অনুবাদক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, প্রজ্ঞাবান, সুফি, ওলী মহাত্মা ইবনুল আরাবী (রহ.)। তাঁর চিন্তাধারায় যুগপৎ আকৃষ্ট ও আবিষ্ট সমগ্র মুসলিম জাতি, বিশেষ করে সুফি, আধ্যাত্মিক ধর্ম সম্প্রদায়সমূহ। আর রহস্যবাদ, ধর্মে শাশ্বত আধ্যাত্মিক ব্যাখাবলী বিশ্বকে মুগ্ধ করে রেখেছে হাজার বছর ধরে। এই পোস্টে আমরা মহাত্মা ইবনুল আরাবীর তিনটি সুফি কবিতার অনুবাদ পড়বো। অনুবাদ করেছেন লাবিব মাহফুজ চিশতী।
০১. আমায় শাসন করে সূর্যের চোখ
যখন আমাকে শাসন করে স্বয়ং সুর্যের চক্ষু
আমার আত্মায় প্রেম তখন সমাসীন সুলতান!
তার সেনাদল শিবির গেড়েছে আমার অন্তরে
আবেগ, আকুতি, যন্ত্রণা, শোকে!
সুলতান যখন আমাকে করে পূর্ণ অধিকার
আমি আর্তনাদ করে উঠি
কারণ আমার কামনার অগ্নিশিখা
জ্বলে উঠে আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
এ এমন প্রেম- কেড়ে নিয়েছে আমার ঘুম
আমাকে করেছে হতবুদ্ধি
আমাকে অন্যায় যুদ্ধে করেছে হত
আর আমি যে নিতান্ত অসহায়!
এ এমন প্রেম, আমার ওপর চাপিয়েছে এমন বোঝা
যার ভার আমি সইতে পারি না –
আমি তো তাই তারি সমীপে দান করি প্রাণ
দেহ হীনতায়, দেহের বাঁধনের উর্দ্ধে।
০২. যারা গলিয়ে দেয় আত্মাকে
বসন্তের তৃণভূমিও এখন জনশূণ্য
তবু বেঁচে থাকে আকাঙ্খারা
চিরকাল! আমাদের হৃদয়ে
যা কখনো মরে না।
তাদের অশ্রু, তাদের উদ্বৃত্ত স্মরণ
আত্মাকেও গলিয়ে দেয়।
তাকে অনুসরণ করলাম
এবং প্রেমে বিভোর হয়ে ডেকে উঠলাম
বললাম- তুমি সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ
আমি আসলে কিছুই না।
প্রেমরোগে দিশাহারা আমি
মুখ থুবড়ে পড়লাম মাটিতে
তোমার জন্য তীব্র আকাঙ্খা ছিল বলে
আমার হৃদয়কে চূর্ণ কোরো না।
যে মানুষ তোমার কথায় আপ্লুত হয়েছে
শোকে জীবন্ত দগ্ধ হয়েছে –
এখন কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না।
সে অগ্নি কি কামনা করো তুমি?
তবে শান্ত হও।
এ আবেগ অগ্নিময়। এক করো স্পর্শ
যা তোমার আপন প্রতিজ্ঞাকেও করবে প্রজ্বলিত।
০৩. যখন আমরা একত্রিত হলাম
তোমাকে যখন বিদায় জানাতে এলাম
তোমারও মনে হতে পারতো
আমরা ছিলাম ‘যুক্তাক্ষর’।
মিলনে, আলিঙ্গনে।
যদিও আমাদের সৃজন হয়েছে
দ্বৈত স্বভাবে, প্রকৃতিতে
তবু আমাদের দৃষ্টি দেখে চলে শুধু
এক একীভূত সত্ত্বা।
আমি যেখানে অনস্তিত্ব
ইচ্ছা আমার আত্মাকে বিলীন করে
মিলন সেখানে কাম্য নয়
কারণ, মিলন তো হয় উভয় জগতে
উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতিতেও।
বরং মিলন আমায় এমন উন্মাদ করলো
যা কল্পনারও সীমারও বাইরে
নিরাময় স্বয়ং যেখানে হল নবতর ব্যাধি
যা আসে পরমানন্দ থেকে।
আমি দেখি এমন এক সত্ত্বা
যার সৌন্দর্য ও উজ্জলতা বৃদ্ধি পায়
আমাদের প্রতিটি মিলনে।
এ এমন এক পরমানন্দ
যা থেকে কেউ পালাতে পারে না
এ এমন এক সৌন্দর্য
যা নিয়ত তীব্রতর হতে থাকে
পূর্ণতম নিশ্চয়তার বিন্দু অবধি।

