লিখুন

Date:

ফেসবুক
ইউটিউব

ফরিদুদ্দিন আত্তার রহ. এর মরমী কবিতা – আত্মবিলোপন

অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী

হযরত ফরিদুদ্দিন আত্তার (রহ.) ছিলেন পারস্যের আকাশে উদিত এমন এক অনির্বাণ মরমি নক্ষত্র, যাঁর হৃদয় ইশকের আগুনে জ্বলে উঠেছিল পরম সত্যের সন্ধানে। দ্বাদশ শতকের মধ্যভাগে পারস্যের নিশাপুরে তাঁর জন্ম। ‘আত্তার’ অর্থ সুগন্ধি বিক্রেতা বা ঔষধ প্রস্তুতকারক। পেশাগত জীবনে তিনি ঔষধ ও সুগন্ধির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু বাহ্যিক সুগন্ধির আড়ালে তাঁর অন্তর অন্বেষণ করত সেই অনন্তের সুবাস, যা মানুষের আত্মাকে পরম প্রিয়তমের দিকে আকৃষ্ট করে।

কথিত আছে, জীবনের কোনো এক গভীর মুহূর্তে মৃত্যুর অনিবার্যতা ও জগতের ক্ষণস্থায়িত্ব তাঁকে এমনভাবে আলোড়িত করেছিল যে, পার্থিব মোহের পর্দা সরিয়ে তিনি প্রবেশ করেন মারেফতের শাশ্বত পথে। তাঁর সাধনার মূল সুর ছিল—নিজেকে চেনা, নফসকে পরিশুদ্ধ করা এবং প্রেমের মধ্য দিয়ে সত্যের উপলব্ধি অর্জন।

আত্তারের অমর সৃষ্টি ‘মানতিকুত তায়র’—অর্থাৎ ‘পাখিদের সম্মেলন’—সুফি সাহিত্যের এক অনন্য মহাকাব্য। এখানে পাখিরা তাদের রাজা সিমুর্গের সন্ধানে দীর্ঘ ও দুর্গম যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে। সাতটি উপত্যকা অতিক্রম করে অবশেষে ত্রিশটি পাখি উপলব্ধি করে, তাদের কাঙ্ক্ষিত সিমুর্গ তাদের সম্মিলিত অস্তিত্বেরই এক প্রতিফলন মাত্র। এই রূপকের অন্তরালে রয়েছে আত্মবিসর্জন, নফসের বিলয় এবং আত্মোপলব্ধির গভীর দর্শন।

তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’, যেখানে বহু আল্লাহপ্রেমিক সাধকের জীবন ও আধ্যাত্মিক বাণী সংকলিত হয়েছে; ‘ইলাহিনামা’ এবং ‘আসরারনামা’ও বিশেষভাবে স্মরণীয়।

আনুমানিক ১২২১ সালে মোঙ্গল আক্রমণের সময় নিশাপুরে তাঁর ওফাত ঘটে।তাঁর দেহের প্রস্থান ঘটলেও তাঁর প্রেমতত্ত্ব আজও চির জীবন্ত।

কবিতা – আত্মবিলোপন
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী

পথিক, যন্ত্রনার এ রণক্ষেত্রে
তখনি আসে ভালোবাসা, যখন তুমি ফানা হও
তুমিতো এমন এক সত্তা – যার
অস্তিত্ব অনস্তিত্বের সাথে মিশ্রিত।
তুমি এমন এক আনন্দ,
যা দুঃখের সাথে মিশ্রিত।
উরুজ ও নজুলের স্বাদ যদি না পাও
তবে কী করে স্বস্তি পাবে?

সাহসী হও, বজ্রের মত আঘাত হানো
তারপর নিজেকে ঢেকে নাও –
এবং সত্যিকারের আশেকের মত জেগে ওঠো।
আগুন দাও যুক্তির গুদামে
জ্বলে ওঠো উন্মাদনায়।

এই প্রেম নিয়ে দ্বিধা কোরো না
কতকাল বন্দী থাকবে আপন চিন্তার বলয়ে?
এবার নিজেকে ত্যাগ করো,
অর্জন করো দূরদৃষ্টি –
যাতে তুমিও হতে পারো প্রেমিক দরবেশ এবং
পরমানন্দে শামিল হও –
আপন আত্মার বিলয়কর্মে।

আমি, আসলে যার অস্তিত্ব নেই,
নেই কোনো অনস্তিত্বেও,
সদা সর্বদা ভ্রমণ করি যুক্তি ও ভালোমন্দের উর্দ্ধে।
আমি নিজেকে হারাই নিজেরি মধ্যে।

ত্যাগের সূর্য স্বমহিমায় যখন পতিত হলো আমার মস্তকে
উভয় জগৎ পরিণত হলো আলোকস্তম্ভে
আমি হারিয়ে গেলাম বিস্মৃতির অতলে
পরিণত হলাম এক ফোটা জলে
আর মিশে গেলাম অনন্ত স্রোতের মধ্যে।

যা যা ছিল জীবনের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি
সবি বিসর্জন দিলাম স্রোতের কালো জলে।

অদৃশ্য হলাম, হারিয়ে গেলাম, শূণ্য হলাম
হয়ে গেলাম অস্তিত্বশূণ্য ছায়ামাত্র
সাগরে মিশে যাওয়া এক ফোটা জল।
যাকে শতচেষ্ঠাও খুঁজে পাবেনা।
এ আত্মবিলোপন সবার জন্য নয়
কিন্তু, আমিযে শামিল হয়েছি শাশ্বত মিলনে
এ পৃথিবী, ধুলিকণা থেকে চাঁদ,
কে চাইবে এমন আত্মহুতি?

Others Post

আপন খবর - Apon Khobor

আধ্যাত্মিক লেখালেখির প্লাটফর্ম
ফেসবুক পেজ
ইউটিউব
হোয়াটসএপ গ্রুপ
টেলিগ্রাম গ্রুপ

বিভাগসমূহ