মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির ত্রৈমাসিক আপন খবর, প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, আগস্ট – অক্টোবর ২০১৮ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও হযরত খাজা হিমেল শাহ চিশতী নিজামী কর্তৃক সম্পাদিত
সম্পাদকীয় – নিজেকে চেনা ব্যতীত ধর্ম নাই
হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী
আপন খবর অর্থাৎ আপন পরিচয়, আপন ভেদ, আপন রহস্য, আত্মসন্ধান, আপনাকে জানা, আত্মপরিচয় তথা নিজেকে জানা। আপন খবর জানার তথা আত্মপরিচয় লাভের মধ্যেই নিহিত স্রষ্টার পরিচয়। তাই দেখা গেছে যে, সকল ধর্মের একমাত্র উপদেশটি হলো ‘আপন খবর’ জানা তথা নিজেকে চেনা। পৃথিবীর সকল ঐশী মহামানবের মূল শিক্ষাটি তথা একমাত্র ধর্মদর্শনটি হচ্ছে – আপন পরিচয় জ্ঞান লাভ করা। কেননা, আপন ভেদ জানতে পারলেই খোদার ভেদ জানা হয়ে যাবে; নিজেকে চিনতে পারলেই আল্লাহকে চেনা হয়ে যাবে। তাই সকল ধর্মের মূল শিক্ষা শুধু একটি; আর তা হচ্ছে ‘নিজেকে চেনা’ তথা ‘আপন খবর’ জানা। এ ছাড়া আর কোনো ধর্মদর্শন নেই।
এই আপন খবরের গুপ্তভেদ প্রকাশে মহাত্মা বৌদ্ধ ঘোষণা করেন, “তুমি তোমার আত্মাকে জানো”। আত্মপরিচয় জানার গুরুত্বকে তুলে ধরতে গিয়ে অবতার পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ আর সহজ ভাষায় প্রকাশ করলেন, “তুমি তোমার ব্রহ্মাকে (ঈশ্বর)কে নিজের মধ্যেই খুঁজে পাবে”।আপন খবর এর ইঙ্গিত দিতে গিয়ে যীশু খৃস্ট ব্যাক্ত করলেন “স্বর্গরাজ্য তোমার ভেতরে”। ইসলাম তথা মোহাম্মদী ধর্মের সার শিক্ষাও ছিল তাই, যা মহানবী (সা) এর বাণীতে দেখা যায়, “মান আরাফা নাফসুহু, ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু” অর্থাৎ যে নিজেকে চিনেছে সে তার আল্লাহকে চিনেছে। নিজের মধ্যে স্রষ্টাকে না খুঁজে তথা আপন খবর না জেনে দূরে কোথাও, অনুমানে, আসমানে খোদাকে সাব্যস্ত করে মানব জাতিকে নিঃস্ব কাঙ্গাল বানিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু নিকটের আল্লাহকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে সপ্ত আকাশে রাখতে পারলেই যে ধর্মব্যবসায়ীদের জন্য অনেক সুবিধা! আপন খবর কে কৌশলে চেপে রেখে মানুষকে অন্ধ বিশ্বাসে, কল্পনার জগতে (হুর-পরী), ধর্মান্ধতার শিকলে বেঁধে রাখতে পারলেই ধর্মডাকাতদের লাভ। প্রকৃতপক্ষে, নিজেকে চেনার মাধ্যমে স্রষ্টার পরিচয়জ্ঞান লাভ করাই হচ্ছে ইসলামের একমাত্র বিধান, যা যোগী, ঋষি, সুফি, দরবেশগণের জীবনে পরিলক্ষিত হয় এবং সকল ধর্ম তথা মরমীবাদের একমাত্র নির্দেশনা ও সুফিদর্শনের মূল শিক্ষাও এটাই।
শ্বাশত মুক্তির আকাঙ্খায় সমর্পিত মানুষেরাই প্রবল সাধনাবলে চেতনার ধ্যানাকাশে লাভ করতে সক্ষম হয় মুর্শিদ তথা গুরূরূপের আলোকময় অনির্বাণ শিখা। গুরু প্রদত্ত আলোকময় করুণাধারায় সিক্ত হয়ে, শুদ্ধ হয়ে, পতিত মানুষ পায় কাঙ্খিত মুক্তির সন্ধান। নিজেকে চেনা ও জানার বাসনায় মানুষগুরুকে নিষ্ঠা করেই চলে তার ভজন সাধনের সার্বিক আয়োজন। আদম কাবায় সেজদাবনত হলেই মানুষ খুঁজে পায় সেরাতুল মুস্তাকিম।
সেরাতুল মুস্তাকিম এর এ চিরন্তন ধারায় ভক্তি, বিশ্বাস আর প্রেম শিকলে গুরুকে শক্ত বাধনে বাধতে পারলেই ধন্য হয় মানুষ জীবন। অনুরাগ সাধনার বলে গুরুপ্রেমে সর্বত্যাগী হলেই মানুষ হয় আত্মজয়ী। আত্মজয়ী মানুষেরাই নিত্যলোকের চির বাসিন্দা হয়ে করে অমরত্বের আস্বাদন। সেই অমরত্বের সন্ধানে “আপন খবর” তার অভিযাত্রা অব্যাহত রাখবে আপনাদের সহযোগিতা পেলে। পরিশেষে এখনও যারা গুরুপ্রেমের করুণাধারায় সিক্ত হতে পারেনি তাদের উদ্দেশ্যে বলি-
“মরতে যদি পারো রে মন
মরার আগে –
ও তোর আপন খোদার মিলবে দীদার
মুর্শিদ প্রেমের অনুরাগে”
প্রবন্ধ – আদম কাবায় সেজদা এবং কিছু কথা
লেখক – হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
আল হাক্কু মুররুন অর্থাৎ সত্য বড় তিতা হয়। তাইতো সত্য আছে রূপক-প্রতীকের (মুতাশাবেহাতের) আড়ালে। জ্ঞানীগণ রূপক প্রতীকের আড়ালে স্থিত সেই চিরন্তন-শ্বাশত দ্ব্যর্থবিহীন সত্যকে বুঝতে পারেন বিধায় তারা জাতি-গোত্রের ভেদাভেদের বাহিরে অবস্থান করেন এবং তারা হলেন পতিত মানুষের পথপ্রদর্শক। সেই সত্যকে সত্যের পথিক বা সত্যনিষ্ঠ ব্যাক্তি ছাড়া কেউ ধারণ করতে পারে না। সেজন্যই সাধারন মানুষের নিকট রূপক প্রতীকের উপস্থাপন। জ্ঞানীগণ সেই রূপক প্রতীকের সমুজ্জল (মুহকামাত) যা দ্ব্যর্থবিহীন তার ভেদ বুঝেন। সাধারন মানুষ তাইতো জ্ঞানীর সঙ্গ না নিলে, কখনো সেই রূপক প্রতীকের দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে তা কখনো জানতে পারে না। এই জ্ঞানীরাই হলেন মানব মুক্তির দিশারী তথা গুরু বা মুর্শিদ। মানুষ ধর্মজ্ঞানহীন এবং পথভ্রষ্ট হয় যখন কোরানের মোতাশাবেহাতকে তথা রূপক প্রতীককেই ধর্মজ্ঞান মনে করে তথা রূপক প্রতীকের অর্থ করে- যা কোরানে নিষেধ করা হয়েছে।
কোরানের সমস্ত কালাম আছে রূপক প্রতীকের আড়ালে। সেই রুপক প্রতীকের আড়ালে লুক্বায়িত চিরসত্য দ্ব্যর্থবিহীন জ্ঞানময় কালামকে না বুঝে শুধু রূপক প্রতীকের অর্থ করে আলেম মোল্লাগণ সাধারন মানুষকে পথভ্রষ্ট করে চলছে। তারই একটি চিরন্তন শ্বাশত চিরবর্তমান ঘটনা হলো আদমকে সেজদা করা। সাধারন লোকগুলো এর শুধু মোতাশাবেহাতটিই জানে, এর মুহকামাত তথা হাকিকত সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর বিধায় অখন্ডে প্রবাহিত চিরন্তন শ্বাশত বর্তমান ঘটনাটিকে অধিকাংশই অতীত কালের ঘটনা বলে জানে, মানে এবং তাই প্রচার করে। ইহাই অজ্ঞতা-মুর্খতা।
আদম কাবায় সেজদা না করে ইবলিশ কাফের হলো। ইবলিশ আল্লাহর সাথে প্রতিজ্ঞা করলো যে পথে আমি পথভ্রষ্ট হলাম (মানে আদম কাবায় সেজদা না করে) বা কাফের বা লানত পেয়ে জান্নাত থেকে বের হলাম আমি তোমার আওলাদে আদমকেও সে পথে পথভ্রষ্ট করবো। আল্লাহ বললেন, তুমি পারবে তবে যারা আমার বান্দা তাদেরকে তুমি কিছুই করতে পারবে না। ইবলিশ কিভাবে পথভ্রষ্ট হলো? সে আদম কাবায় বা মুর্শিদ কাবায় সেজদা করে নি। কিন্তু সে বিমূর্ত আল্লাহকে মানে, সেজদা করে, রাছুল স্বীকার করে, ইহকাল বা পরকালও স্বীকার করে, জান্নাত জাহান্নাম সবই স্বীকার করে এবং আল্লাহর বন্দেগীও বেশি বেশি করছে। আল্লাহর মূর্তরূপ বা আদম কাবায় বা মুর্শিদ কাবায় সে সেজদা করতে রাজি নয় বিধায় আল্লাহপাক তাকে লানত দিয়ে বা ওয়া কানা মিনাল কাফেরীন ঘোষনা দিয়ে তার সমস্ত ইবাদতের ফল অসার ঘোষণা করে দিয়ে জান্নাত থেকে বের করে দিলেন।
আদমের দুটি অবস্থা। একটি জান্নাতে অপরটি দুনিয়ার জীবন। দুনিয়ার জীবনে তিনি পাক পাঞ্জাতনের উছিলা ধরে তওবা করে মুক্তি পেলেন এবং তিনি নবী ও রাছুল হলেন। এই আদমই পতিত মানব জাতির পথপ্রদর্শক বা মুর্শিদ। কাজেই এখন যারা আদম কাবায় বা মুর্শিদ কাবায় সেজদা করা মানে না বা শেরেক বলে চিৎকার করে তারা ইবলিশের বান্দা। ইহাই কুরআনের হুকুম বা বিধান। আদম আল্লাহর প্রতিভূ বা স্থলাভিষিক্ত এবং আদম আল্লাহর সুরতে গঠন এবং আদম বর্তমান। আল্লাহ শুধু নূর, বিমূর্ত নূর, মেছালবিহীন নূর।এ নূর দর্শনযোগ্য নয়। আল্লাহপাক ই আবার তার নূরের মেছাল দিয়েছেন তাকে দেখার জন্য ‘মাছালু নূরীহি কামিশকাতিন ফিহা মিজবাহুন’ বলে। ঐ বিমূর্ত নূরের মেছালই হলো আদম। আল্লাহ প্রয়োগহীন এবং তার প্রায়োগিক অবস্থাই হলো আদম।
কাজেই আদম কাবায় বা মুর্শিদ কাবায় আল্লাহকে দর্শন করতে হবে এবং এখানে সেজদা দিলেই আল্লাহপাক সেজদা পাবেন এবং খুশি হবেন। এই আদম কাবাই হলো ঈমানদারের কাবা কেবলা তথা দিক, যার অভিমুখে আল্লাহকে সেজদা করবে। ইহারই প্রতীক স্বরুপ আরবে পাথরের তৈরী কাবা ঘরকে কেবলা করে আল্লাহ কে সেজদা দিলে তা শরিয়তেই গ্রহনযোগ্য বা স্বীকৃত। হাদিস কুদসী হতে জানা যায়, আল্লাহপাক বলেন, “ইন্নাল্লাহা খালাকা আদামা আলা ছুরাতিহী” অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহপাক আদমকে সৃষ্টি করেছেন আপন সুরতের উপরে। সৃষ্টি মানে অবিকল প্রকাশ বা আসলেরই প্রকাশ। এই মানুষের মাঝেই আল্লাহ তাঁর বিমূর্ত নূর মূর্তরূপে প্রত্যক্ষ করে নবুয়ত খতম ঘোষণা করলেন।
যেখানে আল্লাহর নবুয়ত সেখানেই আছে আল্লাহর সুরত। আল্লাহপাক তাঁর স্বীয় সিরাত হতে আদমের সুরত প্রকাশ করলেন বিধায় আদম সুরতেই আল্লাহকে ঈমানদারগণ দর্শন করছেন এবং আল্লাহপাককে দর্শন করে বা নিরিখ করে নূরী কাবা বা আদম কাবার মাধ্যমে আল্লাহকেই সেজদা করে চলেছেন। আল্লাহ ছাড়া অন্য কেহ সেজদা পাবে না। তবে আল্লাহর বিমূর্ত রূপে নয়, সেজদা হবে তাঁর মূর্ত রূপে- ইহাই হলো সেরাতুল মুস্তাকিম। কিন্তু ইবলিশ তার প্রতিজ্ঞানুযায়ী মানুষকে পথভ্রষ্ট করবে তাই সেরাতুল মুস্তাকিমের মাঝে তথা নূরী কাবায় আল্লাহর ছুরতের নিরিখ প্রতিষ্ঠিত হতে দিবে না।
যদিও ইবলিশ দ্বারা ইহা একটি পরিক্ষা, কারা আদম কাবায় সেজদা করে বা করে না। যারা আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করছে তারা আল্লাহর বান্দা, তাদের সেজদা কবুল হচ্ছে। আর যারা সেজদা করছে না তারা শয়তানের বান্দা বা অনুসারী, তাদের কোনো বন্দেগী কবুল হচ্ছে না; বরং গলায় পড়ছে লানতের মালা। ইবলিশের এই প্রতিজ্ঞার ফাঁদে পড়েছে পৃথীবির চৌদ্দ আনা মানুষই। বলা যায়, এই পৃথিবীতে ইবলিশেরই এক প্রকার রাজত্ব চলছে এবং ইবলিশ মানবজাতির অধিকাংশকে অচেতন করে রেখেছে। বিধায় তারা বুঝতেই পারছে না যে, তারা ইবলিশ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ভুল পথে আছে। তারা ভাবছে ঠিক পথেই আছে, যেমন ভেবেছিলো ইবলিশ যে আমিই আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা না করে একমাত্র আল্লাহকেই (বিমূর্ত আল্লাহকে সেজদা করে) সঠিক পথে আছি! এই শ্রেণীর উপাসকগণের উপাসনার ধারাটি হলো, তারা শুধু আনুষ্ঠানিকতাকেই একমাত্র ইবাদত মনে করে। যেমন, ওয়াক্তিয়া নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদিই একমাত্র ইবাদত! আসলে এ সমস্তই হলো আসলের প্রতীক, উপমা বা মেছাল তথা মুতাশাবেহাত তথা খন্ড কালের ইবাদত, অখন্ড কালের নয়।
এ সমস্ত ইবাদত সময়ের দুই স্তর অতিক্রম করতে পারে না। মানুষের ইবাদত হলো খন্ড কালের ইবাদত হতে অখন্ড কালে স্থিতি লাভ করা তথা দায়েমীতে কায়েম হয়ে যাওয়া তথা নিজেই নামাজ-রোজা হয়ে যাওয়া এবং এবং নিজের নামাজকে হেফাজত করা। মানুষ ইবাদত করবে কার এবং কোথায়? আল্লাহ মানুষে(অহুয়া মায়াকুম আইনামা কুনতুম; ওয়া নাহনু আকরাবু ইলাইহি মিন হাবলিল ওরিদ)। কাজেই মানুষ নিজের মধ্যে নিজের আল্লাহকে চিনে নিজের মধ্যেই তাঁর ইবাদত করবে। এজন্য দেখা যায় নামাজ আদায় করার প্রথমে সেজদার জায়গায় লক্ষ্য, তারপর রুকুতে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলে, সেজদায় নাকের মাথায় এবং তাশাহুদ পাঠ করার সময় ক্বালবের দিকে লক্ষ্য করতে হয় মানে নামাজ মানুষ নিজেই।
এজন্যই আদম কাবায় আল্লাহ আছেন। এই কাবা পাঁচ নূরের তৈরী তথা আদমই হলো নূর আল্লাহ। বিমূর্তের মূর্ত আল্লাহ তথা লাছানির ছানি আল্লাহ তথা বেমেছালের মেছাল আল্লাহ (মাছালু নূরীহি… মিছবাহুন)। তথা নূর আল্লাহ তথা আদমকে সেজদা না করে ইবলিশ পথভ্রষ্ট হলো । আর এখন পনের আনা মানুষকে যেভাবে পথভ্রষ্ট করে চলেছে এবং আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা না করার জন্য শত-সহস্র মত, যুক্তি, বুদ্ধি, ফতোয়া সে তুলে ধরছে! কোথা তে এবং কেমন করে সে এ সমস্ত বিষয়গুলো তুলে ধরছে? তার অবস্থান এই মানুষেরই অন্তর জগতে ছুদুর নামক স্থানে (অছওয়াছিল খান্নাছ)। শেরেকির পচা-দূর্গন্ধটিও এখানে আছে বলে ফতোয়ার ডিগবাজী খেলছে, সেই সঙ্গে জাহান্নামে যাবার প্রচন্ড ভয়টিও দেখাচ্ছে। আর অন্ধ মূর্খ নাদানেরা সেই ফাঁদে পড়ে তাদের অজান্তেই পথভ্রষ্ট হচ্ছে এবং পথভ্রষ্ট করার শিক্ষার জন্য হাজার হাজার আরবী পাঠশালাও খুলেছে।
আল্লাহকে ছাড়া সেজদা দেয়া হারাম এটা সত্য, তবে তা হবে মুর্শিদ বা আদম কাবাকে অভিমুখ করে। যেমন, আরবে পাথরের কাবাকে অভিমুখ করে সেজদা করা হয়। মক্কার কাবা ঘর হলো হাকিকি কাবারই প্রতীক। আল্লাহপাকের মূল সিফাতের মারেফত হলেই চিনা যাবে আল্লাহর সুরতেই আদম বা মানুষ সৃষ্টি। এই ইলমে মারেফত দ্বারা চক্ষু খুলে যাবে এবং দিব্যদৃষ্টি অর্জন হবে। কাজেই আল্লাহর চোখ দ্বারাই আল্লাহকে দেখতে হবে, শুধু মানবীয় চোখে তাকে দেখা যাবে না (লা তুদরিকুল আবছারু)। আল্লাহপাক জানাচ্ছেন, হে রাছুল, আমার বান্দারা জিজ্ঞেস করবে আল্লাহ কোথায়? আপনি বলে দেন, আল্লাহ তোমার কাছেই আছে। আরও পরিষ্কার করে বলছেন, আল্লাহ তোমার সাথেই আছেন। তাহলে অনুমান কল্পনায় বিমূর্ত আল্লাহকে আসমানে সাব্যস্ত করা কুফরী।
আল্লাহকে সৃষ্টি থেকে কোথায় আলাদা স্যাব্যস্ত করা যাবে না, করলে তা হবে শেরেকি। ইবলিশ ই প্রথম এই শেরেকি টা করছে আর করছে তার অনুসারীরা তথা যারা ইবলিশের মতবাদে আক্রান্ত হয়ে আছে তথা নফসে আম্মারার গুণ খাছিয়তে আবৃত হয়ে আছে। এই পথে এবং মতে ইবলিশ অধিকাংশকেই পথভ্রষ্ট করতে পারছে (সুরা আনআম – ১১৬)। আল্লাহ আমার সাথেই আছেন, এর ভেদ রহস্য একমাত্র মানুষই বুঝতে পারে এবং তাকে দেখতে পায়। মানুষেরই এক নাম হলো মুহাম্মদ আর মুহাম্মদ হলো আল্লাহ মোজহার তথা মুহাম্মদ সৃষ্টি হলো আল্লাহর চেহারার নূর হতে। সেজন্য বলা হয়েছে, খালাকতু মুহাম্মাদান মিন নুরে ওয়াজহি। অর্থাৎ আমার চেহারার নূর হতে মোহাম্মদকে সৃষ্টি করেছি। অন্ধ-মূর্খ-নাদানেরা এ হাদিসের হাকিকত বুঝতে না পেরে মিথ্যা বা জাল হাদিস বলে প্রচার করছে। জানা প্রয়োজন যে, আল্লাহ এবং তাঁর হাবিব মুহাম্মদ একই নূর।
হাদিস কুদসীতে বলা হচ্ছে, আনা মিন নূরীল্লাহ ওয়াল খালকু কুল্লিহিম মিন নূরীহি। অর্থাৎ আমি আল্লাহর নূর হতে এবং সমস্ত সৃষ্টি আমার নূর হতে। এর মানে সমস্ত সৃষ্টিই হলো নূরে মোহাম্মদীর ঝরণার প্রবাহিত রূপ তথা কুললানা মুহাম্মদ। তার মধ্যে মানুষ মুহাম্মদ সৃষ্টির বিশেষ বৈশিষ্টের অধিকারী। এ মুহাম্মদই নবুয়ত লাভ করেছে তথা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডময় সুরের ভাবমর্ম মুহাম্মদের জলিতে এসে সুরা কালামে কোরান স্বরূপ জহুর হচ্ছে। ঈমানদারগণ তথা মুহাম্মদের অনুসারীগণ মুহাম্মদ হতে আল্লাহর কালাম শ্রবণ করে ইনছানে পরিণত হচ্ছে। কিসসা কোরানের তার দলিল হলো, আর রহমান।আল্লামাল কোরআন।খালাকাল ইনছান। অর্থাৎ রহমান। তিনি কোরান শিক্ষা দেন। সৃষ্টি করেন ইনছান। এই কোরান হলো আরবী কোরান, কিচ্ছা কোরান নয়।
কিচ্ছা কোরান আসমানী কোরান নয়, আসমানী কোরান হলো আরবী কোরান। আরবী কেরান হলো ইনছান কোরান। ইনছানের বুনিয়াদ হলো ইনছাফ আর ইনছানের পবিত্র গুণ খাছিয়ত হলো ইনছানিয়াত- যা জাতপাক আল্লাহর পবিত্র সিফাত। কিচ্ছা কোরানে তাই বলা হয়েছে, ফিতরাতাল্লাহিল্লাতি ফাতারান নাসা আলাইহা। অর্থাৎ আল্লাহ যেই প্রকৃতির ওপর মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন, তাহাই তো তাদের জন্য আল্লাহর প্রকৃতি বা ফেতরাত। বিশ্বাস ভক্তি যোগে আল্লাহর কালাম শ্রবণে পর্দাবৃত মানুষ পর্দামুক্ত হয়ে ইনছান রূপে গড়ে ওঠে। এটা একমাত্র তাদের দ্বারাই সম্ভব যারা আল্লাহর কালামকে আল্লাহর নিকট হতে শ্রবণ করে নেয়। যিনি এই কালাম প্রকাশ করেন তিনি রহমান, আল্লাহর মূর্তরূপ তথা গুরু তথা আদম বা মুর্শিদ। তুমি জেনে রাখো এবং জানো যে, আল্লাহ নিজেই হলো কালাম। তবে মতলেক কালাম, সেই কালাম আদমে বা তাঁর খলিফার মাধ্যমে নাতেক হচ্ছে। আল্লাহপাক ছাড়া কেহ কোরান শিক্ষা দিতে পারে না।
যারা বলছে আমরা কোরান শিক্ষা দেই তারা কুফরি করছে। ঈমানদারগণ সেই কালাম আল্লাহর কালাম বলে শনাক্ত করে এবং তা শ্রবন করে হেদায়াত প্রাপ্ত হচ্ছে। যারা কিচ্ছা কোরান শ্রবণ বা পাঠ করছে তারা অন্ধ অনুমানেই থেকে যাচ্ছে এবং পথহারা হচ্ছে। তবে কিচ্ছা কোরানের ভেদ যারা আরবী কোরান থেকে বুঝে এবং চিনে নিচ্ছে তারা অনুমান কল্পনার বৃত্ত হতে বের হয়ে বাস্তবে বর্তমান খোদা দর্শন করে পথ প্রাপ্ত হচ্ছে । মারেফাত মানে বাস্তবতা। অনুমান কল্পনা হতে বের হয়ে চিরবর্তমানে কায়েম হয়ে যাওয়া।
যেমন, মাওলানা রুমী, তিনি কিচ্ছা কোরানের ভেদ তাঁর মুর্শিদ শামস তাবরীজের নিকট যখন চিনে নিয়েছেন তখন দ্ব্যার্থহীনভাবে ঘোষণা করলেন, ‘হাম জেকোরা মগজে রাবার দাস্তা, উস্তে খাঁ পেশে ছাগা আন দাখতাম’ অর্থাৎ আমি কোরানের মগজ উঠিয়ে নিয়েছি (আরবী কোরান চিনে নিয়েছি তথা কোরানের মুহকামাত বুঝে নিয়েছি তথা কোরানের বাস্তবতা চিনে নিয়েছি)। আর অস্তি চর্ম শৃগাল কুকুরের জন্য রেখে দিয়েছি। (যারা কোরানের মুহকামাত বুঝেনি তথা কিচ্ছা কোরানকেই আসল কোরান বুঝেছে তাদেরকে তিনি কুকুর সম্বোধন করেছেন)। যারা কোরানের মুহকামাত বুঝে নিজের মধ্যেই খোদাকে শনাক্ত করেছেন তথা চিনে নিয়েছেন তারাই হচ্ছেন পর্দামুক্ত মানুষ তথা আল্লাহর বান্দা তথা আবদুহু ওয়া রাছলুহু। এরা বহু হয়েও এক এবং আল্লাহর সাক্ষী তথা নূর আল্লাহ ।
এরাই হলো রব রহমান, যারা ঈমান এনেছে তাদের কাবা-কেবলা তথা লক্ষ্যস্থল তথা দিক। এই কাবাতে তাওয়াফ করে খোদার পরিচয় নিতে হবে তথা খোদাকে শনাক্ত করতে হবে। এই আল্লাহর ঘর কাবাতে যারা সেজদা করেনা তারাই হলো লানত প্রাপ্ত এবং কাফের তথা পর্দাবৃত। খফি মুহাম্মদরে ঘর এই মানব দেহ, এই ঘরের মধ্যে আরো চারজন – আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইন; এরাই হলো ঘরের অধিবাসী তথা আহলে বাইয়্যেত। আর মুহাম্মদ (সা) কে নিয়ে হলো পাকপাঞ্জাতন (কোরান)। এই পাকপাঞ্জাতন কে? আল্লাহর হাস্তি হলো পাকপাঞ্জাতন আর পাকপাঞ্জাতনের নাস্তি হলো আল্লাহ। এখানে তিনি ‘আমরা’ বলে কোরানে জানাচ্ছেন (ওয়া নাহনু আকরাবু ইলাইহি মিন হাবলিল ওরিদ)।
এই পাকপাঞ্জাতনের পাঁচ অজুদ নিয়ে মানব দেহই হলো একত্বের নিদর্শন। এখানেই খোদা ধরা দিলেন আর জ্ঞানীগণ চিনে নিলেন তাদের খোদাকে, বের হয়ে আসলেন অনুমান কল্পনায় খোদা বিশ্বাস হতে, চলে আসলেন আয়নাল ইয়াকিনে। দেখতে পেলেন আল্লাহ আর খোদা প্রভেদ হয়েও অভেদ হয়ে আছে মানব রূপে এসে। আরো চিনতে পেলেন আল্লাহ আলিফ লাম লাম হা এই চার অক্ষর নিয়ে মানুষের সাথে মিশে আছেন তথা মুহিত হয়ে আছেন (আলা কুল্লে শাইয়্যিম মুহিত)। এখান থেকেই আল্লাহপাকের জ্যোতির প্রকাশ ঘটছে (সুরা নূর ৩৫ নং আয়াত)। বে-মেছাল নূর তাঁর নূরের মেছাল দিলেন (মাছালু নূরীহি), দরশন যোগ্য করলেন এবং তাতে তাঁর নূরের প্রকাশ ঘটাচ্ছেন, ঈমানদারগণ চিনে নিলো এবং দেখে নিলো তাঁর খোদাকে। বললো, আমি একমাত্র আল্লাহর ই ইবাদত করি এবং তাঁরই সাহায্য চাই। (ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাইন)। ‘আরশে আলা’ তে খোদার ধ্যানে দিদারে ঈমানদারগণ কায়েম হলো তথা সেরাতুল মুস্তাকিমে কায়েম হয়ে গেলো।
সমস্ত মহাপুরুষগণ এ সিরাতুল মুস্তাকিমেই প্রতিষ্ঠিত আছে। এখানে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য ঈমানদারগণের প্রার্থনা। মুমিনের ক্বলব আল্লাহর সিংহাসন, এ ক্বালব বুকের মাঝে নয়। ক্বলব তিনটি পর্যায়ে রয়েছে – যা তিন আরশ বলে সাব্যস্ত রয়েছে। এ তিন আরশে একেরই তিন রূপ -মুহাম্মদ, রাছুল, আল্লাহ।
জানা দরকার, মানুষ যখন সিবগাতাল্লায় সিক্ত হয় তখনই হয় আরশুল্লাহ। যখন আমানু বা মুরিদগণ একা হয়ে আল্লাহকে ডাকে বা ডাকার জন্য সাধনা করে তখন সাথে সাথেই আল্লাহপাক তাঁর ডাকের সাড়া দেন এবং ঐ বান্দার ক্বলবে সেরাতুল মুস্তাকিম কায়েম হয়ে যায়। এই অবস্থায় দুই আকৃতিই এক দৃষ্ট হয় তথা ওয়াজেব এমকান এক হয়ে যায় এবং প্রকাশ পায় অজহুল্লাহ। সেই আমিকে এই আমিতে দৃষ্ট হয় তথা আমিকে ফিরে পেলাম তথা তাতে ঈদ পূর্ণমিলন হলো।
জ্ঞানীগণ চিনে নিলো এইতো আমার আল্লাহ। জ্ঞানীগণ আল্লাহকে চিহ্নিত করে তথা শনাক্ত করে শবে মেরাজ আদায় করে নিলেন আর এটাও বুঝে নিলেন যে, বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে এক আল্লাহ ছাড়া আর কিছু নেই। জাত জুলমাত বেমেছাল তথা তনজিয়া এখানে তিনি বিমূর্ত। বিমূর্তের মূর্ত তথা তসবিয়া সিফাতে তিনি দৃশ্যমান, এখানে তাঁর ছুরত আছে, তিনি মূর্তমান হয় আছেন।
দিব্যদৃষ্টি যাদের আছে তারাই সেই রূপ চিনেন এবং দেখেন। কোরানে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুহাম্মদ, আমার বান্দারা জিজ্ঞেস করবে আল্লাহ কোথায়? আপনি বলে দেন, তিনি নিকটেই আছেন।’ তিনি এতো নিকটে যে, তাঁর অস্তিত্ব ছাড়া আর কিছু দৃশ্যমান নেই। অস্তিত্বের প্রকাশের তীব্রতার আড়ালে তিনি অবস্থান করছেন।
মানবীয় দৃষ্টির বাহিরে তাঁর অবস্থান, অথচ এক সাথেই একাকার হয়েই তিনি অবস্থান করছেন। এজন্যই বলা হচ্ছে, লা তুদরিকুল আবছারু। কিন্তু আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানে জ্ঞানীগণ তাকে চিনেন এবং দেখেন। কারণ তিনি বলেছেন, ফালানাকুচ্ছানা বেইলমিউ, ওয়ামা কুননা গায়িবিন। অর্থাৎ আমি জ্ঞান সহ প্রমাণ করবো যে, আমি অদৃশ্য ছিলাম না। সুরা হাদীদের ৩ নাম্বার আয়াতে আল্লাহর চারটি আকছাম তুলে ধরা হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো হুয়ায জাহিরু। আ কালামগুলোর ভেদ রহস্য আছে আল্লাহ প্রদত্ত ইলেমের ভিতর, আর আল্লাহ নিজেই হলেন আলীমুন। এদিকে লক্ষ্য করেই কোরানে বলা হচ্ছে, আল্লাহ যাকে জ্ঞান দান করেন সেই জ্ঞান পায়, যাকে জ্ঞান দান করেন না, সে জ্ঞান পায় না। এ জ্ঞান অবশ্যই জাহিরী বিদ্যা বা ইলমুল কালাম তথা ইলমুল লেছানী নয় তথা মানবীয় এলেম নয়। কাজেই যারা বলছে, আমরা জ্ঞান দান করি, এমনটা বলা ঠিক নয়। কারণ, একমাত্র আল্লাহই জ্ঞান দান করেন তথা কোরান শিক্ষা দেন। দেখুন সুরা রহমান। আল্লাহই রহমান হয়ে কোরান শিক্ষা দেন বলে জানিয়েছেন। যেমন, আর রহমান অর্থাৎ তিনিই রহমান। আল্লামাল কোরান অর্থাৎ তিনি শিক্ষা দেন কোরান।
‘কোরান শিক্ষা দেন’ এ কথার মর্মার্থ হলো নিজেকে চেনার জ্ঞান দান করেন তথা রবকে চেনার শিক্ষা দেন। যা কোরান তথা আল্লাহর কালাম ইনছান সৃষ্টি করে তথা ইনছানিয়াত প্রতিষ্ঠিত করে। তাই বলা হচ্ছে, খালাকাল ইনছান। এই ইনছানের ছুরতই হলো আল্লাহর আমানত। আল্লাহর কালাম ছাড়া এই আমানত রক্ষা করা যায় না। আর আমানত রক্ষা না করলে তথা হেফাজত না করলে আসফালাস সাফেলিন হবে এবং তাতে বারবার চামড়া পরিবর্তন হবে তথা ছুরত বদল হয়ে যাবে। যেমন, বলা হচ্ছে, লাওয়াহাতুল্লিল বাশার অর্থাৎ বাশারের পরিবর্তন ঘটবে। এই জন্য বিশ্বাস এবং আদবের মাধ্যমে রহমানের কালাম মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করতে হবে এবং সেই মোতাবেক জীবন গড়তে হবে তথা আমানত হেফাজত করতে হবে।
ঈমানদারগণ রহমান আল্লাহর কালাম শ্রবণ করতে পারেন। এই কালাম শ্রবণে ইনছানে পরিণত হচ্ছেন। প্রচলিত মাদ্রাসার ইলেম তাহা নয় এবং এই কালাম আল্লাহর শ্রবণযোগ্য কালাম নয়। আল্লাহর কালাম শ্রবণের মধ্যেই ঐ কালামের ভেদ রহস্য লুকিয়ে রয়েছ। এই কালাম শ্রবণে দিব্যদৃষ্টি খুলে যাবে তাতে আল্লাহকে চেনা যাবে। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেহই জ্ঞান দান করতে পারেন না। আর আল্লাহপাক যাকে খুশি জ্ঞান দান করেন। কাজেই মাদ্রাসায় ধর্মজ্ঞান দান করা হয়, একথা কুফরী। আর আলেম সমাজ যাকে শরীয়তের ইলেম বলে দাবী করছে, তা আসল নয়। ইহা ধর্মজ্ঞানের রূপক প্রতীক তথা মুতাশাবেহাত বা জাহিরী ইলেম- যাকে কালাম শাস্ত্র বলে। ধর্মজ্ঞান হলো আত্মার জ্ঞান যা রূপকের আড়ালে রয়েছে। রূপকের ভেদ উন্মোচন হলে তবে মিলে ধর্মজ্ঞান। জাহিরী ইলেম যেহেতু রূপক, কাজেই রূপকের আবরণ উন্মোচন হলেই দেখা যাবে শরীয়তি ইলেমের বিপরীত হলো ধর্মজ্ঞান, যা রূপকের আড়ালে রয়েছে।
বোখারীর ১২২ নম্বর হাদিস হতে জানা যায়, হযরত আবু হোরায়রা (রা) বলছেন, আমি রাসুল (সা) হতে দুটি ইলেমের পাত্র লাভ করেছি। তার মধ্যে একটি তোমরা সবাই জানো, অপরটি আমি যদি তোমাদেরকে বলি, তবে তোমরা আমার কন্ঠনালী কেটে ফেলবে। এ জন্যই বলা যায় মাদ্রাসায় যা শিক্ষা দেয় হচ্ছে তা তাশাবাহা বা রূপক। কাজেই রূপক ধর্মজ্ঞান নয়, রয়েছে রূপকের আড়ালে। সুতরাং যাকে বলা হচ্ছে শরীয়তি ইলেম তা এক প্রকার পাগলামী বৈ আর কিছু নয়। আলেম-মোল্লারা কোরান বা ধর্মজ্ঞান শিক্ষা দিচ্ছে তাহা বলা মাত্রই ঠিক নয়। কারণ, আল্লাহ ছাড়া কেউ কোরান বা ধর্মজ্ঞান দান করতে পারে না। সুরা রহমান ই তার প্রমাণ। মাদ্রাসায় শিক্ষা দেয়া হয় ভাষাজ্ঞান, যা ইলমুন কালাম বা কালাম শাস্ত্র। এ বিদ্যা দিয়ে আরবী ভাষার কোরান পড়া যায়, তার আক্ষরিক বিদ্যা শিক্ষা করা যায় তথা রূপক-কাঠামো শিক্ষা করা যায় কিন্তু কোরানের জ্ঞান লাভ করা মোটেও সম্ভব হয় না।
মাদ্রাসার বিদ্যা হলো মোতাশাবেহাত, এর আড়ালে যে চরম সত্য জ্ঞান মুহকামাত রয়েছে তাই হলো কোরান জ্ঞান, যা অর্জন করা প্রত্যেকের জন ফরজ। মাদ্রাসার বিদ্যা দ্বারা শত-সহস্র মতভেদ সৃষ্টি হয়। কারণ, কোরানের জ্ঞান রয়েছে রূপক-প্রতীকের আড়ালে, আর তাশাবাহা (রূপক-প্রতীক) হলো দ্ব্যার্থক, যা বহুমুখী, যা ইলমুল কালামের বিপরীত। আল্লাহপাক যে কোরান শিক্ষা দেন তা হলো ‘ফি কিতাবিম মাকনুন’ তথা যা আছে গোপন গ্রন্থের মধ্যে। সেই কিতাব যাতে রয়েছে রবের রব তথা আরবী কোরান। এ আরবী কোরান আসমান হতে নাযিল হচ্ছে। আল্লাহ শিক্ষা দেন আরবী কোরান। শিক্ষা দেন মানে নিজেকে চিনিয়ে দেন।
কারণ, নিজেকে চিনলেই রব আল্লাহকে চেনা যায়। আল্লাহকে চিনে তাঁর পাক জাতে বাস করাই হলো মানুষের সাধনা বা ইবাদত । কারণ, জিন ইনছানের ইবাদত হলো নিজেকে চেনা। কোরানের লি ইয়াবুদুন কথাটি লি ইয়ারেফুন শব্দ হতে এসেছে। লি ইয়ারেফুন কথাটির অর্থ হলো নিজেকে চেনা। নিজেকে চেনা মানেই হলো আল্লাহকে চেনা। কাজেই আর রহমান অর্থাৎ তিনি রহমান। আল্লামান কোরআন মানে তিনি শিক্ষা দেন (চিনিয়ে দেন) কোরান। খালাকাল ইনছান বা ইনছান সৃষ্টি করেন। মানব মনের হায়ানিয়াত রূপান্তর করে ইনছানিয়াতের ভেতর কায়েম করেন আর তখনই ইনছান সৃষ্টি হয়। ইনছানই আল্লাহকে চিনে এবং আল্লাহর পাক জাতে বাস করে তথা নিজেই আল্লাহ হয়ে যায় তথা আনাল হকে স্থিত হন।
হাদিসে এহসানে বলা হচ্ছে, তোমরা এমন ভাবে ইবাদত করো যেনো আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছো। আর যদি আল্লাহকে দেখতে না পাও তবে মনে করো আল্লাহই তোমাদেরকে দেখেন। এই হাদিস হতে জানা যায়, দুই শ্রেণীর উপাসক বর্তমান। এক শ্রেণীর উপাসক আল্লাহকে চিনেন এবং দেখেন। এরা রাসুলের প্রথম নির্দেশের ভেতর আছেন মানে এরা জ্ঞানী সম্প্রদায়। তাদের জন্য বলা হচ্ছে ‘লা ছালাতা ইল্লা বে হুজুরিল ক্বালব’ অর্থাৎ ছালাত নেই আল্লাহকে হাজির নাজির দেখা ব্যাতিত। এরা সংখ্যায় খুবই কম । আর দ্বিতীয় শ্রেণীর উপাসক বা ইবাদতকারী হলো তারা আল্লাহকে দেখে না, তবে আল্লাহই তাদের দেখেন, এই বিশ্বাসে পড়ে আছে। এরা সাধারণ শ্রেণীর মানুষ। এরা অন্ধ-মূর্খ। এই শ্রেণীর উপাসকদের মধ্যে দুটি ধারা।
বৃহৎ দলটি গোঁড়া জঙ্গি-মৌলবাদী। এরাই ধর্মের নামে যতো অন্যায়-অত্যাচার, জোর-জুলুম, মানুষ হত্যা ইত্যাদি করে যাচ্ছে। এই দলটি সর্ব ধর্মের আড়ালেই বাস করছে। এমন কোনো জঘণ্য কাজ নেই যা তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে করছে না। তাদের কোনো ধর্ম নেই- এরা ধর্মের হিজাব পড়ে আছে তথা ধর্মের ছদ্মাবরণে বাস করছে। পৃথিবীতে যতো মানুষ মারা গেছে তার অর্ধেকই মারা গেছে ধর্ম নিয়ে দ্বন্দ্ব বিভেদের কারণে। এরা বাস করছে হায়ানিয়াতের ভিতর। পৃথীবি ধ্বংস হবে বনের পশুদের দ্বারা অবশ্যই নয়, ধ্বংস হবে মানব নামক জীবের মনের মধ্যে বাস করা পশুদের দ্বারা। বনের পশুদের আকার আকৃতির সীমা আছে কিন্তু মানব মনে বাস করা পশুদের আকার আকৃতির কোনো সীমা এবং সংখ্যা নেই। এ মানবরূপে বাস করা নরপশুদের দ্বারাই মানব সভ্যতা ধ্বংস হবে। তাদের কোনো ধর্ম নেই পশুত্ব ছাড়া।
প্রবন্ধ – শান এ মাওলা আলী (আ.)
লেখক – শাহ মোখলেসুর রহমান
“রাসুলে পাকপর ভেজ আয় খোদা, দরুদ ও সালাম, আলী ও ফাতেমা হাসান হোসাইন পারভী মোদাম”
মানব ইতিহাসে, বিশেষ করে ইসলামের মহত্তম সন্তানদের মধ্যে আমিরুল মুমেনিন হযরত আলী (কঃ) নিঃসন্দেহে স্বরণীয় ব্যক্তিত্ব। মহানবীর (সঃ) এর নৈকট্য তাঁর মত আর কেউ লাভ করার সুযোগ পায়নি। তার জীবন ধারা এক আদর্শিক ভিওির উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নানাবিধ বিপত্তির মধ্যেও তিনি সেই আদর্শকে সমুজ্জল করেন। তাঁর অসীম জ্ঞান ও আকর্ষনীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট তাকে সাধারন মানুষের কাছে অত্যন্ত আপনজন হিসাবে পরিচিত করে তোলে। তিনি ছিলেন অসীম সাহসী, আলাপ আলোচনায় অত্যন্ত বিজ্ঞ এবং পরমসহিষ্ণু।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রতি তাঁর অবিচল ভক্তি ও আস্থা এবং তাঁর নির্দেশ পালনে দৃঢ়চিত্ততার তুলনা নেই। আরবী ভাষায় আমীরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ) এর অসাধারন বুৎপত্তি ছিলো এবং তার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর লিখিত পত্র ও বক্তৃতার মধ্যে। তিনি ছিলেন অসাধারন বীর ও মহানবীর বিশ্বস্ত সাহাবী, ন্যায়পরায়ণ খলিফা, সর্বোপরি একজন মহান জ্ঞান সাধক।
আমীরুল মুমিনিন মাওলা আলী (আ) আরবের কুরাইশ গোত্রের অন্যতম শাখা হাশিমী বংশে মহানবী (সাঃ) এর নবুয়্যত প্রাপ্তির ১০ বছর পূর্বে রজব মাসের ১৩ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম আবু তালিব এবং মাতার নাম ফাতিমা বিনতে আসাদ। পৃথিবীতে তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি পবিত্র কাবা ঘরের অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণ করেন। জননী স্বীয় পিতার নামানুসারে পুত্রের নাম রাখেন আসাদ, যার অর্থ সিংহ। পাঁচ বছর বয়স থেকেই হযরত আলী (আ) আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও মহীয়সী নারী বিবি খাদিজার নিকট লালিত পালিত হন। তাই তাঁর মন মানসিকতা প্রিয় নবীর পবিত্র হাতের পরশেই বিকশিত হয়েছে। রাসুল (সা) উদার হস্তেই তাকে ভবিষ্যত মানব জাতির জন্য গড়ে তুলেছেন। বদর যুদ্ধের পর মহানবী (সা) এর প্রিয় কন্যা বিবি ফাতিমা (আ) এর সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
শিক্ষা নিয়েছেন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষকের নিকট থেকে, সংকলন করেছেন পবিত্র কোরান। বিজয় এনেছেন ইসলামের প্রতিটি যুদ্ধে, রচনা করেছেন হুদাইবিয়ার সন্ধি। তিনি খেতাব পেয়েছেন আল্লাহর তরবারি, ধ্বংস করেছেন কাবার সমস্ত মুর্তি। জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন নবীর হিজরতে, প্রনয়ণ করেছেন হিজরী কামারী সনের। মহান আল্লাহপাক তার কার্যক্রমে সন্তুষ্ট হয়ে পবিত্র কালাম পাকে আয়াত নাযিল করেছেন। নবী কারীম (সা) তাকে ভালোবেসে উম্মতের যোগ্য কান্ডারী ও ওয়াজির হিসেবে প্রকাশ করেছেন অসংখ্য হাদীস, যা বোখারী থেকে শুরু করে প্রতিটি হাদীস গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে।
তৃতীয় খলিফা ওসমান (রা) নির্মম ভাবে হত্যা হওয়ার ৬ দিন পর আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ) খলিফার সম্মানিত পদ গ্রহণ করেন। তাঁর খেলাফতকাল মাত্র ৪ বৎসর ৯ মাসের মধ্যে হযরত ওসমান হত্যার বিচার ও শাস্তির দাবী, নানা বিক্ষোভ, বিশৃঙ্খলা, অশান্তির মধ্যেও উষ্টের যুদ্ধ ও ভয়াবহ সিফফিনের যুদ্ধ মোকাবিলা ছাড়াও তাকে খারিজিদের দমনে তৎপর হতে হয়। এসব প্রতিকূল অবস্থা সত্বেও ইসলামের বিধান অনুযায়ী একটা শান্তিপূর্ণ সমাজ ব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, তার গৃহিত ব্যাবস্থা এখন ও আদর্শ হিসেবে স্বীকৃত।
এইসমস্ত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মাঝে এবং সীমাহীন দুঃখ কষ্ট ও দারিদ্রের মাঝেও এত সুন্দর ভাবে রাষ্ট্রকে পরিচালনা করে, তিনি এমন শিক্ষা দান করেন যার মাধ্যমে সবাই সত্যিকারভাবেই সিরাতে রাসুল (সঃ) এবং মারেফতে ইলাহীর পথ দেখতে পান। তাঁর সত্যিকার মারেফত বোঝা আমাদের আয়ত্বের বাইরে। কেননা তিনি নুরে মেশকাতের সত্যিকারের আয়না। পন্ডিত, চিন্তাবিদ, আলেম ওলামায়ে কেরামগণ যত বেশি এই সমুদ্রের গভীরে নিমগ্ন হবেন, তত বেশি আলো আবিষ্কার করতে পারবেন। যাহা মারেফতের এলাহী তৃষ্ণাকারীকে মাধুর্য দান করে।
বর্তমান বিশ্বে আমরা একটি বিপর্যস্ত সময়ের মধ্যে বাস করছি। ন্যায়নীতি পৃথীবিতে ক্রমশ বিলুপ্ত হচ্ছে। মানুষের জীবন ও বিশ্বাসে চলার পথে শিথীলতা ঘটছে, কর্তব্য কর্মে অবহেলা একটি প্রাত্যহিক রীতিতে পরিণত হয়েছে।
সুদুর অতীতে উচ্চারিত আমীরুল মুমেনিন হযরত আলী (ক) এর সাবধানবাণী বর্তমান মুহুর্তে অত্যন্ত প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। বাণী –
“দেশের বিদ্বান ব্যাক্তিগণ লোভী হইলে কে দেশের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করিবে? দেশের নেতৃবৃন্দ ঐর্শ্বযের পিছনে ছুটিলে সাধারণ মানুষ কাহাকে অনুসরণ করিবে? দেশের ব্যাবসায়ীগণ অসাধু হইলে মানুষ কাহাকে বিশ্বাস করিবে? দেশের সৈন্যদল দেখার শোভা হইলে কে দেশ রক্ষা করিবে? দেশের প্রশাসন, বিভাগীয় রাজকর্মচারীগণ এবং দন্ডধারী বিচারকমন্ডলী দায়িত্বহীন হইলে নিপীড়িত জনগনকে কে রক্ষা করিবে?”
আমীরুল মুমেনিন আলী (আ) একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তিনি পরিচিত এক গভীর জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে। সারা বিশ্ব তাঁকে শ্রদ্ধা জানায় সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে। একই সাথে তিনি ছিলেন ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রতীক। মহান আল্লাহর ওপর তার গভীর বিশ্বাস এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর ওপরে তার আস্থা ছিলো প্রবাদতুল্য। বিশ্বনবী তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘আমি জ্ঞানের শহর আর আলী তার দরজা’ , আমি যার মাওলা আলীও তার মাওলা। বিশ্বনবীর এই সফল উক্তি থেকেই মহানুভব আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ) এর অসাধারন জ্ঞানের পরিচয় বহন করে চলেছে যুগ যুগ ধরে।
কুরআনে – লাইলাতুল মাবিত অর্থ্যাৎ রাসুল (সা) এর হিজরতের রাতে আলী (আ) রাসুলের বিছানায় শুয়ে ছিলেন। তাঁর এ মহান ত্যাগের জন্য মহান আল্লাহ তার সম্মানার্থে এ আয়াত নাযিল করেন- ‘মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছেন যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজেকে বিক্রয় করে থাকেন। আল্লাহ তার বান্দাগণের প্রতি দয়ার্দ্র। (সুরা বাকারা-২০৭)’
বোখারী শরীফে বর্ণিত আছে- গাদীরে খুম নামক স্থানে জোহরের নামাজান্তে রাসুলুল্লাহ (সা) আমীরুল মুমিনিন হযরত আলীকে নিজ ডান পার্শ্বে দাড় করাইলেন। তারপর আল্লাহ তায়ালার গুণগান পূর্বক বলিলেন, হে লোক সকল- আমার যেনো ডাক আসিয়া গিয়াছে এবং আমি উহা গ্রহণ করিয়া নিয়াছি। আমি অতি ভারী মহান দুইটি বস্তু তোমাদের নিকট রাখিয়া যাইতেছি। আল্লাহর কিতাব এবং আমার পরিবার পরিজন আমার আহলে বাইয়্যেত। আলী,ফাতেমা, হাসান, হোসেন এরাই আমার আহলে বাইয়্যেত। আমার পরে এই দুই বস্তু সম্পর্কে নীতি অবলম্বনে তোমরা গভীর চিন্তা করিও। এই বস্তুদ্বয় একই সাথে হাউজে কাওসারের কিনারায় আমার নিকট উপস্থিত হইবে।
তারপর নবী বলিলেন, আল্লাহ আমার প্রিয়, আমি সকল মুমিনের প্রিয়। এই কথা বলার পর নবী (সা) আলী (আ) এর হস্ত ধারণ পূর্বক বলিলেন, আমি যাহার প্রিয় হইবো আলীও তাহার প্রিয় হইবে। হে আল্লাহ তুমি প্রিয় বানাও ঐ ব্যাক্তিকে যে আলীকে প্রিয় বানায় এবং শত্রু গণ্য করো ঐ ব্যাক্তিকে যে ব্যাক্তি আলীকে শত্রুকে শত্রু বানায় এবং তুমি ভালোবাসো ঐ ব্যাক্তিকে যে ব্যাক্তি ভালোবাসে আলীকে এবং অসন্তুষ্ট থাকো ঐ ব্যাক্তির প্রতি যে আলীর প্রতি অসন্তষ্ট থাকে এবং সাহায্য করো ঐ ব্যাক্তিকে যে আলীকে সাহায্য করে। (পৃষ্ঠা ৪০৪ বোখারী শরীফ)।
মাওলা আলী সম্পর্কে হাদীস-
১. আমি যার মাওলা আলীও তার মাওলা। (বোখারী)
২. হে আলী তোমার সাথে আমার ঐ রূপ সম্পর্ক যেরূপ সম্পর্ক মুসার সাথে হারুনের। তবে পার্থক্য এতটুকু পার্থক্য যে আমার পরে আর নবী আসবে না। (বোখারী)
৩. আমি জ্ঞানের শহর আর আলী তার দরজা। (মুস্তাদরাকে হাকেম)
৪. আলীকে মহব্বত করা ঈমান, আর আলী (আ) এর সাথে শত্রুতা মুনাফেকি। (মুসলিম ১খন্ড, ৪৮পৃ)
৫. যে আলীকে দোষারোপ করলো সে আমাকে দোষারোপ করলো। আর যে আমাকে দোষারোপ করলো সে খোদাকে দোষারোপ করলো। (বোখারী ২খন্ড,তিরমিযি ৫খন্ড,মুসলিম ২ খন্ড, সুনানে মাজাহ, মুস্তাদরাকে হাকীম ৩খন্ড)
৬. হে আলী তুমি আমার থেকে আমি তোমার থেকে। (বোখারী ২খন্ড,৭৬পৃষ্ঠা)
৭. রাসুল হতে আবুবকর বর্ণনা করছেন, রাসুল (সা) বলেছেন,আমার ও আলীর হাত ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে সমান। (কানযুল উম্মাল ৬ খন্ড,পৃ ১৫৩,হাদিস নং ২৫৩৯)
৮. নবী করিম (সা) বলেছেন,যে কেউ পছন্দ করে আমার মতো জীবন যাপন করতে ও আমার ন্যায় মৃত্যুবরন করতে এবং সেই চিরস্থায়ী বেহেশত যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন, তার অধিবাসী হতে, সে যেনো আমার মৃত্যুর পর আলী ও তার বংশধরদের অভিভাবকত্ব মেনে নেয়। তারা তোমাদেরকে হেদায়েতের দ্বার হতে বহিষ্কার করবে না এবং গোমরাহীর পথে পরিচালিত করবে না। (কানযুল উম্মাল ৬খন্ড,পৃ ১৫৫,মুস্তাদরাক ৩খন্ড,পৃ১২৮)
হযরত আলী এর সন্তানদের মধ্যে সকলের শ্রদ্ধাভাজন যারা ইমাম হাসান, ইমাম হোসাইন, মোহাম্মদ হানাফিয়া, বিবি জয়নব, উম্মে কুলসুম, রুকাইয়া, উম্মে হাসান নাফিসাহ ও সোগরা। হযরত আলী (আ) এর স্বরণীয় ঘটনা সকলের মনে প্রাণে জীবিত রাখার মাধ্যমে আহলে বায়েতের প্রতি ভালোবাসার আহ্বান করছি।
খারিজীদের গোপন ষড়যন্ত্রে আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ) ১৯ রমজান কুফা মসজিদে মেহরাবে ফজরের নামাজরত অবস্থায় গুপ্ত ঘাতক আব্দুর রহমান মুলজামের তলোয়ারের আঘাতে মাথায় মারাত্মক আহত হন। মানব ইতিহাসের এই ব্যক্তিত্ব আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ) পরম করুণাময়ের স্বানিধ্য লাভের জন্য ইহজগতের বন্ধন ছিন্ন করে ৬৩ বছর বয়সে ২১ রমজান ৪০ হিজরী শাহাদাৎ বরণ করেন।
প্রবন্ধ – বিদ্রোহী কবির ভিন্ন রূপ
লেখক – ড. জাকির হোসেন
“আমারি রচিত কাননে বসিয়া, পরানু প্রিয়ারে মালিকা রচিয়া
সে মালা সহসা দেখিনু জাগিয়া, আপনারি গলে দোলে হায়”
কে মালা রচে? কি সে মালা? কাননটি কিসের? মালা কাকে পড়ায়? সহসা জেগে উঠার দরকার কী? জেগে উঠে কী দেখা গেল? কে সে প্রিয়? তার গলে পড়ানো মালা আবার নিজের গলায় দোলছে কেন? হ্যাঁ, সেই ‘আপনের চেয়ে আপন যে জন’ তাকে খুুঁজে বেড়াচ্ছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। যিনি ইউনিভার্সিটির নয়, ইউনিভার্সের ছাত্র। জীবনের বিশ্ববিদ্যালয়- যার সিলেবাসে রয়েছে শুধু আপনাকে জানা, চেনা, রহস্যজ্ঞান উদ্ধার করা, সংস্কার বর্জন করা আর অচেনাকে চেনা। তাই তো তিনি তার আনন্দঘন সুন্দর ‘প্রেমঘন সুন্দর’ কে স্বীয় আত্মদর্শনে উপলব্ধি করে স্বগতোক্তি করতে পারেন “যখন কুড়ি হয়ে ফুটে উঠি, পাতা হয়ে ঢেকে রাখ” । কবি বলেন, “মুক্তির দিগ্দর্শন হলো আপন অস্তিত্ব বা দেহমন নামক অস্তিত্বকে সমর্পণ করা”। সে মুক্তি কোনো বৈষয়িক, সামাজিক, অর্থনৈতিক শোষন থেকে মুক্তি নয়- এ মুক্তি মহানন্দের-মুক্তি, পরম পাওয়ার মুক্তি। তার জন্য প্রয়োজন রিপু- ইন্দ্রিয় হীন অবস্থা সৃষ্টি। আর সে অবস্থা সৃষ্টি হলে চিরচাওয়া, পরম আরাধ্য মহান সত্ত্বা হবে নিত্যসঙ্গী।
মনুষ্যত্বের ও মানবতার মহান সৈনিক নজরুলের মতে কাফের মানে হলো আবরণ যা আবৃত করে রাখে বা ঢেকে রাখে। “আমার মধ্যে যতক্ষণ আবরণ অর্থ্যাৎ ভেদাভেদ জ্ঞান, সংস্কার, কোনো প্রকার বাধা-বন্ধন আছে ততক্ষন আমার মাঝে কুফরও আছে। আমি সর্ববন্ধনমুক্ত, সর্বসংস্কার মুক্ত, সর্বভেদাভেদজ্ঞান মুক্ত না হলে সেই পরম নিবারণ, পরম মুক্ত আল্লাহকে পাব না আমার শক্তিতে। নিছক শাস্ত্র না ঘেটে, শুধুই ধর্মগ্রন্থের বেড়াজালে আটকে না থেকে প্রেম ও ধ্যানের সহৃদয় কার্যকরি পথচলাই অধরা কে ধরার সুযোগ করে দিতে পারে- দিতে পারে সেই সদানন্দ জ্যোর্তিময়ের প্রেমময় সান্নিধ্য এনে দিতে।
“খোদার প্রেমের শরাব পিয়ে, বেহুঁশ হয়ে রই পড়ে
ছেড়ে মসজিদ আমার মুর্শিদ এল যে এই পথ ধরে।”
ধ্যান, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দ্বারা কাজী নজরুল ইসলাম অধ্যাত্মবাদ, সুফী, মরমী ও বাউল সম্প্রদায়ের আত্মার উদার জমিনে পরিভ্রমন করেছেন স্বচ্ছন্দে। তিনি ছিলেন ধর্মীয় দর্শন সমুহের এক মহান পর্যবেক্ষক এবং তাঁর ছিল ঋষির আত্মা। ভক্তকুলের জন্য, অসুর সংহারের জন্য, ইনসাফ কায়েমের জন্য, সৃষ্টিকে অসত্য থেকে সত্যে রূপ দেয়ার জন্য, কল্যাণময় স্রষ্টার প্রতিনিধি হিসেবে যারাই এ ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছেন নজরুল কোনো বাছবিচার ছাড়াই তাদের সকলের জয়গান গেয়েছেন। আত্মা বা মর্মের সঙ্গে যার সংযোগ, সেটাই মরমী। পরম সত্ত্বার সঙ্গে যার মর্ম বা অন্তঃকরণ সর্বক্ষণিক সংযুক্ত তিনিই মরমী। স্রষ্টার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংযোগ স্থাপনে সক্ষম ব্যক্তিকেও মরমী বলা হয়। আমাদের বিদ্রোহী কবি কী নিজেও মরমী ছিলেন? তাকেই উদ্ধৃত করা যাক-
“মম একা ঘরে নাথ দেখেছিনু, তোমাহীন দীবালোক হীন করি
হেরি বাহির আলোকে অনন্তলোকে এ কী রুপ তব মরি মরি।”
অথবা,
“প্রানের: মতন আত্মার সম
আমাতে আছ হে অন্তরতম
মন্দির রচি, বিগ্রহ গড়ি
দেখে তুমি হাস স্বামী।”
আমাদের বিদ্রোহী কবি বিশ্বের নকল ধর্মগ্রন্থ, অবতার, মানব মনের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করেছেন দেহ-মন নামক অস্তিত্ব দিয়ে, আদি রহস্য দর্শন করে, সমর্পণ করা জন্য আল্লাহ-মোহাম্মদ-আদম সৃষ্টির মৌলিক রহস্যের পর্দা উন্মোচনের প্রয়াস পেয়েছেন:
“সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে খুলে যায়
সে যে আমার কামলিওয়ালা, কামলিওয়ালা”।
কোনো মরমী, বাউল, সুফী ও বৈষ্ণব-সাধক কোনো মানুষকে সাম্প্রদায়িক ভাবে চিহ্নিত করেন না-পরমত অসহিষ্ণু হন না- তারা জ্ঞানচক্ষু, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তরচক্ষু দিয়ে আপনাকে মৌলিক সত্ত্বার সঙ্গে সংযোগ সৃষ্টি করার জন্য সার্বক্ষণিক ভাবে অস্থির থাকেন। ধর্মব্যাবসায়ীদের আচার সর্বস্ব লোক দেখানোর আনুষ্ঠানিকতা তাদের আর আকর্ষণ করে না। নজরুলের মতে “বুড়ো নীতিবিদ-শাস্ত্র শকুন, জ্ঞান মজুরের দল- অজ্ঞানতা, সম্প্রদায়িকতা, অসাম্য ও ভেদজ্ঞানে বন্দি খাচার পাখি কিচির মিচির শব্দ, গৃহকর্তার শেখানো বুলি ছাড়া পাখি কিছুই শিখলো না, আল্লাহকে জন্মে চিনলো না, পাখি খাচা হতে মুক্ত হলেও শেখানো বুলির অতিরিক্ত কিছু জানা সম্ভব হয় না”।
“জোব্বা জাব্বা দিয়ে ধোকা
দিবি আল্লাহরে ওরে বোকা,
কেয়ামতে হবে মাথা নিচু”।
অথবা:
এ দুনিয়া পাঠশালা
ধর্ম গাধার পৃষ্ঠে এখানে শূন্য পূন্য ছালা!
হেথা সবে সম পাপী
আপন পাপের বাটখারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি”।
নজরুলের মতে এ দেহ মনের মধ্যে সদা বিরাজমান অনন্য সত্ত্বা কে জাগাতে হলে তাকে সত্য দিয়ে আঘাত করতে হবে। “পাথরেতে অগ্নি থাকে,বের করতে হয় ঠুকনি ঠুকে”। সেজন্য ঢাকঢোল পিটিয়ে মহাআড়ম্বরে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের চেয়ে নিজের নিভৃত অন্তর্দেশেই পরম সুন্দরের সন্ধান করা শ্রেয়।
“এই তোর মন্দির মসজিদ
এই তোর কাশী বৃন্দাবন,
আপনার পানে ফিরে চল
কোথা তুই তীর্থে যাবি মন”।
মানুষ যেন অন্নবস্ত্রহীন, পরাধীন না থাকে সেজন্যে প্রার্থনা, সাধ, সাধনা ছিলো নজরুলের। পাশাপাশি বিদ্রোহী কবির সাধনা ছিলো অরূপ দর্শনের। “মানুষ দেখার কৌতুহল আমার নেই, স্রষ্টা দেখার সাধনা আমার। সুন্দরকে দেখার তপস্যা আমার। তোমার প্রকাশ দেখতে চাই আমি, তোমায় দেখতে চাইনি। সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে যে দেখেছে, সেই বড় দেখা দেখেছে। এই দেখা আর্টিষ্টের দেখা, ধ্যানীর দেখা, তপস্বীর দেখা। আমার সাধনা অরূপের সাধনা।
“এসে শয়তান ভোগ বিলাসের
কাড়িয়া লইয়াছে ঈমান তাদের
খোদারে হারায়ে মুসলিম আজ হয়েছে সর্বহারা”।
আল্লাহ, মোহাম্মদ (সা) আল কোরআন, বেদ, গীতা, পুরান, ত্রিপিটক ও বাইবেলের সারমর্ম ও সারকথা উদ্ধার করে পরমেয়র জয়গানে বিদ্রোহী কবি ছিলেন মুখরিত। গুরুবাদী ধর্মীয় দর্শন ও তাদের চিন্তাচেতনায় মৌলিকতত্ব তথা সমাজ, রাষ্ট্র,মানুষ ও ধর্মীয় সকল পবিত্র গ্রন্থ ও অবতারদের রহস্য উদ্ধার করে পশুত্ব ও অশুভ শক্তিকে বর্জন করে কিভাবে আদর্শ, ধারাগত মুক্তির স্পৃহা জাগ্রত করা যায় সেটাই ছিলো তার লক্ষ্য। তাঁর ‘পথ হারার পথ’ আল্লাহত্ব অর্জনের এক দিক নির্দেশক।
অধ্যাত্ম ধর্ম সাধনার মৌলিক বিষয় হলো “মান আরাফা নাফসাহু, ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু’ -নজরুলের ভাষায়-
“কে ভগবান? – আত্মজ্ঞান”
অথবা,
“দেবতারে যারা করিছে সৃজন
সৃজিতে পারে না আপনারে,
আসে না শক্তি,পাষনা আশিস
ব্যর্থ সে পূজা বারেবারে”।
নজরুলের মতে অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসতে হবে, মুক্ত জ্ঞান আর বৈষয়িক জ্ঞানের তুলনা করে অর্জন বর্জনের দ্বারা আপনাকে জানতে হবে।পরমাত্মার রহস্য উদঘাটন করতে হলে দেহমন অবিরাম স্বতঃস্ফূর্ত কিসের অর্চনা করে চলেছে, সেদিকে নজর দিতে হবে। অজ্ঞানতা দুঃখ বৃদ্ধি করে, ভেদজ্ঞান বাড়িয়ে দেয়। বিষয় বাসনাও দুঃখবোধের উপাদান।মুক্তির জন্য মুক্ত জ্ঞানের শক্তি বৃদ্ধি করতে হয়। নজরুল বলেন, আপনারে তুমি চিনিয়াছ যবে, শুধিয়াছ ঋন, টুটেছে ঘুম, অন্ধকারের কুড়িতে ফুটেছে আলোকের শতদল কুসুম।
বিদ্রোহী কবি শ্রদ্ধা করতেন তাঁদের যাঁদের আত্মা জাগ্রত। যাঁরা বাইরের সম্মান লোভ, খ্যাতি সবকিছু বিসর্জন দিয়ে রাহে লিল্লাহ নিজেদের সদ্কা দিতে রাজি, আল গনি আল্লাহতে আত্মনিবেদন করলেই বাদশাহর বাদশা যিনি তার পরম করুণা পাওয়া যায়। এই আত্মনিবেদনের মাধ্যমেই পৌঁছে যাওয়া যায়- ফানাফিল্লাহর স্তরে। আর ফানাফিল্লাহ ও বাকাবিল্লাহ মৌলিকত্বের সঙ্গে এই দেহমন নামক অস্তিত্ব দিয়েই অর্জন ও উপলব্ধি করার রহস্য নজরুল ইসলাম গভীর ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। বাকাবিল্লাহ আল্লাহর সাথে বা আল্লাহর অবস্থার স্থায়ী অবস্থাতে উপনিত হওয়া। বিশেষ এ ধারাতে অনেক সুফী, বাউল, ফকির ও সন্ন্যাস জীবনের সাধন- ভজনের দর্শন অগনিত। হযরত মোহাম্মদ (সা) নবুয়ত ও বেলায়েতের দর্শন হেরা গুহা থেকেই প্রকাশ পেয়েছিলো। এর মুল গ্রন্থ হলো দেহমন নামক অস্তিত্ব। এই বেলায়েতের ধারকদের এক সফল উত্তর পুরুষ কাজী নজরুল ইসলাম- যিনি তার বন্ধন মুক্তির ঘোষণা দেন এভাবে “ আমি সহসা চিনেছি আমারে আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাধ”।
আজন্ম আকাঙ্খিত, চির চাওয়া সেই পরম প্রিয়তমের দর্শন বা সান্নিধ্য লাভে কাতর বিদ্রোহী কবির কন্ঠে এ কী শুনি –
“ তোমার না দেখা পরম প্রিয়তম পরম বন্ধুকে পেতে, বিপুল অসহ তৃষ্ণা, স্বপ্ন, সাধ, কল্পনা, বাধ না মানা, বেগসহ অসীমের পানে প্রবল প্রবাহ নিয়ে উজান গতিতে উর্দ্ধের পানে চলেছিলে, আজ সেই পরম পূর্ণতার, পরম শান্তি ও পরম মুক্তির আনন্দবাণী নিয়ে আমি তোমার কাছে এসেছি তোমার বন্ধু হয়ে। এই পৃথিবীতেই তার সঙ্গে তোমার অপরুপ পূর্ণ মিলন হবে। তার আগে তোমাকে এই অসুন্দর পৃথিবীকে সুন্দর করতে, সর্ব অসাম্য, ভেদকে দুর করতে হবে। মানুষ যে তার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ, পৃথিবীতে তা তোমাকে প্রমাণ করতে হবে, তোমার সুন্দরের সাথে পরম বিলাস, পরম বিহার”।
জ্যোর্তিময় সেই সুন্দরের সাথে পরম বিলাস আর পরম বিহার রত বিদ্রোহী কবির মত স্রষ্টার প্রেমের অমৃত সুধা আকন্ঠ পান করে তারই আনুগত্য ধন্য হয়ে আমরা কজন বলতে সাহসী হয়েছি-
ঐ নামের দাওন ধরে আছি
আমার কিসের ভয়,
ঐ নামের গুণে পাব আমি
খোদার পরিচয়।
প্রবন্ধ – আমির খোঁজে আমি
লেখক – নূর মেহেদী আব্দুর রহমান
আমি যে আমি’র খোঁজে
আমি ছাড়া আমার দুঃখ আর কে বা বুঝে।
জীবনে তো ঘুরলাম কতো? ঘুরে কোথাও পাইনা যে!
অনাহারে থাকলে আমি ক্ষুধা ক্লিষ্ট হই,
কেমন লাগে আমার তা’কি বুঝবে আর কেহই?
আমার সবই আমি বা কই? আমি রই আমার মাঝে।
যাহা কিছু দেখি আমি আমার দুই নয়নে,
একবার দেখলে তাহার ছবি ভাসে হৃদয় মনে!
কেনো ভুলে যাই দর্পনে, দেখিয়াও নিজকে নিজে।
খুশি আর আনন্দে কভু হাসি পায় বদনে,
দুঃখ ব্যাথা পাইলে কভু জল ঝড়ে নয়নে,
আমি’র খোজে রহমানে, বেড়াইলো বাউল সেজে।
চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক ইন্দ্রিয়াদি আর এই দেহ ভূবনে সকলি আমার। আমি কোন জন? নাহি মিলে সন্ধান তার। আমারই ইচ্ছাতে পরিচালিত হস্তপদ আঙ্গুলী সকল- সবই ইচ্ছাতে আমার। আমি খাই, আমি ঘুমাই, করি কত কাজ, সবই তো ইচ্ছাতে আমার। আমি কোন জন- তার নাহি মিলে শুমার। আমি আশরাফুল মাখলুকাত। আমাতে নিহিত আব, আতশ, খাক, বাদ একটি জাতের চার এতবার- তা লইয়া পাঁচ জাত। আর সাত সেফাত। যাহা অগ্নি নয়, নহে পানি, মাটি, বাতাস। গুণাগুণ সাতটি তার। এমনি কতই বেশুমার।
হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (র) জিজ্ঞাসিত হলো, হুজুর! লৌহ মাহফুজ কি? বলিলেন ‘আমি’। প্রশ্ন হলো, আরশ কুরসি কি? উত্তর ‘আমি’। চন্দ্র সূর্য কি? উত্তর ‘আমি’। তাহলে ঈসা, মুসা, দাউদ? উহাও ‘আমি’। প্রশ্নকারীগণ বলিল- হুজুর, কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। বায়েজিদ বোস্তামী বললেন, ‘যখন কোনো মানুষ হক তায়ালার মধ্যে লয় হইয়া যায়, তখন সব কিছুই হক তা’য়ালা হইয়া যায়’।
গোস্তে মনসুরে আনাল হক গাস্তে পোস্ত
গোফতে ফিরাউনে আনাল হক গাস্তে হাস্ত।
মনুসর বললো ‘আমি খোদা’ মিশিল সে আল্লাহর জাতে, ফেরাউন বললো আমি খোদা, সে পতিত জাহান্নামে।
মানতু শুদাম তুমান শুদি, মানতু শুদাম তু জাশুদি,
আকশ কেনা গোয়েদ আজি মান দিগর তু দি গরী।
হে খোদা, তুমি তোমার আপন কুদরতে চেয়ে দেখো, আমি আর আমি নাই, আমি তুমি হইয়া গেছি। আর তুমি আমি হইয়া গেছো।
আর ফেরাউনের আমিত্বে গর্ব, অহংকার, দেমাগ। বড়াই ক্ষমতার দাপটে তার নীজের আমিত্ব।
বুদ্ধদেব বলিলেন,
কা তব কান্তা কান্তেপুত্র, সংসার হয়ম তব বিচিত্র, কসৎ তং বা কুত আয়াত, তত্বং চিন্তনং তদিদং ভ্রত।
কে তুমি? কে তোমার পুত্র পরিবার? কোথা হইতে আসিল? এ সংসার অতি বিচিত্র। হে ভাই, নিগুঢ় তত্ব বিশ্লেষন করো।
আত্মনং বৃদ্ধি, ভূমৈব, স্ততব্য সিতিব্য নাল্পে সুখ মস্তি।
আত্মাকে চিনো, তোমাকে জানো, অল্পে সুখ নাই।
গীতা বলছেন,
নৈনং ছিন্দন্তি সন্ত্রামী নৈনং দহাতি পাবক নচেনং ক্লেদয়ন তাপনে শোধয়াতি মারুত।
অস্ত্র নারে করিবারে আত্মার ছেদন, বহ্নি নাহি পারে তারে করিতে দাহন। সলিলের শক্তি নাই সিক্ত করিবারে, অনলের শক্তি নাই দগ্ধ করে তারে।
অগ্নি যাকে দাহ্য করতে পারে না, সলিল যাকে পারে না সিক্ত করতে, রৌদ্র যাকে নাহি পারে শুকাইতে, বৃষ্টি নাহি পারে তাকে ভিজাইতে- তার মৃত্যু নাই। সে এক অবিনাশী চেতনা। যখন আমাতে সে নাই, তখন আমিও নাই। নাই আমার কোনো অস্বিত্ব। তাহলে আমি কোন? তাই ‘আমি’র খোজে ‘আমি’।
প্রবন্ধ – রুহ ও নফস
লেখক – ফকীর আতিকুর রহমান চিশতী নিজামী
ধর্মে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ “রুহ” ও “নফস”। “রুহ” শব্দটি নিয়ে শরীয়তের মোল্লা, কাজী, মুফতি ও পুস্তক বিদ্যার লোকেরা হৈ চৈ করে না। বিষয়টি সুফীবাদ এর মৌলিক পটভূমি । এখান হতেই ঈমানের বিভিন্ন স্তর ও আধ্যাত্মবাদের যত আলোচনা । উলুহিয়াত-রবুবিয়াত-আবুদিয়াত তিনটি ভরে তৌহিদী ভেদতত্ত্ব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মিল অমিল এখানেই। আত্মদর্শন, তত্ত্বদর্শন নিয়ে এখানে দাড়িয়ে কত বড় বড় লেখালেখি দেখতে পাই ৷
যাহোক, ‘রুহ’ শব্দটির কোন নির্দিষ্ট অনুবাদ হয় না, “নূর” শব্দের মতই মৌলিক শব্দ এটি । কুরআন বলে আল্লাহ্ আসমান যমীনের নূর, অথচ নূর শব্দের অর্থ যত্রতত্র দেখি আলো। তাহলে আল্লাহ আলোতে আছেন অন্ধকারে নাই! আল্লাহর সত্ত্বার জন্য এমন কথা বেমানান । জুলমাত (অজ্ঞতা, অন্ধকার) অপসারনে নূর শব্দটিকে আলো বা চেতনা অনুবাদ করা হয় মাত্র। বরং নূর শব্দটিকে নূর হিসেবে রাখাই যুক্তিযুক্ত। তা আলো অন্ধকারের উৎপত্তিকারক ৷ “নূর” আর “রুহ” শব্দদ্বয়ের যোগসুত্রও গভীর । এ দুটি এক থেকে অন্যে আলাদা নয়। সাধক কঠিন রিয়াজত ধ্যান সাধনা করেই নূরানী অজুদে (জ্যোতির্দেহে) রুহের পরিচিতি পান। রুহের সাধারণ অর্থ করা হয়েছে- “আত্মা”। বর্তমান কালে আরবী অনুবাদে একে সজীব মূলনীতি, প্রাণ, জীবনের শ্বাস-প্রশ্বাস, সার বা নির্যাস, অনুপ্রেরণা ইত্যাদি অর্থে দেখতে পাই।
লক্ষ্য করছি সুফীদের মধ্যে কেউ কেউ ইদানিংকালে দাপটের সাথে লেখছেন, যে- “যারা রুহকে জামাদি (খনিজ জগত), নাবাতি (বৃক্ষ জগত), হায়ানি (পশু জগত), ইনসানি (মনুষ্য জগত) ও কুদসি বা রহমানি (পরম জগত) এ ভাগ করেন, তারা সুফীবাদের কিছুই বুঝেন না” ৷ এ ভাগটি কি বর্তমান কালের কোন সূফীর করা? ‘জগৎবরেণ্য আত্মার বিজ্ঞানীরা এর পরিচিতি তুলে ধরেছেন মাত্র। মহাশুণ্যে ‘বিচরণশীল বিহঙ্গ, উদ্ভিদ, প্রাণী প্রতিটি জাতিই মানুষের মত এক একটি গোত্রভুক্ত, তা ধর্মবিধান বলে দিয়েছে। আজগুবি কথা বলে যাচ্ছেন তারা, সারা বিশ্বে নাকি শুধু নফসের ছড়াছড়ি, এখানে রুহ নাই! অথচ কুরআন বলে- এমন কোন নফস নাই যার উপর একজন সংরক্ষক (হেফাজতকারী) না আছে” [৮৬:৪] ৷ মোদ্দাকথা রুহের শক্তি ছাড়া কোন নিস্তি অস্তিতে আসতে পারে না, কোন দেহ ক্রিয়াশীল হতে পারে না। এক কোষী প্রাণী এ্যামিবা থেকে শুরু করে উন্নত মস্তিষ্কের সর্বত্রই এ রুহের কর্মশক্তির ফলাফল দেখি।
তবে বিশেষ কথাটি হলো জিন আর ইনসান ব্যাতিত অন্যন্য জীবের মস্তিস্ক আত্মপরিচিতি পেতে সক্ষম নয়। জীবজগতকে অনন্ত তৌহিদী ব্যাবস্থাপনায় চলতে হয়, ব্যাক্তি স্বাধীনতা নাই বললেই চলে, তাই তারা সেজদারত আছে। জীবদেহের উপযোগীতার উপর ভিত্তি করে বিশেষ রুহের কর্তৃত্ব রয়েছে। দৃশ্যমান মানুষে জামাদি, নাবাতি, হায়ানি, ইনসানী ও কুদসি পাঁচটি স্তরে রুহের কর্তৃত্ব দেখা যায়। মানুষ পশুর চেয়ে হতবুদ্ধি/খারাপ আচরণ দেখাতে পারে, আবার একটি কুকুর গায়ব (গোপন) অস্ত্র উদ্ধারের জ্ঞানে জ্ঞানী হয়ে উঠছে, তা একটু বুদ্ধি খরচ করলেই বুঝা যায়। আসহাবে কাহাফের কুকুর জান্নাতে যাওয়ার অর্থ কি?
প্রতিটি জীবের চেতনা শক্তির মূলাধার হলো রুহ। রুহ্ মূলত পরোয়ার দেগারের নির্দেশ (আমর), পরমের অখন্ড পরিচিতি । কোন কোন জীব অস্তিত্বে আসবে “কুন বল” সৃষ্টির আদিতেই সেখানে আমানত রাখা হয়েছে। রবের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই কুন বল ক্রিয়াশীল হয়ে কর্মশক্তির মাধ্যমে নফস ও দেহের সংযোগে একটি জীবের উদ্ভব। বাজে আলেম আর ভন্ড পীরের দাপটে ইসলামী চিরন্তন ব্যবস্থাপনা আধুনিক বিজ্ঞানে গ্রহণযোগ্য হতে পারছে না। অথচ বিজ্ঞান প্রাণতত্ত্বের সুক্ষ স্তর জেনেটিক বিদ্যার যে অহংকার করছে তা কুরআন গবেষকদের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।
মন, দেহ, কুলব, রূহ, নফস প্রত্যেকে ক্রিয়াশীল হতে একে অপরের উপর নির্ভরশীল ৷ মনের চিকিৎসক মনোবিজ্ঞানীরা এ মনের পরিচিতি কি পাচ্ছেন? মনের জন্যই উন্নত মস্তিষ্কের জীব মানুষ, এ মনেই মিজান (নিক্তি) স্থাপন করা হয়েছে। বাম পাল্লার নিক্তিটি গায়রুল্লাহ, দুনিল্লাহ্ হতে অজস্র ছবি অংকন করে স্মৃতিতে জমা করছে যা পরকালে একটি দুর্ভাগ্যের কিতাব। ডান পাল্লার নিক্তিটি আত্মপরিচিতি অর্জন করতে একজন গুরুকে গ্রহণ করছে ও জান্নাতের দরজা পার হয়ে অগ্রবর্তীগণের দলে যুক্ত হচ্ছে। রুহুল কুদসির ক্রিয়াকলাপে ঈসা আ. কে আমরা মাটির পাখিতে জীবন সঞ্চার করতে, কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য করতে দেখি। পঁচা, ঠনঠনে কাদাগুলোকে মৈথুন করে গুরু সাঈদান তাইবা বা শুদ্ধ মাটিতে পরিণত করে তাতে রুহ ফুৎকার করে প্রাণ সঞ্চার করেন।
ভব কুষ্ঠব্যাধিতে আক্রান্ত ও চক্ষুহীনদেরকে গুরু আরোগ্যদান করছেন। রুহ দিয়ে প্রাণ সঞ্চার করার মানে তার সুপ্ত রুহকে জাগ্রত করে তোলেন। এখানে গুরু বলতে “আমরা” পরিচয়দানকারী (হিযবুল্লাহ) আল্লাহর দলের সদস্য। সৃষ্টিতে জৈৰ পদার্থে রুহের পরিচিতি সহজ হলেও অজৈব পদার্থে তা জটিল ৷ অথচ জৈব ও অজৈৰ পদার্থের মৌলিক কণাগুলো অভিন্ন, শুধুমাত্র গাঠনিক পার্থক্য ব্যতীত নয়। রুহ দ্বারা সাধারণ অর্থে জীব জগতে প্রাণ সঞ্চার করা হয়।
সৃষ্টিতে কোন জীবে রুহের পরিচিতি পাবার ব্যবস্থা রাখা হয় নাই জিন আর ইনসান ব্যতীত ৷ আমরা কুরআনে প্রাণশক্তি মতবাদে রুহ দ্বারা প্রাণ সঞ্চার, রুহ ফুঁৎকার করা, নিক্ষেপ করা, রুহুল আমিন (বিশ্বস্ত রুহ), রুহুল কুদসি (পবিত্র রুহ), রুহের শক্তিতে রুহ্ ফুঁৎকার ইত্যাদি দেখতে পাই । হাজারো গাছগাছালী, তৃণ লতাগুল্ম এ শক্তির অভাবে কাঠ, খড়কুটো, আবর্জনায় পরিণত হয়। এ প্রাণ, সত্ত্বা, সজীব মূলনীতির অভাবে দেহটি লাশ হয়ে পড়ে থাকে ও পঁচে যায়। দেহটি নিস্পাপ- প্রকৃতিতে বিক্ষিপ্ত হয়, রুহ আল্লাহর সাতটি সিফাত কার্যকর করে পরকালে একটি কিতাবের দিকে নিয়ে যায়, তাহলে মরছে কে?
নফস হিব্রু “নেফেস” (NEFESH) শব্দের সমার্থক । প্রবৃত্তি, আত্মানুভূতি, স্বভাব ইত্যাদি বুঝায় ৷ অপরিশুদ্ধ বস্তবাদী আমিত্ববোধ মানব অস্তিত্বের নিন্মমাত্রা। এখানে নফস আম্মারার তত্বাবধায়ক শয়তান রুহ হায়ানীর পক্ষ হতে মদদপ্রাপ্ত। জীবজগতে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রুহানি কর্তৃত্ব প্রকাশ পায়। অথচ রুহ অবিভাজ্য, শুধুমাত্র কোন সময়ে কোন (নফসের) স্বভাবের উপর তা কার্যকর থাকে সে ভিত্তিতে নামকরণ করা হয়েছে মাত্র। “কুল নাফসি যায়েকাতুল মাওত; ছুম্মা ইলাইনা তুরজাউন” বা “প্রত্যেক নফস মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করে; তারপর আমাদের দিকে ফিরে আসে” [২৯:৫৭] কালামের তাৎপর্য বুঝাও সহজ কাজ নয়। একটিমাত্র নফস থেকে বাকী চারটি নফস প্রসারিত, রুহও তাই । প্রতিটি নফসে রুহ ক্রিয়াশীল ৷
রুহ যখন নফস আম্মারায় বা পশু প্রবৃত্তিতে [১২:৫৩, ৭৯:৪০] কার্যকর হয় তখন তা রুহ হায়ানী নামে পরিচিতি পায়। মুসা আ. এর মত জাদরেল নবীর মাধ্যমে আল্লাহ শিক্ষা দিলেন যে, দুনিয়ায় (আমিত্ব খোয়াড়ে) থাকা অবস্থায় “রবের আরনী”র উত্তর আসে “লান তারানী” ৷ বস্তজগতের সকল মোহ কালিমার ‘তুর’ জ্বালিয়ে দিলেই বস্তজগতে অবচেতন হয়ে আত্মিক চৈতন্যে রবের দীদার হয়। নফস লাওয়াম্মা বা কর্মশীল প্রবৃত্তি বা জাগ্রত বিবেকে [৭৫:২] রুহ নাবাতি, নফস মুলহেমা বা অনুপ্রাণিত বৃত্তি [১৪:৩১] তে রুহ জামাদি, নফস মুতমাইন্না বা মানব প্রবৃত্তি (৮৯:২৭) তে রুহ ইনসানি, নফস সাফিয়্যা/নফস ওয়াহেদ/রহমান [৪:১, ৫৫:১] তে রুহু কুদসি কার্য পরিচালনা করেন। আল্লাহর নফস নিয়ে কুরআন বলে ঈসার ভাষায়ঃ “তা’লামু মাফী নাফসী ওয়ালা আ’লামু মাফী নাফসীকা; ইন্নাকা আনতা আল্লামূল শুযুব” অর্থঃ “আমার নফস সম্পর্কে তুমি অবগত আছ কিন্তু আমি তোমার নফস সম্পর্কে অবগত নই। নিশ্চয় তুমি গায়ব সম্পর্কে অবগত ।”
অবশ্য অধিকাংশ অনুবাদে নফস, কলব, রুহ অনুবাদে অন্তর/আত্মা ইত্যাদি করা হয়েছে। নফসে রহমানী/ওয়াহেদ হতে অন্যান্য নফস প্রকাশিত হয় বলে সকল নফসের গায়ব এ নফসটির জানা, সৃষ্টির বলয়ে থাকা কোন নফস, ওয়াহেদ নফসের স্বরূপ বুঝতে সক্ষম হয় না। রুহ কুদসি বিভিন্ন নফসে ক্রিয়াশীল হয়ে যে অন্যান্য রুহের উপস্থিতি প্রমাণ করে তা মূলত এক একটি নফসের উপর কর্তা বা নিয়ন্ত্রক মাত্র ৷ পরিশুদ্ধ মানব ব্যতীত পরিশুদ্ধ রুহটি (রুহ কুদসি) জীব জগতের কোথাও পরিচিত নাই। রুহের কর্তৃত্ব ব্যতীত কোন নিস্তি অস্তিতে আসে লা, শুধুমাত্র নফসের ক্রিয়াশীল হওয়ার কোন ব্যবস্থাপত্র আল্লাহর বিধানে (কিতাবে) নাই।
উচ্চ স্তরে দাস (আবদু) সিদ্ধি লাভ করলে আল্লাহ্ নিজেই নফসের হেফাযতকারী হয়ে যান। সকল নফস মৃত্যুর আস্বাদন করবে, নফস মোতমাইন্নাকে দাসদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে জানাতে প্রবেশ করার আহ্বান করা হয়েছে (৮৯:২৭-৩০]। নফসের উপরে অত্যাচারী তার নফসকে ধ্বংসযজ্ঞ নামিয়ে নিয়ে এসেছে ফলে নিম্ন শ্রেণীর নফসে উথ্থিত করে বলা হবে “তোমাদের অত্যাচার তোমরা আস্বাদন কর [৫১:১৪]। পশুজগতের চেয়েও নিকৃষ্ট হতে পারে দৃশ্যমান মানুষ৷ “ইন্না শাররাদ দাওয়া ইন্দাল্লাহিল কাফারু ফাছুম লা ইউমিনুন ৷” অর্থঃ “নিশ্চয় আল্লাহর নিকট মন্দ পণ্ড যারা কাফের, যেহেতু তারা ঈমানের কাজ করে না।” [৮:৫৫]
রুহের অবস্থান সর্বত্র থাকলেও শুধুমাত্র পরিচিতিটির অভাবে রুহকে অস্বীকার করা হয়। রুহ ফুৎকার করার পরে মাটির দেহে আদম প্রতিষ্ঠিত হয়, তা নিরাপত্তা দান করলে রুহুল আমিন নাযিল হওয়া বুঝায়। রুহের কর্তৃত্ব যখন নফস রহমানের মাধ্যমে ইনসান কামেলে প্রকাশ পায় তার যাবতীয় আল্লাহর কর্ম হয়, তা নিজে সৃজনশীল হয়ে রুহ ফুৎকার করতে (সুপ্ত রুহকে জাগ্রত করতে) পারে। রুহুল আমিন, রুহুল কুদসি ও রুহ অনুবাদে আমরা যে অনুবাদ দেখতে পাই তা একেবারেই অযৌক্তিক । ফেরেশতারা হলেন নির্দিষ্ট এলেম প্রাপ্ত, বর্তমান বিজ্ঞানের আধুনিক রোবট বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মত । নিজ হতে কিছু করার ক্ষমতা তাদের নাই। রুহের শক্তি হতে তাদের শক্তি প্রসারিত মাত্র। আদম যখন সকল কিছুর পরিচয় ব্যক্ত করলো, জীবরাঈল, মিকাঈল সহ সকল ফেরেশতারা তা ব্যর্থ হলো, আদমে সেজদা করলো [২:৩১-৩৪|।
মানুষের এবাদতের বিশেষ রজনীতে নফসের স্বভাব ঢাকা পড়লে রবের আমর (নির্দেশ) হতে ফেরেশতা ও রুহ নাযিল হয় [৯৭:8]। লাওহে মাহফুয হতে কুরআন জ্ঞান স্পষ্ট হয়। প্রদীপ্ত একটি প্রদীপ হতে অন্য একটি প্রদীপ জ্বালানো হলো। প্রদীপে আলোর উপকরণ সবই ছিল তা প্রজ্জলিত করার ব্যবস্থাটিই রুহ নাযিল করার সমার্থক হতে পারে। এক ফেরেশতা অন্য ফেরেশতার কর্ম করতে পারে না। উপমা স্বরূপ- মনুষ্যে হাইউন (জীবন্ত শক্তি), আলিমুন (জ্ঞান), মুরিদুন এরাদা (ইচ্ছা), কাদিরুন (কুদরত বা কর্মশক্তি), সামিউন (শ্রবণ শক্তি), বাছিরুন (দর্শন শক্তি) ও কলিমুন (বাক শক্তি) একের কাজ অন্যে করতে পারে না।
চক্ষু সারা জীবনেও কর্ণের শ্রবণের কাজ করতে পারে না, তেমনি কর্ণ দেখার কাজ করতে পারে না। এতো কাছাকাছি থেকে একে অপরের কাছে অচেনা । অথচ এ সাতটি সেফাত রুহ হতে ইনসানে এক যোগে প্রকাশ আছে বলেই মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত ৷ অন্য কোন জীবে এ সেফাত সাতটি একত্র পূর্ণভাবে বিকশিত হয় নাই, কোন কোনটি প্রকাশ থাকলেও অন্যান্যগুলি সুপ্ত (নাই এমন নয়- উপযুক্ত বাহনে বা দেহে তা প্রকাশ পায়)।
দেহ হচ্ছে বাহন বা রাজ্য, রুহ রাজা, আকেল উজির, নফস রুহের কর্ম প্রকাশে মাধ্যম বা স্বভাব বা প্রবৃত্তি যা সৈন্য। এর ফেল অসংখ্য (রবের সৈন্য সংখ্যা অসংখ্য) দেহকে রক্ষা করা ও যাবতীয় অর্জনের দায়িত্ব এ নফসের। ভবের হাটের বাণিজ্যে যে ঘোড়াটি দৌড়ে চলছে তাতে অর্জন বা বিসর্জনের নিরব জুয়াখেলা এটি ৷ ঘোড়াটির মালিক বাণিজ্যে মনিমুক্তা জমা করে স্বনির্ভর রাজ্য গড়ে তুলবে এটিই রাজ্যের সংবিধানে লেখা। রাজা তার বাদী নফসের প্রতি আসক্ত। নফস মোলহেমা, লাওয়াম্মা, মোৎমাইন্নাকে পর্যদুস্ত করে নফস আম্মারার জাগরণে একটি অত্যাচারী রাজ্য । নফস আম্মারার প্রধান মাতব্বর আজাজিল/খান্নাস বা ইবলিশ বা শয়তান । নিন্ম জগতের সকল মানুষই জিন স্বভাবগ্রস্ত। নাস আর খান্নাসের পার্থক্যজ্ঞান বুদ্ধিতে ৷ পুস্তকগত বিদ্যায় আমিত্ব অহংকারীরা আজাজিল দলের । এদের মধ্যে যারা ভ্রান্ত ও রবের অবাধ্য তারাই শয়তান। ইবলিস সত্যবিধানে আস্থাহীন, অহংকারী ও কাফের [৩৮:৭৪]।
এক আল্লাহর পরিচিতি (আলিফ = আবজ্বাদ মান-১) দুনিয়ার (চোখে (আইন = আবজাদ মান-৭০) ৭০ হাজার পর্দা টেনে আমিত্ব নুকতা দ্বারা (গাইন = আবজাদ মান-১০০০) গায়ব করে রাখে। যারা আল্লাহর পরিচিতিতে তাদেরকে গাফেল করার কি আছে বরং ইবলিশের ওয়াদা হলো সিরাতাল মুস্তাকিমের পথ হতে আদম সম্তানদের (দৃশ্যমান সকল মানব নয় বরং নূর পরিচিতির বংশ) পথভ্রষ্ট করা। করারও কিছু না ইবলিশের বাহিনী বড়, বস্তজগতে আল্লাহর দেখা পাওয়া সম্ভব নয়- এ কথাটিকে আল্লাহ কে চেনার অযোগ্য বলে প্রচার করা হচ্ছে। অবশ্য যা কঠোর ধ্যান সাধনা করে চিনতে হয়, তা বলা না বলায় কিছু যায় আসে না।
“মা কাযাবাল ফুআদু মারাআ, আফাতুমারুনাছ আলা মাইয়ারা” অর্থঃ “যা সে দেখেছে তার অন্তকরণ তা মিথ্যা বলে নি, তার দেখা বিষয়ে তোমরা কি তর্ক করবে?” [৫৩:১১-১২] “রাআ” শব্দটির অর্থ ব্যকরণবিদরা ভাল অবগত আছেন। এখানে প্রষ্টা করা হয়েছে “ফুআদ” বা “অন্তকরণ” কে। অন্তরের চোখে আল্লাহর দেখা পাওয়া সম্ভব এটি উম্মতে মুহাম্মদীকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, এছাড়া নবী মুহাম্মদ (স), আল্লাহকে দেখলো কি না দেখলো তাতে উম্মতের লাভ ক্ষতি কি? “মাযাগাল বাছারু ওয়ামাতাগা, লাকাদ রাআ মিন আয়াতি রাব্বিহিল কুবরা” অর্থঃ “ভার দৃষ্টি বিভ্রম হয় নি, লক্ষচ্যুতও হয় নি। সে তার রবের মহান (কুবরা) পরিচয় (আয়াত) দেখেই ছিল ।”
কুরআনে কলব বা অন্তর সম্পর্কে বেশ আলোচনা দেখা যায়। হাদীসের বরাত দিয়ে “এক খন্ড মাংস” কে কলব বলে প্রচার করছেন আমাদের ওহাবী ও সমমনারা। অবাক হওয়ার ব্যাপার হলো সুফীবাদের পোশাক পড়েও কেউ কেউ এরূপ কথা বলছেন। সেখানে নাকি যিকিরের তেজে বুকের মাংস লাফালাফি করে। এগুলো প্রকাশ্য রিয়া, তা রাসূল (স.) ও অলিয়ে কামেলের জীবনী হতে প্রমাণিত ৷ কুরআন কলব অর্থ হৃদয় বা হার্ট নির্দিষ্ট করে নি, কেন না- পণ্ড, পক্ষী, মৎস, কীট পতঙ্গের মধ্যে যারা শ্বাস-প্রশ্বাসে বেচে আছে তাদের মধ্যে “হৃদপিন্ড” দেখতে পাই। একটি সাধারণ অর্থে কলবকে হৃদপিন্ড বলা যায় মাত্র, যেহেতু তা দেহে রক্ত সংবহনতন্ত্র সচল রাখে । তবে এ হৃদপিন্ডেরও পরিচালক রয়েছে। মস্তিষ্কের এক এক অংশ অংঙ্গ সমূহকে পরিচালিত করে। জড় জগতের ইন্দ্রিয় ঘরসমূহ অনুভূতি ও জ্ঞানের বাহ্যিক পথ। রুহ বস্তজগতের আবরণে জড়িয়ে আত্মদর্শনে বাধা পরেছে। কলব, ফুআদ ইত্যাদি শব্দ দ্বারা কি বুঝায় কুরআন হতে দেখি ।
“ইন্না ফী যালিকা লাযিকরা লিমান কানা লা কালবুন আও আলকাস সামআ ওয়া হুওয়া শাহীদ ৷” অর্থঃ “নিশ্চয় এতে উপদেশ (যিকর বা স্মরণ) রয়েছে তার জন্য যার কলব আছে। এবং যে কান দেয় আর সাক্ষ্য বহন করে (সে হয় সত্য প্রত্যক্ষকারী) ।”(৫০:০৭]
“কাযালিকা ইরাতবাউল্লাহু আলা কুল্লি কালবি মুতাকাব্বিরিন জাব্বার”। অর্থঃ “এইরূপেই আল্লাহ প্রত্যেক উদ্ধত অহংকারীর কলবের উপরে মোহর মেরে দেন।” [৪০ঃ৩৫]
“লাছম ক্কুলুবুল লা-ইয়াফকাহূনা বিহা, ওয়া লাহুম আ’ইউনুল লা ইউবছিরুনা বিহা, ওয়া লাহুম আযানুল লা-ইয়াসমা’উনা বিহা, উলাইকা
কাল আনআমি বালছুম আদাল্লু; উলাইকা হুমূল গাফিলুন ।”অর্থঃ “তাদের রয়েছে হৃদয় কিন্তু তা দিয়ে হৃদয়াঙ্গম করে না, এবং তাদের
রয়েছে চক্ষু কিন্তু তা দিয়ে দেখেনা, এবং তাদের রয়েছে কর্ণ কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা পশুর মত, বরং তারা ভ্রান্ত । এরাই তারা যারা গাফেল (অলস, অমনোযোগী) ৷” [৭:১৭৯]
“খাতামাল্লাহু আলা কুলুবিহিম” আত্মবিস্মৃতদের কলবের উপর মোহর মেরে দিয়ে আল্লাহ মানুষ ও জিনকে সত্যপথ হতে গাফেল রাখেন। “এবং ফেরাউন বলেছিলঃ হে হামান, আমার জন্য একটি মিনার তৈরী কর যেন আমি বিশেষ পথগুলিতে পৌঁছতে পারি” [৪০:৩৬|। আকাশের পথে (জ্ঞানের উচ্চতায়) অবস্থিত পথ ও পদ্ধতিগুলির আত্মিক দিক কঠিন হওয়ায় সে বস্তুমুখী উচ্চতার পথগুলিতে পৌঁছতে চাইলো। কলব খতম হয়ে তারা আল্লাহর জন্য কাল্পনিক আসন বানায়, লৌকিক এবাদতের পথগুলোকেই বেছে নেয়। অথচ তারা মৃত, পশুকে শিক্ষা দিলে কিছু কিছু বিষয়ে বুঝতে পারে, তারা পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট। রাসূল ডাকেন এমন কিছুর দিকে যা জীবন দান করে। আল্লাহ “বাইনাল মাররি ওয়াল সালবিহি” অর্থঃ “মানুষ ও তার কলবের মধ্যে” বিরাজ করছেন, তারই দিকে হাশর করা হয় [৮:২৪]।
সুফীরা “কলব” কে “হৃদপিন্ড” অনুবাদ না করে অনুবাদ করেছেন “দেল”। আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে “মুমিনের দেল আল্লাহর আরশ” ৷ এক খন্ড মাংসপিন্ড কি আল্লাহকে ধারণ করতে পারে? তাই তো দেখতে পাই “দেল নহে মাংস পিন্ড, দেল বিশ্ব-ভ্রমান্ড” (দেওয়ান রশিদ র.) সূফীদের আলোচনা ৷ দেলে তামাম মজুদ আছে, দেলে মুদওয়ারীতে মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র খেকে বৃহৎ তত্ত্ব ও তথ্য জমা আছে। মহাবিশ্বে দেল মাত্র একটি ৷ গরু বকরি জবাই করে যে দেল আমরা দেখতে পাই মানুষে তা আছে, দেল মুদওয়ারীর নির্দেশ প্রাপ্ত একটি আজল পর্যন্ত কর্মক্ষম দেল এটি । দেহ ধ্বংসের সাথে সাথে এ মাংসপিন্ড পচে যায়। কিন্তু দেল মুদওয়ারীতে ভাল-মন্দ তামাম তথ্য জমা থাকে কিতাবাকারে প্রতিফল দেয়ার জন্য, এখানেই রয়েছে মহাপুরুষদের আল কেতাব যা হেফাযতে থাকে। কোনকালে স্মৃতিভ্রম হয় না। সাধারণ ব্যাক্তির পরিচিত দেলে (সানোয়ার, নিলুফারী) জমা তথ্য মৃত্যুর আঘাতে মুছে যায়।
৭০ হাজার নফসানী পর্দার অন্তরালে রুহের পরিচিতি প্রকাশ পায় না। কলবে রব তাঁর দিকে হাশর করেন যাতে তাকে মুক্তির দিকে আনা যায়। রুহ কোন মানুষে প্রকাশিত হতে না পেরে পশুজগতেরও নিম্ন অধঃপতনে নেমে যায়, এতে সেটিতে রুহ্ নাই এমন প্রমাণ করে না, বরং রুহ নফস আম্মারার ফেলে প্রকাশ পাওয়ায় তা রুহ হায়ানী নামে প্রকাশিত হয়, যা কোন কোন ক্ষেত্রে আনআম বা পশু হতেও নিকৃষ্ট। আলোচনা হতে স্পষ্ট যে রুহের শক্তিই দেহের শক্তি প্রবাহের মূল কারণ। রবের আমর বা নির্দেশ হতেই “কুন” বল প্রয়োগ হয়ে প্রতিটি জীবকোষ কর্মশীল আছে। জীবের অস্তিত্ব, বৃদ্ধি, বংশরক্ষা ও জিনকে প্রবাহমান রাখা রুহের শক্তিরই পরিচয় বহন করে। পরিস্কার ভাষায় বলা যায় কোথাও কোন নফস কোন কালেও অস্তিত্বে আসেনা বা আসতে পারে না যতক্ষণ না তাতে কোন রুহের শক্তি কার্যকরহয়।
রুহ যখন যে নফসের উপর কর্তৃত্বশীল দেখার তখন সেই নফসের পরিচিতিতে রুহের পরিচিতি হয়। যেমন- নফসে ওয়াহেদ রুহু কুদসি, নফসে আম্মারা রুহু হায়ানী, নফসে মোৎমাইন্না রুহ ইনসানী, নফসে লাওয়ামা রুহ মাবাতি, নফসে মুলহেমা রুহ জামাদির পরিচিতি বহন করে। রুহের পরিচিতি নফসে, নফসের পরিচিতি অজুদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রকাশ পায়। আল্লাহর আহাদ, ওয়াহেদ, লা-শরিক, দুনিল্লাহ, গায়রুল্লাহ জগতগুলোর রহস্য রুহের নানামূখী পরিচিতি ভঙ্গি মাত্র। সর্বত্র তার নূর থাকলেও তিনি জাহের হন মুমিনের দেলে। রুহের শক্তি ছাড়া জীব-জগতের বেঁচে থাকার প্রেরণা কোথায়? মৌমাছিরা পর্যন্ত রুহের শক্তিতে ওহি দ্বারা অবগত হয় কোথায় ফুল ফুটেছে। প্রতিটি সৃষ্টিতেই রুহের প্রেরণা লক্ষ্য করা যায়। রুহ ও নফস।
পাঁচটি মুল উপাদান- বায়ু, অনল, বারি, মাটি ও এদের চালিকা শক্তি নূর সমন্বয়ে সৃষ্টি বন উপবন জখুমা-কানন জীব জন্তু নর নারীতে সু-সজ্জিত হয়। “পরম সত্তা নিজে পঞ্চভূতে সেজে, আপনারে দেখিতে আপনি প্রেমে মজে, আপনারে খুঁজে হয় উতালা”। পঞ্চভৌতিক বস্তুর পাঁচটি দেহ (পাঞ্জাতন), পাঁচটি নফস, পাঁচটি রুহ, পাঁচটি মোয়াক্কেল, পাঁচটি মোকাম, পাঁচটি মঞ্জেল, পাঁচটি রাহা, পাঁচটি ঈমান/একিন বিষয়গুলোর বিষদ গুণাগুণ যার পরিচিতি নাই তিনি আরেফ হন কি ভাবে?
দেল, রুহ্, নফস একে অপরের পরিচয়ের সমন্বয়ক। বিজ্ঞান আজ বলছে প্রতিটি মানুষ তার সাথে মরন জিন (DEATH GENE) তার পূর্ব পুরুষ হতে বহন করে চলছে। জীবন মৃত্যু নিয়ে জেনেটিক কোডের ব্যাখ্যা ও কত থিওরি দিচ্ছে তারা। তারা কিছুদিন পূর্বে মাতৃদেহ হতে জীবন্ত কোষ নিয়ে বিশেষ কৌশলে পিতৃকোষ ব্যতীত ডলি নামক ভেড়ার জন্ম দিয়ে হৈচৈ ফেলে দেন। প্রকৃতিতে আমরা অহরহ ক্লোন বা কলম পদ্ধতি দেখতে পাই। প্রতিটি দেহেই রয়েছে অসংখ্য কোষ, প্রতিটি কোষেই রয়েছে স্ব-স্ব জেনেটিক তত্ত্ব ও তথ্য, ধর্মের ভাষায় “কুন” বল আমানত রয়েছে। বিশ্বজগতে মৌলিক পদার্থ নির্দিষ্ট। তাদের জটিল সংযোগে জীবন সমৃদ্ধ জীবিত কোষ রুহেরই পরিচিতি বহন করে। মৌলিক পদার্থ থেকে জীবিত প্রাণীর নির্দিষ্ট জীবিত কোষ উৎপাদনে বস্তবিজ্ঞানীরা ব্যার্থ।
অসংখ্য সুক্ষ দেহের সমষ্টি একটি স্থুল দেহ। জীবের কোষ থেকে তার অনুরূপ জীব উৎপাদন করা আল্লাহ্র সুন্নতে রয়েছে। স্বভাব দ্বারা বীজ উৎপাদন হয়েছে। প্রতিটি বীজেই জমা রয়েছে তার ভবিষ্যত দেহ, নফস-রুহের পরিচিতি কেমন হবে তা। উপযুক্ত পরিবেশেই তা স্থুল অবস্থায় আসে। সেইখানে সকলই ছিল, ছিলনা তোর এই আকার, নজুলের ভেদ জানরে মন আমার”- এটি আরেফের বাণী । গাছ হতে বিচি হয়, বিচি থেকে গাছ- এর মধ্যে কোনোটিকে নকল বলার উপায় নাই।
বলার উপায় নাই এর মধ্যে রুহ নাই, নফস নাই- সুক্ষ অবস্থায় আছে মাত্র । ধর্মে সুফীদের (আত্মার বিজ্ঞানী) আধ্যাত্ম ব্যাখ্যা ছাড়া বর্তমানে গোমরাহদেরকে শান্তির ধর্মে ফিরিয়ে আনা কষ্টকর। মহাবিশ্বের নমুনা একটি দেহ। আরেফগণ নিজ গুরুর মধ্য দিয়ে নিজ রবের পরিচিতি পান, পরে প্রতিটি স্থানেই জগতগুরু আল্লাহর পরিচয় পান। হযরত আলী (কঃ) এর সিনার তালিম সিনা-ব-সিনা হয়ে আরেফের অন্তরে আমানত স্বরূপ জমা রয়েছে যা বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।
এখন স্পষ্ট করে বলা যায়- যেখানে রুহের শক্তি নাই সেখানে নফস (স্বভাব) কার্যকর হতে পারে না। প্রত্যেকটি নফসের উপর রয়েছে হেফাযতকারী রুহ । দেহের উপযুক্তভার উপর ভিত্তি করে রুহের পরিচিতিতে এ নফসের প্রকাশ পায়। মানবদেহে পাঁচটি নফসের উপরে পঞ্চরুহের পরিচিতি পেতে পারে। কে কোন নফসে অবস্থান করে তার উপরেই নির্ভর করে, মানুষ কি পশু । পঞ্চভোতিক দেহে পাঞ্জাতন ও সপ্ত সিফাত মিলে ১২ রই লীলা-খেলা। এটি কালেমার গাঠনিক সংকেত । চারটি প্রতীজ্ঞা নূর, এলেম, শহুদ, অজুদ কার্যকর হয়ে সারাবিশ্বময় আহাদ আল্লাহর পরিচিতি ।
তদুপরি প্রত্যেক ব্যক্তিরই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজনঃ
১। আদম হাওয়া নিষিদ্ধ বৃক্ষ (কথিত গন্দম) আস্বাদন করে অপরাধী হলেন। আদম, হাওয়া, গন্ধম, শয়তান এদের একটি কম্বলে পেঁচিয়ে দুনিয়ায় নিক্ষেপ করা হলো। তারা এখন কে কোথায় কোন হালে আছে?
২। আদম অজুদে রুহ ফুৎকার করার সময় আল্লাহ কোথায় ছিলেন? আদমে কি রব/আল্লাহ্ ছিল না? না কি সুপ্ত রুহ বস্তুদেহের উপরে হুর রুপে জাহের হলো? “নুরুন আলা নূর” মানে কি? রুহ কোথায় স্থান নিলো? রুহ বের হয়ে গেলে নফস মরে, তখন আল্লাহ কোথায় থাকে?
৩। দাউদ নবির উম্মতদের অনেকে নবিকে না মানার কারণে বানর শুকরে পরিণত হয়। পশুতে রূপান্তরিত হওয়ার পরে কি তাদের রুহ ছিল? নাকি পূর্বেই এ লোকদের রুহ ছিল না?
৪। প্রত্যেক নফসের উপরেই তো হেফাজতকারী আছে? কে সে? আল্লাহ নিজেই রবরূপে? তাহলে তাঁর কার্যক্রম কিভাবে পরিচালিত হয়? রুহ ছাড়া? যদি হয় তাহলে মানুষের রুহের প্রয়োজন কি? জিন জাতি ধুম্রহীন আগুনে তৈরী ৷ তাতে কি রুহ আছে? তারা কারা? না কি তারা এই গ্রহে আর নাই? তাদের রুহ থাকলে কিভাবে আছে? না থাকলে তাদের জান্নাত জাহান্নামে যাওয়ার অর্থ কি? শাস্তি বা শান্তি কে ভোগ করবে? আগুনকে কোন আগুনে পোড়াবে?
৫। পশু পাখিকে শিক্ষা দিলে তারা মানুষের চেয়েও জ্ঞানী হয়ে উঠে ৷ বিমান চালায়, অস্ত্র উদ্ধার করে। বাতিতে তেল না থাকলে তা জ্বালানো যায় না, ম্যাচ কাঠির অপব্যয় হয়। সাধারন লোহায় চুম্বক ঘষলে তা চুম্বকের মত অন্য লোহাকে আকর্ষণ করে। কারণ চুম্বকের কণাগুলো একমুখীভাবে সুসজ্জিত । লোহায় তা এলোমেলো । চুম্বকের সাথে ঘষাঘষিতে এলোমেলো কণাগুলো কিছুক্ষণের জন্য হলেও একমুখী হয়ে চুম্বকের স্বভাব (নফস) ধরে। পগুতে কি ইনসানী রুহ সুপ্তভাবে পূর্বেই ছিল না? না কি মানুষের স্বভাবের (নফসের) কারণে পশুর স্বভাব (নফস) পরিবর্তন হয়? চুম্বকে তো কণাগুলো একমুখী হওয়ার কারণে হয়, পশুতে কিসের কারণে স্বভাবের পরিবর্তন আসে, জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে?
৬। আসহাবে কাহাফের কুকুরে রুহ ছিল কি? না থাকলে এত বুদ্ধি খাটিয়ে ঘুমন্ত মানুষের পাহাড়ায় তারা চেতন রইলো কি কারণে? পশুরা কি বেহেস্তে যাবে? নফস তো মারা যায়। এ কুকুরদের রুহ না থাকলে তারা বেহেশতে যাবে কিভাবে? যদি পশু নফস নিয়েই যায় তাহলে তারা কি বেহেস্তের হুর শরাব আরাম আয়েশ পাবে না! যদি পায় সেগুলো ভোগ করবে কিভাবে? রুহের আলোকিত রূপ হুর কি না? যদি হয় পশু নফস দ্বারা তারা কিভাবে হুর ভোগ করবে?
৭। মৌমাছিদের কাছে অহি/প্রেরণা কে পাঠায় যে কোথায় ফুল ফুটেছে? অহি কি নফস পায় না রুহ? বাবুই পাখির বাসা বানায় কি নফস/স্বভাবের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই না রুহের শক্তি কাজ করে? শুধুমাত্র নফস কি কাজ করতে পারে? সৃজনশীল শক্তি কার?
৮। দম কি? শ্বাস-প্রশ্বাস কেন গতিশীল থাকে? রুহের কারণে না নফসের কারণে? রুহ ও নফস? পশু-পক্ষী ও অন্যান্য জীবে শ্বাস-প্রশ্বাস, রগ, হৃদপিন্ড, হাড়, মাংস, অস্থি-মজ্জায় মানুষের সাথে এত মিল কেন? সপ্ত সিফাত অন্যান্য জীবে পঠিত হচ্ছে কি না? জাত নূর ছাড়া কোথাও সিফাত কার্যকর হতে পারে কি? নূরের সত্তাই রুহ কি না?
৯। ইহকালের শাস্তি হিসেবে বহু মানুষ পরকালে পশু কাতারভূক্ত হবে, লম্বা লম্বা খুঁটিতে বেঁধে দেয়া হবে? তখন তাদের রুহ থাকবে কি না? রুহ না থাকলে নফসমুক্ত রুহ কোথায় রাখা হবে? রুহ ছাড়া নফস কিভাবে শাস্তি ভোগ করবে? জান্নাতে রুহ থাকলে জাহান্নামে থাকবে না কেন?
বছ জগতখ্যাত অলিয়ে কামেল স্পষ্টভাবে পঞ্চরুহের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। তাদের মধ্যে উপমহাদেশে যিনি দেওয়ান পরিচিতিতে ভূষিত হয়েছেন, তিনি তাসাউফ গুরু দেওয়ান শাহসুফী আবদুর রশিদ চিশতি নিজামী র. (ঝিটকা শরিফ) । মানবদেহকে খন্ড খন্ড করে রুহ ও নফস দেল, রুহ, নফস, মন, দম, দেহ, ফেরেশতা ও তাদের ফেল, অবস্থান, রঙ, আবজাদ, দেহে মুকাত্তায়াত হরফের পরিচিতি ইত্যাদি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কুষ্টিয়া উদিবাড়ী দায়রাপাকের মনসুর শাহ র. সহ অসংখ্য ব্যক্তি উপমহাদেশে তার প্রচারিত শাস্তিবাদে স্থান নিয়েছেন।
ভারত উপমহাদেশের বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক ড. উপেন্দ্রনাথ যাকে পূর্ববঙ্গের আওলিয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করে তার বহু গান গজল উল্লেখ করেছেন- তিনি আর কেউ নন দেওয়ান শাহসুফী আবদুর রশিদ চিশতি নিজামী র. (ঝিটকা শরিফ)। তিনি বলেছেন-
চেন চেন আমার মন, চেন পাঞ্জাতন
যাতে রুহু পঞ্চজন, বিরাজ করে।
চেল আদম অজুদ, পাবি অজুদে মৌজুদ
তবে রুহুল আজম দেখবি নজরে।
রুহ কুদছি আর রুহ যে ইনসানী
দেখ নজর করে রুহ যে হায়ানী।
রুহু নাবাতি জামাদি, দেখবি মন যদি
তবে ভজ নিরবধি কামেলীন পীরে।
কামেলীন পীর হইবেন যিনি
রুহের সুরাত দেখাইবেন তিনি
তৌহিদ সাগরে ডুবাবে তোমারে
তবে অপরুপ রুপ দেখবে নজরে।
হজরত শাছ ছাফা পীর বাকাবিল্লা ওলি
তাহার কৃপায় জানিনু সকলি
দেওয়ান রশিদ বলে মন, ভুলনা কখন
তারে রেখ হৃদি মাঝে, যতন করে।
পঞ্চতৌতিক দেহে নবি, আলি, ফাতেমা, হাসান, হোসাইনের অবস্থান, তার মোকাম, মঞ্জেল, ফেরেশতা, রঙ, সিফাত অবগত না হয়ে কিসের ধ্যান হয়? কারণ নাসুত, মলকুত, জবরুত, লাহুত, হাহুত মঞ্জেল গুলোতেই তো বিভিন্ন রঙের পর্দা পাড়ি দিতে হয়, পাঞ্জাতনে পঞ্চরুহর পরিচিতি আসে৷ লাহুতে গেলে ইনসান আত্মদর্শন করতে পারে, তারপরে ফানাফিল্লাহর স্তর পাড়ি দিয়ে আলমে হাহুতে “লা মোকাম/মোকাম ওরাওলওরা””য় বাকাপ্রাপ্তি হয়। তিনি “ফিল আরদে খলিফা” অর্থাৎ “দেহের মধ্যে (নাগরদোলা চক্রের উপরে) প্রতিনিধি রুহুল আজম রূপে মহাবিশ্বে তার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রবন্ধ – ফাদখুলি ফি ইবাদী ওয়াদখুলি জান্নাতি
লেখক – এস এম বাহরায়েন হক ওয়ায়েসী
মানুষ কোথায় দাঁড়িয়েছে? যার শ্রেষ্ঠত্ব ভূবন জোড়া, সৃষ্টির সাম্রাজ্যে তার অতুলনীয় পদাচারণা। সাম্যতায় যদি সে আত্মপ্রকাশ ঘটাতে পারে, তবে সে ঐশী প্রেমের মূল্যায়নে মূল্যায়িত হতে পারবে। কারণ, সে আশরাফ। তার গুণ, সুরৎ গঠন লাছানী। নেই কেউ তার সমকক্ষ, তবু কেন যে হিংস্রতা?
ভোগের তাড়নায় পারেনি আমিত্বকে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে। তাই তার মর্যাদা আসফালা সাফেলিনে নেমে গেছে। কিন্তু মহান স্রষ্টা তার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বের অসুন্দর মেনে নিতে চাননি। চেষ্টার পথে এগিয়ে দিয়ে নবুয়ত ও রেসালাত এর মাধ্যমে পবিত্রতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। উপহার দিয়েছেন আম্মারা থেকে লাওয়ামার মাধ্যমে মতমায়েন্নায় পৌঁছাতে পারার ক্ষমতা এবং মলহেমার পথ ত্বরান্নিত করে (আল কোরআনের ভাষায় বিকশিত করে) বিলায়েতের সুমহান দায়িত্ব ভারে তার দিদারকে ঈদে গাদীরে খুম রূপে ঘোষনা করে আসমান হতে দুইটি রশি ছেড়ে দিয়েছেন, জমিন পর্যন্ত। তার প্রথমটি হল- রাসূল (স.) এর আহলে বায়েত। আর দ্বিতীয়টি হল- কালামে পাক আল-কোরআন।
রাসূল (স.) ওফাত প্রাপ্ত হলে আম্মারা ভোগী কিছু মানুষ মতমায়েন্নাকে বাধাগ্রস্ত করতে চেয়েছেন, কিন্তু সাময়িক ছিল সে মোহময়তা। মলহেমার দৃঢ়তায় সেই হক সৃজিত ছিল বলে আজ অবধি ওয়ালিয়াম মুরশীদ রূপে যাদের পদাচারণ, তারা তপস্বী। তাদের আত্মজের মধ্যে কোন কুলশতার স্থান দেননি। তারা সদা সর্বদা ছিলেন ঐশ্বরিক তাৎপর্য বাস্তবায়নে সচেষ্ট যে কারনে অযাচিত, লোভ, মোহ, ক্রাম, ক্রোধ, মাৎসর্য স্থান দেননি তনুমনে। সকলকিছুর উর্দ্ধে তুলে ধরেছেন ইনসানিয়াতকে।
তারা দৈহিক অবকাঠামোর সৌন্দর্য রক্ষা ও পাপ পঙ্কিলতা থেকে নিজেকে সংরক্ষিত করার চেষ্টায় মগ্ন থাকেন। অনেকেই লেবাছের চাকচিক্যে আত্মজের বলিদান না করে অভিনবতায় পশুত্বের কামুকতা প্রদর্শন করে সকলের তরে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ছিনিয়ে নিয়ে সর্ব তপস্বীদেরও অমর্যাদা করার পরিবেশ তৈরি করেছেন। কিন্তু সত্যিকার অর্থে যে সাধক তার সাধনার তাৎপর্যের সততায় গুপ্ত হতে গুপ্ত থেকে নিজের রহমতের বারিধারা পৌঁছে দেন, তার নেই কোন আড়ম্বর। কারন যেকেরকারীদের সংখ্যা অতিব নগন্য।
ভক্তির আদলে যদি স্বার্থ থাকে সেখানে আর যাই হোক আত্ম-সমর্পন হয় না। আত্মসমর্পণ মানে যদি হয় বিক্রয় করা, তবে বিক্রিত জিনিস বিক্রেতা পূণরায় প্রাপ্তির দাবিতে অনড় থাকে তবে ক্রেতাকে লাঞ্ছিত করা হয়। অতএব কাউকে লাঞ্ছিত করলে নিজেরই ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যায়। তাই যার আকলে ইনছাফ বাস্তবায়িত থাকে, সে শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভে দম্ভিত না হয়ে মমতার মাধ্যমে যদি বুঝতে সক্ষম হয় যে, দাসত্বের মাঝেই নিহিত রয়েছে দাসত্বের শুদ্ধতা, তখনই পূর্ণতা লাভ হবে। তার ফলে কেউ আর দাসত্বকে খাটো নজরে দেখবে না। চলে আসবে হৃদয়ের তামান্না মিটাতে । যেখানেই সে খুঁজে পাবে অসীম সম্ভাবনা। সেখানেই নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে সফলতাকে অবলোকন করে দেখতে পায়, তার ভবিষ্যৎ দৃষ্টির সীমায় ভেসে ওঠে।
সমস্ত মানব মানবীর আত্মিক বন্ধনের মিলন মেলা চলে আসে অসীমের দ্বার উন্মুক্ত করে। তার মেজাজীর চিহ্ন না থাকলেও হাকীকী তাৎপর্যের চিরভাস্বর হয়ে থাকে আদি হতে অনাদিকাল। এমন প্রতিভা সবারই মাঝে আছে। কেউ তার সন্ধান পেয়ে যায়, আবার কেউ হারিয়ে ফেলে বা খুঁজেই পায় না তার আত্মসচেতনতার অভাবে। পরিশ্রম বিহীন কোন কাজেরই স্থায়িত্ব আসে না। ত্যাগী প্রতিভার প্রত্যাশা নিয়ে বিলিয়ে দিতে হয় পূর্ণ ইচ্ছাশক্তিকে, কর্ম উদ্যম মন এক দিন দেখতে পায় কখন যেন সে পৌঁছে গেছে সু-উচ্চ চূড়ায়।
কিন্ত কত সময় লেগেছে, কত প্রতিবন্ধকতাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে, কখনো জীবন নাশেরও পর্যায় উপনীত হতে হয়েছে। তবুও অদম্য শক্তিকে ভরসা করে মানবতার নেশায় ডুবিয়ে দিয়ে পূর্ণ মানবতার প্রতিককে, দেখে আত্ম-তুষ্টি হলে তার আদর্শের প্রতি সমস্ত চেতনার শির লুটিয়ে পড়বে, খুঁজে পাবে সেই সাম্রাজ্য, যেখানে ইনছাফ কায়েম হয় সদা সর্বদা। সফলতার চেষ্টায় যে বুঝতে পারবে, যেমন করে পৃথিবীতে তার অস্তিত্বের রক্ষায় সবকিছু ঢেলে সাজাতে সুন্দর শৃঙ্খলায় আসতে হবে। নচেৎ ধ্বংস থেকে রক্ষা করা কঠিন হবে।
মানুষ যদি কখনো ভাবে যে, আমার মর্যাদা আমাকেই রক্ষা করতে হবে, তবে সমস্ত সৃষ্টির নিজের অবস্থান সম্বন্ধে অবহিত হতে হবে। তাহলে নিজের ভাল থাকার প্রয়োজনে অন্যকে ভালো রাখতে হবে। তাই মানুষের সৃষ্টি সত্ত্বার সাথে যার সম্পর্কিত তাকে রক্ষা করতে হবে। তা না হলে মানুষকেই পরতে হবে দুর্বিষহ অবস্থায়। এই পথে যার শিক্ষা রয়েছে তিনি হলেন ওয়ালিয়াম মুর্শীদ, সে তার অজুদি কম্পাসের মাধ্যমে জরিপ করে দেখেছেন কোথা হতে তার নকশা, পর্চার আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। তাঁর ভুখন্ডে অন্য কারো দখল নেই এবং তিনিও অন্যের ভূখন্ড দখল করেন না। তবে একনিষ্ঠ চেষ্টার সফলতায় তাকে নাম , নিয়ামত, জাতকে বুঝতে শেখাবে এবং এ ভেদ শিখতে পারলে ঐশ্বর্য প্রাপ্তি কোনো কঠিন কিছু নয়। দৃঢ়চেতা মনোভাব আত্মপ্রত্যয়ী। অতএব প্রাণবন্ত মন পেছন ফিরে না, সম্মুখ তার স্থির আরাধনা। আল-আমীন।
প্রবন্ধ – আহলে বাইয়্যেত বনাম খেলাফত ও রাজতন্ত্র
লেখক – মো. আলাউদ্দিন ওয়ায়েসী
সর্ব প্রশংসা সেই রাব্বুল আলামিনের যিনি সমগ্র জাহান সৃষ্টি করেছেন, তার প্রদত্ত খিলাফত বাস্তবায়নের মঙ্গলার্থে, সমগ্র সৃষ্টি অধীন করে দিয়েছেন মানবের হীতার্থে। আর হাজারো সালাম ও দরূদ সেই রাহমাতাল্লিল আলামিন হযরত মোহাম্মদ (সা:) এর শানে, যিনি মহান সৃষ্টির মূল উৎস। আরো সালাম ও দরূদ তার আহলে বায়্যেতের শানে।
রাহমাতাল্লিল আলামিন খাতামান নাব্যিয়ান হযরত মোহাম্মদ সা: ইসলামী জীবন ব্যবস্থাপনার যে উন্মেষ ঘটিয়েছেন, ফলশ্রুতিতে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় রাজ্য শাসনের সীমাহীন দর্শন বাস্তবায়িত করে তারই উত্তরসুরী আহলে বায়েত তথা পাক পাঞ্জাতনের প্রধান হযরত আলী আ: কে মাওলাইয়্যাতে অভিষিক্ত করলেন।
আর এটা ও নির্মম সত্য যে, ইসলামী ব্যবস্থাপনার এই মহানায়ক হযরত মোহম্মদ সা: এর ওফাতের সাথে সাথেই তার প্রদত্ত খেলাফত কে তছনছ করে দিয়ে প্রশংসিত তথা খোলাফায়ে রাশেদার আবরনে এক নায়কত্ব রাজতন্ত্রের বীজ আরোপিত হল। অধ্যাত্মিক দর্শনের উৎসধারা পাক পাঞ্জাতনের সমষ্টি আহলে বায়েতকে অন্ধকারের করাল গ্রাসে নিমজ্জিত করল। আহলে বায়েতের নূরকে চিরতরে মুছে দেয়ার প্রয়াসে ইনডিমিনিটি আদেশজারী করা হল। বিনময়ে আহলে হাদিস নামে সংবিধানে এক নতুন অধ্যায়ের সুচনা করল। তবে সুফি মুসলিম মিল্লাতের সংগ্রামী সাধনায় চিরবর্তমান আহলে বায়েত আজও দিপ্তিমান, আর সৃষ্টির প্রজ্জলিত জ্যোতিরূপে স্ব-স্থানে স্থিত আছে। সৃষ্টির মূল উৎস এই আহলে বায়্যেত এর যৎকিঞ্চিত পরিক্রমা কোরআন ও হাদিস ভিত্তিক উপস্থাপনের জন্যই আমার এই প্রয়াস।
আহল শব্দের অর্থ তাবু। আহলে বায়েত হল তাবুর বাসিন্দা। মূলত আহলে বায়েত বলতে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা সবাইকে বুঝায়। তবে নবী রসুলগণের বেলায় অনেক ক্ষেত্রে এই সাধারণ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছিল। তবে কর্মদোষে কোন নবীর স্ত্রী আবার কোন নবীর ছেলে আহলে বায়েত হতে বঞ্চিত হয়েছিল। যেমন হযরত নূহ্ (আ:) এর ছেলে কেনান। আর সায়েদুল মোরসালিন, রহমাতাল্লীল আলামিন, হযরত মোহাম্মদ সা: এর আহলে বায়্যেতগণ হলেন আলমে আরোয়া হতেই রাসুল সা: এর প্রতিনিধি যাহা সৃষ্টির ধারক, অর্থাৎ চিরন্তন শ্বাশত অনন্ত সৃষ্টির মূল উৎস। এই আহলে বায়েত ধারণ করে মানুষ মৃত্যুকে জয় করে অমরত্ব লাভ করে থাকে।
হযরত আলী- ফাতেমা-হাসান-হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুম এই চারজন পাক পাঞ্জাতনের প্রজ্জলিত শক্তি। মোহাম্মদ সা: হলেন পঞ্চ নূরের মুল উৎস। আহলে বায়্যেতের ভেদ রমুজাত যারা জানেনা তারা আহলে বায়্যেত কে বুঝে না আর আহলে বায়্যেত ভেদ রহস্য জানেনা তারা ইসলামকে জানেনা। আর আহালে বায়েতের প্রধান হলেন হযরত আলী (রা:)। হযরত আলী (আ.) আমাদের মত একজন মানুষ, ইহাই ইতি বাচক কথা নয়। জেসেমি আলী (আ.) এর ভেদ রহস্য হলো আল্লাহ মনোনীত ইসলাম ধর্ম যেখানে প্রতিষ্ঠিত, হযরত আলী সেখানে স্থিত আছেন। হযরত আলী (আ.) কে হারুন নবীর সাথে তুলনা করে রসুল সা: বলেছেন, “হে আলী তুমি আমার নিকট ঐ স্থানে, যেখানে মুসার (আ:) নিকট হারুন ছিল। কিন্তু আমার পরে নবী নেই, আমিই শেষ নবি।” (বোখারী ২য় খন্ড ১৯৪ পৃ: ৩য় খন্ড ৫২৬ রাবি সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা)।)
রাসুল (সা:) আরো বলেছেন ‘আনা ওয়া আলী উন নূরিন মিন ওয়াহিদ।’ আমি এবং আলী একট নুরের দুই খন্ড। আলী মিন্নি ওয়া আনা মিনাল আলী। আলী আমা হতে এবং আমি আলী হতে, ফাতেমা মিন্নি ওয়া আনা মিনাল ফাতেমা। ফাতেমা আমা হতে এবং আমি ফাতেমা হতে, হাসান মিন্নি ওয়া আনা মিনাল হাসান। হাসান আমা হতে আমি হাসান হতে। হোসাইন মিন্নি ওয়া আনা মিনাল হোসাইন। হোসাইন আমা হতে অমি হোসাইন হতে। (তিরমিজি, মেসকাত শরিফের ১১তম খন্ড)।
পাক অর্থ পবিত্র, পাঞ্জাতন অর্থ পাঁচটি তন বা দেহ। পাক পাঞ্জাতন অর্থ পাঁচটি পবিত্র দেহ। উপরোল্লিখিত নবুয়্যাতি চার জনকে নিয়েই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আয়াতে তাৎহির (৩৩:৩৩) নজুলের মাধ্যমে পবিত্র হতেও পবিত্র ঘোষণা করেছেন। ইন্নামা ইউরিদুল্লাহে লি ইউজ হিবা আন কুমুর রিজছা আহ্লাল বায়্যিতি অ ইউ তাহ্ হিরাকুম তাৎহিরা (আহযাব-৩৩)। আল্লাহ পাকের নাহনুর সদস্য নবুয়্যাতি ছুরত, পাক পাঞ্জাতন, যাদের বেলায়েতি রূপ সমস্ত সৃষ্টি ব্যাপৃত আছে।
আল কোরআনে উপস্থাপিত হয় কুল লা আজ আলূকুম আলাইহে আজরান ইল্লাল মা আদাদাতা ফিল কুরবা ওমাইন ইয়াকতারিফ হাসানাতান নাজিদ লাহু ফিহা হুসনা (সুরা শুআরা-২৩)। অর্থাৎ – আপনি বলে দিন হে রাসুল, আমি চাই না তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান আমার নিকট বর্তীদের ভালোবাসা ব্যতিত। যে ব্যক্তি ইহার সদ্ব্যবহার করে আমি তার শ্রী বৃদ্ধি করিয়া থাকি। আহলে বায়্যেতের প্রতি মহব্বত রাখা প্রতিটি মানবের জন্য ওয়াজিব। তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ এই আয়াতটি। এই আয়াতটি নাজিলের পর রসুল (স:) কে সাহাবাগণ প্রশ্ন করিলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনার নিকটজন কারা? যাদের ভালোবাসা আল্লাহপাক আমাদের জন্য ওয়াজিব করে দিয়েছেন? উত্তরে রাসুল (সা:) বলেছেন, আল্লাহুম্মা হাওলাই আহলে বায়্যেতে আলীয়াঁও ওয়াফাতিমাতাঁও ওয়া হাসানু ওয়াল হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহুম। অর্থাৎ হে আল্লাহ এই আমার আহলে বায়্যেত হলো আলী-ফাতেমা-হাসান-হুসাইন । হে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থেকো। (আব্দুর রহিম গ্রন্থাবলী প্রথম খন্ড)।
১০ম হিজরির ঘটনা। নাজরান প্রদেশের একটি বৃহৎ গীর্জার পাদ্রীদের সাথে রসুল (সা:) এর মোবাহেলা বা বাহাস হয়। উক্ত বাহাসে রোমের বাদশাহের নির্দেশে ৬০ জন খ্রিষ্টান আলেম ও ২৪ জন তাওরাত জবুরের কিতাবের জ্ঞানে পারদর্শী জ্ঞানী ছিলেন। তাহাদের দলনেতা ছিলেন সুলাবিল। রাসুল (সা:) এই সুলাবিলের অযৌক্তিক প্রশ্নাবলী ও যুক্তিহীন ধারনাকে যুক্তিপূর্ণভাবে সমাধান করেন। তদুপুরী রাসুল (সা:) এর সাথে বেয়াদবিমূলক কুতর্কে লিপ্ত হয়। আর এ সময়ে আল্লাহ মহান মুবাহিলা আয়াত নাযিল করেন। ফামান হাজ্জাকা ফিহে মিমবাদে মাজাআকা মিনাল ইলমে ফাকুল তাআলাও নাদউ আবনা আনা ওয়া আবনা আকুম ওয়ানিছা আনা ওয়া নিছা আকুম ওয়া আনফুসানা ওয়া আনফুসাকুম নাব তাহেল ফানাজ জাআল লা না তাল্লাহে আলাল কাজেবিন। ইমরান-৬১। অর্থ – অতপর জ্ঞান থেকে তোমার নিকট যা এসেছে তার পরেও সে বিষয়েও তোমার সাথে কুতর্ক করে তবে তুমি বল এসো আমরা আমাদের সন্তানগণকে ও তোমাদের সন্তানগণকে আর আমাদের রমনীগণকে ও তোমাদের রমনীগণকে এবং আমাদের নিজেদেরকে ও তোমাদের নিজেদেরকে ডাকি। তৎপর আল্লার কাছে প্রার্থনা করি যেনো মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হয়। (৩:৬১)।
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসুল (সা:) হযরত হুসাইন কে বামে হাসানকে ডানে এবং আলীকে পিছনে ও সবার পিছনে ফাতিমাতুজোহরাকে নিয়ে মুবাহিলায় হাজির হলেন। আর বললেন আমি যখন মুনাজাত করবো তখন তোমরা আমিন! আমিন! বলবেন। পাদরীদের দলনেতা সুলাবিল দেখলেন মোহাম্মদ (সা:) ও আহলে বায়্যেতগণের উপর ধীরে ধীরে নূর বিকশিত হচ্ছে। আর তখনি সুলাবিল চিৎকার করে বললেন, সাবধান! তোমরা কেউ এই পাঁচজনের মোকাবেলায় বের হবে না। যারা বের হবে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। শুনে রেখো, এই ৫জন যদি পাহারের উপর পাহাড় তোলার প্রার্থনা করে তবে তাহাই কবুল হবে। এই ৫ জনের মধ্যে হযরত হুসাইন আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর বিকশিত নূর তাযাল্লীর স্রোত দেখে সুলাবিল স্বীকার করলেন যে রসুল (সা:) এর নব্যুয়াতি সত্য। (মেশকাত শরীফের বাবে আহলে বায়্যেত অধ্যায় রাবি হযরত সাদ ইবনে ওয়াক্কাস (রা.))। হযরত জাবের (রা.) বলেন আনফুসানা বলতে রসুল (সা:) ও মাওলা আলীকে বুঝানো হয়েছে। ওয়ানিছানা বলতে হযরত ফাতেমাতুজজোহরাকে ওয়া আবনা আনা শব্দদ্বারা ঈমাম হাসান ও হুসাইনকে বুঝানো হয়েছে।
হিজরী ১০ম সাল নবীকরিম (সা:) ইচ্ছা প্রকাশ করলেন হজ্বব্রত পালন করবেন। এটাই হবে শেষ ও বিদায় হজ্ব । এই ধারনা পোষনান্তে তিনি সর্বত্র প্রচার করে দিতে নির্দেশ দিলেন যে মুসলিম যেখানেই থাকুক হজ্ব পালনে ইচ্ছুক সবাই যেন আরাফায় সমবেত হয় আর হলো ও তাই। আনুমানিক সোয়া লক্ষ হাজীদের সমাবেশ ঘটে ছিল। বিশাল জনসভায় রাসুল (সা:) মুসলিম জনতার উদ্দেশ্যে এক ভাষন দিলেন। এই নছিহত পূর্ণ ভাষণকে বিদায় ভাষণ বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। ভাষনান্তে হজ্ব সমাপন করিয়া রসুল (সা:) এহরাম বাধা অবস্থায় লক্ষাধিক সাহাবিদের নিয়ে মদিনার পথে রওনা হলেন। সেদিন ছিল ১৮ই জিলহজ্জ। দিনটি ছিল শনিবার। যোহর ও আছরের মধ্যেবর্তী সময়ে মক্কা মদিনার মধ্যেবর্তী জুফায় গাদীরে খুম নামক স্থানে পৌঁছলেন। তখনই রসুল (সা:) এর কাছে জিবরাঈল (আ:) ওহীর বার্তা নিয়া আসেন। জানালেন “ইয়া আইয়্যুহার রাসুল বাললিগ মা উনযিলা উলাইকা মিররাব্বিকা ওয়া ইল্লাম আফআল ফামা বাল্লাগতা রিসালাতাহু, ওয়াল্লাম ইয়াছিমুকা মিনান নাছি, ইন্নাল্লাহা লা ইয়াহদিল কাওমাল কাফিরিন।” মায়েদা-৬৭ ।অর্থ হে রাসুল, আপনার রব হতে যা নাযিল হয়েছে তা পৌঁছে দিন। আর যদি তা না করেন তবে আল্লাহর রিসালাত পৌঁছে দেয়া হলো না। আল্লাহ আপনাকে মানব মন্ডলী হতে নিয়া আসবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফেরদের হেদায়েত করেন না।
খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী সাহেব তাঁর বেহুঁশের চৈতন্যদান কেতাবের ১৬৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করিয়াছেন “আর যদি না করেন তবে রেসালত পৌঁছে দেয়া হলো না।” কথাটি দ্বারা রসুল (সা:) কে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব পৌঁছে দেয়ার হুকুম করলেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় এই প্রতিনিধিত্ব কার কাছে পৌঁছানোর হুকুম করলেন। যার কাছে পৌঁছানোর হুকুম হলো তিনি হলেন মাওলা আলী (আ:)। কারণ মোল্লা জালাল উদ্দিন সিউতির তাফসিরে দূররে মনসুর এর দ্বিতীয় খন্ডের সূত্রে, সদরউদ্দিন চিশতী সাহেব তার মাওলার অভিষেক গ্রন্থের ১৩ পৃষ্টায় উল্লেখ করেছেন, ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেছেন, আবু সাঈদ খুদরী হতে উক্ত আয়াত হযরত আলীর সানে নাযিল হয়েছিল। ইবনে আবু মারদুইয়া ইবনে ওমর হতে বর্ণনা করেন যে, আমরা উক্ত আয়াতটি রসুল (সা:) সামনে এভাবে পড়তাম।” ইয়া আইয়্যুহার রসুল বাল্লেগমা উনজিলা ইলাইকা মির রাব্বিকা। আন্না আলিউন মাওলাল মোমেনিন। ওয়া ইল্লাম তাফআল ফামাবাল্লাগতাহ রিসালাতাহু। ওয়াল্লাহু ইয়াসিমুকা মিনান নাছু। উক্ত আয়াত হতে “আন্না আলিউন মাওলাল মোমেনিন”। কথাটি খলিফা হযরত উসমান (রা.) প্রকাশনীর সময় বাদ দেওয়া হয়েছে।
টানা ২৩ বছর ইসলাম প্রচারে হাজারো দুশমন প্রাণনাশের চেষ্টায় ব্যর্থ হলো। ইসলাম প্রচারে জীবনে ১৭টি যুদ্ধে নিজে সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সমস্ত শত্রু পরাস্থ হয়ে সমগ্র আরব বিশ্ব ইসলামে পতাকাতলে সমবেত হয়েছে। তা হলে প্রচারের বাকী রইল কি? আর শত্রুই বা কাহারা? যাদের কবল থেকে আল্লাহ রক্ষা করবেন এবং কাফেরদের হেদায়েত করবেন না বলে নিশ্চয়তা দিলেন? আল্লাহ মহানের এই পরিপূর্ণ বাণীর প্রেক্ষিতে রসুল (সা:) স্বীয় উটের পৃষ্ঠ হতে নেমে পড়লেন। সামনে পিছনে সবাইকে একস্থানে জড়ো হতে নির্দেশ দিলেন। যোহরের নামাজ আদায় শেষে উটের বেদিগুলো দিয়ে একটি মঞ্চ তৈরী করালেন। রসুল (সা:) মঞ্চে উপবিষ্ট হয়ে আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করলেন। তারপর বললেন, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মাঝে দুটি আমানত রেখে যাচ্ছি, যদি এ দুটিকে তোমরা আকড়িয়ে ধর তাহলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হলো আল্লাহর কিতাব আল কোরআন, যা আসমান হতে জমীন পর্যন্ত টানা রশি এবং অন্যটি হলো আমার আহলে বাইয়্যেত। এদুটি কখনো পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না যতক্ষণ না হাউজে কাউসারে আমার সাথে মিলিত হইবে। তাই লক্ষ্য রেখো তাদের সাথে তোমরা কিরূপ আচরণ করবে। তিরমিযি সূত্রে মেশকাতে হাদিস নং ৫৮৯২ ও ৫৮৯৩ সূত্রে বর্ণিত আছে যে, আমি আমার আহলে বায়্যিত সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।
অতপর রসুল (সা:) হযরত আলী (আ:) এর দুই হাত উপস্থিত জনতার সামনে তুলে ধরে ঘোষণা দিলেন, মান কুন্তুম মাওলাহু ফাহায আলীউন মাওলাহু আল্লাহুমা ওয়ালেমান ওয়ালাহু আদামান আদাহু, আনশুরমান নেছারা, ওয়াখজুল মান খাজালা, ফাল ইয়াস হাদিল হাজেরান খায়েরা। অর্থা আমি যার মাওলা আলীও তার মাওলা, হে আল্লাহ তুমি তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ কর, যে তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তাকে শত্রুরূপে গ্রহণ কর যে তাকে শত্রুরূপে গ্রহণ করে, সাহায্য কর তাকে যে তাকে সাহায্য করে এবং লাঞ্ছনা দাও তাকে যে লাঞ্ছনা দেয়। মেশকাত পৃ:-১৫৭, হাদিস নং-৫৮৪৪।
হযরত বারা ইবনে আয়েব ও জায়েদ ইবনে আরকাম আরও বলেন যে, এর পর যখন হযরত আলী (আ:) এর সাথে হযরত ওমর (রা.) এর সাক্ষাত হয় তখন হযরত আলী (আ:) কে বললেন ধন্যবাদ হে আবু তোরাব তুমি সকাল সন্ধ্যা প্রতিটি মোমিন নর নারীর প্রশংসিত হয়ে রইলেন। হযরত ওমর (রা.) এই আফছোছ ভরা উদ্বেগ জনক কথাটিতে ভবিষ্যতে এক অশুভ বীজ নিহিত ছিল। আর হয়েছিল ও তাই। নবী (সা.) এর ওফাতের পর রসুলের নির্দেশকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলা হয়েছিল। এমনকি ইনডিমিনিটি আদেশের ন্যায় এই হাদিসটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বিপরীতে রোমঞ্চকর ও ভাবপ্রবণ কিসসা তৈরী করে সত্যকে ধামাচাপা দেয়া হয়েছিল। লুটের মাল বন্টনের আখড়ায় গঠিত খিলাফতের ধ্বংশের সূত্রপাত করেছিল পরবর্তীতে মুনাফিক মুয়াবিয়া ও ইয়াজিদের পোষা মোল্লারা মূলভাবটি জগত হতে মুছে ফেলার যথেষ্ট তদবীর চেষ্টা করেছে। আর এখানো করিতেছে তবে রাখে আল্লাহ মারে কে?
আল কুরআনে উপস্থাপিত হয় – আন নাব্যিও আওলা বিল মুহমিনিনা মিন আনফুছিহিম (আহাযাব -৬)। অর্থাৎ – নবী মোমেনদের নিকট তাদের প্রাণ অপেক্ষা অধিক প্রিয়। অত্র আয়াতের মমার্থে দেখা যায় রসুল (সা:) মহব্বত অনুসরণ তার প্রতি ইয়াকিন সহ বায়্যিত সবই আল্লাহ তার নিজের প্রতি ওয়াজেব করে দিয়েছেন। মূলত দাসত্ব আনুগত্য কেবলমাত্র রাসুল (সা:) এর প্রতি হতে হবে। রসুল (সা:) সৃষ্টির উছিলা, সৃষ্টি জগতের করুণা, রসুল (সা:) এর উছিলায় আল্লাহ দান করেন। আবার দান গ্রহণ করেন। সেই রসুল (সা:) বলেছেন, আমি জ্ঞানের নগরী আর আলী (আ.) তার দরজা। সেই দরজায় দর্শন হয় ইলমে লাদুন্নী আর হযরত আলীই রসুল (সা:) কে দেখেছেন। রসুল (সা:) বলেছেন ও তাই, মারাআনী আহাদুন ইল্লা ইবনে তালিব। আলী ছাড়া আমাকে কেউ দেখেনি।
মুলত যারা আলী (আ:) কে দেখেছে তারা রসুল (সা:) কে চিনেছে এবং ইলমে লাদুন্নীর অংশীদার হয়েছেন। কেননা হযরত আলী (আ:) নবীর ওয়ারিশ। আলী (আ:) কে যারা চিনেছে তারাই ওয়ারিছিতুল আম্বিয়া। হযরত আলী (আ:) ও রসুল (সা:) একই নূরের দু খন্ড। নবী এবং তার আহলে বায়্যিত একই সুত্রে গ্রথিত। সৃষ্টির মাঝে হযরত আলী (আ:) নাতেক কুরআনের অমিয় ধারা। শিরক ও বিদআত রক্ষাকারী আলী (আ:) হলেন আল্লাহ ও রসুল (সা:) এর গোপন রহস্যের ভান্ডার। হাকিকি, মালাকি, ও নবুয়্যতি ত্রিজগতে হযরত আলী (আ:) তিন নামে বিরাজিত আছেন এবং থাকবেন ও তাই। বিধায় রসুল (সা:) তার প্রকৃত ওয়ারিশ হযরত আলী (আ:) কে গাদিরে খুমে মাওলাইতে অভিষিক্ত করিলেন।
প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তায়ালার রিসালত বাস্তবায়ন হলো। দয়াময় আল্লাহ নাযিল করলেন কুরআনের শেষ আয়াত। “আল ইয়াওমা ইয়া ইসাল্লাযিনা কাফারু মিন দ্বিনীকুম ফালাতাখ শাওহুম ওয়াখ শাওনি, আল ইয়ামা আখমালতু লাকুম দ্বিনাকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নিয়ামাতি ওয়া রাদ্বিতু লাকুমুল ইসলামা দ্বিনা। (মায়েদা-৩) অর্থ – আজ কাফেরগণ তোমাদের দ্বিন হতে নিরাশ হয়েগিয়েছে অতএব তাদেরকে আর ভয় করিও না। ভয় কর আমাকে। আজ তোমাদের দ্বীন পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ দান করলাম এবং তোমাদের ধর্ম ইসলামের উপর আমি সন্তুষ্ট হইলাম।
চিরন্তন শাশ্বত আহলে বায়্যিতে ভেদ রহস্য যদি মানব মন্ডলীর কাছে উন্মোচিত না হলো, তবে সদ্যঘোষিত পরিপূর্ণ ইসলামের বাস্তবায়নে ঘোর তমশা নেমে আসতে পারে। কারণ, আদি সৃষ্টির এই পবিত্র পাঞ্জাতন এর চারতন যে, জেসেমি হযরত আলী (আ.)-ফাতেমা-হাসান-হুসাইন (আ.) তাহার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত রাখার প্রয়াসে হযরত আলী (আ.) কে বাশারীয়াত জিন্দীগিতে খলিফা নিযুুক্তি ছিল রসুল (সা:) এর প্রধান দায়িত্ব। তাই হযরত আলী (আ.) খলিফা নিযুক্ত করে আপন কর্তব্য সম্পাদনের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ রসুল (সা:) বললেন “আল্লাহু আকবার আলহামদু লিল্লাহ আলা আকমালে দ্বিনা ওয়াএতমামেন নিয়ামাতিন ওয়া রুয়ে রাব্বি আলা রিসালাতি ওয়া বেলায়েতে আলী ইবনে আবু তালিব। অর্থাৎ আল্লাহ মহান দ্বিনকে কামেল করে দেওয়ার উপর এবং নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দেয়ার উপর সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আর রেসালাতের উপর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং আবু তালিবের পুত্র আলীর বেলায়েতের জন্য সকল প্রশংসা আল্লাহর। (বেহুসের চৈতন্যদান পৃ-১৭৪-১৭৫)।
রাসুল করিম (সা:) যাহা কিছু করেন তাহা আল্লাহ মহানের ইচ্ছাতেই হয়। আর হযরত আলী (আ.) এর খিলাফত দান মহান আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়েছিল। সৃষ্টির আদিতে হযরত আদম (আ.) কে আল্লাহ রাব্বুল আল আমিন যে খিলাফত দিয়ে ছিলেন, যুগে যুগে নবী রসুলগণ যে খিলাফত এ অভিষিক্ত হযরত আলী (আ.) এর এই খিলাফত ছিল তারই ধারাবাহিকতার ফসল। এই খিলাফত ছিল রিসালত বাস্তবায়নের খিলাফত। রাসুল (সা:) এর শরীয়তের আবরণে হকিকতের খিলাফত।
এই খিলাফত জাগতিক জগতের রাজনৈতিক খিলাফত ছিল না। ভোগ লালসায় লালায়িত উমাইয়া ও আব্বাসিয়া বংশের কিছু কিছু জিঘাংশু লোকেরা আধ্যাত্বিক এই খিলাফতের ভেদ রহস্য বুঝতে না পেরে, তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রয়াসে আধ্যাত্বিক খিলাফতকে রাজনৈতিক খিলাফতের আবরনের জড়িয়ে স্বঘোষিত রাজা বনে গেলেন। আর মিহি সুরের ধ্বনী তুলে প্রচার করতে লাগলেন যে মশহুর সাহাবাদের সম্মিলিত সমর্থনের ফসল খোলাফায়ে রাশেদা। আদৌ কি তাই? তাই যদি হয় তবে প্রজ্ঞাময় আল্লাহ কেন বললেন “ইন্না আনজালনা ইলাইকাল কিত্বাবা বিল হাক্কে লিতাহকুমা বাইনান নাছি বিমা আরাকাল্লাহ (আন নিছা-১০৫)। অর্থ নাযিল করিয়াছি তোমার কাছে সত্য সহ কিতাব আল্লাহ যে জ্ঞান দান করিয়াছেন যেন সেরূপ তুমি লোকদের বিচার মিমাংসা করিয়া দাও। ওয়ালাতাকুলু লিল খায়েনি মা খাছিমাও। খেয়ানতকারী পক্ষ পাতিত্ব করিও না। রসুল (সা:) তার আমানত সঠিকভাবে সঠিক স্থানে অর্পন করেছেন খেয়ানত করেন নি।
প্রবন্ধ – বড়পীর আব্দুর কাদের জীলানী রহ. এর শিক্ষা
লেখক – মোস্তাক আহমেদ
আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য প্রত্যেক মুমিনের তরিকত সাধনা তথা বায়াত গ্রহণ ইসলামে অপরিহার্য বিষয় অথচ আমরা অজ্ঞতা ও ধর্মীয় গোড়ামীর কারণে এই মহান নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হয়েছি। আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য যুগে যুগে কালে কালে নবী রাসুল, অলি-আল্লাহ তথা পীর-মুর্শিদের হাতে বায়াত হয়ে লক্ষ লক্ষ মানব আল্লাহর মহান অনুগ্রহধন্য হয়েছেন। বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রা.) সেই তরিকত শিক্ষা ও সাধনারই মহান দিকপাল। সকল কুতুবের শিরোমণি হিসেবে তিনি বড়পীড় ও গাউসে পাক ‘মহিউদ্দীন’ খেতাবে অভিষিক্ত। তিনি বিশ্ব মুসলিম জাতির তরিকত শিক্ষা ও সাধনার পথ দেখিয়েছেন। এই শিক্ষা তিনি স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে লাভ করেছেন এবং প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের মনোনীত যুগপ্রতিনিধি হিসেবে অলি-আবদাল, গাউস-কুতুব, পীর-মাশায়েখদের বেলায়েতি মিশন বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেছেন।
৫১১ হিজরীর কোন এক শুক্রবার দিন হযরত গাউসে পাক (রা.) নগ্নপদে বাগদাদ শহরের দিকে আসছিলেন। এমন সময় পথিপার্শ্বে একজন জরাজীর্ণ বৃদ্ধকে তিনি শায়িত অবস্থায় দেখতে পেলেন। উক্ত বৃদ্ধ সালাম দিয়ে হযরত গাউসে পাককে বললেন― ‘আমাকে ধরে তুলুন, আমি শক্তিহীন।’ হযরত বড়পীর সাহেব তাকে তুলে বসালেন। তখন উক্ত জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ ধীরে ধীরে জরামুক্ত হতে লাগলো এবং বললো― ‘আমি ইসলাম ধর্ম, লোকের কুসংস্কারে আমি দুর্বল হয়ে পড়েছি। আপনার সাহায্যে আমি নবজীবন লাভ করলাম।’ এ ঘটনার পর হযরত গাউসে পাক বাগদাদে প্রত্যাবর্তন করে কোন এক জামে মসজিদে জুমা পড়ার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করতেই লোকেরা তাঁকে ‘মহিউদ্দীন’ নামে সম্বোধন করতে লাগলো। তখন থেকেই তাঁর এগার নামের মধ্যে এক নাম হয় ‘মহিউদ্দীন’ বা দ্বীনের নবজীবন দানকারী। সত্যিই তাঁর অসংখ্য কারামত ও সংস্কারমূলক কাজই এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
তাঁর জন্মকালীন ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। হযরত গাউসুল আজম বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রা.) ৪৭১ হিজরীতে রমজান মাসের ১লা তারিখে সোব্হে সাদেকের কিছু পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেদিনই প্রথম রোজা পালন করেন। সারাদিন মাতৃদুগ্ধ পান করা থেকে বিরত থাকেন। সূর্যাস্তের পর তিনি মাতৃদুগ্ধ দ্বারাই ইফতার করেন।
গাউসে পাকের পিতা হযরত সৈয়দ আবু সালেহ মুসা জঙ্গী (র.) ও মাতা সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমা (র.)-এর শুভ বিবাহের পর নিঃসন্তান অবস্থায় বহু বৎসর কেটে যায়। পিতা বৃদ্ধ, মাতাও বৃদ্ধা। সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমার বয়স তখন ৬০ বৎসর। এ বয়সে সাধারণতঃ সন্তান ধারণের ক্ষমতা থাকেনা। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে এ বয়সেই তিনি গর্ভে ধারণ করলেন জগত বিখ্যাত ও সর্বশ্রেষ্ঠ অলী গাউসুল আজম আবদুল কাদের জিলানী (রা.)-কে। হযরত গাউসুল আজম বড়পীর মায়ের গর্ভে আসার পরপরই শুরু হয় কারামতের অপূর্ব খেলা। প্রথম মাসেই বিবি হাওয়া (আ.) স্বপ্নে ধরা দিলেন সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমার সাথে। তিনি বলে গেলেন, তোমার গর্ভে গাউসুল আজমের আগমন হয়েছে। তুমি ধন্য। দ্বিতীয় মাসে বিবি সারাহ (আ.) এসে সুসংবাদ দিলেন তোমার ঘরে মারেফাত এর খনির আগমন হয়েছে।
তৃতীয় মাসে বিবি আছিয়া এসে সুসংবাদ দিলেন; তোমার ঘরে ভেদতত্ত্বের মালিক আগমন করেছেন। চতুর্থ মাসে বিবি মরিয়ম, পঞ্চম মাসে বিবি খাদিজা (রা.), ৬ষ্ঠ মাসে হযরত আয়েশা (রা.) এসে খবর দিলেন― তোমার ঘরে অলীকুল শিরোমণি আগমন করবেন। সপ্তম মাসে নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা (রা.) স্বপ্নে বলে গেলেন― উম্মুল খায়ের! তোমার ঘরে আমার বংশের নয়নমনির আগমন হচ্ছে। অষ্টম মাসে বিবি জয়নব, নবম মাসে বিবি ছকিনা (রা.) স্বপ্নে বলে গেলেন― তোমার সন্তানের গুনে জিলানভূমি ধন্য হবে। এভাবে শুভ স্বপ্ন দেখতে দেখতে নয় মাস কেটে গেলো। দশম মাসের পহেলা রমজানের রাত্রির শেষভাগে সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ ধরে বিশ্বজগতকে আলোকিত করে ধরার বুকে আগমন করলেন গাউসুল আজম বড়পীর মহিউদ্দীন মুহাম্মদ আবদুল কাদের জিলানী (রা.)। তাঁর আগমনে ইসলাম পুনঃজীবন লাভ করলো।
নবী করিম (সা.) হাদিসে বলেছেন― ‘শত্রুর সাথে জেহাদ করা হলো ছোট জেহাদ, কিন্তু নফসের বিরুদ্ধে জেহাদ করা হচ্ছে বড় জেহাদ।’ ষড়রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাসর্য) হচ্ছে নফস। একে নফসে আম্মারা বা কু-প্রবৃত্তি বলা হয়। এই রিপুগুলোকে নিয়ন্ত্রণ বা আজ্ঞাধীন করার জন্য যে সাধনা করা হয়, তাই তরিকতের শিক্ষা ও সাধনা। এজন্য একজন পীর বা মুর্শিদের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে সিদ্ধি লাভ করা যায় না। এজন্যই কোরআন মজিদে বার বার অলীদের সংশ্রবে থাকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ঈমান ও আমল ঠিক করার পর মুর্শিদ অনুসন্ধান করা কোরআন এর নির্দেশ ‘ওয়াবতাগু ইলাইহিল ওয়াছিলা’ এবং ‘ওয়া কুনু মাআছ ছাদেকীন’ দুটি আয়াতে পীরের নিকট বাইয়াত হওয়ার প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাছাড়া সুরা কাহাফের ১৭ নং আয়াতে অলী ও মুর্শিদের কথা সরাসরি বলা হয়েছে। ―তাফসীরে রুহুল বয়ান
ইসলামে তরিকত শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমরা গাউসে পাক বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রা.) থেকে মহান শিক্ষা পাই। কারণ তিনি মাদারজাত অলী হওয়া সত্ত্বেও হযরত আবু ছাঈদ মাখযুমী (রা.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে কঠোর সাধনার মাধ্যমে গাউছিয়তে উজমা (গাউসুল আ’জম) মর্যাদা লাভ করেন। এই বাইয়াত রাসুল করিম (সা.)-এর সুন্নাত। ‘ইরগামুল মুরিদিন’ নামক আরবী গ্রন্থে লিখিত আছে― একজন জীবিত মুর্শিদের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করা সুন্নাত। হযরত গাউসুল আ’জম (রা.) পীরের হাতে বাইয়াত হওয়ার পর কঠোর রিয়াজতে মগ্ন হয়ে পড়েন। যখন উপযুক্ত সময় হলো, তখন তাঁর পীর-মুর্শিদ হযরত আবু ছাঈদ মাখযুখী (রা.) তাঁকে খেরকা (খেলাফতের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ পোষাক) পরিধান করিয়ে দেন এবং নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন। হযরত আবু ছাঈদ মাখযুমী (রা.) ৫১৩ হিজরীর ১লা মুহররম ওফাত প্রাপ্ত হন। কিভাবে তিনি খেলাফাত লাভ করেন তাঁর বর্ণনা তিনি নিজেই দিয়েছেন।
হযরত বড়পীর গাউসুল আ’জম (রা.) বলেন― ‘একদিন আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছিল। এমন সময় আমার পীর হযরত আবু ছাঈদ মাখযুমী (রা.) এসে বললেন― ‘তুমি আমার বাড়ি চলো।’ একথা বলেই তিনি নিজ বাড়িতে চলে গেলেন। কিন্তু আমার লজ্জাবোধ হওয়াতে আমি ইতস্ততঃ করছিলাম। এমন সময় খিজির আলাইহিস সালাম এসে আমাকে যাওয়ার জন্য তাগিদ করলেন। আমি পীরের বাড়ি গিয়ে দেখি― তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমাকে দেখে বললেন― ‘আবদুল কাদের! আমার বলাই কি যথেষ্ঠ ছিল না? আবার খিজির আলাইহিস সালামের বলার প্রয়োজন হলো! একথা বলেই তিনি আমার জন্য খাবার নিয়ে আসলেন এবং নিজ হাতে আমাকে খাওয়াতে লাগলেন। আমার শায়খের হাতের প্রতিটি লোকমায় আমার অন্তরে নূর ভরে যেতো। এরপর তিনি আমাকে খেরকা পরিধান করিয়ে দেন।’
উক্ত খেরকা পরিধান করার পর হযরত গাউসুল আ’জমের ওপর আল্লাহ তায়ালার নানাবিধ রহমত, বরকত ও তাজাল্লী অধিক পরিমাণে প্রকাশ পেতে লাগলো। এখান থেকে গাউসে পাকের তরিকত শিক্ষার সূচনা ও সাধনার পথ শুরু হলো। হযরত গাউসে পাকের পীর হযরত আবু ছাঈদ মাখযুমী (রা.) বাগদাদ শরিফের ‘বাবুশ শাইখ’ নামক স্থানে বাবুল আযাজ নামে একটি উচ্চমানের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইনতিকালের পূর্বে তিনি উক্ত মাদ্রাসার দায়িত্বভার গাউসুল আ’জমের ওপর অর্পণ করে যান। ৫১৩ হিজরী হতে আরম্ভ করে ৫৬১ হিজরীতে ইনতিকাল সময় পর্যন্ত গাউসে পাক উক্ত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত হতে অসংখ্য তালেবে এলেম এসে গাউসে পাকের নিকট কোরআন, হাদিস, তাফসীর, ফিকহ, নাহু ছরফ, আরবী সাহিত্য ও তাসাউফ শিক্ষা করে যুগবরেণ্য আলেম ও আল্লাহর মহান অলীয়ে কামেলে পরিণত হন। উক্ত মাদ্রাসা প্রাঙ্গনেই বর্তমানে গাউসে পাক বড়পীর এর মাযার শরিফ অবস্থিত। সুদীর্ঘ ৯০ বছর হায়াত পেয়ে ৫৬১ হিজরীর রবিউস সানী মাসের ১১ তারিখে বাগদাদ শরিফে বর্তমান মাজার শরিফ সংলগ্ন খানকায় তিনি ইনতিকাল করেন।
হযরত গাউসে পাক (রা.) ৫২১ হিজরীতে ৫০ বছর বয়সক্রমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রূহানি নির্দেশে বিবাহিত জীবনে প্রবেশের পরপরই সে বৎসরই তিনি ওয়াজ নসিহত ও হেদায়াতের কাজের জন্য নির্দেশিত হোন। রাসুল করিম (সা.) ঐ বৎসর ১৬ই শাওয়াল রাত্রে স্বপ্নে হযরত গাউসে পাককে ওয়াজ নসিহত করার নির্দেশ দেন। হযরত গাউসে পাক পারস্যবাসী বলে আরবী উচ্চারণে আরবদের সমকক্ষ ছিলেন না বলে জানালে নবী করিম (সা.) স্বপ্নে সামান্য থুথু মোবারক তাঁর জিহ্বায় ঢেলে দেন। এই থুথু মোবারকের বরকতে গাউসে পাকের জবান খুলে যায় এবং তিনি বেলায়াতের গুপ্তদ্বারের সন্ধান লাভ করেন। পরদিন থেকে তিনি ওয়াজ নসিহত শুরু করেন।
তাঁর ভাষার লালিত্বে, বাচনভঙ্গিতে এবং ভাবের গভীরতায় ওয়াজ মজলিশে দুচারজন করে লোক বেঁহুশ হয়ে মারা যেত। হুজুর (সা.)-এর বেলায়াত জ্ঞান দানের বরকতে তাঁর ওয়াজ মজলিশে লক্ষাধিক লোকের সমাগম হতো। প্রায় চারশত পন্ডিত ব্যক্তি তাঁর ওয়াজ লিখে রাখতেন। এভাবে জগতময় গাউসে পাকের নাম ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় তাঁর একটি কারামত প্রকাশ হয়ে পড়ে। মজলিশের সবচেয়ে পিছনের লোকটিও সামনের লোকের মত সমান আওয়াজে গাউসে পাকের ওয়াজ শুনতেন। এমনকি বাগদাদ থেকে ৫০০ কি. মি. দূরের শহর মোসেলে বসেও অনেক লোক বাগদাদ শরিফে গাউসে পাকের প্রদত্ত ওয়াজ শুনতেন। বর্তমান যুগে ইথারের তরঙ্গের মাধ্যমে মানুষের মুখের কথা পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ছে। ঐ যুগে গাউসে পাকের বাণী বহন করে নিয়ে যেতো ইথারের তরঙ্গরাজী। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহপাকই আপন অলীদেরকে এই অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী করে থাকেন। ইহা গাউসে পাকের খাস কারামত।
এ প্রসঙ্গে মোসেল নিবাসী বিখ্যাত পীর ও গাউসে পাকের মুরিদ হযরত আদি বিন মুসাফির (র.)-এর একটি ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য। আদি বিন মুসাফির (র.) বাগদাদ শরিফে হযরত গাউসে পাকের ওয়াজ মজলিশে সবসময় উপস্থিত থাকতেন এবং ওয়াজ শুনতেন। গাউসে পাক শুক্র, শনি ও রবি এই তিনদিন তিন জায়গায় ওয়াজ করতেন। একদিন আদি বিন মুসাফির (র.) আরজ করলেন― ‘ইয়া গাউসে পাক! আমার মন আপনাকে ছেড়ে যেতে চায় না। তবুও দেশে যেতে হয় কিন্তু দুর্ভাগ্য, আপনার এই মূল্যবান ওয়াজ থেকে আমি বঞ্চিত হবো।’ গাউসে পাক (রা.) বললেন― ‘তুমি আমার ওয়াজের নির্ধারিত সময়ে মোসেল বাসীদের নিয়ে কোন পাহাড়ের পাদদেশে একটি বৃত্ত এঁকে তার মধ্যে সকলকে নিয়ে বসে যাবে। ইনশাআল্লাহ তোমরা সকলেই সেখানে বসে আমার ওয়াজ নসিহত শুনতে পাবে।’
উপদেশ মোতাবেক আদি বিন মুসাফির (র.) তাই করলেন। তিনি বলেন― ‘আমাদের মনে হতো যেন আমাদের মাথার ওপরে মেঘের মিনারে বসে হযরত গাউসে পাক বক্তৃতা দিচ্ছেন, আর আমরা শুনছি।’ এখানে দেখা যায়, বার্তা প্রেরক একজন অলী এবং বার্তা ধারকও আর একজন অলী। আর বার্তাবাহক হচ্ছেন আল্লাহর ইথার তরঙ্গ। আল্লাহ আপন প্রিয় ও মাহবুব বান্দার খেদমতে এমনিভাবেই তার সৃষ্টিজগতকে বশীভূত করে দেন। হযরত শেখ সাদীর একটি বায়েতের অনুবাদ খুবই হৃদয়গ্রাহী―
এক সিজদা কর যদি মহা প্রভুর দ্বারে,
নত হবে শত শীর তব পদতলে।
তিনি কাছিদা গাউছিয়ায় বলেন― ‘ওয়া ওয়াল্লানী আলাল আক্তাবে জাম্আন, ফা-হুক্মী নাফিজুন ফি কুল্লি হালী’ অর্থাৎ ‘আল্লাহপাক আমাকে সকল কুতুবের ওপর কর্তৃত্ব দান করেছেন। আমার আদেশ সর্বাবস্থায়ই কার্যকর থাকবে।’ মূলকথা হলো : হযরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রা.) সর্বযুগের শ্রেষ্ঠতম অলী এবং সকল অলীদের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব বহাল থাকবে। হযরত গাউসুল আ’জম (রা.)-কে মহিউদ্দীন মুহাম্মদ বিন-নাজজার তাঁর ইতিহাসে যুগের শ্রেষ্ঠতম ইমাম বলে উল্লেখ করে বলেছেন― ‘ফিকহ ও হাদিসে গাউসে পাকের জ্ঞান ছিল অসাধারণ। তিনি নির্জন স্থানে পড়াশুনা করতে ভালবাসতেন। অধিকাংশ সময় তাইগ্রীস (দজলা) নদীর তীরে, বনে জঙ্গলে, কখনও বা নির্জন প্রান্তরে বসে বসে তিনি ফিকাহ শাস্ত্র অধ্যয়ন করতেন। তিনি বেলায়েতের শাহানশাহ হযরত মাওলা আলী মুর্তজা (ক.) থেকে বেলায়েতের গুপ্তজ্ঞানের ভান্ডার থেকে সকল প্রকার জ্ঞানের অমৃতসুধা পান করে গাউসে পাকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
আল্লাহর মহান অলীদের কারামত নবীগণের মোজেজার ন্যায় সত্য ও আল্লাহ কর্তৃক বিশেষ কুদরতের সাক্ষরস্বরূপ। নবীদের ক্ষেত্রে যা মোজেজা অলীদের ক্ষেত্রে তা কারামত। গাউসে পাকের কারামত বেলায়াতের উচ্চতর মাকামের পরিচায়ক ও অলীদের গুপ্তজ্ঞানের ভেদরহস্যের উজ্জল সাক্ষর বহনকারী। সমস্ত অলীগণের গুপ্তজ্ঞানের বিকাশস্থল হলেন গাউসে পাক (রা.)। আর গাউসে পাকসহ সকল কুতুবগণের গুপ্তজ্ঞান ও বেলায়াতের কেন্দ্রবিন্দু হল শেরে খোদা মাওলা আলী মুরতাজা মুশকিল কুশা (ক. ওয়াজহাহু)।
মহান আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার পর মক্কা শরিফের অদূরে নোমান পাহাড়ের পাদদেশে, মতান্তরে বেহেস্তে তাঁর পৃষ্ঠদেশ হতে কেয়ামত পর্যন্ত আগমনশীল সমস্ত সন্তানগণের রূহকে মর্তবা অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে দলবদ্ধভাবে দাঁড় করালেন। আম্বিয়ায়ে কেরামের শ্রেণি, আউলিয়ায়ে কেরামের শ্রেণি, ওলামায়ে কেরামের শ্রেণি, সাধারণ মুমিনগণের শ্রেণি ও কাফেরদের শ্রেণি পৃথক পৃথকভাবে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেলো। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাঁর একত্ববাদ স¤পর্কে সকলকে জিজ্ঞাসা করলেন― ‘আলাস্তু বিরাব্বিকুম’ আমি কি তোমাদের রব নই? তদুত্তরে সকলে একের পর এক বলতে লাগলো― ‘কালু বালা’― ‘হ্যাঁ’; ‘আপনি আমাদের প্রভু।’ এই অঙ্গীকারকে রোজে আজলের অঙ্গীকার বলা হয়।
হযরত আদম (আ.) অবাক বিস্ময়ে আরজ করলেন― ‘হে আল্লাহ! এরা কারা?’ মহান আল্লাহপাক বললেন― ‘এরা তোমার আওলাদ।’ হযরত আদম (আ.) লক্ষ করলেন― আউলিয়ায়ে কেরামের সারি হতে একজন লোক আম্বিয়ায়ে কেরামের দলে শামিল হওয়ার জন্য অগ্রসর হতে চায়, আর ফেরেস্তারা বার বার তাঁকে আউলিয়ায়ে কেরামের দলে ধরে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু ধরে রাখতে পারছিলেন না। অবশেষে গায়েবী আওয়াজ হলো― ‘হে মুহিউদ্দীন! স্থির হও। তোমার মধ্যে নবীগণের দলভুক্ত হওয়ার মত যোগ্যতা আছে বটে। কিন্তু তোমাকে সর্বশেষ নবীর উম্মত করেই প্রেরণ করা হবে। তবে জেনে রেখো, তোমাকে আউলিয়াকূলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হবে। তোমার পদযুগল আউলিয়াগণের কাঁধের ওপর হবে। অতঃপর তিনি শান্ত হয়ে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করলেন।’ ―সূত্র : হযরত গাউসুল আজম : মাওলানা নূরুর রহমান
এমন আলেমে হক্কানী রাব্বানী ও আউলিয়ায়ে কেরাম সম্পর্কেই হুজুর আকরাম (সা.) এরশাদ করেছেন― ‘উলামায়ু উম্মাতি কাআন্নাবিয়্যি বানি ইসরাঈল’ অর্থাৎ ‘আমার উম্মতের জাহেরি-বাতেনি ওলামাগণ জ্ঞান ও ধ্যানের ক্ষেত্রে বণী ইসরাইলের নবীগণের ন্যায়।’ ―সূত্র : তাফসীরে নাঈমী- মুফতী আহমদ ইয়ার খান
প্রকাশ থাকে যে, নবী করিম (সা.) যেদিন মেরাজে গমন করেন, সেদিন হযরত জিবরাঈল (আ.), মিকাঈল (আ.) ও ইসরাফিল (আ.) ৭০ হাজার ফেরেস্তাসহ বোরাক নিয়ে মক্কা মোয়াজ্জমায় বিবি উম্মে হানির ঘরের সামনে হাজির হয়ে নবী করিম (সা.)-কে উর্ধ্বজগতে ভ্রমণের জন্য প্রস্তুত করে বোরাকে আরোহণের অনুরোধ করেন। কিন্তু বোরাক একটু নাজ ও নখ্রা করে দুলছিল। নবী করিম (সা.) আরোহণ করতে একটু অসুবিধা বোধ করছিলেন। এমন সময় হযরত গাউসুল আজমের রূহ মোবারক সুরত ধারণ করে নিজের কাঁধ পেতে দিলেন। নবী করিম (সা.) তাঁর কাঁধে পা রেখে বোরাকে সওয়ার হয়ে বললেন― ‘যেভাবে এখন আমি আমার পা তোমার কাঁধের ওপর স্থাপন করলাম, সেভাবে আমার উম্মতের অলীগণের কাঁধের ওপরও তোমার পা স্থান পাবে।’
―সূত্র : গাউসুল আজমের জীবনী ও কারামত : মাওলানা নূরুর রহমান।
হযরত গাউসুল আজম তো নবী পাকের আহলে বায়েত। সুতরাং নবী পাকের সাথে তাঁর স¤পর্ক খুবই ঘনিষ্ট― রূহানী ও জিসমানী উভয় দিক থেকে। গাউসে পাকের বেলায়াতের জ্ঞান ও ভেদরহস্য শেরে খোদা মাওলা আলী মুশকিল কুশা (ক. ওয়াজহাহু) জ্ঞানরাজ্যের গুপ্তভান্ডার থেকে উৎসারিত। কাশ্ফের মাধ্যমে অবগত বিষয়কে অস্বীকার করা যায় না। এ ঘটনাটি বেলায়াতের জ্ঞানবৃক্ষের সবুজ পাতা থেকে মুক্তার দানা ছড়িয়ে গাউসে পাকের রূহানী জগতকে আন্দোলিত করেছে। যে জগতের বিস্তৃতি ব্যাপক ও অসীম খোদা তালার জ্ঞানরাজ্যের সামান্য নিদর্শনমাত্র।
মাওলানা নূরুর রহমান তাঁর সংকলিত গাউসুল আজম বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী গ্রন্থে লিখেছেন― ‘হযরত গাউসে পাক স্বয়ং বলেন, মিরাজ শরিফের রাত্রে যখন হুজুর (সা.) সিদরাতুল মুন্তাহা নামক স্থানে তশরীফ নিলেন, তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) থেমে গেলেন এবং বললেন― ‘আমি যদি আর এক কেশাগ্র পরিমাণ অগ্রসর হই, তাহলে আল্লাহর নূরের তাজাল্লীতে আমার নূরের পাখা জ্বলে যাবে।’ তখন আল্লাহ তায়ালা আমার (আবদুল কাদের) রূহকে হুজুরে আকরাম (সা.)-এর দরবারে হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন এবং আমি হুজুরের কদমবুচী করার সৌভাগ্য অর্জন করলাম। হুজুর (সা.) আমাকে বললেন― ‘হে প্রিয় বৎস! আজ আমার কদম তোমার কাঁধের ওপর, তোমার কদমও সমস্ত আউলিয়া দের কাঁদের ওপর হবে।’
কোন কোন মাশায়েখ আরও রেওয়ায়াত করেছেন যে, মিরাজ শরিফ এ যখন নবী করিম (সা.) আরশ মোয়াল্লায় গমন করলেন, তখন আরশকে উচু দেখতে পেলেন। কিভাবে আরশে আরোহণ করবেন, সে বিষয়ে তিনি চিন্তা করলেন। এমন সময় এক নূরানী যুবক সামনে এসে কাঁধ পেতে দিলেন। হুজুর (সা.) তাঁর কাঁধে পা মোবারক রেখে আরশে আরোহণ করলেন। এমন সময় গায়েবী আওয়াজ ভেসে আসলো― ‘হে হাবীব! ইনি আপনার বংশের সন্তান। তাঁর নাম হবে মুহিউদ্দীন আবদুল কাদের।’ নবী করিম (সা.) এবারও খুশী হয়ে বললেন― ‘আমার কদম তোমার কাঁধে, তোমার কদম অলীদের কাঁধে হবে।’ উপরে বর্ণিত ঘটনাগুলো বেলায়াতের উচ্চতর মাকামের অন্তর্ভুক্ত কাশ্ফের দ্বারা উদ্ঘাটিত।
হযরত গাউসুল আজমের আম্মাজান সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমা (র.) বলেন― ‘যেদিন আমার সন্তান ভূমিষ্ট হয়, সেদিন আমার স্বামী সৈয়দ আবু সালেহ মুসা জঙ্গী স্বপ্নে দেখেন, নবী করিম (সা.) প্রধান সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে আমাদের ঘরে তশরীফ আনলেন এবং আমার স্বামীকে বললেন― ‘ইয়া আবু সালেহ্ আ’তাকল্লাাহু ইব্নান ছলিহান ওয়াহুয়া ওয়ালাদী ওয়া মাহ্বুবি ওয়া মাহ্বুবুল্লাহি সুব্হানাহু ওয়াতা‘আলা ওয়া সাইয়াকুনু লাহু শানুন ফীল আউলিয়ায়ি ওয়াল আক্তাবি কাশানি বাইনাল আন্বিয়ায়ি ওয়ার রাসুলি।’
অর্থাৎ ‘হে আবু সালেহ! আল্লাহপাক তোমাকে একজন নেক্কার ছেলে সন্তান দান করেছেন। সে আমার বংশধর, আমার প্রিয় এবং আল্লাহ সুবহানাহুরও প্রিয়। সে শীঘ্রই আউলিয়া ও কুতুবগণের মধ্যে এমন মর্যাদা লাভ করবেন, যেমন আম্বিয়া ও রাসুলগণের মধ্যে আমার মর্যাদা।’―সূত্র : গাউসুল আজম : মাওলানা নূরুর রহমান
হযরত বড়পীর (রা.) মাতৃগর্ভে থাকাকালীন অলৌকিক ক্ষমতাবলে ব্যাঘ্ররূপ ধারণ করে এক ভন্ড ফকিরকে হত্যা করে মায়ের আবরু রক্ষা করেছিলেন। সে ঘটনাটি ছিল এরূপ―
একদিন এক ভিক্ষুক ভিক্ষার উদ্দেশ্যে হযরত সৈয়দ আবু সালেহ মুসা জঙ্গী (র.)-এর বাড়িতে এসে ভিক্ষা চাইতে লাগলো। ঘটনাক্রমে সেদিন বাড়িতে পুরুষ লোক কেউ ছিলেন না। ভিক্ষুক ক্ষুধার তাড়নায় কাকুতি মিনতি করতে লাগলো। পুণ্যবতী সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমা (র.) দয়া পরবশ হয়ে পর্দার আড়াল থেকে কিছু খানা ভিক্ষুককে বাড়িয়ে দিলেন। খানা খেয়ে ভিক্ষুক খালী বাড়ি দেখে অন্দর মহলে প্রবেশ করতে উদ্যত হলো। সৈয়দা উম্মুল খায়ের দিশেহারা হয়ে ভিক্ষুকের হাত থেকে বাঁচবার জন্য খোদার কাছে ফরিয়াদ করতে লাগলেন। আল্লাহর কুদরতে জননীর এই চরম বিপদের সময় হযরত আবদুল কাদের জিলানীর রূহ মোবারক মাতৃগর্ভ হতে বের হয়ে একটি বাঘের রূপ ধারণ করে মুহূর্তের মধ্যে ভিক্ষুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তাকে হত্যা করে পুনরায় মাতৃগর্ভে প্রবেশ করলেন। জননী কিছু টের করতে পারলেন না। তিনি শুধু এতটুকুই দেখতে পেলেন যে, কোথা হতে একটি বাঘ এসে ভিক্ষুককে হত্যা করে আবার কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
পরবর্তীতে কোন এক সময় গাউসুল আজমের আম্মাজান কোন কারণে একটু রাগ করে বলেছিলেন, ‘আবদুল কাদের! তোমার জন্য তোমার শিশুকালে কত কষ্ট করেছি― মনে আছে কি? এটা ছিল সন্তানের প্রতি মায়ের আদরের শাসন।’ হযরত বড়পীর সাহেবও বলে ফেললেন― ‘আমিও তো গর্ভকালীন সময়ে আপনার একটি উপকার করেছিলাম। সে কথা কি আপনার মনে নেই?’ এ কথা শুনে মাতা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন― ‘সেটা কি?’ হযরত বড়পীর সাহেব (রা.) বললেন― ‘ভিক্ষুককে যে বাঘটি হত্যা করে আপনার আবরু রক্ষা করেছিল, সে তো আমিই ছিলাম।’ একথা শুনে সৈয়দা উম্মুল খায়ের অবাক বিস্ময়ে মনে মনে ভাবলেন― ‘আমার এ সন্তান কোন সাধারণ সন্তান নন সে কালে আল্লাহর পরম বন্ধুরূপে গণ্য হবে।’ এরপর থেকে তিনি আর কোন দিন পুত্রের প্রতি বিরক্ত হননি।―সূত্র : মানাক্বেবে গাউসিয়া
হযরত গাউসুল আজমের জন্ম ছিল আধ্যাত্মিক ও রূহানী জগতে মুসলিম মিল্লাতের নবজাগরণ স্বরূপ। মুসলমানগণ যখন নানা ভ্রান্ত আক্বিদা ও মতবাদে জর্জরিত সেই ক্রান্তিকালে তৎকালীন পারস্য, বর্তমান কালের ইরাক দেশের অন্তর্গত জিলান বা গীলান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন হাসান বংশীয় এবং মাতা হোসাইন বংশীয়। উভয় দিক থেকে তিনি সৈয়দ ও আওলাদে রাসুল (সা.)। নবী করিম (সা.)-এর পবিত্র রক্তধারা গাউসে পাকের শরীরে প্রবাহমান। সকল অলীগণের গর্দানে তাঁর পবিত্র কদম মুবারক স্থাপিত। এজন্যই তাঁর লকব ‘মালিকুর রিকাব’। ‘মানাক্বেবে গাউছিয়া’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, হযরত গাউসুল আ’জমের আম্মাজান সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমা (র.) বর্ণনা করেছেন― ‘আবদুল কাদের রমজান শরিফের প্রথম রাত্রে জন্মগ্রহণ করেছেন। জন্মদিন থেকেই দিনের বেলায় তিনি আমার দুধ পান করেননি। ইফতারের সময় থেকে সোব্হে সাদেক পর্যন্ত সারারাত্র তিনি দুধ পান করতেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর এ কারামত সারা জিলান শহরে রাষ্ট্রময় ছড়িয়ে যায়।’
৪৭১ হিজরীর শাবান মাসের ২৯ তারিখ জিলানের আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। লোকেরা রমজানের চাঁদ দেখতে না পেয়ে পরদিন সাবধানতাবশতঃ সেহেরি খেয়ে নিলেন এ আশায় যে, হয়তো অন্য কোন স্থান থেকে চাঁদ দেখার সংবাদ আসতে পারে। পরদিন একজন আল্লাহওয়ালা দরবেশের নিকট চাঁদের বিষয়ে জানতে চাইলে উক্ত দরবেশ বললেন― ‘আবু সালেহ মুসা জঙ্গীকে জিজ্ঞাসা করো; তাঁর নবজাত সন্তান আজকে সোব্হে সাদেক থেকে মায়ের দুধ পান করেছে কিনা।’ খবর নিয়ে দেখা গেল― নবশিশু সোব্হে সাদেক থেকে দুধ পানে বিরত রয়েছেন। এমন সময়ই খবর হলো― গতকাল চাঁদ দেখার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
জিলান শহরের লোকেরা এই সংবাদ জেনে হযরত গাউসুল আজম বড়পীর এর প্রথম রোজা রাখার কারামত দর্শনে হতবাক হয়ে গেল। দেশের জাহেরি আলেম উলামাগণ আকাশের নবচাঁদ দর্শনে বিফল হলেও বাতেনি শক্তির অধিকারী গাউসে পাক (রা.) ঠিকই চাঁদ দর্শন করে প্রথম রোজা পালন করেছিলেন। এখানে এসেই প্রকৃত নায়েবে নবীর পরিচয় পাওয়া যায়। শিশুকালে গাউসে পাকের জেকের-আজকার ও দোলনায় থাকাকালীন তাঁর রোজা রাখার প্রতি ইঙ্গিত করেই পরবর্তীকালে তিনি নিজেই একটি কাছিদায় একথা উল্লেখ করেছেন। ‘তারগীবুল মানাজির’ নামক গ্রন্থে উক্ত কাছিদার সংশ্লিষ্ট পঙতি উল্লেখ করা হয়েছে। কবিতাংশটি নিম্নরূপ―
‘বিদা‘আতু আম্রি জিক্রুহু মালাআ ফাযা ওয়া সাওমি ফী মাহ্দিবিহী কানা’
অর্থ― ‘আমার শৈশবকালের জিকির-আজকারে সমগ্র জগত পরিপূর্ণ হয়ে আছে। আর শৈশবের দোলনায় আমার রোজা পালনের ব্যাপারটি তো প্রসিদ্ধিই লাভ করেছে।’ ―সূত্র : তারগীবুল মানাজির
‘তাফরিহুল খাতির ফি মানাকিবে শেখ আবদুল কাদের’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে।
৫০৯ হিজরী সনে ৩৮ বৎসর বয়সে হযরত গাউসুল আজম (রা.) হজ্ব পালন উপলক্ষে মদিনা মোনাওয়ারায় গমন করে নবী করিম (সা.)-এর রওজা মোবারকের পাশে দাঁড়িয়ে নিম্নের দুখানা শের আবৃত্তি করলেন―
‘ফী হালাতিল বা’দি রূহী কুনতু য়ুরসিলুহা
তুকাব্বালুল আরদা আন্নি ওয়া হিয়া নায়িবাতি
ওয়া হাজিহী নাওইয়াতুল আসবায়ি ক্বাদ হাদারাত
ফামদুদ ইয়ামিনাকা কাই তুহ্জা বিহা সাফাতি।’
অর্থাৎ ‘দূরে অবস্থানকালে আমি আমার রূহকে উপস্থিত করতাম, আর সে আমার পক্ষ হতে প্রতিনিধি হয়ে এই পবিত্র জমিন চুম্বন করতো। এখন স্বশরীরের পালা। আমি নিজে স্বশরীরে উপস্থিত হয়েছি। ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি অনুগ্রহ করে ডানহাত মোবারক ওপরে তুলে দিন। (চুম্বন করে) আমার ঠোঁট দুটি ধন্য হোক।’
উক্ত কবিতা পঙ্তি আবৃত্তি করার সাথে সাথে নবী করিম (সা.) আপন ডানহাত মোবারক বের করে দেন। হযরত গাউসুল আজম (রা.) উক্ত হাত মোবারক চুম্বন করে ধন্য হন।―সূত্র : তাফরিহুল খাতির
সুতরাং আল্লাহপাক আমাদের ভ্রান্তবাদী আক্বিদা ও ফেরকাবাজীর মতপার্থক্যের বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করে আউলিয়ায়ে কেরামদের অনুসরণীয় আল্লাহ ও নবীর মনোনীত সিরাতুল মুস্তাকীমের পথে দাখিল করুন। আমীন। আমরা যেন অলি-আল্লাহ ও পীর-মুর্শিদ এর হাতে বায়াত হয়ে আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক আকা মওলা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি অধিকহারে দরুদ ও সালতোচ্ছালাম পাঠ করার মাধ্যমে পীর-মুর্শিদের দামান ধরে ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তি লাভ করতে পারি। আমীন।
তথ্যসূত্র :
১. নুজহাতুল খাতিরিল ফাতির-ফি তারজিমাতে সাইয়েদীশ শরীফ আবদুল কাদের জিলানী (রা.) : মোল্লা আলী কারী (র.)।
২. বাহজাতুল আসরার : বড়পীর গাউসুল আযম দস্তগীর হযরত সৈয়্যেদেনা আব্দুল কাদের জিলানী (রা.) : ইমাম নূরুদ্দীন আবুল হাসান শাতনুফী লাখমী মিশরী (র.)।
৩. সিররুল আসরার: বড়পীর গাউসুল আযম দস্তগীর হযরত সৈয়্যেদেনা আব্দুল কাদের জিলানী (রা.)
৪. কাউলুল জামীল বা উর্দু শেফা-উল আলীল : হযরত শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী (র.)।
৫. গাউসুল আজম (রা.) এর জীবনী : মাওলানা নূরুর রহমান
৬. মোজেজায়ে আম্বিয়া ও কারামাতে আউলিয়া : অধ্যক্ষ হাফেজ এম এ জলিল (র.)
প্রবন্ধ – সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ এর বিষাক্ত ছোবল
লেখক – ফরহাদ রহমান দিনার
ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে মনুষ্য জাতি আজ ভুলে গেছে ঐশি পুরুষদের দেখানো সেই সাম্যের পথ, শান্তির পথ, প্রেমের পথ, মহাভাবের পথ। ফলে, সমগ্র পৃথিবীতেই আজ বেড়ে চলছে বিভেদ-বৈষম্য, ধর্মীয়-কলহ, সাম্প্রদায়িক-দ্বন্দ্বসংঘাত; দুর্বিষহ হয়ে উঠছে জনজীবন ও বিশ্ব জগত । কিন্তু কোনো প্রেরিত পুরুষই তো এটা প্রত্যাশা করেন নি যে- তাদের ধর্মগুলো পৃথিবীকে দুর্বিষহ করে তুলবে, তাদের মতাদর্শগুলো সাম্প্রদায়িক বিবাধের কারণ হয়ে মানবতা কে বিনষ্ট করবে, তাদের ধর্মগ্রন্থগুলো ‘এক মানবজাতিকে’ ভেঙে খানখান করে দিবে, তাদের অনুসারীরা ‘ধর্মের নামে’ মানুষে মানুষে বৈষম্য ও বিবাদ সৃ্ষ্টি করে এ ধরিত্রীকে দুর্গন্ধময় করে তুলবে এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার নামে হত্যা-যজ্ঞ, জঙ্গীপনা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে কালে কালে ইতিহাসের পাতাকে কলঙ্কিত করবে !!
জগতে শান্তিবাদ ও প্রেমবাদ প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যেই এ ধূলার ধরণীতে মহাপুরুষগণের অবতরণ । কিন্তু মানুষ তাঁদের সাম্যবাদী ভাবধারাকে বুঝতে না পেরে ভিন্ন ভিন্ন দলে, বিভিন্ন গোত্রে, আলাদা আলাদা সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পৃথিবীর সৌন্দর্য ও ঐশি পরিকল্পনাকে একেবারে বিনষ্ট করে দিয়েছে !! শান্তি ও সাম্যই যদি সব ধর্মের মূল কথা হবে, তাহলে ধর্মকে আশ্রয় করে কেন চারিদিকে চলছে এতো অশান্তি, এতো অশ্রুপাত? ধর্মকে কেন্দ্র করে সমগ্র পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যতগুলো মানুষের জীবন কেড়ে নেয়া হয়েছে, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও এত বেশি পরিমাণ মানুষকে জীবন দিতে হয় নি ।
অথচ মানুষের কল্যাণের জন্যই নাকি এ ধর্মের সৃষ্টি; কিন্তু সে ধর্মই যদি মানুষের জন্য অকল্যাণ বয়ে আনে, সে ধর্মই যদি মানুষে মানুষে বিভেদ ও বৈষম্য তৈরি করে, সে ধর্মই যদি সাম্প্রদায়িক কলহের সৃষ্টি করে, সে ধর্মই যদি মানুষের পবিত্র বুকে লাত্থি মারার শিক্ষা দেয়, সে ধর্মই যদি যুদ্ধ ও রক্তপাতের কারণ হয়, সে ধর্মই যদি মানুষের চোখে বেদনার অশ্রু ঝরায়, সে ধর্মই যদি স্রষ্টার আইন প্রতিষ্ঠার নামে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তবে কি আমরা বলতে পারি না যে- সেই ধর্মপথ বিধাতা প্রদত্ত কোনো ধর্মপথ নয়? বরং বিকৃত হয়ে যাওয়া জীর্ণ মতবাদের এক মৌলবাদী ভাবধারাকেই সমাজে ‘ধর্ম’ বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে মাত্র !! কেননা, যে ভাবদর্শন ‘মানুষে’ ‘মানুষে’ বিভেদ ও বৈষম্যের দেয়াল গড়ে তুলছে, মানুষে মানুষে প্রেম-মৈত্রীভাবকে ঘৃণায় পরিণত করছে; যে ধর্মদর্শন যুগে যুগে ইতিহাসের পাতাকে রক্তাক্ত করেছে এবং মানুষকে বাধ্য করেছে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বে, লিপ্ত করেছে পারস্পরিক হত্যাকাণ্ডে; সেটা কখনোই বিধাতার দেয়া ধর্মদর্শন হতে পারে না । বরং সেটা মোল্লা, পাণ্ডা, যাযক, ভিক্ষু, পুরোহিতদের কবলে পড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়া এক অধর্ম !!
গবেষণা করে দেখা গেছে যে, ধর্মীয় মৌলবাদের বিষাক্ত ছোবলে প্রতিটি ধর্ম পথই আজ ক্ষতবিক্ষত, প্রতিটি ধর্ম মতই আজ বিভ্রান্তিতে জর্জরিত । ধর্মের দালানকোঠাগুলো আজ ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের দখলে । সমগ্র পৃথিবীতেই গোঁড়াবাদী ভাবদর্শনের ছাঁচে গড়ে উঠছে অগণীত উপাসনালয়, দেবালয়, মাদ্রাসা, গির্জা, মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ মঠ ইত্যাদি । যার ফলশ্রুতিতে নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে গোঁড়াবাদী, জঙ্গীবাদী, মৌলবাদী, অনুষ্ঠানবাদী, নেশাগ্রস্থ উগ্রবাদী, সাম্প্রদায়বাদী ধর্মান্ধ রূপে । চলমান বিশ্ব পরিস্থিতি, মৌলবাদী তাণ্ডবলীলা, জঙ্গী নাশকতা ও ধর্মান্ধতা সেটারই স্বাক্ষ্য বহন করছে । কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখাগেছে যে, মূলত ধর্মপথগুলোর চেহারাকেই পরিকল্পিতভাবে পাল্টে দেয়া হয়েছে । ধর্মপ্রবর্তকগণের ভাবদর্শনের সাথে প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থাগুলোর খুব একটা মিল নেই বললেই চলে; বরং ধর্মগুলো বিকৃত হয়ে গেছে । ইসলাম ধর্মের কথাই ধরা যাক, মোহাম্মদী ধর্মদর্শনের সাথে প্রচলিত ইসলাম অনেক ক্ষেত্রেই সাংঘর্ষিক ।
মহানবি (স.) কখনোই সম্প্রদায়গত বিদ্ধেষ তৈরি করে দিয়ে যান নি, বরং তিনি ধর্মনিরপেক্ষ এক অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন । নবি মোহাম্মদ কখনোই মানুষের লাশের উপর দিয়ে বেহেশত যাবার পথ রচনা করে যান নি; ধর্মের নামে, আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার নামে তিনি কখনোই মনুষ্য হত্যার শিক্ষা দিয়ে যান নি । কিন্তু প্রচলিত মুসলিমরা তাদের ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মের দোহায় দিয়ে ঠিকই অমানবিক এ নির্মম হত্যাযজ্ঞের এজিদী সুন্নতি-ধারা অব্যাহত রেখেছে, যা মোহাম্মদী ভাবদর্শনের সাথে একেবারেই সাংঘর্ষিক । ফলে, শান্তির ধর্ম ইসলাম আজ সমগ্র বিশ্বে হত্যা, খুন, মারামারি, রক্তক্ষয়ী ও জঙ্গীবাদী এক অধর্মে রূপান্তরিত হয়ে বিশ্ববাসীর কাছে জঘন্য ও ঘৃণিত ধর্মদর্শনে পরিণত হয়েছে; আর মহানবি (স.) বিশ্ববাসী ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বিদের কাছে একজন সন্ত্রাসী ধর্মগুরু হিসেবে পরিচিতি লাভ করে ইসলামের পতাকাকে উজ্জিবীত ও সুমহান করে তুলেছে !! তবে, গবেষণায় এটাও বেড়িয়ে এসেছে যে, ধর্মের প্রকৃত সত্যকে বিনষ্ট করতে, ধর্মদর্শনের বিকৃত রূপকে সমাজে কৌশলে দাঁড় করিয়ে দিতে একদল ষড়যন্ত্রকারী সর্বকালেই গোপনে ও প্রকাশ্যে শয়তানি করে এসেছে ।
সর্বযুগেই একটি মোনাফেক চক্র ছিল, যারা প্রতিটি প্রেরিত পুরুষেরই বিরোধীতা করে এসেছে, সত্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে, ধর্মের গুটকাটা ইঁদুরে মত বিভিন্ন চক্রান্তে নিরবচ্ছিন্ন ধারায় লিপ্ত থেকেছে । সত্য বলতে গেলে- মহানবির ক্ষেত্রেই সেই চক্রান্ত ও বিরোধিতার মাত্রা ছিল অত্যধিক । ইসলাম ধর্মের মধ্যেই সেই আত্মদ্রোহী মোনাফেকদের সংখ্যা ছিল অন্যান্য ধর্মের তুলনায় অনেক বেশি । একটু খোলামেলা ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় যে, নবি-পরিবার বিদ্বেষী কতগুলো কুলাঙ্গারের হাতেই লালিত হয়েছে আজকের ইসলাম । মূলত আজকের সত্যবিবর্জিত এই অনুষ্ঠান নির্ভর টুপি-দাঁড়ি পাগড়ি-পাঞ্জাবি ও মুখস্থ বুলি আওড়ানো মার্কা প্রচলিত ইসলাম তাদের হাত ধরেই এসেছে, যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে কারবালার ময়দানে নবি-বংশের বিরুদ্ধেই রক্তের হোলি খেলায় মেতে উঠেছিল । কারবালায় ইসলামের সাময়িক কবর রচনার পর মূলত এজিদী সিলেবাসকেই মোহাম্মদী ইসলাম বলে সমাজে চালিয়ে এবং একপ্রকার চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল ।
নবি বংশের জাতশত্রু উমাইয়ারা ইসলামী ক্ষমতায় আরোহণ করার পর থেকেই মোহাম্মদী ভাবদর্শনের অনুসরণ করার নামে চলছে এজিদ-মুয়াবিয়ার সিলেবাস অনুসরণ । নিজেদের সুবিধা মত কোরান-হাদিসের চেহারাকে পাল্টে দেয়া হয়েছে । উমাইয়া-আব্বাসিয়দের নিজস্ব ছাপাখানায় তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য সহি হাদিস, যার প্রতিটি রচনাই ছিল মিথ্যা ও বানোয়াট । বেঈমানেরা তাতেই থেমে থাকে নি, বরং কোরানের আয়াত ও রদবদল করে নিয়েছে (সূত্র: ইমাম বাকের); প্রায় অর্ধসহস্র আয়াত কোরান থেকে গায়েব করে দিয়েছে (সূত্র: বাজারে প্রচলিত কোরান); প্রায় পাঁচ লাখ হাদিস সহ হস্ত লিখিত শত শত কোরান পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে এবং ইমাম গাজ্জালীর লেখা ১১৯ খণ্ডের কোরানের মূল্যবান সেই তফসিরটিও পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা সহ আরও অসংখ্য নেক্কারজনক কাজের দায়িত্ব তারা নিষ্ঠার সাথে পালন করেছে ।
তাই বর্তমানে ইসলামের নামে চলছে মৌলবাদী, সন্ত্রাসবাদী, উগ্রবাদী, অনুষ্ঠানবাদী, ভোগবাদী, জঙ্গীবাদী, চাঁদাবাজি, মাইকবাজি, বলাৎকারবাজি, স্বেচ্ছাচারী, রাজকীয় ধর্ম পালন; আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার নামে চলছে মানুষ হত্যার পথ অনুসরণ । তবে মনুষ্য হত্যার মধ্য দিয়ে ধর্ম প্রতিষ্ঠা (?) করার এ সুন্নতি-শিক্ষা ইসলামের কুখ্যাত খলিফা ও সম্রাট (কায়সারুল আরব) কুলাঙ্গার ইয়াজিদের সিলেবাসে দেড় হাজার বছর পূর্বেই পাঠ্য ছিল !!
বিধাতার গোপন রহস্য এই মানুষ (হাদিসে কুদসি); আর সেই মানুষের বুকে লাথি মেরে যারা আল্লাহ-ভগবানের সন্তুষ্টি খুঁজে বেড়ায়, নিঃসন্দেহে তারা শাস্ত্রীয় এলকোহল পান করা বেঁহুশ । যারা মানুষের চেয়ে ধর্মকে বড় করে দেখে তারা মাতাল, তারা ভয়ংকর । এই মানুষই তো ধর্ম সৃষ্টি করেছেন, কোনো ধর্ম এই মানুষ সৃষ্টি করে নি (ঋষিমত)। সুতরাং, ধর্ম নয় বরং মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ । যদি মানুষই না বাঁচে তবে ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থ কিংবা ধর্মীয় দালানকোঠা দিয়ে কী হবে? কবি নজরুলের ধিক্কার: “তোরা ছেলের মুখে থুতু দিয়ে, মার মুখে দিস ধূপের ধোঁয়া”? মানুষের জন্যই ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয় । কোরান, বেদ, বাইবেল, তাওরাত, ইঞ্জিল, গীতা, ত্রিপিটক, পৃথিবীর যত গ্রন্থ সবকিছু এই মানুষেরাই এনেছেন । কাবা, মন্দির, গির্জা, মসজিদ, প্যাগোডা, পৃথিবীর যত উপাসনালয় সব মানুষই সৃষ্টি করেছেন ।
কোনো গ্রন্থ বা কোনো উপাসনালয় এই মানুষকে সৃষ্টি করে নি, কিংবা মর্যাদায় মানুষকে ছাড়িয়ে যেতে পারে নি । বেঁহুশে চৈতন্যদানে কবি নজরুলের প্রেসক্রিপশন: “জগতের যত গ্রন্থ ভজনালয়, ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়”। তাহলে মোল্লা-পুরোহিত-পণ্ডিতদের মাতলামীর দরুণ সেই ধর্ম কিংবা ধর্মের দালান কোঠার জন্যে যদি একজন মানুষকেও জীবন দিতে হয় তবে এর চেয়ে দুঃখ ও লজ্জার আর কিছু হতে পারে না । মনুষ্য হত্যা মহা পাপ; আর সে হত্যা যদি হয় ধর্মের নামে, তবে এখানেই ধর্মের সবচেয়ে বড় পরাজয় ।
কোনো ধর্মের ধার্মিকেরাই ধর্মের সত্যকে, ধর্মপ্রবর্তকের শিক্ষাকে সঠিকরূপে বুঝে উঠতে পারে নি । তাই তারা জন্ম দিয়েছে দুর্বিষহ এই ধরিত্রীর । যে বুদ্ধ নাকি একটি তীরবিদ্ধ পাখিকে বুকে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, সেই বুদ্ধের অনুসারীরা আজ হাজার হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করছে; যে দুষ্ট বুড়ি মহানবির চলার পথে কাটা পুঁতে রাখা সত্ত্বেও সেই বুড়িকে মহানবি নিজেই সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছিলেন, আজ সেই মোহাম্মদেরই অনুসারীরা মানুষের লাশের উপর দিয়ে বেহেশতে যাবার পথে ভিড় জমাচ্ছে !! নবি মোহাম্মদের অনুসারী বলে কথিত ‘মোল্লারা’ ইসলামের সংজ্ঞা ঠিকঠাকমত বুঝে উঠতে পারে নি ।
মাতালেরা ঐশি-গ্রন্থের রুপক ভাষাকে ধরতে না পেরে ধর্মের নামে জন্ম দিয়েছে সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ, অহাবিবাদ । তারাই সর্বযুগে ধর্মের দোহায় দিয়ে মানুষ হত্যা করেছে; তারাই ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার নামে মানবতাকে বিনষ্ট করেছে; রসুলের সাম্যবাদী ধর্ম ইসলামকে বিকৃত করেছে; কথিত বেহেশতে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিতে গিয়ে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়া হচ্ছে । বকধার্মিকেরা ইসলাম হেফাজতের নামে, ধর্ম রক্ষার নামে মারছে মানুষ, পুড়ছে ঘরবাড়ি, ভাঙছে দেবালয়, উপাসনালয়, অবলা হৃদয় !!
ধর্ম তো সেটাই যা মানুষকে এক হয়ে প্রেম-শান্তি-সাম্যের পথে বাঁচতে শেখায়, সাম্প্রদায়িকতাটাই ধর্ম নয় । কিন্তু সাম্প্রদায়িকতাটাকেই মানুষ ‘ধর্ম’ হিসেবে ধরে নিয়েছে এবং মেনেও নিয়েছে । শুধু তাই নয়, পৃথিবীতে মানুষ বেড়ে উঠছে ধর্মীয় পরিচয়ে, সাম্প্রদায়িক আইডিতে । ধর্মীয় সাইনবোর্ড একজন মানুষের পরিচয় হতে পারে না; ধর্মের পরিচয়ে একজন মানুষ বেড়ে উঠতে পারে না । কারণ, ধর্ম কখনোই মানুষের চেয়ে বড় নয়, এই মানুষের উর্ধ্বেও নয় ।
আজ বৌদ্ধ-খৃস্টান হিন্দু-মুসলমানের সংখ্যা ব্যাপক পরিমাণে বৃদ্ধি পেলেও মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে অনেক কমে গেছে । প্রচলিত ধার্মিকের(?) সংখ্যা ব্যাপকহারে বেড়ে চললেও, প্রকৃত মানুষের সংখ্যা অধিক হ্রাস পেয়েছে । আমরা যুগে যুগে হিন্দু হয়েছি, মুসলিম (?) হয়েছি, বৌদ্ধ-খৃস্টান হয়েছি কিন্তু ‘মানুষ’ হতে পারিনি; তাই দিন যত যাচ্ছে মানুষে মানুষে বিভেদ, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতা তত বাড়ছে; এবং বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে মহা মানবগণের সাম্যবাদী শিক্ষা ও ভাবদর্শন । ফলে, হিংস্রতা ও সাম্প্রদায়িকতার অপর নামই এখন হয়ে উঠেছে ধর্ম । অথচ সাম্যবাদ, প্রেমবাদ, ভাববাদ, শান্তিবাদের প্রতীক হিসেবে থাকার কথা ছিল এই ধর্ম । মূলত ধর্মের সৃষ্টিই হয়েছিল মানুষের মুক্তির জন্য; ধর্ম গ্রন্থের সৃৃষ্টি হয়েছিল মানুষকে আলোর পথ দেখানোর জন্য; ধর্মীয় দালানকোঠাগুলো গড়ে উঠেছিল মানুষের কল্যাণ ও বিশ্ব শান্তির জন্য ।
ঐশী বার্তা: “গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”(কবি নজরুল)। তাহলে ধর্ম কি জন্যে একজন মানুষের পরিচয়ের মাপকাঠি হতে যাবে? মানুষ বেড়ে উঠবে মানুষের আইডিতে, কোনো ধর্মের আইডি বা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে নয় । বিধাতা বারবার চেয়েছেন তাঁর প্রতিনিধি পাঠিয়ে ধর্ম মুক্ত এক অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী জীব সমাজ তথা প্রেমের বুনিয়াদ গড়ে তুলতে, কিন্তু নির্বোধদের মগজে তা জায়গা করে নিতে পারে নি । মানুষ সম্প্রদায় প্রিয়, গোত্র প্রিয় । নিজেরা বিভিন্ন দলে, গোত্রে, জাতিতে ভাগ হয়ে যেতে ভালবাসে । সাম্প্রদায়িক দলে বিভক্ত হওয়া মানুষের সহজাত স্বভাব । অসাম্প্রদায়িক মনোভাব মানুষের ভাল লাগে না, তাই তারা বিভিন্ন দল, মত, পথ সৃ্ষ্টি করে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে আছে; এবং সে জন্য তারা খুব তৃপ্তি অনুভব করছে ।
কিন্তু সে ধর্ম এখন মানুষকে মুক্তি দেবার বদলে উল্টো বিপথগামী করছে; সে ধর্মগ্রন্থ এখন প্রেম শিক্ষা দেবার বদলে হিংস্রতার ভাইরাস ছড়াচ্ছে; সে উপাসনালয় এখন মানুষে মানুষে প্রেম মৈত্রী বন্ধন তৈরি করার বদলে বিভাজন তৈরি করছে । অর্থাৎ- যে ধর্ম নাকি মানুষের কল্যাণ ও প্রেম বন্ধনের সেতু হবার কথা ছিল, সেটা হয়ে উঠেছে এখন প্রাণনাশ ও অকল্যাণের হেতু । যে ধর্ম হওয়ার কথা ছিল প্রেম, সাম্য ও শান্তির প্রতীক, সে ধর্ম এখন হয়ে উঠেছে অশান্তি ও হিংসা বিদ্বেষের একমাত্র ক্ষেত্র ভূমি । শুধুমাত্র ধর্মকে কেন্দ্র করে পৃথিবীতে যত অশান্তি, কলহ, দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ ও রক্তপাত হয়েছে অন্য কোন কিছুকে কেন্দ্র করে পৃথিবী এতোটা আর্তনাদ আর হাহাকারে ভাড়াক্রান্ত হয়ে উঠে নি । সত্যি কথা বলতে কি, পান্ডা-মৌলভিদের মাতলামির কারণে ধর্ম এখন বেশ সন্ত্রাসবাদী ব্যাপারে পরিণত হয়েছে; ধর্ম এখন মহা আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
কলুষিত মৌলবাদ এর ছোয়াতে ধর্মপথগুলো সাম্প্রদায়িকতার ভয়াবহ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় কেবিনে পড়ে আছে; গোঁড়াবাদের পরশে ধর্মগ্রন্থগুলো এলকোহল সমৃদ্ধ নেশাদ্রব্যে পরিণত হয়েছে; প্রচলিত ধার্মিকগুলো ধর্মের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে; আর ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো পরিণত হয়েছে ধর্মান্ধ-উগ্র-মাতালের আড্ডাখানাতে !! ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে- সকল ঐশী পুরুষই প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থা তথা ধর্মীয় মৌলবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন । মৌলবাদী তাণ্ডবলীলার সামান্য চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে এক সাক্ষাতকারে মরমি কবি বাউল শাহ্ আব্দুল করিম বলেছিলেন: “প্রচলিত ধর্ম-ব্যবস্থা আমাদের মধ্যে সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ তৈরি করে দিয়েছে । কতিপয় হীন মোল্লা-পুরুত আমাদের ভাইয়ে ভাইয়ে বিভাজন নিয়ে এসেছে । এই বিভাজনই যদি ধর্ম হয় তবে সেই ধর্মের কপালে আমি লাত্থি মারি ।
সবার উপরে মানুষ সত্য- এই হলো আমার ধর্ম । নামাজ রোজার মতো লোক দেখানো ধর্মে আমার আস্থা নেই । আমি কখনোই আসমানী খোদাকে মান্য করি না । মানুষের মধ্যে যে খোদা বিরাজ করে আমি তাঁর চরণেই পুজো দেই । মন্ত্রপড়া ধর্ম নয়, কর্মকেই ধর্ম মনে করি । লাখ লাখ টাকা খরচ করে হজ্জ্ব পালনের চেয়ে এই টাকাগুলো দিয়ে দেশের দুঃখী দরিদ্র মানুষের সেবা করাটাকে আমি অনেক বড় কাজ মনে করি । কতিপয় কাঠমোল্লা ধর্মকে তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে । এই মোল্লারা ইংরেজ শাসনামলে ইংরেজী পড়তে বারণ করেছিল; এই মোল্লারা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের পক্ষে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল । আজো মোল্লারা তাদের দাপট সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছে । এগুলো দেখে মনে হয় একাই আবার যুদ্ধ করি ! একলাই আবার লড়াইয়ের ময়দানে নেমে পড়ি ! জীবনের ভয় এখন আর করি না । আরেক যুদ্ধ অবধারিত হয়ে পড়েছে, এছাড়া আর মুক্তি নাই”(এ কথাগুলো বলার সময় মহর্ষি করিমের দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল)!!
ধর্মের নামে এই বিভাজন মানবতাকে আজ বিপন্ন করেছে, বিশ্ব শান্তিকে বিনষ্ট করে দিয়েছে । অথচ কোন মহামানবই নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের বার্তা নিয়ে আসেন নি, আলাদা আলাদা ধর্ম নিয়ে আবির্ভূত হন নি । তাঁরা জগতে প্রেম, সাম্য ও শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন । কিন্তু তাদের কিছু কিছু নির্বোধ অনুসারীরা সেটাকে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে বিভক্ত করে তা মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন; সৃষ্টি করেছেন বৌদ্ধ ধর্ম, মুসলিম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, ইহুদি ধর্ম, খৃস্টান ধর্ম ইত্যাদি ।
অথচ প্রেমের কোনো ধর্ম নাই; শান্তির কোন ধর্ম হয় না, হতে পারে না । দরবেশ লালনের ভাষায়: “আল্লাহ হরি ভজন পূজন, সকলই মানুষের সৃজন”; মওলানা রুমি এর ভাষায়: “সকল ধর্মই প্রেমের কথা বলে, অথচ প্রেমের কোনো ধর্ম নাই”!! প্রকৃতপক্ষে কোনো ঐশী মতাদর্শই সাম্প্রদায়িকতাকে পছন্দ করেন না, ধর্মের ভিন্নতাকে সমর্থন করেন না । এ জন্যই কোরানে মানুষকে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম তথা নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের আইডি বা নাম ধরে ডাকা হয় নি, বরং ‘হে মানবজাতি’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
কিন্তু পরিতাপের বিষয়- কোরানের সেই ভাবধারাকে সমাজ থেকে মুছে ফেলা হয়েছে । তাইতো দরবেশ লালন এর আক্ষেপ: “এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে, যেদিন হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খৃস্টান জাতি-গোত্র নাহি রবে”!! বিধাতা একাধিক ধর্ম প্রেরণ করেন নি । কারণ কোনো সত্যের থাকতে পারে না একাধিক ব্যাখ্যা, একাধিক তত্ত্ব, একাধিক দর্শন । একাধিক ধর্ম সৃষ্টির পিছনে সকল অবদান নির্বোধ মানুষেরই, বিধাতার নয় । সুতরাং একই সময়ে সবগুলো ধর্মই সত্য হতে পারে না । ভুল অংকের ফলাফল বহু এবং বিভিন্ন হয়; কিন্তু শুদ্ধ অংকের ফল হয় এক ও অভিন্ন । প্রেরিত পুরুষ শ্রীকৃষ্ণও চেয়েছিলেন ধর্ম মুক্ত প্রেমবাদী এক বিশ্ব গড়ে তুলতে । তাই তিনি ঘোষণা করেছিলেন: “সকল ধর্ম পরিত্যাগ করে আমাতে স্মরণ লও”; কিন্তু অবোধেরা সে কথার অর্থ বুঝে নি । নবি মোহাম্মদও এমনটাই চেয়েছিলেন।
কিন্তু উমাইয়া আব্বাসিয়দের গভীর ষড়যন্ত্রে মহানবির সাম্যবাদী ভাবদর্শন আমাদের নিকট পর্যন্ত আসতে পারে নি । নবি মোহাম্মদ ভিন্ন কোন ধর্ম নিয়ে আবির্ভূত হন নি। তিনি নতুন কোন ধর্ম প্রচার করতে আসেন নি, পৃথিবীতে তিনি প্রেমবাদ ও শান্তিবাদের বীজ বপন করতেই এসেছিলেন; গোঁড়ামি ও কুসংস্কার মুক্ত, একটি ধর্ম-নিরপেক্ষ ও সাম্যবাদী বিশ্ব গড়তে এসেছিলেন। পথপ্রদর্শকগণ কখনোই নির্দিষ্ট কোনো গোত্র বা ধর্মের জন্য আবির্ভূত হন না, তাঁরা শিক্ষকের ন্যায় সকলের, আলোর ন্যায় সবার জন্যই আবির্ভূত হন । কোনো মহামানবই ঘোষণা করেন নি যে: তিনি হিন্দুর জন্যে এসেছেন, তিনি মুসলমান কিংবা বৌদ্ধ জাতির জন্য এসেছেন । মহামানবগণ বিধাতার ন্যায় অধার্মিক তথা ধর্মনিরপেক্ষ । বিধাতার কোনো ধর্ম নেই, জাত নেই; বিধাতা অধার্মিক, তিনি নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের নন, জাতের নন । তিনি সব মানুষের ।
এক অধার্মিক সত্ত্বার নামই তো পরম তথা প্রভু; কিন্তু ধর্ম ডাকাতরা নিজেদের স্বার্থে স্রষ্টাকেও ধার্মিক বানিয়ে ছেড়েছেন !! কিন্তু আমরা ধর্মীয় পরিচয়ে বেড়ে উঠতে চাই না, মানুষের পরিচয়েই বাঁচতে চাই । এমন একটি মানব সমাজ গড়ে তোলা আজ জরুরী হয়ে পড়েছে, যে সমাজে থাকবে না কোনো বৌদ্ধ-খৃস্টান, থাকবে না কোনো হিন্দু-মুসলমান, থাকবে কেবল মানুষ । থাকতে পারবে না আলাদা আলাদা কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ।
ধর্মের নামে জোব্বা জাব্বা, টুপি, দাঁড়ি, পাঞ্জাবি, টিকি, পাগড়ী, লাল, সাদা, কালো, গেরুয়া ইত্যাদি রঙের কোনো ইউনিফর্ম বা ধর্মীয় সাইনবোর্ড তথা লেবাশের প্রচলনও থাকতে পারবে না । ধর্ম তো মনের বিষয়, আভ্যন্তরীণ বিষয়; এটা লোকদেখানো এমন কোনো বিষয় নয় যে, ধর্মকে তার কথায়, ভাবে, পোশাকে, আচরণে, লেবাসে ফুটিয়ে তুলতে হবে, বাহিরে প্রকাশ করতে হবে । ভিতরের সত্য রূপটি নষ্ট হয়ে গেলেই নাকি বাহিরের সাজসজ্জার অত্যধিক প্রয়োজন হয় । টুপি-দাঁড়ি, পাগড়ি, জুব্বা-জাব্বা, সেলোয়ার কামিছ মার্কা ধর্মের নাম ইসলাম নহে । যদিও এজিদের রেখে যাওয়া লেবাসধারী, বাহিরের সাজসজ্জা ও আনুষ্ঠানিক ধর্ম চর্চাকেই বেঁহুশেরা ‘ইসলাম’ ভেবে বসে আছে ।
সুতরাং, বন্ধুগণ ! ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে, সমাজ পরিবর্তনের যুগ এসেছে । প্রচলিত ধর্মমত সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে । মৌলবাদের কবল থেকে ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে; আগত শিশুদেরকে গড়ে তুলতে হবে মরমীবাদের আলোকে । প্রিয় বন্ধুগণ, সত্যের সাথে মিথ্যার সংঘাত চিরকালের । তাই আসুন আমরা কষ্টিপাথরে সোনা যাচাইয়ে সত্য পথের সন্ধানে আরও সচেতন হই, আরও যত্নবান হই, আরও সচেষ্ট হই !! ভবিষ্যত প্রজন্মের নিরাপত্তা বিধান কল্পে সমগ্র জাতিকে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে মাঠে নামতেই হবে, নইলে বিশ্ব শান্তি সুদূরপরাহত । সত্যবিবর্জিত মোল্লা-পুরুতের বৃত্ত সমূহকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতে হবে । কারণ দাঁড়িওয়ালা, ভুঁড়িওয়ালারা মানবজাতিকে করেছে বিভক্ত, মানবতাকে করেছে বিনষ্ট । ঈশ্বর-আল্লাহর অবস্থান, পরিচয়, স্বভাব, ঠিকানা, প্রতিকৃতি ইত্যাদি এই মানুষেই (ঐশীমত) ।
কিন্তু প্রচলিত ধর্ম আল্লাহ-ভগবানকে ‘এই মানুষ’ থেকে দূরে সরিয়ে দেবার কারণেই জন্ম নিয়েছে জঙ্গীবাদ । অথচ কোরানে অসংখ্যবার ঘোষণা করা হয়েছে যে: “আমার বান্দা যখন আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন বলো যে- আমি তাদের সাথেই আছি”(সূরা বাকারা)। মানুষ আদি, মানুষই অন্ত, মানুষ বাতেন, মানুষই দৃশ্য । হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী তাই বলেন: “মানবদেহ বিশ্বজগতের নমুনা”।
যার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কবি নজরুল প্রকাশ করেন: “তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব, সকল কালের জ্ঞান; সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখো নিজপ্রাণ”। প্রকৃতপক্ষে ইহকাল ও পরকালে এই ‘মানুষ’ই একমাত্র সারসত্য; যেদিন সমগ্র মানবজাতি এ সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে, সেদিন থেকেই ‘মানুষ’ ধরে ‘মানুষ হওয়ার’ চাপাপড়া মোহাম্মদী ইসলাম পুনরায় জাগ্রত হয়ে উঠবে; জীর্ণ মতবাদ সব ইতিহাস হবে; অধর্মের যত আবর্জনা স্তূপীকৃত হয়ে উঠেছে, মাথাচাড়া দিয়ে জেগেছে- ভেঙ্গেচুড়ে সব নিশ্চিহ্ন হবে; ফলে, আগত শিশুরা সুন্দর পরিবেশ পাবে এবং মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার অশুভ ঝড় থেমে গিয়ে পৃথিবী আবার শান্ত হবে!!
প্রবন্ধ – ঈমান
লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী
মহানবী (স:) ও আহলে বাইয়্যেত এর প্রতি ভালোবাসাই ঈমান। মানবজাতি তথা মুসলমানের মূল ভিত্তি হল ঈমান; আর ঈমানের মূল ভিত্তিই নবীর প্রেম। আল্লাহপাকের ঘোষনায়- নবী প্রেমের পূর্ণতা হাসিল হবে আহলে বাইয়্যাতের প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমে। দয়াল নবীজির সাথে যার মহব্বত নাই তার ঈমান নাই। বেঈমানের যাবতীয় ধর্ম কর্ম মহান আল্লাহ পাকের দরবারে গৃহিত হবে না। ঈমান আছে তো আমলের দাম আছে। ঈমান নেই তো আমলের দাম কোন নেই। যেমন গণিত সংখ্যায় প্রথম ‘এক’ লিখে পাশে শুন্য দিলে দশ হয়, এভাবে শুন্য বাড়ালে গাণিতিক মান বাড়তে থাকবে। প্রথমে ‘এক’ না লিখে শুধু হাজার হাজার শুন্য লিখলে মান হবে জিরো অর্থ্যাৎ সম্পূর্ন লিখনী বাতিল সাব্যস্ত হবে। সুতরাং এক আছে তো শুন্যের দাম আছে প্রথমে এক নাই তো শুধু শুণ্যের কোন দাম নেই।
অনুরূপ ঈমান আছে তো আমলের মূল্য আছে ঈমান নেই তো ভুরি ভুরি আমলের কোন মূল্য নেই। স্মর্তব্য, সর্ব প্রথম আমাকে পূর্ণ ঈমানদার হতে হবে। পূর্ণ ঈমনদার হওয়া সম্পর্কে আল্লাহ এরশাদ করেন ‘হে প্রিয় হাবীব আপনি বলে দিন- তোমাদের বাপ, দাদা, তোমাদের ছেলে, মেয়ে, তোমাদের ভাই, বোন, তোমাদের স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের কষ্টার্জিত ধন-সম্পদ, ব্যাবসা-বানিজ্য;যার লোকসানের ভয় তোমরা করো, তোমাদের পছন্দনীয় ঘর বাড়ী ইত্যাদি যদি আল্লাহ ও তার রাসুল ও তার পথে জিহাদের চেয়ে বেশি মুল্যবান হয় তবে তা আযাবের অপেক্ষা করে। আর আল্লাহ তায়ালা ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না। (সুরা তওবা -২৪)।
উক্ত আয়াত দ্বারা একথা প্রমানিত হয়েছে যে, নবী করীম (সা) কে অপরাপর সবকিছুর উর্দ্ধে ভালোবাসা ওয়াজিব। এ ব্যাপারে সাহাবী হযরত আনাছ (রা) থেকে বর্নিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন,- কোনো ব্যাক্তি ততক্ষন পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষন না আমি তার কাছে তার পিতা মাতা, সন্তান সন্ততি ও অন্যান্য লোক থেকে বেশি প্রিয় হই। (বুখারী ১৪,মুসলিম ৪৪)।
পবিত্র কোরান ও হাদিস দ্বারা ইহাই প্রমানিত হলো যে, ঈমানের ফাউন্ডেশন বা ভিত্তি হলো মহানবী (সা) কে প্রাণাধিক ভালোবাসা। যখন রাসুলুল্লাহ (সা) কে পৃথিবীর সমস্ত কিছু এমনকি নিজের প্রাণাপেক্ষা অধিক ভালোবাসা যাবে, তখনই প্রকৃত ঈমানদার হওয়া সম্ভব। সুতরাং দয়াল নবীজীকে প্রাণাধিক ভালোবাসাই হলো ঈমান। নবীজীর প্রতি যার ভালোবাসার পরিমান যত বেশি তার ঈমান তত মজবুত। পক্ষান্তরে যার ভালোবাসার পরিমান যত কম তার ঈমান তত দুর্বল। ঈমানের মাপকাঠি নবী প্রেম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, নবী মুমিনদের নিকট তার জানের চেয়ে বেশি প্রিয়। (সুরা আহযাব-৬)
কোরআন হাদিস দ্বারা প্রতিয়মান হলো, একমাত্র নবী প্রেমই হলো ইমানের মুল চাবিকাঠি। নুর নবী (সা) হলেন প্রেমের উৎস, সৃষ্টির মুলাধার, শাফায়াতের কান্ডার, রহমতের ভান্ডার, জাতি নুরের জ্যোতি। শাফিয়েল মুজনাবিন, রহমাতুল্লিল আলামিন, মুরাদিল মুস্তাকিম, সিরাজুম মুনির। আল্লাহ পাক বলেন, লাওলা কা লা মা খলাকতুল আফলাক” অর্থ্যাৎ- হে নবী , আপনি যদি না হতেন, তাহলে বিশ্ব জগতের কোনো কিছুই সৃষ্টি হতো না। (তাফসিরে রুহুল বায়ান ২/ ৩৯২)।
পবিত্র কোরআন শরীফে আল্লাহ ইরশাদ করেন, ওয়ামা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতুল্লিল আলামিন” অর্থ্যাৎ- আমি আপনাকে জগত সমুহের জন্য রহমত স্বরুপ প্রেরণ করিয়াছি। (সুরা আম্বিয়া -১০৭)। তাহলে নবীর নুরেই জগত সৃজন। যার আনুগত্যেই আল্লাহর আনুগত্য (নিসা ৮০) । যার হাতে বায়াত হলে আল্লাহর হাতেই বায়াত হয় । (ফাত্তাহ ১০)। যার ভালোবাসাই আল্লাহর ভালোবাসা। (আল ইমরান- ৩১)। যার স্বরন বা জিকিরকে আল্লাহ সুউচ্চ করেছেন।(সুরা ইনশিরাহ -৪)। কতটুকু উচ্চ করেছেন তার কোনো সিমা নেই। সেই মহানবী (সা) এর ভালোবাসায় পূর্নতা প্রাপ্ত হতে হলে তার আহলে বায়েত এর প্রতি চুড়ান্ত ভালোবাসা থাকতে হবে নচেৎ নবী প্রেম হবে না।
এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন, “হে হাবীব, আপনি লোকদিগকে বলে দিন যে, শুধুমাত্র আমার আহলে বাইয়াতের প্রতি ভালোবাসা ব্যাতিত (মুওয়াদ্দাতা ফিল কুবরা) রিসালাতের পারিশ্রমিক অন্য কিছুই চাই না।”( শুরা ২৩)। নবীজীর পরিবার বর্গ বা আহলে বায়াতের সঠিক পরিচয় তুলে ধরেছেন বিশিষ্ট সাহাবী সাদ বিন আবু আক্কাছ (রা)। (মুসলিম শরীফ) তিনি বর্ণনা করেন, রাসুল (সা) এর আহলে বায়েত হলো মাওলা আলী, মা ফাতেমা, ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন – (আ)। তিরমিজি, মেশকাত, মুসলিম শরীফ প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে “পাক- পাঞ্জাতন” বা আহলে বায়েত সম্পর্কে যা বর্নিত আছে তার মুল কথা এই যে, হযরত মুহাম্মদ (সা), হযরত আলী (আ), মা ফাতেমা (আ), ইমাম হাসান (আ), ইমাম হোসাইন (আ) -এই পাচজনকেই পাক পাঞ্জাতন বা আহলে বায়েত বলা হয়।
আল্লাহর জাত ও সিফাত প্রকাশ লাভ করেছে তাদের মধ্য দিয়েই। জগতে যা কিছু প্রকাশিত হয়েছে বা সৃষ্টি হয়েছে তা সবই আহলে বায়েতেরই বিকশিত রূপ। যাদের সম্পর্কে বিদায় হজ্বের ভাষণে মহানবী (সা) বলেছিলেন- “আমি উম্মতের মধ্যে দুটি ভারী বস্তু রেখে গেলাম। তা হলো পবিত্র কোরআন ও আমার আহলে বায়েত। এরা কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না, যতক্ষন না হাউজে কাওসারে আমার সাথে মিলিত হবে। (বুখারী- ৫খন্ড, মেশকাত -৫৮৯২, ৯৩ নং হাদীস)। তাফসীরে ইবনে কাসীর ২/৪৭৭ ও তাফসীরে মাযহারী ৯/৪৯২ পৃষ্ঠায়ও আহলে বায়েতের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া আছে।
আউয়াল আখের, জাহের বাতেন, বেলায়েত নবুয়ত সর্বস্থানে আহলে বায়েত পাক পাঞ্জাতন চির বর্তমান এবং অনন্ত কালের বস্তুমোহে নাছুত সাগরে নিমজ্জিত জীবের উদ্ধার কর্তা ও পারের তরণী। দয়াল নবী (সা) ফরমান, “মাছালা আহলে বায়াত কামাছালা সাফিনাতুন নুহীন, মান দাখালা ফান্নাজি” অর্থ্যাৎ- আমার আহলে বায়াত হলো নুহ নবীর কিস্তীর মতো যে ঐ কিস্তীতে আরোহন করবে সে নাজাত প্রাপ্ত বা মুক্তিপ্রাপ্ত হবে।
সাইজীর ভাষায় – পারে কে যাবি, নবীর নৌকাতে আয়, রুপ কাষ্ঠেরই নৌকাখানি নাই ডোবার ভয় ।
ঈমান কোনো তপ জপ, পোষাপ পরিচ্ছদ, বা সার্টিফিকেট পাওয়ার বিষয় নয় – ঈমান হলো দেখে শুনে চিনে জেনে দেহ মন প্রান অর্পন করে ভালোবাসার বিষয়। সুতরাং, বৃথায় জীবন ব্যায় না করে, মওলা আলী (আ) এর ছিলছিলা ভুক্ত একজন কামেল মোরশেদের হাতে বায়াত গ্রহন পূর্বক – ঈমানে বেলগায়েব ছেড়ে ইলমুল,আয়নুল,হক্কোল ও হুয়াল একীনে পৌছে পরিপূর্ন ঈমানদার হয়ে যাই। হে পরম সত্বা প্রভু- সকলকে তৌফিক নসীব করুন। ছুম্মা আমীন।
প্রবন্ধ – সালাতে মুমিন বান্দার মেরাজ
লেখক – সৈয়দ হুমায়ুন কবীর
হাদীসে আছে সালাত এ মুমিন বান্দা মেরাজ হয়। মুমিন বান্দার এই মেরাজ কার সাথে হয়? আল্লাহর সাথে এই মেরাজ হয় না রাসুল পাকের সাথে এই মেরাজ হয়। কোরআনের আয়াত থেকে যা বুঝা যায় আমাদের কে তাই করতে হবে।
আপনি বলুন, আমি তোমাদেরকে শুধু একটি উপদেশ দিচ্ছি, তা হচ্ছে এই যে, তোমরা আল্লাহর নামে দু ’ দু জন করে ও এক একজন করে দাড়িয়ে যাও! তারপর তোমরা চিন্তা করে দেখ। তোমাদের সাথী তো কোন পাগল নন, তিনি তো আসন্ন কঠোর শাস্তি সম্পর্কে তোমাদেরকে সতর্ককারী ছাড়া আর কিছুই নন।(৩৪:৪৬)। তাকে কারো দৃষ্টি প্রত্যক্ষ করতে পারে না। তিনি দৃষ্টিকে আয়ত্ত করেন; তিনি সুক্ষদর্শী জ্ঞানময়। (৬:১০৩) । অবশ্য তোমার কাছে এসেছে রবের পক্ষ হতে জ্ঞান- চক্ষু। সুতরাং যে দেখে কল্যাণ তারই, অন্ধ সাজলে তারই ক্ষতি আর আমি পর্যবেক্ষক নই।(৬:১০৪)।
উপরোক্ত কোরানের আয়াত (৩৪:৪৬) তে বুঝা যাচ্ছে নামাজে সালাতে রাসুল (সা) কে বুঝতে হবে। আয়াত নম্বর (২০:১১০,৬:১০৩,৬:১০৪) তে বুঝা যাচ্ছে আল্লাহকে জ্ঞান দিয়ে আয়ত্ত্ব করা যাবে না, চোখ দিয়ে আল্লাহকে দেখা যাবে না, আল্লাহর জ্ঞান চক্ষু বিশিষ্ট রাসুল (সা) কে দেখলে কল্যাণ তারই। অন্ধ সাজলে সে ইহকালেও অন্ধ, পরকালেও অন্ধ। সরাসরি আল্লাহকে দেখার কোন উপায় নেই- নবী রাসুল ছাড়া। বাস্তবে হউক-স্বপ্নে হউক, সালাতে হউক আল্লাহকে দেখার কোনো উপায়-কায়দা পদ্ধতি নাই। বাস্তবে স্বপ্নে সালাত এ রাসুল (সা) কেই দেখতে হবে। সালাত -নামাজে রাসুল (সা) এর সাথেই মেরাজ হবে- মুমিন বান্দা নামাজে – সালাত এ রাসূল (সা) কে দেখবে।
সুরা ইউনুস – আর এমন অনেক আছে যারা আপনার প্রতি কান রাখে, তারা না বুঝলেও কি আপনি বধিরকে শ্রবন করাবেন? তাদের কেউ কেউ আপনার প্রতি দৃষ্টি রাখে তারা না দেখলেও কি আপনি অন্ধকে পথ প্রদর্শন করবেন?(৪২,৪৩)
সুরা যুখরফ – আপনি কি শুনাবেন বধিরকে? না অন্ধকে পথ দেখাবেন? যে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত। (৪০)
সুরা বনী ইসরাইল – আর যে ব্যাক্তি ইহকালে অন্ধ হবে সে ব্যক্তি পরকালেও অন্ধ হবে এবং পথভ্রষ্ট হবে। (৭০)
সুরা আরাফ – তাদের কে সৎপথে ডাকলে তারা কিছুই শুনবে না। এবং আপনি দেখবেন যে আপনার দিকে তারা চেয়ে আছে অথচ তারা কিছুই দেখে না।(১৯৮)
সুরা নিসা – আজ আমি সকল মানুষের জন্য আপনাকে রাসুলরূপে প্রেরন করেছি, আল্লাহর সাক্ষীই যথেষ্ট। রাসুলের আনুগত্য করলে আল্লাহর আনুগত্য হয়। কেউ মুখ ফেরালে আপনাকে তাদের ওপর পর্যবেক্ষক করিনি।(৮০)সুরা আল ইমরান-অপনি বলে দিন,যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার অনুকরন কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন আর পাপ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু। বলূন তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য কর, যদি অবাধ্য হও, তবে জেনে রেখ আল্লাহ কাফেরদের ভালোবাসেন না। (৩১,৩২)
সুরা ফাতাহ – আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাত ও সতর্তকারীরূপে পাঠালাম। যেন আল্লাহ ও রাসুলে ঈমান আনো, তাকে সাহায্য ও সম্মান করো, সকাল সন্ধ্যায় তার তাসবিহ পাঠ করো। নিশ্চয়ই যারা আপনার কাছে বায়াত নেয় তারা আল্লাহর কাছেই আনুগত্যের শপথ গ্রহন করে, আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর। যদি ভঙ্গ করে তবে পরিণাম তাদেরই ওপর। যে আল্লাহর সঙ্গেকার প্রতিশ্রুতি পূর্ন করে, তিনি তাকে পুরষ্কার দেন।
মোহাম্মদ (সা) এর বংশধরদের দৃষ্টিতে নামাজি –
নামাজে দরুদে ইব্রাহীম “হে আল্লাহ, তুমি মুহাম্মদ (সা) এবং মুহাম্মদ (সা) এর বংশধরদের প্রতি রহমত বর্ষন কর যেভাবে ইব্রাহীম ও তহার বংশধরদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেছ। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ (সা) ও তার বংশধরদের বরকত দান কর, যেভাবে ইব্রাহীম ও তার বংশধরদের বরকত দান করেছ্ নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত সম্মানিত।”
পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজে, সুন্নত নামাজে, নফল নামাজে ও অন্য যে কোন নামাজে দরুদে ইব্রাহীমের মাধ্যমে মোহাম্মদ (সা) ও তার বংশধরের জন্য আল্লাহর কাচে রহমত ও বরকত চাওয়া হয়। এই চাওয়াটা অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে নচেৎ নামাজ অমনোযোগিদের নামাজ হবে এবং লোক দেখানো নামাজ হবে।
(৪) অনন্তর ঐ নামাজ আদায় কারীদের জন্য ধ্বংস, (৫) যারা নিজেদের নামাজ সমন্ধে উদাসীন থাকে, (৬) যারা নামাজ লোক দেখানোর জন্য আদায় করে থাকে। (১০৭:৪,৫,৬)। নবীর বংশধর আওলাদে রাসুলগণ নামাজিদের প্রতি সবচেয়ে বেশি খুশি বা সন্তুষ্ট থাকার কথা। কিন্ত নবীর বংশধর আওলাদে রাসুলগণ নামাজিদের প্রতি প্রচন্ডভাবে অসন্তুষ্ট। প্রায় সব নামাজি নামাজে দরুদে ইব্রাহীমের প্রতি আনুগত্যশীল নয়।
যে সমস্ত নামাজির দরুদে ইব্রাহীমের প্রতি অনুগত্যশীলতা নাই তাদের মন মস্তিষ্ক অন্তরাত্মায়, জবানে ও প্রচারে নবীবংশধর আওলাদে রাসুলদের নাম থাকবে না এবং থাাকতে পারে না। মুল কথা হলে, নামাজের প্রতি ও দরুদে ইব্রাহীমের প্রতি নামাজি মনোযোগী হলে অবশ্যই নবীবংশধর আওলাদে রাসুলদের বুঝতে পারত, তারাই নবীবংশধর আওলাদে রাসুলদের সবচেয়ে বেশি ভালেবাসতো। নামাজিদের কে দরুদে ইব্রাহীমের প্রতি অপরিসীম আনুগত্যশীল থেকেই নবীবংশধর আওলাদে রাসুলদের প্রতি মহব্বতের ভালবাসার আনুগত্যশীল থাকতে হবে।
নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ও তার ফিরিশতাগণ নবীর ওপর রহমত পেশ করেন। হে মুমিনগন, তোমরা তার ওপর দরুদ ও উত্তম তরিকায় সালাম পেশ কর। (সুরা আহযাব ৫৬)
হাদীস- তোমরা জুমুয়ার দিন আামার ওপর অধিক দরুদ পাঠ করবে। কেননা তা ফিরিশতাগণ আমার নিকট পৌঁছিয়ে দেন।
প্রবন্ধ – মৌলবাদ রোগে আক্রান্ত বর্তমান সমাজ
লেখক – মুফতি নূর এ আলম চিশতী
মহান আল্লাহ তায়ালা মানষ সৃষ্টির পূর্বে জ্বীন জাতিকে সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর জাত পাক প্রকাশের জন্য, প্রেমের জন্য, তাঁর ইবাদতের জন্য। কিন্তু সেই প্রেম তাঁর মনমতো হয়নি বিধায়, মানুষ সৃষ্টির ইরাদা করলেন, মানুষের মাধ্যমে তাঁর জাত পাক প্রকাশ করবেন। তাই তিনি ফেরেশতাদের কাছে মানুষ সৃষ্টির কথা তুলে ধরলেন, ফেরেশতারা মানুষ সৃষ্টির বিরোধিতা করে বললেন, বনী আদম পৃথীবিতে মারামারী খুন-খারাবী করবে, তাই মানুষ সৃষ্টির কোন প্রয়োজন নাই। বরং আমরাই তো আপনার প্রসংশায় তাসবীহ ও পবিত্রতা ঘোষনা করি। আল্লাহ বললেন, আমি যা জানি তোমরা তা জানো না। (বাকারা ৩০)
এখন বোঝা দরকার, জ্বীন জাতির মাধ্যমে আল্লাহর সেই প্রেম প্রকাশ পায়নি বিধায় আল্লাহ মানব জাতিকে তাঁর জাত পাক প্রকাশের জন্য সৃষ্টি করলেন।
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাস করা মানুষের একটি স্বভাবগত অভ্যাস। তাই তাদেরই মধ্যে থেকে প্রতিনিধি পাঠিয়ে তাদেরকে সঠিক পথের দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে পরিক্ষা করার জন্য সঙ্গে দিয়েছেন শয়তান, ভালো মন্দ যাচাই করার জন্য। কথায় বলে ঘরের চোরে চুরি করলে ধরা মুশকিল, আসলে তাই। অন্যান্য ধর্মের লোক ইসলামের যতটুকু ক্ষতি করেছে, তারচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে মুসলমান নামধারী মৌলবাদ। অবশ্য এদেরকে সহজে চেনাও মুশকিল। তবে সত্যকে প্রকাশ করাই মুসলমানদের কাজ, চেপে রাখা মুনাফিকের লক্ষন।
যে ইসলামের আলোক আভায় বিশ্বজগত উজ্জল হয়ে উঠেছিলো, মরুর তৃষাতুর বালুকা রাশি রহমতের বারিধারায় সিক্ত হয়েছিলো, নিষ্প্রান মরুর ধুলায় সবুজের অংকুর উঠেছিলো, যার আগমনে যুলুম ও অত্যাচারের প্রাসাদ ঝরঝর করে ধ্বসে পড়েছিলো, নিপিড়িত মানবজাতি মুক্তির মুকুট পেয়েছিলো, সে ইসলাম ও তার রাসুলকে নিয়ে চলছে অসংখ্য পায়তারা। কখনো বিধর্মী ও কখনো মুখোশধারী মৌলবাদদের দ্বারা যুগে যুগে ইসলাম বহু আক্রান্ত হয়েছে। এ সমস্ত মুসলমানদের চেনা সহজ, আবার কঠিন।
এরা পৃথিবীর কানায় কানায় এমনভাবে ছড়িয়ে আছে, এক শ্রেনীর লোক তাদেরকে বুজুর্গ হিসেবে ভক্তিও করে। বাহ্যিক ভাবে এদেরকে দেখলে মনে হয় এরা পাক্কা মুসলমান। কিন্তু এরা আকিদা গত ভাবে ধর্মের মধ্যে গোড়ামী সৃষ্টি করে যাচ্ছে, এরা ইসলাম বিরোধী মৌলবাদ।
একপাল ছাগলের মধ্যে দুটো ক্ষুধার্ত দুটি বাঘ ছেড়ে দিলে ছাগল পালের জন্য যেমন মারাত্মক ঠিক তেমনি ইসলাম ধর্মের জন্য এরাও মারাত্মক।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুগ যুগ ধরে বিধর্মী শত্রুরা ইসলামের যতটুকু ক্ষতি সাধন করতে পারেনি, তার চেয়েও অধিক ক্ষতি সাধন করেছে নামধারী মুসলমান মৌলবাদ সমাজ। এরা নামধারী আলেম সেজে, কয়টা আরবী বই পড়ে সমাজের সরলমনা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছে গোড়ামী, ফতোয়া যা ধর্মের মধ্যে নাই। তারা লম্বা দাড়ি, লম্বা টুপি, জুব্বা, পাগড়ী পড়ে সমাজগুলো ধ্বংস করতে চলেছে। এর মৌলবী রুপী শয়তান। আর মানুষ এখন মৌলবী পোশাক টাকে এত মূল্যবান মনে করছে যে, এ পোষাকটা পড়লেই আলেম! আলেম সাহেব যা বলে কোরআন হাদীস থেকেই বলে! আলেম সাহেব কি আর মিথ্যা বলতে পারে! হায়রে সমাজ!
মৌলবীরা রূপকের বিশ্বাসী, রূপকের আড়ালে যে সত্য তথা বাস্তবতা লুকায়িত আছে তারা তা বিশ্বাস করতে চায় না। মানুষকে বিশ্বাস করতে চায় না। দেয় শুধূ ফতোয়া।
পবিত্র কালামে আল্লাহ বলেন, ধর্মের মধ্যে কোনো জোর জবরদস্তি নাই। (বাকারা ২৫৬)
রাসুল (সা) এর কালাম হলো- আল ইসলামু দ্বীনুল ফিৎরাত অর্থাৎ ইসলাম হলো স্বভাবগত ধর্ম।
মানুষ কে নামাজের কথা বলে- নামাজ পড়ো। চুরির কাজ চুরি করবে, নামাজের কাজ নামাজ করবে। অথচ কোরানে বলা হয়েছে নামাজ সমস্ত অশ্লীল ও ঘৃনিত কাজ হতে বিরত রাখে। (আনকাবুত ৪৫) । কই, এরা তো নামাজও পড়ে, নামাজের দাওয়াতও দেয়, তবুও তো মৌলবীদের স্বভাব পরিবর্তন হয়না! যতসব অশ্লীল কাজ আছে, খুন থেকে শুরু করে সব ধরনের ঘৃনিত কাজে এরা জড়িত। এরা আবার আলেম! মৌলবীরা ধর্ম জ্ঞান বুঝে না।
নামাজের কাজ বা গুণ হলো মুসল্লির সৎ স্বভাবগুলো ফুটিয়ে তোলা। আর খারাপ স্বভাব গুলো পরিহার করা।
রাসুল (সা) একদিন দেখলেন, তার কিছু সাহাবী দাজ্জাল সম্পর্কে আলোকপাত করছে। রাসুল (সা) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমারা কি সম্পর্কে আলোচনা করছিলে? সাহাবা গণ বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা) আমরা দাজ্জালের ভয়ে ভীত সন্ত্রন্ত হয়ে গেলাম। রাসুল (সা) বললেন, আমি কি তোমাদেরকে দাজ্জালের চেয়েও ভয়ংকর কিছু বলবো না? সাহাবা গন বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা) বলুন। তখন রাসুল (সা) বললেন, মানুষকে দেখানোর জন্য যারা নামাজ আদায় করে তারা দাজ্জালের চেয়েও ভয়ংকর।
হাদিস – হযরত আবু দারদা (রা) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, নামাজ রোজা এবং সদকার চেয়েও উত্তম সমাজে সুসম্পর্ক স্থাপন করা। কারন সমাজে সুসম্পর্ক নষ্ট হওয়া মানেই দ্বীন ধ্বংস হওয়া। (হাদিস)
একদল মৌলবী সাহেবগন কালেমা নামাজ রোজা হজ্জ এবং যাকাতে শুধু আনুষ্ঠানিকতা আদায় করছে তারা কেবল খোসাটি নিয়েই ব্যস্ত আছেন। বিধায় এ ধরনের বন্দেগী তে মানব মুক্তি মোটেই মিলবে না। বরং জাহান্নামী হতে হবে। (সুরা মাউন) তাদের ধারনা শুধু নামাজ রোজা ইত্যাদি বাহ্যিকভাবে বা আনুষ্ঠানিক ভাবে বা ওয়াক্তিয়া নামাজ আদায় করে গেলেই পার পেয়ে যাবে। আসলে এরা নামাজ কি জিনিস মোটেই বুঝেনি। বুঝলে এ ধরনের কথা মোটেই বলতে পারতো না। এরা পারে ফতোয়া দিয়ে ধর্মে গোড়ামী সৃষ্টি করতে।
আমিত্বকে দীলে ধারণ করে বা নফসে আম্মরাতে আশ্রয় নিয়ে যতো নামাজ রোযাই করা হোক না কেনো তার মুক্তি কম্মিনকালেও মিলবে না।
পবিত্র কোরানে আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হও অর্থাৎ ইসলামকে ধারণ করো। (বাকারা ১৩৮)
এখন মৌলবাদী সমাজ গুলো এসব মানতে চায় না, মানে না।
ইসলাম নিছক কোনো পোষাক, দাড়ী, জুব্বা, বেশ ভূষা দিয়ে হয় না। মানুষ স্বভাবে সুন্দর, চেহারায় সুন্দর হয় না।ধর্ম চেহারা দেখে না, স্বভাব দেখে।
মুসলিম ও বোখারী শরীফের হাদীস, আল্লাহ তোমাদের বেশ ভূষন ধন সম্পদ দেখে না, বরং দেখে তোমাদের অন্তর ও উদ্দেশ্যের দিকে।
আরো বলা হয়েছে, তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর গুনে গুনান্বিত হও।
শুধু লম্বা জুব্বা, ঢিলা কুলুপ দ্বারা আলেম সাজা যায়, আলেম হওয়া যায় না। আরবী পড়তে শিখে তাফসীর করে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বিরুদ্ধাচারন করলে তাকে আলেম বলে, এই কথায় যারা বিশ্বাসী, তাদের মাথায় মগজ বলতে কিছুই নাই।
চৈতন্য জ্ঞানের অধিকারী হলে সে হয় আলেম, আর এ জ্ঞান না থাকলে হবে মৌলবাদ।
আলেমের মধ্যে থাকবে আল্লাহর স্বভাব। তারা মাদ্রাসা স্কুল কলেজে পড়ুক আর নাই পড়ুক তারা আলেম।
মৌলবীগন মসজিদে মসজিদে চাকরী নিয়ে নামাজ পড়ানোর নামে গ্রাম বা মহল্লার মানুষকে তাদের মতবাদে দীক্ষিত করে মগজ ধোলাইর মাধ্যমে ঈমান ধ্বংস করে চলেছে। ইসলামের তাবলীগের নামে গ্রাম গঞ্জে গাট্টি মাথায় নিয়ে মৌলবী ইলিয়াছের স্বপ্ন কে বাস্তবায়ন করছে, এরা জঙ্গী মৌলবাদ। এদের সম্পর্কে জানার জন্য “পরহেজগারীর আড়ালে ওরা কারা” বইটি পড়ুন।
কারবালার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। রাসুল (সা) এর দৌহিত্র , মাওলা আলী (আ) এর কলিজার টুকরা, মা ফাতেমা এর নয়নের মনি, আহলে বাইয়াতের সদস্য ইমাম হোসাইন (আ) তৎকালীন যুগের নামধারী মুসলমান তথা মৌলবাদদেরকে লক্ষ্য করে ফোরাত নদীর তীরে হাজার হাজার মুফতি মুফাসসির হাফেজ মাওলানাদেরকে বলেছিলেন, আলাইছা ফি মুসলিমুন? অর্থ- তোমাদের মধ্যে কি একজনও মুসলমান নাই? অথচ বর্তমান আলেম সমাজের চেয়ে তাদের কুরআন কিতাবের জ্ঞান, পোষাকের বাহার কম ছিল না। ইমাম হোসাইন (আ) মৌলবাদ দেরকে চিহ্নিত করে দেখাইয়া গেলেন, এরা নামধারী মুসলমান মৌলবাদ যার স্থান ধর্মের মধ্যে নাই। তারা লম্পট ইয়াজিদের চেলা চামুন্ডা টাকার গোলাম ছিল বিধায় ফতোয়া দিয়েছিলেন ইমাম হোসাইন (আ) এর শির মোবারক নিয়ে তারাতারি কেটে নিয়ে আয়, আসরের নামাজ যেন কাজা না হয়! হায়রে ইসলাম দরদী! যারা ইসলামের কর্ণধার তাদের বিরুদ্ধাচরন করে আবার নামাজের দাবি করে! এরা কেমন মুসল্লী বোঝা দরকার।এদেরকে কোরানে বধির, বোবা ও অন্ধ বলা হয়েছে। (বাকারা ১৮)
তাই জগৎ বিখ্যাত মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (র) এদের গোড়ামীর কারনে এদেরকে কুকুরের সাথে তুলনা করে তার মসনবী শরীফে বলেছেন, আমি কুরআনের মগজ (আসল অর্থ) উঠিয়ে নিয়েছি আর হাড্ডি গোশত (রূপক কাঠামো) কুকুরের জন্য ফেলে রেখেছি।
কারন মৌলবীদের মাঝে তিনি কুকুরের স্বভাব দেখেছেন। এরা কোরানের রূপকের অর্থ করে এবং রূপককেই ধর্ম জ্ঞান বুঝায়। তাই এদেরকে কুকুরের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
এই স্বভাব থাকা কালীন তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারবে না। মৌলবী স্বভাব ছেড়ে দিয়ে একজন জ্ঞানীর সংস্পর্শ ছাড়া মানুষ হওয়া যায় না। এটা মৌলবী সমাজ বুঝতে চায় না, সাধারন মানুষকেও বুঝতে দেয়না। এরা রুপকে বিশ্বাসী, ইসলাম যে যুগে যুগে বর্তমান, এদের মগজে তা ধরে না।
একজন জ্ঞানীর সঙ্গে থাকলে ধর্ম জ্ঞান বুঝা যায়, জানা যায় এবং দেখা যায়। তাই আমার প্রান প্রিয় মুর্শিদ কেবলা কাজী বেনজীর হক আল চিশতী নিজামী (কুঃ ছেঃ) বধিরদেরকে লক্ষ্য করে তার কালামে লিখেছেন,
“বেদ কোরান আর বাইবেল গীতা, সকলের মুল মুর্শিদ তোমার
ভজন করো তাররে মন ভজন করো তার।”
অর্থাৎ কোরআন হাদীস বাইবেল গীতা যত ধর্ম গ্রন্থ আছে, যত বড় পন্ডিত হও না কেনো বুঝতে পারবে না যদি একজন জ্ঞানী তোমাকে বুঝিয়ে না দেয়।
তাই মহান আল্লাহ তায়ালা তার কালামের মধ্যে বলেছেন, হে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আল্লাহকে ভয় করো আর একজন সাদেকিন বান্দার সঙ্গী হয়ে যাও। (তওবা ১১৯)
অর্থাৎ যারা সত্য ধারন কারী, আল্লাহ প্রাপ্ত, চৈতন্য জ্ঞানের অধিকারী, তাদের সঙ্গে থাকতে বলেছেন, তাদের সাথে থাকলে ধর্ম জ্ঞান বুঝা যায়, জানা যায়।
ধর্ম জ্ঞান না বুঝে নিজেরাই আলেম সেজে যারা সমাজগুলোকে পথভ্রষ্ট করছে তারাই আসল মৌলবাদ।
এরা লেবাছ পড়া শয়তান, এদের কাছ থেকে আমাদের দুরে থাকতে হবে।তাই আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাইলের ৮১ নং আয়াতে বলেছেন, সত্য এসেছে, মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে।আর নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হবারই ছিল।
সত্য আগমনে মিথ্যা তিরোহিত হবে, এর মধ্যে কোনো সন্দেহ নাই।
যারা দ্বীনে মোহাম্মদীর মধ্যে দাখিল হবে তাদের মধ্যে মৌলবাদ স্বভাব থাকবে না। তারা হয়ে যাবে সত্যিকারের মানুষ।তাদের মধ্যে থাকবে প্রেম ভালোবাসা, একে অপরের প্রতি তারা ভালোবাসায় আবদ্ধ থাকবে, শান্তিতে থাকবে, শান্তিতে বসবাস করবে। আর মৌলবাদদের কাজ সমাজে গোড়ামী সৃষ্টি করা, মানুষের মধ্যে পশুর স্বভাব সৃষ্টি করা, এরা শয়তানের বান্দা, তারা নিজেরাই শয়তান হয়ে গেছে। রমজানের রোজাতে হোটেল রেস্তোরা বন্ধ করার জন্য মিছিল করে। এদেরকে চিহ্নিত করতে হবে। তাহলেই ঈমানদারদের ঈমান হেফাজতে থাকবে।
প্রবন্ধ – নব নির্মাণ
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
ইহা এক উন্মত্ততা।
ইহা মহাকালের বুকে ভাসিয়া আসা মানবের আদি হৃদয়-উৎসের গভীরতম সংগীত।
চেতনার গভীরের বিজন-কুঠরীতে আজিও অবিরাম বাজে সেই মনোহারিনী তান। সপ্তসুরে মহান প্রভু আজিও মানবের দ্বারে-দ্বারে পৌঁছিয়া দেন সেই অনাদী কালের আহ্বান- হে ঘুমন্ত ব্যার্থ, ওঠো, জাগো। নারায়ণ আজি ক্ষীরোদ সাগরের কালনিদ্রা ত্যাজিয়া তোমার মানব-দুয়ারে কড়া নাড়িতেছে- হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! ওঠো, জাগো। ঐ শোনো মহাভারতের মহারণতীর্থে মহাকালের বুক চিড়িয়া ভাসিয়া আসিতেছে পাঞ্চজণ্য শঙ্খধ্বনী। হে মূঢ়, হে অজ্ঞান, আজ সময় অধর্ম নাশের, আসো চেতনার, মহাপ্রেমের মহামিলন সমুদ্র মাঝে। করো ধর্ম সংস্থাপন, কালের পদধ্বনীরে বাধো আপনার আশ্রয় রূপ বন্ধনে।
অচেতনতার মায়ামোহন বাহু শৃঙ্খলে আবদ্ধ মানব!
তব কর্ণকুহ্বর কি আজো শুনিতে পায় না ঈসরাফিলের প্রলয়ধ্বনি? দেব চক্রপানি আজ তোমারই সারথি। তোমায় লইয়াই তাহার অনন্ত মহাযাত্রা। দেখো হে ঘুমন্ত, স্বয়ং আযাযিল আজ স্ববেশে, সে এক সৌম্য মূর্তি, কল্পনাতিত এক আনন্দ উজ্জীবণ সূধায় আবাহন করিয়া আসিয়াছে তোমারে জাগাইয়া তুলিতে। তোমার তরে তাহার প্রেমাঞ্জলী সমর্পন করিতে। বেখেয়ালের এক অন্ধকূপ হইতে আঘাতের পর আঘাত হানিয়া, তব হাতে-পায়ে বাধা জিঞ্জির শৃঙ্খলে হাতুড়ি হানিয়া, খেয়াল তথা চেতনার আর্শীতে অবলোকন করাইতে তোমার ঐশী রূপ। আজো কি রহিবে অন্ধ? জন্ম তব মৃত্যু মাঝে, ধ্বংস মাঝে, আজো কি রাখিবে পথবিহীন সংশয়তায় বদ্ধ করিয়া?
মৃত্যুর দুয়াড়ে তব জীবনের আহ্বান লইয়া আসিয়াছে মহান দিকবিহীন সেই অনন্ত সত্ত্বা, তোমার যৌবন-কুঞ্জ-কিশলয়ে। বাসুমতি চাহিয়া রহিয়াছে তোমার টলটলায়মান চরণযুগল পানে। বীণাপানির স্তববৃষ্টি অবিরাম বর্ষিত হইতেছে তোমার নাঙা শিরে। জিবরাইল আজ তাহার অপরূপ নূরময় ডানাসমূহ মেলিয়া নৃত্ত করিতে করিতে আগাইয়া আসিতেছে তোমার পানে, তোমায় পথ দেখাইয়া লইয়া যাইবে বলিয়া। তেত্রিশ কোটি দেবতা সকল আজি ধ্যানমগ্ন তোমারই তরে। তবুও কি মুখ ফিরাইয়া রইবে হে পাষাণ? উঠিয়া আসো ঐ ধর্ম মাতাল, জীবন মাতালদের আড্ডা হইতে। উঠিয়া আসো ঐ নোংরা পঁচা-শব ভাগাড় পায়ে দলিয়া, শশ্মানের মৃত্যু আহ্বান পেরিয়ে উঠিয়া আসো হে মুক্ত আকাশের পাখি।
শোনো আজি নবযুগ বাণী
বদ্ধ-অন্ধ অতীতের পঁচা শব,
ছাড়ো আজি পুরাতন, শকুন-স্বপন
মৃত্যুকূপে গলিত লাশের, বর্বর উৎসব!
মৃত্যু স্বপনে নীল-নেশায় আক্রান্ত হে মানব!
আজ তারার বহ্নিস্রোতে দুর্বার গতি। জীবন সমুদ্রের পাড়ে চেতনার হিমালয়ে আজ নবযুগের বিশাল পক্ষধ্বনি। দুহাতে আঁখি ঢাকিয়া কেনো ইচ্ছা অন্ধ হইয়া পাষাণ বিবেকে দিতেছো সূধা মহন্তের হৃদয় ক্ষরা আর্শীবাদ বিসর্জন?
জীবন সিন্ধু মন্থন করিয়া আজ অঞ্জলী ভরিয়া নাও মহাপ্রেমের অমৃত। জীবন দুয়ারে আজ স্বাগত জানাও জাগরণকে। ওঠো কালনিদ্রা ত্যাজিয়া। আপনারে লয়ে সকল দ্বিধা, সকল অনিশ্চয়তায় খন্ডিত সংশয়ের হউক অবসান। জাগিয়া উঠুক নব নির্মাণ। মুক্ত কন্ঠে আজি গাও ভাঙ্গার গান। সে তানে সুউচ্চ মানবের মহামিলন তীর্থে প্রতিষ্ঠিত হউক আত্মশক্তি, আত্মচেতনার, মহাপ্রেমের গননস্পর্শী গম্বুজ। রবির রক্ত উজ্জল রাঙা আভায় আলোকিত হইয়া হাসিয়া উঠুক তোমার করুণাধন্য এই জগৎ।
নব-কন্ঠে নব-মঞ্চে দাঁড়ায়ে
মৃত্যু-ভাগাড় দু’পায়ে মাড়ায়ে,
মুক্তপথে মুক্ত-মতের গাও জয়গান,
ঐ শোনো আজ, নবরুপ জ্যোতি
চির নতুনের ধরিয়াছে তান-
মুক্ত করো প্রান, সকলি গাও, চির নতুনের গান!
হে চির শিশু, তোমার উন্মাদ কোলাহলে প্রান পা’ক মরার দল। আশীর্বাদরূপে আবির্ভূত হও ধরণীর, বুকে বাধিয়া মহামানবের মহামিলন সূধা, আত্মাকে বিলাইয়া দিয়া বৃহৎ সুন্দরে, তুমিও হও সুন্দরের এক জ্যোতির্চ্ছটা, স্বয়ং ভগবানের অবতার। অনন্ত সৌন্দর্যকে করো বক্ষে ধারন, অখন্ড অনাদী রাঙা চরনযুগলকে করো আপনার আপন। তবেই জগতের সমস্ত অনস্তিত্ব বা খারাপ সমূহ ভেদী হাসিয়া উঠবে তোমার মুক্ত সুন্দর প্রান। তোমার হাসির মোহন রূপে উন্মাদ ধরণী রহিবে হাজার বছর দীপ্তিমাণ।
তোমার কন্ঠে ফুটিয়া উঠুক বিশ্ব-নিখিলের অপূর্ব মহিমাময় সুর-
খুলেছে আজি দক্ষিণা দুয়ার
ছিল যেথা লু-হাওয়া সাইমুম ঝড়-
হতাশার নরকাগ্নি, অসহায় মৃত্যুর প্রহর,
ছাঁপিয়েছে কূল-
নব-দিগন্তে আশা-ভালোবাসার সরোবরে
সুগন্ধময়, হাসিতেছে উৎপল!
জাগিতেছে আজ শত-সরোবরে নিত্য-নন্দন শতদল।
বীণা-সুরে আজ ভাসিতেছে বাণী, ভোরের পাখি জাগো
জাগো আজি জাগো, আপনার প্রাণে
আপনি আজিকে জাগো!
চির-শিশু, অশান্ত হিয়া উন্মাদ কোলাহলে
শান্তির বাণী ব্যাপ্ত হোক- চরাচরে, ব্রমান্ডলে
তোমার ছোঁয়ায় খুলে যাক সকল, বদ্ধ ব্যাথিত প্রাণ
জগৎ মাঝারে উচ্চ রবে গাহো, চির-শান্তির জয়গান।
কবিতা – পরিচয়
লেখক – দাউদ আহমেদ চিশতী
আমি উঁচু আমি নিচু, আমার কথা আমি কিছু
আমারি কাছে আমি করিব প্রকাশ,
আমি ভক্ত আমি ভক্তি, আমি শক্তি আমি মুক্তি
এ সংসারে আমি একাই বিকাশ।
আমি সং আমি সার, আমি হই সংসার
সংসারের মায়া যে আমি,
আমি পিতা আমি মাতা, আমি বন্ধু আমি ভ্রাতা
আমি হই সমতল ভূমি।
আমি চোর আমি চুরি, আমিই আমারে ধরি
আমি হই শাসন আমি যে প্রহার,
আমি খাদ্য আমি ক্ষুধা, আমি পানি আমি সুধা
আমারে আমি তাই করেছি আহার।
আমি বৃক্ষ আমি ফল, আমি সবুজ ছায়াতল
আমার ছায়াতে আমি বসে জুড়াই প্রান,
আমি পাখি আমি পাখা, আমি সখি আমি সখা
আমারে করতে পাগল আমি হই গান।
আমি সুর আমি বাঁশি, আমি মুখ আমি হাসি
আমি কুমারী আমি যে কুমার,
আমি জিবন আমি যৌবন, আমি হই আমার মন
আমার প্রশংসার হয়না শুমার।
আমি নিন্দুক আমি নিন্দা, আমি সকাল আমি সন্ধা
আমি আধার আমিযে আলো,
আমি মিথ্যা আমি সত্য, আমি কথ্য আমি অকথ্য
আমি খারাপ আমি যে ভালো।
আমি দয়াবান ও নির্দয়, আমি ভয় নির্ভয়
আমি চরম বিরক্তেরী রুপ,
আমি ঝগড়া আমি বাদ, আমি মিমাংসার কোমল হাত
আমি আঘাত আমি নিশ্চুপ।
আমি আসল আমি মেকী, আমি বাকী আমি ফাকি
আমি নগদ আমি পরিশোধ,
আমি যন্ত্র আমি যান, আমি ইঞ্জিন আমি প্রান
আমি চালক আমি হ্ই খোদ।
আমি আত্মা আমি কর্তা, আমি হই পরম সত্ত্বা
আমি খুব সুক্ষ অতি,
আমি আপন আমি পর, আমি নিত্য বরাবর
আমি নফস আমি যে গতি।
আমি জ্ঞান আমি গুনি, আমি খুন আমি খুনি
আমি জহর আমিতো জহুরী,
আমি দেশ আমি দশ, আমি অর্থ আমি যশ
আমি মাল আমি যে প্রহরী।
আমি প্রেম আমি কাম, আমি হই নিষ্কাম
আমি প্রকাশ আমি যে প্রকাশক,
আমি তত্ত্ব আমি ভাব, সব আমার নিজ স্বভাব
আমি রোগী আমি সব রোগ।
আমি জীব আমি জড়, আমি অতি ভয়ংকর
আমি হই বিষধর ফণী,
আমি শোক আমি ব্যাথা, আমি বুকের চাপা কথা
আমি মাটিতে চেপে থাকা নানান খনি।
আমি আখি আমি জল, আমি বলবান আমি দুর্বল
আমি হই জঘন্য খারাপ,
আমি পাপী আমি পাপ, আমি ক্ষমা আমি মাফ
আমি মহা পবিত্র নিষ্পাপ।
আমি শুন্যের নিরবতা, আমি মাটির গভীরতা
আমি অনন্ত শুন্য ময়,
আমি জয় দুর্জয়, আমি ভয় নির্ভয়
আমি ক্ষয় আমি অক্ষয়।
আমি রাজ্য আমি রাজা, আমি মন্ত্রী আমি প্রজা
আমি সভা আমি অমূল্য তাজ,
আমি আদেশ আমি নিষেধ, আমি উপমা ও উপদেশ
একরুপে আমি রহুরুপী সাজ।
আমি ছায়া আমি কায়া, আমি দর্পন আমি মায়া
আমি এ জগত আর আমি প্রতিচ্ছবী,
আমি চতুর আমি বোকা, আমি বৃদ্ধ আমি খোকা
সমস্ত ভাবনা আমার আমিই ভাবি।
আমি ভাগ্য আমি ফতুর, আমি ধনী আমি অতুর
আমি আদব আর আমিযে বেয়াদব,
আমি যোগ আমি যোগী, আমি বিয়োগ আমি ভোগী
আমি লোকনাথ আর আমি যে মাধব।
আমি সূর্য আমি তেজ, আমি হই নিস্তেজ
আমি চাঁদ আমি স্নিগ্ধ প্রভা,
আমি শৈল আমি গুহা, আমি স্বর্ণ আমি লোহা
আমি প্রকৃতি আমি তার শোভা।
আমি দুর আমি কাছ, আমি ভোর আমি সাঝ
আমি ডুবন্ত আমি যে সাতার,
আমি ইতি আমি স্মৃতি, আমি হই বিস্মৃতি
আমি হই অসীম পাথার।
আমি লাজুক আমি লজ্জা, আমি হই ফুলসজ্জা
ভুবনে আমি নির্লজ্জ অতি,
আমি নারী আমি নর, আমি বাড়ী আমি ঘর
আমি কলংঙ্ক আমি যে ক্ষতি।
আমি নৌকা আমি পাল, আমি মাঝি আমি হাল
আমি যাত্রি আমি সব রুহ,
আামি বাতাস আমি গতি, আমি কলঙ্ক আমি সতী
আমি ধ্যান আর আমিই যে হু।
আমি পুত্র আমি কন্যা, আমি বিয়ে আমি বন্যা
আমি রিপু আমিই যে কাম,
আমি অর্জুন আমি কৃষ্ণ, আমি রাধা আমি বিষ্ণু
আমি শ্যাম আমিই যে শাম।
আমি মা আমি মায়া, আমি আচল আমি ছায়া
আমি রৌদ্র আমি যে খরা,
আমি ফসল আমি জমি, আমি হই জন্মভুমি
আমি নরম আমি শক্ত তেড়া।
আমি ইচ্ছা আমি সাধ, আমি রশি আমি ফাদ
আমি হই ঝুলন্ত ফাঁসি,
আমি ভাঙ্গা আমি গড়া, আমি তাজা আমি মরা
আমি যাই আমিই তো আসি।
আমি নাই আমি আছি, আমি হই কাছাকাছি
আমি হই অনন্ত দুর,
আমি চিনা আমি জানা, আমি হই অজানা
আমি অচিন্ত আর আমি অচিনপুর।
আমি কান্না আমি হাসি, আমি ধর্মশালা গয়া কাশি
আমি ধার্মিক আমি ধর্ম হই,
আমি কর্মী আমি কর্ম, আমি তলোয়ার আমি বর্ম
আমি যোদ্ধা আমি যুদ্ধের বই।
আমি হিন্দু আমি মুসলিম, আমি বৌদ্ধ আমি খ্রিস্টান
আমি সর্ব জাতি,
আমি ব্রাহ্মন আমি বৈশ্য, আমি ক্ষত্রিয় আমি শুদ্র
আমি বিভিন্ন আমি যে খ্যাতি।
আমি আকার আমি সাকার, আমি হই নির্বিকার
অব্যক্ত ও ব্যক্ত আমি,
আমি আকাশ আমি মাটি, আমি খাঁদ আমি খাটি
আমি স্ত্রী আর আমি যে স্বামী।
আমি সারথি আমি রথ, আমি উচু নিচু ঢালু পথ
আমি হই সরল সোজা,
আমি কলেমা আমি নামাজ, আমি যাকাত আমি হজ্জ
আমি হই অসংযম আমি যে রোজা।
আমি ফুল আমি ফল, আমি পুষ্পের মধু জল
আমি সুরভীর ইন্দ্র সদা,
আমি পচা আমি গলা, আমি মেথর আমি শলা
আমি হই দুর্গন্ধ কাদা।
আমি জীব আমি পরম, আমি শীত আমি গরম
আমি হই অসুর আযাযিল,
আমি নিত্য আমি লীলা, আমি জ্বলি আমি জ্বালা
আমি ধ্বংস আমি ইসরাফিল।
আমি বনবাস আমি সিতা, আমি বাইবেল আমি গিতা
আমি হই দুর্গা দেবী,
আমি দেবী আমি দেব, আমি হই মহাদেব
আমি কাব্য আমি যে কবি।
আমি অলি আলি আল্লাহ, আমি জপি আল্লা আল্লাহ
আমি কথা আমি জিবরাইল,
আমি স্রষ্টা আমি সৃষ্টি, আমি আখি আমি দৃষ্টি
আমিই তো হই মিকাইল।
আমি ভিক্ষুক আমি ভিক্ষা, আমি ছাত্র আমি দীক্ষা
আমি আজরাইল আমি যে গুরু,
আমি আদি আমি অন্ত, আমি গুপ্ত আমি ব্যক্ত
আমি শেষ আমি যে শুরু।
আমি বই আমি পাতা, আমি লিখা আমি কথা
আমি কুরান আমি যে আয়াত,
আমি কাল আমি কালী, আমি হযরত আলী আলী
আমি নবী আর আমি যে হায়াত।
আমি মানুষ আমি পশু, আমি ঈশ্বর আমি শিশু
আমি হই দ্বীন ইসলাম,
আমি কলম আমি কালি, আমি খেলা আমি খেলি
আমি হই আমার মুখের পবিত্র কালাম।
আমি অসীম শুন্যকার, আমি একা একেশ^র
আমাতেই আমি হই নত,
আমার নাই মান অপমান, তাই আমি সম্মান
আমার বিভুতি নয় শেষ হবার মতো।
আমি ধনী আমি ধন, আমি অতি গরীব জন
আমি ভিক্ষুক আমি ভিক্ষা করি,
ত্রিভুবনের সমুদয়, আমি একা নিশ্চয়
আমি আল্লাহ ঈশ্বর বিধাতা ও হরি।
সংগীত – ওরে ভোলা মন
লেখক – মোতাহার হোসেন চিশতী
ওরে ভোলা মন, বৃথা গেলো জীবন
না চিনিয়া ভবে আপনার আপন।
স্ত্রী পুত্র মাতা পিতা জানি আপন হয়,
ভাবিয়া দেখি এখন এরা আপন নয়।
আমার জিহ্বা আমার দাঁত, কত প্রেম এদেই সাথ,
সুযোগ পাইলে দাঁতে ছাড়ে না যখন।
আপন চিনে আপনাকে ভালোবাসো মন
যাত্রা পথে তোমার সাথে যাত্রী হয় যেজন,
আত্মা যারে ভালোবাসে, থাকো তার পাশে পাশে
দুই জনে মিলে মিশে হইয়া যাও একজন।
হযরত আদেল উদ্দিন কয় মোতাহার আপনা চিনে,
তাহাকে রাখো তোমার আপন আসনে
গুরুর প্রেমে দাও আত্ম কর তার মমতা,
তার যার ক্ষমতা তিনিই আপন জন।
সংগীত – শোনরে মন গোপন রতন
লেখক – মোতাহার হোসেন চিশতী
শোনরে মন গোপন রতন, আছে গোপনে মিশে
নিজকে নিজে না চিনছে যে, পরম ধন বুঝবে কিসে।
গাছে যেমন ফুল ফুটে রয়, ফুল সবে ভালবাসে,
ফুল দেখিয়া মন ভরে না, মন ভরে তার সুবাসে,
তেমনি স্বরুপ সেই অপরুপ, আছে গোপন মিশে।
মোরাকাবায় মোশাহেদায় নফি এসবাত করিলে
নয় দরজা তালা দিলে জ্ঞান আখি যাবে খুলে,
প্রেম তরঙ্গে রুপের ছবি দেখবি অনায়াসে।
হযরত আদেলউদ্দিন কয় মোতাহার, তুমি হলে দিন কানা
দুগ্ধের মধ্যে আছে মাখন তাতো তুমি দেখ না,
তোমার ফুটবে যেদিন জ্ঞানের আখি দেখবি শুধু সে আর সে।
সংগীত – আমাকে খুঁজিয়া আমি
লেখক – আওলাদ হোসেন চিশতী
আমাকে খুঁজিয়া আমি
ক্লান্ত পথের শেষে –
ভ্রান্ত মনে দেখি খুঁজে
আমিই আছি আমাতে মিশে।
আমি নই আমার কেহ
করি নাই সম্মান করি নাই স্নেহ।
আমায়, আমার করে নেয় নাই কেহ
বুঝলাম আমি আমার নায় কেহ অবশেষে।
আমার আপন খবর যে করে দেয়
আমিই তাহার আপন হই নেইকো পরিচয়।
আমার পরিচয়ের মধ্যেই আপন রয়
তাইতো তাকে খুঁজে পেতে এত সংশয়।
আছ তুমি থাকবো আমি নয়তো কথা মিছে
সবার মাঝে থাক তুমি আমি আছি তোমায় মিশে।
তুমি আমি হই পরাধীন, স্বাধীন হবো কিসে
আওলাদ নামেই খালেক তুমি স্রষ্টা সৃষ্টি এক সাথে মিশে।
সংগীত – হলে আশেক পাবি মাশুক
লেখক – জসিম উদ্দিন চিশতী
হলে আশেক পাবি মাশুক দেখবিরে নিজ নজরে
দেখা দেয়না রে যারে তারে।
মালকুতেরি কাটলে পর্দা আইনুলেতে দেখবি খোদা
তোমাতে সদা –
ওরে যার ভাবনায় আছে জুদা
সে কখন দেখতে নারে (তারে)।
যে দেখেছে খোদার লিলা
দুর হইছে তার ভ্রম জ্বালা, সদাই থাকে নিহারে।
সে যে আশেকে রাসুল, হয় নারে ভুল
ঝড় তুফান পায়না তারে (মনরে)।
আশেকের রাজ্যে যে বানছে ঘর
সে হবে হাবিব বরাবর, দোস্ত কয় তারে।
সে যে ছালাতে মিরাজ করে
তখন আপন অজুদ ভান্ডারে।
মুর্শিদ লতিফ হয় আশেকের রাজা
মোল্লা জসিম হযে সোজা, পূজা দাও তারে।
নইলে পরে পাবি সাজা
দেখবি মজা আখেরে।
বাণী – তরিকতের বাণী সমূহ
১. এক পলক দুনিয়ার অনাসক্তি, হাজার বছর ইবাদত অপেক্ষা অধিক মূল্যবান। – হযরত খাজা হাসান বসরী (রা)
২. যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুতে শান্তি পায় না, সেই আসল ফকির। – হযরত শিবলী (র)
৩. হয় ভাবো, না হয় ভ্রমণ করো। ভাবুক আর ভ্রমণকারীই জগতের শ্রেষ্ঠ দরবেশ। – শেখ সাদী (র)
৪. মূর্খ দের আড্ডা থেকে সবসময় দূরে থাকবে। অন্যথায় তারা তোমাকেও মূর্খ বানিয়ে ছাড়বে। – মাওলা আলী (আ)
৫. সমস্তকে ত্যাগ করে তুমি কোনো কামেল ওলীর গোলাম হয়ে যাও। তবেই তুমি ধর্মের প্রকৃত স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে। – মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী (র)
৬. সেই পথ শ্রেষ্ঠ, যেখানে সকল পথের যোগ আছে। – মহর্ষি মনমোহন
৭. সংসারকে তুচ্ছ তুমি করিবে যখন, গৌরবে সংসার তোমায় করিবে গ্রহণ। – মহর্ষি মনমোহন
৮. সমস্ত কিতাব গ্রন্থ যা আছে সব ঐ নদীতে ফেলে দাও। আল্লাহকে পেতে হলে শামস তাবরীজ এর কাছে যাও। – মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী (র)
৯. যত বেশি নিরব হবে, তত বেশি শুনতে পাবে। – মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী (র)
১০. আরেফ ঐ ব্যাক্তি, যিনি নিজের হৃদয়কে দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের আকর্ষণ থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আর প্রতি মুহুর্তে আল্লাহর হাজার হাজার তাজাল্লু তাঁর মাঝে বিকশিত হয়। – হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র)
১১. গতকাল চালাক ছিলাম, তাই পৃথিবীকে বদলাতে চেয়েছিলাম। আজ আমি বিজ্ঞ, তাই নিজেকে বদলাতে চাই। – মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী (র)
১২. প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই, যে নির্জনতা পছন্দ করে। – হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (র)
১৩. তুমি দুনিয়াও চাও, আবার আল্লাহকেও চাও। এটা নিছক পাগলামী ছাড়া আর কিছু নয়। – হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র)
১৪. ভাবিতে ভাবিতে হলে ব্রহ্ম ভাব, খন্ড জীবে ফুটে ওঠে প্রকান্ড স্বভাব।
নির্জনে থাকিলে হয় ঈশ্বরত্ব বোধ, নির্জনে সাধনা করো, পাইবে প্রবোধ। – মহর্ষি মনমোহন
১৫. মানুষ থুইয়া খোদা ভজো, এ মন্ত্রণা কে দিয়েছে,
মানুষ ভজো, কোরান খুঁজো, পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে। – জালাল উদ্দিন খাঁ
১৬. মুরিদের পক্ষে পীরের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি উভয় অবস্থাতেই একই প্রকার খেদমত হওয়া উচিত।
১৭. আল্লাহ প্রেমিকেরা আল্লাহ প্রেমে মত্ত থেকে নিজেকে ভুলে প্রভুর অপরিসীম রূপের ধ্যানে মগ্ন হয়ে যাও। – শেখ সাদী (র)
১৮. মানুষ যখন আমিত্বের খোলস ত্যাগ করে, তখন নিগুঢ় ভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, প্রেমিক প্রেমাস্পদ সবই এক। – খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র)
১৯. হিংসুকদের ভৎস্যনায় চিন্তিত হয়ো না, কষ্ট ও যন্ত্রনা দিয়েই আশেকের হৃদয় প্রতিপালিত হয়। – খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র)
২০. অনেক লোক ভূমির ওপর বিচরণ করে, কিন্তু তারা মৃত। আর অনেক লোক ভূমিগর্ভে শায়িত, কিন্তু তারা জীবিত। – হযরত আবুল হোসেন খেরকানী (র)
২১. মহাবিশ্বের সবকিছুর মাধ্যমেই খোদাকে চিনতে পারবে। কারণ, খোদা সমজিদ মন্দির গীর্জাতে সীমাবদ্ধ নন। তবু যদি জানতে চাও, খোদা মূলত কোথায় বাস করে? তবে তাঁকে খোঁজার জন্য একটি জায়গাই আছে। তা হলো, প্রকৃত প্রেমিকের অন্তর। – শামস তাবরীজ (র)
২২. প্রকৃত প্রস্তাবে মানব দেহই আসল কিতাব এবং প্রকৃত কাবা। তোমার আপন দেহেই আল্লাহকে অনুসন্ধান করো। – মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী (র)
২৩. এলেম গভীর সাগর সদৃশ। মারেফত উহার তরঙ্গ। – খাজা মঈনুুদ্দিন চিশতী (র)
২৪. ধ্যান হলো হৃদয়ের বাতি। এটি নিভে গেলে হৃদয়ে আর আলো থাকে না। – ইবনে আতাউল্লাহ (র)
২৫. মুমিন হচ্ছে সেই, যে কিনা দুনিয়াবী কাজের মাঝেও আল্লাহ হতে গাফেল হয় না। – হযরত সিররী সাকতি (র)
২৬. ভালো মানুষদের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো, তাদের স্বরণ রাখতে হয় না। তাদের স্বরণ এমনিতেই থেকে যায়।
২৭. আমাদের কর্মের ফল আমাদের দিকেই ফিরে আসে। – মাওলা আলী (আ)
২৮. খসরু এ প্রেম খেলা, খেলবো সঙ্গে প্রেমিকার! হারি যদি আমি তাঁর, জিতে গেলে সে আমার! – হযরত আমির খসরু (র)
২৯. হে প্রভু, জান্নাত জাহান্নামের অস্তিত্ব না থাকলে বোঝা যেতো, আপনার ইবাদতকারীর সংখ্যা কতো! – হযরত আবুল হাসান খেরকানী (র)
৩০. যুক্তিতে না পরলে শক্তিতে দেখে নিবে, এটাই বর্বর নীতি। – হযরত শেখ সাদী (র)
৩১. বেদ কোরান বাইবেল গীতা, সকলের মূল মুর্শিদ তোমার
ভজন করো তাঁর রে মন, ভজন করো তাঁর। – হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী (র)
৩২. অচেনারে চিনতে হলে রে, বসো চেনা লোকের সনে,
আল্লাহর আশেকান, বসো অলী আল্লাহর ধ্যানে। – হযরত খাজা দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী চিশতী (র)
৩৩. যদি নিত্যধামে যেতে থাকে বাসনা,
অনিত্য দেহ থাকিতে, নিত্যের করণ হবে না। – হযরত খাজা দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী চিশতী (র)
৩৪. মেরাজ হয় ভাবের ভূবন, সেথা গুপ্ত ব্যাক্ত হয় আলাপন
না জেনে লালন ভাবের উদ্দীপণ, হলো প্রেম করা মিছে। – ফকির লালন শাহ
৩৫. মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার, সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার। – ফকির লালন শাহ
৩৬. আলিফ লাম মীম তিনের-ই ভেদ, রেখেছেন সাঁই গোপন করে
চিনগা মুর্শিদ ধরে রে মন, জানগা মুর্শিদ ধরে। – হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী (র)
৩৭. মন তোর কপালে খারিজির চিহ্ন, অন্তরে তোর ভূতে ভরা
এই কি মন তোর নামাজ পড়া! – হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী (র)
৩৮. থেকো মন স্বচেতনে, জ্ঞান নয়নে, ঘুমাইও না।
তুই ঘুমাইলে পড়বি ভুলে, হারাবি মূল ষোল আনা। – দেওয়ান খাজা আব্দুর রশিদ চিশতী নিজামী (র)
৩৯. তুমি সেজেছো যে সাজ, করিও সেই কাজ
নইলে পাইবে লাজ, বিচারের দিনে। – দেওয়ান খাজা আব্দুর রশিদ চিশতী নিজামী (র)
৪০. আমি তুমি হলাম, তুমি আমি হলে। আমি দেহ তুমি প্রাণ। এরপর যেনো কেউ বলতে না পারে, তুমি একজন আর আমি একজন। – খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র)
৪১. বসে ধ্যানে দীলের টানে, দূরের বস্তু সামনে কর,
স্বচক্ষে দেখে শুনে, দীল হুজুরী নামাজ পর। – হযরত খাজা দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী চিশতী (র)
৪১. মূল বিচারে থাকে যে জন, দেহ জমি চাষের করণ
মানুষ রূপ করিয়া ধারণ, জমিতে ফলায় সোনা। – হযরত ইয়ার আলম চিশতী (র)
৪২. কাবকাওসিন নছিরাতে নূরের ঝলক দেয় তিনি,
মানব দেহ খুঁজলে পাবি নিশানী। – খাজা গওহার আলী শাহ চিশতী (র)
৪৩. প্রতি কর্মে থাকতে হয় সুন্দর রেসালাত, যার নিকট পরাজিত সকল মাখলুকাত
মানুষের পদতলে যাহার বাসস্থান, সে একদিন লাভ করবে দেবতার সম্মান। – হযরত পাগল শাহ হাশেম আলী ওয়ায়েসী (র)
৪৪. মাওলা আলীর স্বরণ এবাদত তূল্য।
৪৫. শরীরকে শুদ্ধ করো পানি দিয়ে, নফসকে শুদ্ধ করো অশ্রু দিয়ে, বুদ্ধিকে শুদ্ধ করো জ্ঞান দিয়ে এবং আত্মাকে শুদ্ধ করো প্রেম দিয়ে। – মাওলা আলী (আ)
৪৬. তোমার অন্তরকে সংশোধিত ও পরিশুদ্ধ করো। অবশ্যই প্রতি নিঃশ্বাসে তোমার সাথে আল্লাহর সাক্ষাত ঘটবে। – বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র)
৪৭. নফসকে নিয়ন্ত্রন করা একটি পাগলা ঘোড়া নিয়ন্ত্রন করার চাইতেও কঠিন। – হযরত হাসান বসরী (রা)
৪৮. যে দুনিয়াকে সম্পূর্নরূপে ত্যাগ করিয়াছে, সেই প্রকৃত আরেফ। আরেফ লোকটি পৃথিবী আলোকিতকারী সূর্যের ন্যায়। তার আ্যধাত্মিক আলোতে বিশ্ব আলোকিত হয়। – খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র)
৪৯. ধ্যান ও ইবাদত বন্দেগীর তরবারী দিয়ে যিনি যাবতীয় কামনা বাসনা কেটে ফেলেছেন, তিনিই খাঁটি আরেফ। – হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (র)
৫০. সাধক যদি হতে চাও, কম খাও, কম ঘুমাও।
মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির ত্রৈমাসিক আপন খবর, প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, আগস্ট – অক্টোবর ২০১৮ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও হযরত খাজা হিমেল শাহ চিশতী নিজামী কর্তৃক সম্পাদিত

