আপন ফাউন্ডেশন

ইমাম জাফর সাদিক (র) এর শিক্ষনীয় ঘটনা ও বাণী

Date:

Share post:

লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী

নবী করীম (সা) এর পরিবারের অন্তর্ভূক্ত মহান আউলিয়া ইমাম জাফর সাদিক (র)। প্রজ্ঞা, ইলমে মারেফতে অপার পারদর্শীতা, চারিত্রিক মধূরতা তাঁকে যুগশ্রেষ্ঠ অলীর আসনে সমাসীন করেছিল। তিনি ছিলেন তাঁর যুগের ইমাম। দীর্ঘকাল তিনি মুসলিম জাহানকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার তাঁর সমগ্র জীবনটাই ছিল চরম শুদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। দ্বীনে মোহাম্মদীর ঝান্ডাবাহক হওয়ায় সারাজীবন তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে ধর্মবিরোধী রাজশক্তিকে।

ইমাম জাফর সাদিক (র) এর ঘটনাবহুল জীবনের উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরছি।

ইমাম জাফর সাদিক (র) এর আধ্যাত্মিকতা

মুসলিম জাহানের খলিফা মনছুর বিল্লাহ। সে সময়টাতে চারিদিকে ইমাম জাফর সাদিক (র) এর জয়জয়কার। লোকমুখে শুধু ইমামের প্রশংসা। খ্যাতি, জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তখন ইমাম জাফর সাদিক (র)। লোকজনের অঢেল ভক্তি, সম্মান ও বিশ্বাস পাচ্ছেন তিনি। শঙ্কিত হয়ে পড়লেন খলিফা। খলিফার মনে জ্বলে উঠল হিংসার অনল। যদি নবী বংশীয় ইমাম, দিব্যজ্ঞানী জাফর সাদিক তার সিংহাসনের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়? ইমাম কে হত্যা করতে মনস্থির করলেন খলিফা।

মন্ত্রীকে আদেশ দিলেন ইমাম জাফর সাদিক (র) কে রাজদরবারে নিয়ে আসা হোক। তিনি তাঁকে হত্যা করবেন। চমকে উঠলেন মন্ত্রী! একি কথা! ইমাম কে হত্যা! আত্মমগ্ন একজন সাধক, যিনি নির্জনে ধ্যান সাধনায় মগ্ন, আল্লাহপ্রেমে বিভোর, তাকে হত্যা! খলিফা অনঢ়। বাস্তবায়িত হলো খলিফার আদেশ। জল্লাদকে বলে রাখলেন, ইমাম রাজদরবারে এলে যখন আমি মাথার টুপি তুলে রাখবো তখনই তুমি তাঁকে হত্যা করবে।

রাজাজ্ঞায় দরবারে আসতে হলো ইমামকে। ইমাম জাফর সাদিক (র) প্রবেশ করলেন দরবারে। ধ্যানমগ্ন মৌন তাপস। ধীর পদে এগিয়ে এলেন রাজসিংহাসনের নিকট।

কেঁপে উঠলো খলিফার অন্তরাত্মা। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তিনি সিংহাসন ছেড়ে এগিয়ে গেলেন ইমামের নিকট। বিনয়ের সঙ্গে সসম্মানে অভ্যর্থনা জানিয়ে সিংহাসনে এনে বসালেন। নিজে বসে পড়লেন মহাতাপসের পায়ের তলায়। বিনয়ের সাথে জিজ্ঞাসা করলেন, “বলুন, আপনার কি প্রয়োজন?” ইমাম জাফর সাদিক (র) উত্তর দিলেন, “কিছুই প্রয়োজন নেই আমার, শুধু এভাবে তলব করে আমার প্রার্থনায় বিঘ্ন ঘটাবেন না।”

বিদায় গ্রহন করলেন ইমাম জাফর সাদিক (র)। অচৈতন্য হয়ে পড়লেন খলিফা। সংজ্ঞা ফিরে পেলে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বর্ণনা করলেন ঘটে যাওয়া ঘটনার রহস্য। বললেন, যখন ইমাম জাফর সাদিক রাজদরবারে প্রবেশ করলেন, আমি দেখলাম তার উভয় পার্শ্বে ভয়ানক দুটি বাঘ প্রবল প্রতাপে তেড়ে আসছে। আর আমাকে শাসাচ্ছে, যদি আমি ইমামের কোনো ক্ষতি করি তাহলে আমাকে খেয়ে ফেলবে। সে ভয়েই আমি অচেতন হয়ে পড়ি।

বিখ্যাত সাধক দাউদ তায়ী (র) কে প্রদত্ত উপদেশ

একবার বিখ্যাত অলী দাউদ তায়ী (র) এলেন ইমাম জাফর সাদিক (র) এর নিকট। প্রার্থনা করলেন কিছু উপদেশ। ইমাম বললেন, “শেষ বিচারের দিন যদি রাসুল (সা) প্রশ্ন করেন, কেনো তুমি আমার তাবেদারী করলে না, আমি কি উত্তর দিবো? সে ভয়েই আমি তটস্থ।” মনে রাখবেন, বংশ দিয়ে কিছু হয় না। আপনার সাধনাই আপনাকে মুক্তির পথ দেখাবে।”

কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা

– ইমাম জাফর সাদিক একবার খুব দামী পোষাক পড়ে আছেন। এক লোক অভিযোগ তুললেন, আপনার পক্ষে এমন পোষাক বেমানান। ইমাম জাফর সাদিক ঐ লোকটির হাত টেনে জামার ভেতর দেখালেন। সেখানে পুরু আর খসখসে পোষাক। ইমাম জাফর সাদিক (র) বললেন, “আমার একটি জামা আটপৌরে, লোকের মাঝে চলাচলের জন্য, অন্যটি আল্লাহর দরবারে দাসত্বের জন্য।”

– একবার ইমাম আবু হানিফার সাথে সাক্ষাৎ হলো ইমাম জাফর সাদিক (র) এর। ইমাম জাফর সাদিক আবু হানিফা কে প্রশ্ন করলেন, “বলুন তো জ্ঞানীর সংজ্ঞা কি?”ইমাম আবু হানিফা বললেন, “যিনি ভালো ও মন্দের বিচার জানেন, তিনিই জ্ঞানী।” ইমাম জাফর সাদিক (র) বললেন, “ভালো মন্দের বিচার তো পশুও জানে। বরং জ্ঞানী তো তিনিই যিনি দুটো ভালোর মধ্য হতে বেশি ভালোটিকে গ্রহন করেন, আর দুটো মন্দের মধ্য হতে বেশি মন্দটিকে বর্জন করেন।”

একবার ইমাম জাফর সাদিক (র) এর সঙ্গের এক লোকের একটি টাকার থলে হারিয়ে যায়। লোকটি ইমাম জাফর সাদিক (র) সন্দেহ করেন এবং দাবী করেন যে ইমাম জাফর সাদিক (র) সেটি নিয়েছেন। ইমাম জাফর সাদিক কোনো প্রতিবাদ না করে হারিয়ে যাওয়া যত টাকা হারিয়েছে ততগুলো টাকা বাড়ি থেকে এনে লোকটিকে দিয়ে দেন। ইতোমধ্যে লোকটি হারিয়ে যাওয়া টাকার থলে টা পেয়ে যান। সে প্রচন্ড লজ্জিত আর অনুতপ্ত হয়ে টাকা ফেরত দিতে আসেন। কিন্তু ইমাম জাফর সাদিক (র) সে টাকা আর ফেরত নিলেন না ।

ইমাম জাফর সাদিক (র) এর মূল্যবান কিছু উপদেশ

– যে লোক বলে আল্লাহ অমুক বস্তুর মধ্যে রয়েছেন বা ঐ বস্তু থেকে তিনি সৃষ্টি, তাহলে সে কুফরী করলো।

– যে পাপ কাজ করে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়, সে প্রভূর অনুগত দের অন্তর্ভূক্ত হয়।

– আল্লাহর যিকিরের অর্থ হলো, তাঁকে স্বরণ করতে যেয়ে সে ব্যাতিত অন্য সকল কিছু কে একদম ভুলে যাওয়া।

– জান্নাত ও জাহান্নামের ব্যাঞ্জনা রয়েছে পার্থিব জীবনেই। মানুষে সুখ ও শান্তি হলো জান্নাতের রুপ আর দুঃখ যন্ত্রনাই হলো জাহান্নামের রূপ।

– যিনি তার সর্বস্ব আল্লাহর কাছে অর্পন করেন, একমাত্র তিনিই জান্নাতের অধিকারী। আর যে প্রবৃত্তির হাতের ক্রীড়ানক, জাহান্নামই তার চিরস্থায়ী বাসস্থান।

রচনাকাল – 14/12/2020
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

Related articles