লেখক – হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
বাহ্যিক রূপক কাঠামো অনুসরণকারীরাই মনগড়া বিভিন্ন অর্থ করে ধর্মের নামে শত মতভেদ সৃষ্টি করে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ, খুনাখুনি করে চলেছে। এরাই হলো ইয়াজুজ-মাজুজ, কামড়া কামড়ি করে চলছে। মাওলানা রুমী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি তাদেরকেই কুকুরের সাথে তুলনা করেছেন। মানব জাতির দুর্ভাগ্য; কোরানের অনুবাদ বা ব্যাখ্যা বলতে এসব রূপক কাঠামোকেই মুসলিম সমাজ গ্রহণ করে নিয়ে কুকুরের মতো একে অন্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ করছে, কোরান-হাদিসেরও দোহাই দিচ্ছে! তাতে সাধারন মানুষের ঈমান যাবার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যান্য ধর্মের মৌলবাদীরা এবং নাস্তিকরা যথেষ্ট সুযোগ পেয়ে মুসলমানদেরকে আক্রমণ করে চলেছে। এর জন্য কোরান-হাদিসের আক্ষরিক ব্যাখ্যা বা মাদ্রাসার ইলমুল কালামই হলো দায়ী। কোরানের কালাম মানে আত্মার জ্ঞান। আত্মার জ্ঞান হলো ধর্মজ্ঞান, যা চিরন্তন-শাশ্বত কালাম। কোরান কাগজে থাকে না এটা বুঝা দরকার। কাগজের কোরান আল্লাহর তরফের কোরান নয়। কারণ,
“কোরান হলো আল্লাহর নূর, কদিম, কোরান অসীম এবং তা অখন্ড-কালের সাথে সম্পৃক্ত রাছুলের আহলে বাইয়্যেতসহ ”
এটা কাগজে থাকে না, থাকার প্রশ্নই আসে না। কাগজে কোরান থাকলে ধ্বংসশীল একটি বই হয়ে যায়। কোরান জিন্দা, চিরন্তন শাশ্বত- এর ধ্বংস নেই, এর সাথে আল্লাহ আছেন। মুর্দা আরবী বিদ্বানেরা মুর্দা কাগজের কোরানকেই আসমানী কিতাব বা নাজিল কোরান বলে যাচ্ছে। আসলে আল্লাহর কালামকে আরবী ভাষায় লিখে রাখা হয়েছে, যাতে মানুষ ভুলে না যায়। “কোরানের ভাষা হলো রূপক-প্রতীক-মুতাশাবেহাত, আসল বা মুহকামাত হলো এই মানুষ মানে খোদার তরফ থেকে মানবসত্ত্বা বিশ্বস্ত আত্মাসহ নাজিলই আল্লাহর তরফের নাজিল কোরান।” এজন্যই বলা হয়েছে – নাজালা বিহী রুহুল আমীন। কাজেই মানুষই হলো আল্লাহর তরফের নাযেল কোরান তথা কোরানুন্ নাতেক বা বাঙময় কোরান। তিন জমাতভুক্ত জীবাত্মার বা হায়ানী আত্মার মানুষের মধ্যে ‘রুহুল আমীন’ থাকে না। আসলে যা আল্লাহর কালাম তা-ই হলো কোরান। ওহী কালামের কোনো শব্দ নেই, নেই মোরাজের কালামেরও। যার শব্দ নেই তার পার্থিব কোনো ভাষাও নেই। কোরানের কালাম যে রূপক বা প্রতীক- এ কথা দজ্জাল মোল্লা-মৌলবীরা বুঝে না। মোল্লা-মৌলবীগণ ইনছান কোরান বা নাতেক কোরানকে ঘৃণা করছে, আর কাগজ কোরানকে চুম্বন করছে, সম্মান করছে, মানে নিজেকেই অপমান করছে। তারা মানুষের ভেদ-রহস্য বুঝেনি। যদি বুঝতো তবে মানুষকে ঘৃণা করতো না। যেহেতু খোদা মানুষের সাথে আছেন, কাজেই মানুষকে ঘৃণা করলে খোদাকে ঘৃণা করা আর বাকি থাকে না।
এ সমস্ত নির্বোধদের বোধ জাগানোর জন্যই বাংলার বিখ্যাত অলি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন –
মানুষেরে ঘৃণা করি –
ও কারা- কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি!
ও মুখ হতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে
যারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে।
পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল, মূর্খেরা সব শোনো –
মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।
মানুষকে চেনার জন্যই কোরান গাইডস্বরূপ আছে। কাজেই যাদের মধ্যে চিরন্তন-শাশ্বত কোরানের ব্যাখ্যা নেই, তারা আক্ষরিক অর্থে কোরানের ব্যাখ্যা করে কোরানকে অপমান করে চলেছে, সীমাবদ্ধ করে কোরান বিকৃত করছে, মানুষকে পথভ্রষ্ট করে চলেছে। ধর্ম-প্রবর্তককে অপমান করছে। কোরানের চিরন্তন-শাশ্বত ব্যাখ্যা হলে বিশ্বের মানুষকে এক দৃষ্ট হতো এবং কোরানের শিক্ষা নিলে মানুষের মাঝে ইনছানি আত্মার জাগরণ ঘটতো তথা রুহু নাযেল হতো এবং লামউতে স্থিত হতো, দ্বন্দ্ব-বিভেদ দূর হয়ে ঐক্যতা সৃষ্টি হতো এবং এ ধরাধামেই স্বর্গ রচিত হতো। মুহকামাতুন অর্থে ধর্মবাণী এক তাতে কোনো দ্বিত্ব নেই। আর কোরানের মুহকামাত মানেই মানুষ। মানুষের ধর্ম হলো মানবাত্মার জাগরণ ঘটানো, যার নফস হলো মুৎমাইন্নাহ। এ নফসের অধিকারী মানুষই হলো মুসলমান আর মুসলমানগণই হলো বেহেশতী। যেহেতু ইনছানি আত্মা বা নফসে মুৎমাইন্নাহর কোনো জাত-ভেদ নেই, কাজেই ইনছানি আত্মার অধিকারী মানুষই হলো খাঁটি মুসলমান; বা খাঁটি হিন্দ;ু বা খ্রিষ্টান; বা বৌদ্ধ; তাদেরও কোনো জাত-ভেদ নেই। ইনছানি আত্মার জগত হলো সৃষ্টির পবিত্রতম স্থান, যেখানে কোনো গলিজ প্রবেশ করে না। এজন্যই কোরান হলো বিশ্বমানব জাতির জন্য।
মোল্লা-মৌলবীদের কোরান-হাদিসের আক্ষরিক ব্যাখ্যার সুযোগেই শত মত, মতভেদ সৃষ্টি হচ্ছে, দলাদলি বা ফেরকাবাজি বা ফতোয়াবাজির ডিগবাজি চলছে। আর নাস্তিকরাও এ সুযোগ নিয়ে কোরান-হাদিসের বিরুদ্ধে বিকৃত মত পেশ করে মানুষকে পথভ্রষ্ট করছে। ধার্মিকদের জন্য ধর্মান্ধ মোল্লা-মৌলবীরা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি নাস্তিকরাও বিপজ্জনক। আঘাত করে রোগী হত্যা করা আর বেশী যতœ করে রোগী মারা রোগীর ক্ষেত্রে একই কথা। তবে নাস্তিকদেরকে চেনা যায়, তাদের থেকে বেঁচে থাকার বা সরে থাকার পথ পাওয়া যায়। কারণ, এরা ধর্মের ছদ্মাবরণে বাস করে না। কিন্তু ধর্মের ছদ্মাবরণে বাস করা অন্ধ-বধির মোল্লাদের থেকে সাধারণ মানুষ রক্ষা পাবে কেমন করে ! এরাতো হলো নাস্তিকদের চেয়েও ভয়ংকর। যদি কোরান কি তা চেনা হতো, কোরানের চিরন্তন-শাশ্বত (সার্বজনীন) ব্যাখ্যা করা হতো তবে অবশ্যই তাদের ধান্ধাবাজির সমস্ত পথ রুদ্ধ হয়ে যেতো, মানুষও চির সত্যকে ধারণ করে মানব সুরতকে কায়েম করতে পারতো। নাস্তিকদের বিকৃত চিন্তার পথ রুদ্ধ হতো। কিন্তু তথাকথিত মুসলিম সমাজ বা আলেম-মোল্লারা তাও দেবে না। কারণ, তাতে তাদের ধর্মের নামে ব্যবসাটি বন্ধ হয়ে যায়। কোনো অলি-আল্লাহই কোরানের তাফসির করে যাননি, অজ্ঞ-মূর্খ ধর্মান্ধ আলেম-মোল্লারা তার বিরোধীতা করবে, মানবে না। কারণ, মুসলিম সমাজে ধর্মজ্ঞান নেই ইহাই হলো তার প্রমাণ, আছে রূপক-কাঠামো, প্রতীক, ইলমুল কালাম বা আক্ষরিক বিদ্যা।
মানব সুরতের মাঝেই আল্লাহর সুরত আছে। ‘মানব সুরত কায়েম হলেই বাকশক্তি রক্ষা হয় আর বাকশক্তি রক্ষা হলেই আল্লাহর কালাম কোরান পাওয়া যায়, সে কোরান শ্রবণযোগ্য।’ কাজেই বলা যায়, বাকশক্তি রক্ষা করাই হলো মানুষের সাধনা। ধর্মশাস্ত্রের কথা হলো মানুষকে ঐক্যতায় নিয়ে আসা। এজন্যই নামাজ, রোজা, সদকার চেয়ে উত্তম হলো মানুষের মধ্যে ঐক্যতা সৃষ্টি করা। আর ঐক্যতা সৃষ্টি হবে তখন যখন ইনছানি আত্মার জাগরণ ঘটবে। প্রত্যেক ধর্মের মাঝেই এ সমস্ত জঙ্গি মৌলবাদী নামক জঞ্জালগুলো অবস্থান করছে। তারা এ পথে আসতে রাজি নয়। আসলে যারা ধার্মিক তারাই হলো মানুষ, মানুষ মানেই হলো সিরাতে-সুরতে এক। এরা ধর্মের নামে সন্ত্রাস, প্রতারণা, ঘরবাড়ি পুড়ে ফেলা, পর ধর্মের নিন্দা, মানুষ হত্যা করা ইত্যাদির মধ্যে নেই। সূরা বাকারার ১৯১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “ওয়াক্তুলূহুম হাইসূ সাকেফ্তুমুহুম” অর্থাৎ এবং তোমরা তাদেরকে যেখানে পাও হত্যা করো। “ওয়া আখরেজুহুম মিন হাইসু আখরাজুকুম” অর্থাৎ এবং তাদেরকে বের করো, যেখান থেকে তোমাদেরকে বের করেছিলো। “ওয়াল ফেতনাতু আশাদ্দু মিনাল কাতলে” অর্থাৎ এবং ফেৎনা (ঝগড়া-বিবাদ) হত্যা করা হতে জঘন্যতম (অপরাধ)। ১৯৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “কাতেলূহুম হাত্তা লা তাকূনা ফেতনাতুন ওয়া ইয়াকুনাদ্ দ্বীনু লিল্লাহে” অর্থাৎ এবং তাদেরকে হত্যা করো, যে পর্যন্ত না তারা ফেৎনা হতে বিরত না হয় এবং আল্লাহর জন্য দ্বীন প্রতিষ্ঠিত না হয়। কোরানে উক্ত কালাম দ্বারা তথাকথিত ধার্মিকেরা বুঝেছে শুধু মুতাশাবেহাত তথা কাঠামোগত বা রূপক অর্থ, তাঁর মুহকামাত বা গূঢ়ার্থ বা দ্ব্যর্থহীন বা সমুজ্জলটি গ্রহণ করেনি। তাই তারা কাফের বলতে বুঝেছে অন্য জাতি বা ধর্মের মানুষকে এবং কতল বলতে বুঝেছে তাদেরকে জবাই করা বা হত্যা করা।
আর “দ্বীন” বলতে বুঝেছে শুধু বাহ্যিক বা আনুষ্ঠানিক নামাজ, রোজা, দাঁড়ী, টুপি, লম্বা জুব্বা, তাসবিহ জপ ইত্যাদি। অন্য ধর্মের বকধার্মিকরাও ধর্ম বলতে তাই বুঝেছে, যা নিজ নিজ ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা ব্যতীত নয়। তাই ধর্মের ছদ্মাাবরণে ধর্মের সাইনবোর্ড কাঁধে নিয়ে একে অন্যকে হিংস্র পশুর মতো আক্রমণ করছে, হত্যা করছে, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, খানকাহ ইত্যাদি দখল করছে আর ভেঙ্গে বা পুড়িয়ে মহাপুণ্যের কাজ করেছে বলে আত্মতৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। এরা আলমে নাছুতে সর্বদাই অবস্থান করছে। এ সমস্ত নির্লজ্জ জঘন্য কাজে মারা গেলে শহীদ শহীদ বলে চিৎকার করতে থাকে। তথাকথিত জ্ঞানপাপীরা বুঝেনি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম, ঈসা, মুসা, বুদ্ধ, শ্রী কৃষ্ণ আলায়হিমাস্ সালাম তারা ধর্ম বলতে কি বুঝিয়েছেন এবং কিসের বাণী তাঁরা প্রচার করেছেন। তারা ধর্মের মহাপুরুষদেরকে তাদেরই মতো মানুষ মনে করে তাদের অন্ধ মানসিকতার বন্ধ খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখতে চাচ্ছে আর সেই গন্ডীভূত মানসিকতার ব্যাখ্যা দ্বারা ধর্মকে বিকৃত করছে, সেই বিষপাষ্পে আক্রান্ত হচ্ছে মানব সমাজ।
কোরান শুধু মুসলমানের নয়, এটা বিশ্বমানব জাতির জন্য নাজিলকৃত আল্লাহর বাণী। তাওরাত, ইঞ্জিল, যাবুর, গীতা, বেদ এসব ধর্মশাস্ত্র কোনো নির্দিষ্ট জাতির হতে পারে না- এগুলো মানব জাতির। আসলে কাগজে লিখিত ধর্মশাস্ত্রের মধ্যে যারা ধর্মজ্ঞান খুঁজে বেড়ায় সমস্যা হলো তাদের নিয়ে।
এটা মনে রাখা দরকার ধর্মবাণীগুলো রূপক কাঠামো। তার সমুজ্জ্বল বা মুহকামাত যারা বুঝে না তারাই ধর্মশাস্ত্রকে বিকৃত করছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হিস ওয়াছাল্লাম হলেন বিশ্বনবী। তাহলে কোরানের বাণীর কি এমন কোনো ব্যাখ্যা বা তাফসির করা হয়েছে, যা বিশ্বের মানুষ প্রত্যেকেই স্বীকার করে নিবে ? মোটেই করা হয়নি। বরং এমন সব তাফসির করা হয়েছে, (রূপক কাঠামোর অর্থ করা হয়েছে) যার ফলে কোরান এবং মহানবী কেবল দেড়শত কোটি মুসলমানের জন্য সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে, তাও নিজেরা নিজেদের মধ্যে শত শত দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে মারামারি, খুনাখুনি করছে। প্রত্যেক ধর্মের বকধার্মিকগণও তা-ই করেছে। ধর্মকে তাদের ব্যক্তিস্বার্থের, অন্ধত্বের চারি দেয়ালে আবদ্ধ করে রেখে, যার যার ধর্ম বলে সাব্যস্ত করে ধর্মের নামে অন্যায় অত্যাচার, জোর-জুলুম, ফেরকাবাজি, ফতোয়াবাজি এবং শেষে রগ কেটে, গুলি করে, বোমা বা গ্রেনেড হামলা করে বা বিভিন্ন পদ্ধতিতে মানুষ হত্যা করে চলেছে। এর মূল কারণ হলো এরা হায়ানী আত্মার অধিকারী মানুষ মানে সিরাতে মানুষ নয়, পশু। এরা আলমে নাছুতের জীব, যেখানে মনুষ্যত্বের কোনো স্থান নেই ; আছে পশুত্বের বিচরণ। এরা মানব-ধর্ম ইসলাম কি তা বুঝেনি, বুঝেছে আক্ষরিক অর্থে বিধায় দ্বন্দ্ব-বিভেদ, মারামারি চলছেই। আর এটাও জানা দরকার, আখেরে বিচার হবে সিরাত অনুসারেই।
পৃথিবীতে যতো মানুষ মারা গেছে, ধর্মের দোহাই দিয়েই তার প্রায় অর্ধেক মারা গেছে; এখনো মারা যাচ্ছে। অথচ মানবধর্ম একটিই। ব্যক্তিস্বার্থের আঘাতে জর্জরিত হচ্ছে পৃথিবী এবং ব্যক্তিস্বার্থেই হয় পাপের জন্ম, যা ইনছানি আত্মার পরিপন্থী। ব্যাক্তিস্বার্থের বিষবাষ্পে পৃথিবী নামক গ্রহটি দ্রুত ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। খুব দ্রুতই তার প্রমাণ এ গ্রহের মানবজাতি। যদি মানুষের মধ্যে ধর্ম এবং ধর্মবোধ থাকতো তবে এ পরিণতি অবশ্যই হতো না। যারা ধর্ম ধর্ম বলে চিৎকার করছে তাদের এ প্রতারণার চিৎকার থামাতে হবে। কারণ, তাদের মধ্যে ধর্ম বলতে কিছু নেই। ইনছানি আত্মার অধিকারী হওয়ার সাধনা যারা করছে বা ইনছানি আত্মার অধিকারী হয়েছে সে মানুষই হলো খাঁটি মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান। বাকি সবাই ধর্মের নামে প্রতারণা করছে, অন্ধ-অনুমানবাদীরা ধার্মিক অবশ্যই নয়, এরা ধর্মের ছদ্মাবরণে আছে। মানবাত্মার ধর্ম হলো রক্ষা করা, দয়া-মায়া, প্রেম-মহব্বত এবং মানুষের মধ্যে ঐক্যতা, ভ্রাতৃত্ববন্ধন স্থাপন করা, ধ্বংস করা নয়। ধ্বংস করা হলো হায়ানী আত্মার কাজ আর রক্ষা করা মানবাত্মার কাজ।
যারা সুরতে মানুষ কিন্তু সিরাতে হায়ানী আত্মার অধিকারী তারাই ধর্মের নামে প্রতারণা, ফেরকাবাজি, সন্ত্রাস, মানুষ হত্যা ইত্যাদি করে বেড়াচ্ছে। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ইত্যাদি ধর্মের দোহাই দেয়া হলো তাদের সাইনবোর্ড, যেমন, বিষের বোতলে মধুর লেবেল লাগিয়ে দেয়া হলো। পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রিয়ভাবে অশান্তি সৃষ্টি করে চলেছে ধর্মের নামে। এরা মানবসভ্যতার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ- ইয়াজুজ-মাজুজ। কোরান বলছে ফেৎনা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও জঘন্য অপরাধ। মানবাত্মার মানবধর্ম ইসলাম কখনো ফেৎনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে না। প্রেম-মহব্বত, ঐক্যতার মাধ্যমে মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্বভাব সৃষ্টি করে এবং ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে, জ্ঞানের মাধ্যমে দ্বন্দ্ব-বিভেদ-বৈষম্য দূর করে মানুষকে নিত্য সত্যে প্রতিষ্ঠিত করে ঐক্যতায় আবদ্ধ করে রাখে। মানবাত্মার মানবধর্মই হলো নিজকে চেনা বা দ্বীন-এ-মুহাম্মদী বা দ্বীন-ই-মিল্লাত। এরা হলো হিজবুল্লাহ তথা আল্লাহর দল। আর হিজবুল্লাহগণই হলো জান্নাতবাসী বা স্বর্গবাসী বা হেভেনবাসী। এরাই হলো তিয়াত্তর কাতারের মধ্যে একমাত্র মুক্তিপ্রাপ্ত দল। মানবধর্ম (আরবীতে ইসলাম বলে) একটিই, তার দুই হয় না।
ইনছানি আত্মার ইনছানিয়াতে যারা অধিষ্ঠিত আছে তারাই খাঁটি মুসলমান, খাটি হিন্দু বা বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান। কারণ, ইনছানি আত্মা হলো চিরসত্য, চিরন্তন-শাশ্বত, নিত্য, এর কোনো জাত-ভেদ নেই, তার কোনো বিভক্তি নেই। মানবাত্মার মানুষই হলো আশরাফুল মাখলুকাত-এর কোনো বিভেদ নেই আছে অভেদ সুন্দর জ্যোতির্ময় সত্ত্বা। চিরসত্য যা, তা নহে হিন্দু, নহে মুসলমান, নহে খ্রিষ্টান, নহে বৌদ্ধ, আবার সবারই সবকিছু। এটা নিরপেক্ষতার জগতে স্থিত আছে। যিনি বা যারা সেই চিরসত্য ইনছানি আত্মার অধিকারী তারাই হলেন খাঁটি মুসলমান বা হিন্দু বা খ্রিষ্টান বা বৌদ্ধ ইত্যাদি। ধর্ম মানুষকে বহু হতে এক সত্যে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় বিধায় তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিভেদ নেই, ধর্মের নামে সন্ত্রাস নেই, মানুষ হত্যা নেই। লৌকিক ধর্ম বহু এবং বহু ভেদ-বিভেদ-মতভেদ রয়েছে এসব ধর্মে। কারণ, তা হলো হায়ানী আত্মার ধর্ম। এরা নিছক আনুষ্ঠানিকতাকেই ধর্ম বলে জানে এবং মানে, এর বাহিরে এরা আর কিছু মানতে রাজি নয় এবং অন্যকেও মানতে বাধার সৃষ্টি করে। আর ধর্মশাস্ত্রকে আক্ষরিক অর্থে বিশ্লেষণ করে তারা শত মত-মতান্তরে আকণ্ঠ ডুবে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হয় এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করার জন্য তাবলিগ করে বেড়ায়। মানুষকে ঘৃণা করতে, দ্বন্দ্ব-বিভেদ, অন্যায়-অত্যাচার করতে শিখায় যে ধর্ম তা সার্বজনীন মানবধর্ম ইসলাম হতে পারে না। এ ধরনের ধর্ম-ভাব নফসে আম্মারা বা ব্যক্তিস্বার্থে প্রচলন হয়- যা হতে লৌকিক ধর্মের সৃষ্টি হয়। এরাই ধর্মান্ধ জঙ্গি হয় এবং শত সহস্র মতভেদের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
অধিকাংশ মানুষই এ লৌকিক ধর্মকে মানবধর্ম ইসলাম বলে স্বীকার করে নিয়েছে, যেমন নিয়েছে ইয়াজিদ ও ইয়াজিদের আলেম-মোল্লারা। যার ফলে দ্বীন-এ-মুহাম্মদী কলঙ্কিত হচ্ছে। নিজ ধর্মকে ইয়াকিনের সাথে মেনে নিয়ে সকলকে প্রাণ হতে দু’বাহু বাড়িয়ে আলিঙ্গন করার শক্তি অর্জন করা মনুষ্যত্ব। হায়ানী আত্মার কাজ হলো ধ্বংস করা, বহুমূখী পথ ও মত সৃষ্টি করা বিধায় যাদের মধ্যে হায়ানী আত্মার গুণ-খাছিয়ত আছে তারাই ধর্মের নামে পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রিয়ভাবে, কুটনামী-গীবত, অন্যায়-অত্যাচার, জোর-জুলুম, সন্ত্রাস, মানুষ হত্যা করা, ফেরকাবাজি, ফতোয়াবাজি ইত্যাদি করে ফিরে। এটা রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামও জানতেন তার উম্মতের মধ্যে এমন হবে। তাই বলেছেন “বনী ইসরাঈলরা বিভক্ত হয়েছে বাহাত্তর দলে। আমার উম্মত বিভক্ত হবে তিয়াত্তর দলে। তার মধ্যে একদল নাজাত পাবে”। তার মানে অধিকাংশই হবে পথভ্রষ্ট- মুনাফেক। অথচ তিয়াত্তর ফেরকার সবাই কিন্তু নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি করেই যাচ্ছে, কোরান-হাদিসের দোহাই দিয়েই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের এবং সৎপথে আছে বলে স্লোগান দিচ্ছে।
‘আসলে যারা আমিত্ব নাস্তি করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইয়্যেতের মহব্বতে আছে তারাই নাজাতপ্রাপ্ত দল।’
এ কথাটি জ্ঞানী-গুণীদের নিকট জেনে নিলেই নাজাতপ্রাপ্ত দলের পরিচয় পাওয়া যাবে। ‘সেই চিরন্তন-শাশ্বত আহলে বাইয়্যেতের পরিচয় যারা জানে তথা নিজকে চিনে তারাই হলো জ্ঞানী, আর জ্ঞানীগণই হলো অলি-আউলিয়া।’ এরাই দায়েমী ছালাতে কায়েম আছে। কোরান আর সেই চিরন্তন-শাশ্বত আহলে বাইয়্যেত অবিচ্ছিন্নবস্থায় আছে। প্রতিটি মানুষের সাথেই রয়েছে সেই আহলে বাইয়্যেত- আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইন। কাজেই ধর্ম কথার মর্ম না বুঝে কথা বললে ধর্ম বিকৃতি হবেই, বহু মতভেদ সৃষ্টি হবেই। আর মতভেদে ফেরকাবাজি, ফতোয়াবাজি শুরু হবেই। তাতে পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় ভাবে দূর্যোগ সৃষ্টি হবে, দূর্যোগে আসবে দূর্ভোগ শেষে ধর্মের ছদ্মাবরণে শুরু হবে দূর্নীতি, প্রতারণা, মারামারি, খুনাখুনি ইত্যাদি।
আব, আতশ, খাক, বাদ, নূরে সাফা এ পঞ্চ মহাভূতে মানুষ গড়া। এ সৃষ্টিতে কোনো জাত-ভেদ নেই। সব মানুষই এ পাঁচ বস্তুতে গড়া বিধায় সমস্ত মানুষই এক। খোদাও মানুষের সাথেই আছেন- এখানেই ঐক্যতার নিদর্শন। এমকান আর ওয়াজেব এক সুরতেই আছে। আর পাঁচ বস্তু এবং তার গুণ-খাছিয়ত সমস্ত সৃষ্টিতে প্রকাশ পাচ্ছে বলে মানুষ মানে এখানেই সব স্থিত ও উপস্থিত। সব মানুষ এক, ¯্রষ্টা এক এবং তার ধর্মও এক। কোরানুল করিমেও সৃষ্টিগতভাবে সব মানুষকে এক এবং এক মানুষ হতেই সৃষ্টি বলে ঘোষণা করেছে। কেবল স্বভাবের কর্মানুসারে ভিন্নতা বা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। পাঁচ বস্তুতে গড়া মানুষের মাঝে পাঁচটি নফস স্থিত আছে, তার একটি হলো নফসে আম্মারা বা কুপ্রবৃত্তি। যদিও এক নফসই জাতে জাতে এসে নাম হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন। তার মধ্যে কোনো ধর্মাচারণ নেই তথা মানবধর্ম ইনছানিয়াতের প্রতিকূল আচরণ উক্ত নফসে বিদ্যমান বিধায় দীল হতে তার ক্রিয়া যখন হাত, পা, চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদিতে প্রভাব ফেলে তখনই ঐ মানুষ দ্বারা সমস্ত অন্যায়, অবৈধ কর্ম সংঘটিত হতে থাকে এবং এ অবস্থায় তার মধ্যে কোনো দ্বীন বা ধর্ম নেই।
হায়ানী আত্মা বা নফসে আম্মারাই কাফের, তার পরিচালক হলো শয়তান। সে-ই হলো জালেম, যে জুলুম করে। সমস্ত মানুষের মাঝে এক জালেমই সর্বদা জুলুম করে চলেছে। কাফের শয়তানকে বা জালেমকে মন মানসিকতা হতে তথা দীল হতে বের করে দেয়ার কথাই সুরা বাকারার ১৯১-৯৩ নম্বর আয়াতে বিধৃত হয়েছে এবং আমিত্বরূপী পশুত্বকে কতল বা সংযমে আনার কথা উক্ত আয়াতসমূহে বর্ণিত হয়েছে। ইহাই কোরানের মুহকামাত বা গূঢ়ার্থ, কাজেই ইহা সার্বজনীন এবং সমস্ত মানুষের মাঝেই কাফের শয়তান বিদ্যমান। সমস্ত অপকর্ম বা ধর্ম বিরোধী কর্ম তার দ্বারাই ঘটে। এ কাফেরের বিরুদ্ধে জেহাদ করাই হলো জেহাদুল আকবর বা বড় জেহাদ- একথা সমস্ত মানুষের জন্য আগত এবং সমস্ত মানুষের অস্তিত্বে স্থিত মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামই জানিয়ে দিচ্ছেন। কোরানের ঘোষণাও ইহাই।
লেখক – হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

