আপন ফাউন্ডেশন

Date:

ফেসবুক
ইউটিউব

প্রবন্ধ – ৩ জন পার্সিয়ান সুফি শহীদ

আপন খবর - Apon Khobor

লাবিব মাহফুজ চিশতী

লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী

হুসাইন বিন মনসুর হাল্লাজ রহ.

সুফিবাদের সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী সুফি ব্যক্তিত্ব হলেন হুসাইন বিন মনসুর হাল্লাজ রহ.। যিনি সত্ত্বার অমোঘ উচ্চারণ “আনা আল হক” এর জন্য বিশ্ববিখ্যাত। খোদায়ী রহস্যের ভেতর হারিয়ে যাওয়া এক মহান উপলব্ধি, যা তাকে চালিত করেছিল আনা আল হক বলার রহস্যপুঞ্জের পথে – সেই উপলব্ধিকে ধারণ করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দিগন্তসম নির্বিকার ও দিব্য-উন্মাদ। তার আধ্যাত্মবোধ, কাব্যিকতা ও রহস্যপূর্ণ ব্যাক্তিত্ব তাকে যুগের শ্রেষ্ঠ ওলীরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ধর্মীয় হাকিকত বর্জিত জনমন্ডলির ক্ষোভ ও রাজরোষ তাকে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম আঘাত দিয়েছে, শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন করে ক্রশে ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে দেহ জ্বালিয়ে দিয়েছে, তিনি হাসিমুখে সহ্য করেছেন। অবশেষে অধিষ্ঠিত হয়েছেন আশেকদের মাথার মুকুট হিসেবে।

সুফি মনসুর হাল্লাজের কয়েকটি কবিতা –

১.
প্রেমের সাগরে সাঁতরে চলি অবিরাম
ঢেউয়ের সাথে কখনো দুলে উঠি, কখনো নামি
কখনো বা তলিয়ে যাই –
প্রেম আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় – এমন স্থানে
যেখানে কোনো কূল নেই।

২.
সত্য এবং আমার মধ্যে
যুক্তি প্রমাণের দেয়াল আর নেই।
কিংবা নেই প্রত্যাদেশে সাক্ষ্য –
এখন, প্রতিনি ক্ষীণ আলোর মাঝেই –
আমার সত্যের দীপ্তি পূর্ণ প্রজ্জলিত।

৩.
তোমার সন্ধানে আমি স্থল ও জলপথ পেরোই
পার হয়ে যাই মরুভূমি, বিভক্ত করি পাহাড়কে –
এবং মুখ ফেরাই সকল কিছু থেকে।
যতক্ষণ না তোমাকে পাই, একান্তে।

৪.
আমাকে হত্যা করো, বন্ধূরা,
কারণ, আমার জীবন তো
আমার নিহত হওয়ার মধ্যেই।
ভালোবাসা এটাই –
তখনও অবিচল থাকবো আমি
যখন কেড়ে নেওয়া হবে সমস্তকিছু।
আমার সমস্ত গুণ।
তখনি তাঁর গুণরাশি লাভ করবো আমি।
আমার আর তোমার মধ্য থেকে –
সরিয়ে দাও আমাকে –
যেন শুধু তুমিই থাকো ।

৫.
আমি সেঁ, যাকে আমি ভালোবাসি
যাকে আমি ভালোবাসি, আমিই সেঁ।
আমরা এক দেহে দুটি আত্মা।
যদি আমাকে দেখো, তবে তুমি তাকেই দেখো
যদি তুমি তাকে দেখো, তবে তুমি আমাকেই দেখো।

আইনুল কুজাত হামাদানী রহ.

আইনুল কুজাত হামাদানী একজন পার্সীয়ান রহস্যবাদী, ধর্মতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সুফি ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন ইমাম আল গাজালীর ভাই আহমদ গাজালীর শিষ্য। ইমাম গাজালী, ওমর খৈয়ামের সঙ্গও লাভ করেছিলেন তিনি। তাঁর প্রতিভার জন্য তাকে আইনুল কুজাত বা বিচারকদের মুক্তা বলা হত। তাহমীদাত, জুবদাত আল হাক্বারিফ ফি কাশফ আল হালক তার রহস্যবাদ বা ইসলামী মরমী দর্শনের ওপর বিখ্যাত দুটি বই। ইসলামী আধ্যাত্মবাদ তথা সুফিবাদের রহস্যাবলীর প্রকাশক ছিলেন বিধায় তিনি তৎকালীন সেলজুক শাসকদের বিরাগভাজন হন এবং মাত্র ৩৩ বছর বয়সে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে মৃত্যদন্ডপ্রাপ্ত হন। মনসুর হাল্লাজের মতই ক্রুশবিদ্ধ করে এবং পুড়িয়ে তাকে হত্যা করা হয়।

সুফি আইনুল কুজাতের কিছু কবিতা –

১.
আমি আল্লাহর কাছে মৃত্যু ও শাহাদাত চাই
তিনটি সুলভ জিনিসের মধ্যে –
যদি বন্ধু (আল্লাহ) আমার ইচ্ছা পূর্ণ করেন –
আমি আগুন, তেল ও খড় চাই।

২.
যতদিন বেঁচে থাকবো
তোমাকে ভালোবাসার যন্ত্রণা আমি পান করবো।
সারাজীবন, এমনকি মৃত্যুর পরেও।
এবং পুনরুত্থানের দিনে –
মস্তিষ্কে ঝড় এবং সুতীব্র তৃষ্ণা নিয়েই
এগিয়ে যাবো আমি।

৩.
যিনি সহস্র জগতকে রাঙিয়েছেন বিভিন্ন রঙে
তিনি কিভাবে আমি ও তুমি এর রঙে
রাঙতে পারেন?
রঙ তো কেবল খেয়াল ও কল্পনা –
তিনি বর্ণহীন, এই বর্ণচ্ছটাকেই গ্রহণ করতে হবে।

৪.
অস্তিত্বের মাঝেই অনস্তিত্ব
আমার বিধান হারিয়ে যাওয়ার মাঝেই।
হারিয়ে যাওয়াই আমার ধর্ম।

৫.
চক্ষুর অভ্যন্তরে
আমি স্থাপন করেছিলাম আরেক চোখ –
তাঁরই সৌন্দর্যে সাজিয়ে।
হঠাৎ-ই পতিত হলাম পূর্ণতার চতুর্ভাগে –
সকল দৃষ্টি থেকে, মননের চক্ষু থেকেও।

শিহাব আদ দীন ইয়াহিয়া সুহরাওয়ার্দী রহ.

পারস্য বংশোব্ধূত শিহাব আদ দীন ইয়াহিয়া সুহরাওয়ার্দী ইরানের সুহরাওয়ার্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাজদ আদ দীন জিলি, ফখর উদ্দিন রাযি সহ কয়েকজন বিখ্যাত বিদ্বানের সংস্পর্শে আসেন তিনি। সংক্ষিপ্ত জীবন ছিল তার। পরবর্তীতে ইরাক ও সিরিয়ার বসবাস করেন এবং জ্ঞানীয় চর্চাকে শানিত করেন। তিনি ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে হিকমাত আল ইশরাক নামে এক নতুন শাখা যুক্ত করেন এবং তিনিও শাইখ ই ইশরাক নামে খ্যাত হন। তার কিতাব আলোকিতকরণের দর্শন সে সময়ে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। ধর্মীয় গুহ্যতত্ব তথা ইলমে মারেফাত ও সুফিবাদ (বাতিনি ইলম) প্রচারের কারণে আইয়ুবি শাসক ও কুর্দি সেনাপতি মালিক আল জাহিরের বিরাগভাজন হয়ে মৃতুদন্ডপ্রাপ্ত হন। দূর্গচূড়া থেকে ফেলে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল তাকে।

সুফি শিহাব আদ দীন সুহরাওয়ার্দী বলেন –

যিনি দর্শন ( হিকমত ) জানেন এবং জ্যোতির্ময় সত্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও পবিত্রতা সাধনে অবিচল থাকেন, তিনি রাজকীয় গৌরব ( খাররেহ ) ও জ্যোতির্ময় দীপ্তি ( ফাররেহ ) দ্বারা ভূষিত হবেন এবং—যেমন আমরা অন্যত্র বলেছি— ঐশ্বরিক আলো তাঁকে রাজকীয় ক্ষমতা ও মর্যাদার চাদরে আবৃত করবে। অতঃপর এমন ব্যক্তি মহাবিশ্বের স্বাভাবিক শাসক হয়ে উঠবেন। তিনি উচ্চ স্বর্গ থেকে সাহায্য লাভ করবেন এবং তাঁর সমস্ত আদেশ মান্য করা হবে; আর তাঁর স্বপ্ন ও অনুপ্রেরণা তার সর্বোচ্চ, নিখুঁত শিখরে পৌঁছাবে।

লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
চেয়ারম্যান – আপন ফাউন্ডেশন
সম্পাদক – আপন খবর পত্রিকা

Others Post

Labib Mahfuj Chisty

Editor - Apon Khobor

ফেসবুক পেজ
ইউটিউব
হোয়াটসএপ গ্রুপ
টেলিগ্রাম গ্রুপ