ধ্যান কি? (What is Meditation in Bengali) : আপন খবর ডেস্ক
ধ্যান কি? ধ্যান হলো নিজের এমন একটি আধ্যাত্মিক পন্থা যেখানে আপন মন, শ্বাস, অনুভূতি, চেতনা ও মনোদৈহিক সকল ক্রিয়াকর্মের ওপর মনের সচেতন পর্যবেক্ষন ও গভীর নিরিক্ষণ বজায় রাখার চর্চা করা হয়। মনের সকল ইচ্ছা, অনুভূতি ও গতিপ্রকৃতি কে সচেতন ভাবে পাঠ করার গভীর অনুশীলন। আমাদের মন তো প্রতিদিনের সহস্র কোলাহলে শতব্যস্ত ও চরম উদ্বিগ্ন থাকে। সহজ ভাষায় বললে ধ্যান হলো মনের সকল কোলাহল থামিয়ে মন কে স্থির করা, মনের গতিকে নিয়ন্ত্রিত করা ও আপন দেহকে সংবদ্ধ করে মনের শান্তি কায়েম করা।
আজকে ধ্যান সস্পর্কে আমরা জানব আপন খবরের এই আয়োজন থেকে। আমরা জানবো –
ধ্যান কি?
ধ্যান কি ও কেন? মেডিটেশন কি?
ধ্যান করার নিয়ম
ধ্যান করার পদ্ধতি
ধ্যান করার উপকারিতা
ধ্যান কত প্রকার ও কি কি?
ধ্যান করলে কি হয়?
ধ্যান কিভাবে করবো?
চলমান বৈশ্বিক অশান্তি, মানসিক দ্বন্দে যখন প্রতিটি মানুষ অশান্ত, মানুষ প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে সংসারের চক্রে, সীমাহীন অভাবের দুষ্টচক্র যখন মানুষের শ্বাসরোধ করে ধরছে প্রতিনিয়ত, মানুষ যখন একটু শান্তির আশ্রয় চায়, তখন ধ্যানের কোনো বিকল্প খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষ তো শান্তি চায়, কিন্তু শান্তির পথ জানে না, ধ্যান ব্যতীত সে শান্তি লাভ করা অসম্ভব।
ধ্যান শুধু ধর্মীয় রিচুয়াল বা প্রথা নয়, অথবা শুধু মানসিক ব্যায়াম নয়, ধ্যান হলো প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে প্রচলিত এমন এক চিরসিদ্ধ ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক আচরণ, যা সকল কালের সকল দেশের সকল ধর্মের সাধক. মুনি, ঋষি, নবী, অলী সহ সকল সত্যান্বেষী কে সত্যের সন্ধান দিয়েছে, আত্মার শান্তি দিয়েছে, সত্য ধর্মের দেশনা দিয়েছে।
ধ্যান কেন প্রয়োজন? (Why Meditation is Important)
বর্তমান যুগে প্রায় প্রতিটি মানুষ আত্মপরিচয়ের সংকটে ভূগছে। প্রবল মানসিক চাপ সহ্য করতে হয় প্রতিটি মানুষকে। অতিরিক্ত চিন্তা, দুশ্চিন্তা, ভয়, উদ্বেগ, হতাশা, শূণ্যতা, একাকীত্বের যন্ত্রনা নিয়ে জীবন যাপন করতে হয়। ভোগবাদীতার এই প্রবল পরাক্রমের যুগে মানুষ একপ্রকার যান্ত্রিক অসহায়ত্বে ভূগে। মানুষ দিন দিন দূর্বল হচ্ছে। শক্তি হারিয়ে ফেলছে। কারণ – মানুষের আজ আর তার নিজের সঙ্গে সংযোগ নেই, আপন হারা প্রাণ আজ বড় একা, ক্ষীণ। তাই জগতের অশান্তি আজ আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
আমাদের ভেতরের আমির সঙ্গে যে সংযোগ আমরা হারিয়ে ফেলেছি, ধ্যান সে সংযোগ কে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে। ধ্যান মনকে স্থির করে, শক্তিশালী করে, ধ্যান আত্মাকে জাগ্রত করে। গবেষণায় উপলব্ধ তথ্য আমাদের বলে –
১. নিয়মিত ধ্যান করলে মস্তিষ্কের স্ট্রেস হরমোন কমে।
২. মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়ে।
৩. ঘুমের মান উন্নত হয়।
৪. রাগ ও অস্থিরতা কমে যায়।
৫. মানসিক শান্তি স্থায়ী হয়।
সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিটি হল ধ্যানের মাধ্যমে মানুষ তাঁর অস্তিত্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে, হারানো আমিকে খুঁজে পায়, আত্মদর্শন লাভ করে, আত্মজ্ঞান অর্জন করে, চিরশান্তিতে কায়েম হয়।
কিভাবে ধ্যান করবো? ধ্যান-পদ্ধতি (How to Meditation? Meditation methods)
ধ্যান শুরু করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি হচ্ছে নির্দিষ্ট সময় ও স্থান ঠিক করা। ভোর বা রাতে ঘুমের আগের সময়টা ধ্যানের জন্য সবচেয়ে উত্তম সময়। যে স্থানে ধ্যানে বসবেন সে জায়গাটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরী। ধ্যানে বসার সময় আরামদায়ক স্থানে বসবেন, এবং শরীর আরামে রাখবেন – যাতে দীর্ঘক্ষন বসে থাকা সহজ হয়। দুই একদিন ধ্যান করে বেশ প্রাপ্তিযোগ ঘটবে এমন চিন্তা পরিহার করে ধ্যানে নিয়মিত হবার চেষ্টা করতে হবে। প্রতিদিন ঠিক সময়মতো অল্পক্ষন হলেও ধ্যান চালিয়ে যেতে হবে।
ধ্যান কার্যকর ও সহজ করার ৭ টি উপায় :
১. শ্বাসের ওপর ধ্যান (Breathing Meditation)
শ্বাস বা দম কেন্দ্রিক ধ্যান অত্যন্ত সহজ ও প্রচলিত ধ্যান পদ্ধতি। শ্বাস-প্রশ্বাসের ধ্যান করার জন্য প্রথমে আসনে বসে চোখ বন্ধ করুন। নাক দিয়ে শ্বাস ঢুকছে, বের হচ্ছে – মন দিয়ে এসব লক্ষ্য করুন। যদি আপনার কোনো গুরুমন্ত্র থাকে তাহলে তা জপ করুন। গুরু বরযখ ধ্যান করুন। চিন্তা এলে বিরক্ত হবেন না, মনোসংযোগ বজায় রাখায় চেষ্টা চালিয়ে যান। এভাবে প্রতিদিন করতে থাকুন।
২. নাম বা মন্ত্র ধ্যান (Mantra Meditation)
নামের ধ্যান হল এমন ধ্যান যেখানে গুরুনাম বা প্রভূনাম অবিরাম জপ করতে হয়। আল্লাহ, ওঁ, অথবা যার যার গুরুপ্রদত্ত নামখানি অনবরত জপ করতে হয়। এতে মনের অস্থিরতা কমে যায়, হৃদয় শান্ত হয় এবং ভেতরে আধ্যাত্মিক অনুভূতি তৈরী হয়।
৩. দেহ সচেতনতার ধ্যান (Body Awareness Meditation)
দেহ সচেতনতার ধ্যান দেহের প্রতিটি অংশকে সচেতনতার মধ্যে নিয়ে আসা। এই ধ্যানে দেহের পা থেকে মাথা পর্যন্ত সকল স্থানে মনোযোগ দিতে হয়। এই ধ্যান স্ট্রেস ও উদ্বেগ কমায়।
৪. হৃদয় কেন্দ্রিক ধ্যান (Heart Meditation)
হৃদয়কেন্দ্রিক ধ্যানে হৃদয়ের ওপর জোর দেয়া হয়। হৃদয়ের গতিপ্রকৃতি, হৃদয়ের কামনা বাসনা, চাওয়া পাওয়ার দ্বন্দ্ব ও হৃদয়ের যাবতীয় বিষয়ের ওপর পর্যবেক্ষন করা হয়। বুকের ওপর মনোসংযোগ করা হয় এই ধ্যানে। মনে করা হয় বুক থেকে প্রতি শ্বাসে দেহব্যাপী আলো ছড়িয়ে পড়ছে। এতে এক অনবদ্য আনন্দ লাভ হয়।
৫. মাইন্ডফুলনেস ধ্যান (Mindfulness Meditation)
এই ধ্যানে সকল অতীন ভবিষ্যতের চিন্তা বাদ দিয়ে বর্তমান মুহুর্তে নিজেকে উপলব্ধি করতে হয়। দৈনন্দিন জীবনে এই ধ্যানের গুরুত্ব অনেক। এই ধ্যান আমাদেরকে সময়ানুবর্তী ও সুশৃঙ্খল হতে শেখায়।
৬. প্রশ্নভিত্তিক ধ্যান (Self-Inquiry)
এই স্তরের ধ্যানে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতে হয়। অজানা অস্তিত্বের গভীরতা ও রহস্যাবলী নিয়ে নিজের প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে হয়। নিজেকে প্রশ্ন করুন, আমি কে? আমার চিন্তাগুলো কি আমি? আমি কোথায় ছিলাম, যাবো কোথায়? যে কথা বলছে সে আসলে কে? এই ধরণের প্রশ্ন আপনাকে আপনার অস্তিত্বের নিকটে নিয়ে যাবে।
৭. নীরব ধ্যান (Silent Sitting)
নীরব ধ্যান অনেক উন্নত মানের এক ধ্যান পদ্ধতি। এই ধরনের ধ্যানে আসলে কিছুই করতে হয় না। কিছুই না করে চুপচাপ শুধু বসে থাকতে হয়। না কোনো মন্ত্র, না কোনো না, না কোনো চিন্তা। শুধু বসে থাকা। বসে বসে আপনত্বে ঈশ্বরত্বের অসীম শান্তি শুধু উপভোগ করা। এই নীরব ধ্যানটি আধ্যাত্মিক জাগরণের এক শক্তিশালী উপায়।
শেষ কথা : আজই শুরু করুন ধ্যান
ধ্যান আমাদেরকে মানসিক শান্তি প্রদান করে। মন শান্ত হয়, চিন্তা ধীর ও সিদ্ধান্ত পরিষ্কার হয়, জীবনের অর্থ স্পষ্ট হয়। ধ্যান জীবনকে বদলে দেয়। জীবনের উন্নত আকাঙ্খা তৈরী হয়, সৃজনশীলতা ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়। প্রথম ৭ দিনেই ধ্যানের হালকা শান্তি এবং ২১ দিনে পূর্ণ শান্তির অবস্থা তৈরী হয়। ৪০ দিনের ধ্যানে মনের সম্পূর্ণ জাগরণ এবং ৯০ দিন বা ১২০ দিনের ধ্যানে মানুষ সম্পূর্ণ বদলে যায়। তার মধ্যে আধ্যাত্মিক শক্তি কাজ করে। আত্মা জাগ্রত হয়, অহংকার ভেঙ্গে যায়, সত্য উপলব্ধ হয়। জীবন ও জগতের সকল রহস্য পরিষ্কার হয়। জগতের সকল ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পুরুষ এই ধ্যানের মাধ্যমেই মহান হয়েছেন।
আপন খবর ডেস্ক.

