আপন ফাউন্ডেশন

Date:

ফেসবুক
ইউটিউব

আপন খবর – ৩য় সংখ্যা, মার্চ ২০২১

মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৩য় সংখ্যা, মার্চ ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

প্রবন্ধ – যাদের কোনো ধর্ম নেই

লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

বাহ্যিক রূপক কাঠামো অনুসরণকারীরাই মনগড়া বিভিন্ন অর্থ করে ধর্মের নামে শত মতভেদ সৃষ্টি করে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ, খুনাখুনি করে চলেছে। এরাই হলো ইয়াজুজ-মাজুজ, কামড়া কামড়ি করে চলছে। মাওলানা রুমী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি তাদেরকেই কুকুরের সাথে তুলনা করেছেন। মানব জাতির দুর্ভাগ্য; কোরানের অনুবাদ বা ব্যাখ্যা বলতে এসব রূপক কাঠামোকেই মুসলিম সমাজ গ্রহণ করে নিয়ে কুকুরের মতো একে অন্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ করছে, কোরান-হাদিসেরও দোহাই দিচ্ছে! তাতে সাধারন মানুষের ঈমান যাবার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যান্য ধর্মের মৌলবাদীরা এবং নাস্তিকরা যথেষ্ট সুযোগ পেয়ে মুসলমানদেরকে আক্রমণ করে চলেছে। এর জন্য কোরান-হাদিসের আক্ষরিক ব্যাখ্যা বা মাদ্রাসার ইলমুল কালামই হলো দায়ী। কোরানের কালাম মানে আত্মার জ্ঞান। আত্মার জ্ঞান হলো ধর্মজ্ঞান, যা চিরন্তন-শাশ্বত কালাম। কোরান কাগজে থাকে না এটা বুঝা দরকার। কাগজের কোরান আল্লাহর তরফের কোরান নয়। কারণ,

“কোরান হলো আল্লাহর নূর, কদিম, কোরান অসীম এবং তা অখন্ড-কালের সাথে সম্পৃক্ত রাছুলের আহলে বাইয়্যেতসহ ”

এটা কাগজে থাকে না, থাকার প্রশ্নই আসে না। কাগজে কোরান থাকলে ধ্বংসশীল একটি বই হয়ে যায়। কোরান জিন্দা, চিরন্তন শাশ্বত- এর ধ্বংস নেই, এর সাথে আল্লাহ আছেন। মুর্দা আরবী বিদ্বানেরা মুর্দা কাগজের কোরানকেই আসমানী কিতাব বা নাজিল কোরান বলে যাচ্ছে। আসলে আল্লাহর কালামকে আরবী ভাষায় লিখে রাখা হয়েছে, যাতে মানুষ ভুলে না যায়। “কোরানের ভাষা হলো রূপক-প্রতীক-মুতাশাবেহাত, আসল বা মুহকামাত হলো এই মানুষ মানে খোদার তরফ থেকে মানবসত্ত্বা বিশ্বস্ত আত্মাসহ নাজিলই আল্লাহর তরফের নাজিল কোরান।” এজন্যই বলা হয়েছে – নাজালা বিহী রুহুল আমীন। কাজেই মানুষই হলো আল্লাহর তরফের নাযেল কোরান তথা কোরানুন্ নাতেক বা বাঙময় কোরান। তিন জমাতভুক্ত জীবাত্মার বা হায়ানী আত্মার মানুষের মধ্যে ‘রুহুল আমীন’ থাকে না। আসলে যা আল্লাহর কালাম তা-ই হলো কোরান। ওহী কালামের কোনো শব্দ নেই, নেই মোরাজের কালামেরও। যার শব্দ নেই তার পার্থিব কোনো ভাষাও নেই। কোরানের কালাম যে রূপক বা প্রতীক- এ কথা দজ্জাল মোল্লা-মৌলবীরা বুঝে না। মোল্লা-মৌলবীগণ ইনছান কোরান বা নাতেক কোরানকে ঘৃণা করছে, আর কাগজ কোরানকে চুম্বন করছে, সম্মান করছে, মানে নিজেকেই অপমান করছে। তারা মানুষের ভেদ-রহস্য বুঝেনি। যদি বুঝতো তবে মানুষকে ঘৃণা করতো না। যেহেতু খোদা মানুষের সাথে আছেন, কাজেই মানুষকে ঘৃণা করলে খোদাকে ঘৃণা করা আর বাকি থাকে না।

এ সমস্ত নির্বোধদের বোধ জাগানোর জন্যই বাংলার বিখ্যাত অলি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন –
মানুষেরে ঘৃণা করি –
ও কারা- কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি!
ও মুখ হতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে
যারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে।
পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল, মূর্খেরা সব শোনো –
মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।

মানুষকে চেনার জন্যই কোরান গাইডস্বরূপ আছে। কাজেই যাদের মধ্যে চিরন্তন-শাশ্বত কোরানের ব্যাখ্যা নেই, তারা আক্ষরিক অর্থে কোরানের ব্যাখ্যা করে কোরানকে অপমান করে চলেছে, সীমাবদ্ধ করে কোরান বিকৃত করছে, মানুষকে পথভ্রষ্ট করে চলেছে। ধর্ম-প্রবর্তককে অপমান করছে। কোরানের চিরন্তন-শাশ্বত ব্যাখ্যা হলে বিশ্বের মানুষকে এক দৃষ্ট হতো এবং কোরানের শিক্ষা নিলে মানুষের মাঝে ইনছানি আত্মার জাগরণ ঘটতো তথা রুহু নাযেল হতো এবং লামউতে স্থিত হতো, দ্বন্দ্ব-বিভেদ দূর হয়ে ঐক্যতা সৃষ্টি হতো এবং এ ধরাধামেই স্বর্গ রচিত হতো। মুহকামাতুন অর্থে ধর্মবাণী এক তাতে কোনো দ্বিত্ব নেই। আর কোরানের মুহকামাত মানেই মানুষ। মানুষের ধর্ম হলো মানবাত্মার জাগরণ ঘটানো, যার নফস হলো মুৎমাইন্নাহ। এ নফসের অধিকারী মানুষই হলো মুসলমান আর মুসলমানগণই হলো বেহেশতী। যেহেতু ইনছানি আত্মা বা নফসে মুৎমাইন্নাহর কোনো জাত-ভেদ নেই, কাজেই ইনছানি আত্মার অধিকারী মানুষই হলো খাঁটি মুসলমান; বা খাঁটি হিন্দ;ু বা খ্রিষ্টান; বা বৌদ্ধ; তাদেরও কোনো জাত-ভেদ নেই। ইনছানি আত্মার জগত হলো সৃষ্টির পবিত্রতম স্থান, যেখানে কোনো গলিজ প্রবেশ করে না। এজন্যই কোরান হলো বিশ্বমানব জাতির জন্য।

মোল্লা-মৌলবীদের কোরান-হাদিসের আক্ষরিক ব্যাখ্যার সুযোগেই শত মত, মতভেদ সৃষ্টি হচ্ছে, দলাদলি বা ফেরকাবাজি বা ফতোয়াবাজির ডিগবাজি চলছে। আর নাস্তিকরাও এ সুযোগ নিয়ে কোরান-হাদিসের বিরুদ্ধে বিকৃত মত পেশ করে মানুষকে পথভ্রষ্ট করছে। ধার্মিকদের জন্য ধর্মান্ধ মোল্লা-মৌলবীরা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি নাস্তিকরাও বিপজ্জনক। আঘাত করে রোগী হত্যা করা আর বেশী যতœ করে রোগী মারা রোগীর ক্ষেত্রে একই কথা। তবে নাস্তিকদেরকে চেনা যায়, তাদের থেকে বেঁচে থাকার বা সরে থাকার পথ পাওয়া যায়। কারণ, এরা ধর্মের ছদ্মাবরণে বাস করে না। কিন্তু ধর্মের ছদ্মাবরণে বাস করা অন্ধ-বধির মোল্লাদের থেকে সাধারণ মানুষ রক্ষা পাবে কেমন করে ! এরাতো হলো নাস্তিকদের চেয়েও ভয়ংকর। যদি কোরান কি তা চেনা হতো, কোরানের চিরন্তন-শাশ্বত (সার্বজনীন) ব্যাখ্যা করা হতো তবে অবশ্যই তাদের ধান্ধাবাজির সমস্ত পথ রুদ্ধ হয়ে যেতো, মানুষও চির সত্যকে ধারণ করে মানব সুরতকে কায়েম করতে পারতো। নাস্তিকদের বিকৃত চিন্তার পথ রুদ্ধ হতো। কিন্তু তথাকথিত মুসলিম সমাজ বা আলেম-মোল্লারা তাও দেবে না। কারণ, তাতে তাদের ধর্মের নামে ব্যবসাটি বন্ধ হয়ে যায়। কোনো অলি-আল্লাহই কোরানের তাফসির করে যাননি, অজ্ঞ-মূর্খ ধর্মান্ধ আলেম-মোল্লারা তার বিরোধীতা করবে, মানবে না। কারণ, মুসলিম সমাজে ধর্মজ্ঞান নেই ইহাই হলো তার প্রমাণ, আছে রূপক-কাঠামো, প্রতীক, ইলমুল কালাম বা আক্ষরিক বিদ্যা।

মানব সুরতের মাঝেই আল্লাহর সুরত আছে। ‘মানব সুরত কায়েম হলেই বাকশক্তি রক্ষা হয় আর বাকশক্তি রক্ষা হলেই আল্লাহর কালাম কোরান পাওয়া যায়, সে কোরান শ্রবণযোগ্য।’ কাজেই বলা যায়, বাকশক্তি রক্ষা করাই হলো মানুষের সাধনা। ধর্মশাস্ত্রের কথা হলো মানুষকে ঐক্যতায় নিয়ে আসা। এজন্যই নামাজ, রোজা, সদকার চেয়ে উত্তম হলো মানুষের মধ্যে ঐক্যতা সৃষ্টি করা। আর ঐক্যতা সৃষ্টি হবে তখন যখন ইনছানি আত্মার জাগরণ ঘটবে। প্রত্যেক ধর্মের মাঝেই এ সমস্ত জঙ্গি মৌলবাদী নামক জঞ্জালগুলো অবস্থান করছে। তারা এ পথে আসতে রাজি নয়। আসলে যারা ধার্মিক তারাই হলো মানুষ, মানুষ মানেই হলো সিরাতে-সুরতে এক। এরা ধর্মের নামে সন্ত্রাস, প্রতারণা, ঘরবাড়ি পুড়ে ফেলা, পর ধর্মের নিন্দা, মানুষ হত্যা করা ইত্যাদির মধ্যে নেই। সূরা বাকারার ১৯১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “ওয়াক্তুলূহুম হাইসূ সাকেফ্তুমুহুম” অর্থাৎ এবং তোমরা তাদেরকে যেখানে পাও হত্যা করো। “ওয়া আখরেজুহুম মিন হাইসু আখরাজুকুম” অর্থাৎ এবং তাদেরকে বের করো, যেখান থেকে তোমাদেরকে বের করেছিলো। “ওয়াল ফেতনাতু আশাদ্দু মিনাল কাতলে” অর্থাৎ এবং ফেৎনা (ঝগড়া-বিবাদ) হত্যা করা হতে জঘন্যতম (অপরাধ)। ১৯৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “কাতেলূহুম হাত্তা লা তাকূনা ফেতনাতুন ওয়া ইয়াকুনাদ্ দ্বীনু লিল্লাহে” অর্থাৎ এবং তাদেরকে হত্যা করো, যে পর্যন্ত না তারা ফেৎনা হতে বিরত না হয় এবং আল্লাহর জন্য দ্বীন প্রতিষ্ঠিত না হয়। কোরানে উক্ত কালাম দ্বারা তথাকথিত ধার্মিকেরা বুঝেছে শুধু মুতাশাবেহাত তথা কাঠামোগত বা রূপক অর্থ, তাঁর মুহকামাত বা গূঢ়ার্থ বা দ্ব্যর্থহীন বা সমুজ্জলটি গ্রহণ করেনি। তাই তারা কাফের বলতে বুঝেছে অন্য জাতি বা ধর্মের মানুষকে এবং কতল বলতে বুঝেছে তাদেরকে জবাই করা বা হত্যা করা।

আর “দ্বীন” বলতে বুঝেছে শুধু বাহ্যিক বা আনুষ্ঠানিক নামাজ, রোজা, দাঁড়ী, টুপি, লম্বা জুব্বা, তাসবিহ জপ ইত্যাদি। অন্য ধর্মের বকধার্মিকরাও ধর্ম বলতে তাই বুঝেছে, যা নিজ নিজ ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা ব্যতীত নয়। তাই ধর্মের ছদ্মাাবরণে ধর্মের সাইনবোর্ড কাঁধে নিয়ে একে অন্যকে হিংস্র পশুর মতো আক্রমণ করছে, হত্যা করছে, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, খানকাহ ইত্যাদি দখল করছে আর ভেঙ্গে বা পুড়িয়ে মহাপুণ্যের কাজ করেছে বলে আত্মতৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। এরা আলমে নাছুতে সর্বদাই অবস্থান করছে। এ সমস্ত নির্লজ্জ জঘন্য কাজে মারা গেলে শহীদ শহীদ বলে চিৎকার করতে থাকে। তথাকথিত জ্ঞানপাপীরা বুঝেনি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম, ঈসা, মুসা, বুদ্ধ, শ্রী কৃষ্ণ আলায়হিমাস্ সালাম তারা ধর্ম বলতে কি বুঝিয়েছেন এবং কিসের বাণী তাঁরা প্রচার করেছেন। তারা ধর্মের মহাপুরুষদেরকে তাদেরই মতো মানুষ মনে করে তাদের অন্ধ মানসিকতার বন্ধ খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখতে চাচ্ছে আর সেই গন্ডীভূত মানসিকতার ব্যাখ্যা দ্বারা ধর্মকে বিকৃত করছে, সেই বিষপাষ্পে আক্রান্ত হচ্ছে মানব সমাজ।

কোরান শুধু মুসলমানের নয়, এটা বিশ্বমানব জাতির জন্য নাজিলকৃত আল্লাহর বাণী। তাওরাত, ইঞ্জিল, যাবুর, গীতা, বেদ এসব ধর্মশাস্ত্র কোনো নির্দিষ্ট জাতির হতে পারে না- এগুলো মানব জাতির। আসলে কাগজে লিখিত ধর্মশাস্ত্রের মধ্যে যারা ধর্মজ্ঞান খুঁজে বেড়ায় সমস্যা হলো তাদের নিয়ে।

এটা মনে রাখা দরকার ধর্মবাণীগুলো রূপক কাঠামো। তার সমুজ্জ্বল বা মুহকামাত যারা বুঝে না তারাই ধর্মশাস্ত্রকে বিকৃত করছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হিস ওয়াছাল্লাম হলেন বিশ্বনবী। তাহলে কোরানের বাণীর কি এমন কোনো ব্যাখ্যা বা তাফসির করা হয়েছে, যা বিশ্বের মানুষ প্রত্যেকেই স্বীকার করে নিবে ? মোটেই করা হয়নি। বরং এমন সব তাফসির করা হয়েছে, (রূপক কাঠামোর অর্থ করা হয়েছে) যার ফলে কোরান এবং মহানবী কেবল দেড়শত কোটি মুসলমানের জন্য সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে, তাও নিজেরা নিজেদের মধ্যে শত শত দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে মারামারি, খুনাখুনি করছে। প্রত্যেক ধর্মের বকধার্মিকগণও তা-ই করেছে। ধর্মকে তাদের ব্যক্তিস্বার্থের, অন্ধত্বের চারি দেয়ালে আবদ্ধ করে রেখে, যার যার ধর্ম বলে সাব্যস্ত করে ধর্মের নামে অন্যায় অত্যাচার, জোর-জুলুম, ফেরকাবাজি, ফতোয়াবাজি এবং শেষে রগ কেটে, গুলি করে, বোমা বা গ্রেনেড হামলা করে বা বিভিন্ন পদ্ধতিতে মানুষ হত্যা করে চলেছে। এর মূল কারণ হলো এরা হায়ানী আত্মার অধিকারী মানুষ মানে সিরাতে মানুষ নয়, পশু। এরা আলমে নাছুতের জীব, যেখানে মনুষ্যত্বের কোনো স্থান নেই ; আছে পশুত্বের বিচরণ। এরা মানব-ধর্ম ইসলাম কি তা বুঝেনি, বুঝেছে আক্ষরিক অর্থে বিধায় দ্বন্দ্ব-বিভেদ, মারামারি চলছেই। আর এটাও জানা দরকার, আখেরে বিচার হবে সিরাত অনুসারেই।

পৃথিবীতে যতো মানুষ মারা গেছে, ধর্মের দোহাই দিয়েই তার প্রায় অর্ধেক মারা গেছে; এখনো মারা যাচ্ছে। অথচ মানবধর্ম একটিই। ব্যক্তিস্বার্থের আঘাতে জর্জরিত হচ্ছে পৃথিবী এবং ব্যক্তিস্বার্থেই হয় পাপের জন্ম, যা ইনছানি আত্মার পরিপন্থী। ব্যাক্তিস্বার্থের বিষবাষ্পে পৃথিবী নামক গ্রহটি দ্রুত ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। খুব দ্রুতই তার প্রমাণ এ গ্রহের মানবজাতি। যদি মানুষের মধ্যে ধর্ম এবং ধর্মবোধ থাকতো তবে এ পরিণতি অবশ্যই হতো না। যারা ধর্ম ধর্ম বলে চিৎকার করছে তাদের এ প্রতারণার চিৎকার থামাতে হবে। কারণ, তাদের মধ্যে ধর্ম বলতে কিছু নেই। ইনছানি আত্মার অধিকারী হওয়ার সাধনা যারা করছে বা ইনছানি আত্মার অধিকারী হয়েছে সে মানুষই হলো খাঁটি মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান। বাকি সবাই ধর্মের নামে প্রতারণা করছে, অন্ধ-অনুমানবাদীরা ধার্মিক অবশ্যই নয়, এরা ধর্মের ছদ্মাবরণে আছে। মানবাত্মার ধর্ম হলো রক্ষা করা, দয়া-মায়া, প্রেম-মহব্বত এবং মানুষের মধ্যে ঐক্যতা, ভ্রাতৃত্ববন্ধন স্থাপন করা, ধ্বংস করা নয়। ধ্বংস করা হলো হায়ানী আত্মার কাজ আর রক্ষা করা মানবাত্মার কাজ।

যারা সুরতে মানুষ কিন্তু সিরাতে হায়ানী আত্মার অধিকারী তারাই ধর্মের নামে প্রতারণা, ফেরকাবাজি, সন্ত্রাস, মানুষ হত্যা ইত্যাদি করে বেড়াচ্ছে। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ইত্যাদি ধর্মের দোহাই দেয়া হলো তাদের সাইনবোর্ড, যেমন, বিষের বোতলে মধুর লেবেল লাগিয়ে দেয়া হলো। পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রিয়ভাবে অশান্তি সৃষ্টি করে চলেছে ধর্মের নামে। এরা মানবসভ্যতার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ- ইয়াজুজ-মাজুজ। কোরান বলছে ফেৎনা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও জঘন্য অপরাধ। মানবাত্মার মানবধর্ম ইসলাম কখনো ফেৎনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে না। প্রেম-মহব্বত, ঐক্যতার মাধ্যমে মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্বভাব সৃষ্টি করে এবং ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে, জ্ঞানের মাধ্যমে দ্বন্দ্ব-বিভেদ-বৈষম্য দূর করে মানুষকে নিত্য সত্যে প্রতিষ্ঠিত করে ঐক্যতায় আবদ্ধ করে রাখে। মানবাত্মার মানবধর্মই হলো নিজকে চেনা বা দ্বীন-এ-মুহাম্মদী বা দ্বীন-ই-মিল্লাত। এরা হলো হিজবুল্লাহ তথা আল্লাহর দল। আর হিজবুল্লাহগণই হলো জান্নাতবাসী বা স্বর্গবাসী বা হেভেনবাসী। এরাই হলো তিয়াত্তর কাতারের মধ্যে একমাত্র মুক্তিপ্রাপ্ত দল। মানবধর্ম (আরবীতে ইসলাম বলে) একটিই, তার দুই হয় না।

ইনছানি আত্মার ইনছানিয়াতে যারা অধিষ্ঠিত আছে তারাই খাঁটি মুসলমান, খাটি হিন্দু বা বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান। কারণ, ইনছানি আত্মা হলো চিরসত্য, চিরন্তন-শাশ্বত, নিত্য, এর কোনো জাত-ভেদ নেই, তার কোনো বিভক্তি নেই। মানবাত্মার মানুষই হলো আশরাফুল মাখলুকাত-এর কোনো বিভেদ নেই আছে অভেদ সুন্দর জ্যোতির্ময় সত্ত্বা। চিরসত্য যা, তা নহে হিন্দু, নহে মুসলমান, নহে খ্রিষ্টান, নহে বৌদ্ধ, আবার সবারই সবকিছু। এটা নিরপেক্ষতার জগতে স্থিত আছে। যিনি বা যারা সেই চিরসত্য ইনছানি আত্মার অধিকারী তারাই হলেন খাঁটি মুসলমান বা হিন্দু বা খ্রিষ্টান বা বৌদ্ধ ইত্যাদি। ধর্ম মানুষকে বহু হতে এক সত্যে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় বিধায় তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিভেদ নেই, ধর্মের নামে সন্ত্রাস নেই, মানুষ হত্যা নেই। লৌকিক ধর্ম বহু এবং বহু ভেদ-বিভেদ-মতভেদ রয়েছে এসব ধর্মে। কারণ, তা হলো হায়ানী আত্মার ধর্ম। এরা নিছক আনুষ্ঠানিকতাকেই ধর্ম বলে জানে এবং মানে, এর বাহিরে এরা আর কিছু মানতে রাজি নয় এবং অন্যকেও মানতে বাধার সৃষ্টি করে। আর ধর্মশাস্ত্রকে আক্ষরিক অর্থে বিশ্লেষণ করে তারা শত মত-মতান্তরে আকণ্ঠ ডুবে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হয় এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করার জন্য তাবলিগ করে বেড়ায়। মানুষকে ঘৃণা করতে, দ্বন্দ্ব-বিভেদ, অন্যায়-অত্যাচার করতে শিখায় যে ধর্ম তা সার্বজনীন মানবধর্ম ইসলাম হতে পারে না। এ ধরনের ধর্ম-ভাব নফসে আম্মারা বা ব্যক্তিস্বার্থে প্রচলন হয়- যা হতে লৌকিক ধর্মের সৃষ্টি হয়। এরাই ধর্মান্ধ জঙ্গি হয় এবং শত সহস্র মতভেদের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।

অধিকাংশ মানুষই এ লৌকিক ধর্মকে মানবধর্ম ইসলাম বলে স্বীকার করে নিয়েছে, যেমন নিয়েছে ইয়াজিদ ও ইয়াজিদের আলেম-মোল্লারা। যার ফলে দ্বীন-এ-মুহাম্মদী কলঙ্কিত হচ্ছে। নিজ ধর্মকে ইয়াকিনের সাথে মেনে নিয়ে সকলকে প্রাণ হতে দু’বাহু বাড়িয়ে আলিঙ্গন করার শক্তি অর্জন করা মনুষ্যত্ব। হায়ানী আত্মার কাজ হলো ধ্বংস করা, বহুমূখী পথ ও মত সৃষ্টি করা বিধায় যাদের মধ্যে হায়ানী আত্মার গুণ-খাছিয়ত আছে তারাই ধর্মের নামে পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রিয়ভাবে, কুটনামী-গীবত, অন্যায়-অত্যাচার, জোর-জুলুম, সন্ত্রাস, মানুষ হত্যা করা, ফেরকাবাজি, ফতোয়াবাজি ইত্যাদি করে ফিরে। এটা রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামও জানতেন তার উম্মতের মধ্যে এমন হবে। তাই বলেছেন “বনী ইসরাঈলরা বিভক্ত হয়েছে বাহাত্তর দলে। আমার উম্মত বিভক্ত হবে তিয়াত্তর দলে। তার মধ্যে একদল নাজাত পাবে”। তার মানে অধিকাংশই হবে পথভ্রষ্ট- মুনাফেক। অথচ তিয়াত্তর ফেরকার সবাই কিন্তু নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি করেই যাচ্ছে, কোরান-হাদিসের দোহাই দিয়েই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের এবং সৎপথে আছে বলে স্লোগান দিচ্ছে।

‘আসলে যারা আমিত্ব নাস্তি করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইয়্যেতের মহব্বতে আছে তারাই নাজাতপ্রাপ্ত দল।’

এ কথাটি জ্ঞানী-গুণীদের নিকট জেনে নিলেই নাজাতপ্রাপ্ত দলের পরিচয় পাওয়া যাবে। ‘সেই চিরন্তন-শাশ্বত আহলে বাইয়্যেতের পরিচয় যারা জানে তথা নিজকে চিনে তারাই হলো জ্ঞানী, আর জ্ঞানীগণই হলো অলি-আউলিয়া।’ এরাই দায়েমী ছালাতে কায়েম আছে। কোরান আর সেই চিরন্তন-শাশ্বত আহলে বাইয়্যেত অবিচ্ছিন্নবস্থায় আছে। প্রতিটি মানুষের সাথেই রয়েছে সেই আহলে বাইয়্যেত- আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইন। কাজেই ধর্ম কথার মর্ম না বুঝে কথা বললে ধর্ম বিকৃতি হবেই, বহু মতভেদ সৃষ্টি হবেই। আর মতভেদে ফেরকাবাজি, ফতোয়াবাজি শুরু হবেই। তাতে পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় ভাবে দূর্যোগ সৃষ্টি হবে, দূর্যোগে আসবে দূর্ভোগ শেষে ধর্মের ছদ্মাবরণে শুরু হবে দূর্নীতি, প্রতারণা, মারামারি, খুনাখুনি ইত্যাদি।

আব, আতশ, খাক, বাদ, নূরে সাফা এ পঞ্চ মহাভূতে মানুষ গড়া। এ সৃষ্টিতে কোনো জাত-ভেদ নেই। সব মানুষই এ পাঁচ বস্তুতে গড়া বিধায় সমস্ত মানুষই এক। খোদাও মানুষের সাথেই আছেন- এখানেই ঐক্যতার নিদর্শন। এমকান আর ওয়াজেব এক সুরতেই আছে। আর পাঁচ বস্তু এবং তার গুণ-খাছিয়ত সমস্ত সৃষ্টিতে প্রকাশ পাচ্ছে বলে মানুষ মানে এখানেই সব স্থিত ও উপস্থিত। সব মানুষ এক, ¯্রষ্টা এক এবং তার ধর্মও এক। কোরানুল করিমেও সৃষ্টিগতভাবে সব মানুষকে এক এবং এক মানুষ হতেই সৃষ্টি বলে ঘোষণা করেছে। কেবল স্বভাবের কর্মানুসারে ভিন্নতা বা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। পাঁচ বস্তুতে গড়া মানুষের মাঝে পাঁচটি নফস স্থিত আছে, তার একটি হলো নফসে আম্মারা বা কুপ্রবৃত্তি। যদিও এক নফসই জাতে জাতে এসে নাম হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন। তার মধ্যে কোনো ধর্মাচারণ নেই তথা মানবধর্ম ইনছানিয়াতের প্রতিকূল আচরণ উক্ত নফসে বিদ্যমান বিধায় দীল হতে তার ক্রিয়া যখন হাত, পা, চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদিতে প্রভাব ফেলে তখনই ঐ মানুষ দ্বারা সমস্ত অন্যায়, অবৈধ কর্ম সংঘটিত হতে থাকে এবং এ অবস্থায় তার মধ্যে কোনো দ্বীন বা ধর্ম নেই।

হায়ানী আত্মা বা নফসে আম্মারাই কাফের, তার পরিচালক হলো শয়তান। সে-ই হলো জালেম, যে জুলুম করে। সমস্ত মানুষের মাঝে এক জালেমই সর্বদা জুলুম করে চলেছে। কাফের শয়তানকে বা জালেমকে মন মানসিকতা হতে তথা দীল হতে বের করে দেয়ার কথাই সুরা বাকারার ১৯১-৯৩ নম্বর আয়াতে বিধৃত হয়েছে এবং আমিত্বরূপী পশুত্বকে কতল বা সংযমে আনার কথা উক্ত আয়াতসমূহে বর্ণিত হয়েছে। ইহাই কোরানের মুহকামাত বা গূঢ়ার্থ, কাজেই ইহা সার্বজনীন এবং সমস্ত মানুষের মাঝেই কাফের শয়তান বিদ্যমান। সমস্ত অপকর্ম বা ধর্ম বিরোধী কর্ম তার দ্বারাই ঘটে। এ কাফেরের বিরুদ্ধে জেহাদ করাই হলো জেহাদুল আকবর বা বড় জেহাদ- একথা সমস্ত মানুষের জন্য আগত এবং সমস্ত মানুষের অস্তিত্বে স্থিত মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামই জানিয়ে দিচ্ছেন। কোরানের ঘোষণাও ইহাই।

প্রবন্ধ – হবে কিরে মন শ্রীগুরুর ভজন

সালমা আক্তার চিশতী

ভজন ও পূজনে মিলবে মাওলার দর্শন। মুর্শিদের ভেদ রহস্য জানতে হলে তাঁর এশকের দরিয়ায় ডুব দিতে হবে। মানুষ যখন বায়াত হয় তখন মুর্শিদের প্রতি প্রবল বিশ্বাস-ভক্তির কারণে তার মনের ভেজালগুলো দূর করার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়। ঐ ভেজালগুলো হলো ছয় রিপু । যেমন, কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, মোহ, মাৎসর্য। এই রিপুর তাড়নায় মানুষ গুরুকে ভুলে বিষয় মোহের পূজা করে।

যেমন, একটি বাঘের বাচ্চা যখন ছোট থাকে তখন একটি ভেড়ার সাথে খেলতে পারে আর যখন বাঘের বাচ্চাটি বড় হয়ে যায় তখন আর ভেড়ার সাথে খেলতে পারে না তাকে কিভাবে খাবে সেই আশায় তার মন ডুবে থাকে। তেমনি একজন মানুষের দশা, সে যখন শিশু থাকে তখন সবার সাথে মিশতে পারে এমনকি তার শত্রুর সাথেও। আর যখন সেই মানুষটি বড় হয় আস্তে আস্তে ছয় রিপু এসে ঐ মানুষের মাঝে প্রভাব বিস্তার করে তখন সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, তখন শুধু সুরতেই মানুষ থাকে, সিরাতে আর মানুষ থাকে না। তখন লোকটি স্বভাবে পশুর সমতুল্য হয়ে উঠে। কোরআনের একটি আয়াত আছে, “লাহুম কুলুবুন লা ইয়াব্কাহুনা বেহা ওয়া লাহুম আইনুন লা ইয়উবসেরূনা বেহা ওয়া লাহুম আজানুন লা ইয়াসমাউনা বেহা। উলাইকা কাল আনআমে। বালহুম আদাল্লুন। উলাইকাহুমুল গাফেলুনা।” অর্থাৎ তাদের দীল আছে বুঝে না, তাদের চোখ আছে দেখে না, তাদের কান আছে শুনে না। উহারাই চতুস্পদ জন্তুর মতো, তার চেয়েও নিকৃষ্ট। এরাই গাফেল, জাহান্নামী।

গুরু ভজনে মিলবে মাওলার দরশন আর যারা গুরুকে রেখে আল্লাহ আল্লাহ জিকির করতেছে তারা হলো গাফেল লোক। কারণ, গাফেল যারা তারাই জাহান্নামী অজুদ নিয়ে হাশরে উঠবে।

আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী তাঁর আলোচনার মাঝে বলতে থাকেন,
“একজন পাক মানুষ বা পরকাল প্রাপ্ত মানুষ নিজেই বেহেশত।”

তেমনি একজন অপবিত্র মানুষ নিজেই জাহান্নাম। আখেরে জাহান্নামীদের বাকশক্তি থাকবে না। মানুষ সৃষ্টির সেরা হয়েছে এই বাকশক্তির জন্য। কারণ, সাত+পাঁচ=বারো’র মিলন ঘটছে এই মানুষের মাঝে। একটি বানরের আকৃতি ঠিক মানুষের মত কিন্তু বানরটি চিড়িয়াখানায় থাকে কেন ? কারণ, সে পশু, তার বাকশক্তি নেই বলে। কোরানের মাঝে বর্ণনা আছে হযরত দাঊদ (আঃ)-এর নিষেধ অমান্য করে তাঁর যে সমস্ত উম্মতগণ শনিবারে মাছ ধরেছে তারা সবাই বানর হয়ে গেছে। শনিবারটা আসলে কি ? তা কি জানা জরুরী নয়? কোরানের সব ইতিহাসই বর্তমান। আর একজন এলমে ইলাহীর অধিকারী ব্যক্তি ছাড়া কোরানের ভেদ রহস্য বা কোরানের জ্ঞান লাভ করা কারো পক্ষে মোটেও সম্ভব নয়। মাদ্রাসায় শিক্ষা দেয়া হয় ইলমুল কালাম তথা আক্ষরিক বিদ্যা, তা দিয়ে কোরান কখনো বুঝা সম্ভব নয়। কারণ, কোরানের ভাষাগুলো হলো রূপক। রূপকের অন্তরালে রয়েছে মূল ভেদ।

আমার দাদা হুজুর দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী চিশ্তি নিজামী তাঁর একটি গানের মাঝে বলছেন, “হরিণীর নাভী মূলে মৃগনাভি, হরিণী তা খুঁজে পায় না।” আমাদের অচেতন মানব সমাজের দশা ঠিক তেমন সে তার মূল হারিয়ে, নিজেকে হারিয়ে এই মায়ার জগতের মাঝে ঘুরে বেড়ায়। যেমন, আমাদের সবার ঘরেই শোকেস থাকে, এই শোকেসের মাঝে আমরা মূল্যবান সব কাঁচের জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখি। কিন্তু আমরা এমন বে-খেয়ালি যে, আমাদের এই দেহ শোকেসের মাঝে আল্লাহ যে বিরাজমান আছে তাকে কি আমরা সাজিয়ে রাখছি, চিনেছি, আমি কে তা কি জেনেছি ? আমাদের দশা হলো আমার দাদা হুজুরের গানের মতো; আল্লাহকে ভুলে এই মায়ার জগতের চাকচিক্য নিয়ে আমরা ব্যস্ত থাকি। আর গুরু ভজন করতে হলে এই মোহ মায়ার উপর নিরপেক্ষ হতে হবে, দুনিয়ামুখী ইচ্ছাকে পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একজন মানুষের চাকরি, ব্যবসা, কৃষি-কাজ, রিক্সা চালানো, পড়া-লেখা ইত্যাদি কিছুই ছাড়তে হবে না। সব কিছুর মধ্যে থেকেও যিনি মোহমুক্ত তিনি নাছুত সাগরে ভাসমান নূহের কিস্তী (কোরান)। যেমনÑ একটি আয়না যখন ঠিকঠাক থাকে তখন একজন মানুষের চেহারা দেখা যায়, আর যখন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায় তখন একই আয়নাতে অনেক রূপ দরশন হয়। মানুষের অন্তর জগতটা ঠিক এইরূপ, তা ঠিক থাকলে গুরুরূপ দরশন হবে, আর যদি নষ্ট হয়ে যায় তবে গুরুর রূপ আর থাকবে না, বরং বহু রূপ দরশন হবে, কেবলা কাবা হারিয়ে ফেলতে হবে।

গুরুজ্ঞানের আলোকে একজন মুরিদের মনটাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে তবেই আমরা একজন খাঁটি ভক্ত হতে পারবো। ভক্ত ঐ দেশে বাস করে যেই দেশে থেকে গোপীগণ কৃষ্ণকে, তাদের গুরুকে চরণ ধুলা দিয়েছিল। হযরত আলী (আ.) তাঁর গুরু মহানবী (সা.) এর কাঁধে উঠে কাবা ঘরের মূর্তি ভেঙেছিল। কিস্সাটি অনেক বড়। গুরুর মাথা ব্যথা ছিল কিন্তু ভক্তের চরণের ধূলা নারদ হাতে ধরার সাথে সাথে গুরুর মাথা ব্যাথা সেরে গেল। ভক্ত কি জিনিস শ্রীকৃষ্ণ তার স্ত্রীগণকে এবং নারদকে দেখিয়ে দিলেন। এই পরিস্থিতির নিগুঢ় ভেদ রহস্য রয়েছে তা মোটা বুদ্ধি দিয়ে বুঝা যাবে না। তা বুঝতে হলে গুরুজ্ঞানের আলো লাগবে । তবেই অহেদানিয়াতের দেশে ডুব দিতে পারবে । ঐ দেশে আর দুই নাই সব এক দেশের খেলা চলছে। ঐ দেশটাই হলো তৌহিদের দেশ। জাত কুলের জাতাজাতি থাকলে তৌহিদের দেশে প্রবেশ করা যায় না।

আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী প্রায় সময় তাঁর আলোচনার মাঝে একটি গান বলতে থাকেন,
“তোর জাত কুলমান ছাড়তে পারলে প্রাণ বন্ধুকে পাবি।”

আমার দাদা হুজুর দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী চিশ্তি নিজামি তাঁর একটি গানের মাঝে বলছেন,
“থাকলে লোক লজ্জা কুল কলংকের ভয় রজ্জব কয় যাইসনে সেইখানে।”

অর্থাৎ গুরুর করণ করতে গিয়ে লোকের মন্দ, অপবাদ, বাধা অপমান ইত্যাদি এবং হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ইত্যাদি জাত কুলের ভেদাভেদ সামনে আসবে তা অতিক্রম করতে না পারলে গুরু ভজন করা যায় না, মানুষও হওয়া যায় না।

আমার দাদা হুজুর আরো বলছেন,
“গুরু ভজন সহজ কথা নয়, আমাতে আমিত্ব থাকিতে ভজন নাহি হয়।”

তিনি আরো বলছেন,
“হিংসা ভরা হৃদয় নিয়ে মিছে ধর্মের গল্প করো, আগে জাতির গৌরব ছাড়ো।”

গুরু ভজন করা মানে অসাধ্যকে সাধ্য করা, মনকে পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা, মোহমুক্ত হওয়া, আমিত্ব ত্যাগ করা বা মুক্ত হওয়া। আমিত্বই দুনিয়া, দুনিয়া নিয়ে গুরু ভজন হয় না। যেমন, আমরা সাবান দিয়ে যখন হাত ধুই তখন হাতের ময়লা পরিষ্কার হয়ে যায়, তেমনি গুরুর কাছে যাওয়া মানে গুরুর কালামগুলো হলো সাবান, বিশ্বাস-ভক্তি-প্রেমযোগে তা শ্রবণ এবং তাঁর হুকুম নির্দেশের অনুসরণ করলে একজন মুরিদের মনের সমস্ত ময়লাগুলো পরিষ্কার হয়ে যায়। তা এক দিনে সম্ভব নয়, আবার হতেও পারে। তবে গুরু প্রেম যার হৃদয়ে জাগ্রত সেই মানুষের দেহে পাপ থাকে না (সুরা ইমরান-৩১)। সেই অচেনাকে চিনতে হলে বিরামহীনভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে তবেই তার দেখা মিলবে ও এই মায়াময় জগত থেকে মুক্তি মিলবে। একজন লেখক বলছেন, “মানুষের জীবনটাকে চায়ের কাপের সাথে তুলনা করা যায়, কাপের চা যতই তলার দিকে যায় মানুষের জীবনটা ততই শেষের দিকে অগ্রসর হয়।” কিন্ত আমার কথা হলো একজন গুরুভক্ত গুরু ভজন করতে করতে (আমিত্বের পরিশুদ্ধির সাধনায় জয়ী হয়ে) অমরত্ব লাভ করে, মৃত্যুকে জয় করে, তার লয়Ñক্ষয়, ধ্বংস নেই।

মানুষের সাধনাই হলো মৃত্যুকে জয় করে চিরঞ্জীব হওয়া এবং আল্লাহর বাকশক্তি কায়েম রাখা। তা খোদার ফেৎরাতকে ধারণ করতে পারলেই হবে, তখনই আল্লাহর ছুরত প্রতিষ্ঠিত হবে, মৃত্যুকে জয় করা হবে এবং তার মানব ছুরত আর ধ্বংস হবে না। দেহ এবং দেহী কি জিনিস এই দু’য়ের প্রভেদ বুঝতে পারলে মানুষের সাধনা কিসের জন্য তা জানা যায়। কোরানুল করিমে সূরা আর-রহমানের ২৬-২৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “কুল্লুমান আলাইহা ফা’ন। ওয়া ইয়াব্কা ওয়াজহু রাব্বিকা জুল্ জালালি ওয়াল ইকরাম।” অর্থাৎ ইহার উপর সমস্ত কিছুই ধংসশীল। এবং বাঁকা হয় তোমার রবের চেহারা, যা জালাল এবং কেরামতের অধিকারী। এই থেকে বুঝা যায় রবের চেহারা রয়েছে। রবের চেহারা ধারণ করা ঈমানদারদের জন্য সহজ আর যাদের ঈমান নড়বড়ে তাদের জন্য অনেক কঠিন। কারণ, একজন মানুষের মুক্তি সুন্দর স্বভাবের বলেই। হযরত খাজা বাবা গরীবে নেওয়াজ (রাঃ)-এর রঁওজায় জিয়ারতের জন্য যারা যায় রঁওজার ভিতরে ময়ূরের পাখা দিয়ে জিয়ারতকারীদের মাথায় স্পর্শ করানো হয়। এর ভেদ রহস্য কি তা জানতে হবে। যদিও এই নিয়ম অনেক ওলীদের মাজার বা রঁওজায়ই প্রচলিত আছে। আমাদের সমাজে কোনো মানুষ যদি অপকর্ম করে তবে তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য বলা হয় ঝাড়–র বারি দেওয়া উচিত, ইহা অপমানজনক কর্ম। কিন্তু একজন পবিত্র মানুষের বা পরকাল প্রাপ্ত মানুষের বা ওলীর রঁওজার বা মাজারের ধূলা জিয়ারতকারীর মাথায় পড়লে অবশ্যই সে উছিলায় আল্লাহপাক তার মনের মকসুদ পূর্ণ করে দেন, আখেরাতের দরজা খুলে দেন, তাঁর মাগফেরাত হয়ে যায়, মন মস্তিস্ক হতে দুনিয়া বের হয়ে মন গুরু প্রেমিক হয়ে যায়।

এই পৃথিবীতে আল্লাহপাক সবই করেন তাঁর ওলীদের মাধ্যমে। এই কথার ভেদ বুঝা সবার কপালে জুটে না। কারণ, সব তরিকতপন্থীরা গুরুর নীতি আদর্শকে ধারণ করতে পারে না; এ অবস্থানটি পূর্বে থেকেই ঘটে এসেছে আর তা এখন বর্তমানেও ঘটে চলেছে। যারা ঈমানদার তারা এই কথার উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখেন। যারা বায়াতই হয়নি তারা অবশ্যই ঈমানদার নয়, তারা ওলীদের প্রতি বিশ্বাসী নয় বা মাজার বা রঁওজায় বিশ্বাসী নয়। মুক্তির দরজাটি একমাত্র ঈমানদার বা বিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে। একজন মুরিদের অবস্থা আর একজন বে-মুরিদের অবস্থা এক নয়। মুর্শিদের ভেদ রহস্য জানা সহজ নয়। যিনি গুরু ভক্ত হয়েছেন তিনিই তার ভেদ রহস্য জানেন। লালন সাঁইজী বলছেন, “যেই জন শিষ্য হয়, সে গুরুর মনের খবর লয়।” গুরুর মনের খবর লওয়াটা সহজ ব্যাপার নয়। আমার মতো নরাধম তার আভাসটুকুও পাইনি। বায়াত হওয়ার পর থেকে একজন মুরিদের পথ চলা শুরু হয়। যেমন, একটি টিস্যু বক্সের মাঝে টিস্যুগুলো ভাঁজ করে রাখা হয় মানুষের যখন প্রয়োজন হয় তখন তা বের করতে পারে, কোনো প্রতিবাদ নেই। তেমনি একজন শিষ্যের অবস্থা। গুরুর যেই ভাবে খুশি তাকে চালাবে, নির্দেশ দিবে। যতো কঠিন হোক ভক্ত তা পালন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকতে হবে। এই জন্য কোরানে বর্ণিত হযরত খিজির ও হযরত মুসা (আঃ)-এর ঘটনাটি স্মরণে রাখতে হবে, কিভাবে গুরুকে অনুসরণ করতে হবে!

তবে ভক্ত আর শিষ্যের মধ্যে অনেক প্রভেদ রয়েছে। ভক্ত হলে তা পালন করা সম্ভব হয়। আমরা হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ, হযরত জালালুদ্দীন কোবরা, হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহাম, হযরত রাবেয়া বসরী, হযরত হাফেজা জামাল (খাজা বাবার মেয়ে) বা অন্যান্য ওলীদের ঘটনা হতে গুরুভক্তের পরিচয়, গুরুর প্রতি একনিষ্ঠ দৃঢ় বিশ্বাস এবং গুরুর খেদমতের ইতিহাসগুলো দেখতে পাই। বলা হয়, ‘আমলে মিলে আমালিয়াত আর খেদমতে মিলে কামালিয়াত।’ এই খেদমতের পথেই ওলীদের কামালিয়াত হাছিল হয়েছে। কোরানে ইহাকে বলছে ‘এতায়াত করো’ জান-মাল উৎসর্গ করে গুরু বা মুর্শিদের খেদমত করো। এই পথে যত বাঁধাই আসুক তার বিশ্বাস-ভক্তি-প্রেমের বলে সে সমস্ত বাধা জয় করা যায়। আর মুরিদের মনের মাঝে যদি ভেজাল থাকে, বিশ্বাসে সমস্যা থাকে তবে আর মূল লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। তার পরম সম্পদ আদব-নম্রতা, তমিজ-তাজিম হারিয়ে জাহান্নামী অজুদ সৃষ্টি হতে থাকবে। আমাদের অচেতন মুর্দা সমাজে, উলঙ্গ সমাজে অথবা বায়াত হওয়ার পর গুরুর প্রতি যাদের বিশ্বাস-ভক্তির ঠিক নেই তারা গুরুভক্তকে নানা রকম সমালোচনা করে থাকে, আল্লাহর করুণা হতে বঞ্চিত বিধায় তাদের এই দশা হচ্ছে-এটা তারা বুঝতে পারে না। কারণ, গুরুর সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি মানেই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি। সুরা ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতটি তার প্রমাণ। কারণ, বায়াতের অঙ্গীকার হলো একমাত্র আল্লাহর সাথে, উছিলা হলো মানব গুরু, তবে প্রভেদ নেই, অভেদ হয়েই আছে। ইহা বিকৃত স্বভাব থাকতে বুঝবেও না- ইহাই জাহান্নামী হওয়ার লক্ষণ। আমাদের দরবারের নিকট ২/৩ জন লোকেরও (ওরাও মুরিদ ছিল) এই দশা, আমি নিজেই দেখেছি। ওরা ভয়ংকর মুনাফিক, অগ্নি পূজারী, ব্যক্তিস্বার্থের কৃতদাস। তাদের দীলে, চোখে এবং কর্ণে মোহর মারা রয়েছে, গুরুর বাণী তাদের কর্ণে মাত্রই প্রবেশ করছে না। তারা একের পর এক জাহান্নামী অজুদ সৃষ্টি করে চলছে, অথচ নিজেকে সঠিক বলে লোক সমাজে তুলেও ধরছে। কোনো বুঝ-সমুঝ তাদের দীলে নেই, বিশ্বাস-ভক্তির মারাত্মক সমস্যা, দো-দীল বান্দা। কারণ, গুরুর অঙ্গীকার থেকে বের হয়ে যাওয়া, তাঁর বিরোধিতা করা মানে ধর্ম হতে মুরতাদ হয়ে যাওয়া, এরা হলো জাহান্নামী লোক। তাদের এ ধরনের পশুত্ব স্বভাবের পরিণতির উৎকৃষ্ট জবাব আল্লাহপাকই তাঁর হাবিব মুহাম্মদ রাছুলের মাধ্যমে দিয়েছেন সুরা লাহাব এবং সুরা মুনাফেকুন তার প্রমাণ। আমাদের মুর্শিদ সর্বদাই এই কথা বলে যাচ্ছেন। যারা জাহান্নামী হবে তারা নিজেদের ভুলগুলো ধরতে পারবে না। যাক, তথাকথিত মুসলিম উলঙ্গ-মুর্দা সমাজে মেয়েদের জন্য তো আরো সমস্যা, গুরু ভজনের পথে শত অপবাদ তার মাথায় এসে পড়বে, যেমন, একদল আলেম সমাজ কঠোর সমালোচনা করেছিল হযরত খাজা রাবেয়া বসরী (রাঃ)-এর ক্ষেত্রে । তাঁর প্রধান দোষ তিনি বিবাহ করেননি। জাত-কুলের ভেদাভেদ, উলঙ্গ, মুর্দা সমাজের বিরোধীতা করে যে গুরুর করণ করে থাকে তার মানব জনমে সার্থকতা মিলবেই। এই জন্য লালন সাঁইজী বলছেন, “যায় যাবে ছাই জাত কুলমান, আমার তাতে ক্ষতি নাই। যদি আমার প্রাণ বন্ধুরে পাই।” ইহাই একজন সাধকের মনের কথা হতে হবে। আমরা কাকে ভয় করবো? গুরু ভজন করতে কাকে লজ্জা করবো ? কেনো করবো ? সমাজে তো সাড়ে পনের আনাই উলঙ্গ, মুর্দা, বিচিত্র সুরতধারী লোক, স্বভাবে গরু, ছাগল, শুকর, বানর, বাঘ, ভাল্লুক ইত্যাদি, শুধু আকৃতিটুকু মানুষের। সত্যিকারের মানুষ তাদেরকে ভয় অবশ্যই করবে না। তবে গুরুকে ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা, সম্মান করতে হবে-ইহা ইবাদত। মানুষের এবাদত হলো এই মানব সুরতকে অটল রাখা। লালন সাঁইজি তাঁর একটি গানের মাঝে বলছেন, “সর্ব সাধন সিদ্ধি হয় তার মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার।” ‘নিষ্ঠা’ অর্থ হলো একাগ্র চিত্তে গুরুতে মন নিবিষ্ট করে রাখা। গুরু ভিন্ন অন্য কিছু হতে মন তুলে নেয়া।

আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী, যখন তাঁর গান গাওয়ার ইচ্ছা হয় তখন তিঁনি এই গানটি প্রথমেই গেয়ে থাকেন। এই গানের মূল ভেদ রহস্য জানতে হলে আধ্যাত্মিক এলেম লাগবে। জীবজন্তুর মগজ দিয়ে মাওলার ভেদ রহস্যের দরিয়ায় সাঁতার দেওয়া যায় না। মাওলার ভেদের দরিয়ায় সাঁতার দিতে হলে খোদার কালামগুলো শুনতে হবে। ভালো করে শুনে দীলে ধারণ করলে উত্তম সিরাতের অধিকারী হওয়া সম্ভব। যেমন, একটি গরু সে শুধু ঘাস খাওয়াটাই বুঝবে, গরুর কিন্তু পোলাও, কোরমা খাওয়ার তকদির নেই এই রিজিকটা শুধু মানুষের। তেমনি একজন সাধারণ লোক আর একজন ইনছানুল কামেলের মাঝে আকাশ জমিন পার্থক্য। একজন ইনছানুল কামেল লালন সাঁইজীর এই গানটির ব্যাখ্যা দিতে পারবে আর সাধারণ লোকটি কি তা পারবে ? একজন কামেল গুরুর কাছে না গেলে ঐ আধ্যাত্মিক দেশের ভেদ রহস্য বুঝার উপায় নেই। আর ঐ আধ্যাত্মিক এলেম অর্জন করতে হলে একটি মোমের বাতির মত হতে হবে। গুরুর যখন ইচ্ছা তখনই মোমের বাতিটিকে জ্বালাতে পারবে। সাধারণ মোমের বাতি আর গুরুর মোমের বাতি আলাদা, সাধারণ মোমের বাতির আলো ছড়ানো আর গুরুর মোমের বাতির আলো ছড়ানো এক বিষয় বস্তু নয়। সাধারণ আলো দিয়ে অন্ধকার দূর হয় আর গুরুর আলো দিয়ে, নূর দিয়ে একজন মুরিদ বা শিষ্যের দীলের অন্ধকারগুলো দূর হয়ে যায়, আখেরাত প্রাপ্ত হয়-মুক্তি লাভ করে। ভক্ত নিজেই আদব-নম্রতায় মোমের বাতিতে পরিণত হলে সেই ভক্ত হৃদয়ে নূরের জাগরণ ঘটে।

গুরুর কাছে মুরিদ হওয়াটা সহজ আর গুরুর ভক্ত হওয়াটা অনেক কঠিন। কারণ, একজন ভক্তই গুরুর নিগুঢ় ভেদ রহস্য জানতে পারে। ভক্তের দরজা অনেক উচ্চ স্তরে, আমাদের মতো শুষ্ক মন দিয়ে, ভজনবিহীন মন দিয়ে তা কোনো দিন সম্ভব নয়। হিন্দুদের কীর্ত্তনের মাঝে শিল্পীরা বলতে থাকে, “আছে ভক্তের হাতে প্রেমের ডুরি, ভক্ত যে দিক ঘুরায় সেই দিক ঘুরি।” এই ভক্ত দুনিয়া বিবর্জিত অবস্থায় বাস করে, সর্বদাই গুরুর ধ্যানে-দিদারে কায়েম থাকে, সে বাস করে প্রেম সাগরে। লোক সমাজে তার চাল-চলন সম্পূর্ণ আলাদা। গুরু ভক্তের শক্তি অনেক, যদি কেউ সত্যিকারের গুরুভক্ত হয়ে যায়, গুরু নিজ রূপ ঐ ভক্তের মধ্যেই দেখতে পায়। আমরা দুনিয়ায় ডুব দিয়ে গুরুকে ধারণ করতে চাই দেখেই আমাদের সে শক্তি অর্জন হয় না। খাজা ওয়ায়েস ক্বরণী পেরেছিলেন, ভক্ত হনুমান পেরেছিলেন, হযরত আমীর খসরু পেরেছিলেন। আমাদের মুর্শিদ বলেন, এই ধরনের ভক্ত হলো গুরুর গুরু। সেই ভক্তের প্রতিই গুরুর দৃষ্টি চলে যায়, গুরুই তার হয়ে যায়। যেমন গিয়েছিল নবীজির ওয়ায়েস ক্বরণীর প্রতি, নিজামউদ্দীন আউলিয়ার তাঁর ভক্ত আমীর খসরুর প্রতি। তখন কে কার কাবা তা বুঝা যায় না। কোরানে “ইন্নাল্লাহা ওয়া মালাইকাতাহু ইউসাল্লুনা আলান্ নাবীয়ি”-এই আয়াতে তাঁর প্রমাণ রয়েছে। আমাদের মুর্শিদ প্রায়ই এই আয়াতের ভেদ আমাদের শোনাতেন। ভক্ত হওয়ার জন্য একজন শিষ্য সাধনা করবে কিন্তু সব শিষ্য সেই দেশে যেতে পারে না বিশ্বাস-ভক্তির কারণে, সেই দেশটা হলো এক তৌহিদের দেশ। যে গুরু ভক্ত হয়ে যাবে সে এই তৌহিদের দেশে বাস করবে। যেমনÑ একজন মানুষ একটি বিদেশী ফল মুখে দিলে সেই ফলটির স্বাদ অন্য আরেক জন মানুষ বলতে পারবে না, ঐ বিদেশী ফলটির স্বাদ কি রকম তা না খেলে বুঝা যাবে না। তেমনি গুরুর তৌহিদের সাগরের মাঝে ডুব না দিলে সেই দেশের ভেদ রহস্য উন্মোচিত হবে না। গুরু যাকে তৌহিদের দেশে নিয়ে যাবে তার চাল-চলন, কথা বলার ভঙ্গিমা আলাদা থাকবে। শত কষ্ট হলেও সে গুরুর ইচ্ছার বাইরে চলবে না। কারণ, মুরিদ মানেই নিজ ইচ্ছা উৎসর্গ করা। উৎসর্গ করতে পারলে সে ভক্ত হয়ে যাবে। নিজ ইচ্ছা রাখলে গুরু ভজন হবে না, হবে গোবিন্দ ভজন, গুরু ভজন ।

আমার কেবলা কাবা গুরু কাজী বেনজীর হক চিশ্তি নিজামী তাঁর আলোচনার মাঝে অনেক সময় বলতে থাকেন – ‘গুরুকে থুইয়া যে গোবিন্দ/আল্লাহ ভজে সেই পাপি নরকে মজে।’

আমার দাদা গুরু দেওয়ান শাহ্ রজ্জব আলী চিশ্তি নিজামী একটি গানের মাঝে বলছেন- ‘সোনাতে সোহাগা দিলে দুই বস্তু এক যোগে চলে, গুরু শিষ্য এমনি হলে যাওয়া যেত জাতে মিশে।’

নিজ সেফাত ফানা হলেই হয় “তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লাহ” আর তখনই হয় গুরুর জাতে স্থিত হওয়া, ঐক্যতায় পৌছে যাওয়া। গুরুর জাতে মিশাটা সহজ কথা নয়, গুরুর জাতে মিশতে হলে গুরু যা বলবে তা সরল মনে শুনতে হবে, হৃদে ধারণ করবে এবং সে অনুসারে জীবন গঠন করতে হবে। গুরুর কালাম শোনার মূল অর্থ হলো তা নিজ মানব জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে আর নিজ অস্তিত্বের ধারণায় বা দুনিয়ায় মন আবদ্ধ থাকলে গুরুর কালামগুলো কানে ও দীলে পৌছেবে না। কারণ, যেই মানুষটি ভক্ত হবে সে গুরুর কান দিয়ে শুনবে, গুরুর চোখ দিয়ে দেখবে তার নিজ কোন অস্তিত্ব থাকবে না। এ অবস্থাকে কোরানে বলা হয়েছে, “ওয়ামা ইয়ান্তেকু আনিল হাওয়া।”

যেমন, একটি পুতুল যখন মানুষ তৈরি করে, পুতুলটি কিভাবে কথা বলবে তা একমাত্র ঐ মানুষটি বলতে পারবে। কারণ, সে যেই ভাবে চাইবে পুতুলটি সেই ভাবেই ব্যাটারী লাগানোর পর কথা বলবে। তেমনি একজন গুরু ভক্তের অবস্থান সে গুরুর কাছে পুতুলের মতো হয়ে যাবে। গুরু ভজন

মাওলানা রুমী (রাঃ) তাঁর ‘মসনবীতে’ বলছেন –
“পীরেরা জাতে খোদা এক না দিদ
হাকিকতে নাই মুরিদু নাই মুরিদু নাই মুরিদু।”
অর্থাৎ – পীরের জাত ও আল্লাহর জাত যে এক ও অভিন্ন রূপে দেখতে পায়নি,
সে এখনো মুরিদ হয়নি, মুরিদ হয়নি, মুরিদ হয়নি।

মুরিদ হওয়াটা সহজ কথা নয়, আর মুরিদ হয়ে পীরের দরবারে কয়জন টিকতে পারে। পীরের জাতে জাত মিশাইতে চাইলে এই মানব মনের ভেজালগুলো ছাড়তে হবে, তবেই গুরু ভজন পূর্ণরূপে হবে। যেমন, আমরা কাপড় ধোয়ার পর সূর্যের আলোতে শুকাতে দেই, এই সূর্যের আলোতে দেওয়ার কারণ হলো কাপড়টি ভেজা। তেমনি গুরুর কালামগুলো হলো সূর্যের আলোর মত একজন মুরিদের হায়ানী আত্মার ভেজা ভাবটি শুকিয়ে ইনসানি আত্মার অধীকারী হয়ে যাবে। ইনসানীয়াত অর্জন করাটাই হলো একজন মুরিদের মূল কর্ম। একজন মুরিদ তার মূল কর্ম ভুলে হায়ানী আত্মার কর্মে মনকে ডুবিয়ে রাখে। হায়ানী আত্মার মাঝে মনকে ডুবিয়ে রাখাই হলো অচেতন থাকা, আর যারা অচেতন তারা জাহান্নামে যাবে।

কোরানের সূরা রহমানের ৪১ নম্বর আয়াত অনুসারে তাদেরকে দেখলেই চিনা যাবে। কারণ, তাদের মানব ছুরত থাকবে না। যেমন, আমরা একটি বস্তু চিনি না কিন্তু বস্তুটির নাম জানি, সেই বস্তুটি আমাদের চোখের সামনে থাকলেও, এই দেখা বস্তুটি অচেনা হয়ে রবে। তেমনি একজন অচেতন মানুষের দশা হবে তার সিরাত অনুসারে ছুরত হয়ে যাবে, তা সামনে থাকলেও চিনা যাবে না। কারণ, আমরা দেখার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলছি তাই। সিরাত ঠিক না থাকলে মানব ছুরত কোনো দিন ঠিক থাকবে না, বদল হয়ে যাবে। মানব জনমটা শুধু দুনিয়া ভোগের জন্য নয়, মানবাত্মার মুক্তির জন্য আগমন। এই মানব জনমের মাঝে অনেক ত্যাগ স্বীকার করে কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে মুক্তির দেশে পৌছতে হয় গুরুর শিক্ষায় তাই জানা-বুঝা যায়। আমরা অনেক সময় মানুষের মুখে এই বাক্যটি শুনতে পাই, “ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ।” যারা দুনিয়া বিবর্জিত মানুষ তারাই পারে দুনিয়ায় থেকেও দুনিয়ার বাহিরে বাস করতে। তারাই প্রকৃত সুখ-বিলাসিতা ভোগ করতে পারে। দুনিয়ায় থেকে ভোগ-বিলাসিতা পাপ। মাওলার সিরাত ধারণ করতে পারলে মাওলার এশ্কের দরিয়ার মাঝে বাস করা যাবে। এশ্ক হলো দুই রকমের একটি হলো দুনিয়াবী এবং অপরটি হলো আখেরাত মুখী।

হযরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রাঃ) দিওয়ানে-ই-মুঈনুদ্দিন এর মাঝে বলছেন –
বোর’ক্বে এশ্ক্ব বার’য়ে তো সাদ্ ক্বাদাম্ তেই র্কাদ
তো হাম মোয’য়েক্বে বেগ্যর্’ ইয়েক্ ক্বাদাম্ পীশ্ বিঅ।
অর্থাৎ – এশকের বোরাক তোমার জন্য শত কদম পাড়ি দিয়েছে
তুমি সংকীর্ণ জায়গা ছেড়ে এক পা এগিয়ে আসো।

এই মায়ার চক্ষু দিয়ে গুরুকে চিনা যাবে না। গুরুকে চিনতে হলে আখেরাত মুখী এশ্ক লাগবে। যেমন, জুলেখা যতক্ষণ এই মায়ার জগতের ইশ্কে ছিল ততক্ষণ ইউসুফকে পায়নি, আর যখন তাঁর মাঝে পবিত্র এশ্ক জাগ্রত হলো তখনই ইউসুফকে তিনি পেলেন। এই পাওয়াটা নিজ অস্তিত্বের মাঝে পাওয়া আর নিজ অস্তিত্বের মাঝে পাওয়ার ভেদ রহস্য জানতে হলে একজন আরিফে ইলাহীর কাছে যেতে হবে।

গাউছেপাক হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রাঃ) তাঁর ‘আল ফাতহুর রাব্বানী ওয়া ফায়জুর রাহমানী’ কিতাবে ২৯৯ পৃষ্ঠায় বলছেন,
‘মুনাফিক, দজ্জাল ও প্রবৃত্তির পূজারীরাই সালেহীনদের (ওলী-আউলিয়াদের) এ হালতের প্রতি অবিশ্বাসী।’

যারা ‘মুনাফিক, তারা মনে করে একজন পীর-মুর্শিদ তাদের ভেদ রহস্য জানেন না। এই ধরনের ধারণাটি হলো তাদের ভুল ধারণা, জাহান্নামী হওয়ার লক্ষণ। কারণ, একজন পীর-মুর্শিদ হলো অন্তর্দৃষ্টিওয়ালা। তাঁর চোখে কিছু ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয় না, তিনি আল্লাহর চোখেই দেখেন। যে একজন পীর-মুর্শিদের চোখে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করবে সে নিজেকেই নিজে ফাঁকি দিবে। এই ফাঁকি দেওয়ার কারণেই ঐ মুনাফিকের মধ্যে অন্ধত্ব প্রকাশ পেল। মুনাফিকরা মনে করে একজন পীর অথবা মুর্শিদ তাদের মতো সাধারণ লোক কিন্তু তাঁরা যে অসাধারণ মানুষ তারা তা বুঝে না, না বুঝাটাই তাদের জাহান্নামী হওয়ার লক্ষণ। যেমন, আমরা খাঁটি দই তৈরি করতে গিয়ে দুধকে ভালো করে জাল দিয়ে ঘন করে নেই তারপর দই পাতা হয়। আর এই দই মানুষের হজমের কাজ করে থাকে, স্বাদ সৃষ্টি করে। একজন মানুষ ছাড়া অন্য পশু কি এই দই খেতে পারবে ? পশুর তকদির ও মানুষের তকদির আলাদা। তেমনি একজন কামেল গুরুর কাছে গিয়ে তাঁর খাঁটি ভক্ত হতে হবে তবেই গুরুর পাক কালামগুলো ধারণ করতে পারবে। আকৃতিতে ও নামে মানুষ অথচ মানুষের স্বভাব নেই সে তো আসলে মানুষ নামের কলঙ্ক, পশু। এই কলঙ্ক’কে অলংকার করতে হলে একজন গুরুর নিকট বায়াত গ্রহণ করতে হবে, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে হবে। বায়াত না হয়ে আখেরাতের কর্ম করলে তা আল্লাহর দরবারে পৌঁছাবে না। যেমন, একটি গাছের মূল কেটে ফেলা হলে গাছটি বাঁচবে না, তেমনি একজন মুরিদের কাছে গুরু হলো গাছের মূলের মতো। আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী তাঁর আধ্যাত্মিক আলোচনার মাঝে একটি কথা তুলে থাকেন যদিও তার পূর্বে এই কথা মাওলানা রুমীও বলছেন, কথাটি হলো “গুরুকে মনুষ্য জ্ঞান যার অধঃপাতে গতি তার।” গুরু হলো সর্বজ্ঞ, গুরু হলো চিরস্থায়ী সত্তা। তাই বলা যায় গুরুকে দেখার পর যদি একজন মুরিদের মনের ময়লা দূর না হয় তবে তার গুরু ভজন হবে না। গুরু আর ভক্ত একই আত্মার সমাবেশ ঘটিয়েছে এই মায়াময় জগতের মাঝে। আত্মার এক নাম হলো আল্লাহ। পবিত্রময় সত্তার অধিকারী হওয়া সাধনা সাপেক্ষ। সাধনা করার জন্য দৃঢ় মনোভাব/অনুরাগের আশ্রয় নিতে হবে। খোদাকে ধারণ করা অনেক কঠিন কার্র্য এই মায়ার জগতে। বার বার মন নিন্মগামী হয়ে যায়, তবু যারা এই অসাধ্যকে সাধন করেছে তারা খোদার দিদার লাভ করেছে।

সুরা বাকারা ১১১নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন – ‘বালা মান্ আস্লামা ওয়াজ্হাহু লিল্লাহি ওয়া হুয়া মোহসিনুন’ অর্থাৎ হ্যাঁ, যে ব্যক্তি সমর্পণ করলো বা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করলো বা নিজেকে উৎসর্গ করলো তথা নফসকে খান্নাস মুক্ত করলো তার মুখমন্ডল আল্লাহর জন্য এবং সেই তো সৎকর্মশীল। ‘ফালা আজরুহু ইনদা রাব্বেহী’ অর্থাৎ অতএব তার জন্য উহার বিনিময় তার রবের নিকট রয়েছে। ‘ওয়া লা খাওফুন আলাইহীম ওয়ালাহুম ইয়াহ্জানুন’ অর্থাৎ তাদের জন্য ভয় নেই এবং তারা (কখনো) চিন্তিতও হবে না (সুরা বাকারা ১২নং আয়াত)। খোদাকে/গুরুকে যারা চিনেছে, খোদাতেই বাস করছে তারা ভয় মুক্ত। আল্লাহর নাম নয়, রাসুলের নাম নয়, হরদমে জপো মন গুরুজীর পাক নাম। যে নামে পার হবে কঠিন হাশরের মোকাম। যে যা জপে জপতে থাকুক, মন তুমি জপো মুর্শিদের/গুরুর নাম।

কবিতা – সীমের মাঝে অসীমের লীলা

লেখক – নাসরিন সুলতানা চিশতী

অসীম আর সীমের মিলন মেলা হলো এ মানুষ
সীমেতে লীলা নিত্য দেখো জাগিয়ে তব হুঁশ।

একত্বের মাঝে আল্লাহ হয়ে আছেন লীন
মুহাম্মদের রূপের ঘরে রয়েছেন বিলীন।

নিস্তি থেকে হাস্তি হয়ে হুয়াজ জাহির হলো
হিজাবের আড়ালে দেখো লুকিয়ে রইলো।

বিভেদের ভাবনায় যবে চৈতন্য হারালো
খন্ডকালের ভাবনায় তা বিচ্ছিন্ন হলো।

ত্রিভুবনে এক মুহাম্মদ সর্বস্তরে আছেন
জ্ঞানীজনে চিনতে পেরে তাঁরে ভক্তি করেন।

স্বাধীন দেশের যাত্রী তাঁরা স্বাধীন দেশে বসত
তাঁরাই পেয়েছে জানো দ্বীনে মুহাম্মদ।

আত্ম পরিচয় হারিয়ে আজ রয়েছে বেহুঁশ
নিজ আত্মা হারা হলে থাকে না আর মানুষ।

চৈতন্য জ্ঞানযোগে হবে সেই দেশের দিশা
আক্ষরিক বিদ্যা দিয়ে তা হবে না খোলাসা।

মতলেক কালাম নাতেক হলো প্রতীকি ভাষায়
অসীমের কালাম এই সীমেতে ফুঁকায়।

সেই কালামের ভেদ বুঝেছে যাহারা
অসীম-সীমের খেলা বুঝেছে তাহারা।

এই লীলার ভেদ যদি কেহ বুঝতে চাও
গুরুর শ্রীপাদ পদ্মে ভক্তিযোগে নিজেকে বিকাও।

প্রবন্ধ – আসরারে পাঞ্জাতন – ৩য় পর্ব

লেখক – হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

‘রহস্যময় সৃষ্টি’ নামক কিতাবে বর্ণিত আছে যে, এমন এক সময় ছিল যখন এই বিশ্ব ছিল অন্ধকারময় তথা অঘোর। বিশ্বের কোনো আকার ছিল না। এই রূপে বহু বৎসর অতিবাহিত হওয়ার পর বিশ্ব কুয়াশাচ্ছন্ন রূপ ধারণ করলো। মহান প্রভু শক্তি রূপে ডিম্বের আকৃতি ধারণ করে এই কুয়াশার মধ্যে অবস্থান করেন। বহু বৎসর এইভাবে কাটালেন। হঠাৎ মহান প্রভু তাঁর স্ব-ইচ্ছায় হু-হা-হে তিনটি শব্দ করলেন। তিন শব্দে প্রভু তাঁর রূপ পরিবর্তন করে নিলেন। এই অবস্থায় ৪০ বৎসর কাটিয়েছিলেন।

৪০ বৎসর পর পুনরায় সৃষ্টির কথা মনে করেন। ডিম্বের এক অংশ আল্লাহর নিজ রূপ বা গুণ মিশিয়ে কুদরতের মাধ্যমে রূহে মোহাম্মদী সৃষ্টি করলেন [আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু রূহ]। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের রূহ সৃষ্টি করে আল্লাহপাক জিজ্ঞাসা করলেন – ‘আল আস্তবে রাব্বিকুম’ অর্থাৎ আমি কি তোমার রব নই? রূহ হতে উত্তর আসলো -‘আনতা আনা’ অর্থাৎ আমি তোমাকে চিনি না। এক হাজার বৎসর এভাবে কেটে গেলো। তারপর পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন ‘আল আস্তবে রাব্বিকুম’ – আমি কি তোমার রব নই? পুনরায় একই জবাব আসলো ‘আনতা আনা’। আবার পাঁচশত বৎসর পর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আল আস্তবে রাব্বিকুম?’ এবারও জবাব আসলো ‘আনতা আনা’। আল্লাহপাক ভাবলেন আমার সৃষ্টি আমাকে চিনে না। তাই তিনি চিন্তা করে দেখলেন, রূহানী খাদ্য কুদরতী বাতাস যদি বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে দেখা যাক কি উত্তর আসে। আল্লাহপাক তাই করলেন এবং সাথে সাথে জিজ্ঞাসা করলেন – ‘আল আস্তবে রাব্বিকুম?’ বাতাস বন্ধ করার সাথে সাথে রূহ নড়াচড়া দিয়ে উঠলেন এবং সাথে সাথে জবাব দিলেন ‘কালুবালা’ অর্থাৎ তুমিই আমার প্রভু (রব) সৃষ্টিকর্তা। আল্লাহপাক খুশি হয়ে রূহানীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর কুদরতী এক আয়না তৈরী করে তাঁর সামনে ধরলেন। আয়নায় নিজ রূপ দেখে পর পর পাঁচটি সেজদা দিলেন। এই পঞ্চ সেজদাই পাঁচ সালাত ও পাঁচ ইয়াকীন নামে পরিচিত [ রহস্যময় সৃষ্টি – ৫/৬ পৃষ্ঠা]।

‘তাওয়ারিখে মোহাম্মদী’ কিতাবের প্রথম খন্ডের ৪/৫ পৃষ্ঠায় রাবি আবদুল জলিল হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহপাক চার শাখাযুক্ত একটি বৃক্ষ তৈরী করে তার নাম রাখলেন ‘শাজারাতুল ইয়াকিন’ মানে বিশ্বাসের গাছ। সে গাছে নূরকে শ্বেত মুক্তা সদৃশ ময়ূরবেশে গঠন করে সত্তুর হাজার বৎসর বসিয়ে রাখলেন। পরে আল্লাহপাক শরমের এক আয়না সৃষ্টি করে (কারো মতে এরফানি আয়না ছিল) ময়ূরের সামনে ধরলেন। সে আয়নাতে ময়ূর নিজ রূপ দরশন করে ভয় পেলেন এবং তাতে সে নূর পাঁচটি সেজদা করলো। সে পাঁচ সেজদা হতেই পাঁচটি সালাত সৃষ্টি হয়েছিল। আর সে নূরের শরীর হতে যে ঘাম বের হয়েছিল তা হতে আঠার হাজার মাখলুকাত সৃষ্টি করেন। তাঁর মাথার ঘাম হতে ফেরেশেতা সৃষ্টি হলো। ‘কপালের’ ঘাম হতে আরশ, কুরশি, লওহ, কলম, চন্দ্র-সূর্য, বেহেশত- দোযখ, গ্রহ-নক্ষত্র, হিজাব সৃষ্টি হলো। ‘সিনার’ ঘাম হতে আম্বিয়া-আউলিয়া, আবেদ, শহীদ, ইমাম, সমস্ত ভালো তাতে সৃজন করলেন। ‘চেহারার ’ ঘাম হতে যতো নবীর উম্মত সৃষ্টি হলো। ‘কানের’ ঘাম হতে ইহুদি, নাসারা, মজুছীর জান তৈরী হলো। ‘বগলের’ ঘাম হতে জিন জাত শয়তান সৃষ্টি হলো। ‘দুপায়ের’ ঘাম হতে অবশিষ্ট সমস্ত কিছু সৃষ্টি হলো।

সে নূরের ‘নাভী’ হতে সাত ফোটা নূর ঝড়েছিল, তা হল আকল, ইলেম, ফাকা, হায়া, ছবর, মেহের এবং তৌহিদ নামক সাতটি দরিয়া পয়দা হয়েছিল। এরপর ময়ূরকে হুকুম করলেন সামনের দিকে তাকাতে। নূর সামনের দিকে তাকিয়ে এক উজ্জল নূর দেখতে পেলেন। আর চারদিকে চারটি নূর তাকে ঘিরে রয়েছে। এ চারটি নূরই হলো হাবিবে খোদা মোহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের পবিত্র আহলে বাইয়েত আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইন আলাইহিস সালাম। হযরত আদম আলাইহিস সালাম এ নূর পঞ্চক তথা পাক পাঞ্জাতনের উছিলাতেই মুক্তি পেয়েছিলেন। কোনো কোনো বাজে বর্ণনা হতে জানা যায়, ঐ চারজন ছিল আবু বকর, ওমর, ওসমান এবং আলী – তা মোটেও সঠিক নয়। নূর পঞ্চক বা পাক পাঞ্জাতন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে এ ধরনের বাজে বর্ণনা অনেক বই-পুস্তকে লিখে রেখেছে। ‘সহিহ’ কথাটি বইয়ের মলাটে লিখলেই সত্য বলে স্বীকার করা যায় না, যদি না তার আধ্যাত্মিক জ্ঞান বিশ্লেষণে সঠিকতার প্রমাণ না মিলে, কোরানের মুহকামাতের সাথে সামঞ্জস্য না হয়। কারণ আত্মার জ্ঞানই হলো ধর্ম জ্ঞান।

আত্মার জ্ঞান যখন নবুয়তে ওহী হয় তখন তা মুতাশাবেহাত হয়ে আসে তথা রূপক-প্রতীক হয়। রূপক-প্রতীকের অর্থ করতে আল্লাহপাক নিষেধ করছেন (সুরা ইমরান)। রূপক-প্রতীক দ্বারা কি বুঝানো হচ্ছে সেটা জানাই হলো কোরানের জ্ঞান লাভ করা বা ধর্ম জ্ঞান লাভ করা। সে জ্ঞান যার নেই তার দ্বারা ধর্ম কথা বলা মানেই ধর্ম বিকৃত করা। ধর্মজ্ঞান রয়েছে পরকাল প্রাপ্ত মানুষের নিকট বা প্রেরিত পুরুষের নিকট তথা ইনছানুল কামেলের নিকট। এটা মাদ্রাসায় খুঁজলে কোনো দিনই পাওয়া যাবে না, বরং মাদ্রাসার বিদ্যা বা ইলমুল কালাম সে ইলেমের সম্পূর্ণ বিপরীত। কোরানের মুতাশাবেহাত এবং তার মুহকামাত চিনলে সে ভেদ জানা যাবে। জানা দরকার ইলেম দু-প্রকার ( মেশকাত, আত তারগীব ওয়া তাহরীব -১ম খন্ড)। একটি ইলমুল লেছানী এবং অপরটি ইলমুল ক্বালবী। হযরত আবু হুরায়রার ভাষায় একটি সবাই জানে অপরটি যা গোপন, সিনার ইলেম তা প্রকাশ করলে তার গলা কাটা যাবে ( বোখারী শরীফ)। এ গোপন ইলেমটিই হলো ইলমে মারেফত বা আত্মার জ্ঞান তথা কোরানের জ্ঞান। এ জ্ঞানের অধিকারীগণই হলে গুরু বা পীর বা মুর্শিদ। এ ইলেম আল্লাহ পরিষদের ব্যক্তির বা পরকাল প্রাপ্ত মানুষের বা প্রেরিত পুরুষের সিনায় নাযিল হয় এবং সিনায়ই রক্ষিত থাকে। এ ইলেম আল জবরুতে যখন প্রকাশ হয় তখনই তা রূপক-প্রতীক হয়ে আসে। নবুয়তে ইহা ওহী এবং বেলায়েতে ইলমে লাদুন্নী বলে বিধৃত আছে। যার বেলায়তী ইলেম নেই ইলমে নবুয়তের ভেদ (যা রূপক-প্রতীক, আলংকারিক) তার বুঝা কখনো সম্ভব নয়। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম এবং আল্লাহর ওলী হযরত খিজির আলাইহিস সালামের ঘটনা হতে তার শিক্ষা নেয়া যেতে পারে।

ইমাম আবদুর রাজ্জাক [ইমাম বুখারী দাদা ওস্তাদ এবং ইমাম মালেকের সাগরিদ] তার ‘মোসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক’ নামক হাদিস গ্রন্থে সনদ ও সূত্র পরম্পরায় বিশিষ্ট সাহাবী হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন। হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু বলেন, আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপর আমার পিতা মাতা উৎসর্গীত হউক, আল্লাহ সর্বপ্রথম কোন্-বস্তু সৃষ্টি করেছেন? উত্তরে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বললেন, “হে জাবের, আল্লাহ তা’য়ালা সর্বপ্রথম আপন বা নিজ নূর হতে তোমার নবীর নূর পয়দা করেছেন।” তারপর আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী ঐ নূর পরিভ্রমন করতে লাগলো। ঐ সময় না ছিল লওহ মাহফুজ, না ছিল কলম, না ছিল বেহেশত-দোযখ, না ছিল আসমান-জমিন, সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ-নক্ষত্র, ছিল না জিন-ইনছান। তারপর আল্লাহপাক অন্যান্য বস্তু সৃষ্টির মনস্থ করলেন, তখন সেই নূর বারো ভাগে বিভক্ত করে সমস্ত কিছু সৃষ্টি করলেন।

উক্ত হাদিসটি পরবর্তীতে হাদিস বিশারদগণ নিজ নিজ কিতাবে সংকলিত করেছেন। যেমন, ইমাম কাস্তুলানীর রচিত নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের জীবনী গ্রন্থ ‘মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়ায়’ উক্ত হাদিসটি সংকলন করেছেন। মিশরের আল্লামা ইউসুফ নাব্হানী তার ‘আনোয়ারে মোহাম্মদী’ কিতাবে তুলে ধরেছেন। উক্ত হাদিসে ‘মিন নূরিহী’ শব্দটির ব্যাখ্যা মোল্লা আলী ক্বারী মিরকাত শরীফে লিখেছেন – ‘আয়-মিন লামআতে নূরিহী’ অর্থাৎ আল্লাহপাক স্বীয় জাতি নূরের জ্যোতি দিয়ে নবীজির নূর সৃষ্টি করেছেন। যোরকানী ‘মিন নূরিহী’ এ কথাটির ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘মিন নূরিন হুয়া জাতুহু’ অর্থাৎ আল্লাহর জাত বা সত্ত্বা হলো নূর। সেই জাতি নূরের জ্যোতি হতেই নূরে মোহাম্মদী পয়দা হয়েছে। আল্লাহ এবং নবী একই নূরের দুই রূপ। যে আল্লাহ এবং মোহাম্মদ একই নূরের বলে বিশ্বাস করে না, সে নিশ্চয়ই অন্ধ-মূর্খ-জাহেল এবং কাফের। হাজি ইমদাদুল্লাহ মোহাজের মক্কী চিশতী সাবেরীও বলছেন, আল্লাহ এবং মোহাম্মদ একই নূরে, এ কথা যারা বিশ্বাস করবে না তারা কাফের। এ কথা শুনে দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রধান ছয়জন ওহাবী মৌলবী যার তার মুরিদ ছিল তারা তাঁর বিরোধিতা করেছিল বিধায় তিনি তাদেরকে তাঁর তরিকা হতে খারিজ করে দিয়েছিলেন। সে খারেজী মুরতাদ মুরীদগণ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করলে তিনি তখন মক্কায় চলে গিয়েছিলেন। তাদের নামগুলো এ বইয়েই পাবেন বা ‘পরহেজগারীর আড়ালে ওরা কারা!!!’ বইটিতে দেখতে পাবেন। সেই খারেজীগণের গোলাবী ওহাবী (বর্ণচোরা) তরিকা আমাদের বাংলাদেশে বেশ ভালোভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে এবং মানুষকে খারেজী তরিকায় দাখেল করে পথভ্রষ্ট করে চলছে।

কবিতা – প্রথম দিনের সূর্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্ত্বার নূতন আবির্ভাবে,
কে তুমি?
মেলে নি উত্তর।
বৎসর বৎসর চলে গেল,
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল
পশ্চিম-সাগরতীরে,
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় –
কে তুমি?
পেল না উত্তর।

কবিতা – মানুষ

কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
‘পূজারী দুয়ার খোলো,
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে, পূজার সময় হ’ল!’
স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়,
দেবতার বরে আজ, রাজা-টাজা হ’য়ে যাবে নিশ্চয়!
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ’, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনি’ক সাত দিন!’
সহসা বন্ধ হ’ল মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে,
তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!
ভুখারী ফুকারি’ কয়,
‘ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!’
মসজিদে কাল শির্ণী আছিল, -অঢেল গোস্ত রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটি কুটি!
এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে আজারির চিন্,
বলে, ‘বাবা, আমি ভূখা-ফাঁকা আছি, আজ নিয়ে সাত দিন!’
তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা- ‘ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,
ভূখা আছ মর গে-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?
ভূখারী কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল-‘তা হলে শালা
সোজা পথ দেখ!’ গোস্ত রুটি নিয়া, মসজিদে দিল তালা!
ভুখারী ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে-
‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা ব’লে, বন্ধ করনি প্রভু।
তব মস্জিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী!’
কোথা চেঙ্গিস্, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের, যত তালা- দেওয়া-দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!
হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি’
ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি’ মরি’
ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ’ নাও জোর ক’রে কেড়ে-
যাহারা আনিল গ্রন্থ’- কেতাব, সেই মানুষেরে মেরে-
পূজিছে গ্রন্থ’ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ’;-গ্রন্থ’ আনেনি মানুষ কোনো।

সংগীত – থেকো মন স্বচেতনে

লেখক – দেওয়ান শাহ আব্দুর রশিদ চিশতী

থেকো মন স্বচেতনে, জ্ঞান নয়নে, ঘুমাইও না
ঘুমাইলে পড়বি ভুলে, হারাবি মূল ষোল আনা।

চৈতন্য মানুষ যারা, বেহুঁসে রয় না তারা
সদা দেয় রূপের পাহারা, সাধু যারা,
ও সে, দিব্য ঘরে বসত করে, ভগ্ন ঘরে বাস করে না।

যে থাকে ভগ্ন ঘরে, কারিগরে পেয়ে তারে
ভাঙ্গে গড়ে বারে বারে, দেয় যাতনা,
ঘরামী সে বাধ্য হলে, ঠিক রবে ঘর ষোল আনা।

করে মন তাড়াতাড়ি, কায়েমী কর বাড়ী
কত কাল থাকবি আর এই ছাড়া বাড়ী,
ও মন, সাদ্ধ সিদ্ধি যোগ বলে, ঘর কেন পাকা কর না।

রশিদ কয় বারে বারে, ঘরখানি পাকা করে
বসত কর সেই ঘরে, আর ভাঙবে না,
ছাড়া বাড়ী পলানে ঘর, সে ঘরে আর বাস কর না।

সংগীত – খোদা তোর হাজির নাজির

লেখক – হযরত খাজা দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী আল চিশতী নিজামী

খোদা তোর হাজির নাযির, জান মুসাফির, সদায় বর্তমান।
যে দেখেছে বর্তমানে, সে কি মানবে অনুমান?

যার হুকুমে কুল মাখলুকাত, এ সারে জাহান
পয়দা হল আগুন পানি, জমিনও আসমান।
স্বচক্ষে দেখতে তারে, এক নজরে, চায় না কেনো প্রাণ!

(এক) আল্লাহ আছে, এই বিশ্বাসে, আনিয়ে ঈমান
পড়ে মায়ার ভুলে, মহাজালে, হল দিন কাটান।
কেবল তাই ডাকাডাকি, হল ফাঁকি, বাকির খাতায় টান।

আকার ধরে সেজদা করে, যাবে জাহান্নাম
নীরাকারেও হয়না সেজদা, বলছে পাক কোরান
কামেলীন পীরের কাছে, বিধান আছে, জান তার সন্ধান ।

দয়াল কাদির চাঁন কয় রজ্জবরে তুই চোখ থাকিতে আন্ধা
জ্ঞান অস্ত্রে কাটলে না, চোখের আবরণ পর্দা।
মন তোর কাটলে পর্দা, খুলত ধান্ধা, দেখতি বর্তমান।

সংগীত – তুমি চাও যদি মানুষে

লেখক – হযরত খাজা ইয়ার আলম চিশতী নিজামী

চাও যদি মানুষে
ভক্তি রসের বাদাম দিয়া, যাওনা সরল দেশে।

মনা ভাই, সেই না দেশে যেতে যদি, মনে বাঞ্ছা করো
অনুরাগের বিষ খাইয়া, বাইচা যাইচা মরা মরো।
সেই না দেশের মানুষরে ভাই, মরা ভালোবাসে
জিন্দা মানুষ গেলে ধৈরা খায় মরা মানুষে।

মনা ভাই, ত্রিবেণীরও উজান বাকে, রাগ দেখা যায় পানি
ঘুর্ণিপাকে পইলে নৌকা, করবে টানাটানি।
নিরিখ বেন্ধে ধইরো শলা, সেই মানুষের আশে
তোর প্রেমের নৌকা টেনে নিবে, অনুরাগ বাতাসে।

মনা ভাই, সরল দেশের সরল মানুষ, সরল বেচাকেনা
গরল জিনিস সেই হাটেতে, কভূও বিকায় না।
মন মানুষ পবনে তথা ওজন করে বৈশে
তোলামাপা কম পড়িলে নেয় কিনা বাতাসে।

মনা ভাই, গুরুবস্তু কবচ কৈরে, সঙ্গে যদি রাখো
ঝড় তুফানের থাকবে না ভয়, সদায় মনে রেখ।
ইয়ার আলম সেই ভয়েতে, নয়ন জলে ভাসে
হালচালা সব ছেড়ে দিছে, নেয় কিনা বাতাসে।

অনুবাদ – ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র, ৩য় ও ৪র্থ পর্ব

মূল – এলিফ শাফাক হতে
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী

পর্ব ০৫
প্রভু তো প্রতিনিয়ত কথা বলে। তোমাকে তার শাশ্বত প্রেমের অমরলোকে ডেকে চলে অবিরত। শুনতে পাওনা? কিভাবে শুনবে, হৃদয়ে যদি রয় এতো কোলাহল?

বাহির তো কেবল বাহির-ই দেখে। প্রেমের উপযুক্ত হতে হলে দেখতে শেখো ভিতর। অনুভব করতে শেখো শুণ্যতা এবং শুনতে শেখো নীরবতার ডাক। তোমার বাহ্যিক আচরণ, বাহ্যিক কথা, ভাষা, সর্বোপরি তোমার বাহিরের এতোকিছু, সে অনন্ত প্রেমের অনুভূতিতে পৌঁছতে পারে না। প্রেমের অনুভব কখনো মুখে উচ্চারণ করা যায় না, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, সে তো শুধু উপলব্ধি! এক অনন্ত শুণ্যতা, অপার বিশালতা, যা কোনো সীমায় আবদ্ধ নয়!

প্রবেশ করো মহিমান্বিত প্রেমের রাজ্যে। দু’চোখ বন্ধ করে খুলে নাও অন্য দৃষ্টি। সকল ভাষা ভুলে কথা বলো অনন্তের ভাষায়। শাশ্বত প্রেমকে ধারণ করো তোমার নির্বিকার নিত্যতায়। সেখানে সব অচল। চালু থাকুক কেবল তোমার অনুভূতি, প্রেম, আনন্দ আর আনন্দ।

প্রেম কথা বলে নীরবতার ভাষায়, নির্লিপ্ততার আবহে, নির্বিকারত্বের আকারে। নীরব হয়ে যাও। তবেই প্রেম কথা বলে উঠবে।

নীরবতাই সকল কিছুকে আঁকড়ে রাখে!

পর্ব ০৬
আপনত্ব থেকে বিসর্জন দিতে হবে বাদবাকী অস্তিত্বসমুহকে। নির্ভেজাল অস্তিত্বের মাঝেই বিরাজ করে মহান ঈশ্বর। নিঃসঙ্গতার অনুভব মানেই সঙ্গের অভাববোধ। তাই ঈশ্বরানুভূতির সবচেয়ে সুন্দর উপায় হচ্ছে নির্জনতা। যেখানে শুধুই তুমি আর তোমার অন্তরতমস্ত, সেখানে আর কেউ কথা না বলুক। না থাকুক কোনো পক্ষ-প্রতিপক্ষ, না থাকুক কোনো শব্দ। শুধুই নির্জনতা।

একা হয়ে ডুবে যাও ঈশ্বর সন্দর্শনে। যদি থেকে থাকে তোমার সাথে অন্য অন্য অস্তিত্বসমুহ বা অস্তিত্বের প্রতিক্রিয়া, তবে নিশ্চিতই হারাবে তাকে। সে ভালোবাসার এক অনন্য মহিমা। শুধু একাগ্রতা ও হৃদয়ের শতভাগ অনুরাগ প্রচেষ্টার দ্বারাই তাকে ধরা যায়।

খুঁজে নাও তাকে যে তোমার প্রভু দর্শনের দর্পন। যার চেহারায় দেখতে পাবে খোদাকে। স্বয়ং যিনি প্রভুপ্রেমের আধাঁর। তবেই পাবে তাকে। সে আধেয় সদা বিরাজে ভালোবাসার মানমন্দিরে, পবিত্রাত্মায়, যাকে তুমি ভালোবাসো, তোমার সেই প্রেমের আধাঁরে।

ডুবে যাও নির্জনতায়, নিঃশব্দতায়। অনুভূতিতে। ভালোবাসায়।

তোমার ভালোবাসাতেই প্রকাশিত হবে তোমার প্রভু।

সম্পাদকীয় – নিত্যময়তার প্রকাশ

লাবিব মাহফুজ চিশতী

অনন্ত অখন্ড ইচ্ছাশক্তিতে মহান জাতপাক নিত্যময়তার প্রকাশ অভিলাষে স্বয়ং নিয়ত প্রকাশিত ও বিকশিত হয়ে চলেছে শাশ্বত জগতের পলে পলে। অর্থাৎ সৃষ্টি স্বতঃপ্রাপ্ত অবিনশ্বর সত্ত্বার স্বপ্রবৃত্ত বহিঃপ্রকাশ ও সত্ত্বা পরিব্যাপ্ত। অনন্ত সৌন্দর্যের আঁধার জাত কদিম তাঁর শব্দ, স্পর্শ, রুপ, রস, গন্ধে সদা মোহিত রাখে সমগ্র সৃষ্টিকে। আহাদ তত্ত্বের অভেদ জ্ঞানে সকল কিছুকে একত্বের চাদরে মুড়িয়ে তিনি স্বয়ং বয়ে চলেছেন মহাকালে, বস্তু ও গুণশক্তির অমোঘ কার্যকারণের নিয়মে।

অনন্ত চৈতন্যের স্বতঃপ্রকাশরূপ এ ধরায় কোথাও দ্বিতীয় কোনো সত্ত্বার অবস্থিতি নেই। নেই কোনো অসৎ স্বভাব বা সংকীর্ণ অহং বোধের কোনো অস্তিত্ব। মানবীয় গুণ তথা প্রভুগুণ হারিয়ে মানুষ যখন দাখিল হয় পশুত্বে, বিচ্যুত হয় নিত্যময়তা থেকে, আচ্ছন্ন হয় অজ্ঞানতায়, তখনই সে ভোগ করে নরক যন্ত্রণা। অর্থাৎ সে বন্দী হয় এক একটি ক্ষুদ্র আমিত্বে বা অজ্ঞান আমিত্বের মাঝে। হারিয়ে ফেলে নিজেকে।

জ্ঞান আমিত্বের জাগরণ তথা নিত্যসত্ত্বায় চিরসমাধিপ্রাপ্তি বা নির্বাণ লাভের বাসনায় মানুষটি আবার ফিরে যেতে পারে পূর্বধামে, নিত্যের দেশে। নিত্যসত্ত্বায় বা মুক্ত সত্ত্বায় অবস্থিত ব্যক্তিটিই মুক্ত।

আহাদ স্বরূপধারী মহাপ্রভু পঞ্চ উপাদান সমন্বিত মানবদেহ নৌকা নিয়ে মুক্তির বারতা হাতে ডেকে ফিরছেন পতিতদের। জানিয়ে দিচ্ছেন আপন খবর। মুক্তির খবর। নিজেকে ফিরে পাওয়ার বার্তা। বাতলে দিচ্ছেন শাশ্বত অমর লোক প্রাপ্ত হওয়ার উপায়। প্রভুগুরু সকলের সহায় হোক।

তরিকতের বাণী সংকলন

1.
তোমার অন্তরকে সংশোধিত ও পরিশুদ্ধ করো, অবশ্যই প্রতি নিঃশ্বাসে তোমার সাথে আল্লাহর সাক্ষাৎ ঘটবে।
– হযরত বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র.)

2.
সম্মুখে যাহাকে দেখিবে তাহাকেই তোমার চাইতে উত্তম মনে করার নামই প্রকৃত বিনয়।
– হযরত খাজা ওসমান হারুনী (র.)

3.
শত জ্ঞানী ও বিদ্বানের সমস্ত জীবনের পাপ-পূণ্যের হিসাব হাশরের দিন এক নিঃশ্বাসে শেষ হইবে, প্রেমিকের এক পলকের নেকী বদীর হিসাব শত হাশরেও শেষ হইবে না।
– হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র.)

4.
আমার বুকের মধ্যে আমার মুর্শিদের আলোয় ভরপুর। আমি আমার মুর্শিদেরই পূজা করি। আমার মন আমার মুর্শিদেরই ঘর।
হযরত বু – আলী শাহ্ কলন্দর (র.)

5.
ওহে দয়াময়! আমি আর বিরহ চাই না। আমাকে তোমার মিলনের জন্য মনোনীত করো। আমি তোমার চিরন্তন বন্ধনে মিশে যেতে চাই।
– কবি হাফিজ সিরাজী (র.)

6.
হে প্রভূ! জান্নাত আর জাহান্নামের অস্তিত্ব না থাকলে দেখা যেত তোমার ইবাদতকারীর সংখ্যা কত!
– হযরত আবুল হাসান খেরকানী (র.)

7.
আল্লাহর দিকে মুখ করা হয় না ততক্ষন, যতক্ষন না অন্যান্য সকল দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আনা হয়।
– ইমাম গাজ্জালী (র.)

8.
সবচাইতে বেশি সৌন্দর্য রয়েছে উত্তম আচরণের মাঝে। যার আচরণ সুন্দর নয়, তার কোনো সৌন্দর্যই নেই।
– মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান (র.)

9.
প্রভ স্মরণে লিপ্ত যারা তারা ইহকাল পরকাল সব ভুলে যায়, তারাই প্রভুর দিদার লাভ করে।
– হযরত মনসুর হাল্লাজ (র.)

10.
নিজের সত্ত্বা ভুলতে পারলে, তবেই প্রভুর সাথে মিলিত হওয়া যায়।
– খাজা শেখ ফরিদ (র)

11.
ধ্যান হলো হৃদয়ের বাতি। এটি নিভে গেলে হৃদয়ে আর আলো থাকে না।
– ইবনে আতাউল্লাহ (র.)

12.
যারা আদম কাবায় সেজদা করছে তারা আল্লাহর বান্দা। তাদের সেজদাই কবুল হচ্ছে।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

13.
গুরু প্রেমে সর্বত্যাগী হও। এমনকি ত্যাগ করো নিজের অস্তিত্বকেও। তবেই তুমি হবে আত্মজয়ী তথা সর্বজয়ী।
– হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী

14.
মানব সুরততে অটল রাখতে হলে নফসানীয়াত খায়েশকে দৃঢ়তার সাথে দমন করো।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

15.
দেখবি যদি সাঁই নিরাঞ্জন, মুর্শিদ রূপ ভজে করো অন্বেষণ।
– লালন শাহ ফকির।

16.
মানুষ থুইয়া খোদা ভজো, এ মন্ত্রণা কে দিয়েছে
মানুষ ভজো কোরান খুঁজো, পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে।
– জালাল উদ্দিন খাঁ

17.
শুদ্ধ জ্ঞান এবং শুদ্ধ প্রেম একই জিনিস। জ্ঞান আর প্রেমের মাধ্যেমেই লক্ষ্যকে পূরণ করা যেতে পারে। তবে এখানে, প্রেম নামক রাস্তাটি বেশি সহজ।
– ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।

18.
হে নবী বলে দিন, নবুয়্যতের বিনিময়ে তোমাদের কাছে আমার আহলে বাইয়াতের প্রতি ভালোবাসা ব্যতীত কিছু চাই না।
– আল কোরআন, শুরা ২৩

19.
একশত বৎসর নির্জন ইবাদত হতেও ছামা বা গানে বেশি ফল লাভ হয়।
– খাজা নাসিরউদ্দিন আবু ইউসুফ চিশতী

20.
আমার মাঝে আমি থাকলে পরম আসে না। আর আমার মাঝে আমি না থাকলে আমি সবার তীর্থস্থানে পরিণত হই।
– হযরত আমীর খসরু রহ.

মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৩য় সংখ্যা, মার্চ ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

Others Post

আপন খবর - Apon Khobor

লাবিব মাহফুজ চিশতী
ফেসবুক পেজ
ইউটিউব
হোয়াটসএপ গ্রুপ
টেলিগ্রাম গ্রুপ