লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
সুফির সাধনা অন্তরের সাধনা, অন্তরতমস্তের সাধনা। আপন অস্তিত্বে ঐশী উপলব্ধির সাধনা। এ সাধনায় সুফিকে পাড়ি দিতে হয় প্রভূপ্রেমের এক বিস্তীর্ণ প্রান্তর। পথিক যখন পথ চলতে শুরু করে, তখন সে বুঝতে পারে এ পথটি কেবল জ্ঞানের নয়; পথটি বরং মরমী অভিজ্ঞতার এবং মর্মে মর্মে ঐশ্বরিক অনুভূতিকে অর্জন করে ধারণ করবার পথ। প্রতিনিয়ত নিজেকে ভাঙ্গাগড়ার পথ, ভেতরে ভেতরে ঐশী রূপান্তরের পথ।
হাল (আহওয়াল) – কন্টকসমার্কীর্ণ এ পথটি বড়ই আজব! পথের ক্লান্তি, ভ্রান্তি, ভয়, মোহ সহ সকল প্রতিবন্ধকতা যেমন দৃশ্যমান, তেমনি মুহুর্তে মুহুর্তে ঘটে নব নব আনন্দের বিকীরণ। রক্তাক্ত পদযুগল যখন শ্রান্ত, সামনে ভয়াল অস্পৃহা, তখনি হয়তো খুলে যায় সামনের সুনীল আকাশ! পৃথীবির সব ক্লান্তি যেন মুছে যায় মুহুর্তে, হৃদয় ভরে ওঠে অনন্ত প্রশান্তিতে। পথিক নব উদ্যমে আবার শুরু করে তার পথচলা। কখনো সে অনুভূতি বিদ্যুৎ চমকের মত মুহুর্তে শীতল করে যায় দেহমন, কখনো সে অদ্ভুত আনন্দের ঝিলিক কিয়ৎকাল লেগে থাকে চোখেমুখে, অপার্থিব এ দ্যুতিরচ্ছটা যেন রাঙ্গিয়ে যায় পথিকের সর্ব অস্তিত্ব। হঠাৎ লাভ করা এই ঐশী অনুগ্রহ, যাকে সুফিরা বলে হাল।
মাকাম (মাকামাত) – আবার, পথ চলতে চলতে পথিক বা সালেক একসময় ভূলে যায় তার অতীত, প্রভূপ্রেমের পথে চলার আনন্দে অন্তরজগত থেকে বিদূরিত হয় জাগতিক লোভ, মোহ; অন্তরভুমি নিয়ত সিক্ত হয়ে ওঠে প্রভুর খাস নূরের ঝর্ণাধারায়, সে নূরের স্রোত কভূ আর শুকিয়ে যায় না – অন্তরজগতের সেই চিরস্থায়ী অর্জনকে সুফিরা বলে মাকাম। বহু বছরের ধ্যান, সাধনা, মুজাহাদা, রিয়াজত, কান্না ও নিবেদনের মতন আত্মকর্মে লিপ্ত থাকার ফলশ্রুতিতে ধীরে ধীরে অর্জিত হয় মাকাম। মাকাম সুফির আধ্যাত্মিক স্থিতি।
হাল যেন এক ঐশ্বরিক দ্যূতি, যা মুহুর্তে আলোকিত করে যায় হৃদয়ের সকল কুঠরী। মাকাম হলো ঐশ্বরিক উপস্থিতি যা আর কখনো ম্লান হয় না। হাল হল প্রিয়তমার পত্র, যা তাৎক্ষণিক আবেশে উন্মত্ত করে দেয় হৃদয়; মাকাম হলো প্রিয়তমার দরজা, যেখানে উঁকি দেয়া মাত্রই নয়নপথে ফুটে ওঠে প্রভূর অপার মহিমা। হাল প্রভূর অন্তর থেকে নেমে আসা আকস্মিক আশীর্বাদ, আর মাকাম হলো প্রভুর সাধনায় নিবিষ্ট সাধকের প্রভুপ্রাপ্তি ও স্থায়ীত্বের নিশ্চয়তা।
হাল – অস্থায়ী আত্মানন্দ
হাল ঐশী অনুভূতির তুড়ীয় আনন্দ যা মূলত সালেক/আশেকের অন্তরজগতের ঐশী আশীষধারা রূপে নাযিল হয়। হালের বহুবিধ ধরণ রয়েছে। মন-রাজ্যের সংকোচন-প্রসারণ (কাবজ-বাস্ত), শোকানুভূতি-সুখানুভূতি (বুজন-তারাহ), বিস্ময়-ভালোবাসা (বাবাত-উনস), নেশাগ্রস্ততা-অচেতনতা (মাস্তি-বেখুদি) অথবা তড়িৎ উপলব্ধ অন্তরের অজানা প্রবাহ, যা সর্বাঙ্গে এক অনির্বচনীয় ভাবান্তর ঘটায়। আবার ভাবটি বিলীন হয়ে যায়, দ্রুতই। আশেকের অনুরাগের ওপর ভিত্তি করে হাল কিছু প্রকারের হয়ে থাকে। যেমন, হাল আল মুরাকাবাহ (ধ্যানে নজর রাখা), হাল কোরব (নিকটবর্তীতা), হাল ওয়াজদ (ভাবাবেগ), হাল শুকর (মত্ততা), হাল সাহু (সংযম), হাল উদ্দ (একাত্মতা)। হাল সাধকের অন্তরে অপরিসীম আধ্যাত্মিক আনন্দের উৎস হয়ে থাকে।
মাকাম – অন্তরের ঐশী স্থায়িত্ব
সাধক ঐশী পূর্ণতা প্রাপ্তির পথে পাড়ি জমায় এক দুঃসাহসিক ভ্রমণের পথে। মুর্শিদের প্রদর্শিত পথে। সুলুকের পথে চলতে চলতে সাধকের অন্তর ধীরে ধীরে শুদ্ধ হয়ে ঐশ্বরিক পূর্ণতায় ভরপুর হয়ে যায়। বেশ কিছু স্তর অতিক্রম করে সাধক পৌঁছে যায় প্রভুর খাসমহলে, সেখান থেকে আর বিচ্যূতি ঘটে না। অনন্তকাল সাধক সে সুরসাগরে অবগাহন করে অনন্ত শান্তি সহযোগে। পথে তওবা (অনুশোচনা), ওয়ারা (সতর্কতা), যুহদ (ত্যাগ), ফখর (দারিদ্র), সবর (ধৈর্য), তাওয়াক্কুল (বিশ্বাস), রেদা (সন্তুষ্টি) এর মত স্তরগুলো অতিক্রান্ত হলে সাধকের দেহমন স্বর্গীয় সুষুষ্মায় সমুজ্জল হয়ে ওঠে। সাধক নিশ্চিতে অবস্থান করে সে ঐশী প্রেমের মাকামে।
প্রভুপ্রাপ্তির এ পথ অনন্ত সুন্দরের পথ, সাধনার পথ। এ পথে ক্ষণে ক্ষণে সাধক আত্মত্যাগ ও আত্ম প্রতিষ্ঠার খেলায় লিপ্ত থাকে। এ খেলারই দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হাল (আহওয়াল) ও মাকাম (মাকামাত)। মাওলা আমাদের অন্তরে হালের অসীম সৌন্দর্য নাযিল করুন এবং মাকামে স্থায়ী আবাস দান করুন।
আমীন।
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
রচনাকাল – 10-06/2026

