লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
এই কি যুগের ধারা –
সত্যধর্ম রসাতলে যায়, দেশ আজ
যত সব ভীরু, কাপুরুষে ভরা…
আদিকাল থেকেই বাংলাদেশ ওলী-সাধুদের বিচরণভূমি। এ অঞ্চলের মাটি-বাতাসে মিশে আছে সুফির নিঃশ্বাস, মারেফাতপন্থীর উদার ধর্মচিন্তার উদ্দাম তরঙ্গ। মারফতি গান, ওরশ, মাজার, দরবার, খানকার ঐতিহ্য এ দেশের কোনায় কোনায় বিলিয়েছে সত্যধর্মের কিরণ। জন্ম নিয়েছে অগনিত সাধু, মহাত্মা, ওলী, দরবেশ, গুণী ব্যক্তিবর্গ।
ধর্মের অন্তর্নিহিত সত্য ও সাধনাকে উপজীব্য করে এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অসংখ্য দরবার, যারা দ্বীন ইসলাম তথা মোহাম্মদী ধর্মের প্রকৃত সারসত্যকে অন্তর্বাহ্যে ধারণ করে জিন্দা রেখেছে ধর্মের ফল্গুধারা। তরিকত তথা সুফিতত্ত্বের এ অপূর্ব প্রকাশ সাধিত হয়েছে সেসব সাধু-ফকির-পীর-ওলী-মহাত্মাদের দ্বারা যারা সত্য প্রকাশে ছিলেন সাহসী, দৃঢ়চেতা ও তেজস্বী। তাদের ত্যাগী আত্মা ছিল অনন্য শক্তিধর, মুহাম্মদী নূরের কিরণে দীপ্তিমান। তাদের ব্যক্তিত্ব ও সত্যচেতনার কাছে মাথা নত করেছিল অগনিত মানুষ।
আজো জগতে তাদের অপূর্ব নূরের বিকিরণ লক্ষ্য করা যায়।
কিন্তু, আশাহত হতে হয় তখন, যখন এ প্রজন্মকে দেখি ভীরুতায় ভরা! আত্মশক্তির স্থলে দেখি আত্মপ্রবঞ্চনার ঢল! আত্মতেজস্বীতার বদলে দেখি ছলপরায়নতা ও পলায়ণ-উন্মুখ মনোভাব! ধর্ম যদি আমাদেরকে তেজস্বী না করে, সাহসী না করে, সে ধর্ম কি করে ধর্ম হয়? আমার আত্মদর্শন যদি আমাকে ভীরুতায় আবদ্ধ করে সে দর্শনে আমার কি অর্জন হবে? এমন রূপে নিজের ধর্মকে অপমান করা নিশ্চয়ই কোনো জ্ঞানীর কাজ নয়।
সাম্প্রতিক সময়ের দুটো ঘটনাকে ব্যখ্যা করতে চাই৷
১.
আমরা দেখেছি, গোটাকতক ওহাবী-ধর্মান্ধের চাপের মুখে আমিনুর শাহকে তওবা পড়তে অর্থাৎ সত্যকে বিসর্জন দিয়ে অসত্যের কাছে মাথা নত করতে! কি ভীরুতা! কতবড় আত্মপ্রবঞ্চনা!
রসুলে খোদা (স) এর পবিত্র দেহ মোবারক দাফনে কেনো প্রায় ৩ দিন বিলম্ব হয়েছিল, সেটা জানতে চাওয়া কি অন্যায়? অবশ্য দেশ যদি হয় যাযাবর জাহেলিয়াতের, সেখানে অন্যায় হতেও পারে! কাদের জন্য ৩ দিন দেরী হল, কেনো দেরী হলো এসব জানতে চাওয়া নবীপ্রেমেরই অংশ৷ রসুল (স) মনোনিত উত্তরাধিকার কেনো পরিত্যক্ত হলো, মাওলাইয়াত কেনো ব্যার্থতায় পর্যবসিত হলো, স্বয়ং মাওলা কেনো নির্যাতিত-নিগৃহীত হলো, সেটা জানতে চাওয়া অবশ্যই নবীপ্রেমের অংশ৷ কারা কারা রসুল (স) এর দাফনে ছিলেন আর কারা ছিলেন না, এটা জানতে চাওয়া নবীপ্রেমেরই অংশ৷
আমরা সেই প্রশ্নকারীর মধ্যে নবীপ্রেমের তেজস্বীতা দেখিনি, বরং আত্মপ্রবঞ্চনা দেখেছি। চোহারায় নবীপ্রেমের বলিষ্ঠতা দেখিনি, বরং ছলচাতুরী ও ভীরুতা দেখেছি। ছি! নবীপ্রেমকে মিথ্যার কাছে মাথা নত করতে দেখেছি।
ধর্মান্ধরা আমিনুর শাহ উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর জবাব দেয়নি। দিবেও না। তাদের কাজই হিংস্রতা, পাশবিকতা প্রদর্শন। সেখানে নবীপ্রেমের দৃষ্টান্ত হতে পারত আমিনুর শাহ। রসুলে খোদা (স) এর প্রেমকে অন্তরে ধারণ করে উচ্চ শীরে বলতে পারত, আমি আমার প্রশ্নের উত্তর চাই। রসুলের প্রেমে জীবন দিতে হলেও আমি প্রস্তুত।
সে দৃঢ়তা আমরা দেখিনি। আমরা তাকে কৌশলের আশ্রয় নিতে দেখেছি। সে কৌশলও তাকে রক্ষা করতে পারেনি! রাজ সরকারের বিচারহীন দন্ড তার ওপর ঠিকই পড়েছে।
২.
গুজুরী দরবারের শাহিন শাহকে মিথ্যা বলতে দেখেছি। তিনি তার দরবারকে দ্বিতীয় মদিনা শরীফ বলাতে সাংবাদিক/প্রশ্নকারীদের চাপে তিনি মিথ্যা বলেছেন। প্রিন্ট মিসটেক বলেছেন। আর লিখবেন না বলেছেন।
ধর্মের অন্তরভূমে অবস্থিত হাকিকত জ্ঞান তো এটাই বলে, জগতের সকল সত্যনিষ্ঠ পূতঃ ব্যক্তিগণ মোহাম্মদী সত্ত্বায় স্থিত। সকল ভালো মানুষের সঙ্গে আমি আছি – মর্মে রাসুলে খোদা (স) এর স্বীকারোক্তিও রয়েছে। আউয়ালুনা, আখেরুনা, আওসাতুনা, কুললানা বলে রাসুলে খোদা (স) এর বাণী রয়েছে। এখানেই খতমে নবুয়তের মাহাত্ম্য লুকানো যা সকল জ্ঞানীগণ জানেন। মুহাম্মদ (স) এর পরে আর নবী হবেন না, বরং তারা সকলে মুহাম্মদী সত্ত্বায় স্থিত মোহাম্মদ (চরমতম প্রশংসিত) হবেন। অর্থাৎ মোহাম্মদী হবেন। এখানেই চিরকালীন তাইয়্যেব কলেমার বাস্তবতা। নূর মোহাম্মদীর অনন্ত লীলাক্ষেত্র এ জগতে সকল জ্ঞানীই মোহাম্মদ, সকল দরবারই মদীনা, সকল খানকাই মসজিদে নববী। এ সত্য অবশ্যই সকল পীর, সাধু, ফকির, ওলীগণ জানেন। আর যে জানেন না তিনি পীর,সাধু, ফকির বা ওলী হতে পারেন না। যিনি মোহাম্মদী সত্ত্বায় স্থিত নন, তিনি পীর নন, হতে পারেন না। যার দরবার মদীনা নয়, তিনি পীর নন, যার খানকা মসজিদে নববী নয়, তিনি পীর নন।
ধর্মান্ধ এ জাতি ধর্মশূণ্য। গোলামীতে অভ্যস্থ। মুয়াবিয়া-এজিদের দেখানো মোল্লাতন্ত্র শূণ্যে খোদা, আর আরবে রাসুল নামক উদ্ভট আনুমানিক ধর্মনেশায় উদগ্র, উন্মত্ত, হিংস্র। চিরকালীন শাশ্বত ধর্ম এ জাতির বোধগম্য নয়৷ যুক্তির বদলে শক্তিতে দিশাহারা জাতি। তাদের কাজই হলো জ্ঞানীদের হত্যা করা, মাজার থেকে লাশ তুলে পোড়ানো, মাজার লুটতরাজ। অধর্ম এদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
টঙ্গী ইজতেমাকে কেউ ২য় হজ্ব বললে কারো প্রশ্ন থাকবে না, বলাৎকার যখন মহামারী পর্যায়ে, তখনো এদের কোনো মাথাব্যাথা নেই, ইমাম সাহেবগণ ধর্ষণ, বলাৎকার, মাদক পাচার করলে কোনো প্রতিবাদ নাই, এ জাতি আছে সুফিদের নিয়ে। মাজার ভাঙা নিয়ে, ওরশ বন্ধ করা নিয়ে, পীর সাহেবদের মুখ বন্ধ করা নিয়ে! আজব এ দেশ! আজব এ দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা!
আমরা আছি ভয়ে তটস্থ হয়ে! কেমন পীর আপনি? দুজন সাংবাদিকের প্রশ্নে আপনার দরবারী জ্ঞান অবলুপ্ত হলো! বুকে হাত রেখে বলতে পারলেন না “আমিই মোহাম্মদ”।
দেশে দরবার তৈরী হচ্ছে প্রচুর, পীর তৈরী হচ্ছে প্রচুর, সাধু তৈরী হচ্ছে প্রচুর। সাদা পোষাক, পাগড়ী, কি বেশ! মুখে নবীপ্রেম, অন্তরে ভয়! মুখে মদীনা শরীফ, অন্তরে ভয়!
ভয় আর নবীপ্রেম একপাত্রে থাকে কি করে?
সত্যধর্ম আর ভয় একপাত্রে থাকে কি করে?
আপনারা প্রেমিক নন, সত্য ধার্মিক নন। আপনারা ধার্মিক সেজেছেন। যখন ভয় এসেছে, আপনাদের ধর্ম পালিয়েছে। আপনারা কপট। মনসুর হাল্লাজের দৃঢ়তা আপনাদের নেই। সারমাদের অটলতা আপনাদের নেই, আইনুল কুজাতের সত্যবোধ আপনাদের নেই, শিহাবুদ্দিন সুহরাওয়ার্দীর সাহস আপনাদের নেই। সত্য আপনাদের অন্তরে নেই, পোষাকে। আপনাদের ধর্ম আপনাদের অন্তরে সাহসের জন্ম দেয়নি। আপনাদের ধর্ম নেই।
আজ এ সংকটকালে লক্ষ মুরিদানের দরবার বা বড় বড় পীর দরকার নেই, গরু মহিষ উট জবাইয়ের মহরত (ওরশ) দরকার নেই, গালভরা বস্তাপচা তত্ত্বতালিম আর ধর্মবুলির উচ্চ – ওয়াজ/আওয়াজের দরকার নেই, দরকার যুগের কিছু সাহসী সন্তানের। যারা বুক ফুলিয়ে সত্য বলবে, মাথা উঁচিয়ে দাড়িয়ে সত্য বলবে। মোল্লার মুখের ওপর সত্য বলবে। জীবন বিপন্ন করে সত্য বলবে, ফাঁসিকাষ্ঠে দাড়িয়ে হাসিমুখে সত্য বলবে।
আজ কৌশল দরকার নেই, অবিচলতা দরকার, অটলতা দরকার, সাহস দরকার, শৌর্য দরকার, তেজস্বীতা দরকার৷ এ তেজস্বীতা আসে সঠিক ধর্মজ্ঞান ও সাধনা থেকে৷ আজ সাধনা দরকার।
আহ্বান করি সে সত্য সাধকদেরকে, আজ সময় সত্য বলার। আসুন, সত্য বলে মনসুর-সারমাদ-আইনুলকুজাত-শিহাবুদ্দিনের সাথে এক মঞ্চে দাড়াই। ধর্ম মুক্তি পাক, সত্যের জয় হোক।
জয়গুরু।
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
সম্পাদক – আপন খবর পত্রিকা
পরিচালক – আপন ফাউন্ডেশন

