মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ১০ম সংখ্যা, মার্চ ২০২২ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত
প্রবন্ধ – রঁওযা বা মাজার জিয়ারত ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
মহান জাতপাক আল্লাহ কোরানুল করিমের সুরা ইউনুসের ৬২ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “আলা ইন্না আউলিয়াআল্লাহে লাখাওফুন্ আলাইহিম ওয়ালা হুম্ ইয়াহ জানুনা” অর্থাৎ সাবধান! নিশ্চয় আল্লাহর আউলিয়াগণের (বন্ধুদের) কোনো ভয় নেই এবং তাঁরা কখনো চিন্তিতও হবেন না।
সুরা বাকারা ১৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে “ওয়ালা তাকুলু লিমাই-ইউকতালূ ফী সাবিলিল্লাহে আমওয়াতুন বাল আহইয়াউন ওয়ালাকিন লা তাসউরূনা” অর্থাৎ এবং তাদেরকে মৃত বলিও না, যারা আল্লাহর রাস্তার (সাধনায়) মধ্যে কতল হয়েছেন, বরং তাঁরা জীবিত, এবং তোমরা উহা জানতে পার না (অনুধাবন করতে পার না)।
একথা উহুদের যুদ্ধে শহীদানদের মাজারে গিয়ে কাফেরগণ বলতো, তোমরা মুহাম্মদের কথায় যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করেছ, দুনিয়ার সুখ ভোগ করতে পারনি। দেখ আমরা এখনো জীবিত আছি দুনিয়ার সুখ আমরা ভোগ করছি। আল্লাহপাক কাফেরদের এ কথার মোকাবেলায় উক্ত আয়াত নাজিল করে বলেছেন – না তাঁরা মৃত নয়, বরং জীবিত, যদিও তোমরা বুঝতে পার না বা জানতে পার না। রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামও বলছেন, “আউলিয়া আল্লাহে লা ইয়ামুতুন বালইয়ান তাকিলু মিন দারুল ফানা ইলা দারুল বাকা” অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের মৃত্যু নেই বরং তারা স্থানান্তরিত হয় ধ্বংসশীল ইহলোক হতে স্থায়ী পরলোকে। কাজেই আল্লাহর অলিগণ হলেন লামউতের অধিকারী তথা চিরঞ্জীব জগতের বাসিন্দা।
জামাদাত, নাবাদাত ও হায়ানাত- এ তিন জামাতের উর্দ্ধে তাদের অবস্থান, যেখানে ইনছানিয়াতের জগত। অন্যান্য সাধারণ মানুষ স্তর বিশেষে সিরাতে হায়ানাত, নাবাদাত ও জামাদাত শ্রেনীভূক্ত তথা আঠার হাজার মাখলুকাতভূক্ত হয়ে অবস্থান করে। রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন, “মুতু কাবলা আনতা মাউত” অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বেই মৃত্যুবরণ করো তথা হায়ানাত, নাবাদাত ও জামাদাতের গুণ-খাছিয়ত পরিহার করে ইনছানের গুণ-খাছিয়ত তথা ইনছানিয়াত অর্জন করে লামউতে স্থিত হও তথা চিরঞ্জীব হয়ে যাও। এ পথে ধাবিত হওয়ার রাস্তা হলো নফসে আম্মারার গুণ-খাছিয়ত পরিশুদ্ধ করে ছালাত কায়েম করা। এই লামউতের অধিকারীগণই হলো নবুয়তে নবী-রাছুল আর বেলায়েতে তাদেরকে বলা হয় কামেল মুর্শিদ বা অলি-আউলিয়া। তাদের সাথে থাকার জন্য আল্লাহপাক হুকুম করেছেন আমানুগণকে তথা নতুন ঈমানওয়ালা বা ভক্তগণকে।
মুমিনদের উপর আল্লাহর কোনো হুকুম নেই। কারণ, তারা দায়েমী ছালাতে উপর স্থিত আছে। কোরানে তাই বলা হয়েছে, “ইয়া আয়্যুহালল্লাযিনা আমানুত্তাকুল্লাহা ওয়াকুনু মা’আছ ছাদেকীনা” অর্থাৎ হে আমানুগণ তথা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের বা অলিদের সঙ্গে থাক। সুরা বাকারাতে আরো বলা হয়েছে, “ওয়ালা তাহ্তাসাবান্নাল্লাযিনা ফি সাবিলিল্লাহি আমওয়াতুন” র্অথাৎ তাদেরকে মৃত বলে ধারণাও করো না, যারা আল্লাহর রাস্তায় কতল হয়েছে। কাজেই আল্লাহর অলিগণ মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের কোনো ক্ষমতা নেই ইত্যাদি যারা বলে তারা অবশই আল্লাহ ও তাঁর রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের বিরুদ্ধে কথা বলে থাকে এবং তারা স্পষ্ট কুফরীতে লিপ্ত আছে। নবী-রাছুল অলি-আউলিয়াগণ তাদের জেসমানী অজুদ ছেড়ে মালাকী অজুদ ধারণ করে আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতা বলে সর্বত্রই গমনাগমন করতে পারেন জীবিত বা ইন্তেকালের পর উভয় অবস্থায়ই। শত শত প্রমাণ রয়েছে কিতাবাদিতে বা বাস্তবেও।
ইন্তেকালের (কালান্তর বা স্থান পরিবর্তন) পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মৃত দেহের অবস্থান স্থলকে আরবীতে কবর বলা হয়। শুধু কবরে শায়িত ব্যক্তির মর্যাদার পার্থক্যের কারণে পুনরুত্থানের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সে মোতাবেক নবী-রাছুলদের এবং অলি-আউলিয়া তথা পীর-মুর্শিদের কবরকে বলা হয় রঁওযা আর ফার্সি ভাষায় বলা হয় মাজার বা দরগাহ এবং সাধারণ মানুষের মৃতদেহের অবস্থান স্থলকে কবর বলা হয়। রঁওযা মানে বেহেশতের বাগান। মাজার স্থানগত বিশেষ্য শব্দ। ধাতুগত অর্থ দর্শনার্থে গমন করা। সাধারণতঃ অলি-আউলিয়াগণের সমাধিস্থলকে মাজার বলা হয়, রঁওযাও বলা হয়। “তাফসিরে কানজুল ঈমান ও খাজাইনুল এরফানে” সুরা কাহাফের ২১ নম্বর আয়াতের টিকার মাসআলা বর্ণিত আছে, “মাজার হতে বরকত লাভ করা জায়েজ” এবং এ কথা ফতোয়ায়ে আলমগিরীর ২য় খন্ডে-র ৫৫১ পৃষ্ঠায়ও বিধৃত আছে। হযরত আল্লামা আলহাজ্ব মোঃ আজিজুল হক আল কাদেরী আস-সাঈদী সাহেব তাঁর রচিত “আস সায়েক্বাহ” কিতাবে বলেছেন, “মাজার করাটা হচ্ছে একটি উত্তম ও জায়েজ কাজ। বুযুর্গদের মাজারকে সর্বসাধারণের জিয়ারতের সুবিধার জন্য তার উপর ঘর তৈরী করা উত্তম ও জায়েজ এবং সুন্নতে সাহাবা”।
রঁওযা ও মাজারের উপর ঘর বা গম্বুজ করার নিয়ম-নীতি প্রত্যেক নবী- রাছুলগণের যুগ হতে আমাদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম পর্যন্ত এবং তারপর আল্লাহর সমস্ত অলিদের মধ্যেই তা প্রচলিত আছে। যেমন, রোখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ “এরশাদুস সারীর” মধ্যে উল্লেখ আছে যে, আমাদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের পূর্বে যতো নবী রাছুল ছিলো তাদের সকল রঁওযা সমূহ পাকা করে তাঁর উপর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে দিতেন যাহা দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পরও পূর্ব স্মৃতিগুলো ঝকঝক করতো। প্রমাণস্বরূপ আজো পূর্বেকার নবী-রাছূলদের রঁওযা যেমন, হযরত বাগদাদ শরীফ হতে ৪৩০ কিঃ মিঃ উত্তরে মওসুল শহরের দজলা নদীর দক্ষিণ পার্শ্বে এক পাহাড়ের চূড়ায় হযরত ইউনুছ আলায়হিস সালামের মাজার শরীফ, যেখানে যেতে ১৫৭টি ধাপ অতিক্রম করে যেতে হয়, ইরাকে হযরত জোনাইদ বোগদাদী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হির মাজারের উত্তর পাশে নবী হযরত ইউশা ইবনে নুন আলায়হিস সালামের মাজার, মওসুল শহরে নবী হযরত ইউনুছ আলায়হিস সালামের মাজার হতে ২ কিঃ মিঃ উত্তরে রয়েছে হযরত শীষ আলায়হিস সালামের মাজার, হযরত শীষ আলায়হিস সালামের মাজার হতে দেড় কিঃ মিঃ উত্তর-পশ্চিমে মওসুল শহরে হযরত জরজীজ আলায়হিস সালামের মাজার বিদ্যমান, তিনি তৎকালীন শাম দেশের দা-দিয়ানা বাদশাহ্’র জামানার পয়গাম্বর ছিলেন।
ইরাকের মওসুল শহরের হযরত জরজীজ আলায়হিস সালামের মাজারের ৪/৫ শত গজ উত্তর-পশ্চিমে হযরত দানিয়েল নবী আলায়হিস সালামের মাজার রয়েছে, জর্ডানে আম্মান শহরের অনতিদূরে এক পাহাড়ের চূড়ায় নবী হযরত শোয়াইব আলায়হিস সালামের মাজার শরীফ রয়েছে, সিরিয়ার দামেস্কে হযরত ইয়াহ্ইয়া নবী আলায়হিস সালামের মাজার শরীফ বিদ্যমান আছে, বায়তুল মোক্বাদ্দাসের সীমানার বাইরে কিছুটা পূর্ব-দক্ষিণে পাহাড়ের উপর হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের মাজার রয়েছে, হযরত দাউদ আলায়হিস সালামের মাজার শরীফটি বারো হাত লম্বা, বায়তুল মোক্বাদ্দাস হতে ১০/১৫ কিঃ মিঃ দক্ষিণে গিয়ে প্রধান সড়কের প্রায় ২/৩ কিঃ মিঃ পশ্চিমে হযরত মুসা আলায়হিস সালামের মাজার বিদ্যমান, তাঁর মাজার শরীফ এগারো হাত লম্বা, বায়তুল মোক্বাদ্দাস হতে ৫০ কিঃ মিঃ দক্ষিণে হেবরণ শহরে হযরত ইবরাহীম আলায়হিস সালাম, হযরত ইসহাক আলায়হিস সালাম, হযরত ইউসুফ আলায়হিস সালাম, হযরত সারা আলায়হিমাস সালামসহ কয়েকশ নবীর মাজার শরীফ রয়েছে, ফিলিস্তিনের “আল খলীল” শহর থেকে ৬ মাইল দূরবর্তী লূত উপসাগরের কূলে হযরত লুত আলায়হিস সালামের মাজার শরীফ বিদ্যমান আছে, শেরে খোদা, আমিরুল মুমিনীন, মহানবীর আহলে বাইয়্যেতের প্রধান হযরত আলী ইবনে আবি তালিব আলায়হিস সালাম এবং নবী হযরত নূহ আলায়হিস সালামের মাজার ইরাকের নজফ শহরে বিদ্যমান আছে, কারবালার ময়দান হতে ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত নজফ শহরের প্রায় ৯/১০ মাইল এলাকাব্যাপী বিস্তৃত এক কবরস্থানের পশ্চিম পাশে প্রসিদ্ধ নবী হযরত ছালেহ আলায়হিস সালাম এবং হযরত হুদ আলায়হিস্ সালামের মাজার শরীফ রয়েছে, তারা যথাক্রমে সামুদ এবং আদ্ গোত্রের মাঝে প্রেরিত হয়েছিলেন এবং হযরত ইয়াকুব আলায়হিস্ সালামের রঁওযা অদ্যাবধি নিজ নিজ স্থানে বিদ্যমান আছে।
হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু যখন বায়তুল মুক্কাদ্দাস বিজয় করেন তখন বায়তুল খলিলের মধ্যে উক্ত স্মৃতিগুলো বিদ্যমান ছিলো এবং তিনি বড় আবেগের সাথে রঁওযাগুলো জিয়ারত করেন। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু সেখান থেকে ফিরে এসে রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা, আলে রাছুল ও সাহাবাগণের মাজার বা রঁওযাগুলো পাঁকা করেছিলেন। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম পশ্চিম দিকে মাথা মোবারক এবং পূর্ব দিকে পা মোবারক দিয়ে শায়িত আছেন। কারণ, এখান থেকে দক্ষিণ দিকেই কাবা শরীফ অবস্থিত আছে। তখন থেকে ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের রাজত্বকাল পর্যন্ত রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা ঐ ভাবেই বিদ্যমান ছিলো। এরপর খলিফা ওয়ালিদের নির্দেশে হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু একে ভেঙ্গে চিত্রাঙ্কিত পাথর দ্বারা পুনঃ নির্মাণ করেন। আর এর বাহিরে অপর একটি দালান তৈরী করেন।
৫৫০ হিজরীতে জামালউদ্দীন ইস্পাহানী নামক এক মহান ব্যক্তি যার দান খয়রাতের কথা মদিনা শরীফের দিক-দিগন্তে মুখরিত ছিলো, তিনি রঁওযা শরীফের চারিপাশে চন্দন কাঠের একখানা জালি তৈরী করেছিলেন। এ সময় মিশরের উজির ইবনে আবিল হাইজার শরীফ সাদা ‘দীবা’ বা একপ্রকার সূক্ষ্ম রেশমী কাপড়ের তৈরী গিলাফ পাঠান, যার মধ্যে লাল রেশমী ফুল অংকিত ছিলো এবং তাঁর উপর সুরা ইয়াছীন লেখা ছিলো। খলিফা মুস্তাজী বিল্লাহর নির্দেশে তিনি এই গিলাফ রঁওযা শরীফের উপর পড়িয়ে দিয়েছিলেন। ৬৭৮ হিজরীতে ‘কলাউল ছালেহী’ রঁওযা শরীফের উপর সবুজ গম্ভুজ যা মসজিদের ছাদ থেকেও বেশি উঁচু, তামার জালি সহ নির্মাণ করেন। এরপূর্বে ছাদ হতে দু’হাতের বেশি উচু ছিলো না। এরপরে শাহ্ ফয়সল এবং বাদশাহ ফাহাদের আমলে এক বিরাট কর্মসূচীর মাধ্যমে হেরামাইন শরীফাইন সংস্কার করা হয়, যা বর্তমানে বিদ্যমান আছে। এ বিষয়ে ‘জজবুল কুলুব ইলা দিয়ারিল মাহবুব’ কিতাবে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
মদীনা শহর, তার গম্বুজ ও মিনার দৃষ্টিগোচর হলে তাজিমের জন্য সওয়ারী হতে নেমে পড়বে। সম্ভব হলে মসজিদে নব্বী পায়ে হেটে যাবে। হাদিসে বর্ণিত আছে, আবুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধি দল মদীনায় পৌঁছে যখন রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামকে দূর থেকে দেখতে পায়, তখন উট বসানোর পূর্বেই তারা উটের পিঠ হতে লাফিয়ে মাটিতে পড়ে যায়।
চার মযহাবের ইমামগণের মতে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম এর রঁওযা মোবারকের পবিত্র স্থানটি, যে স্থানটি হুজুর সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের পবিত্র শরীরের সাথে সংযুক্ত, তা সমস্ত সৃষ্টি জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এমনকি বায়তুল্লাহ, বায়তুল মামুর, আরশ-কুরশী, লওহ, কলম হতেও পবিত্রতম। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের শান, মান-মর্যাদার জন্যই তাঁর রঁওযা মোবারকের এ মর্যাদা এবং তিনি কাবারও কাবা।
কোরানুল করিমের সূরা কাহাফের ২১ নম্বর আয়াতের শেষাংশ হলো, “কালাল্লাজীনা গালাবু আলা আমরেহীম লানাত্তা খেজান্না আলাইহীম্ মাসজেদান্” অর্থাৎ তাদের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এ বিষয়ে বললো, তাদের গুহার মধ্যে অবশ্যই আমরা একখানা মসজিদ তৈরী করবো। এ আয়াতের টিকার মাসআলায় ‘কানজুল ঈমান’ ও ‘খাজাইনুল এরফান’ তাফসীরের ২য় খন্ডে ৫৩৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, মাজার ও মাজারের পাশে মসজিদ নির্মাণ করা জায়েজ এবং মাজার জিয়ারত সুন্নত। রঁওযা বা মাজারে অবস্থিত ব্যক্তিকে একমাত্র উপাস্য জেনে জিয়ারত করা হারাম। রঁওযা বা মাজার জিয়ারত করা মানে নিজেকে রঁওযা বা মাজারে পরিণত করার শিক্ষা গ্রহণ করা।
হায়ানীয়াত দূর হলেই ইনছানিয়াতের জাগরণ ঘটে, আর তখনই ঐ মানুষটি মাজার (জিয়ারতের স্থান) বা রঁওযায় পরিণত হয়ে যায়। একজন রাছুল-আউলিয়ার মাজার বা রঁওযা (যেখানে সমাধি) জিয়ারত হতে এ শিক্ষাই নিতে হবে এবং তাঁর নিকট দোয়া প্রার্থী হতে হবে। দোয়া করতে হবে “হে আল্লাহ ! আমার কবরকে রাছুলের রঁওযার নিকটবর্তী করে দাও”। যারা নিজেকে মাজার বা রঁওযায় পরিণত করার শিক্ষা নেয় না, তারা করছে কবর পূজা। যা পূর্ববর্তী নবীগণের অনেক উম্মতগণ করেছিলো বিধায় নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন, “তোমরা পূর্ববর্তীদের ন্যায় আমার কবরকে পূজা করিও না”। কিন্তু জিয়ারত নিষেধ নয়। যেমন হাজি সাহেবেরা এবং যাদের সামর্থ আছে তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারক জিয়ারত করে থাকে। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন, “আমার রঁওযাকে ঈদ বানিয়ো না”- এ হাদিস সর্ম্পকে হাফেজ ইবনে মুনযের বলেন, সম্ভবত; হাদিসের উদ্দেশ্য অধিক পরিমাণে জিয়ারতে উদ্বৃদ্ধ করা অর্থাৎ আমার কবর জিয়ারতকে ঈদের মতো বানিয়ো না, মানে বছরে একবার দু’বারের বেশী জিয়ারত করতে আসবে না, অধিক পরিমানে জিয়ারতে আসবে।
রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারক জিয়ারত করা ওয়াজিব এবং সে উদ্দেশ্যে সফর করাও ওয়াজিব। এ জিয়ারতের জন্য হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের শাফায়াত অবধারিত বলে সহীহ হাদিসে বিধৃত আছে। ইমাম তকিউদ্দীন সুবকী (৭২৭ হিজরী) তাঁর লিখিত ‘সিফাউল সিকাম’ কিতাবের সূত্রে অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা আঃ জলিল সাহেবের লিখিত ‘আহকামুল মাজার’ কিতাবের ৩৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, শুধু রওযা শরীফের উদ্দেশ্যেই সফর করা এবং জিয়ারত করা উত্তম ইবাদত এবং নৈকট্য লাভের উত্তম পন্থা (মূল কিতাবের ৪৩ পৃষ্ঠা)। যদি রঁওযা জিয়ারতের মাধ্যমে নিজের হায়ানী আত্মা বা নফস আম্মারার ফেল ত্যাগ করে ইনছানিয়াতে স্থিত হতে পারে তবেই হবে উত্তম ইবাদত এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন, “যে ব্যক্তি কেবল আমার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আমার রঁওযা শরীফে আসবে এবং আগমনের মধ্যে আমার জিয়ারতই তাকে উদ্বুদ্ধ করবে, তাহলে পরকালে তার জন্য শাফায়াতকারী হওয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব হয়ে পড়বে”(তিবরানীর মো’জামে কবির এবং দারকুতনীর আমালী গ্রন্থ)। জানা দরকার, ইহকাল এবং পরকাল এক সাথেই আছে। ইহকাল ত্যাগ করলেই পরকাল প্রাপ্ত হওয়া যায়। শাফায়াত হবে পরকালে অর্থাৎ চৈতন্যের জগতে। এখানেই মুক্তির জগত। এই বিষয়ে রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম অনেক কথাই বলেছেন। যেমন –
১। “মান যারা কবরি, আজাবাত্ লাহু শাফায়াতি” অর্থাৎ রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম এরশাদ করছেন, যে ব্যক্তি আমার রঁওযা জিয়ারত করেছে, তার জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজেব হয়ে গেছে।
এ হাদিসটি ‘দারে কুতনী’ এবং ‘বায়হাকী’ ও অন্যান্যগণ বর্ণনা করেছেন। ইমাম সুব্কী বলেছেন যে, এ হাদিসটি ‘হাসানুন’-এর উচ্চ মর্যাদা পেয়ে ‘সহীহুন’ বা বিশুদ্ধতার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
২। “মান যারা কব্রি, হালাত লাহু শাফাাতি” অর্থাৎ যে ব্যক্তি আমার রঁওযা জিয়ারত করলো, তার জন্যে আমার শাফায়াত হালাল হয়ে গেলো।
এ হাদিসটি ইমাম আবু বকর আহমদুল বায্যার স্বীয় ‘মসনদে’ নকল করেছেন। পূর্বোক্ত হাদিস হতে এ হাদিসটির মধ্যে ‘আজাবাত’ এর পরিবর্তে ‘হালাত’ শব্দটি রয়েছে বিধায় এ হাদিসটি আলাদাভাবে আবারো তুলে দেয়া হলো। এ হাদিসটিকে উক্ত হাদিসের মোতাবেয়াত (অনুগামী) এবং সবুত বা প্রমাণ হিসেবে ধরা যেতে পারে।
৩। “মান জায়ানি যায়েরান্ লা ইয়া’মালুহু হাজাতুন্ ইল্লা যিয়ারাতি কানা হাক্কান আলাইয়া আন্ আকুনা লাহু শাফিয়ান্ ইয়াওমাল্ কিয়ামতে” অর্থাৎ যে ব্যক্তি জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আমার কাছে এলো এবং এ কাজে সে জিয়ারত ছাড়া নিজেকে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলো না, তাহলে আমার উপর জরুরী হবে যে, আমি কেয়ামতের দিন তার শাফায়াতকারী হবো।
এ হাদিসটি তিরবানী ‘মো’জমে কবীর’-এর মধ্যে, দারেকুতনী ‘আমালী’-এর মধ্যে এবং আবু বকর ইবনুল মুক্রী ‘মো’জাম’-এর মধ্যে সহীহ্ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৪। “মান্ হাজ্জা ফযারা কব্রি বা’দা অফাতি ফাকাআন্নামা যারানি ফি হায়াতি” অর্থাৎ যে ব্যক্তি হজ্জ করলো, অতঃপর আমার ওফাতের পর আমার (কবর) রঁওযা জিয়ারত করলো, সে যেন আমার জীবদ্দশাতে আমার সাথে সাক্ষাৎ করলো।
এ হাদিসটিকে দারে কুতনী তাঁর ‘সুনানে’ এবং অন্যান্য মুহাদ্দিসগণও রেওয়ায়েত করেছেন। ইমাম সুবকী এ রেওয়ায়েতের সনদের উপর বাহাছ করে সমস্ত আপত্তি খন্ডন করে বিরুদ্ধবাদীদের চমৎকার জবাব দিয়েছেন। এ ইবারতটি আবু আহামদ ইবনে আদী ‘কামিল’-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। অনেক মুহাদ্দেসীন তো এ রেওয়ায়েতটিতে ‘সহেবাণী’ শব্দটি বৃদ্ধি করেছেন, যার অর্থ এটাই যে, “ঐ জিয়ারতকারী সাহাবী হওয়ার মর্যাদা লাভ করবে”।
৫। “মান্ হাজ্জাল বাইতা, ওয়ালাম্ ইয়াযুরনী ফাকাদ জাফানী” অর্থাৎ যে ব্যক্তি বায়তুল্লায় হজ্জ সম্পন্ন করলো, অথচ আমার সঙ্গে জিয়ারত করলো না, সে ব্যক্তি আমার প্রতি অন্যায় বা যুলুম করলো।
এ রেওয়ায়েতটি ইবনে আদী তাঁর ‘কামিল’-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। এ রেওয়ায়েতের সনদে ‘আন-নো’মান ইবনে শিবলিন্’ রয়েছে, তার সম্বন্ধে ইমাম সুবকী বলেছেন, তাকে ইমরান ইবনে মুসা ‘ছিকা’ (মো’তাবর, বিশ্বস্ত) বলেছেন এবং মুসা ইবনে হারুন তাকে ‘মুত্তাহিম’ (দোষারোপকারী) বলেছেন। মতান্তরের শেষে সিদ্ধান্ত হলো তাকে বিশ্বস্ত বলেই সাব্যস্ত করা হয়েছে।
৬। “মান্ যারা কব্রি আও মান্ যারানি কুন্তো লাহু শাফিয়ান্ আও শাহিদান” অর্থাৎ মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম হয় (মান্ যারা কব্রি) বলেছিলেন অর্থাৎ আমার কবরের জিয়ারত করেছে, না হয় বলেছিলেন (মান্ যারানি) অর্থাৎ যে আমার জিয়ারত করেছে, আমি তার শাফায়াতকারী হয়ে গেলাম অথবা এ কথা বলেছেন, তার সাক্ষী হয়ে গেলাম।
এ হাদিসটিকে আবু দাউদ তায়াল্সি তাঁর ‘মুসনাদ’-এর মধ্যে রেওয়ায়েত করেছেন।
৭। “মান্ যারানি মোতাআম্মেদান, কানা ফি জাওয়ারি ইয়াওমাল্ কিয়ামতে” অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এবং নিয়ত করে আমার জিয়ারত করবে, সে কেয়ামতের দিন আমার হেফাজতে থাকবে।
যদিও এ রেওয়ায়েতের সনদে হারুনকে আয্দি অগ্রহণযোগ্য দলিল বলে পেশ করেছেন, কিন্তু ইবনে হাব্বান তাকে ‘ছেক্কাহ’ বা মো’তাবার-এর মধ্যে গণ্য করেছেন। আর ইবনে হাব্বানের মর্যাদা আয্দি হতে অনেক উপরে।
৮। “মান্ যারানি বা’দা মওতি ফাকাআন্নামা যারানি ফি হায়াতি” অর্থাৎ নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন, যে ব্যক্তি আমার ওফাতের পর আমার জিয়ারত করলো সে যেন আমার জীবদ্দশাতেই আমার সঙ্গে জিয়ারত করলো।
এ বর্ণনাটি দারে কুতনী প্রভৃতিরা বর্ণনা করেছেন। কিছু কিছু সনদে এ শব্দগুলো বেশী রয়েছে, “ওয়ামান্ মাতা বে আহাদিল্ হারামাইনে, বোয়েছা মিনাল্ আ’মেনীনা ইয়াওমাল কিয়ামতে”। অর্থাৎ যে ব্যক্তি হারমে মক্কা অথবা হারমে মদিনাতে মৃত্যুবরণ করলো, কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তির প্রশান্ত অবস্থায় পুনরত্থান হবে।
৯। “মান্ হাজ্জা হাজ্জাতাল্ ইসলামে ওয়া যারা কব্রি ওয়া গাজা গাজওয়াতান্ ওয়াছাল্লা আলাইয়া ফি বাইতিল মকদেসে লাম্ ইয়াস্আল্হুল্লাহু আয্যা ওয়া জাল্লা ফিমা ইফতারাদা আলাইহি” অর্থাৎ যে ব্যক্তি ফরজ হজ্জ আদায় করলো এবং আমার রঁওযা জিয়ারত করলো এবং সে জেহাদ করলো এবং বায়তুল মোকাদ্দাসে গিয়ে আমার উপর দুরূদ পাঠালো, আল্লাহপাক তার কাছে অন্যান্য ফরজসমূহের বিষয় কোনো প্রশ্ন করবে না।
হাফেজ আবুল ফতহুল আয্দি এ রেওয়ায়েতটি বর্ণনা করেছেন।
১০। “মান্ আতাল্ মদিনাতা যায়েরান্ লি আজাবাত লাহু শাফায়াতি ইয়াওমাল কিয়ামতে, ওয়ামান্ মাতা ফি আহাদিল হারামাইনে, বোয়েছা আমেনান্” অর্থাৎ যে ব্যক্তি মদিনায় আমার জিয়ারতের জন্য এলো, তার জন্যে আমার শাফায়াত কিয়ামতের দিন ওয়াজিব হয়ে গেলো। আর যে ব্যক্তি দু’টি হারামের মধ্য হতে কোনো একটি হারামে মৃত্যুবরণ করলো, তাকে কিয়ামতের দিন আরামের সঙ্গে পুনরুত্থান করা হবে।
এ হাদিসটি ইয়াহইয়া আল হুসাইনী “আখবারুল মদিনাতে” উল্লেখ করেছেন।
১১। “মান্ লাম ইয়াযোর কবরি, ফাকাদ জাফানি” অর্থাৎ যে ব্যক্তি আমার রঁওযা জিয়ারত করলো না, সে আমার সঙ্গে বে-ইনছাফি করলো।
এ হাদিসটি ইবনুন নাজ্জার “আদ্-দুররাতুস সামিনা” কিতাবের সূত্রে “সেফাউস সেকামের” ২৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে।
১২। “মান্ যারানি বিল্ মদিনাতে মুহ্তাসেবান্ কুনতো লাহু শাহিদান্ ওয়া শফিয়ান্”। অর্থাৎ যে ব্যক্তি পূণ্যার্জনের নিয়তে মদিনায় আমার সঙ্গে জিয়ারত করলো, আমি তার সাক্ষী এবং সুপারিশকারী হবো।
অন্য একটি রেওয়ায়েতে আছে, “মান্ যারানি মুহতাসেবান্ এলাল্ মদিনাতে কানা ফি জেওয়ারি ইয়াওমাল কিয়ামাতি” অর্থাৎ যে ব্যক্তি পূণ্যার্জনের নিয়তে মদিনা পর্যন্ত এসে আমার জিয়ারত করলো, সে কিয়ামতের দিন আমার হেফাজতে থাকবে।
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুর এ বর্ণনাটি তিনটি সনদের মাধ্যমে বর্ণনা করার পর ইমাম সুবকী বলেছেন, এ সনদ তিনটি মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল ইবনে আবি ফদিকের উপর নির্ভরশীল এবং তিনি “মুত্তাফেকুন” আলায়হি- এর তরিকায় সনদ হিসেবে পেশ করার যোগ্য। এ হাদিসগুলো “সেফাউস্ সাকামের” ২০-২৬ পৃষ্ঠা হতে তুলে দেয়া হলো।
১৩। যে ব্যক্তি মূল উদ্দেশ্যরূপে আমার জিয়ারত করে, সে কিয়ামতের দিন আমার পড়শী হবে।
১৪। যে ব্যক্তি মক্কায় হজ্জ করার পর আমার উদ্দেশ্যে আমার মসজিদে আসে তার জন্যে দু’টি মকবুল হজ্জ লেখা হয়। এখানে রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের জিয়ারতকে মকবুল হজ্জের সমান বলা হয়েছে। (হৃদয় তীর্থ মদীনার পথে- ১৪৪ পৃষ্ঠা)।
কবিতা – অমৃত সুধা
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
ওহে জীব মানবগণ, করো সত্য আকিঞ্চন
হবে ব্যক্ত গোপন তোমার হৃদ আঙ্গিনায় –
ছাড় প্রবৃত্তির ধর্ম, করো নিত্যের কর্ম
হবে নিবৃত্তির ধর্ম এ বসুন্ধরায়।
প্রবৃত্তি আমিত্বময়, নিবৃত্তি তিনিত্বময়
প্রবৃত্তি থাকিতে নয় নিবৃত্তির কর্ম –
ছাড় প্রবৃত্তির কর্ম, পাবে নিবৃত্তির মর্ম
পরম ধর্ম নিত্যের কর্ম।
স্বরূপ স্রষ্টার অভিপ্রায়, প্রকাশিতে বসুন্ধরায়
তাইতো হলে সৃষ্টির বাসনা –
স্রষ্টা আছে কিবা নাই, কে সুধাবে তাই
নহে জীবন বৃথা, তুমি আমি যত জনা।
তুমি আমি যতজনা, মহাসত্যের প্রকাশনা
হলো অনিত্যের সূচনা –
নিত্য হতে অনিত্যে, আবার গমণ নিত্যে
ভ্রমভাব মহা ছলনা।
মহাসত্য নির্গুণ আত্মা, তা হতে ব্যোম তথা
ত্রি-আত্মা তথা জীবাত্মাময় –
দ্বি-আত্মা হইতে যতো, ত্রি-আত্মা প্রকাশিত
জীব আর পরম তাইতো এ ভবময়।
নিরাকার হতে আর, ধরিল জীবের আকার
দ্বি-মিশ্রণে সাকার এই ভূবনে –
জীব ছাড়া নিরাকার নয়, তা বিনে কে স্রষ্টা কয়
স্রষ্টা সৃষ্টি এই ভবময়, গাঁথা একতনে।
সে গোপন আমি প্রকাশ, তাইতো হলো সৃষ্টির বিকাশ
জীবের প্রকাশ বিনে কি তা হয় –
তাই সৃষ্টির আদি মুহাম্মদ, হলো স্রষ্টার প্রেমাস্পদ
সৃষ্টিতে পেয়ে হদ, লুকায় ভূবনময়।
আলাক্ব হতে খালাক্ব করে, মুহাম্মদী হিজাব পড়ে
মাছালু নূরীহি দিয়ে এলো দ্বাদশে –
সেই ছিলো এই হলো, এমকানে ঝলক দিলো
রূপাতীত রূপে এলো আরব দেশে।
সে আমি একাকার মায়াভ্রান্তি পর্দা তার
অভেদ প্রভেদ হলো, হলো দ্বিত্বকার –
হারিয়ে আদি রূপ আমি তুমি বান্দা প্রভু
বিভেদ্য বাসনায় চলে, নিত্য লীলাকার।
এখন জীবে আমিত্ব নিয়া, স্রষ্টার ভাব ছেড়ে দিয়া
আমি তুমি বিভেদ নিয়া তাই –
পড়ে মহা ভ্রান্তির গোলে, কাটিয়ে কাল মায়ার কোলে
আমি তুমি বিভেদ গাই।
আমি আদি আমি অন্ত, তাইতো ছিল মূল মন্ত্র
ভ্রান্তি বশে হলো ক্ষ্যান্ত, ভাবিছি সদায় –
কাটিয়ে মায়াভ্রান্তির পাশ, করো আদ্য মহাশক্তির বিকাশ
হবে আত্মবিভেদ্য বিনাশ, এই ভূবনময়।
গাও সবে সাম্যের গান, বিভেদ নয় সবাই সমান
ভয় কিরে জীবগণ এই ভবেতে –
যথা হতে আগমন তথাস্তঃ হবে গমন
হিন্দু কি মুসলমান আর খ্রিষ্টানেতে।
নিত্য তত্ত্ব মানুষ সত্য, জাগাও তব মনুষ্যত্ব
পরমার্থ শুদ্ধ চিত্ত হইবে যখন –
পরমার্থ পরম ভাব, হৃদে পড়বে তারই প্রভাব
নূরাল্লাহ বিভা রূপ হইবে তখন।
বেনজীর কয় কথা মান, ইহাই স্রষ্টার বিধান
হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিষ্টান শুধু বাহ্যতে –
সুবাক্য আর সৎ কর্ম, সে পায় স্রষ্টার ধর্ম
সেজনই পূজনীয় এই ভবেতে।
প্রবন্ধ – সত্য বড় তিতা
লেখক – সালমা আক্তার চিশতী
একজন মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাকে তার আত্মসম্মানবোধের উপর ভিত্তি করে। যার আত্মসম্মান নেই, তার মাঝে ব্যক্তিত্ব নেই। আত্মসম্মান একটি ক্ষণস্থায়ী/ধ্বংসশীল, অপরটি চিরস্থায়ী। একটি দুনিয়ার, অপরটি আখেরাতের। একটি অকল্যাণের/লাঞ্ছনাময়, অপরটি কল্যাণের/মর্যাদাময়। মানুষের আত্মসম্মান নষ্ট হয় দুনিয়ামুখী চিন্তা-চেতনার দ্বারা। অহংবোধ হতে যে আত্মসম্মানের প্রকাশ ঘটে, তা ক্ষনস্থায়ী এবং লাঞ্ছনাময়। এর দ্বারা পরকাল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অহংবোধের মূলে রয়েছে ঘোর অজ্ঞানতা। মনুষ্যত্ব হারিয়ে যারা অজ্ঞানান্ধকারে ঘুরপাক খাচ্ছে, তাদের দ্বারাই ঘটে যত অঘটন। কারণ, তরিকতে/ধর্মজগতে থাকলে ছয় রিপু/নফসে আম্মারা বা হায়ানী আত্মার অধিকারী মানবরূপী পশুদের দ্বারা নির্যাতিত হতে হয়। ওরা বহু লেজের অধিকারী। তা না কাটতে পারলে হাশরের দিন সেই লেজগুলো লোক সমাজে প্রকাশিত হবে এবং হবে জাহান্নামী। বাহিরের রূপটি মানবরূপ কিন্তু ভিতরে রয়েছে ভয়ঙ্কর পশু-প্রবৃত্তি। তাই তাদেরকে বলা হয় নরপশু। ওরাই হলো শয়তানের বান্দা। কারণ, ওরা শয়তানের ধর্মে দাখেল হয়ে আছে। মানবদেহে নফস আম্মারা হলো শয়তানের/খান্নাছের অবস্থানের জায়গা। এই অবস্থানটি দুই রকম। মানুষের ভিতর থেকেও হতে পারে, আবার বাহির থেকেও হতে পারে। ভিতরের পশুত্বটি যখন বাহিরে আসে তখনই সে হয় মুক্তিকামী মানুষের জন্য প্রকাশ্য শত্রু (কোরান দ্রঃ)। এ ধরণের প্রকাশ্য শত্রুদের ব্যক্তিস্বার্থের বলি হচ্ছে মুক্তিকামী মানুষ বা সাধারণ মানুষগুলো। ওরা তাগুতের পূজা করছে বা বাছুর পূজা করছে (কোরান দ্রঃ)। এ ধরণের বিচিত্র দুনিয়ামূখী মানবরূপী পশুদের জাগতিক ধন-সম্পদের মোহে বা মনের মাঝে লালিত অসুরত্ব/পশুত্বের কারণে অন্ধ হয়ে অন্ধকার কবরে বাস করছে- এটি তাদের মগজে ঢুকছে না (সুরা হুমাযা, ১-৪)। অন্ধ-বধির বোকারা বসে আছে দেহ ত্যাগের পরে মাটির অন্ধকার কবরে বাস করবে বলে। মোল্লাদের কুশিক্ষার ফল ইহা। আরব বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক মেয়েদের বায়াত সম্পর্কে তাঁর রচিত “রাসূলের (স.) যুগে নারী স্বাধীনতা” কিতাবের ৪৬২ পৃঃ বলছেন – “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে মেয়েদের বাইয়াত গ্রহণ কয়েকটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে। প্রথম ইঙ্গিত- নারীর স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব এবং সে নিছক পুরুষের অধীন নয়, বরং পুরুষের মত তাকেও বাইয়াত করতে হয়। দ্বিতীয় ইঙ্গিত, মেয়েদের বাইয়াত ইসলামের বাইয়াত এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য। এ বিষয়ে নারী ও পুরুষ সমান। পুরুষরাও অনেক সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে হুবহু মেয়েদের বাইয়াতের ভাষায় বাইয়াত করতো।”
মাটির কবরে মানুষ যাবে না, যাবে মানুষের দেহটি। নানা ফেরকার মোল্লাদের কামড়াকামড়িতে (ইয়াজুজ-মাজুজ) ইসলাম ধর্ম ৭৩ তালির পোশাক পড়ে জোকার সেজেছে। মূর্খ মোল্লাদের রচিত বিধানের কারণেই নারীগণ ভেদ-বিভেদ, বৈষম্যের শিকার হয়ে আছে সমাজে। একদল অন্ধ-বধির-মুর্দা নারীগণও তা মেনে নিয়েছে। ওরা মনে করছে কিছু শাস্ত্র আওড়ালেই ভুরি ভুরি ছোয়াব মিলবে! পাবে জান্নাত! সেখানে নারী দেহ ভোগ করতে পারবে,- এ ধরনের অলীক কিচ্ছাই তাদেরকে অন্ধ-বধিরে পরিণত করছে। সেদিন বুঝবে তাদেরকে অলীক ছোয়াবের কিচ্ছা শুনিয়ে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু ফিরে আসার সুযোগ হবে না। ইসলাম বাস্তব ধর্ম। অনুমান-অলীক কিচ্ছার ধর্ম ইহা অবশ্যই নয়। তাদের এ দশা কেনো ? কারণ, ওরা অন্ধকার কবরে বাস করে চিৎকার করছে, তারা তাদের নিজের তকদির পরিবর্তন করতে চাচ্ছে না তাই। ওরা খোদার নিকট প্রার্থনা করতে জানে না, চাইতে জানে না। আল্লাহ বলেন, তুমি চাওয়ার সাথে সাথেই আমি তোমাকে দিয়ে দিব। কিন্ত না তাগুতের/বাছুর পূজারীরা/বস্তুবাদীরা চাওয়া বলতে, ধন-সম্পদ, পুত্র-কন্যা, ব্যবসা-বানিজ্য, রোগ-ব্যাধি ইত্যাদি হতে মুক্তির জন্য দোয়া চাইছে। ওরা দোয়া করতেই জানে না। এ ধরণের লোকগুলো দ্বারাই ধর্ম জগত বিকৃত হয়। ঈমানদারগণ (যারা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান এনছে) এ ধরনের ধর্মান্ধ দৈত্য-দানবদের দ্বারাই নির্যাতিত, সমালোচিত, বাঁধাগ্রস্ত হয়ে থাকে সমাজে, বিশেষ করে নারী সমাজ। ঘরে বাইরে রয়েছে তাদের অবস্থান। প্রবাদ বাক্য রয়েছে – “নিজের চরকায় তেল না দিয়ে অন্যের চরকায় তেল দেওয়া।” অশুদ্ধ মানুষের স্বভাব এইরূপই হয়, যারা মানুষরূপী পশু তাদের স্বভাব হয় এইরূপ। গুরু ভজন করতে গিয়ে অনেক বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়, ধর্মান্ধ দৈত্য-দানবদের মোকাবেলা করতে হয়। আমার দাদা গুরু দেওয়ান শাহ্ রজ্জব আলী চিশতি নিজামী একটি গানের মাঝে বলছেন “থাকলে লোক লজ্জা কুল কলংকের ভয়, রজ্জব কয় যাইসনে সেই খানে।” লালন সাইজি বলছেন “যায় যাবে ছাই জাত কুল মান তাতে ক্ষতি নাই, যদি আমার প্রাণ বন্ধুরে পাই।”
মহাপুরুষগণ জাগতিক জগতের মান-মর্যাদাকে/জাত-কুলকে অস্বীকার করে চিরস্থায়ী জাতের/মান-মর্যাদার অধিকারী হয়েছে। ইতিহাসে তার হাজার হাজার নজীর রয়েছে। এইরূপ বহু কথা জ্ঞানীরা বলছেন। এর মানে অশালীন চলাফেরা বা অশালীন পোশাক পড়া নয়। যারা আধ্যাত্মিক জ্ঞানীদেরকে সম্মান করতে পারে না তারা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে লানত/অভিশাপ প্রাপ্ত। নারীদের গুরুর নিকট যাওয়া পারিবারিক ও সামাজিক ভাবে মেনে নিতে পারে না। কারণ, অন্ধ মূর্খরা মনে করে নারীদের কবর, হাশর, মিজান, পুলছিরাত, বেহেশত বা দোযখ নেই। যুগে যুগে নারীরা এই পুরুষ শাসিত অন্ধ-মূর্খ সমাজের কাছে নির্যাতিত হয়ে আসতেছে। কারণ, পুরুষরা মনে করে নারীরা শোকেসে সাজিয়ে রাখার পুতুল। যখন তার দরকার মনে হবে তখন সে শোকেস থেকে বের করবে, আবার যখন তার দরকার নেই তখন শোকেসের ভেতরে ভরে রাখবে। জেল খানার ন্যায় সেই মেয়েটির জীবন। ভোগবাদী পুরুষদের এই হলো চরিত্রের হাল। চেয়ে দেখুন আফগানিস্তানের কুখ্যাত মৌলবাদ তালেবানদের দিকে। ওরা নারী লোভী ধর্মান্ধ দৈত্য-দানব। বিধবা বা কুমারী মেয়েদেরকে ঘর হতে জোর করে বের করে নিয়ে বিয়ে করছে। কুলীন-অকুলীন নেই, সম-অসম নেই, যাকে পছন্দ হচ্ছে/মনে চাচ্ছে তাদেরকেই জোর করে ধরে নিয়ে বিয়ে করছে। বন্য পশুর মতো নারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাতে এক বিভীষিকাময় চিত্র ফুটে উঠেছে আফগানিস্তানের মধ্যে (যুগান্তর)। তাদের এ ধরনের শাস্তি পাবার কারণ হলো তারা নারী। অথচ বোখারী ও মুসলিমের হাদিস হতে জানা যায়, হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাছুল স. বলেন, “বিধবা নারীর নির্দেশ ও কুমারীর অনুমতি ব্যতিরেকে বিবাহ দেয়া যাবে না।” নারী তাদের নিকট শুধু ভোগ্যপণ্য ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ধরনের ধর্মান্ধ দৈত্য-দানবেরা আবার মুসলমানও দাবী করছে, মেয়েদের পর্দার দোহাই দিচ্ছে আবার দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের লীলা খেলাও চালাচ্ছে। রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলছেন “পৃথিবী একটি সম্পদ তার উত্তম সম্পদ হচ্ছে নেককার নারী।” (বোখারী ও মুসলিম, রাছুল সা.-এর যুগে নারী স্বাধীনতা, প্রথম খন্ড।)।
অন্ধ-মূর্খ গোয়ার গোবিন্দের দল শুধু কাপড়ের পর্দা হিজাব দ্বারাই নারীদের মর্যাদা নির্ণয় করছে, গুণ-খাছিয়ত দ্বারা নির্ণয় করার শক্তি তাদের নেই। নারীদের জন্য পর্দার কঠোরতা বা বাড়াবাড়ি পুরুষ জাতির দূর্বলতা বা অধঃপতন হতে সৃষ্টি। যদিও শুধু জৈবিক দেহের নারী-পুরুষ দ্বারা ধর্ম জগতের বিচার বিশ্লেষন চলে না। হযরত রাবেয়া বসরী (র.) বলছেন “যারা দুনিয়ার প্রেমি সেই লোকগুলো পুরুষ হলেও সে নারী আর যেই মানুষটি আল্লাহর প্রেমিক সে জৈবিক দেহের নারী হলেও সে পুরুষ।” পুরুষ হওয়াটা অনেক বড় সাধনার বিষয়। জৈবিক দেহের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করাটাই হচ্ছে সাধনা। “নারী কখনো বেহেশতে যাবে না”- রাছুলের এ কালামকে অন্ধ-বধির আলেম মোল্লারা জৈবিক দেহের নারী বুঝিয়ে মুসলিম সমাজকে ধ্বংস করছে, পথভ্রষ্ট করে চলছে, অথচ হাকিকত হলো ওরা নিজেরাই নারী ; সে ভেদ বুঝেনি। মোহ যা চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করতে বাঁধাস্বরূপ এসে দাড়িয়ে থাকে নারীত্ব। যেমন – মিষ্টি ধরলে হাত আঠা হয়ে যায়, সেই আঠা ধোয়ার জন্য পানির প্রয়োজন হয় ঠিক তেমনি মোহ দীলকে দুনিয়াবি চিন্তা দ্বারা আবৃত করে রাখে, সেই আবরণ দূর করতে হলে দীলের মাঝে অনুরাগ তৈরি করতে হবে, মুর্শিদের বিশ্বাস-ভক্তি-প্রেম হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। মুর্শিদের জাত আর খোদার জাত এক বুঝতে হবে, এক দেখতে হবে, নয়তো কালেমা পড়লে শেরেক হবে। মুহাম্মদ রাছুলই হলেন একমাত্র মুর্শিদ, চিনে নিতে হবে তাঁর পরিচয় কি ? তিনিই যুগে যুগে বর্তমান, হেদায়েতকারী। আল্লাহর সৃষ্টিতে মুর্শিদই একমাত্র মুক্তির কান্ডারী-কালেমাতে ইহাই দেখানো হয়েছে। যারা কালেমা জানে তারা এ ভেদ-রহস্য অবশ্যই জানে এবং চিনে মুর্শিদ/গুরু কে ? আর অন্ধ-মূর্খরা তার সমালোচনা করে-ইহাই জাহান্নামী হওয়ার প্রমাণ। তবেই দুনিয়া থেকে আখেরাতে প্রবেশ করতে পারবে। একজন নারীকে তুচ্ছ ভাবাটাই ভুল, নিজেই নারী তার প্রমাণ। খোদার নিকট জৈবিক নারী পুরুষ প্রভেদ নেই। কিছু নিচু মনের (অসভ্য-পশুত্ব স্বভাবের) মানুষদের দ্বারা নারীরা নিজ গন্তব্যের/আখেরাতের পথ হারিয়ে দিকভ্রান্ত হয়ে থাকে। যাদের মনে গুরু দেয়া অনুরাগ শক্তি রয়েছে তারা ঐ সমস্ত নরপশুদের/শয়তানের বান্দাদের শত ধোকা-প্রবঞ্চনায়ও ঈমান হারাবে না। কারণ, তাদের অন্তরাত্মার মাঝে অনুরাগস্বরূপ গুরু বাস করে। তারা ঈমানে কামেল হয়ে আছে। শয়তানের শত চক্রান্তেও তাদের ঈমান হারাবে না। মানবরূপী শয়তান সব সময়ই ঈমানদারদের পিছনে লেগে আছে। মানবরূপ না ধরে শয়তান মুক্তিকামী মানুষ বা ঈমানদারকে ধোঁকা দিতে পারে না, ইহাই তার সহজ পথ। এরাই হলো প্রকাশ্য শত্রু (কোরান দ্রঃ)।
যার ঈমান আছে সে-ই গুরুতেই খোদা দর্শনকারী হয়, যারা কিছু পায়নি তারা তাদের ঈমানের দূর্বলতার কারণেই পায়নি। কবি জালাল খাঁ বলছেন, “পীরের ছুরতে খোদা আছেন এই জগতে, না থাকিলে নাই তোমার বিশ^াসের কারণ। বিশ্বাস বিহনে পাবে না এই জীবনে, রয়ে সয়ে থাকলে পাবে প্রভু নিরাঞ্জন।” যারা চেতন মানুষ সে জৈবিক দেহের পুরুষ হোক বা নারী হোক সে আত্মার নূরকে চিনতে পারে তাই সে দৃঢ় মনোভাব নিয়ে চলে। দেহের নূর আর আত্মার নূর এক নয়, তা চেনা দরকার। যেমন লবন পরিমাণ মত হলে তরকারির স্বাদ অক্ষুন্ন থাকে, আর যদি ভাতের ও তরকারির মাঝে পরিমানের চেয়ে বেশি লবন দেওয়া হয় তবে সেই খাবার খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পরে। ঠিক তেমনি একজন নারীর স্বাধীনতার উপর অহরহ যদি হস্তক্ষেপ করে সে জাগতিক জগতে যতো আপনজনই হোক না কেন তার প্রতি তিক্ততা এসে যাবে।
মনের মাঝে শয়তানের ক্রিয়া থাকলে নিজের সন্তান ও ভাইয়ের সন্তান এক দেখার মতো মনোভাব দীলে থাকবে না। তাই একজন নারীর ধর্ম জগতে যদি তার চাচা বা মামা বাধাস্বরূপ এসে দাঁড়িয়ে যায় তবে সেই নারীর ভাবতে হবে তার সামনে প্রকাশ্য শত্রু শয়তান এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান হলেও তারা হবে মানবরূপী শয়তান। দুনিয়ার স্বার্থপূরণ করতে গিয়ে মা ও বাবা সন্তানের দিকে ফিরে তাকায় না। আমি জাগতিক জগতের কথাই বলি যেমন – একটি মুরগির যখন বাচ্চা ফুটে তখন দেখা যায়, মুরগির বাচ্চাকে কোন মানুষ বা জীব-জন্তু ধরতে আসলে মুরগি তার বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য তার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে। যারা ব্যক্তিস্বার্থ পূরণ করতে গিয়ে সন্তানের কথা ভুলে যায় সেই বাবা এবং মা সামান্য একটি মুরগির চেয়েও নিকৃষ্ট। বাদুর যেমন যেই মুখ দিয়ে খায় আবার সেই মুখ দিয়ে পায়খানা করে, কিছু কিছু মা বাবার আচরণ ঠিক বাদুরের ন্যায়। ব্যক্তিস্বার্থ পূরণ না হলে চেহারা হয়ে যায় পেঁচার মতো। জগতের আত্মীয়তা ক্ষণস্থায়ী, চিরস্থায়ী অবশ্যই নয়, যদি না একই গুরুর অনুসারী হয়। প্রবাদ বাক্যে রয়েছে ‘অর্থই হলো অনর্থের মূল।’ সম্পর্কের মাঝে পরিবর্তন আসে বিশেষ করে ব্যক্তিস্বার্থের কারণে, অর্থের মোহে বিবেক-জ্ঞান হারিয়ে ফেলার কারণে। তাতে মানুষ নিজ মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলে।
অর্থের যেই অহংকার তা ভাঙতে হলে গুরুর দয়া থাকতে হবে। যারা ব্যক্তিস্বার্থের পূজা করে বা বিষয়-সম্পদের পিছনে দৌঁড়াতে থাকে তারা গুরু ভজন করতে পারে না, মুক্তির দরজা তাদের জন্য কখনো খুলবে না। নিজ মনের পরিবর্তন আনতে না পারলে গুরু ভজন হয় না। গুরু ভজনের মাধ্যমেই একামাত্র মুক্তির পথ পাবে, সে ওয়াদাই করে এসেছি (সুরা হিজর-১৭২)। গুরু কখনো ভক্তের জাগতিক জগতের উন্নতির জন্য দোয়া করতে পারেন না। যারা ভক্তের জাগতিক জগতের ধন-সম্পদের জন্য দোয়া করে ওরা গুরুই নয়, কখনো হতে পারে না। তবে আল্লাহর অলীদেরকে/গুরুকে যারা অতিরিক্ত কষ্ট দেয় তখন ঐ লোকটির জন্য দোয়া করেন, যেন তাকে প্রভূত ধন-সম্পদ দান করেন। তার কারণটি জেনে নিন সুরা হুমাযা পড়ে। কারণ, এ দুনিয়ার ধন-সম্পদই তার আখেরাতের জন্য পাহাড়সম বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে। বিশ^াস না হলে একজন ধনী লোককে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন অথবা লক্ষ্য করে দেখতে পারেন তার মানসিক পরিস্থিতি কেমন, সে কি নিয়ে ব্যস্ত দুনিয়া না আখেরাত। যাক, আত্মসুখ গুরুর নিকট বিসর্জন দেওয়ার নামই হলো ধর্মবোধ জাগ্রত করা। সমাজ এবং সংসারের মানুষ একজন নারীকে দূর্বল ভাবতে পারে কিন্তু অনুরাগ সাধনার বলে একজন দৈহিক নারী হাকিকতে পুরুষে পরিণত হয়। একজন নারী সমাজের এই অন্ধকার দেওয়ালকে ভাঙতে পারে। হযরত রাবেয়া বসরী (রাঃ) তিঁনি দৈহিক নারী হলেও হাকিকতে তিনি পুরুষ। অন্যের বাড়িতে সারাদিন কাজ করেও সারা রাত খোদার ধ্যানে কাটিয়ে দিতেন। আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী বলছেন – নারীদের মাঝে আউলিয়ার সংখ্যা বেশি।
রাসূলের (সাঃ) যুগে নারী স্বাধীনতা ৪১ পৃঃ বর্ননা করা হয়েছে –
“রসূলের (সা.) যুগই আমাদের জন্য স্থায়ী আদর্শ যুগ। জ্ঞানের এই সমুন্নত উৎসসমূহ থেকে জ্ঞানার্জনে আকাঙ্খিত থাকা উচিত। নারীদেরকে প্রখ্যাত ও জ্ঞানসমৃদ্ধ শিক্ষকদের নিকট থেকে জ্ঞানার্জনে বাধা দেয়া উচিত নয়। কিংবা পরুষদেরকেও প্রখ্যাত ও জ্ঞান সমৃদ্ধ কোন মহিলা শিক্ষকের নিকট থেকে জ্ঞানার্জনে বাধা দেয়া উচিত হবে না।”
“পুরুষদের সাথে একই মজলিসে জ্ঞানার্জন করার ব্যবস্থা বর্জন করতে চাচ্ছিল বলে নারীরা একটি নির্দিষ্ট দিন দাবি করেছিল, তা নয়। বরং এই একই মসজিদে পুরুষদের জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি তারা আরেকটু ব্যাপক ও বিস্তৃত সুযোগ লাভ করতে চাচ্ছিল। তাই ঐরূপ একটি দিন নির্দিষ্ট হওয়ার পরও তারা মসজিদ ও ঈদের মাঠে উপস্থিত হয়েছে এবং পুরুষদের সাথে মনোযোগসহকারে জ্ঞানের কথা ও উপদেশবাণী শুনেছে।”
বর্তমানে আলেম-মোল্লাদের শিক্ষা এবং পর্দা নিয়ে বাড়াবাড়ির কারণে নারী জাতির এবং সমাজকে পথভ্রষ্টের দিকে দ্রুত ধাবিত করছে। তাদের ফেরকাবাজির ডিগবাজিতে মানুষ পথভ্রষ্ট হচ্ছে। তা বোধ সম্পন্ন লোকেরা ঠিকই বুঝতে পারছে। ইসলাম নারীদেকে শালীনতার মধ্যেই স্বাধীনতা দিয়েছে কিন্তু মৌলবী সমাজ নারীদের স্বাধীনতা হরণ করেছে তাদের অজ্ঞতা এবং ব্যক্তি স্বার্থের জন্য। ব্যক্তিস্বার্থ থেকেই সমস্ত দ্বন্দ্ব-বিভেদ সৃষ্টি হয়। যেমন – একটি ঘর তার মাঝে দরজা থাকে, ইচ্ছে মতো দরজা খোলা যায় আবার সেই দরজা তালা দিয়ে বন্ধ করে রাখা যায় ঠিক তেমনি মনে করে মেয়েদেরকে তাদের ইচ্ছে মতো চালাবে। যেমন – মেয়েরা শোকেসে সাজানো পুতুলের মতো। আঠারো বৎসরের পর থেকে মেয়েরা স্বাধীন ভাবে চলা ফেরা করতে পারবে। কিন্তু আমাদের সমাজ ব্যবস্থা হলো মোল্লাপন্থি, এই দুর্বল সমাজ ব্যবস্থার জন্য মেয়েরা স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। সেজন্য দায়ী পুরুষের ভোগবাদী অনিয়ন্ত্রিত মন মানসিকতা। সেই ক্যান্সারে আক্রান্ত সমাজে মুক্ত মনে মুক্ত জ্ঞান আহরণ করা কষ্টকর। যদি দ্বীনে মুহাম্মদীর শিক্ষা সমাজে থাকতো তবে অন্ধ-মূর্খদের এ ধরণের দৌরাত্ম মোটেও থাকতো না।
রাছুল পাক (স).-এর সময় নারীদের স্বাধীনতা একদল আলেম-মোল্লা নামধারীদের কারণে ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে। মুখ খোলা রাখা, হাতের কব্জী এবং পায়ের কণ্ঠার নিচে খোলা রাখা রাছুলের যুগের সুন্নত। কিন্তু মোল্লাদের আইন তার বিপরীত। রাছুলের সাথে মেয়েরা মসজিদে, ঈদের জামাতে নামাজে শরীক হতো। মেয়েরা মসজিদে নববী ঝাড়– দিতো, মেয়েরা যুদ্ধাহতদের সেবা-শুশ্রুষা করতো- রাছুল (স). নিজেও খেদমত করতেন, মাথার উকুন বেঁচে দিতো, চুল আচঁড়িয়ে দিতো, সাহাবাগণ প্রয়োজনে মেয়েদের নিকট বা মেয়েরা সাহাবাগণের নিকট যেতো এবং তাদের সাথে কথাবার্তা বলতো, মেয়েরা আত্মীয়স্বজনের মেহমানদারী করতো, তাদের সাথে একত্রে বসে খাবার খেত, সাহাবাদের সাথে ছালাম বিনিময় করতো, কুশলাদি জিজ্ঞেস করতো, স্বামীদের সাথে কাজে যোগদান করতো। উম্মে শরাইক একজন ধনী আনসারী মহিলা ছিলেন দান-সদকার ব্যাপারে তিনি খুবই উদারহস্ত ছিলেন। তাঁর বাড়িতে মেহমানের ভীড় লেগেই থাকতো। কোনো পরামর্শ সভায় মসজিদে যোগদান করতো, রাছুল স. এর স্ত্রীগণ ছাড়াও অন্য মেয়েরা জমিতে কাজ করতো ইত্যাদি পুরুষের পাশাপাশি মেয়েরা জ্ঞানার্জন করতো, মেয়েদের নিকট হতে পুরুষগণ জ্ঞানার্জন করতো। যেমন, হযরত ফাতেমা (আঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) নিকট হতে অনেক সাহাবাগণ জ্ঞানার্জন করেছেন। আর মোল্লাদের আইন তার বিপরীত চলছে। এ ধরনের বলতে গেলে বহু কিছুই নেই যা রাছুলের যুগে ছিল। সুরা নূরে বলা হয়েছে, “যারা চরিত্রবান, সরলমনা ও মুমিন নারীদের উপর অপবাদ দেয় তাদের প্রতি দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহর অভিসম্পাত।” সুরা বুরজের বলা হয়েছে, “যে সব লোক ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদের উপর নিপীড়ন ও জুলুম-নিয়ার্তন করেছে এবং তার জন্য আল্লাহর নিকট তওবা করেনি, তাদের জন্য জাহান্নামের শাস্তি ও প্রজ¦লিত অগ্নিকুন্ডের সাজা রয়েছে।” এ ধরণের অন্ধ-মূর্খদের থেকে দ্বীনে মুহাম্মদীকে রক্ষা করার জন্য আধ্যাত্মিক ধর্ম জ্ঞানীদের এগিয়ে আসা বর্তমানে জরুরী হয়ে পড়ছে।
বর্তমান সারা বাংলায় একজনই আছেন যিনি আধ্যাত্মিকতার প্রাণপুরুষ, মহাসাধক, লেখক হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী (মাঃ জিঃ আঃ) যিনি পথভ্রষ্ট মানুষকে দ্বীনে মুহাম্মদীর সেই জ্ঞান দান করে মুক্তির পথ বাতলিয়ে দিচ্ছেন। তাঁর রচিত বইগুলো দ্বীনে মুহাম্মদীর এক অমূল্য সম্পদ। মোল্লাতন্ত্র যে ইসলাম নয়, নিছক ফেরকাবাজি তা তিনি প্রমাণ করেছেন। রাছুলের (স.) যুগে নারীদের অবস্থা আর বর্তমান নারীদের অবস্থা যে কতো বিস্তর প্রভেদ তা জানতে চান তবে আরব বিশে^র সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক আবদুল হালীম আবু শুক্কার লেখা ‘রাছুলের স. যুগে নারী স্বাধীনতা’ কিতাবটি পড়ে দেখতে পারেন। এমন গুরুত্বপূর্ণ বইটি ৪ খন্ডে বাংলায় অনুবাদ পাওয়া যায়। কোরান ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। নারীদেরকে নিয়ে ওহাবী-কওমী আলেম-মোল্লাদের বিকৃতির ডিগবাজি খেলাটি পরিস্কার বুঝতে পারবেন। যুগে যুগে তারা কিভাবে রাছুলের স. এর নীতি আদর্শকে পরিবর্তন করেছে এবং ফেরকার বেড়াজালের শৃঙ্খলে, ঘরের চারি দেয়ালে আবদ্ধ করে নারীদেরকে অবরুদ্ধ করছে তার আলোচনা দেখতে পাবেন।
সুরা হজ্জের ৭৮ নম্বর আয়াতটি হলো, “দ্বীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের উপর কোনো কঠোরতা আরোপ করেননি।” তাহরীরুল মারআ ফী আসরির রিসালাহ্ (রাছুলের স. যুগে নারী স্বাধীনতা) কিতাবের ১ম খন্ডের ৬০ পৃষ্ঠায় চেহারা খুলে রাখার ব্যাপারে বলা হয়েছে, “নারীদের চেহারা খুলে রাখার ব্যাপারে শরীয়তের স্বীকৃতির প্রতি এবং শরীয়তের নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকে পুরুষদের উপস্থিতিতে সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের বৈধতার আহ্বান জানানো হয়েছে। সুস্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণিত হওয়ার পর তা সঠিক পথে আহ্বানেরই নামান্তর। আমি তাদেরকে (যারা নারীদের মুখ খোলা রাখা হারাম জানে) শরীয়তের আহকামের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার ব্যাপারে ও হাদিস শরীফে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে সে বিষয়ে সতর্ক করবো। কোরানে বলা হয়েছে, “হালালকে হারাম মনে করা হারামকে হালাল মনে করার সমতুল্য।”এ দুটোই শরীয়তের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। রাছুল (স). যখন নারীদের চেহারা খুলে রাখা ও সামাজিক কর্মকান্ডে তার অংশগ্রহণের কথা বললেন তখন মুসলমানদের কল্যাণের উদ্দেশ্যই ছিল।
জীবনের কল্যাণের পথে সহজে ফিরে যাওয়া এবং নারীদের সামনে সৎকর্ম করার সুযোগ সৃষ্টির দ্বার উন্মুক্ত করাই তার লক্ষ্য ছিল। তা হবে জ্ঞানার্জন, শিক্ষা, অর্থ উপার্জনে দূর্বল স্বামী বা সংসারের সহযোগীতা, উত্তম সামাজিক কাজে ও গঠনমূলক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং খারাপ কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। হিজাব পরিধান করা রাছুলের (স). স্ত্রীদের বিশেষত্ব যেমন স্বীকৃত তেমনি সম্মানিত মহিলা সাহাবীগণ রাছুল (স). এর স্ত্রীদের এ ব্যাপারে অনুকরণ করতেন না। রাছুল স. এর যুগে মেয়েরা তাদের প্রয়োজন ও জীবন ধারণের তাগিদে কারিগরি, রাজনৈতিক সমস্যায় অংশ নিতো। কায়িক পরিশ্রম ও কারিগরি ক্ষেত্রে মেয়েরা পশুপালন, কৃষিকাজ, হস্তশিল্প, ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা, নার্সিং, পরিস্কার-পরিছন্নতা ও গৃহকর্মে ব্যাপৃত থাকতো (রাছুলের স. যুগে নারী স্বাধীনতা-১ম খন্ড, ৫৬ পৃষ্ঠা)। মেয়েদের অধিকার পুরুষের সমতুল্য তবে পুরুষের মর্যাদা অগ্রাধিকার রয়েছে (সুরা বাকারা-২২৮)। বুঝতে হবে কুচক্রিগণ কতোগুলো বানোয়াট হাদিস দ্বারা মেয়েদেরকে মসজিদে এবং ঈদের নামাজে যোগদান করা থেকে দূরে রাখার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতো।
এশার নামাজে একজন মেয়ে আক্রান্ত হলে সেই হতে হযরত ওমর (রা). মেয়েদের মসজিদে যেতে নিষেধ করলেন। যদি তাই হয় তবে ছেলে-মেয়েদের ধর্ষণ-বলাৎকারের কারণে মাদ্রাসায় যেতেও নিষেধ করা উচিত। শালীনতার ভিতরে নারীদের যে স্বাধীনতা রাছুল (স). দিয়েছেন একদল আলেম-মোল্লা সমাজ তা সেই নীতি আদর্শ পরিবর্তন করে তাদের মনগড়া মতবাদ চালু করেছে এবং নারীদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করছে। কোরান বলছে, মুমিন পুরুষ-নারী একে অন্যের বন্ধু (সুরা তাওবা-৭১)। কোরানের কালাম রূপকের আবরণে আবৃত বা কোরান রূপক সাহিত্য, সে রূপকের আড়ালেই রয়েছে কোরানের জ্ঞান। মাদ্রাসার আক্ষরিক বিদ্যা দিয়ে তা কোনো দিনই বুঝা সম্ভব নয়।
প্রবন্ধ – মারেফাত হচ্ছে গুপ্ত বিদ্যা
লেখক – এস এম বাহরায়েন হক ওয়ায়েসী
মারেফাত হচ্ছে গুপ্ত বিদ্যা, এজন্য মারেফাত সহজসাধ্য নয়। জীবনের পূর্ণ আত্মত্যাগ এর মাধ্যমে অর্জিত যে মুনাফা, তাই হলো মারেফাত। সর্ব-সাধারণের জন্য এটা উন্মুক্ত নয়। কঠিন সততার আলিঙ্গন, আত্ম-উৎসাহিত জীবন ব্যাবস্থার রুকন, আল্লাহ্ তা’য়ালার ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর বাস্তবায়িত হয়। আল্লাহর ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে চাইলে পরীক্ষা দিতে হয়। এতে তার জীবনের সমস্ত সুখও কেড়ে নেয়া হতে পারে। দেখা হবে তাতে তার মনের পরিধিতে আল্লাহর প্রতি বৈরী মনোভাব আছে কিনা! যদিও তিনি অন্তর্যামী, তারপরও বাস্তবতার মুখোমুখি করেন তার বান্দাকে।
সাধক তাই বলেন, “যে করে আমার আশ, আমি করি তার সর্বনাশ! যদি না ছাড়ে আমার পাছ, তবেই আমি করি তারে দাসের দাস।” আল্লাহ্প্রাপ্তি হচ্ছে মারেফাত। এই মারেফাত বুঝতে চাইলে অজুদী রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে। জানতে হবে, কোথায় সৃষ্টির উৎস। কলেমা, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্ব এসব কি ওজুদী রহস্য উদ্ঘাটনের সোপান? ‘ফাল ইয়ান জুরীল ইনছানু মিমমা খুলীক’ অর্থাৎ – মানুষকে জানতে হবে কি বস্তু দিয়ে তার আত্মপ্রকাশ। এই আত্মপ্রকাশের পথ পরিক্রমণ যদি ত্বরান্বিত না হয়, তবে মওলার দিদারে কি করে তাকে নিয়ে যাবে? সালাত শব্দের অর্থ যদি হয় অশ্লীল বা বদ কর্ম থেকে বেঁচে থাকা, তাহলে অন্য শব্দ বলে মিথ্যাচার কেন? আল্লাহ্ যে তাঁর কালাম সম্পর্কে প্রচারনায় হুঁশিয়ার করেছেন, তার কি হবে? তিনি তার বান্দাকে নাজেল মতে প্রচার করতে বলেছেন। না করলে কাফের হতে হবে। যাকাত হচ্ছে পবিত্র করণ, কি কি পবিত্র করলে সত্যিকার অর্থে পবিত্র করা হবে, তার কোন সঠিক বিশ্লেষণ আছে কি? যদি কেবল মালের উপর এই কথাটি বলা হতো, তাহলে কোরআনে সালাতের পাশাপাশি যাকাত কেন? এ থেকে বুঝা যায়, নিশ্চয় এর মধ্যে কঠিন হাকিকত নিহিত আছে, যা সর্বসাধারণ জানতে পারছেনা। হজ্জের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে দেখা বা সাক্ষাত, সেখানেও সালাতই মূল বিষয়। কিভাবে আল্লাহ্কে দেখা যাবে, আদৌ তার কোন সঠিক ফয়সালা নেই। কিন্তু কেন? আল্লাহ্ তায়ালার পাক কোরআনে আছে “কুল্লেশাইয়েন মোহিত।” তবে কেন হজ্জের মাধ্যমে আরব দেশে যেয়ে তাঁকে দেখতে হবে? তবে কি আল্লাহ্র কথা সত্য নয়? নাকী হজ্জের মূল তাৎপর্য সমন্ধে মানুষ রয়েছে অন্ধকারে? এ থেকে মুক্তির কি কোনো উপায় নেই?
কালেমার কথাই বলি। কালেমা হলো আল্লাহ্কে মানা ও হযরত মুহাম্মাদ (স:) কে নবী ও রাসুল স্বীকার করা। শুধু বাচনিক উচ্চারণেই কি কালেমা আদায় হবে? নাকী কালেমায় নিজের ইনছানিয়াতের স্বরূপ দাঁড় করিয়ে দেখলেই, মূল কালেমার সাধনা স্বার্থক হবে? তা না হলে “আলফা আলফা মাররাতুন বেলা তাহ্কীক ফাহুয়া কাফেরুন” কেন? সিয়াম আত্মশুদ্ধির এক শ্রেষ্ঠ নিয়ামক। যিনি যার প্রতি দূর্বল হবেন, তিনি নিশ্চয় অনুধাবন করবেন যে, বিনয়-ই হচ্ছে সংযম। সিয়ামের সংযম আমাদের মধ্যে নেই। বাস্তবতা এমন যে, বর্তমানে যে সিয়াম আমরা পালন করি তা আল্লাহ্ তায়ালাকে উপহাস করা ছাড়া কিছু নয়! বর্তমান রোজার নিয়ম-কানুন দেখলে সহজেই বোঝা যাবে। আজকের শরিয়তের ধর্ম প্রচারকগণ প্রচার করে দিয়েছে, এ মাসে যত ব্যায় করবে তার হিসাব নাকি আল্লাহ্ নিবেনা! যে মাসে সংযমের শিক্ষা নিতে বলা হচ্ছে, সে মাসে যদি খরচের খাতা খুলে দেওলিয়া হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ্ তাকে কতটুক মর্যাদা দিবে তা বুঝতে কারোই অসুবিধা হওয়ার কথা না। শুধু সিয়ামের একটা শরিয়তী বিশ্লেষণ করলে অনেকেই দেখতে পাবেন আল্লাহ্ কি এরকম কোন নিয়ম বেধে দিয়ে ছিলেন কিনা?
যদি এরকম নিয়ম বেধে দিয়ে না থাকেন, তাহলে আল্লাহ্ তালার হুকুমের সিয়ামে সংযমতা কোথায়? আর সংযমের প্রতিফলন হচ্ছে অহিংস হয়ে ওঠা। যা সমগ্র জীবনে বাস্তবায়িত করতে হয়। এজন্য অনেক সাধক বলে থাকেন সিয়াম একটাই। কারণ জীবন একটাই, এ জীবনে সংযমের শুরু আছেম, শেষ নেই। বিরামহীন সে সংযম বা আত্মশুদ্ধি। অনেকেই তার মমার্থ বুঝতে ন পেরে অযথা অলিদের কষ্ট দিয়ে থাকে। এহেন মূর্খদের জন্য মওলার দরবারে প্রর্থনা করি, তারা যেন মনুষ্যত্বের মর্তবা বুঝতে পারে। তারা যেন হয়ে উঠতে পারে একজন শ্রেষ্ঠ নিষ্কলুষ মানুষ। ওলিরা আঘাত পান, কিন্তু আঘাত দেন না। কারণ, মহান ওলীগণ সবচে’ শান্তিপ্রিয় মানুষ, তাই তাদের কাছে মানুষ ছুটে যায়, একটু দোয়া নেবার জন্য। আমাদের সমাজে অনেক মাওলানা ওয়াজ মাহফিলে রওজা সমদ্ধে ঘৃণিত প্রচারণা চালিয়ে অলীদের জীবন দর্শনকে বিতর্কিত করতে চায়, আবার গোপনে ঐ রওজায় গিয়ে মানত করেন নিজের অপকর্ম থেকে পানাহর জন্য!
তাই মারেফত সমন্ধে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে হলে মুর্শিদের পাবন্দ হতে হবে। যারা সমাজে মুর্শিদরূপে প্রকাশিত হয়েছেন, তারা কোরআন মতেই চলাফেরা করেন। তারা কখনো ধর্মের নামে কোরআনের পাতা বিক্রয় করে মুনাফা হাছেল করেন না। তিনারা জানেন, কোরআনের মর্তবা অমুল্য সম্পদ, উহা বিক্রয়ের জন্য নহে। তবে বিনিময় যোগ্য। এ বিনিময় মানে অর্থ সম্পদ নয়। আল্লাহ্ তায়ালা নিজেকে ছামাদ বলেছেন, যার কোন অভাব নেই। যে পূর্ণ অভাবমুক্ত। সেই মহান আল্লাহ্তালা বলেছেন বান্দার কাছে তিনি উত্তম ঋণ চান। এর হাকিকত কি? না বুঝে অনেকেই দুনিয়াবি বিনাশের পথে এগুচ্ছে। এগুলো এক সময় কোন কাজেই আসবে না। যদি প্রকৃত পরহেজগারী না থাকে। পৃথিবীতে এমন এক গুপ্ত প্রতিভা আছে, যা নির্জন ধ্যান বিহীন কায়েম সম্ভব নয়। তাকে অর্জন করতে হলে দুনিয়াবী যত অপকর্ম বা অকল্যানমূলক অবস্থান আছে, তা থেকে ফারেগ থাকতে হবে। এজন্যই মুর্শিদ শপথ ও শর্ত এমনকি পরিক্ষার মাধ্যমে মর্যাদার উপাধীতে ভূষিত কবেন।
আমরা অনেক সময় বলে থাকি কোরআন সবার জন্য। আসলে তা নয়। জ্ঞানীদের জন্যই কোরআন পথ নির্দেশক। তাই যিনি জ্ঞানী বা পথনির্দেশক, তঁর সন্নিকটে যাওয়া ব্যতিত কোন দিনই তা বাস্তবায়িত করা সম্ভব নয়। ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হলে তার পরিচয় সমন্ধে জ্ঞান থাকতে হবে। কোথা হতে এর সুচনা হলো আর কোথায় যেয়ে তার পূর্ণতা পেলো। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর জীবন দর্শন’ই হচ্ছে আল কোরআন। তাঁর প্রতিফলনই হচ্ছে আহলে বায়াত বা পাক পাঞ্জাতন। যাহাদের সহচর্যে নবুয়ত রেসালত দাড়িয়ে, তাদের বাদ দিয়ে পূর্ণতা প্রাপ্তির দম্ভ কোনদিন সুফল বয়ে আনেনি, আর আগামীতেও আনবেনা।
হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর ইন্তেকালের পরেই ইসলাম দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রথমত মওলাইয়াত। পরে খোলাফায়ে রাশেদীন। এই খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম, দ্বিতীয়, ও তৃতীয় পুরুষ তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে এজমা কেয়াস নাম করে আধ্যাত্মবাদকে দূরে ঠেলে দিয়ে নামসর্বস্ব ইসলাম প্রচার করেছেন। প্রকৃত ইসলাম বজায় থাকলে নিশ্চয় কালেমা, সালাত, যাকাত, রোজা, হজ্ব কেবল অনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিতো না। এবাদত এমন এক জিনিস যা হচ্ছে স্বভাবগত পরিচিতি। একবার তা স্পর্শ করতে পারলে তার নগদ মূল্য পাওয়া যায়। যার প্রতিশ্রুতি আল কোরআনে এসেছে। “আলাইন্না আউলিয়াল্লাহে লা খাওফুন আলায়হীম, অলাহুম ইয়াহজানুন”। ভয় তাদের নেই কারণ, অলিগণ বেহেস্তের আশা বা দোযখের ভয়ে ইবাদত করে না। করে আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য। তাই কারো চোখ রাঙ্গানো ফতোয়ায় তাঁরা ভিত হন না। এমন অনেক ওলীদের জীবন কেড়ে নিয়েছেন ফতোয়াবাজগণ। আবার অনুশোচনায় সেই ওলীকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ বলে স্বীকার করেছেন! স্বীকার করলেই যে পাপ মোচন হবে এর তো কোন প্রমাণ পাওয়া যায়না! কারণ বান্দার হক বান্দা থেকেই আদায় করতে হবে। তাই কোন সিদ্ধান্ত নেবার আগে ভেবে দেখুন এ ফতোয়া প্রতিহিংসায় পড়ে কিনা?
যারা অহমিকাই দূরিভূত করতে পারেনি, তারা কি করে মুহাম্মদী ইসলামের দাবীদার? আর মুহাম্মদী ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে আহলে বায়াতের দাওন ধরে, কাজেই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুল (স) কে মানলেই ইমানদার হওয়া যাবে না। তিনার বংশধরদের মানতে হবে। কারণ, কোরআনের ভাষায় সাহাবীদের উপরে আহ্লে বায়াতের শান। আহ্লে বায়াতের প্রশংসা করতে গেলে যাদের চেহারা কালো হয়ে যায়, মুলত তারাই মুহাম্মদী ইসলামের হত্যাকারী, তারা এজন্যই সঠিক ইসলাম থেকে বহুদূরে আছে। যার ফলে মূল মারেফতে তাদের বোধগম্যতার ভিতর নেই। অতএব তাদের কাছে সহিষ্ণু মনোভাব আশা করা ঠিক নয়। এরা সবসময় উগ্রতা দিয়ে ধর্মপ্রচার করতে চায়, যার জন্য ইসলাম নামটাই অনেকে নিতে ভয় পায়। তবে কখনো যদি ঐসমস্ত ধার্মিক নামের দম্ভধারী নিজেকে একজন মানুষ শিক্ষকের পা বন্দ করে মারেফাতের গুপ্ত বিদ্যার সংস্পর্শে আসে, তাহলেই কেবল নফছের ঘৃণিত রুচির দহন হতে মুক্তি পেতে পারে, অন্যথা নয়। এজন্য সময় থাকতেই তাকে মারেফতের গুপ্ত বিদ্যা সমন্ধে ওয়াকেফ-হাল হতে হবে। লেবাসী শরীয়তের মধ্যে কোন মারেফত নেই। মারেফত হচ্ছে আল্লাহ্ তায়ালার সেই সত্ত্বা দেখা, যাকে কারও সঙ্গে তুলনা চলেনা। কারণ, যিনি আধ্যাত্মবাদকে আপনত্বে প্রতিফলিত করতে চান, তার নেই কোন লোভ, মোহ, কাম, ক্রোধ, মাৎসর্য, মদ। তার পরিচিতি তখন হয়, তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লাহ্।
অতএব, আসুন আমরা প্রতিটি পদক্ষেপ নেই এমন ভাবে যেন সেই সুক্ষ ভেদ সমন্ধে অবহিত হতে পারি। যে স¦ভাব সৃষ্টিকে আশরাফ করে আমরা যেনো সে স্বভাবে স্বভাবিত হই। হিংসা কখনো মানুষকে সুপথ দেখাতে পারে নি। প্রেমময়তা মানুষকে ঐশ্বরিক পথ দেখায়। সে প্রেম নারী পুরুষের যৌন তারনা নয়। সে প্রেম সবার তরে পবিত্রতা বিকশিত করে। সেই প্রেম হাসিল হলেই মারেফত হাসিল হবে। আল্লাহ্তালা সন্ধানীদের মারেফত তথা গুপ্ত বিদ্যা ধারণের ক্ষমতা প্রদান করুন, ¯্রষ্টার নিকট এই বিনীত প্রার্থনা থাকলো মহান প্রভুর দরবারে। আমিন।
প্রবন্ধ – আসরারে পাঞ্জাতন – ১০ম পর্ব
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
অপর দিকে ‘আহলে কিতাবগণও (ইহুদি-খ্রিষ্টান) বিভিন্ন নিদর্শনাদি হতে জ্ঞাত হয়েছিল যে, আখেরী জামানার নবী হযরত আবদুল্লাহর পৃষ্ঠে রয়েছেন। তাই তাঁর সাথে তাদের চরম শত্রুতা আরম্ভ করে দিল। তাঁকে হত্যা করার জন্য বিভিন্ন ঘাঁটিতে ওৎ পেতে থাকতো। যদিও অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন আশ্চর্য ঘটনা দেখে নিরাশ ও অনুতপ্ত হয়ে ফিরে যেতো। ইহুদিগণ ইয়াহিয়া নবীকে শহীদ করে ফেলেছিল এবং তাঁর গায়ের পশমী জামা রক্তসহ রেখে দিল। তাদের মধ্যে একদল আলেম বললো, এ জামা যেদিন রক্তে ভিজে তার থেকে কয়েক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়বে তখন তোমরা বুঝে নিবে যে, আরবে আবদুল্লাহ নামে এক লোকের ঘরে আখেরী নবী জন্ম নিয়েছে। এ ধরনের বহু কিস্সা বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত আছে তা তুলে ধরলে লেখা অনেক বেড়ে যায় বিধায় থেমে যেতে হলো।
হযরত আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালামের প্রতি প্রেমাসক্ত ছিল প্রায় তিনশত কুমারী নারী। তাঁর পেশানীতে সর্বদা ঐ নূর চমকাইত। তাই দেখে নারীগণ তাঁর গমন পথে দাঁড়িয়ে থাকতো তাঁর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার জন্য। কেউবা তাঁর সাথে মিলনের জন্য বার বার আহ্বান জানাতো- যাতে ঐ নূর তাদের লাভ হয়। তাকে নানা রকম বিত্ত-সম্পদের লোভও দেখানো হতো। কিন্তু সবাই বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যেতো। বিভিন্ন নারীদের এ অবস্থা দেখে হযরত খাজা আবদুল মুত্তালিব হযরত আবদুল্লাহকে শিকারের উদ্দেশ্যে কিছুদিনের জন্য বাহিরে পাঠালেন। হযরত আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালাম যে ময়দানে শিকারের জন্য হাজির হলেন, সে ময়দানে হযরত আমেনা আলাইহিস্ সালামের পিতা ‘ওহাব ইবনে মানাফও’ উপস্থিত ছিলেন। কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে তিনি হযরত আবদুল্লাহর সাথেই গিয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ শিকারের যাচ্ছেন এ কথা অবগত হয়ে সিরিয়ার (শামদেশ) চল্লিশজন (কোনো কোনো বর্ণনায় নব্বইজন) খ্রিষ্টান উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে তাকে হত্যা করার জন্য ঐ ময়দানে এসে হাজির হলো। তখন ‘ওহাব ইবনে মানাফ’ দেখতে পেলেন অদৃশ্য জগত হতে একদল শক্তিশালী অশ্বারোহী সৈন্য এসে ঐ খ্রিষ্টান সৈন্যদেরকে বিতাড়িত করে দিল। কোনো কোনো সহিহ্ বর্ণনায় রয়েছে, ঐ চল্লিশজনকে হত্যা করে তারা আবার অদৃশ্য জগতে চলে গিয়েছিল। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে ‘ওহাব ইবনে মানাফ’ বাড়িতে এসে সমস্ত ঘটনা স্বীয় স্ত্রীকে বললেন এবং আমেনাকে হযরত আবদুল্লাহর নিকট বিবাহ দেয়ার আকাঙ্খা প্রকাশ করলেন। এরপর তারা হযরত আবদুল মুত্তালিবের নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন। হযরত আবদুল মুত্তালিব সর্বদিকে বিচার বিবেচনা করে হযরত আবদুল্লাহ ও হযরত আমেনার পরিণয় সূত্র সম্পন্ন করলেন। তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল ‘জমাদিউস্ সানী মাসের পঞ্চম দিবসে বৃহস্পতিবার (নর-ই-মুজাস্সাম মুহাম্মাদুর রাছুলুল্লাহ -১৩৮ পৃঃ), তাওয়ারিখে মোহাম্মদী প্রথম খন্ডের ৩৬-৩৭ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে তাদের বিবাহ হয়েছিল নয়-ই জমাদিউস্ সানী। যখন হযরত আবদুল্লাহ আলাইহিস্ সালাম হযরত আমেনা আলাইহিস্ সালামের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হলেন এবং সেখানে তিনি তিন দিন অবস্থান করেছিলেন। তখন ১২ই জমাদিউস্ সানী শুক্রবার দিন ঐ নূর চলে গেল হযরত আমেনা আলাইহিস্ সালামের গর্ভে। তখন হজ্জ্বের জন্য ‘জিলহ্জ্ব’ মাসের প্রয়োজন ছিল না। এরপর হতে তাঁর প্রতি কোনো নারীর আর তেমন আকর্ষণ রইলো না।
তাদের বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর পিতামহ হযরত আবদুল মুত্তালিব স্বপ্নে দেখলেন, আবদুল্লাহর গৃহ হতে একটি নতুন সূর্য বের হলো ; তা উর্ধ্বদিকে আরোহণ করতে থাকলো। আরোহণ করতে করতে আসমানের নিকট যেয়ে পৌঁছলো ও স্থির হলো। তাতে চন্দ্র ও তারকারাজি এর কিরণে অদৃশ্য হয়ে গেল। তিনি স্বপ্নের কথা স্বপ্নবেত্তা আবদুর রহমানকে জানালেন। আবদুর রহমান বললেন, আপনি খুশি হোন। আবদুল্লাহর ঘরে এমন এক পয়গাম্বর হবেন যার ধর্ম সকল ধর্মের উপর বিজয়ী হবে, তা সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং কিয়ামত পর্যন্ত কায়েম থাকবে।
ইবনে সা’দ ও ইবনে আবি শায়বা মোহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণনা করেন, রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, “আমার বংশে মূর্খতার যুগের কোনো বিবাহ নেই। আমার বংশ সর্বত্র পাক পবিত্র [খাসায়েসুল কুবরা, ১ম খন্ড-৭২ পৃষ্ঠা]।”
‘তিরমিযী’ হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, “আমার বংশে মূর্খতার যুগের কোনো বিবাহ নেই। আমার বংশের সকল বিবাহ ইসলামী পদ্ধতির অনুরূপ হয়েছে [খাসায়েসুল কুবরা, ১ম খন্ড- ৭২ পৃষ্ঠা]।”
উক্ত হাদিসসমূহ হতে প্রমাণিত যে, রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের বংশাবলী যুগে যুগেই পবিত্রতার ভিতর চলে এসেছে এবং অসংখ্য রেওয়ায়েত রয়েছে এ ব্যাপারে। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের বংশ হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সাল্লাম হতে হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম পর্যন্ত একাত্তর জনের নাম উল্লেখিত আছে এবং ঐতিহাসিকদের মতে এরা সবাই ছিল পরম পবিত্রতার আবরণে ঢাকা। আল্লাহপাকই তাদেরকে পবিত্র রেখেছেন এবং তাদের প্রতি রাজি-খুশি বা সন্তুষ্ট আছেন একমাত্র নূরে মোহাম্মদীর কারণে। সিহাহ্তে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, ‘কোরাইশ’ মূলত একটি মাছের নাম। তার জীবিকা হলো অপরাপর মাছ কিন্তু কোনো মাছের আহার সে নয়। তাকে বলা যায় মাছের পিতা। এ জন্য ঐ নামটি কোরাইশ বংশের জন্য গৃহীত হয়েছে। ‘মাছের পিতা বা মৎস্য বাবা’ যেমন কোরাইশ, তেমনি মানবজাতির বংশরাজ হলো কোরাইশ। এটাও বর্ণিত আছে যে, নাযার ইবনে কিনানার বংশধর আরবের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত অবস্থায় বসবাস করতো। কোসাই ইবনে কিলাব তাদেরকে মক্কায় একত্র করে বসবাস করতে থাকেন। সে হতে তিনি হলেন কোরাইশ মানে সংঘবদ্ধকারী বা একত্রকারী। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের উর্ধ্বতন বংশধারার একাদশতম পুরুষ হলেন ‘ফিহির’ এবং ফিহিরই কোরাইশ নামে অভিহিত ছিল বিধায় রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম হলেন কোরাইশ বংশের। পরবর্তীতে এ কোরাইশ বংশ নানা শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। শেষে হাশেমী এবং উমাইয়া – এ দুই বংশের বিভক্ত হয়েছে। তার মধ্যে ‘হাশেমী’ বংশ সর্বশেষ্ঠ, এ হাশেমী বংশেই মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন। রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের উর্ধ্বতন সপ্তম পুরুষ ‘মুররাহ’ হতে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এবং নবম পুরুষ লুহাই বিন কাব হতে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর বংশধারা বিভক্ত হয়ে গেছে। কাজেই নবীজির সপ্তম ও নবম উর্ধ্বতন বংশ ধারায় আবুবকর ও ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমা জড়িত আছে। আর স্বয়ং ‘হাসেমী’ বংশে জন্মগ্রহণ করেন নবীর জ্ঞানের তোরণ, নূরের অংশ, জান্নাত-জাহান্নামের বন্টনকারী, মুমিন ও মুনাফিকের মধ্যে প্রভেদকারী হযরত আলী আলাইহিস্ সালাম।
ওয়াসিলা ইবনে আসকা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলছেন, আমি রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলছেন, আল্লাহপাক ইসমাঈলের বংশধর হতে কিনানাকে মনোনীত করে নিয়েছেন, বনী কিনানা হতে কোরাইশকে মনোনীত করে নিয়েছেন, কোরাইশ হতে বনী হাশেমকে মনোনীত করে নিয়েছেন এবং বনী হাশেম হতে আমাকে মনোনীত করে নিয়েছেন। তিরমিযীর বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ ইব্রাহীমের বংশধর হতে ইসমাঈলকে মনোনীত করে নিলেন এবং ইসমাঈলের বংশধর হতে বনী কিনানাকে মনোনীত করে নিলেন।
হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত (নবীজি কাফেরদের মুখে কিছু টিকা-টিপ্পনী শুনে অতিশয় ক্ষুন্ন হলেন, তাতে তাঁর শান ও বংশ মর্যাদার কিছুটা বর্ণনা দিলেন) আছে যে, নবীজি মিম্বরের উপরে উঠে দাঁড়ালেন, অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন, আমি কে? উপস্থিত সাহাবাগণ বললেন, আপনি আল্লাহর রাছুল। তিনি বললেন, আমি মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব। আল্লাহপাক মাখলুককে (জিন-ইনছানকে) সৃষ্টি করলেন, অতঃপর তিনি আমাকে স্থাপন করলেন তাদের উত্তম (ইনছানের) দলে। তারপর তিনি তাদেরকে বিভক্ত করলেন দুই দলে (আরব ও আজমে) এবং আমাকে স্থাপন করলেন উত্তম (আরবে) গোত্রে। তারপর তিনি তাদেরকে বিভক্ত করলেন বহু গৃহে (খান্দানে) এবং আমাকে স্থাপন করলেন উত্তম (হাশেম) গৃহে (খান্দানে)। কাজেই আমি মর্যাদায় তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ও খান্দান হিসেবেও সর্বশ্রেষ্ঠ (আর উত্তম বংশের উত্তম লোকই নবুয়ত ও রিসালাতের হকদার হয়ে থাকে)।
একবার হযরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তাবুক যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের পর বললেন, হে আল্লাহর রাছুল ! আমাকে অনুমতি দিন, আমি আপনার কিছু প্রশংসা করি। তিনি বললেন, বলো। হযরত আব্বাস বললেন
(১) দুনিয়ায় আবির্ভূত হওয়ার পূর্বে তুমি ছিলে বেহেশতের ছায়ায় অতি সুখে ও স্বাচ্ছন্দে এবং (আদমের পৃষ্ঠে) এক আমানতগার। যেখানে বেহেশতের (বৃক্ষ সকলের) পত্রগুচ্ছ দ্বারা আচ্ছাদন সম্পন্ন হয়েছিল।
(২) অনন্তর তুমি অবতরণ করলে জমীনে, তখন তুমি চর্মাবৃত মানুষ নও, নও
মাংসপিন্ড, নও জমাট রক্ত।
(৩) বরং তুমি ছিলে শুক্রবিন্দু, তা ছিল নূহের কিশতিতে, তখন প্লাবন নসর ও
তার উপাসকদের কণ্ঠ পর্যন্ত ডুবিয়ে দিলে।
(৪) এরূপে তুমি অতিক্রম করতে থাকলে এক পৃষ্ঠ হতে অপর গর্ভাশয়ের স্তরে,
যখন এক জগত পার হলো, অপর স্তর শুরু হলো।
(৫) তুমি অবতরণ করলে খলীলের অগ্নিকুন্ডে- সংগোপনে, তুমি ছিলে খলীলের
পৃষ্ঠে, কাজেই খলীল কিরূপে জ্বলে?
(৬) অবশেষে তোমার গৌরবময় গৃহ খানদাফের এক উচ্চ শিখরে গিয়ে উপস্থিত
হলো যার নিন্মে অবস্থিত অপরাপর বংশ। (তাঁর উর্ধ্বতন বংশের এক পুরুষের
নাম মুদারিকা ইবনে ইলিয়াস। তিনি ছিলেন দূর সম্পর্কীয় পিতামহ। তাঁর
জননীর নাম ছিল খানদাফ)।
(৭) এবং যখন তুমি ভুমিষ্ঠ হলে পৃথিবী আলোকিত হয়ে গেল এবং তোমার
আলোতে দিগ্দিগন্ত প্রদীপ্ত হয়ে গেল।
(৮) অতঃপর সে জ্যোতিতে ও সে আলোতে আমরা বয়ে চলছি হিদায়েতের
পথসমূহ।
অনুবাদ – ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র, ১৯ ও ২০ পর্ব
মূল এলিফ শাফাক হতে
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী
পর্ব ১৯
সাধনায় সাফলতা লাভের পূর্বশর্ত হচ্ছে নিজের মনোযোগ কে সঠিক স্থানে নিবদ্ধ করা। একাগ্র মানসিক তন্ময়তা ও অনুরাগ সাধনার দ্বারা ভক্ত দ্রুত পৌঁছতে থাকে তাঁর অভিষ্ঠ গন্তব্যের দিকে। নিজের মনোযোগ কে সঠিক কেবলা পানে স্থির করা গেলেই ত্বরান্বিত হয় সাফল্য।
পথের চিন্তা বাদ দিয়ে তুমি বরং তোমার প্রথম পদক্ষেপ নিয়ে চিন্তা করো। মনোনিবেশ করো একদম শুরুতে। প্রথম পদক্ষেপই তোমাকে পৌঁছে দিবে তোমার গন্তব্যে। পথ চলার ক্ষেত্রে এটাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ জন্য তুমিই দায়ী থাকবে যদি তোমার প্রথম পদক্ষেপটি হয় ভুল। পথে অভিষিক্ত হও সুন্দর এবং যথাযথ একটি পদক্ষেপের মাধ্যমে।
স্রোতে মিশে যেও না। বরং নিজেই একটি প্রবাহে পরিণত হও। ডুবে যাও সে সমুদ্রে যে সমুদ্রটি প্রেমের। নিজেকে পূর্ণতর প্রেমময় সত্ত্বার পবিত্র চরণ কমলে সমর্পন করে দাও।
প্রভুগুরু তোমাকে মুক্তির পথ দেখাবেন। প্রেমের পথ দেখাবেন।
তুমি শুধু কায়েম করো তোমার পূর্ণতম সমর্পন।
পর্ব ২০
প্রভু আমাদেরকে তৈরী করেছেন তাঁর নিজ চেহারায়। প্রভু স্বয়ং অনন্য সত্ত্বা, তাই আমরাও অনন্য। প্রভু মূর্তিতে মূর্তিমান প্রতিটি মানুষ ধারণ করে এক একটি পৃথক পৃথক সত্ত্বা ও চেহারা। দু’জন মানুষ কখনো একরকম নয়। প্রভুর একত্বের প্রমাণ স্বরুপ তাঁর অস্তিত্বে অস্তিত্ববান মানুষও নির্মিত হয়েছে এক ও অনন্য রূপে।
প্রতিটি মানুষকে অনন্য ও আলাদা আলাদা করে সৃজন করা স্রষ্টার এক মহান পরিকল্পনার অংশ। প্রতিটি মানুষ সতন্ত্র। হৃদয়সমূহ কখনোই একই স্পন্দনে স্পন্দিত হয় না। কন্ঠসমূহ কখনো একই সুরে কথা বলে না। প্রতিটি মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্বটিই একটি রহস্যের আধার, যা পূর্ণ সাতন্ত্রে সমুজ্জল। যদি ঈশ্বর চাইতেন যে, সবাই একরকম হোক, তবে তিনি এটা করতে পারতেন।
আপন স্বভাব ও বৈশিষ্টে আপনাকে ফুটিতে তুলতে হবে। সকল সাতন্ত্রতাকে স্বীকার করে যার যার মতো তৈরী করতে হবে বিশ্বাস ভক্তি তথা ধর্মচেতনার বলয়। কারো ওপর চাপিয়ে দেয়া ধর্ম তথা চিন্তা মানেই হলো স্রষ্টার পবিত্র পরিকল্পনাকে অস্বীকার করা!
নিজেকে সমুজ্জল করো স্বকীয় বৈশিষ্ট ও আপন স্বভাবের সৌন্দযের্র দৃঢ়তায়।
সংগীত – দেল কোরানের মূল বারতা
লেখক – ফকীর আতিকুর রহমান চিশতী
দেল কোরানের মূল বারতা, দেল ডুবারু জানতে পারে
সবাই বুঝবে কেমন করে, কোরান পড়বে কেমন করে।।
কসম করে বলে আল্লাহ, এই কোরান পাবে না মোল্লা
কেরামতি কোরান আছে, কিতাবের ভিতরে –
নাপাকে ছুঁইতে পারেনা, পড়বে কেমন করে!
দেল দরিয়ার গুপ্ত কথা, সাধ্য কি জানিতে পারে।।
পাশাপাশি দুই দরিয়া, বরযোখে তা ভাগ করিয়া
এস্ক জোশে রত্ন পয়দা, হচ্ছে তার ভিতরে-
নুক্তা নূরে আলিফ লাম মীম, কিতাব এ সংসারে
ঐ কিতাবে নাই সন্দেহ, নূর দ্বারা হেদায়াত করে।।
নূরের প্রচার রাখতে জারি, এক নূরে তিন তৌহিদ তারি
আল্লা আদম আর মুহাম্মদ , প্রচার এ সংসারে-
মাওলা নিজে আশেক হইয়া, নিজকে খুঁজে ফিরে
আউয়াল আখের জাহের বাতেন, রয়েছে সব পর্দায় ঘিরে।।
আলে রাসুল বংশধারা, পবিত্র বিশুদ্ধ তারা
কিতাব কোরান রয়েছে সব, তাঁদের এক্তিয়ারে।
ফকির আতিক বলে নক্সায় কোরান, থাকো রূপ নিহারে
খোলা কিতাব আদম অজুদ, উম্মুল কিতাব চিনলে পরে।।
সংগীত – ক্বাফ এর শক্তি নয় সামান্য
লেখক – হেলাল সরকার ওয়ায়েসী
ক্বাফ এর শক্তি নয় সামান্য, প্রাপ্ত হয় যে সেই তো ধন্য
গুরুর আদেশ নির্দেশ মানো নতশীরে, বলি তোমারে
সম্যক গুরু যদি কৃপা করে।।
কাইয়্যুমুন চিরস্থায়ী শক্তি, নির্ধারিত হয় যার প্রতি
জ্ঞানের বাতি জ্বলে আধার ঘরে,
কুদ্দুছুন করিলে অর্জন , দুর্বলতা হয় তার বর্জন
উন্নত মর্যাদা শক্তি ধরে।।
কাবিউন চিরঞ্জীব ধারা, বুঝা কঠিন তার মাজেরা
সৃষ্ট শক্তির উৎস বলে যারে,
কাদিরুন সুপরিমিত, পারি দিয়া কর্মবৃত্ত
দাড়ায় সত্য অলীদের কাতারে।।
কাহহারুন ক্ষমতাধারী, শক্তি হয় মৃত্যুদানকারী
ক্ষনস্থায়ী দুনিয়া ধ্বংস করে,
কাবিদুন হইলে দৃষ্টি, তার নিয়ন্ত্রনে যাবে সৃষ্টি
পরম ইষ্টি ডাইকা নেয় তাহারে।।
শেরে খোদা মাওলা আলী, এই ছয় শক্তির গুণাবলী
রাসুল হতে প্রাপ্ত ভবের পরে,
ক্বাফ শক্তি হইলে হারা, একুল সেকুল দফা সারা
কপাল পুড়া কয় হেলাল সরকারে।।
সংগীত – ও ভোলা মন
লেখক – কাঙাল আব্দুর রহমান
ও ভোলা মন, বুঝবি কখন, ভুলে কষ্ট পাইলি এমন
ভুলের সঙ্গে চলন-বলন, বাড়াইলি যন্ত্রনা,
নিজের পায়ে কুড়াল মারা, আজো গেলো না।।
কষ্ট পাইতে নষ্ট হইলি, সদায় ভুলের তরী বাইলি
আগুনে দ্বিগুণ পুড়িলি, তবু শিক্ষা হইলো না।।
বদ নেশাতে ডুবিয়া মন, সইবি কতো এই জ্বালাতন
অপচয়ে কষ্ট ভীষণ, তাইতে সুদিন আইলোনা।।
কাঁদিয়া কয় কাঙাল রহমান, বাঁচাও দয়াল বেনজীর চাঁন
দয়াল বিনে, দোজাহানে, কে আছে আপনা।।
সংগীত – কি ভুল করলিরে মন
লেখক – মোতালেব হোসেন চিশতী
কি ভুল করিলি রে মন
না চিনে অমূল্য রতন,
গুরু হইলো পরশমণি
দুগ্ধে যেমন রয় মাখন।।
গুরুকে মানুষ ভেবো না, গুরুতে রয় নিরঞ্জন
পুষ্পে যেমন বাস্প থাকে, গুরু হয় তেমন একজন –
গুরুকে জানো জানের জান, তরাবে হাশর ও ময়দান
গুরু বিনে হইলে মরণ, আসফালাতে হয় গমন।।
গুরু হইলো অন্ধের বাতি, করে আধারে আলো দান
যার পরশ পাইবে আলো, কেউ নয় তাঁর সমান –
সঁপিয়া এই দেহপ্রাণ, ভয় রবে না কাল শমন
মরা দেহ জিন্দা হবে, করলে গুরু কৃপাদান।।
ইহকাল আর পরকালে, রবে গুরু দোজাহান
যার চরণে বিকায়েছো, তোমার আপন মনও প্রাণ –
তারে দেখলে যদি চিনোরে মন, হিসাব নিবে আর কোনজন
মোতালেব কয় ভজন সাধন, থাকলে চেনা যাবে তখন।।
সংগীত – আকাশ পথে দিচ্ছে আযান
লেখক – বাউল উজ্জল শাহ
আকাশ পথে দিচ্ছে আযান
পরবি নামাজ আয়রে আয়,
এই কাবাতে করে ভক্তি
দেখ ছবি রূপময়।।
যেদিন হলো কাবার গঠন, আযান ধ্বনি দেয় পিতৃধন
কল্যাণময় করিতে বাগান, হাত বাড়িয়ে চেয়ে রয় –
নিঃশর্ত সমর্পনে, কাবার ঘর নামাজি টানে
অনুরাগ হয় শুদ্ধ প্রেমে, নিগুম ঘরের খবর হয়।।
জানবি যদি কাবার গঠন, ভেতরে তার রয় কোন রতন
করলে ভক্তি আইন মতন, কাবার চাবি হাতে পায় –
জ্ঞান দরজা খুললে পরে, পথ হারা আর হবি নারে
যেই পথে সেই পরোয়ারে, হাতটি ধরে পথ দেখায়।।
চিনবি যদি সেই মোয়াজ্জিন, কাবার ঘর হয় যাহার অধীন
রত্ন পেয়ে হবি মমিন, নদীয়ায় বাধিবি ঘর –
ত্রিবেনীতে নজর করে, রসের আশায় থাকো পরে
উজ্জল কয় দেখ প্রেমের ঘরে, রূপ হতে রূপ বিশ্বময়।।
সংগীত – তোমার শোধন করো দেহ খানি
লেখক – মোবারক হুসাইন ওয়ায়েসী
তোমার শোধন করো দেহখানি
তবেই হবে আত্মজ্ঞানী
শোধন করো দেহখানি।।
এই দেহেতে পঞ্চ নফস, পঞ্চগুণ প্রকাশের ঘর
আম্মারাকে বশে এনে, ইনছানি কায়েম কর –
নফস মুৎমাইন্নায় মাওলার দীদার যে মিলে
পরিশুদ্ধ স্বভাব হলে, দেখবি সে রূপ নূরানী।।
এ দেহেতে সপ্ত সিফাত, সপ্তগুণ প্রকাশ করে
সাত হরফে কোরান নাযিল, দেখনা তফসির করে –
হলে পরিশুদ্ধ মন, হবে জান্নাতি জীবন
শুদ্ধস্বভাব কায়েম হলে, জাগবে রূহ ইনছানি।।
কামেলীনের মাঝে আল্লাহ সর্বদা বিরাজ করে
সেই নিরাকার আকার ধরে, জ্যোতির্ময় এক রূপ ধরে –
যদি তারে পাইতে চাও, ধরো মুর্শিদেরও পাও
অধম মোবারকে জীবন বৃথা, না বুঝে রূপ এরফানী।।
মহাত্মাদের পবিত্র বাণী সমূহ
1. যে কালেমাকে চিনে কালেমাকেই ধারণ করে আছে, সেই মুক্তিপ্রাপ্ত মানুষ।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
2. নফসানিয়াতের খায়েশ হতে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত চেতনার আরশীতে তোমাকে তুমি কখনোই দেখতে পাবে না।
– হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী
3. সৃষ্টিকর্তার প্রেমে আত্মা খুইয়ে দাও। বিশ্বাস করো, এ ব্যাতিত আর কোনো পথ নেই।
– জালালউদ্দিন রুমী রহ.
4. নিজের সত্ত্বা লোপ করে দাও এবং এমনভাবে কর্ম করো যেনো আল্লাহর সন্তোষ লাভ হয়।
– বাহাউদ্দিন নকশাবন্দ রহ.
5. মানুষ থুইয়ে খোদা ভজো, এ মন্ত্রণা কে দিয়েছে
মানুষ ভজো কোরান খুঁজো, পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে।
– জালালউদ্দিন খাঁ
6. হাজারো জ্ঞানের বই পড়েছো, কখনো কি নিজেকে নিজে পাঠ করেছো।
– বুল্লে শাহ
7. আমার অন্তর আজ তোমার সৌরভে ভরপুর। যখন আমি নিজেকে পেয়েছি তোমাতে।
– হযরত আমীর খসরু রহ.
8. জাগ্রত রুহের অধিকারী তথা কামেল গুরুর প্রেমে আপন ঘরটিকে নূরময় করে তোলো।
– হযরত আল্লামা ইকবাল রহ.
9. নিজের সত্ত্বা ভুলতে পারলে তবেই প্রভুর সাথে মিলিত হওয়া যায়।
– খাজা শেখ ফরিদ রহ.
10. যারা আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করছে, তারাই আল্লাহর বান্দা, তাদের সেজদাই কবুল হচ্ছে।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
11. কোরান হলো আল্লাহর নূর, কদিম, কোরান অসীম এবং তা অখন্ডকালের সাথে সম্পৃক্ত রাছুলের আহলে বাইয়েত সহ।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
12. মানব সুরতকে কায়েম রাখতে হলে নফসানিয়াত খায়েশকে দৃঢ়তার সাথে দমন করো।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ১০ম সংখ্যা, মার্চ ২০২২ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

