সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী
সুফি দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা—ওয়াহদাতুল ওজুদ وحدة الوجود মতবাদের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত আন্দালুসীয় সুফি দার্শনিক মুহিউদ্দিন ইবন আরাবি। তাঁর দর্শনে আল্লাহর পরম অস্তিত্ব, সৃষ্টির নির্ভরশীলতা এবং জগতের মধ্যে ঐশী নিদর্শনের প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে।
১. সূরা আল-হাদীদ ৩
৫৭:৩: তিনিই আদি, তিনিই অন্ত, তিনিই প্রকাশ্য, তিনিই গোপন
আরবি আয়াত:
هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ ۖ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
বাংলা উচ্চারণ: হুওয়াল আউয়ালু ওয়াল আখিরু ওয়ায্-যাহিরু ওয়াল বাতিনু, ওয়া হুয়া বিকুল্লি শাইয়িন আলীম।
বাংলা অর্থ: তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ, তিনিই প্রকাশ্য এবং তিনিই গোপন। আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।
ওয়াহদাতুল ওজুদ দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত কুরআনিক আয়াতগুলোর মধ্যে এটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আয়াতটিতে আল্লাহর চারটি নাম বা পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে—আল-আউয়াল, আল-আখির, আয-যাহির এবং আল-বাতিন। এই চারটি ধারণাকে একত্রে বিবেচনা করলে অস্তিত্ব, প্রকাশ, অপ্রকাশ এবং সময়ের সীমা অতিক্রমকারী পরম সত্য সম্পর্কে গভীর দার্শনিক প্রশ্ন উন্মোচিত হয়।
আল-আউয়াল অর্থ, তাঁর আগে কিছু নেই; আল-আখির অর্থ, তিনিই চিরস্থায়ী। আয-যাহির তাঁর প্রকাশ্য নিদর্শন ও ক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করে, আর আল-বাতিন তাঁর অদৃশ্যতা ও মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
ইবন আরাবি-প্রভাবিত সুফি ব্যাখ্যায় এই আয়াতকে অস্তিত্বের একত্ব বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সৃষ্টিজগতের প্রতিটি অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ, পরিবর্তনশীল ও নির্ভরশীল; কিন্তু আল্লাহর অস্তিত্ব কোনো কিছুর ওপর নির্ভরশীল নয়। এই দৃষ্টিতে জগতের অস্তিত্ব তার নিজের মধ্যে চূড়ান্ত নয়, বরং তা পরম সত্যের ওপর নির্ভরশীল।
২. সূরা আল-বাকারা ১১৫
২:১১৫: যেদিকেই ফিরো, সেদিকেই আল্লাহর ওয়াজহু
আরবি আয়াত:
وَلِلَّهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ ۚ فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
বাংলা উচ্চারণ: ওয়া লিল্লাহিল মাশরিকু ওয়াল মাগরিব। ফা-আইনামা তুওয়াল্লু ফাছাম্মা ওয়াজহুল্লাহ। ইন্নাল্লাহা ওয়াসিউন আলীম।
বাংলা অর্থ: পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। অতএব, তোমরা যেদিকেই মুখ ফেরাও, সেদিকেই আল্লাহর ওয়াজহ। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।
এই আয়াতের ‘ওয়াজহুল্লাহ’ বা আল্লাহর ওয়াজহ কথাটি সুফি চিন্তায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এখানে ওয়াজহকে আল্লাহর সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি কুরআনিক পরিভাষা হিসেবে বুঝতে হয়; এর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নিয়ে ইসলামী তাফসিরে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে।
সুফি দার্শনিকেরা এই আয়াত থেকে এমন একটি উপলব্ধির দিকে অগ্রসর হন যে, সমগ্র সৃষ্টিজগত আল্লাহর কর্তৃত্ব, জ্ঞান ও সৃষ্টিশক্তির বাইরে নয়। জগতের কোনো দিকই তাঁর অজ্ঞাত বা তাঁর ক্ষমতার বাইরে নয়। সাধকের দৃষ্টিতে প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানুষের অন্তরের পরিবর্তন এবং মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা আল্লাহর নিদর্শন স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।
এই উপলব্ধিকে তাজাল্লির ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়। তাজাল্লি অর্থ প্রকাশ বা উদ্ভাসন; সুফি পরিভাষায় এটি ঐশী গুণাবলি ও নিদর্শনের প্রকাশ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
৩. সূরা আন-নূর ৩৫
২৪:৩৫: আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের নূর
আরবি আয়াতের প্রথমাংশ:
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহু নূরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ।
বাংলা অর্থ: আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের নূর।
কুরআনের নূর-সংক্রান্ত আয়াতগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম গভীর ও বহুল আলোচিত। আয়াতটির পরবর্তী অংশে আল্লাহর নূরের একটি উপমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে কুলুঙ্গি, প্রদীপ, কাচ এবং বরকতময় জলপাইগাছের চিত্র এসেছে।
সুফি দর্শনে নূর কেবল দৃশ্যমান আলোর অর্থে ব্যবহৃত হয় না। এটি জ্ঞান, হিদায়াত, সত্যের উদ্ভাস এবং অস্তিত্বের প্রকাশের প্রতীক হিসেবেও আলোচিত হয়। এই দৃষ্টিতে সৃষ্টিজগতের কোনো কিছু নিজে নিজে চূড়ান্ত অর্থে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; বরং তার অস্তিত্ব ও পরিচিতি আল্লাহর সৃষ্টি, ক্ষমতা ও জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ওয়াহদাতুল ওজুদ-সংশ্লিষ্ট পাঠে নূরের ধারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ভূমিকা পালন করে। যেমন আলো ছাড়া কোনো দৃশ্য আমাদের কাছে স্পষ্ট হয় না, তেমনি সুফি দার্শনিকেরা আল্লাহর সৃষ্টিশক্তি ও ঐশী প্রকাশের ধারণার মাধ্যমে জগতের অস্তিত্ব ও উপলব্ধির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।
৪. সূরা আর-রহমান ২৬-২৭
৫৫:২৬–২৭: সবকিছু ধ্বংসশীল, অবশিষ্ট থাকবেন তোমার রব
আরবি আয়াত:
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ وَيَبْقَىٰ وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ
বাংলা উচ্চারণ: কুল্লু মান আলাইহা ফান। ওয়া ইয়াবকা ওয়াজহু রব্বিকা যুল-জালালি ওয়াল-ইকরাম।
বাংলা অর্থ: পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে, সবই ধ্বংসশীল। আর অবশিষ্ট থাকবেন তোমার মহিমাময় ও সম্মানিত রবের ওয়াজহ।
এই আয়াত দুটি অস্তিত্বের স্থায়িত্ব ও নশ্বরতার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরে। সৃষ্টিজগত পরিবর্তিত হয়, ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং একসময় বিলুপ্ত হয়। আল্লাহ চিরস্থায়ী; তাঁর স্থায়িত্ব সৃষ্টির স্থায়িত্বের মতো নয়।
সুফি সাধনার ভাষায় ফানা ও বাকার ধারণা এই আয়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত করে আলোচনা করা হয়। ফানা বলতে সাধকের অহংকেন্দ্রিকতা, আত্মগর্ব ও নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করার প্রবণতার বিলয় বোঝানো হতে পারে। বাকা বলতে আল্লাহর স্মরণ, আনুগত্য ও নৈতিক স্থিতির মধ্যে অবিচল থাকা বোঝানো হয়।
ওয়াহদাতুল ওজুদ দর্শনের আলোকে এই আয়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: যদি সৃষ্টিজগতের সবকিছুই নশ্বর হয়, তবে তার অস্তিত্বের স্থায়ী ভিত্তি কোথায়? সুফি দার্শনিকের উত্তর হলো, সৃষ্টির অস্তিত্ব নিজস্বভাবে পরম নয়; তা পরম সত্তার ওপর নির্ভরশীল।
৫. সূরা কাফ ১৬
৫০:১৬: আল্লাহ মানুষের গ্রীবাস্থিত শিরার চেয়েও নিকটবর্তী
আরবি আয়াতের প্রাসঙ্গিক অংশ:
وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
বাংলা উচ্চারণ: ওয়া নাহনু আকরাবু ইলাইহি মিন হাবলিল ওয়ারীদ।
বাংলা অর্থ: আর আমরা তার গ্রীবাস্থিত শিরার চেয়েও তার নিকটবর্তী।
এই আয়াতের শুরুতে মানুষের সৃষ্টি এবং তার অন্তরে উদিত চিন্তা সম্পর্কে আল্লাহর জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে আল্লাহর নৈকট্যের ঘোষণা মানুষের আত্মপরিচয় ও আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
সুফি সাধক যখন নিজের অন্তর্জগতের দিকে তাকান, তখন তিনি উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন যে, তাঁর চিন্তা, অনুভূতি, দুর্বলতা, আকাঙ্ক্ষা ও গোপন অবস্থাও আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। এই উপলব্ধি আত্মশুদ্ধি, আত্মসমালোচনা ও আল্লাহমুখী জীবনের অনুপ্রেরণা হতে পারে।
ওয়াহদাতুল ওজুদ-সংশ্লিষ্ট আলোচনায় আল্লাহর নৈকট্যকে অস্তিত্বের নির্ভরশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়।
৬. সূরা আল-কাসাস ৮৮
২৮:৮৮: তাঁর ওয়াজহ ছাড়া সবকিছু ধ্বংসশীল
আরবি আয়াতের প্রাসঙ্গিক অংশ:
كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ
বাংলা উচ্চারণ: কুল্লু শাইয়িন হালিকুন ইল্লা ওয়াজহাহু।
বাংলা অর্থ: তাঁর ওয়াজহ ছাড়া সবকিছুই ধ্বংসশীল।
আয়াতটির পূর্ণ বক্তব্যে আল্লাহ ছাড়া অন্য উপাস্যকে আহ্বান করতে নিষেধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে যে, বিধান তাঁরই এবং তাঁর কাছেই সবাইকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
সুফি দর্শনে এই আয়াতের তাৎপর্য হলো, সৃষ্টিজগতের কোনো কিছুই চূড়ান্ত অর্থে স্বয়ংসম্পূর্ণ বা চিরস্থায়ী নয়। মানুষ, প্রকৃতি, সময়, ক্ষমতা, সম্পদ এবং দৃশ্যমান জগতের প্রতিটি রূপ পরিবর্তনের অধীন। মানুষের অহংকারের ভিত্তিও তাই স্থায়ী নয়।
ওয়াহদাতুল ওজুদের দার্শনিক পাঠে এটি পরম অস্তিত্ব ও নির্ভরশীল অস্তিত্বের পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করে।
৭. সূরা আল-হাদীদ ৪
৫৭:৪: তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন
আরবি আয়াতের প্রাসঙ্গিক অংশ:
وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ
বাংলা উচ্চারণ: ওয়া হুয়া মাআকুম আইনামা কুনতুম।
বাংলা অর্থ: আর তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন।
এই আয়াত আল্লাহর জ্ঞান, ক্ষমতা ও মানুষের সব অবস্থার ওপর তাঁর পূর্ণ অবগতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষের কাছে এমন অনেক বিষয় অজানা থাকতে পারে, যা তার নিজের জীবনেই ঘটে চলেছে; কিন্তু আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে কিছুই নয়।
সুফি সাধনার ক্ষেত্রে এই উপলব্ধি মুরাকাবা বা আত্মসচেতন আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাধক নিজের অন্তরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং মনে রাখেন যে, তাঁর প্রকাশ্য আচরণের পাশাপাশি গোপন উদ্দেশ্যও আল্লাহর জ্ঞাত।
৮. সূরা আল-বাকারা ১৮৬
২:১৮৬: আমি নিকটবর্তী
আরবি আয়াতের প্রাসঙ্গিক অংশ:
فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
বাংলা উচ্চারণ: ফা-ইন্নী কারীব। উজীবু দা‘ওয়াতাদ দা‘ই ইযা দা‘আন।
বাংলা অর্থ: নিশ্চয়ই আমি নিকটবর্তী। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই।
এই আয়াতের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো দোয়া, আল্লাহর নৈকট্য এবং বান্দার আহ্বানে সাড়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। মানুষের সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ক কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আন্তরিক প্রার্থনা ও আত্মসমর্পণেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
সুফি সাধকের কাছে এই নৈকট্য প্রেম, স্মরণ ও অন্তরের জাগরণের উৎস হতে পারে। যখন মানুষ নিজের অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিকতা অতিক্রম করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তখন তার আধ্যাত্মিক জীবনে নৈকট্যের উপলব্ধি গভীর হয়।
৯. সূরা আল-আনফাল ১৭
৮:১৭: তুমি নিক্ষেপ করোনি, বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছেন
আরবি আয়াতের প্রাসঙ্গিক অংশ:
وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ رَمَىٰ
বাংলা উচ্চারণ: ওয়া মা রামাইতা ইয রামাইতা ওয়ালাকিন্নাল্লাহা রামা।
বাংলা অর্থ: যখন তুমি নিক্ষেপ করেছিলে, তখন তুমি নিক্ষেপ করোনি; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন।
বদরের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই আয়াত নাজিল হয়েছিল। এতে মানুষের কর্ম এবং আল্লাহর কার্যকারিতার মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ কাজ করে, কিন্তু তার সামর্থ্য, উপকরণ, পরিস্থিতি ও ফলাফল আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন।
সুফি চিন্তায় এই আয়াত মানুষের অহংবোধ ভাঙার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মানুষ যখন নিজের প্রতিটি সাফল্যকে কেবল নিজের যোগ্যতার ফল মনে করে, তখন সে নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলে যায়। কিন্তু নিজের সামর্থ্যের পেছনে আল্লাহর দান উপলব্ধি করলে তার মধ্যে বিনয় জন্ম নিতে পারে।
১০. সূরা আন-নিসা ১২৬
৪:১২৬: আসমান ও জমিনের সবকিছু আল্লাহর
আরবি আয়াতের প্রাসঙ্গিক অংশ:
وَلِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۚ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ مُحِيطًا
বাংলা উচ্চারণ: ওয়া লিল্লাহি মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদ, ওয়া কানাল্লাহু বিকুল্লি শাইয়িম মুহীতা।
বাংলা অর্থ: আসমানসমূহে যা আছে এবং পৃথিবীতে যা আছে, সবই আল্লাহর। আর আল্লাহ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।
এই আয়াতে আল্লাহর মালিকানা ও সর্বব্যাপী জ্ঞানের কথা ঘোষিত হয়েছে। সমগ্র সৃষ্টি তাঁর; কোনো কিছুই তাঁর সার্বভৌম কর্তৃত্বের বাইরে নয়।
ওয়াহদাতুল ওজুদের সঙ্গে এর সম্পর্ক বোঝার জন্য ‘মালিকানা’ এবং ‘সত্তাগত অভিন্নতা’র পার্থক্য বুঝতে হবে।
আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ আয়াত
ওয়াহদাতুল ওজুদ, তাওহিদ, তাজাল্লি, নূর ও অস্তিত্বের নির্ভরশীলতা নিয়ে আরও কয়েকটি আয়াত বিশেষভাবে অধ্যয়নযোগ্য।
সূরা আল-ইখলাস ১১২:১–৪: আল্লাহর একত্ব, অদ্বিতীয়তা এবং তাঁর তুলনাহীন সত্তার ঘোষণা। এটি তাওহিদের মৌলিক ভিত্তি।
সূরা আলে ইমরান ৩:১৯০–১৯১: আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত-দিনের পরিবর্তনে চিন্তাশীল মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে। প্রকৃতির মধ্যে অর্থ ও নিদর্শন অনুসন্ধানের জন্য এই আয়াতগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
সূরা আল-হাশর ৫৯:২২–২৪: আল্লাহর নাম ও গুণাবলির বিস্তৃত পরিচয় পাওয়া যায়। আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি সম্পর্কে সুফি ও কালামশাস্ত্রীয় আলোচনায় এগুলো প্রাসঙ্গিক।
সূরা ফুসসিলাত ৪১:৫৩: দিগন্তে এবং মানুষের নিজেদের মধ্যে আল্লাহর নিদর্শন প্রকাশিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আত্মপরিচয় ও বিশ্বজগতের নিদর্শন নিয়ে চিন্তনের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত।
সূরা আল-মুজাদালা ৫৮:৭: গোপন পরামর্শে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কেও আল্লাহর জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহর জ্ঞানের ব্যাপকতা ও মানুষের গোপন জীবনের দায়িত্ববোধ বোঝার ক্ষেত্রে আয়াতটি গুরুত্বপূর্ণ।
এই আয়াতগুলোকে একত্রে পড়লে তাওহিদ, আল্লাহর নৈকট্য, সৃষ্টির নির্ভরশীলতা এবং জগতের মধ্যে ঐশী নিদর্শন অনুসন্ধানের একটি বিস্তৃত কুরআনিক পরিসর পাওয়া যায়।
প্রস্তাবিত প্রাথমিক পাঠসূত্র
১. আল-কুরআন: সূরা আল-হাদীদ ৫৭:৩–৪; সূরা আল-বাকারা ২:১১৫, ২:১৮৬; সূরা আন-নূর ২৪:৩৫; সূরা আর-রহমান ৫৫:২৬–২৭; সূরা আল-কাসাস ২৮:৮৮।
২. মুহিউদ্দিন ইবন আরাবি, আল-ফুতুহাতুল মাক্কিয়্যা (الفتوحات المكية)।
৩. মুহিউদ্দিন ইবন আরাবি, ফুসুসুল হিকাম (فصوص الحكم)।
৪. সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর জন্য নির্ভরযোগ্য তাফসির—বিশেষত তাফসির আত-তাবারি, তাফসির ইবন কাসির এবং তাফসির আল-কুরতুবি।

