আপন ফাউন্ডেশন

Date:

সুফি প্রবন্ধ : ধর্মচুরি ও বাইয়াত প্রসঙ্গ – Spiritual Theses

ফেসবুক পেজ
ইউটিউব চ্যানেল
হোয়াটসএপ গ্রুপ
টেলিগ্রাম গ্রুপ

ধর্মচুুরি
মুফতি খন্দকার নূরে আলম চিশতী

সময়ের পরিক্রমায় মানুষের মাঝে চিন্তা, উপলব্ধি ও আক্বিদাগত বিভিন্ন পার্থক্য সৃষ্টি হয়। এ পার্থক্য কালক্রমে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে ঐশী ধর্মের অনুসারীদের মাঝে তৈরী করে বিচ্ছিন্নতা। এ কথা স্বীকার্য যে, এই বিচ্ছিন্নতা তথা বিভিন্ন ফেরকা গুলো দ্বীনের ঐক্যকে টার্গেট করে বিভক্তির তীর নিক্ষেপ করে চলেছে। ইসলাম সার্বজনীন ঐক্যের ধর্ম। বিভিন্ন ফেরকা বা দলমতগুলো মুখে ঐক্যের কথা বললেও বাস্তবে এরা ইসলাম হতে ছিটকে পড়েছে।
হক-বাতিল আর সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব আবহমানকালের। এ সংঘাত প্রথম মানব ও প্রথম নবী হযরত আদম (আ) ও বিতাড়িত ইবলিশের মাঝে আরম্ভ হয়ে আজ অব্দি চলমান। আল্লাহপাক বলেন, মুনাফিকরা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে তাদের ব্যর্থ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে (সুরা তাওবা ৩২, সুরা ছাফ ০৮)। তারই ধারাবাহিকতায় চিরদিনই ধর্মের দুশমনরা বিভিন্ন ছলে বলে কৌশলে ধর্মীয় পরিমন্ডলে প্রবেশ করে অব্যাহত রেখেছে তাদের দুশমনি। ধর্মীয় ছদ্মাবরণে থেকে তারা ধ্বংস করার পাঁয়তারা করেছে ধর্মকে।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়া’লা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম এর জীবদ্দশা থেকেই শুরু করে একদল ধর্মবিরোধী চক্র দ্বীনে মুহাম্মদীর আসল হাকিকত কে ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে শুরু করে দূরভিসন্ধীমূলক অপতৎপরতা। যা মারাত্মক পরিণতি লাভ করে ৬১ হিজরীতে কারবালায়। আহলে বাইয়্যেতের অন্যতম সদস্য, মা ফাতেমার নয়ন মণি, ইমাম হোসাইন (আ) এবং তার পরিবার, অনুসারীদের সকলের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়ার মধ্য দিয়ে।
ধর্মবিরোধী দুশমনদের পরবর্তী চক্র আত্মপ্রকাশ করে নজদ প্রদেশ হতে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা) বলেছিলেন, নজদ হতে শয়তানের দুটি শিং বাহির হবে। যারা হলেন যথাক্রমে – মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার মুসায়লামা কাজ্জাব এবং ভ্রান্ত ওহাবী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী। এই ভ্রান্ত ওহাব নজদী এবং তার অনুসারীদের দ্বারাই দ্বীনে মুহাম্মদীর ওপর আসে অন্যতম বড় আঘাত। তাদের সম্পর্কের রাসুল (সা) বলেছিলেন, শেষ যামানায় এমন একদল লোকের উদ্ভব হবে, যারা কুরআন পড়বে কিন্তু কুরআন তাদের কন্ঠের নিচে নামবে না (হৃদয়ে পৌছবে না)। তারা ইসলাম থেকে এমন ভাবে দূরে সরে যাবে যেমন ভাবে ধনুক থেকে তীর বের হয়ে যায়। তাদের অন্যান্য আরো লক্ষণ হলো, তারা নামাজ পড়তে পড়তে কপালে কালো দাগ করে ফেলবে। কথায় কথায় তসবীহ পড়বে, সুমধুর কন্ঠে কুরআন তেলাওয়াত করবে, ইসলামের মূল কাজ বাদ দিয়ে সামাজিক কাজগুলোর ওপর বেশী জোর দিবে। এদের প্রবর্তকের নাম জুল খুয়াইসারা।
এরা একের পর এক নাম পাল্টায়ে বের হতেই থাকবে, শেষ পর্যন্ত এদের দলটি দাজ্জালের দলের সাথে মিলিত হবে।
অন্য মতে বলা হয়, যদি তোমরা তাদের সাক্ষাৎ পাও তবে তাদের হত্যা করো। তারা সৃষ্টির মধ্যে সবচাইতে নিকৃষ্ট। নবীজি বলেছেন, যদি আমি তাদেরকে পেতাম, তাহলে আদ জাতির মতো তাদের হত্যা করতাম।
এরাই ধর্মীয় ছদ্মাবরণে থেকে উদ্গার করছে বিভেদ বৈষম্যের বিষবাস্প। সাধারন মানুষ বুঝতে না পেরে পা দিচ্ছে তাদের ফাঁদে। তারাও হরণ করে নিচ্ছে মানুষের ঈমান।
ধর্মের প্রকৃত জ্ঞান বা হাকিকত যুগে যুগে সংরক্ষিত হয়েছে ওলী মুর্শিদ তথা জ্ঞানী মানুষদের সিনায় সিনায়। ধর্মজগতে প্রচলিত সকল ভ্রান্ত মতবাদ থেকে বের হয়ে ওলী মুর্শিদের শরনাপন্ন হলেই পাওয়া যাবে সে ইলমে এলাহী বা ইলমে নববী বা খোদার পরিচয় জ্ঞান। যে জ্ঞান লাভ করলে বুঝা যাবে ধর্মের হাকিকত।
ইসলাম হলো সার্বজনীন স্বভাব ধর্ম। মাওলার ফেতরাত বা ইনছানিয়াত যার মধ্যে জাগ্রত তিনিই মুসলমান। মানুষ আল্লাহর ফেতরাতে সৃষ্টি (সুরা রুম-৩০)। আমরা ক্রমে সে গুনসমূহ হারিয়ে পশুত্বের গুণ খাছিয়ত তথা আঠারো হাজার মাখলুকাতের গুণ খাছিয়তকে ধারন করে মনুষ্যত্ব থেকে নির্বাসিত হয়েছি অনেক দূরে (দুনিয়ায়)। কাজেই পূর্বের স্বভাব তথা ¯্রষ্টার স্বভাব বা ফিতরাতাল্লাহ ফিরে পাওয়াই বা পাওয়ার প্রচেষ্টাই হলো ধর্ম কর্ম বা গুরুসাধনা।
যিনি ইলমে সিনার অধিকারী তথা ওলী মুর্শিদ, তাঁর নির্দেশিত পথে জীবন যাপন করলে বা ধর্মকর্ম করলে তবেই লাভ হবে মুক্তি। এ পথে স্বীয় আমিত্বটিকে মুর্শিদের চরণে সমর্পন করতে হয় বা বিসর্জন দিতে হয়। যে কথা বলা হয়েছে সুরা ফাতাহ এর ১০ নম্বর আয়াতে। সুরা বনী ইসরাইলের ৯৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ যাকে পথপ্রদর্শন করেন সেই সঠিক পথ প্রাপ্ত আর যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্য কোনো অভিভাবক পাবেন না। এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন মুখের ওপর ভর করে উঠাবো অন্ধ, মূক ও বধির করে।’
আপনত্বে পরম সত্ত্বা প্রাপ্তির অনুশীলনে, মহান ¯্রষ্টার স্বভাব ধারন করে তাঁর তথা তার ওলী মুর্শিদের পায়রবী গোলামীর মধ্য দিয়ে নিজেকে স্থিত করতে হয় মুক্তির ধামে। এটাই ইসলাম। মহান প্রভু আমাদের সবাইকে সরল সঠিক পথের দেশনা দান করুন। আমিন।

বাইয়াত প্রসঙ্গ
খলিলুর রহমান চিশতী

আমাদের সত্য সনাতন ইসলাম সার্বজনীন বা সমস্ত মানব জাতির জন্য মুক্তির বিধান। কারণ, ইসলাম মানে আমিত্বের কলুষ পরিহার করে মানবতা জাগ্রত করা তথা পরিপূর্ণ আত্মসমর্পন করা বা তথা লা মউতে স্থিত হওয়া বা চিরঞ্জীব জগতে অধিষ্ঠিত হওয়া বা অমরত্ব লাভ করা তথা ‘ওঁম শান্তি’। এ বিধান জ্বীন এবং ইনসানের জন্য প্রযোজ্য এবং জ্বীন ও ইনসানের জন্যই এবাদতের শর্ত। সে এক বিশেষ এবাদত যার দ্বারা লা- মউতে পৌঁছানো যায় তথা কেয়ামতের বাহিরে অবস্থান করা যায়। জ্বীন ইনসান ও আদম মূলত ঃ এক বিষয় নয়। এবাদতের ক্ষেত্রে জ্বীন ইনসান কথাটি আসবে। আর সমস্ত ফেরেশতাদের উপর হুকুম হলো আদমকে সেজদা করার জন্য বা আদমের প্রতি আত্মসমর্পণ করার জন্য। এ আত্মসমর্পনের আরবী হলো ‘ইসলাম’ আর আত্মসমর্পন কারীর আরবী হলো মুসলমান। কাজেই ইসলাম বা ওঁম শান্তি বা ¯্রষ্টাতে আত্মসমর্পন কোনো সীমাবদ্ধ জাতি গোত্রের বিষয় অবশ্যই নয়। ইহা পৃথিবীর মানব জাতির জন্য আল্লাহ বা ¯্রষ্টা প্রদত্ত বিধান বা ধর্ম। এ আল্লাহর বিধান মানতে হলে একজন পরকাল প্রাপ্ত মানুষ বা খান্নাসমুক্ত মানুষ এবং একজন চেতন মানুষের হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহন করে পরিপূর্ণ ইসলামে দাখিল হতে হবে। বায়াত গ্রহন ব্যতীত কোন এবাদত আল্লাহর নিকট কবুল হবে না। তাই প্রত্যেক মানব জাতিরই একজন নায়েব নবীর নিকট বায়াত গ্রহন করাই হলো আল্লাহর বিধান।
এই পৃথিবীতে আল্লাহ্ অনেক নবী রাসূল ও অনেক ওলি, আউলিয়া প্রেরণ করেছেন। সকল মানব জাতির হেদায়তের জন্য ও প্রত্যেক নবী রাসূলের দেখানো পথ অনুসরন করার জন্য একজন নায়েব নবী বা একজন ইনসানুল কামেলের হাতে হাত দিয়ে বায়াত গ্রহন করতে হবে। তা না হলে কোন মতেই আল্লাহ্র দর্শন পাওয়া যাবে না।
মহান আল্লাহ্ পাকের বিধান হলো একজন পরকাল প্রাপ্ত চেতন মানুষ এবং জিন্দা মানুষ এলমে সিনার অধিকারী একজন পাক মানুষের হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহন করতে হবে। কারন আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে বলেছেন যে, ব্যক্তি রাসূলের হাতে হাত দিয়ে বায়াত গ্রহন করলো, তার হাতের উপর আমার হাত থাকে। (সূরা ফাত্তাহ, আয়াত-১০)। কারন আল্লাহ্ বলেছেন, আল্লাহ্ ও রাসূলের মধ্যে প্রভেদ জ্ঞান করা যাবে না। করলে ভূল হবে এবং খাঁটি কাফের হয়ে যাবে। (সূরা নিসা আয়াত-১৫০-১৫১)।
আমরা জানি এই প্রথিবীতে যত বড় বড় সাধক, ফকির, ওলি- আউলিয়াগণ রয়েছে তারা সবাই কোন না কোন মুর্শিদের নিকট হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহন করেছেন। তাহলে কী সকল ইনসানুল কামেলগণ ভূল করেছেন? বাইয়াতের বিরুদ্ধের কথাগুলো হলো মুনাফেক মুয়াবিয়া এবং তাদের প্রেতাত্মা ও তার পোষা কুকুর মৌল্লা- মৌলভীগণের মুখের বানানো কিচ্ছা। কারন মুর্শিদ ব্যতীত কোন এবাদত আল্লাহ্র কাছে কবুল হবে না। যদি কোন ব্যক্তি একজন ইনসানুল কামেলের হাতে হাত ধরে বায়াত গ্রহন না করে তাহলে সে কোন দিন মুসলমান হতে পারবে না। মুসলমান শব্দের অর্থ হলো আত্মসমর্পন। এ আত্মসমর্পন করতে হলে একজন ইনসানুল কামেলের হাতে হাত ধরতে হবে। তা না হলে কোন দিন আল্লাহ্র দিদার লাভ করা যাবে না। একজন মুর্শীদ ব্যতীত কোন দিন আল্লাহ্র ভেদ জানা যাবে না। কারন খোদার হাদিদু এ সেফাতি নামের শব্দের অর্থই হলো মুর্শিদ (যা বর্তমান) আর তারাই হলো আত্ম পরিচয়ের অধিকারী ও লা মউতে অবস্থানকারী। কুরআনে আল্লাহ্ পাক বলেছেন, যে ব্যক্তি রাসূলের অনুগত্য করল, সুতরাং অবশ্যই সে আল্লাহ্র অনুগত্য করলো (সূরা নিসা আয়াত-৮০)। এই আয়াত দ্বারা বোঝা গেল যে, আল্লাহ্র দিদার লাভ করতে হলে মুর্শিদের হাতে বায়াত হতে হবে। কারণ বলা হয়েছে, যার কোন মুর্শিদ নেই তার মুর্শিদ শয়তান। আর যারা বলে যে স্বপ্নে বায়াত হওয়া যায়, তাদের কোন মর্শিদ নেই। তার মানে বোঝা গেল, তাদের মুর্শিদ হলো ইবলিস। আর ইবলিসের বান্দা কখনো আল্লাহ্র বান্দা হতে পারে না। খাজা বাবা গরিবে নেওয়াজ (আঃ) হতে এরশাদ করেছেন যে, যে ব্যক্তি শায়েখ বা মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শক নেই তার কোন দ্বীন নেই। যার দ্বীন নেই তার কোন মারফতের এলাহি নেই। যার মারফতের এলাহি নেই তার সত্য পথের পথিক গণের সঙ্গে সংযোগ নেই। যার কোন শুভাকাঙ্খী নেই তার কোন মাওলা (প্রভু) নেই। অজ্ঞ মুর্খগণ এ কালামগুলোর ভেদ বুঝে না। শানে হাবিবুর রহমান কিতাবে ২০০ পৃষ্ঠা মুফতী আহম্মদ ইয়ার নাইমী “ইয়াও মানাদউ কুল্লালা ইনাসিন বিইমামহীন”যে দিন আমরা প্রত্যেক মানুষদেরকে তাতের ইমামসহ (নেতাসহ) ডাকবো, এ আয়াতের সূত্রে বলেন, মানলা শাইখা লান্ছ ফিস শায়খিশ শয়তান। যারা বায়াত গ্রহন করেনি তাদের কে হাশরের দিন শয়তানের দল হিসেবে ডাকা হবে। যেহেতু শয়তান হলো কাফের। আর যারা বাইয়াতে অবিশ্বাসী অর্থাৎ যাদের কোন মুর্শীদ নেই, আপনারাই বলুন তারা কোন দলের?
ওলী মুর্শিদের হাতে হাত দিয়ে তথা বাইয়াত গ্রহন করে তাঁর নিদের্শিত পথে চললেই আসবে কাঙ্খিত মুক্তি। নতুবা আবদ্ধই থাকতে হবে নফসানিয়াতের দোযখ যন্ত্রনায়। মুর্শিদ সকলের সহায় হোক।

সাবস্ক্রাইব করুন
ফেসবুক পেজ
ইউটিউব
ইনস্টাগ্রাম
টুইটার X