আপন ফাউন্ডেশন

সুফিবাদ কেন এখন তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে?

Date:

Share post:

এক সময় সুফিবাদ ছিল সাধকদের সাধনার বিষয়, মসজিদ আর খানকাহ এর চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ এক আত্মিক গুপ্ত ধারা। কিন্তু আধুনিক যুগে, বিশেষত ডিজিটাল যুগের তরুণ সমাজের মধ্যে সুফিবাদের প্রতি এক আশ্চর্যজনক আকর্ষণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইনস্টাগ্রাম রিল, ইউটিউব ভিডিও, স্যোশাল মিডিয়া পোস্ট এবং আত্ম-অন্বেষণমূলক বই—সবখানেই দেখা যায় রূমী, ইবনে আরাবি কিংবা হাফেজের বাণীর জয়জয়কার। প্রশ্ন ওঠে: কেন হঠাৎ করে সুফিবাদ তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে? এই নিবন্ধে আমরা খুঁজে দেখব সেই উত্তরের পরতগুলো।

১. আধুনিক জীবনের শূন্যতা এবং আত্মিক ক্ষুধা
বর্তমান সময়ের তরুণেরা প্রযুক্তি, তথ্য ও দ্রুত গতির জীবনের ভেতর দৌড়াচ্ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির ছটায় এক ধরণের ভেতরের শূন্যতা তৈরি হয়েছে:
সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডিকশন
মানসিক অবসাদ ও আত্মহত্যার প্রবণতা
অর্থহীন সম্পর্ক ও আত্মবিচ্ছিন্নতা
এই শূন্যতাকে পূরণ করার জন্য যে আত্মিক খোঁজ শুরু হয়, সেটি তাদের নিয়ে আসে সুফিবাদের দরজায়। কারণ সুফিবাদ শুধু জ্ঞান নয়, হৃদয়ের পরিতৃপ্তির একটি পথ।
“তুমি যদি তোমার হৃদয়ের গভীরে সত্য খুঁজো, তবে তুমি একদিন আল্লাহকে খুঁজে পাবে।” — রূমী

২. ভালোবাসা ও মানবিকতার বার্তা
সুফিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হলো ভালোবাসা। এই ভালোবাসা কেবল ঈশ্বরের প্রতি নয়, বরং সমস্ত সৃষ্টির প্রতি। তরুণ প্রজন্ম আজ ঘৃণা, ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও সংঘাতের বিরুদ্ধে:
তারা ভালোবাসার ভাষা খোঁজে
তারা মানবিকতা চায়
তারা বিশ্বাসে চাইছে উন্মুক্ততা ও আন্তরিকতা
সুফিবাদ এই বার্তাই বহন করে—ভালোবাসা দিয়ে জগৎকে জয় করা যায়।

৩. রূমী, হাফেজ ও কবিতার পুনর্জাগরণ
সুফিবাদের অনেক মণিমুক্তা ছড়িয়ে আছে কবিতায়। বিশেষ করে জালালুদ্দিন রূমী, হাফেজ, ইবনে আরাবি, বুল্লে শাহ, এবং নজরুল ইসলামও এই ধারায় অনেকাংশে যুক্ত। এই কবিদের ভাষায় রয়েছে:
আত্মা ও ঈশ্বরের প্রেম
বিরহ ও মিলনের আকুতি
সত্য ও সৌন্দর্যের সন্ধান
তরুণেরা এই কবিতার মধ্য দিয়ে নিজেদের আবেগ, প্রেম, এবং প্রশ্নের উত্তর খোঁজে।
“Don’t grieve. Anything you lose comes round in another form.” — Rumi
এই ধরনের বানী এখন ইনস্টাগ্রামের হাজারো পোস্টে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

৪. ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে আত্মিক বিদ্রোহ
ধর্মের নামে যান্ত্রিকতা, ফতোয়া, কঠোরতা, এবং বিভেদ দেখে অনেক তরুণ ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। কিন্তু তারা সম্পূর্ণ ধর্মবিমুখ হতে পারেনি। তারা খুঁজেছে এমন একটি রূপ:
যেখানে হৃদয় গুরুত্ব পায়
যেখানে আল্লাহকে ভালোবাসা যায়, ভয় নয়
যেখানে ধর্ম মানে আত্মিক মুক্তি, বাহ্যিক অনুশাসন নয়
সুফিবাদ তাদের সেই “উপশমের পথ”—একটি নরম, মানবিক, হৃদয়স্পর্শী ইসলাম।

৫. মিডিয়া ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে সুফিবাদের উপস্থিতি
বর্তমান সময়ের গণমাধ্যম এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও সুফিবাদের জয়জয়কার:
পাকিস্তানি সুফি গান (কাওয়ালি, গজল) — নুসরাত ফতেহ আলি খান, আবিদা পারভীন
ভারতের সুফি ধ্বনি — কৈলাশ খের, রাহাত ফতেহ আলি খান
ওয়েব সিরিজ/ফিল্ম — Ertugrul-এ তাসাওফের প্রভাব, কুরআনিক যিকরের দৃশ্য
ইউটিউব ব্লগারদের সফর — সুফি দরগায় যাওয়া, ধ্যান করার অভিজ্ঞতা
এই সবকিছুই তরুণদের কাছে সুফিবাদকে করে তুলেছে আকর্ষণীয়, সুন্দর ও উপলব্ধিযোগ্য।

৬. আত্ম-অন্বেষণ ও Mindfulness ট্রেন্ড
আধুনিক তরুণ প্রজন্ম আত্ম-উন্নয়ন ও Mindfulness ট্রেন্ডে ঝুঁকছে। তারা ধ্যান, ধৈর্য, এবং আত্মচর্চার পথে আগ্রহী। সুফিবাদও এসব বিষয়ের চর্চা করে:
যিকর (Dhikr): হৃদয়ের ধ্যান
মুরাকাবা: আত্মা ও সৃষ্টিকর্তার মধ্যে গভীর সংযোগ
তাওবা ও তাযকিয়া: আত্মার বিশুদ্ধি
এই বিষয়গুলো আধুনিক Mindfulness-এর বিকল্প নয়, বরং প্রাচীন ইসলামি বিকল্প।

৭. সুফিবাদে ব্যক্তিত্বের বিকাশ
সুফিবাদ তরুণদের শুধু আল্লাহর কাছে নয়, নিজের কাছেও ফিরিয়ে আনে। এটি তাদের আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতা ও অন্তর্জ্ঞানকে জাগিয়ে তোলে:
আত্মবিশ্বাসী হওয়া, অহংকারী নয়
ক্ষমাশীল হওয়া, দুর্বল নয়
প্রেমময় হওয়া, অন্ধ নয়
এভাবেই সুফিবাদ তরুণদের আত্মমুক্তি ও আত্মবিকাশের দিকনির্দেশনা দেয়।

৮. সুফিবাদে নারী ও পুরুষের সমান মর্যাদা
অনেক তরুণী ইসলামি অনুশাসনে নারীর প্রতি বৈষম্য অনুভব করেন। সুফিবাদ তাদের জন্য একটি বিকল্প আশ্রয় দেয়:
সুফিবাদে নারী-পুরুষ উভয়েই আত্মা, দেহ নয়।
ইতিহাসে অনেক মহিলা সুফি সাধিকা ছিলেন—যেমন, রাবেয়া বসরী।
প্রেম ও ভক্তির ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদ নেই।
এই দৃষ্টিভঙ্গি তরুণদের দৃষ্টিকে উদার করে তোলে।

৯. সুফি গানের ব্যতিক্রমী আকর্ষণ
আজকের তরুণরা কেবল কথায় নয়, সুরে আবেগ খোঁজে। সুফি সংগীত এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে:
কাওয়ালি: সংগীতের মাধ্যমে যিকর ও ধ্যান
গজল ও হামদ: হৃদয়ঘন ভালোবাসার বাণী
ধ্রুপদি রাগে সুফি কবিতা: উচ্চতর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা
এই গানের মধ্য দিয়ে তারা অনুভব করে ভালোবাসা, চোখে জল আসে, অন্তর নরম হয়।

১০. সুফি সাধকদের জীবনী থেকে অনুপ্রেরণা
তরুণরা আজ আর আদর্শ খুঁজে পায় না—নেতাদের মধ্যে নয়, তারকাদের মধ্যে নয়। তারা খুঁজে পায়:
রূমীর মতো ভালোবাসায় মগ্ন মানুষ
বায়েজিদ বস্তামীর মতো আত্মবিলয়কারী সাধক
শাহ জালাল, শাহ মখদুম, বাবা ফারিদ এর মতো নির্লোভ সমাজ সংস্কারক
এই আদর্শিক জীবনের গল্প তাদের প্রেরণা দেয় নতুন করে মানুষ হতে।

উপসংহার: হৃদয় থেকে হৃদয়ে ফেরার ডাক
সুফিবাদ কোনো নতুন ধর্ম নয়, কোনো দল বা সম্প্রদায়ও নয়। এটি হৃদয় থেকে হৃদয়ের পথে যাত্রা। তরুণেরা আজ সেই হৃদয়ের পথে ফিরে আসতে চাইছে। তারা ভালোবাসা খুঁজছে, আত্মা খুঁজছে, আর আল্লাহকে খুঁজছে।
এই খোঁজেই সুফিবাদ আজ তাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কারণ এখানে কোনো জোর নেই, ভয় নেই—শুধু প্রেম আছে, আলো আছে, আর আত্মার মুক্তি আছে।
সুফিবাদ হলো সেই পথ, যেখানে তুমি নিজেকে হারিয়ে দিয়ে আল্লাহকে খুঁজে পাও।

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

Related articles