আধ্যাত্মিকতা কি? আপন খবর ডেস্ক
ভূমিকা : মানুষ, আত্মা ও অনন্তের ডাক
মানুষ কেবল রক্তে মাংসে গড়া এক জৈবিক দেহ নয়। এই মানুষের ভেতরে আছে এমন এক রহস্যময় সত্ত্বা, যা এসেছে অনন্ত নূরের জগত থেকে। সে সত্ত্বাটিই মূলত প্রশ্ন করে, হাসে, কাঁদে বা ভালোবাসে। সে সত্ত্বাটিই সত্যকে খোঁজে এবং অনন্তের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মানুষের মনে চিরায়ত কাল থেকে এখন অব্দি ঘুরে বেড়াচ্ছে চরমতম অমীমাংসীত কিছু দার্শনিক প্রশ্ন। কে আমি? কেন আমি এখানে? যাবো কোথায়? জগতের এই হাসি-কান্নার আসল মানেটা কি? কে করছে এসব? কেন আমি মারা যাবো? মারা যাবার পর আমার কি হবে? – এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই জন্ম নিয়েছে মানুষের নানারকমের জীবন দর্শন, দেশে দেশে তৈরী হয়েছে নানান ধর্ম। কিন্তু মানুষ তার অসীম তৃষ্ণাকে কেবল বাড়িয়েই তুলেছে। যুগ যুগ সঞ্চিত এসব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর আসলে সে পায়নি। না ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা এসব প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পেরেছে, না দর্শনের মারপ্যাঁচ। মানুষ তাই ঠাঁই নিয়েছে আধ্যাত্মিকতার কোলে। আধ্যাত্মিকতা মানুষের এসব রহস্যের জটাজাল খুলে দিয়েছে।
আধ্যাত্মিকতা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মাচার বা গোষ্ঠীর নাম নয়। আধ্যাত্মিকতা হলো আত্মর বিজ্ঞান, হৃদয়ের দর্শন ও মানুষের ভেতরে লুকানো চিরকালের অসীম সত্য ও সুন্দর কে আবিষ্কার করবার তথা জাগ্রত করবার অসীম প্রয়াসের নাম। আধ্যাত্মিকতা এক দীর্ঘ সাধনার নাম। একজন কৃষক যেভাবে মাটি চষে চষে বীজ বপন করে, ঠিক তেমনি একজন আধ্যাত্মিক সাধক আপন অন্তরভূমিকে চাষ করে প্রভুর নামের বীজ বপন করে। একসম সাধকের হৃদয় মন্দিরে জাগ্রত হয়ে ওঠে প্রভূ, তখন মানুষটিও পরিণত হয় পূর্ণ মানুষে। এভাবেই মূলত ঘটে আধ্যাত্মিক জাগরণ।
আধ্যাত্মিকতা কি? একটি দার্শনিক ও মানবিক সংজ্ঞা
এক কথায় আধ্যাত্মিকতা মানে আত্মকে জানা। আর আত্মাকে জানা মানেই হলো আপন অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করা। নিজেকে জানার পূর্বশর্ত হলো নিজেকে চেনা। তাই সুফি সাধকগণ বলে থাকেন, যে নিজেকে নফছকে, সে চিনেছে রবকে। এই চেনা কোনো তথ্যগত জ্ঞান নয়, এটি একটি অস্তিত্বগত উপলব্ধি। এই উপলব্ধির ফলে ধীরে ধীরে মানুষের মন মগজ থেকে স্বনির্মিত ক্ষণিকের পরিচয়গুলো মুছে যায়। সব পরিচয় তথা পর্দা উন্মোচিত হয়ে যাবার পরে অস্তিত্বের গভীরে পড়ে থাকে নিরেট সত্য, আসল সত্ত্বা, ও হাকিকত। সে হাকিকত কে লাভ করাই আধ্যাত্মিকতার মূল উদ্দেশ্য।
আধ্যাত্মিক সাধক কখনো দুনিয়া ত্যাগ করে না, বরং দুনিয়ার মাঝেই সে দুনিয়াকে অতিক্রম করে। সে জানে, সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ীত্বের মাঝেই লুকানো আছে চিরস্থায়ীত্বের বীজ। সসীমের মাঝেই বিরাজ করে অসীম সত্ত্বা। মানুষের ভঙ্গুর দেহ আয়নার মাঝে প্রস্ফুটিত হয় সে মহান ছবি। মানবীয় মোহনাতেই ধরা সে অধর মহাপ্রভূ।
ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা
ধর্ম হলো কাঠামো, আধ্যাত্মিকতা হলো তার প্রাণ। শুধু ধর্মাচারে আবদ্ধ ব্যক্তিটির আত্মা শুষ্ক, মন বস্তবাদী বিমারে আক্রান্ত ও তার সকল ধর্ম পালন নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত। আর আধ্যাত্মিক আত্মাটি সেখানে ধর্মের অমীয় বারি সিঞ্চনে সদাসিক্ত, প্রেমপূর্ণ ও রহস্যাবৃত।
আত্মা, নফস ও আধ্যাত্মিক সংগ্রাম
সুফি দর্শন তথা আধ্যাত্মিকতা মানুষকে ভেতর থেকে অবমুক্ত করে, জাগ্রতে করে। রবের আদেশ রূপ রুহ কে উন্নত ও সক্রিয় করে, বিকশিত করে। নফসের পর্দাবৃত অস্তিত্বকে পরিশুদ্ধ করে। আম্মারা, লাওয়ামা, মুলহেমো অতিক্রম করে মানুষটিকে প্রশান্ত করে। চির শান্তিতে স্থিত করে।
ওলী আউলিয়াদের দৃষ্টিতে আধ্যাত্মিক পথ
আপন অস্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে যিনি নিজেকে প্রভূর মহিমান্বিত অস্তিত্বের ভেতর সমর্পন করে প্রভূময় হয়ে প্রভূতে কায়েম আছেন তিনিই অলী। তিনিই প্রভূগুণে গুণান্বিত ও প্রভূর পরিচয়ের বাহক। প্রভূর সকল গুণ এই অলী মাধ্যমে ক্রিয়াশীল হয়। একজন ওলী কখনো অলৌকিকতার প্রদর্শন কয়, বরং তিনি হৃদয়ের কারিগর, যিনি পতিত মানুষকে পথ দেখানোর ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন।
আধ্যাত্মিক জাগরণ কি? আধ্যাত্মিকতা কি?
আধ্যাত্মিক জাগরণ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি মানবীয় অন্তকরণে ধীরে ধীরে জন্ম নেয়া এক গভীর সচেতনতা। মানুষ যখন উপলব্ধি করে – আমি আমার চিন্তা নই, আমার উপলব্ধি নই – আমি সেই চেতনা ও সত্ত্বা, যে জগতের সকল চিন্তা ও অনুভূতিকে প্রত্যক্ষ করে। এটাই মূল জাগরণ। এ জাগরণ মানুষকে ওলীতে পরিণত করে। তখন মানুষের অহংকার ও আত্মপ্রশংসা কমে যায়, তখন সে ক্ষমা করতে শেখে, একাকীত্বে তখন সে শান্তি অনুভব করে, দুনিয়ার মোহ থেকে তখন সে মুক্ত হয়, এবং হৃদয়ে প্রভূর স্মরণ জারী হয়ে হৃদয় এক ঐশী আনন্দে ভরপুর হয়ে যায়।
আধ্যাত্মিক জাগরণের উপায়
আত্মপর্যবেক্ষন (মুহাসাবা) : আত্মতেই পরমাত্মা। তাই আত্মপর্যবেক্ষনেই পরমের খবর পাওয়া যায়।
জিকির ও ধ্যান : হৃদয়ের গভীরে প্রভূর উপস্থিতি ধরে রাখার নামই জিকির। আর ধ্যান হলো সচেতন উপস্থিতি।
নীরবতা ও একাকীত্ব : নীরবতা হলো প্রভূর ভাষা। আমরা যখন নীরব হই, তখন আমাদের ভেতর থেকে প্রভূ কথা বলে ওঠেন। আমাদের শব্দ থামলে তবেই তিনি বলে উঠেন, কুন।
ওলীদের সান্নিধ্য (সোহবত) : এ পথে ওলী মুর্শিদের অনুসরণ ব্যতীত পথ চলার কোনো ব্যাবস্থা নেই।
আধ্যাত্মিকতা – এক অনন্ত যাত্রা
আধ্যাত্মিকতা এক অনন্ত যাত্রা, যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙ্গেচুরে নতুন করে নির্মাণ করি। কারণ, আমাদের ভেতরেই সেই, যাকে আমরা খুঁজি। পথ কঠিন, কিন্তু মুক্তি একমাত্র এ পথেই।

