আপন ফাউন্ডেশন

Date:

ইশক ও সুফিবাদ : আল্লাহর প্রতি বান্দার অনন্ত প্রেমের রহস্যাবলী

ফেসবুক পেজ
ইউটিউব চ্যানেল
হোয়াটসএপ গ্রুপ
টেলিগ্রাম গ্রুপ

সুফিবাদের প্রাণকেন্দ্র হলো ইশক (Ishq)—অতল, নিখাদ এবং চিরন্তন প্রেম, যা আল্লাহর প্রতি এক আত্মিক আকর্ষণ সৃষ্টি করে। এই প্রেম কেবল অনুভূতির বিষয় নয়; এটি একটি অভিযাত্রা, যেখানে মানুষের হৃদয় ক্রমে অহম, কামনা এবং সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে গিয়ে চিরন্তন শাশ্বত প্রেমের স্রোতে মিলিয়ে যায়।

ইসলামের আধ্যাত্মিক শাখা সুফিবাদে প্রেম বা ইশককে বলা হয় দিব্য শক্তি। এটি একদিকে মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, অন্যদিকে সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যে সম্পর্ককে দৃঢ় করে।

ইশক কী? সুফি দৃষ্টিতে ইশক মানে হলো এমন এক প্রেম, যা ব্যাকুলতা ও ত্যাগে ভরপুর। এটি তিনটি স্তরে প্রকাশ পায়—
১. প্রারম্ভিক প্রেম (Love of Yearning) – আল্লাহর প্রতি আকুল আকাঙ্ক্ষা।
২. আত্মিক প্রেম (Love of Surrender) – নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর প্রেমে আত্মসমর্পণ।
৩. চূড়ান্ত প্রেম (Union of Ishq) – যেখানে প্রেমিক ও প্রিয় এক হয়ে যায়; আর কোনো বিভাজন থাকে না।

রুমি বলেছেন, “Love is the bridge between you and everything.” অর্থাৎ প্রেমই সেই সেতু, যা মানুষকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়। সুফি সাধকরা বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর সবকিছুই প্রেমের মাধ্যম। ফুলের সৌরভ, শিশিরের স্নিগ্ধতা, আকাশের নীরবতা—সবই প্রেমের প্রতিফলন। রাবিয়া বসরি বলেন: “আমি আল্লাহকে জান্নাতের জন্য ভালোবাসি না, নরকভয়ের জন্যও নয়; আমি তাঁকে ভালোবাসি কারণ তিনি প্রেমের যোগ্য।” সুফি দৃষ্টিতে, প্রেম ছাড়া ধর্ম কেবল বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। ইশক সেই আনুষ্ঠানিকতাকে প্রাণ দেয়।

সুফি ঐতিহ্যে প্রেম বা ইশকের ধাপগুলো খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:

১. ইরাদা (Iradah) – আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করার ইচ্ছা।
২. ওয়ালা (Wala’a) – অন্তরে গভীর আকুলতা জন্মানো।
৩. শাগাফ (Shagaf) – হৃদয়ে প্রেমের বীজ স্থায়ী হওয়া।
৪. হাওয়া (Hawa) – দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে অন্তরে স্রষ্টার প্রেম বাড়ানো।
৫. ইশক (Ishq) – প্রেমের এমন স্তর যেখানে প্রেমিক ও প্রিয় আলাদা থাকে না।

এই ধাপ পেরিয়ে সাধক আত্মবিসর্জন (Fanaa)-এ পৌঁছে যান, যেখানে তাঁর নিজের সত্তা আল্লাহর প্রেমে বিলীন হয়ে যায়। সুফি দর্শনে প্রেমের প্রথম শর্ত হলো অহং বা “আমি” কে বিলোপ করা। প্রেমিক যখন নিজের সব দাবি ছেড়ে দিয়ে শুধু আল্লাহকে চায়, তখন সে ফানা-তে পৌঁছে। প্রেমের চূড়ান্ত স্তরে সাধক তাঁর হৃদয়ে আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করেন। রুমি বলেছিলেন: “Close your eyes. Fall in love. Stay there.” সুফি প্রেম মানুষকে করে তোলে নরম, সহনশীল ও করুণাময়। অহংকার ও লোভ ধীরে ধীরে দূর হয়। মানুষের প্রতি সহানুভূতি জন্মায়। ভালোবাসা হয়ে ওঠে নৈতিকতার মূল। হাফিজ বলেন, “Even after all this time, the Sun never says to the Earth, ‘You owe me.’ Look what happens with a love like that—it lights the whole sky.”

যিকির – নিরন্তর আল্লাহর নাম স্মরণ।
সামা – সঙ্গীত ও কণ্ঠে ঈশ্বর প্রেমের প্রকাশ।
খলওয়া – নির্জনে ধ্যান ও অন্তর্মুখী যাত্রা।
সেবা – মানুষের প্রতি প্রেম ও দয়া প্রদর্শন।

সৃষ্টির প্রতি প্রেম: ইশকের ফল যে হৃদয় আল্লাহর প্রেমে ভরে ওঠে, সে আর কাউকে ঘৃণা করতে পারে না। তার প্রেম প্রবাহিত হয়— মানুষের প্রতি দয়া, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, নিঃস্বার্থ সেবা, এটাই সুফিবাদের মূল শিক্ষা—প্রেমে একতা। ইশক ও সুফিবাদ কেবল একটি আধ্যাত্মিক পথ নয়; এটি হৃদয়ের সম্পূর্ণ রূপান্তর। এখানে প্রেম হলো শিখা, যা অহংকার ও দুনিয়ার মোহ জ্বালিয়ে দেয়, আর রেখে যায় শুধুই আল্লাহর আলো। রুমি যেমন বলেছেন: “Love is the whole thing. We are only pieces.” ইশকই সেই শক্তি, যা মানুষকে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিয়ে দেয় এবং সৃষ্টির প্রতি অনন্ত দয়া জাগায়।

সাবস্ক্রাইব করুন
ফেসবুক পেজ
ইউটিউব
ইনস্টাগ্রাম
টুইটার X