আপন ফাউন্ডেশন

১৪ – শানে আহলে বাইয়্যেত

Date:

Share post:

লেখক – হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

আসমানী কালাম আরবী ভাষা আর মহানবীর (আরব জাতির) ভাষাকে বলে আরবী ভাষা – এ দু‘য়ের প্রভেদ অভেদ জানা দরকার। কারণ, অন্যান্য ভাষায়ও আল্লাহর কালাম নাযিল হয়েছে; কিন্তু সব ভাষার মূলে আরবী ভাষা – মানুষের বাকশক্তিতে এসে হয়েছে যার যার ভাষা। ঘটনাক্রমে রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের দেশ সৌদি আরব বিধায় তাঁর ভাষা আরবী আর আল্লাহর ভাষা আরবী একই নামে পরিচিত হলেও দুই ভাষার মধ্যে আসমান – জমিন প্রভেদ রয়েছে। একটি শাশ্বত কালের / কদিম ভাষা; অপরটি ধ্বংসশীল ভাষা। একটি আপেক্ষিক সত্য অপরটি চিরসত্য, দুই ভাষার সম্মিলন হয়েছে সত্য মানুষ মুহাম্মদের মধ্যে এসে। একটি মানব রচিত, অপরটি খোদার নূরের অক্ষরাতীত ভাষা।

জানা দরকার ঐ কিতাব সত্য – গুপ্ত গ্রন্থ (কিতাবুন মাকনুন – সুরা জারিয়াত)। আলিফ – লাম – মীম। জালিকাল কিতাব তথা ঐ কিতাব সত্য। ঐ কিতাব কি ? ঐ কিতাব হলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম। এ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামই হলেন “লা রাইবা ফি” এবং “হুদাল্লিল মুত্তাকিন”- ইহাই কালামের মূল বক্তব্য এবং উদ্দেশ্য। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামকে ১০০% সত্য না জানলে আল্লাহর কালামকে সত্য বলে জানা হলো না, মানা হলো না। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের জবান আল্লাহরই জবান (সুরা নজম-৩), মুহাম্মদের হাত আল্লাহরই হাত (সুরা ফাত্তাহ-১০), মুহাম্মদের চোখ আল্লাহর চোখ, হযরত মুহাম্মদ কে ভালোবাসলে আল্লাহ কে ভালোবাসা হয় এবং জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায় (সুরা ইমরান-৩১), মুহাম্মদ এর কানই আল্লাহর কান তথা মুহাম্মদের কর্মই আল্লাহর কর্ম তথা আল্লাহর ফেল। মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের মাধ্যমে ক্রিয়াশীল হচ্ছে। (সুরা আন ফাল-১৭)।

মুহাম্মদী গৃহের ভিত্তি হলো আহলে বাইয়্যেত – যার মাধ্যমে আল্লাহর নূর ক্রিয়াশীল হচ্ছে। ঐ নূরের প্রতীক দুনিয়ার মানুষ আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন আলাইহিমুস্ সালাম – যাদের মাধ্যমে আসমানী গুণ/আল্লাহর কালাম নাযিল/উদয় হচ্ছে। কিন্তু মুহাম্মদকে আল্লাহ বলা যায় না, আল্লাহকেও মুহাম্মদ বলা যায় না – কিন্তু আল্লাহ – মুহাম্মদ এক নূর। তারপরও এ দু’য়ের প্রভেদ অভেদের গোপন রহস্যটি গুরুর নিকট জেনে নেওয়াই ভালো। তাই বলা হচ্ছে, “ইন্নাহু লা কাওলু রাছুলিন কারিম।” অর্থাৎ নিশ্চয়ই ইহা সম্মানিত রাছুলের কালাম। সুতরাং “ওয়ামা আরসালনাকা লিল্নাছে রাছুলান ওয়া কাফা বিল্লাহি সাহিদান মাইয়িতির রাছুলা ফাকাদ আতাল্লাহ (সুরা নেছা-৭৯-৮০)।” অর্থাৎ এবং তোমাকে মানুষদের নিকট পাঠিয়েছি রাছুলরূপে। আল্লাহই যথেষ্ট সাক্ষী। যে রাছুলের আনুগত্য করছে সেতো আল্লাহরই আনুগত্য করছে।

কোরানে রাছুলের আনুগত্যকেই আল্লাহর আনুগত্য বলে তুলে ধরা হয়েছে এবং আল্লাহর কালাম আর রাছুলের কালাম অভেদ ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ, আল্লাহ – রাছুল – মুহাম্মদ ঐক্যতায় স্থিত/তাওহিদে অবস্থান করে অহেদাল অজুদ ধারণ করে আছে। আল্লাহর ওয়াজেবুল অজুদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের মধ্যে এসে নুরুন আলা নুর হয়েছে, ঐক্যতায় কায়েম আছে – এ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামই সত্য কিতাব। আল্লাহর মতলেক কালামের প্রকাশক নাতেক কোরান মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম। তাহলে সত্য কিতাব বলতে ‘আলিফ-লাম-মীমকে’ বুঝানো হয়েছে – যার সমুজ্জ্বল অর্থ/ভেদ – রমুজাত হলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম। “লা রাইবা ফিহি হুদাল্লিল মুত্তাকিন।” অর্থাৎ নাই কোনো সন্দেহ ইহার মধ্যে, মুত্তাকিদের (হুঁশ – আক্কেল – বিবেকবানদের জন্য) পথপ্রদর্শক / হেদায়েত। সত্য মানুষ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের মাধ্যমেই আল্লাহর হেদায়েত বাণী পতিত মানুষের নিকট বা পথভ্রষ্ট মানুষের নিকট পৌঁছে যাচ্ছে। আল্লাহর ঐ কালাম শ্রবণে যারা হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের নিকট ঈমান (আল্লাহ মুমিন, মুহাম্মদ মুমিন, আলী মুমিন, আলীওয়ালাগণ মুমিন এবং মুহাম্মদ নিজেই হলেন ঈমান। যুগে যুগে ঈমান রূপ-শেকেল নিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সৎ মানুষ/প্রেরিত পুরুষ রূপে।) এনেছে তারা বাস্তবেই মুক্তি লাভ করছে। এ মুহাম্মদ হলেন রাছুল মুহাম্মদ। বুঝা দরকার আল্লাহকে বা মুহাম্মদকে না দেখে ঈমান আনা যায় না এবং ঈমান আনার জন্য আল্লাহর অনুমতি লাগবে (সুরা ইফসুফ-১০০)। যেখানে রাছুল মুহাম্মদ সেখানেই আল্লাহ। সুতরাং হাবিবে খোদার প্রতি ঈমান আনলেই/বায়াত হলেই আল্লাহর অনুমতি/সম্মতি নেয়া হলো (সুরা ফাত্তাহ-১০)। আল্লাহ হলেন নূর, বেমেছাল ঐ নূর যখন প্রকাশ হয় তখন হয় মুহাম্মদ। নিজের সাথে আহলে বাইয়্যেতকে চিনলে ঈমান ও আমলের সব ভেদই জানা যায়। এ মুহাম্মদই হলেন ‘ইয়াসিন’-যেখানে আল্লাহর সমস্ত নামে মোজহার বা সমষ্টিরূপ। এবং এখানেই আল্লাহর আরশ-কুরশী-লওহ-কলম সহ সামিউন, বাসিরুন, কালিমুন সেফাতসমূহ ক্রিয়াশীল। প্রয়োগহীন নূর প্রয়োগে এসেছে এবং এখান থেকেই সৃষ্টি আরম্ভ। কোরানের মুহকামাত যারা বুঝে তারা ইহাও জানে যে, মুহাম্মদ হতে আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন এবং কোরান নবীর আহলে বাইয়্যেতের সাথে অবিচ্ছিন্ন রয়েছে – ইহা শাশ্বতকালের কথা। আরব দেশের ভাষায় লিখিত কাগজের কোরান পড়া আর কোরানের জ্ঞান লাভ করা এক জিনিস নয়।

যিনি জিন্দা কোরান/কোরানের হাফেজ (মুখস্থকারী নয় – হেফাজতকারী) তার নিকট ইলমে এলাহীর ভেদ রয়েছে, রয়েছে ধ্বংসশীল হরফের ভিতরে কদিম কোরান লুক্বায়িত সেই ভেদ-রহস্য, যা জানা হলে হক্কানী আলেম (গুরু/মুর্শিদ) হবে, হবে ওলীআল্লাহ। ওলীর পরিচয়ে আল্লাহপাক আছেন বিধায় বলা হয় ওলীআল্লাহ, আল্লাহ ওলী বলা হয় না। শাস্ত্রকানা পন্ডিতের দল এর ভেদ-রমুজাত না বুঝেই আবোল তাবোল বকবক করতে শুরু করে/করছে।

রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম বলছেন, “আলী মিন্নি ওয়া আনা মিনাল আলী, ফাতেমা মিন্নি ওয়া আনা মিনাল ফাতেমা, হাসান মিন্নি ওয়া আনা মিনাল হাসান, হুসাইন মিন্নি ওয়া মিনাল হুসাইন (মেশকাত)।” অর্থাৎ আলী আমা হতে এবং আমি আলী হতে, ফাতেমা আমা হতে এবং আমি ফাতেমা হতে, হাসান আমা হতে এবং আমি হাসান হতে, এবং হুসাইন আমা হতে এবং আমি হুসাইন হতে। এর মানে আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইন এক মুহাম্মদের মধ্যে ঐক্যতায় স্থিত এবং আহলে বাইয়্যেত হতে মুহাম্মদী গুণ প্রকাশিত হচ্ছে।

যারা আহলে বাইয়্যেতের শত্রু, তাদের উপর নির্যাতন করছে, তাদেরকে ঘৃণা করে, তাদের হক হরণ করছে তারা মুনাফেক, জাহান্নামী ; আল্লাহ ও তাঁর রাছুলের শত্রু। বুঝতে হবে নূর যখন আকারে আসে তখন হয় মুহাম্মদ, আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইন – এক নূরের প্রবাহিত রূপ। গায়ের কালো চাদর/কম্বল/দেহ – আত্মার জগতে যে জ্যোতির্ময় রূপরাশি বাইরে তেমনি দীপ্ত রূপের মূর্ত প্রতীক তথা নূর প্রতীকে আছেন আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন, হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুলের নবুয়তের ফসল হলো তাঁর আহলে বাইয়্যেত। “জানা দরকার যখন আল্লাহর নূর জহুরে আসে তখন তাকে আল্লাহ বলা যায় না, বলতে হবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম।” মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের অদৃশ্য অবস্থাটি শুধু নূর – যাকে আল্লাহ বলা হয়। আল্লাহ আদম মুহাম্মদ এক নূর কিন্তু এক নয়। মুহাম্মদ কারো নাম নয়, সৃষ্টির সর্বোচ্চ প্রশংসিত একটি স্তরের নাম । যিনি ঐ স্তরে পৌঁছেন তিনিই মুহাম্মদ। সুরা ফাত্তাহ-এর ১০ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, “ইন্নাল্াযিনা ইউবাইউনাকা ইন্নামা ইইবাইউনাল্লাহা ইয়াদুল্লাহি ফাওকা আইদিহীম। অর্থাৎ নিশ্চয়ই যারা আপনার নিকট বায়াত গ্রহণ

করছে তারা আল্লাহর হাতেই বায়াত গ্রহন করেছে, আমার হাত তাদের হাতের উপর। নবুয়তে আম্বিয়ায়ে কেরামের হাতে আর বেলায়েতে ওলীয়ম মুর্শিদের হাতে হাত দিয়ে বায়াত গ্রহণ করা ওয়াজিব।

মানব গুরুর হাতই আল্লাহর হাত Ñ এ বিশ্বাস রাখাই একজন ঈমানদারের বায়াতের শর্ত। এ বায়াত ভঙ্গকারী জাহান্নামী (সুরা ফাত্তাহ-১০)। বাহিরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের হাত হাকিকতে আল্লাহর হাত। চর্ম চক্ষে দেখা যায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের হাত, রাজে মুখফিতে তাকিয়ে দেখ, না না, ঐ হাত আল্লাহর হাত, ঐ চোখ আল্লাহর চোখ, ঐ কর্ণ আল্লাহর কর্ণ। মূলতঃ মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের সর্বাঙ্গের কর্তা আল্লাহ নিজেই, প্রভেদ নয় অভেদ হয়েই আছে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের নিকট বায়াত মানে আল্লাহর হাতেই বায়াত হয়েছে। এ হাতের উপর ঐ আল্লাহর হাতই প্রকাশ পেয়েছে। এ হাত আর ঐ হাত অভেদ হয়েই ঐক্যতায় কায়েম আছে, ইহাই কোরানের মূল ভাষ্য। কারণ, কোরানের মুহকামাত হলো মানুষ-এ কথা না বুঝলে সবই ভন্ডুল হয়ে যাবে। অন্ধরা তা দেখে না, অন্ধত্বের কারণে ওরা শেরেক মনে করছে, গাইরুল্লাহ মনে করছে। মুহাম্মদকে গাইরুল্লাহ মনে করে কালেমা পড়লে জাহান্নামী হবে। মুহাম্মদ অবশ্যই গাইরুল্লাহ নয়, বরং নুরুল্লাহ, নফস্সুল্লাহ, হিজবুল্লাহ, আইনুল্লাহ, কালি মুল্লাহ। সুতরাং যারা মুহাম্মদকে গাইরুল্লাহ মনে করে ওরা নিজেরাই আকন্ঠ শিরকের মধ্যেই ডুবে আছে সেই হুঁশ-আক্কেল নেই। তাবুক যুদ্ধে হয়েছিল মুসলমানদের সাথে, সে যুদ্ধে রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম কাফেরদের লক্ষ্য করে ধূলি নিক্ষেপ করলেন। তাতে তাদের মধ্যে কেউ অন্ধ, কেউ পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। সে ঘটনাকে লক্ষ্য করে কোরানে আয়াত নাযিল হলো। “ফালাম্ তাক্তুলুহুম্ ওয়ালা কিন্নাল্লাহা ক্বাতালাহুম। ওয়ামা রামাইতা ইয্ রামাইতা ওয়ালা কিন্নাল্লাহা রামা (সুরা আন ফাল-১৭)।” অর্থাৎ অতঃপর তোমরা তাদেরকে হত্যা করো নি। বরং আল্লাহপাকই তাদেরকে হত্যা করেছে। (হে আমার হাবিব) এবং আপনি যখন ধূলি নিক্ষেপ করতে ছিলেন তা আপনি নিক্ষেপ করেন নি, বরং আমিই ধূলি নিক্ষেপ করেছি। এখানেও নবীর হাতকে আল্লাহপাক নিজের হাত বলে সাব্যস্ত করেছেন এবং নবীর কর্মটি আল্লাহর কর্ম বলে ঐক্যতা ঘোষণা করেছেন। দূরে কোথাও হতে নয়; আল্লাহ-মুহাম্মদ ঐক্যতায় স্থিত হয়েই খোদার কর্ম প্রকাশ হচ্ছে। শুধু তা’ই নয়, মুমিনদের কর্মটিকেও আল্লাহপাক নিজের কর্ম বলে স্বীকার করে নিলেন। সুরা নজমের ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “ওয়ামা ইয়ানতিকু আনিল হাওয়া।” অর্থাৎ (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম) নিজ প্রবৃত্তি (ইচ্ছা) হতে কিছু বলেন না। অর্থাৎ যা বলেন আল্লাহর ওহী হতেই বলেন (ইন্ হুয়া ইল্লা ওয়া হয়ুই ইউহা)। কোরান হতে বুঝা গেল আল্লাহর ওয়াজেবুল অজুদ আর বান্দার অজুদ এক হয়ে অহেদাল হয়ে আছে। মুহাম্মদের সর্ব অঙ্গের কর্তা আল্লাহপাক নিজেই এবং তার হাকিকতে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুলকে দরশন করলে আল্লাহ দেখার আর বাকি থাকে না। তাইতো রাছুলপাক স্বয়ং-ই বললেন, “মান রা’য়ানী ফাকাদ রা’য়াল হক (তাফসিরে জিলানী ১ম খন্ড- ৩৭৭পৃঃ)।” অর্থাৎ যে ব্যক্তি আমাকে দেখলো সে হককেই/আল্লাহকেই দেখলো। তা জাগ্রত কিবা স্বপ্নে যেভাবেই হোক। এ হাদিসের ব্যাখ্যা ভিন্ন দিকে নেয়ার অবকাশ নেই, কারণ, তার ভেদ-রমুজাত রয়েছে। যারা ঈমানদার হবে (আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান আনবে – সুরা ইউসুফ-১০০) বা উম্মতে মুহাম্মদী হবে তারা মুহাম্মদকে দেখেই ঈমান আনবে। মুহাম্মদকে না দেখে ঈমান আনা যায় না। তাই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম হলেন আল্লাহর নুরের প্রকাশ এবং সমস্ত ঈমানদারগণের হাকিকি কাবা-কেবলা। আড়েফেল অজুদটি আল্লাহর তরফ হতে আল্লাহকে দেখার জন্য ঈমানদারগণের জন্য একটি বিশেষ এনায়েত/নেয়ামত। যারা হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম থেকে আল্লাহকে পৃথক দেখছে, ভাবছে তারা খাঁটি কাফের (সুরা নেছা – ১৫০-৫১)। তাদের কালেমা পড়ায় শেরেক হচ্ছে এবং শেরেক যারা করছে তারা মুশরেক হচ্ছে। যারা মুশরেক তারা হবে জাহান্নামী। হাদিস বলছে, “মান ক্বলা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আলফা আল্লাফা মাররাতুল বেলা তাহকিক।” অর্থাৎ বিনা তাহকিকে হাজার হাজার বার কালেমা পড়লেও সে কাফেরই থেকে যাবে। হাদিসে আরো বলছে, “লাইছা মুমিনু মাহ্মাউনা ফিল মাসজিদি ইয়াকূলুনা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাছুলুল্লাহ বারছাহি ফাহুয়া মুনাফিকুন।” অর্থাৎ ঐ সকল লোক মুমিন নহে যারা মসজিদে সমবেত হয়ে বাহ্যভাবে/শুধু মৌখিকভাবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাছুলুল্লাহ পাঠ করে থাকে, যেহেতু ঐ সকল লোক কপট মুনাফেক। কালেমাকে যারা তাহকিক করে, দেখে শুনে একবার পাঠ করবে তারা জান্নাতি (মেশকাত-৩৫ নম্বর হাদিস)। হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুলকে না চিনলে, না দেখলে কালেমা পড়া হয় না, ইলমে বেলায়েতে সে ভেদ-রহস্য রয়েছে ; উম্মতে মুহাম্মদীগণ সে ভেদ জেনে-শুনেই কালেমা পাঠ করছে। ইলমে মদিনাতুন্নবীর দরজা মাওলা আলীর বেলায়েতের জগতে সে ইলেম রয়েছে। যারা নাকেছ, ৭২ ফেরকার লোক তারা ইলমে বেলায়েতের অস্বীকারকারী জাহান্নামী হবে। কালেমা একবার পড়লে জান্নাতি তা সে চুরি করুক বা জিনা করুক ; তবু সে বেহেশতী (বোখারী ৫ম খন্ড, ৫৭২৬, ৬ষ্ঠ খন্ড-৫৯৯৩। ইহা হাদিসে জিবরাইল)। কালেমার নফী-এসবাত, ফানা-বাকা, অরুজ-নজুল যে জানে না সে মুসলমানই নয় (মমতাজুল ফাতাওয়া)। রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম মৃত্যুবরণ করেছেন বা আল্লাহ থেকে তাকে আলাদা দেখলে-ভাবলে বা প্রভেদ করলে তার কালেমা পড়ায় শেরেক হবে। রাছুলে খোদা যুগে যুগে বর্তমান এবং মূর্তমান এ ভেদ যে জানে না সে ঈমানদারই নয়। না চিনে না দেখে ঈমান আনা যায় না। যারা না চিনে না দেখে ঈমানদার দাবী করছে তাদের ঈমান শয়তানের ঈমানের সমতুল্য। শয়তানও না দেখে না চিনে ৬/৯ লক্ষ বৎসর আল্লাহর ইবাদত করেছিল, এখনো বেশী বেশী ইবাদত করছে। সে তার গুরু আদমকে অস্বীকার করে কালেমা পাঠ করছে। কিন্তু খোদার ছুরত গুরু / মুর্শিদ আদমকে অস্বীকার করে তার সমস্ত বন্দেগীর ফলাফল বাতিল হলো/হচ্ছে এবং শেষে কাফের হয়ে জাহান্নামী হলো। এ ঘটনা আওলাদে আদমের জন্য চিরবর্তমান একটি বিশেষ শিক্ষণীয় বিষয় যে, আদম গুরুকে সেজদা/তাঁর আনুগত্য করলে কি হবে আর না করলে কি হবে। আদমকে গাইরুল্লাহ জানলে, ভাবলে কাফের হয়ে যাবে। যাক, কোরান দ্বারা প্রমাণিত আল্লাহ এবং তাঁর হাবিব মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম ঐক্যতায় স্থিত, প্রভেদ জ্ঞানকারীরা মুশরেক হয়ে যাবে। আল্লাহর ছুরত হতেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের ছুরত প্রকাশিত হচ্ছে। নিরাকারে তিনি আল্লাহ আর আকারে তিনি মুহাম্মদ। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের সর্ব অঙ্গে আল্লাহপাকই কর্তা – এ বিশ্বাসই তাওহিদ জ্ঞান। আল্লাহপাকই তার বান্দাকে হেদায়েতের বাণী শুনিয়ে যাচ্ছেন এবং ভাষা জ্ঞান শিক্ষা দিচ্ছেন (সুরা রহমান ঃ ১-৪)। একটু দৃষ্টি দিয়ে দেখুন, আইনিয়াতে হাকিকিতে নবী ছিলেন, আসলেন গাইরিয়াতে এতবারিতে/মদিনাতে মুহাম্মদ রূপ ধারণ করে এলেন। মক্কায় থাকার জায়গা নয়, থাকার জায়গা মদিনাতে। হাকিকতে মক্কা এবং মদিনা কি, কোথায় তা জানা দরকার। “আন্ নাবীউ আওলা বিল মুমিনীনা মিন আনফুসিহিম।” অর্থাৎ নবী মুমিনগণের জানের চেয়ে নিকটে বা প্রিয়। ‘আওলা’ অর্থ জানের/প্রাণের চেয়েও প্রিয় বা নিকটে। প্রাণের মানুষ প্রাণেই বাস/অবস্থান করে। মদিনার পূর্ব নাম ইয়াছরিব ছিল, নবীজি সেখানে যাবার পর নাম মদিনাতুন্ নবী (নবীর শহর) হয়েছে। ভেদ বুঝে দেখুন মুমিনগণ নিজেই মদিনাতুন নবী। আহলে বাইয়্যেতকে ধারণ করে মুমিনগণ (হিজবুল্লাহ) মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে আছে। মুমিনগণই হলেন নবীর ঠিকানা। হাকিকতে দৃষ্টি দিয়ে দেখুন হিজাবে মুহাম্মদীতে কে রূপ দেখাচ্ছেন। সে-ই তো এই হয়ে আছে। নবুয়তের বে-নিশান কালেমা বেলায়েতে রূপ ধরে আছে। “আল্লাহু নূরুচ্ছামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ব”-এ নূর “মাছালু নূরীহি কামিশ কাতিন”-নূরের মেছাল দিয়ে আড়েফেল অজুদে ঝলক দিচ্ছে। পিছনের নবুয়ত সামনে এসে বেলায়েতে খোদার রূপ দেখাচ্ছে। উম্মতে মুহাম্মদীগণ খোদাকে দেখেই ঈমান আনছে এবং কালেমার সাক্ষী দিচ্ছে। আর ৭২ কাতারের মুনাফেকগণ অন্ধ-বধির হয়ে আছে, তাদের ক্বালবের নূর হারিয়ে বা নিজ আত্মা হারিয়ে (সুরা আনআম-১২) অন্ধকার কবরে বসে চিৎকার করছে। আল্লাহপাক দেখবেন, শুনবেন, হাটবেন, বলবেন স্বীয় ইচ্ছা পূরণ করবেন, তাই সেই ইচ্ছা পূরণের ক্ষেত্রটি হলেন তার হাবিব মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম। তাই হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামকে ভালোবাসার মধ্যে আল্লাহরই ভালোবাসা/মহব্বত রয়েছে এবং এ ভালোবাসা/মহব্বতের বিনিময়ে ঈমানদারের সমস্ত গুনাহ্ আল্লাহপাক ক্ষমা করে দিবেন (সুরা বনি ইসরাঈল-৩১)। আল্লাহপাক মুহাম্মদের মধ্যে নিজ রূপ দরশন করে সৃষ্টির বিবর্তন থামিয়ে দিলেন তথা বললেন ‘ওয়া খাতামান্ নাবীয়্যিন’। এখান থেকেই মাওলা আলীর বেলায়েতের দরজা শুরু তথা এ মোহরে নবুয়তের উপরই রয়েছে মাওলা আলীর বেলায়েত।

লেখক – হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

Related articles