মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ১৩তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২৩ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত
প্রবন্ধ – শানে আহলে বাইয়্যেত (আ.)
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
আল্লাহপাক অনাদি অনন্ত অসীম অব্যয়। তিনি আউয়াল, আখের, জাহের ও বাতেন চার আকসামেই বিরাজমান। তিনি সর্ব সৃষ্টিতে পরিব্যপ্ত হয়েও এক অদ্বিতীয়। সর্ব কিছুর অস্তিত্ব/রূপ/নকশা/শেকেল তাঁর হতে এবং তাঁরই মুখাপেক্ষী, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নয়। অসীম হতে সীমের মধ্যে নিত্য লীলায় ক্রিয়াশীল। তিনি রূপে এসেও রূপাতীত, বর্ণনাতীত (লাইছা কা মিছলিহী সাইয়্যুন) এবং মানবাত্মা-পরমাত্মার সম্মিলনে অহেদাল অজুদে তিনি তাঁর রূপ/শেকেল প্রকাশ করছেন (তাঁর সাদৃশ্য নেই তবে সদৃশ আছে)। জ্ঞানীগণ তাঁর ভেদ-রহস্য জানেন এবং খোদাকে চিনেন, দেখেন। নিঃশব্দ, নিস্তদ্ধ জগত হতে স্বীয় রূপ দরশন করণার্থে স্বীয় এশকে নিজেই ফানা হয়ে নিজেই নিজের মাশুক সাজেন।
‘আশেক-মাশুক শুধু একটি হিজাবের ব্যবধান,
একই নূরের প্রকাশ ও বিকাশ।’
প্রকাশ ও বিকাশের ধারাটি গঞ্জমুখফিতে অব্যক্ত-অপ্রকাশ-অদৃশ্য ছিল। আপন পরিচয় নিতে তাতে জোশ-হরকতের সৃষ্টি হলো। সাফা হতে বাতাসের প্রকাশ হলো এবং সাফা-বাতাসের সংঘর্ষে (ইয়াখরুজু মিনহুমার জোশে) আতশের জহুর হলো। সেখানে শহুদের তরঙ্গের জোশে বান উঠে আবের ছুরত হয়ে গেল। সেই আব/পানি বাগে এরেমে আশ্রয় নিল। এবার আহাদ হুবাব হয়ে গঞ্জমুখফি হতে নয়টি স্তর (নয় বাতুন) অতিক্রম করে শেষে আজসাম অজুদ পাইল। ছিল আহাদ মুখফি, শেষে পাইল আজসাম অজুদ। জ্ঞানী (আলেমগণ) যারা তারা চিনতে পেল এই তো সেই গঞ্জমুখফি নূর। সেই এই হয়ে রজ্জব নাম ধারণ করেছে। আহামদে এসে স্বীয় নিত্য লীলায় রতো হয়েছেন। আহাদ নামটি আলাদা করে ঐ আহামদে ‘মীম’ রূপ ধারণ করে। ঐ ‘মীমের’ মধ্যে পাঞ্জাতনের রূপ-শেকেল নিয়ে পঞ্চশক্তি বিরাজ করছে। ‘তাই পাঞ্জাতনের পঞ্চশক্তি এ সৃষ্টির সৃজনের মূল নিয়ামক।’ এ পাঞ্জাতনের সম্মিলনেই শাজরাতুল ইয়াকীন নাম ধরে। ঐ শাজারাতুল ইয়াকীন গাছে এরফানী আয়নায় স্বীয় রূপ দরশন করেন। তাই তিনি মানবীয় স্তরে প্রয়োগহীন নূর প্রয়োগ ঘটিয়ে নিজেই নিজের রূপ দরশন করে/ইচ্ছা পূরণ করে ‘খাতামান্ নাবীয়্যিন’ ঘোষণা করলেন।
তিনিই হাইউন, তিনিই সামিউল-আলিম, সামিউন-বাসির। তিনিই আজ্জাতু কুল্লুহু আলিমুন, আজ্জাতু কুল্লুহু মুরিদুন, আজ্জাতু কুল্লহু কাদিরুন। তিনিই জাত ও সেফাতের আদিবস্থা জাত আহদিয়াত। হাইউন সেফাত হতে জাত সাফা, বাতাস, আতশ, আব এবং খাকের প্রকাশ ও বিকাশ পেয়েছে। ইহা সৃষ্টির আদি প্রকাশ। সাফা হতে বাতাস, বাতাস হতে আতশ, আতশ হতে আব/পানি এবং পানি হতে খাক বা মাটির প্রকাশ পেয়েছে। তিনিই আল-লা-হু। সমস্তই নফী, হু ব্যতিত। হু-ই সাফা, হু-ই বাতাস, হু-ই আতশ, হু-ই আব, হু-ই খাক। এ খাক-ই সেই আদি নূরের প্রকাশ। সুতরাং লাইছা ফিদ্দুরাইনে ইল্লাহু। অথবা ‘আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লাহু, ‘হু’-ই’ নাযিল/প্রকাশ ও বিকাশ হয়েছে বিধায় এ ‘হু’-ই হুয়ায জাহিরু। ‘হু’ সৃষ্টি লীলায় স্বরূপ দর্শনার্থে/স্বীয় ইচ্ছা পূরণ করার বাসনায় ‘ফি লাইলাতুল মোবারাকাতে/শবে বরাতে/বিজ্ঞানময় ভাগ্য বন্টনের রাতে স্থিত। এখান থেকে বস্তু সত্তা আত্মাসহ ‘লাইলাতুল কদরে এসে ‘হু’-এর প্রকাশ ঘটে। এখানেই পবিত্র রমজান মাস-যেখানে রমজানের সিয়াম সাধনায় খোদাকে লাভ করা যায়। হাদিস বলছে, “যারা রমজান পাবে তারা যেন সিয়াম সাধনা করে।” এ মাটিই সমস্ত কিছুর মূল/পাত্র। পাঁচ পাত্রে একই রুহ পাঁচ রুহ নামে প্রকাশিত আছে এবং সৃষ্টি লীলায় মাতোয়ারা আছে।
‘এ সৃষ্টি জগত আত্মার ভ্রমণের স্থান। তিন জমাত অতিক্রম করে ইনছানিয়াতে উত্তরণ ঘটিয়ে মানবাত্মা মুক্তি লাভ করছে।’ মৃত্যু নামক ব্যবস্থাপত্রের মাধ্যমে প্রমোশন-ডিমোশন হচ্ছে তথা মৃত্যুঞ্জয়ী নয়তো আস্ফালা সাফেলিন হচ্ছে। ৫+২৫+৩+৭ = ৪০ ই হলো সৃষ্টির নিয়ামক। এ চল্লিশ কদম দ্বারা সৃষ্টির হাশর হচ্ছে, মৃত জিন্দা হচ্ছে। তার মধ্যে পাঁচই হলো মূল। হাশরের পর নশর না হলে আবার তিন জমাতে ঘুরতে হবে বা সিজ্জিনে বাস করতে হবে। মানবাত্মায় মৃত্যুঞ্জয়ী – ইল্লিনে বাসস্থান, নয়তো বাকি তিন জমাতের সিরাত অনুসারে ছুরত পেয়ে সিজ্জিনে অবস্থান করে কর্মফল ভোগ করতে হবে। যে সিরাতে দেহপাত হবে ঐ সিরাতে এবং ঐ জমাতেই তার বাসস্থান সাব্যস্ত হবে। পুণরুত্থান হবে চল্লিশ কদমের উপর। তার মধ্যে মাওলা আলীর বেলায়তী শক্তি সিররীর গুণ ক্রিয়ায় সৃষ্টিলীলা পরিচালিত/পরিবাহিত হচ্ছে। শোহ্হত, মেহের এবং গোস্বা; সাফার গুণ খাছিয়ত দ্বারা সৃষ্টি – অস্তিত্ব এবং ধ্বংস- এ তিন কার্য সাধিত হচ্ছে। এ সৃষ্টিতে বস্তু-গুণ ছাড়া আর কিছুই নেই। ‘বস্তু-গুণের সমষ্টিতে সৃষ্টির প্রকাশ ও বিকাশ হয়ে চলছে, তার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশ হলো মুহাম্মদ।’ এখানেই সৃষ্টির বিবর্তন ধারা সমাপ্ত। আল্লাহর ইচ্ছা পূরণের ক্ষেত্র। এ পাঁচ বস্তুতে পাক পাঞ্জাতন এবং তা হতে আদম অজুদ গঠন করে আরশ মোয়াল্লায় রেখে দিলেন আল্লাহপাক। আল্লাহর সিরাত হতে ছুরত পেয়ে অবিকল সৃষ্টি আদম। আদম ছুরতই ওয়াজহুল্লাহ। ইয়াকিন এবং অন্তর্চক্ষু দ্বারা তা দেখা যায়।
‘যখন আদমকে সৃষ্টি করলেন এবং তাতে রুহ ফুকে দিলেন, তখন আদম চেতন হলো। আদম আলাইহিস্ সালাম চেতন হয়ে বা চেতন পেয়ে আরশে মোয়াল্লার দিকে তাকিয়ে ঐ পাঁচটি নূর দরশন করে বললেন, হে আল্লাহপাক, ঐ পাঁচজন কারা ? তাদের কি আমার থেকে সৃষ্টি করেছেন নাকি আমার আগেই তাদেরকে সৃষ্টির করেছেন? আল্লাহপাক বললেন, হে আদম ! আমি যদি তাদেরকে সৃষ্টি না করতাম (লাওলাকা নবীতে পাঁচের সমাবেশ ঘটেছে-ঐক্যতায় স্থিত আছে) তবে তোমাকেও সৃষ্টি করতাম না। হযরত আদম আলাইহিস সালাম তাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। আল্লাহপাক বললেন, হে আদম ! ইনারা হলেন মুহাম্মদ, আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন। প্রথমজন আমার হাবিব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম এবং সে হলো তোমার বংশধারায় নবীদের শেষ নবী, মোহরযুক্ত নবী। আর বাকি চারজন হলো তাঁর আহলে বাইয়্যেত (নির্দিষ্ট ঘরের অধিবাসী)।’
এ পাক পাঞ্জাতন দিয়ে একটি খাঁচা তৈরী করে ঐ খাঁচাতে আদমকে রাখলেন। ওয়াহেদ হতে আহাদের প্রকাশ। আহাদের মধ্যে মীম যুক্ত হয়ে হলো ‘আহামদ’ এবং আহামদে ছানী মীম যুক্ত হয়ে হলো মুহাম্মদ। মুহাম্মদের আদি রূপ আহামদ, আহামদের আদি রূপ আহাদ এবং আহাদের আদি পরিচয় ওয়াহেদ আল্লাহ (সুরা এখলাছ)। বেলায়েতে খফির ঘর মুহাম্মদ। সে মুহাম্মদী ঘরের চারজন হল আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন আলাইহিমুস্ সালাম। বেলায়তী পাক পাঞ্জাতন মূলতঃ দু’পাওয়ালা মানুষ নয়, ওরা হলো আদি নূরের প্রকাশ ও বিকাশ। পঞ্চ নূরের প্রতীকে আছে নবুয়তী বাশারী পাক পাঞ্জাতন। এক নূর পাঁচ স্তরে প্রকাশ ও বিকাশ (তানাজ্জুলাত-ই-খামছা) লাভ করছে। বেলায়তী জগত হতে আসমানী জগতে প্রকাশ, শেষে নবুয়তে এসে দুনিয়ার মানুষ আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন নূরের প্রতীকে প্রকাশ। এর মধ্যে মদিনাতুন্নবীতে এক মহাশক্তি গুপ্ত-সুপ্ত হয়ে আছে। সেই মহাশক্তির প্রকাশ নবুয়তে দুনিয়ার মানুষ মাওলা আলী বিধায় মাওলা আলী হলেন শক্তির প্রতীক। এ পঞ্চ শক্তি আদি নুরের প্রকাশ ও বিকাশ এবং তার হরকত-কুদরতে বিশ্বের সমস্ত কার্যই সাধিত হচ্ছে। এখান থেকে প্রত্যেকেই যার যার আসমানী গুণ প্রকাশ করছেন। আল্লাহপাক বলেন, আমি তাদেরকে পাক করে সৃষ্টি করেছি বিধায় তাদেরকে বলা হয় পাক পাঞ্জাতন। নূরের প্রতীকে দুনিয়ার মানুষ আহলে বাইয়্যেত সম্পর্কে সুরা আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক নিজেই বলছেন, “ইন্নামা ইউরিদুল্লাহু লিইউয্হিবা আনকুর্মু রিজ্বসা আহ্লাল্ বাইতি ওয়া ইউত্বাহ্হিরাকুম তাত্বহিরা।” অর্থাৎ (হে) আহলাল বাইয়্যেতি (আহল আল বাইয়্যেতি – নির্দিষ্ট ঘরের অধিবাসী) নিশ্চয়ই আল্লাহপাক তোমাদের হতে অপবিত্রতা/কলুষ-কালিমা (রাজাস) অপসারণ (ইয্হাব) করে ফেলতে এবং তোমাদেরকে বিশোধন বা পবিত্রকরণ (তহুর) করতে ইচ্ছা (ইরাদা) করেন, একটি শুদ্ধি (তাত্হির) কর্ম দ্বারা । “আয়াতে তাত্হির’ মোতাবেক রাছুলের আহলে বাইয়্যেত হলেন মাওলা আলী, ফাতেমা, ইমাম হাসান ও হুসাইন এবং তাদেরকে আল্লাহপাক নিজেই আহলাল বাইয়্যেত (খফির ঘর মুহাম্মদ-সে ঘরের অধিবাসী বলছেন-যাদের উপর মুহাম্মদী সত্তার ভিত্তি) বলে ঘোষণা করেছেন। এ কথা সৃষ্টির আদিতেই লওহ মাহফুজে চিরবর্তমানস্বরূপ লিখিত। হাকিকতে ডুব দিয়ে দেখলে দেখা যাবে তাদের কারো শান-মান-মর্যাদা কারো থেকে বিন্দু মাত্র কম নয়। একই নূরের প্রকাশ ও বিকাশ ভিন্ন ভিন্ন নামে, ছোট বড় সাব্যস্ত করা বাতুলতা বৈ নয় । ‘আলামিন’-জগতসমূহ, জগতসমূহের অস্তিত্ব পাক পাঞ্জাতন হতে। এ আয়াত মোতাবেক নবীর আহলে বাইয়্যেতকে পাক সাব্যস্ত করা হয়েছে। আহলে বাইয়্যেতের বিষয়ে মেশকাতের ১১তম (বঙ্গানুবাদ) হযরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস হতে বর্ণিত, রাছুল সা. বলেন, “আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন আ. হলো আমার আহলে বাইয়্যেত।”
“ছিরাতুল আইম্মা সাজাবানী” কিতাবের ১১৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম বলছেন, “আল হাসান ওয়াল হুসাইন কুররাতুল আইনানী।” অর্থাৎ হাসান এবং হুসাইন হলো আমার চোখের শীতলতা। হাসান ও হুসাইন হতে আহসান হয়ে দু’য়ের সমষ্টিতে মুহাম্মদী ছুরত প্রকাশ করছে (তিরমিযি, মেশকাত-৫৯১০) এবং ইনারাই হলেন ‘ইবনে রাছুল’ তথা রাছুলের পুত্র (তিরমিযি সূত্রে মেশকাতের-৫৯০৫)। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম ইমাম হাসান ও হুসাইন আলাইহিমাস সালামকে জান্নাতের প্রধান/সরদার/নেতা/সাইয়্যেদ বলে জানাচ্ছেন এবং ইনারাই হলেন মুহাম্মদী নূরী বাগানের দু’টি সুগন্ধময় ফুল (তিরমিযি, বঙ্গানুবাদ মেশকাত-৫৯০৩-৪),Ñ যাদের মাধ্যমে ‘সিবগা’ প্রকাশ ও বিকাশ হচ্ছে।
রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের প্রিয় বস্তু হলো, নারী, ছালাত এবং সুগন্ধি। কি সুন্দর বিজ্ঞানময় কালাম রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম প্রকাশ করছেন। প্রত্যেকটি মুক্তিকামী মানুষের পথ ইহা। এ সম্পর্কে বিস্তারিত হাদিস এবং তার ইতিহাসটি যদি কারো জানার ইচ্ছা থাকে তবে “বেঁহুশের চৈতন্য দান” কিতাবটি পড়ে দেখতে পারেন, আপনার জীবনের একটি বৃহৎ ভুল আশা করি ভেঙ্গে যাবে। যারা আহলে বাইয়্যেত বলতে নবীর স্ত্রীগণকে বুঝাতে চায় ওরা কোরানের হাকিকত/মুহাকামাত বুঝেনি, তাই এ ধরনের লেজেগুবুরে দশা, ধর্মশাস্ত্রের আক্ষরিক ব্যাখ্যা-বয়ানের কুফল ইহা। কোরানের আয়াত দলিলস্বরূপ তুলে ধরে ঠিকই কিন্তু রূপকের (তাশাবাহার) অর্থ করে তথা আক্ষরিক অর্থ তথা সরাসরি যা আছে তাই বুঝিয়ে থাকে। চিরন্তন-শাশ্বতকালের আহলে বাইয়্যেতকে ওরা চিনেনি, চিনেনি বেলায়তী, আসমানী এবং নবুয়তী জগতে তাদের পরিচয় কি। চিনেনি পঞ্চ নূরের প্রতীকে প্রকাশ দুনিয়ার মানুষ মুহাম্মদ-আলী-ফাতেমা-হাসান ও হুসাইনকে। হযরত রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম একদিন হযরত উম্মে ছালমা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহার ঘরে গিয়ে বললেন, ছালমা ! আমার কালো ইয়ামনি চাদরটি নিয়ে এসো। তিনি চাদর নিয়ে আসলেন এবং রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামকে দিলেন। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম সে চাদরটি গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ডাকলেন, আইনাল আলী ! মাওলা আলী আলাইহিস সালাম এসে বললেন, লাব্বাইক ইয়া রাছুলুল্লাহ। তাকে তিনি চাদরের ভিতরে প্রবেশ করালেন। এভাবে তিনি ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইনকে ঐ চাদরের ভিতর ঢুকিয়ে নিলেন। এমন সময় হযরত উম্মে ছালমা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা বললেন, ইয়া রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম ! আমি কি এর ভিতরে আসতে পারি ? রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম বললেন, না, তুমি সত্যের উপরই আছ। তখন রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম বললেন, হে আল্লাহ ! এরাই হলো আমার আহলে বাইয়্যেত। তখন আল্লাহপাক আয়াত নাযিল করলেন, “কুল লা আছআলুকুম আলাইহি আজরান ইল্লা মাওয়াদ্দাতা ফিল কুরবা (সুরা শুরা. ২৩)। অর্থাৎ (হে নবী) ! আপনি বলুন, আমি আমার আহ্বানের (নবুয়ত প্রচারের) জন্য উজরত (বিনিময়/পারিশ্রমিক) হিসেবে তোমাদের (উম্মতের) নিকট কোনো কিছু চাই না, শুধু আমার আহলে বাইয়্যেতের/নিকটবর্তীগণের ভালোবাসা ব্যতিত। এ আয়াতকে বলা হয় ‘আয়াতে মাওয়াদ্দাতা’ বা ভালোবাসার আয়াত। এ আয়াত নাযিল হবার পর সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে রাছুল ! আপনার নিকটবর্তীজন কারা ? যাদের প্রতি মহব্বত রাখা আমাদের জন্য ওয়াজিব করা হয়েছে ! রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম বললেন, আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইনই হলো আমার আহলে বাইয়্যেত। সিররি, রুহী, ক্বালবী এবং জলি বেলায়েতের জগত হতে নবুয়তের জগতে নাম ধরলেন আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইন। মুহাম্মদী নূরের চারটি প্রবাহিত রূপ হলেন তাঁর আহলে বাইয়্যেত। ঘরের অধিবাসী তথা হিজাবে মুহাম্মদীর মধ্যে চার নূরের অবস্থান তথা নবুয়তী কালো চাদরের ভিতর চারজন। নবুয়তী এ চাদরটি শাশ্বতকালের চাদর (ইয়ামনী কালো চাদরের প্রতীকে আছে)-এর মধ্যে রয়েছে শাশ্বতকালের আহলে বাইয়্যেত। আল্লাহপাক তাঁর হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুলের নূর মোবারক সৃষ্টি করে আরশে রেখে দিলেন। যখন আদমকে সৃষ্টি করা হলো তখন ঐ নূর আদমের পেশানীতে স্থাপন করা হলো। আদম হতে পাক মুমিন-মুমিনাতের মাধ্যমে হযরত আবদুল মুত্তালিব আলাইহিস সালামের নিকট পৌঁছে যায়। বাদশাহ আবরাহা যখন কাবা ঘর ভেঙ্গে ফেলতে আসে তখন হযরত আবদুল মুত্তালিব আলাইহিস্ সালাম কয়েকজন লোক নিয়ে সরির পর্বতে উঠেন এবং সেখান থেকে কাবা ঘরের দিকে দৃষ্টি দিলেন, সাথে সাথে তাঁর পেশানী হতে একটি নূর বের হয়ে কাবা ঘরের উপর গিয়ে পড়লো। তখন হযরত আবদুল মুত্তালিব আলাইহিস্ সালাম সবাইকে বললেন, চলো আমরা চলে যাই ; এ কাবা ঘর কেহ ভাঙ্গতে পারবে না, আল্লাহর ঘর আল্লাহই রক্ষা করবেন। এরপর বাদশাহ আবরাহা কাবাঘর ভাঙতে গিয়ে স্বসৈন্যে আবাবিল পাখির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। সুরা ফিলে তার বর্ণনা রয়েছে। কোরানের প্রত্যেকটি ঘটনা/কিস্সা চিরন্তন-শাশ্বতকালের, অখন্ড কালের ঘটনা। যেহেতু এ সমস্ত ঘটনা চিরন্তন-শাশ্বতকালের ঘটনাবলী, তাই কোরানকে ‘কাসাসুল কোরান’ বলা হয়।
কিস্সা কোরানের ভেদ বর্তমান এবং সে চিরবর্তমানকে যারা চিনে না, জানে না তারা কোরানের জ্ঞানে জ্ঞানী নয়। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম বলেন, আমার আগমনের বংশধারায় কখনো অপবিত্রতার ছোয়া নেই, পবিত্র মুমিন- মুমিনাতের মিলনের মাধ্যমে আমার আগমন। সুতরাং বলা যায় হাবিবে খোদার নূর বহনকারী সবাই দ্বীনে হানিফের অন্তর্ভূক্ত বিধায় তাদের নামের সাথে ‘হযরত’ এবং ‘আলাইহিস্ সালাম’ ব্যবহার করাই সঙ্গত। খাঁটি সুন্নী আলেমগণ হযরত আবদুল মুত্তালিব এবং হযরত আবু তালিবের নামের শেষে ‘রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু’ কথাটি ব্যবহার করেছেন। অপর কারণটি হলো আল্লাহপাক নিশ্চয়ই তাঁর হাবিবের নূর মোবারক কোনো কাফের বা অপবিত্র নর-নারীর মধ্যে স্থানান্তরিত করেননি, রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের বর্ণনা হতেও তা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। হযরত আবদুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম হতে সেই নূর দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে এক ভাগ হযরত আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালামের নিকট আর অপর ভাগ হযরত আবু তালিব আলাইহিস সালামের নিকট চলে যায়। হযরত আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালাম হতে হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম এবং হযরত আবু তালিব আলাইহিস সালাম হতে নূরের দ্বিতীয় ভাগ হযরত মাওলা আলী আলাইহিস্ সালাম আগমন ঘটে এ ধরাধামে। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম স্বীয় পরিশুদ্ধ (খান্নাছমুক্ত) নফসের স্বরূপ দেখবার বাসনার্থে হযরত ফাতেমার আগমন। আলী-ফাতেমার সম্মিলনে হাসান ও হুসাইনের আগমন ঘটেছে। বেলায়তী জগত হতে পাক পাঞ্জাতন নবুয়তে এসে রূপ সাগরের নিত্য লীলায় রতো আছে। এ হুসাইনই হলেন সমস্ত কিছুর মূল/অস্তিত্বের ধারক-বাহক। হুসাইন হতেই কালেমা, যাকাত, নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব প্রচার হচ্ছে। তাই রাছুলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম বললেন, “আনা ওয়া আলীউন নূরীন্ মিন ওয়াহিদ।” অর্থাৎ আমি এবং আলী এক নূরের দুই খন্ড। হাকিকতের জগতে ইহাই চিরসত্য। আদি নুরের দ্বিতীয় প্রকাশটিই হলেন মাওলা আলী আলাইহিস সালাম। নূরের দু’ভাগ হলো কেনো ? কারণ, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম নবুয়ত প্রচার করার সময় কাফেরগণ সবাই তাকে ধিক্কার দিবে, বিদ্রুপ করবে, অস্বীকার করবে তখন পাক পাঞ্জাতনের সদস্য-নূরের দ্বিতীয় প্রকাশ একমাত্র মাওলা আলী তাঁর সত্যতার সাক্ষী দিবে, তার সাহায্যকারী হবে। তাই একই নূর হতে বিভক্ত হয়ে নবূয়তের সাক্ষীস্বরূপ মাওলা আলী আলাইহিস্ সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কালেমা শাহাদাতের ভেদ জানলে একথা স্পষ্ট হয়ে যাবে। পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম হযরত মাওলা আলী (ইয়ানাবিউল মুয়াদ্দাতা-পৃষ্ঠা-৬২, মেশকাত, বাবে আহলে বাইয়্যেত অধ্যায়) এবং মেয়েদের মধ্যে হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা হলেন রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের নবুয়তের স্বীকৃতদানকারী তথা মুসলমান।
যারা বলছে ছেলেদের মধ্যে আলী আলাইহিস সালাম প্রথম মুসলমান আর বয়স্কদের মধ্যে হযরত আবুবকর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু প্রথম মুসলমান ওরা গোমরাহ, মতলববাজ। ইসলাম গ্রহণের মধ্যে যুবক-বৃদ্ধ নেই। এগুলো যারা বলে তাদের উদ্দেশ্য হলো যে কোনো প্রকারেই হোক আবুবকর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুকে প্রথম কাতারে রাখতেই হবে। তারই পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক নবীর নূরের অংশ, আহলে বাইয়্যেতের প্রধান, নবীর পরেই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, মেছালে হারুন, আল্লাহ ও তাঁর রাছুলের নির্বাচিত খলিফাকে/ওয়াছি/মাওলাকে অস্বীকার করে স্বীয় মতলব/স্বার্থানুকূলে খলিফা নির্বাচিত করা হয়েছিল। ৭২ ফেরকার সূচনাকারীগণ তা মেনে নিয়েছিল, এখনো মেনে নিয়েছে। শুধু তা-ই নয় ভবিষ্যতে যাতে কেহ তার প্রতিবাদ করতে সাহস না পায় সেজন্য কাফের/ মুনাফেক/মুরতাদ ইত্যাদি ফতোয়ার কুৎসিত কাদাগুলোও প্রস্তুত রেখেছে, প্রয়োজন হলেই রক্তচক্ষুর কসরত দেখিয়ে ফতোয়ার ডিগবাজি খেলে বানর নৃত্য প্রদর্শন শুরু করে দিবে। তাদের দ্বারাই ইসলামে ৭৩ ফেরকার সূত্রপাত ঘটেছিল। দেখুন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম নবুয়ত পাবার পর যখন মক্কার লোকদেরকে (আবু লাহাব-আবু জাহেলসহ) দাওয়াত দিয়ে খাওয়ালেন। খাবার শেষে রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম সবাইকে বললেন, আমি যদি বলি ঐ পাহাড়ের পিছনে শত্রু আছে আমাদেরকে আক্রমণ করবে; আপনারা কি বিশ্বাস করবেন ? সবাই বললো, হ্যাঁ, বিশ্বাস করবো। কারণ, তুমি সত্যবাদি, কখনো মিথ্যা বলোনি। তখন আল্লাহর রাছুল বললেন, তাহলে আপনার সবাই শুনুন এবং বলুন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাছুলুল্লাহ – এ তাওহিদ কালেমাকে স্বীকার করে নিন। এবং দেব-দেবী অসার তারা কারো কোনো উপকার বা অপকার করতে পারে না, সে পাথরের মূর্তি পুজা ছেড়ে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করুন। তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, মুক্তিদাতা। আপনারা আল্লাহপাকের এ তাওহিদ কালেমা স্বীকার করে নিন। তাতে কেহ-ই সাড়া দিল না।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম বললেন, আমার এ তাওহিদ ঘোষণার সাক্ষী বা সাহায্যকারী কি আপনাদের মধ্যে কেউ হবেন ? তখনো কেউ সাড়া দিলো না। তখন মাওলা আলী আলাইহিস্ সালাম দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমি আপনার নবুয়তের সাক্ষী এবং সাহায্যকারী হবো। এভাবে তিনি ৩ বার বললেন, এবং ৩ বারই কেউ সাড়া দিলো না, আর তিনবারই মাওলা আলী আলাইহিস সালাম বললেন, ‘আমি আপনার নবুয়তের সাক্ষী এবং সাহায্যকারী হবো। এরপর রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম বললেন – হে আলী, তুমি হলে আমার নবুয়তের স্বীকৃতিদানকারী, সাহায্যকারী এবং আমার ভাবি ওয়াছি। তখন সবাই হাস্য- রসিকতা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে বললো, হে আবু তালিব ! তোমার ভাতিজা চাইছে আমরা সবাই বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করে তার হুকুম-নির্দেশ মেনে চলি। এখন থেকে তোমাকেও তোমার পুত্র ও ভাতিজার নির্দেশ মেনে চলতে হবে ! এ কথা বলে সবাই চলে গেলো। পিতৃধর্মের দেয়াল ভেঙ্গে শাশ্বতকালের ইসলামকে (মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার ধর্ম) ওরা স্বীকার করে নিতে পারেনি, এ এক কঠিন দেয়াল। এখনো ৭২ ফেরকার লোকেরা পিতৃধর্মের দোহাই দিয়ে অলিয়ম মুর্শিদের (নবুয়তে নবী-রাছুল আর বেলায়েতে অলি-আল্লাহ সবাই মুর্শিদ/গুরু) নিকট বায়াত (আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান গ্রহণ করা) হতে পারেনি/পারছে না। তখনো কাফের-মুশরিকগণ পিতৃ ধর্মের দোহাই দিয়ে তাদের ধর্মই সত্য, তারা খোদার ধর্মে আছে এ যুক্তি উপস্থাপন করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামকে এবং দ্বীনে মুহাম্মদী বা ইসলামকে কবুল করে নিতে পারেনি, এখনো পারছে না। কতোগুলো লেংড়া-লুলা খোড়া যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করছে আর নানা ফেরকা প্রসব করে চলছে। তাদের এ ধরনের ফেরকাবাজির আতুর ঘরের দুর্গন্ধে মানব জাতি দিশেহারা। যাক, মাওলা আলী আলাইহিস্ সালামই হলেন কালেমা শাহাদাতের ভিত্তি। মোহরে নবুয়তে উপরে মাওলা আলী আলাইহিস সালামের বেলায়েত চির প্রবাহিত। উম্মতে মুহাম্মদীগণ আল্লাহ ও তাঁর হাবিব মুহাম্মদ রাছুলকে চিনে-দেখেই কালেমা শাহাদাত পাঠ করছে মানে সাক্ষী দিচ্ছে। কিভাবে সেই ভেদ-রমুজাত জানা/বুঝা যাবে তা মাওলা আলী আলাইহিস সালামের ইলমে বেলায়েতে রয়েছে। শুধু তা-ই নয় সমস্ত পবিত্র মঞ্চগুলো বেয়ে হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম আগমন করছেন-সমস্ত আম্বিয়াগণই জেনে-চিনে এ বিষয়ে সাক্ষী দিয়েছেন। সে পবিত্র মঞ্চগুলোর মধ্যে হাবিবে খোদা এক মুহাম্মদ ব্যতিত আর কেউ নেই-ইহা শাশ্বতকালের কথা। সর্ব ধর্মের সর্ব মহাপুরুষের অস্তিত্বে এক মুহাম্মদ বিরাজমান। যাক, রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম নিজেই বলছেন, “আমি ইলেমের শহর আলী হলো সেই শহরের দরজা, যে আমার ইলেম লাভ করতে চায় সে যেন আলীর দরজা দিয়ে আসে (আল বিদায়া ওয়ান্ নিহায়া, ৮ম খন্ড, ৩৬০পৃষ্ঠা, আল মুজামুল কবীর, হাদিস নং-১১০৬২)।”
আরো বলছেন, “আনা দারুল হিকমাহ্ ওয়া আলীউ বাবুহা (তিরমিযি, মানাকিব অধ্যায়, মেশকাত, বাবে আহলে বাইয়্যেত)।” অর্থাৎ আমি হলেম প্রজ্ঞার নগরী এবং আলী হলো তার দরজা। এ ‘প্রজ্ঞা’ কথাটির মধ্যে জাহির-বাতিন সৃষ্টির সর্ব রকম জ্ঞানেরই সমাহার ঘটেছে। ওহী কালামের মধ্যে ‘জ্ঞান’ ও ‘প্রজ্ঞা’ দুটিই রয়েছে-যা রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের উপর নাযিল হচ্ছে। তিনি তা নিজের ভাষায় (সৌদি আরবের ভাষায়) সাহাবীদেরকে শিক্ষা দিতেন। ইহাই হলো ইলমে মারেফাত। যেমন, সুরা বাকারার ১২৯ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, “রাব্বানা ওয়াব্আস ফীহিম রাছুলান মিন হুম।” অর্থাৎ (ইবরাহীম ও ইসমাঈল বললেন) হে আমাদের রব ! তাদের মধ্য হতে তাদের জন্য একজন রাছুল পাঠাও। “ইয়াত্লু আলাইহিম আইয়াতিকা ওয়া ইউআল্লেমুহুমূল কিতাবা ওয়াল হিকমাতা ওয়া ইউজাক্কিহিম।” অর্থাৎ তিনি তাদের উপর তেলওয়াত করবেন তোমার আয়াত এবং তাদেরকে হিকমত ও কিতাবের জ্ঞান শিক্ষা দিবেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন। “ইন্নাকা আনতাল আজিজুল হাকিম।” নিশ্চয়ই তুমি সর্বোচ্চ হিকমতের অধিকারী। সুরা বাকারার ১৫১ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, “কামা আরসাল্না ফীকুম রাছুলান্ মিনকুম।” অর্থাৎ যেমন আমরা তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের নিকট রাছুল প্রেরণ করেছি। ইয়াত্লু আলাইকুম আইয়াতিন।” অর্থাৎ তিনি তোমাদের উপর আমাদের আয়াত (নির্দশন) তেলওয়াত (দেখান) করেন। “ওয়া ইউজাক্কিকুম ওয়া ইউআল লেমুকুমুল কিতাবা ওয়াল হিকমাত।” অর্থাৎ এবং তোমাদেরকে পবিত্র করেন এবং তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত (বিজ্ঞান) শিক্ষা দেন। “ওয়া ইউ আল্লেমুকুম মা লাম তাকূনু তায়ালামুন।” অর্থাৎ এবং তোমরা যা জানতে না তা তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। সুরা বাকারার ২৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “ওয়ামা আন্জালা আলাইকুম মিনাল কিতাবি ওয়াল হিকমাতি ইয়াএজুকুম বিহি।” অর্থাৎ এবং তোমাদের উপর কিতাব ও হিকমাত নাযিল করা হয়েছে তার সাহায্যে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো। পতিত মানুষ সুরা নিসার ১৬৪ নম্বর আয়াতে এ কথা বলা হয়েছে। এ ইলেমের দরজাটি হলেন একমাত্র মাওলা আলী আলাইহিস সালাম। সুতরাং যার শাজরা নামা মাওলা আলী আলাইহিস্ সালামের সাথে যুক্ত নেই, ইলমে এলাহী বা ইলমে বেলায়েত/গুপ্ত রহস্যের জ্ঞান তার পাবার কোনো সিষ্টেমই নেই। এ হাদিসটি নিয়ে ৭২ ফেরকার গোমরাহদের মন্তব্য হলো শুধু আলীই নয়, সব সাহাবাগণই ইলমে নব্বীর অধিকারী ছিল। হ্যা, সব সাহাবীগণ যা জানতেন তা হলো ইলমুল লেসানী/জাহেরী, ইলমুল ক্বালবী/ইলমে এলাহী/ইলমে নব্বী নয়। বাতিনী ইলেম/ইলমে এলাহী জাহিরী ইলেমের সম্পূর্ন বিপরীত। “আমি মুহাম্মদ হলেম ইলেম ও হিকমাতের (জ্ঞান ও প্রজ্ঞার) নগরী আর তার একমাত্র দরজাটি হলো আলী আলাইহিস সালাম।” (হাদিস)।
সৃষ্টির মধ্যে এ একক গুণ বা মর্যাদাটি অধিকারী একমাত্র মাওলা আলী আলাইহিস সালামই। ‘ইয়ানাবিউল মুয়াদ্দাতা’ কিতাবের ৭০ পৃষ্ঠায় ইবনে মাসুদ রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের সন্মুখে ছিলাম। হঠাৎ হযরত মাওলা আলী আলইসি সালামের জ্ঞান-গরিমা সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়। তিনি বললেন, “জ্ঞানকে ১০ ভাগ করে ৯ ভাগ মাওলা আলীকে এবং অবশিষ্ট এক ভাগ সমস্ত পৃথিবীর লোককে দেয়া হয়েছে। এ ১০ ভাগের অধিকাংশ মাওলা আলী আলাইহিস সালাম পেয়েছেন।” জ্ঞানের দু’টি ভাগ। একটি ‘মুতাশাবেহাত বা তাশাবাহা অপরটি মুহকামাত। একটি রূপক অপরটি সমুজ্জ্বল অর্থ। কোরানের সমুজ্জ্বল অর্থটি জানলে নিজকে চেনা যায় তথা খোদাকে চেনা যায়। সেই ইলমে বাতিন সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বানীটি হলো, তিনি বলেন, “আন আবি হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু কালা হাফিসতু মিন রাছুলিল্লাহি ইওয়াইনে ফাআম্মা আহাদুহুমা ফাবাস্তুহু ওয়া আম্মাল আখারু ফালাও বাস্তুহু কুতিয়া হাজাল মাল্উম্।” অর্থাৎ হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু বলছেন, আমি রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম হতে ইলেমের দু’টি পাত্র (জাহের এবং বাতেন) মুখস্ত করে রেখেছিলাম, তারই একটি পাত্র আমি বিতরণ করে দিয়েছি এবং অপর পাত্রটি প্রকাশ করলে আমার গলা কাটা যাবে। (বোখারী-১২২ নম্বর হাদিস, আত্-তারগীব ওয়াত তারহীব)।” ‘আত্-তারগীব ওয়াত্ তারহীব” কিতাবের ১ম খন্ডের ১২৩ পৃষ্ঠার ৪০ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, “আন জাবিরীন কালা-কালা রাছুলুল্লাহ সা. আল ইলমু এলমানে, ইলমু ফিল ক্বালবী, ফাজাকাল ইলমু নাফে ওয়া ইলমু আলাল নিসানে ফাজাকা হুজ্জাতুল্লাহি আলা ইবনে আদম।” অর্থাৎ হযরত জাবির থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, ইলেম দুই প্রকার – এক ক্বালবী ইলেম-ইহাই উপকারী/ মানবের কার্যকরী ইলেম। দ্বিতীয় হলো ইলমুল লেসানী-ইহা আদম সন্তানের জন্য দলিলস্বরূপ। এ হাদিসটি হযরত আনাস থেকেও বর্র্ণিত আছে (আত্-তারগীব ওয়াত্ তারহীব- ১ম খন্ড, ১২৩ পৃষ্ঠা)। যা দলিলস্বরূপ তার হাকিকত না জানলে/না জেনে শুধু জাহিরী বিদ্যা দ্বারা কথা বললেন, দ্বন্দ্ব-বিভেদ হবেই এবং তাতে মানুষ পথভ্রষ্ট হবে।
আত-্তারগীব ওয়াত্-তারহীব কিতাবের ১২৪ পৃষ্ঠায় হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম বলেন, “এক ধরনের ইলেম গুপ্ত মুক্তাসদৃশ্য (ইলমে মারেফাত/ ইলমে এলাহী/ইলেম বাতেন)। আরিফবিল্লাহগণ/আধ্যাত্মিক জ্ঞানীগণ ছাড়া আর কেউ তা অবগত নয়। অচেতন (গাফিল)/অজ্ঞ-মূর্খ ছাড়া কেউ তা অস্বীকার করে না।” রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম. বলেন, আল্লাহপাক যার মঙ্গল/কল্যাণ চান তাকে ইলেম দান করেন (মুসলিম, বোখারী ও ইবনে মাজাহ), যাকে দ্বীনের ইলেম (আত্মার জ্ঞান/ইলমে এলাহী) দান করা হয়নি তার ইবাদতের কোনো দাম/গুরুত্ব নেই।” কোরানের ঘোষণা হলো, “ওয়া আসবাগা আলাইকুম নিয়ামাহু জাহিরাতাও ওয়া বাতিনাতান ; ওয়া মিনান্ নাসি মাই ইউজ্বাদিলু ফিল্লাহি বিগাইরি ইলমিও ওয়ালা হুদাও ওয়ালা কিতাবিম মুনীর।” (সুরা লোকমান-২০)।” অর্থাৎ এবং তোমাদের জন্য (আল্লাহপাক) একটি জাহেরী (প্রকাশ্য) ও একটি বাতেনী (অপ্রকাশ্য) নেয়ামতের সাব্গা (প্রাচুর্য) দান করেছেন। কিন্তু মানুষদের মধ্যে কেহ কেহ আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতার সহিত বিতর্ক (জিদাল) করে ; অথচ তার নাই কোনো হুদা (পথ প্রদর্শক) ; অধিকন্তু তার নাই কোনো মুনীর তথা নূরময়, দীপ্তিমান) কিতাব। এ আয়াতের মুহকামাত হলো সেই গুপ্ত ইলেম/নূর যার দ্বারা আলোকিত হয়ে মানুষ ওলীআল্লাহ হয়ে যায়, তার তাশাবাহা/রূপকটি হলো জাহেরী ইলেম। নূরময় তথা আলোকিত মানুষ তথা আল্লাহর নূর যে মানুষের মধ্যে উদয় হয়েছে বা জাগরণ ঘটেছে সে মানুষটি নিজেই মুনীর/নূরময় কিতাব। এ নূর/ইলেম আসমানী, জমিনের নয় তথা জাগতিক জগতের নয়, মাদ্রাসার নয়। মানবীয় জ্ঞান যেখানে শেষ আল্লাহর ইলেম সেখান থেকে শুরু। জাহেরী ইলেম সবাই জানে কিন্তু বাতেনী ইলেম সবাই জানে না, জানে একমাত্র আরেফেবিল্লাহগণ/প্রেরিত পুরুষগণ/পরকাল প্রাপ্ত/ আলোকিত মানুষগণ এবং ইহাই মানবের একমাত্র উপকারী ইলেম-যা মানুষকে মহাপুুরুষে অধিষ্ঠিত করে, মৃত্যুঞ্জয়ী করে। ঈমানদারগণ/উম্মতে মুহাম্মদীগণ সে ইলেম অর্জন করে বাস্তবে মুক্তি লাভ করছে। রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম বলেন, “যে কেউ ইলেম অর্জন করে তার পূর্ববর্তী যাবতীয় পাপরাশি ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” এ ইলেম মাদ্রাসার নয়, যারা মাদ্রাসার বিদ্যাকে বুঝে-বুঝায় তারা অন্ধ-জাহেল-দজ্জাল। এ ইলেম আল্লাহ প্রদত্ত, বাতেনী ইলেম, আসমানী ইলেম/ইলমে এলাহী। আল্লাহু আলিমুন-মানে আল্লাহপাক নিজেই ‘ইলেম’-সর্বজ্ঞাত, ইহা তাঁর সেফাতি নাম। ‘আজ্জাতু কুল্লুহু আলিমুন’-এ নামের সাথে যার যোগসূত্র তথা আল্লাহপাকের ইলেম যে পরিশুদ্ধ মানুষের মধ্যে নাযিল হয়/উদয় হয় তিনিই হলেন আলেম-জিন্দা নূরময় কিতাব, বেলায়েতে ওরাই হলো ওয়ারেছাতুল আম্বিয়া (আল্ উলামাউ ওয়ারাসাতুল আম্বিয়ি ইউহিব্বুহুম আহলিস্ সামায়ি ওয়া ইয়াস তাগফিরু লাহুমুল হিতানু ফিল বাহরি ইলা ইয়াওমাল কিয়ামাত। অর্থাৎ আলেম সম্প্রদায় (ওলীগণ) নবীদের ওয়ারিশ। আকাশবাসী ফেরেশতাকুল তাদেরকে মহব্বত করেন। নদীর মাছ তাদের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে (তিরমিযী, ইবনে মাজা, আবুদাউদ)।
আসমানী কিতাব পাঠ করছে ; যা অপবিত্রাবস্থায় কোনো দিনই স্পর্শ করা যাবে না। এ ইলেম হলো নূর-এ নূর যার মধ্যে নাযিল/উদয় হয় তার সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায় এবং তিনি হয়ে যান ওলীআল্লাহ। যতো ইবাদতই করা হোক হাশরের দিন তার প্রতিফল পাবে ইলেম অনুযায়ী এবং মানুষের মর্যাদাও হবে ইলেম অনুয়ায়ী। সুরা নেসার ৭০ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, “জালীকাল ফাদ্লু মিনাল্লাহি ওয়া কাফা বিল্লাহি আলীমান্।” অর্থাৎ উহা আল্লাহর পক্ষ হতে (তাদের প্রতি) বিশেষ অনুগ্রহ এবং জ্ঞানী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহপাকের বিশেষ রহস্যময় সাতটি সেফাতি নামের মধ্যে একটি হলো আলিমুন। ঐ সাতটি সেফাতি নাম আল্লাহর সমস্ত সেফাতের মূল এবং স্বয়ং-ই তিনি। ঐ নূরী নামের অধিকারীদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে, “আফামান্ শারাহাল্লাহু ছাদ্রাহু লিল্ ইসলামি ফাহুওয়া আলা নূরীম্মির রাব্বিহী (সুরা যুমার-২২)। অর্থাৎ এবং যে ব্যক্তির অন্তর/দীল/মন/সদ্র রব ইসলামের (সম্যক গুরুর নিকট আত্মসমর্পনের) জন্য উন্মুক্ত/খুুলে দিয়েছেন, অতএব তারা তাদের রবের নূরের (আল্লাহু আলিমুনের) উপর আছেন। ইসলামে পরিপূর্ণ দাখেল হতে হলে খান্নাছমুক্ত নফস তৈরী করতে হবে-ইহাই কোরানের নির্দেশ। যারা মুসলমান পিতার ঘরে জন্ম নিয়ে মুসলমান দাবী করছে তা কোরান বিরোধী/ধর্মবিরোধী কথা, ইহা ফেরাউন-নমরুদ, আবু জাহেল, আবু লাহাব এবং মুনাফেক মুয়াবিয়া-ইয়াজিদের মতবাদ। পিতৃধর্মানুসারীদের দাবি কোরানুল করিমে স্বীকৃতি দেয়নি, যুগে যুগে পিতৃধর্মানুসারীগণই নবী-রাছুলদের বিরোধীতা করেছে এখনো ওলীদের/গুরুদের/মুর্শিদের বিরোধীতা করছে। ৭২ ফেরকার লোকদের কথা তথা যারা গুরুবাদী নয় তারা পিতৃধর্মনুসারী তথা স্ব-ঘোষিত ধার্মিক, প্রবৃত্তি পূজারী। তা’হলে নূহ নবীর ছেলে কেনানও মুসলমান দাবী করতে পারতো, কিন্তু সে কাফের। নবীর ছেলে কি করে কাফের হলো তা কি ভাবনার বিষয় নয় ? আল্লাহপাক নূহনবীর ছেলে কেনানকে তাঁর আওলাদই (বংশধর) স্বীকার করলেন না (সুরা হুদ-৪৫)। ইয়াকুব ও ইবরাহীম নবী কেনো তার পুত্রদেরকে বললেন, “ইয়া বানাইয়্যা ইননাললাহাস্তাফা লাকুমুদ্ দ্বীনা ফালা তামূতুন্না ইল্লা ওয়া আন্তুম মুসলিমুন (সুরা বাকারা-১৩২)।” অর্থাৎ হে পুত্রগণ ! নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদের জন্য দ্বীনকে মনোনীত করেছেন। সুতরাং তোমরা মুসলমান হওয়া ব্যতিত মৃত্যুবরণ করো না। যেহেতু ইবরাহীম এবং ইয়াকুব নবী মুসলমান সেহেতু তাদের পুত্রগণও তো নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করতে পারতো ! তবে কেনো “মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না”-এ উপদেশটি দিলেন ?
নবুয়তে সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরামই হলেন গুরু/মুর্শিদ, বেলায়তে ওলীআল্লাহগণ। তারা বহু হয়েও এক-ঐক্যতায়/তাওহিদে স্থিত। নবী পরিচয়ে কেউ আসবে না, আসবে ওলী পরিচয়ে, কাজ একই শুধু উপাধি ভিন্ন। সুতরাং গুরু/মুর্শিদের নিকট বায়াত/আনুগত্য স্বীকারকারীগণই হলেন ঈমানদার/আমানু। প্রবৃত্তির পূজারী/ অনুসারীগণ ওলিয়ম মুর্শিদ/গুরু পাবে না (সুরা কাহাফÑ১৭)। আমানুদের প্রতিই খোদার নির্দেশ যেন খান্নাছমুক্ত হয়ে পরিপূর্ণ ইসলামে দাখেল হয়ে যায়। উত্তম চলা নবুয়তের চব্বিশ ভাগের এক ভাগ এবং নবীজি রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের আগমন হয়েছে, মানুষের উৎকৃষ্ট গুণাবলীগুলো (ইনছানিয়াত) ফুটিয়ে তোলার জন্য (মেশকাত ৯ম খন্ড-৪৮৩৮, ৪৮৭০)। ইনসাফ হতে ইনছান এবং ইনছানের পবিত্র গুণাবলীই হলো ইনছানিয়াত-যা মাওলা আলীর ইলমে বেলায়েতে স্থিত। মাদ্রাসার ইলেম দ্বান্দ্বিক/বহুমুখী অর্থ প্রকাশ করে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে, ইহা মানব রচিত ইলেম/ইলমুল কালাম/ কালাম শাস্ত্র। ইহা আসমানী ইলেম/ইলমে এলাহী অবশ্যই নয়। এ ইলেমে মুফতি, মুহাদ্দেস, মুফাচ্ছের ইত্যাদি হওয়া যায় কিন্তু ওলী-আউলিয়া/গুরু, মুর্শিদ, পীর হওয়া যায় না, বরং এ ইলেম ওলীত্বের দরজার দিকে ধাবিত হওয়া জন্য বাধাস্বরূপ (আল ইলমুল হেজাবুল আকবর)। মহানবী সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম হলেন ইলমে এলাহীর অধিকারী এবং তার দরজাটি হলো একমাত্র মাওলা আলী আলাইহিস্ সালাম-এ কথা নবীজি সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম নিজেই বলেছেন। বলুন, কোন সাহাবাকে নবীজি সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম আসমানী ইলেমের/ইলমে এলাহীর দরজা বলছেন ? একমাত্র মাওলা আলী আলাইহিস্ সালাম ব্যতিত আর কাউকে নবী করিম রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম ইলেমের বা প্রজ্ঞার দরজা বলেন নি। মাওলা আলী আলাইহিস্ সালাম ব্যতিত আর কারো নিকট নবীর ইলেম/ইলমে এলাহী পাবে না, তা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম নিজেই বলছেন। আসমানী ইলেম বা ইলমে নব্বী/ইলমে এলাহীর শহর নবী আর তার দরজা হলো মাওলা আলী, সে ইলেম পেতে হলে আলী আলাইহিস্ সালামের দরজা দিয়েই আসতে হবে রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম তা নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন। জানা দরকার সব সাহাবাগণই মুমিন ছিলেন না। তারাই মুমিন ছিল যারা আল্লাহর হাবিবের দরজা মাওলা আলী আলাইহিস্ সালামকে ভালোবাসতো/ভালোবাসে, ইলমে নব্বীর দরজার সাথে যুক্ত ছিল/আছে। আর তারাই মুনাফেক যারা মাওলা আলীকে ঘৃণা করে, তাঁর উচ্চ মর্যাদা-ফজিলতকে অস্বীকার করে, তাঁর বিরুদ্ধে শত্রুতা করে/করছে, তাঁর মর্যাদা অন্যান্য সাহাবাদের মতো মনে করে বা দুই নম্বর/চার নম্বর ভাবে/মনে করে। নবীজি সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামকে বিশ্বাস করলে/মুহাম্মদ রাছুল বলে স্বীকার করলে মুসলমান হবে আর মাওলা আলী আলাইহিস্ সালামকে ভালোবাসলে মুমিন হবে।
মুহাম্মদ হতে আলী এবং আলী হতে মুহাম্মদ মানে মুহাম্মদ ও আলী অবিচ্ছিন্ন (সুনানে ইবনে মাজা, ফাজায়েলে আলী)। আল্লাহপাকেরও এক নাম হলো ‘মুমিন’। আল্লাহপাক মুমিন মানে ঈমান দেনেওয়ালা আর বান্দা মুমিন মানে মানবাত্মার চরম শিখরে আরোহনকারী মহাজন, পরকাল প্রাপ্ত মানুষ। মুমিন আর আল্লাহ অবিচ্ছিন্ন। বিধায় মুমিন কাবার চেয়েও শ্রেষ্ঠ (আল মুমিনু আজামু হুরমাতাম মিনাল কাবা, ইবনে মাজা শরীফ)। নবীর আহলে বাইয়্যেতকে যারা না চিনে, না বুঝেই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্পে নিক্ষেপ করছে ওরা মুনাফেক। আর ৭২ কাতারের কাফের/মুনাফেকগণ অন্ধ-বধির থেকে জাহান্নামী হচ্ছে। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম আরো বলছেন, “আনা কাশ্শামছ ওয়া আলী আল কামার।” অর্থাৎ আমি হলাম সূর্য এবং আলী হলো চন্দ্র। সুরা রহমানের ৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “আশ্ শামছু আল কামারু বিহুছবান্।” অর্থাৎ সূর্যটি এবং চন্দ্রটি হিসাবের সহিত চলমান। এ সূর্য এবং চন্দ্র জাগতিক আকাশের নয়, মূর্খরা জাগতিক আকাশের চন্দ্র সুর্যকে বুঝে এবং বুঝায়। সূর্য এবং চন্দ্র সম্পর্কে জ্ঞান না হলে এ হাদিসের ভেদ জানা সম্ভব নয়। তবে জানা দরকার মানব সত্তাই হলো চাঁদ তথা নূর মুহাম্মদীর নফসযুক্ত আলোকিত অবস্থাটি হলো চাঁদ। সূর্য আবর্তন করে না, আবর্তিত হয় চাঁদ ; ১২ মাসে আবর্তন করে। সেজন্য ধর্ম জগতে মাসের হিসাব চন্দ্র মাস ধরা হয়। হাকিকতের দৃষ্টিতে ৫+৭ = ১২। প্রত্যেকেই ১২ চন্দ্রবিশিষ্ট। এ ১২-তেই কালেমা, এ ১২-তেই মুহাম্মদের আগমন, ১২-তেই তাঁর বর্তমান অবস্থান। এ ১২ মাসের মধ্যে চার মাস ‘মাসহারুল হারাম’ রয়েছে-যা মুহাম্মদীর নূরী সত্তা বলে বিধৃত। আল্লাহ-রাছুল-মুর্শিদ-একেরই তিন রূপ, যা ১২ মাসের মধ্যেই প্রকাশ ও বিকাশ আছে চিরন্তন-শাশ্বতকালে। পাক পাঞ্জাতনের নবূয়তী, মালাকী এবং বেলায়তীর ভেদ-পরিচয় না জানলে চিরন্তন-শাশ্বতকালের পাক পাঞ্জাতনকে চিনা সম্ভব নয়। এ পাক পাঞ্জাতনই সৃষ্টির মূল নিয়ামক। “আল্লাহু নুরুছ্সামওয়াতে ওয়াল আরদ্ব (সুরা নূর – ৩৫)।” অর্থাৎ আল্লাহ হলে আসমান জমিনের নূর। আসমান-জমিন হলো মানস জগত ও দেহ জগত। বস্তু-গুণ ছাড়া এ সৃষ্টিতে আর কিছুই নেই। আল্লাহর নূর ধরা-ছোয়ার বাহিরে, বেমেছাল ; মহা শক্তির ভান্ডার কিন্তু প্রয়োগহীন। এ নূর যখন আকারে আসে (হুয়ায জাহিরু/‘হু’-এর প্রকাশ), নিজ নূরের মেছাল দেয় (মাছালু নুরিহী) তখন তার নাম হয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম। এ মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের মধ্যেই আল্লাহর প্রয়োগহীন নূর প্রয়োগে আসে, আসমানী গুণ-কালাম প্রকাশ হচ্ছে। এখান থেকেই সমস্ত সৃষ্টি আরম্ভ। সেই নূরের পরিবাহক মাওলা আলীর বেলায়তী শক্তি সিররি। প্রয়োগহীন নূর প্রয়োগে আসে নবীর আহলে বাইয়্যেতের বেলায়তী শক্তির মাধ্যমে। তাই নবী সম্পর্কে বলা হচ্ছে, “লাওলাকা লা’মা খালাক্তু আফলাক।” অর্থাৎ আপনি সৃষ্টি না হলে আমি কিছৃই সৃষ্টি করতাম না।
আল্লাহর নূর প্রকাশ হয়ে মুহাম্মদ রূপ ধারণ করলো (খালাক্বতু মুহাম্মাদান মিন নূরে ওয়াজহী)। যারা কোরানের হাকিকত তথা মুহকামাত জানে একমাত্র তারাই এ চিরসত্য-শাশ্বত কথাটির ভেদ জানে। যারা শুধু শাস্ত্রবিদ্যায় পান্ডিত্বের অধিকারী বা আরবের ভাষা (আল্লাহর ভাষা আরবী আর আরব দেশের ভাষা আরবী এক নয়, কিন্তু নামে দু’টিই আরবী ভাষা) শিখে পান্ডিত্ব প্রদর্শন করছে তারা অজ্ঞতা-মূর্খতার কারণে জ্ঞানীদের (আধ্যাত্মিক জ্ঞানীদের/ইলমে এলাহীর অধিকারীদের) সমালোচনা করে থাকে।
সৌদি আরবের ভাষায় কোরান নাযিল হয়নি, হয়েছে আরবী ভাষায় (৮৯ঃ৩, ১১১ঃ২)। তা কোন আরবী ভাষাষ নাযিল হয়েছে জানা দরকার, ঐ আরবী ভাষায় কোরান লিপিবদ্ধ আছে লওহ মাহ্ফুজে; পবিত্র মানুষ ছাড়া ঐ কিতাব স্পর্শই করা যাবে না। আরবের ভাষাকেও আরবী ভাষা বলে বিধায় শাস্ত্র কানা পন্ডিতগণ বুঝাচ্ছে সৌদি আরবের ভাষায় কোরান নাযিল হয়েছে, আসলে আল্লাহর ভাষা আরবীকে তারা বুঝতে পারেনি। সে আরবী ভাষা নূরের কলমে নূরের কালিতে লেখা, তা মূলতঃ কোনো জাগতিক বা ধ্বংসশীল অক্ষরে লেখা নয়, উহা অক্ষরাতীত/কদিম নূরী অক্ষর নূরী কোরান। আর আসমানী কালামগুলো স্মৃতি হতে ভুলে যাবে মনে করে আরবের আরবী/ধ্বংশীল অক্ষরে/ভাষায় কোরান লিপিবদ্ধ করে রেখেছে সাহাবায়ে কেরাম-যাকে আমরা এখন কাগজে লিপিবদ্ধ কোরান বলছি। এখন একটু চিন্তা করে দেখুন কোন আরবী ভাষায় এবং কোন কোরান নাযিল হয়েছে। জ্ঞানীগণ বা সত্য মানুষ ঐ কিতাব (জালিকাল কিতাব) পাঠ করছে, আসমানী কালাম লাভ করছে-ইহা ধর্ম জ্ঞানীর নিকট বুঝতে হবে এবং তারা আল্লাহর ভাষা আরবীতেই আল্লাহর কালাম লাভ করছে। কাগজে লিপিবদ্ধ কোরানে লেখা আছে ‘জালিকাল কিতাব’, তা না চিনলে কাগজের কোরান পড়লে কি হবে ! কাগজে লিখিত কোরান ‘জালিকাল কিতাব’-কে সত্যায়িত করছে। যা লেখা আছে পান্ডিত্ব বাদ দিয়ে তা জ্ঞানীর নিকট যেয়ে চিনো, চোখ খুলে যাবে।
প্রবন্ধ – জেরার মসজিদ ও তাকওয়ার মসজিদ
লেখক – সালমা আক্তার চিশতী
জেরার মসজিদ হলো ষড়যন্ত্রের মসজিদ – যা বনী গানেম গোত্রের মুনাফিকদের দ্বারা তৈরী করা হয়েছিল। রাছুল (সাঃ) সেই মসজিদ ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। কোরান মাজিদের সূরা আত তওবা এর ১৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে – “মা কানা লীল মুশ্রিকীনা আন্ ইয়ামুরূ মাসাজিদাল্লাহি শাহিদীনা আলা আন্ফুসিহীম বিল কুফরি। উলাইকা হাবিতাত আমালুহুম, ওয়া ফীন্নারিও হুম খালিদূনা।” অর্থাৎ মুশরেকরা নিজেরা নিজেদের উপর কুফরীর সাক্ষ্য দেওয়া অবস্থায় আল্লাহর মসজিদ নির্মাণ করিবার অধিকার কিভাবে লাভ করিবে ? উহাদের আমলসমূহ তো বরবাদ হইয়া গিয়াছে। এবং তাহারা অনন্তকাল আগুনের মধ্যে অবস্থান করিবে।
মুনাফিকরা তাকওয়ার মসজিদের মাঝে নামাজ আদায় করতে পারে না। ঈমানদার যারা তারা নামাজ আদায় করে তাকওয়ার মসজিদের মাঝে। মানব আত্মার ঘরকে মসজিদ বলে। মানবাত্মা জাগ্রত করাটা অনেক সাধনার বিষয়। সাধন ভজনের মূল হলো মানবাত্মার জাগরণ ঘটানো। যত সব জীব-জন্তু রয়েছে, সেই সব জীব-জন্তুর আশ্রয়-স্থল হলো এই জেরার মসজিদ। মানুষের মনের মাঝে যত পাপের জন্ম হয় তার উৎপত্তি হলো পশু আত্মার অন্ধকার দ্বারা। অন্ধকার কাটানোটা দুঃসাহসের পরিচয় দেওয়া। অন্ধকারময় দীলের কারণে সুরত পরিবর্তন হয় (সুরা রহমান)। কারণ, মানব মনের অন্ধকার দ্বারা মানব অজুদের পরিবর্তন মানে খোদা হতে বিচ্ছিন্নতা ঘটানো। মানবাত্মাকে পরিছন্ন রাখতে পারাটাই হলো নামাজ। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর সতের সুন্নতের একটি সুন্নত হলোÑ ‘নামাজে আমার চক্ষু শীতল হয়।’ মসজিদ যদি পাক পবিত্র না থাকে তবে আর কি নামাজ আদায় হবে ? নামাজ আদায় করার স্থানটি পবিত্র থাকতে হবে।
মানুষের মনের গহিনের মাঝে আগুনের গুণ খাছিয়ত গুলোর অবস্থান। এই আগুনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মনের পশুত্ব ভাব দূর করতে হবে, এই দূর করাটা সহজ সাধ্য বিষয় নয়। অনুরাগ সাধনার বলে তা অবশ্যই সম্ভব। অসাধ্যকে সাধন করাটা হলো তরিকতের মূল। কারণ, সাধনা করার ফলাফল নির্ভর করে নিজ কর্মফলের উপর। প্রবাদ বাক্য রয়েছে ‘জন্ম হোক যথা-তথা, কর্ম হোক ভাল।’ তাই কর্ম দিয়ে মনুষের মূল মর্ম প্রকাশ পায়। এই কর্ম হলো দুই প্রকারের। একটি হলো দুনিয়ামুখী কর্ম, অন্যটি হলো আখেরাতমুখী কর্ম। দুনিয়ামুখী লোক এই জেরার মসজিদের মাঝে নামাজ আদায় করে আর যারা আখেরাতমুখী মানুষ তারা নামাজ আদায় করবে তাকওয়ার মসজিদে।
তাকওয়া হলো খোদা-ভীরুতার মাধ্যমে সমস্ত নিষিদ্ধ কর্ম থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা বা সরিয়ে রাখা। মোহমুক্ত হয়ে পরকালে বা চৈতন্যের জগতে কায়েম থাকাই হলো সালাত/নামাজ। খোদাভীরুতার লক্ষ্য হলো ঐ দিকে। কোরান মাজিদের সূরা আত তওবা এর ১৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে “ইননামা ইয়ামুরূ মাসাজিদাল্লাহি মান আমানা বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি ওয়া আকামাস সালাতা ওয়া আতাজ্জাকাতা ওয়া লামম ইয়াখশা ইল্লাল্লাহা।” অর্থাৎ আল্লাহর মস্জিদ তো সেই ব্যক্তিই নির্মাণ করিবে, যে আল্লাহ্র উপর এবং ইয়াওমুল আখেরাতের উপর ঈমান আনিবে এবং যে সালাত কায়েম করিবে এবং যে যাকাত আদায় করিবে এবং আল্লাহকে ব্যতিত অন্য কাহাকেও ভয় করিবে না।
আল্লাহর তৈরি মসজিদের মাঝে আদম এবং আওলাদে আদমগণ নামাজ আদায় করে থাকে যাকে বাইতুল মামুর (নূরে নূরান্বিত গৃহ) বলে। আমাদের তথাকথিত মুসলিম সমাজে আল্লাহর তৈরি মসজিদ সম্পর্কে বেখবর। যারা এই মসজিদের খবর রাখে তারা সব সময়ই আযান শুনতে থাকে। কারণ, মসজিদ ও আযান এক সূতায় গাথা। আযান হলো তাকওয়ার মসজিদে যাওয়ার আহ্বান। বিশ^াসীগণ আযান সর্ব অবস্থায় শুনতে থাকে। কারণ, তাদের সামিউন জাগ্রত। তারা চৈতন্যতার জগতে আরোহন করে তাকওয়ার মসজিদের দিকে ধাবিত হয়। স্বামী বিবেকানন্দ বলছেন “জীবন্ত ঈশ্বর তোমাদের সঙ্গে রহিয়াছেন, তথাপি তোমরা মসজিদ, মন্দির, গীর্জা নির্মাণ করিতেছ, আর সর্বপ্রকার কাল্পনিক মিথ্যা বস্তুতে বিশ্বাস করিতেছ।” এই দিক দিয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায় প্রকৃত মসজিদ পরিশুদ্ধ মানবীয় দীলে তার অবস্থান। এ মসজিদে আল্লাহই অবস্থান করেন। আলেম মোল্লারা এই তাকওয়ার মসজিদের ধারে কাছেও যেতে পারবে না। কারণ, অচেতন আর চেতন মানুষ আকাশ জমিন তফাত। তাদের তকদিরে রয়েছে জেরার মসজিদ। আমার মুর্শিদ কেবলা – কাবা কাজী বেনজীর হকে চিশতী নিজামী (কুঃ সিঃ আঃ) বলেন, “জাহিরী মসজিদ তথা ইট-পাথরের মসজিদের মৌলবী এবং নামাজী যদি বেমুরিদান হয় তবে ঐ মসজিদও জেরার মসজিদ হয়ে যায়।” যদিও তার হাকিকত রয়েছে নিজ দেহে। যেমন আমরা মালা গাঁথি এই মালার যদি সূতার মাঝে গিট্টু দেওয়া না হয় তবে আর মালা গাঁথা হবে না তেমনি হাল হয় জেরার মসজিদওয়ালাদের। জেরার মসজিদে অবস্থান করা অবস্থায় তাকওয়ার মসজিদ তৈরী করা সম্ভব নয়। আর তাকওয়ার মসজিদ তৈরী না হলে নিজ মনকে ঐক্যতায় নিয়ে আসা সম্ভব নয়।
রাছুল বলেন, “তোমাদের মধ্যে ঐক্যতা সৃষ্টি করা নামাজ-রোজা-সদকার চেয়েও উত্তম।” ঐক্যতা সৃষ্টি করা মানে রুহে ইনছানিতে কায়েম হওয়া। তাই যারা জেরার মসজিদে বাস করছে তাদের মধ্যে ঐক্যতার জগতে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। যারা ঐক্যতার জগতে কায়েম হতে পারেনি তারা জাহান্নামী হয়ে যাবে। কারণ, তাদের দীলের মাঝে মোহর মারা, কানে মোহর মারা, চোখের মোহর মারা। হাশরের দিন তাদের সুরত বদল হয়ে জানোয়ার রূপে হাশরে উঠবে। কারণ, তাদের মধ্যে আনোয়ার নেই। তাদের সাধ্য নেই আল্লাহ এবং আল্লাহর রসুলের ভেদ রহস্য জানার।
মসজিদ সম্পর্কে জানতে হলে দিব্য দৃষ্টিওয়ালা মহা মানবের কাছে গিয়ে আনুগত্য/বায়াত গ্রহণ করতে হবে। তাঁর দয়ার পরশ দ্বারা যদি দীলের অন্ধকার যদি কেটে যায় তবে এই দেহটা নূরের আলোতে আলোকিত হবে তথা জানোয়ার আনোয়ার হবে। এই নূরটাই হলো আল্লাহু আলীমুন। আল্লাহু আলীমুনের জন্য মানুষ সৃষ্টির সেরা হয়েছে। সৃষ্টির সেরা হওয়াটা সহজ বিষয় অবশ্যই নয়। কারণ, সৃষ্টির সেরা হতে গেলে মানবাত্মার জাগরণ ঘটাতে হবে। মানুষ একটা পর্যায়ে হায়ানী আত্মার মাঝে বাস করে। জেরার মসজিদের মাঝে কায়েম থাকা আর পশু আত্মার গুণ- খাসিয়ত দীলে ধারণ করা একই বিষয়। যারা পুন্যবাণ হবে তাদের স্থান তাকওয়ার মসজিদে, তারা তাকওয়া নিজ মানব জীবনে প্রতিষ্ঠিত করবে। চেতন-অচেতন হওয়ার সাথেই এই দুই মসজিদের অবস্থান। ষড়যন্ত্রকারী (নফস আম্মারার) গুণ-খাছিয়তের লোক এই মানব সমাজে অনেক রয়েছে তদের থেকে নিজেকে বাঁচাতে হলে একজন ইনসানুল কামেলের নিকট বায়াত গ্রহণ করেও তাঁর আশ্রয়ে মানব মনের অন্ধকার কোঠাগুলোকে আলোকিত করতে হবে।
প্রত্যেকটা বিষয় জানা অর্থাৎ অন্ধকারগুলো কাটার হাতিয়ার তৈরি করা। হযরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতী (রাঃ) বলছেন “হিংসুকদের ভৎর্স্যনায় চিন্তিত হয়ো না, কষ্ট ও যন্ত্রণা দিয়েই আশেক তথা প্রেমিকের হৃদয় প্রতিপালিত হয়।” মানুষ পারে সর্ব কিছুর উর্ধ্বে নিজেকে নিয়ে যেতে। কারণ, মানুষের যেই জ্ঞান শক্তি রয়েছে তা অন্য কোন কিছুর মাঝে নেই। আত্মার উন্নতি তখনই ঘটে যখন মানব হৃদয় নির্ভেজাল হয়। জানার মঝেই সর্ব কিছুর মর্ম ভেদ রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। যারা নবীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে/করছে তারা সব হলো হায়ানী আত্মার অধিকারী পশুর ন্যায়। তাদের অবস্থান হবে সিজ্জিনে। তাদের ধ্বংস নিশ্চিত। তারা স্বভাব অনুসারে সুুরত ধারণ করবে। কারণ, যখন অপকর্ম (পশুরেত্ব আচরণ) করা হয় তখন আর আখেরে কি হবে তা ভাবা হয় না। হায়ানী আত্মার কর্ম করতে গিয়ে মানব মন হয়ে উঠে পশুর আত্মার অধিকারী। যারা রাছুলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে তারা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। ইনছানি আত্মা দ্বারা তাকওয়ার মসজিদ তৈরী করা হয়েছে। যারা অচেতন তারা তা বুঝতে পারে না তাদের বুঝ হলো হায়ানী আত্মার ঘরে। এই হায়ানী আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারার মাঝেই রয়েছে একজন ইনসানের ইনছানিয়াত অর্জন করা।
ইনছানিয়াত মনে ধারণ করলে জেরার মসজিদ কেটে তাকওয়ার মসজিদ তৈরী হবে। একজন মানুষ আহামদী ছুরতে নামাজ আদায় করবে। নামাজ আদায় করার জন্য মূল হলো অজু করা, সেই অজু দ্বারা আবেহায়াত প্রাপ্ত হতে হবে। তাকওয়া ছাড়া নামাজ আদায় করা কখনো আল্লাহপাক কবুুল করবে না। সেজন্য জেরার মসজিদে রাছুলপাক (সা.)- কে দাঁড়াতে নিষেধ করা হয়েছে।
কবিতা – কৃতজ্ঞতা সবার তরে
লেখক – এস এম বাহরায়েন শাহ ওয়ায়েসী
মাতা পিতা হতে অজুদ পাইয়া
সঞ্চালিত হলো রুহানী,
মনুষ্যত্ব ধারণ করে
হলো রূপ নিরূপন ইনছানি।
অছিলাতে ছিলেন যারা
কৃতজ্ঞতা তাদের প্রতি অন্তর জোড়া,
আদম অজুদে চেয়ে দেখি
শোভিত আছেন পাক গনী।
কলেমাতে এসেছে পবিত্র বাণী
মাওলার দরশন লা-ছানি,
মুহাম্মদ হতে পেলে চিহ্ন
দেখতে পাবো রাব্বানী।
ওহী হতে আসে কোরআন
তাতে প্রকাশ হয় মোহাম্মদী জবান,
নূর মোহাম্মদ নামের মধ্যে
দোজাহান রয় রৌশনী।
বাহরায়েন শাহ ওছিলা ধরে
ছিলছিলা নিয়েছে আপন করে,
ভয় চিন্তা তার দূর হয়েছে
নজরে মিলেছে যখন রহমানি।
কবিতা – রূপ মনোহর
লেখক – অজয় বোস
প্রাণেতে বাঁধিয়াছে প্রাণ
স্বরূপে রূপের ছায়া,
নয়নে সুধা অফুরান
সুরেতে মোহন মায়া!
নিহারি সে রূপ প্রাণে জাগে সুখ
অমৃত রসের ধারা,
শিহরিত মন তাই অনুক্ষণ
আজি হইয়াছে আত্মহারা!
আপনা আপনি মাঝে
সাজিয়া অপরূপ সাজে,
নিতুই বহিয়া উজানে
তব রূপের কিরণ উছলায়।
আকুল পরাণ তাই
অকারণে শুধু হায়,
ছুটিয়া বেড়ায় সদা
অসীম পিয়াসা মেটায়।
সাহারার বুকে যেন
পড়ে ছিনু কণা সম,
আপনি তুলিয়া বুকে
পরম প্রেমেতে রাখিলে হেথায়।
সাঙ্গ করি ভব-মায়া
ত্যাজিব মাটির কায়া,
পরম পুরুষ রূপে
সেই ক্ষণে শুধাইবে আমায়।
সংগীত – আমাতে আমি মিশে
লেখক – মোতালেব হোসেন চিশতী
আমাতে আমি মিশে, প্রভু তুমি এই ধরাতে এসে
নিজেকে দেখার তরে, সৃজিলে মোহাম্মদ।
আমা হতে আমি বাদে, দেখিলেন মোহাম্মদের মাঝে
প্রভু শাঁই নিরাঞ্জন, আহ! কী অপরূপ সুন্দর।
তোরা দেখবি যদি সেই রূপ, তৃপ্ত করে এই দু’চোখ
তৌহিদের দেশে দেখবি, শাঁই কী অপরূপ।
নিজের রূপে আদম সৃজে, মোহাম্মদ রূপে রূপ লুকায়ে
সৃষ্টি কূলে করছো ভ্রমন, সদা-সর্বদায়।
যে জন চিনিলো তোমারে, লুটাইয়ে পরে চরণ তলে
অবনত মস্তকে প্রভু, প্রণাম জানায়।
মুরশিদ রূপে ফানা হইলে, দায়েমী সালাত কায়েম থাকলে
দেখতে পাবি সেই রূপ, এই রূপের মাঝে।
পরে ছলনাময়ীর ছলে, জীবন গেলো ভুলে ভুলে
এখন কান্দি নির্জনে, পাইতে তোমার দর্শন।
তুমি প্রভু দয়াময়, অসহায়ের সহায় – সম্বল
এই অধমেরে রাখিও তোমার, চরণ তলে।
সংগীত – নামাজে হয় দেল নূরানী
লেখক – ফকীর আতিকুর রহমান চিশতী নিজামী
নামাজে হয় দেল নূরানী রে
খোদার সঙ্গে দেখা শোনা,
কেহ নামাজ বিনা প্রাণবন্ধুরে পায় না।
কালেমা ঈমান ধর মুছুল্লি
ওরে গুরুপদে হয়ে ছাল্লি
বাঁকা পথে মন থাকিলে রে
তোর নামাজ তো হবে কানা।।
আম্মারা নফস হইলে তোমার দাস
যাকাত হবে, পাইবে নামাজ
ও তোর সংযমে রোজা বার মাস রে
দেল কাবাতে হও মাওলানা।।
ভাড়া মোল্লার পিছন ধরে
ও তুই পড়লি নামাজ বরযখ ছেড়ে
মাওলা নাই তার, সাজ মাওলানা রে
মাকাল ফলে ছাই দেখোনা।।
চিনি রয় শরবতে যেমন
তুমি রব্বানী হও রবের মতন
আতিক শাহ কয় কোরান বচন রে
তোর চেহারা আর ভাঙবে না।।
সংগীত – আমার মানব তরী
লেখক – মোবারক হুসাইন ওয়ায়েসী
আমার মানব তরী হেলায় ডুবে যায়
দয়াল গুরু গো –
কান্ডারী হইয়া এসে, বাঁচাও অকূল দরিয়ায়।।
কাম কামনার বিষয় জালে
মত্ত হইলাম তোমায় ভূলে
জানিনা শেষ নিদান কালে কি হবে উপায়।।
কান্ডারী হইয়া এসে
আমায় নিয়ে চলো আপন দেশে
আমার মানব তরী ঠেকিলো চড়ায়।।
কাঁচা বাঁশের ঘরখানি মোর
ঘুনে করলো জড়জড়
বাস করা যে হলো আমার দায়।।
অধম মোবারকের শেষ নিদানে
ত্বরাও গুরু নিজগুণে
তোমার আপন দেশে দাও মোরে আশ্রয়।।
সংগীত – মহাপ্রেমিক হে ধার্মিক
লেখক – কাঙাল আব্দুর রহমান
মহাপ্রেমিক, হে ধার্মিক, রহিম রহমান
দয়াল মুর্শিদ, কোরান মজিদ, বেনজীর চাঁন।।
কেবলা কাবা দয়াল বাবা
এসো এ হৃদয়ে –
দয়া করে এসো হে, ডাকে তোমার আশেকান।।
দয়াল খাজা তুমি রাজা
অধম কাঙাল তোমার প্রজা –
পূজারী হয়ে তোমার, করি গুণগান।।
মানুষ ভজন কর্ম শেখালে
সত্য সুপথ তুমি দেখালে –
দেখা দিও নিদান কালে, হে সুমহান।।
কভু ভুল হলে শুধরে দিও
শুদ্ধ করো মোরে প্রিয় –
নিও তোমার করে, কাঙালের মনপ্রাণ।।
প্রবন্ধ – আসরারে পাঞ্জাতন – ১৩তম পর্ব
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
ইবনে ইসহাকের ‘সিরাতে রাছুলুল্লাহ (সাঃ)’ বিশ্ব বিখ্যাত কিতাবের ৯৫-৯৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, হযরত হালিমা যখন শিশু মোহাম্মদকে মক্কায় তাঁর নিজের লোকদের কাছে নিয়ে এলেন, তখন ভিড়ের মধ্যে তাঁর কাছ থেকে মোহাম্মদ হারিয়ে গিয়েছিলেন। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও হযরত হালিমা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা তাকে পেলেন না। না পেয়ে তিনি তখন খাজা আবদুল মুত্তালিবের কাছে যেয়ে বললেন, আজকে রাতে আমি মোহাম্মদকে নিয়ে এসেছিলাম। মক্কার উত্তর দিকে আমি ছিলাম। তখন কোথায় সে চলে গেলো, তাকে খুঁজে পাচ্ছি না। খাজা আবদুল মুত্তালিব এ কথা শুনে দ্রুত কাবাঘরে গিয়ে তাকে ফিরে পাবার জন্য প্রার্থনা করলেন। এর কিছুক্ষণ পরই ওয়ারাকা ইবনে নওফেল ইবনে আসাদ এবং অন্য একজন কোরাইশ তাঁকে পেয়ে খাজা আবদুল মুত্তালিবের কাছে নিয়ে এলেন। বললেন, ‘আমরা আপনার এ ছেলেকে মক্কার উত্তর দিকে পেয়েছি। তখন খাজা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে কাঁধে নিয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করলেন এবং আল্লাহর হেফাজতে তাঁকে দেয়ার কথা বললেন, আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য প্রার্থনা করলেন। এরপর পাঠিয়ে দিলেন হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালামের কাছে। সুদীর্ঘ পাঁচ বৎসর পর হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালাম শিশু মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামকে বুকে ফিরিয়ে পেলেন। কিন্তু হযরত আমিনার আলাইহাস্ সালামের এ সুখ বেশী দিন ছিল না। মনের অভিলাষ মতে হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালাম স্বামীর মাজার জিয়ারতের জন্য এবং তার পিতৃকুলের সবাইকে দেখার জন্য মদীনায় রওয়ানা হলেন। সাথে নিলেন বিশ্বস্ত পারিবারিক দাসী উম্মে আয়মনকে। মদীনার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে স্বামীর মাজার দরশনে হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালামের হৃদয় বিগলিত অশ্রুধারা প্রবাহিত করে, মাজার জিয়ারত করে পিতৃালয়ে চলে গেলেন। একমাস সেখানে অতিবাহিত করে মক্কায় ফিরে আসার পথে মাঝখানে হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালাম মারাত্মক অসুস্থ হয়ে প্রাণ ত্যাগ করলেন। তখন রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের বয়স মাত্র ছয় বৎসর ছিল। হযরত আমিনা আলাইহাস্ সালামকে সেখানে শিশু মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম ও উম্মে আয়মন মিলে সমাধিস্থ করে অশ্রুভারাক্রান্ত হৃদয়ে মক্কায় চলে আসেন। আসার পথে শিশু মোহাম্মদ তাঁর মায়ের মাজারের দিকে ফিরে বার বার তাকাতে ছিলেন আর চোখের পানি ফেলছিলেন। ইতিহাসে ইহা এক করুণ হৃদয় বিদারক দৃশ্য। পিতা হারানো ছয় বৎসরের শিশু হয়ে নিজ হাতে মায়ের সমাধি দিতে হলো, সেই দূর দেশে নির্জন মরুভূমিতে, তা হৃদয় দিয়ে একটু উপলদ্ধি করে দেখুন বিষয়টি কেমন। যদি আমার আপনার এতোটুকু ছয় বছরের শিশু সন্তানের এমন হয় ভেবে দেখুন তা কেমন লাগবে। যদিও ইতিহাস আর হৃদয়ের উপলদ্ধি এক জিনিস নয়, তবু ঘটনাটি কেমন করুণ তা নবী প্রেমিকগণ উপলদ্ধি করতে পারবেন।
শিশু মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের দায়িত্ব ভার নিলেন দাদা হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিব এবং অতিশয় আদর যতœ সহকারে পৌত্রের দেখাশোনা করেছিলেন। কিন্তু তিন বা চার বৎসর পর পিতামহ হযরত আবদুল মুত্তালিবও ওফাত লাভ করেন। ৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দে হযরত আবদুল মুত্তালিব পারসিকদের সাহায্যে ‘জুল ইয়েজেনের’ পুত্র সায়েফের তোব্বাসের সিংহাসন আরোহণ উপলক্ষে অভিনন্দন জ্ঞাপনের জন্য কোরাইশদের প্রতিনিধি হিসাবে তিনি ‘সানা-তে’ গিয়েছিলেন। তার কিছুকাল পরেই ৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তিনি ওফাত লাভ করেন। তখন রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের বয়স ছিল ‘হাতির বছরে’ আট বৎসর। কোনো বর্ণনায় রয়েছে তখন তাঁর নয় বৎসর ছিল।
মোহাম্মদ ইবনে সাদ ইবনে আল-মুসাইয়িব হতে বর্ণিত হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিব যখন বুঝতে পারলেন তাঁর ইন্তেকালের সময় সন্নিকটে, তখন তিনি তাঁর ছয়জন মেয়ে সাফিয়া, বাররা, আতিকা, উম্ম হাকিম আল-বায়দা, উমায়মা ও আরওয়াকে ডেকে বললেন, আমাকে নিয়ে তোমরা শোকগাথা রচনা করো। আমার ইন্তেকালের পর তোমরা কে কী বলবে আমি তা শুনে যেতে চাই। তারা তাদের পিতাকে সেই শোকগাথা কবিতা শুনিয়েছিলেন। শোকগাথা কবিতাগুলো অনেক বড় বিধায় উল্লেখ করা হলো না। ইবনে ইসহাকের ‘সিরাতে রাছুলুল্লাহ (সাঃ)’ কিতাবের ৯৭ পৃষ্ঠায় শোকগাথাগুলো বর্ণিত আছে।
হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিবের ইন্তেকাল বা ওফাত লাভের পর শিশু হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের দায়িত্ব ভার হযরত খাজা আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর উপর ন্যাস্ত হয়। ১২ বৎসর ২ মাস ১০ দিন বয়সে চাচা খাজা আবু তালিবের সাথে শাম (সিরিয়া) দেশে বাণিজ্যে যান। ১৪ বৎসর বয়সে ফিজারের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং পরে ‘হিলফুল ফজুল’ নামে জনসেবামুলক একটি সংস্থা গঠন করেন। ২৪ বৎসর বয়সে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর সাথে দ্বিতীয়বার নবীজি শাম দেশে বাণিজ্যে যান। ২৫ বৎসর বয়সে হযরত খাদিজাতুত্ তাহেরা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহার মালামাল নিয়ে তৃতীয়বারের মত শাম দেশে বাণিজ্যে যান এবং বানিজ্যে প্রচুর লাভবান হয়ে ফিরে আসেন। শাম দেশ হতে আসার ২ মাস পর ৪০ বৎসর বয়স্কা নারী হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহাকে বিবাহ করেন। তখন ছিল ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দ। যদিও মাত্র ২/১জন লেখক এ কথাটি স্বীকার করতে রাজি নয় যে, বিবাহের সময় হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহার বয়স চল্লিশ বৎসর ছিলো। তাদের মতে তখন তাঁর বয়স ছিল ছাব্বিশ বৎসর। আর রোকেয়া, কুলসুম, জয়নব রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের মেয়ে নয়, হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহার বোনের মেয়ে বলে কয়েকজন লেখক অভিমত পেশ করেছেন। কিন্তু নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামকে তারা আব্বা বা পিতা বলেই সম্ভোধন করতেন বলে ইতিহাসে তারা নবীজির মেয়ে বলেই পরিচিত। একমাত্র হযরত ফাতেমাকেই নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের মেয়ে বলে তারা স্বীকার করেন। যদিও ইসলামের ইতিহাসে চৌদ্দ আনা লেখকই এ কথা স্বীকার করেন না। মূলতঃ চল্লিশ বৎসরের অভিমতটিই সর্বজন স্বীকৃত। হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা আরবের মধ্যে ধনবতী ও পবিত্রা মহিলা ছিলেন। জাহেলিয়াত যুগের কোনো অপবিত্রতা তাকে ষ্পর্শ করতে পারেনি বিধায় আরবে তিনি ‘খাজিাতুত্ তাহেরা’ বলে খ্যাতি লাভ করেছিলেন।
হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম ব্যতীত সব সন্তান হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহার গর্ভেই জন্মগ্রহণ করে। রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের ৩৫ বৎসর বয়সের সময় কাবাঘর মেরামতে নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করেন এবং ‘হাজরে আসওয়াদ’ নিজ হাতে স্থাপন করে এক রক্তক্ষয়ী ঝগড়ার মিমাংসা করেন। এ সময়ে রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম ৫ বৎসর বয়স্ক হযরত আলী আলাইহিস্ সালামকে নিজ গৃহে প্রতিপালনের জন্য নিয়ে আসেন। ২৫বৎসরের শেষের দিকে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানে মগ্ন হন। তিনি ২/৩ দিনের খাবার সাথে নিয়ে যেতেন আবার মাঝে মাঝে বাড়িতে আসতেন। এভাবে নির্জনে বা পর্বত গুহায় ধ্যান সাধনা করার রীতি নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের বংশগত একটি রেওয়াজ ছিল। হযরত আবদুল মুত্তালিবও প্রতি বৎসর রমজান মাস এলে নির্জন পাহাড়ের গুহায় বসে দীর্ঘ এক মাস ধ্যান সাধনায় মগ্ন থাকতেন। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামকে হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা মাঝে মধ্যে খাবার দিয়ে আসতেন। এভাবে হেরাগুহায় ধ্যান সাধনায় ২৭শে রমজান সোমবার ১লা ফেব্রুয়ারী ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ৪০বৎসর ১দিন বয়সে রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম নবুয়ত লাভ করেন। নবুয়ত লাভের পর সর্বপ্রথম সুরা আলাকের পাঁচটি আয়াত নাযিল হলো। আয়াতগুলো হলো, ‘ইক্বরা বিসমি রাব্বিাকাল্ লাযী খালাক্ব অর্থাৎ পড় যা তোমার প্রভুরূপে আছে বা প্রভুর নামের সাথে এবং যা সৃষ্টি করে। ‘খালাক্বাল ইনছানা মিন্ আলাক্ব’ অর্থাৎ সৃষ্টি করেন ইনছানকে আলাক্ব হতে তথা ইনছান সৃষ্টি হয়েছে আলাক্ব হতে তথা রক্তপিন্ড হতে। ‘ইক্বরা ওয়া রাব্বুকাল আকরামুল্’ অর্থাৎ পড় এবং তোমার রব প্রতিষ্ঠিতভাবে (বা পরম) সম্মানীত দাতা বা অতি দানশীল। ‘অল্লাযী আল্লামা বিল্ক্বালাম’ অর্থাৎ তিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দেন অথবা যিনি শিক্ষা দান করেন কলম দ্বারা। ‘আল্লামাল ইন্ছানা মা-লাম ইয়া’লাম’ অর্থাৎ শিক্ষা দেন ইনছানকে যা সে জানে না।
এ পাঁচটি আয়াতের মাধ্যমে রব মানুষকে কলমের সাহায্যে কোরান শিক্ষা দেন সে গোপন ভেদ-রহস্য প্রকাশ করা হয়েছে। সে কলম নূরের সৃষ্টি এবং তার কালিও নুরের-লেখে চলছেন অনাদিকাল হতে। নূরের কলমে নূর কালিতে নূরের কোরান লওহ মাহফুজে লেখা হচ্ছে-যাকে বলে ‘কিতাবুন মাকনূনি’। সেখান থেকে চার ফেরেশতার মাধ্যমে হাবিবে খোদার ক্বলবে নাযিল হয়। কোরান শিক্ষা দেয়ার পর আল্লাহপাক ইনছান সৃষ্টি করে তারপর ভাষা জ্ঞান দান করেন। যে সাত অক্ষরের কোরান মানুষকে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে তা খন্ডন হলে আল্লাহপাক কৈফিয়ত নিবেন এবং তা হেফাজত না হলে জাহান্নামী হতে হবে। আল্লাহর শিক্ষা দেয়া কোরানকে যারা হেফাজত করছে একমাত্র তারাই হলো কোরানে হাফেজ এবং এ হাফেজগণই আল্লাহর কালাম বহনকারী, প্রকাশকারী তথা তাদের মধ্যেই আল্লাহর কালাম নাযিল হয়। নবুয়তের ভাষায় ‘ওহী’ আর বেলায়েতের ভাষায় ‘ইলমে লাদুন্নী।’ যিনি মুর্শিদ (খোদা নিজেই মুর্শিদ) একমাত্র তিনিই তার কোরান শিক্ষা দিতে পারেন। বুঝা প্রয়োজন যে, ‘আলাকের’ পূর্বে আরো পাঁচটি স্তর বা জগত ছিল, পরে আরো চারটি স্তর অতিক্রম করে শেষে ইনছানের আগমন হলো। এ চারটি স্তরের প্রথমই হলো ‘ধালাক’-যেখান থেকে রব-রহমান সাত অক্ষরের কোরান শিক্ষা দিয়ে ইনছান সৃষ্টি করছেন। ঈমানদারগণ আল্লাহর নিকট হতেই কোরান শিক্ষা করে বা পাঠ করে তথা আত্মাপরিচয় লাভ করে তাকে চিনে নিচ্ছেন এবং একমাত্র তারই মধ্যে দায়েমীত ওয়াছেল হয়ে থাকেন। এ মানুষের মধ্যেই স্রষ্টার অবস্থান, কোরানের অবস্থান, ইলমে এলাহীর প্রকাশ। এ পাঁচ আয়াত হতেই সুরা ফাতেহার সাত আয়াত প্রকাশ সাব্যস্ত আছে। এ সাত আয়াত মক্কায় ছিল শেষে মদীনাতে প্রকাশিল বিধায় পূর্ণাঙ্গ সুরা হিসাবে এ সুরাটি দু’বার নাযিল দেখানো হয়েছে। সুরা ফাতেহায় আল্লাহ, রব, রহমান, রহিম এবং মালিক-এ পাঁচটি নামের মর্মার্থে জাতপাকের গোপন পরিচয় নিহিত আছে।
অনুবাদ – ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র, ১ম ও ২য় পর্ব
মূল এলিফ শাফাক হতে
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী
পর্ব ২৫
কুরআন এমন এক ঐশী গ্রন্থ যা অনুধাবিত হয় পাঠকের উপলব্ধির গভীরতার প্রেক্ষিতে। আমরা আমাদের চেতনার প্রগাঢ়তার দ্বারা নির্মাণ করি কুরআনের ভাব-ব্যাঞ্জনাকে। আমাদের উপলদ্ধির গভীরতা আমাদেরকে পৌঁছে দেয় কুরআনের অতল-গভীর সুমহান সৌন্দর্যে।
অন্তর্দৃষ্টি যার যত প্রখর, সে ততটাই মর্ম উদ্ধার করে কুরআন থেকে। প্রকৃত প্রেমিক জনা সেখানে খুঁজে পায় ঐশী প্রেমের বারতা। জ্ঞানী সেখানে খুঁজে পায় অনন্ত-অসীম জ্ঞান-রাজ্য। কুরআন ঠিক ততটাই বিভ্রান্ত এবং পথহারা করে একটি গন্ড-মূর্খকে! অন্তর্দৃষ্টির চারটি স্তর রয়েছে। যার প্রথম স্তরটি হলো বাহ্যিক এবং সাধারণ। এ স্তরেই সন্তুষ্ট থাকে বেশিরভাগ মানুষ। দ্বিতীয় স্তর হলো গোপন তথা ভিতরের। অল্পসংখ্যকই সে স্তরের খোঁজ পায়। তৃতীয় স্তর আরো গোপন যা ঐশীমূলে প্রোথিত এবং চতুর্থ স্তরের গভীরতা এতটাই ব্যাপক যা বর্ণনাতীত ও দূর্বোধ্য। অন্তর্দৃষ্টির সঠিক ব্যবহারই কুরআন কে পঠিত করে তুলবে।
প্রখর করে তুলুন অন্তর্দৃষ্টিকে, ধরা দিবে কুরআন।
পর্ব ২৬
শাশ্বত এ জগৎ একটি একক সত্ত্বা। এক অখন্ড অস্তিত্ব দিয়ে ঘেরা এ জগৎ। এ অখন্ড সত্ত্বায় অবস্থিত সকল কিছুই একে অপরের সাথে সংযুক্ত। সত্ত্বা বহির্ভূত কিছুর অবস্থিতি নেই এখানে।
আমাদের চিন্তা সর্বদা সক্রিয়। নিরব আলাপচারিতায় মগ্ন আমরা। আমাদের চিন্তা কথা বা কর্ম সকল চিরকালের আয়নায় গচ্ছিত রয়ে যাচ্ছে। অনন্তের সংগ্রহশালায় জমা পরছে আমাদের প্রতিটি কথা। আমাদের জীবনযাত্রার সকল উপাদান ঠিকই আবার অনন্ত হতে ফিরে ফিরে আসবে আমাদের কাছে। সুতরাং, জীবন কে যদি সজ্জিত করি সৌন্দর্য দিয়ে, তাই আবার ফিরে পাবো আমরা। আমরা জীবন পথে তখনি সফল পথিক হবো, যখন আমাদের আনন্দ ও যন্ত্রনা কে উপলব্ধি করতে পারবো সত্য ও সুন্দরের চেতনা দিয়ে। সেদিনই আমরা হবো অখন্ড কালের মানুষ, যেদিন একজন মানুষের কষ্ট আমাদের সবাইকে কষ্ট দিবে, একজন মানুষের আনন্দ আমাদের সকলের মুখে হাসি ফোটাবে।
আমাদের মহৎ উপলদ্ধি আমাদের জিবনকে মহৎ করে তুলবে।
সম্পাদকীয় – চেতনার দরিদ্রতা
লাবিব মাহফুজ চিশতী
এ কেমন মূঢ়তা! মানবের এ কেমন অসীম অজ্ঞতা! শ্রেষ্ঠতম বোধশক্তি তথা বিবেক-সৌন্দর্যের অধিকারী মানব সম্প্রদায় কি করে চেতনার সীমাহীন দরিদ্রে জর্জরিত? অস্তিত্বের মিথ্যে অহংবোধে আক্রান্ত? আজ জগতের সর্বদিকে, সকল মানবের অন্তরে বাহিরে তার মিথ্যা অস্তিত্বের অহংকার! জীবনের ক্ষণিক মায়ামোহের আবরণে আবদ্ধ মানব সম্প্রদায় চলেছে অনিশ্চয়তার এক অন্ধকূপে। তবু তার একি আস্ফালন!
আমাদের জীবন শাশ্বত অস্তিত্ব হতে আগত এক স্ফুলিঙ্গ মাত্র। যা ক্ষণকাল মিটিমিটি করে জ্বলে জ্বলে নিভে যাবে। এক কূল থেকে ঠাঁই নিবে ফের অন্য কোনো কূলে। এভাবেই চলতে থাকবে তার নিরুদ্দেশ যাত্রা। তাসের ঘরের মতো অস্তিত্বের এ আবরণ ঝড়ো হাওয়ায় ভাঙবে আর গড়বে। এ ভাঙ্গাগড়ার মিথ্যে খেলা চলতে থাকবে অনির্দিষ্ট কাল। জড়া, ব্যাধি, মৃত্যুর অধীন আমাদের এ অস্তিত্ব। হতাশা, যন্ত্রণা, লজ্জা, ভয় সহ নানা প্রতিকূলতার তল্পিবাহক আমরা। সর্বক্ষণ ভিতরে বাহিরে বয়ে বেড়াই নানান অপমৃত্যুকে। আগামীর নিঃশ্বাসটুকুর নিশ্চয়তা যার নেই, সেও নিশ্চিন্তে আগামী এক শতকের চিন্তায় মাতিয়ে রাখছে নিজেকে । অতীতের অনুশোচনা আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আবদ্ধ করে রাখে আমাদের বর্তমানকে। আমরা অতীত নামক কারাগারে বন্দী। ভবিষ্যতের নিগঢ়ে বন্দী। এত সব বন্দীদশার মাঝে থেকেও আমরা নিশ্চিন্ত মনে পার করি আমাদের বর্তমান।
শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি তথা আশরাফুল মাখলুকাতের খেতাবধারী মানব এ জগতে কত ক্ষুদ্র, কত অসহায়, তা ভাবতেও অবাক লাগে। অস্তিত্বের মিথ্যে বড়াই তো এখানে অপ্রাসঙ্গিক, জগৎটাই যেখানে নশ্বর! যদি আমাদের অতি ক্ষুদ্রাদপিক্ষুদ্র এ জীবনটাকে রাঙিয়ে নিতে সক্ষম হই চিরন্তন অস্তিত্বর রঙে, তবেই স্বার্থক হয় আমাদের অহংকার।
স্বয়ং প্রভু মানবীয় চেতনায় নিয়ত প্রকাশিত ও বিকশিত হচ্ছেন। তাঁকে লাভ করার তথা আপনত্বে ধারণ করার একটাই পথ-পদ্ধতি। আর তা হলো, যে সমস্ত পবিত্র মানবগণ নিজেকে প্রভুতে সমর্পিত করে প্রভুসত্ত্বায় চিরপরিনির্বাণ লাভ করে চিরকালে জীবিত হয়ে আছেন, তাঁদের অনুসরণ অনুকরণের মধ্য দিয়ে অনুসরণকারীর ব্যক্তিসত্ত্বায় প্রভুসত্ত্বাকে জাগ্রত করে তোলা। তবেই মানুষ স্থিত হবে প্রভুতে। প্রভুগুণে হবে গুণান্বিত।
প্রভু অজর অমর অক্ষয় অব্যয়। তিনি সর্ববিকার মুক্ত। তিনি জড়া-ব্যাধি-মৃত্যুর উর্দ্ধে। তার কোনো লয় ক্ষয় বিনাশ বা পরিবর্তন নাই। তিনি চির নিত্য। তাঁর গুণে যদি অনিত্য এ ক্ষুদ্র মানুষটি গুণান্বিত হয়, তবে মানুষটিও পরিণত হবে নিত্যে। তখন সে মানুষটিরও আর জরা-ব্যাধি-মৃত্যুর ভয় থাকবে না।
সসীম এ মানবীয় মোহনাতে অসীম প্রভু বিরাজ করেন। তিনি সসীম এ দেহধামে মূর্ত হয়ে ওঠেন সাধকের সাধনার শক্তিতে। তিনি যখন হৃদপদ্মে জাগ্রত হন তখন তাকে ধারণকারী মানুষটিও হয়ে ওঠেন চিরকালের মানুষ। তাঁরও আর মৃত্যু হয় না। তিনিও বিরাজ করেন চিরকালের নিত্যতায়।
প্রভুসত্ত্বার গুণগুলো মানুষ যখন আপনত্বে ধারণ করে তখন সে মানুষটি আর সাধারণ মানুষ থাকে না। মানবীয় অস্তিত্বে তখন মানুষটি পরিণত হয় প্রভুতে। তখন তাঁর দাসত্ব বন্দেগী তথা অনুকরণ অনুসরনের দ্বারা অন্যান্য মানুষগণ লাভ করে মুক্তি। এটাই ধর্ম বিধান। দোযখ থেকে মুক্তি পাওয়ার এটাই প্রক্রিয়া। শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ এটাই। যখন মানুষের সসীম অস্তিত্বের মধ্যে অসীম প্রভুকে ধারণ করে তখনই সে হয় আশরাফুল মাখলুকাত তথা আদম। তখন ফেরেশতাদের তথা পূণ্যবানদের কেবলা হয় সে এবং ফেরেশতারা সে মানুষটির চরণে হয় সেজদাবনত।
প্রভুর স্বানিধ্যপ্রাপ্ত হলেই আপনি বিরাজ করবেন চির মুক্তির, চির শান্তির অমর লোকে তথা নিত্য বৃন্দাবনে তথা মানবীয় জান্নাতে।
আর যদি আপনি হন প্রভু হতে বিচ্যূত, তাহলে আপনি সর্বক্ষণ জ্বলতে থাকবেন নরক অনলে। প্রভুরূপ আপনাকে মুক্তি দিবে সকল সংশয়-আধার হতে। তাঁর রূপের জ্যোতি প্রজ্জ্বলিত করে সে আলোকে আপনাকে দেখে নিতে হবে অমরত্বের পথ। তাঁর এশকের আবহায়াত পান করে তথা কাওসারের পিয়ালা পান করে আপনি তাঁর সঙ্গে চিরকালে স্থিত হবেন চির প্রশান্তিতে, এটাই হবে মানুষের একমাত্র সাফল্য। প্রভুযোগেই চিরমুক্তি। মুক্ত সত্ত্বায় স্থিত হলেই চিরমুক্তি।
মানবীয় সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর মধ্য দিয়ে যদি মানুষ প্রভুসত্ত্বাকে ভিতর বাহিরে ধারণ করে প্রভুময় হয়, তবেই সে হবে শ্রেষ্ঠ। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম থাকুক চিরকাল। প্রভুগুরু সহায় হোক সকলের।
তরিকতের সুমহান উক্তি সংকলন
1. মুহাম্মদই ধর্ম, ধর্মই মুহাম্মদ। মুহাম্মদ হওয়াই মুক্তিলাভ এবং মুহাম্মদই সর্বত্র বিরাজিত।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
2. গভীর অন্তদৃষ্টি দিয়ে তুমি তোমাকে দেখো। যদি হাকিকত লাভে সমর্থ হও, তবে জানতে পারবে তুমিই সেই।
– হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী
3. আলিফ লাম মীম তিনেরী ভেদ, রেখেছেন সাঁই গোপন করে
চিনগা মুর্শিদ ধরে রে মন, জানগা মুর্শিদ ধরে।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
4. জানো কি জামী, সমস্ত জগতের প্রাণ হলো মুহাম্মদ। আর মুহাম্মদের প্রাণ হলো হুসাইন বিন আলী।
– আব্দুর রহমান জামী রহ.
5. যারা নিজেদের অন্তর সাজাতে ব্যস্ত, বাহিরের সাজ তাদের ঠিক থাকে না।
– হযরত বায়েজীদ বোস্তামী রহ.
6. ইহজীবনে যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য বস্তুর প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে আছে, পরজীবনে তাদের জন্য আফসোস ছাড়া কিছুই থাকবে না।
– জালালউদ্দিন রুমী রহ.
7. তোমার ওপর যদি তোমার মুর্শিদের ছায়া না থাকে, তবে শয়তানের ওছওয়াছা তোমাকে সর্বদা অস্থির করে রাখবে।
– হযরত খাজা বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী রহ.
8. তোমার অন্তরকে সংশোধিত ও পরিশুদ্ধ করো, প্রতি শ্বাসে আল্লাহর সাথে তোমার দীদার ঘটবে।
– হযরত খাজা বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী রহ.
9. কাবা নির্মিত হয়েছে পাথর ও পানি দিয়ে, আর আল্লাহ প্রেমিকদের অন্তর জাগ্রত হয় আল্লাহর নূরের তাজাল্লি দিয়ে।
– জালালউদ্দিন রুমী রহ.
10. বংশ দিয়ে কিছু হয় না। আপনার কর্ম সাধনাই আপনাকে চিরমুক্তির দরজায় পৌঁছে দিবে।
– হযরত খাজা জাফর আস সাদিক রহ.
11. আমার যা কিছু নিজস্ব গৌরব সবি আমি মুছে ফেলেছি। কিছু আল্লাহ প্রদত্ত যা আপনা হতেই প্রতিভাত হয়, তাকে অহংকার বলা চলে না।
– হযরত খাজা জাফর আস সাদিক রহ.
12. সেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে যে অন্যায় করার আগেই পাপের কথা ভেবে নিবৃত্ত হয়।
– হযরত খাজা জাফর আস সাদিক রহ.
13. নফসের পুতুল হোয়ো না, তাহলে জাহান্নাম হবে তোমার অনন্ত আবাস।
– হযরত খাজা জাফর আস সাদিক রহ.
14. ধীরে ধীরে মানুষের কাছ থেকে অপরিচিত হয়ে যাও। কারণ সত্য কিছু মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করে না।
– শামস তারবীজ রহ.
15. আত্মপরিশুদ্ধি ও আত্মপরিচয়ের মাধ্যমে যিনি আল্লাহকে চিনেছেন, তিনিই মুমিন।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ১৩তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২৩ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

