লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী
নূরে মুজাচ্ছাম, রহমতে আলম, ইমামুল মুরছালিন, ছাইয়্যেদুল কাওনায়েন, আশরাফুল আম্বিয়া, হাবিবুল্লাহ, আহম্মদে মুজতবা মোহাম্মাদ মোস্তফা রাসুলুল্লাহ্ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম মহান আল্লাহ্ পাকের জাতি নূরের জ্যোতি-সৃষ্টির প্রথম সৃষ্ট “নূর” । পরম সত্তা (গঞ্জ মফি) গুপ্ত ধনাগারে একাকী ছিলেন । আপন মহিমা প্রকাশের ইচ্ছায় স্বীয় জাত নূর হতে সর্ব প্রথম নূরে মোহাম্মাদী সৃষ্টি করেন । অতঃপর অন্যান্য মাখলুক নূরে মোহাম্মাদী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে । ইহাই আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত এর সকল উলামা মাশাইখের আকিদা। এ পর্যায়ে বিষয়টি দলিল ভিত্তিক নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হ’ল ।
পবিত্র কোরআনের আলোকে রাসূল (সঃ) – নূর
পবিত্র কোরআনে যে কয়টি জিনিসকে “নূর” বলা হয়েছে তার মধ্যে রাসূলে পাক (সঃ) অন্যতম। হাবিবুল্লাহ্ রাসূল (সঃ) আল্লাহর “নূর” এবং “নূর” হয়েই এসেছেন – যা কোরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ আছে ।
দলিল-১ : ক্বাদ জা’য়াকুম মিনাল্লাহে নুরুন ওয়া কিতাবুম মুবীন ।
অর্থাৎ :- অবশ্যই আল্লাহর নিকট থেকে তোমাদের কাছে এসেছে নূর এবং সুস্পষ্ট কিতাব । (সূরা মায়েদা ১৫ নং আয়াত)। কোরআনের এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায় আল্লাহর তরফ থেকে “নূর” এসেছে । এখন জানতে হবে কে সেই নূর?
দলিল-২ : ইয়া আইয়্যুহান্নাস ক্বাদ জা’য়াকুম বুরহানুন মির রব্বিকুম ওয়াআন ঝালনা ইলাইকুম নুরান মুবীন ।
অর্থাৎ :- হে মানুষ অবশ্যই তোমাদের কাছে রবের তরফ থেকে প্রমাণ এসেছে এবং আমি তোমাদের প্রতি উজ্জ্বল “নূর” প্রেরণ করেছি । (সূরা আন নিসা ১৭৪ নং আয়াত)। পবিত্র কোরআনের এই আয়াত দ্বারাও বুঝা গেল- আল্লাহর তরফ হতে আমাদের কাছে “নূর” এসেছে ।
দলিল-৩ : আল্লাহু নুরুচ্ছামাওয়াতে ওয়াল আরদে মাছালু নুরিহী….. । অর্থাৎ :- আল্লাহ্ আসমান ও জমীনের নুরদাতা, মেছাল হ’ল চেরাগের মত । (সূরা নূর ৩৫ নং আয়াত)। আয়াতে উল্লেখিত “নূর” ও নূরের মেছাল সম্পর্কে হক্কানী রব্বানী ফকিহ্ মুজতাহিদ মুহাদ্দিস ও মুফাচ্ছির গনের অভিমত, নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হ’ল ।
অভিমত-ক : আল্লামা ইমাম জালালদ্দিন ছিয়তী (রঃ) উক্ত আয়াতের তাফছিরে বলেনঃ অবশ্যই তোমাদের কাছে আল্লাহর তরফ থেকে “নূর” এসেছে আর এই “নূর” হলেন নবী মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্ (সঃ) । আর কিতাব হলো সু-স্পষ্ট কোরআন । (তাফছিরে জালালাইন-১৯৭ পৃ: তাফছিরে ছাবীর ১ম খন্ড ৪৫১ পৃঃ)
অভিমত-খ : বিশ্ব বিখ্যাত ইমাম আল্লামা ইমাম বাগভী (রঃ) প্রায় এক হাজার বছর পূর্বে উল্লেখ করেছেন : আল্লাহর তরফ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে “নূর”- অর্থাৎ মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্ (সঃ) (তাফছিরে বাগভী ২য় খন্ড ১৩৮ পৃ:)
অভিমত-গ : ইমাম আল্লামা আবু জাফর তাবারী (রঃ) বলেন :- হে আহলে তাওরাত ও ইঞ্জিল গন । আল্লাহর তরফ হতে তোমাদের নিকট এসেছে “নূর” অর্থাৎ “নূর” দ্বারা অর্থ হচ্ছে মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্ (সঃ) যার মাধ্যমে আল্লাহ্ পাক সত্যকে উজ্জ্বল করেছেন এবং যার মাধ্যমে ইসলামকে প্রকাশ করেছেন । (তাফছিরে তাবারী শরীফ ৬ষ্ঠ খন্ড-১৭৬ পৃ:)
অভিমত-ঘ : আল্লামা মাহমুদ আলুছী বাগদাদী (রঃ) বলেন : নিশ্চয়ই আল্লাহর তরফ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে “নূর” । তিনি সবচেয়ে বড় “নূর” এবং তিনি সকল নূরের “নূর” । তিনি নবী মুখতার মুহাম্মাদ (সঃ) । (তাফছিরে রুহুল মায়ানী ৬ষ্ঠ খন্ড-২৪পৃ:)
অভিমত-ঙ : ইমাম আবু জাফর তাবারী (রঃ) ও আল্লামা আবু মুহাম্মদ আবদুর রহমান ইবনে মহাম্মদ আর রাজী ইবনে আবী হাতেম (রঃ) উল্লেখ করেন- হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) কা’ব আহবার (রাঃ) এর কাছে আসলেন ও বললেন “আল্লাহ্ আসমান জমীনের “নূর” দাতা এবং তার নূরের উদাহরণ (মেছাল) সম্পর্কে আমাকে বলুন । তাঁর নূরের মেছাল বা উদাহরণ হ’ল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর উদাহরণ যেমন “চেরাগ” (তাফছিরে ইবনে আবী হাতেম ৮ম খন্ড-২৫৯৬ পৃ:, হাদীস নং: ১৪৫৭১-তাফছিরে তাবারী ১৭তম খন্ড-২১৭ পৃ:)
প্রিয় পাঠক, এ বিষয়ে অসংখ্য বিশ্ব বিখ্যাত তাফছিরে উক্ত আয়াত সমূহে উল্লেখিত “নূর” দ্বারা নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্ (সঃ) কে ই বুঝানো বা বলা হয়েছে । অতএব প্রমাণ হলো আমাদের দয়াল নবী করীম (সঃ) নিঃসন্দেহে “নূর” বা নূরের তৈরী ।
“ইস্কো মাহবুবে খোদা জিস দিলমে হাছেল নেহী
লাখো মমিন হো মাগার ঈমান মে কামেল নেহী”
সহিহ হাদিস শরীফের আলোকে রাসূল (সঃ) – নূর
হাদিস: হযরত জাবের আল আনছারী (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রাসুলুল্লাহ্ (সঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার পিতা-মাতা আপনার কদমে কোরবানী হউক, ইয়া রাসুলুল্লাহ। আমাকে বলে দিন আল্লাহ্ সর্বপ্রথম কি সৃষ্টি করেছেন? দয়াল নবীজি বললেন হে জাবের নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সব কিছুর পূর্বে তাঁর “নূর” থেকে তোমার নবীর “নূর” সৃষ্টি করেছেন । অতঃপর সে “নূর” আল্লাহর কুদরতে পরিভ্রমণ করতে থাকল যেখানে আল্লাহ্ চেয়েছেন । তখন কোন ওয়াক্ত, লওহ কলম, জান্নাত জাহান্নাম, ফেরেশতা, আসমান জমীন, চন্দ্র সূর্য, জ্বীন ইনছান কোন কিছুই ছিল না ।
এই হাদিস খানা নিম্নলিখিত কিতাব সমূহে রয়েছে –
১। যুযউল মাফকুদ ৬৩ পৃ: (মুছান্নেফ আবদুর রাজ্জাক)
২। আল মাদখাল-১ম খন্ড, ৩২ পৃ: (আল্লামা ইবনুল হাজ্জ)
৩। মাওয়াহিবুল্লাদুন্নিয়া-১ম খন্ড, ৭১ পৃ: (ইমাম কাস্তলানি)
৪। শরহে মাওয়াহেব লিয যুরকানী-১ম খন্ড, ৮৯ পৃ: (ইমাম যুরকানী)
৫। তাফহিমাতে ইলাহিয়্যা- ১৯ পৃ: (শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ দেহলবী)
৬। নশরুত্তিব- ৫ পৃ: (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
৭। ছিরাতে হালাভিয়া- ১ম খন্ড, ৪৭ পৃ: (আল্লাম নুরুদ্দিন হালভী)
নিম্নে উল্লেখিত হাদীস ও কিতাব সমূহে রসূল (সঃ) কে “নূর” বলেছে।
তিরমিজি শরীফ ২য় খন্ড- ২০৩ পৃ:
মেশকাত শরীফ- ৫১৩ পৃ:
মেরকাত শরহে মেশকাত ১০ খন্ড- ৪৩৯ পৃ:
নশরুত্তিব- ২৫ পৃ:
মুসনাদে আহমদ- হাদীস নং: ১৭১৬৩ পৃ:
মুস্তাদরাকে হাকেম হাদীস নং: ৪১৭৫ পৃ:
মুসনাদে বাজ্জার- হাদীস নং: ৪১৯৯ পৃ:
সহীহ্ ইবনে হিব্বান- হাদীস নং: ৬৪০৪ পৃ:
খাছাইছুল কোবরা ১ম খন্ড- ১৬৪ পৃ:
তাফছিরে আজিজি ৩০ পারা- ২১৯ পৃ:
মাওজুয়াতুল কবীর- ৮৬ পৃ:
তাফছিরে রুহুল বয়ান- ২য় খন্ড- ৩৭০ পৃ.
এমদাদুস সুলুক- ৮৫ পৃ.
সিরাতে হালাভীয়া- ১ম খন্ড- ৪৭ পৃ.
ইমাম বুখারীর সূত্রে যাওয়াহিরুল বিহার- ৩য় খন্ড- ৩৩৯ পৃ.
তাফছীরে রুহুল বয়ান- ৩য় খন্ড- ৬৫১ পৃ:, ৭ম খন্ড- ৫৪৩ পৃ.
দালায়ে নুন্নবুয়াত- ১ম খন্ড- ৮৪ পৃ.
প্রিয় পাঠক বৃন্দ, এ বিষয়ে যে পরিমাণ দলিল প্রমাণ আমার সংগ্রহে আছে সেগুলো একত্রিত করলে বড় আকারের একখানা গ্রন্থ হয়ে যাবে ইন্শাল্লাহ্ । এ অধ্যায়ে অল্প কিছু দলিল আদিল্লাহ্ উল্লেখ করে প্রসঙ্গটি শেষ করছি ।
হে পরম করুণাময় আল্লাহ্ আমাদের অন্তরে নূর নবী (সঃ), আহলে বাইত, পাক পাঞ্জাতন ও আউলিয়া কেরামের মহব্বত নসিব করুন । সত্যকে জেনে ও মেনে চলার তাওফীক দান করুন ।
“মোহাম্মাদ মোস্তফা নূরে মুজাচ্ছাম
সিরাজাম মুনীরা রহমতে আলম”
-ছুম্মা আমীন
লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী