মৃত্যুর পর আত্মার কি হয়? – আপন খবর ডেস্ক
জন্ম মুহুর্ত হতেই প্রতিটি মানুষ শুরু করে অদ্ভুদত এক গন্তব্যের পথে অনিশ্চিত যাত্রা। কেউ জানেনা এ যাত্রার শেষ কোথায়। এ যাত্রাপথের শুরু এবং শেষের প্রশ্নটিই মানব সভ্যতার সবচেয়ে পুরনো প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটি। জগতের সকল ধর্মই কমবেশি এ বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করেছে। শুধু ধর্ম নয়, বিভিন্ন চিন্তাগোষ্ঠী থেকে শুরু করে সকল দার্শনিক সম্প্রদায় ও আধ্যাত্মিক কওমগুলো এ বিষয়টি নিয়ে গভীর ও বহুল চর্চা করেছে।
আসলেই কি মৃত্যুই সবকিছুর শেষ? নাকি মৃত্যু একটি দরজা মাত্র – যার ওপারেই শুরু হয় আত্মার রহস্যময় এক অনন্ত জগতের পথে অবিরাম যাত্রা? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদেরকে বুঝতে হবে আত্মা কী, মৃত্যু কী এবং মৃত্যুর পরে মানুষের অস্তিত্বের কী ঘটে। ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা, সুফি দর্শন ও দার্শনিক চিন্তা-পরিধির আলোকে আমরা এই অনন্ত রহস্যের কিছু আভাস/ইঙ্গিত পেতেই পারি।
মৃত্যু কি একটি সমাপ্তি? নাকি নতুন যাত্রার সূচনা?
সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হয় মৃত্যু হলো জীবনের সমাপ্তি। কিন্তু আ্যধাত্মিক দৃষ্টিতে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়, বরং মৃত্যু হলো একটি রুপান্তর। যেমন করে একটি পাখির সদ্যপ্রসূত ছানা ডিমের খোলস ভেঙ্গ ধরায় জন্মগ্রহণ করে, ঠিক তেমনি মানুষটিও তার দেহের খোলস ভেঙ্গে আরেক জগতে প্রবেশ করে। তাই মৃত্যুকে বলা যায় পর্দা উন্মোচন, রুপান্তর, নবযাত্রা, নূতন জীবন ইত্যাদি। এই পৃথিবী হলো আত্মর একটি অস্থায়ী আবাস। আমরা এখানে আসি আমাদের আত্মাকে পবিত্র ও নির্মল করে আবার অনন্ত গমণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে। নিজেকে পরিশুদ্ধ করে মহান জাতপাক আল্লাহ তথা মহান সৃষ্টিকর্তার সাথে নিজেকে একত্বে সংলীন করতে, অথবা সেই যোগ্যতা অর্জন করতে।
মানুষের প্রকৃত সত্ত্বা – আত্মা
মানুষের অস্তিত্ব অত্যন্ত গভীর ও রহস্যজনক অস্তিত্ব। মানুষ কোনো শরীর নয়। শরীর হলো একটি বাহন মাত্র। এই শরীরের ভেতর থাকে এমন একটি সত্ত্বা, যা দৃশ্যমান নয়, আর এই শক্তিকেই আত্মা বলা হয়। এই আত্মাটিই হলো মানুষের প্রকৃত পরিচয়। অজর, অমর, অব্যয়, অক্ষয় এই আত্মাটিই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, আমাদের সকল শক্তি সরবরাহ করে। আর দেহটি নিয়ত বৃদ্ধি পায়, ক্ষয়ে যায়, পঁচে যায়। একদিন মাটিতে মিশে যায়। কিন্তু আত্মটি কখনো ধ্বংস হয় না।
আধ্যাত্মবাদে বলা হয়, আত্মা হলো স্বয়ং প্রভূর অথবা প্রভূর নূর। ঐশ্বরিক জ্যোতি থেকে উদ্ভুত এক অনন্ত সত্ত্বা।
কি ঘটে মৃত্যুর মুহুর্তে?
আধ্যাত্মিক সাধকগণ ও জ্ঞানীগণ মৃত্যুকে একটি রহস্যবোধক ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। মানুষের প্রাণশক্তি যখন শেষ হয়ে আসে, শরীর তখন ধীরে ধীরে তার সকল ক্ষমতা হারাতে থাকে। আর আত্মা অনুভব করতে থাকে এক গভীর জাগরণ তথা আনন্দ। মৃত্যুর প্রাক মুহুর্তে মানুষের সামনে ভেসে উঠে তার সারাজীবনে কৃতকর্মের দৃশ্য। আত্মা যেন তার বিগত জীবনকে শেষবারের মতন দেখে নেয়। এরপরই আসে সে চরম মুহুর্ত, আত্মা যখন শরীরের বন্ধন হতে মুক্ত হয়ে যায়।
কবর জীবন বা বারযাখ এর রহস্য
মৃত্যর পরেই মানুষের আত্মা এমন এক অতীন্দ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হয়, যাকে বলা হয় বারযাখ বা দুই জগতের মাঝের পর্দা বা মধ্যবর্তী অবস্থা। কবর হলো এমন একটি অস্তিত্বগত অবস্থা যেখানে অবস্থান করে আত্মা তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করে। যে ব্যক্তি শান্তিময়, পরিশুদ্ধ তথা নির্মল আত্মা নিয়ে বারযাখে পৌঁছায়, তার বারযাখ তথা কবর হয় শান্তিতে ভরপুর, আর যে অশান্ত আত্মা নিয়ে বারযাখে পৌঁছায়, তার কবর হয় অশান্তিতে ভরা।
জীবনের সমস্ত ক্রিয়া, চিন্তা ও অনুভূতি আমাদের পরবর্তী জীবনের অস্তিত্বকে নির্মাণ করে। আমরা আমাদের হাতেই গড়ে তুমি আমাদের সেই শাশ্বত গন্তব্য, যেখানেই আমাকে যেতে হবে। মৃত্যু আমাদের সেই গন্তব্যে নিয়ে যায়, যার রচয়িতা আমি নিজেই, আমার চিন্তা, অনুভূতিই যেখানকার বাস্তবতা তৈরী করে।
স্বপ্ন ও মৃত্যুর মধ্যে সম্পর্ক
মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তার চেতনা আংশিকভাবে শরীরের সীমা ছাড়িয়ে যায়। সেই সময় আমরা এমন অনেক দৃশ্য দেখি, যা বাস্তব জগতের নয়। স্বপ্নের অভিজ্ঞতা আমাদেরকে মৃত্যুর পরের জগত সম্পর্কে ক্ষুদ্র ইঙ্গিত দেয়।
সুফি সাধকদের দৃষ্টিতে মৃত্যু
সুফি সাধকদের কাছে মৃত্যু কোনো ভয়ের বিষয় নয়, বরং তারা মৃত্যুকে দেখেন প্রিয়তমের সাথে সাক্ষাতের পরম মৃহুর্ত হিসেবে। মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো আত্মাকে নির্মল ও শুদ্ধতর করে ঐশ্বরিক প্রেমের পথে এগিয়ে যাওয়া। তাই একজন সাধকের কাছে মনে হয়, মৃত্যু মানে হলো পৃথিবীর অস্থায়ী কারাগার হতে মুক্তি। তাই তারা মৃত্যুকে শান্তভাবে ও সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করতে পারেন।
মানুষ কেনো মৃত্যুকে ভয় পায়?
সাধারণ মানুষ বা বিষয়রাশি তথা জাগতিক লোভলাসসা সিক্ত মানুষ জগতকে ছেড়ে যেতে চায় না, তারা যন্ত্রনা পায়। আর যন্ত্রনা পায় পাপীরা, যারা তাদের পরবর্তী গন্তব্য সম্পর্কে ভীত সন্ত্রস্ত।
উপসংহার – মৃত্যু একটি দরজা
মৃত্যু কোনো অন্ধকার গহ্বর নয়, এটি একটি দরজা। যার ওপারে শুরু হয় আত্মার আরেকটি মহাজগত। এই পৃথিবীর জীবন আমাদেরকে প্রস্তুত করে সেই মহাজীবনের জন্য, সেই বৃহত্তর জীবনে যাত্রা করবার জন্য। যে মানুষটি সত্য, প্রেম ও মানবতাপূর্ণ জীবন কাটায়, মৃত্যু তার জন্য এক গভীর শান্তির সূচনা করে। অতএব, মৃত্যুকে নিয়ে ভয় না পেয়ে আমাদের উচিত জীবনকে একনভাবে গড়ে তোলা, যাতে আত্মাটি একদিন শান্তভাবে তার মূলের দিকে ফিরে যেতে পারে।
লাবিব মাহফুজ চিশতী
আপন খবর ডেস্ক

