আপন ফাউন্ডেশন

কাজী নজরুল ইসলাম এর কিছু উক্তি সংকলন (আত্মকথা)

Date:

Share post:

সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী

বাধন ভাঙার কবি কাজী নজরুল ইসলাম । যিনি তাঁর দুরন্ত প্রাণের বেগে স্বয়ং নির্মাণ করে চলেছেন নিজের পথ। দ্রোহ আর প্রেমের এক অনন্যসাধারণ মেলবন্ধনের নাম কাজী নজরুল ইসলাম। আপন খবরের এবারের আয়োজনে থাকছে কাজী নজরুল ইসলামের আরো ৩০ টি উক্তির সংকলন।

১. আমি কবি। বনের পাখির মতো স্বভাব আমার গান করার। কাহারও ভালো লাগিলেও গাই, ভালো না লাগিলেও গাহিয়া যাই।

২. আমাদের – কবিদের বাণী বহে ক্ষীণ ভীরু ঝর্ণাধারার মতো। ছন্দের দুকূল প্রাণপণে আঁকড়িয়া ধরিয়া সে সঙ্গীতগুঞ্জন করিতে করিতে বহিয়া যায়। পদ্মা-ভাগীরথীর মত খরস্রোতা যাহাদের বাণী, আমি তাহাদের বহু পশ্চাতে।

৩. আমি যে নদীর জলধারা, সেই নদীকূলে যাবেন আপনারা, তবে না চাইতেই আমার ভাষা, আমার গান সেখানে শুনতে পাবেন।

৪. সুন্দরের ধ্যান, তাঁর স্তবগানই আমার উপাসনা।

৫. যে কূলে, সে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহন করি, সে আমার দৈব। আমি তাকে ছাড়িয়া উঠতে পেরেছি বলেই কবি।

৬. আমি যেটুকু দান করেছি, তার কার কতটুকু ক্ষুধা মিটেছে জানিনে, কিন্তু আমি জানি, আমাকে পরিপূর্ণরুপে আজো দিতে পারিনি, আমার দেবার ক্ষুধা আজো মেটেনি।

৭. আমি যেটুকু দিতে পারি, সেটুকু প্রসন্নচিত্তে গ্রহণ করুন।

৮. সাহিত্য ব্যক্তিত্বেরই প্রকাশ। আমি সাহিত্যে কি করেছি তার প্রকাশ আমার ব্যক্তিত্বের ভিতর।

৯. শুধু পরম গোপনকে জানাই আমার সাধনা নয়। তাঁকে জেনে তাঁকে পেয়ে প্রকাশ-জগতে আনার জন্যই আমার এ তপস্যা।

১০. আমি কবি, আমি জানি কি করে সুন্দরের বুকে ফুল ফোটাতে হয়।

১১. আমি শক্তি-সুন্দর, রুপ-সুন্দরকে ছাড়িয়ে আজো উঠতে পারিনি। সুন্দরের ধেয়ানী দুলাল কীটসের মতো আমারও মন্ত্র “Beauty is truth, truth is beauty”

১২. যে উচ্চ গিরি শিখরের পলাতকা সাগর-সন্ধানী জলস্রোত আমি সেই গিরি-শিখরের মহিমাকে যেন খর্ব্ব না করি। যেন মরুপথে পথ না হারাই। এই আশীর্বাদ আপনারা করুন।

১৩. যিনি আমার হৃদয়ের এতো কাছাকাছি থাকেন, তিনি আমার নিশ্চয়ই পরম অথবা চরম আত্মীয়।

১৪. আমি শুধু সুন্দরের হাতে বীণা, পায়ে পদ্মফুলই দেখিনি, তার চোখে চোখ-ভরা জলও দেখেছি। শ্মশানের পথে, গোরস্থানের পথে, তাকে ক্ষুধা-দীর্ণ মুর্তিতে ব্যথিত পায়ে চলে যেতে দেখেছি। যুদ্ধ ভূমিতে তাকে দেখেছি, কারাগারের অন্ধকূপে তাকে দেখেছি, ফাঁসির মঞ্চে তাকে দেখেছি। আমার গান সেই সুন্দরকে রূপে রূপে অপরূপ করে দেখার স্তব-স্তুতি।

১৫. কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি, ও দুটোর কিছুই নয়। আমি মাত্র হিন্দু মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।

১৬. তারুণ্যকে, যৌবনকে, আমি যেদিন হইতে গান গাহিতে শিখিয়াছি, সেদিন হইতে বারে বারে সালাম করিয়াছি, তাজিম করিয়াছি, সশ্রদ্ধ নমষ্কার নিবেদন করিয়াছি। গানে কবিতায় আমার সকল শক্তি দিয়া তাহারই জয় ঘোষণা করিয়াছি, স্তব রচনা করিয়াছি।

১৭. আমি গানের পাখি, অনাগত অরুণোদয় স্পন্দন আমার কন্ঠে গান হয়ে ‍ফুটে উঠেছে, -সরাইখানার ঘুমন্ত মুসাফির, জাগো। সূর্য্যোদয়ের আর দেরী নাই। বন্ধু জাগো।

১৮. আমি নিজের ওপর যে সমন্ধে নিজেরই বিশ্বাস নেই, সে সম্বন্ধে নেতৃত্ব করা আমার সাজে না।

১৯. আলো সওয়া যায়, শিখা সওয়া যায় না। আমি জ্বলছি শিখার মতো, আপনার আনন্দে আপনি জ্বলছি। কাছে এলে তা দেয় দাহ, দূর হতে দেয় আলো।

২০. মানুষের হৃদয় উল্টে গেলে ভূত হয় বা ভূত হলে তার মুখ উল্টে যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয় উল্টে গেলে সে যে ভূতের চেয়েও কত ভীষণ আর প্রতিহিংসা পরায়ণ হিংস্র হয়ে ওঠে, তাও আমি ভাল করেই জানি। তবু আমি মানুষকে শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি।

২১. স্রষ্টাকে আমি দেখিনি, কিন্তু মানুষকে দেখেছি। এই ধুলিমাখা পাপলিপ্ত অসহায় দূঃখী মানুষই একদিন বিশ্ব নিয়ন্ত্রিত করবে, চির রহস্যের অবগুন্ঠন মোচন করবে, এই ধুলোর নীচে স্বর্গ টেনে আনবে, এ আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি।

২২. আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলে শুধু এই দেশেরই, এই সমাজেরই নই। আমি সকল দেশের, সকল মানুষের।

২৩. নূতন করে গড়তে চাই বলেই তো ভাঙি। শুধু ভাঙার জন্যই ভাঙার গান আমার নয়।

২৪. আমার সমস্ত লেখায়, কামনায় শুধু এই প্রার্থনাই ধ্বনিত হয়েছে, তোমার এসো অনাগত কবির দল, আমি ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে গেলাম, তোমরা ভোরের পাখী, তাদের গান শুনাও।

২৫. মুক্ত প্রাণে, মুক্ত বাতাসে যেদিন মুক্তির গান গাইতে পারবো, সেই দিন হবে আমার অভিযানের শেষ।

২৬. যখন আমি বালক, তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার কান্না আসতো। বুকের মধ্যে বায়ু যেনো রুদ্ধ হয়ে আসতো। আমার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতাম, “ঐ আকাশটা যেনো ‍ঝুড়ি, আমি যেন পাখির বাচ্চা, আমি ঐ ঝুড়ি চাপা থাকবো না, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।” তাই য়ুনিভার্সিটির দ্বার থেকে য়ুনিভার্সের দ্বারে হাত পেতে দাড়ালাম।

২৭. জীবনে কোনোদিন কোনো বন্ধনকে স্বীকার করতে পারলাম না। কেনো স্নেহ ভালোবাসা আমায় বুকে টেনে রাখতে পারলো না। এই পরম তৃষ্ণা যে কোন পরম সুন্দরের, তা বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারিনি বলেই অবুঝের মতো পথ থেকে পথান্তরে ঘুরেছি।

২৮. আমার এই পরম মধুময় অস্তিত্বে প্রেম শক্তিতে আত্মসমর্পন করে আমি বেঁচে গেছি। আমার অনন্ত জীবনকে ফিরে পেয়েছি।

২৯. আমার কাব্যে, সঙ্গীতে, কর্মজীবনে অভেদ-সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম, অসুন্দরকে ক্ষমা করতে, অসুন্দরকে সংহার করতে এসেছিলাম, আপনারা সাক্ষী আর সাক্ষী আমার পরম সুন্দর।

৩০. পদ্ম যেমন সূর্য্যের ধ্যান করে তারই জন্য তার দল মেলে, আমিও আমার ধ্যানের প্রিয়তমের দিকে চেয়েই গড়ে উঠেছি। আমি কোনো বাধা-বন্ধন স্বীকার করিনি, বিস্মৃত দিনের স্মৃতি আমার পথ ভুলায়নি, আমি আমার বেগে পথ কেটে চলেছি।

সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

Related articles