আপন ফাউন্ডেশন

Date:

মাওলা আলী (আ) এর পবিত্র শতবাণী / Mawla Ali AH.

 ১। যে লোভে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে সে নিজেকে অবমূল্যায়ন করে; যে নিজের অভাব অনটনের কথা প্রকাশ করে সে নিজেকে অবমানিত করে; আর যার জিহ্বা আত্মাকে পরাভূত করে তার আত্মা দূষিত হয়।

২। কৃপণতা লজ্জা, কাপুষতা ত্রুটি; দরিদ্রতা- একজন বুদ্ধিমান লোককেও তার নিজের বেলায় যুক্তি প্রদর্শন করতে ব্যর্থ করে এবং দুঃস্থ ব্যক্তি তার নিজের শহরেও আগন্তুকের মতো।

৩। কারো ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে পৃথিবী যখন অনুকূলে আসে তখন অন্যের ভালো কাজের সুকীর্তি তার নামে হয়; আর পৃথিবী প্রতিকূলে গেলে নিজের ভালো কাজের সুনাম থেকে সে বঞ্চিত হয়।

৪। ন্যায়কে ত্যাগ করলেও অন্যায়ের সমর্থন করো না।

৫। যার কর্ম তৎপরতা নিন্মমানের তার বংশ মর্যাাদার জন্য তাকে উচ্চ মর্যাদা দেওয়া যায় না।

৬। সব চাইতে সংযমী সে, যে এটা (সংযম) গোপন রাখে।

৭। উদার হয়ো কিন্তু অপচয়কারী হয়ো না; মিতব্যয়ী হয়ো কিন্তু কৃপণ হয়ো না।

৮। আকাঙ্খা পরিত্যাগ করাই সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ।

৯। বুদ্ধিমত্তা সর্বোত্তম সম্পদ, মূর্খতা সবচাইতে বড় দুঃস্থতা, আত্মগর্ব সব চাইতে বড় বর্বরতা এবং নৈতিক চরিত্র সর্বোত্তম অবদান।

১০। মূর্খলোকের সাথে বন্ধুত্ব করো না, কারণ সে তোমার উপকার করতে গিয়ে অপকার করে ফেলবে। কৃপণের সাথে বন্ধুত্ব করো না, কারণ তুমি যখন তার প্রয়োজন অনুভব করবে তখন সে তোমাকে স্বল্পমূল্যে বিক্রি করে দেবে। মিথ্যাবাদীর সাথে বন্ধুত্ব করো না, কারণ সে তোমাকে দূরের জিনিস কাছের ও কাছের জিনিস দূরের বলবে। 

১১। জ্ঞানী লোকের জিহ্বা হৃদয়ের পেছনে, আর মূর্খ লোকের হৃদয় জিহ্বার পেছনে।

১২। আমার এ তরবারী দ্বারা কোনো ইমানদারের নাকে যদি আমি আঘাতও করি তবু সে আমাকে ঘৃণা করবে না। আবার আমাকে ভালোবাসার জন্য যদি আমি মোনাফেকের সামনে দুনিয়ার সকল সম্পদ স্তূপীকৃত করে দেই তবুও সে আমাকে ভালোবাসবে না । এর কারণ হলো পরম প্রিয় রাসুল (স) তাঁর নিজ মুখে বলে গেছেন, ‘হে আলী, ইমানদার কখনো তোমাকে ঘৃণা করবে না এবং মোনাফেকগণ কখনো তোমাকে ভালোবাসবে না।’

১৩। আপনা থেকে প্রদান করাকেই উদারতা বলে, কারণ যাঞ্চা করলে প্রদান করা মানে হলো হয় আত্মসম্মান বৃদ্ধি, না হয় বদনাম ঘোচানো।

১৪। প্রজ্ঞার মতো সম্পদ নেই, অজ্ঞতার মতো দুরবস্থা নেই, বিশোধনের মতো উত্তরাধিকারিত্ব নেই এবং আলোচনার মতো খুঁটি নেই।

১৫। ধৈর্য দু রকম- ১. যা তোমাকে পীড়া দেয় তাতে ধৈর্য এবং ২. যা তোমার লালসা সৃষ্টি করে তার বিরুদ্ধে ধৈর্য।

১৬। তৃপ্তি এমন এক সম্পদ যা কখনো কমে না।

১৭। যদি তুমি অভিবাদন পাও তবে বিনিময়ে আরও বেশি অভিবাদন দিও। যদি তোমার দিকে কেউ সাহায্যের হাত বাড়ায় তবে বিনিময়ে আরও ভালো আনুকূল্য দিও; যদিও যে প্রথম করবে কৃতিত্ব তারই।

১৮। সামান্য হলেও দান করতে লজ্জাবোধ করো না, কারণ ফিরিয়ে দেওয়া তদপেক্ষাও ক্ষুদ্র।

১৯। জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা যত বাড়বে বক্তব্য তত কমবে।

২০। যে নিজেকে মানুষের নেতা বলে দাবি করে তার উচিত অপরকে শিক্ষা দেওয়ার পূর্বে নিজে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং মুখের বদলে সে যেন নিজের আচরণ দিয়ে অন্যকে শিক্ষা দেয়। যে ব্যক্তি নিজেকে শিক্ষা দেয় সে অন্যকে শিক্ষাদানকারী অপেক্ষা অধিক সুমহানের দাবিদার।

২১। মানুষের প্রতিটি নিঃশ্বাস মৃত্যুর দিকে পদক্ষেপ মাত্র।

২২। জ্ঞানগর্ভ বাণী মোমেনের কাছে হারানো বস্তুর মতো। কাজেই মোনাফেকের কাছ থেকেও জ্ঞানগর্ভ বাণী পেলে গ্রহণ কর।

২৩। আমি তোমাদের পাঁচটি বিষয় বলে দিচ্ছি। যদি তোমরা উটে চরে দ্রুত তা খুঁজে নাও (অর্থাৎ মানতে চেষ্টা কর) তবে এর সুফল পাবে। আল্লাহ ছাড়া আর কিছুতে আশা স্থাপন না করা; নিজের পাপ ছাড়া আর কোনো  কিছুকে ভয় না করা; যা নিজে জানো না সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলে ‘আমি জানি না’ বলতে লজ্জাবোধ না করা; যা নিজে জানো না তা অন্যের কাছ থেকে শিক্ষা করতে লজ্জা না করা এবং ধৈর্য ধারণ করার অভ্যাস করা, কারণ দেহের জন্য মাথা যেরূপ ইমানের জন্য ধৈর্য তদ্রুপ।

২৪। ‘আমি জানি না’ বলা যে পরিত্যাগ করে সে ধ্বংসের মুখোমুখি হয়।

২৫। হীনতম জ্ঞান জিহ্বায় থাকে এবং উচ্চমানের জ্ঞান কর্মের মাঝে প্রকাশ পায়।

২৬। ভালো  মানে এ নয় যে, তোমার অনেক সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি থাকবে; ভালো মানে তোমার অনেক জ্ঞান থাকবে; তোমার ধৈর্য থাকবে অসীম এবং তুমি আল্লাহর ইবাদাতে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে। যদি তুমি ভালো কাজ কর তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। এ পৃথিবীতে ভালো শুধু দুব্যক্তির জন্য, যে পাপ করার পর তওবা করে এবং যে ব্যক্তি দ্রুত ভালো কাজের দিকে এগিয়ে যায়।

২৭। দৃঢ় ইমানে ঘুমানো সংশয়পূর্ণ ইবাদত থেকে অধিকতর ভালো।

২৮। যখন তুমি কোনো হাদিস শোনো তখন বুদ্ধিমত্তার সাথে তা পরিক্ষা করো, কারণ হাদিস বর্ণনাকারী জ্ঞানী লোকের সংখ্যা অনেক কিন্তু হাদিসের সঠিকতা রক্ষাকারীর সংখ্যা খুবই কম।

২৯। সহসাই এমন এক সময় আসবে যখন এমন লোককে উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হবে যারা অন্যের বদনাম করে বেড়ায়, যখন দুষ্ট প্রকৃতির লোককে বুদ্ধিমান বলা হবে এবং ন্যায়পরায়ণকে দূর্বল মনে করা হবে। মানুষ দানকে ক্ষতি বা লোকসান বলে মনে করবে, জ্ঞাতিত্বের বিবেচনা দায়িত্ব বলে মনে করবে না এবং ইবাদতের স্থ্ানসমূহ অন্যের ওপর মহত্ত্ব দাবির স্থান হবে। এ সময় নারীর পরামর্শে কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা হবে। অল্প বয়স্ক বালককে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করা হবে এবং নপুংসক লোক দ্বারা প্রশাসন চালানো হবে।

৩০। মানুষের মধ্যে এক টুকরো মাংস একটি শিরার সঙ্গে সংযুক্ত অবস্থায় রয়েছে এবং এটা এক অদ্ভুত জিনিস। এটাকে ‘কাল্ব’ বলে। এটাই জ্ঞান ও জ্ঞানের সাথে দ্বান্দ্বিক জিনিসের ভান্ড। যদি এটা কোনো আশার রশ্মি দেখে, উদ্বিগ্নতা এটাকে কলুষিত করে এবং যখন উদ্বিগ্নতা বেড়ে যায় তখন লোভ এটাকে ধ্বংস করে। যদি হতাশা এটাকে ছেয়ে ফেলে তবে শোক এটাকে হত্যা করে। যদি এর ভেতর ক্রোধ জেগে ওঠে তাহলে একটা মারাত্মক ক্ষিপ্ততা জন্ম নেয়। যদি এতে আনন্দ বিরাজ করে তবে এটা সতর্ক হওয়ার বিষয় ভুলে যায়। যদি এটা ভয়ে ভীত হয় তবে এটা অমনোযোগী হয়ে পড়ে। যদি চারদিকে শান্তি বিরাজ করে তবে এটা গাফেল হয়ে পড়ে। যদি কেউ সম্পদ অর্জন করে তবে বেপরোয়া মনোভাব এটাকে ভুল পথে নিয়ে যায়। যদি এতে বিপদ আপতিত হয় তবে অধৈর্য এটাকে হীন করে দেয়। যদি এটা উপোস করে তবে দুস্থাবস্থা এটাকে পরাভূত করে। যদি ক্ষুধা এটাকে আক্রমণ করে তবে দুর্বলতা এটাকে স্থবির করে দেয়। যদি এর খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে যায় তবে শরীরের ওজন এটাকে ব্যথা দেয়। এভাবে প্রতিটি কমতি এবং প্রতিটি বাড়তি এর জন্য ক্ষতিকর।

৩১। আমরা (আহ্লুল বাইত) মাঝখানের বালিশের মতো। যে পিছনে পড়ে আছে তাকে এটা পেতে হলে এগিয়ে আসতে হবে এবং যে অতিক্রম করে গেছে তাকে ফিরে আসতে হবে।

৩২। আহলুল বাইতকে যারা ভালোবাসে তাদেরকে অনেক দুঃখ-দুর্দশা-লাঞ্ছনা-উৎপীড়ন-যন্ত্রণা পোহাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

৩৩। প্রজ্ঞার চেয়ে আর লাভজনক সম্পদ আর নেই। আত্মশ্লাঘা অপেক্ষা বড় বিচ্ছিন্নকারী ও একাকিত্ব নিক্ষেপকারী কিছু নেই। কৌশলের মতো উত্তম প্রজ্ঞা আর নেই। খোদাভীতির মতো সম্মান আর নেই। নৈতিক চরিত্রের মতো উত্তম সাথী আর নেই। ভদ্রতার মতো উত্তরাধিকারীত্ব আর কিছু নেই। তৎপরতার মতো দেশনা আর কিছু নেই। সৎকর্মের মতো ব্যবসায় আর কিছু নেই। ঐশী পুরস্কারের মতো লাভজনক আর কিছু নেই। সংশয়ে মিথস্ক্রিয়ার মতো আত্মনিয়ন্ত্রণ আর কিছু নেই। নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকার মতো সংযম আর কিছু নেই। বিনম্রতা ও ধৈর্যের মতো ইমান আর কিছুই নেই। নিরহংকার হওয়ার মতো সাফল্য আর কিছু নেই। আলাপ আলোচনার মতো বিশ্বস্ত স্তম্ভ আর কিছু নেই।

৩৪। দু-শ্রেনির লোক আমাকে নিয়ে ধ্বংসের মুখোমুখি হবে। এক শ্রেণি হলো, যারা আমাকে অতিরঞ্জনের সাথে ভালোবাসে এবং অপর শ্রেণি হলো, যারা আমাকে চরমভাবে ঘৃণা করে।

৩৫। যে নিজেকে বিনম্র করে সে আর্শীবাদপুষ্ট। তার জীবিকা পবিত্র, হৃদয় পবিত্র ও অভ্যাসাবলী ধার্মিকতাপূর্ণ। সে তার সঞ্চয়কে আল্লাহর নামে খরচ করে। সে খারাপ কথা বলা থেকে তার জিহ্বাকে বিরত রাখে। সে মানুষকে পাপ থেকে নিরাপদে রাখে। সে রাসুলের সুন্নাহতে সন্তুষ্ট এবং দ্বীনের কোনো বেদাতের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

৩৬। আমি ইসলামকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করছি যা পূর্বে আর কেউ করে নি; ইসলাম হলো সমর্পণ, সমর্পণ হলো প্রত্যয়-উৎপাদন,প্রত্যয় হলো সত্যতা সমর্থন, সত্যতা সমর্থন হলো স্বীকৃতি প্রদান, স্বীকৃতি প্রদান হলো দায়িত্বপালন এবং দায়িত্বপালন হলো আমল।

৩৭। কৃপণদের দেখে আমার আশ্চর্য লাগে যারা দুর্দশার দিকে বেগে ধাবিত হচ্ছে; অথচ তারা দুর্দশা থেকে দৌড়ে পালাতে চায়। জীবনের আরাম-আয়েশ হারিয়ে ফেলছে; অথচ তারা ব্যাকুলভাবে তা কামনা করে। অহংকারী লোকদের দেখে আমার আশ্চর্য লাগে, যে কদিন আগেও বীর্যের ফোঁটা ছিল এবং আগামীকাল লাশে পরিণত হবে। যে লোক আল্লাহ্তে সন্দেহ করে তাকে দেখে আমার আশ্চর্য লাগে, কারণ সে তো আল্লাহ্ও সৃষ্টি দেখেছে। মানুষকে মরতে দেখেও যেসব লোক মৃত্যুকে ভুলে থাকে তাদের কথা ভেবে আশ্চর্য লাগে যারা দ্বিতীয় জীবনকে অস্বীকার করে, যদিও তারা প্রথম জীবন দেখেছে। তাদের কথা ভেবেও আশ্চর্য লাগে যারা চিরস্থায়ী আবাসকে ভুলে ক্ষণস্থায়ী আবাস নিয়ে ব্যস্ত।

৩৮। কর্মবিমুখ লোক দুঃখে নিপতিত হয়। যে আল্লাহর নামে তার সম্পদ থেকে কিছুই ব্যয় করে না তার বিষয়ে আল্লাহর করণীয় কিছু নেই।

৩৯। এ পৃথিবী থাকার জন্য নয়-যাত্রাপথের বিশ্রামস্থল। এখানে দুধরনের মানুষ আছে। এক হলো, যারা কামনা-বাসনার দাস হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে; আর হলো যারা কামনা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করে মুক্তিপ্রাপ্ত হয়েছে।

৪০। যে মধ্যপথাবলম্বী সে কখনো দুর্দশাগ্রস্ত হয় না।

৪১।  এমন অনেক লোক সিয়াম পালন করে যাদের সিয়াম উপোষ থাকা ও তৃষ্ণার্ত হওয়ার বৈ কিছু নয় এবং এমন অনেক সালাতি আছে যাদের সালাত জাগরণ ও কষ্ট করা বৈ কিছু নয়। তাদের ইবাদাত অপেক্ষা তত্বজ্ঞানীদের খাওয়া, পান করা ও ঘুম অনেক বেশি ভালো।

৪২। জ্ঞান পার্থিব সম্পদ থেকে অনেক ভালো। জ্ঞান তোমাকে রক্ষা করবে; অথচ সম্পদ তোমার রক্ষা করতে হবে। ব্যয় করলে সম্পদ কমে যায়; অথচ দান করলে জ্ঞান বহুগুণ বেড়ে যায় এবং সম্পদের পরিণাম মৃত্যু যেহেতু সম্পদ বিনষ্ট হয়। জ্ঞান হলো বিশ্বাস যা আমল করা হয়। এর দ্বারা মানুষ জীবদ্দশায় আনুগত্য অর্জন করে এবং মৃত্যুর পর সুখ্যাতি বেড়ে যায়। জ্ঞান হলো শাসক আর সম্পদ হলো শাসিত। যারা সম্পদ স্তূপীকৃত করে তারা মৃত, যদিও তারা সর্বসমক্ষে জীবিত। আবার যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, যতদিন পৃথিবীতে থাকবে ততদিন তারা থাকবে। তাদের দেহ পাওয়া যাবে না, কিন্তু তাদের আকৃতি হৃদয়ে স্থাপিত থাকবে। আমার বক্ষের দিকে তাকাও; এখানে জ্ঞান স্তূপীকৃত হয়ে আছে। আমি আশা করি আমার এ জ্ঞান বহনকারী কাউকে পেয়ে যাবো।

৪৩। যে নিজের মূল্য জানে না সে রসাতলে যায়।

৪৪। কখনো সে লোকের মতো হয়ো না, যে আমল ছাড়া পরকালের পরম সুখের আশা করে, আশা-আকাঙ্খাকে দীর্ঘায়িত করে, তওবা করতে বিলম্ব করে  এবং দরবেশের মতো কথা বলে কিন্তু দুনিয়ালোভীর মতো কাজ করে। সে অল্পতে তুষ্ট ও তৃপ্ত হয় না, তাকে যা দেওয়া  হয়েছে সেজন্য শুকরিয়া আদায় করে না। সে অন্যকে বঞ্চিত করে দুনিয়ার সম্পদ বৃদ্ধি করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। সে যা করে না অন্যদের তা করার জন্য  আদেশ করে। সে ধার্মিকগণকে ভালোবাসে কিন্তু নিজে তাদের মতো হয় না। সে পাপীদেরকে ঘৃণা করে অথচ নিজেই তাদের মধ্যে একজন। পাপাধিক্য হেতু সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে; কিন্তু যে জন্য সে মৃত্যুভয়ে ভীত সে বিষয়ে অমনোযোগী। সে পীড়িত হলে লজ্জাবোধ করে, সুস্থ থাকলে নিরাপদ অনুভব করে এবং আনন্দ-উৎসব সবকিছু ভুলে থাকে। যখন সে পীড়া থেকে আরোগ্যলাভ করে তখন নিজের সম্পর্কে দাম্ভিক হয়ে পড়ে আবার যখন দুর্দশাগ্রস্থ হয় তখন নিরাশ হয়ে পড়ে। বিপদ আপতিত হলে সে হতভম্বের মতো প্রার্থনা করে, আবার বিপদ কেটে গেলে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তার হৃদয় কাল্পনিক জিনিষ দ্বারা পরাভূত হয়। কোনো কিছুতেই তার হৃদয়ে দৃঢ় প্রত্যয় থাকে না। অন্যদের ছোটখাটো পাপের জন্য সে দুশ্চিন্তা করে কিন্তু নিজের বেলায় কৃতকর্মের চেয়ে অধিক পুরস্কার আশা করে। যদি সে  সম্পদশালী হয়ে পড়ে তবে সে আত্ম-কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে এবং পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে। যদি সে দরিদ্র হয়ে পড়ে তবে সে দুর্বল ও হতাশ হয়ে পড়ে। কল্যাণকর কাজে সে স্বল্প সময় ব্যয় করে অথচ যাচনা করতে সে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে। কামনা-বাসনা যখন তাকে ঘিরে ধরে তখন সে তড়িঘড়ি করে পাপে লিপ্ত হয় অথচ তওবা করতে বিলম্ব ঘটায়। তার ওপর দুর্দশা নিপতিত হলে সে ইসলামের উম্মার সকল নিয়ম-কানুন অমান্য করে। সে উপদেশ নেওয়ার মতো ঘটনাবলী বর্ণনা করে কিন্তু নিজে উপদেশ গ্রহণ করে না। সে অন্যদের উপদেশ দিয়ে বেড়ায় কিন্তু নিজে তা মান্য করে না। সে বাগাড়ম্বরে পটু কিন্তু আমলে খাটো। যা ধ্বংস হয়ে যাবে এমন জিনিসের জন্য সে আকাঙ্খী, কিন্তু যা চিরস্থায়ী তাতে উদাসীন। সে লাভকে লোকসান আর লোকসানকে লাভ মনে করে। সে মৃত্যুকে ভয় করে কিন্তু মৃত্যুর বিরুদ্ধে তার করণীয় কিছুই নেই। সে অন্যের পাপকে অনেক বড় করে দেখে অথচ নিজের পাপকে অতিক্ষুদ্র করে দেখে। সে একটু খানিক আল্লাহর বাধ্যতা দেখালে মনে করে অনেক করেছে কিন্তু অন্য কেউ অনেক আনুগত্য প্রকাশ করলেও সে তা অতিক্ষুদ্র মনে করে। এভাবে সে অন্যকে ভর্ৎসনা করে নিজের প্রতি তোষামুদে হয়। সে ধনশালীদের সঙ্গ পেতে ভালোবাসে। সে দরিদ্রদের সাথে আল্লাহর জেকের করতেও পছন্দ করে না। সে নিজের স্বার্থে অন্যের বিরুদ্ধে রায় দেয় কিন্তু নিজকে গোমরাহিতে ডুবিয়ে রাখে। অন্যরা তাকে মান্য করে কিন্তু সে আল্লাহকে অমান্য করে। সে ব্যগ্র থাকে যাতে অন্যরা তার প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করে কিন্তু অন্যদের প্রতি তার দায়িত্ব সে পালন করে না। সে লোকভয়ে আমল করে কিন্তু তার কাজ-কর্মে সে প্রভুকে ভয় করে না।

৪৫। ধৈর্যশীলগণ কখনো অকৃতকার্য হয় না; হতে পারে, হতে পারে, তাতে দীর্ঘ সময় লাগবে।

৪৬। নিশ্চয়ই তোমরা দেখতে পাবে যদি তোমরা দেখার জন্য যত্নবান হও। নিশ্চয়ই তোমরা সৎপথের সন্ধান পাবে যদি তোমাদের কানকে হেদায়েত গ্রহণ কর। নিশ্চয়ই তোমরা শুনতে পাবে যদি তোমাদের কানকে শোনার জন্য আগ্রহান্বিত কর।

৪৭। তোমরা সদাচারণ দ্বারা তোমার সাথীদের সতর্ক কর এবং তাদের প্রতি আনুকূল্য দেখিয়ে তাদের মন্দ দূরীভূত কর।

৪৮। পাপ করে তওবা করার চেয়ে পাপ থেকে বিরত থাকা সহজতর।

৪৯। যখন কোনো কিছুতে ভয় পাবে সোজা তার গভীরে প্রবেশ করবে; কারণ তুমি যতটুকু ভয় পাও তার অনেক বেশি হলো তা থেকে দূরে থাকার প্রবণতা।

৫০। লোভ হলো স্থায়ী দাসত্ব।

৫১। জ্ঞানের বিষয়ে নীরব থাকার কোনো সুফল নেই; যেমন নির্বুদ্ধিতার বিষয়ে কথা বলে কোনো কল্যাণ হয় না।

৫২। ন্যায়ের ব্যাপারে আমি কখনো সন্দেহের বশীভূত হইনি; কারণ আমাকে তা দেখিয়ে দেওয়া হতো।

৫৩। অত্যাচারে যে নেতৃত্ব দেয়, পরে সে অনুশোচনায় নিজের হাত কামড়ায়।

৫৪। হে আদম সন্তান, মৌলিক চাহিদার বেশি যা কিছু তোমরা অর্জন কর তাতে তোমরা শুধুমাত্র অন্যের জন্য সতর্ক প্রহরী।

৫৫। শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লে হৃদয় ক্লান্ত হয়ে যায়। সুতরাং হৃদয়ের জন্য মধুর বক্তব্যের সন্ধান কর এবং তা উপভোগ করে হৃদয়কে তাজা করে তোলো।

৫৬। প্রত্যেক পাত্রেরই ধারণ ক্ষমতা কমে আসে, যতই তাতে কোনো কিছু রাখা হয়। কিন্তু জ্ঞান হলো এর বিপরীত যার ধারণ ক্ষমতা ক্রমেই বেড়ে যায়।

৫৭। যে ধৈর্য ধারণ করা অভ্যাস করে তার প্রথম পুরস্কার হলো মানুষ তার সাহায্যকারী হয়।

৫৮। যে নিজের কর্মকান্ডের হিসাব-নিকাশ করে সে উপকৃত হয়; আর যে বেমালুম থাকে তার ভোগান্তি হয়। যে ভয় করে সে নিরাপদ থাকে। যে উপদেশ গ্রহণ করে (চারপাশের বস্তু থেকে) সে আলোর সন্ধান পায়।  যে আলোর সন্ধান পায় তার বোধগম্যতা হয়; যার বোধগম্যতা হয় সে জ্ঞান অর্জন করতে পারে।

৫৯। উদারতা সম্মানের রক্ষক, ধৈর্য বোকার লাগাম; ক্ষমা কৃতকার্যতার ধার্যকৃত কর। অসম্মান বিশ্বসঘাতকের শাস্তি; এবং আলাপ-পরামর্শ হেদায়েতের প্রধান পথ। যে নিজের মতামতে তৃপ্ত হয় সে বিপদে পড়ে। সহিষ্ণুতা বিপদে সাহস যোগায়। সবচেয়ে বড় তৃপ্তি হলো আকাক্সক্ষা পরিত্যাগ করা। আকাঙ্খাকে পরাভূত করে অনেক দাসতুল্য ব্যক্তিও উন্নতি লাভ করেছে। ক্ষমতা অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করে। ভালোবাসা মানে হলো সুদৃঢ় আত্মীয়তা। শোকাহতকে বিশ্বাস করো না।

৬০। বিনম্রতার পোশাক যে পড়েছে (অর্থাৎ বিনয়ী হয়েছে) তার কোনো ত্রুটি মানুষ দেখতে পায় না।

৬১। নীরবতার আধিক্য সশঙ্ক মনোভাবের সঞ্চার করে; ন্যায়-বিচার গাঢ় বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে; উদারতা মর্যাদা উন্নত করে; নম্রতা অনেক আশীর্বাদ আনে; দুঃখ-দুর্দশার মোকাবেলা করে নেতৃত্ব অর্জন করতে হয়; ন্যায়-সঙ্গত আচরণ করে বিরোধীদের পরাভূত করা যায় এবং মূর্খদের কর্মকান্ডে ধৈর্যধারণ করলে নিজের সমর্থকগণ বিরুদ্ধে যায়।

৬২। তৃপ্তি জমিদারি স্বরূপ এবং উত্তম নৈতিক চরিত্র আর্শীবাদ স্বরূপ।

৬৩। সে হলো জ্ঞানী ব্যক্তি যে সবকিছুকে যথাযোগ্য অবস্থানে রাখতে পারে।

৬৪। কিছু লোক আছে যারা পুরস্কারের আশায় ইবাদত করে। নিশ্চয়ই, এটা ব্যবসায়ীদের ইবাদত। আবার কিছু লোক ভয়ে আল্লাহর ইবাদত করে-এটা দাসদের ইবাদাত। এরপরও কিছু লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আল্লাহর ইবাদাত করে-এটা স্বাধীন মানুষের ইবাদত।

৬৫। অসৎ উপায়ে প্রাপ্ত একটি পাথরও যদি কোনো ঘরে থাকে তবে তা সে ঘরের ধ্বংস নিশ্চিতভাবে ডেকে আনবে।

৬৬। আল্লাহ বহু-ঈশ্বরবাদ থেকে পবিত্র করার জন্য ইমান প্রতিষ্ঠিত করেছেন, আত্মশ্লাঘা থেকে পবিত্র থাকার জন্য সালাত; জীবিকার উপায় হিসেবে যাকাত; মানুষের পরিক্ষা হিসেবে সিয়াম; দ্বীনের খুঁটি হিসেবে হজ; ইসলামের সম্মান হিসেবে জিহাদ; সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য আমর বিল মা’রুফ; ফেতনা-ফাসাদ নিয়ন্ত্রণের জন্য নাহি আনিল মুনকার; সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য জ্ঞাতিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ; রক্তপাত বন্ধ করার জন্য কিসাস; হারামের গুরুত্ব অনুধাবনের  জন্য শাস্তির ব্যবস্থা; বুদ্ধিমত্তা রক্ষা করার জন্য মদ্যপান নিষিদ্ধ; সততা জাগিয়ে দেওয়ার জন্য চৌর্যবৃত্তি বাতিল; মনোরম অবস্থা বজায় রাখার জন্য ব্যভিচার নিষিদ্ধ; বংশবৃদ্ধির জন্য সমকামিতা নিষিদ্ধ; কোনো বিষয় প্রমাণ করার জন্য সাক্ষী; সত্যের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য মিথ্যা প্রতিহত; বিপজ্জনক অবস্থা থেকে রক্ষা করার জন্য শান্তি রক্ষা; উম্মাহর শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ইমামত এবং ইমামতের প্রতি সম্মান হিসেবে ইমামদের মান্য করা সুস্থতা অর্জিত করেছেন।

৬৭। ঈর্ষা না থাকলে শারীরিক সুস্থতা অর্জিত হয়।

৬৮। যখনই তুমি বিপদ বা দুরবস্থায় পড়বে তখন দান-সদকার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে ব্যবসা কর।

৬৯। বন্ধুকে একটা সীমা অবধি ভালোবাসো, কারণ সে যেকোনো সময় শত্রু হয়ে যেতে পারে। আবার শত্রুকে একটা সীমা অবধি ঘৃণা করো, কারণ যেকোনো সময় সে তোমার বন্ধু হয়ে যেতে পারে।

৭০। দৃঢ় প্রত্যয় সহকারে জেনে রাখো, অদৃষ্টলিপিতে যা লেখা আছে তার অধিক জীবিকা আল্লাহ নির্ধারণ করেন না। যতই উপায় অবলম্বন করা হোক, যতই কঠোর প্রচেষ্টা করা হোক আর যতই কসরত করা হোক না কেন নির্ধারিত জীবিকার বেশি পাবে না। কোনো লোকের  দুর্বল অবস্থা বা উপায়-উপকরণের অভাব নির্ধারিত জীবিকার পথে অন্তরায় হতে পারে না। যারা এটা অনুধাবন করে এবং সে মতে আমল করে তারাই সব চাইতে আরাম-আয়েশে থাকে; আর যারা এতে সন্দেহ পোষণ করে এবং এর প্রতি অবহেলা করে তারা সকলের চেয়ে বেশি অসুবিধা ভোগ করে। আনুকূল্য প্রাপ্ত ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে আনুকূল্যের মাধ্যমে শান্তির দিকে তাড়িত করা হচ্ছে এবং শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে শাস্তির মাধ্যমে কল্যাণ করা হচ্ছে। সুতরাং হে শোতৃমন্ডলী, তোমাদের কৃতজ্ঞতা বর্ধিত কর, লোভ-লালসা কমিয়ে ফেল এবং তোমাদের জীবিকার সীমার মধ্যে তৃপ্ত থাকো।

৭১। লোভ মানুষকে জলাশয়ের কাছে টেনে নিয়ে যায় কিন্তু পানি পান করানো ছাড়াই আবার টেনে ফেরত নিয়ে আসে। লোভ দায়িত্ব গ্রহণ করে কিন্তু তা পরিপূর্ণ করে না। লোভাতুর ব্যক্তি তৃষ্ণা মেটার আগেই অনেক সময় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ে। কোনো কিছু পাবার আকুল আকাঙ্খা যত বেশি হবে, তা না পেলে দুঃখও তত বেশি হবে। লোভ-লালসা বোধগম্যতার চক্ষু অন্ধ করে দেয়। যা ভাগ্যে নির্ধারিত আছে তা না চাইলেও পৌঁছে যাবে।

৭২। মূর্খের সঙ্গে মেলামেশা করো না; কারণ সে তার আমলসমূহ তোমার সামনে সুন্দর করে তুলে ধরবে এবং আশা করবে তুমি যেন তার মতো হও।

৭৩। কোরানে রয়েছে অতীতের খবর, ভবিষ্যতের পূর্বাভাস এবং বর্তমানের জন্য আদেশ।

৭৪। আল্লাহ দুঃখীজনের জীবিকা ধনীদের সম্পদের মাঝে রেখেছেন। যার ফলে, যখন কোনো অভাবগ্রস্ত লোক উপোস থাকে তখন বুঝতে কোনো ধনী ব্যক্তি তার সম্পদে অভাবগ্রস্ত লোকটির হিস্যা অস্বীকার করেছে। মহিমমান্বিত আল্লাহ ধনী লোকদের এজন্য একদিন জিজ্ঞেস করবেন।

৭৫। জ্ঞান দু-রকমের-আত্মভূত জ্ঞান ও শ্রুত জ্ঞান। শ্রুত জ্ঞান আত্মভূত না হলে কোনো উপকারে আসে না।

৭৬। অন্যের কী আছে সেদিকে নজর না দেওয়াই বড় সম্পদ।

৭৭। সবচাইতে বড় পাপ হলো সেটি করে পাপী তা নগণ্য মনে করে।

৭৮। যে ব্যক্তি নিজের দোষ-ত্রুটির প্রতি লক্ষ্য রাখে সে অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ায় না। আল্লাহ প্রদত্ত জীবিকায় যে সন্তুষ্ট থাকে সে যা পায়নি সেজন্য দুঃখ করে না। যে বিদ্রোহের জন্য তরবারি বের করে সে তরবারিতেই মারা যায়। যে সহায়-সম্বল ছাড়া সংগ্রাম করে সে ধ্বংস হয়ে যায়। যে গভীরে প্রবেশ করে সে ডুবে থাকে। যে কুখ্যাত স্থানে যায় তার বদনাম হয়। যে বেশি কথা বলে  সে বেশি ভুল করে। যে বেশি ভুল করে সে নির্লজ্জ হয়ে পড়ে। যে নির্লজ্জ হয় সে আল্লাহকে কম ভয় করে। যে আল্লাহকে কম ভয় করে তার হৃদয় মরে যায়। যার হৃদয় মৃত সে আগুনে প্রবেশ করে। যে অন্যেল দোষ-ত্রুটি দেখেও নিজেই তা করে থাকে নিঃসন্দেহে সে মূর্খ। তৃপ্তি এটা পুঁজি যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস (অবচয়) হয় না। যে মৃত্যুকে স্মরণ করে সে এ পৃথিবীতে অল্পে তুষ্ট থাকে। যে ব্যক্তি জানে যে, তার কথা আমলের একটা অংশ সে বিশেষ লক্ষ্য ছাড়া কথা বলে না।

৭৯। মহিমান্বিত আল্লাহর কাছে কিছু চাইতে হলে তোমরা প্রথমে রাসুল (স) ও তাঁর আহলুল বাইতের প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ কর, তারপর যা যাচনা করার তা কর। কারণ পরম দয়ালু আল্লাহ দুটি অনুরোধের মধ্যে যেটি রাসুল (স) ও তাঁর আহলুল বাইতের দরূদ ও সালাম সংলাগকৃত সেটি রক্ষা করেন এবং অন্য সব যাচনা বাতিল করে দেন।

৮০। হে মানুষ, এ দুনিয়ার সম্পদ উচ্ছিষ্টের মতো যা মহামারির সৃষ্টি করে। সুতরাং এ চারণভূমি থেকে দূরে সরে থাকো। এতে শান্তিতে থাকা অপেক্ষা এটাকে ত্যাগ করা অনেক বেশি ভালো এবং এর সম্পদরাজি অপেক্ষা পারিতোষিক অংশ অনেক বেশি সুখকর। এখানে যারা সম্পদশালী পরকালে তারা হবে দুর্দশাগ্রস্ত। তাদের জন্যই রয়েছে পরকালের সুখ-শান্তি যারা দুনিয়া থেকে দূরে সরে থাকতে পেরেছে। এর চাকচিক্যে কোনো লোক আকৃষ্ট হলে তার দুচোখ ধাঁধা লাগে। যদি কেউ এর প্রতি আগ্রহান্বিত হয়ে পড়ে তবে তার হৃদয় দুঃখপূর্ণ হয় এবং ক্রমেই কালিমালিপ্ত হয়ে পড়ে। এর কিছু তাকে উদ্বিগ্ন করে আর কিছু তাকে বেদনা দেয়। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সে এ অবস্থায় থাকে। সে শূন্যে নিক্ষিপ্ত হয় এবং তার হৃদয়ের ঔজ্জ্বল্য বিনষ্ট হয়ে পড়ে। তার মৃত্যু ঘটানো ও তার সহচরগণ দ্বারা তাকে কবরে শায়িত করা আল্লাহর পক্ষে বড় সহজ কাজ।

৮১। এমন সময় আসবে যখন লেখা ছাড়া কোরানের আর কিছুই থাকবে না; নাম ছাড়া ইসলামের আর কিছুই থাকবে না। সে সময় মানুষ মসজিদগুলোকে বড় বড় ইমারতে পরিণত করায় ব্যস্ত থাকবে, কিন্তু তাতে কোনো হেদায়েত থাকবে না। যারা এর মধ্যে থাকবে এবং যারা এতে যাবে তারা পৃথিবীতে নিকৃষ্টতম হবে। তাদের থেকে ফেতনা ছড়িয়ে পড়বে এবং সকল বিভ্রান্তি তাদের দিকেই ফিরে যাবে। যদি কেউ তাদের থেকে ফিরে যায় তবে তাকে ধাক্কা দিয়ে পুনরায় সামিল করা হবে।

৮২। হে জনমন্ডলী, আল্লাহকে ভয় কর। মানুষকে তিনি অকারণে সৃষ্টি করেননি যে, সে নিজেকে যেনতেনভাবে কাটিয়ে দেবে। তিনি মানুষকে এমন অযত্নে রক্ষিত করেননি যে, সে কান্ডজ্ঞানহীন বাজে কাজ করে যাবে। এ দুনিয়া তার কাছে যতই মনোমুগ্ধকর মনে হোক না কেন তা কখনো পরকালের স্থানাপন্ন হতে পারে না। সাহসিকতার মাধ্যমে যে এ জগতে কৃতকার্য হয়েছে সে পরকালের কৃতকার্যতার তুলনায় সামান্যতমও অর্জন করতে পারেনি।

৮৩।   ইসলামের চেয়ে উচ্চ মর্যাদাশীল আর কিছু নেই; আল্লাহর ভয়ের চেয়ে সম্মানজনক আর কিছু নেই; আত্মসংযম অপেক্ষা বড় আশ্রয় আর কিছু নেই; তওবার চেয়ে বড় উকিল আর কিছু নেই; তৃপ্তির চেয়ে বড় মূল্যবান সম্পদ আর কিছু নেই; নূন্যতম জীবনোপকরণে তৃপ্ত হওয়ার চেয়ে বড় দুঃখনাশক আর কিছু নেই। কামনা-বাসনা হলো দুঃখের চাবিকাঠি এবং দুর্দশার বাহন। লোভ, অহংকার ও ঈর্ষা হলো পাপের আলো এবং ফেতনাবাজি হলো সব চাইতে বড় কু-অভ্যাস।

৮৪। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি উচ্চারণ করবে না ততক্ষণ পর্যন্ত কথা তোমার নিয়ন্ত্রণে। আর বলে ফেললেই তুমি কথার নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে। সুতরাং স্বর্ণ-রৌপ্যকে যেভাবে পাহারা দাও সেভাবে তোমরা জিহ্বাকেও পাহারা দিয়ো, কারণ একটা কথাই তোমার আর্শীবাদ কেড়ে নিয়ে তোমার জন্য শাস্তি আনয়ন করতে পারে।

৮৫। যা জানো না তা বলো না এবং যা জানো তার সবকিছু বলো না; কারণ আল্লাহ তোমার সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং শেষ বিচারের দিন এসব নিয়েই তোমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

৮৬। কোনো ব্যক্তি যা খোঁজে তার অংশ হলেও পায়।

৮৭। যাতে তৃপ্তি পাওয়া যায় তা ক্ষুদ্র হলেও যথেষ্ট।

৮৮। অপমানিত হওয়ার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়। অন্যের মাধ্যম ব্যতীত ক্ষুদ্র জিনিসও উত্তম। যে বসে পায় না, সে দাঁড়িয়েও পাবে না। এ পৃথিবীতে তোমাদের দুটি সময় হবে- একটি তোমার পক্ষে অপরটি তোমার বিরুদ্ধে। সময় তোমার অনুকূলে থাকলে আত্মম্ভরী হয়ো না, আবার তোমার প্রতিকূলে গেলে ধৈর্য ধারণ কর।

৮৯। দম্ভোক্তি পরিহার কর, আত্ম-প্রবঞ্চনা পরিত্যাগ কর এবং কবরকে স্মরণ কর।

৯০। যে  কেউ অসঙ্গত কিছুর জন্য লালায়িত হয় সে কৃতকার্য হওয়ার পথ খুঁজে পায় না।

৯১। বিজ্ঞদের মতো ধৈর্য ধারণ করতে হবে, না হয় অজ্ঞদের মতো চুপ করে থাকতে হবে।

৯২। মানুষের কল্যাণ কর। কল্যাণকর কাজের কোনো অংশকে ক্ষুদ্র মনে করো না; কারণ এর ক্ষুদ্রাংশও অনেক বড়। কল্যাণকর কাজের বেলায় কখনো এ কথা বলো না যে, ‘আমার অপেক্ষা অন্য ব্যক্তি এ কাজের জন্য অধিক উপযুক্ত।’ যদি এরকম বল, তবে মনে রেখ, আল্লাহর কসম, বাস্তবে তাই ঘটবে। সমাজে ভালো ও মন্দ উভয় ধরনের লোক আছে। তুমি যেটা ফেলে  রাখবে অন্যরা সেটা করে ফেলবে।

৯৩। ধৈর্য দুর্বলতা ঢাকার এক প্রকার পর্দা এবং জ্ঞান তীক্ষ্ণ তরবারি। সুতরাং তোমার স্বভাবের দুর্বলতা ধৈর্য দ্বারা ঢেকে রেখ এবং জ্ঞান দ্বারা কামনা-বাসনাকে হত্যা  কর।

৯৪। সম্পদ আর স্বাস্থ্য নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই। কারণ এখন যাকে স্বাস্থ্যবান দেখছো একটু পরেই সে রুগ্ন পড়তে পারে এবং এখন যাকে ধনবান দেখছো একটু পরেই সে দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে।

৯৫। জীবিকা দুপ্রকার; অনুসন্ধানকারী ও যা অনুসন্ধান করা হয়েছে। সুতরাং যে এ দুনিয়ার প্রতি লালায়িত হয় মৃত্যু তাকে সন্ধান করে নেয় দুনিয়া থেকে মুখ ফেরানোর পূর্বেই। আর যে ব্যক্তি পরকালের প্রতি লালায়িত থাকে জাগতিক আরাম-আয়েশ তাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সে দুনিয়া থেকে জীবিকা গ্রহণ না করে।

৯৬। যখনই মানুষ হাসি-তামাশায় লিপ্ত হয় তখনই সে তার প্রজ্ঞা থেকে কিছুটা সরে যায়।

৯৭। দু ধরনের লোভী ব্যক্তি কখনো তৃপ্ত হয় না। এদের একজন হলো জ্ঞান অন্বেষণকারী আর অপরজন হলো দুনিয়া অন্বেষণকারী।

৯৮। ইমান হলো-তুমি সত্যকে আঁকড়ে ধরবে যদি তাতে তোমার ক্ষতিও হয় এবং মিথ্যাকে বর্জন করবে যদি মিথ্যা দ্বারা তোমার লাভও হয়। তোমার কথা যেন কাজের চেয়ে বেশি না হয় এবং অন্যদের সম্পর্কে কথা বলতে আল্লাহকে ভয় কর।

৯৯। ক্ষমা আর ধৈর্য জমজ এবং দুটি উচ্চ স্তরের সাহসের ফল।

১০০। পরিতৃপ্তি এমন এক সম্পদ যা কখনো শেষ হয় না।

মাওলা আলী আ. এর শতবাণী ও প্রার্থনা। সংগৃহীত।

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন