আপন ফাউন্ডেশন

Date:

রঁওজা বা মাজার জিয়ারত : কাজী বেনজীর হক চিশতীর প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ
ইউটিউব চ্যানেল
হোয়াটসএপ গ্রুপ
টেলিগ্রাম গ্রুপ

হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

মহান জাতপাক আল্লাহ কোরানুল করিমের সুরা ইউনুসের ৬২ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “আলা ইন্না আউলিয়াআল্লাহে লাখাওফুন্ আলাইহিম ওয়ালা হুম্ ইয়াহ জানুনা” অর্থাৎ সাবধান! নিশ্চয় আল্লাহর আউলিয়াগণের (বন্ধুদের) কোনো ভয় নেই এবং তাঁরা কখনো চিন্তিতও হবেন না।

সুরা বাকারা ১৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে “ওয়ালা তাকুলু লিমাই-ইউকতালূ ফী সাবিলিল্লাহে আমওয়াতুন বাল আহইয়াউন ওয়ালাকিন লা তাসউরূনা” অর্থাৎ এবং তাদেরকে মৃত বলিও না, যারা আল্লাহর রাস্তার (সাধনায়) মধ্যে কতল হয়েছেন, বরং তাঁরা জীবিত, এবং তোমরা উহা জানতে পার না (অনুধাবন করতে পার না)।

একথা উহুদের যুদ্ধে শহীদানদের মাজারে গিয়ে কাফেরগণ বলতো, তোমরা মুহাম্মদের কথায় যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করেছ, দুনিয়ার সুখ ভোগ করতে পারনি। দেখ আমরা এখনো জীবিত আছি দুনিয়ার সুখ আমরা ভোগ করছি। আল্লাহপাক কাফেরদের এ কথার মোকাবেলায় উক্ত আয়াত নাজিল করে বলেছেন – না তাঁরা মৃত নয়, বরং জীবিত, যদিও তোমরা বুঝতে পার না বা জানতে পার না। রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামও বলছেন, “আউলিয়া আল্লাহে লা ইয়ামুতুন বালইয়ান তাকিলু মিন দারুল ফানা ইলা দারুল বাকা” অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের মৃত্যু নেই বরং তারা স্থানান্তরিত হয় ধ্বংসশীল ইহলোক হতে স্থায়ী পরলোকে। কাজেই আল্লাহর অলিগণ হলেন লামউতের অধিকারী তথা চিরঞ্জীব জগতের বাসিন্দা।

জামাদাত, নাবাদাত ও হায়ানাত- এ তিন জামাতের উর্দ্ধে তাদের অবস্থান, যেখানে ইনছানিয়াতের জগত। অন্যান্য সাধারণ মানুষ স্তর বিশেষে সিরাতে হায়ানাত, নাবাদাত ও জামাদাত শ্রেনীভূক্ত তথা আঠার হাজার মাখলুকাতভূক্ত হয়ে অবস্থান করে। রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন, “মুতু কাবলা আনতা মাউত” অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বেই মৃত্যুবরণ করো তথা হায়ানাত, নাবাদাত ও জামাদাতের গুণ-খাছিয়ত পরিহার করে ইনছানের গুণ-খাছিয়ত তথা ইনছানিয়াত অর্জন করে লামউতে স্থিত হও তথা চিরঞ্জীব হয়ে যাও। এ পথে ধাবিত হওয়ার রাস্তা হলো নফসে আম্মারার গুণ-খাছিয়ত পরিশুদ্ধ করে ছালাত কায়েম করা। এই লামউতের অধিকারীগণই হলো নবুয়তে নবী-রাছুল আর বেলায়েতে তাদেরকে বলা হয় কামেল মুর্শিদ বা অলি-আউলিয়া। তাদের সাথে থাকার জন্য আল্লাহপাক হুকুম করেছেন আমানুগণকে তথা নতুন ঈমানওয়ালা বা ভক্তগণকে।

মুমিনদের উপর আল্লাহর কোনো হুকুম নেই। কারণ, তারা দায়েমী ছালাতে উপর স্থিত আছে। কোরানে তাই বলা হয়েছে, “ইয়া আয়্যুহালল্লাযিনা আমানুত্তাকুল্লাহা ওয়াকুনু মা’আছ ছাদেকীনা” অর্থাৎ হে আমানুগণ তথা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের বা অলিদের সঙ্গে থাক। সুরা বাকারাতে আরো বলা হয়েছে, “ওয়ালা তাহ্তাসাবান্নাল্লাযিনা ফি সাবিলিল্লাহি আমওয়াতুন” র্অথাৎ তাদেরকে মৃত বলে ধারণাও করো না, যারা আল্লাহর রাস্তায় কতল হয়েছে। কাজেই আল্লাহর অলিগণ মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের কোনো ক্ষমতা নেই ইত্যাদি যারা বলে তারা অবশই আল্লাহ ও তাঁর রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের বিরুদ্ধে কথা বলে থাকে এবং তারা স্পষ্ট কুফরীতে লিপ্ত আছে। নবী-রাছুল অলি-আউলিয়াগণ তাদের জেসমানী অজুদ ছেড়ে মালাকী অজুদ ধারণ করে আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতা বলে সর্বত্রই গমনাগমন করতে পারেন জীবিত বা ইন্তেকালের পর উভয় অবস্থায়ই। শত শত প্রমাণ রয়েছে কিতাবাদিতে বা বাস্তবেও।

ইন্তেকালের (কালান্তর বা স্থান পরিবর্তন) পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মৃত দেহের অবস্থান স্থলকে আরবীতে কবর বলা হয়। শুধু কবরে শায়িত ব্যক্তির মর্যাদার পার্থক্যের কারণে পুনরুত্থানের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সে মোতাবেক নবী-রাছুলদের এবং অলি-আউলিয়া তথা পীর-মুর্শিদের কবরকে বলা হয় রঁওযা আর ফার্সি ভাষায় বলা হয় মাজার বা দরগাহ এবং সাধারণ মানুষের মৃতদেহের অবস্থান স্থলকে কবর বলা হয়। রঁওযা মানে বেহেশতের বাগান। মাজার স্থানগত বিশেষ্য শব্দ। ধাতুগত অর্থ দর্শনার্থে গমন করা। সাধারণতঃ অলি-আউলিয়াগণের সমাধিস্থলকে মাজার বলা হয়, রঁওযাও বলা হয়। “তাফসিরে কানজুল ঈমান ও খাজাইনুল এরফানে” সুরা কাহাফের ২১ নম্বর আয়াতের টিকার মাসআলা বর্ণিত আছে, “মাজার হতে বরকত লাভ করা জায়েজ” এবং এ কথা ফতোয়ায়ে আলমগিরীর ২য় খন্ডে-র ৫৫১ পৃষ্ঠায়ও বিধৃত আছে। হযরত আল্লামা আলহাজ্ব মোঃ আজিজুল হক আল কাদেরী আস-সাঈদী সাহেব তাঁর রচিত “আস সায়েক্বাহ” কিতাবে বলেছেন, “মাজার করাটা হচ্ছে একটি উত্তম ও জায়েজ কাজ। বুযুর্গদের মাজারকে সর্বসাধারণের জিয়ারতের সুবিধার জন্য তার উপর ঘর তৈরী করা উত্তম ও জায়েজ এবং সুন্নতে সাহাবা”।

রঁওযা ও মাজারের উপর ঘর বা গম্বুজ করার নিয়ম-নীতি প্রত্যেক নবী- রাছুলগণের যুগ হতে আমাদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম পর্যন্ত এবং তারপর আল্লাহর সমস্ত অলিদের মধ্যেই তা প্রচলিত আছে। যেমন, রোখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ “এরশাদুস সারীর” মধ্যে উল্লেখ আছে যে, আমাদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের পূর্বে যতো নবী রাছুল ছিলো তাদের সকল রঁওযা সমূহ পাকা করে তাঁর উপর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে দিতেন যাহা দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পরও পূর্ব স্মৃতিগুলো ঝকঝক করতো। প্রমাণস্বরূপ আজো পূর্বেকার নবী-রাছূলদের রঁওযা যেমন, হযরত বাগদাদ শরীফ হতে ৪৩০ কিঃ মিঃ উত্তরে মওসুল শহরের দজলা নদীর দক্ষিণ পার্শ্বে এক পাহাড়ের চূড়ায় হযরত ইউনুছ আলায়হিস সালামের মাজার শরীফ, যেখানে যেতে ১৫৭টি ধাপ অতিক্রম করে যেতে হয়, ইরাকে হযরত জোনাইদ বোগদাদী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হির মাজারের উত্তর পাশে নবী হযরত ইউশা ইবনে নুন আলায়হিস সালামের মাজার, মওসুল শহরে নবী হযরত ইউনুছ আলায়হিস সালামের মাজার হতে ২ কিঃ মিঃ উত্তরে রয়েছে হযরত শীষ আলায়হিস সালামের মাজার, হযরত শীষ আলায়হিস সালামের মাজার হতে দেড় কিঃ মিঃ উত্তর-পশ্চিমে মওসুল শহরে হযরত জরজীজ আলায়হিস সালামের মাজার বিদ্যমান, তিনি তৎকালীন শাম দেশের দা-দিয়ানা বাদশাহ্’র জামানার পয়গাম্বর ছিলেন।

ইরাকের মওসুল শহরের হযরত জরজীজ আলায়হিস সালামের মাজারের ৪/৫ শত গজ উত্তর-পশ্চিমে হযরত দানিয়েল নবী আলায়হিস সালামের মাজার রয়েছে, জর্ডানে আম্মান শহরের অনতিদূরে এক পাহাড়ের চূড়ায় নবী হযরত শোয়াইব আলায়হিস সালামের মাজার শরীফ রয়েছে, সিরিয়ার দামেস্কে হযরত ইয়াহ্ইয়া নবী আলায়হিস সালামের মাজার শরীফ বিদ্যমান আছে, বায়তুল মোক্বাদ্দাসের সীমানার বাইরে কিছুটা পূর্ব-দক্ষিণে পাহাড়ের উপর হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের মাজার রয়েছে, হযরত দাউদ আলায়হিস সালামের মাজার শরীফটি বারো হাত লম্বা, বায়তুল মোক্বাদ্দাস হতে ১০/১৫ কিঃ মিঃ দক্ষিণে গিয়ে প্রধান সড়কের প্রায় ২/৩ কিঃ মিঃ পশ্চিমে হযরত মুসা আলায়হিস সালামের মাজার বিদ্যমান, তাঁর মাজার শরীফ এগারো হাত লম্বা, বায়তুল মোক্বাদ্দাস হতে ৫০ কিঃ মিঃ দক্ষিণে হেবরণ শহরে হযরত ইবরাহীম আলায়হিস সালাম, হযরত ইসহাক আলায়হিস সালাম, হযরত ইউসুফ আলায়হিস সালাম, হযরত সারা আলায়হিমাস সালামসহ কয়েকশ নবীর মাজার শরীফ রয়েছে, ফিলিস্তিনের “আল খলীল” শহর থেকে ৬ মাইল দূরবর্তী লূত উপসাগরের কূলে হযরত লুত আলায়হিস সালামের মাজার শরীফ বিদ্যমান আছে, শেরে খোদা, আমিরুল মুমিনীন, মহানবীর আহলে বাইয়্যেতের প্রধান হযরত  আলী ইবনে আবি তালিব আলায়হিস সালাম এবং নবী হযরত নূহ আলায়হিস সালামের মাজার ইরাকের নজফ শহরে বিদ্যমান আছে, কারবালার ময়দান হতে ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত নজফ শহরের প্রায় ৯/১০ মাইল এলাকাব্যাপী বিস্তৃত এক কবরস্থানের পশ্চিম পাশে প্রসিদ্ধ নবী হযরত ছালেহ আলায়হিস সালাম এবং হযরত হুদ আলায়হিস্ সালামের মাজার শরীফ রয়েছে, তারা যথাক্রমে সামুদ এবং আদ্ গোত্রের মাঝে প্রেরিত হয়েছিলেন এবং হযরত ইয়াকুব আলায়হিস্ সালামের রঁওযা অদ্যাবধি নিজ নিজ স্থানে বিদ্যমান আছে।

হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু যখন বায়তুল মুক্কাদ্দাস বিজয় করেন তখন বায়তুল খলিলের মধ্যে উক্ত স্মৃতিগুলো বিদ্যমান ছিলো এবং তিনি বড় আবেগের সাথে রঁওযাগুলো জিয়ারত করেন। হযরত ওমর  রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু সেখান থেকে ফিরে এসে রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা, আলে রাছুল ও সাহাবাগণের মাজার বা রঁওযাগুলো পাঁকা করেছিলেন। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম পশ্চিম দিকে মাথা মোবারক এবং পূর্ব দিকে পা মোবারক দিয়ে শায়িত আছেন। কারণ, এখান থেকে দক্ষিণ দিকেই কাবা শরীফ অবস্থিত আছে। তখন থেকে ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের রাজত্বকাল পর্যন্ত রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা ঐ ভাবেই বিদ্যমান ছিলো। এরপর খলিফা ওয়ালিদের নির্দেশে হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু একে ভেঙ্গে চিত্রাঙ্কিত পাথর দ্বারা পুনঃ নির্মাণ করেন। আর এর বাহিরে অপর একটি দালান তৈরী করেন।

৫৫০ হিজরীতে জামালউদ্দীন ইস্পাহানী নামক এক মহান ব্যক্তি যার দান খয়রাতের কথা মদিনা শরীফের দিক-দিগন্তে মুখরিত ছিলো, তিনি রঁওযা শরীফের চারিপাশে চন্দন কাঠের একখানা জালি তৈরী করেছিলেন। এ সময় মিশরের উজির ইবনে আবিল হাইজার শরীফ সাদা ‘দীবা’ বা একপ্রকার সূক্ষ্ম রেশমী কাপড়ের তৈরী গিলাফ পাঠান, যার মধ্যে লাল রেশমী ফুল অংকিত ছিলো এবং তাঁর উপর সুরা ইয়াছীন লেখা ছিলো। খলিফা মুস্তাজী বিল্লাহর নির্দেশে তিনি এই গিলাফ রঁওযা শরীফের উপর পড়িয়ে দিয়েছিলেন। ৬৭৮ হিজরীতে ‘কলাউল ছালেহী’ রঁওযা শরীফের উপর সবুজ গম্ভুজ যা মসজিদের ছাদ থেকেও বেশি উঁচু, তামার জালি সহ নির্মাণ করেন। এরপূর্বে ছাদ হতে দু’হাতের বেশি উচু ছিলো না। এরপরে শাহ্ ফয়সল এবং বাদশাহ ফাহাদের আমলে এক বিরাট কর্মসূচীর মাধ্যমে হেরামাইন শরীফাইন সংস্কার করা হয়, যা বর্তমানে বিদ্যমান আছে। এ বিষয়ে ‘জজবুল কুলুব ইলা দিয়ারিল মাহবুব’ কিতাবে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

মদীনা শহর, তার গম্বুজ ও মিনার দৃষ্টিগোচর হলে তাজিমের জন্য সওয়ারী হতে নেমে পড়বে। সম্ভব হলে মসজিদে নব্বী পায়ে হেটে যাবে। হাদিসে বর্ণিত আছে, আবুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধি দল মদীনায় পৌঁছে যখন রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামকে দূর থেকে দেখতে পায়, তখন উট বসানোর পূর্বেই তারা উটের পিঠ হতে লাফিয়ে মাটিতে পড়ে যায়।

চার মযহাবের ইমামগণের মতে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম এর রঁওযা মোবারকের পবিত্র স্থানটি, যে স্থানটি হুজুর সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের পবিত্র শরীরের সাথে সংযুক্ত, তা সমস্ত সৃষ্টি জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এমনকি বায়তুল্লাহ, বায়তুল মামুর, আরশ-কুরশী, লওহ, কলম হতেও পবিত্রতম। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের শান, মান-মর্যাদার জন্যই তাঁর রঁওযা   মোবারকের এ মর্যাদা এবং তিনি কাবারও কাবা।

কোরানুল করিমের সূরা কাহাফের ২১ নম্বর আয়াতের শেষাংশ হলো, “কালাল্লাজীনা গালাবু আলা আমরেহীম লানাত্তা খেজান্না আলাইহীম্ মাসজেদান্” অর্থাৎ তাদের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এ বিষয়ে বললো, তাদের গুহার মধ্যে অবশ্যই আমরা একখানা মসজিদ তৈরী করবো। এ আয়াতের টিকার মাসআলায় ‘কানজুল ঈমান’ ও ‘খাজাইনুল এরফান’ তাফসীরের ২য় খন্ডে ৫৩৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, মাজার ও মাজারের পাশে মসজিদ নির্মাণ করা জায়েজ এবং মাজার জিয়ারত সুন্নত। রঁওযা বা মাজারে অবস্থিত ব্যক্তিকে একমাত্র উপাস্য জেনে জিয়ারত করা হারাম। রঁওযা বা মাজার জিয়ারত করা মানে নিজেকে রঁওযা বা মাজারে পরিণত করার শিক্ষা গ্রহণ করা।

হায়ানীয়াত দূর হলেই ইনছানিয়াতের জাগরণ ঘটে, আর তখনই ঐ মানুষটি মাজার (জিয়ারতের স্থান) বা রঁওযায় পরিণত হয়ে যায়। একজন রাছুল-আউলিয়ার মাজার বা রঁওযা (যেখানে সমাধি) জিয়ারত হতে এ শিক্ষাই নিতে হবে এবং তাঁর নিকট দোয়া প্রার্থী হতে হবে। দোয়া করতে হবে “হে আল্লাহ ! আমার কবরকে রাছুলের রঁওযার নিকটবর্তী করে দাও”। যারা নিজেকে মাজার বা রঁওযায় পরিণত করার শিক্ষা নেয় না, তারা করছে কবর পূজা। যা পূর্ববর্তী নবীগণের অনেক উম্মতগণ করেছিলো বিধায় নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন, “তোমরা পূর্ববর্তীদের ন্যায় আমার কবরকে পূজা করিও না”। কিন্তু জিয়ারত  নিষেধ নয়। যেমন হাজি সাহেবেরা এবং যাদের সামর্থ আছে তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারক জিয়ারত করে থাকে। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন, “আমার রঁওযাকে ঈদ বানিয়ো না”- এ হাদিস সর্ম্পকে হাফেজ ইবনে মুনযের বলেন, সম্ভবত; হাদিসের উদ্দেশ্য অধিক পরিমাণে জিয়ারতে উদ্বৃদ্ধ করা অর্থাৎ আমার কবর জিয়ারতকে ঈদের মতো বানিয়ো না, মানে বছরে একবার দু’বারের বেশী জিয়ারত করতে আসবে না, অধিক পরিমানে জিয়ারতে আসবে।

রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের রঁওযা মোবারক জিয়ারত করা ওয়াজিব এবং সে উদ্দেশ্যে সফর করাও ওয়াজিব। এ জিয়ারতের জন্য হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের শাফায়াত অবধারিত বলে সহীহ হাদিসে বিধৃত আছে। ইমাম তকিউদ্দীন সুবকী (৭২৭ হিজরী) তাঁর লিখিত   ‘সিফাউল সিকাম’ কিতাবের সূত্রে অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা আঃ জলিল সাহেবের লিখিত ‘আহকামুল মাজার’ কিতাবের ৩৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, শুধু রওযা শরীফের উদ্দেশ্যেই সফর করা এবং জিয়ারত করা উত্তম ইবাদত এবং নৈকট্য লাভের উত্তম পন্থা (মূল কিতাবের ৪৩ পৃষ্ঠা)। যদি রঁওযা জিয়ারতের মাধ্যমে নিজের হায়ানী আত্মা বা নফস আম্মারার ফেল ত্যাগ করে ইনছানিয়াতে স্থিত হতে পারে তবেই হবে উত্তম ইবাদত এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ। রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন, “যে ব্যক্তি কেবল আমার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আমার রঁওযা শরীফে আসবে এবং আগমনের মধ্যে আমার জিয়ারতই তাকে উদ্বুদ্ধ করবে, তাহলে পরকালে তার জন্য শাফায়াতকারী হওয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব হয়ে পড়বে”(তিবরানীর মো’জামে কবির এবং দারকুতনীর আমালী গ্রন্থ)। জানা দরকার, ইহকাল এবং পরকাল এক সাথেই আছে। ইহকাল ত্যাগ করলেই পরকাল প্রাপ্ত হওয়া যায়। শাফায়াত হবে পরকালে অর্থাৎ চৈতন্যের জগতে। এখানেই মুক্তির জগত। এই বিষয়ে রাছুলপাক  সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম অনেক কথাই বলেছেন। যেমন –

১। “মান যারা কবরি, আজাবাত্ লাহু শাফায়াতি” অর্থাৎ রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম এরশাদ করছেন, যে ব্যক্তি আমার রঁওযা জিয়ারত করেছে, তার জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজেব হয়ে গেছে।

এ হাদিসটি ‘দারে কুতনী’ এবং ‘বায়হাকী’ ও অন্যান্যগণ বর্ণনা করেছেন। ইমাম সুব্কী বলেছেন যে, এ হাদিসটি ‘হাসানুন’-এর উচ্চ মর্যাদা পেয়ে ‘সহীহুন’ বা বিশুদ্ধতার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

২। “মান যারা কব্রি, হালাত লাহু শাফাাতি” অর্থাৎ যে ব্যক্তি আমার রঁওযা জিয়ারত করলো, তার জন্যে আমার শাফায়াত হালাল হয়ে গেলো।

এ হাদিসটি ইমাম আবু বকর আহমদুল বায্যার স্বীয় ‘মসনদে’ নকল করেছেন। পূর্বোক্ত হাদিস হতে এ হাদিসটির মধ্যে ‘আজাবাত’ এর পরিবর্তে ‘হালাত’ শব্দটি রয়েছে বিধায় এ হাদিসটি আলাদাভাবে আবারো তুলে দেয়া হলো। এ হাদিসটিকে উক্ত হাদিসের মোতাবেয়াত (অনুগামী) এবং সবুত বা প্রমাণ হিসেবে ধরা যেতে পারে।

৩। “মান জায়ানি যায়েরান্ লা ইয়া’মালুহু হাজাতুন্ ইল্লা যিয়ারাতি কানা হাক্কান আলাইয়া আন্ আকুনা লাহু শাফিয়ান্ ইয়াওমাল্ কিয়ামতে” অর্থাৎ যে ব্যক্তি জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আমার কাছে এলো এবং এ কাজে সে জিয়ারত ছাড়া নিজেকে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলো না, তাহলে আমার উপর জরুরী হবে যে, আমি কেয়ামতের দিন তার শাফায়াতকারী হবো।

এ হাদিসটি তিরবানী ‘মো’জমে কবীর’-এর মধ্যে, দারেকুতনী ‘আমালী’-এর মধ্যে এবং আবু বকর ইবনুল মুক্রী ‘মো’জাম’-এর মধ্যে সহীহ্ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

৪। “মান্ হাজ্জা ফযারা কব্রি বা’দা অফাতি ফাকাআন্নামা যারানি ফি     হায়াতি” অর্থাৎ যে ব্যক্তি হজ্জ করলো, অতঃপর আমার ওফাতের পর আমার (কবর) রঁওযা জিয়ারত করলো, সে যেন আমার জীবদ্দশাতে আমার সাথে সাক্ষাৎ করলো।

এ হাদিসটিকে দারে কুতনী তাঁর ‘সুনানে’ এবং অন্যান্য মুহাদ্দিসগণও রেওয়ায়েত করেছেন। ইমাম সুবকী এ রেওয়ায়েতের সনদের উপর বাহাছ করে সমস্ত আপত্তি খন্ডন করে বিরুদ্ধবাদীদের চমৎকার জবাব দিয়েছেন। এ ইবারতটি আবু আহামদ ইবনে আদী ‘কামিল’-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। অনেক মুহাদ্দেসীন তো এ রেওয়ায়েতটিতে ‘সহেবাণী’ শব্দটি বৃদ্ধি করেছেন, যার অর্থ এটাই যে, “ঐ জিয়ারতকারী সাহাবী হওয়ার মর্যাদা লাভ করবে”।

৫। “মান্ হাজ্জাল বাইতা, ওয়ালাম্ ইয়াযুরনী ফাকাদ জাফানী” অর্থাৎ যে ব্যক্তি বায়তুল্লায় হজ্জ সম্পন্ন করলো, অথচ আমার সঙ্গে জিয়ারত করলো না, সে ব্যক্তি আমার প্রতি অন্যায় বা যুলুম করলো।

এ রেওয়ায়েতটি ইবনে আদী তাঁর ‘কামিল’-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। এ রেওয়ায়েতের সনদে ‘আন-নো’মান ইবনে শিবলিন্’ রয়েছে, তার সম্বন্ধে ইমাম সুবকী বলেছেন, তাকে ইমরান ইবনে মুসা ‘ছিকা’ (মো’তাবর, বিশ্বস্ত) বলেছেন এবং মুসা ইবনে হারুন তাকে ‘মুত্তাহিম’ (দোষারোপকারী) বলেছেন। মতান্তরের শেষে সিদ্ধান্ত হলো তাকে বিশ্বস্ত বলেই সাব্যস্ত করা হয়েছে।

৬। “মান্ যারা কব্রি আও মান্ যারানি কুন্তো লাহু শাফিয়ান্ আও শাহিদান” অর্থাৎ মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম হয় (মান্ যারা কব্রি) বলেছিলেন অর্থাৎ আমার কবরের জিয়ারত করেছে, না হয় বলেছিলেন (মান্ যারানি) অর্থাৎ যে আমার জিয়ারত করেছে, আমি তার শাফায়াতকারী হয়ে গেলাম  অথবা এ কথা বলেছেন, তার সাক্ষী হয়ে গেলাম।

এ হাদিসটিকে আবু দাউদ তায়াল্সি তাঁর ‘মুসনাদ’-এর মধ্যে রেওয়ায়েত করেছেন।

৭। “মান্ যারানি মোতাআম্মেদান, কানা ফি জাওয়ারি ইয়াওমাল্ কিয়ামতে” অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এবং নিয়ত করে আমার জিয়ারত করবে, সে কেয়ামতের দিন আমার হেফাজতে থাকবে।

যদিও এ রেওয়ায়েতের সনদে হারুনকে আয্দি অগ্রহণযোগ্য দলিল বলে পেশ করেছেন, কিন্তু ইবনে হাব্বান তাকে ‘ছেক্কাহ’ বা মো’তাবার-এর মধ্যে গণ্য করেছেন। আর ইবনে হাব্বানের মর্যাদা আয্দি হতে অনেক উপরে।

৮। “মান্ যারানি বা’দা মওতি ফাকাআন্নামা যারানি ফি হায়াতি” অর্থাৎ নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন, যে ব্যক্তি আমার ওফাতের পর আমার জিয়ারত করলো সে যেন আমার জীবদ্দশাতেই আমার সঙ্গে জিয়ারত করলো।

এ বর্ণনাটি দারে কুতনী প্রভৃতিরা বর্ণনা করেছেন। কিছু কিছু সনদে এ শব্দগুলো বেশী রয়েছে, “ওয়ামান্ মাতা বে আহাদিল্ হারামাইনে, বোয়েছা মিনাল্ আ’মেনীনা ইয়াওমাল কিয়ামতে”। অর্থাৎ যে ব্যক্তি হারমে মক্কা অথবা হারমে মদিনাতে মৃত্যুবরণ করলো, কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তির প্রশান্ত অবস্থায় পুনরত্থান হবে।

৯। “মান্ হাজ্জা হাজ্জাতাল্ ইসলামে ওয়া যারা কব্রি ওয়া গাজা গাজওয়াতান্ ওয়াছাল্লা আলাইয়া ফি বাইতিল মকদেসে লাম্ ইয়াস্আল্হুল্লাহু আয্যা ওয়া জাল্লা ফিমা ইফতারাদা আলাইহি” অর্থাৎ যে ব্যক্তি ফরজ হজ্জ আদায় করলো এবং আমার রঁওযা জিয়ারত করলো এবং সে জেহাদ করলো এবং বায়তুল মোকাদ্দাসে গিয়ে আমার উপর দুরূদ পাঠালো, আল্লাহপাক তার কাছে অন্যান্য ফরজসমূহের বিষয় কোনো প্রশ্ন করবে না।

হাফেজ আবুল ফতহুল আয্দি এ রেওয়ায়েতটি বর্ণনা করেছেন।

১০। “মান্ আতাল্ মদিনাতা যায়েরান্ লি আজাবাত লাহু শাফায়াতি ইয়াওমাল কিয়ামতে, ওয়ামান্ মাতা ফি আহাদিল হারামাইনে, বোয়েছা আমেনান্” অর্থাৎ যে ব্যক্তি মদিনায় আমার জিয়ারতের জন্য এলো, তার জন্যে আমার শাফায়াত কিয়ামতের দিন ওয়াজিব হয়ে গেলো। আর যে ব্যক্তি দু’টি হারামের মধ্য হতে কোনো একটি হারামে মৃত্যুবরণ করলো, তাকে কিয়ামতের দিন আরামের সঙ্গে পুনরুত্থান করা হবে।

এ হাদিসটি ইয়াহইয়া আল হুসাইনী “আখবারুল মদিনাতে” উল্লেখ করেছেন।

১১। “মান্ লাম ইয়াযোর কবরি, ফাকাদ জাফানি” অর্থাৎ যে ব্যক্তি আমার রঁওযা জিয়ারত করলো না, সে আমার সঙ্গে বে-ইনছাফি করলো।

এ হাদিসটি ইবনুন নাজ্জার “আদ্-দুররাতুস সামিনা” কিতাবের সূত্রে “সেফাউস সেকামের” ২৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে।

১২। “মান্ যারানি বিল্ মদিনাতে মুহ্তাসেবান্ কুনতো লাহু শাহিদান্ ওয়া শফিয়ান্”। অর্থাৎ যে ব্যক্তি পূণ্যার্জনের নিয়তে মদিনায় আমার সঙ্গে জিয়ারত করলো, আমি তার সাক্ষী এবং সুপারিশকারী হবো।

অন্য একটি রেওয়ায়েতে আছে, “মান্ যারানি মুহতাসেবান্ এলাল্ মদিনাতে কানা ফি জেওয়ারি ইয়াওমাল কিয়ামাতি” অর্থাৎ যে ব্যক্তি পূণ্যার্জনের নিয়তে মদিনা পর্যন্ত এসে আমার জিয়ারত করলো, সে কিয়ামতের দিন আমার হেফাজতে থাকবে।

হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুর এ বর্ণনাটি তিনটি সনদের মাধ্যমে বর্ণনা করার পর ইমাম সুবকী বলেছেন, এ সনদ তিনটি মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল ইবনে আবি ফদিকের উপর নির্ভরশীল এবং তিনি “মুত্তাফেকুন” আলায়হি- এর তরিকায় সনদ হিসেবে পেশ করার যোগ্য। এ হাদিসগুলো “সেফাউস্ সাকামের” ২০-২৬ পৃষ্ঠা হতে তুলে দেয়া হলো।

১৩। যে ব্যক্তি মূল উদ্দেশ্যরূপে আমার জিয়ারত করে, সে কিয়ামতের দিন আমার পড়শী হবে।

১৪। যে ব্যক্তি মক্কায় হজ্জ করার পর আমার উদ্দেশ্যে আমার মসজিদে আসে তার জন্যে দু’টি মকবুল হজ্জ লেখা হয়। এখানে রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের জিয়ারতকে মকবুল হজ্জের সমান বলা হয়েছে। (হৃদয় তীর্থ মদীনার পথে- ১৪৪ পৃষ্ঠা)। 

রঁওজা বা মাজার জিয়ারত : কাজী বেনজীর হক চিশতীর প্রবন্ধ
হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

সাবস্ক্রাইব করুন
ফেসবুক পেজ
ইউটিউব
ইনস্টাগ্রাম
টুইটার X