লাবিব মাহফুজ চিশতী
প্রতিবছর যখন আকাশে উদিত হয় মহররমের চাঁদ, আশেকের অস্তিত্বের গভীরে তখনই জেগে উঠে এক শাশ্বত রহস্যের সীমারেখা, প্রেম ও আত্মবিসর্জনের মহাজাগতিক মাকাম, ফানা ও বাকার চিরন্তন মিলন মোহনা। বুকে বয়ে চলা এক অনন্ত দীর্ঘশ্বাস, যা অনাদীকালের ঐকতান হয়ে বেজে চলেছে সৃষ্টির সীমানাজুড়ে, সে দীর্ঘশ্বাস পায় রূপ! কারবালার রূপে, ফোরাতের রূপে। তাজা রক্তের টকটকে লাল রঙে রাঙিয়ে রূপ পায় সে ঐশী চেতনা।
যে আদি চেতনা সৃষ্টির পূর্বেই তাঁর আপন ভান্ডার থেকে ঘোষণা করেছিলেন স্বপ্রকাশের ফরমান – “আমি গোপন ধনভান্ডার থেকে প্রকাশিত হতে চাই।” সেদিনই রূপ পেয়েছিল এমন এক ঐশী অনুভব, যার নাম ইশক, প্রেম। এই মহাজাগতিক প্রেমেরই বয়ে চলা দেখতে পাই আমরা সময়ের পলে পলে। নুহের তরীতে, ইবরাহিমের আগুনে, মুসার তুরে, ঈসার ক্রন্দনে – সে ইশকের জয়গান ধ্বনিত হয় বারংবার। সেই ইশকের, মহাজাগতিক রহস্যের চরমতম প্রকাশ কারবালায়, ফোরাতের কূলে, হুসাইনী মন্ত্রে দীক্ষিত প্রতিটি উত্তীর্ণ মানব হিয়ার অশ্রু নদীর কূলে কূলে।
কারবালায় হুসাইন পরাজিত হয়নি, কারবালায় স্বমহিমায় ধ্বনিত হয়েছে ঐশী প্রেমের জয়গান। সাধারণ চক্ষু যেখানে দেখতে পেয়েছে তাজা রক্ত, আরেফের দৃষ্টি সেখানে খুঁজে পেয়েছে শাশ্বত নূরের ফোয়াড়া। মানুষ যেখানে দেখেছে মৃত্য, আশেক সেখানে দেখেছে মিলন, মানুষ দেখেছে বিচ্ছেদ আর সুফি সেখানে খুঁজে পেয়েছে চিরন্তন ওয়াসেল।
“ইত্তেসাল বেতাকিফ বেকিয়া হাস্তরবিন্নাছ,
রাবা রবাস জানে নাস“
মানুষ যখন মুহাম্মদী নূরে নূরান্বিত হয়, তখন যুগ-যুগান্তরের চাপা নফসানিয়াতের দেয়াল ভেঙ্গে পরে, আর মানবহৃদয়ের অন্তঃপূরে সূচিত হয় দ্বীনের জয়যাত্রা। হুসাইনের কাফেলা। মরু-হৃদয়ের সাইমুম হয় পথের দিশা, যার প্রতিটি ঝাপটা বহন করে আহলে বাইতের সকরুণ নিঃশ্বাস। এ যাত্রা যে প্রেমের, মহামরণের, আত্মবিসর্জনের। এ যাত্রা যে কারবালার!
জ্ঞান, প্রেম ও মারেফতের নদী ফোরাত। ভক্তি বিশ্বাস ও প্রেমের নদী ফোরাত। যার কূলেই নির্মিত হয় কারবালা। কারবালা – প্রেমের কাটাপথ, ইশকের যন্ত্রণাময় বেদী।
কারবালার কান্না তাই নফসানি ইয়াজিদের বিরুদ্ধে সত্যের হেমলক পান করবার অমোঘ আহ্বান। ক্ষুধিত, পিপাসার্ত সত্যকে হিরকচূর্ণের শীতল পরশ দান করবর আহ্বান, কচি কন্ঠে পাষাণ তূণের এফোড়-ওফোড় আলিঙ্গন!
হুসাইন হৃদয়ের সে নূরের ধারা প্রেমিককে মুহাম্মদী আলোয় আলোকিত হবার প্রেরণা জোগায়। নফস ইয়াজিদের কলুষ তখত ধূলায় লুটানোর শিক্ষা বয়ে আনে মহামরণের মাধ্যমে। অনন্ত সৃষ্টির ফোয়াড়া জারি রাখার নিত্য পন্থা কায়েম হয় সে নিত্য কারবালায়, আশেকের হৃদয় কারবালায়। হাল মিন নুসুরিন ইয়ানসুরুনা কোনো কান্না নয়, এটি আত্ম উন্মোচনের বিজয় ভৈরবী। আলাম তাসমাও, আলাইছা ফি মুসলিমুন কোনো আক্ষেপ নয়, এটি প্রেমিক বিনির্মাণের পরাকাষ্ঠা।
কারবালা সে ঐশ্বরিক ভূমি, মুহাম্মদ সা. যেখানে অন্তর্লীন হয় হুসাইনের অঙ্গে, পাক পাঞ্জাতনের অপার মহিমা যেখানে প্রস্ফুটিত হয় মরু-মাকামে, দশদিক প্লাবিত করে নূরের ধারা যেখানে জারি করে দ্বীন, দ্বীনে মুহাম্মদ। কারবালা সেই চিরন্তন সময়, ফোরাত সেই চিরন্তন অববাহিকা, যেখানে সমগ্র সৃষ্টি নমিত হয় সেজদায়, মহামিলনে, বাকায়। কারবালা সে সেজদার ভূমি, কারবালা সে নিবেদনের বেদী, কারবালা সে মহাপ্রেমের ভিত্তি।
কারবালা সে চূড়ান্ত প্রেমের মাকাম, আশেকের সেজদা যেখানে কবুল হয়।
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
সম্পাদক – আপন খবর
পরিচালক – আপন ফাউন্ডেশন

