ছালমা আক্তার চিশতী
আমাদের সমাজের মাঝে দেখা যায় কিছু লোক তরিকার নাম নিয়ে অনেক তরিকত বিরোধী কর্মকান্ড করে থাকে। যেমন- তারা মনে করে বায়াত না হয়ে পীরমুর্শিদের নাম স্মরণে থাকলেই হবে। এই বিষয়টি তারা বুঝে না যে, তারা কত বড় ধোঁকার মাঝে পরতেছে। কারণ, তাদের মাথাটি দেখতে মানুষের মাথার মতো হলেও তাদের মাথার চিন্তা চেতনা গুলো নিন্মস্তরের, তরিকত শূণ্য। আমার মুর্শিদ তাঁর আলোচনার মাঝে এই উপমাটি তুলে ধরে- গিট্টু ছাড়া কাঁথা সেলাই করা, ঠিক তেমনি দশা হয় এই ধরনের লোকদের।
কোরানের মাঝে সূরা কাহ্ফ ১৭নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন- “আল্লাহ যাকে হেদায়েত দেন সে-ই হেদায়াত প্রাপ্ত হয় ; যাকে তিনি বিপথগামী করেন, সে ওলিয়ম মুর্শিদ (পথপ্রদর্শক) পাবে না।” কারণ, মুর্শিদ নিজেই ঈমান এবং তাঁর নিকট মুরিদ হওয়াটাই হলো ঈমানদার হওয়ার প্রমাণ (আল্লাহর অনুমতিক্রমে ঈমান আনা হলো- সুরা ইউনুস – ১০০) এবং ঈমানকে সরল মনে দৃঢ়তার সাথে আঁকড়িয়ে ধরে রাখা হলো সৌভাগ্যের বিষয়; মুক্তির পথ ইহাই ঈমানদারগণের প্রতি আল্লাহর দয়া-করুণা। যারা গুরুর আশ্রয়ে আসেনি আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান নেই, তারা পথভ্রষ্ট। নবী-রাছুলগণই মানব গুরু, বেলায়েতে আল্লাহর ওলিগণ। নমরুদ, ফেরাউন, সরদার সউদ, আবু জাহেল, আবু লাহাবগণ কোনো যুগেই গুরুকে মানে নি/মানে না। যারা গুরুর আনুগত্যে না এসে অমুকের-তমুকের আশেক সেজেছে তারাও এক ধরণের বস্তুবাদি জিনগ্রস্থ মানুষ, দুনিয়ার মানুষ। এরা আশেক-মাশুকের নাম নিয়ে অশ্লীল পথে ধাবিত হয়ে চলছে। যারা শুধু দুনিয়ার আশা করে তারা হলো দুনিয়া মুখি মানুষ। কারণ, দুনিয়া মানেই হলো ছয় রিপু বা আমিত্বের মাঝে ডুবে থাকা মানেই বস্তুবাদী হওয়া। সুতরাং যারা দুনিয়ার সুখ সন্ধানেই রতো আছে তাদের বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘তালিবুদ্দুুনিয়া মরদুদ/মুয়ান্নাছ।’ অর্থাৎ দুনিয়ার সুখ সন্ধানীগণ মরদুদ শয়তান/নারী। গুরু ব্যতীত জগতের আর সমস্তই নারী। নারীর জান্নাত নেই, মুক্তি নেই ; এরা দুনিয়াতে আবদ্ধ হয়ে সিজ্জিনে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। গুরুর/জগত স্বামীর নিকট নিকাহ (বায়াত)-এর মাধ্যমে বস্তুমোহ (নারীত্ব) হতে মুক্ত হয়ে পুরুষত্ব অর্জন করলে মিলবে জান্নাত। নারীত্ব হতে বের হয়ে পুরুষত্ব অর্জন হলে তার জন্য চার বিয়ে করা ফরজ, সে দৈহিক নারী-পুরুষ যে-ই হোক। সে নারী প্রত্যেকের সাথেই আছে।
মন আখেরাত মুখি না হলে দুনিয়ার কর্ম বা ইবাদত করাটাও পাপ হবে। ছয় রিপুকে ধারণ করে যত কর্ম করা হউক তা মূল্যহীন। যেমন- ময়লা ভর্তি কন্টিনারের মাঝে কেউ খাবার রাখবে না, তেমনি মানুষের অবস্থান দীলের কন্টিনারে যদি ময়লা থাকে তবে আর খোদার নূরের জ্যোতি তার মাঝে প্রকাশ পাবে না। ‘মকতুবাতের’ ২য় খন্ডের ৬৫ পৃষ্ঠায় ১৮৭ নং মকতুবাতে বর্ণিত আছে যে, হযরত খাজা আহরার রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু স্বীয় পুস্তকে লিখেছেন যে, “পীরের ছায়া অর্থাৎ তাছাওর বা ধ্যান আল্লাহর জেকের হতেও উৎকৃষ্ট।” হযরত শায়েখ আহামদ শেরহিন্দি রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু বলছেন, “পীরে তাস্ত আউয়াল মাবুদ তাস্ত” অর্থাৎ তোমার পীরই হলো তোমার প্রথম মাবুদ। নিজ পীরকে এই রূপ জানতে না পারলে ইবাদত বন্দেগী বিফল হবে, মানব জনমটা হবে অসার। অসার জিন্দেগী আখেরাতকে ধংস করে দেয়। যারা দুনিয়ার সৌভাগ্যের আশা করে বা দুনিয়ার মান-মর্যাদার কথা ভেবে আখেরাতের কর্ম হতে বিরত/দূরে থাকে বা সরে যায় তারাই বিপথগামী/দোযখগামী হবে। তাদের তকদির তারা নিজেরাই তৈরী করে নেয়। তারা এমন কর্মে লিপ্ত হয় যা জীব জন্তুদের কর্মের মতো, জীব জন্তুরা তাদের ভিতর বাহির এক করে চলা ফেরা করে আর যারা এই রূপ মানবীয় অজুদ ধারণ করে পশুর স্বভাবটা ধারণ করে রেখেছে তারা জঙ্গলের জীব/জন্তুর থেকেও অধম।
আল্লাহকে পাওয়ার আশা করা এবং আল্লাহকে পেতে হলে ভিতর বাহির এক করে গুরু ভজন করতে হবে। যারা গুরুর নির্দেশিত পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে তারা মানব জনমে মুক্তি লাভ অবশ্যই করবে। কথায় বলে, গুরু থুইয়া যে গোবিন্দ ভজে সেই পাপী নরকে যাবে। ফকিরী নাম ধরে সাধনার নামে এক ধরনের লোক আছে তারা চন্দ্র সাধনার নামে নানা কিছু আহার-বিহার করে, ইহা মাত্রই তরিকার কাজ নয়/মানব ধর্ম নয়। এরা চরম ভাবে বিভ্রান্ত। তারা নিজেরাই পোলাও, মাংস রেখে পায়খানা, প্রশ্রাব, রজ, বীর্য ইত্যাদি সাধনার নামে খেয়ে থাকে। কারণ, এই ধরনের সাধারণ বিষয়টি বুঝার মতো জ্ঞানও তাদের নেই। তাতে তাদের মানবাত্মা হারিয়ে পশুত্বের জগতে নেমে যায়/আসফালাস সাফেলিন হয়ে যায়। সাধনার প্রথম স্তরই হলো জিনগ্রস্থ হতে ইনছানে উত্তীর্ণ হওয়া আর ইনছান আল্লাহর মধ্যে ফানা হয়ে চির স্বাধীনতার জগতে বাকা হয়ে যায়। এ জন্য একজন মুক্তিকামী মানুষের সব কর্মের মূল হলো বায়াত হওয়া।
গাউছেপাক হযরত আব্দুল কাদির জিলানী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তাঁর ‘আল ফাতহুর রাব্বানী ওয়া ফায়জুর রাহমানী’ কিতাবের ৮৫ পৃষ্ঠায় বলছেন, ‘নেককারদের বা ইনছানুল কামেলদের খেদমতে থাকা যদি তোমার সম্ভব হয়, তবে ইহাই তোমার জন্য ইহকাল ও পরকালে মুক্তির জন্য শতগুণে শ্রেয় হবে’। সুতরাং তারাই হতভাগা যারা গুরুর সান্নিধ্য হতে ইচ্ছাকৃত ভাবে দূরে আছে/গুরু সংযোগ হতে বিচ্ছিন্ন আছে। যেমন- আমরা রাতে ঘুমানোর আগে ঘরের মাঝে মশারী টানিয়ে থাকি। মশারী টানানোর কারণ হলো মশায় কামড়াবে। এই পাঁচ বস্তু দিয়ে গড়া দেহটাকে সেবা যত্ন করতেছি। তেমনি মন একদিন ভেবে দেখেছে কি এই মাটির দেহের মাঝে আল্লাহর নূরের দেহ যে লুকিয়ে আছে তার মাঝে মশারী লাগানো হয়েছে কিনা। এই নূরের দেহের মশারী লাগাতে হলে গুরুর জ্ঞানের আলো/জ্যোতি লাগবে। আপাদ-মস্তক গুরু নিজেই নুর এবং গুরু হতে আগত জ্ঞানটাই হলো জ্যোতি। এই জ্যোতির্দেহের অধিকারী হতে হলে আমিত্বের আবরণ খুলতে হবে। আর এই আবরণ খুলতে হলে অনুরাগের বাহনে বসতে হবে। কারণ, অনুরাগ ছাড়া এই আবরণ খোলা যায় না। যেমন- ঘরের মাঝে জানালা থাকে যার ঘর সে জানালার মাঝে পর্দা দিয়ে থাকে যাতে কোন মানুষ ঘরের ভিতরটা দেখতে না পারে তেমনি ছয় রিপু পর্দা হয়ে একজন অচেতন মানুষের দীলের জানালাগুলোকে বন্ধ করে ফেলে। এই বন্ধ জানালাগুলো খুলতে হলে গুরুর নূরের আলো লাগবে। বোখারী শরীফের ৫ম খন্ডের মাঝে বর্ণনা করা হয়েছে- “পার্থিব স্বার্থপূরণ না হলে যারা বায়াত ভঙ্গ করে আল্লাহপাক তাদের প্রতি হাশরের দিন তাকাবেন না।” কারণ, ব্যক্তিস্বার্থ থেকে সকল পাপের জন্ম হয়। দুনিয়া নিয়ে গুরুর দরবারে যাওয়াটাই হলো পাপ।
কিছু সংখ্যক মানুষ ব্যতিত সবই এই ভুলগুলো করে থাকে। যারা ভুল করে তারা মানব জনম হারানোর দিকে ধাবিত হয়। কারণ, দুনিয়ার পূজারীগণ আখেরাত হারাবে এইটাই স্বাভাবিক। যারা স্মৃতির পাতায় অমর হয়ে রয়েছে তারা অনেক দুঃখ যাতনা পার হয়ে এই বিপদ সংকুল রাস্তা পারি দিয়েছে। যারা অচেতন অর্থাৎ গুরুর কালাম শ্রবণ করেনি সামনে বসেও গুরুর কালাম শুনতে পায়নি তারা এই ভয়ংকর বিপদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, আলমে নাছুতের সাগরে ডুবে যাবে ; শেষে সুরত বদল হয়ে হাশরে তাদের উত্থান ঘটবে। কারণ, তাদের শ্রবণ শক্তিকে ইবলিশের নিকট ধার দিয়েছে। তাই কান থাকলেও গুরুর পবিত্র কালামগুলো শ্রবণে আসেনি। দেলের দ্বারা কালাম উপলদ্ধি করেনি। তারা পশু আকৃতিতে হাশরে উঠবে (সুরা হিজর)। আল্লাহর দেওয়া সাতটি নূরি সেফাতকে জাগ্রত করতে না পারলে গুরুর করণ করা যাবে না কারণ, এই সাত সেফাত সব মানুষের মাঝে রয়েছে যারা গুরুকে ধারণ করবে তারা এই নূরানী সেফাতগুলোর হেফাজত করবে আর যারা মুর্দার তারা এই নূরের অবস্থানে জুলমাত এনে অন্ধকার দ্বারা সেফাতগুলোকে ঢেকে দিবে। কারণ, একজন মানুষের মনে অহরহ অন্ধকার এসে পূর্ণিমার চাঁদের (মানব সত্তাই চাঁদ) আলোকে ঢেকে ফেলে। এই চাঁদের আলোটা যে কি তা জ্ঞানীগণ বুঝেন। একজন জ্ঞানীর কাছে গিয়ে নফসের প্ররোচনায় অচেতন থাকাটা দুর্ভাগ্যের বিষয়।
এই দূর্ভাগ্যকে সৌভাগ্য করতে হলে আল্লাহর দেওয়া খাস নাম আলিমুন দ্বারা নফসকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। যার আলিমুন জাগ্রত সে ভাল/মন্দ প্রভেদ করতে পারবে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর পবিত্র কালাম শুনিয়েছে তা অর্জুন শ্রবণ করে, গুরুর দেওয়া সেই কালাম অনুযায়ী যুদ্ধ করে জয় লাভ করেছে। গুরু অচেতন ভক্তকে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়ে চেতন করে। হযরত খাজা বাবা গরীবে নেওয়াজ রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তাঁর ‘দেওয়ান-ই-মঈনুদ্দীনে’ বলছেন, “খাওয়াহিকে রাখম বানিদার বেহারা মান বানগরমান আয়না ওয়েম ও সিত্ খোদা আজ মান” অর্থাৎ তুমি যদি খোদার মুখ দেখতে চাও তা হলে আমার চেহারার দিকে তাকাও। আমি তার আয়না, সে আমা হতে আলাদা নয়। যারা গুরু প্রেমিক তাদের হাল হাকিকত আলাদা। তারা এই মায়াময় জগতে বাস করেও এই মায়া থেকে নিজ মনকে দূরে রাখে। আর যারা গাফেল তারা মনকে বিষয় মোহের মাঝে বেঁধে রাখে। কারণ, তারা বুঝতে পারে না এই কাজগুলো কার। মহা মনের অধিকারী না হতে পারলে গুরু সেবা করা যায় না। আর মহা মনের অধিকারী তখনই একজন মানুষ হয় যখন সে পর্দা মুক্ত হয়। আয়নার মাঝে রূপ দরশন করতে হলে আমিত্বের খোলস হতে নিজ অস্তিত্বকে বের করে নিতে হবে তবেই ইরফানী আয়নার মাঝে রূপ দরশন হবে। যারা একত্ববাদে বিশ্বাসী তারা প্রবৃত্তির পুজা করবে না।
কারণ, তারা মানব ধর্ম ইসলাম ধারণ করার অবিরাম চেষ্টা সাধনা করতেছে। একজন মুরিদের মনের খবর গুরু জানেন কারণ, গুরুর অন্তর্দৃষ্টি খোলা। গুরু একজন মুরিদের ভিতর বাহির দুইটি অবস্থাই দেখতে পায়। যে ব্যক্তি পার্থিব স্বার্থপূরণ করতে গিয়ে গুরুকে ভুলে যায় সে আল্লাহর অশেষ রহমতের দরজা হতে বের হয়ে জাহান্নামের দরজায় অবস্থান করে। গুরুর আশ্রয়ে থাকাই জান্নাতের দরজায় অবস্থান করা। যেহেতু মানবগুরুর হাতে বায়াত মানেই আল্লাহর হাতে বায়াত (সুরা ফাত্তাহ-১০) বিধায় গুরু ত্যাগ করা বা বায়াত ভঙ্গ করা আল্লাহর নিকট হতেই ঈমান ত্যাগ করা। এরাই কাফের হয়ে যায়। যেমন, একজন চেতন মানুষ খাবার প্লেটে নিয়ে খায় আর একজন অচেতন মানুষ সে নিজেকেই হায়ানী আত্মার খাবার হিসেবে সাজিয়ে রাখে। তার এই অবস্থার থেকে বুঝা যায় সে কতটা অচেতন। সে বুঝতে পারে না সে কতটা ভুলে আছে/ভুল করছে। কারণ, সে নিজে নিজেই হায়ানীয়াতের ফাঁদের দিকে পা বাড়াচ্ছে। কারণ, গুরু ব্যতীত আর সমস্তই দুনিয়া। গুরুর প্রতি যার পূর্ণ ঈমান নেই অথবা পার্থিব স্বার্থের জন্য যারা গুরুর সঙ্গ/ঈমান ত্যাগ করে তারা আখেরে অবশ্যই মানব জনম হারাবে/জাহান্নামী হবে। এ জগতে নফস দ্বারা অর্জিত আমলের ফলাফলটা এই রূপ হবেই। শত নামাজ, রোজা, তসবিহ ইত্যাদিতে রতো থাকলেও।
বুঝতে হবে মুক্তির দরজা একমাত্র গুরুর/রবের করুণা-দয়া (রহিমের) ভিতর রয়েছে, এখানেই তিনি গাফুরুর রহিম। নিজ গুরুকে রেখে পার্থিব স্বার্থ পূরণ করতে গিয়ে গুরুকে ত্যাগ করলে তার দশা হবে কুকুরের ন্যায়। যেমন- কুকুর খাবারের আশায় বিভিন্ন জায়গায় জিহ্বা বের করে দৌড়াদৌড়ি করে থাকে, তাকে কেউ খাবার দেয় আবার কেউ কুকুরটিকে তাড়িয়ে দেয়, তেমনি হয় এই গুরু ত্যাগী লোকদের অবস্থা। এই রূপ অন্ধদের কোন বুঝ জ্ঞান আসে না যে তারা কি ভুল করতেছে। কারণ, তারা হলো বেখবর, তারা হলো তাদের নফসে আম্মারার পূজারী।
পূজা হলো দুই রকমের। একটি হলো নফস মোৎমাইন্নার আর অন্যটি হলো নফসে আম্মারার। কর্ম অনুসারে ফলাফল, কর্ম যদি ভাল হয় তবে ফলাফল ভাল হবে আর কর্ম খারাপ হয় ফলাফল খারাপ হবে। বাজে যুক্তি তর্ক দিয়ে গুরু ভজন হয় না, বরং ঈমানের ক্ষতি হয়। শায়খ সাইয়্যেদ হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ) তাঁর ‘আল্ ফাত্হুর রাব্বানী ওয়া আল্ ফায়জুর রাহমানী’ কিতাবের মাঝে বলছেন-“তুমি আমার কথা না শুনিয়া স্বীয় নফস ও কামনা সাথে লইয়া ইবাদত খানায় বসিয়াছ। সর্ব প্রথম প্রয়োজন পীরের সাহচর্য লাভ করা। স্বীয় নফস, কামনা এবং আল্লাহ ব্যতীত সকল কিছু হত্যা করিয়া পীরের দ্বারে চাপিয়া বস।” আর মুরিদ/বায়াত না হয়েই শুধু কারো নামের উপরে গুরু ভজন হলো খাঁটি স্বর্ণের জিনিস রেখে ইমিটেশনের জিনিস নিয়ে বসে থাকা। তারা হলো অন্ধ, অন্ধের কাছে সব কিছুই আলোহীন ঠিক তেমনি অবস্থা এই অচেতন লোকদের। আর এই কর্মগুলো এই অচেতন মানবরূপী জীবেরা করে থাকে। কারণ, তারা মানুষের পোশাক রেখে জীব-জন্তুর পোশাক পরিধান করে আছে মানে এরা উলঙ্গ। যে মেয়ের বিয়েই হয়নি দেশ ভরেই তার শ্বশুর বাড়ি কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বাড়ি দাবী করার সিষ্টেম নেই, তেমনি দশা হলো মুরিদ না হয়েই যারা এজন-সেজনকে পীর দাবী করছে তাদের দশা, স্রোতে ভাসমান কঁচুরী পানার মতো ঘাটে ঘাঠে ভেসে বেড়ায়।
একটি প্রবাদ বাক্য রয়েছে- ‘পাগলও তার নিজের বুঝ বুঝে’। যারা নামের উপরে গুরু ভজন করে তারা পাগলের চেয়েও অধম। একনিষ্ট ভাবে গুরু ভজন করতে হলে মনকে অনুরাগের দরজায় নিতে হবে। গুরুর প্রতি ঈমানের অনুরাগ ছাড়া গুরু ভজন হয় না, অনুরাগ বিনে এই মানব জনমটা বৃথা যাবে। মানুষ কেমন অন্ধকার সাগরের মাঝে পড়ে আছে সে তা দেখতেছে কিন্তু তা বুঝতেছে না। কারণ, বুঝলে আর সে অন্ধকার সাগরের মাঝে থাকবে না। অন্ধকার জগতে যারা অগ্রসর হচ্ছে তারা বুঝবে না তারা যে অন্ধকারে ডুবে আছে। এই অন্ধকারে থাকাটাই হলো অচেতন ভাব আর এই অন্ধকার কেটে আলোর মুখ দেখা হলো চেতন ভাব। যেমন একটি শিশুর দাঁত পরে গেলে সেই দাঁত আবার উঠবে আর একজন বৃদ্ধ লোকের দাঁত পরে গেলে সেই দাঁত আর উঠবে না। এই উপমা থেকে বুঝা যায় গুরুর নিকট শিশুর ন্যায় হয়ে থাকলে সে হোঁচট খেয়ে পরে গেলেও গুরু দয়া করে উঠিয়ে দিবে কিন্তু একজন শিশুর মতো আচরণ করতে না পারলে টেটনামি/পাকনামি করলে তার দশাটি হবে বৃদ্ধের দাঁতের নেয়, টেটনামির জন্য হোচট খাওয়া হলে গুরুর দয়া এই নরাধমের মাঝে পৌছাবে না। কারণ, তাদের কানে, চোখে ও দেলে মোহর মারা থাকবে।
কোরানে সূরা আরাফ ১৯৮ নং আয়াতে আল্লাহ তায়াল নবীকে বলতেছেন- “ওয়া তারাহুম ইয়ানজুরুনা ইলাইকা ওয়াহুম লা ইউবসিরূণ।” অর্থাৎ এবং দেখছেন তারা আপনাকে দেখতেছে অথচ দেখতেছে না। সর্বযুগে আল্লাহতায়ালা হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-কে লক্ষ্য করে এ কথা বলে আসতেছেন। কারণ, কোরানের বাণী হলো চিরবর্তমান। যাদের দিব্য দৃষ্টি খুলে গেছে তারা তা দেখতে পায় এবং কোরানের ভেদ রহস্য উন্মোচন করতে পারে। কোরানের প্রত্যেকটি আয়াত বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায় সেখানে গুরুবাদের আলোচনা করা হয়েছে। এক ধরনের পীর আছে দালাল ধরে মুরিদ করে যেমন- হাট বাজারে দালালরা গরু বিক্রি করে ঠিক সেই ভাবে। কিছু কিছু লোক আছে কিছু দিন এই পীরের কাছে আবার কিছু দিন অন্য পীরের কাছে মুরিদ হয়। তাদের এবাদত বন্দেগী হবে না, মূলতঃ তাদের বায়াতই সঠিক নয় এবং তাদের কোনো ঈমান নেই এই সমস্ত কর্ম করে তারা নিজেদেরকে জাহান্নামের উপযুক্ত করে তুলে। কিছু কিছু মহিলা আছে তরিকার দোহাই দিয়ে নানা অপকর্মে নিজেকে লিপ্ত রাখে। তারা দুই দিন পর পর এই পীরের কাছে ঐ পীরের কাছে মুরিদ হয় তাদের অবস্থা সম্পর্কে বা তাদের পরিণতি সম্পর্কে মুন্সিগঞ্জ জেলার গালিমপুরের প্রখ্যাত মরমী সাধক রহিম ফকির সাহেব তাঁর একটি গানের মাঝে বলছেন –
নিকাহ বসিওনা যথা তথা
বেঁচিওনা বেঁচা মাথা,
মাফ হবে না গুনাহ খাতা
সারা জীবন ভরে॥
প্রত্যেকটি সাধকই এইরূপ কথা সর্ব যুগে বলে থাকে বিভিন্ন ভাবে। তাদের কর্ম অনুসারে আখেরে কি হবে তা নির্ধারণ করে রাখতেছে। এই অচেতন লোকদের স্থান হবে সিজ্জিনে। সিজ্জিন হলো ঐ স্থানের নাম যেই স্থানে পাপীদের আত্মা থাকবে। আল্লাহ আর নবীর ভেদ রহস্য জানার জন্য সৌভাগ্য লাগবে। তাঁরই করুণা-দয়া লাগবে। আর সেই সৌভাগ্যটাই হলো গুরুর দয়া। কারণ, তাঁর কৃপা বিনে এই মানব জগতে কিছুই সমাধান হয় না। গুরুর কাছে যাওয়ার পরে তাঁর শিক্ষানুসারে মনের ময়লাগুলোকে পরিস্কার করার জন্য সাধনা করতে হবে। এই সমাজের লোকেরা সাধনা অর্থ কি তারা তা জানে না ? সাধনা করতে হলে অনুরাগের দরজায় দাঁড়াতে হবে।
একজন গুরু ভক্তের সারাটা জীবন প্রমাণ দিতে হয় যে, সে সত্যিকারের ঈমানদার, একজন গুরু ভক্ত। শিষ্য আর ভক্ত এক নয়। ‘শিষ্য’ হলো অনুসারী, যে গুরুর হুকুম-নির্দেশকে পরিপূর্ণ অনুসরণ করে চলে। আর ‘ভক্ত’ হলো যে মোহমুক্ত হয়েছে, নফস আম্মারার বলয় থেকে বের হয়ে গেছে বা বস্তুবাদ মুক্ত হয়েছে, সে গুরু ভিন্ন অন্য কিছুর ধ্যান-ধারণা তার চিন্তা/মানস জগত হতে উঠে গেছে, জাগতিক জাত-কুলের ব্যাধিমুক্ত হয়েছে। যেমন, কাঁচের মাঝে একটি ডিজাইন করা পেপার লাগানো থাকলে কাঁচের বাহির থেকে ভিতরে কি আছে তা দেখা যাবে না আবার ভিতর থেকে বাহিরে কি আছে তা দেখা যাবে না, তেমন দশা হবে অনুরাগবিহীন লোকেদের। তারা রাসুলের সামনে থেকেও রাসুলকে দেখতে পাবে না। কারণ, তার দীল জুলমাতের পর্দা দ্বারা আবৃত। এই মানব ছুরতটাকে অমর করতে হলে অনুরাগ সাধনায় ডুব দিতে হবে। কোন মানুষ যদি তার নিজ মনের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হয় তবে সে মূল গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না। যেমন, একটি ছবির মাঝে একজন মানুষ যেমন স্থির হয়ে থাকে তেমনি হায়ানীয়াত একজন মানুষের ইনসানিয়াতকে স্থির করে/ঢেকে রাখে। ইনসানিয়াতের এই স্থির অবস্থার জাগরণ ঘটাতে হলে মনকে অদৃশ্য সূতার বস্তুবাদের বাঁধন থেকে মুক্ত করতেই হবে। এই সূতার বাধন মানুষের মনকে কঠিন থেকে কঠিন করে রাখে। মনের এই কঠিন অবস্থার জন্য মানুষ তার নিজ মুর্শিদকে ভুলে দুনিয়ার কর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তারা দুনিয়াটাকে মনে করে বেহেশতের সুখের মতো। কিন্তু ইহা যে ক্ষণস্থায়ী এ চিন্তা তাদের মাথায় আর কাজ করে না, ইহা জাহান্নামী হওয়ার লক্ষণ।
একজন আধ্যাত্মিক জ্ঞানীর বাক্য নিজ অস্তিত্বের মাঝে ধারণ করতে পারলে জাহান্নামের দুর্গম পথ অতিক্রম করা সম্ভব হবে। যেমন, সূর্যের আলো দ্বারা গাছ-পালা খাবার তৈরী করে তেমনি একজন ভক্ত গুরু প্রদত্ত আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আলোকে নিজ ইনসানি আত্মার গুণগুলোর জাগরণ ঘটায়। আমার মুর্শিদ হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশ্তী নিজামী তাঁর আলোচনার মাঝে বলতে থাকে- হযরত জুনায়েদ বোগদাদী (রাঃ) এর এক শিষ্য অনেক দিন ধরে দরবারে আসে না। তাই তিঁনি নিজেই ঐ শিষ্যের বাড়ি গেলেন। শিষ্যকে তিঁনি জিজ্ঞেস করলেন, কতদিন হয় তুমি দরবারে যাও না, কারণ কী? শিষ্যটি বলল হুজুর, আমি এখন প্রতিদিনই বেহেশতে যাই, সে জন্য সময় পাই না। হযরত জুনায়েদ বোগদাদী তার কথা শুনে বিষয়টি বুঝতে পারলেন। হযরত জুনায়েদ বোগদাদী (রাঃ) শিষ্যকে বলল, ঠিক আছে বেহেশতে গিয়ে কিছু খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ্ বলে খাওয়া শুরু করিও। এই কথাটি বলে তিনি দরবারে চলে গেল। শিষ্য প্রতিদিনের মতো বেহেশতে গেল তার সামনে নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার নিয়ে আসল। খাবার যখন সে মুখে দিবে তার গুরুর বাণীটি মনে পরে গেল। যখন সে বিসমিল্লাহ্ বলে খাবার মুখে দিল অমনি সব খাবার চিতাশালের পঁচাগলা মাংসে পরিণত হয়ে গেল ও বেহেশতী হুর-পরীগুলো ভূত-পেত্নী হয়ে গেল। পরের দিন সকাল বেলা তাকে চিতাশালের পাশে একটি জমিতে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেল। এরপর হতে যখনই তার ঐ পচা-গলা মাংসের কথা মনে পরে তখনই সে বমি করতে থাকে। তিন দিন পর শিষ্যটি গুরুর বাড়িতে গেল এবং হযরত জুনায়েদ বোগদাদী (রাঃ)-এর কাছে ক্ষমা চাইলেন। অচেতনদের বেহেশত এমনি হয় তারা দেখবে সেই দেখার মাঝে অনেক অপূর্ণতা থাকবে। কারণ, তাদের বাসিরুনের সাথে গুরুর দেওয়া আলীমুন নেই, মানে এরা অন্ধ-বধির।
গুরুর দেওয়া আলীমুনকে ধারণ করতে পারলে এলমে এলাহীর অধিকারী হওয়া যায়, আর তাতে অন্ধকার কবর আলোকিত হয়ে ‘রঁওজা’ বা জান্নাতের বাগান সৃষ্টি হয়। যারা গুরুর দেওয়া আলীমুনকে ধারণ করতে পারে না তাদের দশা ঠিক এমনি হয় যেমনÑ ডায়াবেটিস রোগ হলে শরীরের সমস্ত অঙ্গ ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। আর মিষ্টি যখন অতিরিক্ত খাওয়া হয় তখন আর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা য়ায় না এর ফলে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে থাকে। তেমনি দশা হয় আলীমুনবিহীন লোকেদের। তারা হায়ানীয়াতের মধু (যা মূলতঃ বিষ সমতুল্য) পান করতে গিয়ে অচিরেই মানব সুরতটিকে হারিয়ে ফেলে। যেমন, আমরা সাগরের পারে গিয়ে সূর্য ডুবতে দেখি ঠিক মনে হয় সূর্যটি সাগরের ঐ পাড়ে কিংবা সাগরের মাঝেই ডুবতেছে আসলে এই বিষয়টি কি সঠিক? ঠিক তেমনি যারা পন্ডিত তারা ভাবতে থাকে সে নিজেই একমাত্র শ্রেষ্ট আসলে এই অবস্থানটি যে তার ভুল তার তা বুঝার মতো জ্ঞান নেই, সে নিজ সত্তাকে হারিয়ে ফেলছে। ঐ ব্যক্তিটি এক বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মাঝে পরে থাকে। তারা এই মায়ার জগতের ভোগ বিলাস করতে করতে নিজ আপন সত্তা থেকে হারিয়ে যায়। ডা. জাহাঙ্গীর আল সুরেশ^রী সূরা বাকারা ১৪৮নং আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছেন- যে কল্যাণের সাহায্যে মানুষ মরণকে জয় করে নিতে পারে তথা জন্মচক্রের ঘূর্ণায়মান বৃত্ত হতে নিজেকে মুক্ত করতে পারে উহাই আল্লাহ্র দৃষ্টিতে একমাত্র কল্যাণ তথা একমাত্র রহমত। ইহাই আল্লাহ্কে পাবার পথে ধাবিত করে এবং পরিশেষে যাহা পাওয়া উচিত সেই রবরূপী আল্লাহ্র সঙ্গে মিলনে একাকার হয়ে যায়। একজন ভক্তের মূল কর্ম হলো রবরূপী খোদার দীদারের জন্য মনকে প্রস্তুত রাখা। কারণ, খোদা বাস করে একজন মুমিনের অন্তরের মাঝে। যেমন, একটি ডিম লাইট ঘরকে পুরোপুরি আলোকিত করতে পারে না তেমনি গুরুর দেওয়া জ্ঞানের আলো যদি ড্রিম লাইটের মতো কাজে লাগাই তবে আর এই অন্ধকার দেহকে আলোকিত করা যাবে না। একজন মুমিন ব্যক্তির গুণ ধারণ করতে হলে দীলকে এনার্জী লাইটের আলো দিয়ে আলোকিত করতে হবে।
দ্বীনে মোহাম্মদী : সালমা চিশতীর বয়ানে – Apon Khobor
লেখক – সালামা আক্তার চিশতী
