মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৯ম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২২ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত
কবিতা – শ্রদ্ধাঞ্জলী
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
হে মাওলা, হে কবি, হে সুন্দর
ধরণীর অমৃত সন্তান, সত্যের নিশাণ বরদার
হে ঋষি, তাপস প্রবর!
কুহেলিকা যবে ফেলি মায়াজাল, আধারে ডুবায় ধরা
রুদ্ধ হিয়ার ক্রন্দন চাহে, মুক্তির মোহনচূড়া।
ব্যাথিত সকল শাপে তাপে ভরা, বসুধার সন্তানে
সাদরে করিলা গ্রহণ তাদেরে লইতে মুক্তি পানে।
হে মানব সুন্দর –
তোমার মাঝারে লভিল জগৎ, মুক্তি স্বর্গ দ্বার।
নিশার অশনি বাঁধন ছিড়িয়া হে শক্তিধর বীর
আনিলে ধরায় রবির নবযুগ, প্রভাত ভৈরবীর।
ক্রন্দনও তব বাণীরূপ ধরি, মাতালো ধুলির ধরা
মৃত্যুর পারাবারে তব দিশি দীপ বিলায় জীবন ধারা।
হে রুদ্র সুন্দর –
মুক্তি আনিলে, শক্তি আনিলে, আনিলে বারতা অনন্তের।
অনিন্দ্য স্বপন চারণে, সুরের মোহন ভূবনে, হে সুর সুন্দর
আগত শারাব আলোকনন্দায়, পীতধড়া তব প্রদীপ্ত ভাস্বর।
জোছনার মতো বিলাইলে প্রেম আপনারে করি দান
অমর প্রেমের প্রতি শাখে তাই, রইলে দীপ্তিমান।
হে সুধা সিক্ত প্রাণ বসুধার –
মহান তুমি, তব রাজটিকা, পথ হারার পথে জ্বলে অনিবার।
হে মহান চাহি তব আশীষ সুধা, দাও ভরিয়া ডালি
বঞ্চিতের তরে লিখো ভাগ্যলিখা, মোরা পথ যেনো না ভুলি
মরমের মর্মম সঁপিলাম চরণে, লহো এ শ্রদ্ধাঞ্জলী।
প্রবন্ধ – বাবরী চুল
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
হযরত মাহজুরা (রাঃ)-এর মাথার চুল এতো লম্বা ছিল যে, বসলে সেই চুল মাটিতে গিয়ে পড়তো (মাদারেজুন নবুয়ত, ৩য় খন্ড – ১২৭ পৃষ্ঠা)। হযরত মাহজুরা (রাঃ)-এর মাথার চুল খুব সুন্দর ছিল। রাছুলপাক (সাঃ) প্রায়ই তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, মাহজুরার চুলগুলো খুব সুন্দর। রাছুলপাক (সাঃ) এর হাতের স্পর্শ কে বিশেষ বরকতময় মনে করে তিনি আর মাথার চুল কাটতেন না। তাই চুলগুলো এতো লম্বা হয়েছিল যে, বসলে তা মাটিতে গিয়ে পড়তো। তা নিশ্চয়ই রাছুলপাক (সাঃ) দেখেছেন। তিনিতো বলেননি, মাহজুরা! তোমার মাথায় এতো লম্বা চুল কেনো? এতো লম্বা চুল রাখা তো জায়েজ নেই? হ্যাঁ, নবী করিম (সাঃ) যদি মাদ্রাসায় পড়তেন তবে হয়তো অজ্ঞ-মূর্খদের মতো নাজায়েজ ফতোয়া’ই দিতেন ! কিন্তু তিনি তো ইলমে এলাহীর অধিকারী, নূরে মুজাস্সাম, জাতে এলাহীর মোজহার, খোদার কালাম আর তাঁর কালাম ঐক্যতায় স্থিত (ওয়ামা ইয়ান্তেকু আনিল হাওয়া) বিধায় তিনি ফতোয়াবাজি করেননি, নিজেও বাবরী চুল রেখেছেন এবং যারা বাবরী চুল রেখেছে তারা যেন তা যত্ন করে রাখে তার নির্দেশও দিয়েছেন।
রাছুলপাক (সাঃ) এর হুকুম/নির্দেশ কে ঈমানদারগণ ওয়াজিব বলেই জানেন-মানেন, কাফের-মুনাফেকেরা তার বিপরীত আকিদা পোষণ করবে নিশ্চয়ই। সেজন্যই আহাম্মক-বেকুবেরা তা অবজ্ঞা করে। ওরা নবীজি (সাঃ), তাঁর পবিত্র আহলে বাইয়্যেত এবং ওলী-আউলিয়াদের বিরোধীতা করে নিজেদের আখেরাতকে ধ্বংস করে চলছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হলেন মক্কায় ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবী। মক্কায় যে ছয়জন প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন তার মধ্যে তিনি হলেন ষষ্ঠতম। তিনি হযরত ওমর (রাঃ) এর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মদিনায় তিনি মসজিদে নববীর পশ্চাতে বাস করতেন এবং তাঁকে ও তাঁর মাকে এতো ঘন ঘন রাছুলুল্লাহ (সাঃ) এর গৃহে যাতায়াত করতে দেখা যেতো যে, অপরিচিত লোকেরা তাদেরকে রাছুলুল্লাহ (সাঃ) এর পরিবারভুক্ত বলেই মনে করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ নবীজি (সাঃ) এর জুতা, মিস্ওয়াক, শয্যা ইত্যাদি বহন করতেন। সে হিসেবে তিনি নবীজি (সাঃ) এর বিশেষ সেবক ছিলেন। বাহ্যিক চালচলনে তিনি নবীজিকে অনুকরণ করতেন। রাছুল (সাঃ) এর সেবক আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) এর চুল মোবারক ছিল অনেক দীর্ঘ-লম্বা এবং গায়ের রং ছিল লোহিত বর্ণের (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ২ খন্ড-১৩৮)।
“আচ্ছাওয়াইকুল মুহরিকা” নামক কিতাবে বর্ণিত আছে যে, যখন সাইয়্যেদেনা ইমাম আলী রেজা (আঃ) নিশাপুরে আগমন করেন তখন তাঁর চেহারা মোবারক একটি পর্দা দ্বারা ঢাকা ছিল। হাফেজে হাদিস ইমাম আবুযর আর রাজী, ইমাম মুহাম্মদ বিন আছলাম তুসী প্রমুখ এবং তাদের সাথে আরো অসংখ্য জ্ঞানী-গুণী হাদিসের শিক্ষার্থী এসে তাঁর নিকট উপস্থিত হন এবং জোরালো আবেদন করেন ‘আপনার চেহারা মোবারক আমাদের প্রদর্শন করুন।’ ইমাম রেজা (আঃ) তাঁর বাহন থামালেন এবং সেবকদেরকে পর্দা সরাতে আদেশ দিলেন।
পর্দা সরানোর সাথে সাথে জনতার অবস্থা এমন হলো যে, কেউ হর্ষধ্বনি করছিল, কেউ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিল, কেউ মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিল আবার কেউ বাহনের খুর চুম্বন করছিল। তাঁর রূপ-সৌন্দর্য্য অবলোকন করে জনতার চক্ষু শীতল হলো। এ সময় দেখা গেল, তাঁর পবিত্র স্কন্ধ মোবারকে দুই গোছা লম্বা চুল ঝুলছিল। এ ঘটনাটি ‘মমতাজুল ফাতাওয়া’ কিতাবের ৭৮ পৃষ্ঠাতেও বর্ণিত আছে। অন্য একটি বর্ণনা হতে জানা যায় যে, তাঁর পবিত্র কাঁধ মোবারকে লম্বা চুলের দু’টি বেণী ঝুলছিল। মূলতঃ দু’টি কথারই মূল হলো তাঁর মাথায় লম্বা/বাবরী চুল ছিল। হযরত সাইয়্যেদ মুহাম্মদ গেসু দারাজ (রাঃ) এর রচিত ‘রূহে তাসাউওফ’ কিতাবের শুরুতেই বলছেন, ‘তৎকালীন সময়ে সাইয়্যেদ’দেরকে অর্থাৎ মাওলা আলী ও হযরত ফাতেমা (আঃ) এর বংশধরগণকে ‘লম্বা চুলওয়ালা’ বলেই সবাই সম্বোধন করতো। যেহেতু নবীজি (সাঃ) এর আহলে বাইয়্যেতের মর্যাদা সৃষ্টির ভিতর কারো সাথে তুলনা চলে না, সেহেতু ঈমানদারগণ, ওলী-আউলিয়া, ফকির- দরবেশগণের পক্ষ হতে এক বিশেষ সম্মানসূচক উপাধি হলো ‘লম্বা চুলওয়ালা’। কারণ, তাদের মাথায় লম্বা চুল থাকতো। তাদের সম্মানার্থেও ফকির-দরবেশ, ওলী-আউলিয়া বা তাদের অনুসরণকারীগণ স্বীয় মস্তকে লম্বা চুল রাখতেন। রাছুলপাক (সাঃ) বলেন, “যে যে সম্প্রদায়ের অনুসরণ/মহব্বত করবে সে সম্প্রদায়ের সাথেই তার হাশর হবে।” হাশরের দিন নিরানব্বই ভাগ রহমতের অধিকারী হবেন আল্লাহর ওলীগণ (তাফসিরে মাযহারী)। তাদের অনুসারীগণই প্রথমে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
আল্লামা আবদুর রহমান জামী (রহঃ)-এর বিখ্যাত ‘শাওয়াহেদুন-নবুয়ত’ কিতাবের ৬৮ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, হযরত মুগীরা ইবনে শো’বা (রাঃ) আলেকজান্দ্রিয়ার পাদ্রীর ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, আমি হুজুর (সাঃ) এর আবির্ভাবের সময়কালে তায়েফের ব্যবসায়ীদের একটি দলের সাথে আলেকজান্দ্রিয়ায় গেলাম। সেখানে একজন বড় পাদ্রী ছিল। সে সর্বদা ইবাদতে মশগুল থাকতো। লোকজন তাদের রোগীদেরকে তার কাছে নিয়ে যেতো এবং সুস্থ হওয়ার জন্য দোয়া চাইতো। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, পয়গাম্বরগণের মধ্যে কেউ কি বাকি আছে ? সে বললো, হ্যাঁ, একজন বাকি আছেন এবং তিনিই হবেন সর্বশেষ পয়গম্বর। তাঁর ও ঈসার (আঃ) এর মাঝখানে সময়কাল খুবই কম হবে। তিনি না দীর্ঘদেহী, না বেঁটে হবেন এবং না অত্যাধিক শ্বেতকায় হবেন, না কালো। তাঁর চোখে লালিমা থাকবে এবং মাথার কেশ লম্বা হবে। জানা দরকার রাছুলপাক (সাঃ) এর বংশধরদের উপাধি হলো ‘লম্বা চুলওয়ালা’ (ইসলামী বিশ্ব কোষ-২য় খন্ড)। নবীজির কেশ মোবারক, জামা মোবারক, তাঁর হাতে লাগানো গাছের ফল, মুখের লালা, খাকে শেফা, প্রশাব, তাঁর রঁওযার মাটি ইত্যাদি রোগমুক্তি এবং আখেরাতের মুক্তির উছিলাস্বরূপ সাহাবাগণ ব্যবহার করতেন। রাছুলুল্লাহর চুলের বরকতেই মহাবীর খালেদ একাধিক রাজ্য জয় করেছেন। যুদ্ধের সময় ঐ চুল তার পাগড়ীর নিচে থাকতো।
নবীজি (সাঃ)-এর চুল মোবারককে সাহাবাগণ দুনিয়া ও তন্মধ্যে যতো কিছু আছে তার চেয়েও অধিক প্রিয়-পবিত্র, বরকতময় মনে করতেন (বোখারী)। আল্লাহর ওলীদের ব্যবহৃত জিনিস-পত্রও ভক্ত-মুরিদানদের জন্য রোগমুক্তি, আখেরাতের মুক্তির জন্য উছিলাস্বরূপ। ফেরাউন-নমরুদের দলেরা কোনোকালেই তা স্বীকার করে নেয়নি। বিস্তারিত জানার জন্য পড়তে পারেন ‘অন্ধের পথ প্রদর্শন’ বইটি। সুতরাং সাধক-পীর-ফকির-দরবেশদের দীর্ঘ/লম্বা চুলও সেই নূরে মুজাচ্ছাম হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুল (সাঃ) এর নূরী চুলেরই প্রতিবিম্ব/প্রতিরূপ। যারা পীর-ফকিরদের লম্বা চুল বা বাবরী দেখে ঘৃণা বা অবজ্ঞার দৃষ্টিতে কথা বলে তারা প্রকারান্তরে রাছুলুল্লাহ (সাঃ) এর লম্বা কেশ মোবারককেই ঘৃণা বা অবজ্ঞা করে। এ ধরনের কাজ স্পষ্ট কুফুরী। কুফরীতে কায়েম থাকলে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, রাছুলপাক (সাঃ) লম্বা চুলকে যত্ন করে রাখার হুকুম দিয়েছেন। আর রাছুলুল্লাহর হুকুম পালন করা ওয়াজিব। কখনো কখনো দেখা যায়, সৌদি রাজতন্ত্রের (যদিও বর্তমানে তাদের আকিদায় কিছুটা ভিন্ন মোড় নিয়েছে) দালাল ও লেবাছধারী মোল্লা-মুফতিরা দ্বীনে মুহাম্মদী তথা তরিকতপন্থীদের চুল নিয়ে ফতোয়াবাজির ডিগবাজি খেলছে এবং তাদের চুল কর্তনের জন্য নাপিত সেজে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে থাকে। এরা মূলতঃ ওহাবী কওমী-খারেজী, জামায়াত ও অন্যান্য মৌলবাদী গোষ্ঠীসমূহের লোক। তাদের মধ্যে সবচেয়ে যে জিনিসটির অভাব তা হলো লজ্জা-শরম। সেজন্য তারা সাধক পীর- ফকিরদেরকে অনেক জায়গায় অপমান-অপদস্থ করে থাকে বা চুল, দাঁড়ি- গোঁফ ধরে টানাটানি করে থাকে। ফরিদপুরের এক মাহফিলে লালন অনুসারীদের চুল-গোঁফ-দাঁড়ি নাপিত বেলেহাজ আলেম-মোল্লা এবং তাদের দালালরা কর্তন করে দিয়েছিল, পরে আবার প্রশাসনের চাপে পড়ে মাফও চেয়েছিল। এইতো ২৩শে সেপ্টেম্বর ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা গেল গাজিপুর জেলার ১৬/১৭ বৎসরের এক বাউল সঙ্গীত শিল্পীর বাবরী চুল কয়েকজন নাপিত (ধর্ম সন্ত্রাসী) কেটে দিয়েছিল। পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতারও করেছে। ইহাই একদল মোল্লা-মুফতি এবং তাদের অনুসারীদের চরিত্র। ওরা মানুষ মাত্রই নয়, মানব সুরতে পশু মানে নরপশু। পশুত্ব তথা অসুরত্বই তাদের চরিত্র। তাদেরকে চিনতে পারাটাও আল্লাহপাকের বিশেষ দয়ার মধ্যে একটি দয়া। কোরান মতে দেখা যায় চুল ধরে টানাটানি করাটা কোরান বিরোধী কাজ। সুরা ত্বোহা-র ৯৪ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, (হারুন নবী তাঁর ভাই মুছা নবীকে বলছেন), “ক্বালা ইয়াবনাউম্মা লাতা’খুয্ বিলিহ্ইয়াতী ওয়ালা বিরা‘সী, ইন্নি খাশীতু আন তাকূলা র্ফারাক্বতা বাইনা বানী ইসরাঈলা ঈলা ওয়ালাম তারকুব কাওলী।” অর্থাৎ (হারুন বললো) হে আমার সহোদর। শ্মশ্রু/দাঁড়ি ও কেশ ধরিও না, আমি শংকিত ছিলাম যে, তুমি বলবে, তুমি বনী ইসরাঈলদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ এবং তুমি আমার বাক্য মাননি। এরপরও ৪২০ নম্বর তথাকথিত আলেম-মোল্লাগণ তরিকতপন্থীগণের বা ঈমানদারগণের চুল কর্তন করার জন্য অনেক স্থানে জোর-জুলুম এমনকি দল পাকিয়ে আক্রমণ করতে দেখা যায়। দেখতে যেন সঙ্গবদ্ধ হায়েনার দল। আসলেই যদি ওরা মুসলমান হয়ে থাকে তবে কখনো কোরান বিরোধী কাজ বা রাছুলপাক (সাঃ) যা নিজেই করেছেন, তা যত্ন করে রাখার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন তার বিরোধীতা করতে পারতো না।
তাছাড়া লম্বা গোঁফ, মোচ রাখার বহু নজীর নবী-রাছুল এবং আল্লাহর ওলীদের পক্ষ হতে দলিল রয়েছে। মাওলানা কাতাদাতা ছেলেদের দ্বারা একজন ফকিরের (বু’আলী কলন্দরের) বড় গোঁফ কাটতে গিয়ে তার সাত ছেলেরই মৃত্যু হয়েছিল। আরেক তথাকথিত আলেম নামক জালেম এক ফকিরের গোঁফ কাটতে গিয়ে দেখলো ঐ ফকিরের মোঁচ আল্লাহর আরশের পায়া পেঁচিয়ে রয়েছে। আবার রাছুলপাক (সাঃ)-এর সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে অনেকে দাঁড়ি মোঁচও রাখতো না। যেমন, হযরত কায়েস, আবদুল্লাহ বিন জোবায়ের, কাজী শুরাইহ্, আহনাফ (রাঃ) প্রমুখ সাহাবাদের মুখে কোনো দাঁড়ি মোঁচ ছিল না। তন্মধ্যে হযরত কায়েস (রাঃ) ছিলেন খুব সুন্দর চেহারার লোক (আসমাউর রেজাল-১৮৭, বঙ্গানুবাদ) এবং তিনি মদিনার আনসারী সাহাবী ছিলেন। তিনি ছিলেন সূক্ষ্ম চিন্তা সম্পন্ন, বুদ্ধিমান ও রণ কুশলী সমর যোদ্ধা। এ ব্যপারে যারা জোর-জুলুম করে তারা নিশ্চয়ই জালেম। জালেম কখনো মুসলমান হতে পারে না, তাদের বাসস্থান জাহান্নামে (কোরান দ্রঃ)। হযরত ইমাম গাযযালী (রাঃ) এর মাথায়ও লম্বা কেশ মোবারক ছিল। বিখ্যাত ওলী হযরত নাসিরুদ্দীন চেরাগে দেহলবী (রাঃ) এর পালকী বাহক হযরত গেসু দারাজ (রাঃ) এর চুল এতো লম্বা ছিল যে, তা পায়ের হাটুর নিচ পর্যন্ত চলে যেতো। ‘গেসু’ অর্থ চুল আর ‘দারাজ’ অর্থ লম্বা যখন তিনি পালকী বহন করতেন তখন ঐ চুল মোবারক পালকীর পায়ে জড়িয়ে যেতো। তাতে তাঁর গুরু/মুর্শিদ হযরত নাসিরউদ্দিন চেরাগে দেহলী (রাঃ) খুশী হয়ে বলতেন, গেসু দারাজ শুধু নিজেই পীরের খেদমত করে না, তাঁর মাথার চুলও পীরের খেদমত করে (মাওলানা মজিবুর রহমান রচিত ‘তাজকেরাতুল আউলিয়া’ ৫ম খন্ডের ১৩৮পৃষ্ঠা, ‘রূহে তাসাউফ’- শুরুতেই বর্ণিত আছে)।
হযরত গেসু দারাজের মুর্শিদ হযরত খাজা নাসিরউদ্দিন মাহমুদ চেরাগে দেহলী (রাঃ) এর ওফাত লাভের সময় তাঁর ভাগিনা শেখ কামালউদ্দিন এবং শেখ রুকুনুদ্দীন বেরুনীকে বললেন, চিশতীয়া খান্দানের পূর্বকালের পীর-মুর্শিদগণের যে সমস্ত নেয়ামত আমার নিকট গচ্ছিত ছিল, উহা হতে যে যা প্রাপ্য আমি তাকে তা দিয়েছি। তোমাদের প্রতি আমার নির্দেশ হলো যে, “আমার ওফাত লাভের পর আমাকে সমাধিতে রাখা হলে আমার খেরকাটি আমার সীনার উপর, কাষ্ঠ পাত্রটি মাথার নীচে, তসবীহ ছড়াটি আমার আঙ্গুলের ফাঁকে, কাষ্ঠের খড়ম জোড়া এক পার্শ্বে এবং লাঠিটি অপর পার্শ্বে রেখে দিও।” হযরত গেসু দারাজ তাঁর পীরের খেরকা না পেয়ে যে চার পায়ার উপর তাকে গোসল করানো হয়েছিল সে চার পায়ার বানা হতে রশি খুলে তা নিজের গলায় ঝুলিয়ে বললেন, ‘ইহাই হযরত শেখের নেয়ামতস্বরূপ আমার খেরকা।’ এ বলে দাক্ষিণাত্যের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। দাক্ষিণাত্যে যাবার পথে উক্ত রশি হতে সামান্য যার গলায় পড়িয়ে দিয়েছেন, তিনিই ওলীআল্লাহ হয়ে গিয়েছেন।
হযরত সাইয়্যেদ মুহাম্মদ গেসু দারাজ (রাঃ) ২২ বৎসর গুলবর্গায় অবস্থান করেন এবং ৮২৫ হিজরীর ১৬ই জিলক্বদে ওফাত লাভ করেন। সুলতান আহমাদ শাহ্ বাহ্মানী হযরত গেসু দারাজের খুব ভক্ত ছিলেন। তিনি হযরত গেসু দারাজের মাজার শরীফে অনেক বড় গম্বুজ তৈরী করেন এবং মাজার শরীফের দেয়ালের গায়ে সোনালী হরফে পূর্ণ ত্রিশ পারা কোরান মজিদ লিখিয়ে দেন। গম্বুজের গায়েও স্বর্ণ খচিত বহু নক্শা করিয়েছিলেন। দিল্লীর একজন খ্যাতিমান আলেম নাসিরুদ্দিন তার প্রথম জীবনে কোনো বুযুর্গ লোককে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন না। শেষ বয়সে তিনি হযরত গেসু দারাজের নিকট বায়াত হলে তার ওস্তাদ তা জানতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলো, আপনি শ্রেষ্ঠ আলেম হয়ে গেসু দারাজের নিকট মুরিদ হলেন কেনো ? তখন মাওলানা নাসিরুদ্দিন উত্তর দিলেন, ‘আমি আগে শুধু আলেমই ছিলাম, এখন হযরত গেসু দারাজের হাতে বায়াত হয়ে মুসলমান হয়েছি। বুঝা গেল যতো বড় আলেমই হোক না কেনো বায়াত না হলে সে মুসলমান হতে পারবে না, বুঝতে হবে সে ঈমানদারই নয়- ইহাই কোরানের নির্দেশ (মজিবুর রহমান রচিত ‘তাজকেরাতুল আউলিয়া’-১৪৩ পৃষ্ঠা)।
হযরত সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী দাতা গঞ্জে বখ্স হাজবেরী (রাঃ) এর রচিত বিখ্যাত ‘কাশফুল মাহজুব’ কিতাবের ১১২ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, আশেকে রাছুল (সাঃ) এবং খলিফায়ে মাওলা আলী হযরত ওয়ায়েছ করণী (রাঃ) এর (তাঁর গুরু মাওলা আলী আ.) কেশ মোবারক অনেক দীর্ঘ ছিল। অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি তাঁর লম্বা কেশ মোবারক মাথার তালুতে মুঠির মতো পেঁচিয়ে রাখতেন। তাঁর এ দীর্ঘ চুলের কথা রাছুলপাক (সাঃ) নিজেই হযরত ওমর (রাঃ) এবং মাওলা আলী (আঃ) কে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি কোনো মানুষজনের সাথে সংশ্রব রাখতেন না, সর্বদা নির্জনে বাস করতেন।
রাছুলপাক (সাঃ) বলেন, “মান ইস্তার ছাল শারাহু ফি কেফাহা হুশেরা লাহু ইয়াও মা কিয়ামাতে মাআল মুহছেনীন।” অর্থাৎ যে লোক নিজের মাথায় চুল পিছনের দিকে লম্বা করে ছেড়ে দিবে কিয়ামতের দিন নেককারদের সাথে তার হাশর হবে (রূহে তাসাউওফ-৭২ পৃষ্ঠা)।
উক্ত হাদিসটি সম্পর্কে মাহবুবে এলাহী হযরত খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রাঃ) বলেন, এ হাদিসটির শুদ্ধতা প্রমাণিত। আমি নিজে এ হাদিসটি কারো নিকট হতে শুনিনি। বরং স্বয়ং হুজুর (সাঃ) এর জবান মোবারক হতে আমি শুনেছি। আল্লাহর ওলীদের পক্ষ হতে তা অবশ্যই সম্ভব, তার বহু নজীরও রয়েছে।
সাধক পীর-ফকিরগণ নির্জন বা একাগ্রচিত্তে অধিক কাল সাধনায় থাকাটাও তাদের চুল গোঁফ/মোচ লম্বা হওয়ার একটি কারণ। এ সম্পর্কে দলিলাদী ধর্মীয় কিতাবসমূহে এবং ইতিহাসে সাবেত আছে। ওলী-আউলিয়া বা ফকির, দরবেশ , সুফি সাধকগণের ক্রিয়া-কর্ম রাছুলপাক (সাঃ) এর নবুয়ত ও বেলায়েতের আলোকেই সম্পন্ন করেন এবং তারা যা বলেন তা-ই একমাত্র পতিত মানবজাতির বাস্তব মুক্তির বিধান এবং তাদের নির্দেশিত পথই হলো শরীয়ত, তাদের মুখের কথাই হলো ঐতিহাসিক বাস্তব দলিল। তাদের নিকট দলিল চাওয়া যায় না। যেমন রাছুলের কালামের বিরুদ্ধে কোনো ঈমানদার কখনো দলিল প্রমাণ চায়নি, দলিল-প্রমাণ চাওয়া ঈমানের দূর্বলতার প্রমাণ। যারা চেয়েছে তারা ছিলেন কাফের-মুনাফিক। তেমনি আল্লাহর ওলীদের নিকট হতেও দলিল-প্রমাণ চাওয়া যায় না, তাহলে ঈমানের দূর্বলতার প্রমাণ সাব্যস্ত হবে। কোরানে বর্ণিত হযরত মুসা ও খিজির (আঃ)-এর ঘটনা মধ্যেও তার নজীর রয়েছে। যারা সত্যিকারের ঈমানদার/ভক্ত/মুরিদান তারা কখনো কোনো মতেই গুরুর নিকট সত্যতার দলিল প্রমাণ চাইতে পরে না বা তাদের কালামের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কোনো মোল্লা-মুফতির নিকট জিজ্ঞাসা করবে না।
সুরেশ্বর দরবারের আদি পীর হযরত জান শরীফের প্রণীত ‘জামে হক জামে নূর’ কিতাবে বর্ণিত আছে, ভারতের বিখ্যাত সাধক হযরত বু-আলী কলন্দর (তাঁর তরিকার আকিদা আলেম-মোল্লাদের আকিদার বিরোধী কাজ করা) বাকাবিল্লাহ প্রাপ্ত মোকামে মাহমুদায় স্থিত ছিলেন, মজনু-মজ্জুব হালরত অবস্থায় তাঁর দাঁড়ি, চুল, গোঁফ মাত্রাধিক লম্বা হয়ে গিয়েছিল। তাতে একদল অন্ধ-বধির আলেম-মোল্লাগণ তাঁর গীবত-নিন্দা, ফতোয়াবাজির ডিগবাজি খেলতে শুরু করলো। এ সংবাদ আলেম- মোল্লাদের নিকট হতে শুনে ধর্ম ব্যাপারী নগরের কাজী তেলে-বেগুণে জ্বলে উঠলো এবং অনন্তর তাঁর লম্বা দাঁড়ি, চুল, গোঁফ কাটার জন্য নির্দেশ দিলেন। কিন্তু কেহ সাহস করে রাজি হয়নি বিধায় কাজী সাহেব নিজের ছেলেদেরকে পাঠালো ফকিরের লম্বা চুল, দাঁড়ি-গোঁফ কাটার জন্য। বু-আলী কলন্দর শাহ্র লম্বা চুল, দাঁড়ি, গোঁফ কাটতে গিয়ে কাজীর তিন ছেলেই মৃত্যুবরণ করে। তাতে কাজী সাহেব আরো অগ্নিশর্মা হয়ে নিজেই লম্বা মোচ কাটতে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে মোচ হতে রক্ত প্রবাহিত হতে শুরু করলো। তা দেখে কাজী সাহেব ভয়ে কম্পমান হয়ে মোচ কাটা বন্ধ করে দিলেন। তখন হযরত বু-আলী কলন্দর (রাঃ) বললেন, ‘হে বেকুফ! কাজী! তোর মতো কুকুরের মোচ-গোঁফ আমার নয়। আমার গোঁফ-মোচ খোদার জিকিরে মশগুল থাকে। এরপর কাজী সাহেব বু-আলী কলন্দর সাহেবের নিকট নতশীরে চরণে ক্ষমা চেয়ে মুক্তি লাভ করেন। কলন্দরী তরিকার নিয়ম হলো ওরা দাঁড়ী-মোচ-চুল মুন্ডন করে ফেলে, নয়তো তা আর কখনো কাটেই না। বড় বড় চুল-দাঁড়ি গোঁফ রেখে থাকে। ইলমে মারেফাতের দেশে প্রচলিত শরীয়তের আইন অকেজো-অচল। ঠিক তেমনি ইলমে মারেফাতের দেশের বিধি-বিধান শরীয়ত শাস্ত্রে অচল-অকেজো। কারণ, ইলমে শরীয়তের কালাম মুতাশাবেহাতের অন্তর্ভূক্ত আর ইলমে মারেফাতের কালাম মুহকামাতের অন্তর্ভূক্ত। যে ইলমে মারেফাত অর্জন করেনি তার শরীয়তের ইলেম কোনো কাজেই আসবে না। অপর দিকে দ্বীনে মুহাম্মদী বা দ্বীন ইসলামের শরীয়ত হলো খোদাকে চিনার মূল ভিত্তি, ইসলামের মধ্যে এ শরীয়তই হলো প্রধান বিষয়। শরীয়তের মধ্যেই আল্লাহ খোদাস্বরূপ মূর্তমান-বর্তমান বিধায় উম্মতে মুহাম্মদীগণ খোদাকে দেখেই ছালাত কায়েম করছে (আচ্ছালাতু মেরাজুল মুমিনীন)। ইলমে মারেফাতের দেশে একমাত্র পুরুষগণই বিহার করতে পারেন এবং তাদের অনুসারীগণ সে দেশের যাত্রী।
ধর্ম ব্যাপারী কাঠ মোল্লা-মুফতিরা শুধু ধর্মীয় শাস্ত্র-পুথি আওড়িয়েই ধর্মজ্ঞানী সেজেছে। এ এক ধরনের তোতা পখির শিখানোর বুলির মতো। কিন্তু তার নিগূঢ় রহস্য উপলদ্ধি করতে পারেনি। এ ধরনের বিদ্যা পরকালে কোনো কাজেই আসবে না-এ বুঝ-জ্ঞানটুকুও যদি তাদের মধ্যে জাগতো তবে হয়তো শুভবুদ্ধির উদয় হতো। যার ইলমে মারেফাত জানা নেই সে তো আলেমই নয় ! আশ্চর্য যারা আরবী ভাষার পন্ডিত হয়ে তিন কুড়ি তেরটি টাইটেল গলায় ঝুলিয়ে অহংকার অহমিকায় আকণ্ঠ ডুবে আছে, তারা কিন্তু ‘আলিফ’ অক্ষরটির ভেদও জানে না। তাদের ওয়াজ নামক আওয়াজের উচ্চ চিৎকারে রাস্তা-ঘাট, হাট-মাঠ গরম করে তুলছে। মূল উদ্দেশ্য জনতাকে উত্তেজিত করে বড় বড় মাওলানা, মুফতি, মুহাদ্দেস, মুফাচ্ছের, জেহাদি ইত্যাদি বলে নিজেকে তুলে ধরা, প্রচার করা আর টাকা কামাই করার ফন্দি-ফিকির করা। তাতে নানা রকম দ্বন্দ্ব-বিভেদ সৃষ্টি করে ইসলামকে সাম্প্রদায়িকতার ভিতর আবদ্ধ করে মুসলিম সমাজকে ধ্বংসের এক অন্ধকার গহ্বরে নিক্ষেপ করছে। এরাই ইসলামের বারোটা বাজিয়ে চলছে। দ্বীনে মুহাম্মদী বা দ্বীন ইসলামের মধ্যে শরীয়ত এবং মারেফাত অবিচ্ছিন্নাবস্থায় আছে। দ্বীনে মুহাম্মদীর মধ্যে শরীয়তই সবার বড়, শরীয়তের উপরই তরিকত, হাকিকত, মারেফাত এবং অহেদানিয়াত। কিন্তু তথাকথিত মুসলিম সমাজ সে শরীয়ত হতে বিস্মৃত আছে। যা আছে তা তাদের মনগড়া শরীয়ত। এ শরীয়ত বাকি চার রাহা হতে বিচ্ছিন্ন বিধায় ইহা শরীয়তই নয়। ইসলামের মধ্যে শরীয়তই প্রধান বিষয় এবং শরীয়তেই আল্লাহ খোদা হয়ে মূর্তমান-চিরবর্তমান।
হাদিস হতে (মুসলিম) জানা যায় রাছুল (সাঃ) বলেন, “ইন্নাল্লাযিনা লা ইয়ানজিরু ইলা সওয়ারিকুম ওয়ালা ইলা আমালিকুম, ওয়া লাকিন ইয়াজুরু ইলা কুলুবিকুম নিয়াতিকুম।” অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহপাক তোমাদের বাহ্যিক এবং তোমাদের আমল দেখেন না। তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর এবং নিয়ত। তাই অপর একটি হাদিসে বলা হচ্ছে, ‘ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়াত।’ অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমল নিয়তের উপর। বিচার হবে নিয়তের, কর্মের নয়। শুদ্ধ নিয়তের ছোয়াব সাথে সাথেই পেয়ে যায়, তা বাস্তবায়ন না হলেও। সুতরাং যারা লম্বা চুল-গোঁফ ইত্যাদি রাখে অথবা রাখে না, তারা যার যার নিয়তানুসারেই তার ফল পবে। লম্বা চুল-গোঁফ দেখলে যাদের মধ্যে এলার্জির চুলকানি উঠে, পশুত্ব-অসুরত্বের চরিত্রটি প্রকাশ পায় তারা পশুই- যদিও মানব সুরতের আড়ালে বাস করছে। তাদের মধ্যে রয়েছে অনেক পশুর লেজ, শিং, বিষাক্ত দাঁত। যখন যে লেজটি নড়েচড়ে উঠে তখন সে পশুর মতোই আচরণ করতে থাকে। মানবরূপ পশুগুলো দ্বারাই পীর-ফকির, সুফি, দরবেশ এবং তাদের অনুসারীগণ আক্রান্ত হচ্ছে যুগে যুগে। এরা কখনো কোনো কালেই গুরুকে স্বীকার করে নেয়নি। তাদের দেহ ত্যাগের সাথে সাথেই সুরত বদল হয়ে যাবে (সুরা রহমান দ্রঃ)।
মূলতঃ লম্বা চুল, গোঁফ, দাঁড়ি রাখা প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত বিষয়। এখানে ফতোয়াবাজি করা অজ্ঞতা-মূর্খতারই নামান্তর। মানব মুক্তির বিধান মানব ধর্ম ইসলাম (নফস মুৎমাইন্নাহর অধিকারী হওয়া) কখনো ধর্মের নামে জোর-জুলুম স্বীকার করে না (লা ইকরাহা ফিদ্দ্বীন)। কিন্তু আলেম-মোল্লা-মুফতিরা জোর-জুলুম করবে, ফতোয়াবাজি করবে। তাদের অহংকার-অহমিকাপ্রসূত মতলবটিকে কোরানের দোহাই দিয়ে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিবে, তাতে কার্য সিদ্ধি না হলে পশুত্বের চরিত্রটির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করবে ; ফেরকাবাজির ডিগবাজি খেলতে শুরু করবে। এ ধরণের লোকগুলোই হলো জালেম।
কোরানের বিধান মতে কোথাও লম্বা চুলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আসেনি, দাঁড়ি রাখার বিষয়েও কিছু আসেনি, আসতে পারে না। কারণ, মানব মুক্তি বিধান মানব ধর্ম বা দ্বীন ইসলামের মূল বিষয় এখানে নয়। রাছুল (সাঃ) বলেন, “আল ইসলামু দ্বীনুল ফেৎরাত।” অর্থাৎ ইসলাম হলো স্বভাব ধর্ম। খান্নাছমুক্ত স্বভাবের অধিকারী মানুষটিই হলো মুসলমান। ভক্ত/মুরিদান/সাধক/আমানুগণের উপর নির্দেশ হলো এ শয়তান বা খান্নাছের অনুসরণ না করা (কোরান দ্রঃ)। এর মধ্যে কোনো জাতি বর্ণ গোত্র নেই। যে মানুষই শয়তান বা খান্নাছ/ইভিল/নারদ মুক্ত হয়েছে সে-ই খাঁটি মুসলমান বা হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান। এখানেই কালেমার মূল মন্ত্র-শিক্ষা। অজ্ঞ-মূর্খরা ভেদ না বুঝে মানব জাতির মধ্যে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, মারামারি করছে, দ্বন্দ্ব-বিভেদ, সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে চলছে, ইহা কোরান বিরোধী কাজ। ইহাই হলো শয়তানের কর্ম এবং ধর্ম। এরা কখনো এক হতে পারে না বিধায় এরা ‘হিজবুশ্শায়াতিন।” এ ধরনের ‘হিজবুশ্শায়াতিনদের’ মধ্যে দ্বীন ইসলাম বা দ্বীনে মুহাম্মদীর তাবলিগ করতে হবে যেন তারা ইসলামে দাখেল হয়ে মুসলমান হয়ে যায়। ‘হিজবুশ্শায়তিনদের’ মধ্যে মৌলবী ইলিয়াছের খোয়াব নামা তরিকা ‘তাবলিগ জামাতকেও’ দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে ইসলামে দাখেল করতে হবে। কারণ, ওরা প্রতারক, চরমভাবে পথভ্রষ্ট।
দ্বীন ইসলাম বা দ্বনে মুহাম্মদীর তাবলিগ আর মৌলবী ইলিয়াছের প্রবর্তিত তাবলিগের মধ্যে রয়েছে আসমান-জমিন প্রভেদ। দ্বীন ইসলামের তাবলিগের মূল আল্লাহপাক এবং তাঁর হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুলের প্রতি নাযিলকৃত ওহী। আর মৌলবী ইলিয়াছের তাবলিগ জামাতের মূল ইলিয়াছ নিজেই এবং তার প্রচারিত তাবলিগের ভিত্তি হলো খোয়াব/স্বপ্ন। দ্বীনে মুহাম্মদীতে পাঁচ উছুল আর ইলিয়াছের প্রবর্তীত তাবলিগের মধ্যে হলো ছয় উছুল/ভিত্তি/স্তম্ভ। একটির মূল আল্লাহপাকের ওহী আর অপরটি সাধারণ এক মৌলবীর খোয়াব/স্বপ্ন। সেজন্যই মৌলবী ইলিয়াছের ‘তাবলিগ জমাত’ যারা আছে (যা শয়তানের ধর্ম) তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে হবে যেন তারা প্রতারণার আশ্রয় ছেড়ে দ্বীন ইসলামের দখেল হয়ে ‘হিজবুল্লাহ’তে দাখেল হয়ে আখেরাতে মুক্তি লাভ করতে পারে।
প্রবন্ধ – গোপন ও প্রকাশ্য শত্রু
লেখক – সালমা আক্তার চিশতী
জালাল উদ্দিন খাঁ বলছেন –
“মানুষ থুইয়া খোদা ভজো
এ মন্ত্রণা কে দিয়েছে?
মানুষ ভজো, কোরান খুঁজো
পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে।”
এই কথার ভেদ-রহস্য রয়েছে। কারণ, ভেদ উন্মোচন করার মাঝেই রয়েছে কোরানের মূল মর্ম। আধ্যাত্মিক ভেদ-রহস্য যারা জানে তারা আলিফ, লাম, মীম আসলে কি তা তারা বুঝে। আলিফ দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে, লাম দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে আর মিম দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে তা জানাই হলো কোরানের মূল ভেদ জানা। আলিফ এর ভেদ না জানা থাকলে নিজ অস্তিত্বের মাঝে খোদা রয়েছে তা জানা হবে না। কারণ, একজন মানুষ জীবিত থাকে এই আলিফের দ্বারা। লাম দ্বারা এই দেহ-ঘর নূরে নূরান্বিত হয়। আর মিম হলো মূল অস্তিত্বের প্রকাশ ও বিকাশ। কোরানের সাথে একজন মানুষ এক সুতায় বাধা কারণ, কোরানের ভেদ বিষয় জানার একটাই পথ তা হলো একজন কামেল মানুষ। একজন চেতন মানুষ হলো কোরানের মূল ভেদ। কোরানের মূল ভেদ সম্পর্কে জানতে হলে আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশ্তী নিজামীর লেখা ‘আসরারুল কোরান’ বইটি পড়লে জানতে পারবে।
বায়াত হয়ে একজন মানুষ যখন নিজ সম্পর্কে চেতন থাকে সর্বাবস্থায় তাঁর জবানেই কোরানের বাণী প্রকাশ পায়। এই অবস্থাটি তৈরি করতে হলে পরিপূর্ণ ঈমান নিয়ে নিজ সম্পর্কে চেতন থাকতে হবে। নিজ সম্পর্কে গাফেল হওয়া মানে নিজ অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলা। তাই নিজ সম্পর্কে যথার্থ চেতন থাকা মানেই ঈমানের দৃঢ়তা অর্জন করা। একজন মানুষ পারে সব কিছুকে জয় করতে। তাই বলা যায় ঈমানদার অর্থাৎ ঈমানি শক্তি অর্জন করতে হলে মনকে অনুরাগের বাহনে বসাতে হবে।
জালালউদ্দিন রুমি (রাঃ) বলছেন – ‘কম্বল কে পিটানো হয় কম্বলের বিরুদ্ধে নয়, ধুলোর বিরুদ্ধে।’ ঈমানকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে হায়ানি আত্মাকে পরিশুদ্ধ অর্থাৎ পরিবর্তন করে। যেমন একটি কাপড়ের মাঝে যদি দাগ না থাকে তবে আর তা পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই, যতক্ষণ দাগ থাকে ততক্ষণই দাগ উঠানোর চিন্তা থাকে তাই ঈমানকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে দীলে যাতে দাগ না লাগে তার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তবেই গুরুর কৃপায় আখেরে মুক্তি লাভ হবে। আদম অজুদের মাঝে নূর এবং জুলমাত দুইটি গুণ থাকে। যারা এই আদম অজুদে অন্তরাত্মার জুলমাতি গুণগুলোকে কাটিয়ে নূরে নূরান্বিত করেছেন, তারা দীলে সানুয়ারীকে পরিশুদ্ধ করেছেন। কারণ, একটি মানুষ যখন জন্ম নেয় তখন তার দীলের মাঝে ময়লা থাকে না। একটি নবজাতক শিশু হলো পবিত্র। একটি শিশুর আগে পিছে কোন পাপ থাকে না। যখন সে বড় হতে শুরু করল তখন তার মাঝে হায়ানী আত্মার গুণের জাগরণ শুরু করল। তখনই শিশুটির সৌন্দর্য্য হারিয়ে গেল কাল-বৈশাখী ঝড়ের ন্যায়। যখন কাল-বৈশাখী ঝড় আসে মানুষ অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে হলে অনেক দুঃসাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। দেখা যায় একজন মানুষের একটি মাত্র সম্বল তার নিজ বাড়ি তা এই ঝড়ের কবলে পরে ধ্বংস হয়ে গেছে। তখন সেই মানুষটি কি হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবে ? সে তার বাড়ি তৈরি করার কাজে আবার লেগে যাবে। তেমনি একজন মানুষ হায়ানী আত্মার ঝড়ে পরে তার নিজ বাড়ি/দেহ ইনসানী আত্মাকে হারিয়ে নিজ বাড়িতে ভাড়াটিয়া হয়ে আছে। কারণ, হায়ানী আত্মা কাটাতে না পারলে নিজ বাড়িতে আর থাকা হবে না। সেই বাড়িটি পরিবর্তিত হয়ে কুকুর, শুকর, বাঘ, সিংহ ইত্যাদির ঘর হয়ে যেতে পারে। সেই বাড়ি যদি ফিরে পেতে হয় তবে এই ঝড়ে ভেঙ্গে যাওয়া বাড়িটিকে মেরামত করতে হবে। এই করাটার নামই হলো চেতন থাকা। কারণ, এই মায়ার জনমের মাঝে চেতন কয়জন থাকতে পারে? বারে বারে অচেতনতা এসে মানুষকে ঘিরে রাখে। মানুষ এই জগতের মোহ ত্যাগ করার জন্য কতইনা চেষ্টা করে থাকে।
মানুষ হলো আধ্যাত্মিক জীব। এই বিষয়টা শুধু আধ্যাত্মিক একজন মানবই বুঝতে পারে। সে হলো অন্তর্দৃষ্টিওয়ালা। যারা অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী, তাঁরা নিজ সম্পর্কে সর্বদাই চেতন থাকে, তাঁরা জানে কিসে একজন মানুষকে গাফেল করে রাখে। হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রাঃ) বলছেন ‘ধ্যান ও ইবাদত বন্দেগীর তরবারি দিয়ে যিনি যাবতীয় কামনা-বাসনা কেটে ফেলেছেন, তিনিই খাঁটি আরেফ।’ মানব জনমটা সুন্দর করতে হলে আধ্যাত্মিক ভাব নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। ঈমানের সাথে এই বিষয়গুলোর সম্পর্ক বিদ্যমান। ঈমানের বলেই মুর্শিদের সুঘ্রান প্রাপ্ত হতে হয়। কারণ, ঈমানদার মুর্শিদের সুঘ্রাণের মোজেজা বুঝে। সেই ভক্তের জ্যোতির্ময়ী সত্তা হতে জগত ব্যাপি তার আলোক-রশ্মি ছড়িয়ে পরে। যদি ঈমানের অপূর্ণতা থাকে তবে আর আত্মার উন্নতি ঘটবে না। ঈমানটা হেফাজত করার জন্যই মানুষের জীবনে সাধনা করতে হয়। নূরে ঈমানের মধ্যেই খোদার রূপ দরশন হবে। এই সাধনার দরজায় সিদ্ধি লাভ করতে হলে নির্জনতাকে প্রকৃত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নিতে হয়। যখন একজন মানুষ তার নিজ সত্তাকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টায় রত হয় তখন তার একাকি বা নির্জন হয়ে বসতে হবে। কারণ, আল্লাহর ধ্যান নির্জনতা ব্যতিত হয় না।
এই দিকে লক্ষ্য করে মহর্ষি মনমোহন দত্ত বলছেন –
“নির্জনে থাকিলে হয় ঈশ্বরত্ব বোধ,
নির্জনে সাধন করো পাইবে প্রবোধ”
মানব অজুদটাই হলো নূরের ভান্ডার। এই ভান্ডার থেকে যার নূরের জ্যোতি বিকশিত হয়েছে, তার আচার-আচরণ দ্বারাই তা বুঝা যাবে। যেমন – একটি পোকা মানুষকে কামড় দিতে পারে। কিন্তু পোকাটিকে মানুষ কামড় দিতে পারে না, ইহা তার কাজ নয়। তেমনি ঈমানকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে কতইনা প্রতিকূল পরিবেশের মোকাবেলা করতে হয়। এমনও হতে পারে মুর্শিদই ঈমান ভাঙ্গার জন্য অনেক কর্ম করতে পারে। যেমন করেছিল হযরত খাজা ওসমান হারুনী (রাঃ)। এই সমস্ত বিষয়গুলো বুঝে নিতে পারলে ঈমান প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। কারণ, মুর্শিদের সকল কর্মের মাঝেই ভেদ লুকানো রয়েছে। ভাল মন্দ এক করতে না পারলে ঈমান প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ভাল হলে একজন মুরিদের মন ভাল থাকবে আর মন্দ হলে খারাপ হয়ে যাবে। তবে আর ঐ ভেজাল/খান্নাছযুক্ত বা আমিত্বময় হৃদয় দ্বারা ঈমান প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। যেমন – কাপড় ছিড়ে গেলে তা আর পুনরায় আগের মতো হয় না। ঠিক তরিকতের বিষয়টা আলাদা। নফসে আম্বারা মানুষের নফস মোৎমাইন্নাহ’কে ছিড়ে ফেললে তা পুনরায় ঠিক করা যায়, ঈমানের পূর্ণতার বলে।
এই মানব জনমটা টিকিয়ে রাখতে হলে মনকে কাদা-মাটির ন্যায় করে নিতে হবে। তা করে নেওয়াটার মাঝেই লুকিয়ে আছে ভক্তের সাধনা। এই সাধনা সম্পর্কে জানাটাও একটি জ্ঞান। জ্ঞানী যারা তারা ছাই এর মাঝে মানিক খুঁজতে থাকে। কারণ, সৃষ্টির সর্ব কিছুতেই আল্লাহর সৃষ্টি-লীলার জ্ঞান লুকিয়ে রয়েছে। আধ্যাত্মিক জ্ঞানীরা তা জানেন, তাই তারা হলো জ্ঞানপিয়াসী। সাধারণ চিন্তাধারা দিয়ে খোদার ভেদ জানা যায় না। খোদের মাঝেই খোদার ভেদ গোপন রয়েছে। যারা খোদ সম্পর্কে চেতন তারা খোদার ভেদ জানতে পেরেছে। হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রাঃ) বলছেন – “গাফেল হৃদয়ে কিভাবে বন্ধুর দয়া ও ভালোবাসার আলো জ্বালবে, চেতন হৃদয় ব্যাতিত সে নূরের অবরোহন স্থল নেই।” আল্লাহ চেতন মানুষের মাঝে অবস্থান নিয়ে কথা বলে, দেখে, শুনে, হাটে চলে। নিজ সম্পর্কে চেতন হওয়া মানেই খোদার ভেদ রহস্য উন্মোচিত করা।
যার মান আরাফা হয়েছে সে এই ভেদ বুঝতে পারে। এই বুঝটা সাধারণ জ্ঞান দ্বারা বুঝা যাবে না। মানুষের জীবনে আল্লাহর দয়া রয়েছে। সেই দয়ার ফসলই হলো এই মানব ছুরত। কারণ, ভাগ্যের ফেরে মানব জনম না হয়ে পশুর জনমও হতে পারত। খোদার সাথে যারা অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখে তারাই পারে তার সাধনায় সিদ্ধি লাভ করতে। যেমন – কেউ যদি কানে না শোনে তার কাছে কোরান পড়া অথবা গালি গালাজ করা একই মনে হবে, ঠিক তেমনি হতে হয় একজন ঈমানদারের অবস্থান। কারণ, একজন প্রকৃত ঈমানদার সে তার নিজ অস্তিত্ববোধ রাখে না। নিজ সম্পর্কে বেখেয়ালী হলে অকাল মৃত্যু ঘটবে। একজন ভক্তের জন্য মুর্শিদ স্বয়ং হলো ঈমান অর্থাৎ ঈমানের ছুরত। গুরু ঈমান, গুরুর নিকট আনুগত্য/বায়াত যে গ্রহণ যারা করেছে তারা হলো ঈমানদার।
আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশ্তী নিজামী (কুঃ ছেঃ আঃ) তাঁর গানের মাঝে বলছেন –
“নবীর ঈমানেতে মিলবে আমান
আগে ঈমান চিন আপনার,
বেনজীর কয় ঈমান আমার
মুর্শিদ সরোয়ার।”
খোদা যেই আমানত দিয়েছেন তার কতটুকু হেফাজত করা হয়েছে তা নির্ধারিত হয় নিজ সম্পর্কে চেতন বা অচেতন থাকার মাঝে। কারণ, আমানত চিনে হেফাজত করার মাঝে খোদার পরিচয়ও রয়েছে। নিজ অস্তিত্বের মাঝে খোদাকে ধারণ করা অর্থাৎ অন্ধকারের মাঝে আলো দেখা। তার অজুদ হবে জ্যোতির্ময়ী। নিজেকে হেফাজত করাটাই হলো মানুষের মূল কর্ম। যেমন, কার কাছে কোন জিনিস হেফাজত রাখা হলে তা কিভাবে সুরক্ষিত থাকবে তা খেয়াল রাখতে হয়। যদি বেখেয়ালি হয়ে যায় তবে আর জিনিস হেফাজত করা হবে না। তেমনি ঈমানকে হেফাজত করতে হলে মূল বস্তুর (খোদার জাতের) দিকে খেয়াল রাখতে হবে তবেই মূল গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।
মূল বস্তুটি হলো ইনসানিয়াত। ইনসাফ শক্তি যার মাঝে বিরাজিত রয়েছে সেই ব্যক্তি হলো ইনসান, রুহে ইনসানীর অধিকারী। ইনসানিয়াতের সাথেই আল্লাহর সর্ব বিষয় জড়িত আছে। যারা দিব্যদৃষ্টির অধিকারী, তারা ঈমানকে সচল রাখার জন্য সর্ব সময় খেয়াল রাখে। আমাদের সমাজের মাঝে দেখা যায় বৃহৎ একদল লোক ঈমান না এনেই ঈমানের দাবী করে চলছে, পিতৃ ধর্মের অনুসারী ; সংখ্যায় ৭২ কাতার। আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান আনতে হয়, আর তা হলো একজন গুরুর নিকট বায়াত গ্রহণ করা (সুরা ইউসুফ-১০০, সুরা ফাত্তাহ-১০)। মানব গুরুর মাধ্যমে আল্লাহর নিকটই বায়াত গ্রহন করা হচ্ছে, আল্লাহ নিজেই তা স্বীকার করেছেন (সুরা ফাত্তাহ-১০)। কাজেই যারা বায়াত ভঙ্গ করছে তারা আল্লাহর নিকট হতেই ঈমান ত্যাগ করেছে বিধায় তারা আর মুসলমান থাকছে না। একটু লক্ষ্য করে দেখুন, আবু জাহেল, আবু লাহাব বা নমরুদ, ফেরাউন যুগে যুগেই বর্তমান।
ঈমান ত্যাগ করা ব্যক্তি, তারা ঈমানদারদের ঈমান ভাঙ্গার জন্য বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপ করে থাকে।
যারা দুনিয়ার স্বার্থে ঈমান ত্যাগ করে তাদের ঈমানের মূল্য হলো পাঁচ টাকা, যে কেউ তা কিনতে পারে। দুনিয়ার স্বার্থে যারা ঈমান ত্যাগ করে হাশরের দিন আল্লাহপাক তাদের দিকে তাকাবেন না (বোখারী)। বায়াত ভঙ্গকারী অপবিত্র-জাহান্নামী (বোখারী-৫খন্ড)। আবার তারা টাকা-পয়সা, দালান-কোঠা কিংবা দুনিয়ার স্বার্থ পূরণ হয় এই রূপ বস্তু দ্বারা ঈমান ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে থাকে। বলতে বাধ্য হলাম, আমাদের উপরও আবু লাহাব বা ফেরাউনদের (স্বঘোষিত ধার্মিক, গুরুকে অস্বীকারকারী, গুরু ত্যাগীদের) দ্বারা এ ধরণের ঘটনা বর্তমান। আল্লাহপাক আমাদের প্রতি দয়া করেছে, ঈমানকে হেফাজত করার শক্তি দান করেছেন, নয়তো ঈমান রক্ষা করা একটু কঠিন হতো। শুধু এই প্রার্থনা, আল্লাহ যেন প্রকাশ্য শত্রু মানবরূপী শয়তানদের (ইন্নাহু লাকুম্ আদুউ্যুমমুবীন) থেকে আমাদের ঈমানকে হেফাজত করার তওফিক দান করেন।
শয়তান কি ? কোথা হতে এবং কোন দিক দিয়ে ঈমানের উপর আক্রমণ করে তা গুরুর দয়ায় আমরা চিনতে পেরেছি। যারা গুরুকে চিনতে পেরেছে তাদের ঈমান এই সমস্ত ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেলরা কখনোই ভাঙ্গতে পারবে না। বায়াত ভঙ্গ করা মানে নিজেই নিজের ক্ষতি করা/জাহান্নামী করা (সুরা ফাত্তাহ-১০)। যার গুরু নেই তার গুরু হলো শয়তান এবং সে শয়তানেরই বান্দা বলে অভিহিত হবে। ঈমানদার আর কাফের-মুনাফেকের মধ্যে কখনো বন্ধুত্ব হয় না, আত্মীয়তা হয় না-ইহা কোরানেরই কথা। মানব গুরুকে যারা অস্বীকার করলো তারা আল্লাহকেই অস্বীকার করলো। কারণ, বায়াত আল্লাহর নিকটই হতে হয়, মানবগুরু তার উছিলা (সুরা ফাত্তাহ-১০, সুরা মায়েদা-৩৫)।
যারা মানব গুরুকে অস্বীকার করে তারা ফেরাউন। ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেল, আবু লাহাব তারা হলো স্বঘোষিত ধার্মিক-পিতৃধর্মের অনুসারী। তাদের মতবাদ যারা গ্রহণ করবে তাদের অবস্থান হবে নিকৃষ্ট পশুর মতো, জাহান্নামী হবে তারা। ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেল, আবু লাহাবরা কখনো গুরুকে স্বীকার করেনি, এখনো করে না। ইমাম জয়নাল আবেদীন বলছেন – ‘দুনিয়ার সন্ধানীগণ কুকুর সদৃশ্য।’ তারা এই জগতেই নিজ ছিরাত অনুসারে সুরত নির্ধারণ করে যাচ্ছে, দোযখের আমলনামায় জাহান্নামী অজুদ তৈরী করে যাচ্ছে। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) বলছেন – “পার্থিব স্বার্থ পূরণ না হলে যারা বায়াত ভঙ্গ করে হাশরের দিন আল্লাহপাক তাদের প্রতি তাকাবেন না (বুখারী ৫ম খন্ড)।” একথাটি নবুয়ত এবং বেলায়েত উভয় যুগেই চিরসত্য।
যারা আখেরাতকে ভুলে, জাগতিক জগতের স্বার্থের মোহে পড়ে গুরুকে ত্যাগ করে দুনিয়ার সুখ সন্ধানে মগ্ন, তারাই জাহান্নামের কুকুর। তাদের খোদার ভয় নেই, খোদার প্রতি তাদের মাত্রই ঈমান নেই। সে পীর-মাওলানা যে-ই হোক। কারণ, যাদের খোদার ভয় থাকে তারা এইরূপ বেলেহাজ কর্ম করতে পারবে না। যারা মুরিদ হয় নাই তাদের থেকে আরো অধিক ঘৃনিত যারা মুরিদ হয়েও মানব গুরুকে দুনিয়ার স্বার্থে ত্যাগ করে অর্থাৎ সে ঈমানকেই ত্যাগ করলো। ইমাম আবু হানিফা (রাঃ) বলছেন, “আমি যদি ইমাম জাফর আস সাদেক (আঃ)-এর নিকট বায়াত না হতাম, তবে আমি নোমান ধ্বংস হয়ে যেতাম।” সমস্ত আল্লাহর ওলীদের মূল বক্তব্যও ইহাই-যা কোরান সম্মত। যারা গুরুকে দুনিয়ার স্বাথের্র জন্য ত্যাগ করছে তারা জাহান্নামী।
কারণ, যারা গুরুর আনুগত্যে আসেনি বা বায়াত গ্রহণ করেনি তারা আল্লাহ কর্তৃক পথভ্রষ্ট (সুরা কাহাফ-১৭)। তারা ঈমানদার নয় ; আর যারা গুরুর নিকট বায়াত গ্রহণ করেছে তারাই ঈমানদার-আল্লাহরই হাতে বায়াত গ্রহণ করেছে-ইহাই আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান আনা হলো (সুরা ফাত্তাহ-১০, ইউনুছ-১০০)। সুতরাং যারা বায়াত ভঙ্গ করেছে তাদের কোনো বন্দেগীই আল্লাহপাক কবুল করবে না। কোরান বলছে, “আল্লাহপাক হাশরের দিন প্রত্যেককে তার ইমামের সাথে ডাকবেন।” সেদিন যার মুর্শিদ বা গুরু নেই তাকে শয়তানের দল বলে ডাকা হবে এবং শয়তানের কাতারে শামিল হওয়ার জন্য নিদের্শ দেওয়া হবে (জা’আল হক)। মানব গুরুর থেকে ঈমান ত্যাগ করা মানেই আল্লাহর থেকে ঈমান ত্যাগ করা।
ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেলরা তা কোনো কালেই স্বীকার করেনি। যারা দুনিয়ার স্বার্থে ঈমান ত্যাগ করেছে তারা ঈমানদারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র, অত্যাচার-নির্যাতন বা মানসিক নির্যাতন করে থাকে যুগে যুগে তাই দেখা যায়। ওরা জুলুমবাজ জালেম, আর জালেমদের স্থান জাহান্নামের সর্বনি¤œ স্তরে (কোরান দ্রঃ)। ঈমান দেখার জিনিস, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ঈমান আনা যায় না এবং না দেখেও ঈমান আনা যায় না। ঈমান আল্লাহর জাত নূর হতে প্রকাশ, মানব জাতির জন্য এক বিশেষ রহমত। আল্লাহপাক যাকে ঈমান দান করেন তিনিই একজন গুরুর সান্নিধ্যে অবস্থান করতে পারেন। আর যে নিজ প্রবৃত্তির পূজক হয় আল্লাহপাক তার ঈমান কেড়ে নিয়ে ঈমান শূন্য করে জাহান্নামী করে দেন। সুতরাং ঈমান রক্ষা করাই হলো দ্বীনে মুহাম্মদীর মূল বিষয় এবং আল্লাহপাকের দয়া ছাড়া ঈমান রক্ষা করা যায় না। যে স্বীয় প্রবৃত্তিকে গুরুর মর্জির উপর ছেড়ে দিয়েছে আল্লাহপাক তার উপরই রহিম নামের দয়া বর্ষণ করে জান্নাতি করে দেন।
যারা গুরুর নিকট হতে ঈমান ত্যাগ করেছে বা গুরুকে অস্বীকার করছে তারা গুরুকে নিজের মতোই সাধারণ মানুষ মনে করে এবং অন্যের ঈমান নষ্ট করার জন্য নমরুদ, ফেরাউন, আবু জাহেল, আবু লাহাবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এরা শয়তানের ধর্মের অনুসারী-প্রকাশ্য শয়তান (কোরান), তাদের অনুসরণ করতে বা তাদের পথে না চলার জন্য কোরানে কঠোর ভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং এরা যুগে যুগেই গুরুর বিরোধীতায় বর্তমান। তাদেরকে চিনতে না পারাটাই হলো পথভ্রষ্টতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ, আর চিনতে পারাই হলো দ্বীনের পথে থাকার প্রমাণ। কারণ, তাদেরকে না চিনতে পারলে তাদের ধোকা-প্রবঞ্চনা হতে ঈমান রক্ষা করা সম্ভব নয়। এ ধরনের প্রকাশ্য শত্রু শয়তান (যার মধ্যে শয়তানের/নফস আম্মারা গুণ-খাছিয়ত আছে) বাবা-মা, ভাই-বোন বা আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধবও হতে পারে। যারা নিজেরা ঈমান শূণ্য হয়ে গেছে মানে বে-ঈমান তারাই শয়তানের/ফেরাউন, নমরুদের, আবু জাহেলের ভূমিকা নিয়ে অন্যের ঈমান নষ্ট করার চেষ্টায় রত থাকে। তাদেরকে যদিও দেখতে মানুষের মতো মূলতঃ ওরাই হলো মানবরূপী শয়তান।
বিষয়টি এমন যেমন, ‘এক শিয়াল মুরগি চুরি করার জন্য এক বাড়িতে গেল, শিয়াল মুরগি চুরি করতে গিয়ে বাড়ির মালিকের হাতে ধরা পরে গেল। তখন বাড়ির মালিক শাস্তিস্ব^রূপ শিয়ালের লেজটি কেটে দিল। লেজ কেটে দেওয়ার পর শিয়াল লজ্জায় গর্তে গিয়ে লুকিয়ে রইল। এভাবে আর কতো দিন থাকবে, বের হতে পারছে না লজ্জা, তাই এক দিন সে জঙ্গলের সব শিয়ালদের খবর দিল। সব শিয়াল আসার পর সে গর্ত থেকে পুরোপুরি না বের হয়ে সব শিয়ালদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল, দেখ, আমাদের এ লেজটিতো কোন কাজে লাগে না, বরং মুরগী চুরি করতে গিয়ে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়, তাই এসো আমরা সবাই লেজটি কেটে ফেলি। তখন বৃদ্ধ এক শিয়াল বললো, এমন কথা তো জীবনেও শুনি নি! চল সবাই মিলে গর্ত হতে তাকে বের করে দেখি বিষয়টি আসলে কি? গর্তের ভিতর থেকে বের করে আনার পর সবাই দেখতে পেল শিয়ালটির লেজ কাটা!’ যেহেতু নিজের লেজ নেই, তাই সে অন্যের লেজ কাটার পরামর্শ দিচ্ছে। ঠিক তেমনি দশা হয় প্রকাশ্য শত্রু শয়তান-বেঈমান লোকদের। সে তার নিজের ঈমান ধরে রাখতে পারেনি, এখন উদ্দেশ্য হলো অন্যের ঈমানও সে নষ্ট করবে। এরা সর্বযুগেই বাস করছে, ঈমান রক্ষার জন্যই তাদেরকে চিনতে হবে। ওরা পারিবারিক ও সামাজিক দুই দিক থেকে ঈমান ভাঙ্গানোর চেষ্টা করে থাকে। যুগে যুগে মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, দাদা-দাদী, চাচা-চাচী এই রূপ নিজ রক্তের সম্পর্কের লোক শয়তানের অনুসারী-ভক্ত সেজে ঈমান ভাঙ্গার চেষ্টা করে যাচ্ছে। হযরত খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রাঃ) বলছেন ‘ভ্রাতৃত্ব দু’ প্রকারের। এক ভাই হচ্ছে রক্তের সম্পর্কের। দ্বিতীয় ভাই হচ্ছে দ্বীনি বা ধর্মের। উভয়ের মধ্যে দ্বীনি ভাইয়ের মর্যাদা অধিক। কেননা রক্তের বন্ধন যার সাথে তার সঙ্গে ঝগড়া, বিবাদ ও বিচ্ছেদ ঘটতে পারে। কিন্তু দ্বীনি ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হচ্ছে আত্মার যা কখনও বিচ্ছিন্ন হয় না।’ দ্বীনি ভাই-বোন সম্পর্কটি চিরস্থায়ী আর রক্ত সম্পর্কটি ক্ষণস্থায়ী। যারা গুরুর নিকট বায়াত গ্রহণ করেনি বা তাঁর নীতি-আদর্শের উপর নেই তারা দ্বীন ইসলামের মধ্যে নেই, তাদের সম্পর্কটি ইহজগতেই শেষ হয়ে যাবে। নবী-রাছুল বা ওলীর দল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাহান্নামী হয়ে যাবে।
এ সম্বন্ধে হযরত খাজা একটি ঘটনা বললেন, আপন দুই ভাই ছিলো। তাদের মধ্যে একজন মুমিন ও অন্যজন কাফের ছিলো। সত্তাগত দিক থেকে মুসলমান ভাইয়ের সত্তা কাফের ভাইয়ের সত্তাকে অস্বীকার করবে সুতরাং এ বন্ধন দূর্বল বলে বিবেচিত হবে। দ্বীনি ভাইয়ের বন্ধন মজবুত হওয়ার কারণ হচ্ছে পরকালে এরা একে অপরের সন্নিকটে থাকবে। (ফাওয়াদুল ফাওয়াদ ১০৮পৃঃ) বেখেয়ালি লোক দ্বারা তরিকতের কর্ম একেবারেই করা সম্ভব না কারণ, যারা তরিকতের কর্ম সাধনা করবে তারা চেতন মানুষ। ঈমান দ্বারাই তরিকতের মূল গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। ঈমানদারের ঈমানের ছুরত মাটিতে এবং আসমানে উভয় স্থানেই থাকে। আসমান ছাড়ে আর জমিন ধারণ করে, আসমানী ছুরত ঈমানদারগণ জমিনেই প্রত্যক্ষ করে। যারা উম্মতে মুহাম্মদী নয় তারা ঈমানকে চিনবে না, দেখবে না বিধায় তারা ঈমানের নূর হতে বহু দূরে সরে যাবে এব খোদাকে চিনবে না, দেখবে না- এরাই হলো পথভ্রষ্ট (কোরান)। যেমন একটি ঘর সেই ঘরের দরজা বন্ধ থাকলে কোন মানুষ সেই ঘরে পৌঁছাতে পারবে না। আর যদি সেই ঘরের দরজা খুলে দেওয়া হয় তবে সেই ঘরের মাঝে সব মানুষই প্রবেশ করতে পারবে। একজন মুর্শিদের দরবার ঠিক তেমনি ঘরের খোলা দরজার নেয় ঈমানদারদের জন্য আর যারা ঈমান শূন্য তাদের অবস্থান হবে বন্ধ দরজার মতো। কারণ, তারা ঘর এবং দরজা কোনটাই দেখবে না, ঈমানের বলেই খোদাকে পাওয়া য়ায়। মুর্শিদের প্রতিটা পদক্ষেপের দিকে, নির্দেশের দিকে খেয়াল রাখতে হবে । কারণ, গুরু ভক্তের ঈমান পরীক্ষা হয় প্রতি মুহুর্তে। তাই প্রতি মুহুর্তে এই পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই প্রস্তুত থাকা মানেই চেতন থাকা। ঈমানকে হেফাজত করতে পারাটাই হলো সর্ব সাধনায় সিদ্ধি অর্জন করা।
কবিতা – কি নেশা খাওয়ালে
লেখক – এস এম বাহরায়েন হক ওয়ায়েসী
কি নেশা খাওয়াইলে বন্ধু, সব ভুলে যাই কেনে?
তুমি বিনা নাইরে বন্ধু, যে আমারে চিনে?
এসেছিলাম ভবের বাড়ী
পেয়েছি নিয়ামত কোটি হাজারী,
শুকর করতে পারলাম না
আমি গুনে গুনে।।
পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের এমন ভাবনা
সুরত শেকেল এক, নেই বিড়ম্বনা
স্বভাবে মানুষ না হইলে
কষ্ট কেনো আসে মনে।।
কোথায় পাবো যেয়ে মানবরূপ
কে দেখাবে আমায় তার অনুরূপ,
পাইতাম যদি সন্ধান তাহার
রাখতাম মাথা চরণে।।
বাহরাইন শাহ্ বলে অবুঝ মন
কাহার কাছে দুঃখের কথা করিবো বর্ণন,
খাওয়াইয়ে বিষম নেশা
আমায় মারিলে পরাণে।।
সংগীত – কর্মদোষে কানার দেশে
লেখক – ফকীর আতিকুর রহমান চিশতী
কর্মদোষে কানার দেশে, আইলি রে মন বারে বার
কেহ খুঁজতে চায়না আপন ভান্ড, গাট্টি টাইনা জীবন পার।।
আহারে কি নিষ্ঠুর কানুন, ধর্ম সমাজের বেড়া
বিরাট শিশু আটকা পড়ে হয়েছে দিশাহারা!
কেউ শিখালো মূর্তি ভজতে, কেউ নিয়ে যায় নামাজ পড়তে
শত জনে শত মতে কেড়ে নেয় তার অধিকার।।
মহাগুরু যোগী ঋষি দিলেন সব সত্য বিধান
ভোগবাদী আর জ্ঞানের কানা টানলো তাতে আবরণ!
মুক্তি পাওয়ার পথটি বন্ধ, আছে শুধু কামের গন্ধ
সাধক জনে সত্য বলে, কল্লা দিছে বহুবার।।
মহাবিশ্বে কবে হবে মুক্ত শিশুর আগমন
নিরপেক্ষ শুণ্যবিন্দু করবে সে জন নিরুপণ!
যেই শক্তিতে মহাকর্ষ, নিয়ন্ত্রন হয় মহাবিশ্ব
সেই খানেতে আবাস করে, মানুষ করবে পারাপার।।
ফকীর আতিক বলে ওরে মানুষ পাইলি এই মগজখানা
লোকের কথায় কেনো ঘুরো, সত্য কি বুঝতে চাওনা?
যেথায় থেমে গেছে মহাগুরু, তোমার সেথায় যাত্রা শুরু
পরম প্রভু সব জানাইতে গড়েছে আদম বাজার।।
সংগীত – নবীজি হলেন জ্ঞানের শহর
লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী
নবীজি হলেন জ্ঞানের শহর, মাওলা আলী প্রবেশদ্বার
আনা মদীনাতুল ইলমে আলীউন বাবুহা –
বলেছেন দ্বীনের পয়গম্বর।।
১৮ জিলহজ্জ গাদীরে খুমে
ঘোষনা দিলেন নবী, আল্লার হুকুমে,
‘আমি যার মাওলা আলীও তার মাওলা
বায়াত পড় সবে হাতেতে তাহার।।
নবীজি হলেন আখেরী পয়গম্বর
মাওলা আলী কে দিলেন বেলায়েতের ভার,
আলী হতে এলো সিনা-সিনা তরিকার
শাজরা শরীফ প্রমাণ তার।।
আহলে বায়াতের বাহিরে যারা
বাতিল তরিকার অনুসারী তারা,
বিফল তার বন্দেগী বৃথা জিন্দেগী
আখেরে পাবেনা নিস্তার।।
মোফাজ্জেল চিশতী বিনয় করে কয়
বায়াত হও সবে আলীর তরিকায়,
ইলমে লাদুন্নি দিবে নবী মুস্তফায়
মুর্শিদ সহায় হবে যার।।
সংগীত – কিছুই পালন হয়নি রাসুল
লেখক – শাহ ফরহাদ চিশতী
কিছুই পালন হয়নি রাছুল, নবুয়ত তেইশ বছরে
মাওলা আলী ঘোষণায় রেছালাত, পূর্ণ হলো খুম গাদীরে।।
হজ্জ শেষে বেধে এহরাম, রাসুল রওনা হলো মদিনা ধাম
পথিমধ্যে আসে কালাম, জানায়ে দাও সকলের তরে।।
সঙ্গে ছাহাবা ছিলো সোয়ালক্ষ, বাহিরে তাদের মধুর সখ্য
সঙ্কিত রাছুল আত্মপক্ষ, কি যেন হয় ঘোষণার পরে।।
অভয় বাণী প্রাপ্ত হইয়া, গাদিরে খুমে থামলেন গিয়া
বানায় মঞ্চ উষ্ট্র দিয়া, প্রস্তুত নামাজ আদায় করে।।
মঞ্চে তুলে ধরেন আলীর হাত, পৌঁছাইয়া দিলেন রেসালাত
মান কুনতুম মাওলা আয়াত, ১৮ জিলহজ্জ, বৃহস্পতিবারে।।
দ্বীন সেদিন পূর্ণ হলো, মুমিনগণে মাওলা পেল
ফরহাদ তুমি আঁখি খোলো, দেখো সালাম উছিলা করে।।
সংগীত – ডাকি দয়াল তোমারে
লেখক – মোবারক হুসাইন ওয়ায়েসী
ডাকি দয়াল তোমারে
এ জীবনে দেখা দিও আমারে,
তোমার দয়াগুণে ত্বরাও আমায়
রেখো না কারাগারে।।
তোমার নাম স্বরণে হৃদে আসে ভাব
তুমি তো সকলি জানো কি আমার অভাব।
এবার ঘুচাও আমার সকল অভাব, রেখো না অন্ধকারে।।
প্রেমের বাণী নিয়ে এলেন খাজা বাবায়
কত শত পাপীর জীবন ধন্য হয়ে যায়।
মুর্শিদ তুমি আমার খাজা বাবা, ধন্য করো আমারে।।
এ জগতের মায়ায় তোমায় ভুলে রই
তুমি আমার নাইবা হলে যেনো আমি তোমার হই।
অধম মোবারক তাই কেঁদে বলে, ঠাঁই দিও চরণ পরে।।
সংগীত – আল্লায় কোরান হইয়া
লেখক – আমির হোসেন
আল্লায় কোরআন হইয়া কোরআন শিখায়
ভেদ জেনে লও তাহারি,
মুর্শিদ আমার জিন্দা কোরআন, হইলো জাহেরী।।
ছিল পুশিদাতে গুপ্ত কোরআন
পঞ্চভাগে তাহারি শান,
অজুদ মূলে হয় ব্যাবধান, দেখ চিন্তা করে,
আরবি কোরআন নাযিল হইলো মানবও শহরে।
আইন হরফ তার হইলে নফী, কালাম পাবি সরাসরি।।
নূরেরও কালিতে লেখা
অজুদ কোরআন যাবে দেখা
প্রেমময়ে আছে বাকা তত্ত্ব নিগূঢ়ে।
তত্ত্বা হাসিল করলো যে জন, মুমিন বলে তারে।
জাহের বাতেন সবি জানেন, দেখেন সবি নজরকারি।।
সাবআ মাছানি
হরফ হইলো আসমানী
তাহাতে সকল বাণী দিন রজনী ঝড়ে।
অসীমও কালামের ভেদ বলছে পরোয়ারে।
ঈমানদারে শুনে কালাম, ধ্যান সাধনায় হইলো ভারী।।
আরবি কোরআন প্রাপ্তি যেইজন
বিশেষ জ্ঞানী হইলো সেইজন
তেমনি ধরায় আছে একজন, ঝাউগড়া দরবারে।
সে যে আমার বেনজীর চাঁন, থাকেন বাকাবিল্লাহর ঘরে।
আমিরের ই এই বাসনা, পাইতে বাবার চরণ তরী।।
কবিতা – প্রিয় মুহাম্মদ সা.
লেখক – আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস
তোমার আগমনে প্রিয় নবি, নৃত্যে দোলে ধরনী
আলোকিত হলো সৃষ্টিকূল, সৌরভ পুষ্প মঞ্জুরী।।
আবির রাঙা হাসে উষা, মরু বক্ষে লাবনী,
চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-তারা, সজীব হলো অবনী।।
তুমি আনলে কালিমার দাওয়াত, মানব মুক্তির পথ,
আল্লাহ ছাড়া নাই প্রভু, তুমি শিখালে একত্ববাদ।।
শোনালে তুমি সাম্যের বাণী, নাই মানুষের ভেদাভেদ,
বিশ্বে ছড়ালে ধর্মের বারতা, আল্লাহ-রাসুল অভেদ।।
হে মরুচারী মানব কান্ডারী, আমরা তোমার উম্মত,
ধন্য মোরা তোমায় পেয়ে, হে প্রিয় মোহাম্মদ।।
কবিতা – প্রার্থনা
লেখক – জসিম মিয়া
স্বরণে যেনো পাই তোমারে
নিঃসঙ্গ নির্জনও কুঞ্জবনে!
যেথায় মহানন্দের বাস
দক্ষিণা পবন, ঝর্ণাধারা, বহিবার প্রয়াস!
আছে যেথায় বসন্ত বাতাসী,
আসে ভেসে কৃষ্ণ-সুর-বাঁশী!
মম মন-রাধা সেথা আনমনে
শত শত প্রলাপ বকে, অভিমানে!
আছে সেথা নিত্য নতুন, ফুল কুমারীর ঝাক
নব-ভঙ্গিমে গেঁথে যায় মালা, নিশ্চুপ নির্বাক!
নিরব নিঝুম আধারে, সেথা জোনাকির মেলা বসে
নিশ্চুপ অসীম ঐ মহাকাশে-
সাদা মেঘের আড়ে চন্দ্রিমা হাসে!
তব পূজারী হয়ে এই মহাকালে
প্রার্থনা মম, রেখ ঐ রাঙা চরণে!
প্রবন্ধ – আসরারে পাঞ্জাতন – ৯ম পর্ব
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
‘তাফসীরে কানযুল ঈমান ও খাযাইনুল ইরফানের’ প্রথম খন্ডে সুরা বাকারার ২৪৮ নম্বর আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, এ ‘তাবুত’ (পরে যা মুসা নবীর নিকট ছিল) শামশাদ কাঠের তৈরী একটা স্বর্ণ-খচিত সিন্দুক ছিল, যার দৈর্ঘ্য তিন হাত এবং প্রস্থ দু’হাত ছিল। সেটাকে আল্লাহপাক হযরত আদম আলাইহিস্ সালামের উপর নাযিল করেছিলেন। এর মধ্যে সমস্ত নবীদের ছবি রক্ষিত ছিল। তাদের বাসস্থান ও বাসগৃহের ছবিও ছিল এবং শেষ ভাগে রাছুলে করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম এবং তাঁর পবিত্রতম বাসগৃহের ছবি একটা লাল ইয়াকুতের মধ্যে ছিল, যাতে হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম নামাজরত অবস্থায় দন্ডায়মান এবং সাহাবা-ই-কেরাম তাঁর চারদিকে ঘিরে রয়েছে। সিন্দুকখানা বংশ পরস্পরায় হযরত মুসা আলাইহিস্ সালাম পর্যন্ত পৌঁছলো। তিনি এর মধ্যে তাওরাত কিতাব ও তাঁর বিশেষ বিশেষ সামগ্রী রাখতেন। বিশেষ সামগ্রীর মধ্যে হযরত মুসা আলাইহিস্ সালামের ‘আসা’ (লাঠি), তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ, পবিত্র স্যান্ডেল যুগল এবং হযরত হারুন আলাইহিস্ সালামের পাগড়ি, লাঠি এবং সামান্য ‘মান্না’, যা বনী ইসরাঈলগণের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল।
হযরত শীশ আলাইহিস্ সালামও তাঁর পুত্রকে আদমের ওসীয়ত পালন করার জন্য নির্দেশ দিলেন। বললেন, ঐ নূর যেন পবিত্র রমণীদের ছাড়া অপর পাত্রে স্থাপিত না হয়। সে হতে এ ওসীয়ত এক করণ (যুগ) হতে অপর করণ পর্যন্ত চলে আসতে থাকে। এরূপে ওসীয়তের নিয়মের ভিতর দিয়ে আল্লাহপাক ঐ নূরকে পৌঁছিয়ে দিলেন হযরত আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ্ পর্যন্ত। এ মর্যাদাশীল বংশকে তিনি মুক্ত রাখলেন আইয়্যামে জাহেলীয়াতের কলুষ হতে। এভাবে পুরুষাণুক্রমে পবিত্র পৃষ্ঠদেশ ও পবিত্র গর্ভস্তরগুলো অতিক্রম করতে করতে এসে পড়লো হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিবের পেশানীতে।
‘কা’আবুল আহবার’ বর্ণনা করেন, ‘রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের নূর মোবারক স্থিত হলো হযরত আবদুল মুত্তালিবের পেশানীতে। যখন তাঁর ভরা যৌবন, তিনি একদিন ঘুমিয়ে পড়লেন কাবার হাতিমে। ঘুম ভাঙ্গার পরে দেখলেন, তাঁর চক্ষুদ্বয় সুরমা লিপ্ত, মস্তকে তৈলমাখা, অঙ্গে সুন্দর ও সজ্জিত লেবাস। তিনি অতিশয় পেরেশান। তিনি কিছুই অবগত নন যে, কে এরূপ করলো। তাঁর পিতা তাকে কোরাইশদের ভবিষ্যদ্বিদগণের নিকট নিয়ে গেলেন। তারা সব শুনে বললেন, আসমান সমুদয়ের প্রভু তাঁর বিবাহের আদেশ জ্ঞাপন করলেন। তিনি প্রথম পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হলেন ‘কয়লা, নামক এক মেয়ের সাথে। ‘কয়লা’র ইন্তেকালের পর তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হলেন ফাতেমার সাথে। এ ফাতেমার গর্ভ অলংকৃত করেন হযরত আবদুল্লাহ। হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিবের দেহ হতে সর্বদা মেশকের সৌরভ বের হতো আর তাঁর পেশানী হতে রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের নূর চমকিত। দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে কোরাইশরা আবদুল মুত্তালিবকে হাতে ধরে ‘সাবির’ পাহাড়ে নিয়ে যেতো। তারা তাঁর উছিলা দিয়ে আল্লাহর কুদরত অন্বেষণ করতো ও পরিবারের জন্য প্রার্থনা জানাতো। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের আগমনের জন্য প্রার্থনা জানাতো। এ হযরত আবদুল মুত্তালিব নূরে মোহাম্মদীর ধারক-বাহক ছিলেন এবং তিনি দ্বীনে হানিফের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।
‘খাসায়েসুল কুবরা’ ২য় খন্ডের ৭৭ পৃষ্ঠায় হাকেম, বায়হাকী, তিবরানী ও আবু নায়ীম আবু আওয়ান থেকে, তিনি মেসওয়ার ইবনে মাখরামা থেকে, তিনি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণনা করেন যে, আবদুল মুত্তালিব বলছেন, আমরা শীতকালীন সফরে ইয়ামেনে পৌছলাম। সেখানে এক ইহুদি আলেমের কাছে গেলে সে আমাকে প্রশ্ন করলো – তুমি কে ? আমি বললাম, আমি একজন কোরাইশী। সে জিজ্ঞেস করলো, কোন্ গোত্রের ? আমি বললাম, বনী-হাশেমের। তখন সে আমার অনুমতি নিয়ে আমার নাকের ছিদ্র দেখে বললো, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তোমার এক হাতে রাজত্ব এবং অন্য হাতে নবুয়ত রয়েছে। আমার ধারণা ছিল যে, এ নবুয়ত ও রাজত্ব বনী-যুহরার মধ্যে হবে। এখন এটা কিরূপে হলো ?
তখনো খাজা আবদুল মুত্তালিব বিবাহ করেননি। তাকে বিবাহ করার জন্য ঐ ইহুদি আলেম বললো। খাজা আবদুল মুত্তালিব দেশে ফিরে ‘হালা বিনতে ওয়াহাব ইবনে আবদে মানাফ’ কে বিয়ে করলেন। ভিন্ন বর্ণনায় তার নাম ‘কয়লা’ বলেও উল্লেখ আছে। তার মৃত্যুর পর ফাতেমাকে বিয়ে করলেন। এ ফাতেমাই হলো রাছুল পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের দাদী এবং হযরত খাজা আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালামের মাতা। খাজা আবদুল মুত্তালিবের পিতার নাম হাশিম এবং তাঁর মাতার নাম ছিল ছালমা।
যখন বাদশাহ আবরাহা বিরাট হস্তি বাহিনী নিয়ে কাবাঘর ধ্বংস করার মানসে মক্কায় আগমণ করে, তখন আবদুল মুত্তালিব ‘সাবির’ পাহাড়ে আশ্রয় নিলেন। তাঁর পেশানী হতে রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের নূর মোবারক নতুন চাঁদের আকৃতিতে গোল হয়ে ঝলমল করে জ্বলে উঠলো। সে চাঁদ সদৃশ কিরণ গিয়ে কাবা ঘরের উপর পতিত হলো। এটা দেখে হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিব বললেন, কোরাইশগণ তোমরা ফিরে চলো। নিশ্চিতই আমরা জয়ী হবো, কাবাঘর বাদশাহ্ আবরাহা ভাঙ্গতে পারবে না – এ ঘটনাই হলো তার প্রমাণ।
মক্কায় এসে বাদশাহ আবরাহা তার সেনাপতিকে মক্কার সর্দার হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিবের নিকট পাঠালো, সেনাপতি খাজা আবদুল মুত্তালিবকে দেখার সাথে সাথেই ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। যখন তার জ্ঞান ফিরলো সাথে সাথেই সে দৌঁড়িয়ে চলে গেল আর বলে গেল-হে মক্কার সর্দার ! আপনার সঙ্গে কেহই পারবে না। মক্কার লোকদের চারশত উট যখন বাদশাহ্ আবরাহার লোকেরা ধরে নিয়ে গেলো হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিব সে উটের জন্য যখন বাদশাহ্ আবরাহার নিকট গেলেন, বাদশাহ্ আবরাহা খাজা আবদুল মুত্তালিবকে দেখার সাথে সাথে স্বীয় আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল এবং তাঁর হাত ধরে নিয়ে নিজের কাছে বসালো। তিনি তার লোকদের উট ফিরিয়ে নিয়ে আসলেন।
যখন বাদশাহ্ কাবাঘর ভাঙ্গার জন্য এক হাজার হাতি নিয়ে রওয়ানা হলো। আবরাহা বাদশাহ্র হাতি ছিল সাদা বর্ণের এবং তার নাম ছিল ‘মাহ্মুদ’। বাদশাহর হাতি যখন পথে খাজা আবদুল মুত্তালিবের সামনে পড়লো সঙ্গে সঙ্গে সে হাতি শীর নত করে তাকে প্রণাম করলো। শেষে আল্লাহ পাক ‘আবাবিল’ পাখির দ্বারা বাদশাহ আবরাহাকে হাতি-ঘোড়া, সৈন্যসহ ধ্বংস করে দিলেন। সুরা ফীলে তার বর্ণনা রয়েছে। সে পাখির দুই পায়ে এবং মুখে মোট তিনটি পাথর ছিল এবং এখনো আছে। সে ভেদ-রহস্য ইলমে সিনাতে গোপন আছে। এসবই ছিল তাঁর পেশানীতে যে নূর-ই- মোহাম্মদী ছিল তার মহিমা। একটু বুঝা দরকার যে, যে পবিত্র সত্তাটি নূরে মোহাম্মদীর ধারক-বাহক ছিল তার মর্যাদাটি আল্লাহপাকের সৃষ্টির ভিতর কতো উচ্চস্তরের হতে পারে। সে নূরের স্পর্শ যারাই পেয়েছে তারাই জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা পেয়েছে, বিষয়টি জ্ঞান দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করুন।
‘মাদারিজুন্ নবুয়ত এবং ‘রওজাতুল আহযাব’ কিতাবে বর্ণিত আছে যে, একদিন হযরত আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালাম তাঁর পিতা আবদুল মুত্তালিবকে বললেন, পিতঃ আমি যখন মাঠে যাই, একটি নূর আমার পৃষ্ঠদেশ হতে বের হয়ে আসে এবং দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক ভাগ চলে যায় পূর্ব দিকে অন্য ভাগ চলে যায় পশ্চিম দিকে, মূহুর্তের মধ্যেই তা আবার মেঘের আকার ধারণ করে ও আমাকে ছায়া দান করে। এরপর তা আসমানের দিকে উঠে যায়। তখন আসমানের দরজা খুলে যায়। যখন আমি জমীনে বসি, তখন আওয়াজ আসতে থাকে “হে নূর-ই-মোহাম্মদীর বাহক, তোমার উপর ছালামত হোক।” আমি যখন শুষ্ক গাছের নিচে যাই সে মূহুর্তে তা সবুজ হয়ে যায়। আবদুল মুত্তালিব বললেন, বৎস ! তুমি মোবারক হও, তোমার পৃষ্ঠদেশ হতে আবির্ভাব ঘটবে নবীগণের সর্দার।
বুঝা যাচ্ছে, হযরত আবদুল মুত্তালিবও নূর-ই-মোহাম্মদী সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন এবং তিনি যে নূর-ই-মোহাম্মদীর ধারক-বাহক সে বিষয়ে তার বিশ্বাসও ছিল। তা না হলে এ ধরনের ঘটনা তাঁর দ্বারা সংঘটিত হতো না এবং এ ধরনের বর্ণনাও তিনি দিতেন না। পবিত্র মানবগণের মাধ্যমেই নূরে মোহাম্মদীর আগমন ঘটেছে-এ কথা হাবিবে খোদা নিজেও বহুবার বলছেন-যা আমি আমার লেখার মাধ্যমে তুলে ধরেছি। সুতরাং তাঁর পবিত্র নূরের ধারক-বাহক যারা তারা সবাই হলেন জান্নাতি মানুষ। এ সৌভাগ্য লাভ হয়েছে একমাত্র সেই নূরের মোহাম্মদীর কারণেই এবং যারাই সেই নূরে মোহাম্মদীর ধারক-বাহক তারা সবাই পবিত্র মানুষ, মুক্তিপ্রাপ্ত মানুষ বিধায় তারা সবাই হলেন ‘হযরত এবং সাইয়্যেদ’।
অনুবাদ – ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র, ১৭ ও ১৮ পর্ব
মূল এলিফ শাফাক হতে
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী
পর্ব – ১৭
মানব অস্তিত্ব একটি পূর্ণতম অস্তিত্ব, যে অস্তিত্বের মধ্যে জগতের সকল উপাদান বিদ্যমান। সমগ্র মহাবিশ্ব একটি মানব অস্তিত্বের মধ্যে নিহিত। আমরা যা পছন্দ করি অথবা আমরা যা ঘৃণা করি, তার সবই ক্রিয়াশীল আমাদের মানবীয় অস্তিত্বের মধ্যে। স্রষ্টা তাঁর রহস্য কে প্রকাশ করেছেন মানবীয় অস্তিত্বের মধ্যে। তাই যা কিছু খোঁজার বা পাওয়ার তার সবই রয়েছে মানবীয় অজুদে তথা মানুষের সিমানায়। মানুষ মোহনায় বিরাজিত জগতের অপার রহস্য ভান্ডারের সকল চাবিকাঠি।
মানব মোহনায় বিরাজিত অনন্ত রহস্যকে তথা পরম প্রভুকে আমাদের উপলব্ধিতে প্রস্ফুটিত হতে বাধা প্রদান করে শয়তান শক্তি যা আমাদের অস্তিত্বের মধ্যেই অবস্থান করে। নিজের বাহিরে শয়তানকে কখনো খুঁজে পাওয়া যাবে না। শয়তান বা খান্নাছ শক্তি আমাদের ভেতরে থেকে আমাদেরকে খারাপ কাজে প্রেরণা দেয়। এটি আমাদের মধ্যে থেকে আমাদের আক্রমণ করে। এটি আমাদের ভেতরের একটি কন্ঠস্বর যা প্রতিনিয়ত আমাদেরকে খারাপসমূহের উজ্জীবনে প্রয়াস চালাচ্ছে।
যদি আপনি জানতে চান জগতের অপার রহস্য, অনুধাবন করতে চান অনন্ত প্রেমের লীলা, সম্পূর্ণ রূপে প্রস্ফুটিত করতে চান নিজেকে, তাহলে সততা ও কঠোরতার সাথে আপন অস্তিত্বে বিরাজিত শয়তান বা খান্নাছ শক্তির মোকাবিলা করুন।
অস্তিত্বে অবস্থিত খারাপসমূহের ত্যাগেই উদ্ভাসিত হবে অনন্ত সত্য।
পর্ব – ১৮
প্রকৃত বিশ্বাস হলো আমাদের ভিতরের বিশ্বাস। বাহিরের সংস্কার তো কেবল বাহিরেই থাকে। হৃদয়ের সংশয়বিহীন সুদৃঢ় ধারনা সমুহের সমন্বয়েই আমরা আমাদের বিশ্বাসের ভীতকে নির্মাণ করে থাকি। প্রভু প্রেমের পথে সবচাইতে মূল্যবান হলো আমাদের ভিতরের পরিশুদ্ধ বিশ্বাস।
আমাদের বাহিরকে আমরা বাহিরের উপাদান দিয়ে ধৌত করতে পারি। কিন্তু অভ্যন্তরকে ধৌত করতে হয় অভ্যন্তরীন উপাদান দিয়ে। আমাদের হৃদয়ে লেগে থাকা ঘৃণা, গোঁড়ামী আর অন্ধবিশ্বাস তথা কুসংস্কারের দাগ, যা বাহিরের পানি দিয়ে ধৌত করা যায় না। যে নোংরাগুলো আমাদের হৃদয়কে প্রতিনিয়ত দূষিত করে, তা ধৌত করার জন্য প্রয়োজন এক বিশেষ উপাদান।
উপবাস বা সংযম সাধনার মধ্য দিয়ে শরীরকে শুদ্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু যখনই আপনি আপনার হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করতে চাইবেন, তা করতে হবে কেবল ভালোবাসা দিয়ে। ভালোবাসাই সেই নিরন্তর মহিমা, যা আপনাকে ভিতরে বাহিরে পরিশুদ্ধ করবে।
একমাত্র ভালোবাসাই হৃদয়কে শুদ্ধ করতে পারে।
সম্পাদকীয় – মানবীয় মাহাত্ম্য
লাবিব মাহফুজ চিশতী
বোধের সীমাহীন দরিদ্রতায় নিমজ্জিত মানবসত্তা যখন নিজেকে হারিয়ে আপন-হারা অস্তিত্ব নিয়ে অকূলে কূল পাবার চেষ্টায় ডেকে ফিরে সংকট নিবারক কে, তখনই ভক্তকূল কে উত্তরণের দায়ভার নিয়ে প্রকট হন মহাপ্রভু। যুগে যুগে তিনি আসেন। জাতিতে জাতিতে তিনি আসেন। তারই হেটে চলা পথের ধূলায় নির্মিত হয় অজস্র পথহারার পথ। পতিত মানবসত্তা খুঁজে পায় মুক্তির দিশা।
প্রভু প্রকট হন পূর্ণতম অস্তিত্বের মধ্যে। সুন্দরতম রূপের মধ্যে। যাকে আমরা বলি ইনছানুল কামেল বা অলী-আউলিয়া বা মুর্শিদ-গুরু। মহাপ্রভু গুরুরূপে ভক্তকূলকে বিলিয়ে বেড়ান মুক্তির অমিয় সুধা। ভক্তকূলকে দীক্ষিত করে তুলেন, “আর যেনো হারাতে না হয় নিজেকে”। চিরকাল মানবীয় মাহাত্ম্যে অধিষ্ঠিত থাকার শিক্ষা তিনি প্রচার করেন মানুষের দ্বারে দ্বারে।
নিজেকে নিজে চেনার, লাভ করার এই মহান শিক্ষা আধ্যাত্ম-মননে ছড়িয়ে দেবার প্রচেষ্টায় তথা আত্মোপলব্ধি ও মুক্তিচেতনা শাণিত করার প্রয়াসে শুরু হয় সুফি ভাবনার কাগজ “আপন খবর” এর পথচলা। কলতা এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফের মহান মুর্শিদ কেবলা বাবাজান হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামীর নির্দেশে এবং প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে ত্রৈমাসিক সাময়িকী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে “আপন খবর” । দাদাগুরু হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী এবং মুর্শিদ কেবলার আশীর্বাদ নিয়ে ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি হতে “আপন খবর” প্রকাশিত হয় মাসিক পত্রিকা রূপে।
একটি বছর পার করলো মাসিক “আপন খবর”। আপন অস্তিত্বে মহাসত্যের উজ্জীবনের প্রয়াসী আত্মাগুলোর তৃষ্ণা যদি এর মাধ্যমে একটুও বৃদ্ধি পায়, তবে আমাদের এ পথচলাকে সফল মনে করবো।
আপনাকে চেনা-জানা তথা আপন খবরের চর্চা চলমান থাকুন যুগ-যুগান্তরে। “আপন খবর” স্বমহিমায় চিরভাস্বর থাকুক সত্যানুসন্ধানীদের চেতনা-মানসে।
জয় হোক সকলের।
তরিতকের বাণী সমাহার
1.
যে অন্তরে মুর্শিদের প্রতি ঈমান, এশক, মহব্বত নাই, সে অন্তর মৃত।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
2.
যা তোমার আপন স্বভাবে অনুপস্থিত, সে বিষয়ে অপরকে উপদেশ দিও না।
– হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী
3.
নিজের সত্ত্বা ভুলতে পারলে, তবেই প্রভুর সাথে মিলিত হওয়া যায়।
– খাজা শেখ ফরিদ রহ.
4.
ধ্যান হলো হৃদয়ের বাতি। এটি নিভে গেলে হৃদয়ে আর আলো থাকে না।
– ইবনে আতাউল্লাহ
5.
যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুতেই আর শান্তি পায় না, সেই আসল ফকির।
– হযরত শিবলী রহ.
6.
ধর্ম একটিই। তা হলো মানব ধর্ম, মানবতা, ইনছানিয়াত।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
7.
দুনিয়া পঁচা লাশ, এর অনুসন্ধানীগণ কুকুর।
– ইমাম জয়নুল আবেদিন রহ.
8.
আত্মাকে উন্নীত করার জন্য কবিতা আবশ্যক।
– এডগার এ্যালান পো
9.
সংগীত হচ্ছে শাশ্বত ভাষা, যার আবেদন দেশ,কাল,পাত্র ভেদে অভিন্ন।
– জে জি বেইনার্ড
10.
সৃষ্টির সেবা ব্যতিত ইবাদত নাই। তসবিহ ও জায়নামাজ আল্লাহ পাওয়ার নিয়ামক নয়।
– শেখ সাদী রহ.
11.
আলিফ লাম মীম তিনেরি ভেদ, রেখেছেন সাঁই গোপ করে,
চিনগা মুর্শিদ ধরে রে মন, জাগনা মুর্শিদ ধরে।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
12.
হে প্রভু, জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব না থাকলে জানা যেত যে, তোমার উপাসকের সংখ্যা কত!
– হযরত আবুল হাসান খেরকানী রহ.
13.
যেদিন আল্লাহ আমার থেকে আমিত্ব দূর করে দিয়েছেন, সেদিন থেকে জান্নাত আমার জন্য লালায়িত আর জাহান্নাম আমার থেকে ভীতিগ্রস্ত।
– হযরত আবুল হাসান খেরকানী রহ.
14.
আল্লাহ আমাকে যে স্থানে তুলে দিয়েছেন, যদি জান্নাত ও জাহান্নামের সে স্থানে যাতায়াত থাকতো, উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।
– হযরত আবুল হাসান খেরকানী রহ.
মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ৯ম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২২ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

