অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী
হযরত খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের চিশতিয়া তরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক, যাঁর জীবন ছিল ইশক, ফকিরি এবং মানবপ্রেমের এক জীবন্ত মুর্শিদি কাব্য। ১২৩৮ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর ভারতের বদায়ুঁতে তাঁর জন্ম। শৈশবেই পিতৃহারা হয়ে দারিদ্র্য ও বেদনার যে আগুনে তিনি দগ্ধ হয়েছিলেন, সেই আগুনই পরবর্তীকালে তাঁর অন্তরে জ্বালিয়েছিল মারেফতের শাশ্বত প্রদীপ।
দিল্লিতে আগমনের পর তিনি চিশতিয়া তরিকার মহান সাধক হযরত বাবা ফরিদুদ্দিন গঞ্জেশকর (রহ.) এর সান্নিধ্যে আসেন। মুর্শিদের নূরানি নজর তাঁর আত্মার সুপ্ত দরজা খুলে দেয়। তিনি বুঝেছিলেন, ইলমের চূড়ান্ত সৌন্দর্য কিতাবের পাতায় নয়, বরং অন্তরের তাজকিয়া, নফসের বিলুপ্তি এবং প্রেমের আত্মসমর্পণে। মুর্শিদের হাতে বাইআত গ্রহণ করে তিনি প্রবেশ করেন সেই অন্তর্জগতে।
দিল্লির গিয়াসপুরে তাঁর খানকাহ হয়ে ওঠে ক্ষুধার্তের আশ্রয়, নিঃস্বের ভরসা এবং পথহারা আত্মার প্রশান্তির ঠিকানা। রাজদরবারের ঐশ্বর্যের পরিবর্তে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ফকিরির স্বাধীনতা। সুলতানদের ক্ষমতা তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি; বরং দরিদ্র মানুষের অশ্রু মুছে দেওয়াকেই তিনি মনে করতেন প্রেমের প্রকৃত সাধনা। তাঁর আধ্যাত্মিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ইশক, ফকিরি, সহনশীলতা ও সৃষ্টির প্রতি মমত্ববোধ।
তাঁর প্রিয় শিষ্যদের মধ্যে ছিলেন আমির খুসরো—যিনি কবিতা, সংগীত ও আধ্যাত্মিক প্রেমের ভাষায় মুর্শিদের মহিমা ছড়িয়ে দেন। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিক্ষায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অন্তরের পবিত্রতা ও মানবকল্যাণ বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।
১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পর্দা গ্রহণ করেন। দিল্লির তাঁর দরগাহ আজও প্রেমপিপাসু মানুষের মিলনস্থল।
খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া রহ. এর দুটি কাসিদার অনুবাদ –
০১.
প্রভুর বাগানে তুমি হও গোলাপ অন্বেষণকারী
ঐশ্বরিক রহস্যে হও বিভোর
মেহবুবে এলাহী – প্রভূর প্রিয়তমা
তোমার সান্নিধ্যের সুঘ্রাণের জন্য
আমি ভীষণ আকুল।
০২.
হে বাতাস, মদিনার দিকে মুখ ফেরাও
এবং আমার সালাম পাঠ করো।
প্রদক্ষিন করো নবীগণের বাদশাহকে
পৌঁছে দাও বিনয়ী সালাম।
প্রবেশ করো দয়ার দরজায়, জিব্রাইলের দরজায়
শান্তির দরজায়, পাঠ করো বিনয়ী সালাম।
মদিনার ধূলিকণার ওপর স্থাপন করো
ঈমানের মস্তক।
একাত্ম হও দাউদ আ. এর মোহনীয় সুরে
পরিচিত হও যন্ত্রণার আর্তনাদের সঙ্গে।
নবীগণের এ মহিমান্বিত মজলিসে
বিনয়ী ‘নিজাম’ এর বাণী পাঠ করো।

