আপন ফাউন্ডেশন

Date:

তরিকতে নূর : আদব প্রসঙ্গে আলোচনা

ফেসবুক পেজ
ইউটিউব চ্যানেল

ছালমা আক্তার চিশতী

আদব ও নম্রতা হলো জন্নাতি গুণ। এই আদব, নম্রতা, তমিজ, তাজিম অর্জন রেতে হলে তরিকতে পরিপূর্ণ দাখেল হতে হয়। ঈমান যার যতো বিশুদ্ধ/নির্মল আদব-নম্রতা-বিনয় তার ততো প্রবল। ইতাই সর্ব ইবাদতের মূল। কারণ-কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত এই পাঁচটি স্তম্ভ ঠিক মতো ধরে রাকতে হলে আদবও নম্রতার নূর লাগবে। আমরা মনে করি এমনি স্বাভাবিক গতিতেই চললেই হবে- এই ধারণাটিই হলো আমাদের ভুল। এই ভুলের মাঝে থাকলেই বিপথগামি হতে হবে। যেমন- কথায় আছে, ‘কাাঁচাতে নু নুলে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস’। যখন কাঁচা থাকে তখন বাঁশকে নোয়ানো যায় না। তেমনি একজন তরিকতপন্থী মানুষের হওয়া উচিত। তরিকতপন্থী হওয়াটাই হলো তার মাঝে আদব নম্রতার নূর লাগবে। যার মাঝে আলো রয়েছে তার আর অতিরিক্ত আলোর প্রয়োজন হয় না তেমনি যার মাঝে আদব নম্রতা রয়েছে সেই ব্যক্তি অতিরিক্ত কোন চাহিদা থাকবে না। অতিরিক্ত চাহিদাটা হলো দুনিয়াতে কায়েম থাকার লক্ষণ।

যার চাহিদার নিয়ন্ত্রণ হয় নাই তার আখেরাতের ফলাফল হবে শুন্য। কারণ, আখেরাত এই নাছুতের জগত হতে তৈরি করে যেতে হবে, না হলে কর্মফল অনুযায়ী ফলাফল তৈরি হবে। যে কর্মফলটা আখেরাত মুখি হবে সে মানব জনমা হবে সার্থক। সর্থকতা অর্জন করতে হলে আদব নম্রতা সর্বোচ্চতর অবস্থানের উপর দাঁড়াতে হবে। কারণ, কর্মফলটার মাঝে নিজ অবস্থান কি হবে কতা নির্ভর করে। নিজ অবস্থানের উপর যেই মানুষ অচেতন তার কর্মফলটা অতি ভয়াবহ হবে। এই ভয়াবহ কর্মটাকে সুফলে পরিণত করতে হলে চরম আদব নম্রতার মাঝে যুব দিতে হবে। যেমন- একটি বরফের টুকরা আগুনের তাপ পেলে গলতে শুরু করে তেমনি যার মাঝে আদব নম্রতা রয়েছে তার মান গুরুর এশকের আগুনে পুড়ে বরফের মতো শক্ত অবস্থানটি পানির মতো সরল হয়ে যাবে, শুধু তা-ই নয় সবার সাথেই তার আচার-আচরণ হবে মধুময়। পানি যেমন যেই পত্রে রাখা হয় সেই পত্রের আকর ধারণ করে তেমনি যার মাঝে আদব নম্রতা রয়েছে তাকে যেই হালে রাখে সে ঐ হালেই থাকবে। আমার গুরু হযরত কাজা কাজী বেনজীর হক চিশত নিজামী (মাঃ জিঃ আঃ) তাঁর একটি গানের মাঝে বলছেন “সরল মনে গুরুর ধ্যানে সদায় যেইজন মজে থাকে, বলো তার মতো কি ধনীরে আছে ত্রিজগতে”।

এলেম দ্বারা মুর্শিদকে চিনা যায় আর আদব নম্রতা দ্বারা মুর্শিদের মনকে জয় করা যায়। বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ)- তাঁর আলোচনা সভার মাঝে একটি কুকুরকে দেখে সাত বার দাঁড়িয়ে গেলেন। কারণ, সে কুকুরটি ঐ পথে সাতবার আসা-যাওয়া করেছিল এবং সে কুকুরটি ছিল তাঁর হুজুরের বাড়ির। হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ)- তাঁর এত উচ্চ স্তরের আদব ছিল যে তাঁর আলোচনা সভার মধ্যে যখনই তাঁর দুষ্টি ডান দিকে পড়তো তখনই সাথে সাথে দাঁড়িয়ে যেতেন। কারণ, তাঁর হুজুরের মাজার বা রঁওযাটি ছিল আলোচনা সভার ডান দিকে।

হযরত ফরিদউদ্দীন মাসুদ গঞ্জেশকর (রাঃ)- তাঁর হুজুরের খেদমত করেছিল চৌদ্দ বছর। তাঁর হুজুরের খেদমত করতে গিয়ে পতিতা মহিলার নিকট চোখ বন্ধক রেখে হুজুরের খেদমতের আঞ্জাম দিয়েছিলেন। ইহা এক কঠিন বিষয়। হযরত ইব্রাহিম বিন আদহাম (রাঃ)- তাঁর রাজত্ব ছেড়ে দিয়ে হুজুরের খেদমত করেছিল চব্বিশ বছর। তিনি নিজেই জঙ্গল হতে কাঠ কেটে এন জীরের দরবারে দিতেন। ইহাই ছিল তার খেদমতের আঞ্জাম। আদব নম্রতা ধরে রাখাইট ভক্তের মূল সাধনা। বিশ্বাস যার যতোটুকু প্রতিষ্ঠিত/পরিশুদ্ধ তার আদব-নম্রতা ততোটুকু পরিশুদ্ধ। যারা পর্থিব স্বার্থ পূরণের জন্য বায়াত হয়, তাদের বায়াত সঠিক নয়, তারা তাদের কর্ম অনুসারে ফলাফল ভোগ করবে। কারণ, হেদায়েত পাওয়াটা অতি ভাগ্যের বিষয়। আর পার্থিব স্বার্থ পূরণ না হলে যারা গুরুকে ত্যাগ করে আল্লাহপাক হাশরের দিন তাদের প্রতি তাকাবেন না। যাদের মাঝে স্বার্থ রয়েছে তাদের আদব নম্রতার ঘাটিতিও রয়েছে। আদব নম্রতা থাকলে নিজ ব্যক্তি স্বার্থ আর থাকে না। আদব নম্রতা যার যত বেশি সে ততো বেশি মুর্শিদের আনুগত্যে থাকতে পারবে।

হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রাঃ) –এর একটি ঘটনা নিচে বর্ণনা করা হলো- মানুষের নফস বা কু-প্রবৃত্তি যেন কয়লা সদৃশ। প্রথমতঃ তিনি কয়লার প্রভাবে অর্থাৎ তামসিকতায় ভুগছেন। তখন এবাদত-বন্দেগীর অগ্নিকুন্ডে ফেলে দিয়ে কয়লাকে তিনি উত্তপ্ত করেন। আর তওবা ও অনুতাপের হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে তাকে আয়নার মতো স্বচ্ছ করেন। এ নিয়ে পাঁচ বছর অতিবাহিত হয়। নানা ধরনের এবাদত-বন্দেগীতে নিজেকে তিনি গড়ে তোলেন। পুরো এক বছর নিজের প্রতি সূক্ষ্ম দৃষ্টি ফেলে তিনি দেখতে পান, অহংকারের রশি তাঁর কাঁধে। এ রশি ছিন্ন করার জন্য আরও পাঁচ বছর তিনি কঠের সাধনায় রত হন। আর নব মুসলমান হয়ে যান। তখন মানব সমাজকে তাঁর মৃত বলে মনে হয়। তিনি তাদের ওপর জানাযা আদায় করে তাদের থেকে আলাদা হয়ে যান। যেমন জানাযা আদায়কারীরা মৃত ব্যক্তি থেকে তাদের থেকে আলাদা হয়ে যান। যেমন জানাযা আদায়কারীরা মৃত ব্যক্তির থেকে আলাদা হয়ে যান। তারপর তিনি আল্লাহর নৈকট্যলাভে সক্ষম হন।। গুরুর প্রতি আদব, নম্রতা, তমিজ ও তাজিম দ্বারাই সর্ব সাধন সিদ্ধি হয়। সব যুগের যত মহাপুরুস রয়েছে তাঁরা এই আদবের দ্বারাই সাধনার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন। আদবের ফল’ই হলো পবিত্র প্রেম। যেমন- একটি মসজিদ ঘর তৈরি করতে গিয়ে তার ফাউন্ডেশন তৈরি করতে হয় ইট, পাথর, সিমেন্ট, বালু দিয়ে তেমনি এই দেহ মসজিদ ঘরের ফাউন্ডেশন হলো বিশ্বাস-ভক্তি, আদব নম্রতা। ফাউন্ডেশন না থাকলে মূল ভিত্তি ঠিক থাকে না। একটা মানুষ তার মূল ভিত্তিকে ধরে রাখে নিজ নফসের খায়েশকে দূরীভূত করে। মুরিদের আদব-নম্রতা সম্পর্কে পীর-মুর্শিদের কিছু বাণী উল্লেখ করা হলোঃ-

পীরের অজুদকে খোদার এনায়েত মনে করবে এবং তার সাথে পূর্ণ আদব বজায় রাখবে। নিজের সুখ-শান্তি পীরের মর্জির উপর নির্ভর করবে এবং নিজের নফসের খায়েশকে তাঁর সন্তুষ্টির তাবেদার করবে।

একজন মুরিদের এইরূপ অবস্থানই তৈরি করে নিতে হয় তার মনের। কারণ, দুনিয়ার সুখ-শান্তির আশা যদি মনে অহরহ থাকে তবে আর গুরু ভজন হবে না। মনের মাঝে যত দুনিয়ার প্রাধান্য থাকবে তত আখেরাত হারানো যাবে। যারা আধ্যাত্মিক জ্ঞানী রূপে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে তাঁরা সবাই দুনিয়ার সুখ-শান্তিকে ত্যাগ করেছেন। আমিত্ব ত্যাগেই মানব ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। যারা আমিত্বের আবরণ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেনি সে অশান্তির অতল সাগরের মাঝে ডুবে আছে। মানুষ এক দরজা থেকে অন্য দরজায ভ্রমণ করে যেমন- হায়ানিয়াত থেকে ইনসানিয়াতে। মানুষ যখন খোদার দিকে ধাবিত হয় তখন তার নিজ নফসে বাস করা মুন্সি আজাজিল/খান্নাছ এসে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার বহুরূপ চেষ্টা করে থাকে, এই বাধাগুলোকে অতিক্রম করার একটাই পথ হলো নির্মল বিশ্বাসের মাধ্যমে পীরের মর্জির উপর নিজ মনকে ধাবিত করা। গুরুর এ বাহ্যিক দেহটা বিমূর্তের মূর্তরূপ বিধায় একজন ভক্ত/মুরিদানের জন্য খোদার রূপ দর্শন করার একমাত্র অবলম্বন বিধায় আল্লাহর তরফ হতে ইহা এক মহা নেয়ামতস্বরূপ। মানব মনকে গুরুর প্রতি একনিষ্ট চিত্তে ধাবিত করতে চাইলে নফসের ভেজালগুলো সরাতে হবে/হায়ানিয়াত দূর করতে হবে। যেমন ইটের দেয়াল তৈরি করতে চাইলে ঐ দেয়ালটি মজবুত হবে পানির দ্বারা তেমনি আমাদের দেহ ঘরের মনের দেয়ালগুলো শক্ত হবে আদব নম্রতার পানি দ্বারা। আদব নম্রতার নূর দ্বারা একজন ভক্ত তার নিজ সত্তাকে কলুষিত করে তোলে। পীরের ভেদ জানা হরে খোদার ভেদ রহস্য জানতে হলে খোদার ভেদ রহস্য জানতে পারবে, কারণ, খোদাকে চেনার মাঝে অন্তর্নিহিত মূল ভেদ রয়েছে নিজকে চেনার মধ্যে।

পীর-দরবেশদের সাথে ওঠা-বসা করা এবং আদবের সাথে পবিত্র মন নিয়ে আলোচনা করা পৃথিবীতে সবচেয়ে উত্তম কাজ এবং তার বিপরীত কাজ হল সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ।

নিজ পীরকে রেখে অন্য দরবারে বা বিভিন্ন মাজারে দৌড়াদৌড়ি করলে বা ‍পূণ্য লাভের আশা করলে নিজ পীরের ফায়েজ বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি তার ঈমান মাত্রই সঠিক নয় বলে সাব্যস্ত হবে। তাই একজন প্রকৃত মুরিদের কতৃব্য হলো পীরকে রেখে কোথাও না যাওয়া। ‘বস্তুত বাধ্যকারী সটিক প্রয়োজন ছাড়া স্বীয় পীর-মুর্শিদ থাকা সত্ত্বেও অন্য পীরের হাতে বায়’আতে ইরাদত’ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা জরুরী। এটাই নির্ভরযোগ্য অভিমত। এটাতেই কল্যাণ নিহিত। অন্যথায় পরিপূর্ণ ক্ষতির সম্ভাবনা বিদ্যমান’ (বায়আত ও খিলাফতের বিধান ২১ পৃঃ)। যারা পীরকে রেখে অন্য দরবারে আসা যাওয়া করে এবং স্বীয় পীর অসন্তুষ্ট হয় তবে তার সর্ব আমল ধ্বংস হয়ে যাবে এবং পরিণামে তারা অন্ধকার কবরের মাঝে নিক্ষিপ্ত হবে, কালো অজুদ নিয়ে হাশরে উঠবে। এই অন্ধকার থেকে মুক্ত হতে গেলে পীর মুর্শিদের দয়া লাগবে।

এই আদব, নম্রতা, তমিজ ও তাজিম ধরে রাখতে পারলেই একমাত্র পীরের ফায়েজ বরকত লাভ করবে। খোদাকে জয় করার একটাই রাস্তা হলো বিশ্বাসযোগে আদব-নম্রতা ধারণ করা। এর দ্বারাই খোদার ভেদত্ত্ব জানা যায়। খোদার ভেদ হলো একজন ইনসান। ইনসাফ হতে ইনসান এবং ইনসানের গুণ-খাছিয়ত হলো ইনছানিয়াত- যাকে ফিতরাতাল্লাহ্ বলে। এই জানার মাঝে বাধাস্বরূপ এসে দাঁড়ায় কালো রঙ্গের একটি অজুদ। তার আছে অসংখ্য সুরত। সেই কালো অজুদকে নূরের অজুদের রূপ দিতে চাইলে আল্লাহর খাস নাম আলিমুল দীলে ধারণ করতে হবে।

আমর দাাদ হুজুর দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী চিশতী নিজামী (রাঃ) তাঁর একটি গানের মাঝে বলছেন- ‘হলে জ্ঞানের অঙ্কুর, মন পাগল তোর, ভয় কিরে কার শমনে, জ্ঞান দিয়ে মন রাখবে সংশোধনে’।

মন একটি অচিন পাখির ন্যায়, এই মনকে ধরতে হলে গুরুপ্রদত্ত জ্ঞান লাগবে, তা ধারণ করতে না পারলে এই অচেনাকে চেনা যাবে না। দীলের মাঝে যাদি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে বাসা বাধে তবে আর কালো রঙের অজুদটি ভাঙ্গা যাবে না/অতিক্রম/নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কারণ, সব ভেজালের মূল হলো দুনিয়ামুখি চিন্তা চেতনা- যা এ অজুদের নফস হতে প্রকাশ। এই জগতে যারা কামেল তাঁদেরকে চিনতে হলে সরল স্বভা দীলে ধারণ করতে হবে। যারা খোদার ভেদ জানতে চায় তাদের গুরুর সংযোগে এসে নিজকে চিনতে হবে। রুহে ইনসানীর অধিকারী হলেই হবে চৈতন্যের উদয়, আর চৈতন্যতাই পরকাল। চেতন যারা তার সর্বসময়/দম-কদমে রূপের পাহাড়া দিবে। কারণ, রূপের ঘরেই মাওলার বাসস্থান। আদব নম্রতা ধরে রাখতে হলে জান্নাতি কিছু গুন লাগবে। জান্নাতি গুণগুলো না থাকলে পীর মুর্শিদের প্রতিও আদব নম্রতা আর থাকবে না। ভক্তি রস দ্বারাই গুরুকে জয় করা যায়। প্রেম ফুল দ্বারাই তাঁর পূজা করা যায়। কারণ, গুরু হলো প্রেমের কাঙ্গাল, সে ধারে ধারে ঘুরে বেড়ায় প্রেমেরে জন্য। গালিমপুরের সাধক শেরআলী খান একটি গানে লিখেছেন, গানটি হলো- ‘প্রেম ফুলে পূজলে নাকি শুদ্ধ পূজা হবে তোমার, পূজিবার কী আছে আমার পূজিবার কী আছে আমার।’ গুরুর এখতিয়ারের বাহিরে চলাফেরা করলে পবিত্র প্রেমের আবাস ইঙ্গিত বিন্দু পরিমাণও দেখা মিলবে না তকদিরে।

পীর-মুর্শিদ আসলে দাঁড়াইয়া সম্মান করবে এবং তাজিম করবে। তাঁর বংশধরকেও সম্মান করবে এবং তাদের প্রতি সু-ধারনা পোষণ করবে।

শুধু গুরুকে/পীরকেই নয় তাঁর বংশধরদের প্রতিও আদব সম্মান বজায় রাখতে হবে। সম্মান না দিতে পারলে নিজ পূর বিরক্ত/অসন্তুষ্ট হবে। পীর অসন্তুষ্ট হওয়া মানে আল্লাহকেই অসন্তুষ্ট করা- এই কথার ভেদ রহস্য কেবল একজন কামেল পীর-মুর্শিদ দিতে পারবে। পীরের বংশধরদের অবস্থান অনেক উচ্চ স্তরে। কারণ, তাদেরকে সম্মান দিতে না পারলে পীরকে/গুরুকে পুরোপুরি সম্মান দেয়া হলো না। কারণ, যদি এই সম্পর্কে জানার চ্ছিা থাকে তবে আদবের সাথে একজন পীরের নিকট থেকে জেনে নিতে পারে। বিশ্বাসের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে যে আদব-নম্রতা ধারণ করে রেখেছে সেই জ্ঞানী, ভক্ত। ভক্ত থাকে দায়েমী নামাজে। তাই বলা হয় ভক্তের অধীন ভগবান। নামাজের স্বভাব হলো আদব-নম্রতা (সুরা-মুমিনুন-২)। যার আদব-নম্রতা ঠিক আছে তার সর্ব ইবাদতই ঠিক আছে। আর আদবে আউলিয়া, বেআদবে শয়তান। মনের অবস্থান যদি সুন্দর না হয় তবে আর গুরুর নিকট যাওয়া ফলদায়ক হবে না কারণ, গুরুর কাছে যাওয়ার মূল উদেশ্য হলো মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যার গুরুতে মন একাগ্র চিত্তে স্থির হয়েছে সেই সম্পর্কে লালন সাঁইজি গানের মাঝে বলেছেন- “সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার।” গুরু জ্ঞানকে সঠিকভাবে কাজে না লাগাতে পারলে গুরুর দয়া কোন দিন শিষ্যের দীলে পৌঁছবে না। যেমন- টিভি দেখার জন্য রিমোট লাগে, রিমোটের সঠিক ব্যবহার করতে না পারলে সেই রিমোটই টিভি নষ্ট করতে পারে, তেমনি মানুষের দীলের মাঝে ইচ্ছা শক্তি নামক রিমোট রয়েছে সেই রিমোটের অপব্যবহার করলে দেহ নামক ঘরটি ভেঙ্গে যাবে।

পীরের ব্যবহৃত জিনিস পাত্র ব্যবহার করবে না হুকুম ব্যতীত এবং তাঁর জায়নামাজে পা রাখবে না।

পীর-মুর্শিদ যেই জিনিসপত্র ব্যবহার করে থাকে সেইগুলো তাঁর অনুমতি ব্যতিত ব্যবহার করবে না। কারণ, পীর-মুর্শিদের বিষয়টি হলো আলাদা। তাঁদের সাধারণ মানুষের মত দেখা গেলেও তাঁরা আলাদা। পীর-মুর্শিদের কালামগুলো হলো এলমে লাদুন্নী। তাঁরা আধ্যাত্মিক জগতে মহামানব, তাই তাঁদের সব বিষয় হলো আলাদা। যার আদব নেই তার ঈমান ঠিক নেই। কিছুদিন পর সে ব্যক্তি হয়তো পীর-মুর্শিদ থেকে বিতাড়িত হয়, নয়তো সে নিজেই আল্লাহর প্রতি ঈমান হারিয়ে আসফালা সাফেলীন হয়ে যায়। গুরু কর্তৃক বা নিজেই গুরু/মুর্শিদ হতে বিতাড়িত হলে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর লানত প্রাপ্ত হয়, আঠার হাজার মাখলুকাত তাকে লানত দিতে তাকে। কারণ, গুরু বা মুর্শিদের নিকট বায়াত হওয়াই হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা এবং তা আল্লাহর হাতেই বায়াত বলে কোরানে বিধৃত (সুরা ফাতহ্- ১০)। সর্ব প্রথম গুরুর প্রতি বেয়াদবী করে তর্ক-অহংকার করে এবং আল্লাহর ঘর মসজিদে সেজদা না করে লানত প্রাপ্ত হলো মুন্সি আজাজিল। সে হলো গুরু/মুর্শিদ হতে বিতাড়িত। কারণ, সে আদব-নম্রতা, বিনয়ের নূরে দাখেল হতে পারেনি।

যুগে যুগে মুন্স আজাজিলের অনুসারীদের মাধ্যেই আদব-নম্রতা, বিনয়ের চরম ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যারা পূর-মুর্শিদের ভেদ জানে না তারা এইরূপ বেখেয়ালী কর্মকান্ড করে তাকে। যাদের বংশগত ভাবে পীর-মুর্শিদের আদব বুঝেনা তারা বেশীরভাগ এরূপ বেলেহাজ কুফরী কর্মকান্ডগুলো করে থাকে।

মাওলানা রুমী (রাঃ) বলেছেন- “পীরকে খোদা হইতে দুই জানিও না, দুই দেখিও না, দুই ভাবিও না।”

নিজ মানব সত্তার মাঝে যদি আদব-নম্রতা থাকে তবে পীর মুর্শিদের প্রতি এইরূপ সুধারণা আসবে। নিজ সত্তাটাকে পবিত্র করে তুলতে হবে, না হরে অপবিত্র সত্তার জন্য এই মানব জনমটা অভিশপ্ত জনমের অীধকারী হয়ে যাবে। যেমন- মানুষ বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন পোশাক পরিধান করে থাকে, আর ঋতুটা যদি একটাই হতো তবে একই রকমের পোশাক পরিধান করা হতো, ঠিক তেমনি একজন মানুষের এই মনকে বহুগামী করলে সেই স্বভাব অনুসারে তাকে পোশাক পরিধান করানো হবে সেই পোশাকগুলো মানুষের হবে না, আর মান যদি গুরুর অনুগামী হয় তবে সেই মানুষটির পরনে মানুষের পোশাক পরিধান করা থাকবে।

একজন মুরিদের নিজ অস্তিত্বকে বা ইচ্ছাকে পীরের ইচ্ছিা/মর্জির উপরে পরিপূর্ণ সমর্পিত করতে হবে। কারণ, পীর যদি সন্তুষ্ট থাকে তবে একজন মুরিদ তার মূল গন্তব্যে পৌঁছতে পারে। আমাদের এই পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়াটা হলো একটি অজানা পরীক্ষার মতো, আর গুরুর দেখা পাওয়াটা হলো সৌভাগ্যের বিষয়, আল্লাহর দয়া ও করুণার ফল। কারণ, ইহা পূর্ব ওয়াদার বাস্তবায়ন (সুরা আরাফ- ১২৭)। আর এই অজানা পরীক্ষা পাশ করতে হলে গুরুর নিকট গিয়ে তাঁর নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে, গুরুকে নিজ মনের ভিতরে ফুলের বাগান তৈরি করে আদব নম্রতা অর্থাৎ তাজা ফুলের সুগন্ধি দিয়ে সন্তুষ্ট রাখতে পারলে এই অসার জনমটা সার্থক হবে। কোদা যার সহায় হবে তার এই দূর্গম পথ অতিক্রম করতে কষ্ট হবে না। যেমন- যারা শিক্ষকের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল এবং পড়ালেখায় অধিক মনোযোগ থাকে তাদের পরীক্ষায় পাস করাটা কষ্টকর হয় না। তেমনি যারা তরিকতের জগতে অধিক মনোযোগী , বিশ্বাস-ভক্তি নির্মল আছে তারা এই নাসুতের দরিয়া ধৈর্য্যের সাথে পাড়ি দিযে রুহে ইনসানীর দেশে দেশে পৌঁছে যাবে। পীরের জিনিস পত্র পীরের অনুমতি ব্যতিত না ধরার মাঝে একটি নিগুর ভেদ রহস্য লুকিয়ে রয়েছে কারণ, একজন মুরিদের জন্য এই অবস্থানটি হলো চরম আদব নম্রতার। গুরু একজন সাধারণ মানুষের মতো দেখতে হলেও কিন্তু সে সাধারণ নয় তাঁর অন্তর জগতটা হলো পরিশুদ্ধ, আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারীতে পূর্ণ। আর একজন সাধারণ মানুষ ভুল ভ্রান্তির অতল সাগরের মাঝে ডুবে থাকে, গুরু হলো এই মায়ার জগতের ভুল ভ্রান্তির উর্ধ্বে হলো তাঁর বাসস্থান।

এ ডুবন্ত নাসুত সাগর হতে গুরু তার অনুসারীকে তুলে মুক্তির জগতে নিয়ে যায় তাই একজন গুরুর সম্মান আল্লাহ নিজেই তৈরি করে দেন। গুরুর প্রতি আদব, নম্রতা, তমিজ ও তাজিম না থাকলে তার সরিষার তেল মেখে কলা গাছে ওঠার মতো পরিস্থিতি হবে। পিছল খেতে খেতে সে নিজের গন্তব্য ভুলে যায়। একবার যদি ভুল পথে অগ্রসর হয় তবে আর সহজে মূল গন্তব্যে পৌঁছানো হবে না। কারণ, শয়তান অহরহ মানুষের পিছনে লেগে আছে। তাকে বশ করতে না পারলে মানব জনমটাই অসার হয়ে যাবে। বহু রূপের মাঝে ভ্রমণ করতে হবে। আমার মাঝে আদব নম্রতার অনেক ঘাটতি রয়েছে। গুরু/মুর্শিদের নিকট নূরে-এ-আদব/বিনয়-নম্রতার করুণা প্রার্থী। তারপরেও নূর-এ-আদবের মতো কঠিন বিষয়টি সম্পর্কে কিছু লেখার বাসনায় কলম ধরলাম, ভুল হলে দয়াল যেন ক্ষমা করেন।

তরিকতে নূর : আদব প্রসঙ্গে আলোচনা
ছালমা আক্তার চিশতী

সাবস্ক্রাইব করুন
ফেসবুক পেজ
ইউটিউব
হোয়াটসএপ গ্রুপ
টেলিগ্রাম গ্রুপ