অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী
আল্লামা প্রভূ দ্বাদশ শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট কন্নড়ভাষী সাধক পুরুষ, দার্শনিক, মহাত্মা যোগী ও কবি। কর্ণাটকের বাল্লেগাভী নামক অঞ্চলে জন্ম তাঁর। তাঁর সময়ের “অনুভব মন্ডপ” নামক এক আধ্যাত্মিক মঞ্চের প্রধান ছিলেন তিনি। বসবেস্বর, আক্কা মহাদেবী প্রমুখ তাঁর অনুসারী ছিলেন। গুহেশ (uheshvara) ছদ্মনামে লিখতেন তিনি। তাঁর রচনাবলীকে ‘বচন’ বলা হত। যুক্তিবাদী জীবন, মানুষে প্রভুপ্রাপ্তি, মানবীয় ঈশ্বরতত্ত্ব ও শিবচেতনার ওপর তাঁর অনেক লেখালেখি রয়েছে। সে সময় তাঁর রচনা নিয়ে প্রভূলিঙ্গলিলে, শূণ্যসম্পাদনের মত গ্রন্থ রচিত হয়েছে।
তাঁর ধর্ম দর্শন ছিল অত্যন্ত উঁচুমানের। বিশ্বব্যাপী সারবত্তা প্রভূকে অর্জন ও মানুষে অটল সাধনই ছিল তাঁর জীবনকর্মের প্রধান উপজীব্য। তিনি বলেন –
যদি কেউ নিজেকে জানে, তবে সমস্ত ভাষাই অতীন্দ্রিয়তার সার। যদি কেউ নিজের সম্পর্কে অসচেতন থাকে, তবে সমস্ত ভাষাই অজ্ঞতা।
চলুন আল্লামা প্রভূর কিছু কবিতা পড়ি। অনুবাদ করেছেন লাবিব মাহফুজ চিশতী
০১.
আয়নার মাঝের প্রতিবিম্ব
অনুসন্ধান করেও দেখতে পায়না তারা।
যা জ্বলজ্বল করে ভ্রুদ্বয়ের মাঝের বৃত্তে –
এ কথা কে জানে, প্রভূ ব্যতীত?
০২.
যদি অগ্নিবৃষ্টি হয়
তুমি হও জলের মতন।
যদি জলের প্লাবন হয়
তুমি হও বাতাসের মতন।
যদি হয় মহাপ্রলয়
তোমাকে হতে হবে আকাশের মতন।
আর যদি নেমে আসে চূড়ান্ত প্রলয়
তখন তোমাকের আত্মত্যাগ করে
হতে হবে স্বয়ং “প্রভূ”।
০৩.
আলো গ্রাস করলো আধারকে
আমি একা ভেতরে!
যখন ঝড়ে পড়ে দৃশ্যমান অন্ধকার
এবং আমি হয়ে উঠি তোমার লক্ষ্য!
হে গুহার অধিপতি!
০৪.
তোমার জ্যোতির খোঁজে আমি বেরোলাম
যা ছিল অগণন সূর্যের ভোর!
কোটি সূর্যের কিরণরশ্নির ঝলকানি –
আমাকে করলো বিস্মিত।
হে গুহার অধিপতি –
তুমিই যদি হও সে জ্যোতি
আর কোন উপমা প্রয়োজন নেই।
০৫.
যখন ভ্রমর এলো
গন্ধ পালালো!
কি আজব! যখন হৃদয় এলো
তখন বুদ্ধি পালালো!
আর যখন এলো ঈশ্বর
মন্দির পালালো!
০৬.
চেতনা যখন হয় শুণ্য
তখনি প্রভু আসেন,
মন্ত্র, আচার বা আনুষ্ঠানিকতা নয় –
তাকে আহ্বান করো নিঃশব্দতা দিয়ে।
০৭.
তাকে কোনো প্রশ্ন কোরো না
জাত কিংবা কর্মফল –
হৃদয়ে যখন প্রেম জেগে ওঠে
তখন সবি বিলুপ্ত হয়
এমনকি জন্ম-মৃত্যুও।
তখন অবশিষ্ট থাকে একমাত্র প্রিয়তম।
০৮.
মন্দির তো এ দেহটিই
আর প্রাণ! ঈশ্বর!
কেনো তাকে বাহিরে খোঁজো?
যে রয়েছে তোমার প্রতি নিঃশ্বাসে?
০৯.
তীর্থে, শাস্ত্রে বা আচারে
কোথাও প্রভূ নেই,
যখন আমিত্ব থেকে ‘আমি’ লয় হয়
তিনি তখনি আসেন।
১০.
আমি তাঁকে খুঁজলাম মন্ত্রে
পবিত্র অগ্নিশিখার মাঝে,
পাহাড়ে, গুহায়,
কিন্তু তিনিতো জেগে ছিলেন আমার
প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে!
যাকে আমি অবহেলা করেছি!
১১.
পর্বতের যদি শীত লাগে
কি দিয়ে ঢাকবে তাকে?
মাঠ যদি হয় ন্যাড়া
কোন বস্ত্র দিবে তাকে?
ভক্ত যদি হয় দুনিয়াদার –
কিসের সাথে করবে তুলনা?
হে গুহাধিপতি?
১২.
দু পা হলো দুটি চাকা
দেহটি একটি গাড়ি, যা সামানে পূর্ণ
গাড়িটি পাঁচজনে চালায়।
তাদের কেউ কারো মত নয়।
যদি এর কৌশল না জানো,
আর এতে না চড়ো –
তবে অক্ষদন্ডটি ভেঙ্গে যাবে!
হে গুহার অধিপতি!

