আপন ফাউন্ডেশন

Date:

ফেসবুক
ইউটিউব

আপন খবর – ১২তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২২

মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ১২তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২২ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

প্রবন্ধ – রঁওযা বা মাজার জিয়ারত ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

সফর পাঁচ প্রকার – ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, মোবাহ ও হারাম।

  • উপলক্ষ যদি ফরজ হয় তবে এর জন্য সফর করাও ফরজ। যেমন, হজ্ব করার জন্য সফর করা ফরজ।
  • উপলক্ষ যদি ওয়াজিব হয় তবে তাঁর জন্য সফর করাও ওয়াজিব। যেমন, মান্নতি হজ্জ ওয়াজিব বিধায় তার জন্য সফর করাও ওয়াজিব।
  • উপলক্ষ সুন্নত হলে তার জন্য সফর করাও সুন্নত। যেমন, জিয়ারত সুন্নত। সুতরাং জিয়ারতের জন্য সফর করাও সুন্নত।
  • উদ্দেশ্য যদি মোবাহ হয় তবে এর জন্য সফর করাও মোবাহ হবে। যেমন, ব্যবসা বাণিজ্য ও বন্ধু-বান্ধবের সাথে সাক্ষাতের জন্য সফর করা।
  • উপলক্ষ হারাম হলে তার জন্য সফর করাও হারাম। যেমন, চুরি করার জন্য সফর করা হারাম।

কাজেই রঁওযা বা মাজার মোবারক এবং কবর জিয়ারত যেহেতু সুন্নত সেহেতু তার জন্য সফর করাটাও সুন্নত। যারা সফরকে নাজায়েজ বা হারাম বলে তারা গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট। রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন, বাইতুল্লাহ, মসজিদে নব্বী ও বাইতুল মোকাদ্দাস এই তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোনোখানে সফর করবে না, এ হাদিস কবর বা মাজার বা রঁওযা জিয়ারতের ক্ষেত্রে যারা প্রয়োগ করে তারা গোমরাহ ও নির্বোধ। এ হাদিস উক্ত তিন মসজিদের ফজিলতের শাণে বর্ণিত হয়েছে, রঁওযা শরীফ বা মাজার শরীফের উদ্দেশ্যে নয়- এ কথা বুঝা উচিত।

১৩। “জুবদাতুন নাছায়ীহ ফী মাসালিজ জাবায়ীহ” নামক কিতাবে হযরত শাহ আবদুল আজিজ দেহলবী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি ও মৌলবী আবদুল হাকিম শিয়ালকোটী বর্ণনা করেন, “ছালেহীন বুজুর্গানে দ্বীনের মাজার হতে বরকত নেয়া, ইছালে ছওয়াব (ওরশ), কোরান পাক তেলাওয়াত, শিরণী ও খানা পরিবেশনের মাধ্যমে তাঁদের ফয়েজ ও বরকত হাছিল করা ইজমা-ই উলামার মতে উত্তম”।

১৪। মুসলিম শরীফে হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা হতে বর্ণিত আছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের খেদমতে হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা আরজ করলেন, আমি কবর সমূহ জিয়ারত করলে কিভাবে সম্বোধন ও দোয়া করবো এবং কিভাবে জিয়ারত করবো? তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বললেন, এভাবে সম্বোধন ও দোয়া করবে- “হে কবরবাসী মুসলিম নর-নারীগণ! তোমাদের উপর আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক। আমাদের পূর্বে গমনকারী ও পরে গমনকারী পরলোকগত নর-নারীকে আল্লাহ রহম করুন। ইনশাল্লাহ, আমরা অচিরেই তোমাদের সাথে মিলিত হব”।

১৫। আল্লামা আবদুর রহমান জামী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হির বিখ্যাত কিতাব “শাওয়াহেদুন নবুয়ত” এর ২৭২ পৃষ্ঠায় হযরত রেজা আলী ইবনে মুহাম্মদ মুসা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আমার রঁওযা জিয়ারত করবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে।

১৬। ইমাম জযরী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি বলেন, যদি হুজুর সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের নিকট (রঁওযায়) দোয়া কবুল না হয় তবে আর কোথায় হবে ? উক্ত স্থানকে দোয়া কবুলের শিরোভাগে রাখা উচিত।

১৭। “মুসনাদে ইমাম আজম আবু হানিফা” কিতাবের ২৩৫ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, হযরত ইমাম শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি বলেন, হযরত ইমাম কাযিম আলায়হিস সালামের মাজার দু’আ কবুলের এক আশ্চর্য জায়গা।

রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারক জিয়ারতের সময় “নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের চেহারা খেয়াল করবে”-এ কথা ফতোয়ায়ে আলমগীরি ২য় খন্ডের ৫৪৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে। একথাটি সাহাবাগণের বেলায় নিশ্চয়ই প্রযোজ্য বা সম্ভব। কারণ, তাঁরা নবীজিকে দেখেছেন। না দেখলে তাঁর চেহারা খেয়াল করা যায় না। আর করলেও মনের কল্পিত ধারণা বিভিন্ন রকম হয়ে যাবে, রাছুল করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের চেহারা খেয়াল হবে না। এ অবস্থায় যার যার পীর-মুর্শিদের বরযোখ নিয়ে জিয়ারত করাই হলো উত্তমপন্থা এবং উক্ত ফতোয়ার মূল উদ্দেশ্যও হবে তা-ই। তাছাড়া সমস্ত সুফিয়ানে কেরামগণের মতে তাসাব্বুরে শায়েখ হলো উত্তম ইবাদত। এবার ওহাবী নেতা আশরাফ আলী থানভী লিখিত পুস্তক “কছদুছ ছবীল” যার অনুবাদ লালবাগ মাদ্রাসার ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ মাওলানা শামছুল হক করেছেন। থানভী সাহেব উক্ত পুস্তকে কবর জিয়ারত সম্পর্কে বলেছেন, “আবার ইহাও দরকার যে, আউলিয়াদের মাজার এবং বুজুর্গদের মাজার জিয়ারত হাছেল করবে এবং সে সময় যেনো দীলের মধ্যে অন্য কোনো চিন্তা না থাকে। তখন তাঁদের রূহের দিকে মন দিয়া তাদের রূহানিয়াতকে নিজের পীরের সুরতে কল্পনা করে তাদের ফয়েজ এবং বরকত হাছিল করবে। এ কথাটি হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মাক্কী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হির পত্রাবলীতে বর্ণিত আছে এবং শায়েখ আহমদ শেরহিন্দী মুজাদ্দেদ সাহেব তাঁর “মকতুবাত” শরীফেও উল্লেখ করেছেন। কাজেই রঁওযা বা মাজার জিয়ারতের সময় যদি মাজারস্থ অলির চেহারা অপরিচিত হয় তবে স্বীয় মুর্শিদের চেহারায় ঐ মাজার মোবারক জিয়ারত করবে।

হযরত মীর্জা মাজহার জানেজাঁনান রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি যিনি হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মোহাদ্দেছ দেহলভীর পীর ছিলেন, তিনি একবার তাঁর আপন একজন ভক্তের মাধ্যমে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হির মাজারে সালাম পাঠালেন। যখন সেই মাজারে গিয়ে হযরত মীর্জা মাজহার জানেজাঁনান রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হির পক্ষ হতে সালাম পেশ করলেন তখন মুজাদ্দেদ আলফেসানী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হির মাজার থেকে তাঁর মাথা মোবারক সিনা পর্যন্ত বের করলেন এবং বললেন, কোন মীর্জা? যিনি আমার পাগল ও আশেক সে মীর্জা নাকি? তোমার এবং তাঁর উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হউক (আস-সায়েক্বাহ)। আশা করি এ লেখা হতে নবী-রাছুল এবং অলি-আউলিয়াদের ভক্ত-মুরিদান এবং আশেকান তথা দ্বীন-এ-মুহাম্মদী বা ইসলামের অনুসারীগণের রঁওযা শরীফ বা মাজার শরীফ জিয়ারত করা অবশ্যই জায়েজ ও সুন্নত এবং কখনো ওয়াজিব বলেও প্রমাণিত হলো। সউদি সরকার এবং তার দোসর ওহাবীদের মনগড়া মতবাদ বাতিল বলে প্রমাণিত হলো। তবে এটাও ঠিক যে, অন্ধ-মূর্খ ও গোঁড়া ওহাবীদের বুঝাতে যাওয়া আর গাধার নাকে গোলাপ ফুল ধরা একই কথা।

মাজার তাওয়াফ করাঃ

“খাজানাতুর রিওয়ায়েতে” গ্রন্থে “মোলতাকাত” কিতাবের সূত্রে এবং “ইসলাহে বেহেশতী জেওর” কিতাবের ৭৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, “ওয়া ইনকানা কাবরু আবদিন ছলিহিন ওয়া ইউমকিনুহু আইইয়াতুফা হাওলাহ ছালাছা মাররাতিন ফাআলা জালিকা”। অর্থাৎ কবর যদি নেকবান্দার (অলি-আল্লাহর) হয় এবং কবরের চারিদিকে তাওয়াফ করা সম্ভব হয়, তা হলে তিনবার তাওয়াফ করবে। কাবে আহবার বর্ণিত হাদিছে আছে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা শরীফে দৈনিক সত্তর হাজার ফেরেশতা নেমে এসে ঘাড় দুলিয়ে রঁওযা শরীফ তাওয়াফ করতে থাকে। হাশরের দিন নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম সেই সমস্ত ফেরেশতা সমভিব্যহারেই উঠবেন রঁওযা মোবারক হতে (মাদারেজুন নবুয়ত ২য় খন্ড,৭৭ পৃঃ)।

হাজ্জাজ বিন ইউসূফ (তার গর্ভনর পদে থাকাকালীন) কিছু লোককে রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারকের চর্তুদিকে তাওয়াফ করতে দেখে মন্তব্য করে বসলো যে, “এ লোকগুলো কিছু লাকড়ী ও গলিত দেহের তাওয়াফ করছে”। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের উক্ত মন্তব্যের কারণে ফেকাহশাস্ত্রবিদ ওলামায়ে কেরামগণ তাকে কাফের ফতোয়া দিয়েছেন। এ কথা জুরকানী “শরহে মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া” কিতাবে আল্লামা জুরকান “কামেল” গ্রন্থের হাওলায় উদ্ধৃত করেছেন। তার রাজত্বকাল যেহেতু আনুমানিক ৬৮-৮৬ হিজরী পর্যন্ত ছিলো, কাজেই তখন নিশ্চয়ই রাছুল করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের কোনো সাহাবা বা তাবেঈন এ তাওয়াফ করেছিলেন। না জায়েজ হলে এ রকম তাওয়াফ অবশ্যই করতেন না। বরং খারাপ মন্তব্য করাতে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কাফের ফতোয়া পেলো। যদিও তাতে রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের শান, মান, মর্যাদা জড়িত এবং প্রধান বিষয়।

ওহাবী নেতা আশরাফ আলী থানভী সাহেবও তাওয়াফ বৈধ স্বীকার করেছেন। মৌলবী থানভী সাহেব জনৈক ব্যক্তির এক প্রশ্নোত্তরে তিনির রচিত “হিফজুল ঈমান” বইয়ের ৬ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেছেন যে, আশরাফ আলী থানভীকে জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছেন যে, হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ সাহেব “কাশফে কবুর” অর্থাৎ কবরবাসীর সাথে আধ্যাত্মিক সংযোগের নিয়ম এভাবে বলেছেন, “ওয়া বাআদাহু হাফাত কুরা তাওয়াফা কুনাদ ওয়াদান তাকবীরা ফি খাওনাদ ওয়া আগাজ আজ রাসতা কুনাদ বা আদাহু তারফি ফাইয়ান রূখছাদা নিহাদ”। অর্থাৎ শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী বলেছেন, “অতঃপর কবরের চতুর্দিকে সাত চক্কর তাওয়াফ শুরু করবে এমন ভাবে যেনো জিয়ারতকারীর মুখ কবরবাসীর অলির পায়ের দিকে থাকে।

উক্ত কথাটি লিখে প্রশ্নকারী থানভী সাহেবকে জিজ্ঞাসা করেন- ইহা বৈধ কিনা? থানভী সাহেব তার লিখিত “হিফজুল ঈমান” বইয়ের ৬ পৃষ্ঠায় প্রশ্নোত্তরে বলেন, “এ প্রকার তাওয়াফ শরিয়তের পরিভাষায় তাওয়াফ নহে- যার দ্বারা ইবাদত ও সান্নিধ্য মকসুদ হয় এবং এ ধরনের তাওয়াফই শরিয়তে নিষিদ্ধ বরং যে তাওয়াফের কথা শাহ ওয়ালিউল্লাহ সাহেব বলেছেন সেটা হচ্ছে শাব্দিক অর্থে তাওয়াফ। অর্থাৎ মাজারের চারদিকে ঘুরে মাজারবাসী অলির সাথে আত্মিক নিছবত তথা সংযোগ স্থাপন করা হলো এ তাওয়াফের উদ্দেশ্য এবং অলির পক্ষ হতে বরকত লাভ করা তার মূখ্য উদ্দেশ্য। সুতরাং মৌলবী আশরাফ আলী থানভী সাহেবও মাজার তাওয়াফ, অলির নিছবত ও ফয়েজ বরকত লাভের উদ্দেশ্যে জায়েজ স্বীকার করেছেন।

“ইসলাহে বেহেশতী জেওর” কিতাবের ৭৪-৭৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “অলিদের মাজার তাওয়াফ করার উদ্দেশ্য হলো অলির পক্ষ হতে ফয়েজ ও বরকত লাভ করা এবং তাঁর সাথে আত্মিক নিছবত স্থাপন করা”। একথাটি “জা’আল হক” বিখ্যাত কিতাবের ১৩৯ পৃষ্ঠায়ও বর্ণিত আছে। “বেলায়েতে মোতলাকা” কিতাবের ১৮৭ পৃষ্ঠায় এবং “মোতালেবে রশীদিয়ার” ১৪৩ পৃষ্ঠায় বর্নিত আছে যে, শায়েখ আবু সাঈদ আবুল খায়ের রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হির মুরীদগণের মধ্যে কেহ হজ্ব করার বাসনা করলেন, তিনি তাদেরকে বলতেন, পীরে কামেল শায়েখ আবুল ফজল রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হির মাজার শরীফের মাটি জিয়ারত করো এবং তাঁর চতুর্পাশ্বে সাতবার তাওয়াফ করো। তোমার সমস্ত মকসুদ হাছেল হবে।

হযরত সাইয়্যেদানা মীর আবুল উলা ভারতের মশহুর ও সর্বমান্য মাশায়েখ বা পীর ছিলেন। প্রথম নকশবন্দীয়ায় মুরিদ হয়ে আধ্যাত্মিক রাজ্যে বিশেষ উন্নতি না হওয়ায় অত্যন্ত পেরেশান ছিলেন। একদা তিনি নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের আদেশে ও খাজা গরীবে নেওয়াজ রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হির আহ্বানে আজমীর শরীফে উপস্থিত হলেন। তিনি যখন রাত্রিতে মাজার শরীফের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন দরজা বন্ধ ছিল। কিন্তু তিনি দরজার সামনে যেতেই আপনা আপনি দরজা খুলে গেলো। তিনি ভিতরে গিয়ে মাজার শরীফ চুম্বন করে তাওয়াফ করতে লাগলেন। এ অবস্থায় তিনি খাজা গরীবে নেওয়াজকে মাজার শরীফের উপর উপবিষ্ট দেখতে পেয়ে তাজিম সেজদায় পড়ে গেলেন। হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি তাকে “সাইয়্যেদানা” খেতাবে আহ্বান করে হাঁ করতে বললেন। তিনি হাঁ করলে হযরত খাজা বাবা গরীবে নেওয়াজ রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি নিজ হাতে তাঁর মুখে একটি লাল বর্ণের বস্তু প্রদান করলেন। তিনি তা খাওয়া মাত্র তাঁর রূহানী জগত রৌশনময় হয়ে গেলো। আরো অনেক প্রমাণাদি দ্বারা ইহা স্পষ্ট হলো যে, মাজার তাওয়াফ করা মাজারস্থ অলি-আল্লাহর আত্মিক নিছবত, ফয়েজ ও বরকত লাভের উদ্দেশ্যে অবশ্যই জায়েজ। তাওয়াফ শব্দের অর্থ কোনো জিনিসের চর্তুদিকে চক্কর দেয়া বা ঘুরা।

কাবা শরীফ ব্যতীত অন্য কোনো জিনিসের ইবাদতের নিয়তে তাওয়াফ করা শরিয়ত মোতাবেক নাজায়েজ। কিন্তু পীর-আউলিয়াদের মাজার ইবাদতের নিয়ত ব্যতীত মাজারস্থ অলির আত্মিক নিছবত, ফয়েজ ও বরকত লাভের উদ্দেশ্যে তাওয়াফ করা জায়েজ ও বৈধ- এ কথাটি শরিয়তের ভাষায় বলা হলো, যদিও ইহা একটি উৎকৃষ্ট ইবাদত। এ ব্যাপারে ইয়াজিদী, ওহাবী, মওদুদী তাবলিগপন্থী ধিকৃত মৌলবীদের অপব্যাখ্যা ও অপপ্রচার হতে সবার সতর্ক থাকা জরুরী। নয়তো তাদের চক্রান্তে পড়ে ঈমান হারাতে হবে। উক্ত দলিলাদি দ্বারা প্রমাণ হলো মাজার জিয়ারত, তাওয়াফ করা, জিয়ারতের জন্য নিয়ত ও সফর করা সুন্নত। কোনো স্থানে নিয়ত ছাড়া সফর করা যায় না এবং কোনো কর্মই নিয়ত ছাড়া হয় না। নিয়ত হলো মনের সংকল্প বা ইচ্ছা। কাজেই কোনো সুস্থ মস্তিস্কের মানুষ একথা বলতে পারে না যে, রঁওযা বা মাজার বা কবর জিয়ারত করা সুন্নত অথচ তা জিয়ারতের জন্য সফর করা বা নিয়ত করা নাজায়েজ। নবুয়তে যাদেরকে নবী-রাছুল বলা হয়, বেলায়েতে তাদেরকেই বলা হয় অলি-আউলিয়া। কাজেই অলি-আউলিয়ার মহব্বত যাদের দীলে নেই আল্লাহর রহমত হতে তারা অবশ্যই মাহরুম হয়ে আছে। শরিয়তে সে ভেদ-রহস্য গোপনই রয়ে গেল।

রঁওযা বা মাজার স্পর্শ বা চুম্বন করাঃ

রঁওযা বা মাজার শরীফ ফয়েজ ও বরকতের উদ্দেশ্যে স্পর্শ করে শরীরে মোচন করা বা চুমু দেয়া জায়েজ এবং সুন্নতে সাহাবা। বোখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ “ফতুহুল বারী” ৬ষ্ঠ খ-ে ১৫ পৃষ্ঠার সূত্রে “আহকামুল মাজার” কিতাবের ৫৫ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের মিম্বর শরীফ ও রঁওযা মোবারক চুম্বন করার বৈধতা সম্পর্কে ইমাম আহামদ ইবনে হাম্বল রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রশ্নোত্তরে বলেন, “আমি ইহাতে ক্ষতির কিছু দেখছি না।” অর্থাৎ চুম্বন করা জায়েজ। মক্কা শরীফের শাফেয়ী মাযহাবভূক্ত ওলামাদের মধ্যে অন্যতম আলেম ইবনে আবিস সানাফ থেকেও কোরানুল করিম, হাদিস শরীফের বিশেষ অংশ এবং বুজুর্গানে দ্বীনের মাজার শরীফ চুম্বন করা বৈধ বলে বিধৃত আছে। একথা বিখ্যাত কিতাব “জা’আল হক”-এর ২০৬ পৃষ্ঠায়ও বর্ণিত আছে। খতিব ইবনে জামালার সূত্রে “প্রশ্নোত্তরে আকাঈদ শিক্ষা” বইয়ের ৫৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু আপন ডান হাত নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারকে স্থাপন করতেন বরকত ও ছোয়াবের উদ্দেশ্যে। “আদিল্লাতু আহলিচ্ছুন্নাহ” কিতাবে বর্ণিত আছে যে, হযরত খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমাতুজ্জাহরা আলায়হিস সালাম আপন দু’গন্ড (গাল) নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারকের উপর স্থাপন করতেন। কোনো সাহাবীই তা নিষেধ করেননি। বিখ্যাত “তুশেখ” কিতাবে আল্লামা জালাল উদ্দীন সয়ুতী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি বলেছেন, হাজরে আসওয়াদের চুম্বন থেকে কতেক আরেফীন বুজুর্গানে কিরামের মাজার শরীফ চুমু দেওয়ার বৈধতা প্রমাণ করেছেন। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের ওফাতের পর হযরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু শোকে মদিনা ছেড়ে সিরিয়া চলে যান এবং জেহাদে অংশ গ্রহণ করে জীবন অতিবাহিত করতে থাকেন। তিনি একদিন স্বপ্নে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামকে দেখলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম হযরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুকে বলছেন, “হে বেলাল! এটা কোন ধরনের জুলুম ও জফা (অত্যাচার এবং লা-ইনছাফি)! এখনো কি আমার জিয়ারতের জন্য তোমার আসার সময় হয়নি? তুমি আমাকে ছেড়ে কিভাবে দূরে থাকতে পারলে? স্বপ্ন দেখে হযরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু তৎক্ষনাৎ মদিনার পানে রওয়ানা হলেন জিয়ারতের উদ্দেশ্যে। তিনি মদীনায় পৌঁছার সাথে সাথে খবর ছড়িয়ে পড়লো যে, হযরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু মদিনায় ফিরে এসেছে। হযরত ইমাম হাছান-হুসাইন আলায়হিমাস সালামও দৌঁড়ে আসলেন। হযরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু সোজা রঁওযা মোবারকে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন এবং রঁওযা মোবারকে কপাল ঘষতে লাগলেন। এ ঘটনাটি বিখ্যাত কিতাব “জজবুল কুলুব ইলা দিয়ারিল মাহবুব” এবং ইমাম তকিউদ্দিন সুবকীর “শেফাউস্ সাকামে” কিতাবে ৩৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে। ইবনুল জাওযীর “মীসার আল গারাম” সূত্রে “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের দলিল” কিতাবের ৯৪ পৃষ্ঠায় এবং তাফসীরে কানজুল ঈমান ও খাজাইনুল ইরফানের প্রথম খন্ডের ১৭৪ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, মুহাম্মদ বিন হারব আল হেলালী বলেন, “আমি মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা শরীফের নিকট এসে তাঁর জিয়ারত করলাম এবং তাঁর বরাবর বসে পড়লাম। এ সময় একজন গ্রাম্য লোক এসে বলতে লাগলো, ইয়া রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম! আপনি বলেছেন, আর আমরা আপনার কথা শুনেছি। আপনি আল্লাহ থেকে বুঝে নিয়েছেন, আর আমরা আপনার থেকে বুঝে নিয়েছি। আপনার উপর নাযিল হয়েছিলো,“ওয়া লাও আন্নাহুম্ ইজ্জালামু আনফুসাহুম্ জা-উকা ফাসতাগফারুল্লা-হা ওয়াস তাগফারা লাহুমুর রাছুলু। লাওয়াজাদুল্ লা-হা তাওওয়া-বার রাহিমান” (আনÑনিসা, আয়াত-৬৪)। অর্থাৎ এবং যদি কখনো তারা নিজেদের নফসের প্রতি জুলুম করে এবং তোমার নিকট ফিরে আসে (এবং) আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং রাছুলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তা হলে তারা আল্লাহকে পরম ক্ষমাশীল (এবং) পরম রাহিম (দয়ালু) রূপে পাবে।- এ আয়াতটি। এখন আমি নিজের উপর জুলুম করেছি, আর আপনার কাছে আসলাম ; আমার জন্য একটু ক্ষমা চান। তখন রঁওযা থেকে আওয়াজ এলো তোমাকে মাফ করে দেওয়া হয়েছে। এ হাদিসটি আবু সাঈদ আস-সামআনী ও মাওলা আলী ইবনে আবি তালিব আলায়হিস সালাম হতে বর্ণনা করেছেন। “হৃদয় তীর্থ মদীনার পথে” কিতাবের ১৫৪ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, মারওয়ান ইবনে হাকাম এক ব্যক্তিকে রঁওযা শরীফের উপর মুখমন্ডল রাখতে দেখে তার ঘাড় ধরে বললো, তুমি যে কাজটি করছ, তা কেমন জানো? লোকটি বলল, খবরদার আমাকে ছেড়ে দাও। আমি আমার মুখমন্ডল কোনো পাথরের উপর রাখিনি; বরং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযার মাটির উপর রেখেছি। সে আরো বললো, আমি রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম হতে শুনেছি যে, দ্বীনের জন্য তখন ক্রন্দন করা উচিত, যখন শাসন ক্ষমতা অযোগ্য লোকের হাতে চলে যায়। হাফেজ আল ইরাকী তাঁর “ফাতুহুল মোতআল” কিতাবে তাঁর সনদ সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম ও অন্যান্যদের রঁওযা ও মাজার চুম্বন করা জায়েজ বলেছেন। তিনি বলেন, এটা ইবনে তাইমিয়া দেখে অবাক হয়ে গেলেন। ফতোয়ায়ে আলমগীরির সূত্রে “জা’আল হক” কিতাবের ২০৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, নিজের মাতা-পিতার কবরে চুমু দেয়ায় কোনো ক্ষতি নেই অর্থাৎ বৈধ।

“ফতোয়ায়ে আলমগীরি”, “খাজিনাতোল রাওয়াজা”, “মাতালেবুল মুমিনীন” গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি রাছুল করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের কাছে উপস্থিত হয়ে বললো যে, হে রাছুল ! আমি প্রতিজ্ঞা করছিলাম যে, বেহেশতের চৌকাঠে ও হুরীর ললাটে চুম্বন করবো। কিন্তু আমি অতি পাপী, বেহেশতে যাওয়া আমার ভাগ্যে বোধ হয় নেই। এমতাবস্থায় কি করে আমার প্রতিজ্ঞা পালন করি। উত্তরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বললেন, তুমি তোমার মাতার ললাটে ও পিতার পায়ে চুম্বন করো তবেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা হবে। সে বলল, হুজুর সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম! তারা তো কেউ জীবিত নেই। হযরত বললেন তাদের কবরে গিয়ে চুম্বন করো। সে আবার বললো, হুজুর তাদের কবরও জানা নেই। হুজুর বললেন তাদের উদ্দেশ্যে দু’টি নকল কবর মাটিতে দাগ কেটে বানিয়ে তাতে চুম্বন করো। এ বর্ণনাটি ইমাম সাবির “কেফায়া” গ্রন্থের মাঝেও বর্ণিত আছে।

প্রবন্ধ – মানবধর্ম

লেখক – আব্দুল হালিম

ধর্ম মূলত একটি মানসিক ব্যাপার। ধর্ম বাহিরে দেখানোর বা আনুষ্ঠানিক কোনো বিষয় নয়। আল্লাহ বিরাজ করে মানুষের মাঝে। সপ্তম আকাশে কিংবা মক্কা নগরীতে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানুষের মাঝেই তাঁর অবস্থান।

রাসুলে পাক (সা.) বলেছেন, যে আমাকে দেখলো, সে স্বয়ং আল্লাহকেই দেখলো। “মান রা’আনি ফাকাদ রাআল হক”। নূরে মোহাম্মদীকে দর্শন করা আর সত্যকে দর্শন করা একই কথা।

আপনত্বে বিরাজিত প্রভুসত্ত্বাকে জাগ্রতকরণের নামই ধর্ম। এজন্যই নিজেকে চিনতে বলা হয়েছে। “মান আরাফা নাফসাহু, ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু”। বহুকাল পূর্বেও একথাটি বলেছিলেন সক্রেটিস। নিজেকে চেনো। মানবীয় অস্তিত্বের উৎসমূলে ধ্যানপ্রক্রিয়ায় নিমগ্নতার ফলে ধীরে ধীরে মানবীয় সত্ত্বায় উদ্ভাসিত হয় প্রভুসত্ত্বা। এজন্যই নিজেকে চেনাই হচ্ছে প্রভুপরিচয়ের ভিত্তিভূমি। আল্লাহ বলছেন, “আমি তোমার নফসের সাথে মিশে আছি, তুমি কি দেখতে পাও না?”

কোরানের স্পষ্ট বর্ণনা, আল্লাহ পাক তাঁর নিজের রুহ ফুঁকে দিয়ে আদম কে তৈরী করেছেন। আদম যদি আল্লাহর রুহ প্রাপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে আদম কে? এজন্যই বলা হচ্ছে, আপনাকে চিনতে। মানবধর্মই একমাত্র ধর্ম। কারণ, মানুষেই বিরাজিত মহান প্রভু। মানুষেই তাঁর প্রকাশ বিকাশ। তাই পুরুষোত্তম নজরুল ইসলাম বলছেন, ভগবান – আত্মজ্ঞান! আত্মজ্ঞান জাগ্রত হলেই মানবসত্তায় জেগে ওঠেন আল্লাহ। কবি চন্ডীদাস বলেন, সবার উপরে মানুষ সত্য, তার উপরে নাই। মহাত্মা লালন সাঁইজি বলেন, সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার, মানুষ গুরুর নিষ্ঠা যার”।

অন্ধ অনুমান কল্পনায় খোদা সাব্যাস্ত করে নিজেকে অধপতিত না করে সকলেরই উচিত সঠিক ধর্মজ্ঞান অর্জন করা। মানুষতত্ত্বে নিষ্ঠাবান হয়ে প্রভুকে লাভ করলেই পালিত হবে সঠিক ধর্ম। প্রভু আমাদের সকলের জ্ঞানচক্ষু উন্মোচিত করতে সহায় হোক।

কবিতা – অভিনিষ্ক্রমণ

লেখক – অজয় বোস

অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভায়
উদ্বেলিত হৃদয়ে প্রশান্তি অনাবিল,
অন্তরে আজি অবাধ উচ্ছ্বাস
শরতের আকাশ সেজেছে সুনীল।

ক্ষণিকের এই সুখস্মৃতি তবে
আঁধারেই কি যাবে মিশে?
নাকি অরুণ আলোয় আগামীর প্রাতে
উঠবে স্বরূপে হেসে!

ভেবে ভেবে সব দুঃখ গাঁথা
তবে কেন অকারণ কাঁদ?
কেনইবা তবে হৃদয় বীণায়
বেহাগের সুর বাঁধ?

সময়! সেতো যাবেই বয়ে
প্রকৃতির নিয়ম মেনে,
স্থিতু হয়ে মন চল যাই এবার
আত্মারূপ দর্শনে।

সংগীত – জ্ঞান হলো না ভ্রান্ত মানুষ

লেখক – ফকীর আতিকুর রহমান চিশতী নিজামী

জ্ঞান হলো না ভ্রান্ত মানুষ
কান্দো লাশের মায়ায়
ভাবলি না তুই দেহ ছেড়ে
গেল পাখি কোথায়।।
খাঁচা যে তোর মাটির গড়া
মাটি হবে এইতো ধারা,
ময়না পাখি, তার মায়া নাই
কান্দো খাঁচার মায়ায়।।
মেরুদন্ড মাংস শিরা
স্বভাব তাদের ভাঙ্গাগড়া,
সেটিই হবে আসল কবর
যেই খাঁচায় সে বন্দী হয়।।
কাঁচা দেহ খসেই যাবে
পাকা বাড়ি বানাও তবে,
ফকির আতিক বলে জিন্দা মরলে
যমরাজা তার বাধ্য হয়।।

সংগীত – মুহাম্মদ এক নূরের পুতুল

লেখক – দাউদ আহমেদ চিশতী

মুহাম্মদ এক নূরের পুতুল
কে বলে সে অনেক দূরে
আমার নবী এলো নাছুত পুরে।।
ইল্লাল্লারী রূপ দেখাতে, প্রকাশ হলো নজুলেতে
সকল সিফাত সঙ্গে নিয়ে, নয় বোতনে এলো ঘুরে।।
নবী লা ইলাহাতে প্রকাশ হলো, ইল্লাল্লাকে চিনাইলো
মাওলা আলী চিনলো ভালো, বায়াত হয়ে নবীর ধারে।।
ইল্লাল্লাকে চিনবি, লা ইলাহা খুঁজো নিরবধী
ইল্লাল্লাকে চিনতে দাউদ, লা ইলাহাকেই চিহ্ন করে।।

সংগীত – পাপে ভরা অঙ্গ আমার

লেখক – মোবারক হুসাইন ওয়ায়েসী

পাপে ভরা অঙ্গ আমার, হয়না সাধু সঙ্গ
কত রঙ্গে ঢঙ্গে আমি, আছি তোমায় ভূলে –
আমার তরী ভিড়বে কি আর
মুর্শিদ নামের কূলে।।
কান্দ কেন মিছে মিছে তুমি, ওরে আমার মন
একজন মানুষ চিনে করোরে তাঁর ভজন ও সাধন
এ জগতের মায়ায় পড়ে, তাঁরে আছি ভূলে গো।।
সুরা ফাত্তাহর দশ আয়াতে বলছে খোদ খোদায়
নবীর হাতে হইলে বায়াত, সে হাত আমার হয়
তাই রাসুল পেলে খোদা মিলে, আল কোরানে বলে গো।।
শাহ শাহীনের চরণ তলে, হয় যেনো মোর ঠাঁই
অধম মোবারকের এ ছাড়া আর কোনো চাওয়া নাই
আমি বুঝেছি বুঝেছি মুর্শিদ, তুমি জীবন মূলে গো।।

প্রবন্ধ – আমি দেখেছি ফেরাউন নমরুদ

লেখক – সালমা আক্তার চিশতী

সুরা ইউনুসের ১০০ নম্বর আয়াত অনুসারে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ঈমান আনা যায় না। আবার সুরা ফাত্তাহর ১০ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, যারা নবীর হাতে বায়াত হয়েছে (বায়াতে রেদওয়ান) তারা আল্লাহর নিকটই বায়াত হয়েছে। ইহাই আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান আনা। সুরা ফাত্তাহর ১০ নম্বর আয়াতের শেষে বলা হচ্ছে, “এই অঙ্গীকার/বায়াত যারা রক্ষা করেছে তারা তাদের নিজেদের মঙ্গল করেছে। আর এই বায়াত/অঙ্গীকার যারা ভঙ্গ করেছে, তারা তাদের নিজেদেরই ক্ষতি করেছে।” মানে নিজেকে জাহান্নামী করেছে। যেহেতু বায়াতটি আল্লাহর হাতেই হয়েছে মানব গুরুর উছিলায়, কাজেই বায়াত ভেঙ্গে ফেলা মানে আল্লাহ ও রাছুল হতে তার ঈমান চলে গেছে, মানে সে আর মুসলমানই নেই, নবীর দ্বীনে নেই। আর গুরু/মুর্শিদ হতে খোদাকে আলাদা দেখলে বা গুরুকে গাইরুল্লাহ মনে করলে তার আর বায়াতই থাকবে না। আমার মুর্শিদ কেবলার কালাম, “নবুয়তে যাদেরকে নবী-রাছুল বলা হয় বেলায়তে তাদেরকেই অলি-আল্লাহ বলা হয়। কাজ একই শুধু উপাধি ভিন্ন। নবী পরিচয়ে আর কেহ আসবে না।”

সুতরাং বেলায়তের জগতে ওলিয়ম মুর্শিদের নিকট বায়াত হওয়া মানে আল্লাহর হাতেই বায়াত হওয়া। সুতরাং যারা বায়াত গ্রহণ করেনি, তারা ঈমানদার নয়। আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমানও নেই। কারণ, ঈমান আনতে হলে আল্লাহর অনুমতি/সমর্থন লাগবে। পিতার ঘরে জন্ম নিয়ে মুসলমান দাবী করছে যারা, তারা ঈমানদার নয় (স্ব-ঘোষিত ধার্মিক)। তাহলে ইবরাহীম ও ইয়াকুব নবী তাদের ছেলেদেরকে ‘মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না’Ñ এ কথা বলতো না। পিতা নবী/মুসলমান, তবে পুত্রগণও মুসলমান হবার কথা, ফের মুসলমান হতে হবে কেনো ? নূহ নবীর ছেলে কেনান কেনো কাফের হলো ? বায়াত/আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান আনতে হবে, তবেই সে হবে মুসলিম। পরে হবে আমানু, মুত্তাকি এবং মুমিন।

নমরুদ, ফেরাউন, আবু জাহেল, আবু লাহাবরা কখনো গুরুবাদী নয়, ওরাও স্ব-ঘোষিত ধার্মিক। নবুয়তে যেমন নবী-রাছুলদের বিরোধীতা করছে কাফের- মুশরিকরা, এখনো তারা পীর/মুর্শিদ/গুরুর বিরোধীতা করছে। যুগেযুগে বিভিন্ন সুরতে একই শয়তানের খলিফা নমরুদ, ফেরাউন, আবু জাহেল, আবু লাহাবরা গুরু/মুর্শিদের এবং তাদের ভক্ত/ঈমানদারগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, ফতোয়াবাজি, শারীরিক, মানসিক অত্যাচার-নির্যাতন করছে। ঈমানদারগণ তাদেরকে চিনতে পারেন। পশু পাখিরাও আল্লাহর সালেহ বান্দাদের (নবী-রাছুল, অলি-আল্লাহদের) চিনতে পারে, কিন্তু শয়তানের বান্দারা চিনতে পারে না। তাই কিভাবে ঈমান নষ্ট করা যায় সে চেষ্টায় দিন-রাত কোশেশ করে থাকে। হাদিসে বলা হচ্ছে – যারা বায়াত হয়নি (নবুয়তে নবী-রাছুলের নিকট, বেলায়েতে মুর্শিদের/গুরুর নিকট) তাদের মৃত্যু হবে জাহেলিয়াতের তথা কাফের-মুশরিকের মৃত্যু (বোখারী ৫ খন্ড-১২৮ পৃষ্ঠা টিকা, মেশকাত শরীফ)। আমাদের এই অচেতন/মুর্দা সমাজের মাঝে মুসলমান বেশে ফেরাউন/আবু লাহাব/নমরুদ/আবু জাহেলরা বসবাস করছে। মুসা নবীর বিরোধীতা করছে ফেরাউন (স্ব-ঘোষিত ধার্মিক), ইবরাহীম নবীর বিরোধীতা করছে নমরুদ, মহানবীর বিরোধীতা করছে আবু জাহেল, আবু লাহাব। এরা সবাই স্ব-ঘোষিত ধার্মিক, গুরুবাদী নয়। এরা কখনই গুরুবাদী ছিল না, এখনো নেই। এরা নবীজির সাহাবাগণকে বিভিন্ন রকমের অত্যাচার-নির্যাতন করতো আর বলতো মুহাম্মদের ধর্ম ত্যাগ করো, নইলে মেরে ফেলবো। নবীজির বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকমের ষড়যন্ত্র করতো, এমনকি তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল। ঈমানদার আর কাফের-মুনাফেক সবই নবীজিকে কেন্দ্র করে। এখন বেলায়েতের যুগে স্ব-ঘোষিত ধার্মিক (মুসলিম বেশে নমরুদ/ফেরাউন/আবু জাহেলÑযারা গুরুবাদী নয়) মুর্শিদের বিরোধীতা করছে এবং ঈমানদারদেরকে দৈহিক-মানসিক অত্যাচার-নির্যাতন করে চলছে। সেই আবু জাহেল/নমরুদ আর এই আবু জাহেল-নমরুদগণের খাছিয়ত একই, শুধু চেহারা ভিন্ন। তাদের দ্বারা সব যুগেই আল্লাহর প্রেমিকগণ নির্যাতিত হয়। কারণ, ব্যক্তিস্বার্থ পূরণ করতে গিয়ে নিকট আত্মীয়-স্বজনদের সাথে অনৈতিক আচরণ করে থাকে। ধর্মের ছদ্মাবরণে থেকে তারা অধর্মমূলক কর্ম করে বেড়ায়। ব্যবহারেই মানুষ বা শয়তানের পার্থক্য বোঝা যায়। লোকটি কি আনোয়ার না জানোয়ার তার ব্যবহারেই ফুটে উঠবে। আবু জাহেল বা আবু লাহাব যেমন নবীকে মানেনি, তেমনি অন্ধরাও গুরুকে মানে না। এমনকি তাদের পরিবারের কেউ যদি গুরুমুখী হয়, তারা তখন বিদ্বেষ পোষন করে। গুরু ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। কারণ, তাদের নিকট দুনিয়াই মূখ্য। তারা এমন ভাবে বায়াত ভঙ্গ করে আল্লাহ ও তাঁর রাছুলের দ্বীন থেকে বের হয়ে গেছে, যেভাবে ধনুক থেকে তীর বের হয়ে যায়। যারা সম্পদের মোহে অন্ধ হয়ে আখেরাতকে ত্যাগ করে, গুরুকে ত্যাগ বা ঈমান ভেঙ্গে ফেলে তারা নিশ্চিত জাহান্নামী (সুরা হুমাযা, ১-৪, সুরা ফাত্তাহ-১০)।

সম্পদ থাকাটা পাপ নয় কিন্তু সম্পদের মোহে পড়ে গৌরব-অহংকার করাটা পাপ। যারা দুনিয়ার সম্পদ নিয়ে অহংকার-গৌরব করে, গরীবের উপর জোর-জুলুম করে, অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ হরণ করে, ভোগ দখল করে, প্রতিবেশীগণ যার আচার-আচরণে নিরাপত্তাবোধ করে না, ঐ সমস্ত লোক মুসলমান নয়, তারা হলো জালিম। হাদিস বলছে, “যার হাত এবং জিহ্বা হতে প্রতিবেশীগণ নিরাপত্তাবোধ করে না তারা মুসলমান নয়।” যারা জুলুম করে তারা জাহান্নামে যাবে। অহংকার, গৌরব হলো ইবলিশের গুণÑখাছিয়ত। ইবলিশ মানেই অহংকারী। শয়তান মানুষকে মেরে/অচেতন করে তার বান্দা বানিয়ে নেয়। সম্পদের মোহের জন্য বিবেক হারিয়ে অমানবিক আচরণ করে থাকে। কোরানের ভাষায় – যাদের বিবেক নেই তারা অপবিত্র (সুরা বনী ইসরাঈল-৩৬)। আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী (কুঃ ছেঃ আঃ) বলছেন- “জ্ঞানীর (ধর্মজ্ঞানীর) সম্পদ আল্লাহর আশির্বাদ এবং অজ্ঞানীর (যারা জোর-জুলুম, অহংকার-গৌরব করে) সম্পদ হলো আল্লাহর অভিশাপ।” যুগে যুগে অন্ধ ফেরাউন, আবুজাহেল, আবুলাহাবের গুণ ধারণ করে নবী-রাসূল বা অলী-আউলিয়াদের অনুসারীদেরকে শারীরিক-মানসিক অমানবিক অত্যাচার বা নির্যাতন করে চলছে। খোদা প্রেমিকগণ তাদের সাথে এইরূপ আচরণ হওয়াকে বলতে থাকে, এইটা হলো তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে ঈমানের পরিক্ষা। ঈমানদারদের মূল সম্পদ হলো তার ঈমান, আর শয়তান একজন ঈমানদারের ঈমান ভাঙ্গার জন্য মানবরূপে আশ্রয় নিয়ে এইরূপ অপকর্ম করে থাকে, এরাই হলো নমরুদ, ফেরাউন, আবু জাহেল, আবু লাহাব।

আল্লাহপাক নির্বাচন করছেন বা খলিফা বানিয়েছেন, নবুয়তে নবী রাছুল আর বেলায়েতে ওলী আল্লাহগণকে আর ইবলিশ বা শয়তান নির্বাচন বা খলিফা বানিয়েছে ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেল, আবু লাহাব, ইয়াজিদকে। দুইটিই চিরবর্তমান। শয়তানের খলিফারা গুরুবাদী নয়, স্বীয় প্রবৃত্তির উপাসক। ওরা কখনই গুরুবাদী ছিল না, এখনো গুরুবাদী নয়। হোক না সে আলেম, মুফতি, মুহাদ্দেস, মুফাচ্ছের বা পীর। কোরানের ভাষায় ওরা ‘আউলিয়া’ – আউলিয়া আল্লাহি নয়। ওরা শয়তানের বন্ধু, আল্লাহর বন্ধু নয়। আমাদের মুর্শিদ মাওলা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী প্রায়ই একথা আলোচনা করে থাকেন। শ্রী কৃষ্ণ বলছেনÑ “একটি প্রদীপ ও একটি সাপ অর্থাৎ একজন মানুষের মাঝে প্রদীপ রূপী আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আলো যদি প্রবেশ করে, তবে সেই মানুষটির জ্ঞানের আলোতে অনেক মানুষ আলোকিত হয়, আর যেই মানুষের মাঝে সাপের স্বভাবের ক্রিয়া প্রকাশ পায় অর্থাৎ তার আচরণ হয় বিষাক্ত, তখন তার নিকট মানুষ এসে শান্তি লাভ করতে পারবে না।” ঠিক তেমনি দশা হয় একজন গুরু ভক্তের। কারণ, গুরুর নিকট যাওয়ার জন্য অনেক বিষাক্ত মানুষের (শয়তানের খলিফাদের) ছোবলের ব্যাথা তাকে অনুভব করতে হয়, কিন্তু যখন গুরুর কথা স্মরণ হয় তখন আর সেই ভক্তের মনের মাঝে কোনো কষ্টই থাকে না। ধৈর্যের চাদর গায়ে মাখিয়ে সে এই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে থাকে। মন যদিও অনেক সময় মানতে চায় তবুও মনকে গুরু জ্ঞানের আলোকে আলোকিত করে খোদার দীদারের পথে অগ্রসর হতে থাকে।

অন্যায়-অত্যাচার বা জোর জুলুম এই জগতে করা যায়, কিন্তু যখন কালের হাতে অর্থাৎ যখন ঝড়ের মতো মৃত্যুর এসে নিয়ে যাবে তখন সবই চোখের সামনে দেখতে পাবে। দেখতে পাবে মানব ছুরতকে কর্মফলে পশুর ছুরতের রূপদান করছে, তখন আর ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না। যেমন – ডায়বেটিক রোগীদের জন্য মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া নিষেধ, কিন্তু যারা এই রোগ থাকা সত্ত্বেও লোভে পড়ে বার বার মিষ্টি খেতে থাকে তখন সেই ব্যক্তিটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে, এই ফলাফলটি সে কর্মের দ্বারা লাভ করে থাকে। ঠিক তেমনি দশা হয় সেই মানুষটির করণ সে জোর- জুলুম করতে করতে করতে তার পাপের খাতা এতই ভারি করে তুলে যে, যার ফলাফলে সে নিজেই চরম বিপদগ্রস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু ইহজগতে যদিও সে তা বুঝতে পারে না। যদি গুরুর দয়া হয় তবেই সে এ ভয়ংকর পথ হতে উদ্ধার পেতে পারে। তাদের এই পাপের ফলে অমূল্য সম্পদ মানব সুরত হারিয়ে জানোয়ারের সুরত ধারণ করে জাহান্নামে যেতে হবে। কারণ, মানব সুরত কখনো দোযখে যাবে না। সুতরাং সেই ব্যক্তি যদি নিজের ভুল বুঝতে না পারে তবে সে মানব জনম হারাবে। দুনিয়ামুখী চিন্তা চেতনার দ্বারা একজন ব্যক্তি খোদা থেকে আলাদা হয়ে যায়। খোদার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়াই হলো মানব জনমের বাহিরে অবস্থান করা। অন্ধকার যেমন আলোকে আড়াল করে দেয় ঠিক তেমনি গুরুকে ত্যাগ করা ব্যক্তি কালো অজুদ ধারণ করে ফেলে।

অজ্ঞানতার মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে অচেতন মানবগণ খোদার প্রেমিক বান্দাদের সাথে যুগে যুগে অনৈতিক আচরণ করে গেছে। যেমন- সূর্যগ্রহন যখন হয় তখন সূর্যটি অন্ধকারে ঢাকা পরে যায় ঠিক তেমনি হয় অন্ধদের দশা তাদের হায়ানী স্বভাবের দ্বারা খোদাার রূপ দরশন করতে পারে না। খোদার ভেদ যারা জানে তাদের প্রতি বিদ্ধেষ পোষন করে নিজের ক্ষতি করতেছে ফেরাউনের দল কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না। কুকুরের লেজ যেমন সোজা হয় না তেমনি হয় ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেল, আবু লাহাবদেও, ইয়াজিদদের দশা। মানবের মুখশদারী অন্ধদের দ্বারা ফেৎনার সৃষ্টি হয়েছে সব যুগে। কারণ, মানব রূপেই গুরু বা মুর্শিদ আর মানব রূপেই আবু জাহেল, আবু লাহাব, ফেরাউন, নমরুদ। তাই এই রূপ মুখোশধারী ব্যক্তিরা গুরু বা মুর্শিদের ভেদ জানে না। গুরু/মুর্শিদ পুজা সবার নছিবে থাকে না কারণ, গুরু/মুর্শিদ হলো আল্লাহর মূর্ত রূপ। আল্লাহ বলেন : ‘যেই বান্দা আমার হয়ে যায় আমি সেই বান্দার সর্বঅঙ্গের

কর্তা হয়ে যাই।’ যারা হায়ানী আত্মাতে বাস করে নফসে ইনসানির ভেদ তারা বুঝবে না। আর গুরু/মুর্শিদ বাস করে রূহ্-কুদসিতে। তাই ভেড়ার মগজ নিয়ে অর্থাৎ ভেড়ার স্বভাব হলো অন্য ভেড়ারা যা করবে সে তাই করে। ঠিক তেমনি হয় ফেরাউনদের অবস্থান সে তার হুঁশ, আক্কেল হারিয়ে অন্যের কান কথা অনুযায়ী গুরু/মুর্শিদ ও গুরু বা মুর্শিদের অনুসারীদের সাথে শত্রুতা করে থাকে। বাদুরের স্বভাব হলো সে মুখে খাবার খায় এবং মুখেই পায়খানা করে ঠিক তেমনি হয় ফেরাউনদের দশা। আমি নিজের চোখেই ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেল, আবু লাহাব, ইয়াজিদদেরকে দেখেছি। আমি তাদের মোকাবেলা করেই তাওহিদের পথ চলছি। আমার ঈমান ভাঙ্গার জন্য অনেক প্রচেষ্টা করেছে/করছে। এই ধরনের ফেরাউন বেশী নরপশুরা সব যুগেই ছিল/আছে। এরা শয়তানের মানবরূপী খলিফা। মানবরূপী শয়তানের খলিফারা নারী-পুরুষ দুই রকমেরই আছে। এই ধরণের পশুদের দ্বারা আল্লাহর প্রেমিকগণ নির্যাতিত হয়েছে/হচ্ছে। তাদের দীলে, কর্ণে এবং চোখে আল্লাহপাকই মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তারা থাকবে কঠিন আযাবে (সুরা বাকারা – ৭)। কারণ, ওরা নিজেদের প্রবৃত্তির/নফসের পূজা করছে, অথচ বুঝতে পারছে না। যেমনÑ একটি গাড়ির ইঞ্জিনের সাথে সংযুক্ত তার যদি ইচ্ছা করে কোন ব্যক্তি কেটে ফেলে তবে গাড়িটিকে মিস্ত্রী দেখাতে হবে তবেই গাড়িটি ঠিক হবে। গাড়ির ইঞ্জিনটিকে মানুষের মনের সাথে তুলনা করা যায়, ফেরাউন বা আবু জাহেলদেরও (গুরুবাদী নয়, দুনিয়ার পূজারী) দ্বারা একজন ঈমানদারের মনে অনেক আঘাত আসতে থাকে, আর গুরুর কালাম/বাণী হলো সেই আঘাত ঠিক করার মহা ঔষধ।

একজন ঈমানদার তার ঈমানকে গুরুর দয়ার দৃষ্টি দ্বারা রক্ষা করে থাকে। একজন গুরু ত্যাগী (যে ব্যক্তি বায়াত ভঙ্গকারী) শয়তানের খলিফা দিশাহারা পাগলের ন্যায় একজন ঈমানদারের পিছনে লেগে থাকে, কিভাবে সে ঈমানদার ব্যক্তিটিকে তার দলের অন্তর্ভুক্ত করবে। শয়তান এ ওয়াদা’ই খোদার সাথে করেছে কিন্তু খোদার বান্দা (যারা খোদাকেই চায়, খোদাতেই ফানা হয়ে থাকে) তাদেরকে শয়তান কিছুই করতে পারবে না। দুনিয়ার আশা বা উদ্দেশ্য নিয়ে বায়াত হওয়া হলো হারাম। এইজন্য একজন মুরিদ/ঈমানদার ব্যক্তি যদি দুনিয়া লাভের জন্য গুরুর নিকট যায়, কামেল মুর্শিদ তাকে তা কখনো দিবে না। মুরিদকে দুনিয়া দান করা গুরুর নীতি বিরোধী কাজ। যারা শুধু জাগতিক রোগ ভালো হয়ে যাবে তার আর ডাক্তারের প্রয়োজন হবে না, এ নিয়তে মুরিদ হয় তবে তার মুরিদই হবে না এবং সে মুরিদই নয়। এ ধরনের চিন্তাই একজন মুরিদের ভুল ধরণা কারণ, আশা পূর্ণ না হলে ঈমান ভাঙ্গতে পারে। এ পথেই শয়তান তাকে তার বন্ধু করে নেয়। একজন মুরিদের যে ধরনের কাজ, চিন্তা-ভাবনা বা যাদের সাথে চলাফেরা করলে ঈমানের ক্ষতি হয় ঐ সমস্ত মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করা ফরজ। তা না হলে ঈমান হারিয়ে বেঈমান হয়ে জাহান্নামে যেতে হবে। আমার মুর্শিদ কেবলার মুখে একটি গান শুনেছি, লেখক বলছেন –

ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়,
ওরা চাহে ধন-জন, চাহে আরোগ্য বিজয়
ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়।

যারা ঈমানদার হবে তারা রাছুলকে দেখেই ঈমান আনবে। না দেখে ঈমান আনা যায় না। কারণ, কচু পাতার মাঝে পানি ধরে রাখা যায় না, তাই ঈমান ধরে রাখতে হলে চাতক পাখির ন্যায় একদৃষ্টে গুরু/মুর্শিদের দাওন ধরে রাখতে হবে, চেতন থাকতে হবে। আমার মুর্শিদ কেবলার বানী “অচেতন ইহকাল আর চেতন হলো পরকাল।” অন্ধরা ভাবে গুরু সাধারণ একজন মানুষ, তাদের এই ধরনের করুণ অবস্থা হবে তা পূর্বেই লেখা ছিল। গুরুকে মনুষ্য জ্ঞান যার, অধঃপাতে গতি তার। মানব গুরু খোদা নয়, খোদা হতে জুদাও নয়। এ ভেদ শয়তান এবং তার খলিফারা জানে না। সেজন্যই শয়তান আদম গুরুকে সেজদা করেনি। এখনো শয়তানের বান্দারা আদম গুরুকে সেজদা করে না। শয়তান ইহাকে শেরেক মনে করে তার খলিফা বা বান্দারাও শেরেক জানে। আবু জাহেল/আবু লাহাবদেরকে যেমন নবীজি হাজারো বুঝিয়ে পারেনি, তেমনি এ যুগের আবু জাহেল, আবু লাহাবদেরকে হাজারো ঝুঝালেও বুঝবে না। কারণ, স্বীয় প্রবৃত্তি পূজার কারণে তাদের দ্বীলে, কর্ণে, চোখে আল্লাহপাক মোহর মেরে দিয়েছেন।

যারা গুরুবাদী নয়, বা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান আনেনি তারা কখনো বর্তমান যুগের আবু লাহাব, আবু জাহেল, নমরুদ, ফেরাউনকে চিনবে না। কারণ, তারা নিজেরাই তাদের অনুসারী হয়ে আছে। আর তাদেরকে চিনতে না পারলে ঈমান রক্ষা অবশ্যই কঠিন হয়ে পড়বে। শয়তানের খলিফা আবু জাহেল, আবু লাহাবরা সব সময়ই পিছনে লেগে আছে ঈমানদারের ঈমান ভাঙ্গার জন্য। শয়তানের খলিফারা পিতৃধর্মে বিশ্বাসী। আনুষ্ঠানিক নামাজ, রোজা ইত্যাদি খুব বেশী বেশী করে আদায় করে থাকে, কিন্তু তাদের কোনো বন্দেগীই আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। একথা ঈমানদারগণ বাস্তবেই বুঝতে পারেন এবং চোখে দেখে থাকেন। তাদের মধ্যে আলেম-মাওলানা, মুফতি, মুহাদ্দেস, মুফাচ্ছের রয়েছে লক্ষ লক্ষ। রাছুলপাকের ভাষায় ওরা হবে ৭২ কাতারের লোক-জাহান্নামী। বর্তমানে শয়তানের খলিফা আবু জাহেল আবু লাহাবকে চিনবে একমাত্র তারাই যারা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান এনেছে তথা মুর্শিদের/গুরুর নিকট বায়াত গ্রহণ করেছে। এরাই একমাত্র নাজাত প্রাপ্ত দল তথা ৭৩ কাতারের মধ্যে ১ কাতার। এখানেই গুরু বা মুর্শিদের শিক্ষা অতীতকে বর্তমানে দেখা। যে অতীতকে বর্তমানে দেখে না সে অন্ধ।

সংগীত – দেহ রাজ্যের খবর করো

লেখক – নূর আলম খাঁন

দেহ রাজ্যের খবর করো পাগল মন
নিত্য গুরু কল্পতরু, মানো সদা তাঁর বচন।।
রুহ রাজা আক্কেল উজির, নফস হয় উহার বাহির
আপন প্রবৃত্তির, করিয়া লও চেতন
মনরাজ্য ভূবন ব্যাপী, আয়ত্ত্বে রেখেছে ত্যাগী
পতন হইয়াছে ভোগীর, না করে তাঁরে স্বরণ।।
খাকের ঘরে আরেফেল অজুদ, নাছুতে রয়েছে মজুদ
জিবরাইল রাখিলো সুরত, জানিবে করলে ভজন
মিকাইল মোয়াক্কেল হইয়া, মলকুতে রইয়াছে বইয়া
মমতেনাল অজুদ পাইয়া, আবের ঘরে রয় যখন।।
বাদ অহেদুল অজুদ পাইয়া, ইসরাফিল মোয়াক্কেল হইয়া
লাহুতে রইলো চাহিয়া, জানিবে করলে করণ
মমকানল অজুদের স্থিতি, আতশ রাখিল মতি
আজরাইল পাইয়া গতি, জবরুতে বাধিল ধাম।।
রুহুতে ওয়াজেবল পাইয়া, মুহাম্মদ মোয়াক্কেল হইয়া
হাহুতে রইল লুকাইয়া, ভক্তকে করে আহ্বান
দীপ্তময় প্রভাগুণে, আত্মচেতন হয় ধ্যানে
শুদ্ধময় প্রেম দর্পনে, না পেল নূর আলম খান।।

সংগীত – যে জাতে মিশিলে পরে

লেখক – কাঙাল আব্দুর রহমান

যে জাতে মিশিলে পরে, পথিক হয় খাঁটি সোনা
গুরু ভজন কররে মন, করো সেই জাতের ধ্যান সাধনা।।
অসাধ্যকে সাধন করা ভক্তের কাজ হয়
কলকাঠি নারেন গুরু জানিবে নিশ্চয়
ভক্তিতে মুক্তি আসে থাকেনা দুখ যাতনা।।
ভজন কর্মে থাকবি ধর্মে মুর্শিদ মুলে খোদা
ফানাফিল্লায় যেয়ে দেখবি নয়রে সৃষ্টি জুদা
সবখানেতে স্রষ্টা প্রকাশ, সুদৃষ্টি দিয়ে দেখোনা।।
পশুর দলে তাল মেলালে, মানুষ ভাবা ভুল
সকলের মুল মুর্শিদ সবার সুখ তটিনীর কুল
বেনজীর চাঁন মৌলানা, অধম কাঙাল বুঝলোনা।।

সংগীত – যেই কাবাতে রবের দেখা

লেখক – বাউল উজ্জল শাহ্

যেই কাবাতে রবের দেখা , আযান হয় তার কোন ঘাটে
কাবার মালিক আর মোয়াজ্জিন, প্রকাশ হয় কোন রূপেতে।।
কাবার ঘর কোন রূপের অধীন, কোন জনা তার হয় মোয়াজ্জিন
থাকি যদি পরিচয় হীন, কার ডাকে যাই কোন পথে
কার বা সে ঘর কোন বা পথে, পড়তে নামাজ আমায় ডাকে
ভক্তি না হলে সাক্ষাতে, মন থাকেনা প্রেম পথে।।
বলো আমায় কাবার গঠন, কোথায় সে অমূল্য রতন
ভক্তি দেবো দেখে চরণ, কোন পথে তার কাছে যাই
পথে যেতে অন্ধকারে, আলোর মশাল রয় কোন ঘরে
কোন কান্ডারি নির্দেশ করে, চলে নৌকা প্রেম পথে।।
ইমাম হয় কোনজনা কাবার, কোনজন দেয় নামাজীর স্বাকার
বুঝিতে আজ এই সমাচার, আবেদন তোর দরবারে
উজ্জ্বল বলে কাতর স্বরে, দরদী মা বাচাতন রে
জ্ঞান পিপাসায় ধরছে মোরে, বলতে ডড়াই মুখ ফুটে।।

প্রবন্ধ – মানব জীবনের পূর্ণতা মানবিকতায়

লেখক – এস এম বাহরায়েন হক ওয়ায়েসী

সৃষ্টির সেরা মানুষ, কিসে তার শ্রেষ্ঠত্ব? আইয়ামে জাহিলিয়াতকে পরাভূত করে দাঁড় করিয়ে দেয়া এই অজুদ শৈলীর স্থায়ীত্বকে বিকশিত করে হাইউনে পৌঁছে পৃথীবিকে করেছে সুখময়। অমলিন হয়েছে প্রেমময়তা। অহমিকা ছেড়ে সুষ্ঠভাবের আদান প্রদানে হয়ে উঠেছে সবে দরদী। আজ আমরা বেঁচে থাকার স্বার্থকতা খুঁজে পেয়েছি। পেয়েছি সেই পথের অবলম্বন – কোথায় ছিলাম, কোথায় আছি, আবার কোথায় যাব?

তরিকা মানে পথ, এই পথ কদম চলার পথ নয়। এই পথ হচ্ছে আত্মার সুনিপুন স্বচ্ছ দিক নির্দেশনার প্রতিফলন। যা বাহ্যিক দৃষ্টি ও অভ্যন্তরীন দৃষ্টিকে কলংকিত হতে রেহাই দেয়। সে যেদিকেই ফেরে, কেবল তাকেই দেখতে পায়। কারণ এক হতে একক সত্ত্বার বিকাশ ঘটলে এক তো কখনও মিলিয়ে যায় না। সুক্ষ হতে অতি সুক্ষে অবস্থান নেয়। এত মিহিন হেকমতের দ্বারা এই বিশ্বালয় পরিচালিত, যেন কে বা কারা এক হস্তে নিয়ন্ত্রণ করছে সব। তার সৃষ্টির দর্শন, কেউ কাউকে টপকাচ্ছে না। সমান তালে নিজের আত্ম-কর্তব্য পরিচয়ে মানুষের প্রভুত্ব সম্মান প্রদর্শন করে ধন্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মানুষ কি তা বুঝতে পারছে?

নিয়মতান্ত্রিক পথ কখনও পরিবর্তন হয়নি, হবেও না। যে সমস্ত মানুষ তা উপলদ্ধি করতে পারে না, সে থেকে যায় অমর্যাদায়। আর মর্যাদাবান মহামানবেরা তাঁর অস্তিত্ব সমন্ধে পরিচয় দিয়ে, মুল্যায়িত করে পৌঁছে যায় মহিয়ানে। অফুরন্ত ভান্ডারের মালিকানায় বিকশিত হয়ে ফিরে এসে মায়ামৃগে তার অবস্থানকে দেখিয়ে দেয় দূরত্বই কাছে। তখন সাধকগণ সাধনার রেওয়াজ দেখিয়ে দেয়। ঐশি জাত সত্ত্বা সর্বসময় রক্ষার কাজেই পরিচালিত থাকে। ধ্বংস সে কখনও পছন্দ করতে চায় না।

সৃষ্টিতে যার সুখ অন্বেষণ, সে তো ধ্বংস চাইবে না। তবে রাহমানুর রাহিম কখনও মন্দকে একপেশে করে না, তাকেও পৃথিবীর রাজ্যে প্রভু অবস্থানের সুযোগ দিয়েছেন। দুইটা কারনে, এক ভালকে ভাল রাখার প্রত্যয়ে, আর দুই মন্দও যদি চায় তবে শুদ্ধতা আনয়ন করে ভাল হওয়ার সুযোগ দেয়ার জন্যে। তাই মানব জীবনের পূর্ণতা বিশ্লেষন করে, তার শিক্ষার পরিধীকে সসীমে আটকে দিলে হবে না, অসীমকে স্পর্শ করতে সমস্ত পথ খুঁজে পেতে হবে। সে পথে স্বার্থ অন্বেষণ করা যাবে না।

কর্তব্যপরায়ণতার ওয়াদায় ছিফাতের গুণাগুণ লালন করে জাতের পথকে ত্বরান্বিত করতে হবে। একটা পর্যায়ে সে আপনা-আপনি অনুভব করতে থাকবে ওয়ালিয়ম মুর্শিদ আসলে কি? ওয়ালিয়ম মুর্শিদ ভক্তের ভক্তির সিমায় রূহানী তাছিরে নূরানী নূরে চির জাগ্রত করে দিতে পারে। তখন সে সংরক্ষিত করে স্বতন্ত্র সেই রূপ যা লাছানি। তার মানবিকতা ছাপিয়ে মুহিত চেতনার কুল আলমকে ঐশ^রিক শক্তি দেয়। ছুটে যায় মানুষ তার কাছে তখন সে হয়ে উঠে সকলের। তার আত্মা হতে অমৃতের সুধা বিলিয়ে দেয় সবার মননে। তারই প্রতিচ্ছবি হৃদয়ে অঙ্কন করে অনেকেই ভূলে যায় পাশবিকতা। মানবতার পূণ্যে ত্যাগের মহিমাকে লালন করে সে। সরল সে পথ অনেক কষ্টে অর্জিত, সেই পথে নেই কোন ভয়।

মহান ¯্রষ্টার বলয়ে প্রভুত্বের মর্যাদা পেয়ে দেখায়ে দিয়ে যায় কখনও কেউ অবমুল্যায়িত হতে পারে না। সৃষ্টির ধারায় এক বর্ণিল শোভায় শোভিত হয়ে প্রকৃতিকে প্রাণবন্ত নির্ভেজাল অপরূপ শক্তি সঞ্চালন করে প্রত্যেকে স্বজন হয়ে উঠে। তখন বিচ্ছেদ হয় বেদনা বিধুর। এস্কের তামান্না মিটানোর মধ্যে কর্তব্যপরায়নতা ঐশী নিয়মের প্রতিফলন ঘটিয়ে ওজুদী তাৎপর্যকে লাছানিতে দাড় করিয়ে দিয়ে চমৎকারে দর্শনীয় শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিয়ে তার সত্ত্বা বুঝিয়ে দিয়েছেন। কি করে সর্বজনীন জাত স্বত্তায় মোহাম্মদী চেতনা বশবর্তী হওয়া যায়। নবুয়তী হেকমতে বিলায়েতের যে আত্মপরিচয় তা তার অসীম প্রয়োজনীয়তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে।

প্রভু আর গোলাম এক নয়, তবে গোলামী করেই প্রভুত্বে পৌঁছাতে হয়। প্রভুত্বে পৌঁছে একক থেকে একলীন হয়ে যখন দেখতে থাকে তখন অমরত্বের পথ খুলে, যে পরিচয় পাওয়া যায়, ঐ রূপের ছুরত হতে কখনও আর নিরিখ ফেরানো যায় না। যে যেখানে ঘুরে কেবল আপনাকে পেয়ে যায় নীড়ে। যাকে এখন সর্বজনীন মানবিকতায় পূর্ণ করে শ্রেষ্ঠত্বের গৌরবান্বিত আত্মপ্রত্যয়ী বিশে^র আবাসস্থল হিসেবে পূজনীয় করে রাখে সর্বদায়। তখন বলতে হয়না কাউকে ধর্মভিরু হতে, ধর্মের অনুরক্ত হচ্ছে স্বার্থহীন এক সত্ত্বা, যা তার প্রকৃত মর্যাদাকে মুল্যায়িত করে হেফাজতের অধিকার দেয়।

একটু খানি অনুভব করবেন, যেন এই পৃথিবীর আলো, বাতাস, মাটি, পানি, বৃক্ষ তরুলতা হায়ানিয়াতে দাড়িয়ে প্রকৃতির প্রকৃতকে অবলোকন করে আমার অস্তিত্বকে চিহ্নিত করে প্রতিনিধির দায়িত্বকে স্বীকার করে কর্তব্যের স্বীকৃতি নিয়ে পবিত্র হতে পারা যায়। আর পবিত্র হলেই মানব জীবনের পূর্ণতা মানবিকতায় দেখতে পাব।

সবাই ভাল থাকুন । আমিন।

প্রবন্ধ – দৃষ্টিভঙ্গির আড়ালে সত্য বাণী

লেখক – মোতালেব চিশতী

আমরা শুধু বাহ্যিক চাকচিক্য বা পোশাকের মর্যাদা দিতে জানি। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিরাজিত অন্ধত্ব আর আমাদের অজ্ঞতা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন হীনমন্য করে রেখেছে। যার সুযোগ গ্রহণ করেছে এক শ্রেণীর নামধারী জালিম সম্প্রদায়, যারা আলেমের বেশ-ভূষা গ্রহণ করে লিপ্ত হয়েছে অধর্ম তথা অপকর্মে। তাদের বাহারী পোষাক আর খুবসুরত চেহারা দেখে সমাজের সাধারণ মানুষ তাদেরকেই বসিয়েছে ধর্মগুরুর আসনে। তারাও সে সুযোগে ইচ্ছেমতো কলুষিত করে চলেছে ধর্মকে। মানুষের ঈমানকে হরণ করে যুগের পর যুগ অন্ধত্বের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে তারা। তারা নিজেদের অপ-স্বার্থ হাসিল করার জন্য ধর্মের মর্মবাণীকে আড়াল করে শুধুমাত্র রূপক বা মোতাশাবেহাতের মনগড়া ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে সাধারণ মানুষদের বিভ্রান্ত করে ফায়দা লুটে নিচ্ছে। মানবতা কে উপেক্ষা করে শুধু বাহ্যিক পোষাক-আশাক আর রূপক প্রতীকের এ রাজত্বে আজ নির্বাসিত হয়েছে সত্য বিধান। উপেক্ষিত হয়েছে প্রকৃত ধর্ম।

ধর্মব্যাবসায়ী এসকল ধান্দাবাজদের খপ্পর হতে জনসাধারণ বের হতে পারছেনা বলেই এক বৃহৎ জনগোষ্ঠী অন্ধ, বধির, পথভ্রষ্ট আর গোমরাহ রয়ে গেছে। তারা এখন দেখে না, শুনে না, বুঝেও না। তারা দেখে শুধু বাহ্যিক আবরণ বা পোষাক। অথচ মানুষ হওয়ার জন্য পোষাক নয়, দরকার একটি সুন্দর, পবিত্র, নির্মল আর মনুষ্যত্ববোধে পূর্ণ একটি হৃদয়। যে হৃদয়ে থাকবে মানুষের প্রতি দরদ আর ভালোবাসা। যে হৃদয়ে সদা বেজে চলবে মানবতার জয়গান। অন্ধদের কাতারে দাড়িয়ে থাকা জীবগুলোর জ্ঞানচক্ষু বন্ধ থাকে ব্যক্তিস্বার্থের পর্দায়। সত্য তাদের নয়নে রেখাপাত করেনা। তারাও সত্যটাকে খুঁজে দেখার চেষ্টা করে না। ধর্মীয় দৃষ্টিতে তারাই দাজ্জাল। তাদের দ্বারাই পথভ্রষ্ট হচ্ছে বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী। পোশাকের তো কোন দোষ নেই, দোষ হলো তার, যে এই পোশাক পরে পোশাকের মর্যাদা রক্ষা করেনি, বরং এই পোশাকের অন্তরালে থেকে অমানবিক যতসব কর্মকান্ড করে বেড়াচ্ছে। আর সমাজের সহজ সরল মানুষগুলোর সরলতাকে পুঁজি করে নিজেদের আখের গুছাচ্ছে। তারাই হলো মানুষরূপী শয়তান, তাদেরকেই হাদিসে দাজ্জাল বলা হয়েছে, আর এদেরকেই কালামে পাকের ভাষায় বলা হয়েছে প্রকাশ্য শত্রু।

আজ সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার। অজ্ঞানতার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে, সত্য-সুন্দর আর বাস্তবধর্মী দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করা আজ সময়ের দাবি। মনে রাখা দরকার, সত্য-সুন্দর আর সঠিক জ্ঞানের আলোয় পরিবার, সমাজ ও দেশ আলোকিত করতে না পারলে আমাদের আগামী প্রজন্ম অন্ধকার থেকে আরো অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। এমন পোষাকী দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই আজ জগত জুড়ে যত বিশৃঙ্খলা। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প আজ গ্রাস করেছে সমগ্র জগতকে। ধর্ম শাস্ত্রের অপব্যাখ্যা করে একদল আলেম নামধারী জাহেল শ্রেণী বিভ্রান্ত করে বেড়াচ্ছে সাধারণ মানুষদেরকে। ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষ বিভক্ত হয়েছে শত সহ¯্র দল-মতে। করে বেড়াছে হানাহানি, রক্তপাত। শান্তির ধর্মকে নিক্ষিপ্ত করেছে অশান্তির আস্তাকুড়ে।

উপরে মানুষসুরত, ভেতরে পশু স্বভাব ধারণকারী এসব মুনাফিকদের জন্যই মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী লিখেছেন, ‘আমি বহু মানুষ দেখেছি যাদের গায়ে পোশাক নাই, আবার বহু পোশাক দেখেছি, যার ভিতরে মানুষ নাই।’ সাধন দাস বৈরাগী লিখেছেন, ‘থাকলে হাত, পা, নাসা, চক্ষু, কর্ণ, মানুষ তারে বলে না, মানুষ হওয়াই মানুষের সাধনা।’ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে আমাদেরকে গাইতে হবে মানবতার জয়গান। যার মধ্যে মানবতা নেই, তার কোন ধর্মই নেই। যে পথে গমন করেছেন অসংখ্য নবী-রাসূল, গাউস-কুতুব, পীর-মাশায়েখ, ওলী- আউলিয়াগণ। যাদের সংস্পর্শে এসে অসংখ্য পথহারা মানুষ পেয়েছেন পথের দিশা। যারা মিথ্যার বেড়াজাল চ্ছিন্ন করে মানবজাতিকে দিয়েছেন সত্যের সন্ধান। মানবজাতিকে এই সত্যের সন্ধান দিতে গিয়ে অসংখ্য নবী-রাসুল, ওলী-আউলিয়া, পীর ফকিরগণ লেবাছধারী জালেমদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন।

যারা তাদের আত্মত্যাগ, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং মুনাফেকদের দ্বারা বিভিন্ন ষড়যন্ত্র আর নির্যাতনের শিকার হয়েও অন্ধকারাচ্ছন্ন মানবমন্ডলীর মাঝে সত্যের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন, মানুষের মাঝে মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছেন অকাতরে, পথহারা মানুষকে দিচ্ছেন সিরাতুল মুস্তাকিম এর ঠিকানা, সেই মহান সাধকদের মধ্যে অন্যতম একজন সাধক হলেন আমার মহান মুর্শিদ কেবলা হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী (কুঃ ছেঃ আঃ)। যার রচিত কালজয়ী গ্রন্থসমূহতে তিনি বাস্তব মুক্তির পথনির্দেশনা দান করেছেন পতিত মানবদেরকে।

প্রবন্ধ – আসরারে পাঞ্জাতন – ১২তম পর্ব

লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

ইবনে সা’দ সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব থেকে বর্ণনা করেন যে, আরবরা অতীন্দ্রিয়বাদী ও কিতাবধারীদের মুখ থেকে ‘মোহাম্মদ’ নামের একজন নবীর আগমন সম্পর্কে প্রায়ই শুনতো। যে-ই একথা শুনতো সে-ই নবুয়তের আকাঙ্খায় স্বীয় পুত্রের নাম ‘মোহাম্মদ’ রাখতো (খাসায়েসুল কুবরা-১ম খন্ড, ৪৬পৃষ্ঠা)।

হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, যখন রাছুলে করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম ভুমিষ্ঠ হলেন তখন চারজন স্ত্রীলোক আসমান হতে অবতীর্ণ হলো। তিনি তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা বললো, ‘আমি হলাম হযরত হাওয়া – তার হাতে ছিল একটি স্বর্ণের কড়াই, দ্বিতীয়জন বললো, আমি ইব্রাহীম নবী স্ত্রী সারাহ – তাঁর হাতে ছিল হাউজে কাওসারের পানি ভরা একটি রূপার পাত্র, তৃতীয়জন বললো, আমি হাজেরা (ইব্রাহীম নবীর দ্বিতীয় স্ত্রী)- তাঁর হাতে ছিল বেহেশতের আতর এবং চতুর্থজন বললো, আমি হলাম মাযাহেমের কন্যা আছিয়া (ফেরাউনের স্ত্রী)- তাঁর হাতে ছিল সবুজ রেশমের একটি রুমাল। তারা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামকে গোসল করিয়ে আমার কোলে দিলেন। অতঃপর তিনি আল্লাহপাকের দরবারে সেজদায় পড়লেন এবং উঠে আসমানের দিকে হাত তুলে দোয়া করলেন, “হে আমার আল্লাহ, আমার উম্মতকে ক্ষমা করে দাও।” জবাব আসলো, ‘হে মোহাম্মদ, তোমার খাতিরে তাদেরকে ক্ষমা করে দিব। তবে যারা শিরক করবে, তাকে ক্ষমা করা হবে না। তারপর আল্লাহপাক ফেরেশতাগণকে বললেন, দেখো আমার হাবিব কতো হিম্মতওয়ালা, কতো উদারচেতা, জন্মের প্রাক্কালে তিনি তাঁর উম্মতকে ভুলেননি। তিনি কেয়ামতের দিনও তাঁর উম্মতকে ভুলবেন না।

হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম হতে আরো বর্ণিত আছে যে, শিশু মোহাম্মদ আমা হতে আলাদা হলেন এবং তাঁর সাথে বের হয়ে গেলো একটি নূর। তা আলোকিত করে ফেললো পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত সব কিছুই। অনন্তর তিনি পতিত হলেন উভয় হাতের উপর ভর করে জমীনের উপর। তিনি গ্রহণ করলেন এক মুষ্টি মাটি, তা আবদ্ধ করলেন মুষ্টিতে আর উত্তোলন করলেন মস্তক আসমানের দিকে। অন্য বর্ণনায় ইহাও রয়েছে যে, ‘তিনি এক হাত মাটিতে এবং এক হাত আসমানের দিকে তুলে ধরলেন।’ এর মানে তিনি জমীন হতে আসমানে ভ্রমনের ঈশারা দিলেন।

হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালাম হতে বর্ণিত তিনি বলেন, যখন মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন তখন আমি দেখতে পেলাম এক বিশাল জ্যোতির্ময় মেঘ। তাতে শব্দ হচ্ছে অশ্বের হ্রেষাধ্বনি, পাখির পাখার আওয়াজ। এক আওয়াজকারী আর মানুষের কথা বলার শব্দ। তা এসে শিশু মোহাম্মদকে আচ্ছাদিত করে ফেলল। তারপর আমি শুনতে পেলাম একজন বলছেন, ‘মোহাম্মদকে সমগ্র আলম ঘুরিয়ে আনো এবং তাঁকে স্থাপন করো মানব, দানব ও ফেরেশতাকূলের সামনে, যারা দৃষ্টির অগোচরে রয়েছে আর যাবতীয় বিহঙ্গ ও পশুকূলের সামনে (যেন প্রত্যেকেই তাকে উত্তমভাবে চিনে নেয়)।

ঐ আওয়াজকারী বলছে, এবং তাকে দান করো আদমের চরিত্র, শীশের মারেফাত, নূহের বীরত্ব, ইব্রাহীমের প্রগাঢ় অনুরাগ, ঈসমাইলের ভাষা, ইসহাকের সন্তুষ্টি, সালেহের বিশুদ্ধভাষিতা, লুতের হিকমত, ইয়াকুবের খোশ-খবর, মুসার কঠোরতা, আয়ুবের সবর, ইউনুসের পায়রুবী (বন্দেগী), ইউশার জিহাদ, ইউসুফের সৌন্দর্য, দাউদের মধুর কন্ঠ, দানিয়ালের প্রেম, ইলিয়াছের স্নেহ ও মহত্ব, ইয়াহইয়ার ইসমত (পাপহীনতা), ঈসার বৈরাগ্য এবং তাকে নবীগণের চরিত্রের সমুদ্রে অবগাহণ করাও।

হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালাম আরো বলছেন, যখন আমার দৃষ্টি হতে মেঘখন্ডকে অপসারিত করা হলো, তখন দেখলাম শিশু মোহাম্মদকে একখন্ড সবুজ রেশমী কাপড়ে উত্তমরূপে জড়িয়ে দেয়া হলো। তা হতে ঝর্ণার মতো পানি ঝরঝর করে পড়ছে এবং তাকে দেখলাম পূর্ণিমার চন্দ্রের মতো উজ্জ্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে। তাঁর শরীর হতে মৃগনাভির ঘ্রাণ প্রকাশ পাচ্ছে। আমি দেখতে পেলাম তিন ব্যক্তি, একজনের হাতে রূপার পাত্র, দ্বিতীয়জনের হাতে সবুজ বর্ণের জমরুদ পাথরের তসতরী এবং তৃতীয়জনের হাতে সাদা রেশমী কাপড়। তৃতীয় ব্যক্তি একটি আংটি বের করলেন এবং তাকে সাতবার গোসল করিয়ে তাঁর উভয় সিনার মধ্যবর্তী স্থানে ঐ আংটি দ্বারা একটি মোহর অঙ্কিত করে দিলেন (ইহাই মোহর-ই-নবুয়ত)।

সুতরাং হাবিবে খোদা মোহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম হলেন জামে কামালতে সিফাত ও জাত। আল্লাহপাকের নিরানব্বই নামের মোজহার, লা-মাকানের এমকান, তিনি ইয়াছিন, তিনি নূর ও নুরের মোজাহার। এ হিজাব ধারণ করে জাতে পাকের জালোয়াই বর্তমান, যারা চক্ষুষ্মান তারা খোদাকে এ হিজাবের মধ্যেই দেখতে পাচ্ছেন।

এরপর শিশু মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের জন্মের পরের দিন তাঁর দাদা হযরত আবদুল মুত্তালিব নাম রাখলেন ‘মোহাম্মদ’। অদৃশ্য জগত হতে তাকে এ নামই জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। কোরাইশগণ তাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কেনো সন্তানের নাম ‘মোহাম্মদ’ রেখেছ ? কোনো বা পূর্বপুরুষদের কারো নামানুসারে এর নামকরণ করলে না ? এ নাম তো তোমার কওমে কারো নেই। তিনি বললেন, আশা এই, সে প্রশংসিত হবে জমীনে এবং আসমানে।

আবার কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে উৎসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর নামকরণ করা হয়েছিল। যুরকানী শরীফে বর্নিত আছে, হযরত আমিনা আলাইহিস সালাম বলেন, “এক রাতে আমি ঘুমঘোরে দেখলাম, কে একজন তাকে বলছে, তোমার গর্ভে অবস্থান করছেন সাইয়্যেদুল আলামীন ও মানবকুলের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। যখন তাঁকে প্রসব করবে তখন তাঁর নাম রাখবে ‘মোহাম্মদ’।” তাওরাতে তাঁর নাম ‘হামিদ’ এবং ইঞ্জীলে তাঁর নাম ‘আহামদ’। এ ‘মোহাম্মদ’ নামই আল্লাহর নির্দেশে চারশত বৎসর পর্যন্ত কলম লিখেছে আরশ মোয়াল্লার উপর। এক বর্ণনায় এসেছে কলম ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ চারশত বৎসর পর্যন্ত লিখে থেমে গেল। আল্লাহপাক বললেন, এরপর লিখ ‘মোহাম্মাদুর রাছুলুল্লাহ’। কলম আরজ করলো, হে আল্লাহপাক ‘তুমি বে-মেছাল, তোমার সমকক্ষ কেউ নেই ; তোমার নামের সাথে যে সম্মানিত নামটি বিরাজ করছে, তা কার নাম ? আল্লাহপাক বললেন, ইহা আমার হাবিব মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের নাম। অতঃপর কলম ভয়ে কেঁপে উঠে বিদীর্ণ হয়ে গেল এবং চারশত বৎসর পর্যন্ত লিখলো ‘মোহাম্মাদুর রাছুলুল্লাহ।’ সকল সৃষ্টির আদিতে তাঁকে আল্লাহপাক এমন নূর হতে সৃষ্টি করেছেন, যার পূর্বে কোনো কিছু আল্লাহপাক সৃষ্টি করেননি। সৃষ্টির অস্তিত্ব হিসেবে তাঁরই ছিল প্রথম প্রকাশ। এজন্যই ইহা সর্ব পুরাতন-কদিম। প্রথম সৃষ্টি হিসেবে তাঁর পূর্বে কিছু নেই। এ নূর হতেই সমস্ত সৃষ্টির সৃজন হচ্ছে, ইহাই আদি নূর তথা জাত-ই- কদিম। আল্লাহপাকের নূরের প্রবাহিত ও বিকশিত নূর হলো ‘মোহাম্মদ’। এ দিকে লক্ষ্য করে রাছুল তাঁর পরিচয় দিলেন, ‘আনা মিন নূরীল্লাহ্’-আমি আল্লাহর নূর হতে।

সিরাত গ্রন্থগুলোতে রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের জন্মগ্রহণের সময়ে যে সমস্ত ঘটনাবলী প্রকাশ পেয়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে- যা উল্লেখ করলে এক বিশাল গ্রন্থ হয়ে যাবে বিধায় থেমে যেতে হলো। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের জন্মের পর তিনি তাঁর মাতা হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালামের দুধ পান করেন সাতদিন এবং আবু লাহাবের দাসী ‘সোয়েবাহ’ আট দিন দুগ্ধ পান করিয়ে ছিলেন। তারপর তায়েফ শহরের বনী হাওয়াযেন গোত্রের হযরত হালিমা সাদিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর দুগ্ধ পান করেছিলেন এবং হযরত হালিমা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা ধন্য হলেন নবীজির সংষ্পর্শ পেয়ে। তবে তারা ‘বনী ছাদ’ বলেই বিখ্যাত ছিলেন তাঁর স্বামীর নাম ছিল হারিস। হযরত হালিমা ধৈর্যশীল, বুদ্ধিমতি ও অনেক সুন্দরী ছিলেন এবং দয়া মায়ায় বিখ্যাত ছিলেন। হযরত হালিমা শিশু মোহাম্মদকে মক্কায় নিয়ে আসার পথে তাকে একটি গাছের নীচে বসিয়ে পায়খানা করার জন্য দূরে চলে গেলেন, তার একটু দূরেই ছিল কিছু লোক। তারা নবীজিকে হত্যা করার জন্য তার সন্ধানে বের হয়েছিল। এ সময় জিবরাইল এসে শিশু মোহাম্মদকে শত্রুদের হাত হতে রক্ষার করার জন্য শূন্যে তুলে নিলেন এবং আড়াই দিন পর্যন্ত রেখেছিলেন। হযরত হালিমা এসে মোহাম্মদকে অনেক খোঁজাখুজি করেও না পেয়ে অনেক পেরেশান হয়ে মক্কায় গিয়ে খাজা আবদুল মুত্তালিবকে এ সংবাদ জানালেন। খাজা আবদুল মুত্তালিব শুনে কাঁদতে শুরু করলেন এবং খোলা তলোয়ার নিয়ে নিকটে এক পাহাড়ে উঠে সমস্ত কোরাইশীগণকে চিৎকার করে ডেকে একত্রে জড়ো করে ঘটনা খুলে বললেন। ঘটনা শুনে সবাই প্রতিজ্ঞা করলো যতোক্ষণ মোহাম্মদকে পাওয়া না যাবে ততোক্ষণ তারা কোনো খানা-পানি গ্রহণ করবে না। তারপর একশত কোরাইশী সঙ্গে নিয়ে কাবা ঘরে গিয়ে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় নাতীকে ফিরে পাবার জন্য। এ সময় গায়েব হতে আওয়াজ এলো, ‘হে মুত্তালিব! তুমি ব্যাকুল হইও না, আল্লাহর হাবিবকে কেহ হত্যা করতে বা লোপ করতে পারবে না। তুমি তাকে ‘তেহামা’ ময়দানে খোঁজ করো।’ এ শব্দ শুনে সবাই তেহামা ময়দানে গিয়ে দেখতে পেল শিশু মোহাম্মদ একটি গাছের নীচে আনন্দে খেলা করছে।

অনুবাদ – ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র, ২৩ ও ২৪ পর্ব

মূল এলিফ শাফাক হতে
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী

পর্ব ২
প্রভুর সকল সৃষ্টিসমূহের মাঝে মানুষ এক অনন্য সৃষ্টি। মানুষ মোহনাতে মূর্ত হয়েছেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা। প্রভুর নিজের রুহ থেকে তিনি রুহ ফুঁকে দিয়েছেন মানুষকে। মানবকাবাতে আসন গড়েছেন তিনি। মানবতত্ত্বে প্রভুতত্ত্বের প্রকাশ প্রত্যাশায়।

মানুষকে এমন মহত্ত্বে নির্মিত করা হয়েছে, যাতে মানুষ হয়ে উঠতে পারে যথার্থই প্রভুর প্রতিনিধি। প্রভুগুণে গুণান্বিত হয়ে মানুষ যাতে মানবসত্ত্বায় প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, সে শক্তি সামর্থ্য প্রদান করা হয়েছে মানুষকে। এবার প্রশ্ন করুন নিজেকে, যে মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্ত জন্মৃ আপনার, কতটুকু পূরণ করছেন তার? আপনার আচরণ কি প্রভু আচরণ দ্বারা পূনর্নবায়িত? সর্বজ্ঞানস্বামী কি প্রতিস্থাপিত হয়েছে আপনার অস্তিত্বে? যদি না হয়, তাহলে আপনি চরমভাবে ব্যার্থ।

মনে রাখবেন, মানুষ হিসেবে আমাদের একমাত্র কর্তব্য হচ্ছে আমাদের অস্তিত্বে প্রবাহিত শাশ্বত সত্ত্বাটিকে আবিষ্কার করা এবং তাতে লিপ্ত হয়ে নিজেকে প্রভুত্বে উন্নীত করা, যে অবস্থাকে আমরা প্রভুর প্রতিনিধি বলে থাকি।

প্রভুসত্ত্বাকে অস্তিত্বে জাগ্রত রাখাই আমাদের সাধনা।

পর্ব ২৪
অজ্ঞানতার মোহপাশে আবদ্ধ মন আমাদের। বহুদূরে কোনো সূদুর কল্পনায় খুঁজে বেড়াই স্বর্গ আর নরক। না, দূরে নয়! বরং এখানেই তো রয়েছে জান্নাত জাহান্নাম! বন্ধ করুন সূদুর অন্বেষণ। ফিরে তাকান আপনার পানে! চোখ মেলে দেখুন – এইতো শাশ্বত স্বর্গ! শাশ্বত নরক!

অন্ধ অনুমান কল্পনায় স্বর্গ নরক কে অঙ্কিত না করে দৃষ্টি নিবন্ধ করুন এই মুহুর্তে। দেখুন, কি অনিন্দ্য সুন্দর স্বর্গ! চারধারে পারিজাত মন্দারের সারি! ধীর প্রবাহিনী অলোকনন্দা! শান্তি-সুবাসে উদ্বেলিত হবেন আপনি! অথবা দেখে নিন নরক! পূর্ণত্বের তৃষ্ণা নিয়ে কি ব্যাকুল ছুটে চলা পথ থেকে পথান্তরে! অনন্ত যন্ত্রণার পথে পথে! দুঃখের মৃণালে নিত্য সুখের ফুল ফুটাইতে কি অধীর অপেক্ষায় আধার নিশি যাপন করছে নরকবাসী! যাপিত জীবনকে রাঙিয়ে তুলুন প্রেমের রঙে। জিবন স্বর্গে পরিণত হবে। অথবা জিবন কে বহন করে চলুন গাধার বোঝার মতো, প্রেমহীন – নিশ্চিতই আপনি অবস্থান করবেন নরকে।

প্রেমের উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি আপনার জিবনকে পরিণত করবে স্বর্গে অথবা নরকে।

প্রেম! এমনই এক মহাশক্তি!

অনুবাদ কবিতা – পথ প্রদর্শক

অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী

অতীন্দ্রিয়বাদী দার্শনিক, প্রেমমার্গের কবি, একাদশ শতাব্দীর ধ্রুপদী সুফি লেখকদের অন্যতম মহাত্মা হাকিম সানায়ী (র.) (১০৪৪ – ১১৫০) দক্ষিন আফগানিস্থানের গজনা প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মহান ওলী ইউসুফ হামদানী (র.) কর্তৃক দীক্ষিত হয়ে তিনি পথচলা শুরু করেছিলেন আধ্যাত্ম্য প্রেম পথে। ইশকের রহস্যজ্ঞানী সানায়ী নির্মাণ করেছিলেন সুফি প্রেম-সাহিত্যের বিশেষ ধারা এবং প্রভুপ্রাপ্তির চরম উপলব্ধিকে প্রকাশ করেছিলেন কাব্য-সাহিত্যে।

কবিতা – পথ প্রদর্শক

অতঃপর, অস্পষ্টতায়
আমি দেখলাম, একজন বৃদ্ধ। যার
মুখমন্ডলে বিরাজ করছে সুমহান উজ্জ্বলতা!
তুমিই চাঁদ! ডাকলাম আমি। প্রশ্ন করলাম,
কোথা থেকে এসেছে তুমি?

তিনি বললেন – আমি যাবতীয় পদার্থ আর
স্থানের বাহিরে অবস্থান করি।
সৃষ্টির অনাদী কারণ আমি!
প্রত্যাবর্তনের তাগিদ নিয়ে –
মাঝে মাঝে আসি এ ভূমিতে!
হৃদয়ে বহন করে আনি জলন্ত আগুন! এ আগুনে
ছাই করে ফেলো নিজেকে। ভয় পেও না –
এটি এমন আগুন, যার ভেতর রয়েছে –
অনন্ত জলের ঝর্ণাধারা!

তিনি বললেন –
যদি মৃত হয় তোমার অভ্যন্তরস্থিত পশু-আত্মা
তবেই, সুমহান দীপ্তি নিয়ে জেগে উঠবে –
নব-শক্তি! শাশ্বত প্রাণ প্রবাহ! হে পথিক!
বিনয়-নম্রতায় অনুসরণ করো আমাকে।
আমি তোমাকে মহিমান্বিত করবো।

তিনি বললেন – আরো অনেক কথা! নিরবে!
এক প্রদীপ্ত ভালোবাসা আর জ্যোতিষ্মান চক্ষু
তিনি দান করলেন আমায়।
সে সুমহান সত্ত্বা! যথার্থই চাঁদ এবং
পথ প্রদর্শনকারী!

হাকিম সানায়ী (রহ) এর একটি বাণী মুবারক –
অনুবাদক – লাবিব মাহফুজ চিশতী

  • দুনিয়ার মানুষ হচ্ছে মোমবাতির শিখার সামনে উড়ন্ত তিনটি প্রজাপতির মতো। প্রথমটি অগ্নিশিখার খুব কাছে গিয়ে বলে, ভালোবাসা কি আমি জানি। দ্বিতীয়টি তার ডানা দিয়ে অগ্নিকে আলতো স্পর্শ করে বলে, আমি জানি প্রেমানল কিভাবে পোড়ায়। আর তৃতীয়জন নিজেকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করে এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কেবল সেই জানে সত্যিকারের প্রেম কি!”

সম্পাদকীয় – মহিমান্বিত আহ্বান

লাবিব মাহফুজ চিশতী

যখনি প্রয়োজন হয়েছে সংস্কারের, যখনি মানবমন্ডলী সত্য সুপথ ছেড়ে পতিত হয়েছে ভ্রষ্টতায়, তখনি কথা বলে উঠেছেন প্রভু। সৃষ্টির উষালগ্ন থেকেই মানবজাতিকে পথ প্রদর্শণের নিমিত্ত বারবার বাণীর পসরা নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন তিনি। পরিশুদ্ধ মানব মনের গহীনে বেজে উঠেছে তাঁর মহিমান্বিত কন্ঠ।

কখনো প্রভুবাণী প্রতিধ্বনী তুলেছে প্রাচীন ভারতে হিমালয়ের পাদদেশে মৌনী ঋষি/সন্ন্যাসীর কন্ঠে, কখনো তিনি কথা বলেছেন বোধি-বৃক্ষতলে। কখনো গাঙ্গেয় অববাহিকায় তীর্থঙ্করদের কন্ঠে সুর তুলেছেন প্রভু। প্রভু কথা বলেছেন ‘আর’ নগরীতে, জেরুজালেমে। কখনো গ্রীসে উচ্চারিত হয়েছে তাঁর বাণী। প্রাচীন চিনে প্রভু মানবমুক্তির উপায় বাতলে দিয়েছেন কনফুসিয়াস, তাও তে চিং এর সুরে। জরথুস্ত্রের কন্ঠে বাণী যুগিয়েছেন তিনি। সিনাই মরু প্রান্তরে মুসার হৃদয়ে কথা বলে উঠেছেন তিনি। ঈসার কন্ঠে গেয়েছেন মানবমুক্তির গান। হেরা গুহায় মুহাম্মদের তপোস্নিগ্ধ অন্তরে তিনি উচ্চারণ করেছেন মুক্তির বিজয়গাঁথা। প্রভু কথা বলে উঠেছেন নানক কবীরের সংগীতের সুর মুর্ছনায়। কৃষ্ণ-বুদ্ধ-ঈসা-মুসা-মোহাম্মদ সকলেই সেই একই বার্তাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন আপন আপন পরিসরে।

যুগে যুগে প্রভু সকল মুক্ত আত্মায় অধিষ্ঠিত হয়ে আপন বাণী-মাহাত্ম্য কে ছড়িয়ে দেন জগৎময়। অবতার রাসুল রূপে উদ্ধার করেন পতিতদের। তারই কন্ঠে চিরকাল ধ্বনিত হয় একই আহ্বান – হে ঘুমন্ত মানবমন্ডলী! উঠো! জাগো!

সকল মুক্তিকামী আত্মায় মুর্শিদ/রাসুল রূপে বাণী দেন তিনি। প্রতি যুগে, প্রতি জাতিতে, প্রতি দেশে দেশে পরমসত্ত্বা গুরুসত্ত্বায় পর্যবসিত হয়ে ভক্তকে করেন উদ্ধার। দেখান মুক্তির পথ। গেয়ে বেড়ান মুক্তির গান।

“আপন সত্ত্বায় সেই পরম সুন্দরকে যেদিন তুমি জাগিয়ে তুলতে পারবে, সেদিন তুমি ইনছান হবে।”

তরিকতের বাণীসমূহ

1. সৃষ্টির ভেতরে পাক পাঞ্জাতন চিরন্তন ও শাশ্বতভাবে বিদ্যমান। পাক পাঞ্জাতন না চিনলে আল্লাহকে চেনা যায় না।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

2. ভক্তি বিশ্বাসের পূর্ণতাই আদব। আদবের পরিপূর্ণতাই ইনছান।
– হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী

3. রহস্যলোকের যে সূর্য আমার মধ্যে আছে, মস্তিষ্কপ্রসূত জ্ঞান দিয়ে তা কিছুতেই বুঝতে পারবে না।
– খাজা ফরিদ উদ্দিন মাসুদ গঞ্জেশকর রহ.

4. পীর ব্যতীত যে আধ্যাত্মিক পথ অতিক্রম করতে চায়, তার জিন্দেগী খতম হয়ে যাবে, তবু মঞ্জিলের সন্ধান পাবে না।
– হযরত ফরিদুদ্দিন আত্তার রহ.

5. খোদার দরজা কভূ বন্ধ হবে না তোমার জন্য, বরং খুলে যাবে আরো সহস্র সুন্দর দরজা।
– মুহাম্মদ আল রুদাকী

6. এ চাঁদ কিরণে মধূ লুটো আজ, কাল নিশিথের ভরসা কই
চাঁদনী হাসিবে যুগ যুগ ধরি, আমরা আর রবো না সই।
– ওমর খৈয়াম

7. পথ যখন আত্মায় আগুন জ্বালায়, তখন থেমে থাকা বলে কিছু নেই।
– হযরত হাকিম সানায়ী রহ.

8. গোটা মানবজাতি একটা শরীরেরই অংশ। একই আত্মা ও বীজ থেকে জন্ম তাদের।
– হযরত শেখ সাদী

9. আমার অস্তিত্বের সবটুকুই তুমি। এমনকি খসরুর অন্তরটাও ও ধর্মটাও।
– হযরত আমীর খসরু রহ.

মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ১২তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২২ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

Others Post

আপন খবর - Apon Khobor

লাবিব মাহফুজ চিশতী
ফেসবুক পেজ
ইউটিউব
হোয়াটসএপ গ্রুপ
টেলিগ্রাম গ্রুপ