লিখুন

Date:

ফেসবুক
ইউটিউব

রাবেয়া বসরী রহ. – মহীয়সী নারীর পূতঃ জীবনী

হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর পিতার সংসার ছিল খুব অভাবের শুধু অভাব আর অভাব । কিন্তু সেখানেও সংসার থেমে থাকে না। সেখানেও জীবন আপন ছন্দে বয়ে যায়। নতুন প্রাণ অঙ্কুরিত হয়। আসন্ন প্রসবা এক জননী বুঝতে পারেন, তাঁর জঠর থেকে আরো একটি প্রাণ পৃথিবীর আলো-বাতাসে অচিরেই মুক্তি পাবে। সময় আসন্ন। আর কিছুক্ষণ পরে হয়তো একটি নবীন প্রাণ তার অস্তিত্ব ঘোষণা করবে। কিন্তু রাতেরবেলা আলো জ্বালাতে হবে। কিন্তু ঘরে এক ফোটা তেল নেই। আলো জ্বালবে কি করে? তিনি স্বামীকে এক পড়শীর ঘর থেকে খানিকটা তেল ধার করে আনতে বললেন। এর আগে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন, কোন লোকের কাছে ধার করবেন না। কিন্তু আজ? আর স্ত্রীর অবস্থা উপলব্ধি করে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঐ প্রতিবেশীর বাড়িতে গেলেন তেল ধার করতে। স্ত্রীর জন্য তিনি প্রতিজ্ঞা ভাঙলেন। কিন্তু কাজ হল না। ধার দেয়া তো দূরের কথা, প্রতিবেশী বাড়ির দরজা পর্যন্ত খুলল না। নিরাশ হয়ে তিনি ফিরে এলেন। তারপর একসময় যে চোখ দু’টি পানিতে ভাসছিল, তা বুজে এল তন্দ্রায়। আর তিনি স্বপ্ন দেখলেন, রাসূলুল্লাহ্ এসে তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কেঁদো না, দুঃখ কর না। আল্লাহর ইচ্ছায় তুমি এক অসাধারণ কন্যার পিতা হতে চলেছ। ভবিষ্যতে সে এক অন্যতমা মহিয়সী নারী হবে। জান্নাতের অগ্রবর্তিনীদের অন্যতম হবে। তার সুপারিশে আমার সত্তর হাজার পাপী উম্মত মুক্তি পাবে ।

স্বপ্নযোগে রাসূলে করীম (স) তাঁকে বসবার আমীর ঈসার নিকট যেতে বললেন। এক টুকরো কাগজে কয়েকটি কথা লিখে নিতেও বললেন। কথাগুলো হল- হে আমীর তুমি প্রতি রাতে শোবার সময় একশ বার দরূদ শরীফ পাঠ করে থাক, আর জুমআর রাতে পড় চারশ বার। আর যেহেতু গত জুমআয় দরূদ পাঠ করনি, অতএব ক্ষতিপূরণ স্বরূপ চারশ দিরহাম দান করে দাও।

ঘুম ভেঙে গেল। এ আশ্চর্য স্বপ্ন দেখে তিনি জেগে উঠলেন। আর স্বপ্নের নির্দেশমত একখানি কাগজে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথাগুলো লিখে নিলেন। পরদিন ভোরে একটি লোক মারফত সে বাণীলিপি পাঠিয়ে ছিলেন বসরার আমীরের কাছে। লিপি পড়ে বসবার আমীর ঈসা অবাক। মহানবী (স)-এর মূল্যবান উপদেশের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তিনি দশ হাজার দিরহাম দীনদুঃখীদের দান করলেন। আর যাঁর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর এ অমূল্য বাণী লাভ করেছেন, তাঁর জন্য চারশ দিনার আলাদা করে রাখলেন। পরে একদিন নিজেই দিনারগুলো নিয়ে গেলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে।

যথাসময়ে তাঁর সঙ্গে দেখা হল বসরার আমীর ঈসার। দিনারগুলো তাঁর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, আপনার যখন যা দরকার হবে, দয়া করে আমাকে জানাবেন। কোন সঙ্কোচ করবেন না। আমি তার ব্যবস্থা করব।

রসূলুল্লাহর (স)-এর স্বপ্ন-প্রদত্ত বাণী বৃথা যায়নি। অভাবপীড়িত, অতি-দরিদ্র মানুষটি সত্যিই এক মহিমান্বিত কন্যা লাভ করলেন। এ কন্যাই রমণীকুল শিরোমণি মহাতাপসী হযরত রাবেয়া বসরী (র)। এক দরিদ্র-জীর্ণ পরিবারে নিষ্প্রদীপ কুটিরে আলো ফুল হয়ে ফুটলেন । তাঁর আলোকপ্রভায়, সুবাসে শুধু সে কুটিরই নয়, তমসাচ্ছন্ন পৃথিবীর যাবতীয় অন্ধকার দূর হয়ে গেল।

হযরত রাবেয়া বসরী (র) ক্রমশ বড় হলেন। কিন্তু সহসা তাঁর পৃথিবী হঠাৎ শুণ্য হয়ে গেল। প্রথমে চিরবিদায় নিলেন রত্নপ্রসবিনী জননী। পরে পিতা। রয়ে গেল চারটি অনাথা বোন। শুরু হল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। মা নেই, বাপ নেই, অথচ ক্ষুধা আছে, তৃষ্ণা আছে। আছে জীবন। চার বোনে এর ওর তার বাড়িতে কাজ করতে লাগল। ঝিয়ের কাজ। কখনো খাওয়া জোটে, কখনও জোটে না। একবেলা আধবেলা খেয়ে বা না খেয়ে তাঁদের দিন যায়, রাত যায়। তার ওপর বসরায় দেখা দিল দুর্ভিক্ষ। কে কাকে খেতে দেয়, কে-ই বা কাকে দেখে। বাপ-মা তাদের আদরের সন্তানদেরও বেচে খেতে শুরু করে। তখন কে বা কার। তখন নিজের পেট বড় হয়ে দেখা দেয়। আর কারো কথা মনে আসে না। রাবেয়া বসরী (র) এর তিন বোন এ দুঃসময়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। তাদের আর হাদিস পাওয়া গেল না। এখন রাবেয়া বসরী (স) একা-বিশাল পৃথিবীতে সম্পূর্ণ একা।

অবশ্য আরও একজন আছেন। তিনি অনন্ত করুণাময় আল্লাহ্, মানুষের মহান প্রতিপালক । মানুষের জীবনে তিনি জেগে আছেন সর্বক্ষণ। নিঃসঙ্গ অবস্থায় কান্নাকাটি করে কিছুদিন কাটল হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর। পরে একদিন অনাথিনীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেল এক পাষাণ-হৃদয়। আর তাঁকে বিক্রি করে দিল ততোধিক কঠোর-হৃদয় এক গৃরস্থের কাছে।

হযরত রাবেয়া বসরী (র) এখন ক্রীতদাসী। মনিবের বাড়িতে দিন-রাত কাজ করেন। এতটুকু এদিক-ওদিক হলে কপালে জোটে প্রহার আর নির্যাতন, নিষ্ঠুর গঞ্জনা। এক ফোটা আদর নেই কোথাও, নেই ভালবাসা। শুধু কাজ আর কাজ। আর পীড়ন আর যন্ত্রণা। কিন্তু সহ্যের ও একটা সীমা আছে। আর পারেন না হযরত রাবেয়া বসরী (র) একদিন মনিবের বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলেন গোপনে।

মুক্তি। অবাধ মুক্তি। মুক্তির নেশায় তিনি দৌড়াতে শুরু করলেন। আর দৌড়াতে গিয়েই আচমকা মুখ থুবড়ে পড়লেন মাটিতে। আর একখানা হাত সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গেল। আল্লাহ্ তাঁকে কোন্ পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে নিয়ে গেলেন, হয়তো তখন তিনি তা বুঝলেন না।

হাতের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে তিনি হাত ওঠালেন মহান প্রতিপালকের দরবারে আল্লাহ্ গো, আমি এক অসহায় দাসী। আমার একখানি হাত গেল, যাক। তার জন্য আমার কোন দুঃখ নেই। কেবল আপনি আমার ওপর প্রসন্ন থাকুন তাহলেই আমি খুশি। প্রভু আমার! আপনি আমার ওপর প্রসন্ন কিনা, দয়া করে আমাকে জানান।
তাঁর এ আপ্লুত প্রার্থনার উত্তর পাওয়া যায়। আকাশ থেকে উত্তর আসে-দুঃখ কর না, হতাশও হয়ো না। দুঃখ-কষ্টে ভেঙে পড় না। মনে রাকবে, রোজ কিয়ামতে তোমার যে মর্যাদা হবে, তা দেখে ফেরশতারাও ঈর্ষা পোষণ করবে। সবাই তোমাকে মর্যাদা দেবে। অভিনন্দন জানাবে।

আকাশবাণী হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর মনে অঢেল শান্তি এনে দেয়। এখন বড় স্বস্তি তাঁর মনে। এ ভাঙা হাত নিয়ে তিনি আর কোথায় যাবেন। মালিক নিষ্ঠুর হোক। তবুও তো মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই আছে ওখানে। সাত-পাঁচ ভেবে তিনি আবার মনিবের বাড়িতেই ফিরলেন। এবার নিজের জন্য তিনি একটা নিয়ম করে নিলেন। দিনে কাজ। রাতে উপাসনা। আগে রাতের বেলায় কিছু সময় বিশ্রাম নিতেন। এখন থেকে পুরো রাত বরাদ্দ হয়ে গেল আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীর জন্য।

এক গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় মনিবের। তার কানে এল কিছু অস্পষ্ট কথার গুঞ্জন। চুপি চুপি বিছানা ছেড়ে সে উঠে এল। চারপাশে গভীর অন্ধকার। অথচ সে দেখল হযরত রাবেয়া বসরী (রা)-এর ঘরে এক আশ্চর্য আলোর রোশনাই। দেখল, হযরত রাবেয়া বসরী (র) তন্ময়চিত্তে অস্ফুট উচ্চারণে আল্লাহর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করছেন, প্রভু আমার! আপনি জানেন, আমি সারাক্ষণ আপনার ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতে চাই। কেননা, আপনার স্ব-স্তুতি প্রশংসাই আমার চোখের জ্যোতি। আমার যদি সুযোগ ও শক্তি থাকত, তাহলে আপনার ইবাদত ছাড়া এক মূহূর্ত ও আমি অন্য কাজে নষ্ট করতাম না। কিন্তু কী করব প্রভু, আমি পরাধীনা। ইচ্ছা থাকলেও আমি আপনার ইবাদতে সব সময় উপস্থিত হতে পারি না। আপনার উপসনায় আমার অনেক দেরি হয়ে যায়।

দাসীর এ আকুল প্রার্থনা মনিবের নিষ্ঠুর হৃদয় স্পর্শ করে। তার মনে হয়, এ সাধারণ কোন দাসী-বাদী নয় । আল্লাহর প্রকৃত সেবিকা সে। তাঁকে বন্দিনী অবস্থায় রেখে তার সেবা ও শ্রম গ্রহণ করা ঠিক নয় বরং এ অশ্রুমতী অপাপবিদ্ধা বালিকার সেবা করা তার কর্তব্য। মনে মনে সে স্থির করে, দাসীকে সে মুক্তি দেবে। ইচ্ছে হলে সে এখানে থাকতে পারে, অথবা অন্য কোথাও যেতে পারে । আল্লাহ্ তার হৃদয়ের পরিবর্তন ঘটালেন। পরদিন ভোরে হযরত রাবেয়া বসরী (র)-কে সে তার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিল ।

আল্লাহর প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়লেন হযরত রাবেয়া বসরী (র)। তিনি এখন এক স্বাধীনা রমণী। স্বাধীনভাবে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হলেন। সারা দিন, সারা রাত। অন্তত হাজার রাকাত নফল নামায আদায় শুরু করলেন। মাঝে মাঝে যেতে লাগলেন মহাতাপস হযরত হাসান বসরী (র)-এর আলোচনা সভায়। হযরত হাসান বরসী (র)-ও তাঁর আলোকময়ী শিষ্যাকে খুবই স্নেহের চোখে দেখতে শুরু করলেন। তাপসী হযরত রাবেয়া বসরী (র) ডুবে গেলেন জ্যোতির সমুদ্রে
কেউ কেউ বলেন, হযরত রাবেয়া বসরী (র) প্রথম জীবনে ভক্তিগীতি গাইতেন। পরে সব ছেড়ে শুধু ইবাদতে মগ্ন হন। এ উদ্দেশ্যে তিনি কিছুদিন নির্জন বনভূমিতেও বাস করেন। পরে এক নিরিবিলি স্থানে এক উপাসনালয় নির্মাণ করেন সেখানেই ধ্যানরত থাকতেন। অবশ্য শেষ জীবনে তিনি চলে যান পবিত্র মক্কা শরীফে। সেখানেই তাঁর অধ্যাত্ম-জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

এ মহিমান্বিতা মহাতাপসীর আলোকোজ্জ্বল জীবনের বিচিত্র পরিচয় ছড়িয়ে আছে মানুষের মনোলোকে ।

হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর জীবনের কয়েকটি ঘটনা :

১. এক দুর্বল গাধার পিঠে মালপত্র তুলে দিয়ে তিনি চলছেন চিরবাঞ্ছিত মক্কা মোয়াজ্জামায়। রাস্তায় গাধাটি মারা গেল। সঙ্গের লোকেরা তাঁর মালপত্র বয়ে নিয়ে যেতে চাইল। তিনি রাজি হলেন না। অগত্যা, তাঁকে ছেড়ে সবাই চলে গেল। আর তিনি হাত ওঠালেন আল্লাহর দরবারে। প্রভু গো, আপনি আপনার দাসীকে পবিত্র করার দিকে ডাক দিলেন। অথচ, গাধাটিকে মেরে ফেলে তাকে এমন বিপাকে ফেললেন? কাজটি কি ঠিক হল? আল্লাহ্, তাঁর অভিমান-ক্ষুব্ধ হৃদয়ের প্রার্থনার বিচলিত হয়ে মৃত গাধার প্রাণ ফিরিয়ে দিলেন। তাঁর হজ্জযাত্রায় আর বিঘ্ন ঘটল না।

২. মক্কা শরীফের উপকণ্ঠে নির্জনে তিনি তাঁর প্রভুর কাছে আবেদন জানালেন, তিনি তাঁকে দেখতে চান। আল্লাহ্ তাঁকে খবর দিলেন, তুমি কি চাও দুনিয়া ধ্বংস হোক, আর তার দায়-দায়িত্ব তোমার ওপরে পড়ুক? তুমি কি জানো না আমাকে দেখতে চেয়ে মুসার কী অবস্থা হয়েছিল? আমি তাঁকে বার বার বাধা দিয়েছিলাম। সে শোনেনি। ফলে আমার নূরের কণামাত্র প্রকাশ করায় তূর পর্বত জ্বলে উঠে শেষ হয়ে গেল ।
তাযকিরাতুল আওলিয়া

৩. হযরত রাবেয়া বসরী (র) দ্বিতীয়বার যখন হজ্জযাত্রায় যান, তখন কারার অদূরে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হন। হঠাৎ তিনি দেখেন, খোদা কাবা তাঁকে স্বাগত জানাবার জন্য এগিয়ে আসছে। তখন তিনি বলেন, এ ঘর নিয়ে আমি কী করব? আমি ঘরের মালিককে চাই। কেননা, ঘরের মালিক নিজেই বলেছেন, যে আমার দিকে আধ হাত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। অতএব কেবল কাবা নিয়ে আমি খুশি হতে পারি না।

৪. ঠিক এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অন্য একটি কাহিনী শোনা যায় যা তাপসী হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি করে। মহাসাধক হযরত ইব্রাহীম আদহাম (র) চলেছেন মক্কা শরীফে। এক পা করে যান, আর দু দু রাকায়াত করে নফল নামায পড়েন। আর পায়ে হাঁটার বদলে হামাগুড়ি দিয়ে যেতে থাকেন। দারুণ কষ্টকর সে হজ্জযাত্রা । মক্কায় পৌঁছাতে তাঁর সময় লেগে গেল চৌদ্দ বছর। কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখলেন, কাবা শরীফের জায়গায় কাবা শরীফ নেই, নাকি তাঁর চোখ খারাপ? তাই দেখতে পাচ্ছেন না? তাঁর সংশয়- সন্দেহ-হতাশার উত্তরে একজন ফেরেশতা বললেন, না, চোখের দোষ না। আসলে এক বৃদ্ধাকে স্বাগত জানাবার জন্য কাবাঘর সাময়িকভাবে তার স্থান ত্যাগ করেছে।
কে, কে সে? চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন ইব্রাহীম আদহাম (র)।
আর তখন লাঠিতে ভর দিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন হযরত রাবেয়া বসরী (র) সেই পবিত্র কাবাঘরও ফিরে এসেছে আপন জায়গায়। হযরত ইব্রাহীম আদহাম (র) বললেন, পৃথিবীতে আপনি এক নজির স্থাপন করলেন। হযরত রাবেয়া বসরী (র) বললেন, আপনি তো পথে নামায পড়তে পড়তে চৌদ্দ বছর লাগিয়ে দিলেন। আর দিব্যি হেসে খেলে এখানে এসে হাজির হয়েছি। নজির স্থাপন করল কে, আমি না আপনি?
আল্লাহ্র প্রিয়জনদের ও রহস্যময় সংলাপের অর্থ একমাত্র আল্লাহ্ই জানেন। আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে তাপসী হযরত রাবেয়া বসরী (র) এর প্রার্থনা, কোন ত্রুটিবিচ্যুতির কারণে আল্লাহ্ যদি তাঁর হজ্জ কবুল না করেন, তাহলে সেটি তাঁর পক্ষে চরম বিপদ-স্বরূপ। সে বিপদের পুণ্য অর্জনের সৌভাগ্য যেন তাঁর হয়।
অতঃপর হজ্জ সম্পন্ন করে তিনি বসরায় ফিরে আসেন। পরবর্তী এক বছর গভীর সাধনায় মগ্ন থেকে আবার হজ্জের ইচ্ছা করেন। মনে মনে ঠিক করেন, গতবার কাবা তাঁকে সম্মান জানিয়েছে, এবার তিনি তাঁকে সম্মান জানাবেন।

৫. পরবর্তী ঘটনা বর্ণনা করেছেন হযরত ফারমাদী (র)। তিনি বলেন, এবার বসরার এক বনাঞ্চল থেকে হামাগুড়ি দিয়ে তিনি হজ্জযাত্রায় বেরিয়ে পড়েন। আর দীর্ঘ সাত বছর কৃচ্ছসাধনার পর আরাফতের ময়দানে পৌঁছান। তখন এক দৈববাণী হয়—তুমি যদি চাও, তবে তোমার কৃচ্ছসাধনার পুরস্কারস্বরূপ আমি এখনই আমার নূরের এক ঝলক দেখাই। হযরত রাবেয়া বসরী (র) বলেন, না প্রভু, আমি নূরের তাজাল্লী দেখার যোগ্য নই। আমি দারিদ্র্য চাই। দারিদ্র্য আমার ক্রোধ ও দুর্ভিক্ষস্বরূপ, আসমানী স্বর তরঙ্গায়িত হয়, অবশ্য যদি ঐ প্রেমিক ও আমার মধ্যে এক চুলও ব্যবধান না থাকে, তবে সে কথা আলাদা ।
আল্লাহর প্রতি তাঁর কী অবিচল আস্থা ছিল একটি ঘটনার বিবরণ থেকে তা স্পষ্ট হয়। একদিন দুজন দরবেশ এলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। দুজনেই ক্ষুর্ধাত । কিন্তু ঘরে মাত্র দুখানা রুটি। হযরত রাবেয়া বসরী (র) তা-ই এনে দিলেন অতিথিদের সামনে। ঠিক তখনই দরজায় এক ভিক্ষুক। সেও কিছু খেতে চায়। তাপসী হযরত রাবেয়া বসরী (র) রুটি দুখানা তুলে এনে তাকেই দিলেন। বলা বাহুল্য, এতে অতিথিরা অসন্তুষ্ট হলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে অন্য বাড়ির এক দাসী এক গোছা রুটিও মাংস এনে রাবেয়া বসরী (র)-কে দিলেন। তিনি গুণে দেখলেন, ত্রুটি রয়েছে আঠারোখানা। দাসীকে বললেন, তোমরা ভুল হয়েছে। কারো জন্য রুটি পাঠিয়েছেন, আমার জন্য নয়। উনি অন্য দাসী বললে, না, আমার ভুল হয়নি। এগুলি আপনার জন্যই। কিন্তু হযরত রাবেয়া বসরী মুখে (র) তা মানবেন না। রুটি ফিরিয়ে দিলেন। যে গৃহকর্ত্রী রুটি দিয়েছিলেন, তিনি দাসীর বিবরণ শুনে আরো দুখানি রুটি দিয়ে আবারও তাকে পাঠালেন। এবারে রুটির সংখ্যা বিশ। আর আপত্তি উঠল না। প্রসন্নচিত্তে হযরত রাবেয়া বসরী (র) অতিথিদের আপ্যায়িত করলেন।
তাঁর এ আচরণের রহস্য কোথায়?
অতিথিরা কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।
রহস্য উদ্ঘাটন করে তিনি জানালেন, মাত্র দুখানা রুটিতে দুজন দরবেশের হত না। এজন্য তিনি বড় অস্বস্তিতে ছিলেন। হয়তো আল্লাহ্ তাঁর অন্তরের অস্বস্তি উপলবিদ্ধ করে ঐ ভিক্ষুককে পাঠান। আর তিনি রুটি দুখানা তাকেই দান করেন। একটি দানের বদলে, আল্লাহ্ দশগুণ দেন। আল্লাহ্র এ প্রতিশ্রুতির ওপর অবিচল আস্থা রেখে অতিথি আপ্যায়ণের পুরো দায়িত্ব তিনি আল্লাহ্র ওপরেই ন্যস্ত করেন। দাসী যখন প্রথমে আঠারখানা রুটি এনে দিল, তখন তিনি বুঝলেন এ তাঁর জন্য নয়। কেননা, তিনি যখন দুখানা রুটি দিয়েছেন, তখন তিনি পাবেন তার দশগুণ, অর্থাৎ দশ দুগুণে কুড়িখানা। তাই তখন তিনি রুটি ফেরত দেন। দ্বিতীয় দায় অবশ্য বিশখানা রুটিই এল। আর তিনি তা গ্রহণ করলেন নিশ্চিন্তে।
বিস্ময়-বিমূঢ় দরবেশ-অতিথিরা নির্বাক হয়ে গেলেন।

৬. প্রিয়জনের রক্ষণাবেক্ষণে আল্লাহ্ অতন্ত্র প্রহরী। একদিন এক চোর তাপসী হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর ঘরে। আল্লাহ্র ধ্যান করতে করতে তিনি তখন তন্দ্রাতুর। চোর তাঁর চাদরখানা তুলে নিয়ে চম্পট দেয় আর কি! কিন্তু আশ্চর্য, চোর ঘরের দরজা খুঁজে পায় না। বহু চেষ্টা করেও সে ঘর থেকে বেরোবার পথ খুঁজে পেল না। তখন ঘরের কোণ থেকে এক অদৃশ্য কণ্ঠ বেজে ওঠে; কার ঘরে তুই ঢুকেছিস হতভাগা। গৃহকর্ত্রী আমাকে গত এক বছর ধরে তাঁর ঘরের পাহারায় নিযুক্ত রেখেছেন। তিনি যদিও নিদ্রাচ্ছন্ন, তাঁর প্রহরী কিন্তু নিয়ত জাগ্রত। এখানে কোন কিছু চুরি করা সম্ভব নয়। আওয়াজ শুনে চোর চমকে ওঠে। চাদর খানা হাত থেকে ফেলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের দরজাও সে খুঁজে পায়। তারপর চোর চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

৭. রান্নার সময় দেখা গেল পেঁয়াজ নেই। পরিচারিকার ইচ্ছে, কোন প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার করে আনে। কিন্তু বিগত চল্লিশ বছর ধরে সাধ্বী হযরত রাবেয়া বসরী (র) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো কাছে তিনি কিছু প্রত্যাশা করবেন না। অতএব তাঁর নির্দেশ, পেঁয়াজ ছাড়াই রান্না হোক। কিন্তু তা আর করতে হল না। একটা কাক কোথা থেকে কয়েকটা পেঁয়াজ এনে ফেলে দিল। পরিচারিকা খুশি। কিন্তু হযরত রাবেয়া বসরী (র) তরকারী ছাড়াই রুটি খেলেন । কারণ পেঁয়াজ সম্পর্কে তিনি সন্দেহমুক্ত হতে পারেননি ।

৮. হযরত রাবেয়া বসরী (র) গভীর অরণ্যে ধ্যানমগ্না। বনের পশুরা এসে তাঁর চারপাশে ঘিরে দাঁড়ায়। আজও তারা ঘিরে রয়েছে তাঁকে। হঠাৎ দেখা গেল পশুরা যে যেদিকে পারল, দৌড়ে পালিয়ে গেল। কারণ, ওখানে তখন এসে পড়েছেন সাধককুল তিলক হযরত হাসান বসরী (র)। তাঁকে দেখেই বুনো প্রাণীরা লুকিয়ে গেল। তিনি তাপসীকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। হযরত রাবেয়া বসরী (র) তাঁকেই পালটা প্রশ্ন করেন, আপনি আজ কি খেয়েছেন? হযরত হাসান বসরী (র) জবাব দেন, গোশত রুটি ।
তাপসী বলেন, তবে আর কী! আপনি যাদের মাংস খেয়েছেন, তারা আপনার ভয়ে ছুটে পালাবে বইকি!
অন্য একদিন-
হযরত রাবেয়া বসরী (র) এসেছেন হযরত হাসান বসরী (র)-এর বাড়িতে। তিনি তখন কাঁদছেন; প্রবল কান্না। রাবেয়া বসরী (র) বললেন, এ কান্না যদি অকৃত্রিম হয়, খুব ভালো কথা। কিন্তু যদি কৃত্রিমতা থাকে, তাহলে কান্নার অতলে আপনি হারিয়ে যাবেন। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না ।
হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর কথায় হযরত হাসান বসরী (র) আহত হলেন। কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইলেন।
আরও একদিন-
হযরত রাবেয়া বসরী (র) ফোরাত নদীকূলে ধ্যানরতা। হযরত হাসান বসরী (র) গিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। তাপসীর ধ্যান ভাঙলে দুজনের মধ্যে কিছু কথাবার্তা হল । এক সময় হযরত হাসান বসরী (র) নদীর পানির ওপর তাঁর জায়নামায বিছিয়ে বললেন, এসো, নামায পড়ি।
তাপসী হযরত রাবেয়া বসরী (র) বললেন, হযরত! এটা যদি আপনার লোক-দেখানো হয় তো খুব ভাল কথা। আর তা যদি না হয়, তহলে আসুন, আমরা শূন্যে নামায পড়ি। এ বলে তিনি শূন্যে তাঁর জায়নামায পেতে দিলেন ।
হযরত হাসান বসরী (র) মনে মনে নিজেকে অতি ক্ষুদ্র মনে করলেন। হযরত রাবেয়া বসরী (র) তাঁর অবস্থা অনুধাবন করে বললেন, আপনি যা দেখালেন, তা এমন কিছু নয়। সামান্য মাছও তা পারে। আর আমি যা দেখালাম, তা তুচ্ছ মাছিও পারে। আসল কাজ কিন্তু এর অনেক ওপরে। তাঁর সম্পর্কে হযরত হাসান বসরী (র) বলেন, একবার অধ্যাত্মসাধনার নানা জটিল তত্ত্ব নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার আলোচনা হয়। কিন্তু মুহূর্তের জন্যেও আমার যেমন মনে হয়নি যে, আমি একজন পুরুষ, তেমনি তারও মনে হয়নি, সে একজন মহিলা। বিদায় নেবার সময় মনে হল, আমি অতি তুচ্ছ একটি লোক আর সে বিশুদ্ধ এক তাপসী
তাঁর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে হযরত হাসান বসরী (র) এর মনে কোন সংশয় ছিল না। এক রাতে তিনি একদল অনুগামীসহ হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর বাসভবনে যান। তাঁর বাড়িতে আলোর ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু হযরত রাবেয়া বসরী (র) জানতেন, হযরত হাসান বসরী (র)- এর আলোর দরকার। তাই তিনি তাঁর একটি আঙুলে দম দিলেন। আর আঙ্গুলটি উদ্ভাসিত হয়ে আলো দিতে লাগল। হাসান বসরী (র)-এর শিষ্যগণ সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, এটা কি করে সম্ভব হল? তাপসী হযরত রাবেয়া বসরী (র) তার উত্তর দিতে গেলেন। কিন্তু তাঁর আগেই হযরত হাসান বসরী (র) বললেন, যিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর একান্ত অনুগত, তাঁর পক্ষে এসব কাজ কিছুই নয়। আল্লাহর নবীদের দ্বারা যদি মোজেযা প্রকাশ পায়, তাহলে আল্লাহ্র আউলিয়াদের দ্বারা আলৌকিক কাণ্ড হতে পারে। তাতে অবাক হওয়ার কি আছে।
একবার হযরত রাবেয়া বসরী (র) হযরত হাসান বসরী (র)-এর কাছে তিনটি উপহার পাঠিয়ে সেগুলোর প্রতীকী তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। উপহার তিনটি হল মোম, সূচ ও একগাছি চুল। তার কথা ছিল, মোমের মতো আলো দিয়ে বিগলিত হতে হবে। সূচের মতো সবসময় মানুষের কাজে লাগতে হবে। আর এসব করতে করতে নিজেকে চুলের চেয়েও ক্ষীণতর করে
তুলতে হবে। তবেই উদ্দেশ্যে সফল হবে।
হযরত হাসান বসরী (র) প্রশ্ন করলেন: তুমি এত উচ্চ মর্যাদার অধিকারিণী হলে কিভাবে?
হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর উত্তর: সবকিছু আল্লাহতে সমর্পণ করে দিয়ে। তাঁকে জানলে ও চিনলে কি করে।
হযরত রাবেয়া বসরী (র) বললেন, আপনি তাঁকে চিনেছেন যুক্তি তর্কের মাধ্যমে। কিন্তু আমি তাঁর সন্ধান পেয়েছি বিনা বাক্যব্যয়ে ।
হযরত হাসান বসরী (র) তাঁর কাছে মারেফাতের শিক্ষা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কয়েকটি টুপি সেলাই করে আমি বিক্রি করি। আর দুটি মুদ্রা পাই। একটি নিই ডান হাতে, অন্যটি বাম হাতে । দুটিকে একই হাতে ধারণ করি না। তা করলে হয়তো মুদ্রা সঞ্চয়ের দিকে মনটা ঝুঁকে যেতে পারে। আর তা হতে পারে আমার পথভ্রষ্টতার কারণ। এভাবে আমি আমার প্রবৃত্তির ওপর জয়ী হয়েছি।
অর্থাৎ, তিনি সরাসরি আল্লাহ্র কাছ থেকে মারফাতের শিক্ষালাভ করেন, কোন মানুষের
মাধ্যমে নয়।

৯. হযরত হাসান বসরী (র) বলেন, শেষ বিচারের দিনে যদি আল্লাহ্র দীদার লাভে বঞ্চিত হই, তাহলে আমি এত বেশি কান্নাকাটি করব যে, তা দেখে জান্নাতীরা আমার প্রতি মমতায় অভিভূত হয়ে পড়বে।
তাঁর কথা শুনে হযরত রাবেয়া বসরী (র) বললেন, খুব ভাল কথা। কিন্তু যে লোক আল্লাহ্র দেখা পাওয়ার জন্য এ দুনিয়াতে কাঁদে না, সে পরকালেও কাঁদবে না।

১০. স্বামী গ্রহণে তাঁর অনীহা ও আপত্তির কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তিনটি বিষয় নিয়ে আমি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছি। কেউ যদি এগুলো দূর করতে পারত, তাহলে আমি অবশ্যই স্বামী গ্রহণ করতাম। সে তিনটি বিষয় হল- (১) কেউ কি বলতে পারেন, ঈমানের সঙ্গে আমার মৃত্যু হবে? (২) রোজ কিয়ামতে আমি কি ডান হাতে আমার আমলনামা পাব? (৩) ঐ দিন একটি দল যাবে জাহান্নামের দিকে, অন্যটি জান্নাতে। আমি কোন্ দলে থাকব বলতে পারে।
তাঁকে যারা প্রশ্ন করেন, তাঁরা স্বীকার করেন, এগুলোর উত্তর দেয়া এই মুহূর্তে কারোর পক্ষে সম্ভব নয়। তখন হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর উত্তর: এসব চিন্তা যার মাথায় দিনরাত ঘুরপাক খায়, সে কিভাবে বাড়তি একটা চিন্তা (স্বামী-চিন্তা) মাথায় নিতে পারে?
কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর:
প্রশ্ন: আপনি কোথা থেকে এসেছেন, কোথায় যাবেন?
উত্তর: এ মাটি থেকে এসেছি। মাটির নিচেই যাব।
প্রশ্ন: আপনি এখন কি করছেন?
উত্তর: অনুতাপ করছি।
প্রশ্ন: সেটা কি রকম?
উত্তর: আমি ঐ জগতের খাবার খাই আর কাজ করি এ জগতের।
প্রশ্ন: আপনি যেমন মধুর ভাষায় কথা বলেন, তাতে সরাইখানার কর্মাধ্যক্ষা হলে আপনাকে বেশ মানাত ।
উত্তর: আমি নিজেই তো এক সরাইখানা। আমার ভেতরে যা আছে, আমি তা বাইরে যেতে দিই। কিন্তু বাইরের কোন কিছু ভেতরে ঢুকতে দিই না। কে এল, কে গেল, আমার তা জানার দরকার নেই। আমি শুধু আমার ভেতরটা বা অন্তর নিয়ে ব্যস্ত। বাইরেরটা নিয়ে নয়।
রাসূলে করীম (স) তিনি একরাত্রে স্বপ্ন দেখেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করছেন, আপনি কি আমাকে ভালবাসেন?
হযরত রাবেয়া বসরী (র) উত্তর দেন, আপনাকে ভালবাসে না কে? তবে আমি ডুবে আছি আল্লাহ্র প্রেমে। সেখানে আর কাউকে ভালোবাসি কিনা ভেবে দেখতেও পারছি না, এ রকম আমার অবস্থা।
ভালবাসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রকৃত ভালোবাসা সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এর এক ফোঁটা যে পান করেছে সে প্রেমাষ্পদ আল্লাহ্র সঙ্গে মিলিত হয়। আর এ নির্দেশ লাভ করে যে, যে আল্লাহকে ভালবাসে, স্বয়ং আল্লাহ্ তাঁকে ভালোবাসেন।
হযরত রাবেয়া বসরী (র) সবসময় কান্নাকাটি করতেন।
এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আল্লাহ্ থেকে পাছে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি, এ ভয়ে আমি কাঁদি। তাঁর প্রতি আমার যে আসক্তি, তাতে যদি মৃত্যুর মুহূর্তে আমি শুনে ফেলি, আল্লাহ্ ঘোষণা করছেন যে, তুমি আমার যোগ্য ব্যক্তি নও তাহলে আমার কী উপায় হবে?
পাপীরা তওবা করলে কি তা কবুল হয়? তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তওবা করার তওফিক স্বয়ং আল্লাহ্র। সুতরাং সে তওফিক অনুযায়ী কেউ তওবা করলে তা কবুল না হওয়ার কোন কারণই নেই।
তিনি বলেন, আল্লাহর কোন নিয়ামত লাভ করে মানুষ যেমন সন্তুষ্ট হয় তাঁকে লাভ করার পরিশ্রম ও সাধনার দ্বারা যদি সে অনুরূপ সন্তুষ্টি অর্জন করে, আল্লাহ্ কেবল তখনই সন্তুষ্ট হন ।
তাঁর কথা হল; শুধু মাত্র বহিরেন্দ্রিয়ের দ্বারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় না। হাত পা চোখ কান জিভ দ্বারাও তা সম্ভব নয়। কেননা, কান শুধু শোনে, আর পা চালায়। কিন্তু আল্লাহ্র সম্পর্ক হৃদয়ের সঙ্গে। অতএব হৃদয়ের জাগরণ খুব জরুরী। যার অন্তর জেগে থাকে, তার কোন বন্ধুর প্রয়োজন নেই। আর আল্লাহতে যিনি সব সমর্পণ করেছেন, একমাত্র তিনিই চির-জাগরুক।
তাঁর বক্তব্য: শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া মিথ্যুকের কাজ। আর প্রকৃত তওবা নিজে করলেই যথেষ্ট। অন্যের মাধ্যমে তওবা করার দরকার নেই। যে প্রকৃত তওবা করে, তার দ্বিতীয়বার তওবার দরকার পড়ে না।
যিনি তত্ত্বাজ্ঞানী, তিনি আল্লাহ্র কাছে পবিত্র অন্তর কামনা করেন । যখন তাঁকে তা দান করা হয়, তখন তা আবার তিনি আল্লাহ্র কাছে ফিরিয়ে দেন-যেন সেটি লোকচক্ষুর আড়ালে সুরক্ষিত থাকে।

১১. হযরত সালেহ আমেরী (র) এক তত্ত্বজ্ঞানী সাধক। তিনি বলতেন, দরজায় অবিরাম শব্দ করতে থাকলে এক সময় তা খুলে দেয়া হবেই। তাঁর কথা হযরত রাবেয়া বসরী (র) বলেন, যে দরজা কখনও বন্ধই থাকে না, তা আবার খোলার প্রশ্ন ওঠে কেন?
তত্ত্বের দিক দিয়ে এ যে কত সূক্ষ্ম, তা সালেহ আমেরী (র)-এর বুঝতে অসুবিধা হয় না । একটি লোক ‘হায় দুঃখ হায়’ বলে বিলাপ করছিল। হযরত রাবেয়া বসরী (র) তাঁকে বললেন, ওসব না বলে তুমি বরং ‘হায় নিশ্চিন্ততা’ বল। কেননা, তোমার যদি সত্যিই দুঃখ থাকত, তাহলে তোমার মুখে কথাই ফুটত না।
একটি লোক মাথায় পট্টি বেঁধে হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর দরবারে এসে হাজির মাথায় পার্টি কেন জিজ্ঞেস করলে সে জানাল, মাথায় দারুণ যন্ত্রণা। তিনি বললেন, তোমার বয়স কত? সে বলল, ত্রিশ। তখন আবার প্রশ্ন, এতকাল কি সুস্থ ছিলে না অসুস্থ? তার উত্তরে সে জানাল, এতদিন সে সুস্থই ছিল। হযরত রাবেয়া বসরী (র) বললেন, তবে এতদিন ঐ সুস্থতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কোন চিহ্ন মাথায় রাখলে না কেন? আর যেই একটু কষ্ট পেলে অমনি কষ্টের চিহ্ন মাথায় ধারণ করলে?
একদিন তিনি একটি লোককে চার দীরহাম দিয়ে একখানি কম্বল কিনে আনতে বললেন। কজলখানা কেমন হবে-সাদা না কালো, তা সে জানতে চাইল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার কাছ থেক দিরহাম ফিরিয়ে নিলেন। কম্বল কিনে কাজ নেই। কেনার আগেই যে জিনিসের সাদা-কালোর প্রশ্ন ওঠে, কেনার পর না জানি আরো কত সমস্যা দেখা দেবে। ওসব পার্থিব ঝামেলায় জড়িয়ে না পড়াই ভাল।
কোন এক বাসন্তী বেলায় হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর পরিচারিকা ঘরে ধ্যানমগ্না তাপসীকে বলল বাইরে বেরিয়ে এসে আল্লাহর সৃষ্টির সৌন্দর্য উপভোগ করুন। তিনি বললেন, তার চেয়ে ঘরে এসে স্রষ্টার নিদর্শন প্রত্যক্ষ কর। জেনে রাখো, স্রষ্টার স্বরূপ দর্শন আমার লক্ষ্য। সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখে কি হবে?

১২. একবার একটানা সাতদিন রোযা রাখলেন হযরত রাবেয়া বসরী (র)-ইফতার ছাড়াই। আর বিনিদ্র রজনী যাপন করলেন আল্লাহর ইবাদতে ডুবে গিয়ে। অষ্টম দিনে তিনি কাতর হয়ে পড়লেন। তাঁর প্রবৃত্তি তাড়া দেয়, আপনি এভাবে আর কত আমাদের কষ্ট দেবেন? ইত্যবসরে এক পেয়ালা ভর্তি খাবার নিয়ে একটি লোক এসে হাজির। ঘরে তখন আলো জ্বালা হয়নি। আর আঁধারে একটা বেড়াল এসে খাবারটা খেয়ে ফেলল। তখন হযরত রাবেয়া বসরী (র) লোকটিকে বললেন, তুমি এক পেয়ালা পানি নিয়ে এস। পানি আনা হলে, যেই তিনি। পানি পান করতে যাবেন, হাত ফসকে পেয়ালাটা পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল। আর তখন হযরত রাবেয়া বসরী (র) ‘আহা’ বলে এমন এক চিৎকার করে উঠলেন যে, সারা ঘর কেঁপে উঠল। তাঁর মর্মস্পর্শী আবেদন উচ্চারিত হল আল্লাহর উদ্দেশ্যে। প্রভু গো, আপনি অবলা দাসীর প্রতি কোন আচরণ শুরু করলেন? সঙ্গে সঙ্গে ধ্বনিত হয় আকাশবাণী: তুমি চাইলে তোমাকে অঢেল পার্থিব প্রাচুর্য দান করতে পারি। কিন্তু সেক্ষেত্রে তোমার হৃদয় থেকে আমার প্রেম-বেদনা তুলে নেব। কেননা, পার্থিব প্রাচুর্য ও প্রেম-যাতনা একই হৃদয়ে সমবেত হতে পারে না। আকাশবাণী শোনামাত্র তাঁর মন থেকে পার্থিব মোহ মুছে গেল। দূর হয়ে গেল ক্ষুৎপিপাসা। এরপর থেকে অবস্থা এমন হল যে, প্রতি ওয়াক্তের নামাযকে তিনি জীবনের শেষ নামায বলে মনে করতে থাকলেন। পাছে আল্লাহর সঙ্গে আত্মিক বন্ধন ছিন্ন হয়, এজন্য তিনি মনে মনে প্রতি মুহূর্তে প্রার্থনা করতেন, প্রভু আমার পৃথিবীর কোন সম্পদ বা প্রাচুর্য যেন আপনার নিকট থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন না করে।
আতাহের প্রতি তাঁর সকাতর প্রার্থনার ভঙ্গি ও কান্না এমন ছিল যে মনে হত তিনি প্রচণ্ড অসুখে ভুগছেন। এজন্য কেউ কেউ কখনও কখনও তাঁকে জিজ্ঞেস করতেন, আপাতদৃষ্টিতে আপনাকে রোগী বলে মনে হয় না। তবুও আপনি অমন করে কাঁদেন কেন?
তিনি উত্তর দিতেন, বাইরে আমার কোন অসুখ নেই ঠিকই। কিন্তু অন্তরে রায়েছে গভীরতর অসুখ। আর তার কোন ওষুধ নেই। কোন চিকিৎসক অমাকে সুস্থ করে তুলতে পারবেন না। এ রোগের একমাত্র ওষুধ প্রভুর সঙ্গে মিলন। যতদিন সে মিলন না হয়, ততদিন এ কাকুতি-মিনতি, কান্নাকাটি বন্ধ হবে না।
কয়েকজন ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তিকে তিনি জিজ্ঞেস করেন, কে কোন উদ্দেশ্যে আল্লাহ্র ইবাদত- বন্দেগী করেন। কেউ বললেন, জাহান্নামে যাতে যেতে না হয়, তার জন্যেই এ ইবাদত। কেউ বললেন, জান্নাতের সুখ উপভোগ করার জন্যই আল্লাহ্র এ উপাসনা। তাঁরা এবার তাঁর উদ্দেশ্যে জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, জান্নাত কিংবা জাহান্নামের জন্য তাঁর ইবাদত নয়। সেগুলো না থাকলেও শুধু আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্যই তাঁকে ইবাদত করতে হত। তাঁর নির্দেশ পালন ও সন্তুষ্টিলাভের জন্যই তিনি ইবাদত করেন জান্নাতের লোভের, কিংবা জাহান্নামের ভয়ে নয় । বলা বাহুল্য তাঁর যুক্তিপূর্ণ কথায় ধর্মভীরু লোকগুলো লজ্জিত হলেন।
হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর পরণের জীর্ণ পোশাক দেখে এক ধার্মিক ব্যক্তি অনুতাপ করে বললেন, আপনার দুর্দশা দেখে দুঃখ হয়। সামান্য ইশারা পেলে সবাই আপনার অভাব মোচনে এগিয়ে আসবে তিনি বললেন, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কাজে কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা লজ্জাকর। এ হল আল্লাহর কাজ। যার যা কিছু আছে, সবই আল্লাহ্ প্রদত্ত। এ কথা জানার পর, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো কাছে কি সাহায্য চাওয়া যায়? তিনি তো আমার অবস্থা দেখছেন। ইচ্ছে হলে তিনি নিজেই সাহায্য করবেন।
তাঁর এ সুললিত জবাব শুনে সেই ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি অন্য এক ব্যক্তির নিকট মন্তব্য করেন; তাঁকে আমি যতটুকু উচুস্তরের সাধিকা বলে ভেবেছিলাম, তিনি তার চেয়েও উচুস্তরের।

১৩. হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর অসুস্থতার সময়ে স্বনামধন্য সাধক হযরত হাসান বেসরী (র) তাঁকে দেখতে গেলেন। গিয়ে দেখলেন, বসরার এক ধনী ব্যক্তি রূপোর টাকা ভর্তি একটা থলে নিয়ে ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে আছেন হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর দরজায়। হযরত হাসান বসরী (র) তার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর অভাব অনটনের খবর পেয়ে তাঁকে কিছু টাকা দিতে এসেছি। কিন্তু তিনি তো কারো কিছু গ্রহণ করেন না। তাই ভাবছি, আমাকে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হবে। কিভাবে তাঁকে যে আমার ইচ্ছের কথা বলব, তারও সাহস হচ্ছে না। আপনি কি আমার জন্যে একটু সুপারিশ করবেন?
হযরত হাসান বসরী (র) সত্যিই ভেতরে গিয়ে তাঁর কথা বললেন। তখন হযরত রাবেয়া বসরী (র) বললেন, যে লোক আল্লাহর নিন্দা করে, তিনি তারও জীবিকা বন্ধ করেন না। আর যে আল্লাহর প্রেমে বিভোর, জীবিকা ছাড়াই আল্লাহ তাঁকে জীবিত রাখেন। যেদিন থেকে আমি আমার প্রভুকে জেনেছি, সেদিন থেকেই মানুষের মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। তাছাড়া, মানুষের অর্থ হালাল না হারাম, তাও তো আমার জানা নেই। সুতরাং দয়া করে এ ব্যাপারে আপনি কিছু বলবেন না।
অসুস্থ তাপসী হযরত রাবেয়া বসরী (র) কে দেখার জন্য এসেছিলেন হযরত আবদুল ওয়াহেদ আমেরী (র) ও হযরত সুফিয়ান সওরী (র)। কিন্তু তাঁর অসাধারণ ঐশীশক্তির কথা ভেবে তাঁরা চুপচাপ বসে রইলেন। একটি কথাও বলতে পারলেন না। অবশেষে হযরত রাবেয়া বসরী (র) নীরবতা ভেঙে হযরত সুফিয়ান সত্তরী (র)-এর কোন বক্তব্য আছে কিনা, জানতে চাইলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে সাহস পেয়ে সুফিয়ান সওরী (র) বললেন, আল্লাহ্ আপনাকে সুস্থ করে তুলুন, এ প্রার্থনা জানাই।
হযরত রাবেয়া বসরী (র) তার ওপর চোখ রেখে বললেন, আপনি কি জানেন যে, কার ইচ্ছায় আমি রোগাক্রান্ত?
হ্যাঁ। আল্লাহর ইচ্ছায়।
তা যদি জানেনই, তাহলে তাঁর কাছেই আরোগ্যলাভের প্রার্থনা করছেন? এটা কি তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাচ্ছে না?
আপনার কি খেতে ইচ্ছে হয়?
সুফিয়ান, আপনি পণ্ডিত লোক । এ আপনি যা বললেন, তা আপনার পক্ষে শোভা পায়। না। বার বছর ধরে আমার ঘুমা খাওয়ার বড় ইচ্ছা ছিল। আর বসরায় খুমা খুব সস্তাও। তা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত আমি খুর্মা খাইনি। আমার যা ইচ্ছে, আমি যদি তাই করি, আর সেটা যদি।
আমার প্রভুর ইচ্ছার বিপরীতে হয় তাহলে তা হবে অর্ধমের মত।
আমায় ক্ষমা করুন। আমি আর অনধিকার চর্চা করতে চাইনে। আপনি এখন আমাকে কিছু উপদেশ দিন।
আপনি যদি সংসারকে ভাল না বাসতেন, তাহলে সত্যিই একজন পূর্ণবান ব্যক্তি হতেন। আশ্চর্য। আমার মধ্যে আপনি সংসার-প্রীতির কী দেখলেন? তা যদি না হত, তাহলে আপনি অবুঝের মত জিজ্ঞেস করতেন না যে, আমার কী খেতে ইচ্ছে হয়। অথচ আপনি জানেন, এ জগৎ-সংসার অস্থায়ী, ধ্বংসশীল। এর সব কিছুই মূল্যহীন ।
তাপসী হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর কথা শুনে হযরত সুফিয়ান সওরী (র) চৈতন্যোদয় হয়। তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, আল্লাহু আকবার! হে আল্লাহ! আপনি আমার ওপরে খুশি থাকুন। তাঁর প্রার্থনা হযরত রাবেয়া বসরী (র) এর কানে গেলে বললেন, আপনি যাঁর ইচ্ছার ওপর সন্তুষ্ট নন, আপনার ওপর তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করতে আপনার লজ্জা হয় না?
মহাসাধিকা হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর এ আধ্যাত্মিক অনুভূতি অনির্বচনীয়। সমকালের অসাধারণ পুরুষরাও তাঁর মূল্যায়নে হিমশিম খেয়েছেন।

১৪. একদিন এলেন প্রখ্যাত সাধক হযরত মালেক দীনার (র)। দেখলেন হযরত রাবেয়া বসরী (র) একটা ভাঙা ঘটিতে ওজু করেন ও পানি পান করেন। আর শোবার জন্যে রয়েছে পুরানো ছেঁড়া এক চাটাই। আর ইটের বালিশ। এসব দেখে বড় ব্যথা পেলেন তিনি। বললেন, কত কষ্ট আপনার মাননীয়া। আমার প্রচুর ধনী শিষ্য ও বন্ধুবান্ধব রয়েছে। যদি অনুমতি দেন, তাহলে কিছু দরকারী জিনিসপত্র এনে দিই।
তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ উত্তর দিলেন। আপনিও ভুল করলেন? আপনার বিত্তশালী বন্ধুবান্ধবের এবং আমার প্রভু কি এক নয়?
হযরত মালেক দীনার (র) বললেন, তা তো বটেই।
দারিদ্রের কারণে তিনি কি দরিদ্র দাসদের ভুলে থাকেন? নাকি সচ্ছলতার কারণে স্মরণে রাখেন সম্পদশালী দাসদের?
না তা নয়।
তাহলে তিনি যখন ধনী-দরিদ্র সকলের অবস্থাই জানেন, তখন তাঁকে আর স্মরণ করিয়ে দেয়ার দরকার কি?

১৫. আলোচনাসভা বসেছে মহাতাপসী হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর বাসভবনে। আলোচনা করছেন একদল আলেকময় পুরুষ। হযরত হাসান বসরী (র), হযরত মালেক দীনার (র), হযরত শাকীক বলখী (র) প্রমুখ। আলোচ্য বিষয় আল্লাহ্ প্রেমের বিশুদ্ধ সত্যস্বরূপ।
হযরত হাসান বসরী (র) বললেন, প্রভুর আঘাতে যিনি ধৈর্য হারান, তাঁর আল্লাহ্ প্রেমের দাবি সত্য নয়। হযরত রাবেয়া বসরী (র) বললেন, এতে আত্মরপতা ও অহমিকা প্রকাশ পায়। হযরত শাকীক (র) বললেন, প্রভুর আঘাতে যিনি শোকর প্রকাশ করেন না, তাঁর ও প্রভু- প্রেমের দাবি খাটি নয়।
হযরত রাবেয়া বসরী (র) বললেন, এর সংজ্ঞা আরো উন্নত হওয়া দরকার। তখন সবাই তাকেই ধরলেন । এ বিষয়ে আপনি কিছু বলুন। তিনি বললেন, যিনি প্রভুর দেয়া আঘাতে প্রভুর দর্শন ভুলে যান, তিনিই আল্লাহ্র বন্ধুত্বের প্রকৃত দাবিদার। যেমন মিশরের নারীরা হযরত ইউসুফ (আ)-এর দর্শনে নিজেদের আঙুল কর্তনজনিত যন্ত্রণার কথা টেরই পেলেন না । আল্লাহপ্রেমের সত্য-স্বরূপ তিনিই উপলদ্ধি করেন।
একদিন ধর্ম নিয়ে আলোচনা চলছে। হযরত রাবেয়া বসরী (র) উনুনে মাংসের হাঁড়ি চাপিয়ে দিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করলেন। রান্নার চেয়ে আলোচনা তাঁর কাছে অনেক বেশী । আলোচনা চলল সারা বিকেল ধরে। মাগরিবের নামাযের পর ভোজন। হযরত মূল্যবান হাসান বসরী (র)-এর মনে সন্দেহ, ঐ মাংস কি মুখে দেয়া যাবে? কিন্তু এক টুকরো মুখে দিয়েই তিনি বুঝলেন, এমন উত্তম জিনিস তিনি আর কখনো খাননি। অথচ হযরত রাবেয়া বসরী (র) মাংসের হাঁড়িতে শুধু পানি ঢেলে দেন, অন্য কিছু নয়। ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন হযরত হাসান বসরী (র) আরো একদিনের বর্ণনা দিয়েছেন হযরত সুফিয়ান সওরী (র) তিনি তাপসী হযরত রাবেয়া বসরী (র) বাড়িতে একটি রাত নামায পড়লেন। পরদিন সকালে বললেন, আল্লাহ্ তাঁকে যে রাতভর নামায পড়ার তওফিক দিয়েছেন, তার কৃতজ্ঞতা আদায়ের জন্য তিনি আগামীকাল রোজা রাখবেন। এমন আল্লাহ্প্রাণ সাধ্বী আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি।

হযরত রাবেয়া বসরী (রাঃ)-এর প্রার্থানা : হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর প্রার্থনা ছিল খুবই নিগূঢ়, ব্যঞ্জনাধর্মী। যেমন, তিনি বলতেন, প্রভু গো, বিচারদিবসে আপনি যদি আমকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন, তাহলে আমি আপনার এমন এক গোপন রহস্য ফাঁস করব, যাতে জাহান্নাম আমার থেকে হাজার বছরের পথ দূরে পালিয়ে যাবে।
তাঁর প্রার্থনা সরল, কিন্তু সঙ্কেতময়। তিনি বলতেন, প্রভু আমার! এ জগতে আমার জন্য যা রেখেছেন তা আপনার শত্রুদের দিয়ে দিন। আর ঐ জগতে আমার জন্য যা নির্দিষ্ট, তা আপনার মিত্রদের দান করুন। আমি ওসবের প্রত্যাশী নই। আমার জন্য আপনিই যথেষ্ট। জাহান্নামের ভয়ে আমি যদি আপনার উপাসনা করি, তাহলে আপনি আমাকে জাহান্নামে ছুঁড়ে দিন। আর জান্নাতের আশায় যদি আপনার ইবাদত করে থাকি, তাহলে আমাকে তা থেকে বঞ্চিত করুন। আর যদি শুধু আপনার উদ্দেশে ইবাদত করে থাকি, তাহলে দয়া করে আমাকে আপনার চিরসন্তুষ্টি দান করুন। আপনার দীদার থেকে আমি যেন বঞ্চিত না হই।
তাঁর প্রার্থনার অতলস্পর্শী আবেদন মানুষের মর্মমূল কাঁপিয়ে দেয়, আপনি যদি জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন, তাহলে আমি আর্ত-চিৎকারে বলব, প্রভু গো, আমি তো আপনাকে ভালবাসতাম। তারপরেও কি সে প্রিয় বন্ধু তার বন্ধুর সাথে এরূপ ব্যবহার করে? এ প্রার্থনার উত্তরে তিনি শুনতে পান, তুমি আমার ওপর এমন ভ্রান্ত ধারণা পোষণ কর না। তুমি আমার সে বন্ধুদের অন্তর্ভুক্ত হবে, যারা রোজ কিয়ামতে আমার সঙ্গে কথা বলবে।
কি আপ্লুত উচ্চারণ তাঁর; প্রভু গো, এ জগতে আমার একমাত্র ইচ্ছা ও কাজ আপনাকে স্মরণ করা ও স্মরণে রাখা। আর পরকালে আপনার দীদারের প্রত্যাশা। প্রভুর আমার! একমাত্র আপনিই আমার কামনা ও লক্ষ্য। আমার হৃদয়কে আপনি আপনার সংস্পর্শেই রাখুন। আর আমার দুর্বল নামাযকে কবুল করুন।

হযরত রাবেয়া বসরী (র)-এর ইন্তেকাল : অবশেষে একদিন তাঁর প্রভুর ডাক এল, আসন্ন হয়ে উঠল জগৎ ও জীবন থেকে বিদায় নেবার পালা। তাঁর অন্তিম শয্যার পাশে ছুটে এলেন কত বিশুদ্ধ-হৃদয় মানুষ। হযরত রাবেয়া বসরী (র) তাঁদের বললেন, আপনারা দয়া করে আল্লাহর দূতগণের জন্য জায়গা করে দিন। তাঁরা আসছেন। তারা কথায় সবাই বাইরে চলে গেলেন। আর ঘরের দরজা বন্ধ করা হল। বাইরে দাড়িয়ে তাড়া শুনতে পেলেন হে পবিত্র
আত্মা! তোমার প্রভুর দিকে সানন্দে প্রত্যাবর্তন কর।
কিছুক্ষণের স্তব্ধতা। পরে সবাই যখন তার ঘরে এলেন আবার, তখন দেখা গেল হযরত রাবেয়া বসরী (র) এর প্রাণহীন দেহ পড়ে আছে। শেষ উপাসনা শেষ করে তিনি যেন চির নিদ্রায় শায়িত। এক নিষ্প্রদীপ আলোয়ে, রাতির অন্ধকারে তিনি এসেছিলেন। আর আজ মানুষের জন্য এক আলোর ভুবন রচনা করে চলে গেলেন তাঁর মহিমাময় প্রভু ও প্রেমাষ্পদের কাছে ।
আল্লাহ্র বিধি-বিধানের এতটুকু ব্যত্যয় ঘটেনি তার জীবনে। আল্লাহ্, আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও সংস্পর্শ ছাড়া অন্য কোন ইচ্ছার অনুবর্তী হননি কোনদিন ।
মৃত্যুর পর তাঁকে এক শুভ্র-হৃদয় স্বপ্নে দেখেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, কবরে মুনকীর- নাকীর আপনাকে কি প্রশ্ন করেন আর আপনিই বা তার কি উত্তর দেন? তিনি বলেন, তাঁরা জিজ্ঞেস করেন বলুন, আপনার প্রভু কে? আমি বলেছিলাম, দয়া করে আপনারা আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে আমার এ কথাগুলো তাঁকে বলুন যে, জগতে এত লোক থাকা সত্ত্বেও আপনি এঅবলা দাসীকে ভুলবেন না। আমি তো আপনাকে ছাড়া আর কাউকে বন্ধু বলে জানি না, তা সত্ত্বেও আপনি কিভাবে অন্যকে পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করছেন, বল তোমার প্রতিপালক কে?
কত আলোকোজ্জ্বল মানুষ তাঁর পবিত্র কবর জিয়ারতে গেছেন। আর উজ্জ্বলতর হয়েছেন আরো ও। একদিন তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে হযরত আসলাম (র) ও হযরত নিজামী তুসী (র) জিজ্ঞেস করেছেন, হে তাপসী রাবেয়া বসরী! আপনি তো গর্ব করতেন, ইহকাল ও পরকাল থেকে মুক্তিলাভ করেছেন। এখন বলুন, আপনি কী অবস্থায় রয়েছেন?
উত্তর এল, আমি ইহকালে যা দেখেছি, এবং এখনো যা দেখছি, আপনাদের ভাগ্যেও যেন তাই হয়।

গ্রন্থসূত্র – তাযকিরাতুল আউলিয়া
মূল – হযরত খাজা ফরীদুদ্দিন আত্তার নিশাপুরী
অনুবাদ – মাওলানা ক্বারী তোফাজ্জল হোসেন ও মাওলানা ক্বারী মোহাম্মদ হাসান
সিদ্দিকিয়া পাবলিকেশন্স

Others Post

আপন খবর - Apon Khobor

আধ্যাত্মিক লেখালেখির প্লাটফর্ম
ফেসবুক পেজ
ইউটিউব
হোয়াটসএপ গ্রুপ
টেলিগ্রাম গ্রুপ

বিভাগসমূহ