আপন ফাউন্ডেশন

Date:

শয়তান গোপন ও প্রকাশ্য শত্রু : শয়তান প্রসঙ্গে আলাপ

ফেসবুক পেজ
ইউটিউব চ্যানেল

ছালমা আক্তার চিশতী

জালাল উদ্দিন খাঁ বলছেন –          

“মানুষ থুইয়া খোদা ভজো
এ মন্ত্রণা কে দিয়েছে?
মানুষ ভজো, কোরান খুঁজো
পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে।”

এই কথার ভেদ-রহস্য রয়েছে। কারণ, ভেদ উন্মোচন করার মাঝেই রয়েছে কোরানের মূল মর্ম। আধ্যাত্মিক ভেদ-রহস্য যারা জানে তারা আলিফ, লাম, মীম আসলে কি তা তারা বুঝে। আলিফ দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে, লাম দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে আর মিম দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে তা জানাই হলো কোরানের মূল ভেদ জানা। আলিফ এর ভেদ না জানা থাকলে নিজ অস্তিত্বের মাঝে খোদা রয়েছে তা জানা হবে না। কারণ, একজন মানুষ জীবিত থাকে এই আলিফের দ্বারা। লাম দ্বারা এই দেহ-ঘর নূরে নূরান্বিত হয়। আর মিম হলো মূল অস্তিত্বের প্রকাশ ও বিকাশ। কোরানের সাথে একজন মানুষ এক সুতায় বাধা কারণ, কোরানের ভেদ বিষয় জানার একটাই পথ তা হলো একজন কামেল মানুষ। একজন চেতন মানুষ হলো কোরানের মূল ভেদ। কোরানের মূল ভেদ সম্পর্কে জানতে হলে আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশ্তী নিজামীর লেখা ‘আসরারুল কোরান’ বইটি পড়লে জানতে পারবে।

বায়াত হয়ে একজন মানুষ যখন নিজ সম্পর্কে চেতন থাকে সর্বাবস্থায় তাঁর জবানেই কোরানের বাণী প্রকাশ পায়। এই অবস্থাটি তৈরি করতে হলে পরিপূর্ণ ঈমান নিয়ে নিজ সম্পর্কে চেতন থাকতে হবে। নিজ সম্পর্কে গাফেল হওয়া মানে নিজ অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলা। তাই নিজ সম্পর্কে যথার্থ চেতন থাকা মানেই ঈমানের দৃঢ়তা অর্জন করা। একজন মানুষ পারে সব কিছুকে জয় করতে। তাই বলা যায় ঈমানদার অর্থাৎ ঈমানি শক্তি অর্জন করতে হলে মনকে অনুরাগের বাহনে বসাতে হবে।

জালালউদ্দিন রুমি (রাঃ) বলছেন – ‘কম্বল কে পিটানো হয় কম্বলের বিরুদ্ধে নয়, ধুলোর বিরুদ্ধে।’ ঈমানকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে হায়ানি আত্মাকে পরিশুদ্ধ অর্থাৎ পরিবর্তন করে। যেমন একটি কাপড়ের মাঝে যদি দাগ না থাকে তবে আর তা পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই, যতক্ষণ দাগ থাকে ততক্ষণই দাগ উঠানোর চিন্তা থাকে তাই ঈমানকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে দীলে যাতে দাগ না লাগে তার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তবেই গুরুর কৃপায় আখেরে মুক্তি লাভ হবে। আদম অজুদের মাঝে নূর এবং জুলমাত দুইটি গুণ থাকে। যারা এই আদম অজুদে অন্তরাত্মার জুলমাতি গুণগুলোকে কাটিয়ে নূরে নূরান্বিত করেছেন, তারা দীলে সানুয়ারীকে পরিশুদ্ধ করেছেন। কারণ, একটি মানুষ যখন জন্ম নেয় তখন তার দীলের মাঝে ময়লা থাকে না। একটি নবজাতক শিশু হলো পবিত্র। একটি শিশুর আগে পিছে কোন পাপ থাকে না। যখন সে বড় হতে শুরু করল তখন তার মাঝে হায়ানী আত্মার গুণের জাগরণ শুরু করল। তখনই শিশুটির সৌন্দর্য্য হারিয়ে গেল কাল-বৈশাখী ঝড়ের ন্যায়। যখন কাল-বৈশাখী ঝড় আসে মানুষ অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে হলে অনেক দুঃসাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। দেখা যায় একজন মানুষের একটি মাত্র সম্বল তার নিজ বাড়ি তা এই ঝড়ের কবলে পরে ধ্বংস হয়ে গেছে। তখন সেই মানুষটি কি হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবে ? সে তার বাড়ি তৈরি করার কাজে আবার লেগে যাবে। তেমনি একজন মানুষ হায়ানী আত্মার ঝড়ে পরে তার নিজ বাড়ি/দেহ ইনসানী আত্মাকে হারিয়ে নিজ বাড়িতে ভাড়াটিয়া হয়ে আছে। কারণ, হায়ানী আত্মা কাটাতে না পারলে নিজ বাড়িতে আর থাকা হবে না। সেই বাড়িটি পরিবর্তিত হয়ে কুকুর, শুকর, বাঘ, সিংহ ইত্যাদির ঘর হয়ে যেতে পারে। সেই বাড়ি যদি ফিরে পেতে হয় তবে এই  ঝড়ে ভেঙ্গে যাওয়া বাড়িটিকে মেরামত করতে হবে। এই করাটার নামই হলো চেতন থাকা। কারণ, এই মায়ার জনমের মাঝে চেতন কয়জন থাকতে পারে? বারে বারে অচেতনতা এসে মানুষকে ঘিরে রাখে। মানুষ এই জগতের মোহ ত্যাগ করার জন্য কতইনা চেষ্টা করে থাকে।

মানুষ হলো আধ্যাত্মিক জীব। এই বিষয়টা শুধু আধ্যাত্মিক একজন মানবই বুঝতে পারে। সে হলো অন্তর্দৃষ্টিওয়ালা। যারা অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী, তাঁরা নিজ সম্পর্কে সর্বদাই চেতন থাকে, তাঁরা জানে কিসে একজন মানুষকে গাফেল করে রাখে। হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রাঃ) বলছেন ‘ধ্যান ও ইবাদত বন্দেগীর তরবারি দিয়ে যিনি যাবতীয় কামনা-বাসনা কেটে ফেলেছেন, তিনিই খাঁটি আরেফ।’ মানব জনমটা সুন্দর করতে হলে আধ্যাত্মিক ভাব নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। ঈমানের সাথে এই বিষয়গুলোর সম্পর্ক বিদ্যমান। ঈমানের বলেই মুর্শিদের সুঘ্রান প্রাপ্ত হতে হয়। কারণ, ঈমানদার মুর্শিদের সুঘ্রাণের মোজেজা বুঝে। সেই ভক্তের জ্যোতির্ময়ী সত্তা হতে জগত ব্যাপি তার আলোক-রশ্মি ছড়িয়ে পরে। যদি ঈমানের অপূর্ণতা থাকে তবে আর আত্মার উন্নতি ঘটবে না। ঈমানটা হেফাজত করার জন্যই মানুষের জীবনে সাধনা করতে হয়। নূরে ঈমানের মধ্যেই খোদার রূপ দরশন হবে। এই সাধনার দরজায় সিদ্ধি লাভ করতে হলে নির্জনতাকে প্রকৃত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নিতে হয়। যখন একজন মানুষ তার নিজ সত্তাকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টায় রত হয় তখন তার একাকি বা নির্জন হয়ে বসতে হবে। কারণ, আল্লাহর ধ্যান নির্জনতা ব্যতিত হয় না।

এই দিকে লক্ষ্য করে মহর্ষি মনমোহন দত্ত বলছেন –

“নির্জনে থাকিলে হয় ঈশ্বরত্ব বোধ,
নির্জনে সাধন করো পাইবে প্রবোধ”

মানব অজুদটাই হলো নূরের ভান্ডার। এই ভান্ডার থেকে যার নূরের জ্যোতি বিকশিত হয়েছে, তার আচার-আচরণ দ্বারাই তা বুঝা যাবে। যেমন – একটি পোকা মানুষকে কামড় দিতে পারে। কিন্তু পোকাটিকে মানুষ কামড় দিতে পারে না, ইহা তার কাজ নয়। তেমনি ঈমানকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে কতইনা প্রতিকূল পরিবেশের মোকাবেলা করতে হয়। এমনও হতে পারে মুর্শিদই ঈমান ভাঙ্গার জন্য অনেক কর্ম করতে পারে। যেমন করেছিল হযরত খাজা ওসমান হারুনী (রাঃ)। এই সমস্ত বিষয়গুলো বুঝে নিতে পারলে ঈমান প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। কারণ, মুর্শিদের সকল কর্মের মাঝেই ভেদ লুকানো রয়েছে। ভাল মন্দ এক করতে না পারলে ঈমান প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ভাল হলে একজন মুরিদের মন ভাল থাকবে আর মন্দ হলে খারাপ হয়ে যাবে। তবে আর ঐ ভেজাল/খান্নাছযুক্ত বা আমিত্বময় হৃদয় দ্বারা ঈমান প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। যেমন – কাপড় ছিড়ে গেলে তা আর পুনরায় আগের মতো হয় না। ঠিক তরিকতের বিষয়টা আলাদা। নফসে আম্বারা মানুষের নফস মোৎমাইন্নাহ’কে ছিড়ে ফেললে তা পুনরায় ঠিক করা যায়, ঈমানের পূর্ণতার বলে।

এই মানব জনমটা টিকিয়ে রাখতে হলে মনকে কাদা-মাটির ন্যায় করে নিতে হবে। তা করে নেওয়াটার মাঝেই লুকিয়ে আছে ভক্তের সাধনা। এই সাধনা সম্পর্কে জানাটাও একটি জ্ঞান।  জ্ঞানী যারা তারা ছাই এর মাঝে মানিক খুঁজতে থাকে। কারণ, সৃষ্টির সর্ব কিছুতেই আল্লাহর সৃষ্টি-লীলার জ্ঞান লুকিয়ে রয়েছে। আধ্যাত্মিক জ্ঞানীরা তা জানেন, তাই তারা হলো জ্ঞানপিয়াসী।  সাধারণ চিন্তাধারা দিয়ে খোদার ভেদ জানা যায় না। খোদের মাঝেই খোদার ভেদ গোপন রয়েছে। যারা খোদ সম্পর্কে চেতন তারা খোদার ভেদ জানতে পেরেছে। হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রাঃ) বলছেন – “গাফেল হৃদয়ে কিভাবে বন্ধুর দয়া ও ভালোবাসার আলো জ্বালবে, চেতন হৃদয় ব্যাতিত সে নূরের অবরোহন স্থল নেই।” আল্লাহ চেতন মানুষের মাঝে অবস্থান নিয়ে কথা বলে, দেখে, শুনে, হাটে চলে। নিজ সম্পর্কে চেতন হওয়া মানেই খোদার ভেদ রহস্য উন্মোচিত করা।

যার মান আরাফা হয়েছে সে এই ভেদ বুঝতে পারে। এই বুঝটা সাধারণ জ্ঞান দ্বারা বুঝা যাবে না। মানুষের জীবনে আল্লাহর দয়া রয়েছে। সেই দয়ার ফসলই হলো এই মানব ছুরত। কারণ, ভাগ্যের ফেরে মানব জনম না হয়ে পশুর জনমও হতে পারত। খোদার সাথে যারা অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখে তারাই পারে তার সাধনায় সিদ্ধি লাভ করতে। যেমন – কেউ যদি কানে না শোনে তার কাছে কোরান পড়া অথবা গালি গালাজ করা একই মনে হবে, ঠিক তেমনি হতে হয় একজন ঈমানদারের অবস্থান। কারণ, একজন প্রকৃত ঈমানদার সে তার নিজ অস্তিত্ববোধ রাখে না। নিজ সম্পর্কে বেখেয়ালী হলে অকাল মৃত্যু ঘটবে। একজন ভক্তের জন্য মুর্শিদ স্বয়ং হলো ঈমান অর্থাৎ ঈমানের ছুরত। গুরু ঈমান, গুরুর নিকট আনুগত্য/বায়াত যে গ্রহণ যারা করেছে তারা হলো ঈমানদার।

আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশ্তী নিজামী (কুঃ ছেঃ আঃ) তাঁর গানের মাঝে বলছেন –

“নবীর ঈমানেতে মিলবে আমান
আগে ঈমান চিন আপনার,
বেনজীর কয় ঈমান আমার
মুর্শিদ সরোয়ার।”

খোদা যেই আমানত দিয়েছেন তার কতটুকু হেফাজত করা হয়েছে তা নির্ধারিত হয় নিজ সম্পর্কে চেতন বা অচেতন থাকার মাঝে। কারণ, আমানত চিনে হেফাজত করার মাঝে খোদার পরিচয়ও রয়েছে। নিজ অস্তিত্বের মাঝে খোদাকে ধারণ করা অর্থাৎ অন্ধকারের মাঝে আলো দেখা। তার অজুদ হবে জ্যোতির্ময়ী। নিজেকে হেফাজত করাটাই হলো মানুষের মূল কর্ম। যেমন, কার কাছে কোন জিনিস হেফাজত রাখা হলে তা কিভাবে সুরক্ষিত থাকবে তা খেয়াল রাখতে হয়। যদি বেখেয়ালি হয়ে যায় তবে আর জিনিস হেফাজত করা হবে না। তেমনি ঈমানকে হেফাজত করতে হলে মূল বস্তুর (খোদার জাতের) দিকে খেয়াল রাখতে হবে তবেই মূল গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।

মূল বস্তুটি হলো ইনসানিয়াত। ইনসাফ শক্তি যার মাঝে বিরাজিত রয়েছে সেই ব্যক্তি হলো ইনসান, রুহে ইনসানীর অধিকারী। ইনসানিয়াতের সাথেই আল্লাহর সর্ব বিষয় জড়িত আছে। যারা দিব্যদৃষ্টির অধিকারী, তারা ঈমানকে সচল রাখার জন্য সর্ব সময় খেয়াল রাখে। আমাদের সমাজের মাঝে দেখা যায় বৃহৎ একদল লোক ঈমান না এনেই ঈমানের দাবী করে চলছে, পিতৃ ধর্মের অনুসারী ; সংখ্যায় ৭২ কাতার। আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান আনতে হয়, আর তা হলো একজন গুরুর নিকট বায়াত গ্রহণ করা (সুরা ইউসুফ-১০০, সুরা ফাত্তাহ-১০)। মানব গুরুর মাধ্যমে আল্লাহর নিকটই বায়াত গ্রহন করা হচ্ছে, আল্লাহ নিজেই তা স্বীকার করেছেন (সুরা ফাত্তাহ-১০)। কাজেই যারা বায়াত ভঙ্গ করছে তারা আল্লাহর নিকট হতেই ঈমান ত্যাগ করেছে বিধায় তারা আর মুসলমান থাকছে না। একটু লক্ষ্য করে দেখুন, আবু জাহেল, আবু লাহাব বা নমরুদ, ফেরাউন যুগে যুগেই বর্তমান। 

ঈমান ত্যাগ করা ব্যক্তি, তারা ঈমানদারদের ঈমান ভাঙ্গার জন্য বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপ করে থাকে।

যারা দুনিয়ার স্বার্থে ঈমান ত্যাগ করে তাদের ঈমানের মূল্য হলো পাঁচ টাকা, যে কেউ তা কিনতে পারে। দুনিয়ার স্বার্থে যারা ঈমান ত্যাগ করে হাশরের দিন আল্লাহপাক তাদের দিকে তাকাবেন না (বোখারী)। বায়াত ভঙ্গকারী অপবিত্র-জাহান্নামী (বোখারী-৫খন্ড)। আবার তারা টাকা-পয়সা, দালান-কোঠা কিংবা দুনিয়ার স্বার্থ পূরণ হয় এই রূপ বস্তু দ্বারা ঈমান ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে থাকে। বলতে বাধ্য হলাম, আমাদের উপরও আবু লাহাব বা ফেরাউনদের (স্বঘোষিত ধার্মিক, গুরুকে অস্বীকারকারী, গুরু ত্যাগীদের) দ্বারা এ ধরণের ঘটনা বর্তমান। আল্লাহপাক আমাদের প্রতি দয়া করেছে, ঈমানকে হেফাজত করার শক্তি দান করেছেন, নয়তো ঈমান রক্ষা করা একটু কঠিন হতো। শুধু এই প্রার্থনা, আল্লাহ যেন প্রকাশ্য শত্রু মানবরূপী শয়তানদের (ইন্নাহু লাকুম্ আদুউ্যুমমুবীন) থেকে আমাদের ঈমানকে হেফাজত করার তওফিক দান করেন।

শয়তান কি ? কোথা হতে এবং কোন দিক দিয়ে ঈমানের উপর আক্রমণ করে তা গুরুর দয়ায় আমরা চিনতে পেরেছি। যারা গুরুকে চিনতে পেরেছে তাদের ঈমান এই সমস্ত ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেলরা কখনোই ভাঙ্গতে পারবে না। বায়াত ভঙ্গ করা মানে নিজেই নিজের ক্ষতি করা/জাহান্নামী করা (সুরা ফাত্তাহ-১০)। যার গুরু নেই তার গুরু হলো শয়তান এবং সে শয়তানেরই বান্দা বলে অভিহিত হবে। ঈমানদার আর কাফের-মুনাফেকের মধ্যে কখনো বন্ধুত্ব হয় না, আত্মীয়তা হয় না-ইহা কোরানেরই কথা। মানব গুরুকে যারা অস্বীকার করলো তারা আল্লাহকেই অস্বীকার করলো। কারণ, বায়াত আল্লাহর নিকটই হতে হয়, মানবগুরু তার উছিলা (সুরা ফাত্তাহ-১০, সুরা মায়েদা-৩৫)।

যারা মানব গুরুকে অস্বীকার করে তারা ফেরাউন। ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেল, আবু লাহাব তারা হলো স্বঘোষিত ধার্মিক-পিতৃধর্মের অনুসারী। তাদের মতবাদ যারা গ্রহণ করবে তাদের অবস্থান হবে নিকৃষ্ট পশুর মতো, জাহান্নামী হবে তারা। ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেল, আবু লাহাবরা কখনো গুরুকে স্বীকার করেনি, এখনো করে না। ইমাম জয়নাল আবেদীন বলছেন – ‘দুনিয়ার সন্ধানীগণ কুকুর সদৃশ্য।’ তারা এই জগতেই নিজ ছিরাত অনুসারে সুরত নির্ধারণ করে যাচ্ছে, দোযখের আমলনামায় জাহান্নামী অজুদ তৈরী করে যাচ্ছে। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) বলছেন – “পার্থিব স্বার্থ পূরণ না হলে যারা বায়াত ভঙ্গ করে হাশরের দিন আল্লাহপাক তাদের প্রতি তাকাবেন না (বুখারী ৫ম খন্ড)।” একথাটি নবুয়ত এবং বেলায়েত উভয় যুগেই চিরসত্য।

যারা আখেরাতকে ভুলে, জাগতিক জগতের স্বার্থের মোহে পড়ে গুরুকে ত্যাগ করে দুনিয়ার সুখ সন্ধানে মগ্ন, তারাই জাহান্নামের কুকুর। তাদের খোদার ভয় নেই, খোদার প্রতি তাদের মাত্রই ঈমান নেই। সে পীর-মাওলানা যে-ই হোক। কারণ, যাদের খোদার ভয় থাকে তারা এইরূপ বেলেহাজ কর্ম করতে পারবে না। যারা মুরিদ হয় নাই তাদের থেকে আরো অধিক ঘৃনিত যারা মুরিদ হয়েও মানব গুরুকে দুনিয়ার স্বার্থে ত্যাগ করে অর্থাৎ সে ঈমানকেই ত্যাগ করলো। ইমাম আবু হানিফা (রাঃ) বলছেন, “আমি যদি ইমাম জাফর আস সাদেক (আঃ)-এর নিকট বায়াত না হতাম, তবে আমি নোমান ধ্বংস হয়ে যেতাম।” সমস্ত আল্লাহর ওলীদের মূল বক্তব্যও ইহাই-যা কোরান সম্মত। যারা গুরুকে দুনিয়ার স্বাথের্র জন্য ত্যাগ করছে তারা জাহান্নামী।

কারণ, যারা গুরুর আনুগত্যে আসেনি বা বায়াত গ্রহণ করেনি তারা আল্লাহ কর্তৃক পথভ্রষ্ট (সুরা কাহাফ-১৭)। তারা ঈমানদার নয় ; আর যারা গুরুর নিকট বায়াত গ্রহণ করেছে তারাই ঈমানদার-আল্লাহরই হাতে বায়াত গ্রহণ করেছে-ইহাই আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান আনা হলো (সুরা ফাত্তাহ-১০, ইউনুছ-১০০)। সুতরাং যারা বায়াত ভঙ্গ করেছে তাদের কোনো বন্দেগীই আল্লাহপাক কবুল করবে না। কোরান বলছে, “আল্লাহপাক হাশরের দিন প্রত্যেককে তার ইমামের সাথে ডাকবেন।” সেদিন যার মুর্শিদ বা গুরু নেই তাকে শয়তানের দল বলে ডাকা হবে এবং শয়তানের কাতারে শামিল হওয়ার জন্য নিদের্শ দেওয়া হবে (জা’আল হক)। মানব গুরুর থেকে ঈমান ত্যাগ করা মানেই আল্লাহর থেকে ঈমান ত্যাগ করা। 

ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেলরা তা কোনো কালেই  স্বীকার করেনি। যারা দুনিয়ার স্বার্থে ঈমান ত্যাগ করেছে তারা ঈমানদারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র, অত্যাচার-নির্যাতন বা মানসিক নির্যাতন করে থাকে যুগে যুগে তাই দেখা যায়। ওরা জুলুমবাজ জালেম, আর জালেমদের স্থান জাহান্নামের সর্বনি¤œ স্তরে (কোরান দ্রঃ)। ঈমান দেখার জিনিস, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ঈমান আনা যায় না এবং না দেখেও ঈমান আনা যায় না। ঈমান আল্লাহর জাত নূর হতে প্রকাশ, মানব জাতির জন্য এক বিশেষ রহমত। আল্লাহপাক যাকে ঈমান দান করেন তিনিই একজন গুরুর সান্নিধ্যে অবস্থান করতে পারেন। আর যে নিজ প্রবৃত্তির পূজক হয় আল্লাহপাক তার ঈমান কেড়ে নিয়ে ঈমান শূন্য করে জাহান্নামী করে দেন। সুতরাং ঈমান রক্ষা করাই হলো দ্বীনে মুহাম্মদীর মূল বিষয় এবং আল্লাহপাকের দয়া ছাড়া ঈমান রক্ষা করা যায় না। যে স্বীয় প্রবৃত্তিকে গুরুর মর্জির উপর ছেড়ে দিয়েছে আল্লাহপাক তার উপরই রহিম নামের দয়া বর্ষণ করে জান্নাতি করে দেন।

যারা গুরুর নিকট হতে ঈমান ত্যাগ করেছে বা গুরুকে অস্বীকার করছে তারা গুরুকে নিজের মতোই সাধারণ মানুষ মনে করে এবং অন্যের ঈমান নষ্ট করার জন্য নমরুদ, ফেরাউন, আবু জাহেল, আবু লাহাবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এরা শয়তানের ধর্মের অনুসারী-প্রকাশ্য শয়তান (কোরান), তাদের অনুসরণ করতে বা তাদের পথে না চলার জন্য কোরানে কঠোর ভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং এরা যুগে যুগেই গুরুর বিরোধীতায় বর্তমান। তাদেরকে চিনতে না পারাটাই হলো পথভ্রষ্টতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ, আর চিনতে পারাই হলো দ্বীনের পথে থাকার প্রমাণ। কারণ, তাদেরকে না চিনতে পারলে তাদের ধোকা-প্রবঞ্চনা হতে ঈমান রক্ষা করা সম্ভব নয়। এ ধরনের প্রকাশ্য শত্রু শয়তান (যার মধ্যে শয়তানের/নফস আম্মারা গুণ-খাছিয়ত আছে) বাবা-মা, ভাই-বোন বা আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধবও হতে পারে। যারা নিজেরা ঈমান শূণ্য হয়ে গেছে মানে বে-ঈমান তারাই শয়তানের/ফেরাউন, নমরুদের, আবু জাহেলের ভূমিকা নিয়ে অন্যের ঈমান নষ্ট করার চেষ্টায় রত থাকে। তাদেরকে যদিও দেখতে মানুষের মতো মূলতঃ ওরাই হলো মানবরূপী শয়তান। 

বিষয়টি এমন যেমন, ‘এক শিয়াল মুরগি চুরি করার জন্য এক বাড়িতে গেল, শিয়াল মুরগি চুরি করতে গিয়ে বাড়ির মালিকের হাতে ধরা পরে গেল। তখন বাড়ির মালিক শাস্তিস্ব^রূপ শিয়ালের লেজটি কেটে দিল। লেজ কেটে দেওয়ার পর শিয়াল লজ্জায় গর্তে গিয়ে লুকিয়ে রইল। এভাবে আর কতো দিন থাকবে, বের হতে পারছে না লজ্জা, তাই এক দিন সে জঙ্গলের সব শিয়ালদের খবর দিল। সব শিয়াল আসার পর সে গর্ত থেকে পুরোপুরি না বের হয়ে সব শিয়ালদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল, দেখ, আমাদের এ লেজটিতো কোন কাজে লাগে না, বরং মুরগী চুরি করতে গিয়ে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়, তাই এসো আমরা সবাই লেজটি কেটে ফেলি। তখন বৃদ্ধ এক শিয়াল বললো, এমন কথা তো জীবনেও শুনি নি! চল সবাই মিলে গর্ত হতে তাকে বের করে  দেখি বিষয়টি আসলে কি? গর্তের ভিতর থেকে বের করে আনার পর সবাই দেখতে পেল শিয়ালটির লেজ কাটা!’ যেহেতু নিজের লেজ নেই, তাই সে অন্যের লেজ কাটার পরামর্শ দিচ্ছে। ঠিক তেমনি দশা হয় প্রকাশ্য শত্রু শয়তান-বেঈমান লোকদের। সে তার নিজের ঈমান ধরে রাখতে পারেনি, এখন উদ্দেশ্য হলো অন্যের ঈমানও সে নষ্ট করবে। এরা সর্বযুগেই বাস করছে, ঈমান রক্ষার জন্যই তাদেরকে চিনতে হবে।  ওরা পারিবারিক ও সামাজিক দুই দিক থেকে ঈমান ভাঙ্গানোর চেষ্টা করে থাকে। যুগে যুগে মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, দাদা-দাদী, চাচা-চাচী এই রূপ নিজ রক্তের সম্পর্কের লোক শয়তানের অনুসারী-ভক্ত সেজে ঈমান ভাঙ্গার চেষ্টা করে যাচ্ছে। হযরত খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রাঃ) বলছেন ‘ভ্রাতৃত্ব দু’ প্রকারের। এক ভাই হচ্ছে রক্তের সম্পর্কের। দ্বিতীয় ভাই হচ্ছে দ্বীনি বা ধর্মের। উভয়ের মধ্যে দ্বীনি ভাইয়ের মর্যাদা অধিক। কেননা রক্তের বন্ধন যার সাথে তার সঙ্গে ঝগড়া, বিবাদ ও বিচ্ছেদ ঘটতে পারে। কিন্তু দ্বীনি ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হচ্ছে আত্মার যা কখনও বিচ্ছিন্ন হয় না।’ দ্বীনি ভাই-বোন সম্পর্কটি চিরস্থায়ী আর রক্ত সম্পর্কটি ক্ষণস্থায়ী। যারা গুরুর নিকট বায়াত গ্রহণ করেনি বা তাঁর নীতি-আদর্শের উপর নেই তারা দ্বীন ইসলামের মধ্যে নেই, তাদের সম্পর্কটি ইহজগতেই শেষ হয়ে যাবে। নবী-রাছুল বা ওলীর দল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাহান্নামী হয়ে যাবে।

এ সম্বন্ধে হযরত খাজা একটি ঘটনা বললেন, আপন দুই ভাই ছিলো। তাদের মধ্যে একজন মুমিন ও অন্যজন কাফের ছিলো। সত্তাগত দিক থেকে মুসলমান ভাইয়ের সত্তা কাফের ভাইয়ের সত্তাকে অস্বীকার করবে সুতরাং এ বন্ধন দূর্বল বলে বিবেচিত হবে। দ্বীনি ভাইয়ের বন্ধন মজবুত হওয়ার কারণ হচ্ছে পরকালে এরা একে অপরের সন্নিকটে থাকবে। (ফাওয়াদুল ফাওয়াদ ১০৮পৃঃ)  বেখেয়ালি লোক দ্বারা তরিকতের কর্ম   একেবারেই করা সম্ভব না কারণ, যারা তরিকতের কর্ম সাধনা করবে তারা চেতন মানুষ। ঈমান দ্বারাই তরিকতের মূল গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। ঈমানদারের ঈমানের ছুরত মাটিতে এবং আসমানে উভয় স্থানেই থাকে। আসমান ছাড়ে আর জমিন ধারণ করে, আসমানী ছুরত ঈমানদারগণ জমিনেই প্রত্যক্ষ করে। যারা উম্মতে মুহাম্মদী নয় তারা ঈমানকে চিনবে না, দেখবে না বিধায় তারা ঈমানের নূর হতে বহু দূরে সরে যাবে এব খোদাকে চিনবে না, দেখবে না- এরাই হলো পথভ্রষ্ট  (কোরান)। যেমন একটি ঘর সেই ঘরের দরজা বন্ধ থাকলে কোন মানুষ সেই ঘরে পৌঁছাতে পারবে না। আর যদি সেই ঘরের দরজা খুলে দেওয়া হয় তবে সেই ঘরের মাঝে সব মানুষই প্রবেশ করতে পারবে। একজন মুর্শিদের দরবার ঠিক তেমনি ঘরের খোলা দরজার নেয় ঈমানদারদের জন্য আর যারা ঈমান শূন্য তাদের অবস্থান হবে বন্ধ দরজার মতো। কারণ, তারা ঘর এবং দরজা কোনটাই দেখবে না, ঈমানের বলেই খোদাকে পাওয়া য়ায়। মুর্শিদের প্রতিটা পদক্ষেপের দিকে, নির্দেশের দিকে খেয়াল রাখতে হবে । কারণ, গুরু ভক্তের ঈমান পরীক্ষা হয় প্রতি মুহুর্তে। তাই প্রতি মুহুর্তে এই পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই প্রস্তুত থাকা মানেই চেতন থাকা। ঈমানকে হেফাজত করতে পারাটাই হলো সর্ব সাধনায় সিদ্ধি অর্জন করা।

শয়তান গোপন ও প্রকাশ্য শত্রু : শয়তান প্রসঙ্গে আলাপ
ছালমা আক্তার চিশতী

সাবস্ক্রাইব করুন
ফেসবুক পেজ
ইউটিউব
হোয়াটসএপ গ্রুপ
টেলিগ্রাম গ্রুপ