মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৮ম সংখ্যা, অক্টোবর ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত
প্রবন্ধ – বারবী চুল
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
হিংসুকে হিংসা করে, গীবতকারী গীবত চর্চা করে মনে তৃপ্তি পায়। কুকুরের তকদিরে যা আছে তা খেয়েই শান্তি পায়। সব প্রাণী ঘি খেতে পারে না, তা যতো পুষ্টিকর খাদ্যই হোক না কেনো। প্রবাদ বাক্যে বলছে, কুকুরে ঘি খেলে নাকি গায়ের পশম ঝড়ে যায়। একদল আলেম-মোল্লা-মুফতি বা তাদের অনুসারীগণ এমন কিছু বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করে যে তাদেরকে গন্ডমূর্খ বললেও গাধায় বত্রিশ দাঁত বের করে হাসবে। তারা এ ধরণের কাজ কেনো করে ? কারণ, মূলে হলো অজ্ঞতা-মূর্খতা। তাদের এ ধরনের বিকৃত চিন্তার ফসল গ্রহণ করছে সমাজের এক শ্রেণীর লোকজনও। তাই তাদের অনুসারীদের মধ্যে অনেকেই অনেক বিষয়কে নাজায়েজ, বেদআত, হারাম অথবা টিটকারীস্বরূপ অনেক কথা বলে থাকে। যেমন, মাথায় লম্বা চুল থাকলে একদল আলেম-মোল্লারা এবং তাদের অনুসারীগণ বলে ‘চুল্লা’, মেয়ে লোক, বা কেউ বলছে বড় চুল রাখা জায়েজ নেই, কেউ বলছে বেদআত, কেউবা আরো একটু এগিয়ে গিয়ে বলছে ‘ভন্ডামী’ বা এরা ভন্ড ইত্যাদি। এ ধরনের কথা ওরা কেনো বলছে? কারণ, ইহা তাদের বিকৃত স্বভাবেরই প্রতিফলন, যা ইবলিশ বা শয়তানের গুণÑখাছিয়ত। শয়তানের কোনো স্ত্রী নেই কিন্তু বংশ বিস্তার করে চলছে ঠিকই।
শয়তানের গুণ-খাছিয়তকে বা শয়তানের ধর্মকে যে দীলে ধারণ করছে, পোষণ করছে, সে-ই হলো শয়তানের বংশধর। কুকুর যেমন ঘি খেতে পারে না ওরাও তেমন ভালো কোনো কথা বা চিন্তা দীলে পোষণ করতে পারে না। তারা তাদের মনকে অজ্ঞতা-মূর্খতার অন্ধকারে আবৃত করে ফেলছে, মানে দীলে মোহর মারা হয়ে গেছে। অনেকে পীর-ফকিরগণের লেবাছ দেখেও টিটকারী করে থাকে, ইহাই তাদের চরিত্র। ভালোমন্দ প্রভেদ করার শক্তি তাদের নেই, তাই গীবত চর্চা ছাড়া তাদের কোনো পথও নেই। এ ধরনের লোক (মানুষ নয়) নিজ আত্মা হারিয়ে তাদের অজান্তেই অন্তরে পশুর সুরত নিয়ে বাস করছে। তাই পশুত্বের আচরণ তাদের মুখ, হস্ত, পদ থেকে প্রকাশ পাচ্ছে। স্বভাবে সুরতের পরিচয় হয় বিধায় এ ধরণের লোকগুলো মানুষ নয়, মানব সুরতে পশু। যদি এ ধরণের গুণ-খাছিয়ত ত্যাগ করতে না পারে তবে দেহ ত্যাগের পরে তাদের সুরত বদল হয়ে যাবে মানে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। যেখানে ইসলামেরই চৌদ্দ আনা বিকৃত করা হয়েছে/করা হচ্ছে, নানা ফেরকার আলেম-মোল্লারা সেখানে ঝগড়া করছে চুল, দাঁড়ি, নখ, মোচ, হায়েজ-নেফাস, বউ তালাক দেয়া বা আনা, কাপড় টাখনুর নিচে না উপরে, ছবি হারাম না হালাল ইত্যাদি নিয়ে। মোল্লাতন্ত্রের ধর্মজ্ঞান পশ্চাৎমুখী, অকেজো, জড়ত্ব স্বভাবের।
তাই কাঠ মোল্লাদের লক্ষ্য করে বাংলার জাতীয় কবি এবং বিখ্যাত ওলী কাজী নজরুল ইসলাম তাদেরকে সুরসুরি দিয়ে ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য বলছেন,
“বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনো বসে
বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজি, কোরান-হাদিস চষে।”
ওলী-আউলিয়া, ফকির-দরবেশ, সাধু-সন্ন্যাসী বা তাদের অনুসারী তরিকতপন্থীগণের মাথায় লম্বা চুল দেখলে এক শ্রেণির বিকৃত চরিত্রের অধিকারী ছোয়াবের ব্যাপারী/ধর্ম ব্যবসায়ী মোল্লা-মুফতি বা তাদের অনুসারীগণের মগজ গরম হয়ে উঠে। (এ তাপের ঘরে মোয়াক্কেল হলো আজাজিল-শয়তান, সুরা নাস)। ফলে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে তারা। একটু লক্ষ্য করে দেখুন, মূলতঃ শয়তানই এ ধরণের আচরণ প্রকাশ করছে। এ ধরনের মোল্লা-মুফতিগণ দ্বীনে মুহাম্মদী হতে বহু দূরে অবস্থান করছে। বিশেষ করে ওরা দেওবন্দী ওহাবী, খারেজী, জামায়াতে মওদুদী বা অন্যান্য মৌলবাদী কুলাঙ্গার। তাদের এ ধরনের আচরণ ধর্ম এবং কোরান-হাদিসের পরিপন্থী। তাই বলছি, ওরা নামাজ-রোজা’ই যখন করছে সেই সাথে আল্লাহর অনুমতি নিয়ে ঈমান এনে ইসলামে দাখেল হয়ে যাওয়া উচিত। ‘খাসায়েছুল কোবরা’ কিতাবের ২য় খন্ডের ১৯-২১ পৃষ্ঠা (বঙ্গানুবাদ) হতে জানা যায় হযরত আদম (আঃ)-এর মাথায় লম্বা চুল ছিল এবং মুখে কোনো দাঁড়ি ছিল না। হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত আদম (আঃ)-এর মাথার চুল/কেশ মোবারক খেজুর গাছের ডগার মতো লম্বা ঘন কালো ছিল।
জান্নাতে দৌড়াদৌড়ি করার সময় নবীর লম্বা চুল গাছের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল। চুল কতো লম্বা হলে গাছের সাথে জড়িয়ে পড়তে পারে তা কি ভাবনার বিষয় নয়? এ হাদিসটি ‘তাফসিরে ইবনে কাছিরে’ বর্ণিত আছে। জানা দরকার খেজুর গাছের ডালগুলো বা ডগা প্রায় ৪/৫ হাত লম্বা হয়ে থাকে। তা হতে অনুমান করা যায় হযরত আদম নবীর চুল কতোটুকু লম্বা ছিল। প্রায় অধিকাংশ নবী-রাছুলগণের মাথায়ই লম্বা/ বাবরী চুল ছিল বলে প্রমাণিত। মানুষ সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্থায় দাঁড়ি আসে নি এসেছে শিশু উপযোগী লম্বা চুল। আদিম যুগ হতে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মাথার চুল, দাঁড়ি, মোচের অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। আদিম যুগে চুল দাঁড়ি কাটার ব্যবস্থা ছিল না বিধায় সবারই চুল, দাঁড়ি, মোচ অনেক বড় বড় ছিল, থাকাটাই স্বাভাবিক। ধীরে ধীরে উন্নত যুগে উন্নত ব্যাবস্থার কারণে মানুষের পোশাক, খাবার, যানবাহন, আচার-আচরণ, ব্যবহৃত জিনিস পত্র হতে শুরু করে সমস্ত কিছুই পরিবর্তন পরিবর্ধনের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। বর্তমান যুগে আমাদের মহানবী (সাঃ) এর অবস্থান কালে তিনি ক্লিন সেভ করতেন কিনা তা কিন্তু ভাবনার আছে! এ কথাটি শুনে মহিষের মতো গর্জন না করে, ফতোয়ার ডিগবাজি না খেলে আগে একটু গভীরভাবে চিন্তা করে বলুন! ১৯৮৮ ইং সনের ‘মাসিক গণফোরামের’ একটি প্রতিবেদন হতে জানা যায়, নবীজি (সাঃ) ৫৩ বৎসর পর্যন্ত ক্লিন সেভ করতেন। এ কথাটি তৎকালীন সময়ে ‘ইসলামী ফাউন্ডেশনের’ পরিচালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক লাইব্রেরীতে ইসলামী সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন। কারণ, তাঁর মুখে তখন দাঁড়ি ছিল না।
যাক, কিন্তু নবী-রাছুল, ফকির-দরবেশ, ওলীদের অবস্থাটি তা হতে অবশ্যই ভিন্ন প্রকৃতির। কারণ, এরা আল্লাহর পথে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়ে তাঁরই ধ্যানে-দিদারে মগ্ন হয়ে ফানাফিল্লাহতে বাস করেন। কেউ পাহাড়ে, কেউ জঙ্গলে, কেউ বা খানকার নির্জন কোঠায় বসে আল্লাহর গভীর ধ্যানে-দিদারে তথা জিকিরে মগ্ন হয়ে থাকে। কেউ লোক সমাজ হতে দূরে অবস্থান করে মজ্জুব হালতে দিন যাপনকরেছেন/করছেন। বিধায় নিজেদের শরীরের দিকে আর তেমন একটা নজর দেয়ার ,ফুসরত পান না। তাই দেখা যায় তাদের চুল-দাঁড়ি-মোচ অনেকের হাতের নখ পর্যন্ত অনেক বড়-লম্বা হয়ে যায়। সাধারণ লোকজন তাদের হাকিকত বুঝতে না পেরে যার যার মতে সে সমালোচনা করে থাকে। তাই গন্ডারদের গায়ে সুরসুরি দিয়ে বলছি , যদি একটু বোধোদয় হয়। স্বয়ং রাছুল পাক (সাঃ)-ই বাবরী চুল রেখেছেন। তার চুল কখনো কখনো কাঁধ অতিক্রম করে পিঠেও এসে যেতো। বর্তমানে নবীজি (সাঃ)-এর চুল মোবারক গুগলে দেখাচ্ছে তা কমপক্ষে দেড় হাত লম্বা হবে। যে সাহাবা রাছুলপাক (সাঃ)-এর মাথার চুল মোবারক যতোটুকু লম্বা দেখেছেন সে ততোটুকুই বর্ণনা করেছেন। সে মতে বর্ণনার ভিন্নতা স্বীকার্য, তাই শুনুন-
কিতাব মতে চুল তিন প্রকার –
(১) ওয়াফ্রা – যখন মাথার চুল কানের লতি পর্যন্ত লম্বা হয় তখন তাকে বলে ‘ওয়াফ্রা’। রাছুলপাক (সাঃ)-এর চুল অনেক লম্বা করে রাখতেন। কখনো কখনো তিনি তা কর্তন করে কানের লতি পর্যন্ত রেখেছেন। কানের লতি পর্যন্ত লম্বা কেশ মোবারক যারা দেখেছেন তাদের কিছু বর্ণনা তুলে ধরছি।
যেমন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাছুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, এক রাত্রে আমি সাদা গমের বর্ণের মতো একজন সুন্দর পুরুষকে স্বপ্নে দেখতে পেয়েছি। তাঁর মতো সুন্দর মানুষ তোমরা দেখনি। তাঁর চুল কানের লতি পর্যন্ত লম্বা ছিল। এবং এমন সুন্দর ছিলেন যে, তাঁর মতো সুন্দর চুলওয়ালা তোমরা দেখতে পাওনি। তাঁর চুলগুলো আঁচড়ানো ছিল। চুল থেকে যেন পানি টপ্কে পড়ছে। তিনি দু’জন লোকের উপর ভর করে/কাঁধে ভর করে খানা-এ-কাবার তাওয়াফ করছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম ইনি কে ? বলা হলো, ইনি মরিয়ম-তনয় ঈসা-মসীহ্ (আঃ)। পরেই আমি আরেকটি লোক দেখলাম, তার চুল কোঁকড়ানো, ডান চোখ কানা, যেন তা আঙ্গুরের মত বেরিয়ে রয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ লোকটি কে ? বলা হলো, মসীহে দাজ্জাল। (বোখারী ৫ম খন্ড, ৫৪৭৩)।
হযরত কাতাদা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, আমি আনাস (রাঃ)-কে রাছুলুল্লাহ (সাঃ)-এর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বললেন, রাছুলুল্লাহ (সাঃ)-এর চুল না অধিক কোঁকড়ানো ছিল, না অধিক সোজা ছিল। বরং দু’অবস্থার মাঝামাঝি ছিল। এবং লম্বায় ছিল উভয় কান ও ঘাড়ের মাঝ বরাবর (বোখারী ৫ম খন্ড, ৫৪৭৬ নম্বর হাদিস)। এ হাদিসে বর্ণিত কেশ মোবারক কানের লতির চেয়েও নিচে ছিল বলে প্রমাণিত।
হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সাঃ)-এর চুল/কেশ মোবারক অর্ধকর্ণ পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল। এ হাদিসটি ইমাম তিরমিযি তাঁর ‘শামায়েলুন তিরমিযীতে’ ২৩, ২৬ ও ২৮ নম্বর হাদিসে বর্ণনা করেছেন।
সুনান আত তিরমিযী (পোশাক-পরিচ্ছদ অধ্যায়, ১৭৫৪ নম্বর হাদিস) হযরত আনাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাছুলুল্লাহ (সাঃ) ছিলেন মধ্যম আকৃতির। তিনি অধিক লম্বাও ছিলেন না আবার খাটোও ছিলেন না। তিনি সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন এবং তাঁর গায়ের রং ছিল বাদামী। তাঁর মাথার চুল কোঁকড়ানোও ছিল না আবার একবারে সোজাও ছিল না। তিনি রাস্তায় চলাচলের সময় সামনের দিকে ঝুঁকে হাটতেন (সহীহ মুখতাসার শামাইল, নাসাঈ)। এ হাদিসটি হযরত ইবনে আব্বাস, বারাআ, আবু হুরায়রা, আবু সাঈদ, জাবির, উম্মে হানী (রাঃ) হতেও বর্ণিত আছে। হাদিসটি হাসান সহীহ গরীব।
বারাআ ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, নবী করিম (সাঃ) মাঝারি গড়নের ছিলেন। তাঁর উভয় কাঁধের মধ্যস্থল প্রশস্ত ছিল। তাঁর মাথার চুল দু’কানের লতি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আমি তাকে লাল ডোরাকাটা জোড় চাদর পরা অবস্থায় দেখেছি (সহীহ বোখারী-৩৫৫১ নম্বর হাদিস)।
ইবনে সা’দ, তিরমিযী, বায়হাকী, তাবারানী, আবু নায়ীম, ইবনে সাকান ও ইবনে আসাকিরের রওেয়ায়েতে হযরত হাসান (আঃ) বলেন, আমি আমার মামা হিন্দ ইবনে আবী হালাকে রাছুলুল্লাহ (সাঃ)-এ দেহাবয়ব সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। তিনি হুজুর (সাঃ)-এর দেহাবয়ব অধিক পরিমাণে ও সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করতেন। আমার প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন ঃ রাছুলুল্লাহ (সাঃ)-এর আপন সত্তার দিক দিয়েও মহান ছিলেন এবং অপরের দৃষ্টিতেও অত্যন্ত মর্যাদাবান ছিলেন। তাঁর মোবারক মুখমন্ডল পূর্ণিমার চাঁদের মত ঝলমল করতো। তাঁর গড়ন সম্পূর্ণ মাঝারি গড়নের চেয়ে কিছুটা দীর্ঘ ছিল। কিন্তু বেশী লম্বা গড়নের চেয়ে খাটো ছিলেন। মাথা সমতার পর্যায়ে বড় ছিল। কেশ যৎকিঞ্চিৎ কুঞ্চিত ছিল। মাথার কেশে আপনা আপনি সিঁথি হয়ে গেলে তিনি সিঁথি করতেন না। নতুবা সিঁথি করতেন। চুল কানের লতি পার হয়ে যেতো। তাঁর রঙ অত্যন্ত চমকদার ছিল এবং ললাট প্রশস্ত। তাঁর ভ্রু কুঞ্চিত, পাতলা ও ঘন ছিল (সংক্ষিপ্ত। খাসায়েছুল কোবরা, ১ম খন্ড ১৩৫)।
ইবনে আসাকির হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) হতে রেওয়ায়েত করেন যে, কিছু সংখ্যক ইহুদী হযরত আলী (আঃ)-এর কাছে এসে বললো: আপনার চাচাত ভাইয়ের গুণাবলী বর্ণনা করুন। হযরত মাওলা আলী (আঃ) বললেন, মুহাম্মদ না খুব লম্বা ছিলেন, না বেঁটে। তিনি মাঝারি গড়ন থেকে কিছু বেশী ছিলেন। রং ছিল লালিমা মিশ্রিত সাদা। চুল কোঁকড়ানো ছিল, কিন্তু সম্পূর্ণ কুঞ্চিত ছিল না। মাথার চুল কানের লতি পর্যন্ত ছিল। ললাট প্রশস্ত ছিল এবং গাল সুস্পষ্ট ছিল (সংক্ষিপ্ত) । খাসায়েসুল কোবরা ১ম খন্ড-১৩৪ পৃষ্ঠা)। এ ধরনের হাদিস ইবনে সা’দ ও ইবনে আসাকিরের রেওয়ায়েতে হযরত মাওলা আলী (আঃ) হতে বর্ণিত আছে (খাসায়েছুল কোবরা, ১ম খন্ড ১৩১, ১৩৩ পৃষ্ঠা)। তাছাড়া ‘খাসায়েসুল কোবরা’ কিতাবের ১ম খন্ডের ১৩৪ পৃষ্ঠায় হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতেও বর্ণিত আছে।
(২) লিম্মাহ – কানের লতি অতিক্রম করে যখন চুল কাঁধের উপর এসে পড়ে বা কাঁধ পর্যন্ত লম্বা হয় তখন তাকে বলে ‘লিম্মাহ।’
যেমন – বোখারী ৫ম খন্ডের কিতাবুল লেবাছ অধ্যায়ের ৪০৬ পৃষ্ঠায় হযরত বারাআ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আমি লাল তহবন্দ ও চাদর পরিহিত অবস্থায় নবী করিম (সাঃ)-এর চেয়ে অধিক সুন্দর আর কাউকে দেখিনি। (ইমাম বোখারী বলেছেন), আমার কোনো এক বন্ধু মালেক থেকে বর্ণনা করেছেন, হুজুর (সাঃ)-এর মাথার চুল ঘাড় পর্যন্ত এসে যেতো। আবু ইসহাক বর্ণনা করেছেন, আমি বারাআ (রাঃ)-কে এ হাদিস একাধিকবার বর্ণনা করতে শুনেছি। যখনই তিনি এ হাদিস বর্ণনা করেছেন, তখনই তিনি হেসে দিয়েছেন। শো’বা তাকে অনুসরণ করে বর্ণনা করেছেন, হুজুর (সাঃ)-এর চুল দু’কানের লতি পর্যন্ত চলে যেতো (৫৪৭২ নম্বর হাদিস)। সহীহ বোখারী ৩৫৫১ নম্বর হাদিস হতে বর্ণিত আছে যে, ইউসুফ ইবনু আবু ইসহাক তাঁর পিতা হতে বর্ণনায় বলেন, নবী করিম (সাঃ)-এর মাথার চুল কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইসলামিক ফাউন্ডেশন হতে প্রকাশিত, নম্বর – ৩২৯৬)।
হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করিম (সাঃ)-এর মাথার চুল ঘাড় পর্যন্ত এসে যেতো (৫৪৭৪-৭৫ নম্বর হাদিস)।
অধ্যাপক হাফেজ মাওলানা আবদুল জলিল সাহেবের বঙ্গানুবাদ বোখারীর ১৫০৫ নম্বর হাদিস হতে জানা যায় রাছুলপাক (সাঃ) স্বীয় মাথার সামনের চুলে গিট দিয়ে কপালে ঝুলিয়ে রাখতেন।
হযরত উম্মে হানী (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সাঃ) হিজরতের পর একবার মক্কায় আগমন করেন। তখন তাঁর কেশ/চুল মোবারক চতুর্ঝুটি বিশিষ্ট ছিল। অর্থাৎ চুলের চারটি বেণী ছিল। এ হাদিসটি সুনান আত্ তিরমিযীর ১৭৮১ নম্বর হাদিস। (শামায়েলুন তিরিমিযী-২৭ নম্বর হাদিস, অধ্যায় নম্বর ৫)। এ হাদিসটি ইমাম তিরমিযি তাঁর ‘শামায়েলুন তিরমিযীর’ ৩৮ পৃষ্ঠায় ২৯ নম্বর হাদিসেও বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে ওমরও উম্মে হানী হতে এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন যে, নবী করিম (সাঃ) যখন মক্কায় আসেন তখন তাঁর মাথার চুলের চারটি বেণী ছিল। এ হাদিসটি হাসান। (আল মাদানী প্রকাশনী হতে প্রকাশিত ‘তিরমিযী’ হাদিস নম্বর -১৭৮১, সহীহ ইবনে মাজাাহ-৩৬৩১, ইফাঃ -১৭৮৮)।
হযরত আব্বাস (রাঃ) হতে তিনি বলেন, নূর নবীজির (সাঃ)-এর মাথায় চুল মোবারক লম্বা ছিল এবং তিনি তাঁর চুলের মাঝখানে সিঁথি কাটতেন (মুসলিম/বোখারী)। অন্য হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত হযরত ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (আঃ)-হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, নবী করিম (সাঃ)-এর মাথায় লম্বা চুল ছিল যা কানের লতির নিচ পর্যন্ত ঝুলন্ত অবস্থায় রাখতেন (তিরমিযী)। নবী প্রেমিক সাহাবা আসহাবে সুফ্ফাগণ গায়ে ছিন্ন বস্ত্র পরিধান করতেন এবং মাথায় লম্বা চুল রাখতেন। তার মধ্যে হযরত মাহজুরা (রাঃ) একজন। হযরত বেলাল (রাঃ)-এর পরে মুয়াজ্জিন হিসেবে হযরত আবু মাহ্জুরা (রাঃ)-এর নাম শীর্ষে। তৎকালীন অধিকাংশ সাহাবাগণের মাথায় লম্বা চুল ছিল। রাছুলপাক (সাঃ) ১৫ বৎসর হেরাগুহায় নিরন্তর ধ্যান সাধনায় মগ্ন ছিলেন, তখন তাঁর চুল মোবারক/শিরোরুহ মোবারক স্বাভাবিক নিয়ম-নীতির কারণেই অধিক লম্বা হয়ে গিয়েছিল। কারো কারো মতে তখন তাঁর চুল/কেশ মোবারক কোমরের নিচে চলে গিয়েছিল। এ রীতি তাঁর পূর্ব বংশধরদের মধ্যেও প্রচলন ছিল। হযরত আবু তালেব (রাঃ)-ও এ পথের পথিক ছিল। বিশেষ করে রাছুল পাক (সাঃ)-এর দাদা আবদুল মোত্তালেবও (হানীফ-মিল্লাতে ইব্রাহীম) রমজানে এক মাস ব্যাপী নির্জন সাধনার জন্য পাহাড়ের গুহায় চলে যেতেন। তার মাথায়ও বাবরী ছিল বলে বিধৃত। তিনি মুখের দাঁড়ি দিয়ে কাবা ঘর ঝাড়– দিতেন।
পবিত্র কোরানে সুরা কাহাফ (২৫ নং আয়াত) মোতাবেক সাতজন যুবক সাধকগণ (ধর্ম সন্ত্রাসী রাজার ভয়ে পালিয়ে) এক পাহাড়ের গুহায় ৩০৯ বৎসর ধ্যান সাধনায় মগ্ন ছিল। তাদের চুল কতোটুকু হতে পারে তা কাঠ মোল্লার দলেরা হিসাব জানে কি? এ আয়াতের ভেদ যুগে যুগে বর্তমান। সুফি সাধক ফকির দরবেশগণ যদি জঙ্গলে, পাহাড়ের গুহায়, বা কোনো নির্জনস্থানে, ধ্যানের ঘরে ৩শত বৎসর আরো ৯ বৎসর অতিবাহিত করে তাদের চুল কেমন হতে পারে তা কি ভাবনার বিষয় নয়? সাধকগণ গুহা হতে বের হয়ে যখন তাদের মুদ্রা নিয়ে বাজারে গেল তখন দেখা গেল সে মুদ্রা অচল। এখনো সাধক পীর-ফকির, দরবেশগণের মুদ্রা ধর্ম সন্ত্রাসী বা তাদের অনুসারী বা জঙ্গি মৌলবাদীগণের নিকট অচল। সে মুদ্রার পরিচয় যারা জানে তারা ইহাও জানে যে, সে অত্যাচারিত বাদশাহ এবং তাদের অনুসারীগণ যুগে যুগেই বর্তমান। শুধু স্থান-কাল, নাম-উপাধি ভিন্ন, স্বভাব-চরিত্র অভিন্ন।
চুল কতোটুকু বড়/লম্বা হলে চুলে গিট দিয়ে রাখতেন অথবা চারটি বেণী করে রাখতেন তা কি ভাবনার বিষয় নয় ? যারা লম্বা চুল দেখলে পশুত্বের আদিম চরিত্রটির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সমালোচনা করে যাচ্ছে তাদেরকে বলছি আপনি/আপনারা নিজেদের চুলগুলো গিট দিয়ে দেখুন কতোটুকু লম্বা হলে চুলে গিট দিতে পারবেন বা চুলের চারটি বেণী গাঁথতে পারবেন! বাস্তবেই তা একবার প্রমাণ করে দেখুন না ! কসাইয়ের হাতের ছুরি আর ডাক্তারের হাতে ছুরি এক নয়। পুলিশের হাতের পিস্তল আর সন্ত্রাসীর হাতের পিস্তল এক নয়। নবী-রাছুল, ওলীয়ম মুর্শিদ/গুরু/পীরের এবং তাদের ভক্ত-অনুসারী পাগল-মস্তানদের মাথার চুল-গোঁফ আর অন্যান্য সাধারণ মানুষ বা আলেম- মোল্লাদের চুল-গোঁফ এক নয়। চুল বড় রাখলেই যদি মেয়ে হয়ে যায় তবে তো নবীজি (সাঃ) বা অন্যান্য নবী-রাছুলগণকেও তো তাই বলা হলো (জাগতিক অর্থে)। নবুয়তে নবী-রাছুল মানেই বেলায়েতে ওলী-আউলিয়া-উনাদের প্রায় পনের আনাই তো বাবরী বা লম্বা চুলের অধিকারী। তবে তারাও কি মেয়ে নাকি ? তবে হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে, যারা লম্বা চুল বা বাবরী চুল দেখলে পীর, ফকির-দরবেশ বা তাদের অনুসারীগণকে ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ করে মেয়ে বলে সম্ভোধন করছে মূলতঃ তারাই হলো মেয়ে, এ কথা একশত ভাগ সত্য এবং এ ধরনের মেয়ে/নারীগণ কখনো বেহেশতে যাবে না। এ ধরনের অজ্ঞ-মূর্খদের বুঝাতে যাওয়া আর ছাগলের কানে মন্ত্র পড়া একই কথা। ওলী-আউলিয়া বা পীর-ফকির, দরবেশদের মাথায় লম্বা কেশ/চুল-গোঁফ তো নবুয়তের যুগের নবী-রাছুলদেরই সুন্নত অনুসরণ-অনুকরণ। যদি কোনো লোক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে, ঘৃণার দৃষ্টিতে বা অবজ্ঞা করে পীর-ফকির বা ওলী আউলিয়া, দরবেশদের লম্বা চুল-গোঁফের সমালোচনা করে তবে তো প্রকারান্তরে রাছুলপাক (সাঃ)-এরই সমালোচনা করা হলো। যারা রাছুলপাক (সাঃ)-এর সমালোচনা করে তারা সর্বসম্মতভাবে কাফের (ফতোয়ায়ে রহমানিয়া, মমতাজুল ফাতাওয়া)।
হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী করিম (সাঃ) আঠাল জিনিস দ্বারা মাথার চুল জড় করেছিলেন (এহরাম অবস্থায়, এ সময় চুলে চিরুনী করা নিষেধ তাই) তার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে রাছুলপাক (সাঃ) চুল মোবারক বাবরী ছিল (মেশকাত ৫ম খন্ড, ২৪৩৩ নম্বর হাদিস, আবু দাউদ)। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী করিম (সাঃ) এহ্রাম অবস্থায় আপন মাথা ধুইতেন (মেশকাত-২৫৬৫ নম্বর হাদিস, বোখারী, মুসলিমের সূত্রে)। এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, নবী করিম (সাঃ) মাথায় বাবরী চুল রাখতেন (মেশকাত-৩৪১ পৃষ্ঠা)।
হযরত আবু কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, একদা তিনি রাছুলুল্লাহ (সাঃ)-কে বললেন, জনাব ! আমার চুল ঘাড় পর্যন্ত পৌঁছেছে। সুতরাং আমি কি উহাকে আঁচড়িয়ে রাখতে পারি ? তিনি, বললেন, হ্যাঁ, এবং উহাকে যত্নে রাখো। (মেশকাত-৪২৮৩ নম্বর হাদিস)।
হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন – আমার মাথার সম্মুখ ভাগে এক গুচ্ছ লম্বা চুল ছিল। আমার আম্মা আমাকে বললেন, আমি উহা কাটিব না। কেননা, রাছুলুল্লাহ (সাঃ) কখনো কখনো উহাকে ধরে সোজা করতেন (মেশকাত-৪২৬২ নম্বর হাদিস, আবু দাউদ)। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাছুলুল্লাহ (সাঃ) বলছেন, যে ব্যক্তির (বাবরী) আছে, সে যেন উহাকে যত্নে রাখে। (মেশকাত-৪২৫২ নম্বর হাদিস, আবু দাউদ)।
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন – আমি ও রাছুলুল্লাহ (সাঃ) একই পাত্র হতে গোসল করলাম। তখন হুজুর (সাঃ)-এর মাথার চুল জুম্মার উপরে এবং ওয়াফ্রার নীচে ছিল। এ হাদিসটি তিরমিযীর বর্ণিত এবং মেশকাতের ৪২৬০ নম্বর হাদিস। এ হাদিসটি ইমাম তিরমিযি তাঁর “শামায়েলুন তিরমিযীতে” ২৪ নম্বর হাদিসে তুলে ধরেছেন। এবং ‘শরহুস সুন্নাহ’তে ৩১৩৭ নম্বর হাদিসে বর্ণিত আছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদিসটিকে আবু ঈসা উল্লেখিত সনদ সূত্রে হাসান সহীহ গরীব বলেছেন। উল্লেখিত হাদিসটি আরো কয়েকটি সূত্রে আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। তবে তাতে তাঁর বাবরি চুল কাঁধের উপরে কিন্তু কানের লতির নিচ পর্যন্ত লম্বা ছিল কথাটুকু উল্লেখ নেই। (শেষের অংশটুকু আবদুর রহমান ইবনু আবুয্ যিনাদ তাঁর বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন)। তিনি একজন সিকাহ (আস্থাভাজন) বর্ণনাকারী এবং হাদিসের হাফিজ ছিলেন। মালিক ইবনু আনাস (রাঃ) তাকে সিকাহ বলেছেন এবং তাঁর নিকট হতে হাদিস লিখার নির্দেশ দিতেন (সহীহ ইবনে মাজাহ-৬০৪, ৩৬৩৫)।
হযরত বারাআ ইবনে আযেব (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সাঃ) মধ্যাঙ্গী ছিলেন। তাঁর দু’কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান প্রশস্ত ছিল। তাঁর মাথার কেশ কানের লতি পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল (২৫ নম্বর হাদিস, অধ্যায় সংখ্যা ৩)। এ হাদিসটি সহীহ মুসলিম-৬২১০, আবু দাউদ ৪০৭৪, নাসাঈ-৫২৩২, মুসনাদে আহামদ-১৮৪৯৬, সহীহ ইবনে হিব্বান- ৬২৮৪ নম্বরে বর্ণিত আছে।
সহীহ মুসলিমে (ইফাঃ) আমর আন-নাকিদ ও আবু কুরায়ব (রহঃ) বারাআ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বাবরী চুলধারী, লাল পোশাক পরিহিত কোনো লোককে আমি রাছুলুল্লাহ (সাঃ)-এর চেয়ে সুন্দর দেখিনি। তাঁর চুল কাঁধ স্পর্শ করতো। উভয় কাঁধের মধ্যে দূরত্ব ছিল। তিনি লম্বাও ছিলেন না, বেঁটেও ছিলেন না (হাদিস নম্বর-৫৮৫৬)।
সহীহ বোখারী (তাওহীদ), অধ্যায় – ৬১/মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য। হাদিস নম্বর ৩৫৫১। তাতে অতিরিক্ত বর্ণিত আছে যে, বারাআ ইবনে আযেব বলেন, ‘আমি তাকে লাল ডোরাকাটা জোড় চাদর পড়া অবস্থায় দেখেছি। তাঁর চেয়ে বেশী সুন্দর আমি কখনো কাউকে দেখিনি।’
আল মাদানী প্রকাশনী হতে প্রকাশিত সহীহ ইবনে মাজাহ-৩৫৯৯, তিরমিযী-১৭২৪, সুনান তিরমিযী-১৭৩০ নম্বর হাদিসে মাহমুদ ইবনু গায়লান (রহঃ) বারাআ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, লাল (জুড়িদার) পোশাক পরিহিত কাঁধ পর্যন্ত চুলে অধিকারী কোনো ব্যক্তিকে রাছুলুল্লাহ (সাঃ) অপেক্ষা সুন্দর দেখিনি। তাঁর চুল কাঁধে এসে পড়তো। তাঁর দু’কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান ছিল প্রশস্ত। তিনি খর্বাকৃতির ছিলেন না আবার দীর্ঘাঙ্গীও ছিলেন না। এ হাদিসটি জাবির ইবনে সামুরা, আবু রিমছা ও আবু জুহায়েব (রাঃ) থেকেও বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আবু ঈসা (রহঃ) বলেন, এ হাদিসটি হাসান সহীহ। সুনান আত্ তিরমিযীর ১৭২৪ নম্বর হাদিসের বর্ণনায় রয়েছে, “লাল জামা পড়ে থাকাবস্থায় রাছুলুল্লাহ (সাঃ)-এর চেয়ে কোনো বাবরী চুলবিশিষ্ট সুন্দর মানুষ দেখিনি।”
একই হাদিস আধুনিক প্রকাশণীর বোখারী-৩২৮৭, ইফাঃ-৩২৯৬ নম্বর হাদিসে বর্ণিত আছে।
ওহাবীদের নেতা মৌলবী আশরাফ আলী থানবী তার ‘বেহেশতী জেওর’ কিতাবের ২৪৬ পৃষ্ঠায় বলেছেন, “যদি কেহ মাথার চুল কান পর্যন্ত বা কাঁধ পর্যন্ত লম্বা করে রাখে, তবে তাও জায়েজ আছে। তিনি লম্বা চুলকে সুন্নত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
৩। জুম্মাহ – জুম্মাহ চুলের কোনো হদ/সীমা রাখা হয়নি। কাঁধ অতিক্রম করে অধিক লম্বা চুলকে ‘জুম্মাহ’ বলে। বহু নবী-রাছুল এবং ওলী-আউলিয়াদের সুন্নত ইহা। ইতিহাসে দেখা যায় কোনো কোনো সাহাবা বা ওলীদের চুল হাটুর নিচেও চলে যেতো। তার বহু নজীর ইতিহাসে রয়েছে।
সংগীত – গুরুর চরণ অমূল্য ধন
লেখক – ফকীর আতিকুর রহমান চিশতী
গুরুর চরণ অমূল্য ধন, করগে সাধন
মুক্তি পাবি অনায়াসে।।
গুরু হয় লা মাকানের জাত, জীবের হায়াত
হাইয়ুনে সে জিন্দা আছে,
মুরিদুন এরাদা করে, সকল ছেড়ে
রূপের রশি ধরো কষে।।
আমিত্ব থাকিতে হয় না, রূপের আয়নায়
দুই কি আছে,
অহেদ মাওলা শাইয়ীম মুহিত, কর তৌহিদ
সব মিলে আহাদ হয়েছে।।
গুরু প্রেমে মজে যে জন, সর্বস্ব করেছে অর্পন
তার হারানোর ভয় কি আছে,
ওয়াজেবে তার চরণ ছাবুদ, পাইলো মাবুদ
দুই গুটি পাকা হয়েছে।।
আতিক বলে মনরে বোকা, গুরুরূপ ব্রহ্মান্ডে একা
সে বিনে আর কেবা আছে,
ধোঁকাতে পড়িলে ফান্দে, লাভ নাই কেন্দে
মহি চান্দের ঠেকা কিসে।।
সংগীত – বেনজীর চিশতী নাম ধরিয়া
লেখক – শাহ ফরহাদ চিশতী
বেনজীর চিশতী নাম ধরিয়া
কে এলো এই ভূবনে, ভূবনে-
যুগল আঁখি পাগল হয়ে
সালাম জানাই চরণে, চরণে।।
ছিলো গোপন গঞ্জ জাতে
ধরায় এলো তথা হতে,
মুর্শিদ হইয়া এই জগতে
নাম বিলায়ে সবখানে, সবখানে।।
জীব ত্বরাইতে রাসুলের শান
বুঝতে পারে রজ্জব দেওয়ান,
প্রাণের সনে বেঁধে প্রাণ
খেলছে রাসুল গোপনে, গোপনে।।
ও সে, বিশ্বগুরু মহেশ্বরে
ঐরুপে সে আকার ধরে,
ফরহাদ কি আর বুঝতে পারে
ভজন বিহীন সাধনে, সাধনে।।
সংগীত – আল্লাহ নবীর প্রেমে ডুবে
লেখক – মোবারক হুসাইন ওয়ায়েসী
আল্লাহ নবীর প্রেমে ডুবে
হও মন ফানাফিল্লাহ,
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মদ রাসুল আল্লাহ।।
লোহাতে মরিচা এলে
খাঁটি করে আগুন জ্বেলে,
তেমনি শুদ্ধ হতে চাইলে
বাধো গুরুপদে জীবনভেলা।।
কালেমার সুরত শেকেল
কর রুপ নিহারে সালাত হাছেল,
সালাতে হয় দীদার প্রভুর
বলেছেন দ্বীনের রাসুল আল্লাহ।।
আলিফ লাম মীমের খেলা
একের মাঝে তিনের লীলা,
অধম মোবারক ডুবে দেখো
ভাসছে তরী নূর উজালা।।
সংগীত – হে কাঙালের দয়ালরে
লেখক – কাঙাল আব্দুর রহমান
হে কাঙালের দয়ালরে, দয়াল
প্রেমধনে পূর্ণ করো মোরে।।
সত্য সুন্দর ধৈর্য জ্ঞানে
ভক্তি শ্রদ্ধায় মুক্তি আনে,
হেলায় খেলায় যায় যে বেলা
মনভুলা ভুল করেরে।।
কাঙালের এই ভাঙা তরী
তাই নিয়ে গো বড়াই করি,
কখন জানি বিপাকে পড়ি
কাঙাল ডুবে মরেরে।।
হে বেনু চাঁন মুর্শিদ কেবলা
দূর করো মোর বিষয় জ্বালা,
কভু না হই যেনো দুনিয়ামুখী
যেনো না ভুলি গো তোমারে।।
প্রবন্ধ – গোপনও প্রকাশ্য শত্রু শয়তান
লেখক – সালমা আক্তার চিশতী
ধর্মের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। বলা হয় বিশ্বাস মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। ঈমান আর ইসলাম এক নয় (সুরা হুজরাত-১৪)। ঈমান আনার পর (বায়াত হওয়ার পর) ইসলামে দাখেল হওয়ার জন্য সাধনা করতে হয়। তার জন্য প্রথম সাধনাটিই হলো শয়তানের অনুসরণ না করা (সুরা বাকারা-২০৮)। সুরা বাকারার ২০৮ নম্বর আয়াতেই গোপন ও প্রকাশ্য শত্রু শয়তানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। একটি হলো দীলের ভিতর হতে অসওয়াছা দিচ্ছে (খান্নাছ), অপরটি যে লোক শয়তানের/খান্নাছের/মরদুদের/ ইবলিশের গুণে গুণান্বিত সেই লোকটিই হলো প্রকাশ্য শত্রু শয়তান। ঐ মানুষের ছুরতে এবং নামেই তখন শয়তান মূর্তমান হয়ে উঠে। সে মানবরূপে নানা ভাবে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে থাকে। সে শয়তান প্রথমেই ঈমানদারের ঈমানের উপর আঘাত করে। যদি ঈমানদারের ঈমান ভাঙ্গতে পারে তবেই শয়তানের কার্য সিদ্ধি হলো। আর ঈমানদারগণ সে শয়তানকে চিনে-দেখে স্বীয় ঈমানকে হেফাজত করে আল্লাহর খাঁটি বান্দায় পরিণত হয়ে যায়।
ঈমান কিভাবে দৃশ্যমান হয় তা জানা দরকার। সাত সেফাত ও পাঁচ জাত যেই মানুষটি নিজ অস্তিত্বের মাঝে হাসিল করেছে সেই ব্যক্তি পরিপূর্ণ ঈমানদার হয়েছে। কারণ, (৭+৫=১২) এর সমষ্টি রূপ-শেকেলই হলো ঈমান। একজন নবী- রাসুল/পীর-মুর্শিদ হলো ঈমান এবং ঈমানের ছুরত। শুধু মুরিদ হলে চলবে না, একজন মুরিদের তরিকতের জগতে চলার মূল সম্পদ হলো ঈমান, তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, যে স্তরে পৌঁছালে আর বন্দেগী থাকে না (কোরান)। যার ঈমান রয়েছে সে পারে মুক্তির দেশে অবগাহন করতে। মানব গুরু হলো ঈমান, তাকে বিশ্বাস করে যে বায়াত/আনুগত্য স্বীকার করেছে সে-ই হলো ঈমানদার। ঈমানের পূর্ণতা তখনই হাছিল হয় যখন মানব গুরুর প্রতি ঈমান প্রতিষ্ঠিত হয়। ঈমান শূণ্য ব্যক্তি আল্লাহর লানত প্রাপ্ত হয়, তার দ¦ারা এই সমাজ ও সংসারের মাঝে কলহ বিবাদ দেখা দেয়। ‘যার মুর্শিদ নেই তার মুর্শিদ হলো শয়তান।’ (শানে হাবিবুর রহমান-২০০পৃঃ)।
যারা প্রকৃত ঈমানদার তাদের অবস্থান এইরূপ হবে, বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ) বলছেন – “তোমার অন্তরকে সংশোধিত ও পরিশুদ্ধ কর, অবশ্যই প্রতি নিঃশ্বাসে তোমার সাথে আল্লাহর সাক্ষাৎ ঘটবে”। প্রকৃত ঈমানদার তা বুঝতে পারবে। কারণ, সে মোহমুক্ত হওয়ার সাধনায় কামিয়াব তথা বস্তুমোহের উপরে বাস করে। যেমন – পানি বাষ্প হয়ে বাতাসের সাথে মিশে থাকে তেমনি ঈমান একজন মানুষের দিল হতে উদয় হয়ে ভিতর বাহির ঐক্যতায় স্থিত হয়ে যায় বা ওয়াজেব-এমকান ঐক্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে ঈমানের সুরত প্রকাশ করে, যাকে বলে শাজারাতুল ইয়াকিন। যারা একাগ্র চিত্তে সাধনা করতে পারে তারা নির্ভেজাল ভাবে ঈমান ধরে রাখতে পারে। ঈমান ধরে রাখার মাঝে রয়েছে জান্নাতের সুখ আর যারা ঈমান ধরে রাখতে পারে না তাদের অবস্থানের দুর্বিষহতা দেখলে মানুষ আর পাপ কর্ম করতো না। কোরানের মাঝে বলে দেওয়া হয়েছে ‘তাদেরকে দেখলেই চিনা যাবে’ (সুরা রহমান)। যেমন – বালুর মাঝে লোহার গুড়া মিশ্রিত থাকে, চুম্বক নিয়ে বালুর মাঝে ধরলে লোহার গুড়াগুলো আলাদা করা যায় তেমনি যারা ঈমানদার হবে তারা এই নাসুতের জগতের ভেজালগুলো এড়িয়ে নিজ ঈমান অর্থাৎ নিজ মুর্শিদকে ধারণ করতে পারবে।
কারণ, এই নাসুতের দরিয়ার মাঝে নিজ ঈমানকে ধরে রাখতে হলে চুম্বকের মতো আকর্ষণ শক্তি অর্জন করতে হবে। দুনিয়ার সুখ বা বিষয়-বাসনা যদি মনের মাঝে প্রধান হয় তবে আর গুরুর প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হবে না, ঈমানের দূর্বলতা প্রকাশ পাবে। গুরু ভজন দ্বারাই ঈমানকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। কারণ, গুরু ভজনেই মিলবে মাওলার দর্শন। খোদার দর্শনবিহীন মনই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। মনকে নিজ অস্তিত্বের মাঝে ধারণ করে রাখার মূল হলো নিজ সত্ত্বাকে ফিরে পাওয়া। হৃদয়ের টান আর চোখের জল দ্বারাই ঈমান প্রতিষ্টিত হয়। গুরুর অনুগামী হতে পারলে ঈমান প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। কারণ, এই বাহিরের ভাব দিয়ে গুরুকে সন্তুষ্ট করা যাবে না। গুরুকে লাভ করতে হলে একনিষ্ঠ চিত্তে গুরু ভজনের দিকে মনকে নিবিষ্ট করে ধরে রাখতে হবে। হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) ‘আল্ ফাত্হুর রাব্বানী ওয়া আল্ ফায়জুর রাহমানী’ কিতাবের মাঝে বলছেন – ‘তুমি আমার কথা না শুনিয়া স্বীয় নফস ও কামনা সাথে লইয়া ইবাদত খানায় বসিয়াছ।
সর্ব প্রথম তোমার প্রয়োজন পীরের সহচর্য লাভ করা। স্বীয় নফস, কামনা এবং আল্লাহ ব্যতীত সকল কিছু হত্যা করিয়া পীরের দ্বারে চাপিয়া বস।’ একজন সাধকের সারাটা জনমই তার নিজ মনকে পাহারা দিয়ে রাখতে হয়। আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতি নিজামী তাঁর আলোচনার মাঝে বলতে থাকেন – ‘একজন মানুষের মনই তাকে আউলিয়া বানাতে পারে আবার চোরও বানাতে পারে’। তাই একজন মানুষের কর্ম হওয়া উচিত সর্বক্ষণ নিজ সম্পর্কে চেতন থাকা, তা না হলে এই মনই অচেতন হয়ে একজন মানুষকে ভুল কাজে লিপ্ত করতে পারে। ফজরের আজানের মাঝে বলতে থাকে “আচ্ছালাতু খাইরুম মিনান্নাউম” অর্থাৎ ঘুম হইতে নামাজ ভালো। যারা অচেতনের ঘুমকে জয় করে সর্বক্ষণ নামাজে তথা চেতনের ঘরে থাকতে পারে তারা পরিপূর্ণ ভাবে ঈমানকে হেফাজত করতে পারে। এই পারাটার মাঝেই রয়েছে এই মানব জনমের স্বার্থকতা। স্বার্থকতা না থাকলে মানব জনমের পূর্ণতা হাছিল হয় না। স্বার্থক জনম হবে তখনই যখন মন নিয়ন্ত্রন হবে গুরু জ্ঞানের আলোকে। যেমন – আলোর উৎস হলো সূর্য, তেমনি নফসের কালো আধার কেটে গেলে রূহ নামক সূর্যের আলো মানব অজুদকে নূরে নূরান্বিত করে তুলবে। যেমন – মাটির নিচে অনেক জীব বাস করে থাকে, খাবারের খোঁজে ও বিভিন্ন প্রয়োজনে এরা মাটির নিচ থেকে বের হয়, আর যেই সমস্ত জীব মাটির নিচেই বসে থাকে তারা অকালেই মৃত্যুবরণ করে থাকে। তেমনি সমাজের বেশির ভাগ লোক তারা ঈমানের আলোকে গ্রহন করতে পারে না, তারা হায়ানী আত্মার গর্তে লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে, এইরূপ অবস্থানের কারণে তাদের ইনসানি আত্মা হারিয়ে যায় (সুরা আনআম)। তাদের অবস্থান সম্পর্কে তারা অচেতন, ঠিক পশুর ন্যায়।
ঈমান যেদিন পূর্ণ হবে সেদিন দিব্যদৃষ্টি অর্জিত হবে। সূরা নাহলের ৩৬ নং আয়াতের মাঝে আল্লাহপাক বলে দিয়েছেন – “ওয়ালাকাদ্ বা আছনা ফিকুল্লি উম্মাতির রাছুলান্ আনিবু দুল্লাহা ওয়াজ্তানিবুত্ তাগুতা” অর্থাৎ এবং অবশ্যই আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে একজন রাছুল প্রেরণ করি, যাতে তারা (সে জাতি) আল্লাহর ইবাদত এবং তাগুত বর্জন করে। আর এই রাসুলই হলো একজন মুরিদের/আমানুর ঈমান। রাসুলের অবস্থান হলো দীলে নীলুফারীর দেশে। একজন চেতন মানুষ সর্বক্ষণ দীলে নীলুফারীর দেশে দৃষ্টি দিয়ে রাখে। এই চেতন দৃষ্টিটার মাঝেই রয়েছে আখেরে তার কি ফল হবে তার ভেদ। একজন ভক্ত তার ঈমানের বলেই পুলছিরাত পার হয়ে যাবে। যার ঈমানের গভীরতা যত বেশী সে ততো দ্রুতগতিতে পার হবে। যেমন – পানির উৎস হলো মাটির নিচে সেই মাটির নিচে যদি পানি না থাকে তবে কি আর পানির ট্যাঙ্কির মাঝে পানি ভরতে পারবে ? তেমনি হয় একজন মানুষের অবস্থান তার ঈমানের মূল উৎস হলো মুর্শিদের প্রতি বিশ্বাস, ভক্তি, প্রেম এই তিনটি বিষয়ের একটি যদি না থাকে তবে আর তার ঈমানের পরিস্থিতি ঠিক থাকবে না। এই ঠিক না থাকার নামই হলো অচেতন অবস্থা। যারা চেতন তাঁদের অবস্থান হবে পরকালে, মূলতঃ চৈতন্যতাই পরকাল। এই জগতে তাঁদের দেখলে সাধারণ মানুষ অনেক কিছু সম্পর্কে জানতে পারবে। যার আখেরাত সম্পর্কে জানার আগ্রহ রয়েছে বা আখেরাত লাভ করতে চায় সে-ই পারে ঈমানকে হেফাজত করতে।
কারণ, সব কিছুর ভিত্তি হলো ঈমান, ঈমানই হলো শক্তি (ইহা ১৭ সুন্নতের একটি)। এই পারাটার মাঝে রয়েছে জান্নাতি গুণ-খাছিয়তের অবস্থান। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ) ‘আল্ ফাত্হুর রাব্বানী ওয়া আল্ ফায়জুর রাহমানী’ কিতাবের ২৮নং পৃঃ বলছেন – পীরের রুক্ষ কথা এবং অভাব অনটনের মধ্যেই আমার লালন পালন। তোমরা যখন আমার কোন কথা শোন তখন উহাকে আল্লাহর পক্ষ হইতেই মনে করিয়া গ্রহন কর। কারণ তিনিই আমার দ্বারা বলান। ‘তুমি যখন আমার নিকট আগমন কর তখন স্বীয় অস্তিত্বকে ভুলিয়া আস।’ প্রকৃত ঈমানদারের অবস্থান হবে এইরূপ। আমি অধম এইরূপ হইতে পারি নাই। যারা সাত পাঁচের হিসাব অর্থাৎ জাত এবং সেফাত সম্পর্কে অবগত হয়েছে সে পারে ঈমান শূন্যতাকে ঈমানের পূর্ণতায় নিয়ে আসতে। মুর্শিদের আদেশ নিষেধ নিজ মানব জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারলে মানব জনমে আসবে স্বার্থকতা। এই স্বার্থক জনম হয় চিরস্থায়ী। কারণ, এই জনমটাকে মূল্য দিতে হবে, দেখা গেছে যারা এই জনমটাকে মূল্যহীন করবে তাদের জন্য দোযখের শাস্তি ঠিক ঐ মুহুর্ত থেকেই রেডি হয়ে যাবে। যারা অচেতন জীব অর্থাৎ তাদেরকে আর মানুষ বলা যায় না। যেমন – সাপের মাঝে বিষ দাঁত রয়েছে, কৌশলে যদি সাপের বিষ দাঁতগুলো ভেঙ্গে দেওয়া যায় তবে আর সাপটি ক্ষতি করতে পারবে না তেমনি একজন মানুষের হায়ানী স্বভাবটা হলো সাপের বিষ দাঁতের মতো এই স্বভাবের বিষ দাঁতগুলো ভাঙ্গতে না পারলে ঈমান প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। কারণ, হায়ানী স্বভাব একজন লোক ধারণ করে রাখলে ঐ ব্যক্তির ইনসানী স্বভাবটি পর্দাবৃত (মুদ্দাসসির) হয়ে যায়। অর্থাৎ মৃত্যু হলো পরিবর্তন হয়ে যাওয়া।
আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতি নিজামী (কুঃ ছেঃ আঃ) তাঁর একটি গানের মাঝে বলছেন:
জাগো আমার মন, কেনো ঘুমেতে মগন
নইলে বৃথা জীবন, হবেরে আখেরে।
মানুষ কুলে জন্ম পেয়ে কেনো রইলি ভুলে
এই দেহ ভাঙ্গিয়া গেলে দাঁড়াবি কোন কূলে,
তোমার বেঁহুশী জীবন পাবে পশুরই গঠন
দোযখেতে গমন হবে আখেরে।
পেয়ে মন মানুষ আকার, করলিনা তার আচার
অবিচারের বিচার শেষে পাবি পশুরই আকার,
কেনোরে মন তুই হইলি না চেতন
অচেতনে পশুর গঠন হবে আখেরে।
বিষয় বাসনায় সদা ডুবে রইলি ভবে
একদিনও কি ভাবলি মনে আখেরে কি হবে,
দিন থাকিতে মন ভজ শ্রীগুরুর চরণ
নইলে বৃথা জীবন ঘুরবি বারে বারে।
চেতন মানুষ ভবে যারা মায়ার এ সংসারে
সদায় দেয় রূপের পাহারা, থাকে হুঁশের ঘরে,
হবে হুঁশেতে মানুষ, আর বেহুঁশে পশু
হুঁশ হলো না কভু, তাই ভাবছে বেনজীরে।
আখেরে কি রূপ হবে তা এই জনমেই নির্ধারণ হয়ে যাবে। কারণ, কর্ম ফলে ফলাফল ৩৯ বস্তু নিয়ে রেডি হয়ে থাকবে। যারা এই জগতে চেতন মানুষ তারা সদায় রূপের ঘরে দৃষ্টি দিয়ে রাখে। দৃষ্টি দিয়ে রাখার মাঝেই মানুষের ছুরত এবং পশুর ছুরত তৈরি হবে। যেমন – একটি খালি বোতলের মাঝে তেল ভর্তি করতে হলে বোতলটিকে শক্ত ভাবে ধরতে হবে তেমনি একজন মুরিদের অবস্থান হওয়া দরকার। তার মন যদি ভেজাল মুক্ত হয় আর অনুরাগ নিয়ে মুর্শিদের দিকে অগ্রসর হতে থাকে তবেই পারবে ঈমানের নূর ধারণ করতে। এই ধারণ করাটা হয় দুই রকমের, কেউ দীলে মুখে ধারণ করবে আবার কেউ শুধু মুখে ধারণ করবে। যারা অনুরাগের আশ্রয় নিয়ে সাধনা করবে তারা মূল গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। কারণ, পারলে সু-ফলাফল আর না পারলে কু-ফলাফল। যারা অনুরাগের বাহনে দাঁড়াবে তারা অনড় হয়ে থাকবে এই তরিকতের জগতে। তারা সর্বক্ষণ তাদের রূপের ঘরে মনকে নিবিষ্ট করে রাখে। এই মানব জনমটা পাওয়া গেছে অতি ভাগ্যগুণে। গুরু সর্বসময় চাইতেছে একজন মুরিদকে ভক্তে পরিণত করতে। কারণ, যার ঈমানের মাঝে দুর্বলতা রয়েছে সে শিষ্য, ভক্ত হতে পারবে না। যারা অনবরত সাধনা করতে থাকে তারা পারে সৌভাগ্যবান হতে।
যারা নিজ সম্পর্কে গাফেল তারা কোনদিন খোদার দীদার লাভ করবে না, যারা খোদার দীদার লাভ করবে তাদের অবস্থান অতি উচ্চ পর্যায়ে হবে। হযরত খাজা মাঈনুদ্দীন চিশতী (রাঃ) বলছেন “গাফেল হৃদয়ে কিভাবে বন্ধুর দয়া ও ভালোবাসার আলো জ¦লবে, চেতন হৃদয় ব্যতিত সে নূরের অবরোহন স্থল নেই”। গাফেলতি দূর করাটাই হলো সাধনা, এই গাফেল মনকে যারা সফলতার দিকে নিয়ে গেছে তারাই এই মানব জনমকে সুন্দর করতে পেরেছে।
মানব জনমকে সুন্দর করার মাঝে রয়েছে খোদার রহমতের দরজায় পৌঁছে যাওয়া। যেমন, একটি বেলুন যখন আমরা ফুলাই তখন যদি বেলুনটি বেশি ফুলানো হয় তখন বেলুনটি ফেটে হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে আবার অনেক সময় বেলুনটি ফেটেও যায়, তেমনি একজন মানুষ যখন অচেতন হয়ে পড়ে তখন তার অন্তরের সৌন্দর্য্য নষ্ট হয়ে যায়। আর এই সৌন্দর্য্য নষ্ট হওয়ার মূল হলো হায়ানী স্বভাবের বাধ্য হওয়া যা দ্বারা ইনসানী আত্মা হারিয়ে যায়, নিজেকে গুরুর অনুগামী রাখতে পারলে ইনসানিয়াত প্রতিষ্ঠিত করা যায়। বন্ধুর দয়া লাভ করতে চাইলে বন্ধুকে অনুসরণ করতে হবে। এই অনুসরণ সঠিক ভাবে করতে পারলে একজন কামেল ইনসানে পরিণত হওয়া যাবে। কামেল ইনসান বা কামালিয়াত অর্জন করাটা সহজ নয়। তা অর্জন করতে হলে খোদার প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যেমন – শীতকালে গাছের পাতা ঝড়ে পরে। এই পাতাগুলোকে কোনক্রমে ধরে রাখা যায় না, তেমনি যারা ঈমান শূন্য হয়ে গেছে তারা তরিকতের জগত হতে ঝরে পরে যাবে। কারণ, খোদাকে চিনা না হলে খোদার ভেদ জানা হবে না। যারা ভাবুক সদাসর্বদা নিজ প্রবৃত্তির দিকে খেয়াল রাখে, তারা পারে নিজ ঈমানকে প্রতিষ্ঠিত করতে। কারণ, ভাব না থাকলে একজন ইনসানে পরিনত হওয়া যায় না। এই ভাবটা হবে বৈরাগ্যময়ী।
এলমে এলাহীর অধিকারী হওয়াটাই হলো নব সৃষ্টির দিকে ধাবিত হওয়া। কারণ, যারা আধ্যাত্মিক এলেম অর্জন করবে তারা এই মানব জনমে অমরত্ব লাভ করবে। অমরত্ব কিভাবে অর্জন করা যায় তা একজন মুর্শিদ জানিয়ে দিতে পারে। তাই সদাসর্বদা মুর্শিদের নিরিখ ঠিক রাখতে হবে। যেমন – একটি বাড়িওয়ালা যখন তার বাড়ির দেয়াল তৈরী করে, তখন দেয়াল বা ওয়াল তৈরি করতে ইট, সিমেন্ট, বালু ইত্যাদি লাগে। এই ওয়ালটিকে বালু আর সিমেন্ট দিয়ে প্লাষ্টার করা হয়। ওয়াল যখন সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে যায় তখন তার মাঝে রং করা হয়। তেমনি একজন মানুষের দীলে যখন আগুন বস্তুর অন্ধকারে আবৃত থাকে তখন তা পরিশুদ্ধ করতে হলে নফস মোৎমাইন্নার সবুজ রং দ্বারা তা পরিশুদ্ধ করা যায়। মনকে পরিশুদ্ধ করার মাল মসলা হলো আদব – নম্রতা, তমিজ – তাজিম। এই জান্নাতি গুণ। মানুষের কর্ম হলো এই জান্নাতি গুণগুলোকে ধারণ করা। এই অবস্থানটি তৈরী হয় একজন মানুষের দীলে। কারণ, ওয়ালটি যখন প্রথম প্লাষ্টার থাকে, তখন ঘরের সৌন্দর্য্য প্রকাশ পায় না আর যখন রং করা হয় তখন ওয়ালের সৌন্দর্য্য প্রকাশ পায়।
আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশ্তী নিজামী (কুঃ ছেঃ আঃ) বলছেন –
“যারা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত তথা সিবগাতাল্লাহ্-এ ভূষিত তথা প্রভূসত্তার বৃত্তিতে সিক্ত তারাই হলো ধার্মিক।”
আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হতে গেলে এই নফস আম্মারার কালো রং-কে বদলিয়ে সবুজ রং দ্বারা সুসজ্জিত করতে হবে। দীল দ্বারাই একজন মানুষের সুন্দরতম দিকগুলো ফুটে ওঠে, এই ফুটে ওঠার মাঝে রয়েছে একজন শিষ্যের অবস্থান তৈরি করার সুফল। গুরু বা মুর্শিদ একজন শিষ্যের ঈমান পরীক্ষা করার জন্য অনেক পথ অবলম্বন করবে। শিষ্য যদি ধৈর্য্য ধারণ করে অগ্রগামী হতে পারে তবেই পারবে ঈমানদার হতে। যেমন – দুইটি বোতলের মাঝে মধু ও বিষ ভরে রাখলে একজন চেতন মানুষ তার নিজের জন্য মধুর বোতলটি বেছে নিবে। কারণ, সে বিষের জ্বালা সহ্য করেই মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর যারা অচেতন তারা মধুর স্বাদ গ্রহণ করতে গিয়ে বিষের বিষাক্ত এক কুয়ার মাঝে নিজেকে অজান্তে ফেলে দিবে, এই অবস্থানটির ভেদ রয়েছে।
হায়ানিয়াতকে তারা মধুর মতো মনে করে, হায়ানিয়াতের বিষকে ধারণ করে নিচ্ছে, আর একজন মুর্শিদ ঈমান পরীক্ষা করার জন্য মধু আর বিষের বোতল সামনে রেখে দিয়েছে। যারা ঈমানদার হবে সে মধুর বোতলটি বেছে নিবে আর যার তকদির খারাপ সে বিষ পান করে নিজ ঈমানের সাথে সাথে নিজ ছুরত হারাবে। এই হারিয়ে যাওয়াটা অনেক ভয়াবহ। কারণ, ছুরত বদল হয়ে গেলে আর কোন জনমে মানব ছুরত পাওয়া যাবে কিনা তা সন্দেহজনক হয়ে থাকবে। কর্মফল দ্বারাই মানব ছুরত, না হলে পশুর ছুরত। নফস আম্মারার আবরণটি অনেক গভীর, এই গভীরতা কাটাতে হলে ইনসানিয়াত ধারণ করার হাতিয়ার লাগবে। এই হাতিয়ারটি হলো ‘জুলফিকার’। ‘জুলফিকার’ হলো হযরত আলী (আঃ) এর তলোয়ার, তা দুই দিক দিয়েই কাটে। এই কাটার যোগ্যতা যারা মুর্শিদের নিকট থেকে জেনে নিতে পারে তারা নিজ মানব জনমটাকে বিপদমুক্ত করতে পারবে। যেমন – একটি বাচ্চাকে ভালো এবং মন্দ বুঝালে তা সে বুঝবে না, যাদের তকদিরে ভালো মন্দ বুঝার ক্ষমতা নেই তারা এই অবুঝ বচ্চার মতো। তারা পশুর মতো এই পৃথিবীর মাঝে ঘুরে বেড়ায়, যদিও আকৃতি মানুষের মতো।
হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রাঃ) বলছেন – “যে দুনিয়াকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করিয়াছে, সেই প্রকৃত আরেফ। আরেফ লোকটি পৃথিবী আলোকিতকারী সূর্যের মত। তার আধ্যাত্মিক আলোকে বিশ্ব আলোকিত হয়।” যত মহাপুরুষ এই পৃথিবীর বুকে রয়েছে তারা এই আধ্যাত্মিক জগতের মাঝে উজ্জল নক্ষত্র রূপে চিরস্থায়ীত্ব নিয়ে অমর হয়ে থাকে। যারা চিরস্থায়ী হয়েছে তারা এ লোকসমাজ থেকে দূরে অবস্থান নিতে চায়। কারণ, লোক সমাজের সাথে টিকে থাকাটা আর নিজ ঈমানকে হেফাজত করাটা অনেক দুঃসাহসের বিষয়। যার ঈমান যতটা পরিপূর্ণ হয়েছে সে ততটা স্বাধীন সত্তার অধিকারী হয়েছে। স্বাধীন সত্তাটি এইরূপ হবে যেই সত্তার মাঝে খোদার গোপন ভেদ রহস্য উন্মোচিত হবে। এই উন্মোচনটার দ্বারা খোদার রহস্যের ভান্ডারের দ্বার খুলে যাবে। কারণ, মন যতটুকু নির্ভেজাল হয়েছে ততটুকু বেহেশতী সুঘ্রাণ প্রাপ্ত হয়েছে। বেহেশতী সুঘ্রাণ হলো নির্ভেজাল দেশ অর্থাৎ মানব আত্মার জাগরণ ঘটিয়ে মোহমুক্ত দেশে বিচরণ করা। এই করাটার মাঝে দুই রকমের দিক রয়েছে একটি দিক হলো দীলে মুখে ঠিক রাখা। আর একটি দিক হলো দীলের ঠিক নেই কিন্তু মুখে মুখে স্বীকার করা। তারা হবে ‘আসফালাস সাফেলীন’ অর্থাৎ নিন্ম থেকে নিন্মগামী। যারা ঈমানটাকে আঁকরে ধরে রাখবে তারা দীলে মুখে এক করে গুরু ভজন করবে। তারাই জান্নাতী হবে এই জান্নাত মোল্লা মৌলবীদের সাধারণ মানুষদেরকে শোনানো জান্নাতের মতো নয়। এর মাঝে রয়েছে আকাশ জমিন তফাত। যারা আধ্যাত্মিক জ্ঞানী তারা জানে জান্নাত ও জাহান্নাম কি ? যারা আধ্যাত্মিক জগতের মানব, তারা তাদের ঈমান দ্বারাই জান্নাতকে নিজ অস্তিত্বের মাঝে ধারণ করে রাখে। তাই ঈমান প্রতিষ্ঠিত করাটাই হলো একজন মানবের মূল লক্ষ্য। আর মনের জগতে যদি অনিত্য ভাব থাকে তবে ঈমান থাকবে না।
আমার দাদা হুজুর হযরত খাজা দেওয়ান শাহ্ রজ্জব আলী চিশতী নিজামী (রাঃ) বলছেন –
যদি নিত্যধামে যেতে করো বাসনা
তোমার অনিত্য দেহ থাকিতে, নিত্যের করণ হবে না।
মূল লক্ষ্যে যাওয়ার প্রতি যারা বেখেয়ালী, তারাই বিশেষ ভুলগুলি করে থাকে। এই অবস্থাটি তৈরি হয় পীর মুর্শিদের প্রতি ঈমানের ঘাটতি থাকলে। আল্লাহ তায়ালা কোরানে সূরা আরাফ ৭নং আয়াতে বলছেন “ফালানাকুচ্ছানা আলাইহিম বিইলমিউ ওয়ামা-কুন্না-গা-ইবীন” অর্থাৎ অতঃপর অবশ্যই আমি তাদের নিকট বিবৃত করব স্বীয় জ্ঞান সহকারে বা প্রমাণসহ যে, আমি অদৃশ্য ছিলাম না। যারা শুধু নিরাকারে বিশ্বাস রাখে তারা এই ভুল করে থাকে। যেমন – একটি বই যদি আমরা না দেখেই এর ব্যাপারে মন্তব্য করতে থাকি তবে কি তা ঠিক হবে? বইটির ভেদ রহস্য ব্যাখ্যা করা যাবে? কখনো না। তেমনি না চিনে না দেখে খোদা কোন দেশে অবস্থান করে তা বলা যাবে না।
খোদাকে শুধু অদৃশ্য না জেনে তাকে দেখে বিশ্বাস করাটাই হলো ঈমানের মূল। যেমন – আমরা খাবার খেয়ে থাকি এই খাবারের স্বাদ ততক্ষণই বিদ্যমান থাকে যতক্ষণ খাবারটি শেষ না হয় আর ঈমানের অবস্থানটি ঠিক বিপরীত ঈমানের স্বাদ যার ভাগ্যে গ্রহণ করা হয়েছে সেই সাধ শেষ হয় না, তা একজন মানুষকে অমরত্ব দান করে থাকে। ঐ মানুষটি দরিদ্র থেকে এই জগতের মাঝে ধনী হয়েছে। এই ধনীটা এই জগতের টাকা পয়সা দিয়ে হওয়া যায় না এই ধনী হতে গেলে মুর্শিদের প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান রাখে যারা তাঁরা হতে পারবে। কারণ, মুরিদ মানেই পরিপূর্ণ ঈমানদার নয়। তাদের অবস্থান হবে অজয়ী। যারা সর্ব অবস্থাকে জয় করে নিতে পারে তারাই পারে তরিকতের জগতে উজ্জল নক্ষত্র হতে।
এই তরিকতের জগতের মাঝে যারা নিজ বাসনাকে পরিপূর্ণ ত্যাগ করতে পারবে তারাই পারবে ঈমানদার হতে। পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়াটা সহজ ব্যাপার নয়। যেমন – মধু ও কালিজিরা খেলে ঠান্ডা জাতীয় রোগ সারে তেমনি নফস আম্মারার রোগ সারাতে হলে ধৈর্য্য ও অনুরাগ ধারণ করতে হবে। কারণ, নিজ অস্তিত্বের ভাল গুণগুলো ধারণ করেই খোদার গুণে গুণান্বিত হওয়া যায়। এই ভালো গুণ ধারণ করার নামই হলো সাধনা। তরিকতের জগতে নিজ অস্তিত্বকে স্বীকার করা মানেই শেরেকি। এই শেরেকি মনোভাব কাটাতে হবে। নিজ ঈমানকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে দ্বিধা-দ্বন্ধ, খেয়ালিপনা বাদ দিতে হবে। এই বাদ দেওয়া মন তৈরি করতে হলে গুরুর অনুসারী হতে হবে। একজন গুরুর অনুসারী হওয়া গেলে আখেরাতে শস্যক্ষেত্র তৈরি করা যাবে। গুরু হলো উর্বর জমির ন্যায়। কারণ, উর্বর জমির মাঝে যে ফসলই বপন করা হউক না কেন তার ফলন ভাল হবে। তেমনি একজন গুরুর নিকট যাওয়ার পর তাঁর নীতি আদর্শ দ্বারা নিজ দেহ জমিনকে পরিশুদ্ধ করতে পারলে একজন মানুষ রূপে এই জগত মাঝে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যাবে। এই অবস্থা তৈরী করা হলো মানব মুক্তির একমাত্র রাস্তা। কারণ, রাস্তা যখন কঠিন হয় তখন তা দ্বারা পথ চলা সহজ হয় না, আমরা মানব মনের অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তরিকতের সহজ রাস্তাকে কঠিন করে ফেলতেছি। এই জগতে গুরু ভিন্ন অন্য কিছু গ্রহন করাটা হলো মানব জনমের সব চেয়ে বড় ভুল। মনকে গুরু জ্ঞানের আলোকে নিয়ন্ত্রন করার জন্য একজন মানুষের এই জগতে আসা হয়েছে। মূল উদেশ্য এইটাই ছিল। মানব ছুরতের সাথে ছিরাতকে ঠিক করতে হবে।
প্রবন্ধ – ফারসী কাব্যসাহিত্যে নূর মুহাম্মদ প্রসঙ্গ
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
দ্বীনে মোহাম্মদীর অনুসারীগণের মধ্যে এশকে মোহাম্মদীর যে ফল্গুধারা প্রবাহিত, তা সমধিক পরিণত ও প্রস্ফুটিত হয়েছে ইরানে। ফারসী সাহিত্যে। ইরানের গুলিস্তানে বুলবুল আর গোলাপের প্রণয়ে প্রণয়ে কবিচিত্ত খুঁজে পেয়েছেন জগতের এক অমোঘ সত্য। ঐশী প্রেমের পরশ। তারা মাতোয়ারা হয়েছেন প্রভুপ্রেমে তথা রাসুল প্রেমে তথা মুর্শিদ প্রেমে। সে মহিমান্বিত প্রেমের আনন্দরাশি বুলবুল গুঞ্জনের মতো সুর ঝংকারে ঝড়ে পড়েছে রুমী-জামী-সাদী-হাফিজ-খৈয়াম-আত্তার-সানাই এর কন্ঠ হতে। রাসুল (সাঃ) এর প্রেমে উদ্বুদ্ধ ফারসী কবিদের কিছু অমর কবিতার সমন্বয়ে আপন খবরের এবারের আয়োজন-
“দ্বীনে মোহাম্মদীর রয়েছে সমৃদ্ধ সাহিত্যের ইতিহাস। যদিও কথিত আচারসর্বস্ব অতিবোদ্ধারা ধর্মসাহিত্যের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে থাকেন, তথাপিও সকল প্রতিকূলতা পেরিয়ে তৈরী হয়েছে আমাদের ধর্মসাহিত্যের বিশ্বজয়ী রচনাবলী।”
রাসুল পাক (সাঃ) এর জীবদ্দশায় তাঁরই চরণতলে পেশ করা হযরত কাব বিন জুহাইর (রা) এর কবিতাটি ছিল নবীপ্রেমের এক অনন্য নিদর্শন।
“নিশ্চয়ই রাসুল (সাঃ) এমন এক নূর, যার আলোকপ্রভা প্রতিনিয়ত বিচ্ছুরিত হচ্ছে।
মহান আল্লাহর তরবারী সমূহের মাঝে তিনি অতীব তীক্ষ্ণ এবং কোষমুক্ত তরবারি।”
জুহাইরের কবিতায় আপ্লুত রাসুল পাক (সাঃ) নিজের চাদর মুবারক উপহার দিলেন কবিকে। রাসুলুল্লাহর সভাকবি হাস্সান বিন সাবিত (রা) মসজিদে নববীর মিম্বরে বসে কবিতা আবৃত্তি করে রাসুল (সাঃ) কে শুনাতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা), কাব বিন মালেক (রা), মাওলা আলী ইবনে আবু তালিব (আ), মা ফাতেমা (আ) সহ অনেকের কবিতা আরবী সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। কাসিদায়ে বুরদা রাসুলের শানের এক অপূর্ব নিদর্শন।
ফারসী সাহিত্য মূলত প্রকৃত রাসুল প্রেম আর ধর্মবোধের এক উন্নত নিদর্শন। ফারসী ধর্মসাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের এক অভিনব সংযোজন। যে সাহিত্যের প্রতি পরতে পরতে রয়েছে অগাধ রাসুল প্রেমের ধনভান্ডার। দ্বীনে মোহাম্মদীর প্রকৃত দর্শন সযত্নে সংরক্ষিত হয়েছে ফারসী সাহিত্যের পাতায় পাতায়। ধর্মের গুঢ় রহস্যাবলী থেকে শুরু করে রাসুল পাক (সাঃ) এবং তাঁর আহলে বাইয়াতের প্রেম যেনো স্বমহিয়ার প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে এসব কাব্যে। নূর মোহাম্মদ (সাঃ), তাঁর মহিমা ও রাসুল প্রেমের তেমনি কিছু অমর কাব্যাংশ পাঠকদের জন্য উদ্ধৃত হলো।
বিখ্যাত ফারসী কবি শেখ সাদী (র)। যার রচিত কবিতা আজো বিশ্ব মুসলমানের ঘরে ঘরে গীত হয়। তাঁর রচিত কবিতা ব্যাতিত যেনো ধর্মানুষ্ঠান আজও অপূর্ণ।
“তুমি মানবতার পূর্ণতায় উপনীত, মোহন রূপের চ্ছটায় বিদূরিলে আঁধার যত,
সকল গুণের সমাবেশে, হে মহান! তোমার ও তোমার বংশের প্রতি সালাম অগনন।”
“কুল মাখলুকের সুপারিশকারী, হাশরের সরদার, বিচার দিনের নেতা তুমি
তুমি জগতের শ্রেষ্ঠ, প্রভুর বন্ধু, সকল নূর তোমার নূরের অনুগামী।”
“হে রাসুল, আপনি সমগ্র সৃষ্টির মূল উৎস। সকল সৃষ্টি আপনারই শাখা প্রশাখা।”
আত্মার বিজ্ঞানী মহান দার্শনিক ও কবি শেখ ফরিদুদ্দিন আত্তার নিশাপুরি (র)। তাঁর রচিত রাসুলপ্রেমের কাব্য-
“আমি আর কি বলবো? যার প্রশংসাতে স্বয়ং আল্লাহ মাতোয়ারা
যার নাম স্বয়ং আল্লাহর নামের সাথে মিলিত!
যিনি পরম প্রশংসিত, যিনি আল-আমিন
সমগ্র জগতের জন্য যিনি রহমত।
যিনি দোজাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, যিনি দোজাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত।”
“আদম যখন ছিলেন মাটি পানির খামির, তখন দোজাহানের বাদশাহ রাসুল আমার।
আদম অজুদে তাঁরই নূরের কিরণ, তাই ফেরেশতারা করে তারে সজুদ সমর্পন।”
“উভয় জগত ( মোহাম্মদ সা.) এর নূরে মোহিত, তাঁর পদধুলি আরশের ও কেবলা
উভয় জগত তাঁরই অস্তিত্ব থেকে পরিগ্রহ করে নাম, প্রশান্তি লাভ করে আরশ উতলা।
সকল নবী ও রাসুল তাঁর প্রশংসাকারী, সকল সৃষ্টি করে তাঁর তাবেদারী।”
ফারসী সাহিত্যের উজ্জল নক্ষত্র হাকিম সানায়ী গজনভী (র) বলেন,
“পায়ের আঘাতে তব পারস্য সিংহাসন, ভুলুণ্ঠিত কায়সারের দম্ভ অগনন।
ওলীদের মাঝে তুমি পূর্ণ দীপ্ত নূর, নবীদের মাঝে তুমি ইমামে আকবর।”
আধ্যত্মজগতের এক অত্যুজ্জল নক্ষত্র বড়পির আব্দুল কাদির জিলানী (র)। তাঁর কাসিদায়ে গাউছিয়ায় তিনি রেখেছেন রাসুল (সাঃ) প্রেমের এক অনন্য নিদর্শন।
“হে মহান, রেসালাত করিলে আবাদ, আনিলে জগতে সৌহার্দ্য অম্লান
খসরু, কায়কোবাদ, ফাগফুর যারা, তোমার চরণে হলো অবনত তন।
জগত গাহিবে তোমার মহিমা চিরকাল, যতদিন না আসিবে প্রলয় শামান
কাব কাউসিনে হলো মেরাজ তোমার, প্রভুর স্বানিধ্যে রহ চির দীপ্তিমান।
তোমার নূরের ধারায় রৌশন জাহান, জাহের বাতেন সবি হলো নূরময়
হে সম্রাট, রাসুলদের তাজ, ওলীদের মুকুট তুমি, চির প্রেমময়।
তোমার তনুর ঘামে আসে ফুলের সুবাস, অলীরা মধু পায় তোমার নামে
তোমার রহমত দিও মোদের তরে, নূরের চ্ছটা দিও মোদের মরমে।”
প্রেমরাজ হযরত জালালুদ্দিন রুমী (র)। যার প্রতিটি কথায় ঝড়ে ঝড়ে পড়ে আধ্যাত্মপ্রেমের মণি-মাণিক্য। ফারসী কাব্যসাহিত্যের দ্বিগ্বীজয়ী সম্রাটের কথায় রাসুলের শাণ-
“ইঞ্জিলে যার নাম মোস্তাফা, নবীদের সরদার, পবিত্রতার দরিয়া,
পূণ্যের আশায় কত নাছারায়, ইঞ্জিল পড়িত, ভক্তি করিয়া।
তোমার নামের তরে, ভক্তিভরে, চুমু খেত কত আশেকান!”
“আহমদ নামের গুণে পেল সবে মুক্তি, সকল বাদশাহীর আজ শেষ হলো শক্তি।
নামের গুণে আজ দুনিয়া উজালা, ঘরে ঘরে আহমদ, নামের কাফেলা।
আহদম নাম তাঁর চির মদদগার, কত নূর ঝড়ে পড়ে নামেতে তোমার ।
রুহুল আমিন তাঁর সত্ত্বা ও জাত, তোমার হেফাজতে আছে জাহান, কুল মাখলুকাত।”
নুরুদ্দীন আবদুর রহমান জামী (র)। যার প্রতিটি কথা আশেকের হৃদয়ে জ্বেলে দেয় রাসুলপ্রেমের বহ্নিশিখা, তিনি তাঁর কাব্যে বলেন,
“জাম’ আমার জন্মভুমি, পূর্ণ আমার কলম, পিয়ে আহমদী জ্ঞানের, জ্ঞানসুধা অবিরাম।”
“মানুষের তরে হলো সৃষ্টি এ সংসার, মুহাম্মদের তরে হলো সৃজন মানুষ,
মুহাম্মদী গুণ মোদের রক্ষাকবচ, নচেৎ প্রভুর নূরে না পেতাম হুশ।”
“মুহাম্মদের পবিত্র বদন মুবারকে ছায়া ছিলনা- কেননা, তিনি খোদার নূর ব্যতিত, অন্য কিছু না।”
“আহমদ, মুহাম্মদ দুটি নামে, স্রষ্ঠার সকল ভেদ গোপন
তাঁর অস্তিত্বের রহমতে, সৃষ্টি সকল পায় প্রাণ।”
“আসমানের চাঁদ তারকা, নবীর নূরে দীপ্তিমান, সংগোপনে মেরাজ তাঁহার, উর্ধ্বলোকে মহীয়ান।”
ফারসী সাহিতের অন্যতম প্রতিভাবান কবি ওমর খৈয়াম (র)। তিনি বলেন,
“হে মহান, যিনি জগতের অদ্বিতীয়! আমার মন, চক্ষু ও জিবনের চাইতেও অধিক প্রিয়।”
প্রেমিক কবি আমীর খসরু গজনভী (র)। তাঁর কাব্যে তিনি বলেন,
“তব নূরানী বদন হেরী সবে ঈর্ষাতুর, ফুলের মতন তব রুপ, হে রাসুল আমার।”
ফারসী কাব্যসাহিত্যের অন্যতম কবি নিজামী গজনভী (র)। তিনি বলেন,
“প্রেরিত পুরুষ আহমদ, প্রজ্ঞা যার সত্ত্বার আবরণ, যার নূরের বাধা উভয় জাহান।
আদম থেকে ঈসা সকলের শ্রেষ্ঠ তিনি, প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আল-আমিন, আদিঅন্তের নবী যিনি।”
ফরাসী কাব্যসাহিতের খ্যাতিমান কবি মালেকুশ শোয়ারা খোরাসানী (র) বলেন,
“হে নবী, তোমার দয়ায় মোদের মিলিবে জান্নাত, নেয়ামত,
তোমার গোস্বায় মোদের ধ্বংস, নরকবাস, অনিবার্য মউত।
অন্যতম ফারসী কবি রোকনুদ্দিন আওহেদী (র) বলেন,
“শিরে তব চিরদিন, গৌরব তিলক, সকল রাত্র তোমার শবে মেরাজ,
ইশারায় খন্ডিত যামীনির নূর, হাতের মুঠোয় করে সূর্য বিরাজ।”
“মাখলুক জ্যোতির্ময় ইলেমে তব, হাওয়া সেপাহী তোমার রহে হরদম,
তোমার আদেশে কথা বলে যে পাথর, তোমার সুবাসে পায় মৃত্যু ও জনম।”
ফারসী দার্শনিক ও কবি খাকানী শিরয়ানী (র) বলেন,
“হে চির বিজয়ী, তব উচ্চ তব শান, হে পবিত্র, তব অবয়ব, কতই মহান।
হে রাসুল, তব এক শ্বাসের দশমাংশের দাম, না দিতে পারে কভু উভয় জাহান।”
রাসুলপ্রেম, দ্বীনে মোহাম্মদী, আহলে বাইয়াত সহ ধর্মের সকল গুঢ় তাৎপর্য ও রহস্যাবলী নিয়ে সবচাইতে বেশি সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে ফারসী ভাষায়। উর্দু এবং বাংলাতেও রাসুল (সাঃ) এর শান মান নিয়ে রচিত হয়েছে প্রচুর কাব্যসাহিত্য। রাসুল (সাঃ) এর শান মান ও তাঁর প্রেমে বিগলিতচিত্ত ফারসী কবিদের সমুদ্রসম গভীর সাহিত্যকর্ম থেকে যৎসামান্য কাব্যাংশ একত্রিতকরণের প্রয়াস করা হলো।
প্রবন্ধ – আসরারে পাঞ্জাতন – ৮ম পর্ব
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
‘আরজাহুল মাতালিব’ কিতাবে বর্ণিত আছে যে, একদিন হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম আল্লাহকে বললেন, হে আল্লাহ! আমার চেয়ে প্রিয় কোনো কিছু কি আপনি তৈরী করেছেন ? এ কথার কোনো জবাব হযরত আদম আল্লাহর পক্ষ হতে না পেয়ে আবারো একই প্রশ্ন করলেন। এ ভাবে তিনবার কোনো উত্তর না পেয়ে চতুর্থবার ওয়াস্তাগফার পাঠ করলেন। তারপর আল্লাহপাক বললেন, হে আদম! আমি যদি তাদেরকে পয়দা না করতাম, তবে তোমাকেও পয়দা করতাম না। আদম আলাইহিস্ সালাম আল্লাহর সেই প্রিয়জন দেরকে দেখার বাসনার্থে প্রার্থনা জানালেন। ফেরেশতাগণকে আল্লাহপাক হুকুম করলেন আরশের পর্দা উঠানোর জন্যে। আরশের পর্দা উঠানোর পর হযরত আদম পাঁচটি নূরময় সুরত দেখতে পেলেন। একটি মাঝে আর চারটি তাঁর চারদিকে ঘিরে রয়েছে। আদম আলাইহিস্ সালাম জানতে চাইলেন এরা কারা ?
আল্লাহপাক পরিচয় দিয়ে বললেন, ইনি আমার হাবিব শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম, তিনি আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী, উনি আখেরী নবীর মেয়ে হযরত ফাতেমা, আর ইনারা দু’জন মাওলা আলীর দু’সন্তান হাসান ও হুসাইন আলাইহিস্ সালাম। হযরত আদম যখন পৃথিবীতে চলে আসেন তখন ঐ পাঁচ জনের উছিলায় গুনাহ মাফের প্রার্থনা করেছিলেন এবং আল্লাহ পাকও তাকে মাফ করে দিলেন। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় আছে হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের উছিলায় আল্লাহপাক তাঁর গুনাহ মাফ করে দিলেন [আশ্শেফা-১ম খন্ড]। আসলে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের সাথেই তাঁর আহলে বাইয়েত চিরবর্তমানে স্থিত আছে। মোহাম্মদ তাঁর পবিত্র আহলে বাইয়েত ছাড়া নয় এবং আহলে বাইয়েতও মোহাম্মদ ছাড়া নয়, উভয়ই একরূপ ধারণ করে চিরবর্তমানে স্থিত আছে। খফির ঘর মোহাম্মদ আর সে ঘরের অদিবাসী চারজন আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন আলাইহিমাস্ সালাম হলেন ‘আহলে বাইয়েত’ এবং ইনারাই হলেন সমস্ত সৃষ্টির মূল নিয়ামক। মাদারেজুন নবুয়ত কিতাবের ৩য় খন্ডের ১১৫ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, হাবিবেপাক মোহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, আহলে বাইয়েতের পরিচয় লাভ করা হলো দোযখ হতে নাজাতের উছিলা।” সুতরাং সেই চিরন্তনÑশাশ্বতকালের আহলে বাইয়েতের পরিচয়টি কতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস তা কি ভাবনার বিষয় নয় ?
আরো একটি রেওয়ায়েতে রয়েছে যে, যখন আদম আলাইহিস্ সালামের বৃদ্ধাঙ্গুলে নূর নবীর সুরত মোবারক দেখলেন, তাতে ভক্তিভাবে তিনি উভয় বৃদ্ধাঙ্গুলীতে চুম্বন করলেন। তারপর হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম আরজ করলেন, ‘হে আল্লাহ, আরো কোনো নূর রয়েছে কি-না ? আল্লাহপাক তখন শাহাদাত আঙ্গুলে আলী, বাকি তিন আঙ্গুলে হযরত ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন এর সুরত স্থাপন করে আদম আলাইহিস্ সালামকে দেখালেন।
একদিন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের খেদমতে আরজ করলেন, “ইয়া রাছুলুল্লাহ, হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম যখন জান্নাতে ছিলেন, তখন আপনি কোথায় ছিলেন ? হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম মুচকি হাসি দিয়ে বললেন – আদমের ঔরশে। তারপর হযরত নূহ আলাইহিস্ সালাম তাঁর ঔরশে আমাকে ধারণ করে নৌকায় আরোহণ করেছিলেন। তারপর হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের পৃষ্ঠদেশে। তারপর পবিত্র (মুমিন) পিতা-মাতাগণের মাধ্যমে আমি পৃথিবীতে আগমন করি। আমার পূর্ব-পুরুষগণের কেহই চরিত্রহীন ছিলেন না [তাওয়ারিখে মোহাম্মদী, আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া]।
ইবনে সা’দ কালবী থেকে, তিনি আবু ছালেহ থেকে এবং তিনি হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম এরশাদ করছেন, আরববাসীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে ‘মুযার’। মুযারের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে ‘আবদে মানাফ’। আবদে মানাফের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে ‘বনু হাশেম’ এবং তার মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে আবদুল মুত্তালিবের সন্তান-সন্ততি। আল্লাহপাক আদম থেকে বংশ বিভক্ত করেছেন, আমাকে তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শাখায় রেখেছেন [খাসায়েসুল কুবরা, ১ম খন্ড- ৭৩ পৃষ্ঠা]। এ সর্বশ্রেষ্ঠ শাখাটিই হলো ‘হাসেমী গোত্র’, যে হাসেমী গোত্রের মধ্যে রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহিস ওয়াচ্ছাল্লাম এবং হযরত মাওলা আলী আলাইহিস্ সালামের জন্ম।
ইবনে আবি ওমর আদনী হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেন যে, আদম সৃষ্টির দু’হাজার বৎসর পূর্বে ‘কোরাইশ’ আল্লাহপাকের সামনে একটি নূরের আকারে ছিল। এ নূর যখন তাসবীহ পাঠ করতো, তখন ফেরেশতারাও সঙ্গে তাসবীহ পাঠ করতো। আল্লাহপাক আদমকে সৃষ্টি করে এ নূর তাঁর ঔরশে রেখে দিলেন। রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলেন, এরপর আল্লাহ আমাকে আদমের ঔরশে পৃথিবীতে নামালেন। এরপর নূহ নবীর ঔরশে স্থানান্তরিত করলেন এবং তারপরে ইব্রাহীমের পৃষ্ঠদেশে। এমনিভাবে আল্লাহপাক আমাকে সম্মানিত বান্দার ঔরশে এবং পবিত্রাত্মা নারীদের গর্ভে স্থানান্তর করতে থাকেন। অবশেষে আমার পিতা-মাতা আমাকে জন্ম দেন। আমার পিতৃপুরুষের মধ্যে কেউই ব্যভিচারের ভিত্তিতে সঙ্গম করেনি [মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া, খাসায়েসুল কুবরা, প্রথম খন্ড- ৭৫ পৃষ্ঠা]।
আবু নুয়াঈম তার ‘তাহ্কীকুল মাকামে আলা কেফায়াতিল আওয়াম’ কিতাবে বলেছেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, “আল্লাহপাক স্থানান্তরিত করতে থাকলেন আমার নূরকে। এটা ঐ নূর যে নূর আদম আলাইহিস্ সালাম আরশ মোয়াল্লার পর্দাসমূহে দেখেছিলেন।
‘মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়াতে’ বর্ণিত আছে, “যখন আল্লাহর ক্বাদর অনুসারে আদম ও হাওয়া মিলন ঘটলো আরাফাতে, তখন আল্লাহ আদমের প্রতি বেহেশত হতে একটি নহর পাঠিয়ে দিলেন। তিনি এ নহরে গোসল করলেন এবং হওয়ার সাথে মিলিত হলেন। ফলে ঐ নূরগুলো তাঁর প্রতি স্থানান্তরিত হলো। অনন্তর নূর-ই-মোহাম্মদীর স্থানান্তরিত হতে থাকলো এক পৃষ্ঠদেশ হতে আরেক পৃষ্ঠদেশে এবং এক উদর হতে অপর উদরে আসতে আসতে তা স্থানান্তরিত হলো হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের পৃষ্ঠদেশে।
হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম তাঁর পুত্র শীশকে উপদেশ দিলেন, যেন আল্লাহকে স্মরণ করার সঙ্গে সঙ্গে মোহাম্মদকেও স্মরণ করা হয়। কারণ, বেহেশতের প্রতি জায়গায়, ফেরেশতাগণের পেশানীতে ও হুরদের চক্ষুতে ঐ নাম অঙ্কিত আছে এবং ফেরশেতাগণ প্রতি নিঃশ্বাসে জিকির করে মোহাম্মদ নামের উপর।
হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম একবার প্রার্থণা করলেন, হে আমার রব! আমার সন্তানদের মধ্যে যে সকল পয়গাম্বর আগমন করবেন, তাদের সকলের চিত্র বা ছবি আমাকে দেখানো হোক। তখন আল্লাহপাক সমস্ত পয়গাম্বরদের ছবি নাযিল করেন। হযরত আদম আলাইহিস্ সালামের ভান্ডারের সে ছবিগুলো সূর্যাস্তলে রক্ষিত ছিল। সেখান থেকে বাদশাহ যুলকারনাইন এ ছবিগুলো বের করে নিয়ে হযরত দানিয়েল আলাইহিস্ সালামের নিকট সমর্পণ করলেন (খাসায়েসুল কুবরা-১ম খন্ড)।
বায়হাকী ও আবু নায়ীমের রেওয়ায়েতে হিশাম ইবনে আস বলেন, হযরত আবু বকরের আমলে জনৈক কোরাইশীকে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট ইসলামের দাওয়াতের জন্য প্রেরণ করেন। সম্রাটের নিকট যাবার পর তিনি অনেক বিষয়েই তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন এবং সব প্রশ্নেরই যথাযথ উত্তর দিলেন। সেখানে তিন দিন তারা অবস্থান করলেন এবং বাদশাহ তাদের জন্য পানাহার ও বাসস্থানের সুব্যবস্থা করলেন। বাদশাহ রাতে লোক পাঠিয়ে তাদেরকে নিয়ে আবার পূর্বোক্ত প্রশ্নোত্তরগুলো শুনলেন। অতঃপর সম্রাট একটি স্বর্ণখচিত সিন্দুক আনলেন। তাতে কয়েকটি ছক ছিল এবং প্রত্যেক ছকের পৃথক দ্বার ছিল। তিনি একটি ছক খুলে তা থেকে কালো রেশমী বস্ত্র বের করে ছড়িয়ে দিলেন। তাতে একটি হস্তাঙ্কিত ছবি ছিল। ছবিতে নেত্রদ্বয় ও কর্ণদ্বয় বড় বড় ছিল এবং গ্রীবা দীর্ঘ ছিল। মুখে কোনো দাড়ি ছিল না এবং মস্তকে প্রচুর চুল ছিল। সব মিলিয়ে সেটি ছিল এক সুশ্রী পুরুষের ছবি। সম্রাট তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তারা তাকে চিনে কি না। তারা বললো, না। সম্রাট বললো, ইনি হলেন হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম। এভাবে সম্রাট দ্বিতীয় ছক খুলে একটি শুভ্র চিত্র বের করলেন। তাঁর চুলগুলো কোঁকড়ানো, নেত্রদ্বয় লোহিত বর্ণ, মস্তক বৃহৎ এবং দাড়ি সুশ্রী ছিল। সম্রাট বললেন, তিনি হলেন হযরত নূহ আলাইহিস্ সালাম। এরপর হাস্যরতো একটি ছবি বের করলেন। তিনি হলেন হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম। তাঁর নেত্রদ্বয় সুন্দর, প্রশস্ত ললাট, উন্নত গন্ড ও সাদা দাড়ি ছিল। তারপর বের করলেন মুসা ও হারুন আলাইহিস্ সালামের ছবি, গায়ের রং গোধূম, কোঁকড়ানো ক্ষুদ্র কেশ এবং চক্ষু কোটরাগত ও তীক্ষ্ম দৃষ্টিসম্পন্ন ছিল। পরে বের করলেন হযরত লুত আলাইহিস্ সালামের ছবি। তাঁর কেশ ছিল লম্বা ঝুলন্ত এবং তিনি ছিলেন মাঝারি গড়নের লোক। পরে হযরত ইসহাক, ইয়াকুব, ইসমাঈল, ইউসুফ দাউদ, সোলাইমান এবং ঈসা আলাইহিস্ সালামের ছবি বের করে দেখালেন।
সবার শেষে একটি স্বর্ণখচিত ছক হতে শুভ্র ও সুন্দর ছবি বের করলেন। এ ছবি দেখে সাহাবাগণ সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেলেন। সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেনো দাঁড়িয়ে গেলে ? সাহাবাগণ বললেন, এ ছবিটিই হলো আমাদের নবীজি হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের (সংক্ষিপ্ত, খাসায়েসুল কুবরা, ২য় খন্ড- ১৯-২০ পৃষ্ঠা)।
অনুবাদ – ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র, ১৫তম ও ১৬তম পর্ব
মূল – এলিফ শাফাক হতে
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী
পর্ব – ১৫
ভালোবাসার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় প্রকৃত ধার্মিকের ধর্মজগত। প্রকৃত ধার্মিক যিনি, তিনি তাঁর সবটুকু দিয়ে ভালোবাসেন মানুষকে। তিনি মানুষের প্রেমিক। তিনি মানব মহত্ত্বের অনুসন্ধানী। মানুষে বিরাজিত পরমতত্ত্বের পূজারী তিনি। তিনি ভালোবাসার দ্বারা সেই অনন্ত মহিমা কে লাভ করতে চান।
আল্লাহকে তো সবাই ভালোবাসে। নিরাকার, নিষ্কলুষ এবং অদৃশ্য এক কল্পিত সত্ত্বাকে ভালোবাসা খুবই সহজও বটে! বরং কঠিন তো মানুষ হয়ে অপর মানুষকে ভালোবাসা। প্রকৃত ভালোবাসার রহস্য এখানেই লুক্বায়িত।
জগতে ভালোবাসা ব্যতিত কোনো প্রজ্ঞা নেই। মানুষ হয়ে মানুষকে ভালোবাসার চাইতে বড় কোনো ইবাদত নেই। মানুষের সেবা করার মধ্য দিয়েই হয়ে থাকে মহান প্রভুর সেবা। তিনি মানুষেই সমাসীন। মানুষের হৃদয়ই আমাদের ভালোবাসার তীর্থ। একজন মানুষই জানতে পারে অপর মানুষ কতটুকু ভালোবাসতে সক্ষম!
যদি আমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাই, তবে অনিবার্য ভাবেই আমাদেরকে তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে ভালোবাসতে হবে। যদি আমরা মানুষতত্ত্ব কে অবহেলা করে ¯্রষ্টার উপাসনা করি, তাহলে এটাই প্রমাণিত হয় যে, আমরা স্রষ্টা চিনতে ব্যার্থ হয়েছি।
স্রষ্টা তো মানুষেই বিরাজিত।
পর্ব – ১৬
প্রকৃত বিশ্বাস হলো আমাদের ভিতরের বিশ্বাস। বাহিরের সংস্কার তো কেবল বাহিরেই থাকে। হৃদয়ের সংশয়বিহীন সুদৃঢ় ধারনা সমুহের সমন্বয়েই আমরা আমাদের বিশ্বাসের ভীতকে নির্মাণ করে থাকি। প্রভু প্রেমের পথে সবচাইতে মূল্যবান হলো আমাদের ভিতরের পরিশুদ্ধ বিশ্বাস।
আমাদের বাহিরকে আমরা বাহিরের উপাদান দিয়ে ধৌত করতে পারি। কিন্তু অভ্যন্তরকে ধৌত করতে হয় অভ্যন্তরীন উপাদান দিয়ে। আমাদের হৃদয়ে লেগে থাকা ঘৃনা, গোঁড়ামী আর অন্ধবিশ্বাস তথা কুসংস্কারের দাগ, যা বাহিরের পানি দিয়ে ধৌত করা যায় না। যে নোংরাগুলো আমাদের হৃদয়কে প্রতিনিয়ত দূষিত করে, তা ধৌত করার জন্য প্রয়োজন এক বিশেষ উপাদান।
উপবাস বা সংযম সাধনার মধ্য দিয়ে শরীরকে শুদ্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু যখনই আপনি আপনার হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করতে চাইবেন, তা করতে হবে কেবল ভালোবাসা দিয়ে। ভালোবাসাই সেই নিরন্তর মহিমা, যা আপনাকে ভিতরে বাহিরে পরিশুদ্ধ করবে।
একমাত্র ভালোবাসাই হৃদয়কে শুদ্ধ করতে পারে।
সম্পাদকীয় – শাশ্বত নূরের ফোয়াড়া
লাবিব মাহফুজ চিশতী
দ্বীনে মোহাম্মদীর শাশ্বত নূরের ফোঁয়াড়া আরবের কন্টক সমাকীর্ণ তপ্ত মরুপথে অঙ্কুরিত হয়েই তথাকার বৈরী পরিবেশে ক্ষণকালেই মুমূর্ষ হয়ে পরে। আরবের প্রচলিত কুসংস্কার, যাযাবর জনগোষ্ঠীর একগুয়েমী ও অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে এবং বিশেষ করে নবী (সাঃ) এবং তাঁর বংশধরদের চিরশত্রু যারা, তারাই পরবর্তীতে ধর্মীয় নেতৃত্ব লাভ করার ফলে দ্রুতই প্রকৃত ধর্ম নির্বাসিত হয় আরব থেকে। আরব জনগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক বৈরিতা ও ধর্মবোধে অনীহার ফলশ্রুতিতে ধর্মবিদ্বেষীরাই হয়ে উঠে ধর্মের হর্তাকর্তা! তাদের নেতৃত্বেই চালিত হতে থাকে তাদের দ্বারা প্রচুর কাস্টমাইজ করা এক উদ্ভট কিম্ভুতকিমাকার ধর্ম, তাও আবার দ্বীন ইসলামের নামে!
নবী করিম (সাঃ) দেহান্তরে গমন করার অব্যবহিত পর থেকেই শুরু হয় এ ধর্মনাশের বিচিত্র মহড়া! আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল কর্তৃক মনোনীত প্রতিনিধি কে তথা মাওলাইয়াত কে অস্বীকার করে, মনুষ্য দ্বারা প্রোপাগান্ডা মূলক নিবার্চনের মাধ্যমে যখনই ধর্মীয় নেতৃত্বে আসীন হলো আহলে বাইয়্যেত বহির্ভূত ক্ষমতাশালী চক্র, তখন থেকেই মূলত ধর্মবিনাশের জোর তৎপরতা শুরু হলো। আল্লাহ ও রাসুল মনোনীত মাওলাইয়াতের বদলে মনুষ্য নির্বাচিত খেলাফতই দ্বীনে মোহাম্মদীর ভিতকে সমূলে উৎপাটন করার প্রথম এবং স্বার্থক উদ্যোগ। খেলাফতের শুরুতেই নূর মোহাম্মদ (সাঃ) কে মৃত ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে শ্বাশত ধর্মবিধানের বুকে কুঠারাঘাত করা হলো।
দ্বীনে মোহাম্মদীর একমাত্র উত্তরাধিকারী এবং মনোনীত ইমাম মাওলা আলী (আ), মা ফাতেমাতুজ্জাহরা (আ), মাওলা ইমাম হাসান (আ), মাওলা ইমাম হোসাঈন (আ) কে সকল দিক হতে বঞ্চিতকরণের অপপ্রয়াস এবং তাদেরকে অত্যাচার নির্যাতনের মাধ্যমে মজবুত করা হলো অবৈধ খেলাফতের ভিতকে। একের পর এক পূর্বসূরীর মনোনয়নের মাধ্যমে চলতে থাকলো খেলাফতি মিশন। দ্বীনে মোহাম্মদীর প্রকৃত রূপ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকলো। দ্বীনে মোহাম্মদীর কবর রচনা করার সবচাইতে মোক্ষম কর্মটি সাধিত হলো নবীবংশের চিরশত্রু উমাইয়াদের রাজক্ষমতায়নের মাধ্যমে। যার ফলশ্রুতিতেই নির্বাহ হলো পরবর্তীতে আহলে বাইয়্যেত এর প্রতি নির্মম অত্যচারের ও হত্যার ঘটনাবলী।
খেলাফতি শাসনামলে ধর্মবিরোধী অপতৎপরতা এতোটাই প্রসারিত হয়েছে, যদিও জনগণের চাপে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে বাধ্য হলেন মাওলা আলী (আ), অব্যবহিত পরেই গুপ্তঘাতকের হাতে দেহত্যাগ করতে হলো তাঁকে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারেই এগোতে থাকলো ধর্মনাশের সকল কার্যক্রম। মুয়াবিয়ার শাসনকালে অতিকষ্টে বেঁচে থাকা অবশিষ্ট দ্বীন মোহাম্মদীর ওপর দিয়ে বয়ে গেলো ভয়ঙ্কর সাইমুম ঝড়। মুয়াবিয়ার বিস্তর অপকর্মের দরুণ এবং ধর্মবিরুদ্ধ কার্যকলাপের দরুণ মুমূর্ষ ধর্ম শেষ নিঃশ্বাস ফেলতে বাধ্য হলো। কারবালায় দ্বীন মোহাম্মদীকে দাফন করলো তারই গুণধর পুত্র এজিদ।
দ্বীনে মোহাম্মদীর শ্বাশত জ্যোর্তিচ্ছটা শেষ হয়ে যাবার নয়। অপশক্তির হাতে নির্মূল হবার নয়। নবীপ্রেমিক কিছু কিছু মানুষ হৃদয়ে ধারণ করে রাখলেন সে অনির্বাণ জ্যোতি। যদিও পদে পদে সে মানুষগুলো হয়েছেন অপদস্থ, হয়েছেন ক্ষমতাশালীদের নিগ্রহের শিকার, হত্যা করা হয়েছে তাদের, বাধ্য করা হয়েছে দেশত্যাগে। রাষ্ট্রলোভীদের হাতে বার বার গণহত্যার শিকার হয়েছেন তাঁরা। তবুও অতি যত্নে আগলে রেখেছেন দ্বীনে মোহাম্মদীর আলোকধারা। পরম মমতায় সংরক্ষণ করেছেন মাওলা মুহাম্মদ (সা) হতে মাওলা আলী (আ) এর মাধ্যমে প্রাপ্ত গুপ্তজ্ঞানের নহর। হৃদয়ে চির জাগুরুক রেখেছেন নবীপ্রেমের স্বর্গসুধা। এই পরম ভক্তশ্রেণী তথা প্রকৃত ধার্মিকগণ রাজশক্তির কোপানল থেকে জিবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়িয়েছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। তাঁরাই দ্বীনে মোহাম্মদীর দীপ্তি ছড়িয়ে দিয়েছেন জগতের কোনায় কোনায়।
আরব থেকে চরম লাঞ্ছিত, নিগৃহীত ও নির্যাতিত হয়ে দ্বীনে মোহাম্মদী তথা নবীপ্রেম তথা আহলে বাইয়্যেত এর ভালোবাসা বুকে নিয়ে কিছু পরম ভক্ত তথা ধার্মিক তিলে তিলে জেগে রইলেন জগতের কোথাও কোথাও। তাঁদের থেকেই জগতের আবাদ হচ্ছে প্রকৃত ধর্ম। দ্বীনে মোহাম্মদী। তাদের থেকে সিনা-ব-সিনা জগতের বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে ইলমে মারেফতের ফল্গুধারা।
দ্বীনে মোহাম্মদীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আরেকটি শক্তিশালী মরুঝড়ের নাম সালাফিবাদ। ইঙ্গ-মার্কিন অপরাজনীতি তথা ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ এর কবলে পরে এবং মুর্খ গোঁড়া সৌদি রাজতন্ত্রের পেট্রোডলারের রাজনীতির ফলশ্রুতিতে সৌদিতে দ্বীনে মোহাম্মদী ধ্বংসের উপায় হিসেবে আমদানি করা হয় ওহাবীবাদ বা সালাফীবাদকে। যা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাম পরিগ্রহ দ্বীনে মোহাম্মদীকে ধ্বংসের বিভিন্ন ফাঁদ রচনা করে চলেছে। এক্সট্রা পিউরিটান প্রবণতার নামে এই ফাঁকা অক্ষরবাদী তথা খোলসসর্বস্ব/আচারসর্বস্ব ধর্মনীতি দ্বীনে মোহাম্মদীর বিরুদ্ধে দাঁড় করানো এক অতিমারী অস্ত্র ব্যতিত আর কিছুই নয়। আমাদের দেশে এই অপনীতি দেওবন্দী মতবাদ নামে সমধিক পরিচিত। যদিও তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাম ধারন করে তাদের কুকর্ম কুতৎপরতার প্রকাশ বিকাশ ঘটিয়ে থাকে।
যুগে যুগে মুষ্টিমেয় ধার্মিকদের বিপক্ষে অধার্মিক বা অসুরশক্তির তীব্রতা ছিল ভয়াবহ। তাদের বিস্তর অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে তবুও ধুঁকে ধুঁকে কিছু প্রাণ জগতের বুকে বাঁচিয়ে রাখে চির সত্যের দেশনাকে। তারাই ধর্মের ধারক বাহক। তারাই গুরু মুর্শিদ, ওলী আউলিয়া। তাদের শরণেই ধর্মের পালন হয়।
“নবীপ্রেম তথা আহলে বাইয়্যেত এর প্রতি প্রাণাধিক ভালোবাসা তথা গুরু মুর্শিদ বা অলী আউলিয়াদের প্রতি প্রাণাধিক ভালোবাসা ও পূর্ণ আনুগত্য অনুসরণ এর মাধ্যমেই দাখিল হওয়া সম্ভব সেই প্রকৃত দ্বীনে মোহাম্মদীতে।”
সকল বিঘ্ন অতিক্রম করে মুষ্টিমেয় কিছু পবিত্র ও জ্ঞানী মানুষের সিনায় সিনায় ফল্গুধারার মতো জারি থাকবে দ্বীনে মোহাম্মদীর আলোকপ্রবাহ। সে শ্বাশত নূরের ধারায় নিজেকে শামিল করাই প্রকৃত মুসলমানের কাজ।
মহাত্মাগণের পবিত্র বাণী সংকলন
1. সেফাতে আলিমুনকে হৃদয়ে জাগ্রত করে যে তা কায়েম করে নিয়েছে তথা আল্লাহর এলেমের দরিয়ার ভেতর ডুব দিয়ে আছে, সেই হলো আলেম তথা জ্ঞানী।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
2. পথ আমি নই, পথের শেষের গন্তব্যটাই আমি। হে পথিক, ভিন্ন ভিন্ন পথে আমাকে খুঁজে ফিরো বলে, বিচিত্র রূপে আমাকে দেখতে পাও বলে আমি ভিন্ন কিংবা বিচিত্র নই। আমি অভিন্ন এক অখন্ড সত্ত্বা।
– হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী
3. আমার অন্তর ভরে আছে প্রভুর প্রেম। সেখানে অন্য কারো ভালোবাসা বা ঘৃণা প্রকাশ করার জায়গা নেই।
– তাপসী রাবেয়া বসরী
4. আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জ্ঞানার্জন করো এবং জগতের প্রতি মমতাবান হও।
– বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী রহ.
5. হিংসুকদের ভৎর্সনায় চিন্তিত হয়ো না। কষ্ট ও যন্ত্রনা দিয়েই আশেকের হৃদয় প্রতিপালিত হয়।
– খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহ.
6. মআমি পূর্বে হয়তো তার প্রেমের বর্ণনা দিয়েছি। কিন্তু যখন তার প্রেমকে অনুভব করলাম, তখন বাকরুদ্ধ ছিলাম।
– মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী রহ.
7. দেখো সর্বত্রই তাঁর অপার সৌন্দর্য। আমি সর্বদা তাঁর নাম হৃদয়ে রাখি এবং আমি যা করি তাই ইবাদত হয়ে যায়।
– ভক্ত কবির
8. হাজারো জ্ঞানের বই পড়েছো, কখনো কি নিজেকে নিজে পাঠ করেছো?
– বুল্লে শাহ
9. শুধু আরবী ভাষা শিখলেই জ্ঞানী হওয়া যায় না, ধার্মিক হওয়া যায় না। গুরু মুর্শিদের নিকট বাইয়াত হয়ে, তাঁর খেদমত করে আল্লাহর অলি হতে হয়।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৮ম সংখ্যা, অক্টোবর ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

