মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৪র্থ সংখ্যা, এপ্রিল ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত
প্রবন্ধ – যাদের কোনো ধর্ম নেই
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
আল্লাহপাক বলেন, “ফাকতুলু আনফুসাকুম জালিকা খাইরুল্লাহকুম ইন্কুন্তুম তা’লামুন” অর্থাৎ- অতএব তোমাদের নফসকে কতল করো, ইহাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা জ্ঞানী হয়ে থাকো। এ কথা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম এবং অন্যান্য মহাপুরুষগণও বলছেন। কাজেই কোরানের নির্দেশ হলো মানুষকে ঐক্যতায় নিয়ে আসা। নির্বোধগণ বুঝেছে অন্য ধর্মের (প্রচলিত ধর্ম) মানুষের গলায় ছুরি চালানো এবং এ ভাবেই শুরু হয় একে অন্যকে আক্রমণ করার নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা। আক্রান্ত না হলে আক্রমণ করা দ্বীন-এ-মুহাম্মদীর পরিপন্থী। ‘আসলে নফসে আম্মারায় আক্রান্ত ব্যক্তিই বে-দ্বীন, তার কোনো ধর্ম নেই।’ যদি না সংশোধনের কোনো চেষ্টা থাকে। সংশোধনের চেষ্টায় রতো ব্যক্তিগণকে পর্যায়ক্রমে আমানু, মুত্তাকিন বলা হয়েছে কোরানে। নিজের দেহের মধ্যে কাফেরের ঘাঁটি, আর মানুষ হত্যা করে কাফের নিধনের ফতোয়ার কাঁদা ছুড়াছুড়ি করছে অন্ধ-বধির আলেম-মোল্লাগণ। চটকদার বেশ-ভূষণের আড়ালেই বাস করছে কাফের শয়তান, অথচ এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হতে তারা বেখবর।
“মানবাত্মার গুণ-খাছিয়ত অর্জন করাই হলো মানবধর্ম বা আল্লাহর দ্বীন মানে দ্বীন-এ-মুহাম্মদী বা ইসলাম।”
খাঁটি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান আর মুসলমানের মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই- সমস্ত মহাপুরুষগণ এ কথাই মানুষকে বুঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু ধর্মচোরারা যুগে যুগে তা বিকৃত করেছে, স্বীয় ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করছে, ফলে ধর্মের নামে শত-সহস্র মতান্তর, মতভেদ এবং দ্বন্দ্ব-বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। কোরানুল কারিমে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, “ইন্নাছ্ছালাতা তানহা আনিল ফাহশাই ওয়াল মুনকার” অর্থাৎ নিশ্চয়ই ছালাত সমস্ত অশ্লীল কর্ম হতে (মুছল্লিকে) বিরত রাখে। কই, সাড়ে পনেরো আনা’ইতো অসৎ কর্মে লিপ্ত, অধিকাংশ ইমাম সাহেবেগণও তো পিছিয়ে নেই, বরং তারা প্রতিযোগিতায় নেমে আছে। তবে কি আল্লাহর বাণী ভূল, না ছালাত হয়নি ? আসলে ছালাত আদায়ই হয়নি এবং তার অর্থও বুঝেছে আক্ষরিক বা মুতাশাবেহাত, মুহকামাত বুঝেনি। “ছালাত” শব্দটি বহু অর্থবোধক শব্দ। স্বভাবের কু-প্রবৃত্তি ছেড়ে সুপ্রবৃত্তির দিকে ধাবিত হওয়া ছালাত এবং তাতে কামিয়াবী হওয়া ছালাত, প্রেমাগ্নি জাগ্রত করা ছালাত, নিজেকে অণু অণু করে বিশ্লেষণ করে দেখার নাম ছালাত, মানুষ এবং অন্যান্য জীবের মঙ্গল করা এবং মঙ্গল কামনা করাও ছালাত, ছালাত মানে দেখা ইত্যাদি। ছালাতের মূল মর্ম হলো খোদাকে দেখা। যিনি খোদাকে দেখেন তার ছালাতই হলো কোরানিক ছালাত-ছালাতুল মেরাজ।
তাহলে দেখা যাবে ছালাত সমস্ত মন্দ কর্ম হতে অবশ্যই মুছল্লিকে দূরে রাখবে। শুধু আনুষ্ঠানিক ছালাত, সিয়াম বা অন্যান্যতে তো তা হবে না। যারা আত্মশুদ্ধির ক্রিয়া ছেড়ে শুধু বাহ্যিক আনুষ্ঠানিক উপাসনাতে রতো থাকে, আর ভেড়ার দলের মতো মসজিদ, মন্দির, গির্জায় দৌঁড়াতে থাকে, তাদের দ্বারাই ঘটে ধর্মের নামে অধর্মের ক্রিয়া-কর্ম। আসলে এরা উপাসনার নামে স্রষ্টার সঙ্গে উপহাস করে থাকে এবং তাদের দ্বারাই পৃথিবীতে সরবে বা নিরবে জঘন্য কাজকর্ম সংঘটিত হতে থাকে। সত্যি বলতে কি আমরা যারা আনুষ্ঠানিক ছালাতগুলো আদায় করছি ঘরে বা মসজিদে, তাদের মধ্যে সাড়ে নিরানব্বই জনেরই কেবলার দিকে মুখ নেই, যাকে আমরা ইমাম বলছি সেও কেবলা তো দূরের কথা মসজিদেই নেই। কে যে কোথায় চলে গিয়েছে তারইতো ঠিক ঠিকানা নেই, ছালাত আদায় হবে কি করে! যেহেতু খোদা চেনা হয়নি সেহেতু মুছুল্লি এবং ইমামের এ দশা হয়েছে। আর হাকিকি ছালাত আদায় করতে হলে হাকিকি কাবাও চেনা দরকার। কারণ, হাকিকি ছালাত হাকিকি কাবাতে আদায় করতে হয়। যারা হাকিকি কাবাতে মোতাওয়াজ্জা করেছে তারাই মনের শিরক থেকে মুক্ত হয়েছে বা মুক্ত হওয়ার সাধনা করছে। আর মনের মাঝে খোদা ভিন্ন অন্য যে সুরত এসে উদয় হবে তা-ই হবে খোদার শরিক। জ্ঞানীগণ কাবা দর্শন না করা পর্যন্ত ছালাতের নিয়ত বাঁধেন না।
হযরত ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলাইহি একবার নামাজে দাঁড়িয়ে তেত্রিশবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলে নামাজের নিয়ত বাঁধেন আবার ছেড়ে দেন। চৌত্রিশবারে গিয়ে নিয়ত বেঁধে নামাজ আরম্ভ করেন। নামাজ শেষে মুছুল্লিগণ জিজ্ঞাসা করলো হুজুর এতোবার আপনি নামাজের তাকবির দিলেন কেনো ? তিনি বললেন, দেখো, আমি কাবাকে না দেখা পর্যন্ত নামাজ আরম্ভ করতে পারিনা ! চৌত্রিশবারে গিয়ে কাবা আমার সামনে এলো আর আমি তখনই নামাজের নিয়ত বেঁধে ফেলি। এ কাবাটি কি ছিলো জানা দরকার নয় কি? তবে ইহা মেজাজি কাবা অবশ্যই নয়, ইহা ছিল কাবার হাকিকত বা হাকিকি কাবা। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাগণের জীবন-পদ্ধতি লক্ষ্য করলেই বুঝা যাবে যে, তাঁরা আত্মশুদ্ধির ক্রিয়ায় কতো উচ্চে আরোহণ করেছিলেন। ছালাত এমন একটি কর্ম যা সমস্ত মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য কর্ম। সবাই নয়, অধিকাংশই রাছুলের আদর্শ ধরে রাখতে পারেনি। “সাহেব” হতে সাহাবী মানে আমার আত্মা। রাছুলকে এবং তাঁর আহলে বাইয়্যেতকে যারা প্রাণের চেয়ে বেশী মহব্বত করেছিলেন এবং তাঁর আদর্শকে আমৃত্যু ধারণ করেছিলেন তাঁরাই হলেন সাহাবী। সবাই কলেমা পড়লেও সবাই সাহাবী হতে পারেনি।
পাঁচ বস্তুর গড়া মানুষের মাঝে শয়তান “খান্নাছ” নামে অবস্থান করছে। আগুন বস্তুর গুণ-খাছিয়তই হলো খান্নাছ। সে মানুষের মধ্যে হতেই অসৎ চিন্তা ও কর্মের উৎপত্তি করে মানুষকে অন্যায়, অবৈধ কর্মে লিপ্ত করে রাখে। সেই অন্যায় কাজটি দু’ভাগে বিভক্ত- একটি জাহেরী বা মেজাজি এবং বাতেনী বা হাকিকি। জাহেরী বা মেজাজি অন্যায় কাজটি ইহলোকের আর হাকিকি অন্যায়টি পরলোকের জন্য সাব্যস্ত আছে। হাকিকি অন্যায় বা পাপটি মানব সুরতকে কেয়ামতের করালগ্রাসে নিক্ষেপ করে সিরাতানুসারে সুরত সৃষ্টি করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। খান্নাছ বাহির হতে আলাদা কোনো রূপ ধরে এ সমস্ত করে না। তার উপর বিজয়ী হলেই মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করে, আর স্বাধীন হওয়াই হলো মুসলমানের পরিচয়। এ কথাটি তথাকথিত ধর্মান্ধ গোঁড়ারা বুঝতে পারলে মানুষ ও মানবধর্ম রক্ষা পেতো এবং পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতো। রাছুল করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন, “সৎ স্বভাবই ইসলাম”। ইহাই পূণ্য, ইহাই ঈমান। তিনি আরো বলেছেন, “কালা রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম ইননামা বুইছতু লিউতাম্মিমা মা কারিমাল আখলাক” অর্থাৎ রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন ঃ নিশ্চয়ই আমি প্রেরিত হয়েছি মানুষের উৎকৃষ্ট গুণগুলো ফুটিয়ে তোলার জন্য। আল্লাহর গুণে গুণান্বি^ত হওয়ার কথাও বহুবার বলা হয়েছে কোরানুল কারিমের মাঝে।
“আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হওয়াই দ্বীন-এ-মুহাম্মদী অর্জন করা এবং আল্লাহর দ্বীন অর্জন হলেই মুক্তি নিশ্চিত।”
আল্লাহ স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, “ক্বাদ আফলাহা মান যাক্কাহ” অর্থাৎ যে ইহাকে (দীলকে) পরিশুদ্ধ করেছে সে মুক্তি পেয়েছে। এ কথা সার্বজনীন কথা বিধায় হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম সমস্ত মানবজাতির মুক্তির জন্য এসেছেন বলে প্রমাণিত হয়। সমস্ত মহাপুরুষগণ এ কথাই বিভিন্ন আঙ্গিকে বলছেন। সৎস্বভাব যোগে চৈতন্যাবস্থাই ইসলাম তথা মানবধর্ম, সমস্ত মহাপুরুষগণের ধর্মও ইহাই এবং এ ধর্ম আদি হতেই প্রচলিত আছে এবং থাকবে। ধর্ম আর মানুষকে যারা অভেদ জ্ঞানে না দেখে প্রভেদ জ্ঞানে দেখে তাদের ধর্ম জানোয়ারের ধর্ম। কারণ, মানবাত্মার অধিকারী হওয়াই ধার্মিক হওয়া। আর ধর্ম ধার্মিকে সুরতেই আছে অভেদ অস্থায়। দয়া, মায়া, প্রেম, ভালোবাসা তথা সমস্ত সৎগুণাবলীর সমষ্টিই হলো ইনছানিয়াত যা মানবধর্ম হতে প্রকাশিত। এ ধর্ম দ্বারা মানব জাতিকে এক দৃষ্ট হয়। এ ধর্ম দ্বারা মানব সমাজ ও অন্যান্য জীবের কল্যাণ সাধিত হয় এবং স্রষ্টার সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হয়। তারাই মহাপুরুষ, যারা আল্লাহর দ্বীন অর্জন করেছে এবং তাকে চিনে তাতে সংলীন হয়ে আছেন। তাদের পথ ও মতকে বিনয়ের সাথে অনুসরণ করাই হলো ধর্মপথ অবলম্বন করা। কোরানে তাদেরকে “আমানু” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ছালাত, সিয়াম করে, মন্ত্র পাঠ করে, জপমালা জপে, নিয়ম মোতাবেক মসজিদ, মন্দির, গির্জায় গিয়ে যারা অন্যের অমঙ্গল কামনা করে তথা অনিষ্টের চিন্তা করে তাদের কোনো ধর্ম নেই। এ ধর্মান্ধ গোঁড়াদের উপাসনা এক প্রকার হঠকারীতা ব্যতীত নয়। এরাই ধর্মকে বিকৃত করে প্রচার করে, চারি দেয়ালে আবদ্ধ করে ফেরকাবাজি, ফতোয়াবাজি করে মানুষ হত্যার ক্ষেত্র তৈরী করে। যারা সত্যিকার ভাবে স্বধর্মে নিষ্ঠ, তাদের উদার বিশ্ব-প্রেম আপন হতেই জেগে উঠে। ধর্মের নামে ছোঁয়া-ছুয়ি, ধোঁয়া-ধূয়ি, নিচ ব্যবহার ইত্যাদি সবই হলো বকধার্মিক আর বিড়াল তপস্বীদের ক্রিয়া-কর্ম। আসলে যে নিজ ধর্মকে সত্য বলে জানে, ভালোবাসে অবশ্যই সে বিশ্বের সকল মানুষকে ভালোবাসে। ধর্মের নামে বেশ-ভূষণের বা বাহিরের যে ঘটাটা তা কেবল অন্তরের দীনতা-হীনতা ঢাকবার ব্যর্থ প্রয়াস মাত্র। আলমে নাছুত হতে বের হতে না পারলে যে সবই বিফল এ কথা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। যাকে বলি পরম-সত্য, সেই পরম সত্যটি চিরন্তন-শাশ্বত, হাইউল-কাইয়্যুম।
আরো জানা দরকার সেই পরম সত্য কিন্তু নহে হিন্দু, নহে মুসলমান, নহে খ্রিষ্টান বা বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ, শুদ্র, কায়স্থ। আসলে মানুষই চিরসত্য, নিত্য, চিরন্তন-শাশ্বত। যারা ধর্ম বলতে বেশ-ভূষণ আর ধর্মের নামে নিছক কিছু আনুষ্ঠানিকতার ঘটা বুঝে এবং বুঝায় তাদেরই প্রতিহিংসার এবং গোড়ামীর আক্রমণে আক্রান্ত হয়েছে যুগে যুগে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় দিকগুলো এবং জ্ঞানীগণ। এবং ঐ সমস্ত অন্ধ-বধির-গোঁড়াদের কারণে বহু মহাপুরুষগণকেও অত্যাচার-নির্যাতন, দেশ ত্যাগ এবং হত্যার শিকার হতে হয়েছে। আর মানুষকে এভাবে পথভ্রষ্ট করে চলেছে। একদল আলেম-মোল্লা আছে তারা ইসলামকে হেফাজত করার অজুহাতে তাদের কুৎসিত ব্যক্তিস্বার্থ আদায়ের ধান্ধায় চিৎকার করে ফিরছে। এই ধর্মান্ধদের হুঁশ থাকা উচিত যে, যাকে বলে ইসলাম তথা মানবাত্মার সার্বজনীন মানবধর্ম তা আঠার হাজার মাখলুকাতের বাহিরে স্থিত আছে। সেই মানবাত্মার মানবধর্ম বা দ্বীন-এ-মুহাম্মদীকে পৃথিবীর কোনো মানুষ কোনো দিনই বিকৃত করতে পারবে না। কারণ, তা আল্লাহর হেফাজতে আছে। আল্লাহর হেফাজতে আছে কোরানও, তাও কোনো মানুষ কোনো দিন বিকৃত করতে পারবে না। আর আলেম-মোল্লারা সেই চিরন্তন-শাশ্বত, কদিম কোরানকে চেনেও না এবং পাঠ করতেও জানে না। ইসলামের পঞ্চ বিধান ছালাত, সিয়াম, যাকাত, হজ্জ্ এবং কালেমা হলো ইসলামে পৌঁছার পথ। এ পথে ধাবিত হয়ে আঠার হাজার মাখলুকাতের গুণ-খাছিয়ত বা তিন জমাত বা তিন দায়রা অতিক্রম করে ইনছানিয়াতে অধিষ্ঠিত হলেই ইসলাম লাভ করা যায়। এ পথে উরূজের জন্যই পঞ্চ বিধান জারি আছে।
ইসলাম হলো পারলৌকিক বিষয় এবং মুক্ত-স্বাধীন চৈতন্যের জগত। ইসলামের মধ্যে যারা পরিপূর্ণভাবে অধিষ্ঠিত হয়েছে তারাই মুমিন বা অলি-আউলিয়া। মুমিন বা অলি-আউলিয়া আর আলেম-মোল্লাদের বিরোধ চিরকাল। মুমিনগণ মুক্ত, স্বাধীন, সর্বদা চৈতন্যে কায়েম আছেন। যারা ইসলামকে ধারণ করেছে তারাই ইহলোকের মানুষের মাঝে ঐক্যতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইসলামের সামাজিক বিধান তৈরী করে মানুষকে সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করতে এবং পরস্পর প্রেম-মহব্বত, ঐক্যতায় এসে বাস করার বিধান তৈরী করে থাকে, যাতে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শান্তি-শৃঙ্খলা, পরস্পর ভ্রাতৃত্ব-সৌহার্দ্যভাব বজায় থাকে। এ পথ হতে যে সত্ত্বাটি মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে তা হলো খান্নাছ। সেজন্যই বলা যায় তথাকথিত আলেম-মোল্লাদের মধ্যে ইসলাম ধর্মকে লাভ করার কোনো শিক্ষাই নেই, অথচ ইসলাম হেফাজত করার জন্য চিৎকার করছে। আসলে এ সমস্ত ধর্মান্ধরা ইসলাম কি জিনিস তা বুঝেইনি। শুধু খোলসটি নিয়ে দৌঁড়ঝাপ দিচ্ছে আর চিৎকার করছে। এক বন্ধু বললো, ভাই গতকাল তোমার ভাবি ডেলিভারীতে মারা গেছে। অপর বন্ধুটি বললো, ভাই এ রোগটি আসলেই খুব ভয়ংকর। কারণ, গত বৎসর ডেলিভারী রোগে আমার বাবাও মারা গেছেন।
মোল্লা-মৌলবীদের ইসলামের ব্যাখ্যাটি এ রকমই। কোথায় সার্বজনীন দ্বীন-এ-মুহাম্মদী বা ইসলাম আর কোথায় মোল্লাতন্ত্রের ইসলাম। ইসলাম কি জিনিস তা না বুঝেই হেফাজত করতে লেজ তুলে দৌড়াচ্ছে, আর অন্যান্য ধর্মান্ধ গোঁড়ারাও পিছনে পিছনে লেজ তুলে দৌড়াচ্ছে। মানে জমিনে থেকে আসমানের চাঁদ হেফাজত করতে চাচ্ছে। আসলে এরা যা হেফাজত করতে চাচ্ছে তা হচ্ছে তাদের দাঁড়ী, টুপি, জুব্বা, পাগড়ী আর ব্যক্তিস্বার্থের কিছু মতবাদ ইত্যাদির। মোল্লাতন্ত্রের ইসলাম- যার প্রবর্তক হলো ইয়াজিদ মোল্লা। এ ধরনের ইসলামের হেফাজতের দাবী ইয়াজিদ মোল্লাও করেছিলো এবং অধিকাংশ মানুষকে সে বুঝাতেও পেরেছিলো যে সে-ই সত্যপথে বা ইসলামের পথে আছে, হযরত ইমাম হুসাইন আলায়হিস সালামই ভুল পথে আছে। হযরত ইমাম হুসাইন আলায়হিস সালামকে রাষ্ট্রদ্রোহী সাব্যস্ত করে ৩৫০জন ইয়াজিদের আলেম-মোল্লারা তাঁকে হত্যা করা জায়েজ বলে ফতোয়া দিয়েছিলো। সে ফতোয়া শীমার তার পাগড়ীর নিচে নিয়েই ইমাম হুসাইন আলায়হিস সালামের শীর কেটেছিলো। এখনো সাধারণ মানুষকে ইয়াজিদপন্থী আলেম-মোল্লারা বুঝাতে পেরেছে যে, তারাই সঠিক পথে আছে। যদিও এ ইসলামের সূত্রপাত নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের ওফাতের কিছুদিন পূর্ব হতেই শুরু হয়েছিলো একদল সাহাবী নামধারীদের দ্বারা। আর কারাবালার পর হতে ইয়াজিদ মোল্লা আর তার অনুসারীদের দ্বারা প্রচলন ঘটে তা পূর্ণরূপে। কোরানের রূপক-প্রতীক বা কাঠামো তাশাবাহার অনুসারী ইয়াজিদ এবং ইয়াজিদপন্থী আলেম-মোল্লাদের ষড়যন্ত্রে বাইয়্যেনাত-মুহকামাত জ্ঞানগর্ভ আয়াত জানা ইমাম হুসাইন আলায়হিস সালামকে শহীদ করে ইয়াজিদের মতবাদকে ইসলাম বলে প্রচার করার জন্য মসজিদে মসজিদে তাবলিগ শুরু করে।
ফলে ইয়াজিদের মতবাদ, তথা –
(১) অন্ধ অনুমানে আল্লাহকে এক জেনে অদৃশ্য আল্লাহর ইবাদতের প্রবর্তন করা- যা ছিলো আজাজিলের মতবাদ,
(২) তাশাবাহা বা রূপক-কাঠামো বা আক্ষরিক অর্থ দিয়ে কোরানের তাফসির করা এবং কোরান পাঠ করা এবং কাগজের কোরানই হলো আল্লাহর তরফের নাজিল কোরান- এ ধারণা প্রচার করা,
(৩) বায়াত না হয়ে তথা পীর-মুর্শিদের নিকট না গিয়ে কোরান-হাদিসের আক্ষরিক মতে চললেই আল্লাহ খুশী হবেন, জান্নাতে যেতে পারবে,
(৪) শুধু আনুষ্ঠানিক নামাজ-রোজা-হজ্জ, যাকাত, মৌখিক কালেমা পাঠই ধর্মকর্ম,
(৫) আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান না এনে বাপ-দাদার গতানুগতিক ধারায় ধর্ম বিশ্বাসের প্রবর্তন করা।
(৬) অলি-আউলিয়াকে এবং তাদের ক্রিয়া-কর্মকে অস্বীকার করা ইত্যাদি প্রথা প্রবর্তন করা হলো।
সেই হতে জানা বা অজানা সত্ত্বেও ইয়াজিদের মত তারা ইসলাম বলে চালিয়ে আসছে এবং তার শিক্ষার জন্য শত-সহস্র মাদ্রাসা তৈরী করে চলছে। অথচ ইসলাম আছে আল্লাহর হেফাজতে, পৃথিবীর কোনো মানুষই তা বিকৃত করতে পারবে না। যা পারবে তা হলো ইসলামের সামাজিক বিধান। আর ইসলামের সামাজিক বিধান বিকৃত করছে অন্ধ-বধির আলেম-মোল্লারাই। এর মূল কারণ, এরা সত্যকে লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে, বিধায় শত মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে তাদের মধ্যে। যা যুগে যুগে যুগোন্নতির তাগিদে মানুষের সামাজিক কল্যানে নবুয়তের ভাষায় নবী-রাছুল এবং বেলায়েতের ভাষায় অলি-আউলিয়াগণ প্রয়োগ করে থাকেন। এ বিধান যখন অন্ধ-বধির এবং বোবা আলেম-মোল্লাদের দ্বারা সংঘটিত হয় তখনই শত মতভেদ, ফেরকাবাজি, ফতোয়াবাজি, ধর্মের নামে মারামারি, মানুষ হত্যা ইত্যাদি চলতে থকে। এরা নারীদেরকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখার জন্য এবং হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য কতো রকমের যে মিথ্যা বানোয়াট হাদিসের এবং কিস্সার আমদানি করেছে তার ইয়াত্তা নেই।
উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি মিথ্যা হাদিসের মূল অংশ তুলে ধরা হলো –
“আমি যদি কাউকে অপর কাউকে সেজদা করার আদেশ করতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম যেনো তার স্বামীকে সেজদা করে”।
“তোমরা বিভিন্ন ব্যাপারে মেয়েদের সাথে পরামর্শ করবে কিন্তু সে অনুযায়ী কাজ করবে না”।
“নারী জাতি সমস্ত অমঙ্গলের জন্মদাতা। যতো অমঙ্গল সবই নারী জাতিরই সৃষ্টি”।
“মেয়েদেরকে না ভালোবাসার মধ্যে রাখো আর না তাদেরকে লেখাপড়া শেখাও”।
“উত্তম সংসারই হলো কবর বা মৃত্যু এবং জীবন্ত কন্যা সন্তান দাফন একটি সম্মানের ব্যাপার”।
“হযরত ফাতেমা আলায়হিমাস সালাম বলেন, “মেয়েরা যেনো পুরুষদের না দেখে এবং পুরুষরাও যেনো তাদের না দেখে। তারপর নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, পরস্পর পরস্পরের সন্তান”।
“কোনোক্রমেই নারীরা পুরুষদের প্রতি তাকাতে পারবে না এবং পুরুষও নারীর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারবে না” ইত্যাদি।
আরো অনেক মিথ্যা হাদিস এবং হাদিসের বিকৃত ব্যাখ্যা তথা আক্ষরিক অর্থ করে নারীদেরকে অত্যন্ত কঠোরতার মধ্যে ধর্মান্ধরা আবদ্ধ করে ব্যক্তি-স্বাধীনতা হরণ করে মানসিক নির্যাতন করে চলেছে ধর্মের দোহাই দিয়ে। অথচ কোরান মতে নারী-পুরুষ পরস্পর পরস্পরের অংশ। কোরানে উম্মতে মুহাম্মদীকে একটি মধ্যপন্থী জাতি হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং মধ্যম পন্থা অবলম্বনই হলো উত্তম- এ কথাও ঘোষণা করেছে। মাওলা আলী ইবনে আবি তালিব আলায়হিস সালামের কালাম হলো ঃ “তোমরা সবসময় মধ্যম পন্থা অবলম্বন করবে”। কোরান-হাদিসের ভুল এবং আক্ষরিক ব্যাখ্যা করে নারীদেরকে নিছক একটি ভোগ্যপণ্য হিসেবে সাব্যস্ত করে রেখেছে এবং পর্দার ব্যাপারে অত্যাধিক বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে- যা নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের সময়ও করা হয়নি। পর্দার নির্দেশ কখন এবং কি কারণে হয়েছে, তা নবী পরিবারের জন্য এবং উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে কতোটুকু প্রভেদ এবং অভেদ আছে তা নির্ণয় না করেই ঢালাওভাবে অত্যাধিক বাড়াবাড়ি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে আরব বিশ্বের একজন খ্যাতিমান লেখক আবদুল হালীম আবু শুক্কাহ রচিত “তাহীরুল মায়া ফী আসরির রিসালাহ্” গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের যুগে নারীদের অবস্থা-স্বাধীনতা এবং বর্তমান যুগের নারীদের অবস্থা-স্বাধীনতার মধ্যে কতোটুকু প্রভেদ রয়েছে তা অসংখ্য দলিলাদির দ্বারা প্রমাণ করা হয়েছে। আমাদের একদল আলেম-মোল্লাদের অত্যাধিক বাড়াবাড়িতে এবং পশ্চাৎমুখী ফতোয়ার কারণে নারীদের অবস্থা করুন পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে- যা নবীজির সময় মোটেই ছিলো না। অথচ ইসলাম মধ্যপথ অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছে। নারীর যে একজন মানুষ এবং তাঁর স্বাধীন সত্ত্বা আছে, সে কথা এবং ভাবনার পথ রুদ্ধ করে রেখেছে ফতোয়ার কাঁদা ছোড়াছুড়ি করে। এমনকি তাদেরকে শয়তান এবং শয়তানের সমতুল্য বলতে এবং বুঝাতেও কসুর করেনি। নারীদের দেখলে অজু ভেঙ্গে যায়, মসজিদ নাপাক হয়ে যায় ইত্যাদি ফতোয়া এবং মতবাদও শ্রুতিগোচর হচ্ছে। তাদের ব্যক্তি-স্বাধীনতা হরণ করে তাদের মতের বা পছন্দের বিপরীতে বিবাহেও অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য করছে।
এতে জেনার একটা পথ খুলে দেয়া হয়েছে। জোর করে বা মতের বিরুদ্ধে বিবাহ দেয়া আর জেনা করতে বাধ্য করা একই কথা। অথচ ইসলাম মেয়েদেরকে স্বামী নির্বাচনের অধিকার দিয়েছে। কোরান বলছে – এবং তাদের (নারীদের) জন্যও তেমনই ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে যেমন রয়েছে পুরুষদের, এবং নারীদের উপর রয়েছে পুরুষের মর্যাদা (সুরা বাকারা-২২৮)। আর ধর্মকর্ম, এ ব্যাপারেও ইসলামে কোনো কঠোরতা বা বাড়াবাড়ি অবলম্বন করা হয়নি (সুরা হাজ্জ-৭৮)। অথচ নারীদের ব্যাপারে তাও করা হচ্ছে। ইসলামে চারটি বিবাহ করা জায়েজ এবং চার স্ত্রীর মধ্যে অবশ্যই সমতা রক্ষা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে কোরানে। তার হাকিকত কি আলেম-মোল্লারা একটু বুঝিয়ে দিলেই পারে? তাদের ধান্ধাবাজিটাও ধরা পড়ে যাবে। কারণ, এ অন্ধগণ ইসলামের হাকিকত বুঝেনি, বুঝেছে আক্ষরিক অর্থে বিধায় মতভেদের আস্তাকূড়ে নিক্ষেপ করছে নিজেদেরকে এবং সাধারণ মানুষকে। মানব দেহে পাঁচটি নফস আছে। কুমতি নফসে আম্মারা জিনার সাক্ষি বাকি চার নফস। সেই চার নফসের অধিকারী হওয়াই বিবাহিত চার স্ত্রী ইহাই কোরানের মুহকামাত। কোরানের মোতাশাবেহাত হতে মুহকামাত বের করে আনলেই কোরান সার্বজনীন বলে জানা যায়, বুঝা যায় এবং সব মানুষই মানতে বাধ্য, যেহেতু ইহা প্রত্যেকেরই কথা। বহু মতভেদের বেড়াজাল হতে বের হলেই তাওহীদ জ্ঞানের সন্ধান লাভ হয়। আর মানুষতত্ত্বই তাওহীদতত্ত্ব, তাওহীদতত্ত্বই জ্ঞানের ভান্ডার। সেই তাওহীদ জ্ঞানই কোরানের মুহকামাত।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী “দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা”- এর প্রধান ধর্মান্ধ ওহাবী মৌলবী আহামদ শফী। এ মৌলবী আহামদ শফী ৯৩ বৎসর বয়সে নারীদেরকে নিয়ে আবিষ্কার করলো “তেতুলতত্ত্ব”। নারীরা নাকি তেতুলের মতো, নারীদেরকে দেখে যাদের জিব্বায় লালা আসে না তারা নাকি দাউস (হিজড়া) এবং ধ্বজভঙ্গ রোগী। তার এ ধরণের বয়ানগুলো সচেতন সভ্য মানুষের বিবেচনায় অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ, নোংরা, কুৎসিত, অশালীন, নারীবিদ্বেষী, নারীস্বাধীনতা বিরোধী, সভ্যতাবিরোধী এমন কি ইসলাম নারী সম্পর্কে যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। নারীবিদ্বেষী এসব তেতুল মোল্লারাই নারীদের মানসিক নির্যাতনের, কখনো বা দৈহিক নির্যাতনের ফর্মুলা তৈরী ক’রে তথা ফতোয়া রচনা করে তাদের বিকৃত মনোভাবের পরিচয় দিয়ে থাকে। মানুষ যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত চিন্তায় গ্রহান্তরে ভ্রমন করছে, আর তখন মোল্লা আহামদ শফী আবিস্কার করলো নারীদেরকে নিয়ে “তেতুলতত্ত্ব”,- মূর্খ কাকে বলে। বুঝা গেলো এ বুড়ো বয়সেও নারীদেরকে দেখে মৌলবী আহামদ শফী ঠিক থাকতে পারেন না, তার লালা ঝরতে থাকে বিধায় তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছে তিনি ধ্বজভঙ্গ রোগী নন। আসলে তার মনের কুৎসিত-নির্লজ্জ স্বভাবটিতে যা আছে তা-ই প্রকাশ করেছে। যৌবনকালে তার স্বভাবের একটি চিত্র একথা হতে প্রমাণিত হয়। এটাই ধর্মান্ধ গোঁড়া মোল্লা-মৌলবীদের কাজ। নারীদেরকে এরা মানুষই মনে করতে চায় না, এটা ধর্মান্ধ অজ্ঞ-মূর্খ মোল্লাদের বয়ান হতেই বুঝা যায়। মোল্লা শফীর এ ধরনের বয়ান দ্বারা পুরুষজাতিকেও যে চরম অপমান করা হয়েছে, চরম নারীলোভী সাব্যস্ত করা হয়েছে তা বোধসম্পন্ন লোকের জন্য বুঝা কোনো দূর্বোধ্য বিষয়ই নয়। আর সাধারণ মানুষ এবং নবী-রাছুল, অলি-আউলিয়াদেরকেও এক কাতারে নিয়ে আসা হয়েছে তার “তেতুলতত্ত্বের” সূত্র দ্বারা। কাম-প্রেমের প্রভেদ আর অভেদ কি তা যদি কিঞ্চিৎ জানা থাকতো তবে এ ধরনের বয়ান মুখ দিয়ে বের হতো না। নবী-রাছুল এবং অলি-আউলিয়াদের সম্পর্কে মোল্লা শফীর সামান্যতম হুঁশ-আক্কেল যদি থাকতো তবে এ ধরনের নির্লজ্জ প্রলাপ বকতে পারতো না। কালেমাকে শাহাদাত করার মতো সামান্য জ্ঞানও যার নেই তিনি নাকি পীরে কামেল! যেনো কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন। চোখে দেখে না তবু নাম তার নজর আলী। অন্যান্য নির্বোধগণও এ ধিকৃত এবং বিকৃত মানসিকতার মোল্লা শফীকে নিলর্জ্জের মতো বুযুর্গ, পীরে কামেল ইত্যাদি উপাধিতে ভুষিত করে প্রচার করে বেড়ায়। এরা হলো মুর্দার, তাদের হুঁশ-আক্কেল থাকলে এটা সম্ভব হতো না ! তার এ ধরনের বিকৃত চিন্তাটিকে সাদরে গ্রহণ করার জন্য কতো যে বেকুফÑমূর্খগণ প্রস্তুত রয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। যাক, মানব সুরতে এবং মানবের সাথে আল্লাহ আছেন, কোরান-হাদিসের এ চরম সত্যকে অস্বীকার করে যারা অন্ধ-অনুমানে দূরে কোথাও আল্লাহকে চিন্তা করে তারাই হলো ধর্মান্ধ ধিকৃত মৌলবাদ। যে খোদাকে দেখে না সে-ই অন্ধ, যে আল্লাহর কালাম শুনে না সে-ই বধির এবং তার মুখে কখনো আল্লাহর কালাম আসবে না বিধায় সে বোবা।
“যে খোদাকে দেখে, খোদার পাক জাতে বাস করে, খোদার কালাম শুনে, খোদার কথা বলে সে-ই মুমিন, অলি।”
তাই সত্যপথ প্রাপ্ত মুমিন তথা নিজকে চিনে যারা খোদা চিনেছেন তথা অলি- আউলিয়াদের সাথে আলেম-মোল্লাদের বিরোধ চিরকাল। সমাজে কেউ অলি হলে তা না জানাটাই হলো অজ্ঞতা-মূর্খতা, তেমনি কেউ অলি না হলে তাকে অলি বলাটাও মূর্খতা। এ ধরণের অজ্ঞতা-মুর্খতার কারণেই আক্ষরিক বিদ্যার অধিকারী মুর্দা আলেম-মোল্লাদেরকে অলি-বুযুর্গ বলে সমাজের অধিকাংশই গ্রহণ করে নিয়েছে এবং নামের সাথে ‘রাহঃ’ যোগ করে দিচ্ছে-তাতে বুঝা যাচ্ছে তথাকথিত মুসলিম সমাজে ধর্ম জ্ঞান নেই। আছে রূপক-কাঠামো বা তাশাবাহা, যার অনুসরণ করা কোরানে নিষেধ আছে। এ যেনো কাঁচকেই হীরক বলে গ্রহণ করে নিয়েছে। কালের পরিবর্তনে কিছু সংখ্যক জ্ঞানীদের (অলি-আউলিয়াদের) দ্বারা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের চাষ হলেও তথাকথিত আলেম-মোল্লাদের ফতোয়ার কাঁদা ছোড়াছুড়িতে তারা আক্রান্ত হয়ে আছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন -“কেয়ামতের পূর্বে অন্ধ-বধির এবং বোবাদের ফেৎনা সৃষ্টি হবে”। ঈমান-আকিদা সংরক্ষণ করা তাদের আরো একটি প্রতারণা। যে খোদাকে চিনেছে, রাছুলকে চিনেছে তার ঈমান কখনোই নষ্ট হয় না, যায় না। ঈমান আসলে যাওয়া আসার বিষয়ও নয়। ঈমান ঈমানই আছে আমাকে ঈমান আঁকড়ে ধরতে হবে। যে ঈমানকেই চিনেনি, দেখেনি সে ঈমান হেফাজত করবে কেমন করে?
তবে যার ঈমান অদৃশ্য, অন্ধ-অনুমান নির্ভর তার ঈমান অবশ্যই যেতে পারে। কারণ, সে ঈমানকে চিনেনি এবং ঈমানকে দেখেওনি। ঈমানকে চিনে তাকে গ্রহণ করাই হলো দ্বীন-এ-মুহাম্মদীর নীতি। ঈমানের মাঝেই রয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রাছুল। মুহাম্মদী ভেদ মানে প্রতিটি মানুষেরই ভেদ। মূলতঃ মানুষের লক্ষ্যস্থলও মানুষই। কাজেই নিজকে চিনলেই হয় সত্য লাভ। সত্যকে লাভ করাই হলো দ্বীন-এ-মুহাম্মদী। দ্বীন-এ-মুহাম্মদীতে যারা দাখেল হয়েছে তারাই হলো উম্মতে মুহাম্মদী। উম্মতে মুহাম্মদী যারা তারাই খাঁটি মুসলমান, খাঁটি হিন্দু, খাঁটি বৌদ্ধ, খাঁটি খ্রিষ্টান। ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবারে ঈমান জহুর হচ্ছে। জ্ঞানীর কাছে সেই ভেদ জানো। আল্লাহপাক তথাকথিত আলেম-মোল্লাদেরকে ধর্মের সঠিক জ্ঞান দান করুন, ঈমানকে চিনে আঁকড়ে ধরার এবং সার্বজনীন ইসলামে অধিষ্ঠিত হবার তওফিক দান করুন। কারণ, আল্লাহপ্রদত্ত মানবধর্ম দ্বীন-এ-মুহাম্মদী বা ইসলাম মোল্লাতন্ত্রের তথাকথিত ইসলামের কারণে কলঙ্কিত হয়ে চলেছে। মুসলমানগণ নির্যাতিত নয়, বরং মুসলমানের ছদ্মাবরণে যে সমস্ত বানরগুলো বাস করছে, ইসলামের নামে মুসলমানের পরিচয়ে অন্যায়-অত্যাচার, জোর-জুলুম বা মানুষ হত্যা করে চলেছে, জাতি-গোত্রে বিভক্ত করে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করছে তারাই অন্য জাতির কাছে মার খাচ্ছে। যারা সত্যিকারের মুসলমান তারা সর্ব জাতির কাছেই সম্মানিত হচ্ছে।
আল্লামা ইকবাল বলছেন – “কোথায় মুসলমান? সবই মুসলমান বেশে বানর নৃত্য করছে”। মোল্লা-মৌলবীদের অন্ধত্বের গোঁড়ামীর কারণে মুসলিম জাতি পিছনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মানুষের মুক্তির জন্য যে কিতাব নাজিল হয়েছে সে কিতাব মানুষ নিজেই। নিজকে চেনার জন্যই গাইডস্বরূপ কাগজ কোরান। কোরানের মুহকামাত বুঝলে তার সবই জানা যায়। আর কোরানের মুহকামাত মানেই হলো মানুষতত্ত্ব। মানুষতত্ত্ব আর খোদাতত্ত্ব একই বিষয়। ‘আল ইনছানু সিররি ওয়া আনা সিররুহ’- এ হাদিস কুদসীর ভেদমর্ম এখানেই। এজন্যই একজন মুমিন বা দিব্যদৃষ্টিওয়ালার কালাম হলো ‘আনাল হক’। অন্ধ-বধির মোল্লা- মৌলবীরা সে জ্ঞান সম্পর্কে বেখবর, অথচ এরা নিজেদেরকে জ্ঞানী বলে ধারণা করে। এ সমস্ত অন্ধ-বধিরদের কারণে নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম এবং সত্যিকারের মুসলমানগণও অভিযুক্ত হচ্ছে। এরা শুধু ইলমুল কালামকেই ধর্ম জ্ঞান বলে জানে এবং মানে। আসলে ইলমুল কালাম ধর্ম জ্ঞান নয়, খোসা মাত্র। ধর্ম জ্ঞান হলো আত্মার জ্ঞান, যাকে গায়েবী ইলেমও বলা হয়। আত্মার জ্ঞানই হলো কোরানের মুহকামাত। কোরানের মুহকামাত যে জানে না, ধর্ম জ্ঞান সম্পর্কে সে সম্পূর্ণ বেখবর এবং তারাই অন্ধ-বধির। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম এবং কারবালার যুদ্ধ এ অন্ধ-অনুমানবাদীদের বিরুদ্ধেই সংঘটিত হয়েছে, হচ্ছে। রাব্বুল আলামিন যেনো ঐ সমস্ত অন্ধ-বধির-বোবা মোল্লা-মৌলবীদেরকে এবং তাদের অনুসারীদেরকে ইসলামের সত্যিকারের পথ লাভ করার তৌফিক দেন এবং কিছু বুঝ-জ্ঞান দান করেন এ কামনা করে শেষ করছি।
প্রবন্ধ – দ্বীনে মোহাম্মদীর কিছু কথা
লেখক – সালমা আক্তার চিশতী
আমাদের সমাজের মাঝে দেখা যায় কিছু লোক তরিকার নাম নিয়ে অনেক তরিকত বিরোধী কর্মকান্ড করে থাকে। যেমন- তারা মনে করে বায়াত না হয়ে পীরমুর্শিদের নাম স্মরণে থাকলেই হবে। এই বিষয়টি তারা বুঝে না যে, তারা কত বড় ধোঁকার মাঝে পরতেছে। কারণ, তাদের মাথাটি দেখতে মানুষের মাথার মতো হলেও তাদের মাথার চিন্তা চেতনা গুলো নিন্মস্তরের, তরিকত শূণ্য। আমার মুর্শিদ তাঁর আলোচনার মাঝে এই উপমাটি তুলে ধরে- গিট্টু ছাড়া কাঁথা সেলাই করা, ঠিক তেমনি দশা হয় এই ধরনের লোকদের।
কোরানের মাঝে সূরা কাহ্ফ ১৭নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন- “আল্লাহ যাকে হেদায়েত দেন সে-ই হেদায়াত প্রাপ্ত হয় ; যাকে তিনি বিপথগামী করেন, সে ওলিয়ম মুর্শিদ (পথপ্রদর্শক) পাবে না।” কারণ, মুর্শিদ নিজেই ঈমান এবং তাঁর নিকট মুরিদ হওয়াটাই হলো ঈমানদার হওয়ার প্রমাণ (আল্লাহর অনুমতিক্রমে ঈমান আনা হলো- সুরা ইউনুস – ১০০) এবং ঈমানকে সরল মনে দৃঢ়তার সাথে আঁকড়িয়ে ধরে রাখা হলো সৌভাগ্যের বিষয়; মুক্তির পথ ইহাই ঈমানদারগণের প্রতি আল্লাহর দয়া-করুণা। যারা গুরুর আশ্রয়ে আসেনি আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান নেই, তারা পথভ্রষ্ট। নবী-রাছুলগণই মানব গুরু, বেলায়েতে আল্লাহর ওলিগণ। নমরুদ, ফেরাউন, সরদার সউদ, আবু জাহেল, আবু লাহাবগণ কোনো যুগেই গুরুকে মানে নি/মানে না। যারা গুরুর আনুগত্যে না এসে অমুকের-তমুকের আশেক সেজেছে তারাও এক ধরণের বস্তুবাদি জিনগ্রস্থ মানুষ, দুনিয়ার মানুষ। এরা আশেক-মাশুকের নাম নিয়ে অশ্লীল পথে ধাবিত হয়ে চলছে। যারা শুধু দুনিয়ার আশা করে তারা হলো দুনিয়া মুখি মানুষ। কারণ, দুনিয়া মানেই হলো ছয় রিপু বা আমিত্বের মাঝে ডুবে থাকা মানেই বস্তুবাদী হওয়া। সুতরাং যারা দুনিয়ার সুখ সন্ধানেই রতো আছে তাদের বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘তালিবুদ্দুুনিয়া মরদুদ/মুয়ান্নাছ।’ অর্থাৎ দুনিয়ার সুখ সন্ধানীগণ মরদুদ শয়তান/নারী। গুরু ব্যতীত জগতের আর সমস্তই নারী। নারীর জান্নাত নেই, মুক্তি নেই ; এরা দুনিয়াতে আবদ্ধ হয়ে সিজ্জিনে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। গুরুর/জগত স্বামীর নিকট নিকাহ (বায়াত)-এর মাধ্যমে বস্তুমোহ (নারীত্ব) হতে মুক্ত হয়ে পুরুষত্ব অর্জন করলে মিলবে জান্নাত। নারীত্ব হতে বের হয়ে পুরুষত্ব অর্জন হলে তার জন্য চার বিয়ে করা ফরজ, সে দৈহিক নারী-পুরুষ যে-ই হোক। সে নারী প্রত্যেকের সাথেই আছে।
মন আখেরাত মুখি না হলে দুনিয়ার কর্ম বা ইবাদত করাটাও পাপ হবে। ছয় রিপুকে ধারণ করে যত কর্ম করা হউক তা মূল্যহীন। যেমন- ময়লা ভর্তি কন্টিনারের মাঝে কেউ খাবার রাখবে না, তেমনি মানুষের অবস্থান দীলের কন্টিনারে যদি ময়লা থাকে তবে আর খোদার নূরের জ্যোতি তার মাঝে প্রকাশ পাবে না। ‘মকতুবাতের’ ২য় খন্ডের ৬৫ পৃষ্ঠায় ১৮৭ নং মকতুবাতে বর্ণিত আছে যে, হযরত খাজা আহরার রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু স্বীয় পুস্তকে লিখেছেন যে, “পীরের ছায়া অর্থাৎ তাছাওর বা ধ্যান আল্লাহর জেকের হতেও উৎকৃষ্ট।” হযরত শায়েখ আহামদ শেরহিন্দি রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু বলছেন, “পীরে তাস্ত আউয়াল মাবুদ তাস্ত” অর্থাৎ তোমার পীরই হলো তোমার প্রথম মাবুদ। নিজ পীরকে এই রূপ জানতে না পারলে ইবাদত বন্দেগী বিফল হবে, মানব জনমটা হবে অসার। অসার জিন্দেগী আখেরাতকে ধংস করে দেয়। যারা দুনিয়ার সৌভাগ্যের আশা করে বা দুনিয়ার মান-মর্যাদার কথা ভেবে আখেরাতের কর্ম হতে বিরত/দূরে থাকে বা সরে যায় তারাই বিপথগামী/দোযখগামী হবে। তাদের তকদির তারা নিজেরাই তৈরী করে নেয়। তারা এমন কর্মে লিপ্ত হয় যা জীব জন্তুদের কর্মের মতো, জীব জন্তুরা তাদের ভিতর বাহির এক করে চলা ফেরা করে আর যারা এই রূপ মানবীয় অজুদ ধারণ করে পশুর স্বভাবটা ধারণ করে রেখেছে তারা জঙ্গলের জীব/জন্তুর থেকেও অধম।
আল্লাহকে পাওয়ার আশা করা এবং আল্লাহকে পেতে হলে ভিতর বাহির এক করে গুরু ভজন করতে হবে। যারা গুরুর নির্দেশিত পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে তারা মানব জনমে মুক্তি লাভ অবশ্যই করবে। কথায় বলে, গুরু থুইয়া যে গোবিন্দ ভজে সেই পাপী নরকে যাবে। ফকিরী নাম ধরে সাধনার নামে এক ধরনের লোক আছে তারা চন্দ্র সাধনার নামে নানা কিছু আহার-বিহার করে, ইহা মাত্রই তরিকার কাজ নয়/মানব ধর্ম নয়। এরা চরম ভাবে বিভ্রান্ত। তারা নিজেরাই পোলাও, মাংস রেখে পায়খানা, প্রশ্রাব, রজ, বীর্য ইত্যাদি সাধনার নামে খেয়ে থাকে। কারণ, এই ধরনের সাধারণ বিষয়টি বুঝার মতো জ্ঞানও তাদের নেই। তাতে তাদের মানবাত্মা হারিয়ে পশুত্বের জগতে নেমে যায়/আসফালাস সাফেলিন হয়ে যায়। সাধনার প্রথম স্তরই হলো জিনগ্রস্থ হতে ইনছানে উত্তীর্ণ হওয়া আর ইনছান আল্লাহর মধ্যে ফানা হয়ে চির স্বাধীনতার জগতে বাকা হয়ে যায়। এ জন্য একজন মুক্তিকামী মানুষের সব কর্মের মূল হলো বায়াত হওয়া।
গাউছেপাক হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তাঁর ‘আল ফাতহুর রাব্বানী ওয়া ফায়জুর রাহমানী’ কিতাবের ৮৫ পৃষ্ঠায় বলছেন, ‘নেককারদের বা ইনছানুল কামেলদের খেদমতে থাকা যদি তোমার সম্ভব হয়, তবে ইহাই তোমার জন্য ইহকাল ও পরকালে মুক্তির জন্য শতগুণে শ্রেয় হবে’। সুতরাং তারাই হতভাগা যারা গুরুর সান্নিধ্য হতে ইচ্ছাকৃত ভাবে দূরে আছে/গুরু সংযোগ হতে বিচ্ছিন্ন আছে। যেমন- আমরা রাতে ঘুমানোর আগে ঘরের মাঝে মশারী টানিয়ে থাকি। মশারী টানানোর কারণ হলো মশায় কামড়াবে। এই পাঁচ বস্তু দিয়ে গড়া দেহটাকে সেবা যত্ন করতেছি। তেমনি মন একদিন ভেবে দেখেছে কি এই মাটির দেহের মাঝে আল্লাহর নূরের দেহ যে লুকিয়ে আছে তার মাঝে মশারী লাগানো হয়েছে কিনা। এই নূরের দেহের মশারী লাগাতে হলে গুরুর জ্ঞানের আলো/জ্যোতি লাগবে। আপাদ-মস্তক গুরু নিজেই নুর এবং গুরু হতে আগত জ্ঞানটাই হলো জ্যোতি। এই জ্যোতির্দেহের অধিকারী হতে হলে আমিত্বের আবরণ খুলতে হবে। আর এই আবরণ খুলতে হলে অনুরাগের বাহনে বসতে হবে। কারণ, অনুরাগ ছাড়া এই আবরণ খোলা যায় না। যেমন- ঘরের মাঝে জানালা থাকে যার ঘর সে জানালার মাঝে পর্দা দিয়ে থাকে যাতে কোন মানুষ ঘরের ভিতরটা দেখতে না পারে তেমনি ছয় রিপু পর্দা হয়ে একজন অচেতন মানুষের দীলের জানালাগুলোকে বন্ধ করে ফেলে। এই বন্ধ জানালাগুলো খুলতে হলে গুরুর নূরের আলো লাগবে। বোখারী শরীফের ৫ম খন্ডের মাঝে বর্ণনা করা হয়েছে- “পার্থিব স্বার্থপূরণ না হলে যারা বায়াত ভঙ্গ করে আল্লাহপাক তাদের প্রতি হাশরের দিন তাকাবেন না।” কারণ, ব্যক্তিস্বার্থ থেকে সকল পাপের জন্ম হয়। দুনিয়া নিয়ে গুরুর দরবারে যাওয়াটাই হলো পাপ।
কিছু সংখ্যক মানুষ ব্যতিত সবই এই ভুলগুলো করে থাকে। যারা ভুল করে তারা মানব জনম হারানোর দিকে ধাবিত হয়। কারণ, দুনিয়ার পূজারীগণ আখেরাত হারাবে এইটাই স্বাভাবিক। যারা স্মৃতির পাতায় অমর হয়ে রয়েছে তারা অনেক দুঃখ যাতনা পার হয়ে এই বিপদ সংকুল রাস্তা পারি দিয়েছে। যারা অচেতন অর্থাৎ গুরুর কালাম শ্রবণ করেনি সামনে বসেও গুরুর কালাম শুনতে পায়নি তারা এই ভয়ংকর বিপদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, আলমে নাছুতের সাগরে ডুবে যাবে ; শেষে সুরত বদল হয়ে হাশরে তাদের উত্থান ঘটবে। কারণ, তাদের শ্রবণ শক্তিকে ইবলিশের নিকট ধার দিয়েছে। তাই কান থাকলেও গুরুর পবিত্র কালামগুলো শ্রবণে আসেনি। দেলের দ্বারা কালাম উপলদ্ধি করেনি। তারা পশু আকৃতিতে হাশরে উঠবে (সুরা হিজর)। আল্লাহর দেওয়া সাতটি নূরি সেফাতকে জাগ্রত করতে না পারলে গুরুর করণ করা যাবে না কারণ, এই সাত সেফাত সব মানুষের মাঝে রয়েছে যারা গুরুকে ধারণ করবে তারা এই নূরানী সেফাতগুলোর হেফাজত করবে আর যারা মুর্দার তারা এই নূরের অবস্থানে জুলমাত এনে অন্ধকার দ্বারা সেফাতগুলোকে ঢেকে দিবে। কারণ, একজন মানুষের মনে অহরহ অন্ধকার এসে পূর্ণিমার চাঁদের (মানব সত্তাই চাঁদ) আলোকে ঢেকে ফেলে। এই চাঁদের আলোটা যে কি তা জ্ঞানীগণ বুঝেন। একজন জ্ঞানীর কাছে গিয়ে নফসের প্ররোচনায় অচেতন থাকাটা দুর্ভাগ্যের বিষয়।
এই দূর্ভাগ্যকে সৌভাগ্য করতে হলে আল্লাহর দেওয়া খাস নাম আলিমুন দ্বারা নফসকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। যার আলিমুন জাগ্রত সে ভাল/মন্দ প্রভেদ করতে পারবে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর পবিত্র কালাম শুনিয়েছে তা অর্জুন শ্রবণ করে, গুরুর দেওয়া সেই কালাম অনুযায়ী যুদ্ধ করে জয় লাভ করেছে। গুরু অচেতন ভক্তকে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়ে চেতন করে। হযরত খাজা বাবা গরীবে নেওয়াজ রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তাঁর ‘দেওয়ান-ই-মঈনুদ্দীনে’ বলছেন, “খাওয়াহিকে রাখম বানিদার বেহারা মান বানগরমান আয়না ওয়েম ও সিত্ খোদা আজ মান” অর্থাৎ তুমি যদি খোদার মুখ দেখতে চাও তা হলে আমার চেহারার দিকে তাকাও। আমি তার আয়না, সে আমা হতে আলাদা নয়। যারা গুরু প্রেমিক তাদের হাল হাকিকত আলাদা। তারা এই মায়াময় জগতে বাস করেও এই মায়া থেকে নিজ মনকে দূরে রাখে। আর যারা গাফেল তারা মনকে বিষয় মোহের মাঝে বেঁধে রাখে। কারণ, তারা বুঝতে পারে না এই কাজগুলো কার। মহা মনের অধিকারী না হতে পারলে গুরু সেবা করা যায় না। আর মহা মনের অধিকারী তখনই একজন মানুষ হয় যখন সে পর্দা মুক্ত হয়। আয়নার মাঝে রূপ দরশন করতে হলে আমিত্বের খোলস হতে নিজ অস্তিত্বকে বের করে নিতে হবে তবেই ইরফানী আয়নার মাঝে রূপ দরশন হবে। যারা একত্ববাদে বিশ্বাসী তারা প্রবৃত্তির পুজা করবে না।
কারণ, তারা মানব ধর্ম ইসলাম ধারণ করার অবিরাম চেষ্টা সাধনা করতেছে। একজন মুরিদের মনের খবর গুরু জানেন কারণ, গুরুর অন্তর্দৃষ্টি খোলা। গুরু একজন মুরিদের ভিতর বাহির দুইটি অবস্থাই দেখতে পায়। যে ব্যক্তি পার্থিব স্বার্থপূরণ করতে গিয়ে গুরুকে ভুলে যায় সে আল্লাহর অশেষ রহমতের দরজা হতে বের হয়ে জাহান্নামের দরজায় অবস্থান করে। গুরুর আশ্রয়ে থাকাই জান্নাতের দরজায় অবস্থান করা। যেহেতু মানবগুরুর হাতে বায়াত মানেই আল্লাহর হাতে বায়াত (সুরা ফাত্তাহ-১০) বিধায় গুরু ত্যাগ করা বা বায়াত ভঙ্গ করা আল্লাহর নিকট হতেই ঈমান ত্যাগ করা। এরাই কাফের হয়ে যায়। যেমন, একজন চেতন মানুষ খাবার প্লেটে নিয়ে খায় আর একজন অচেতন মানুষ সে নিজেকেই হায়ানী আত্মার খাবার হিসেবে সাজিয়ে রাখে। তার এই অবস্থার থেকে বুঝা যায় সে কতটা অচেতন। সে বুঝতে পারে না সে কতটা ভুলে আছে/ভুল করছে। কারণ, সে নিজে নিজেই হায়ানীয়াতের ফাঁদের দিকে পা বাড়াচ্ছে। কারণ, গুরু ব্যতীত আর সমস্তই দুনিয়া। গুরুর প্রতি যার পূর্ণ ঈমান নেই অথবা পার্থিব স্বার্থের জন্য যারা গুরুর সঙ্গ/ঈমান ত্যাগ করে তারা আখেরে অবশ্যই মানব জনম হারাবে/জাহান্নামী হবে। এ জগতে নফস দ্বারা অর্জিত আমলের ফলাফলটা এই রূপ হবেই। শত নামাজ, রোজা, তসবিহ ইত্যাদিতে রতো থাকলেও।
বুঝতে হবে মুক্তির দরজা একমাত্র গুরুর/রবের করুণা-দয়া (রহিমের) ভিতর রয়েছে, এখানেই তিনি গাফুরুর রহিম। নিজ গুরুকে রেখে পার্থিব স্বার্থ পূরণ করতে গিয়ে গুরুকে ত্যাগ করলে তার দশা হবে কুকুরের ন্যায়। যেমন- কুকুর খাবারের আশায় বিভিন্ন জায়গায় জিহ্বা বের করে দৌড়াদৌড়ি করে থাকে, তাকে কেউ খাবার দেয় আবার কেউ কুকুরটিকে তাড়িয়ে দেয়, তেমনি হয় এই গুরু ত্যাগী লোকদের অবস্থা। এই রূপ অন্ধদের কোন বুঝ জ্ঞান আসে না যে তারা কি ভুল করতেছে। কারণ, তারা হলো বেখবর, তারা হলো তাদের নফসে আম্মারার পূজারী।
পূজা হলো দুই রকমের। একটি হলো নফস মোৎমাইন্নার আর অন্যটি হলো নফসে আম্মারার। কর্ম অনুসারে ফলাফল, কর্ম যদি ভাল হয় তবে ফলাফল ভাল হবে আর কর্ম খারাপ হয় ফলাফল খারাপ হবে। বাজে যুক্তি তর্ক দিয়ে গুরু ভজন হয় না, বরং ঈমানের ক্ষতি হয়। শায়খ সাইয়্যেদ হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ) তাঁর ‘আল্ ফাত্হুর রাব্বানী ওয়া আল্ ফায়জুর রাহমানী’ কিতাবের মাঝে বলছেন-“তুমি আমার কথা না শুনিয়া স্বীয় নফস ও কামনা সাথে লইয়া ইবাদত খানায় বসিয়াছ। সর্ব প্রথম প্রয়োজন পীরের সাহচর্য লাভ করা। স্বীয় নফস, কামনা এবং আল্লাহ ব্যতীত সকল কিছু হত্যা করিয়া পীরের দ্বারে চাপিয়া বস।” আর মুরিদ/বায়াত না হয়েই শুধু কারো নামের উপরে গুরু ভজন হলো খাঁটি স্বর্ণের জিনিস রেখে ইমিটেশনের জিনিস নিয়ে বসে থাকা। তারা হলো অন্ধ, অন্ধের কাছে সব কিছুই আলোহীন ঠিক তেমনি অবস্থা এই অচেতন লোকদের। আর এই কর্মগুলো এই অচেতন মানবরূপী জীবেরা করে থাকে। কারণ, তারা মানুষের পোশাক রেখে জীব-জন্তুর পোশাক পরিধান করে আছে মানে এরা উলঙ্গ। যে মেয়ের বিয়েই হয়নি দেশ ভরেই তার শ্বশুর বাড়ি কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বাড়ি দাবী করার সিষ্টেম নেই, তেমনি দশা হলো মুরিদ না হয়েই যারা এজন-সেজনকে পীর দাবী করছে তাদের দশা, স্রোতে ভাসমান কঁচুরী পানার মতো ঘাটে ঘাঠে ভেসে বেড়ায়।
একটি প্রবাদ বাক্য রয়েছে- ‘পাগলও তার নিজের বুঝ বুঝে’। যারা নামের উপরে গুরু ভজন করে তারা পাগলের চেয়েও অধম। একনিষ্ট ভাবে গুরু ভজন করতে হলে মনকে অনুরাগের দরজায় নিতে হবে। গুরুর প্রতি ঈমানের অনুরাগ ছাড়া গুরু ভজন হয় না, অনুরাগ বিনে এই মানব জনমটা বৃথা যাবে। মানুষ কেমন অন্ধকার সাগরের মাঝে পড়ে আছে সে তা দেখতেছে কিন্তু তা বুঝতেছে না। কারণ, বুঝলে আর সে অন্ধকার সাগরের মাঝে থাকবে না। অন্ধকার জগতে যারা অগ্রসর হচ্ছে তারা বুঝবে না তারা যে অন্ধকারে ডুবে আছে। এই অন্ধকারে থাকাটাই হলো অচেতন ভাব আর এই অন্ধকার কেটে আলোর মুখ দেখা হলো চেতন ভাব। যেমন একটি শিশুর দাঁত পরে গেলে সেই দাঁত আবার উঠবে আর একজন বৃদ্ধ লোকের দাঁত পরে গেলে সেই দাঁত আর উঠবে না। এই উপমা থেকে বুঝা যায় গুরুর নিকট শিশুর ন্যায় হয়ে থাকলে সে হোঁচট খেয়ে পরে গেলেও গুরু দয়া করে উঠিয়ে দিবে কিন্তু একজন শিশুর মতো আচরণ করতে না পারলে টেটনামি/পাকনামি করলে তার দশাটি হবে বৃদ্ধের দাঁতের নেয়, টেটনামির জন্য হোচট খাওয়া হলে গুরুর দয়া এই নরাধমের মাঝে পৌছাবে না। কারণ, তাদের কানে, চোখে ও দেলে মোহর মারা থাকবে।
কোরানে সূরা আরাফ ১৯৮ নং আয়াতে আল্লাহ তায়াল নবীকে বলতেছেন- “ওয়া তারাহুম ইয়ানজুরুনা ইলাইকা ওয়াহুম লা ইউবসিরূণ।” অর্থাৎ এবং দেখছেন তারা আপনাকে দেখতেছে অথচ দেখতেছে না। সর্বযুগে আল্লাহতায়ালা হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-কে লক্ষ্য করে এ কথা বলে আসতেছেন। কারণ, কোরানের বাণী হলো চিরবর্তমান। যাদের দিব্য দৃষ্টি খুলে গেছে তারা তা দেখতে পায় এবং কোরানের ভেদ রহস্য উন্মোচন করতে পারে। কোরানের প্রত্যেকটি আয়াত বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায় সেখানে গুরুবাদের আলোচনা করা হয়েছে। এক ধরনের পীর আছে দালাল ধরে মুরিদ করে যেমন- হাট বাজারে দালালরা গরু বিক্রি করে ঠিক সেই ভাবে। কিছু কিছু লোক আছে কিছু দিন এই পীরের কাছে আবার কিছু দিন অন্য পীরের কাছে মুরিদ হয়। তাদের এবাদত বন্দেগী হবে না, মূলতঃ তাদের বায়াতই সঠিক নয় এবং তাদের কোনো ঈমান নেই এই সমস্ত কর্ম করে তারা নিজেদেরকে জাহান্নামের উপযুক্ত করে তুলে। কিছু কিছু মহিলা আছে তরিকার দোহাই দিয়ে নানা অপকর্মে নিজেকে লিপ্ত রাখে। তারা দুই দিন পর পর এই পীরের কাছে ঐ পীরের কাছে মুরিদ হয় তাদের অবস্থা সম্পর্কে বা তাদের পরিণতি সম্পর্কে মুন্সিগঞ্জ জেলার গালিমপুরের প্রখ্যাত মরমী সাধক রহিম ফকির সাহেব তাঁর একটি গানের মাঝে বলছেন –
নিকাহ বসিওনা যথা তথা
বেঁচিওনা বেঁচা মাথা,
মাফ হবে না গুনাহ খাতা
সারা জীবন ভরে॥
প্রত্যেকটি সাধকই এইরূপ কথা সর্ব যুগে বলে থাকে বিভিন্ন ভাবে। তাদের কর্ম অনুসারে আখেরে কি হবে তা নির্ধারণ করে রাখতেছে। এই অচেতন লোকদের স্থান হবে সিজ্জিনে। সিজ্জিন হলো ঐ স্থানের নাম যেই স্থানে পাপীদের আত্মা থাকবে। আল্লাহ আর নবীর ভেদ রহস্য জানার জন্য সৌভাগ্য লাগবে। তাঁরই করুণা-দয়া লাগবে। আর সেই সৌভাগ্যটাই হলো গুরুর দয়া। কারণ, তাঁর কৃপা বিনে এই মানব জগতে কিছুই সমাধান হয় না। গুরুর কাছে যাওয়ার পরে তাঁর শিক্ষানুসারে মনের ময়লাগুলোকে পরিস্কার করার জন্য সাধনা করতে হবে। এই সমাজের লোকেরা সাধনা অর্থ কি তারা তা জানে না ? সাধনা করতে হলে অনুরাগের দরজায় দাঁড়াতে হবে।
একজন গুরু ভক্তের সারাটা জীবন প্রমাণ দিতে হয় যে, সে সত্যিকারের ঈমানদার, একজন গুরু ভক্ত। শিষ্য আর ভক্ত এক নয়। ‘শিষ্য’ হলো অনুসারী, যে গুরুর হুকুম-নির্দেশকে পরিপূর্ণ অনুসরণ করে চলে। আর ‘ভক্ত’ হলো যে মোহমুক্ত হয়েছে, নফস আম্মারার বলয় থেকে বের হয়ে গেছে বা বস্তুবাদ মুক্ত হয়েছে, সে গুরু ভিন্ন অন্য কিছুর ধ্যান-ধারণা তার চিন্তা/মানস জগত হতে উঠে গেছে, জাগতিক জাত-কুলের ব্যাধিমুক্ত হয়েছে। যেমন, কাঁচের মাঝে একটি ডিজাইন করা পেপার লাগানো থাকলে কাঁচের বাহির থেকে ভিতরে কি আছে তা দেখা যাবে না আবার ভিতর থেকে বাহিরে কি আছে তা দেখা যাবে না, তেমন দশা হবে অনুরাগবিহীন লোকেদের। তারা রাসুলের সামনে থেকেও রাসুলকে দেখতে পাবে না। কারণ, তার দীল জুলমাতের পর্দা দ্বারা আবৃত। এই মানব ছুরতটাকে অমর করতে হলে অনুরাগ সাধনায় ডুব দিতে হবে। কোন মানুষ যদি তার নিজ মনের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হয় তবে সে মূল গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না। যেমন, একটি ছবির মাঝে একজন মানুষ যেমন স্থির হয়ে থাকে তেমনি হায়ানীয়াত একজন মানুষের ইনসানিয়াতকে স্থির করে/ঢেকে রাখে। ইনসানিয়াতের এই স্থির অবস্থার জাগরণ ঘটাতে হলে মনকে অদৃশ্য সূতার বস্তুবাদের বাঁধন থেকে মুক্ত করতেই হবে। এই সূতার বাধন মানুষের মনকে কঠিন থেকে কঠিন করে রাখে। মনের এই কঠিন অবস্থার জন্য মানুষ তার নিজ মুর্শিদকে ভুলে দুনিয়ার কর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তারা দুনিয়াটাকে মনে করে বেহেশতের সুখের মতো। কিন্তু ইহা যে ক্ষণস্থায়ী এ চিন্তা তাদের মাথায় আর কাজ করে না, ইহা জাহান্নামী হওয়ার লক্ষণ।
একজন আধ্যাত্মিক জ্ঞানীর বাক্য নিজ অস্তিত্বের মাঝে ধারণ করতে পারলে জাহান্নামের দুর্গম পথ অতিক্রম করা সম্ভব হবে। যেমন, সূর্যের আলো দ্বারা গাছ-পালা খাবার তৈরী করে তেমনি একজন ভক্ত গুরু প্রদত্ত আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আলোকে নিজ ইনসানি আত্মার গুণগুলোর জাগরণ ঘটায়। আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশ্তী নিজামী তাঁর আলোচনার মাঝে বলতে থাকে- হযরত জুনায়েদ বোগদাদী (রাঃ) এর এক শিষ্য অনেক দিন ধরে দরবারে আসে না। তাই তিঁনি নিজেই ঐ শিষ্যের বাড়ি গেলেন। শিষ্যকে তিঁনি জিজ্ঞেস করলেন, কতদিন হয় তুমি দরবারে যাও না, কারণ কী? শিষ্যটি বলল হুজুর, আমি এখন প্রতিদিনই বেহেশতে যাই, সে জন্য সময় পাই না। হযরত জুনায়েদ বোগদাদী তার কথা শুনে বিষয়টি বুঝতে পারলেন। হযরত জুনায়েদ বোগদাদী (রাঃ) শিষ্যকে বলল, ঠিক আছে বেহেশতে গিয়ে কিছু খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ্ বলে খাওয়া শুরু করিও। এই কথাটি বলে তিনি দরবারে চলে গেল। শিষ্য প্রতিদিনের মতো বেহেশতে গেল তার সামনে নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার নিয়ে আসল। খাবার যখন সে মুখে দিবে তার গুরুর বাণীটি মনে পরে গেল। যখন সে বিসমিল্লাহ্ বলে খাবার মুখে দিল অমনি সব খাবার চিতাশালের পঁচাগলা মাংসে পরিণত হয়ে গেল ও বেহেশতী হুর-পরীগুলো ভূত-পেত্নী হয়ে গেল। পরের দিন সকাল বেলা তাকে চিতাশালের পাশে একটি জমিতে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেল। এরপর হতে যখনই তার ঐ পচা-গলা মাংসের কথা মনে পরে তখনই সে বমি করতে থাকে। তিন দিন পর শিষ্যটি গুরুর বাড়িতে গেল এবং হযরত জুনায়েদ বোগদাদী (রাঃ)-এর কাছে ক্ষমা চাইলেন। অচেতনদের বেহেশত এমনি হয় তারা দেখবে সেই দেখার মাঝে অনেক অপূর্ণতা থাকবে। কারণ, তাদের বাসিরুনের সাথে গুরুর দেওয়া আলীমুন নেই, মানে এরা অন্ধ-বধির।
গুরুর দেওয়া আলীমুনকে ধারণ করতে পারলে এলমে এলাহীর অধিকারী হওয়া যায়, আর তাতে অন্ধকার কবর আলোকিত হয়ে ‘রঁওজা’ বা জান্নাতের বাগান সৃষ্টি হয়। যারা গুরুর দেওয়া আলীমুনকে ধারণ করতে পারে না তাদের দশা ঠিক এমনি হয় যেমনÑ ডায়াবেটিস রোগ হলে শরীরের সমস্ত অঙ্গ ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। আর মিষ্টি যখন অতিরিক্ত খাওয়া হয় তখন আর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা য়ায় না এর ফলে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে থাকে। তেমনি দশা হয় আলীমুনবিহীন লোকেদের। তারা হায়ানীয়াতের মধু (যা মূলতঃ বিষ সমতুল্য) পান করতে গিয়ে অচিরেই মানব সুরতটিকে হারিয়ে ফেলে। যেমন, আমরা সাগরের পারে গিয়ে সূর্য ডুবতে দেখি ঠিক মনে হয় সূর্যটি সাগরের ঐ পাড়ে কিংবা সাগরের মাঝেই ডুবতেছে আসলে এই বিষয়টি কি সঠিক? ঠিক তেমনি যারা পন্ডিত তারা ভাবতে থাকে সে নিজেই একমাত্র শ্রেষ্ট আসলে এই অবস্থানটি যে তার ভুল তার তা বুঝার মতো জ্ঞান নেই, সে নিজ সত্তাকে হারিয়ে ফেলছে। ঐ ব্যক্তিটি এক বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মাঝে পরে থাকে। তারা এই মায়ার জগতের ভোগ বিলাস করতে করতে নিজ আপন সত্তা থেকে হারিয়ে যায়। ডা. জাহাঙ্গীর আল সুরেশ^রী সূরা বাকারা ১৪৮নং আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছেন- যে কল্যাণের সাহায্যে মানুষ মরণকে জয় করে নিতে পারে তথা জন্মচক্রের ঘূর্ণায়মান বৃত্ত হতে নিজেকে মুক্ত করতে পারে উহাই আল্লাহ্র দৃষ্টিতে একমাত্র কল্যাণ তথা একমাত্র রহমত। ইহাই আল্লাহ্কে পাবার পথে ধাবিত করে এবং পরিশেষে যাহা পাওয়া উচিত সেই রবরূপী আল্লাহ্র সঙ্গে মিলনে একাকার হয়ে যায়। একজন ভক্তের মূল কর্ম হলো রবরূপী খোদার দীদারের জন্য মনকে প্রস্তুত রাখা। কারণ, খোদা বাস করে একজন মুমিনের অন্তরের মাঝে। যেমন, একটি ডিম লাইট ঘরকে পুরোপুরি আলোকিত করতে পারে না তেমনি গুরুর দেওয়া জ্ঞানের আলো যদি ড্রিম লাইটের মতো কাজে লাগাই তবে আর এই অন্ধকার দেহকে আলোকিত করা যাবে না। একজন মুমিন ব্যক্তির গুণ ধারণ করতে হলে দীলকে এনার্জী লাইটের আলো দিয়ে আলোকিত করতে হবে।
প্রবন্ধ – আসরারে পাঞ্জাতন – ৪র্থ পর্ব
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
নূর মোহাম্মদী ১৮ টি নাম নিয়েও প্রকাশ আছে। যেমন –
০১। আল হাকিকাতুল মোহাম্মদীয়া (মোহাম্মদের মূল সত্তা)
০২। হাকিকাতুল হাকিকত (মূল সত্তার মূল সত্ত্বা)
০৩। রূহে মোহাম্মদী (মোহাম্মদের রূহ)
০৪। আল আকল্ আল আউয়াল (প্রথম প্রজ্ঞা বা বুদ্ধি)
০৫। আল আরশ (সিংহাসন)
০৬। আল রূহুল আযম (সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি সম্পন্ন)
০৭। আল কালামুল আলা (সর্বশ্রেষ্ঠ কলম)
০৮। আল খলিফা (প্রতিনিধি)
০৯। আল ইনছানুল কামিল (পূর্ণ মানব)
১০। আসলুল আলম (বিশ্বের উৎস)
১১। আদম আল হাকিকি (মূল আদম)
১২। আল বরযোখ (মধ্যস্থতাকারী)
১৩। ফালাকুল হায়া (জীবন স্তর)
১৪। আল হককুল মখলুকুবিহি (সৃষ্টির মূলতত্ত্ব)
১৫। আল হায়ুলা (আদিম জড় উপাদান)
১৬। আল রূহ (আত্মা)
১৭। আল কুতুব (কুতুব)
১৮। আবদ আল জামি (সর্বব্যাপী একের দাস)
এই বিশ্ব সৃষ্টির মূলে নূরে মোহাম্মদী। রাছুল পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, অর্থাৎ আমি আল্লাহর নূর হতে এবং সমস্ত সৃষ্টি আমার নূর হতে সৃষ্টি। আল্লাহ সৃষ্টির কারণে ‘আহাদ’ বিবর্তনে ‘আহামদ’ নাম ধারণ করে সসীমের দিক নির্দেশনার সূচনা করলেন। আহাদ এবং আহামদের মাঝে একটি ‘মীম’-এর পর্দা যা কেবল নামের বিবর্তনে প্রকাশ। এ ‘মীম’ হরফে মুকাত্তায়াতের অন্তর্ভূক্ত বলে ‘আহামদ’ আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় এবং ইহা নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের প্রেমাষ্পদ হওয়ার একটি নিদর্শন।
‘আহাদ’ নামের তিনটি অক্ষর- আলিফ, হে, দাল। ‘আহাদ’ নাম হতে আলিফ বাদ দিলে হয় ‘হদ’ মানে সীমা বা নির্দিষ্টবৃত্ত – যা সসীমের প্রথম দিক নির্দেশনা সূচক। এ ‘হদ’ বা তাইনে আউয়াল বা প্রথম বৃত্ত বা দায়রা লাতাইনের বা অপ্রকাশিত স্তরের নিন্মে অবস্থিত এবং এ দু’য়ের মাঝে একটি সীমা নির্দেশ করছে, যদিও তা অসাধারণ অবস্থা। ‘আহাদ’ হতে যখন শ্রেষ্ঠতর প্রকাশক ‘আলিফ’ লাতাইনে রয়ে গেল তখন ‘হদ’ শব্দকে সীমানির্দেশ হিসাবে ‘তাইনে আউয়ালে’ রাখা হয়েছে এবং সূক্ষ্ম সীমা ‘হদ’ যে মাখলুক তা ভালোভাবে দেখবার জন্য ‘হে’ অক্ষরের পরে ‘মীম’ রাখা হয়েছে এবং তাকে যিনি প্রকাশ করলেন সেই ‘আহাদের’ ‘আলিফ’ সর্বপ্রথমে সম্মান হিসাবে স্থিত রয়েছে। কাজেই বুঝা যাচ্ছে অসীম আল্লাহপাক মাখলুক তথা ‘মীম’-কে প্রকাশ করে স্বীয় অস্তিত্বকে সীমার মাঝে রূপদান করেছেন নাম ও রূপের বিবর্তনের ধারায়। এ ‘আহামদ’ সসীম সৃষ্টি আল্লাহপাকের বিবর্তন ধারায় প্রকাশ আহাদ, আহামদ ও মোহাম্মদ।
হযরত খাজা নিজাম উদ্দিন আউলিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু রচিত ‘রাহাতিল কুলুব’ কিতাবের ২৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, যখন আল্লাহপাক বললেন ‘আল আস্তুবে রাব্বেকুম’ তখন আত্মার হালিয়ত চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়লো।
প্রথম শ্রেণী – এই শ্রেণীতে যারা ছিলেন তারা অন্তর ও মুখ দিয়ে বলছিলেন, ‘বালা’ অর্থাৎ সেজদাবনত হলেন। এরা হলো আম্বিয়া আউলিয়া ও শহীদানগণ।
দ্বিতীয় শ্রেণী – এই শ্রেণীতে যারা ছিলেন তারা অন্তর দিয়ে বললো এবং সেজদা করলো কিন্তু মুখ দিয়ে বললো না। এরা হলো কাফের (আল্লাহকে অস্বীকারকারী) ও অন্যান্য বেদ্বীনদের ঘরে জন্ম নেয় কিন্তু পরবর্তীতে তারা মুসলমান হয়।
তৃতীয় শ্রেণী – এই শ্রেণীতে যারা ছিল তারা মুখে ‘বালা’ বলেছে এবং সেজদা করেছে কিন্তু অন্তর দিয়ে বলেনি। এসব নফসগুলো মুসলমানের ঘরে মুসলমান হয়েই জন্ম নেয় কিন্তু পরে পথভ্রষ্ট ও সর্বশেষে কাফের হয়ে দোযখ ভোগ করবে।
চতুর্থ শ্রেণী – এই শ্রেণীতে যে নফসগুলো ছিল তারা ‘বালা’ না মুখে বলেছে না অন্তরে। এমনকি তারা সেজদাও করেনি। এরা কাফের ও নাস্তিক হয়ে জন্ম নেয় এবং কাফের হয়েই মৃত্যুবরণ করে।
হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে আল্লাহপাক নূরে মোহাম্মদীকে সৃষ্টি করে পঞ্চাকারে রেখেছিলেন। এ পঞ্চাকারকে একত্র করে ‘দরক্ত ইয়াকীনের’ গাছ তৈরী করলেন। এই গাছের ছিল চারটি ডাল, পাঁচটি কুড়ি বা কলি, তিরিশটি পাতা। চার ডালে চার তরিকা, পাঁচ কলিতে পাঁচটি ছালাত এবং ত্রিশ পাতায় ত্রিশ রোজা। মূল ডালে নবী ‘হাবিব’ নামে বসা ছিলেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, যখন আল্লাহপাক নূরে মোহাম্মদীকে সৃষ্টি করলেন, সৃষ্টি হয়েই নূর সেজদায় চলে গেলেন। তাতে আল্লাহপাক খুব খুশী হলেন এবং নূর নবীকে বললেন হে নূর, শির তোল। তোমাকে নিয়ে আমার সব ইচ্ছা, আমার সব মতলব তোমাকে নিয়েই আমার সমস্ত কাজ। তোমাকে আমি অপূর্ব সাজে সাজাবো। এই নাও তোমাকে আমি দশটি তোহ্ফা বা উপহার দিলাম।
প্রথম – তোমাকে আমি পূর্ণ ‘বিদ্যার সাগর’ দান করলাম।
দ্বিতীয় – আমি তোমাকে দান করলাম ‘হেলেমের সাগর’। এ সাগরে ঢেইয়ে ঢেউয়ে মুক্তা মানিক বের হয়।
তৃতীয় – আমি তোমাকে দান করলাম ‘প্রেমের সাগর’ এশকে এলাহী,সর্বদাই প্রেমের বন্যা বইতে থাকবে।
চতুর্থ – আমি তোমাকে দান করলাম ‘ভয়ের সাগর’ কেবল মহান আল্লাহর প্রতি ভয় থাকবে।
পঞ্চম – আমি তোমাকে দান করলাম ‘রহমতের সাগর’ যার প্রতি বিন্দু পানিতে রহমতে ভরা।
ষষ্ঠ – আমি তোমাকে দান করলাম ‘দানশীলতার সাগর’ যার ফলে সর্বদাই দেলে সাখাওয়াতির ঢেউ খেলবে।
সপ্তম – আমি তোমাকে দান করলাম ‘শোকরের সাগর’ যার ফলে সর্বদাই শোকর গোজারী করতে থাকবে।
অষ্ঠম – আমি তোমাকে দান করলাম ‘আকলের সাগর’ যার জন্য প্রতি মুহূর্তে আকলে পরিপূর্ণ থাকবে।
নবম – আমি তোমাকে দান করলাম ‘খোদার গর্ব’ যার জন্যে প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর গর্বে গর্বিত হবে।
দশম – আমি তোমাকে দান করলাম ‘জামে নূর’।
মুসলীম শরীফে হযরত আলী আলাইহিস্ সালাম হতে বর্ণিত আছে যে, এই বিশ্ব সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বৎসর পূর্বে আল্লাহপাক ‘লওহ মাহফুজে’ লিখেছিলেন নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের নাম ‘খাতামুল আম্বিয়া’ তথা নবীদের সিল্মোহর, আল্লাহপাক সমস্ত নবীদের নফস সৃষ্টি করে তাদের নফস হতে এই মর্মে ওয়াদা নিয়েছিলেন যে, তোমাদের সময়ে যদি আমার হাবিব মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম আসে, তবে তোমরাও তাঁর প্রতি ঈমান আনিও এবং তোমাদের উম্মতগণকেও ঈমান আনতে বলে দিও। হাদিস শরীফে আরো বর্ণিত আছে যে, যখন নূর নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম আলমে আরওয়ায় ছিলেন তখন আল্লাহপাক নবীজির ধড়ে রূহ দিলেন। তখন ঐ রূহ পেশানীতে যেয়ে ঘুরতে লাগল ; ফলে নূর নবীর পেশানী হতে পাঁচ ফোটা নূর ঝরেছিল। তা হতে ‘কানাহ্জার’ একটি শব্দ গঠিত হয়েছিল। এ পাঁচফোটা নূরী অক্ষর হতে প্রকাশ হলো পঞ্চ স্তম্ভ। যথা –
প্রথম হরফ ‘কাফ’ (ك) – এর হতে সৃষ্টি হয় কলেমা।
দ্বিতীয় হরফ ‘নুন’ (ن) – এর হতে সৃষ্টি হয় ছালাত।
তৃতীয় হরফ ‘হে’ (ح) – এর হতে সৃষ্টি হয় হজ্জ্ব।
চতুর্থ হরফ ‘জে’ (ز) – এর হতে সৃষ্টি হয় যাকাত।
পঞ্চম হরফ ‘রে’ (ر) – এর হতে সৃষ্টি হয় সাওম।
উক্ত পঞ্চ বেনা বা স্তম্ভগুলোর মূল হলো মোহাম্মদ, আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইন। এ পঞ্চ স্তম্ভের বেলায়তী এবং নবুয়তী নাম সাব্যস্ত আছে। কোন্ বেনা কোথা হতে কিভাবে সৃষ্টি হলো তা জানা দরকার। তাছাড়া পঞ্চ স্তম্ভের মধ্যে একটি হলো ছালাত। তার মূল পাক পাঞ্জাতন-পাঁচ ছালাত সাব্যস্ত আছে। পাক পাঞ্জাতন সমষ্টি করে বা পাঞ্জেগানা সমষ্টি করে ‘আহসান’ সুরতে খোদা হুয়ায জাহেরু বর্তমান। এ পাঞ্জেগানার সৃষ্টি রহস্য অবগত হলে খোদাকে চেনা যায়। সুতরাং যে ছালাতকে হেফাজত করবে আল্লাহপাক তাকে হেফাজত করবেন (সুরা মুমিনুন-৯)। আর যে ছালাত হেফাজত করবে তারই ছালাত কায়েম হবে বরযোখে কোবরাতে। কোরানে ছালাতকে হেফাজত করার নির্দেশ দান করা হয়েছে এবং দায়েমী ছালাতকে কায়েম করার হুকুম দান করা হয়েছে।
কবিতা – মানুষ
কাজী নজরুল ইসলাম
আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মাদ
কৃষ্ণ-বুদ্ধ-নানক-কবীর, -বিশ্বের সম্পদ।
আমাদেরি এঁরা পিতা-পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
তাঁদেরি রক্ত কম-বেশী ক’রে, প্রতি ধমনীতে বাজে!
আমরা তাঁদেরি সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ,
কে জানে কখন মোরাও অমনি, হয়ে যেতে পারি কেহ।
হেসো না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীম,
আমিই কি জানি! কে জানে কে আছে, আমাতে মহামহিম!
হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত- ও আদি? কে পায় কাহার দিশা?
কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
হয়ত উহারই বুকে ভগবান্, জাগিছেন দিবা-রাতি!
অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত, পড়িয়া দুঃখ দাহে –
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ’ ভজনালয়;
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!
হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর-বাসে
জন্মিছে কেহ- জোড়া নাই যার, জগতের ইতিহাসে!
যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
আজিও বিশ্ব দেখনি, হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে!
ও কে? চন্ডাল? চম্কাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!
ওই হ’তে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
আজ চন্ডাল, কাল হ’তে পারে মহাযোগী-সম্রাট
তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।
রাখাল বলিয়া কারে করো হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে!
হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে!
চাষা ব’লে কর ঘৃণা!
দে’খো চাষা-রূপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!
যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,
তারাই আনিল অমর বাণী-যা আছে র’বে চিরকাল।
দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,
তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি!
তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে,
দ্বারী দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি, দেবতারে খেদাইলে।
সে মার রহিল জমা-
কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কি’না ক্ষমা!
বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দু’চোখে স্বার্থ-ঠুলি,
নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হ’য়েছে কুলি।
মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত সুধা,
তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?
তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোন্খানে!
তোমারি কামনা-রাণী-
যুগে যুগে পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি’ ॥
কবিতা – শানে বেনজীর
লেখক – আসাদুজ্জামান আসাদ
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
ধরণীতে তুমি ধ্যানের ছবি,
অন্তরীক্ষে তুমি অসীম রবি।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি ধ্যানে, তুমি গানে
তুমি ফুলে, তুমি ফলে।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি রাধা, তুমি শ্যাম
তুমি বিভু, তুমি শম্ভূ।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি বিদ্রোহী নজরুল, তুমি পারস্যের জামী
তুমি দেওয়ান হাফিজ, তুমি জালালউদ্দিন রুমী।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি আল্লামা ইকবাল, তুমি ফরিদ উদ্দিন আত্তার
তুমি লালন, তুমিই শেখ সাদী।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি মজনু, তুমি লাইলী
তুমি ফরহাদ, তুমি শিরি।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি মাতৃ সেবক, তুমি সাধক বায়েজীদ বোস্তামী
তুমি গোপন প্রেমিক, তুমি খাজা ওয়ায়েস করণী।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি সুর সম্রাট, তুমি গীতে বখতিয়ার উদ্দীন
তুমি মোহাম্মদী ফুল, গাউছ কাদীর, হিন্দে খাজা মঈনুদ্দীন।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি শক্তি, তুমি আলী
তুমি জগৎ জননী ফাতেমা, তুমিই কান্ডারী।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি ব্রজধাম, তুমি কাবা
তুমি বৃন্দাবন, তুমি মক্কা।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি বজ্রকন্ঠ, তুমি তলোয়ার
তুমি স্নেহ-করুণা, তুমি দয়ার সাগর।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি গুরু, তুমি ভক্ত
তুমি সাধনা, তুমি আরাধ্য।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি সুদূর অতীত, তুমি ভবিষ্যত
তুমি গোপনের প্রকাশ, তুমি বর্তমান।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি কালেরও কাল, তুমি মহাকাল
তুমি বে-মেছাল, তুমি মেছাল।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তুমি তোমাতে গোপন, তুমি অন্ত
তুমি তোমাতে প্রকাশ, তুমি অনন্ত।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তোমার কীর্তি আর বলবো কত;
তোমার শানে তুমি মহৎ
জগত প্জ্যূ তব ঐ রাঙা চরণে
শির করি নত।
তোমার তুলনা তুমি
হে মহান কবি।
তোমার মহত্ত্ব তুমি, তোমার মহিমায় তুমি বিভূতি
আমার হারানো সেই শামছ তুমি
তব নাই নজীর, হে বেনজীর।
কবিতা – ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা
লেখক – নাসরিন সুলতানা চিশতী
আপনাতে ছিল আপনি মগন
ভরিয়া উঠেনি তখন পুস্পের কানন।
একাকি ছিল তখন মেদেনীর আকাশ
শূণ্যময় ছিল মেদেনী না ছিল প্রকাশ।
অপ্রকাশ সে মহিমার মাঝে
প্রকাশ হওয়ার বড় সাধ জাগে।
সৃজিলেন এই ভুবন আপনা রূপ দেখিবারে
প্রকাশ হলো না সে রূপ ভাবেন পরোয়ারে।
তাইতো সে নূরের জ্যোতিতে গড়লেন আদম
নিজ রূপ প্রকাশিল ছিল সে ইদম।
সৃজিলেন মানব কাঁদা মাটিতে
কাঁদিতে লাগিল তখন মানবাত্মা যে।
কেমন করিয়া থাকবে আদম মাটির খাঁচাতে
বিচলিত হইলেন আদম তখন আপন চিত্তে।
মুহাম্মদী নূরের জ্যোতি জাগিল যখন
মানবাত্মা পুলকিত হইল যে তখন।
সাতে পাঁচে রঙিন হলো বনমালী
হেরিলেন নিজেকেই নিজে হয়ে কৌশলী।
প্রভু সত্তা বসিল যখন আদমের ধড়ে
নূরের জ্যোতিতে উদ্ভসিত হলো মাটির ঘরে।
অপরূপ সাজে তিনি দেখিলেন নিজেকে
ধন্য হলো এরাদা তাঁর দেখে আপনাকে।
সংগীত – এই চোখে দেখতে পায়না
লেখক – গওহার আলী শাহ চিশতী
এই চক্ষে দেখতে পায় না খোদাকে
জ্ঞানের আঁখি খুলবে যেদিন,
সেদিন পাবে নিকটে।
সর্বশক্তি সে জ্ঞানময়, জ্ঞানেতে হয় তাঁর পরিচয়
আরাফতা রাব্বি বায়না রাব্বি,
আলির কওল মিথ্যা নয়।
বলিয়াছে শেরে খোদা, খোদার চক্ষে দেখি খোদা
যে জনা রয়েছে জুদা,
সেকি পাবে তাহারে?
চিনবে যদি কেহ তাঁরে, ঢোর, খোঁজ আপন ঘরে
তাঁর সৃষ্টি দেখো নেঘা করে,
সৃষ্টি তাঁর নমুনা রে।
এই চক্ষেতে চক্ষু তাঁরি, এই দেহেতে খোদ কাছারি
বসে করে কারিগরি,
আপন আসনে রে।
আরশ কুরছি লৌহ কলম, আঠার হাজার আলম
এই ভেদ যার হয়েছে মালুম,
সেই চিনেছে তাঁহারে।
সর্বব্যাপী পরাকাশে, আরশ কুরছি নিয়ে আছে
হযরত গওহার বলে যাও সে দেশে,
চিনতে যার বাসনারে।
সংগীত – আমারে ভেঙ্গে ভেঙ্গে
লেখক – অতুলপ্রসাদ সেন
আমারে ভেঙে ভেঙে
করো হে তোমার তরী,
যাতে হয় মনোমত
তেমনি করে লওহে গড়ি।
এ তরুতে নাই ফুল ফল
শিকড়গুলি বাড়ছে কেবল,
দিয়ে আঘাত জীবন-মূলে
লও হে তারে চ্ছিন্ন করি।
শক্ত তারে করবে বলে
ফেলে রেখো রৌদ্র জলে,
পুড়িয়ে তারে কোরো বাঁকা
যখন তুমি গড়বে তরী।
যাদের ধন আছে অপার
সোনার নায়ে কোরো হে পার,
আমার বুকে করিও পার
যাদের নাইকো পারের কড়ি।
তোমার ঐ মাঝ গাঙে
এ তরীটি যদি ভাঙে,
তবে সে অতল তলে
আমায় কুড়িয়ে নিয়ো হে শ্রী হরি।
অনুবাদ – ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র, ৭ম ও ৮ম পর্ব
মূল – এলিফ শাফাক হতে
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী
পর্ব ০৭
প্রভুসন্ধানে ব্যাপৃত মানব মন স্বভাবতই জাগতিক ভাবে নিশ্চল ও নির্বিকার, কিন্তু পরমপ্রাপ্তির পথে সে হয়ে উঠে দুরন্ত, চঞ্চল, উন্মাদনাময় ও অধৈর্য। প্রভুদর্শনের পথের প্রক্রিয়াগুলো তাঁর হৃদয়ের আকুলতার দ্বারা হয়ে ওঠে দ্রুত থেকে দ্রুততর।
ধর্মজগতে আপনত্বে ঈশ্বরানুভূতি বা পরমের উপস্থিতির অনুভব’ই ধার্মিকের পরম প্রাপ্তি। যেখানে নিজেকে প্রভু নামক দরিয়ার মধ্যে অনুভূত হয় এক বিন্দু জলরূপে। অথবা কখনো কখনো হারিয়ে যায় সে অনুভূতিটুকুও। থাকে শুধু আদি অন্তহীন এক শাশ্বত আনন্দ। সদানন্দ, চিদানন্দ বা পরমানন্দ। এ পথ শুধু প্রেমের। প্রেম ও হৃদয়ের অনুরাগ দ্বারা বিনির্মিত হয় এ পথ।
আল্লাহপ্রাপ্তির পথে আবশ্যক কর্মপক্রিয়া গুলোর জন্য যা যা প্রয়োজন তাতে সচেষ্ট হতে হবে। কাঁটার সাথে গোলাপ ও রাতের সাথে প্রভাতের যেমন প্রাসঙ্গিকতা, তেমনি অনুরাগ সাধনা ও প্রভুদর্শনের পরস্পর সম্পৃক্ততা। হে পথিক, প্রস্তুত হও পথের সামগ্রিক প্রয়োজনের জন্য।
অর্ধচন্দ্রাকার চাঁদ পূর্ণ হতেই সময় লাগবেই। তেমনি অনুরাগ দ্বারা ধীরে ধীরে নির্মিত হবে প্রভু। সে প্রভুতে নিষ্ঠাবান হও।
তোমার প্রভু নির্মিত হবে তোমার হৃদয়েই।
পর্ব ০৮
বিশ্বাস কে আজীবনের জন্য চিরসঙ্গী করে নাও। যাই হোক না কেনো, প্রভু তো রয়েছেন। কেনো ভয় তোমার? বিদায় জানাও সমস্ত হতাশাকে। জেনে রেখো, হতাশাই তোমাকে অনুপযুক্ত করে তোলে অনন্ত সুখ থেকে। তোমার পারিপার্শ্বিক অবস্থা যত কষ্টকর-ই হোক না কেনো – হতাশ হোয়ো না। যদিও বন্ধ হয় সমস্ত দরোজা- উত্তরণের এমন একটা পথ তো রয়েছে, যা প্রভু উন্মুক্ত করবেন!
কৃতজ্ঞ হও। তব হৃদয় যদি হয় নিবেদিত ও সমর্পিত, তবে কৃতজ্ঞতা হবে তোমার সর্বক্ষণের সঙ্গী। এমন কিছু যা তুমি পাওনি- তার জন্য অকৃতজ্ঞের মতো আচরণ কিভাবে করবে, যেখানে তুমি না চাইতেই পেয়ে গেছো- এমন পুরষ্কার ঢের বেশি!
বরং- সুফি তো তিনিই যিনি কিছু পেতে নন, বরং হারাতে চান সব। দেয়া হোক, এমনটা চান না কোনো সুফি, তারা চান তাদেরকে বঞ্চিত করা হোক। কারন সুফি তো অখন্ড ও পূর্ণ মানব, যেখানে তাঁকে দেয়ার আর কিছু থাকে না। একজন সুফি কৃতজ্ঞ এ জন্যেও যে, তাকে অস্বীকার করা হয়েছে বা বঞ্চিত করা হয়েছে।
আপনাতে পূর্ণ হও।
সম্পাদকীয় – নূর ও জুলমাত
লাবিব মাহফুজ চিশতী
প্রতিটি মানব সত্ত্বায় যুগপৎ বিরাজ করে নূর এবং জুলমাত। যখন অজ্ঞানতার দ্বারা আচ্ছন্ন হয় আমাদের চেতনা, আমরা সাথে সাথে বিচ্যুত হই পূর্ণতম অস্তিত্ব থেকে। আর অজ্ঞানতার বশে মানবতত্ত্বে বিরাজিত প্রভুতত্ত্ব তথা মানব ও প্রভুর অভেদত্ত্ব ভুলে আমরা নিজেকে করে ফেলি খন্ডিত তথা শিরকে আবদ্ধ। অন্ধ অনুমান কল্পনার দ্বারা কল্পিত কোনো উপাস্যের উপাসনায় নিজেকে ব্যাপৃত করে ফেলি। হয়ে উঠি মানব মহত্ত্বে অবিশ্বাসী।
জ্ঞান আঁখির উন্মোচনের ফলে দৃষ্ট হয় মানুষে বিরাজিত প্রভুসত্ত্বার রূপমাধুরীর অপূর্ব নূরের বিকিরণ। প্রভুগুণকে সংরক্ষনকারী তথা প্রভুকে ধারণকারী তথা স্বয়ং প্রভুতে প্রত্যক্ষ আনুগত্য অনুসরন ও পূর্ণ সমর্পণ এর মাধ্যমে নিবেদিত ভক্তটি হয়ে উঠে পরিশুদ্ধ । তাঁর হৃদয়ে জাগ্রত হয় পূর্ণচন্দ্র। যার আলোকমহিমায় অপসারিত হয় সমস্ত অন্ধত্ব ও অজ্ঞানতার দেয়াল।
মুর্শিদ স্বয়ং নূর। পূর্ণচন্দ্র রূপে তিনি উদ্ভাসিত হন ভক্তের মানস গগনে। আপন নূর দ্বারা তিনি নূরান্বিত করেন ভক্তকে। ভক্তের মাঝে জ্ঞানগুণের জাগরণ ঘটিয়ে ভক্তকে পৌঁছে দেন ঐশী প্রেমের অমর লোকে।
প্রভুগুণ তথা গুরুর গুণসমুহকে আপনত্বে ধারণ করে নিত্যময়তা প্রাপ্তির অনুশীলনে লাভ করা যেতে পারে পূর্ণতম প্রশান্তি বা মানবীয় জান্নাত।
মহাত্মাদের পবিত্র বাণীসমূহ
1.
জগৎ জুড়ে এক মানুষই বাস করছে। এ ভেদ রহস্য জেনে, আল্লাহর পাক জাতে বাস করাই হল তাওহীদে বাস করা।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী।
2.
যদি মানব সুরতকে চির কায়েম রাখতে চাও, তবে গুরুর স্বভাবে স্বভাবিত হও।
– হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী।
3.
প্রভু প্রেমের পথে যে অটল থাকে, প্রেমাগ্নি তার অস্তিত্বকে বিলোপ করে দেয়।
– হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতী রহ.
4.
যখন আমি আমার আমি কে নাই করতে পারি, তখনই পরম নববধূর মতো আমাতে আগমণ করে।
– হযরত আমীর খসুর রহ.
5.
হে খোদা, যে বেহেশত বানিয়েছো, ওটা মোল্লাদেরকে দিয়ে দাও। আমি বেহেশত চাই না। শুধু তোমার রহস্যের মাঝে ডুবে থাকতে চাই।
– আল্লামা ইকবাল
6.
প্রকৃত প্রস্তাবে মানব দেহই আসল কিতাব এবং প্রকৃত কাবা। তোমার আপন দেহেই আল্লাহকে অনুসন্ধান করো।
– মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহ.
7.
দেহ আত্মা অবিচ্ছিন্ন, ইহকাল পরকাল অবিচ্ছিন্ন। মোহকামাতুন আয়াতের নূরের কোরান আর আহলে বায়াত অবিচ্ছিন্ন।
– ফকির চিশতী নিজামী।
8.
মানুষ থুয়ে খোদা ভজো এ মন্ত্রণা কে দিয়েছে
মানুষ ভজো, কোরান খুঁজো, পাতায় পাতায় স্বাক্ষী আছে।
– জালাল উদ্দিন খাঁ
9.
অচেনারে চিনতে হলে রে
বসো চেনা লোকের সনে, আল্লাহর আশেকান
বসো অলী আল্লাহর ধ্যানে।
– দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী চিশতী নিজামী
আধ্যাত্মিক বাণীসমূহ : আউলিয়াগণের পবিত্র বাণী
মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৪র্থ সংখ্যা, এপ্রিল ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

