সালমা আক্তার চিশতী
ধর্মের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। বলা হয় বিশ্বাস মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। ঈমান আর ইসলাম এক নয় (সুরা হুজরাত-১৪)। ঈমান আনার পর (বায়াত হওয়ার পর) ইসলামে দাখেল হওয়ার জন্য সাধনা করতে হয়। তার জন্য প্রথম সাধনাটিই হলো শয়তানের অনুসরণ না করা (সুরা বাকারা-২০৮)। সুরা বাকারার ২০৮ নম্বর আয়াতেই গোপন ও প্রকাশ্য শত্রু শয়তানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। একটি হলো দীলের ভিতর হতে অসওয়াছা দিচ্ছে (খান্নাছ), অপরটি যে লোক শয়তানের/খান্নাছের/মরদুদের/ ইবলিশের গুণে গুণান্বিত সেই লোকটিই হলো প্রকাশ্য শত্রু শয়তান। ঐ মানুষের ছুরতে এবং নামেই তখন শয়তান মূর্তমান হয়ে উঠে। সে মানবরূপে নানা ভাবে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে থাকে। সে শয়তান প্রথমেই ঈমানদারের ঈমানের উপর আঘাত করে। যদি ঈমানদারের ঈমান ভাঙ্গতে পারে তবেই শয়তানের কার্য সিদ্ধি হলো। আর ঈমানদারগণ সে শয়তানকে চিনে-দেখে স্বীয় ঈমানকে হেফাজত করে আল্লাহর খাঁটি বান্দায় পরিণত হয়ে যায়।
ঈমান কিভাবে দৃশ্যমান হয় তা জানা দরকার। সাত সেফাত ও পাঁচ জাত যেই মানুষটি নিজ অস্তিত্বের মাঝে হাসিল করেছে সেই ব্যক্তি পরিপূর্ণ ঈমানদার হয়েছে। কারণ, (৭+৫=১২) এর সমষ্টি রূপ-শেকেলই হলো ঈমান। একজন নবী- রাসুল/পীর-মুর্শিদ হলো ঈমান এবং ঈমানের ছুরত। শুধু মুরিদ হলে চলবে না, একজন মুরিদের তরিকতের জগতে চলার মূল সম্পদ হলো ঈমান, তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, যে স্তরে পৌঁছালে আর বন্দেগী থাকে না (কোরান)। যার ঈমান রয়েছে সে পারে মুক্তির দেশে অবগাহন করতে। মানব গুরু হলো ঈমান, তাকে বিশ্বাস করে যে বায়াত/আনুগত্য স্বীকার করেছে সে-ই হলো ঈমানদার। ঈমানের পূর্ণতা তখনই হাছিল হয় যখন মানব গুরুর প্রতি ঈমান প্রতিষ্ঠিত হয়। ঈমান শূণ্য ব্যক্তি আল্লাহর লানত প্রাপ্ত হয়, তার দ¦ারা এই সমাজ ও সংসারের মাঝে কলহ বিবাদ দেখা দেয়। ‘যার মুর্শিদ নেই তার মুর্শিদ হলো শয়তান।’ (শানে হাবিবুর রহমান-২০০পৃঃ)।
যারা প্রকৃত ঈমানদার তাদের অবস্থান এইরূপ হবে, বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ) বলছেন – “তোমার অন্তরকে সংশোধিত ও পরিশুদ্ধ কর, অবশ্যই প্রতি নিঃশ্বাসে তোমার সাথে আল্লাহর সাক্ষাৎ ঘটবে”। প্রকৃত ঈমানদার তা বুঝতে পারবে। কারণ, সে মোহমুক্ত হওয়ার সাধনায় কামিয়াব তথা বস্তুমোহের উপরে বাস করে। যেমন – পানি বাষ্প হয়ে বাতাসের সাথে মিশে থাকে তেমনি ঈমান একজন মানুষের দিল হতে উদয় হয়ে ভিতর বাহির ঐক্যতায় স্থিত হয়ে যায় বা ওয়াজেব-এমকান ঐক্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে ঈমানের সুরত প্রকাশ করে, যাকে বলে শাজারাতুল ইয়াকিন। যারা একাগ্র চিত্তে সাধনা করতে পারে তারা নির্ভেজাল ভাবে ঈমান ধরে রাখতে পারে। ঈমান ধরে রাখার মাঝে রয়েছে জান্নাতের সুখ আর যারা ঈমান ধরে রাখতে পারে না তাদের অবস্থানের দুর্বিষহতা দেখলে মানুষ আর পাপ কর্ম করতো না। কোরানের মাঝে বলে দেওয়া হয়েছে ‘তাদেরকে দেখলেই চিনা যাবে’ (সুরা রহমান)। যেমন – বালুর মাঝে লোহার গুড়া মিশ্রিত থাকে, চুম্বক নিয়ে বালুর মাঝে ধরলে লোহার গুড়াগুলো আলাদা করা যায় তেমনি যারা ঈমানদার হবে তারা এই নাসুতের জগতের ভেজালগুলো এড়িয়ে নিজ ঈমান অর্থাৎ নিজ মুর্শিদকে ধারণ করতে পারবে।
কারণ, এই নাসুতের দরিয়ার মাঝে নিজ ঈমানকে ধরে রাখতে হলে চুম্বকের মতো আকর্ষণ শক্তি অর্জন করতে হবে। দুনিয়ার সুখ বা বিষয়-বাসনা যদি মনের মাঝে প্রধান হয় তবে আর গুরুর প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হবে না, ঈমানের দূর্বলতা প্রকাশ পাবে। গুরু ভজন দ্বারাই ঈমানকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। কারণ, গুরু ভজনেই মিলবে মাওলার দর্শন। খোদার দর্শনবিহীন মনই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। মনকে নিজ অস্তিত্বের মাঝে ধারণ করে রাখার মূল হলো নিজ সত্ত্বাকে ফিরে পাওয়া। হৃদয়ের টান আর চোখের জল দ্বারাই ঈমান প্রতিষ্টিত হয়। গুরুর অনুগামী হতে পারলে ঈমান প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। কারণ, এই বাহিরের ভাব দিয়ে গুরুকে সন্তুষ্ট করা যাবে না। গুরুকে লাভ করতে হলে একনিষ্ঠ চিত্তে গুরু ভজনের দিকে মনকে নিবিষ্ট করে ধরে রাখতে হবে। হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) ‘আল্ ফাত্হুর রাব্বানী ওয়া আল্ ফায়জুর রাহমানী’ কিতাবের মাঝে বলছেন – ‘তুমি আমার কথা না শুনিয়া স্বীয় নফস ও কামনা সাথে লইয়া ইবাদত খানায় বসিয়াছ।
সর্ব প্রথম তোমার প্রয়োজন পীরের সহচর্য লাভ করা। স্বীয় নফস, কামনা এবং আল্লাহ ব্যতীত সকল কিছু হত্যা করিয়া পীরের দ্বারে চাপিয়া বস।’ একজন সাধকের সারাটা জনমই তার নিজ মনকে পাহারা দিয়ে রাখতে হয়। আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতি নিজামী তাঁর আলোচনার মাঝে বলতে থাকেন – ‘একজন মানুষের মনই তাকে আউলিয়া বানাতে পারে আবার চোরও বানাতে পারে’। তাই একজন মানুষের কর্ম হওয়া উচিত সর্বক্ষণ নিজ সম্পর্কে চেতন থাকা, তা না হলে এই মনই অচেতন হয়ে একজন মানুষকে ভুল কাজে লিপ্ত করতে পারে। ফজরের আজানের মাঝে বলতে থাকে “আচ্ছালাতু খাইরুম মিনান্নাউম” অর্থাৎ ঘুম হইতে নামাজ ভালো। যারা অচেতনের ঘুমকে জয় করে সর্বক্ষণ নামাজে তথা চেতনের ঘরে থাকতে পারে তারা পরিপূর্ণ ভাবে ঈমানকে হেফাজত করতে পারে। এই পারাটার মাঝেই রয়েছে এই মানব জনমের স্বার্থকতা। স্বার্থকতা না থাকলে মানব জনমের পূর্ণতা হাছিল হয় না। স্বার্থক জনম হবে তখনই যখন মন নিয়ন্ত্রন হবে গুরু জ্ঞানের আলোকে। যেমন – আলোর উৎস হলো সূর্য, তেমনি নফসের কালো আধার কেটে গেলে রূহ নামক সূর্যের আলো মানব অজুদকে নূরে নূরান্বিত করে তুলবে। যেমন – মাটির নিচে অনেক জীব বাস করে থাকে, খাবারের খোঁজে ও বিভিন্ন প্রয়োজনে এরা মাটির নিচ থেকে বের হয়, আর যেই সমস্ত জীব মাটির নিচেই বসে থাকে তারা অকালেই মৃত্যুবরণ করে থাকে। তেমনি সমাজের বেশির ভাগ লোক তারা ঈমানের আলোকে গ্রহন করতে পারে না, তারা হায়ানী আত্মার গর্তে লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে, এইরূপ অবস্থানের কারণে তাদের ইনসানি আত্মা হারিয়ে যায় (সুরা আনআম)। তাদের অবস্থান সম্পর্কে তারা অচেতন, ঠিক পশুর ন্যায়।
ঈমান যেদিন পূর্ণ হবে সেদিন দিব্যদৃষ্টি অর্জিত হবে। সূরা নাহলের ৩৬ নং আয়াতের মাঝে আল্লাহপাক বলে দিয়েছেন – “ওয়ালাকাদ্ বা আছনা ফিকুল্লি উম্মাতির রাছুলান্ আনিবু দুল্লাহা ওয়াজ্তানিবুত্ তাগুতা” অর্থাৎ এবং অবশ্যই আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে একজন রাছুল প্রেরণ করি, যাতে তারা (সে জাতি) আল্লাহর ইবাদত এবং তাগুত বর্জন করে। আর এই রাসুলই হলো একজন মুরিদের/আমানুর ঈমান। রাসুলের অবস্থান হলো দীলে নীলুফারীর দেশে। একজন চেতন মানুষ সর্বক্ষণ দীলে নীলুফারীর দেশে দৃষ্টি দিয়ে রাখে। এই চেতন দৃষ্টিটার মাঝেই রয়েছে আখেরে তার কি ফল হবে তার ভেদ। একজন ভক্ত তার ঈমানের বলেই পুলছিরাত পার হয়ে যাবে। যার ঈমানের গভীরতা যত বেশী সে ততো দ্রুতগতিতে পার হবে। যেমন – পানির উৎস হলো মাটির নিচে সেই মাটির নিচে যদি পানি না থাকে তবে কি আর পানির ট্যাঙ্কির মাঝে পানি ভরতে পারবে ? তেমনি হয় একজন মানুষের অবস্থান তার ঈমানের মূল উৎস হলো মুর্শিদের প্রতি বিশ্বাস, ভক্তি, প্রেম এই তিনটি বিষয়ের একটি যদি না থাকে তবে আর তার ঈমানের পরিস্থিতি ঠিক থাকবে না। এই ঠিক না থাকার নামই হলো অচেতন অবস্থা। যারা চেতন তাঁদের অবস্থান হবে পরকালে, মূলতঃ চৈতন্যতাই পরকাল। এই জগতে তাঁদের দেখলে সাধারণ মানুষ অনেক কিছু সম্পর্কে জানতে পারবে। যার আখেরাত সম্পর্কে জানার আগ্রহ রয়েছে বা আখেরাত লাভ করতে চায় সে-ই পারে ঈমানকে হেফাজত করতে।
কারণ, সব কিছুর ভিত্তি হলো ঈমান, ঈমানই হলো শক্তি (ইহা ১৭ সুন্নতের একটি)। এই পারাটার মাঝে রয়েছে জান্নাতি গুণ-খাছিয়তের অবস্থান। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ) ‘আল্ ফাত্হুর রাব্বানী ওয়া আল্ ফায়জুর রাহমানী’ কিতাবের ২৮নং পৃঃ বলছেন – পীরের রুক্ষ কথা এবং অভাব অনটনের মধ্যেই আমার লালন পালন। তোমরা যখন আমার কোন কথা শোন তখন উহাকে আল্লাহর পক্ষ হইতেই মনে করিয়া গ্রহন কর। কারণ তিনিই আমার দ্বারা বলান। ‘তুমি যখন আমার নিকট আগমন কর তখন স্বীয় অস্তিত্বকে ভুলিয়া আস।’ প্রকৃত ঈমানদারের অবস্থান হবে এইরূপ। আমি অধম এইরূপ হইতে পারি নাই। যারা সাত পাঁচের হিসাব অর্থাৎ জাত এবং সেফাত সম্পর্কে অবগত হয়েছে সে পারে ঈমান শূন্যতাকে ঈমানের পূর্ণতায় নিয়ে আসতে। মুর্শিদের আদেশ নিষেধ নিজ মানব জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারলে মানব জনমে আসবে স্বার্থকতা। এই স্বার্থক জনম হয় চিরস্থায়ী। কারণ, এই জনমটাকে মূল্য দিতে হবে, দেখা গেছে যারা এই জনমটাকে মূল্যহীন করবে তাদের জন্য দোযখের শাস্তি ঠিক ঐ মুহুর্ত থেকেই রেডি হয়ে যাবে। যারা অচেতন জীব অর্থাৎ তাদেরকে আর মানুষ বলা যায় না। যেমন – সাপের মাঝে বিষ দাঁত রয়েছে, কৌশলে যদি সাপের বিষ দাঁতগুলো ভেঙ্গে দেওয়া যায় তবে আর সাপটি ক্ষতি করতে পারবে না তেমনি একজন মানুষের হায়ানী স্বভাবটা হলো সাপের বিষ দাঁতের মতো এই স্বভাবের বিষ দাঁতগুলো ভাঙ্গতে না পারলে ঈমান প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। কারণ, হায়ানী স্বভাব একজন লোক ধারণ করে রাখলে ঐ ব্যক্তির ইনসানী স্বভাবটি পর্দাবৃত (মুদ্দাসসির) হয়ে যায়। অর্থাৎ মৃত্যু হলো পরিবর্তন হয়ে যাওয়া।
আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতি নিজামী (কুঃ ছেঃ আঃ) তাঁর একটি গানের মাঝে বলছেন:
জাগো আমার মন, কেনো ঘুমেতে মগন
নইলে বৃথা জীবন, হবেরে আখেরে।
মানুষ কুলে জন্ম পেয়ে কেনো রইলি ভুলে
এই দেহ ভাঙ্গিয়া গেলে দাঁড়াবি কোন কূলে,
তোমার বেঁহুশী জীবন পাবে পশুরই গঠন
দোযখেতে গমন হবে আখেরে।
পেয়ে মন মানুষ আকার, করলিনা তার আচার
অবিচারের বিচার শেষে পাবি পশুরই আকার,
কেনোরে মন তুই হইলি না চেতন
অচেতনে পশুর গঠন হবে আখেরে।
বিষয় বাসনায় সদা ডুবে রইলি ভবে
একদিনও কি ভাবলি মনে আখেরে কি হবে,
দিন থাকিতে মন ভজ শ্রীগুরুর চরণ
নইলে বৃথা জীবন ঘুরবি বারে বারে।
চেতন মানুষ ভবে যারা মায়ার এ সংসারে
সদায় দেয় রূপের পাহারা, থাকে হুঁশের ঘরে,
হবে হুঁশেতে মানুষ, আর বেহুঁশে পশু
হুঁশ হলো না কভু, তাই ভাবছে বেনজীরে।
আখেরে কি রূপ হবে তা এই জনমেই নির্ধারণ হয়ে যাবে। কারণ, কর্ম ফলে ফলাফল ৩৯ বস্তু নিয়ে রেডি হয়ে থাকবে। যারা এই জগতে চেতন মানুষ তারা সদায় রূপের ঘরে দৃষ্টি দিয়ে রাখে। দৃষ্টি দিয়ে রাখার মাঝেই মানুষের ছুরত এবং পশুর ছুরত তৈরি হবে। যেমন – একটি খালি বোতলের মাঝে তেল ভর্তি করতে হলে বোতলটিকে শক্ত ভাবে ধরতে হবে তেমনি একজন মুরিদের অবস্থান হওয়া দরকার। তার মন যদি ভেজাল মুক্ত হয় আর অনুরাগ নিয়ে মুর্শিদের দিকে অগ্রসর হতে থাকে তবেই পারবে ঈমানের নূর ধারণ করতে। এই ধারণ করাটা হয় দুই রকমের, কেউ দীলে মুখে ধারণ করবে আবার কেউ শুধু মুখে ধারণ করবে। যারা অনুরাগের আশ্রয় নিয়ে সাধনা করবে তারা মূল গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। কারণ, পারলে সু-ফলাফল আর না পারলে কু-ফলাফল। যারা অনুরাগের বাহনে দাঁড়াবে তারা অনড় হয়ে থাকবে এই তরিকতের জগতে। তারা সর্বক্ষণ তাদের রূপের ঘরে মনকে নিবিষ্ট করে রাখে। এই মানব জনমটা পাওয়া গেছে অতি ভাগ্যগুণে। গুরু সর্বসময় চাইতেছে একজন মুরিদকে ভক্তে পরিণত করতে। কারণ, যার ঈমানের মাঝে দুর্বলতা রয়েছে সে শিষ্য, ভক্ত হতে পারবে না। যারা অনবরত সাধনা করতে থাকে তারা পারে সৌভাগ্যবান হতে।
যারা নিজ সম্পর্কে গাফেল তারা কোনদিন খোদার দীদার লাভ করবে না, যারা খোদার দীদার লাভ করবে তাদের অবস্থান অতি উচ্চ পর্যায়ে হবে। হযরত খাজা মাঈনুদ্দীন চিশতী (রাঃ) বলছেন “গাফেল হৃদয়ে কিভাবে বন্ধুর দয়া ও ভালোবাসার আলো জ¦লবে, চেতন হৃদয় ব্যতিত সে নূরের অবরোহন স্থল নেই”। গাফেলতি দূর করাটাই হলো সাধনা, এই গাফেল মনকে যারা সফলতার দিকে নিয়ে গেছে তারাই এই মানব জনমকে সুন্দর করতে পেরেছে।
মানব জনমকে সুন্দর করার মাঝে রয়েছে খোদার রহমতের দরজায় পৌঁছে যাওয়া। যেমন, একটি বেলুন যখন আমরা ফুলাই তখন যদি বেলুনটি বেশি ফুলানো হয় তখন বেলুনটি ফেটে হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে আবার অনেক সময় বেলুনটি ফেটেও যায়, তেমনি একজন মানুষ যখন অচেতন হয়ে পড়ে তখন তার অন্তরের সৌন্দর্য্য নষ্ট হয়ে যায়। আর এই সৌন্দর্য্য নষ্ট হওয়ার মূল হলো হায়ানী স্বভাবের বাধ্য হওয়া যা দ্বারা ইনসানী আত্মা হারিয়ে যায়, নিজেকে গুরুর অনুগামী রাখতে পারলে ইনসানিয়াত প্রতিষ্ঠিত করা যায়। বন্ধুর দয়া লাভ করতে চাইলে বন্ধুকে অনুসরণ করতে হবে। এই অনুসরণ সঠিক ভাবে করতে পারলে একজন কামেল ইনসানে পরিণত হওয়া যাবে। কামেল ইনসান বা কামালিয়াত অর্জন করাটা সহজ নয়। তা অর্জন করতে হলে খোদার প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যেমন – শীতকালে গাছের পাতা ঝড়ে পরে। এই পাতাগুলোকে কোনক্রমে ধরে রাখা যায় না, তেমনি যারা ঈমান শূন্য হয়ে গেছে তারা তরিকতের জগত হতে ঝরে পরে যাবে। কারণ, খোদাকে চিনা না হলে খোদার ভেদ জানা হবে না। যারা ভাবুক সদাসর্বদা নিজ প্রবৃত্তির দিকে খেয়াল রাখে, তারা পারে নিজ ঈমানকে প্রতিষ্ঠিত করতে। কারণ, ভাব না থাকলে একজন ইনসানে পরিনত হওয়া যায় না। এই ভাবটা হবে বৈরাগ্যময়ী।
এলমে এলাহীর অধিকারী হওয়াটাই হলো নব সৃষ্টির দিকে ধাবিত হওয়া। কারণ, যারা আধ্যাত্মিক এলেম অর্জন করবে তারা এই মানব জনমে অমরত্ব লাভ করবে। অমরত্ব কিভাবে অর্জন করা যায় তা একজন মুর্শিদ জানিয়ে দিতে পারে। তাই সদাসর্বদা মুর্শিদের নিরিখ ঠিক রাখতে হবে। যেমন – একটি বাড়িওয়ালা যখন তার বাড়ির দেয়াল তৈরী করে, তখন দেয়াল বা ওয়াল তৈরি করতে ইট, সিমেন্ট, বালু ইত্যাদি লাগে। এই ওয়ালটিকে বালু আর সিমেন্ট দিয়ে প্লাষ্টার করা হয়। ওয়াল যখন সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে যায় তখন তার মাঝে রং করা হয়। তেমনি একজন মানুষের দীলে যখন আগুন বস্তুর অন্ধকারে আবৃত থাকে তখন তা পরিশুদ্ধ করতে হলে নফস মোৎমাইন্নার সবুজ রং দ্বারা তা পরিশুদ্ধ করা যায়। মনকে পরিশুদ্ধ করার মাল মসলা হলো আদব – নম্রতা, তমিজ – তাজিম। এই জান্নাতি গুণ। মানুষের কর্ম হলো এই জান্নাতি গুণগুলোকে ধারণ করা। এই অবস্থানটি তৈরী হয় একজন মানুষের দীলে। কারণ, ওয়ালটি যখন প্রথম প্লাষ্টার থাকে, তখন ঘরের সৌন্দর্য্য প্রকাশ পায় না আর যখন রং করা হয় তখন ওয়ালের সৌন্দর্য্য প্রকাশ পায়।
আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশ্তী নিজামী (কুঃ ছেঃ আঃ) বলছেন –
“যারা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত তথা সিবগাতাল্লাহ্-এ ভূষিত তথা প্রভূসত্তার বৃত্তিতে সিক্ত তারাই হলো ধার্মিক।”
আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হতে গেলে এই নফস আম্মারার কালো রং-কে বদলিয়ে সবুজ রং দ্বারা সুসজ্জিত করতে হবে। দীল দ্বারাই একজন মানুষের সুন্দরতম দিকগুলো ফুটে ওঠে, এই ফুটে ওঠার মাঝে রয়েছে একজন শিষ্যের অবস্থান তৈরি করার সুফল। গুরু বা মুর্শিদ একজন শিষ্যের ঈমান পরীক্ষা করার জন্য অনেক পথ অবলম্বন করবে। শিষ্য যদি ধৈর্য্য ধারণ করে অগ্রগামী হতে পারে তবেই পারবে ঈমানদার হতে। যেমন – দুইটি বোতলের মাঝে মধু ও বিষ ভরে রাখলে একজন চেতন মানুষ তার নিজের জন্য মধুর বোতলটি বেছে নিবে। কারণ, সে বিষের জ্বালা সহ্য করেই মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর যারা অচেতন তারা মধুর স্বাদ গ্রহণ করতে গিয়ে বিষের বিষাক্ত এক কুয়ার মাঝে নিজেকে অজান্তে ফেলে দিবে, এই অবস্থানটির ভেদ রয়েছে।
হায়ানিয়াতকে তারা মধুর মতো মনে করে, হায়ানিয়াতের বিষকে ধারণ করে নিচ্ছে, আর একজন মুর্শিদ ঈমান পরীক্ষা করার জন্য মধু আর বিষের বোতল সামনে রেখে দিয়েছে। যারা ঈমানদার হবে সে মধুর বোতলটি বেছে নিবে আর যার তকদির খারাপ সে বিষ পান করে নিজ ঈমানের সাথে সাথে নিজ ছুরত হারাবে। এই হারিয়ে যাওয়াটা অনেক ভয়াবহ। কারণ, ছুরত বদল হয়ে গেলে আর কোন জনমে মানব ছুরত পাওয়া যাবে কিনা তা সন্দেহজনক হয়ে থাকবে। কর্মফল দ্বারাই মানব ছুরত, না হলে পশুর ছুরত। নফস আম্মারার আবরণটি অনেক গভীর, এই গভীরতা কাটাতে হলে ইনসানিয়াত ধারণ করার হাতিয়ার লাগবে। এই হাতিয়ারটি হলো ‘জুলফিকার’। ‘জুলফিকার’ হলো হযরত আলী (আঃ) এর তলোয়ার, তা দুই দিক দিয়েই কাটে। এই কাটার যোগ্যতা যারা মুর্শিদের নিকট থেকে জেনে নিতে পারে তারা নিজ মানব জনমটাকে বিপদমুক্ত করতে পারবে। যেমন – একটি বাচ্চাকে ভালো এবং মন্দ বুঝালে তা সে বুঝবে না, যাদের তকদিরে ভালো মন্দ বুঝার ক্ষমতা নেই তারা এই অবুঝ বচ্চার মতো। তারা পশুর মতো এই পৃথিবীর মাঝে ঘুরে বেড়ায়, যদিও আকৃতি মানুষের মতো।
হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রাঃ) বলছেন – “যে দুনিয়াকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করিয়াছে, সেই প্রকৃত আরেফ। আরেফ লোকটি পৃথিবী আলোকিতকারী সূর্যের মত। তার আধ্যাত্মিক আলোকে বিশ্ব আলোকিত হয়।” যত মহাপুরুষ এই পৃথিবীর বুকে রয়েছে তারা এই আধ্যাত্মিক জগতের মাঝে উজ্জল নক্ষত্র রূপে চিরস্থায়ীত্ব নিয়ে অমর হয়ে থাকে। যারা চিরস্থায়ী হয়েছে তারা এ লোকসমাজ থেকে দূরে অবস্থান নিতে চায়। কারণ, লোক সমাজের সাথে টিকে থাকাটা আর নিজ ঈমানকে হেফাজত করাটা অনেক দুঃসাহসের বিষয়। যার ঈমান যতটা পরিপূর্ণ হয়েছে সে ততটা স্বাধীন সত্তার অধিকারী হয়েছে। স্বাধীন সত্তাটি এইরূপ হবে যেই সত্তার মাঝে খোদার গোপন ভেদ রহস্য উন্মোচিত হবে। এই উন্মোচনটার দ্বারা খোদার রহস্যের ভান্ডারের দ্বার খুলে যাবে। কারণ, মন যতটুকু নির্ভেজাল হয়েছে ততটুকু বেহেশতী সুঘ্রাণ প্রাপ্ত হয়েছে। বেহেশতী সুঘ্রাণ হলো নির্ভেজাল দেশ অর্থাৎ মানব আত্মার জাগরণ ঘটিয়ে মোহমুক্ত দেশে বিচরণ করা। এই করাটার মাঝে দুই রকমের দিক রয়েছে একটি দিক হলো দীলে মুখে ঠিক রাখা। আর একটি দিক হলো দীলের ঠিক নেই কিন্তু মুখে মুখে স্বীকার করা। তারা হবে ‘আসফালাস সাফেলীন’ অর্থাৎ নিন্ম থেকে নিন্মগামী। যারা ঈমানটাকে আঁকরে ধরে রাখবে তারা দীলে মুখে এক করে গুরু ভজন করবে। তারাই জান্নাতী হবে এই জান্নাত মোল্লা মৌলবীদের সাধারণ মানুষদেরকে শোনানো জান্নাতের মতো নয়। এর মাঝে রয়েছে আকাশ জমিন তফাত। যারা আধ্যাত্মিক জ্ঞানী তারা জানে জান্নাত ও জাহান্নাম কি ? যারা আধ্যাত্মিক জগতের মানব, তারা তাদের ঈমান দ্বারাই জান্নাতকে নিজ অস্তিত্বের মাঝে ধারণ করে রাখে। তাই ঈমান প্রতিষ্ঠিত করাটাই হলো একজন মানবের মূল লক্ষ্য। আর মনের জগতে যদি অনিত্য ভাব থাকে তবে ঈমান থাকবে না।
আমার দাদা হুজুর হযরত খাজা দেওয়ান শাহ্ রজ্জব আলী চিশতী নিজামী (রাঃ) বলছেন –
যদি নিত্যধামে যেতে করো বাসনা
তোমার অনিত্য দেহ থাকিতে, নিত্যের করণ হবে না।
মূল লক্ষ্যে যাওয়ার প্রতি যারা বেখেয়ালী, তারাই বিশেষ ভুলগুলি করে থাকে। এই অবস্থাটি তৈরি হয় পীর মুর্শিদের প্রতি ঈমানের ঘাটতি থাকলে। আল্লাহ তায়ালা কোরানে সূরা আরাফ ৭নং আয়াতে বলছেন “ফালানাকুচ্ছানা আলাইহিম বিইলমিউ ওয়ামা-কুন্না-গা-ইবীন” অর্থাৎ অতঃপর অবশ্যই আমি তাদের নিকট বিবৃত করব স্বীয় জ্ঞান সহকারে বা প্রমাণসহ যে, আমি অদৃশ্য ছিলাম না। যারা শুধু নিরাকারে বিশ্বাস রাখে তারা এই ভুল করে থাকে। যেমন – একটি বই যদি আমরা না দেখেই এর ব্যাপারে মন্তব্য করতে থাকি তবে কি তা ঠিক হবে? বইটির ভেদ রহস্য ব্যাখ্যা করা যাবে? কখনো না। তেমনি না চিনে না দেখে খোদা কোন দেশে অবস্থান করে তা বলা যাবে না।
খোদাকে শুধু অদৃশ্য না জেনে তাকে দেখে বিশ্বাস করাটাই হলো ঈমানের মূল। যেমন – আমরা খাবার খেয়ে থাকি এই খাবারের স্বাদ ততক্ষণই বিদ্যমান থাকে যতক্ষণ খাবারটি শেষ না হয় আর ঈমানের অবস্থানটি ঠিক বিপরীত ঈমানের স্বাদ যার ভাগ্যে গ্রহণ করা হয়েছে সেই সাধ শেষ হয় না, তা একজন মানুষকে অমরত্ব দান করে থাকে। ঐ মানুষটি দরিদ্র থেকে এই জগতের মাঝে ধনী হয়েছে। এই ধনীটা এই জগতের টাকা পয়সা দিয়ে হওয়া যায় না এই ধনী হতে গেলে মুর্শিদের প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান রাখে যারা তাঁরা হতে পারবে। কারণ, মুরিদ মানেই পরিপূর্ণ ঈমানদার নয়। তাদের অবস্থান হবে অজয়ী। যারা সর্ব অবস্থাকে জয় করে নিতে পারে তারাই পারে তরিকতের জগতে উজ্জল নক্ষত্র হতে।
এই তরিকতের জগতের মাঝে যারা নিজ বাসনাকে পরিপূর্ণ ত্যাগ করতে পারবে তারাই পারবে ঈমানদার হতে। পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়াটা সহজ ব্যাপার নয়। যেমন – মধু ও কালিজিরা খেলে ঠান্ডা জাতীয় রোগ সারে তেমনি নফস আম্মারার রোগ সারাতে হলে ধৈর্য্য ও অনুরাগ ধারণ করতে হবে। কারণ, নিজ অস্তিত্বের ভাল গুণগুলো ধারণ করেই খোদার গুণে গুণান্বিত হওয়া যায়। এই ভালো গুণ ধারণ করার নামই হলো সাধনা। তরিকতের জগতে নিজ অস্তিত্বকে স্বীকার করা মানেই শেরেকি। এই শেরেকি মনোভাব কাটাতে হবে। নিজ ঈমানকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে দ্বিধা-দ্বন্ধ, খেয়ালিপনা বাদ দিতে হবে। এই বাদ দেওয়া মন তৈরি করতে হলে গুরুর অনুসারী হতে হবে। একজন গুরুর অনুসারী হওয়া গেলে আখেরাতে শস্যক্ষেত্র তৈরি করা যাবে। গুরু হলো উর্বর জমির ন্যায়। কারণ, উর্বর জমির মাঝে যে ফসলই বপন করা হউক না কেন তার ফলন ভাল হবে। তেমনি একজন গুরুর নিকট যাওয়ার পর তাঁর নীতি আদর্শ দ্বারা নিজ দেহ জমিনকে পরিশুদ্ধ করতে পারলে একজন মানুষ রূপে এই জগত মাঝে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যাবে। এই অবস্থা তৈরী করা হলো মানব মুক্তির একমাত্র রাস্তা। কারণ, রাস্তা যখন কঠিন হয় তখন তা দ্বারা পথ চলা সহজ হয় না, আমরা মানব মনের অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তরিকতের সহজ রাস্তাকে কঠিন করে ফেলতেছি। এই জগতে গুরু ভিন্ন অন্য কিছু গ্রহন করাটা হলো মানব জনমের সব চেয়ে বড় ভুল। মনকে গুরু জ্ঞানের আলোকে নিয়ন্ত্রন করার জন্য একজন মানুষের এই জগতে আসা হয়েছে। মূল উদেশ্য এইটাই ছিল। মানব ছুরতের সাথে ছিরাতকে ঠিক করতে হবে।
শয়তান : গোপন ও প্রকাশ্য শত্রু – Spiritual Thesis
লেখক – সালমা আক্তার চিশতী

