্রিশ সহ¯্রাধিক অস্ত্র-সুসজ্জিত সেনা। ইমামের পক্ষ থেকে হযরত জোহায়ের (রা.) ঘোড়া চালিয় যেয়ে শত্রু সেনাদের সামনে এক আবেগপ্রবণ বক্তব্য রাখলেন। যে বক্তব্য দাগ কাটলো সেনাপতি হুর এর অন্তরে। সে বুঝতে পারলো, নবী বংশকে ধ্বংস করাই ইয়াজিদের মূল পরিকল্পনা। অনুতপ্ত হুর আশ্রয় নিলেন ইমাম হুসাইন (আ.) এর পবিত্র চরণ মোবারকে!
শুরু হলো যুদ্ধ! একদিকে মুষ্টিমেয় কয়েকজন ইমাম সেনা, অন্যদিকে সুসজ্জিত ইয়াজিদি সৈন্য। একদিকে ঈমানী বলে বলীয়ান ৭২ জন ইমাম প্রেমিক, অন্যদিকে ত্রিশ হাজার ইয়াজিদি সেনা।
অসম এ যুদ্ধে একে একে ইমাম সৈন্য প্রাণ হারাতে লাগলেন। অসীম বিক্রমে যুদ্ধ করে অসংখ্য পাপী ইয়াজিদ সৈন্যকে ধরাশায়ী করে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করতে লাগলেন এক একজন ইমাম সৈন্য। বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে গেলেন সেনাপতি হুর। শহীদ হলেন দুভাই জাফর এবং আব্দুল্লাহ। শাহাদাতের সুধা পান করলেন মুসলিম বিন আওসাজা। ওমায়ের কালবী, উম্মে ওয়াহাব, জাবীব ইবনে মোযাহের সবাই শহীদ হয়ে গেলেন। ইমাম হুসাইন (আ.) এর আওলাদগণ ব্যতিত সবাই পান করলেন শাহাদাতের অমীয় সুধা।
১০ই মহররম শুক্রবার দুপুরের পর ইমাম শিবিরে ইমাম পরিবারের কয়েকজন ব্যতিত আর কেউ অবশিষ্ট নেই। সবাই শহীদ হয়েছে। এবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন ইমাম হুসাইন (আ.) এর বড় ছেলে আলী আকবর। ‘লাহিক’ নামক ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে অমিত তেজে যুদ্ধ করে অগণিত শত্রু সৈন্য ভূপতিত করে শহীদ হন আলী আকবর (আ.)। ইয়াজিদ সৈন্যের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন সখিনার স্বামী হযরত কাসেম (আ.)।
এরপর যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন ইমাম বাহিনীর পতাকাবাহক সানী আব্বাস আলামদার। ইমাম তাবুতে পিপাসার আর্ত কান্না শুনে সানী আব্বাস ছুটলেন ফোরাতের তীরের দিকে। অসীম শক্তিমান যোদ্ধা সানী আব্বাস আলামদার, ফোরাত তীর অবমুক্ত করে নদী থেকে পানি নিয়ে ছুটলেন ইমাম তাবুর দিকে। ইয়াজিদ বাহিনী এবার চারদিক থেকে শুরু করলো আক্রমণ। প্রচন্ড আক্রমনে কেটে গেলো যথাক্রমে ডান ও বাম হাত। তীর এসে বিদ্ধ হলে পিঠে। তবু তিনি হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে লাগলেন তাবুর দিকে। এমন সময় একটা তীর হলে বিদ্ধ হলো তার পানির মশকে। মরুভূমির বুকে গড়িয়ে পড়লো মশকের সব পানি। ইমাম হুসাইন (আ.) দৌঁড়ে এসে কোলে তুলে ধরলেন সানী আব্বাসকে। ইমামের নূরানী চেহারা মুবারকের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিদায় নিলেন সানী আব্বাস আলামদার। শোকে মূহ্যমান ইমাম হুসাইন (আ.) শিবিরে ফিরে দেখেন, মাসুম শিশু আলী আসগর পানির পিপাসায় মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে। সহ্য করতে না পেরে ইমাম হুসাইন (আ.) শিশু আলী আসগর কে দুহাতে উঁচু করে ধরলেন ইয়াজিদ সেনাদের সামেনে। চিৎকার করে বললেন, “হে ইরাক ও সিরিয়ার অধিবাসীরা! তোমরা হুসাইনকে শত্রু মনে করতে পারো, কিন্তু এ মাসুম শিশুতো তোমাদের কোনো ক্ষতি করেনি। শিশুটি তৃষ্ণায় মারা যাচ্ছে। সামান্য পানি তাকে দাও। আল্লাহর কসম, এক ফোটা পানিও আমরা পান করবো না।” নিষ্ঠুরতার কি নির্মম প্রদর্শনী! শত্রু শিবিরের মধ্য হতে হারমলা বিন কাহেন আসাদী নামক এক ব্যক্তি ইমাম হুসাইন (আ.) কে লক্ষ্য করে তীর ছুড়লেন। সে তীর এসে বিদ্ধ হলো শিশু আলী আসগরের কচি বুকে। ফিনকি দিয়ে ছুটলো রক্ত। শোকে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ইমাম হুসাইন (আ.)।
এবার যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তত হলেন স্বয়ং ইমাম হুসাইন (আ.)। মাথায় আমামা, কোমরে কোমরবন্ধনী, হাতে জুলফিকার, পৃষ্ঠে ঢাল, বাম হাতে বর্শা, ডান হাতে তরবারী নিয়ে প্রস্তুত হলেন ইমাম হুসাইন (আ.)। চিরমুক্তির পথপ্রদর্শক, বাক্সময় কোরান, ধর্মের ধারক বাহক, ত্যাগ ও ন্যায়ের মূর্ত প্রতীক আজ যোদ্ধার বেশে চলেছেন ধর্মকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে। মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচণ করতে। মুসলিম বেশধারী মুনাফিকদের চিহ্নিতকরণের জন্য এ বেশ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ইমাম হুসাইন (আ.) শত্রুসৈন্যর নিকট গিয়ে প্রদান করলেন তার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য। “আলাইছা ফি মুসলিমুন? তোমাদের মধ্যে কি একজনও মুসলমান নেই?” নিরব সৈন্যবাহিনী। তাবুতে ফিরে এলেন ইমাম হুসাইন (আ.)। সবার থেকে শেষ বিদায় নিয়ে, সবাইকে শেষ নসীহত করে তিনি দুলদুলে সওয়ার হয়ে রওয়ানা হলেন যুদ্ধে।
অমিত বিক্রমে যুদ্ধ শুরু করলেন ইমাম হুসাইন (আ.)। তাঁর অপ্রতিরোধ্য বিক্রমের কাছে টিকতে পারলো না সম্মিলিত শত্রু বাহিনী। ফোরাত কূল অবমুক্ত করলেন একাই। পানিতে নেমে দুহাতে পানি তুলতেই মনে পরলো শিশু বাচ্চাদের পানির জন্য আহাজারীর করুণ দৃশ্য। ফেলে দিলেন হাতের পানি। এমনি মুহুর্তে একটি তীর এসে বিদ্ধ হলো তাঁর মুখে। অতি কষ্টে মুখ থেকে তীরটি খুলে পুনরায় ফিরে আসলেন যুদ্ধের ময়দানে। অগনিত আঘাতে শরীর হতে বেগে নির্গত হচ্ছে রক্ত। তবু ক্ষিপ্ত সিংহের ন্যায় যাকে যেখানে পেলেন সংহার করে চললেন। ওমর বিন সাদ সম্মুখ থেকে সরে গেলো ভয়ে। শেরে খোদার শের পুত্র ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর, শোকে মূহ্যমান, তবু কি অসীম তাঁর বিক্রম! চলতে থাকলো যুদ্ধ।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে ইমাম হুসাইন (আ.) এর শরীর দূর্বল হতে থাকলো। পাপিষ্ঠ জোরআ বিন শরীফ তামিমী পেছন দিক থেকে এসে ইমাম হুসাইন (আ) এর বাম হাতটি কেটে ফেলে। ইমাম কে বর্শা দিয়ে আঘাত করে পাপিষ্ঠ সেনান বিন আনাস নাখায়ী। বুকে বর্শার আঘাত, গলায় বিধে যাচ্ছে তীর! তীব্র যন্ত্রনায় মাটিতে পড়ে যান ইমাম হুসাইন (আ.)। চারদিক থেকে অবিরাম আঘাতের পর আঘাত পতিত হচ্ছে ইমাম হুসাইনের শরীরে। শত শত তীর বিধে যাচ্ছে পাকতনে! বুকে তলোয়ারের আঘাত করে সালেহ বিন ওহাব! ওমর বিন সাদ ঘোষণা দিলেন, শীঘ্রই হুসাইনের মাথা কেটে ফেলো! চির অভিশপ্ত শিমার বিন যিলজোশান ইমাম হুসাইন (আ.) এর মস্তক দ্বিখন্ডিত করে ফেললো।
শহীদ হলেন ইমাম হুসাইন (আ.)। দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করতে শাহাদাতের অমীয় পেয়ালা পান করে সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে চিরঞ্জীব জীবনের অধিকারী হওয়া যায়।
ইমাম হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের পর দেখা গেলো তার পবিত্র শরীরর ওপর তেত্রিশটি বর্শার আঘাত, তেতাল্লিশটি তলোয়ারের আঘাত এবং অসংখ্য তীরের আঘাত রয়েছে। ইমাম পরিবারের এবং ইমাম শিবিরের যোদ্ধা সবাই শাহাদাত বরণ করেছিলেন এবং শত্রু শিবিরে জাহান্নামী হয়েছিল আটাশি জন।
ইয়াজিদের হিংস্র হায়েনার দল ইমামের শাহাদাতের পর তাঁর পবিত্র দেহ মুবারকের ওপর ঘোড়া চালিয়েছিলেন দেহ মুবারককে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার জন্য। যুদ্ধ শেষে শাহাদাত প্রাপ্তদের মস্তক মোবারক বর্শায় বিদ্ধ করে ওবায়দুল্লাহ জিয়াদের নিকট নেয়া হয়েছিল। তারপর সেই মস্তকসমূহ শিমার ইবনে যিলজোশানের নেতৃত্বে দামেস্কে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য শাহাদাত বরণ করলেন ইমাম হুসাইন (আ.)। চিনিয়ে দিয়ে গেলেন সত্য মিথ্যাকে। যুগ যুগ যারা জীবন্ত ধর্ম কে হত্যা করে অনুমান কল্পনায় ধর্ম করে আসছে, উন্মোচিত করলেন তাদের মুখোশ। হৃদয়ে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হলো সত্যধর্ম। ত্যাগের অপার মহিমার মধ্য দিয়েই উদ্ভাসিত হলো সত্য।
* আতায়ে রাছুল হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ মঈনুদ্দিন চিশতী আজমেরী (র.) বলেছেন, “ইমাম হুসাইন (আ.) হলেন দ্বীনের সম্রাট। তিঁনি দ্বীনের বাদশাহ। ইমাম হুসাইন (আ.) দ্বীনের মাপকাঠি এবং দ্বীনের আশ্রয়। ইয়াজিদের কাছে তিঁনি মাথা দিলেন, তবু হাত দেননি। সত্য কথা ইহাই যে, লা ইলাহা’র ভিত্তি হলেন ইমাম হুসাইন (আ.)।
* খাজা গরীবে নেওয়াজ (র.) আরো বলেন, “যে ব্যক্তি হুসাইন (আ.) এর গোলাম, আমি হলাম সেই গোলামের গোলাম।”
* খাজাবাবা (র.) বলেন, “বোকারা বুঝতে পারেনি ইমাম হুসাইন (আ.) পানি পিপাসায় অসহায়ের মতো মারা যাননি, বরং তিনি আসল ও নকলের ভাগটি পরিষ্কার করে দেখিয়ে গেছেন।”
কবিতা – তবু খোঁজ না পাও
লেখক – এস এম বাহরায়েন হক ওয়ায়েসী
এত কাছে খোদা তবু খোঁজ না পাও
আশেক বিহনে মাশুক, কি রূপে বাতাও।
অসীম দৌলত তোমার ইচ্ছার সহিতে
দিয়াছে বাক শক্তি প্রকাশ করিতে।
চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা ত্বক, শ্রবণ
অনুভবের সত্যের রাহা করিতে বর্ণন।
খেলাপ ইহাতে নাই দেখি বিচারিতে
অশুভ’রে শুভ করে দাসত্ব চিত্তে।
আরশ ফরস আর বাতেন জাহের
তোমাতেই সব ঘেরা কারণ এস্কের!
বুঝিতে পারবে সেই জ্ঞান রৌশনিতে
মুর্শিদ যার আছে সহায় সদায় মদতে।
অধম অধীন যত রাখে জ্ঞান হুঁশিয়ার
নালেক পায় না কখনও দেখেও দিদার!
অহম বোধ যার রয় দেল মথিতে
বোকা বলে হয় চিহ্নিত আকল নিক্তিতে।
অসীম অপার নাম ওজুদ বান্দার
আদবে খেলাপ নয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যার।
ময়দানে সে কভু কৃপণতা না করে
প্রভুর আজ্ঞায় সে হৃদয় দেয় ভরে।
বাহরায়েন শাহ আছে যার গোজার খেদমতে
মুর্শিদ শাহ মতিউল হক রেখেছে মানব আলোতে।
কবিতা – তুমি অতি প্রিয়
লেখক – আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস
তুমি যদি আকারহীন, তবে তোমার
এতো নামকরণ হলো কি করে?
তোমার তেজস্বী রূপে মুসা জ্বললোনা
তুর পাহাড় ছাঁই হলো পুড়ে!
আমি অন্ধের মতো তোমার পরশ
রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করি,
তাইতো আমি সদা – সর্বদা
তোমার-ই সালাত করি।
না চাইতেই যদি তব রূপ
বিমোহিত সুধা, রস – গন্ধ পাই,
আমি আনমনা সদা, উদাস হয়ে
তোমাতেই ডুবে রই।
তোমার সৃষ্টি তোমার দৃষ্টি
আমার চলার পাথেয়,
আমাতে তুমি, তোমাতে আমি
প্রিয় থেকেও তুমি অতি প্রিয়।
কবিতা – বিদায়
লেখক – ঝর্ণা হক
কত দিন আগে তোমায়, দিয়েছি বিদায়
বিরহ-বিধূর, কেনো বেদনা কাঁদায়।
থেকে থেকে মনে পরে, সেই যে প্রহর
সকলি আপনার তরে, কেউ নয় কারো।
ভরা প্রাণে প্রেম ছিল, আজ সে নাই
বিষাদের বিষে শুধু, করি হায় হায়।
স্মৃতির রেখাগুলো সব, শমসের হায়
বুকে চেপে বসে শুধু,আমারে কাঁদায়।
আজো সবার তরে, ভালোবাসা আছে
অন্তর পুড়ে ছাই, হৃদ রহে পাশে।
আঁখি চায় সুন্দর, প্রাণ বলে আয়
থাকিবেনা সেই সব, গোধূলী বেলায়।
কবিতা – জপমালা
লেখক – আমির হামজা শাহরিয়ার
নিত্য জ্বেলে রাখি প্রদীপ
অপেক্ষাতে নিরন্তর,
কবে আসবে আমার হৃদ বাসরে
মুর্শিদ প্রভু রূপ সুন্দর!
জপমালায় জপি আমি
দিবানিশি শ্রীনাম তার,
মোর আকুল ডাকে দিয়ে সারা
হৃদে এসো প্রাণেশ্বর।
চরণধুলি অঙ্গে ধরে
পূঁজবো তোমায় নিশিদিন,
আমার প্রেম পিপাসা মিটাইতে
রাখ মোর বাসরে শ্রীচরণ।
সংগীত – মরাকে আর ছোঁয় না যমে
লেখক – ফকীর আতিকুর রহমান চিশতী
মরাকে আর ছোঁয় না যমে, বান্ধেনা যমরশিতে
যমরাজা হয়েছে বাধ্য, যায়না তারে মারিতে।।
ভূত মেরে সার হইল সুজন, পাইলো তারা অমর জনম
জিন্দামরার এমন ধরণ, স্বেচ্ছায় পারে আসিতে।।
কলঙ্কহার লয়ে গলে, তারা মন্ত্র বিলায় ভক্তকূলে
মিশে না সে সাধুর দলে, ভক্তের জন্মফাঁদ চায় মুছিতে।।
লোক দেখানো কপনি বালা, মন চলে রমনের মেলা
আতিকের মন হয় গোশালা, আলেম তছবি টুপিতে।।
সংগীত – আসমান হতে উদয় আলো
লেখক – দাউদ আহমেদ চিশতী
আসমান হইতে উদয় আলো, জমিনে সেই মুরতি
মোহাম্মদ রাসুল আল্লাহ, করি তোমায় প্রণতি।।
তুমি আখেরেতে হলে আদম, দেখাইলে খোদ নূরীতন
তোমায় খলিফা করিলো খোদায়, দিয়ে তার নূরের জ্যোতি।।
খোদ খোদা সে হয় নবুয়্যত, খলিফা আদম বেলায়েত
মাওলা আলী হয় খলিফা, পেয়ে নূর মুহাম্মদী।।
খলিফা আদমের তরে, ফেরেস্তা সিজদা করে
সিজদা কি আর তুলতে পারে, আছে যার ধ্যানে মতি।।
বেলায়েত আর হয় নবুয়ত, মওলা আলী আর মুহাম্মদ
কোথায় কোনজন হয় খলিফা, দাউদ করে প্রণতি।।
সংগীত – মুশকিল কুশা মাওলা আলী
লেখক – হেলাল সরকার ওয়ায়েসী
মুশকিল কুশা মাওলা আলী, আল্লাহর অতি পিয়ারা
নবীজীর কলিজার টুকরা, নয়নের তারা।।
এই দুনিয়া সৃষ্টির আগে, আকাশের গায় পঞ্চভাগে
পাক পাঞ্জাতন ছিল জেগে, যারা সৃষ্টির মূল গোড়া।।
আমি যার মাওলা আলী তার মাওলা, বলছে আমার রাসুল আল্লাহ
আলীকে করিলে আওলা, আমাকে পাইবে তোমরা।।
পুলছিরাত কঠিন নিদানে, যার মহব্বত নাই আলীর সনে
জ্বলবে দোযখের আগুনে, মলিন হবে চেহারা।।
হেলাল সরকার অতি নাদান, কি বলবো পাঞ্জাতনের শান
দেয়না কিছু আল্লাহ মহান, যাদের উছিলা ছাড়া।।
সংগীত – আমার মানব তরী
লেখক – মোবারক হুসাইন ওয়ায়েসী
আমার মানব তরী হেলায় ডুবে যায়, দয়াল গুরু গো
কান্ডারী হইয়া এসে, বাঁচাও অকূল দরিয়ায়।।
কাম কামনার বিষয় জালে, মত্ত হইলাম তোমায় ভূলে
জানিনা শেষ নিদান কালে, কি হবে উপায়,
কান্ডারী হইয়া এসে, আমায় নিয়ে চলো আপন দেশে
আমার মানব তরী ঠেকিলো চড়ায়।।
কাঁচা বাঁশের ঘরখানি মোর, ঘুনে করলো জড়জড়
বাস করা যে হলো আমার দায়,
অধম মোবারকের শেষ নিদানে, ত্বরাও গুরু নিজগুণে
তোমার আপন দেশে দাও মোরে আশ্রয়।।
সংগীত – জানিলে আপন জানা যাবে সোবাহান
লেখক – মোতালেব হোসেন চিশতী
জানিলে আপন, জানা যাবে সোবাহান
যে জানে সে আরেফ হয়,
আলীকে দ্বীনের নবী, জানাইলেন সবি
তাইলে আলী জুলফিকার হয়।।
চৌদ্দ ভূবনে যাহা, সাঁই নিরাঞ্জন তাহা
মানব দেহে সব করেছে পূরণ,
আকাশ জমিনের খেলা, জানে আরেফ বিল্লাহ
না জানলে মানুষ কেনো মুমিন হয়।।
রুহ নফস যত জন, খুঁজিলে মানব তন
আরো আছে নিরাঞ্জন, এই দেহে,
মুকাম মঞ্জিল করলে তয়, সব কিছুই জানা যায়
আদম ও হাওয়া গন্দম পরিচয়।।
সংগীত – ডুব দিলে স্বরূপের ঘরে
লেখক – বাউল উজ্জল শাহ
ডুব দিলে স্বরূপের ঘরে
মালিক কি আর থাকে দূরে
নাম লেখে তার বন্ধুর সিরিয়ালে, পরোয়ারে –
ডুব দিলে কি থাকতে পারে দূরে!
দেখনা চেয়ে সরোবরে, রূপেতে রূপ বিরাজ করে
জেনে বুঝে ডাক দিতে হয় তারে।
আন্দাজেতে ডাক দিওনা, অখুশি হন শাঁই রাব্বানা
এক ডাক হয় না ভিন্ন ভিন্ন ঘরে! পরোয়ারে –
ডাক দিলে কি থাকতে পারে দূরে!
যখন যে রূপ হবে তোমার, আগেই খবর পাবে তাহার
রাখো নজর কখন খবর আসে।
না বুঝলে সেই গুরু বাণী, রোষের অনল পাইবা তুমি
উজ্জল বলে থাকো ধ্যানের ঘরে! পরোয়ারে –
ডুব দিলে কি থাকতে পারে দূরে!
সংগীত – মহাপ্রেমিক
লেখক – কাঙাল আব্দুর রহমান
মহাপ্রেমিক, হে মোর মাশুক, রহিম রহমান
দয়াল মুর্শিদ কোরান মাজিদ, বেনজীর চাঁন।
দয়াল খাজা তুমি রাজা, অধম কাঙাল তোমার প্রজা
পূজারী হইয়া গো তোমার, করি গুণগান।
শিখাইলে মানুষ ভজন, মানুষ তত্ত্বে রয় ভগবান
দেখা দিও নিদান কালে, হে সুমহান।
চাইহে করুণা তোমার, শুদ্ধ করো অন্তর আমার
নিও সদা তোমার করে, কাঙালের মনপ্রাণ।
প্রবন্ধ – আসরারে পাঞ্জাতন – ১১তম পর্ব
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
নবীজির দাদার দাদা ‘আবদে মান্নাফের’ তিন স্ত্রী হতে এগার সন্তান। তার মধ্যে পাঁচজন পুত্র এবং ছয়জন মেয়ে ছিল। হাশেম এবং আব্দে শামছ এক সাথে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কোনো কোনো বর্ণনায় দেখা যায় হাশেম ও আব্দে শামছের মাথার সম্মুখ ভাগটি সামান্য জোড়া লাগানো অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছিল। জন্মের পর তলোয়ার দিয়ে কেটে তাদেরকে আলাদা করা হয়। যাক, আব্দে শামছ হতে মানুষ কখনো উপকার বা সৎ আচরণ পায়নি এবং এ কথা ইতিহাসে বিধৃত রয়েছে। কারণ, কোরাইশ বংশের এ দু’ধারা কাবার সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং হাজীদের খেদমতে নিয়োজিত ছিল বহুপূর্ব হতেই। তাই হাশেম আব্দুদ্দারের অযোগ্যতা লক্ষ্য করে কাবার মোতাওয়াল্লি নিজের হাতে নিয়ে নেন। অবশ্য এ কার্য সমাধা করতে অনেক বিচার শালিশেরও প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। হাশেম অত্যন্ত সুচারু রূপে এবং ন্যায়নিষ্ঠ ভাবে কাবার মোতাওয়াল্লি পরিচালনা করেছিলেন। অধিকাংশ কোরাইশদের মতো তিনিও বাণিজ্যে ব্যাপৃত ছিলেন। তিনিই কোরাইশদের মধ্যে নিয়মিত ভাবে মক্কা থেকে দু’টি বাণিজ্য যাত্রীদল প্রেরণের প্রথা চালু করেছিলেন, একটি শীতকালে ইয়ামেনে ও অন্যটি গ্রীষ্মকালে সিরিয়ায়। হাশেম বাণিজ্য নিয়ে শাম দেশে যাবার পথে মদীনায় নাজ্জারিয়া উমরের বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন এবং তার পরমা সুন্দরী মেয়ে ছালমাকে বিবাহ করেন। হাশেম সিরিয়ায় এক বাণিজ্য অভিযান কালে গাজ্জা শহরে ৫১০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে ইন্তেকাল করেন। তিনি ইন্তেকালে সময় তার মদীনাবাসিনী মহিলা ছালমার গর্ভজাত একমাত্র পুত্র শায়বাকে রেখে যান। তার ইন্তেকালের পর ‘রিফাদা’ ও ‘মিকায়ার’ দায়িত্ব তদীয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা মুত্তালিবের উপর ন্যাস্ত হয়। তিনি তার স্বদেশ বাসীর দৃষ্টিতে উচ্চস্থান লাভ করেছিলেন এবং তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও দানশীলতার জন্য মহান উপাধি ‘আল ফয়েজ (বা দানবীর)’ পেয়েছিলেন। মুত্তালিব শ্বেতকেশ বিশিষ্ট যুবক শায়বাকে (সাদাচুল বিশিষ্ট) মদীনা থেকে মক্কায় নিয়ে আসেন। শায়বাকে মুত্তালিবের দাস মনে করে মক্কাবাসীরা তাকে আবদুল মুত্তালিব বলে অভিহিত করতো। ইতিহাসে হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের পিতামহ আবদুল মুত্তালিব বা মুত্তালিবের দাস – এ নাম ছাড়া অন্য কোনো নামে অভিহিত নন। এ হাশেম বংশেই নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের জন্ম। আর আব্দে শামছের বংশে জন্ম হয় হযরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও আবু সুফিয়ান।
মুত্তালিব ৫২০ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে ইয়ামেনের কাজওয়ানে ওফাত লাভ করেন এবং তদীয় ভ্রাতৃস্পুত্র হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিব মক্কা নগরীর শাসনভার যথার্থ প্রধান হিসাবে তার উত্তরাধিকারী লাভ করেন। মক্কার মধ্যে তিনি মুকুটহীন বাদশাহ বলে অভিহিত ছিলেন এবং মানবীয় সার্বিক উত্তম গুণাবলীতে তিনি ভূষিত ছিলেন। তার ললাটদেশে সর্বদা নূরে মোহাম্মদী চন্দ্রালোকের ন্যায় চমকিত। তাই বাদশাহ আবরাহার হাতী ‘মাহমুদ’ হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিবকে দেখে মাথা নত করে সম্মান করেছিল এবং সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরে আবাবিল পাখি দ্বারা ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিল।
তিনি স্বপ্নে আদিষ্ট হলেন জমজম কূপ উদ্ধার করতে এবং স্বপ্নে তার নির্দশনও দেখানো হলো। কিন্তু তা খনন করতে গিয়ে অন্যান্য গোত্রের দ্বারা বাঁধার সম্মখীন হলেন। তাছাড়া তাঁর লোকজন কম থাকাতে তাঁর শক্তি-সামর্থ্যও কম বিধায় লোক বলেরও প্রয়োজন ছিল। এদিকে হযরত আবদুল মুত্তালিবের বয়স বৃদ্ধি প্রাপ্ত হলেও কোনো সন্তান-সন্ততি না হওয়াতে এবং জমজম কূপ আবিষ্কার করার মানসে এক প্রতিজ্ঞা করলেন যে, যদি তার দশটি পুত্র সন্তান হয় তবে একটি ইব্রাহীমের ন্যায় আমিও কোরবানী করবো। আল্লাহপাক তাকে দশ পুত্র দান করলেন এবং পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতো একজন পুত্রকে কোরবান দিতে মনস্থ করলেন। পুত্রদিগের মধ্যে ভাগ্য পরীক্ষায় সর্বকনিষ্ঠ পুত্র হযরত আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালামের নাম উঠলো এবং হযরত আবদুল মুত্তালিব তাকেই বেশী স্নেহ করতেন। কর্তব্যের খাতিরে তাকেই কোরবানী করতে স্থির করলেন। তাতে লোকেরা এ কার্য হতে নিবৃত হতে বার বার উপদেশ দিল। শেষে আবদুল মুত্তালিব ‘শিয়া’ নামক এক ভবিষ্যদ্বক্তার পরামর্শে হযরত আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালামের বিনিময়ে দশটি উট নির্ধারণ করে ভাগ্য নির্ণয় করলো। এভাবে দশবার ভাগ্য নির্ণয় করে শেষে একশতটি উটের বিনিময়ে হযরত আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালাম কোরবানী হতে রক্ষা পেলেন। সেই হতে আরবে প্রাণের বিনিময়ে একশতটি উট নির্ধারিত হলো। তাই রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, “আমি দুই কোরবানীর ছেলে।” আল্লামা জালালউদ্দিন সিয়ুতীর ‘খাসায়েসুল কুবরার’ বর্ণনা হতে জানা যায় হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিব একদিন হেরেমে নিদ্রিত থাকাবস্থায় স্বপ্নে তাকে একজন এসে জমজম কূপ খনন করার জন্য নির্দেশ দিলেন। তিনি জাগ্রত হয়ে প্রার্থনা করলেন যেন জমজম কূপের চিহ্ন বা নিদর্শন তাকে জানানো হয়। সে মতে তিনি আবারও স্বপ্নে শুনতে পেলেন তাকে বলা হচ্ছে, জমজম সেই স্থানে খনন করো, যেখানে গোবর ও রক্ত পড়ে রয়েছে, সাদা পাখাবিশিষ্ট কাক চঞ্চু মারছে-পিপীলিকার গর্তের কাছে। খাজা আবদুল মুত্তালিব তার সন্ধান করতে গিয়ে দেখলেন সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে ‘খারুরা’ নামক স্থানে একটি গরু জবাই করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। গরুটি কসাইয়ের হাত হতে ছুটে দৌড়িয়ে জমজমের স্থানে এসে মাটিতে পড়ে গেল এবং সেখানেই গরুটি জবাই করা হলো। একটি সাদা পাখাবিশিষ্ট কাক এসে পিপীলিকার গর্তের কাছে আবর্জনায় বসে চঞ্চু পারছে মানে ঠোকরাচ্ছে। খাজা আবদুল মুত্তালিব এ নির্দশন দেখে সেখানেই খনন কার্য শুরু করলেন। কোরাইশরা এসে তাকে বাধা দিয়েছিল, তিনি তাতে বিরত না হয়ে খনন কার্য চালিয়ে গেলেন। কোনো কোনো বর্ণনায় দেখা যায় কূপ খনন করার পরও পানি না উঠায় তিনি মানত করেছিলেন যে, যদি এ কূপে পানি উঠে , তবে তিনি নিজের একটি পুত্রকে বলীদান করবেন। এরপর খনন শুরু করলে পানি বের হয়ে আসলো এবং তিনি কূপের চতুর্দিকে একটি দেয়াল তৈরী করে দিলেন। এভাবেই জমজম কূপ পুনরুদ্ধার করা হয়। বিভিন্ন কিতাবে এ ঘটনার আরো কিছু বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যাক, খাজা আবদুল মুত্তালিব আমরের কন্যা ফাতেমাকে বিবাহ করেন, এর ঘরে হযরত খাজা আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালাম জন্ম গ্রহণ করেন এবং তার পেশানীতে নূরে মোহাম্মদী পূর্ণিমার চন্দ্র সদৃশ চমকাত। হযরত খাজা আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালাম যখন বিশ বৎসর বয়সে পৌঁছিল রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের উর্ধ্বতন ষষ্ঠ পুরুষ বনি ‘জোহরা গোত্রের’ ওহাবের কন্যা হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালামের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। মাত্র তিনদিন শ্বশুরালয়ে থেকে হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালামকে সঙ্গে নিয়ে নিজ গৃহে চলে আসেন। এর কিছুদিন পরেই বাণিজ্য উদ্দেশ্যে সিরিয়া (শাম দেশে) যাত্রা করেন।
সিরিয়া হতে প্রত্যাবর্তনকালে হযরত খাজা আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালাম মদীনায় কয়েকদিন বিশ্রামরতো অবস্থায় তার কঠিন পীড়া (জ্বর) হলো। এ সংবাদ পেয়ে পিতা খাজা আবদুল মুত্তালিব হযরত খাজা আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালামকে আনার জন্য তার জ্যোষ্ঠপুত্র হারিসকে মদীনায় পাঠালেন। কিন্তু হারিস নিয়ে এলো হযরত খাজা আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালামের ওফাত সংবাদ। তখন তার বয়স ২৫ বৎসর ছিল। অধিকাংশ বর্ণনা মতে পিতার ওফাতের ছয় মাস পরে রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন। দিনটি ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার সোবহে সাদেকের সময়। ১২ই রবিউল আউয়াল, সোমবার এবং সোবহে সাদেক-এ তিনটি কথা একটি চিরন্তন-শাশ্বতকালের কথা। আল্লাহর হাবিব এ তারিখেই এ ধরাধামে এসেছেন এবং ১২ তারিখেই ওফাত লাভ করছেন। ইলমে এলাহীর অধিকারীগণ তা বর্তমানেই জানেন-দেখেন। কারণ, তিনি ১২ই রবিউল আউয়াল মাসে এসেছেন এবং ১২ই রবিউল আউয়াল মাসেই আছেন। অর্থাৎ তিনি যেমন ছিলেন তেমনই আছেন তথা ওফাত লাভ করছেন। এ বিষয়ে যারা মতভেদ সৃষ্টি করেছেন তারা হাবিবে খোদা মোহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের হাকিকত সম্পর্কে বেখবর। হাবিবে খোদার জীবন কাহিনীর (আগমন এবং প্রত্যাগমনের) যে ইতিহাস হাকিকতের সাথে সামঞ্জস্য নয়, তা অবশ্যই পরিবর্তনযোগ্য এবং তা হাকিকতের অনুসরণযোগ্য। হযরত মাকহুল রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বর্ণনা করেছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, “তোমরা সোমবারে রোজা ছাড়বে না। কেননা, আমি সোমবারে জন্মগ্রহণ করেছি, সোমবারে আমার কাছে ওহী প্রেরণ করা হয়েছে, সোমবারে হিজরত করেছি এবং সোমবারেই আমার ওফাত লাভ হবে।” অন্য বর্ণনায় যা অতিরিক্ত রয়েছে তা হলো, ‘সোমবারে মদীনায় পৌঁছেন, সোমবারে মক্কা জয় করেন’। রাছুলে করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের জন্মের সময়কার বিভিন্ন ঘটনা ‘তারিখ ও সিরাত’ গ্রন্থগুলোতে বিস্তর বর্ণনা করা হয়েছে।
বায়হাকী, তিবরানী, আবু নায়ীম খলিফা ইবনে সাওদাহ্ হতে বর্ণনা করেন, আমি মোহাম্মদ ইবনে আদী ইবনে রবীয়াকে প্রশ্ন করলাম, মূর্খতা যুগে তোমার পিতা তোমার নাম মোহাম্মদ রাখলো কেনো ? সে বললো, আমি আমার পিতাকে এ প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, আমরা বনী তামীমের চার ব্যক্তি সিরিয়ায় সফরে রওয়ানা হই- আমি, সুফিয়ান ইবনে মাজাশে, ইয়াজিদ ইবনে ওমর এবং উসাতা ইবনে মালেক। সিরিয়া পৌছে আমরা একটি ছোট জলাশয়ের পাড়ে অবস্থান করলাম। সেখানে একটি বৃক্ষ ছিল। একজন সন্নাসী এসে বললো, তোমরা কে ? আমরা বললাম, আমরা আরবের মুযার গোত্রের লোক। সে বললো, তোমাদের মধ্যে অতি শীঘ্রই একজন নবী আত্মপ্রকাশ করবেন। তাড়াতাড়ি যাও এবং তাঁর কাছ থেকে হেদায়েত হাছিল করো। কেননা, তিনি সর্বশেষ নবী। আমরা বললাম তাঁর নাম কি ? সে বললো, তাঁর নাম হলো মোহাম্মদ। আমরা সফর থেকে গৃহে ফিরে এলে সকলেরই পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করলো এবং সকলেই নিজ নিজ পুত্রের নাম মোহাম্মদ রেখেছিলাম।
অনুবাদ – ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র, ২১ ও ২২ পর্ব
মূল এলিফ শাফাক হতে
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী
পর্ব ২১
প্রেমিক তাঁর অন্তরের প্রেম মাহাত্ম্যের দ্বারা নির্মাণ করে নেয় তাঁর আপন জগতকে। তাঁর হৃদয়স্থিত প্রেম-প্রদীপের আলোয় আলোকিত থাকে তাঁর চারপাশ। যে যথার্থ প্রেমিক, তাঁর জগতটাই হয় প্রেমময়!
একজন প্রভু প্রেমের দেওয়ানা যদি কখনো সরাইখানায় যায়, সরাইখানাটিই তখন পরিণত হয় প্রার্থনাকক্ষে। আর যদি কোনো মদ্যপ উপস্থিত হয় প্রার্থনাকক্ষে, সেটিই হয়ে উঠবে সরাইখানা। আমাদের হৃদয় প্রতিনিয়ত পরিচালিত করে আমাদের। যা স্থিত আছে হৃদয়ে, বাহিরেও তাই মূর্তমান হয়ে উঠবে প্রতিনিয়ত। ভালো-মন্দের পার্থক্য সৃষ্টি করে আমাদের অন্তর, আমাদের অন্তরে থাকা ভালো-মন্দের অনুপাতে।
এজন্য জ্ঞানী ব্যক্তি কখনো অপর ব্যক্তিকে তার চেহারা বা কোনো বাহ্যিক অনুষঙ্গ দিয়ে মূল্যয়ন করেন না। কারণ, জ্ঞানী যখন দেখে, দুচোখ বন্ধ করে দেখে। তখন মুলত খোলা থাকে অন্য একটি চোখ, যে চোখ বাহির নয়, ভেতর দেখে।
জ্ঞানী অন্যকে বিচার করে ভেতর দেখে। বাহির দেখে নয় ॥
পর্ব ২২
এবার তো সময় হলো জাগরণের! ওঠো মোহগ্রস্ত মন! জেনে নাও, এ জগত একটি ক্ষণস্থায়ী ঋণ ব্যতিত নয়! পৃথিবী তো বাস্তবতার একটি স্কেচ অনুকরণ! অস্থায়ী ছায়া মাত্র!
শিশু যেমন করে খেলনা দ্রব্য কে আসল জিনিস ভেবে ভুল করে তেমনি তুমিও কি করে অস্থায়ী এ জগত কে অবিনশ্বর এবং ঐশ্বরিক ভেবে ভুল করলে? কি করে মানব সমাজ লিপ্ত হচ্ছে এ নশ্বর ছায়াধামে! মত্ত হচ্ছে জাগতিক খেলনায়! কখনো হয়ে পড়ছে মোহগ্রস্ত, কখনো বা চরম বিরক্ত! কখনো খেলনা দ্রব্য সমূহকে আগলে রাখছে পরম মমতায়, কখনো অসম্মানের সাথে ভেঙে ফেলছে সেসব! জিবন একটি আধ্যাত্মিক দ্রব্য। জিবনে সব রকমের চরমপন্থা পরিহার করো। চরমপন্থা সব সময়ই জিবনের ভারসাম্য নষ্ট করবে। জিবনকে যাপন করো মৃদু আনন্দে ও সহনশীলতায়। আপন জ্ঞান ও সংযম সাধনার মধ্য দিয়ে।
একজন জ্ঞানী কখনো চরমপন্থী হয় না। বরং সে হয় যথার্থ, সকল পরিস্থিতির জন্য।
একজন জ্ঞানী তার জিবনকে যাপন করে মধ্যপন্থায় ॥
কবিতা – মাতমে কারবালা
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
শত আঁখিধারা, শত হৃদিঝড়, তুফান তুলিছে প্রাণে
উঠিছে ভেদী ক্রন্দনও রোল, আসমান জমিনে।
নিখিল ধরা শোকার্ত ব্যাকুল আজ মরু সাহারার
মোহররম! আসে ফিরে ফিরে, স্মৃতি লয়ে কারবালার।
আসে ক্রন্দন, খুন চন্দন, ফোরাতের কূল বেয়ে আজ
লহুর দরিয়া বহে ফোরাতে, সাজে মরু রুধির সাজ।
আকাশে বাতাসে আজ ভাসি বিলাপ, হায় হোসেন, হায় হোসেন
বদন আজ রুধিরাক্ত, কেমনে তনে, বিধে খঞ্জর তীর বাণ।
মহররম! আজ আসে লয়ে ক্রন্দন সখিনার
হাসনা বানু, জয়নবে আজ, বুকফাটা ক্রন্দন হাহাকার।
আলীর দুলাল, ফাতেমা তনয়, পাকতন ইয়া হোসেন
আঘাতের পর আঘাত সহিয়া, ত্যাজিল আপন প্রাণ।
ঐ শোনা ক্রন্দন হযরত নবীর বালুর মিনারে পড়ি
হায় হোসেন বলে কাঁদিছে লুটায়ে জাহানের কান্ডারী।
নানা নানা বলে শতচ্ছিন্ন দেহ, হোসেন হায় কারবালায়
মুহাম্মদী নিশাণ উড়ায়ে ধরায়, মিশিল শূণ্যতায়।
মহররম! আজ তারি শোক ব্যাথাতুর পরাণে বাজায় ক্রন্দনও সুর
হে প্রেমিক নবীর, হোসাইন তরে কাঁদো আজ, ঝড়াও অশ্রুনীড়।
কবিতা – মহররম
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
আজ ফোরাতের স্রোত সম আঁখিধার বয়ে যায়
মহররম, কারবালা, শহীদানের স্মৃতি হায়।
জাগিল এ প্রাণে, আধার ভূবনে, আলোক দীপ্তি লয়ে
আসিল যাহারা, মুক্তির দূত, জগতের কান্ডারী হয়ে –
বিলাইলো প্রেম, মুক্তির সুধা, নিত্যের অমৃত
আনিল জীবন, নূর রওশন, ভূবন করে মোহিত।
নফসানিয়াতের বন্ধন ত্যাজি, নোংড়া পঙ্ক ছেড়ে
ইনছানিয়াত প্রতিষ্ঠিত যাহারা করিল প্রতি ঘরে –
তাদেরই তরে আজ কাঁদে বসুধা, তাদেরই খুন লয়ে
মাতিল ধরা, এজিদ সীমার, ইমাম শত্রু হয়ে।
কাটিল গর্দান দ্বীনের জিবন, বিষাদিত কারবালায়
তপ্ত মরুর প্রতি বালুকণায়, তারি মাতম শোনা যায়।
সম্পাদকীয় – ইমাম হুসাইন আ.
লাবিব মাহফুজ চিশতী
হুসাইন (আ.) এক শাশ্বত সত্ত্বা। হুসাইন (আ.) চিরঞ্জীব জগতে অধিষ্ঠিত এক জ্যোতির্ময় সত্ত্বা। মানবাত্মা তথা ইনছানি আত্মার অধিকারী মানুষটির মাঝেই এই পরিশুদ্ধ সত্ত্বা মূর্তমান হয়। তখনই মানুষটি পরিণত হয় ইনছানুল কামেলে বা পূর্ণতম অস্তিত্বে এবং হয়ে উঠে বাক্সময় কোরান। হুসাইনী গুণে গুণান্বিত মানুষটিই জীবন্ত কোরান এবং চির জিবনের অধিকারী তথা মুক্তিপ্রাপ্ত বা ধর্মে স্থিত।
হুসাইনি গুণে গুণান্বিত হতে হলে মুক্তি লাভ করতে হয় আঠারো হাজার মাখলুকাতের কারাগার হতে। নফসানি আমিত্বের বিরুদ্ধে জিহাদ ব্যতিত মুক্ত হওয়ার কোনো উপায় নেই। আত্মা হারানো উলঙ্গ মুর্দা মানুষগুলোর তিন জমাতের বন্দীদশা থেকে চির শান্তি, চির মুক্তির তথা লা মউতের অমর ধামে গমন করার জন্য আত্মত্যাগ তথা কারবালা ব্যতিত অন্য কোনো উপায় নেই।
খন্ডিত আমিত্ব বা অজ্ঞান আমিত্বের সাথে যুদ্ধ তথা কারবালার পরেই প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলাম তথা প্রভুবৃত্তি। আপন অস্তিত্বে প্রভু-স্বভাবের এ জাগরণ প্রচেষ্টা তথা জিহাদ-কারবালা সংঘটিত হবে ধর্ম পথের পথিকদের প্রতিটি পদক্ষেপে। আউলিয়াকূল শিরোমনি ইমাম জাফর সাদিক (র.) তাই বলেছেন, ‘প্রতিটি দিনই আশুরা, প্রতিটি ভূমিই কারবালা’।
নফসানি আত্মা এবং ইনছানি আত্মা তথা অজ্ঞান আমিত্ব এবং জ্ঞান আািমত্বের এ জিহাদ-প্রচেষ্টার মাধ্যমেই হাছিল হবে আত্ম-চৈতন্য লাভ। কায়েম হবে ইনছানিয়াত।
আত্মজ্ঞান লাভ তথা রিপুগ্রস্ত বন্দী মানুষদের চিরমুক্তি লাভ-ই হোক আশুরা থেকে শিক্ষা।
নফস এজিদের বশ্যতা না মেনে
হোসাইন সম হায়,
নিজেরে বিলাও গুরুর চরণে
মরণ কারবালায়!
পবিত্র মহামানবগণের অমীয় বাণী
1.
আত্মশুদ্ধি ও আত্মপরিচয়ের মাধ্যমে যিনি আল্লাহকে চিনেছেন, তিনিই মুমিন।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী।
2.
যদি তুমি মুর্শিদের অতি নিকটবর্তী হতে চাও তবে সদাই তাঁর রূপ স্বরণে থাকো এবং মানসিক নির্জনতাকে অবলম্বন করো।
– হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী।
3.
যদি তোমার খোদা জ্ঞান তোমার অস্তিত্বকে ভুলাইয়া না দেয়, তবে সে জ্ঞান হতে অজ্ঞানতাই শ্রেয়।
– হাকিম সানায়ী (র)
4.
খোদা তোর হাজির নাজির, জান মুছাফির, সদায় বর্তমান।
– খাজা দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী চিশতী নিজামী (র)
5.
জানো কি জামী? সমস্ত জগতের জান হলো মুহাম্মদ। আর মোহাম্মদ (সা) এর জান হলো হুসাইন বিন আলী (আ)
– আল্লামা আবদুর রহমান জামী (র)
6.
বসে ধ্যানে দীলের টানে, দূরের বস্তু সামনে কর
স্বচক্ষে দেখে-শুনে, দীল হুজুরী নামাজ পড়।
– খাজা দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী চিশতী নিজামী (র)
7.
আলিফ লাম মীম তিনেরী ভেদ, রেখেছেন সাঁই গোপন করে
চিনগা মুর্শিদ ধরে রে মন, জানগা মুর্শিদ ধরে।
– খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
8.
ইমাম হোসাইন শীতলতম হৃদয়কেও উষ্ণ করেন। হোসাইনের আত্মত্যাগ আধ্যাত্মিক স্বাধীনতাকে তুলে ধরে।
– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
9.
হুসাইনের কতল আসলে ইয়াজিদেরই মৃত্যু। ইসলাম জিন্দা হয় প্রতিটি কারবালার পরই।
– মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর
10.
ইমাম হুসাইনের ও তাঁর সাথীদের ওপর নিপীড়নমূলক ঘটনা ও হৃদয়বিদারক শাহাদাত যার অন্তরে শোক ও বেদনা সৃষ্টি করে না, সে মুসলমান তো নয়ই, মানুষ নামেরও অযোগ্য।
– মুফতি মুহাম্মদ শফী
মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ১১তম সংখ্যা, আগস্ট ২০২২ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত


