আপন ফাউন্ডেশন

বরযখ ধ্যান – বরযখ বিষয়ক আলাপ

Date:

Share post:

লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী

বারযাখ আরবী শব্দ এর অর্থ পর্দা, আড়াল, অন্তরায় ও পৃথককারী বস্তু । দুই অবস্থা বা দুই বস্তুর মাঝখানে যে বস্তু আড়াল হয় তাকে বরযাখ বলা হয় । (ফতহুল কাদীর)

পবিত্র কোরআনে সুরা আল মুমিনুন এর ১০০ নম্বর আয়াতে আলমে ‘বরযাখ’ ও সুরা আর রহমানের ২০ নম্বর আয়াতে প্রবাহিত দুই দরিয়ার মধ্যে ‘বরযাখ’ এর উল্লেখ রয়েছে, যাহা রহস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা যুক্ত । পবিত্র হাদিস শরীফেও আলমে বরযাখ বিষয়ে বেশ অলোচনা রয়েছে । এ অধ্যায়ে আধ্যাত্মিক পথের পথিক বা সালেক আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছার নিমিত্তে আপন পীর মুর্শিদের সুরাত বা চেহারা ধ্যান বিষয়ক দলিল ভিত্তিক আলোচনা করা হলো । তাছাওরে শায়েখ বা বরযাখ এর আমল একান্তই আল্লহর প্রেমিক সালেক ও খাস বান্দাদের জন্য । আম বা সাধারণের জন্য প্রযোজ্য নয়।

বরযাখ ধ্যানের মৌলিকত্ত হল লক্ষ্য স্থির ও হুজুরী কলব পয়দা করা । বাহ্যিক ভাবে যেমন বিশ্বের সকল মুসলিম নর-নারীর বিচ্ছিন্ন দুরন্ত ও চঞ্চল মনকে একই কেন্দ্র স্থলে কেন্দ্রীভূত করতে পবিত্র কাবা গৃহকে কিবলা বা লক্ষ্য স্থল করা হয়েছে । সকল মুসলমান সালাতে দন্ডায়মান হয়ে কাবা ধ্যানে ‘কাবাতিশ শরীফাতে আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবীরে তাহ্রীমা বাধে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হতে লক্ষ লক্ষ হাজীগণ পবিত্র কাবা গৃহ তাওয়াফ করছে এবং লুটায়ে পড়ছেন প্রভুর উদ্দেশ্যে সিজদায় । বিচার্য : কাবাগৃহতো গায়রুল্লাহ ঐ ঘরে আল্লাহ্ আবদ্ধ ও নয় । তা সত্ত্বেও প্রভুর নির্দেশে পবিত্র কাবা ঘরের শান, মান মর্যদা বিশ্বের সমস্ত ঘর গুলি হতে অনন্য পূত ও পবিত্র । এবং সকল মুসলমানের কিবলা নির্ধারণ করা হয়েছে ।

সুতরাং কাবা ও কিবলার ভেদ তত্ত্ব উৎঘাটন হলেই বরযাখ এর মুল রহস্য বা হাকিকত উম্মোচন হবে । সালাত আদায়ে নিয়তের মধ্যেতো কাবার দিকে মুত্তওয়াজ্জা হওয়ার কথা বলতেই হয় । নুরনবী রাসুলুল্লাহ (সঃ) বর্ণনা করেন পবিত্র কাবার উপর দৃষ্টি করা এবাদত (আল-হাদিস) । অতএব প্রমাণিত হলো, কাবা আল্লাহ নয়, তবুও কাবার ধ্যান শরীয়ত সম্মত এবাদত । মানুষের মন অতি চঞ্চল দুরন্ত অশান্ত অবাধ্য ও অস্থির তদুপরি খান্নাস মনের মনিকোঠায় প্রবেশ করে শিরক, মুক্ত এবাদতের চরম অন্তরায় হয়ে দাড়ায়। মুহূর্তের মধ্যে অতিদ্রুত গায়রুল্লাহর রকমারী বস্তু জগতে মনকে বিচরণ করায় ।

অনেক সময় সালাত আদায় করতে গেলে শুধু দেহ খানাই মসজিদে জায়নামাজে পড়ে থাকে মন চলে যায় হাটে মাঠে দোকান পাটে সামনে ভেষে উঠে জরু গরু কত রকম ছবি এমনকি খান্নাসের ধোকায় কত রাকাত নামাজ পড়া হলো তাহাও ভুল হয়ে যায়। ‘মিন শাররিল ওয়াস ওয়াসিল খান্নাস’ এর মারাত্মক আক্রমন হতে ঈমান রক্ষা এবং রিয়া তাকাব্বরী ও শিরক মুক্ত এবাদত করার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি তাসাউফ পন্থী পীর মাশায়েখগণ ভক্ত মুরীদানদেরকে বিশেষ তালিম ও ছবকের মাধ্যমে দিয়ে থাকেন । তাছাওরে শায়েখ বা বরযাখ তার মধ্যে অন্যতম ছবক।

এ প্রসঙ্গে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী বলেন: শায়েখের মধ্যে যে সমস্ত কামালাত এবং মহৎ গুণাবলী আছে সেই সব এবং উহার প্রকৃতি আকৃতি পর্যন্ত খুব বেশী করিয়া ধ্যান অর্থাৎ গাঢ়ভাবে একাগ্রচিত্তে চিন্তা করিলে শায়েখের সঙ্গে মহব্বত বাড়ে নিছবত মুজবুত হয় । শায়েখের কামালিয়াত মুরীদের ভিতর পয়দা হয় । যিকরের সময় নানা খেয়াল ও ওয়াস ওয়াসা দিলের মধ্যে আসিয়া সালেক কে যে কষ্ট দেয় সে সব দুর হয় । এইরূপে যখন ওয়াস ওয়াসা দুর হইয়া গিয়া এক ছুয়ী হাছিল হয় তখন নামাজের মধ্যে ওযীফার মধ্যে এবং অন্যান্য এবাদতের মধ্যে হুজুরী কলব হাছিল করা এবং একাগ্রতার সহিত নিরাকার খোদার ধ্যান করাও সহজ হইয়া পড়ে । (তালিমুদ্দীন-১৬৫ পৃ.)।

বরযাখ বা পীরের সুরত ধ্যান প্রসঙ্গে হযরত মাওলানা শাহ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দেস দেহলবী (রাঃ) বলেন: মোরশেদের অনুপস্থিত অবস্থায় তাঁহার সুরত মুরীদ নিজ দুই নয়নের মধ্যে প্রেম ও ভক্তি সহকারে ধ্যান করিতে থাকিবে । তাহা হইলে সে তাহার সুরত ধ্যান দ্বারা সেই ফল লাভ করিবে যাহা সে তাঁহার পীরের সঙ্গ ও সোহবত দ্বারা লাভ করিত । (আল কাওলুল জামীল ষষ্ট পরিচ্ছেদ) । প্রমাণিত হলো শয়তানের প্ররোচনা হতে ঈমান রক্ষা ও শিরক মুক্ত এবাদত করতে পীরের সুরত তথা “বরযাখ ধ্যান” বাধ্যতামূলক । আমাদের জান, মাল, সাধনা, আরাধনা, উপাসনা সবই একমাত্র আল্লাহর জন্য । আশেক সমস্ত কিছুর বিনিময়ে আধ্যাত্মিক দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে মাশুক (আল্লাহ) এর সাথে মিলন হতে চায় কিন্তু প্রশ্ন জাগে আল্লাহ কোথায় থাকেন কোন ঠিকানায় কিভাবে পাওয়া যাবে ? আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে এ সম্বন্ধে এরশাদ করেন –

(ক) তোমার ঘাড়ের শাহারগ হতেও আল্লাহ নিকটে আছেন । (ক্কাফ-১৬ আয়াত)

(খ) আমি তোমার নফসের সাথে মিশে আছি কিন্তু তুমি দেখছোনা (সুরা যারীয়াত-২১ নং আয়াত.)

(গ) তুমি যেখানে সেও (আল্লাহ) সেখানে (হাদীদ ৪নং আয়াত) (ঘ) আল্লাহর অবস্থান মানুষ ও তাঁর ক্বলবের মধ্যে (সুরা আনফাল ২৪ নং আয়াত)

উপরোক্ত আয়াত দৃষ্টে প্রতীয়মান হলো । মানুষ হতে আল্লাহ্ পৃথক ও দূরবর্তী নয় । একজন পরিশুদ্ধ মানুষের ‘বরযাখ’ বা অন্তরালে এক মাত্র আল্লাহই বিরাজমান ।

“মরদানে খোদাগর খোদা না বাশদ
ওয়া লেকেন আজ খোদা জুদা না বাশাদ”
অর্থাৎ- মানুষকে খোদা কয়, মানুষ খোদা নয় কিন্তু মানুষ থেকে খোদা পৃথক ও নয় (মাওলানা রুমী)।

মানব জাতি দুই শ্ৰেণী ভুক্ত। যেমন –

(এক) বস্তু মোহে আবদ্ধ অচেতন খান্নাস যুক্ত মানুষ ।

(দুই) মমিন পর্যায়ের লামউতের অধিকারী পরিশুদ্ধ স্বচেতন ও খান্নাস মুক্ত তথা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত মানুষ ।

এ পর্যায়ের মানুষকে কোরআনের ভাষায় মুমিন, মুত্তাক্কিন, সাদেকীন, সালেহীন হাদী ও মুর্শিদ বলা হয়েছে । আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে আমাদেরকে সাদেকীন সালেহীন, মুমিন বান্দাদের মহব্বত করতে এবং সঙ্গী হতে বলেছেন । ‘উলিল আমর’ (হযরত আলী (রাঃ) এর সিলসিলাভুক্ত) নায়েবে রাসুলের অনুগত ও অনুস্মরণের কথাও বলা হয়েছে । (সুরা নিসা-৫৯ নং আঃ ও সুরা তাওবা ১১৯নং আয়াত) । প্রমাণ হলো আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য প্রেম মহব্বত হাসিল করতে হলে নায়েবে রাসুল তথা ‘ওয়ালিয়াম মুর্শিদের’ আনুগত্য প্রেম ভক্তি মহব্বত করা মহান আল্লাহর নির্দেশ । আশেকের দুই নয়নে মাশুক রূপ সর্বদা উদ্ভাসিত থাকে । এতে আশেক ও মাশুকের ‘রাবেতা’ বৃদ্ধি পায় ।

কোন কোন মানুষের সুরত দরশনে এবাদত ও সওয়াব হাসিল হয় । যেমনঃ রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন: তোদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যার চেহারা দরশনে আল্লাহকে স্মরণ হয় । অন্যত্র বলেছেন, সন্তান সুনজরে পিতা মাতার চেহারার দিকে তাঁকালে কবুল হজ্জ্বের সওয়াব প্রাপ্তি হয় । (আল হাদিস) মৌলানা আব্দুল আজিজ মোহাদ্দেস দেহলবী তার তাফসীরে আজিজীর শেষ ভাগে এই হাদিস খানা উল্লেখ করেছেন রাসুলে পাক বলেন: হযরত আলী (রাঃ) এর সুরত দরশন এবাদত । “ছোবাহানাল্লাহ” । মহানবী রাসুলুল্লাহ (স:) এরশাদ করেন “আল মুমিনু মিররাতুল মুমিনিন” । অর্থাৎ এক মুমিন অন্য মুমিনের দর্পন । বিচার্যঃ আয়নায় তাঁকালে অবশ্যই কিছু দেখা যায় তাহলে এক মুমিন অন্য মুমিনের দিকে তাকায়ে কি দেখতে পায়? মুমিন বান্দার ‘বরযাখ’ বা আড়ালে কে রয়েছে ? গবেষণা ও ভাবিবার বিষয় । এ সম্বন্ধে হুজুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন “কুলুবিল মুমিনিনা আরশউল্লাহেতায়ালা” অর্থাৎ বিশ্বাসীর হৃদয়ে আল্লাহর সিংহাসন (হাদিস-ই-কুদসী) সুতরাং প্রমাণিত হলো মুমিন বান্দা তথা “তাছাওরে শায়েখ” বা গুরু বরযাখ ধ্যান আল্লাহ প্রাপ্তির উত্তম সোপান । আল্লাহ বলেন, কোন বান্দা যদি কোন কিছুর মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে যা আমি তার উপর ফরজ করেছি তা আমার নিকট প্রিয় । আর যখন আমার বান্দা নফল এবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে, তখন আমি তাকে ওলী বা বন্ধু বলে গ্রহণ করি । যখন আমি তাকে বন্ধু বলে জানি তখন আমি তার কর্ণ হই যার দ্বারা শোনে । আমি তার চক্ষু হই যার দ্বারা সে দেখে । তার জবান হই যার দ্বারা সে কথা বলে । আমি তার হাত হই যার দ্বারা সে ধরে এবং আমি তার পা হই যার দ্বারা সে চলে (হাদিস কুদসী) অর্থাৎ- সালিক যখন স্বীয় অস্তিত্ববোধ জাতের মধ্যে ফানা করে ফেলেন তখন সেখানে স্বয়ং আল্লাহরই সেফাত বা গুণাবলীর বিকাশ ঘটে । এরকম একজন মুমিন বান্দাকে শয়তান কখনো ধোকা দিতে পারে না । উপরন্ত মুমিন বান্দার উপস্থিতিতে শয়তান সেখান থেকে দ্রুত পলায়ন করে । (সুরা হিজর ৪০/৪২ নং আয়াত ও সুরা সাবা ২০নং আয়াত) । পবিত্র কোরআন হাদিস, ও ফকীহ মুজতাহিদ গণের দলিল দ্বারা প্রমাণিত হলো শয়তানের কুমন্ত্রনা ও প্ররোচনা হতে ঈমান রক্ষা করে, সকল প্রকার শিরিক মুক্ত এবাদত দ্বারা আল্লাহর সহিত “রাবেতা” তথা প্রেম মহব্বত বৃদ্ধি করতে সালিকের ‘বরযাখে ছোগরা বরযাখে কোবরা ছবকটি শিরক, বিদয়াত নয় বরং বৈধ ও গুরুত্ব পূর্ণ আমল । মুমিন বান্দা বা পীর মুর্শিদ আল্লাহ নয় । কিন্তু পৃথক ও নয় জানা চেনার ব্যবধান মাত্র । যেমন বাল্ব এর ভিতর আলো জ্বলছে বাল্বটি আলো নয় । আর আলো ও বাল্ব নয় । এই দুয়ের প্রভেদ জ্ঞান থাকলেই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটবে এবং শিরক হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে না । পরিশেষে বুখারী শরীফের একখানা হাদিস দ্বারা আলোচনা শেষ করছি ‘ইন্নামাল আমালু বিননিয়্যত’ । অর্থাৎ কর্মের ফলাফল নিয়তের উপর । যেমন সালাত আদায়ের নিয়ম কানুন রুকু, সিজদা, তাসবীহ, তাশাহুদ একই রকম হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র নিয়তের কারণে ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, নফল হয়ে থাকে, তাহলে পীর মুর্শিদকে আল্লাহ মনে না করে আল্লাহর বন্ধু বা আল্লাহ পাওয়ার মাধ্যম নিয়তে আনুগত্য প্রেম মহব্বত ও বরযাখ তথা, সুরত ধ্যান অবশ্যই যায়েজ বা বৈধ । শিরক মুক্ত ও ফলপ্রদ।

“হরকি খাহাদ হামনি শীনাদ বা খোদা
তুনিশীনাদ দার হুজুরে আউলিয়া (মাঃ রুমীঃ)”

প্রমান সমূহ –

তালীমে তরিকত – মৌলানা আবু জাফর সিদ্দিকী (রঃ)
তালিমুদ্দীন – মাওলানা আশরাফ আলী থানভী
আলকাওলূল জামীল – মাওলানা শাহ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দেস দেহলবী (রঃ)
হুজ্জাতিল্লাহিল বালেগা – মৌলানা কেরামত আলী (রঃ)
শরফুল ইনসান – খান সাহেব মৌলবী হামিদুর রহমান বি,এ
সুফী শব্দকোষ – ডক্টর অধ্যাপক ফকীর অব্দুর রশীদ চিশতী

লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

সালাত

Related articles