মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৫ম সংখ্যা, মে ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত
প্রবন্ধ – একটি গানের তাফসির
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
আমার কৃষক চাষী ভাই, চলো মাঠে যাই
কান্ধে কোঁদাল, লাঙ্গল-জোয়াল, হাল চষীয়া খাই।।
ভাইরে ভাই,
আমরা স্বাধীন, নই পরাধীন
বাংলার মানুষ ভাই,
আমার মাটি, আমি খাঁটি
মাটিতে সোনা ফলাই।।
ভাইরে ভাই,
নতুন দিন নতুন ফলন
ফলাই ক্ষেতেতে,
খেয়ে পরে সুখে থাকবো
আমরা এই মাটিতে।।
ভাইরে ভাই,
খাল কাটিয়া সেচ লাগাইয়া
পানি দেব ক্ষেতে,
সার ছিটাইয়া চাষ করিয়া
দ্বিগুণ পাব তাতে।।
ভাইরে ভাই,
আনন্দ রাখিয়া বুকে
কাজ করো ভাই সুখে,
চাষী মজুর কামার কুমার
যাহার যে কাজ জুটে।।
ভাইরে ভাই,
এই মাটিতে আমার জীবন
হীরা কাঞ্চন পরশ রতন,
রজ্জবে কয় অমূল্য ধন
এই মাটিতে পাই।।
গ্রাম বাংলার চিত্র উপরের গানের মধ্যে ফুটে উঠেছে। আমাদের বাংলার কৃষকগণ তাদের জমিতে ধান, পাট, মুগ, মুশুরি, সরিষা, মটর, কলাই, গম, যব, কাউন নানা রকম ফসল উৎপাদন করে থাকে। সে ফসল হতে বাংলার কৃষকগণ সারা বছরের খাবার যোগান দেয়। আবার কারো কারো প্রয়োজনে সে সমস্ত ফসল বাজারে বিক্রি করে অনেক টাকা আয় করে থাকে। আবার উস্তে, পটল, লাউ, কই, ঝিংগা, তরই, সিম, কফি, শালগম, টমেটো, আলু, লালশাক, পুইশাক, কলমিশাক ইত্যাদি নানা রকম সবজি জমিতে উৎপাদন করে বাজারে বিক্রি করে অনেক টাকা রোজগার করে থাকে। বাতাসের দোলা লেগে সুন্দর কঁচি ধানের ক্ষেতে ঢেউ খেলার দৃশ্যটি দেখে কৃষকের মনে অনাবিল আনন্দের বন্যা বইয়ে যায়। সোনালী রঙের পাকা ধানে মাঠ ভরে উঠে, মনে হয় যেন সোনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মাঠে মাঠে। পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধে কৃষকের মন পুলকিত হয়ে উঠে।
বিকাল বা রাতে গরু দিয়ে ধান মাড়ার দৃশ্য সত্যিই এক অনাবিল আনন্দ দান করতো। খুব সকালে গরু সাথে লাঙ্গল-জোয়াল কাধে নিয়ে কৃষকগণ জমিতে চাষ করতে চলে যায়, যেন ইহাই বাংলার কৃষকের এক আনন্দময় খেলা। বাড়ি হতে নাস্তা পাঠিয়ে দেয়া হয়, জমিতে বসেই সে নাস্তা খেয়ে নেয়া হয়। গরুর দুধ, ছাগলের দুধ প্রায় সবার ঘরেই পাওয়া যেতো। কথায় বলে, “দুধে ভাতে বাঙালী”। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা পূর্ণিমার রাতে নানা ধরনের খেলায় মেতে উঠতো। পুঁথিপাঠের দৃশ্যটিও ভুলবার নয়। গ্রামের আঁকা-বাঁকা কাঁচা মেঠো পথে গ্রামের লোকজনের চলাচল করতে কতোই না আনন্দ উপভোগ করে। সে পথে যান্ত্রিক কোনো যানবাহন নেই, পায়ে হেটে সবাই চলে। সন্ধ্যার পর জারি, সারি, যাত্রা, পালাগান, কবিগান ইত্যাদি গানের সুরে গ্রামের মানুষের মন স্বর্গীয় আনন্দময় পরিবেশ গড়ে উঠে। গ্রামের আঁকা বাঁকা পথে বাউলের একতারার সুর ভেসে উঠতো। গ্রামের মেঠো পথের দু’পাশে গম, যব, কাউন, মটর, সরিষা জমিতে বাতাসের দোলা লেগে তরঙ্গ সৃষ্টি করার দৃশ্যটি ভুলবার নয়। সরিষা ক্ষেতের দৃশ্যটি যেন হলুদ চাদরে আবৃত হয়ে আছে, তার সুন্দর মনোমুগ্ধকর ঘ্রাণে মন পুলকিত হয়ে উঠতো। এ সমস্ত সরিষা ফুল হতে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করে মৌচাকে জমা করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মৌয়ালরা সে মধু আহরণ করে বিক্রি করে থাকে। আরো আনন্দ দান করতো দল বেঁধে জাল, পলো, চাই, কোচ, টেটা, ওছা ইত্যাদি দিয়ে খাল-বিল, পুকুর হতে মাছ ধরার দৃশ্যটি। বড়শী দিয়ে খাল-বিল, পুকুর, ডোবা হতে অনেক মাছ ধরার দৃশ্য মনে পড়ে। প্রায় শুকনো খাল, বিল, পুকুর, ডোবা সেঁচে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা মাছ ধরতো কতো আনন্দের সাথে। তাদের সমস্ত শরীরে কাঁদা মেখে সাদা হয়ে যেতো। এক সময় খাল, বিলে প্রচুর দেশী মাছ পাওয়া যেতো। খালের উপর কাঠ, বাঁশের পুল/সাঁকো হতে লাফ দিয়ে পড়ার দৃশ্যটি তাকিয়ে দেখার মতো।
বর্ষার কাজল কালো জলে খালে বিলে, জমিতে শাপলা, কলমী ফুলের দৃশ্য এক মোহনীয় সৌন্দর্য্য দান করতো। নৌকা বা কলাগাছের ভেলা দিয়ে ঐ সমস্ত শাপলা ও কলমী শাক তুলে নেয়ার দৃশ্যগুলো অহরহ মনে পড়ে। নদীতে দক্ষিনা বাতাসের তরঙ্গের কলতানে অনুরণন বেজে উঠতো। পাল তুলে বড় বড় নৌকা নদী পথে চলে যেতো। বর্ষায় ছৈয়াওয়ালা নৌকায় চড়ে বেড়াতে যাবার দৃশ্যটি এখন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। ষড়ঋতুর আমাদের এ মাতৃভূমি বাংলায় বিভিন্ন ঋতুতে নানা ফুল-ফলের দৃশ্যটি বিশেষ ভাবে উপভোগ করার মতো। আম, জাম, কাঁঠাল, কুল, পেয়ারা, নারিকেল, কলা, পেঁপে, আতা, সিতা, সফেদা ইত্যাদি নানা রকম ফলের সমাহার এক এক ঋতুতে পাওয়া যায়। শীতে খেজুরের রস এবং তা হতে খেজুরের গুড় পাওয়া যায়। তা দিয়ে নানা রকম পিঠা, ক্ষীর-পায়েশ তৈরী করে আত্মীয়-স্বজন নিয়ে খাওয়ার দৃশ্য বাংলার ঘরে ঘরে দেখা যায়। গানের মাঝে তারই প্রতিধ্বনি ফুটে উঠেছে। আমাদের বাংলার দৃশ্য দেখে মনে হয় যেন স্বর্গীয় আভায় আবৃত হয়ে আছে। গ্রামের সহজ সরল মানুষের মন ছিল বন্ধু ভাবাপন্ন। একে অন্যের প্রতি ছিল শ্রদ্ধাশীল, স্নেহ-মায়া মমতায় আবৃত ছিল তাদের মন। মনে হতো সারা গ্রামটিই একটি পরিবার। গাছ পালায় আবৃত গ্রামের দৃশ্য দেখে মনে হতো যেন মায়ার চাদরে জড়িয়ে রেখেছে। তারা নানা রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আনন্দের সাথে উদ্যাপন করতো।
গ্রামের যে চিত্র গানের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে তা এখন প্রায় নাই বললেই চলে। মানুষের মনের এ ধরনের অনাবিল আনন্দ কেড়ে নিয়েছে গ্রামের মানুষের মনে যান্ত্রিকতাময় পরিবেশ সৃষ্টির কারণে। নানা রকম গ্রাম্য খেলাধুলা কতোটুকু বর্তমানে দেখা যায় তা মূলতঃ সবারই জানা আছে, প্রায় নাই বললেই চলে। বলতে গেলে এ সমস্ত খেলাধুলার কথা মনে হলে স্বপ্নের মতোই মনে হয়। মনে পড়ে নানা রকম খেলাধুলা সেই আনন্দঘন পরিবেশের কথা, কতো সুন্দর ছিল সেই সময়গুলো। বাউল আব্দুল করিমের গানটি মনে পড়ে। তিনি বলছেন, “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।” এর মানে এখন আর সেই অনাবিল আনন্দঘন সুন্দর পরিবেশ নেই। মানুষের সাথে মানুষের প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন, এ বাড়ি আর ও বাড়ি ঘুরে গল্প করে সময় কাটানো, নানা রকম মুড়ি, পিঠা, পায়েশ খেয়ে গল্প করা ইত্যাদি সবই স্বপ্নের রাজ্যে চলে গেছে। গ্রামে এ ধরনের চিত্র আর খুব একটা দেখা যায় না। বিশেষ করে জারি, সারি, মুর্শিদী, ভাটিয়ালী, কবিগান, পালাগান, গাজীগান, গ্রাম্য যাত্রা ইত্যাদি ছিল এ বাংলার মানুষের সংস্কৃতির মূল, মনের আনন্দের মূল উৎস। আজ হতে (২০২১ই) ৩০/৩৫ বৎসর পূর্বেও এ দেশের শহরে, গ্রামে হাজার হাজার কবিগান, পালাগানের আসর বসতো, বিশেষ করে পীর-মুর্শিদ বা অলীদের ওরশের মধ্যে। নানা রকম পশরা নিয়ে মেলার আয়োজন হতো শান্তিপূর্ণ পরিবেশে।
কতো আনন্দময় পরিবেশ ছিল তখন। অলীদের মাজার এ ওরশের সময় মেলা বসবার দৃশ্য এখনো রয়েছে, তবে আগের মতো পরিচ্ছন্ন নয়। তাতে কেউ কোনো প্রকার বাঁধার সৃষ্টিও করতো না। বিশেষ করে কওমী-খারেজি মাদ্রাসার জঙ্গি মৌলবীদের অন্ধ-গোঁড়া কুশিক্ষার ফতোয়াবাজি, জোর-জুলুম, মাজারের বিরোধীতা, ওরশের বিরোধীতা, গান বাজনার বিরোধীতা, বাধা দেয়া, মারামারি, মানুষ হত্যা ইত্যাদি তখনো তেমন ছিল না। তখনও এগুলো মহামারির মতো ব্যাপক আকারে বিস্তার লাভ করেনি বিধায় মানুষের মনে এক অনাবিল শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় ছিল, নির্মল আনন্দের মাধ্যমে এ সমস্ত অনুষ্ঠানগুলো পরিচালিত হতো।
সত্যিকারের সুন্নি আলেমগণ ছিল এবং এখনও আছে যারা বরাবরই ধর্মীয় পরিবেশের গান-বাজনার অনূকুলে এবং আমি নিজেই বহু আলেম-হাজীকে অলিদের ওরশের গানে বা ওরশ ছাড়াও অন্যান্য গানের মাহফিলে যোগদান করতে দেখেছি। এখনো বহু সংখ্যক সুন্নি আলেম, হাফেজ, হাজীগণ গানের মাহফিলে হাজির হচ্ছেন এবং এ বিষয়ের উপর তারা অনেক কিতাবাদিও রচনা করেছেন এবং এখনো করছেন। তারাও সে গানে আল্লাহ, রাছুল, পীর- মুর্শিদগণের তথা আল্লাহর অলীগণের প্রেমসূধা পান করেছেন, গান-বাজনা জায়েজ বলে ফতোয়া দিয়েছেন, এখনো দিচ্ছেন। আর ওহাবী কাঠমোল্লারা ধর্মীয় গান বাজনাকে হারাম বলে ফতোয়াবাজি করছে, লজ্জাহীনতা আর কাকে বলে! ইমাম গাযযালী (রঃ)-এর ভাষায় ওরা শুকরের চেয়ে নিকৃষ্ট (ইহইয়াউ উলুমুদ্দীন -১১৯৩)। প্রমাণস্বরূপ পড়ে দেখতে পারেন “আসরারে ছামা” যুগান্তর সৃষ্টিকারী বইটি। কওমী-খারেজি মাদ্রাসার মৌলবীরা তখন এতোটা উচ্ছৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। কারণ, তখনো ওহাবীদের মাদ্রাসা এতো ব্যাপক বিস্তার লাভ করেনি। এখন যেমন, ঘরের কোনায়, বাথরুমের ফাঁকা জায়গায়, হাটে বাজারের কোনায়, জঙ্গলের ধারে, রাস্তার পাশে ব্যাঙের ছাতার মতো কওমী মাদ্রাসা তৈরী হচ্ছে তা তখনো এতো ব্যাপক ছিল না বিধায় মানুষের মনে শান্তি বিরাজ করতো।
ধীরে ধীরে তাদের মাদ্রাসার ব্যাবসা (ইহুদী-খ্রিষ্টানদের দালাল কুখ্যাত ওহাবী সৌদি সরকারের মদদপুষ্টে, তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে, ওহাবীদের বিকৃত মতবাদ প্রচার-প্রসার করার জন্য এবং মাদ্রাসার ব্যাবসায় নিজেরা প্রতিষ্ঠিত হওয়া মূল কারণ) যতোই বিস্তার লাভ করছে ততোই দ্বীনে মুহাম্মদী/দ্বীন ইসলামের এবং অলী-আউলিয়াদের বিরোধীতা বেড়ে চলছে, অলীদের ওরশ মাহফিলের, গানের, তাজিম সেজদার, মিলাদের, তবারক সহ স্বয়ং রাছুলপাক (সাঃ)-কে নিয়েও নানা রকম বিতর্ক চালাচ্ছে! ফতোয়াবাজি, জোর-জুলুম, মানুষ হত্যা ইত্যাদি ব্যাপক বিস্তার লাভ করছে। সমাজের নির্মল আনন্দময় পরিবেশকে কওমী ওহাবীদের ধর্মীয় (?) উন্মাদনায় তথা বিষময় করে তুলছে। ধর্মান্ধগণ স্বার্থোদ্ধারের জন্য এবং জান্নাত আর হুর-পরীর নেশায় মাতাল হয়ে প্রেত-নৃত্য করে চলছে। আমি কোনো রাজনীতি করি না বা কোনো রাজনীতির সাথে আমার সম্পৃক্ততাও নেই। তবে হ্যাঁ, নবী-রাছুল, আল্লাহর অলী-আউলিয়াদের মতাদর্শে আমি পূর্ণ উজ্জীবিত আছি, থাকবো। কারণ, এরাই একমাত্র “আল ইসলামু দ্বীনুল ফেৎরাত বা লা ইকরাহা ফিদ্দ্বীন বা ওয়াল ফেৎনাতু আশাদ্দু মিনাল কাতলে”বা সিবগাতাল্লাহ-য় পরিপূর্ণ সিক্ত আছে- এরাই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত আছে।
যে সরকারের দ্বারা মুক্ত মনের অধিকারী অলী-আউলিয়াদের তরিকা (দ্বীনে মুহাম্মদী/দ্বীন ইসলামের) বা অন্যান্য ধর্মের লোকদের এবং তাদের ধর্ম কর্ম এবং নিরাপত্তাবোধ করবে আমি/আমরা সে সরকারকেই সমর্থন করি এবং করবো। তাই বলছি, এ ধর্ম ব্যবসায়ী গোঁড়া জঙ্গি মৌলবাদ এবং তাদের অনুসারী গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রগতিশীল আওয়ামী লীগ সরকার যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে। বিশেষ করে তাদের গলায় মাষ্টার্স ডিগ্রির টাইটেল ঝুলিয়ে কিছুটা হলেও শান্ত করেছেন, যেন শান্তিতে দেশ পরিচালনা করা যায়। ইহাই রাজনৈতিক কৌশল। তারপরও বিশ্বাস করা যায় না, ওরা খুবই গোঁড়া, উগ্র এবং উচ্ছৃঙ্খল। স্বার্থোদ্ধার না হলে বা সুযোগ পেলেই ওরা বানর নৃত্য শুরু করবেই। কারণ, এ কওমীরা কতোটুকু ভয়ংকর নরপশু তা ২০০৪ সালের ২১ শে আগষ্টের বোমা হামলা হতে রক্ষা পেয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন, আরো টের পেয়েছেন আমাদের আড়াইহাজার উপজেলার এমপি আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম বাবু। সে বোমাবাজদের প্রধান ছিল কওমী মাদ্রসার মুফতি হান্নান। ১৯৮১ সালের পর হতে শেখ হাসিনাকে অন্ততঃ ২০ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০০০ সালের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় সমাবেশস্থলে ৭৬ কেজি ও হেলিপ্যাডের নিকট ৪০ কেজি ওজনের শক্তিশালী দুটি বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে-মুফতি হান্নান নিজেই তা আদালতে স্বীকার করেছেন।
এ জঙ্গিবাদের কর্মে মুফতি হান্নানের সহযোগী ছিল মাওলানা আমিরুল ইসলাম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম এবং তাদের মতাদর্শে উজ্জীবিত হয়ে এ জঘন্য কর্মে সহযোগী হয়েছে আরো ১২ জন। এ ১৪ জন ধর্ম সন্ত্রাসী জঙ্গিদেরকে গুলি করে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে আদালতে (যুগান্তর-২৪-৩-২০২১ই)। আশ্চর্য় যে যখন তাদেরকে ফাঁসি দেয়া হয়, কোনো হত্যাকান্ডে বা ধর্ষণের অভিযুক্ত হয়ে বা বলাৎকারের কারণে, রাষ্ট্রদ্রোহিতার কারণে বা জঙ্গিবাদের কারণে হাত বেধে কোর্টে বা থানায় নেয়া হয় তখনো তাদের মাথায় স্বগৌরবে টুপি পাগড়ী দেখা যায়। তাতে টুপি-পাগড়ীর মর্যাদাটি বাড়লো নাকি কমলো তা বোধসম্পন্ন লোকের জন্য বুঝা কোনো দূর্বোধ্য বিষয় নয়! তাদের জঙ্গি মতাদর্শের অনুসারী বা সাধারণ কিছু মানুষ যারা জুব্বা-টুপি-পাগড়ি দেখে বড় বড় মৌলবী বুঝে তারাও তাদের সমর্থন দিয়ে বলতে থাকে, ওরা ‘আলেমে দ্বীন’ তাদেরকে গ্রেফতার করা বা ফাঁসি দেয়া ঠিক হয়নি। এ মতাদর্শে উজ্জিবীত হয়েই রাস্তায় নেমে বানর নৃত্য শুরু করে দেয়। ওরা কতো ভয়ংকর ধর্ম চোর, ধর্ম ব্যাবসায়ী সে সম্পর্কে বিন্দু মাত্রও এ সমস্ত নির্বোধ গুলোর ধারণা নেই। বাংলার চিরশত্রু রাজাকার ‘জামায়াতে মওদুদী’ আর অন্যান্য জঙ্গি মৌলবাদিদের আকিদা একই, শুধু দল ভিন্ন। সব মৌলবাদিদের ঈমান-আকিদা জামায়াতে মওদুদীর সাথে অভিন্ন সর্ম্পক আছে।
আজকে কওমীরা যাকে ‘কওমী জননী’ বলছে, সে কওমীদের নানা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলার স্বাধীনতাকে পৃথিবীর সমস্ত রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিলেও কওমীদের গুরু ঠাকুর (বলা যায় তাদের ছানি নবী), যাদের মতাদর্শের দোহাই দিয়ে অনুসরণ-অনুকরণ করে আসছে সেই সৌদি সরকার কিন্তু বাংলার স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়নি শেখ মুজিবুর রহমানকে শহীদ না করা পর্যন্ত। যেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে কুখ্যাত সৌদি ওহাবী সরকার সন্তুষ্ট হয়ে তার পরের দিনই বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়েছিল। এ সমস্ত অন্ধ-গোঁড়া, উগ্র-উচ্ছৃঙ্খল মৌলবাদিগণ রাছুলেপাক (সাঃ)-এর পর হতেই বিভিন্ন নামে এরা আত্মপ্রকাশ করছে। যুগে যুগে তাদের ধর্মীয় উন্মাদনার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ওরা হত্যা করেছে/করছে। বর্তমানে ওরা কওমী ওহাবী বলেই পরিচিত। তাদের দ্বিতীয় ঘাঁটিটি হলো দেওবন্দ মাদ্রাসা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে তাদের মধ্যে অন্ততঃ ৪০/৪৫টি শাখা রয়েছে। তার জন্য পড়ে দেখতে পারেন “পরহেজগারীর আড়ালে ওরা কারা !!!” বইটি।
কওমীদের নেতা মৌলবী শফিতো বলেই ফেললেন, “ঈদে মিলাদুন্নবীর মতো জঘন্য বিদআতে লিপ্ত হবেন না (দৈনিক নতুন বাংলাদেশ ও অন্যান্য পত্রিকা)।” মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জন্ম দিনের আনন্দ উৎসব পালন করলে যদি জঘন্য বিদআত হয়, তা হতে বিরত থাকলে হেফাজতি কওমীরা আনন্দ পায়, ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করলে তাদের মনোকষ্ট হয়, তবে আবু জাহেল আর আবু লাহাবের জন্মদিন পালন করলে মনে হয় নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে আনন্দ সৃষ্টি হবে ! মূলতঃ ওদের আকিদা তা-ই। ওরাই মুনাফিক মুয়াবিয়া, ইয়াজিদ, জুলখাইশ, আবু সুফিয়ান, আবদুল্লাহ ইবনে উবাইদের প্রেমিক। তাদের ভাষায় মিলাদ কিয়াম বেদআত, ওরশ বেদআত, গান বাজনা নাজায়েজ, তাজিম সেজদা শেরেক, বায়াত হওয়া লাগবে না, বাবরি চুল না জায়েজ ইত্যাদি ভুতের মন্ত্র আওড়িয়ে চলছে।
আর ধর্ম শিক্ষার নামে স্লোগান দিয়ে মাদ্রাসায় পর্দা উন্মোচনের নিত্য লীলা করে নারী ধর্ষণ জায়েজ, শিকল বন্দি করে পালাক্রমে বাচ্চাদের বলাৎকার করা জায়েজ, চুক্তি করে ইমামতি করা জায়েজ, চুক্তি করে ওয়াজ করা জায়েজ, ধর্ষণের পর হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে মসজিদে গিয়ে ফজর নামাজ পড়ানো জায়েজ, ইমামতির চাকরী নিয়ে বিয়ের কথা গোপন করে আরো ৮/১০টি বিয়ে করা জায়েজ, নারীদের ধর্ষণ করা জায়েজ, মসজিদের মৌলবীর সাথে বিয়ে দিলে বেহেশতে নিয়ে যাবে এ কথা বলে ধর্ষণ করা জায়েজ, নবীর ঘরের (?) দোহাই দিয়ে চাঁদাবাজি-ভিক্ষা-খয়রাতি করা জায়েজ, মসজিদ-মাদ্রাসার নামে চাঁদাবাজি- ভিক্ষা-খয়রাতি করে টাকা ভাগ করে নেওয়া জায়েজ, ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেদের দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করিয়ে লজ্জা-শরম ভাঙ্গানো জায়েজ, ওয়াজের নামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাঁশ সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে টাকা কামানোর ফন্দিফিকির করা জায়েজ, ইয়াতিমখানার নামে সরকারী এবং জনগণের টাকা আত্মসাৎ করা জায়েজ, গাঁজা, ইয়াবা, নকল টাকার ব্যবসা করা জায়েজ, রমজান মাসে ধনী লোকদের দাওয়াত দিয়ে মাদ্রাসার নামে টাকা কামাই করার মতলবটি জায়েজ, বাড়ি বাড়ি/রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বা গাড়িতে ভূয়া রিসিপ নিয়ে মসজিদ-মাদ্রাসার নামে ভিক্ষা-খয়রাতি করে টাকা কামাই করা জায়েজ, -এ ধরনের হাজারো কথা বলা যায় ; তাতেই প্রমাণ ওরা নিজেরাই বহু অন্যায়-অবৈধ কর্মে দিবানিশি কায়েম আছে। এ সমস্ত ক্রিয়া-কর্মগুলো বলুন কোরান-হাদিসের কোথায় পেয়েছেন ? জবাবে হয়তো লেংড়া-লুলা মার্কা কতোগুলো খোঁড়া যুক্তি, নয়তো আপনাদের সমমনা কোনো মোল্লাদের দোহাই দিয়ে ভূতের মন্ত্র আওড়াবেন। পীর-ফকির বা তাদের অনুসারী দের নিকট কথায় কথায় অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দলিল খুঁজে বেড়ান, নিজেদের গায়ে যে হাজার ছিদ্র তা কি চোখে পড়ে না ? পড়লেও দেখবেন না। কারণ, তাহলে ধর্ম ব্যাবসাটি আপসে করে বন্ধ হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে যে তাই !
এ সমস্ত কথাগুলো তুলে ধরলেই অজ্ঞ-মূর্খদের ভাষায় ধর্ম বিরোধী কথা হয়ে যায়, আর তাতে বাহাত্তুর কাতারের লোকজনের পক্ষ হতে হয়তো আদিম চরিত্রের বহিঃপ্রকাশস্বরূপ গোঁয়ার গোবিন্দের মতো প্রেত-নৃত্য করে তার প্রতিবাদ আসবে। ওরা ধর্মের কিছুই বুঝেনি। বুঝে নি ‘রূহে ইনছানির অধিকারীত্বে আসাটাই মানব ধর্ম, দ্বীন ইসলাম।’ আপনার বিবেককে জিজ্ঞেস করুন (যদি বিবেক জাগ্রত থাকে) কথাগুলো কতোটুকু সত্য।
ওহাবীরা নবীজি (সাঃ) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইয়্যেতের বিরোধী। রাছুলপাক (সাঃ) বলেন, “আমার আহলে বাইয়্যেতের বিরোধীতা করা কুফরী (মেশকাত)। আরো বলছেন, “আলীর প্রতি ভালোবাসা এবং ঘৃণার দ্বারা মুমিন-মুনাফিকের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয় (মেশকাত)। সেজন্যই তারা ফতোয়া দিয়েছিল ইয়াজিদের পক্ষে আর ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর বিরুদ্ধে। মোল্লা-মুফতিরা ফতোয়া দিয়েছিল হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ)-কে হত্যা করা জায়েজ। তাহলে কি বুঝা গেল না/চেনা গেল না ওরা কারা!! কারবালার যুদ্ধের সময় এ ফতোয়াটি শীমারের পাগড়ীর নিচে ছিল এবং এ ফতোয়া মাথায় নিয়েই হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর শিরোচ্ছেদ করেছিল শীমার ইবনে জিলজিশান। ওরা নবীজি (সাঃ)-এর আহলে বাইয়্যেতের শেষ সদস্য মাওলা হুসাইন (আঃ)-এর বিরোধী মুনাফিক। সহিহ বোখারীর (বঙ্গানুবাদ) ৫৬২ পৃষ্ঠা আনাস ইবনে মালেক (রাঃ)-এর বর্ণনায় হযরত মাওলা ইমাম হুসাইনের নামের শেষে ‘আঃ’ লেখা রয়েছে, মুনাফিকরা ‘আঃ’ অনুবাদ না করে ‘রাঃ’ অনুবাদ করেছে-ইহাই মুনাফিকদের কাজ, চরিত্র। ওরা ব্রিটিশ গোয়েন্দা মি. হামফ্রের দালাল-এটা আপনারা কেউ বিশ্বাস করতে পারেন বা নাও করতে পারেন, তাতে আমার কিছু বলার নেই, সবই তকদির।
বর্তমানে ওহাবী কওমীরা সৌদি সরকারের সমালোচনা করে চলছে। কারণ, সৌদি সরকার (সালমান) ওহাবী মতবাদের সমালোচনা করছে। বলছে, ওহাবী মতবাদ আমেরিকা-ব্রিটিশদের গড়া। এ মতবাদের জন্যই সৌদি আরব পশ্চাৎমুখী নীতিতে আবদ্ধ হয়ে আছে। মহানবী (সাঃ)-এর ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করলে যদি কওমী ওহাবী মুনাফিকদের বা তাদের সমমনাদের ভাষায় জঘন্য বিদআত হয় তবে আসমান জমিন, আল্লাহ, রাছুল, মুর্শিদ সাক্ষী আমি/আমরা আমৃত্যু ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করে যাবো। কারণ, এ ধরনের মুনাফিকদের আকিদার বিরুদ্ধে কায়েম থাকাই হলো উম্মতে মুহাম্মদীর/ রাছুল প্রেমিকদের ঈমান-আকিদা। হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুলকে প্রাণের চেয়ে ভালোবাসা মুমিনের লক্ষণ (সুরা আহযাব-৬), কওমী ওহাবীরা মুমিন তো নয়-ই, ওরা আমানুও নয়। আল্লাহর নাম নয়, আগে মুহাম্মদ রাছুলের নাম জপো, তাঁর সাথে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করো, তার ভালোবাসাই আল্লাহর ভালোবাসা এবং ইহাই একমাত্র মুক্তি সনদ (সুরা ইমরান-৩১)। কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্জ্ ও যাকাতের মূল হলেন হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুল (সাঃ)। আল্লাহপাক নিজেই ফেরেশতাসহ তাঁর হাবিবে খোদার ছালাতে রয়েছেন এবং আমানুদেরকেও তাঁর হাবিবের ছালাতে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন (সুরা আহযাব-৫৬), রাছুৃলের আনুগত্যই হলো আল্লাহর আনুগত্য (সুরা নিসা-৮০)। এ ধরনের বহু আয়াত কোরানে রয়েছে। সুতরাং আল্লাহর আনুগত্য করতে চাইলে রাছুলের আনুগত্য করতে হবে। রাছুলের আনুগত্য না করলে কাফের হয়ে যাবে। রাছুলের হাতে বায়াতই হলো আল্লাহর হাতে বায়াত হওয়া (সুরা ফাত্তাহ-১০), সরাসরি আল্লাহর হাতে বায়াত হওয়ার কোনো নির্দেশ নেই, হওয়াও যায় না।
“কাজেই যারা নবুয়তে নবী-রাছুল এবং বেলায়েতে ওলিয়ম মুর্শিদ তথা গুরু তথা অলীর নিকট বায়াত না হয়ে আল্লাহর হাতে বায়াত হয়েছে বলছে, ওরা মুয়াহেদ কাফের।
ওলিয়ম মুর্শিদের নিকট বায়াত হওয়াই হলো আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান আনা (সুরা ইউনুছ -১০০, সুরা ফাত্তাহ-১০)। আল্লাহর সন্তুষ্টি, নৈকট্য লাভ হবে মুর্শিদ-গুরুর মাধ্যমে (সুরা মায়েদা-৩৫)। রাছুলের ধূলি নিক্ষেপই আল্লাহ কর্তৃক ধূলি নিক্ষেপ করা (সুরা আনফাল-১৭)। মৌলবাদিদের এবং তাদের আকিদায় নিমজ্জিত অজ্ঞ-মূর্খদের কারণে এবং অন্ধ-গোঁড়া, মূর্খদের অজ্ঞতাপ্রসূত নানা ফতোয়া এবং সন্ত্রাসী ক্রিয়া-কর্মের কারণে বিশ্বের মাঝে খুব দ্রুত মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে-যা মহামারির আকার ধারণ করছে বলে মন্তব্য করছেন জাতি সংঘের মহাসচিব আ্যান্তোনিও গুতেরেস (যুগান্তর-২৩/৩/২০২১ই)। তাদের কারণে মানুষ চরমভাবে বিভ্রান্ত-পথভ্রষ্ট হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের ২৫টি দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে অন্যায়-অত্যাচার, জোর- জুলুম। মনে রাখবে যতো ওহাবীদের (ওরা বহু দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে আছে) মাদ্রাসার ব্যাবসা/প্রচার-প্রসার বাড়বে ততোই মানুষের দুর্দশা বাড়বে, অন্ধ, গোঁড়াদের দৌরাত্ম্য বাড়বে, সাম্প্রদায়িকতা বাড়বে, দ্বন্দ-বিভেদ বাড়বে, মানুষের মনের নির্মল আনন্দ বিলুপ্ত হবে, মুক্ত মনের-জ্ঞানের শিক্ষার (ইলমে সিনা/ইলমে মারেফাত-যা হলো ধর্ম জ্ঞান) চর্চা বন্ধ হবে, বিশেষ করে ওহাবী কওমীদের মাদ্রাসার কারণে।
রাছুলপাক (সাঃ) বলছেন, কেয়ামতের পূর্বে জ্ঞান উঠিয়ে নেয়া হবে জ্ঞানীকে উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে, থাকবে শুধু অজ্ঞ-মূর্খরা। কারণ, সাধারণ মানুষ বেশ-ভূষণের প্রতি দুর্বল, নামাজ রোজার হাকিকত সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই, গুণ-খাছিয়ত দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাও তাদের নেই বিধায় ওহাবী কওমীরা এদিক দিয়ে সুযোগটি লুফে নিচ্ছে। ওহাবী কওমীদের মাদ্রাসায় সভ্য হওয়ার কোনো শিক্ষা মাত্রই নেই, ওদের শিক্ষায় অন্ধ, গোঁড়ামী এবং সংকীর্ণ মন-মানসিকতা সৃষ্টি হয়। মুক্ত মনের শিক্ষার ধারে কাছেও মাদ্রাসার শিক্ষায় নেই। কোরানের জ্ঞান আল্লাহপ্রদত্ত, ইহা আত্মার জ্ঞান, আত্মার জ্ঞানই হলো ধর্ম জ্ঞান ; যে জ্ঞানে মুক্ত মনের মানুষ সৃষ্টি হয়, সাম্প্রদায়িকতার চারি দেয়াল ভেঙ্গে মুক্ত জীবনের স্বাদ উপভোগ করা হয়।
ধর্ম একটিই তা হলো মানব ধর্ম মানবতা, ইনছানিয়াত।
পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষের জন্য এ ধর্ম। অজ্ঞ-মূর্খরা তথা শয়তানের/নারদের/ইভিলের ধর্মে দাখিল হচ্ছে যারা তারাই খোদার ধর্মের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে ফতোয়াবাজি, জোর-জুলুম, অন্যায় অত্যাচার, মানুষ হত্যা করে চলছে।
বুঝা দরকার খোদার ধর্ম দ্বারা ঐক্যতা সৃষ্টি হয় আর শয়তানের ধর্ম দ্বারা বিভক্তি সৃষ্টি হয়।
যারা ইনছানিয়াতের ঐক্যতায় আছে তারাই হলো হিজবুল্লাহ/আল্লাহর দল (হিজবুল্লাহগণ বেশ-ভূষণে নয়, কোনো ভাষা শিখে নয়, কোনো শাস্ত্র-বিদ্যা শিখে নয়, সিবগাতাল্লাহয় সিক্ত হয়ে ইনছানুল কামেল-মোকাম্মেল হয়ে যান ; এরাই হলো গুরু/ মুর্শিদ/ বাকাবিল্লাহধারী)। আর শয়তানের ধর্মে দাখেল হয়ে যারা বিভক্তির সৃষ্টি করে ধর্মের নামে ফতোয়াবাজি করছে, অন্যায় অত্যাচার, জোর-জুলম করছে, মানুষ হত্যা করছে তারা হলো হিজবুশ্শায়াতিন/শয়তানের দল। এরা পরগাছার মতো ধর্মের ছদ্মাবরণে বাস করে পশুত্বের আচরণ প্রকাশ করে চলছে। মানব ধর্ম/খোদার ধর্ম অবশ্যই তাদের মধ্যে নেই, আছে শয়তানের ধর্ম। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইহুদিদের মধ্যেও এ ধরনের নরপশুগুলো ধর্মের আবরণে পাগলা কুকুরের মতো ধর্মের দোহাই দিয়ে, সাদা-কালোর দোহাই দিয়ে একে অন্যকে আক্রমণ করে চলছে। “অহিংসা পরম ধর্ম”- বুদ্ধ দেবের এ বাণীকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে চিনের উইঘুরে মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে, তাদেরকে নামাজ-রোজা/ধর্ম কর্ম করতে বাধা দিচ্ছে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বাড়ি ঘর পুড়িয়ে, হত্যা, ধর্ষণ করে নিজ দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। খাঁটি মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইহুদিগণ কখনো একে অন্যের উপর বা পর ধর্মের মানুষের উপর আঘাত করে না, করবে না। কারণ, তারা ধর্ম কি জিনিস তা বুঝেন, তারা ধর্মকে ধারণ করে ধার্মিক হয়েছেন, শুধু অনুষ্ঠান পালন করে মেকি ধার্মিক সাজে নি। আর প্রত্যেক ধর্মে ছদ্মাবরণে যে নরপশুগুলো বাস করছে ওরা ধর্মের কিছুই শিখেনি, শিখেছে পশুত্বের/অসুরত্বের আচরণ, যেহেতু মানবরূপ তাই এরা হলো নরপশু। এরা ধর্মের হিজাব পড়ে কামড়া কামড়ি করছে (ইয়াজুজ-মাজুজ), খোদার সৃষ্টি এ সুন্দর ধরণীকে অশান্ত, উচ্ছৃঙ্খল- বিশৃঙ্খল, অসভ্যতা (এরাই আদিম জাতি) সৃষ্টি করে নরকে পরিণত করছে। খোদা সুন্দর, খোদার সৃষ্টি পৃথিবী সুন্দর কিন্তু খোদার সৃষ্টি মানুষগুলো নিজ আত্মা হারিয়ে (সুরা আনআম) হায়ানী আত্মার গুণ-খাছিয়তে আবৃত হয়ে আসফালা সাফেলিন হয়ে বিচিত্র পশুর সুরত নিয়ে বাস করছে। আর তার ভিতরে যখন যে পশুর লেজটি নড়েচড়ে উঠে তখন সে পশুরই আচরণ প্রকাশ করে চলছে। তাতে এ সুন্দর ধরণী নরকে পরিণত হচ্ছে, সভ্য মানুষগুলো অসভ্য লোকগুলোর দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে।
কবিতা – নূরের ছবি
লেখক – নাসরিন সুলতানা চিশতী
অপলক নেত্রে আমি দেখিতে যে পাই
সে নূর মাখা চরণে আমি প্রণাম জানাই।
নিরাকারকে আকার করে আসিলেন ধরায়
সীমে এসে ধরা দিয়ে শূন্যেতে মিলায়।
কে বলিলেন কার কথা বেনজীরের মাঝে
যার কথা সেই তো বলে কেবা তাহা বুঝে।
জ্যোতির্ময় নূর যেন জ্বলে ধিকে ধিকে
নূর হতে নূরের প্রকাশ হলো এই জগতে।
ইলমে লাদুন্নীর ধন বয়ে বেড়ান তিনি
অসীম সাগরের মতি নিয়ে এলেন যিনি।
জানিতে পারি না তাকে বিস্মৃত হই
আধারময় হৃদয় আমার অচেতনে রই।
মানবরূপে ভেবে কেউ করো নাকো ভুল
জ্ঞান দর্পনে চেয়ে দেখো ঐতো আল্লাহ-রাছুল।
জ্ঞান দিয়ে ধর এবার অধরার ধন
নইলে কপাল পোড়া হবে, হবে পদস্খলন।
অজানা এক দেশের কথা করিলেন বর্ণন
সেই দেশে যেতে আমার মনের আকিঞ্চন।
সরল দেশে সরল মানুষ, শান্তির সেই নীড়
এমন দেশে যেতে আমি হয়েছি অস্থির।
প্রবন্ধ – সিয়াম সাধনা
লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী
ইফতার (ফাতার) পর্ব যত তাড়াতাড়ি শেষ করবে তত শীঘ্রই রোজা পালন বা সিয়াম সাধনার উপযোগী হবে। সকল প্রকার গর্হিত কাজ হতে ইন্দ্রিয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গুলিকে বিরত রাখাই রোজার হাকিকত। দেহগত, নফসানিয়াত ও হায়ানী আত্মার গুণ খাছিয়ত বর্জন এবং ষড়রিপু দমনই হলো আত্ম সংযম তথা প্রকৃত সিয়াম সাধনা।
প্রবন্ধ – দ্বীনে মোহাম্মদীর কিছু কথা
লেখক – সালমা আক্তার চিশতী
অনুরাগ বিহীন হায়ানীয়াতময় অন্তর হলো একটি চিড়িয়াখানার সমতুল্য। কারণ, চিড়িয়াখানার খাঁচার মাঝে সব জীব-জন্তু বাস করে। মানুষের দীল পরিশুদ্ধ না হলে ঠিক চিড়িয়াখানার মতো তার দীলের অবস্থানটি হয়। দুনিয়ার লোভ ও মোহের সুতাগুলো এতই শক্ত যে, মুক্তির দর্শনের আহ্বানটি কানে ও হৃদয়ে প্রবেশ এবং আঘাত করতে পারে না। একজন মানুষের ভুল-ভ্রান্তি গুলো কাটাতে হলে মনকে কাঁদা মাটির মতো করতে হবে।
যেমন, যখন বাচ্চা ছোট থাকে কথা বলতে পারে না তখন মা বাচ্চাটিকে কথা বলা শিখায়, তেমনি গুরু তাঁর একজন শিষ্যকে তরিকত জগতের কথা বলতে বলতে তাকেও তাঁর মতো কথা বলা শিখিয়ে থাকে এবং সে কালামের মাধ্যমেই জ্ঞানালোক ভক্ত মনে আলো সৃষ্টি করে। আদব, নম্রতা থাকলে একজন কামেল ইনসানে পরিণত হওয়া যায়। কারণ, তরিকত দেশের মূল হলো এই আদব, নম্রতা, তমিজ-তাজিম। গুরুর নিগুঢ় ভাবের দরিয়ার মাঝে যদি লাফ দেওয়ার ইচ্ছা থাকে তবে আদব, নম্রতার নূর লাগবে। যেমন, একটি কাঠের টুকরাকে যে কোন ফার্নিচারের রূপ দেওয়া যাবে তেমনি একজন শিষ্য যদি এই রূপে থাকতে পারে তবে গুরু তাঁর মনের মতো করে শিষ্যকে ভক্তের আকার দিতে পারবে। যারা মোল্লা পীরের পাল্লায় পড়ে শুধু দোয়া-দরূদ পড়েই ছোয়াবের ব্যাবসা করছে তারা মনে করে শুধু এই দোয়াগুলো পড়লেই আখেরে মুক্তি মিলবে এই ধরনের ধারণাগুলো ভুল। কারণ, মোল্লারা জানে কিভাবে একজন মানুষের গিবত করতে হয়।
আমার নিজ চোখে দেখা এক কওমি মোল্লা ছোট ছোট বাচ্চাদের থেকে তথ্য নিয়ে পীর-মুর্শিদের গিবত চর্চা করে থাকে। সে আর ভাবলো না সে যে কত বড় জঘন্য কাজটি করতেছে। এর দ্বারা সে তার নিজের আখের সিজ্জিনে অবস্থান করার রাস্তা তৈরী করে নিচ্ছে। কওমি খারিজি মোল্লারা পীর/গুরুর পিছনে এই ভাবে লেগে থাকতে পারে তা প্রমাণ সহকারে আমি নিজেই অনেকবার দেখেছি। যেমন, কেউ কারো সাথে ঝগড়া করলে সে স্বাভাবিক ভাবেই যার সাথে ঝগড়া হচ্ছে তার বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকবে কিন্তু মোল্লাদের অবস্থা ঠিক বিপরীত। তারা কোন কারণ ছাড়াই একজন মানুষের বিরুদ্ধে খারাপ বক্তব্য পেশ করবে। কারণ, এটা হলো মোল্লাদের বিকৃত স্বভাবের ফলাফল, হয়তো বা তাদের শিক্ষার কুফল। তাদের এই স্বভাব দ্বারা জাহান্নামের টিকেট বিনা মূল্যে কিনে নিচ্ছে। আধ্যাত্মিক জ্ঞানীগণ আলেম- মোল্লাদেরকে ঘৃণা করে থাকে, এই ঘৃণাটা ব্যক্তি হিসেবে নয়, ঘৃণা করার কারণ হলো তারা আক্ষরিক বিদ্যা বা ইলমুল কালামকেই ধর্ম জ্ঞান বুঝিয়ে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে চলছে। আর তাদের এ কু-স্বভাবটি (গুরু/পীর/ফকিরদের বিরুদ্ধে) এমন যে তারা (চৌদ্দ আনা) জান ত্যাগ করতে রাজি কিন্তু তার এই গিবত করার স্বভাবটি ছাড়তে রাজি না। সে এই গিবত করাকে ভাবতেছে জান্নাতি সুখের মতো আবার এই বেলেহাজ মোল্লারাই বলে থাকে গিবত করা মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সমতুল্য। ফতোয়া অন্যের জন্য কিন্তু নিজের জন্য কোন ফতোয়া নেই। কারণ, ব্যক্তি স্বার্থ থাকলে বিবেক জাগ্রত থাকে না। দেখা যায় তারা সব সময়ই মৃত ভাইয়ের মাংস খেয়ে থাকে। গিবত করাটা হলো তাদের নেশার ন্যায়। কারণ, গিবত না করলে তাদের পেটের ভাত হজম হয় না। যারা অন্ধ তারা এই ওহাবী-খারিজি মোল্লাদের পাল্লায় পরে গোল্লায় যাচ্ছে/পথভ্রষ্ট হচ্ছে। আর যারা গুরুর নিকট বায়াত না হয়েই যারে তারে গুরু দাবী করছে-ওরা এক ধরনের মস্তিষ্ক বিকৃত পাগলের মতো। তাদেরও কোনো বন্দেগী আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।
হযরত আবুল হোসেন খেরকানী (র.) বলছেন- “অনেক লোক ভূমির উপর বিচরণ করে, কিন্তু তাহারা মৃত। আর অনেক লোক ভূমিগর্ভে শায়িত, কিন্তু তাঁরা জীবিত”। এই অবস্থাটি একজন গুরু বুঝতে পারেন। কারণ, অন্তর্দৃষ্টি দ্বারাই তা উপলব্ধি করা যায়। এমনও ব্যক্তি দেখা যায় তরিকতের দোহাই দিয়ে স্বপ্নে খেলাফত পেয়েছে বলে দাবী করে পীর সেজে গেছে। যে স্বপ্নের দোহাই দিয়ে পীর সেজেছে সে তো মরবেই (মানব জনম হারাবে), সাথে যারা এ ধরনের খোয়াব নামা পীরের পিছনে লেজ তুলে দৌড়াচ্ছে তারাও আলমে নাছুতের সাগরে ডুবে মরবে। কারণ, এ দু’টির একটারও মানব ছুরত ঠিক থাকবে না। অনেক আলেম-মাওলানারা মাদ্রাসার বিদ্যা শিখে বা মসজিদে চাকরী করে পীর/গুরু দাবী করছে, তারাও বাতিল বা নাকেছ পীর। পীর হওয়াটা কি সোজা কথা। ইলমে এলাহী বা ইলমে মারেফাত/ইলমে গায়েব যার জানা নেই সে কখনো পীর/গুরু হতে পারে না। কেউ কেউ নিজে বায়াত না হয়েই পীর সেজেছে, কেউবা গাঁজা খেয়ে লাল কাপড় পড়ে ফকির/সাধু ইত্যাদি উপাধি নিজের নামের সাথে ব্যবহার করে মানুষকে প্রতারণা করে চলছে। আমাদের এলাকায় এ ধরনের বেশ কিছু লোক রয়েছেÑযারা কোনো পীরের নিকট বায়াত/মুরিদই হয়নি অথচ পীর সেজে আছে। তাদের মধ্যে কেউবা ওরশ শরীফও করছে। এরা ওহাবীদের চেয়েও ভয়ংকর। খোদার ভয় যদি বিন্দু পরিণাম দীলে থাকতো তবে আর এই রূপ কর্মকান্ড করত না। তাদের দ্বারাই সমাজে তরিকতের বিভিন্ন মতভেদের সৃষ্টি হয়ে থাকে/সমালোচনার কারণ হয়ে থাকে। কারণ, তরিকতের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে আইনুল ইয়াকিন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাঝে। যখন এমকান ও ওয়াজেব এক দরশন হয় তখন মানুষের সাধনায় সিদ্ধি অর্জন হয়।
যাদের গুরুর ঠিকানা নেই/বায়াত হয়নি তারা যতই তরিকতের নাম দিয়ে দোয়া-দরূদ, তসবিহ জপবে তার কোনোই পূণ্য লাভ হবে না, বরং জাহান্নামের দরজার দিকে দ্রুত অগ্রসর হবে। আহাম্মকগুলো সে ভেদ জানে না/বুঝে না। কারণ, ভক্তের মুক্তির জন্য গুরুর সন্তুষ্টি অর্জন হলো সর্ব উৎকৃষ্ট দয়া-করুণা। আমার মুর্শিদ কেবলা হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী (র.) তাঁর একটি গানের মাঝে বলছেনÑ ‘বেদ, কোরান, বাইবেল, গীতা সকলের মূল মুর্শিদ তোমার ভজন কর তার।’ এই মায়ার জগত থেকে বাহিরে যেতে হলে একনিষ্ঠ চিত্তে মুর্শিদের আনুগত্যময় অনুসরণ করতেই হবে। সমস্ত শাস্ত্র-বিধানের উপরে আছে মুর্শিদ/গুরু, তাঁর থেকেই সমস্ত শাস্ত্র-বিধান আগমন ঘটে। দেখা গেছে আগে এই জগতের মাঝে মানুষ এসেছে তার পর তার উপরে আসমানি কিতাবগুলি নাজিল হয়েছে। এই কথার ভেদ রয়েছে তা একমাত্র একজন মুর্শিদই বলতে পারেন। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (র.) বলছেন ‘সমস্ত কিছু ত্যাগ করে তুমি কোন কামেল ওলীর গোলাম হয়ে যাও, তবেই তুমি ধর্মের স্বাদ গ্রহন করতে সক্ষম হবে।’ আমাদের মতো ভক্তি-ভজনহীন সাধারণ মানুষের জন্য গোলাম হওয়াটা সহজ ব্যাপার নয়। যেমন, একটি পুকুরের মাঝে মাছ থাকে পুকুরের পানিগুলো যদি ময়লা থাকে তবে মাছগুলো মরে যাবে তেমনি তরিকত জগতটা পুকুরের পরিষ্কার পানির ন্যায়।
তরিকতের নাম দিয়ে বিভিন্ন মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়ায় অথচ দেখা যায় তাদের পীর অথবা মুর্শিদের খবর নেই অথবা গুরুর প্রতি তাদের তেমন কোনো ভালো ঈমান বা ধারণা নেই। যার পীর নেই তার পীর হলো শয়তান। গুরু ব্যতীত অন্য কিছুকে গ্রহণ করা একজন ভক্তের জন্য হারাম। আমার মুর্শিদ কেবলা হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশ্তি নিজামী তাঁর আলোচনার মাঝে বলতে থাকে যার ঘরে চাল আছে সে আর ভিক্ষা করতে কোথাও যাবে না। যারা ঘরে চাল রেখে ভিক্ষা করে তা তাদের স্বভাব দোষেই করে। তেমনি যার পীর রয়েছে (যে নিজেকে গুরুর নিকট পরিপূর্ণ সমর্পণ করেছে) সে আর পীরের অনুমতি ছাড়া বিভিন্ন মাজারে/নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াবে না। কারণ, যার জন্য বা যাকে দেখার জন্য নানা স্থানে ঘুরবে সেতো তারই গুরু/মুর্শিদ! পীরবিহীন লোক হলো মুর্দা, ঈমানশূন্য। যখন একজন মানুষ বায়াত হয়ে যায় তখন তার সব কর্মের মূলে থাকবে পীর, পীরের অনুমতি ছাড়া চলাটা হবে অসার। যেমন, আমরা রাস্তা দিয়ে পথ চলতে থাকি ঐ পথের মাঝে যদি বাধা আসে তবে আর আমরা পথ চলতে পারব না তেমনি একজন মানুষ যখন বায়াত হয় তার পথের মাঝে শয়তান সর্ব অবস্থায় বাঁধাস্বরূপ এসে দাঁড়িয়ে থাকে। এই শয়তানকে চিনতে হলে গুরু জ্ঞানের আলো লাগবে।
গুরু জ্ঞানের আলোর অধিকারী হতে হলে মুর্শিদের হুকুম আহকাম মেনে চলতে হবে। যে সেই হুকুম আহকাম মেনে চলতে পারে ঐ ব্যক্তি আলোর সন্ধান পাবে। যে নিজ প্রবৃত্তি বা স্বভাবকে নিয়ন্ত্রণ করতে পরেনি সে জুলমাতের মাঝে আটকা পরে যাবে। দীলের অন্ধত্বকে যে আঁকড়িয়ে ধরে রাখে সে এই মায়া জালের মাঝে পরে হাবুডুবু খাচ্ছে। যারা গুরুর অনুগামী হবে তারা সবুজ রঙ্গের বৃক্ষরূপ ধারণ করবে। একই জায়গায় ভালো মন্দের অবস্থান। ভালো মন্দের দুইটি রং রয়েছে একটি কালো এবং আরেকটি হলো সাদা। যারা গুরুকে রেখে গোবিন্দ ভজে তারা কালো রঙ্গের অজুদ ধারণ করবে। আর যারা গুরুকেই মূল হিসেবে ধারণ করবে তারা সবুজ বৃক্ষস্বরূপ জ্যোতির অধিকারী হবে।
আমার মুর্শিদ কেবলা কাবা হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী বলছেন-
“যাঁরা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত তথা সিবগাতাল্লাহয় ভূষিত তথা প্রভুসত্তার বৃত্তিতে সিক্ত, তারাই হলো ধার্মিক”।
আমাদের তরিকত জগতে যারা গুরু ভিন্ন অন্য কিছু ধারণ করবে সে ধার্মিক হতে পারবে না। কারণ, ধার্মিক হওয়া সোজা নয়। ধার্মিক হতে হলে মনের আমিত্বকে বিলুপ্ত করতে হবে। মনের মাঝে যদি হায়ানী স্বভাবের বীজ রোপন করা হয় তবে আর ধার্মিক হওয়া যাবে না। যেমন, একটি চাদর খাটের শোভা বর্দ্ধন করে। চাদরটি যখন ময়লা হয় তখন তা আমরা উঠিয়ে ফেলি ধোয়ার জন্য। ময়লা চাদরের মাঝে সাধারণতঃ মানুষ বসতে চায় না, তেমনি আমাদের দীলের মাঝে যে ময়লা রয়েছে তা ধোয়া না হলে খোদা এসে ধরা দিবে না। দীলের খাটের মাঝে যে বিছানা করেছি সেই বিছানা অনুসারে খোদা এসে আসন গ্রহণ করবে।
পবিত্রতা হলো ইমানের অঙ্গ। দীলের পবিত্রতা অর্জন করতে হলে দীল সাফাই করতে হবে গুরুর বাণী দ্বারা। গুরুর কালাম দীলে ধারণ করতে পারলে তা সম্ভব। যেমন, কবুতর যারা পালে তারা নতুন কবুতর বাড়িতে এনে কবুতরকে তার ঘর চিনাবার জন্য ঘরের সাথে খাঁচা বেধে রেখে কবুতরকে তার ঘর চিনানো হয়। তেমনি মানুষ গুরুর কাছে যাওয়ার পর তার নিজ ঘরকে চিনতে হলে গুরুর ঘরের সাথে যোগ সূত্র স্থাপন করতে হবে। তবেই অচেতন মনকে চেতন করতে পারবে। যেমন, ঠান্ডা থেকে গলাকে সেইফ করতে গিয়ে গলার মাঝে মাফলার পেঁচিয়ে রাখা হয় আবার এই মাফলার দুই দিকে ধরে যদি কেউ জোরে টানাটানি করে তবে মানুষের মৃত্যু হতে পারে, তেমনি তরিকার নাম দিয়ে যারা নোংড়া পথে চলে তারা আসলে আত্মাকে বাঁচানোর নাম করে আত্মাকে টানাটানি করে মেরে ফেলছে। একই রুহ/আত্মা পাঁচ ভাগে সর্ব সৃষ্টিতে মুহিত আছে। তারা পাঁচ রকমের আত্মার মাঝে হায়ানী আত্মাকে বেছে নিয়েছে। কারণ, তারা গুরু কি ধন তা বুঝে না।
গুরু ধরতে হবে তারা তা বুঝেও না বুঝার ভান ধরে থাকে। যারা এই জগতের মাঝে তরিকতের জগতটা বুঝে না তারা এই বিকৃত ধারণা যারা করে তাদের থেকে কিছুটা ভাল। তারা হলো তরিকতের শত্রু, তাদের জন্যই তরিকতের বদনাম হচ্ছে। নেড়া মতের লোকেরা যেই সমস্ত বস্তু আহার বিহার করে থাকে তা পশুরাও খাবে না। এই জগত থেকেই তারা তাদের খাদ্য নির্ধারণ করে যাচ্ছে। একজন মানুষের খাবার আর একটি পশুর খাবার এক নয়, এই খাবারের মাঝে আকাশ জমিন তফাত থাকে। এই জগত থেকেই আখেরাতে যে তাদের বিকৃত চেহারা হবে তা তাদের বদ স্বভাব দ্বারা বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। কারণ, যাদের মানব জনমটা চিরস্থায়ী হবে তাঁরা হবে গুরুর অনুসারী। তাঁরা হলো রুহুল কুদসের অধিকারী। কোন পীর মুর্শিদের নামের দোহাই দেওয়ার বাহানা করে অসৎ কর্মকান্ড করলে তার ফলাফল হবে অতি ভয়াবহ। এই সমস্ত অসৎ কর্মকান্ডের ফলাফল এই নাসুতের জগতে বাস করার কারণে হচ্ছে। তাদের অন্ধত্বের কারণে তারা তা দেখতে পায় না। এই অন্ধত্ব হলো দীলের।
‘চির সৌভাগ্যবান-ব্যক্তিগণ আপন পীর-মুর্শিদের নির্দেশ সত্ত্বেও নিজ পীরকে ত্যাগ করে অন্য হক্কানী পীরের খিদমতে আত্মনিয়োগ করাকেও বৈধ মনে করেননি। আর এ ত্যাগ করাও এমন মহান ছিলো যে, ঝর্ণার নিকট থেকে গভীর সমুদ্রে ছুড়ে যাওয়া। এতদসত্ত্বেও পীরের আস্তানা ছেড়ে যাওয়াকে সঙ্গত মনে করেননি’ (বায়াত ও খিলাফতের বিধান ২৪ পৃঃ)। পীর ব্যতীত অন্য কিছু ধারণ করা একজন মুরিদের জন্য কুফুরীর সমতুল্য। নিজ পীরকে রেখে অন্য পীরের নিকট যাওয়াই বুঝতে হবে তার ঈমান সঠিক নয়। আবার পীরের উসিলা দিয়ে অপকর্ম করলে তার ফলাফল এমন হবে তখন আর মানব কুলে বাস করা তার সম্ভব হবে না। কোন কুলে বাস করবে তা এই জনম থেকে বুঝা যাবে না, যদিও জ্ঞানীগণ তা স্বচোখে ইহলোক হতেই দেখেন। সুতরাং তা বুঝতে হলে দিব্য দৃষ্টিওয়ালা পীরের নিকট গিয়ে সে ভেদ জানতে হবে। কারণ, তাঁরা ইহকাল ও পরকাল দুই কালই বর্তমান দেখেন। যেমন, একটি ফুলের তোরা তৈরী করতে হলে প্রথমে একটি শলা/কাঠির মাধ্যমে ফুলগুলোকে কক্সিটের মাঝে আটকে রাখতে হয় তেমনি ভাবে বায়াত হয়ে পীরের সাথে সংযোগ স্থাপন করা হলে একজন ইনসানুল কামেলে পরিণত হওয়া যাবে। আর যারা বায়াত অস্বীকার করবে তাদের অবস্থা এমন হবে- ‘যে ব্যক্তি ইমামের অনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নিলো, যে কিয়ামত দিবসে আল্লাহর সাথে এমতাবস্থায় সাক্ষাৎ করবে, তার হাতে কোন দলীল থাকবে না। যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো যে, তার গর্দানে বায়াত (আনুগত্যের) বেড়ি থাকলো না, সে জাহেলীয়াতের মৃত্যুবরণ করলো’ (বায়াত ও খিলাফতের বিধান ৩১পৃঃ)।
পীর অথবা মুর্শিদের নিকট বায়াত হওয়টা হলো প্রথম ধাপ, তারপর দ্বিতীয় ধাপ হলো নিজ আপন সত্তা থেকে খান্নাস্রূপী শয়তানটিকে সরিয়ে ফেলা এই খান্নাসটিকে সরানো হলে তৃতীয় ধাপ কামেল ইনসান হওয়া যাবে। যেমন- মাছ চোখ খুলে ঘুমায় তেমনি একজন মানুষকে চোখ খুলে ঘুমাতে হয়, না হলে ঘরের সব মাল চোরে লুট করে নিয়ে যাবে। এই চোখ খুলে ঘুমানোটা আধ্যাত্মিক জগতের জ্ঞানীগণ জানেন। আল্লাহর অলীগণ ঘুমায় না, এই ঘুম যে কিসের ঘুম তা এই অচেতন জীব মানুষেরা বুঝে উঠতে পারে না। এইরূপ না পারাটা তাদের তকদিরে লেখা রয়েছে। কারণ, তারা তাদের তকদীরকে পরিবর্তন করতে চায় না। খোদা মানুষকে তার সকল নিয়ামত দ্বারা সুসজ্জিত করেছে। সেই নেয়ামতকে অপব্যাবহার করে মানবরূপী শয়তানের রূপ ধারণ করছে। আমিত্ব মুক্ত হওয়ার চেষ্টা সাধনা করতে হবে মন দিয়ে, না হলে শয়তান মানবীয় মনকে অচেতন করে আধারে ঘিরে রাখবে। আর যারা বায়াত না হয়েই অমুকের তমুকের দোহাই দিচ্ছে/গুরু পুজা করতেছে তারা বিনা প্রশ্নে পরীক্ষা দিতেছে। কারণ, যারা পীর মুর্শিদের নিকট বায়াত, তাদের দলীল রয়েছে তারা এই দলীল অনুসারে বিভিন্ন পরীক্ষা দিয়ে থাকে। যেমন, পড়ালেখা না করলে পরীক্ষায় কিছুই লেখা যায় না, তেমনি গুরুর নিকট প্রথম যেতে হবে তারপর তাঁর কথা মতো পড়ালেখা করতে হবে তবেই গুরুর দেওয়া পরীক্ষাগুলো পাশ করা যাবে।
এই মানব জনমটা হলো পরীক্ষার জনম, একজন গুরুভক্তের প্রতি মূহুর্তে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। এই পরীক্ষাগুলো পাশ করতে হলে একনিষ্ট চিত্তে সাধনা করতে হবে। এই সাধনা করতে হলে অনেক ধৈর্য্য ধারণ করে চলতে হবে। এই ধৈর্য্য ধারণ করে চলার মাঝে মিলবে মাওলার দর্শন। এই দর্শনটা এই ইহজগতের নয় এর ফলাফল হবে পরকালে। কারণ, গুরু করণ একনিষ্ট ভাবে করার মাঝে রয়েছে পরকালের শান্তি। ইহকাল-পরকাল এক সাথেই আছে। এই শান্তিটাই হলো নফস মোৎমাইন্নার অধিকারী হওয়া, আর নফস মোৎমাইন্নাহ নফস রহমানীতে ওয়াছেল/বিলিন হয়ে বাকা লাভ করে। তখন ঐ মানুষটাকে দেখলেই এবাদত হবে। যেমন, মাটির মধ্যে খৈ পরে গেলে সেই খৈটা আর কেউ খেতে চাইবে না কিন্তু এই খৈটাকে ভাজতে হলে কিন্তু বালুর প্রয়োজন হয়, বালু হতে ছেকে খইগুলোকে তুলে আনা হয় তখন আর কেউ বলে না খই খাবো না। তেমনি এই সমাজের লোকদের অবস্থা, তারা গুরু ভজন না করে সরাসরি আল্লাহর এবাদত করে আর যারা গুরু ভজন করে তাদেরকে ঘৃণা করে। এ সমস্ত অন্ধ-বধিরদের ভাবনা তারা বেহেশত লাভ করবে। এই কাল্পনিক বেহেশতটাই হলো সমস্ত ধ্বংসের মূল। বিনা দলিলে গুরুকে না মানা গেলে তার গুরু ভজনই হবে না।
নফসে মোৎমাইন্নাহর অধিকারী যারা হয়েছে তার বিনা দলিলে গুরু ভজন করে যাবে এবং বর্তমান মানবী জান্নাতে বাস করবে। তাদের গুরু ভজনের/ বিশ্বাস-ভক্তি-প্রেমের মাঝে কোন ত্রুটি থাকবে না। আর যারা পীরবিহীন/বেমুরিদ তাদের অবস্থান এইরূপ হবে, লোকদের জন্য করণীয় যে, কোন পীরের দীক্ষা গ্রহন করা। কারণ, পীরহীন লোক কখনো (উভয় জগতে) সফলতা লাভ করতে পারে না। আবূ ইয়াযিদ (হযরত বায়েজিদ বোস্তামী) এইটাই বলেছেন যে, ‘যার কোন পীর নেই, তার পীর শয়তান’ (বায়াত ও খিলাফতের বিধান ৪৭পৃঃ)। গুরুর হাতে হাত দিয়ে বায়াত হওয়া হলো ফরজ। আর যারা গুরুর নিকট বায়াত না হয়ে তরিকার দাবি করে তাদের শাস্তিটা দ্বিগুণ হবে। কারণ, তারা তরিকতের নাম দিয়ে তাদের অপকর্মগুলো চালিয়ে যায়। এই বিষয়টা এক প্রকার অশ্লীলতা এবং চরম পথভ্রষ্টতা। তারা তরিকতের নাম দিয়ে এই ধরনের কাজ করে থাকে। কারণ, পীর মুর্শিদের অনুসারী বা অনুগামীরা এইরূপ কর্মকান্ডে জড়িত হবে না/হওয়া উচিত নয়। এই মানব জনমটা অতি ভাগ্য গুণে পাওয়া গেছে। এখন একজন মানুষের কর্ম হলো গুরু ভজন করে মুক্তির দেশে ধাবিত হওয়া।
একজন ধার্মিক হলো চিরমুক্ত ও স্বাধীন। ধর্মের নামে যারা অধর্ম করে থাকে তারা চিড়িয়াখানার জীবদের মতো কারাগারে বন্দী জীবন যাপন করবে। নিজ মানব ছুরতটাকে আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য এই মানব জনমে আসা হয়েছিল। সেই মানব মুক্তির পথটাকে ভুলে মন অচেতন হয়ে আছে। এইরূপ পথভ্রষ্ট পাগলদের থেকে যতটা দূরে থাকা যায় ততটাই মঙ্গল। ‘এ প্রকার পীর-মুর্শিদ বিহীন লোকের সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। তার ইবাদত বন্দেগী সবই ধ্বংসে নিপতিত। তাকে প্রথমে ছালাম দেয়া নিষেধ। কিয়ামত দিবসে তাঁর পুনরুত্থান হবে শয়তানের দলের সাথে’ (বায়াত ও খিলাফতের বিধান ২৭পৃঃ)। যারা এই গুরু ভজনের নাম দিয়ে খোদার বিরোধীতা করে থাকে তারা জাহান্নামী অজুদ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তারা কালের বিবর্তন ধারার মাঝে পরে যাবে। তাদের এই কু-স্বভাবটাকে দেখলে মনে ঘৃণার জন্ম নেয়। কারণ, ভুল করারও একটা সীমা থাকা প্রয়োজন, মানব ছুরত ঠিক থাকবে সঠিক চিন্তা, ভক্তি-বিশ্বাসের দ্বারা। গুরুর দয়ায় যেই শিষ্যের উপর পরবে সেই শিষ্যের আর পাপ থাকবে না। গুরুর নাম-রূপ ধ্যান সাধনায় মনের পাপ কেটে পুণ্যের উদয় হয়- একথায় যার বিশ্বাস নেই সে কখনো মুরিদ হতে পারে না।
ভক্তি-বিশ্বাস, ধীর-স্থির চিন্তা চেতনা দ্বারাই গুরুকে জয় করা যায়, এই অবস্থাটি যার অর্জন হয়েছে সে পারে এই মায়ার পৃথিবীকে জয় করতে। তকদিরের ভাল মন্দ লুকিয়ে আছে মানব জনমে সঠিক ও ভুল পথ চলার মাঝে। যার যার তকদির সে নিজেই তৈরী করে নেয়। যেমন- একটি প্রবাদ বাক্য রয়েছে, ‘বেশী উচু হলে বাতাসে ভাঙ্গে আর বেশী নিচু হলে ছাগলের পাড়া খেতে হয়’। যারা মধ্য পথ অবলম্বন করবে তারা এই নাছুতের জগত অতিক্রম করে হাহুতের জগতে পৌঁছে যাবে এবং তারাই শান্তির জগতে থাকবে। ভাল থাকাটাই হলো মানব সুরতে কায়েম থাকা। এই অচেতন মনকে চেতন করতে হলে গুরুর দয়া লাগবে। গুরু দয়া করলেও তাদের স্বভাব অনুসারে গুরুর দয়া তারা ধারণ করতে পারে না। কারণ, স্বভাবে তারা মৃত, যারা জীবিত তাদের কাছে গুরুর দয়া পৌঁছবে না। গুরু তাঁর শিষ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে সে ভুল পথ থেকে বের হয়ে আসে কিনা। গুরু ধারণ করে আছে নফসে রহমানীর গুণ খাছিয়ত, ভক্ত যদি গুরুর গুণ ধারণ করতে পারে তবে ভক্তও নফসে রহমানীর গুণ ধারণ করতে পারবে। খোদার রহমত সর্বদাই মানুষের উপর বর্ষিত হতে থাকে। যারা গাফেল তারা তা দেখতে পায় না, বুঝে না। গাফেল হৃদয়ে গুরুর রহমতের নূর পৌছায় না। কারণ, গাফেল অন্তরের মাঝে অন্ধকার এসে খোদার নূরের আলো আসতে বাধা তৈরী করে রাখে। এই দেখতে না পাওয়াটার মাঝে খোদার দেওয়া সাতটি নূরি সেফাতের দুইটি সেফাত আলিমুন ও বাসিরূনের পর্দাবৃত করে রাখা হয়েছে। এই পর্দাটা হলো নিজ ভুলের ফসল। মানুষ অহরহ ভুল পথে অগ্রসর হতে থাকে। ভুল করাটা সোজা কিন্তু ভুল থেকে বের হয়াটা কঠিন। যেমন, মাছ না বেঁছে খাওয়া হলে গলার মাঝে কাটা বিধঁতে পারে সে কাটা গভীর ভাবে আটকে গেলে ডাক্তারের কাছে না যাওয়া হলে তা খোলা যায় না। তেমনি অবস্থা হয় এই নেড়া ফকিরদের দশা তাদের গলার মাঝে হায়ানী স্বভাবের কাটা বিধে আছে তা খুলতে হলে গুরু নামক ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তবেই একজন প্রকৃত মানব হতে পারবে। সক্রেটিস বলছেন “একমাত্র শুভ হলো জ্ঞান, আর একমাত্র অশুভ হলো অজ্ঞতা।”
যারা জ্ঞানী তারা তাদের সঠিক পথ অবলম্বন করেই নিজ মানব জীবন টাকে অতিবাহিত করে থাকে। কারণ, তারা ভাল কোনটা আর মন্দ কোনটা তা জানে। এই জানার ভিতরে ভালটাকে আকড়ে ধরতে পারলেই মুক্তি নিশ্চিত।
প্রবন্ধ – আসরারে পাঞ্জাতন – ৫ম পর্ব
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
‘নূর নামা’ কিতাবে বর্ণিত আছে আল্লাহপাক নূরনবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামকে সৃষ্টি করার পর একদিন আল্লাহপাক বললেন, “হে আমার হাবিব! আমি চারটি জিনিস সৃষ্টি করেছি আর তা হলো –
১। মাটি
২। পানি
৩। আগুন ও
৪। বাতাস
এর মধ্যে হতে একটাকে আপনার অধিকার করতে হবে, বাকি তিনটার শুধু প্রভাবই থাকবে। এর একটা দিয়ে আমি মানবজাতি সৃষ্টি করবো এবং বাকি তিনটিও তাতে সংমিশ্রণ থাকবে। আপনার যে কোনো একটা পছন্দ করতে হবে। আল্লাহপাকের এ কথা শুনে আল্লাহর হাবিব আরবা আনাছের মধ্যে প্রথমে ‘পানির’ নিকট গেল। নূরনবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম দেখলো পানি ধ্বংসের নেশায় ভরপুর। হাবিবে খোদা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম তখন পানিকে দেখে বললেন, আচ্ছালামু আলাইকুম। পানি জবাব দিল, ওয়া আলাইকুম ছালাম বলে। পানি জানতে চাইলো আপনি কে ? নূরনবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বললেন, আমি আল্লাহপাকের সৃষ্টি। তুমিও তাঁর সৃষ্টি। শোন হে পানি! আল্লাহপাক এক জগৎ সৃষ্টি করবেন এবং তোমাকেও সেখানে থাকতে হবে, তোমার এ ইচ্ছা ত্যাগ করো। আমাদের ইচ্ছা বলতে কিছু রাখা ভালো নয়। আল্লাহর ইচ্ছাই ইচ্ছা। আল্লাহকে খুশী করাই আমাদের কাজ, তুমি এখন তোমার দোষ-ত্রুটিগুলো জানো। পানি বললো, আপনি বলুন আমার কি দোষ-ত্রুটি আছে। নূরনবী বললো তোমার মাঝে ধ্বংসের গৌরব আছে, তুমি তা ত্যাগ করে পবিত্র হও। কারণ, তোমার দ্বারা আল্লাহপাক দুনিয়ার সব কিছু পবিত্র করবেন। তোমাকে ছাড়া দুনিয়াতে কোনো জীব বা অন্যান্য কিছুই বাঁচবেনা। তোমাকে পাক করবে বাতাস।
নূরের কথা শুনে পানি খুশী হলো এবং কালেমা শাহাদাত পড়ে মুসলমান বা আত্মসমর্পণকারী হয়ে গেল। এবার আল্লাহপাকের হুকুমে নূর গেল বাতাসের নিকট। এখানেও ছালাম বিনিময়ের পর নূর জানতে চাইলো বাতাসের কি গুণ আছে। বাতাস বললো আমি সব উড়িয়ে ধ্বংস করে দিতে পারি। আর আমাকে দুনিয়ায় নিলে আমার যা ইচ্ছা তা-ই করবো। নূর তখন বললো, হে বাতাস, তুমি তোমার গৌরব নিজ ইচ্ছায় পরিত্যাগ করো, একমাত্র আল্লাহই আমাদের প্রভু, তাঁর ইচ্ছাই আমাদের ইচ্ছা হওয়া উচিত অন্যথায় আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো। এখন তুমি তোমার গৌরব ছাড়। তাহলে পৃথিবীতে যেয়ে খুব গুণী হতে পারবে। জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি জীব তোমার উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে। তুমি কাহারো নজরে পড়বে না। এভাবে বুঝানোর পর বাতাস কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেল। তারপর নূর গেল ‘আগুনের’ কাছে। সেখানেও ছালাম বিনিময়ের পর নূরনবী আগুনের কি গুণ ক্ষমতা আছে তা জানতে চাইলেন। আগুন খুব গর্ব করে বললো যে, তার এমন ক্ষমতা আছে যে, সে ইচ্ছা করলে সব পুড়িয়ে ছাই করে ধ্বংস করে দিতে পারে। আরো দেখলো আগুনের মধ্যে প্রচন্ড অহংকার বিরাজ করছে, নূর এ সমস্ত কিছু লক্ষ্য করে আগুনকে খুব ভালো করে উপদেশ দিল তার মিথ্যা অহংকার ত্যাগ করার জন্য। আল্লাহর গুণগান শোনালেন আগুনকে এবং তার কি কি দোষ আছে তাও জানালেন। আগুন দিয়ে আল্লাহপাক কি কি করবেন তাও বললেন। আগুন নূরের সমস্ত কথা শুনে ‘কালেমা তাইয়্যেবা পড়ে মুসলমান হয়ে গেল। শেষে নূর নবী গেল ‘মাটির’ নিকট। নূরনবী মাটির নম্রতা, নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার অসীম ক্ষমতা, ধৈর্য্যশীলতা, শান্ত স্বভাব ইত্যাদি মহৎ গুণাবলী দেখে খুব খুশী হলেন ‘নূর মাটিকে ছালাম দিলেন। মাটি উত্তরে বললো, ওয়া-আলাইকুম ছালাম-মারহাবা স্বাগতম। নূর তার গুণ জানতে চাইলে মাটি বললো আমার কোনো গুণ নেই। আল্লাহর গুণেই আমি গুণান্বিত। আল্লাহপাক যখন যে অবস্থায়ই রাখেন সে অবস্থায়ই আমি খুশী। এ কথা শুনে নূর খুশী হলেন এবং মাটিকে কালেমা পড়িয়ে মুসলমান করা হলো। মহান আল্লাহপাক উক্ত আরবা আনাছের দ্বারা আদম অজুদ তৈরী করে তাতে ফিল আরদে খলিফা রূপে বসালেন আদমকে এবং তা সমস্ত সৃষ্টি কার্য সমাধা করে চলেছেন অনাদি কাল হতে। হাদিস কুদসীতে আল্লাহপাক বলেছেন, “লাওলাকা লা’মা খালাকতু আফলাক” অর্থাৎ যদি আপনাকে (নূরনবীকে) সৃষ্টি না করতাম তবে আমি কিছুই সৃষ্টি করতাম না। কাজেই নূরনবী হলেন সৃষ্টির কেন্দ্র বিন্দু। আল্লাহপাক হাদিস কুদসীতে আরো বলছেন যে, “খালাকতু মোহাম্মাদান মিন নূরে ওয়াজহিয়ান” অর্থাৎ আমি মোহাম্মদকে আমার চেহারার নূর হতে সৃষ্টি করেছি। এখানে লক্ষণীয় যে, আল্লাহর চেহারার দলিল পাওয়া গেল যেমন, কোরানে বলা হয়েছে, “ফা আইনা মা তুওয়াল্লু ফাছাম্মা ওয়াজহুল্লাহি” অর্থাৎ সুতরাং তোমরা যেদিকেই ফির (তাকাও) না কেনো, সুতরাং সেদিকেই আল্লাহর চেহারা বিদ্যমান। কাজেই এ রহস্যাবলীকে পীর-মুর্শিদের কাছে চিনে নিতে হবে। আল্লাহর চেহারায় সৃষ্টি হলো আদম এবং আল্লাহর চেহারার নূরে সৃষ্টি মোহাম্মদ এ কথার মাঝে গভীর নিগূঢ় তত্ত্ব রয়েছ যা আরেফে বিল্লাহগণই ভালো অবগত আছেন। হাদিস কুদসীতে বর্ণিত আছে, আল্লাহপাক বলেন, হে আমার প্রিয় হাবিব! আপনাকে সৃষ্টি না করলে আমি আকাশ-জমিন কিছুই সৃষ্টি করতাম না। আকাশ মন্ডলকে সুউচ্চে স্থাপন করতাম না এবং ভূমন্ডলকে নি¤েœ বিছানাস্বরূপ করতাম না। আরো বর্ণিত আছে যে, রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলেন, “আমি হযরত আদম আলাইহিস্ সালামের সৃষ্টির চৌদ্দ হাজার বৎসর পূর্বে আল্লাহপাকের দরবারে একটি নূর ছিলাম।”
ইমাম মোহাম্মদ আল-মাহদী আহমাদ তাঁর ‘মাতালিব-উল-মুসাররাত’ কিতাবে লিখেছেন, “আল্লাহ সর্বপ্রথম যে বস্তু সৃষ্টি করেছেন তা হলো আমার নূর এবং আমার নূর হতে সৃষ্টি হলো প্রতিটি বস্তু।”মূলতঃ নবীজি হলেন সৃষ্টি জগতের রূহ হায়াত ও সমস্ত অস্তিত্বের মূল রহস্য। তাঁর হতেই এবং তাঁর মধ্যেই সমস্ত সৃষ্টির অস্তিত্বের ভিত্তি।
‘নুজহাতুল মাজালিশ’ নামক কিতাবে বর্ণিত আছে, “আল্লাহপাক তাঁর নূর হতে এক মুষ্টি নূর গ্রহণ করলেন।” এ হাদিসের ব্যাখ্যায় হযরত মাওলা আলী আলাইহিস সালাম হতে বর্ণিত হয়েছে, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাছুল ! আপনি কোন্ বস্তু হতে সৃষ্টি হয়েছেন ? তিনি বললেন, যখন আমার পরওয়ারদিগার আমার প্রতি যা ওহী করার তা করলেন (ইহা মোকামে কাবা কাওসাইনে), আমি বললাম, হে আমার রব ! তুমি আমাকে কোন্ বস্তু হতে সৃষ্টি করেছ ? আল্লাহপাক বলেন, আমার ইজ্জত ও জালালের কসম, যদি তুমি না হতে আমি আসমান-জমিন সৃষ্টি করতাম না। আমি বললাম, হে আমার রব, তুমি আমাকে কোন্ বস্তু হতে সৃষ্টি করেছ ? তিনি বললেন, হে মোহাম্মদ ! আমি ঐ নূরের শুভ্রতার প্রতি দৃষ্টি করলাম যে নূরকে আমি সৃষ্টি করলাম আমার কুদরতের দ্বারা ; যাকে আমি অভিনব বিস্ময়কর আদি রূপ দান করলাম আমার হুকুম দ্বারা।
আল্লাহপাক এ বিশ্বকে পাঁচটি স্তরে প্রকাশ করেছেন নূরে মোহাম্মদীর মাধ্যমে তথা নূরে মোহাম্মদী হতে –
১। আল্লাহর আধিপত্যের জগত বা আলমে হাহুত।
২। নূরে মোহাম্মদীর জগত বা আলমে লাহুত।
৩। পরিকল্পনার জগত বা আলমে জাবারুত।
৪। নির্দেশের জগত বা আলমে আমর বা আলমে মালাকুত।
৫। সৃষ্টি বা আলমে খালক বা আলমে নাছুত।
আল্লাহপাকের এ সৃষ্টির কোনো রকম পরিবর্তন নেই। তাই কোরানে বলা হয়েছে, “লা তাবদিলা লি খালকিল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। মাওলা পাকের এ পাঁচটি আলমের ভিতর একটি হলো ‘পরিকল্পনার জগত’। নূরে মোহাম্মদী আল্লাহর ইচ্ছা মোতাবেক ‘হামদ’ ও প্রচারের বা বিকশিত করতে ইচ্ছা করলেন এবং সাতটি ঘোষণার মাধ্যমে এর সূচনা হলো। ‘বিছমিল্লাহর’ এক মঞ্চ তৈরী করে তাতে অধিষ্ঠিত হয়ে ঘোষণা করলেন –
প্রথম ঘোষণা করলেন – কুন্তু কান্জান মুখফিয়ান।
দ্বিতীয় ঘোষণা করলেন – লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
তৃতীয় ঘোষণা করলেন – আনা মিন নূরীল্লাহ।
চতুর্থ ঘোষণা করলেন – নূর মিন নূরীল্লাহ।
পঞ্চম ঘোষণা করলেন – নূর মিন নূরী।
ষষ্ঠ ঘোষণা করলেন – খালাকা মিন নূরী।
সপ্তম ঘোষণা করলেন – ইয়া আমীর-আল্লাহু আকবর।
এ সাতটি ঘোষণা ছিল নূর হতে নূর সাইজুদা হবার পরিকল্পিত রূপ এবং সমস্ত সৃষ্টি বিকশিত হবার মূল স্রোতধারা। এ বিকশিত নূর চারটি হালিয়তে দীপ্তি লাভ করে চারটি নামের আবরণে স্থিত আছে। যেমন, “আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু রূহী” মানে সর্বপ্রথম রূহ সৃষ্টি (প্রকাশ)। ইহা হাকিকতের জগতে হাকিকতে মোহাম্মদীর গভীর কেন্দ্রে বর্তমান এবং এখানে রূহের প্রথম প্রকাশিত স্থান। তাই এ স্তরের প্রথম প্রকাশিত অবস্থাকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, “আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু রূহী।” মায়ীয়েতের স্তরে বা মোকামে প্রথম প্রকাশ হয় নূরে মোহাম্মদী রূপে বিধায় বলা হয়েছে, “আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু নূরী”। ইহা নূরের দ্বিতীয় বিকাশ হলেও এ স্তরে প্রথম প্রকাশ এ নামে। ইহা সূক্ষ্মরূপ জগতের প্রথম প্রকাশ ও বিকাশ। ইহার বিভিন্ন নাম সাব্যস্ত আছে। ইহার তৃতীয় বিকাশ আলমে আরওয়াতে অথচ এ স্তরের নাম ও রূপের আবরণে প্রথম প্রকাশ বিধায় বলা হয়েছে, “আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু আকল”। আলমে আরওয়াতে ঈমান আনার অবস্থার সাথে জড়িত – যা এ স্তরে প্রথম প্রকাশ। এখানেই বলা হয়েছে “আলাস্তু বে রাব্বিকুম” -মানে আমি কি তোমাদের রব নই। “আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু কলম”- মানে প্রথম কলম সৃষ্টি করেন আল্লাহপাক। এ অবস্থা ‘লওহ মাহফুজ’ এর লিখিত অবস্থার সাথে জড়িত। এখানেই প্রথম নূরের কলমে নূরের কালিতে প্রথম লিখিত স্থান। এখানে আল্লাহর কালাম বা কিতাবিন মাকনুনিন সংরক্ষিত আছে – যা অপবিত্রগণ কখনো স্পর্শ করতে পারে না, এ কথা কোরানের বিবৃত করা হয়েছে। এ কিতাব কাগজে সংকলিত কিতাব-কোরান অবশ্যই নয়।
প্রবন্ধ – ধর্মচুরি
লেখক – মুফতি নূর আলম চিশতী
সময়ের পরিক্রমায় মানুষের মাঝে চিন্তা, উপলব্ধি ও আক্বিদাগত বিভিন্ন পার্থক্য সৃষ্টি হয়। এ পার্থক্য কালক্রমে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে ঐশী ধর্মের অনুসারীদের মাঝে তৈরী করে বিচ্ছিন্নতা। এ কথা স্বীকার্য যে, এই বিচ্ছিন্নতা তথা বিভিন্ন ফেরকা গুলো দ্বীনের ঐক্যকে টার্গেট করে বিভক্তির তীর নিক্ষেপ করে চলেছে। ইসলাম সার্বজনীন ঐক্যের ধর্ম। বিভিন্ন ফেরকা বা দলমতগুলো মুখে ঐক্যের কথা বললেও বাস্তবে এরা ইসলাম হতে ছিটকে পড়েছে।
হক-বাতিল আর সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব আবহমানকালের। এ সংঘাত প্রথম মানব ও প্রথম নবী হযরত আদম (আ) ও বিতাড়িত ইবলিশের মাঝে আরম্ভ হয়ে আজ অব্দি চলমান। আল্লাহপাক বলেন, মুনাফিকরা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে তাদের ব্যর্থ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে (সুরা তাওবা ৩২, সুরা ছাফ ০৮)। তারই ধারাবাহিকতায় চিরদিনই ধর্মের দুশমনরা বিভিন্ন ছলে বলে কৌশলে ধর্মীয় পরিমন্ডলে প্রবেশ করে অব্যাহত রেখেছে তাদের দুশমনি। ধর্মীয় ছদ্মাবরণে থেকে তারা ধ্বংস করার পাঁয়তারা করেছে ধর্মকে।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়া’লা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম এর জীবদ্দশা থেকেই শুরু করে একদল ধর্মবিরোধী চক্র দ্বীনে মুহাম্মদীর আসল হাকিকত কে ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে শুরু করে দূরভিসন্ধীমূলক অপতৎপরতা। যা মারাত্মক পরিণতি লাভ করে ৬১ হিজরীতে কারবালায়। আহলে বাইয়্যেতের অন্যতম সদস্য, মা ফাতেমার নয়ন মণি, ইমাম হোসাইন (আ) এবং তার পরিবার, অনুসারীদের সকলের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়ার মধ্য দিয়ে।
ধর্মবিরোধী দুশমনদের পরবর্তী চক্র আত্মপ্রকাশ করে নজদ প্রদেশ হতে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা) বলেছিলেন, নজদ হতে শয়তানের দুটি শিং বাহির হবে। যারা হলেন যথাক্রমে – মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার মুসায়লামা কাজ্জাব এবং ভ্রান্ত ওহাবী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী। এই ভ্রান্ত ওহাব নজদী এবং তার অনুসারীদের দ্বারাই দ্বীনে মুহাম্মদীর ওপর আসে অন্যতম বড় আঘাত। তাদের সম্পর্কের রাসুল (সা) বলেছিলেন, শেষ যামানায় এমন একদল লোকের উদ্ভব হবে, যারা কুরআন পড়বে কিন্তু কুরআন তাদের কন্ঠের নিচে নামবে না (হৃদয়ে পৌছবে না)। তারা ইসলাম থেকে এমন ভাবে দূরে সরে যাবে যেমন ভাবে ধনুক থেকে তীর বের হয়ে যায়। তাদের অন্যান্য আরো লক্ষণ হলো, তারা নামাজ পড়তে পড়তে কপালে কালো দাগ করে ফেলবে। কথায় কথায় তসবীহ পড়বে, সুমধুর কন্ঠে কুরআন তেলাওয়াত করবে, ইসলামের মূল কাজ বাদ দিয়ে সামাজিক কাজগুলোর ওপর বেশী জোর দিবে। এদের প্রবর্তকের নাম জুল খুয়াইসারা।
এরা একের পর এক নাম পাল্টায়ে বের হতেই থাকবে, শেষ পর্যন্ত এদের দলটি দাজ্জালের দলের সাথে মিলিত হবে।
অন্য মতে বলা হয়, যদি তোমরা তাদের সাক্ষাৎ পাও তবে তাদের হত্যা করো। তারা সৃষ্টির মধ্যে সবচাইতে নিকৃষ্ট। নবীজি বলেছেন, যদি আমি তাদেরকে পেতাম, তাহলে আদ জাতির মতো তাদের হত্যা করতাম।
এরাই ধর্মীয় ছদ্মাবরণে থেকে উদ্গার করছে বিভেদ বৈষম্যের বিষবাস্প। সাধারন মানুষ বুঝতে না পেরে পা দিচ্ছে তাদের ফাঁদে। তারাও হরণ করে নিচ্ছে মানুষের ঈমান।
ধর্মের প্রকৃত জ্ঞান বা হাকিকত যুগে যুগে সংরক্ষিত হয়েছে ওলী মুর্শিদ তথা জ্ঞানী মানুষদের সিনায় সিনায়। ধর্মজগতে প্রচলিত সকল ভ্রান্ত মতবাদ থেকে বের হয়ে ওলী মুর্শিদের শরনাপন্ন হলেই পাওয়া যাবে সে ইলমে এলাহী বা ইলমে নববী বা খোদার পরিচয় জ্ঞান। যে জ্ঞান লাভ করলে বুঝা যাবে ধর্মের হাকিকত।
ইসলাম হলো সার্বজনীন স্বভাব ধর্ম। মাওলার ফেতরাত বা ইনছানিয়াত যার মধ্যে জাগ্রত তিনিই মুসলমান। মানুষ আল্লাহর ফেতরাতে সৃষ্টি (সুরা রুম-৩০)। আমরা ক্রমে সে গুনসমূহ হারিয়ে পশুত্বের গুণ খাছিয়ত তথা আঠারো হাজার মাখলুকাতের গুণ খাছিয়তকে ধারন করে মনুষ্যত্ব থেকে নির্বাসিত হয়েছি অনেক দূরে (দুনিয়ায়)। কাজেই পূর্বের স্বভাব তথা স্রষ্টার স্বভাব বা ফিতরাতাল্লাহ ফিরে পাওয়াই বা পাওয়ার প্রচেষ্টাই হলো ধর্ম কর্ম বা গুরুসাধনা।
যিনি ইলমে সিনার অধিকারী তথা ওলী মুর্শিদ, তাঁর নির্দেশিত পথে জীবন যাপন করলে বা ধর্মকর্ম করলে তবেই লাভ হবে মুক্তি। এ পথে স্বীয় আমিত্বটিকে মুর্শিদের চরণে সমর্পন করতে হয় বা বিসর্জন দিতে হয়। যে কথা বলা হয়েছে সুরা ফাতাহ এর ১০ নম্বর আয়াতে। সুরা বনী ইসরাইলের ৯৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ যাকে পথপ্রদর্শন করেন সেই সঠিক পথ প্রাপ্ত আর যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্য কোনো অভিভাবক পাবেন না। এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন মুখের ওপর ভর করে উঠাবো অন্ধ, মূক ও বধির করে।’
আপনত্বে পরম সত্ত্বা প্রাপ্তির অনুশীলনে, মহান স্রষ্টার স্বভাব ধারন করে তাঁর তথা তার ওলী মুর্শিদের পায়রবী গোলামীর মধ্য দিয়ে নিজেকে স্থিত করতে হয় মুক্তির ধামে। এটাই ইসলাম। মহান প্রভু আমাদের সবাইকে সরল সঠিক পথের দেশনা দান করুন। আমিন।
প্রবন্ধ – বাইয়াত প্রসঙ্গ
লেখক – খলিলুর রহমান
আমাদের সত্য সনাতন ইসলাম সার্বজনীন বা সমস্ত মানব জাতির জন্য মুক্তির বিধান। কারণ, ইসলাম মানে আমিত্বের কলুষ পরিহার করে মানবতা জাগ্রত করা তথা পরিপূর্ণ আত্মসমর্পন করা বা তথা লা মউতে স্থিত হওয়া বা চিরঞ্জীব জগতে অধিষ্ঠিত হওয়া বা অমরত্ব লাভ করা তথা ‘ওঁম শান্তি’। এ বিধান জ্বীন এবং ইনসানের জন্য প্রযোজ্য এবং জ্বীন ও ইনসানের জন্যই এবাদতের শর্ত। সে এক বিশেষ এবাদত যার দ্বারা লা- মউতে পৌঁছানো যায় তথা কেয়ামতের বাহিরে অবস্থান করা যায়। জ্বীন ইনসান ও আদম মূলত ঃ এক বিষয় নয়। এবাদতের ক্ষেত্রে জ্বীন ইনসান কথাটি আসবে। আর সমস্ত ফেরেশতাদের উপর হুকুম হলো আদমকে সেজদা করার জন্য বা আদমের প্রতি আত্মসমর্পণ করার জন্য। এ আত্মসমর্পনের আরবী হলো ‘ইসলাম’ আর আত্মসমর্পন কারীর আরবী হলো মুসলমান। কাজেই ইসলাম বা ওঁম শান্তি বা স্রষ্টাতে আত্মসমর্পন কোনো সীমাবদ্ধ জাতি গোত্রের বিষয় অবশ্যই নয়। ইহা পৃথিবীর মানব জাতির জন্য আল্লাহ বা স্রষ্টা প্রদত্ত বিধান বা ধর্ম। এ আল্লাহর বিধান মানতে হলে একজন পরকাল প্রাপ্ত মানুষ বা খান্নাসমুক্ত মানুষ এবং একজন চেতন মানুষের হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহন করে পরিপূর্ণ ইসলামে দাখিল হতে হবে। বায়াত গ্রহন ব্যতীত কোন এবাদত আল্লাহর নিকট কবুল হবে না। তাই প্রত্যেক মানব জাতিরই একজন নায়েব নবীর নিকট বায়াত গ্রহন করাই হলো আল্লাহর বিধান।
এই পৃথিবীতে আল্লাহ্ অনেক নবী রাসূল ও অনেক ওলি, আউলিয়া প্রেরণ করেছেন। সকল মানব জাতির হেদায়তের জন্য ও প্রত্যেক নবী রাসূলের দেখানো পথ অনুসরন করার জন্য একজন নায়েব নবী বা একজন ইনসানুল কামেলের হাতে হাত দিয়ে বায়াত গ্রহন করতে হবে। তা না হলে কোন মতেই আল্লাহ্র দর্শন পাওয়া যাবে না।
মহান আল্লাহ্ পাকের বিধান হলো একজন পরকাল প্রাপ্ত চেতন মানুষ এবং জিন্দা মানুষ এলমে সিনার অধিকারী একজন পাক মানুষের হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহন করতে হবে। কারন আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে বলেছেন যে, ব্যক্তি রাসূলের হাতে হাত দিয়ে বায়াত গ্রহন করলো, তার হাতের উপর আমার হাত থাকে। (সূরা ফাত্তাহ, আয়াত-১০)। কারন আল্লাহ্ বলেছেন, আল্লাহ্ ও রাসূলের মধ্যে প্রভেদ জ্ঞান করা যাবে না। করলে ভূল হবে এবং খাঁটি কাফের হয়ে যাবে। (সূরা নিসা আয়াত-১৫০-১৫১)।
আমরা জানি এই প্রথিবীতে যত বড় বড় সাধক, ফকির, ওলি- আউলিয়াগণ রয়েছে তারা সবাই কোন না কোন মুর্শিদের নিকট হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহন করেছেন। তাহলে কী সকল ইনসানুল কামেলগণ ভূল করেছেন? বাইয়াতের বিরুদ্ধের কথাগুলো হলো মুনাফেক মুয়াবিয়া এবং তাদের প্রেতাত্মা ও তার পোষা কুকুর মৌল্লা- মৌলভীগণের মুখের বানানো কিচ্ছা। কারন মুর্শিদ ব্যতীত কোন এবাদত আল্লাহ্র কাছে কবুল হবে না। যদি কোন ব্যক্তি একজন ইনসানুল কামেলের হাতে হাত ধরে বায়াত গ্রহন না করে তাহলে সে কোন দিন মুসলমান হতে পারবে না। মুসলমান শব্দের অর্থ হলো আত্মসমর্পন। এ আত্মসমর্পন করতে হলে একজন ইনসানুল কামেলের হাতে হাত ধরতে হবে। তা না হলে কোন দিন আল্লাহ্র দিদার লাভ করা যাবে না। একজন মুর্শীদ ব্যতীত কোন দিন আল্লাহ্র ভেদ জানা যাবে না। কারন খোদার হাদিদু এ সেফাতি নামের শব্দের অর্থই হলো মুর্শিদ (যা বর্তমান) আর তারাই হলো আত্ম পরিচয়ের অধিকারী ও লা মউতে অবস্থানকারী। কুরআনে আল্লাহ্ পাক বলেছেন, যে ব্যক্তি রাসূলের অনুগত্য করল, সুতরাং অবশ্যই সে আল্লাহ্র অনুগত্য করলো (সূরা নিসা আয়াত-৮০)। এই আয়াত দ্বারা বোঝা গেল যে, আল্লাহ্র দিদার লাভ করতে হলে মুর্শিদের হাতে বায়াত হতে হবে। কারণ বলা হয়েছে, যার কোন মুর্শিদ নেই তার মুর্শিদ শয়তান। আর যারা বলে যে স্বপ্নে বায়াত হওয়া যায়, তাদের কোন মর্শিদ নেই। তার মানে বোঝা গেল, তাদের মুর্শিদ হলো ইবলিস। আর ইবলিসের বান্দা কখনো আল্লাহ্র বান্দা হতে পারে না। খাজা বাবা গরিবে নেওয়াজ (আঃ) হতে এরশাদ করেছেন যে, যে ব্যক্তি শায়েখ বা মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শক নেই তার কোন দ্বীন নেই। যার দ্বীন নেই তার কোন মারফতের এলাহি নেই। যার মারফতের এলাহি নেই তার সত্য পথের পথিক গণের সঙ্গে সংযোগ নেই। যার কোন শুভাকাঙ্খী নেই তার কোন মাওলা (প্রভু) নেই। অজ্ঞ মুর্খগণ এ কালামগুলোর ভেদ বুঝে না। শানে হাবিবুর রহমান কিতাবে ২০০ পৃষ্ঠা মুফতী আহম্মদ ইয়ার নাইমী “ইয়াও মানাদউ কুল্লালা ইনাসিন বিইমামহীন”যে দিন আমরা প্রত্যেক মানুষদেরকে তাতের ইমামসহ (নেতাসহ) ডাকবো, এ আয়াতের সূত্রে বলেন, মানলা শাইখা লান্ছ ফিস শায়খিশ শয়তান। যারা বায়াত গ্রহন করেনি তাদের কে হাশরের দিন শয়তানের দল হিসেবে ডাকা হবে। যেহেতু শয়তান হলো কাফের। আর যারা বাইয়াতে অবিশ্বাসী অর্থাৎ যাদের কোন মুর্শীদ নেই, আপনারাই বলুন তারা কোন দলের?
ওলী মুর্শিদের হাতে হাত দিয়ে তথা বাইয়াত গ্রহন করে তাঁর নিদের্শিত পথে চললেই আসবে কাঙ্খিত মুক্তি। নতুবা আবদ্ধই থাকতে হবে নফসানিয়াতের দোযখ যন্ত্রনায়। মুর্শিদ সকলের সহায় হোক।
সংগীত – যেই বিসমিল্লাহর এতো ওজন
ফকীর আতিকুর রহমান চিশতী
যেই বিসমিল্লাহর এতো ওজন
করলি না তার সাধন ভজন
গপ্প শুনে রইলি মত্ত হইয়া,
পাষাণ মন রে, বিসমিল্লাহর ভেদ দেখলিনা বুঝিয়া।
আলিফ লাম আর মিমের কিতাব
বিসমিল্লায় পাইয়াছে খেতাব,
চারটি নোক্তায় এতবারি হইয়া –
জালেকাল কিতাবু লারইবা ফীহ
আঠার হাজার আলম সহীহ
আছে তিরিশ পারা ডালপালা ছড়াইয়া।
বে নোক্তায় এরাদা হইলো
নূন নুক্তা নূরনবী পাইলো
ইয়া নোক্তায় ওয়াজেব এমকান হইয়া –
মাঝখানে তার আছে বরযোখ
জালাল আর জামালী সুরত
উনিশ হরফ যায় খেলা দেখাইয়া।
বিসমিল্লাহতে হয়ে ফিদা
ওহি এলহাম হাতেপ নেদা
পাইলো যারা রইলো চুপ করিয়া –
ইন্দ্রিয় আর বোতনের দরজা
মার তালা মুছবে সাজা
কেন আতিক ফকির মায়ায় রও ভুলিয়া।
সংগীত – মানুষে হয় খোদার বাড়ি
লেখক – মোতালেব হোসেন চিশতী
মানুষে হয় খোদার বাড়ি
খোদা ঘর বানাইয়া তাতে রয়,
সেজদা করে সেজদা কারি
মকরুমে না চিনিতে পায়।
আপন রুহু পাক জাতে,
ফুঁকে আদমের ক্বলবেতে
আহছান সুরত তাহাতে,
দিয়েছে দ্বীন দয়াময়।
মানুষ খোদার প্রিয় বান্দা,
তাও মানুষের যায় না ধান্ধা
আন্দাজীতে করে সেজদা,
খোদার ঘর না খুঁজে পায়।
মানুষে রয়েছে খোদা,
দেখো সুরা আনফালেতে
তিনি ওলিয়াম মুর্শিদ হয়ে,
জীব ত্বরাইবে উছিলায়।
খাজা মোতালেব কয় বেহুঁশ যারা,
পশুতে মিশিবে তারা
পর্দা খুলে দেখছে যারা,
সেজদা দিচ্ছে মুর্শিদের পায়।
অনুবাদ – ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র, ৯ম ও ১০ম পর্ব
মূল এলিফ শাফাক হতে
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী
পর্ব ০৯
প্রভু সন্দর্শন এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে শুধু প্রভুতেই নিবিষ্টতা বজায় রেখে নিরন্তর তার ধ্যানে নিজেকে ব্যাপিত রাখতে হয়। মনন ও চিন্তন থেকে ঝেড়ে ফেলতে হয় প্রভু ব্যাতিত সমস্ত কিছুকে। তবেই হৃদয়ের একক অধিশ্বর তার আপন মহিমা নিয়ে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে আশেকের ভিতর বাহিরে তথা সর্বময়।
উত্তর দক্ষিন বা পূর্ব পশ্চিম নয়, প্রভু প্রাপ্তির জন্য সালেক’কে নির্ধারন করতে হয় একটি অভ্রান্ত দিক, যে দিকে বিরাজ করে মহান খোদাতায়ালা। পৃথিবীর দিক গুলো তো আপেক্ষিক বা পৃথিবীকেন্দ্রিক। আর ঈশ্বর যে দিকে বিরাজ করেন সে দিকটি শাশ্বত, চিরন্তন। তিনি কোনো দিক বা দিকসমুহে আবদ্ধ নন। সমগ্রতা ব্যাপী তিনি অধিষ্ঠিত। তাই তার দিক বা আধার সম্পর্কে জানতে পারলে জগৎসমুহের আর কিছুই জানার বাকী থাকে না।
অন্য কোনো দিকে নয়, তোমার চেহারা কে ফিরিয়ে নাও একমাত্র প্রভুর দিকে যিনি সর্বদিকে এবং দিকের উর্ধ্বেও বিরাজমান। যদি তুমি নিজেকে মেলে ধরতে পারো প্রভু স্বানিধ্যে, এবং ভ্রমন করতে পারো সে মহিমান্বিত প্রভুর সন্নিধানে, তবে ব্রহ্মান্ড টাই হবে তোমার, আর পৌঁছে যাবে মহান খোদাতায়া’লার নূরময় অনন্ত মহাপ্রেমের অমর লোকে।
তোমার যাত্রা নিশ্চিত করে নাও একমাত্র প্রভুর দিকে।
পর্ব ১০
প্রতিটি জন্মের জন্যই প্রয়োজন তীব্র থেকে তীব্রতর বেদনা। ধাত্রী ভালো করে জানে যে, ব্যাথা বিহীন সন্তান জন্ম হয় না। নতুন নির্মাণের জন্যও প্রয়োজন তেমনি বেদনা।
তোমার ভিতরে জন্ম দিতে চাও নতুন আত্মাকে? স্বীকার করে নাও জন্মের জন্য আবশ্যক বেদনাকে। নবজন্ম এক একটি বেদনাময় পরিনতি যেখানে তোমার অস্তিত্বশীল বর্তমান কে মৃত তে পরিনত করে ভেতরে জন্ম দিবে একটি নতুন প্রাণ, যে প্রাণ অনন্তে প্রতিষ্ঠিত হবে বিশ্বপ্রাণে তথা বিশ্বআত্মায়। প্রেমের আনন্দ তো সেখানেই কার্যকর যেখানে রয়েছে বিরহের বেদনা।
ব্যাথাগুলো সবসময় খুলে দেয় নবজন্মের দুয়ার। ব্যাথাভোগেই প্রাণ উপস্থিত হয় সৃষ্টির সকাশে। নবসৃষ্টি সব সময়ই নবরুপে উদ্ভাসিত হয় ব্যাথাভোগের ফলে। তাই প্রাণ কে নবরুপে রুপায়িত করতে হলে ভোগ করতে হবে সাধনার জ্বালা যন্ত্রনা বা ব্যাথাকে। নিজেকে পরিনত করতে চাও মহামানবে? মেনে নাও নির্মাণের জন্য নির্মিত হওয়ার বেদনাকে।
মাটিকে শক্তিশালী হওয়ার জন্য যেমন তীব্র তাপের দহন জ্বালা ভোগ করতে হয়, ঠিক তেমনি মানুষ থেকে মহামানুষ হওয়ার জন্য তোমাকেও ভোগ করতে হবে সাধনার কষ্ট। প্রেম তো কেবল সিদ্ধ হয় বেদনায়।
প্রেমের বেদনাকে ধারণ করো আপনত্বে।
সম্পাদকীয় – আপন পরিচয় জ্ঞান
লাবিব মাহফুজ চিশতী
মৃত্যুকে জয় করা তথা নিত্যধামে অধিষ্ঠিত হওয়ার পয়গাম নিয়ে আমাদের মাঝে আসে রমজান। মানবীয় সত্ত্বা হতে সকল কলুষতা, নোংরা তথা পাপপ্রবৃত্তিসমুহকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে, নিজেকে খাঁটি করার সাধনাই রমজানের সাধনা। জীবাত্মার গুণ-খাছিয়তে আমরা নিয়ত আবদ্ধ। এই বন্দীদশা থেকে মুক্তির অপর নাম রমজান। আপন কুস্বভাব গুলোকে বিতাড়িত করে প্রভুগুণে গুণান্বিত হলেই কায়েম হবে ইনছানিয়াত- যেখানে রমজানের স্বার্থকতা নিহিত। প্রভুগুণে গুণান্বিত হলেই আমরা পৌঁছে যাবে চির শান্তির, চির মুক্তির, অমর প্রেমের ধামে তথা স্থিত হবো লা-মউতে। সফল হবে মানব জনম।
আমরা প্রভুগুণের চাদরে আবৃত হয়েই জগতে আসি। এখানে এসে রিপুনিচয়ের তাড়নায় বিস্মৃত হই সে মহিমাময়ের অপার প্রেম মাহাত্ম্যকে। বিচ্যূত হই নিত্যময়তা থেকে। মূলত সায়েম যিনি, তিনি কঠোর সাধন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পূনরায় স্বভাবিত হন প্রভু স্বভাবে। ফিরে পায় তার হারানো সেই ‘আমি’ কে। নিজেকে ফিরে পেলেই আসে সেই মহিমান্বিত রজনী – যখন নাযিল হয় ঐশী প্রেরণালোক। নিজেকে ফিরে পাওয়াই হলো ইদ পূণর্মিলনী।
যারা ফিরে পেয়েছেন নিজেকে তথা লাভ করেছেন আপন পরিচয় জ্ঞান এবং স্থিত হয়েছেন পূর্ণতায়, তাঁরাই ওলী মুর্শিদ বা গুরু। তাঁরা নিজেকে ফিরে পাওয়ার এ শাশ্বত বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন ঘুমন্ত মানুষদেরকে। গুরু চরণে নিজেকে আহুতি দিলেই, নিজের সর্বময় গুরুসত্ত্বার তথা গুরুগুণের জাগরণে আসবে কাঙ্খিত ইদ-আনন্দ।
“আপন খবর” লাভ করাই রমজান তথা সিয়াম সাধনার মূল কথা। ‘আপন খবর’ প্রাপ্তির মাধ্যমে সকলেই যেনো পৌঁছতে পারি অমর লোকে। প্রভুগুরু সকলের সহায় হোন।
মহান ওলীগণের পবিত্র বাণী
1.
মানব সুরতকে কায়েম রাখতে হলে নফসানিয়াত খাহেশকে দৃঢ়তার সাথে দমন করো।
হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী
2.
মানুষ হওয়াটাই মানুষের সাধনার একমাত্র লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রয়োজন একজন পূর্ণ মানুষে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ।
হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী
3.
শূণ্য থেকে এসেছি, শূণ্যেই ফিরে যাবো। চোখ কান সবসময় খোলা রেখো। কুয়াশায় পথ হারিও না। বন্য প্রাণীর খাবারে পরিণত হইও না।
ইবনুল আরাবী রহ.
4.
খোদা প্রেমিকগণের ভাবাবেগের অবস্থা বর্ণনা করা সম্ভব না। কেননা উহা মুমিনদের অন্তরে খোদার রহস্য।
হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহ.
5.
খোদা প্রেমের পথে যে অটল থাকে, প্রেমাগ্নি তার অস্তিত্বকে বিলোপ করে দেয়।
খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহ.
6.
আউলিয়া কেরামগণের পদধূলি দ্বারা চক্ষুকে জ্যোতির্ময় করো। তবে তুমি আদি ও অন্তের সবকিছু দেখতে সক্ষম হবে।
জালালউদ্দিন রুমী রহ.
7.
তোমার দরজার সামনে ঘর বানিয়েছি আমি। এবারও কি বলবে যে, আমার ঘরের ঠিকানা জানো না?
মির্জা গালিব
8.
জাগ্রত রুহের অধিকারী তথা কামেল গুরুর প্রেমে আপন ঘরটিকে নূরময় করে তোলো।
আল্লামা ইকবাল
9.
গুরু কে? গুরু হলো স্বয়ং ভগবান। ভগবান না হলে কেউ গুরু হতে পারে না।
বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী
মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৫ম সংখ্যা, মে ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

