আপন ফাউন্ডেশন

নূর নবীজি (দঃ) হাজির ও নাজির

Date:

Share post:

লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের দৃষ্টিতে আল্লাহর হাবীব হুজুর পুরনূর (দঃ) সারা বিশ্বের সব কিছুই সরাসরি দেখতে পান এবং আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতায় সারা জাহানে রূহানী ভাবে হাজির ও নাজির তথা অদৃশ্য নূরানী দেহ মোবারক নিয়ে উপস্থিত হয়ে সব কিছু দেখেন ও শুনেন । এমন এখতিয়ারও প্রিয় নবীজির দেওয়া আছে যে, জেসমানী ভাবে যেখানে খুশি সেখানে গমন করতে পারেন । ইহাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত তথা হক্কানী উলামায়ে কেরামের আকিদা । এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসে এর অনেক দলিল বিদ্যমান রয়েছে।

পবিত্র কুরআনের আলোকে

দলিল : (আলাম তারা কাইফা ফায়ালা রাব্বুকা বিআছফা বিল ফিল) অর্থাৎ : হে নবী! আপনি কি দেখেননি ? আমি হস্তী বাহিনীর সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছি (সূরা ফিল ১-২ নং আয়াত) আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া এবং তাফছিরে ইবনে কাছিরে উল্লেখ আছে হস্তী বাহিনীর ঘটনা ঘটেছিল প্রিয় নবীজির পৃথিবীতে জন্মের ৫০ দিন পূর্বে । আর এ আয়াতে বলা হচ্ছে নবী করিম (দঃ) ঐ ঘটনাও দেখেছেন । কেননা আল্লাহ পাক নবীজিকে বলছেন: আপনি কি দেখেননি? এখানে (!) হামজায়ে ইছতেফাহামিয়া তথা প্রশ্নবোধক হামজা । অর্থাৎ প্রশ্ন করা হয়েছে “আপিনি কি দেখেননি”? অর্থাৎ প্রিয় নবীজি (দঃ) ঐ ঘটনা সমূহ দেখেছেন ।

এ ব্যাপারে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে :

দলিল : (আলাম তারা কাইফা ফায়ালা রাব্বুকা বি-আদ (সুরা ফজর-৬নং আয়াত)
অর্থাৎ- হে নবী! আমি আদ জাতির সাথে কিরুপ ব্যবহার করেছি তা কি দেখেননি?

এই আয়াতেও প্রমাণ হয়, প্রিয় নবীজির পৃথিবীর জন্মের বহু পূর্বের আদ জাতির ঘটনা দেখেছেন ।

দলিল : অর্থাৎ- হে নবী! আপনি কি দেখেননি? জমীনে যা কিছু আছে ও সমুদ্রে চলমান নৌকা সমূহকে আল্লাহর নিজ আদেশে আমাদের অধীন করে দিয়েছেন (সুরা হাজ্জ-৬৫)

সুতরাং এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় আল্লাহর নবী (দঃ) জমীনে কোথায় কি হয় এবং সমুদ্রের কোথায় কি হয় সবই দেখেন । কেননা আল্লাহ তা’লা বলেছেন- আপনি কি দেখেননি ? এরূপ অনেক আয়াত রয়েছে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, যেই নবী পৃথিবীতে জন্মের আগে সব কিছু দেখতেন সেই নবী (দঃ) কি এখনোও সব কিছু দেখেন ?

দলিল : (জ্বালা ইফরুতুম মিনাল জিন্নি আনা আতিকা বিহি কাব্‌লা আন তাকুমা মিম মাকামিকা ওয়া ইন্নাহু আলায়হি লাকাবিউন আমীন) ইফরিত নামক জিন বলেন, আপনি যেখানে বসে আছেন সেখান থেকে দাঁড়ানোর পূর্বেই (রাণী বিলকিছের) সিংহাসন এনে দিব । এ ব্যাপারে আমি শক্তিশালীও বটে। (সূরা নমল: ৩৯)

দলিল : অর্থাৎ- নবী (দঃ) মু’মীনের জানের চেয়েও অধিক নিকটে। (সুরা আহযাব, ৬নং আয়াত)

এই আয়াতের তাফছির করতে গিয়ে দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা আবুল কাশেম নানুতুবী সাহেব বলেন “আওলা” অর্থ নিকটে সুতরাং পবিত্র কুরআন দ্বারা প্রমাণ হয়ে গেল যে, আল্লাহর নবী (দঃ) মুমীনের জানের চেয়েও আরোও নিকটে হাজির ।

দলিল : (ইসা আঃ কে আল্লাহ বলছেন) লোকদেরকে বলুন! আমি বলে দিতে পারি তোমরা কি খেয়েছ এবং কি জমা করে রেখেছ এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, উম্মতের ঘরে কি খেয়েছে এবং কি কি জমা করে রেখেছে সবই ঈসা (আঃ) দেখতেন । হযরত ঈসা (আঃ) যদি উম্মতের ঘরে কি খেয়েছে এবং কি জমা রেখেছে সব দেখতে পারেন, তাহলে বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ) যিনি সব নবীদেরও নবী তিনি কেন উম্মতের ঘরে কি খেয়েছে ও জমা রেখেছে তা দেখবেন না ?

দলিল : আমি আপনাকে সারা জাহানের রহমত ব্যতীত পাঠায়নি । (সুরা আম্বিয়া ১০৭ নং আয়াত)

সুতরাং প্রিয় নবীজি (দঃ) হলেন সারা জাহানের রহমত, আর রহমত কিভাবে কোথায় থাকেন সে ব্যাপারে আল্লাহ তা’লা অন্যত্র বলেন অর্থাৎ, আমার রহতম সব কিছুকে বেস্টন করে আছে । সুতরাং আল্লাহর নবী (দঃ) আল্লাহর রহমত হিসেবে সৃষ্টি জগতের সব কিছুকে বেষ্টন করে আছেন । কারণ আল্লাহ হলেন সমস্থ জগতের রব, আর আমাদের নবী (দঃ) হলেন সমস্থ জগতের রহমত । তাই রব হিসেবে আল্লাহর যতটুকু সীমানা, রহমত হিসেবে নবী পাক (দঃ) এরও ততটুকু সীমানা। সুতরাং আল্লাহর নবী (দঃ) সমস্ত জগতে রহমত হিসেবে রুহানীভাবে বেষ্টন করে আছেন ।

দলিল : অর্থঃ হে আমার নবী! আমি আপনাকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে প্রেরণ করেছি । (সুরা ফাতহ ৮নং আয়াত) এই আয়াতে নবী (দঃ) কে শাহিদ বলে আক্ষায়িত করেছেন ।

অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন : অর্থাৎ রাসুল (দঃ) ই হবেন তাদের জন্যে সাক্ষী । (সুরা বাকারা ১৪৩নং আয়াত) এই আয়াতে আল্লাহর নবী (দঃ) কে তথা সাক্ষী বা প্রত্যক্ষদর্শী বলা হয়েছে । হিজরী ৫ম শতাব্দির মোজাদ্দেদ, আল্লামা ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী (রাঃ) এ সম্পর্কে বলেন । অর্থাৎ, নিশ্চয় সাক্ষা, প্রত্যক্ষকরণ ও উপস্থিত হওয়া এগুলো স্বীয় দৃষ্টিতে দেখার মাধ্যমে হয়, যখন বলা হয় “আমি উপস্থিত ছিলাম” ইহা তখনই হবে যখন সে ঐ ঘটনা নিজে দেখবে ও অবলোকন করবে । সুতরাং আল্লাহর নবী (দঃ) উপস্থিত হয়ে স্বীয় চক্ষু মোবারক দ্বারা দেখার মাধ্যমে স্বাক্ষী বা প্রত্যক্ষদর্শী।

প্রশ্ন আসে নবীজী কিসের সাক্ষী ? জাবাবে ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী (রহঃ) ও ইমাম কুস্তলানী (রঃ) উল্লেখ করেন অর্থাৎ নিশ্চয় নবী পাক (দঃ) সমস্থ সৃষ্টির সাক্ষী বা প্রত্যক্ষদর্শী।

সুতরাং প্রিয় নবীজি (দঃ) সমস্ত সৃষ্টি জগতের কোথায় কি হয় সব কিছু দেখতেছেন এবং ঐ অনুযায়ী কেয়ামতের দিন প্রত্যক্ষদর্শী তথা সাক্ষী দিবেন । উল্লেখ্য যে, প্রত্যক্ষদর্শী ব্যতীত সাক্ষী হওয়া যায় না । দলিল : নবী করিম (দঃ) আল্লাহর ওয়াহদানিয়াতের উপর সাক্ষী, আল্লাহ তা’লাকে দেখেছেন এজন্যই প্রিয় নবীজি (দঃ) আল্লাহর ওয়াহদানিয়্যাতের উপর সাক্ষী। আখেরাতের জান্নাত-জাহান্নাম, মিজান, পুলছেরাতের উপর দুনিয়াতে সাক্ষী । মেরাজের রাত্রে প্রিয় নবীজি (দঃ) এগুলো প্রত্যক্ষ করেছেন এ কারণে এগুলোর উপর সাক্ষী । দুনিয়ার সকল হাল বা অবস্থা আনুগত্য, অপরাধ, নেক কাজ ও পাপ কাজের সকল অবস্থার প্রত্যক্ষদর্শী বা নিজ চক্ষু দ্বারা দেখতে পান এ কারণেই তিনি সব কিছুর সাক্ষী । (মাওয়াহেবুল্লা দুন্নিয়া ৩য় খন্ড ১৬০ পৃষ্ঠা)।

লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

Related articles