Forty Rules Of Love – শামস তাবরীজের “ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র” অবলম্বনে এলিফ শাফাক রচিত “ফরটি রুলস অব লাভ” থেকে চল্লিশ নিয়মের ভাবানুবাদ।
ভাবানুবাদ করেছেন – লাবিব মাহফুজ চিশতী
প্রকাশনায় – আপন খবর
পর্ব – ০১
প্রভু দর্শন চাও? নিমার্ণ করো তোমার দৃষ্টি। তোমার প্রভু তো তুমি যা দেখো তারই প্রতিচ্ছবি! প্রভু কেমন সেটি মূখ্য বিষয় নয়, প্রকৃত বিষয় হচ্ছে তুমি কেমটি দেখছো তাকে!
প্রভু, সেতো পরম প্রেমময়তায় তোমার অন্তরাত্মায় অহর্নিশী বিরাজ করে। যদি তুমি তাকে রূপে রসে রূপায়িত করতে চাও তবে সে রূপকে আঁকতে হবে তোমার হৃদয়ের মাধুরী মিশিয়ে। যেমনটি চাইবে তোমার হৃদয়, তেমন রূপেই প্রস্ফুটিত হবে তোমার প্রভু। যেমনটি তোমার অন্তর, তেমন রূপটিই প্রকটিত হবে তোমার নয়নে, তোমার প্রভু রূপে। প্রভু তো বাহ্যিক কোনো কাঠামোবদ্ধ আকৃতি নয়। সে তোমার প্রাণের প্রাণময় পরম সত্ত্বা। যদি তোমার আত্মা হয় পরিশুদ্ধ, জঞ্জালমুক্ত, নিষ্কলুষ, সেই তো পরম। সে রূপটিই তো পরম প্রভুর রুপ।
প্রভুর দর্শন চাও? নির্মাণ করো আপনত্বকে। আপনার রূপ কে করো নির্ভেজাল। জেনে রাখো, সে রুপটিই তোমার প্রভুরূপ।
যদি তুমি হও পাপী বা কুৎসিত, তোমার প্রভুটিও পাপী বা কুৎসিত। মমতাবান বা প্রেমময় ঈশ্বর চাও? নিজে পরিণত হও ভালোবাসাময় বা মায়াময় মানুষে।
‘তুমি যেমন, তেমনটি তোমার ঈশ্বর’।
পর্ব – ০২
প্রেমময় হও। নিজের পরিচালক নিযুক্ত করো নিজের হৃদয়কে। কোনো যুক্তি-বুদ্ধি বা মস্তিষ্ক দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করো মহাপ্রেমময়ের প্রেমকে। হৃদয়ই কেবল সেই অনন্ত প্রেমের মহিমাকে ধারণ করতে পারে।
সবাইতো অনুসরণ করে মস্তিষ্ককে। নিজের বুদ্ধিকে। তুমি না হয় বোকাই হও। বিসর্জন দাও নিজের সমস্ত জ্ঞানকে। হয়ে উঠো উন্মাদ। আরো উন্মাদনাময়। কথা বলতে দাও তোমার হৃদয়কে। সেই তোমায় যথার্থ পথ দেখাবে। হৃদয়তীর্থের অনুসরণেই আসবে কাঙ্খিত প্রেমময়ের স্বান্নিধ্য। সেতো হৃদয়েই বিরাজিত।
হৃদয়ের প্রেমবলেই বিজয়ী হও প্রবৃত্তিসমূহের উপর, যে কুপ্রবৃত্তিগুলো তোমায় ফিরিয়ে রাখে হৃদয় হতে। হৃদয়ের অনুভূতি দ্বারা জেনে নাও তোমার অস্তিত্বকে, আপনত্বকে। যা তোমাকে পরিচালিত করবে মহান প্রভুর দিকে।
‘হৃদয়েই তোমার যথার্থ পথ প্রদর্শক’।
পর্ব – ০৩
কি করে তাঁকে আবদ্ধ করো ইট পাথরের জঞ্জালতায়? যিনি সর্বত্র বিরাজিত! যার কৃপাদৃষ্টি তলেই প্রবাহিত হয় অনন্ত জগত। ধরার প্রতিটি অনুতে অনুতে যার মন্দির! জগতের সকল কিছুর মধ্যে তুমি ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতে পারো। তিনি কোথাও সীমাবদ্ধ নন। প্রেম ভক্তি ও বিশ্বাস দ্বারা নির্মিত একটি দৃষ্টি তাঁকে সর্বদাই দেখে থাকে। প্রভুতো পরম প্রেমোময়। পরম প্রেমোধনে ধনী তিনি প্রেম বিলাতে ব্যাকুল। অনুভূতির তীক্ষèতা দ্বারা বাধো তাঁকে, তোমার হৃদয় মঞ্জরে।
জানতে চাও তাঁর বাসস্থান কোথায়? জেনে রেখো, তাঁকে সন্ধানের কেবলমাত্র একটি জায়গাই আছে। সেথায় তিনি নিত্য বসত করেন। যদি সেথায় খুঁজতে পারো তাকে তবে তিনি অবশ্যই সাড়া দেবেন।
প্রভু বাস করেন সত্যিকার প্রেমিকের হৃদয়ে। তিনি পূর্ণরূপে বিকশিত হন শুধু প্রেমসিক্ত হৃদয়ে। হৃদয় ব্যতিত অন্য কিছু খোদাকে পূর্ণরূপে ধারন করতে পারে না।
ঈশ্বর, একমাত্র বাস করেন প্রেমিকের হৃদয়ে।
পর্ব – ০৪
বুদ্ধি ও প্রেমের দ্বন্দ্ব চিরকালের। আমাদের অর্জিত জ্ঞান ও সতর্ক বুদ্ধিবৃত্তি চিরকাল-ই আমাদেরকে জ্ঞানের ও সচেতনতার দেয়ালে আবদ্ধ করে রাখে। চিরমুক্তির পথে তৈরী করে অতীব সুক্ষ বাধা। আমিত্বকে সংরক্ষণ করে চাতুর্যতার সাথে এবং সযতনে। তাই বুদ্ধিবৃত্তিক আচরণ কে অতিক্রম করেই হতে হয় উন্মাদ। হিতাহিত জ্ঞানশুন্য। তখনই হৃদয় হয়ে ওঠে উন্মুক্ত, ভালোবাসাকে গ্রহন করার মতো উদার।
উন্মাদ হও। ভুলে যাও সমস্ত বন্ধন। প্রাণের উন্মত্ততাকে করো তোমার অনন্ত রথ সারথী। শুধু অনুভব করো তোমার হৃদয়ের অনুরাগকে। দয়াময়ের প্রেমকে।
আচরনকে বুদ্ধি দিয়ে নিয়ন্ত্রন করার চাইতে প্রেম দিয়ে উন্মুক্ত করে দেয়াই প্রেমিকের কাজ। দরিয়া যদি হয় ভালোবাসার, সেক্ষেত্রে নিশ্চিতই ডুবে যাও। জীবনকে পরিণত করো অনিশ্চয়তার মরূভূমিতে, সুখের গৃহকোনে নয়।
অনুরাগ দিয়ে বেঁধে রাখো নিজেকে। হ্যাঁ, বার বার ঠকে যাও। চূর্ণ বিচূর্ণ হোক হৃদয় । প্রেমকে ধারন করার জন্য ক্ষত বিক্ষত হৃদয়ই উপযুক্ত। ভাঙা হৃদয়েই বিরাজিত সকল ধন।
বুদ্ধি করে নয়, স্বতঃস্ফুর্ত প্রাণের আবেগ কে করো অবলম্বন, ডুবে থাকো শুধু প্রেমে।
পর্ব – ০৫
প্রভু তো প্রতিনিয়ত কথা বলে। তোমাকে তার শাশ্বত প্রেমের অমরলোকে ডেকে চলে অবিরত। শুনতে পাওনা? কিভাবে শুনবে, হৃদয়ে যদি রয় এতো কোলাহল?
বাহির তো কেবল বাহির-ই দেখে। প্রেমের উপযুক্ত হতে হলে দেখতে শেখো ভিতর। অনুভব করতে শেখো শুণ্যতা এবং শুনতে শেখো নীরবতার ডাক। তোমার বাহ্যিক আচরণ, বাহ্যিক কথা, ভাষা, সর্বোপরি তোমার বাহিরের এতোকিছু, সে অনন্ত প্রেমের অনুভূতিতে পৌঁছতে পারে না। প্রেমের অনুভব কখনো মুখে উচ্চারণ করা যায় না, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, সে তো শুধু উপলব্ধি! এক অনন্ত শুণ্যতা, অপার বিশালতা, যা কোনো সীমায় আবদ্ধ নয়!
প্রবেশ করো মহিমান্বিত প্রেমের রাজ্যে। দু’চোখ বন্ধ করে খুলে নাও অন্য দৃষ্টি। সকল ভাষা ভুলে কথা বলো অনন্তের ভাষায়। শাশ্বত প্রেমকে ধারণ করো তোমার নির্বিকার নিত্যতায়। সেখানে সব অচল। চালু থাকুক কেবল তোমার অনুভূতি, প্রেম, আনন্দ আর আনন্দ।
প্রেম কথা বলে নীরবতার ভাষায়, নির্লিপ্ততার আবহে, নির্বিকারত্বের আকারে। নীরব হয়ে যাও। তবেই প্রেম কথা বলে উঠবে।
নীরবতাই সকল কিছুকে আঁকড়ে রাখে!
পর্ব – ০৬
আপনত্ব থেকে বিসর্জন দিতে হবে বাদবাকী অস্তিত্বসমুহকে। নির্ভেজাল অস্তিত্বের মাঝেই বিরাজ করে মহান ঈশ্বর। নিঃসঙ্গতার অনুভব মানেই সঙ্গের অভাববোধ। তাই ঈশ্বরানুভূতির সবচেয়ে সুন্দর উপায় হচ্ছে নির্জনতা। যেখানে শুধুই তুমি আর তোমার অন্তরতমস্ত, সেখানে আর কেউ কথা না বলুক। না থাকুক কোনো পক্ষ-প্রতিপক্ষ, না থাকুক কোনো শব্দ। শুধুই নির্জনতা।
একা হয়ে ডুবে যাও ঈশ্বর সন্দর্শনে। যদি থেকে থাকে তোমার সাথে অন্য অন্য অস্তিত্বসমুহ বা অস্তিত্বের প্রতিক্রিয়া, তবে নিশ্চিতই হারাবে তাকে। সে ভালোবাসার এক অনন্য মহিমা। শুধু একাগ্রতা ও হৃদয়ের শতভাগ অনুরাগ প্রচেষ্টার দ্বারাই তাকে ধরা যায়।
খুঁজে নাও তাকে যে তোমার প্রভু দর্শনের দর্পন। যার চেহারায় দেখতে পাবে খোদাকে। স্বয়ং যিনি প্রভুপ্রেমের আধাঁর। তবেই পাবে তাকে। সে আধেয় সদা বিরাজে ভালোবাসার মানমন্দিরে, পবিত্রাত্মায়, যাকে তুমি ভালোবাসো, তোমার সেই প্রেমের আধাঁরে।
ডুবে যাও নির্জনতায়, নিঃশব্দতায়। অনুভূতিতে। ভালোবাসায়।
তোমার ভালোবাসাতেই প্রকাশিত হবে তোমার প্রভু।
পর্ব – ০৭
প্রভুসন্ধানে ব্যাপৃত মানব মন স্বভাবতই জাগতিক ভাবে নিশ্চল ও নির্বিকার, কিন্তু পরমপ্রাপ্তির পথে সে হয়ে উঠে দুরন্ত, চঞ্চল, উন্মাদনাময় ও অধৈর্য। প্রভুদর্শনের পথের প্রক্রিয়াগুলো তাঁর হৃদয়ের আকুলতার দ্বারা হয়ে ওঠে দ্রুত থেকে দ্রুততর।
ধর্মজগতে আপনত্বে ঈশ্বরানুভূতি বা পরমের উপস্থিতির অনুভব’ই ধার্মিকের পরম প্রাপ্তি। যেখানে নিজেকে প্রভু নামক দরিয়ার মধ্যে অনুভূত হয় এক বিন্দু জলরূপে। অথবা কখনো কখনো হারিয়ে যায় সে অনুভূতিটুকুও। থাকে শুধু আদি অন্তহীন এক শাশ্বত আনন্দ। সদানন্দ, চিদানন্দ বা পরমানন্দ। এ পথ শুধু প্রেমের। প্রেম ও হৃদয়ের অনুরাগ দ্বারা বিনির্মিত হয় এ পথ।
আল্লাহপ্রাপ্তির পথে আবশ্যক কর্মপক্রিয়া গুলোর জন্য যা যা প্রয়োজন তাতে সচেষ্ট হতে হবে। কাঁটার সাথে গোলাপ ও রাতের সাথে প্রভাতের যেমন প্রাসঙ্গিকতা, তেমনি অনুরাগ সাধনা ও প্রভুদর্শনের পরস্পর সম্পৃক্ততা। হে পথিক, প্রস্তুত হও পথের সামগ্রিক প্রয়োজনের জন্য।
অর্ধচন্দ্রাকার চাঁদ পূর্ণ হতেই সময় লাগবেই। তেমনি অনুরাগ দ্বারা ধীরে ধীরে নির্মিত হবে প্রভু। সে প্রভুতে নিষ্ঠাবান হও।
তোমার প্রভু নির্মিত হবে তোমার হৃদয়েই।
পর্ব – ০৮
বিশ্বাস কে আজীবনের জন্য চিরসঙ্গী করে নাও। যাই হোক না কেনো, প্রভু তো রয়েছেন। কেনো ভয় তোমার? বিদায় জানাও সমস্ত হতাশাকে। জেনে রেখো, হতাশাই তোমাকে অনুপযুক্ত করে তোলে অনন্ত সুখ থেকে। তোমার পারিপার্শ্বিক অবস্থা যত কষ্টকর-ই হোক না কেনো – হতাশ হোয়ো না। যদিও বন্ধ হয় সমস্ত দরোজা- উত্তরণের এমন একটা পথ তো রয়েছে, যা প্রভু উন্মুক্ত করবেন!
কৃতজ্ঞ হও। তব হৃদয় যদি হয় নিবেদিত ও সমর্পিত, তবে কৃতজ্ঞতা হবে তোমার সর্বক্ষণের সঙ্গী। এমন কিছু যা তুমি পাওনি- তার জন্য অকৃতজ্ঞের মতো আচরণ কিভাবে করবে, যেখানে তুমি না চাইতেই পেয়ে গেছো- এমন পুরষ্কার ঢের বেশি!
বরং- সুফি তো তিনিই যিনি কিছু পেতে নন, বরং হারাতে চান সব। দেয়া হোক, এমনটা চান না কোনো সুফি, তারা চান তাদেরকে বঞ্চিত করা হোক। কারন সুফি তো অখন্ড ও পূর্ণ মানব, যেখানে তাঁকে দেয়ার আর কিছু থাকে না। একজন সুফি কৃতজ্ঞ এ জন্যেও যে, তাকে অস্বীকার করা হয়েছে বা বঞ্চিত করা হয়েছে।
আপনাতে পূর্ণ হও।
পর্ব – ০৯
প্রভু সন্দর্শন এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে শুধু প্রভুতেই নিবিষ্টতা বজায় রেখে নিরন্তর তার ধ্যানে নিজেকে ব্যাপিত রাখতে হয়। মনন ও চিন্তন থেকে ঝেড়ে ফেলতে হয় প্রভু ব্যাতিত সমস্ত কিছুকে। তবেই হৃদয়ের একক অধিশ্বর তার আপন মহিমা নিয়ে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে আশেকের ভিতর বাহিরে তথা সর্বময়।
উত্তর দক্ষিন বা পূর্ব পশ্চিম নয়, প্রভু প্রাপ্তির জন্য সালেক’কে নির্ধারন করতে হয় একটি অভ্রান্ত দিক, যে দিকে বিরাজ করে মহান খোদাতায়ালা। পৃথিবীর দিক গুলো তো আপেক্ষিক বা পৃথিবীকেন্দ্রিক। আর ঈশ্বর যে দিকে বিরাজ করেন সে দিকটি শাশ্বত, চিরন্তন। তিনি কোনো দিক বা দিকসমুহে আবদ্ধ নন। সমগ্রতা ব্যাপী তিনি অধিষ্ঠিত। তাই তার দিক বা আধার সম্পর্কে জানতে পারলে জগৎসমুহের আর কিছুই জানার বাকী থাকে না।
অন্য কোনো দিকে নয়, তোমার চেহারা কে ফিরিয়ে নাও একমাত্র প্রভুর দিকে যিনি সর্বদিকে এবং দিকের উর্ধ্বেও বিরাজমান। যদি তুমি নিজেকে মেলে ধরতে পারো প্রভু স্বানিধ্যে, এবং ভ্রমন করতে পারো সে মহিমান্বিত প্রভুর সন্নিধানে, তবে ব্রহ্মান্ড টাই হবে তোমার, আর পৌঁছে যাবে মহান খোদাতায়া’লার নূরময় অনন্ত মহাপ্রেমের অমর লোকে।
তোমার যাত্রা নিশ্চিত করে নাও একমাত্র প্রভুর দিকে।
পর্ব – ১০
প্রতিটি জন্মের জন্যই প্রয়োজন তীব্র থেকে তীব্রতর বেদনা। ধাত্রী ভালো করে জানে যে, ব্যাথা বিহীন সন্তান জন্ম হয় না। নতুন নির্মাণের জন্যও প্রয়োজন তেমনি বেদনা।
তোমার ভিতরে জন্ম দিতে চাও নতুন আত্মাকে? স্বীকার করে নাও জন্মের জন্য আবশ্যক বেদনাকে। নবজন্ম এক একটি বেদনাময় পরিনতি যেখানে তোমার অস্তিত্বশীল বর্তমান কে মৃত তে পরিনত করে ভেতরে জন্ম দিবে একটি নতুন প্রাণ, যে প্রাণ অনন্তে প্রতিষ্ঠিত হবে বিশ্বপ্রাণে তথা বিশ্বআত্মায়। প্রেমের আনন্দ তো সেখানেই কার্যকর যেখানে রয়েছে বিরহের বেদনা।
ব্যাথাগুলো সবসময় খুলে দেয় নবজন্মের দুয়ার। ব্যাথাভোগেই প্রাণ উপস্থিত হয় সৃষ্টির সকাশে। নবসৃষ্টি সব সময়ই নবরুপে উদ্ভাসিত হয় ব্যাথাভোগের ফলে। তাই প্রাণ কে নবরুপে রুপায়িত করতে হলে ভোগ করতে হবে সাধনার জ্বালা যন্ত্রনা বা ব্যাথাকে। নিজেকে পরিনত করতে চাও মহামানবে? মেনে নাও নির্মাণের জন্য নির্মিত হওয়ার বেদনাকে।
মাটিকে শক্তিশালী হওয়ার জন্য যেমন তীব্র তাপের দহন জ্বালা ভোগ করতে হয়, ঠিক তেমনি মানুষ থেকে মহামানুষ হওয়ার জন্য তোমাকেও ভোগ করতে হবে সাধনার কষ্ট। প্রেম তো কেবল সিদ্ধ হয় বেদনায়।
প্রেমের বেদনাকে ধারণ করো আপনত্বে।
পর্ব – ১১
সন্ধানকারী হও প্রেমের। সে প্রেম তোমাকে সর্বান্তকরনে বদলে দেবে। প্রেমের মাহাত্ম্য এমনই যে, সে প্রেমিকের মধ্যে প্রেমাস্পদের জন্য এমন আকুলতা তৈরি করে, প্রেমিক মুহুর্তে হয়ে ওঠে উন্মাদ। ভুলে যায় একমাত্র মাশুক ব্যতিত সকল কিছু। পতঙ্গ সম আকুল হয়ে ওঠে প্রেমানলে আত্মহুতি দিতে। অনুসরণকারী হও সে প্রেমের, যে প্রেমই পারে তোমাকে তোমার অভীষ্ট পানে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে।
যারা প্রেম বাদে জগতে অন্য কিছু খুঁজে বেড়ায়, জেনে রেখো, তারা শেষ অব্দি কিছুই পাবে না। জগত নামক মায়া মরীচিকার পেছনে ছুটতে ছুটতে জীবন প্রদীপ স্তিমিত হয়ে আসবে, তবু প্রেমরুপ দর্শন হবে না। না হবে পরমতমস্তের সাথে মধুর মিলন।
হে অন্বেষী! সন্ধান করো একমাত্র প্রেমের। যখনি তুমি প্রেমের সন্ধান শুরু করবে, দেখতে পাবে তোমার ভিতরে এবং বাইরে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। তোমার সকল কিছু দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে ও উত্তমরুপে সজ্জিত হচ্ছে মাশুক আগমনের প্রতীক্ষায়। স্বাগত জানাও সে সুন্দরকে। প্রেমের প্রাপ্তিতেই যাকে আপনায় লাভ করবে তুমি।
প্রেমান্বষন-ই প্রেমময়ের সাথে মিলিত হওয়ার একমাত্র উপায়।
পর্ব – ১২
আলোর পাশেই অন্ধকারের অবস্থান। ভালোর সাথেই থাকে মন্দ। সৃষ্টির চিরাচরিত এ নিয়মেই আধ্যাত্মিক গুরুকেন্দ্রিক সাধন জগতে উদ্ভুত হয়েছে ভন্ড ও স্বার্থলোভী পন্ডিত শ্রেণির। যারা গুরু বা মুর্শিদের লেবাস গায়ে জড়িয়ে ভক্ত বানিয়ে করে চলেছে রমরমা ব্যবসা ও স্বার্থ হাসিল। এসব ভূয়া গুরুদের চিনে নিতে হবে যাতে সাধন মার্গে কোনো প্রতারণার স্পর্শ না থাকে।
পারমার্থিক পথ পরিক্রমায় একমাত্র পথপ্রদর্শক ও সহায় হলো দয়াময় মুর্শিদ বা গুরু। যদি আত্মিক পথ পরিক্রমণে গুরু বা মুর্শিদ-ই হয় ভন্ড ও প্রতারক, সেক্ষেত্রে ভক্তের ধ্বংস বা অবনতি তো হবেই। তাই সাধনপথে আগে গুরু নির্ধারণ আবশ্যক এবং কামেল বা সত্য গুরু লাভ-ও একটি বড় সাধনা বৈ কি!
প্রকৃত হেদায়েতকারী তো সেই মহাত্মা যিনি স্বয়ং রব কর্তৃক নিযুক্ত এবং তিনি হবেন রবের পূর্ণ শক্তির যথাযথ প্রকাশ ও প্রভুর সকল গুণসমূহের সংরক্ষণকারী। যার থাকবে না কোনো স্বার্থ, ভক্তের প্রভুপ্রাপ্তি ব্যতিত। যিনি জাগিয়ে তুলবেন ভক্তের সুপ্ত পরমাত্মিক সত্যকে। মুর্শিদ তো খোদার স্বচ্ছ আর্শী যার ভেতর দিয়েই প্রভুর নূর বর্ষিত হয় ভক্তের উপরে।
ভক্তের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মুর্শিদ প্রাপ্তি। কারন মুর্শিদ প্রাপ্তিতেই সে প্রাপ্ত হবে হেদায়াত ও প্রভুকে।
খোদার বর্তমান রূপটিই মুর্শিদ বা গুরু।
পর্ব – ১৩
অনুভব করতে শিখো মহান প্রভুর প্রভুত্বকে। তিনি তো সদা সর্বক্ষণ নিমগ্ন তোমার অভ্যন্তরীন ও বাহ্যিক কার্যাবলীর সাথে। তোমার তুমিত্ব বা আমার আমিত্ব যখন আপনত্ব থেকে বিদায় নেয়, তখনই আমাদের মানবীয় সত্ত্বায় প্রতিষ্ঠিত হয় প্রভুর প্রভুত্ব। তখন আমরা সদা সর্বক্ষণ থাকি মহান প্রেমময়ের প্রেম প্রতিমার চরণ তলে। প্রতিটি মানুষ-ই সৃষ্টিলগ্ন থেকে ধীরে ধীরে ধাবিত হচ্ছে আত্মিক ও মানবিক চরম উৎকর্ষতার পানে, যেখানে উন্নতির সর্বোচ্চ নিয়ামক হচ্ছে মহান রব কে আপনত্বে ধারন করা। আমরা মানুষ স্রষ্টার এমন একটি অপূর্ণ শিল্প যাকে পূর্ণ থেকে পূর্ণতর করার জন্য আকুলতার সাথে অপেক্ষা ও প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।
আমার প্রভু তো নির্মিত হবে আমার হৃদয়ের আকুলতা ও আমার বির্ণিমাণের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। সেক্ষেত্রে আমার প্রভু আমার মতো এবং আমাদের মানব সত্ত্বার সুক্ষ্ম কল্পনা ও প্রভুকে চিত্রিত করার দক্ষতা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হবে আমাদের সাথে প্রভুর আচরণ। এরুপ অঙ্কিত প্রতিটি প্রভুরূপ-ই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রভুকে নির্মাণ করো আপন প্রজ্ঞা, জ্ঞান আর প্রেমের সমন্বয়ে। তিনি চরমভাবেই তোমাকেন্দ্রিক। এবার তুমি তার অভিমুখী হও।
পর্ব – ১৪
আমাদের প্রত্যেকেরই শিখে নেয়া উচিত যে, কিভাবে পরিবর্তন-কে স্বাগত জানাতে হয়। এক একটি পরিবর্তনের মাধ্যমেই প্রেমময় প্রভুর আশীর্বাদ নেমে আসে আমাদের ওপর।
দুর্বল চিত্তের মানুষ স্বভাবতই পরিবর্তন কে ভয় পায়। গতানুগতিকতায় যারা আচ্ছন্ন, তারা চিরকাল পুরাতন কে আঁকড়ে ধরে’ই কাটিয়ে দিতে চায় জীবন। জীবনের নতুনত্বের সংজ্ঞা থেকে ও উপভোগ থেকে তারা বঞ্চিত। জীবন উন্নত থেকে উন্নততর হয় পরিবর্তনের মাধ্যমে।
কখনোই এমনটি ভাবা যাবে না যে, পরিবর্তিত হয়ে জীবন উল্টে যাচ্ছে। বরং এটা ভাবুন যে, পরিবর্তনের মাধ্যমে জীবন গতিময় হচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে অধিকতর কল্যাণের পথে। আপনি কি জানেন, আপনার বর্তমান জীবনের জীবনের চাইতে আগত জীবন কতখানি ভালো ও উন্নত হতে পারে? সে জীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
দয়াময় আমাদের কে দয়াদানের জন্য প্রস্তুত। দয়া গ্রহণের জন্য আমরা প্রস্তুত কিনা – এটাই হলো আসল কথা। পরিবর্তন মানেই বর্তমান এক একটি অবস্থা থেকে মৃত্যু ও উন্নততর অবস্থানে এক একটি পূনর্জন্ম। অতএব, প্রতিটি পরিবর্তন আসে আমাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
স্বাগত জানান পরিবর্তনকে। নিজেকে প্রস্তুত করুন করুণাময়ের বিগলিত করুণারাশিকে আত্মায় ধারণ করার জন্য। তিনি তো পরম দয়াময়।
পর্ব – ১৫
ভালোবাসার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় প্রকৃত ধার্মিকের ধর্মজগত। প্রকৃত ধার্মিক যিনি, তিনি তাঁর সবটুকু দিয়ে ভালোবাসেন মানুষকে। তিনি মানুষের প্রেমিক। তিনি মানব মহত্ত্বের অনুসন্ধানী। মানুষে বিরাজিত পরমতত্ত্বের পূজারী তিনি। তিনি ভালোবাসার দ্বারা সেই অনন্ত মহিমা কে লাভ করতে চান।
আল্লাহকে তো সবাই ভালোবাসে। নিরাকার, নিষ্কলুষ এবং অদৃশ্য এক কল্পিত সত্ত্বাকে ভালোবাসা খুবই সহজও বটে! বরং কঠিন তো মানুষ হয়ে অপর মানুষকে ভালোবাসা। প্রকৃত ভালোবাসার রহস্য এখানেই লুক্বায়িত।
জগতে ভালোবাসা ব্যতিত কোনো প্রজ্ঞা নেই। মানুষ হয়ে মানুষকে ভালোবাসার চাইতে বড় কোনো ইবাদত নেই। মানুষের সেবা করার মধ্য দিয়েই হয়ে থাকে মহান প্রভুর সেবা। তিনি মানুষেই সমাসীন। মানুষের হৃদয়ই আমাদের ভালোবাসার তীর্থ। একজন মানুষই জানতে পারে অপর মানুষ কতটুকু ভালোবাসতে সক্ষম!
যদি আমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাই, তবে অনিবার্য ভাবেই আমাদেরকে তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে ভালোবাসতে হবে। যদি আমরা মানুষতত্ত্ব কে অবহেলা করে ¯্রষ্টার উপাসনা করি, তাহলে এটাই প্রমাণিত হয় যে, আমরা স্রষ্টা চিনতে ব্যার্থ হয়েছি।
স্রষ্টা তো মানুষেই বিরাজিত।
পর্ব – ১৬
প্রকৃত বিশ্বাস হলো আমাদের ভিতরের বিশ্বাস। বাহিরের সংস্কার তো কেবল বাহিরেই থাকে। হৃদয়ের সংশয়বিহীন সুদৃঢ় ধারনা সমুহের সমন্বয়েই আমরা আমাদের বিশ্বাসের ভীতকে নির্মাণ করে থাকি। প্রভু প্রেমের পথে সবচাইতে মূল্যবান হলো আমাদের ভিতরের পরিশুদ্ধ বিশ্বাস।
আমাদের বাহিরকে আমরা বাহিরের উপাদান দিয়ে ধৌত করতে পারি। কিন্তু অভ্যন্তরকে ধৌত করতে হয় অভ্যন্তরীন উপাদান দিয়ে। আমাদের হৃদয়ে লেগে থাকা ঘৃনা, গোঁড়ামী আর অন্ধবিশ্বাস তথা কুসংস্কারের দাগ, যা বাহিরের পানি দিয়ে ধৌত করা যায় না। যে নোংরাগুলো আমাদের হৃদয়কে প্রতিনিয়ত দূষিত করে, তা ধৌত করার জন্য প্রয়োজন এক বিশেষ উপাদান।
উপবাস বা সংযম সাধনার মধ্য দিয়ে শরীরকে শুদ্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু যখনই আপনি আপনার হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করতে চাইবেন, তা করতে হবে কেবল ভালোবাসা দিয়ে। ভালোবাসাই সেই নিরন্তর মহিমা, যা আপনাকে ভিতরে বাহিরে পরিশুদ্ধ করবে।
একমাত্র ভালোবাসাই হৃদয়কে শুদ্ধ করতে পারে।
পর্ব – ১৭
মানব অস্তিত্ব একটি পূর্ণতম অস্তিত্ব, যে অস্তিত্বের মধ্যে জগতের সকল উপাদান বিদ্যমান। সমগ্র মহাবিশ্ব একটি মানব অস্তিত্বের মধ্যে নিহিত। আমরা যা পছন্দ করি অথবা আমরা যা ঘৃণা করি, তার সবই ক্রিয়াশীল আমাদের মানবীয় অস্তিত্বের মধ্যে। স্রষ্টা তাঁর রহস্য কে প্রকাশ করেছেন মানবীয় অস্তিত্বের মধ্যে। তাই যা কিছু খোঁজার বা পাওয়ার তার সবই রয়েছে মানবীয় অজুদে তথা মানুষের সিমানায়। মানুষ মোহনায় বিরাজিত জগতের অপার রহস্য ভান্ডারের সকল চাবিকাঠি।
মানব মোহনায় বিরাজিত অনন্ত রহস্যকে তথা পরম প্রভুকে আমাদের উপলব্ধিতে প্রস্ফুটিত হতে বাধা প্রদান করে শয়তান শক্তি যা আমাদের অস্তিত্বের মধ্যেই অবস্থান করে। নিজের বাহিরে শয়তানকে কখনো খুঁজে পাওয়া যাবে না। শয়তান বা খান্নাছ শক্তি আমাদের ভেতরে থেকে আমাদেরকে খারাপ কাজে প্রেরণা দেয়। এটি আমাদের মধ্যে থেকে আমাদের আক্রমণ করে। এটি আমাদের ভেতরের একটি কন্ঠস্বর যা প্রতিনিয়ত আমাদেরকে খারাপসমূহের উজ্জীবনে প্রয়াস চালাচ্ছে।
যদি আপনি জানতে চান জগতের অপার রহস্য, অনুধাবন করতে চান অনন্ত প্রেমের লীলা, সম্পূর্ণ রূপে প্রস্ফুটিত করতে চান নিজেকে, তাহলে সততা ও কঠোরতার সাথে আপন অস্তিত্বে বিরাজিত শয়তান বা খান্নাছ শক্তির মোকাবিলা করুন।
অস্তিত্বে অবস্থিত খারাপসমূহের ত্যাগেই উদ্ভাসিত হবে অনন্ত সত্য।
পর্ব – ১৮
প্রকৃত বিশ্বাস হলো আমাদের ভিতরের বিশ্বাস। বাহিরের সংস্কার তো কেবল বাহিরেই থাকে। হৃদয়ের সংশয়বিহীন সুদৃঢ় ধারনা সমুহের সমন্বয়েই আমরা আমাদের বিশ্বাসের ভীতকে নির্মাণ করে থাকি। প্রভু প্রেমের পথে সবচাইতে মূল্যবান হলো আমাদের ভিতরের পরিশুদ্ধ বিশ্বাস।
আমাদের বাহিরকে আমরা বাহিরের উপাদান দিয়ে ধৌত করতে পারি। কিন্তু অভ্যন্তরকে ধৌত করতে হয় অভ্যন্তরীন উপাদান দিয়ে। আমাদের হৃদয়ে লেগে থাকা ঘৃণা, গোঁড়ামী আর অন্ধবিশ্বাস তথা কুসংস্কারের দাগ, যা বাহিরের পানি দিয়ে ধৌত করা যায় না। যে নোংরাগুলো আমাদের হৃদয়কে প্রতিনিয়ত দূষিত করে, তা ধৌত করার জন্য প্রয়োজন এক বিশেষ উপাদান।
উপবাস বা সংযম সাধনার মধ্য দিয়ে শরীরকে শুদ্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু যখনই আপনি আপনার হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করতে চাইবেন, তা করতে হবে কেবল ভালোবাসা দিয়ে। ভালোবাসাই সেই নিরন্তর মহিমা, যা আপনাকে ভিতরে বাহিরে পরিশুদ্ধ করবে।
একমাত্র ভালোবাসাই হৃদয়কে শুদ্ধ করতে পারে।
পর্ব – ১৯
সাধনায় সাফলতা লাভের পূর্বশর্ত হচ্ছে নিজের মনোযোগ কে সঠিক স্থানে নিবদ্ধ করা। একাগ্র মানসিক তন্ময়তা ও অনুরাগ সাধনার দ্বারা ভক্ত দ্রুত পৌঁছতে থাকে তাঁর অভিষ্ঠ গন্তব্যের দিকে। নিজের মনোযোগ কে সঠিক কেবলা পানে স্থির করা গেলেই ত্বরান্বিত হয় সাফল্য।
পথের চিন্তা বাদ দিয়ে তুমি বরং তোমার প্রথম পদক্ষেপ নিয়ে চিন্তা করো। মনোনিবেশ করো একদম শুরুতে। প্রথম পদক্ষেপই তোমাকে পৌঁছে দিবে তোমার গন্তব্যে। পথ চলার ক্ষেত্রে এটাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ জন্য তুমিই দায়ী থাকবে যদি তোমার প্রথম পদক্ষেপটি হয় ভুল। পথে অভিষিক্ত হও সুন্দর এবং যথাযথ একটি পদক্ষেপের মাধ্যমে।
স্রোতে মিশে যেও না। বরং নিজেই একটি প্রবাহে পরিণত হও। ডুবে যাও সে সমুদ্রে যে সমুদ্রটি প্রেমের। নিজেকে পূর্ণতর প্রেমময় সত্ত্বার পবিত্র চরণ কমলে সমর্পন করে দাও।
প্রভুগুরু তোমাকে মুক্তির পথ দেখাবেন। প্রেমের পথ দেখাবেন।
তুমি শুধু কায়েম করো তোমার পূর্ণতম সমর্পন।
পর্ব – ২০
প্রভু আমাদেরকে তৈরী করেছেন তাঁর নিজ চেহারায়। প্রভু স্বয়ং অনন্য সত্ত্বা, তাই আমরাও অনন্য। প্রভু মূর্তিতে মূর্তিমান প্রতিটি মানুষ ধারণ করে এক একটি পৃথক পৃথক সত্ত্বা ও চেহারা। দু’জন মানুষ কখনো একরকম নয়। প্রভুর একত্বের প্রমাণ স্বরুপ তাঁর অস্তিত্বে অস্তিত্ববান মানুষও নির্মিত হয়েছে এক ও অনন্য রূপে।
প্রতিটি মানুষকে অনন্য ও আলাদা আলাদা করে সৃজন করা স্রষ্টার এক মহান পরিকল্পনার অংশ। প্রতিটি মানুষ সতন্ত্র। হৃদয়সমূহ কখনোই একই স্পন্দনে স্পন্দিত হয় না। কন্ঠসমূহ কখনো একই সুরে কথা বলে না। প্রতিটি মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্বটিই একটি রহস্যের আধার, যা পূর্ণ সাতন্ত্রে সমুজ্জল। যদি ঈশ্বর চাইতেন যে, সবাই একরকম হোক, তবে তিনি এটা করতে পারতেন।
আপন স্বভাব ও বৈশিষ্টে আপনাকে ফুটিতে তুলতে হবে। সকল সাতন্ত্রতাকে স্বীকার করে যার যার মতো তৈরী করতে হবে বিশ্বাস ভক্তি তথা ধর্মচেতনার বলয়। কারো ওপর চাপিয়ে দেয়া ধর্ম তথা চিন্তা মানেই হলো ¯্রষ্টার পবিত্র পরিকল্পনাকে অস্বীকার করা!
নিজেকে সমুজ্জল করো স্বকীয় বৈশিষ্ট ও আপন স্বভাবের সৌন্দযের্র দৃঢ়তায়।
পর্ব – ২১
প্রেমিক তাঁর অন্তরের প্রেম মাহাত্ম্যের দ্বারা নির্মাণ করে নেয় তাঁর আপন জগতকে। তাঁর হৃদয়স্থিত প্রেম-প্রদীপের আলোয় আলোকিত থাকে তাঁর চারপাশ। যে যথার্থ প্রেমিক, তাঁর জগতটাই হয় প্রেমময়!
একজন প্রভু প্রেমের দেওয়ানা যদি কখনো সরাইখানায় যায়, সরাইখানাটিই তখন পরিণত হয় প্রার্থনাকক্ষে। আর যদি কোনো মদ্যপ উপস্থিত হয় প্রার্থনাকক্ষে, সেটিই হয়ে উঠবে সরাইখানা।
আমাদের হৃদয় প্রতিনিয়ত পরিচালিত করে আমাদের। যা স্থিত আছে হৃদয়ে, বাহিরেও তাই মূর্তমান হয়ে উঠবে প্রতিনিয়ত। ভালো-মন্দের পার্থক্য সৃষ্টি করে আমাদের অন্তর, আমাদের অন্তরে থাকা ভালো-মন্দের অনুপাতে।
এজন্য জ্ঞানী ব্যক্তি কখনো অপর ব্যক্তিকে তার চেহারা বা কোনো বাহ্যিক অনুষঙ্গ দিয়ে মূল্যয়ন করেন না। কারণ, জ্ঞানী যখন দেখে, দুচোখ বন্ধ করে দেখে। তখন মুলত খোলা থাকে অন্য একটি চোখ, যে চোখ বাহির নয়, ভেতর দেখে।
জ্ঞানী অন্যকে বিচার করে ভেতর দেখে। বাহির দেখে নয় ॥
পর্ব – ২২
এবার তো সময় হলো জাগরণের! ওঠো মোহগ্রস্ত মন! জেনে নাও, এ জগত একটি ক্ষণস্থায়ী ঋণ ব্যতিত নয়! পৃথিবী তো বাস্তবতার একটি স্কেচ অনুকরণ! অস্থায়ী ছায়া মাত্র!
শিশু যেমন করে খেলনা দ্রব্য কে আসল জিনিস ভেবে ভুল করে তেমনি তুমিও কি করে অস্থায়ী এ জগত কে অবিনশ্বর এবং ঐশ্বরিক ভেবে ভুল করলে? কি করে মানব সমাজ লিপ্ত হচ্ছে এ নশ্বর ছায়াধামে! মত্ত হচ্ছে জাগতিক খেলনায়! কখনো হয়ে পড়ছে মোহগ্রস্ত, কখনো বা চরম বিরক্ত! কখনো খেলনা দ্রব্য সমূহকে আগলে রাখছে পরম মমতায়, কখনো অসম্মানের সাথে ভেঙে ফেলছে সেসব!
জিবন একটি আধ্যাত্মিক দ্রব্য। জিবনে সব রকমের চরমপন্থা পরিহার করো। চরমপন্থা সব সময়ই জিবনের ভারসাম্য নষ্ট করবে। জিবনকে যাপন করো মৃদু আনন্দে ও সহনশীলতায়। আপন জ্ঞান ও সংযম সাধনার মধ্য দিয়ে।
একজন জ্ঞানী কখনো চরমপন্থী হয় না। বরং সে হয় যথার্থ, সকল পরিস্থিতির জন্য।
একজন জ্ঞানী তার জিবনকে যাপন করে মধ্যপন্থায়।
পর্ব – ২৩
প্রভুর সকল সৃষ্টিসমূহের মাঝে মানুষ এক অনন্য সৃষ্টি। মানুষ মোহনাতে মূর্ত হয়েছেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা। প্রভুর নিজের রুহ থেকে তিনি রুহ ফুঁকে দিয়েছেন মানুষকে। মানবকাবাতে আসন গড়েছেন তিনি। মানবতত্ত্বে প্রভুতত্ত্বের প্রকাশ প্রত্যাশায়।
মানুষকে এমন মহত্ত্বে নির্মিত করা হয়েছে, যাতে মানুষ হয়ে উঠতে পারে যথার্থই প্রভুর প্রতিনিধি। প্রভুগুণে গুণান্বিত হয়ে মানুষ যাতে মানবসত্ত্বায় প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, সে শক্তি সামর্থ্য প্রদান করা হয়েছে মানুষকে।
এবার প্রশ্ন করুন নিজেকে, যে মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্ত জন্মৃ আপনার, কতটুকু পূরণ করছেন তার? আপনার আচরণ কি প্রভু আচরণ দ্বারা পূনর্নবায়িত? সর্বজ্ঞানস্বামী কি প্রতিস্থাপিত হয়েছে আপনার অস্তিত্বে? যদি না হয়, তাহলে আপনি চরমভাবে ব্যার্থ।
মনে রাখবেন, মানুষ হিসেবে আমাদের একমাত্র কর্তব্য হচ্ছে আমাদের অস্তিত্বে প্রবাহিত শাশ্বত সত্ত্বাটিকে আবিষ্কার করা এবং তাতে লিপ্ত হয়ে নিজেকে প্রভুত্বে উন্নীত করা, যে অবস্থাকে আমরা প্রভুর প্রতিনিধি বলে থাকি।
প্রভুসত্ত্বাকে অস্তিত্বে জাগ্রত রাখাই আমাদের সাধনা।
পর্ব – ২৪
অজ্ঞানতার মোহপাশে আবদ্ধ মন আমাদের। বহুদূরে কোনো সূদুর কল্পনায় খুঁজে বেড়াই স্বর্গ আর নরক। না, দূরে নয়! বরং এখানেই তো রয়েছে জান্নাত জাহান্নাম! বন্ধ করুন সূদুর অন্বেষণ। ফিরে তাকান আপনার পানে! চোখ মেলে দেখুন – এইতো শাশ্বত স্বর্গ! শাশ্বত নরক!
অন্ধ অনুমান কল্পনায় স্বর্গ নরক কে অঙ্কিত না করে দৃষ্টি নিবন্ধ করুন এই মুহুর্তে। দেখুন, কি অনিন্দ্য সুন্দর স্বর্গ! চারধারে পারিজাত মন্দারের সারি! ধীর প্রবাহিনী অলোকনন্দা! শান্তি-সুবাসে উদ্বেলিত হবেন আপনি! অথবা দেখে নিন নরক! পূর্ণত্বের তৃষ্ণা নিয়ে কি ব্যাকুল ছুটে চলা পথ থেকে পথান্তরে! অনন্ত যন্ত্রণার পথে পথে! দুঃখের মৃণালে নিত্য সুখের ফুল ফুটাইতে কি অধীর অপেক্ষায় আধার নিশি যাপন করছে নরকবাসী!
যাপিত জীবনকে রাঙিয়ে তুলুন প্রেমের রঙে। জিবন স্বর্গে পরিণত হবে। অথবা জিবন কে বহন করে চলুন গাধার বোঝার মতো, প্রেমহীন – নিশ্চিতই আপনি অবস্থান করবেন নরকে।
প্রেমের উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি আপনার জিবনকে পরিণত করবে স্বর্গে অথবা নরকে।
প্রেম! এমনই এক মহাশক্তি!
পর্ব – ২৫
কুরআন এমন এক ঐশী গ্রন্থ যা অনুধাবিত হয় পাঠকের উপলব্ধির গভীরতার প্রেক্ষিতে। আমরা আমাদের চেতনার প্রগাঢ়তার দ্বারা নির্মাণ করি কুরআনের ভাব-ব্যাঞ্জনাকে। আমাদের উপলদ্ধির গভীরতা আমাদেরকে পৌঁছে দেয় কুরআনের অতল-গভীর সুমহান সৌন্দর্যে।
অন্তর্দৃষ্টি যার যত প্রখর, সে ততটাই মর্ম উদ্ধার করে কুরআন থেকে। প্রকৃত প্রেমিক জনা সেখানে খুঁজে পায় ঐশী প্রেমের বারতা। জ্ঞানী সেখানে খুঁজে পায় অনন্ত-অসীম জ্ঞান-রাজ্য। কুরআন ঠিক ততটাই বিভ্রান্ত এবং পথহারা করে একটি গন্ড-মূর্খকে!
অন্তর্দৃষ্টির চারটি স্তর রয়েছে। যার প্রথম স্তরটি হলো বাহ্যিক এবং সাধারণ। এ স্তরেই সন্তুষ্ট থাকে বেশিরভাগ মানুষ। দ্বিতীয় স্তর হলো গোপন তথা ভিতরের। অল্পসংখ্যকই সে স্তরের খোঁজ পায়। তৃতীয় স্তর আরো গোপন যা ঐশীমূলে প্রোথিত এবং চতুর্থ স্তরের গভীরতা এতটাই ব্যাপক যা বর্ণনাতীত ও দূর্বোধ্য। অন্তর্দৃষ্টির সঠিক ব্যবহারই কুরআন কে পঠিত করে তুলবে।
প্রখর করে তুলুন অন্তর্দৃষ্টিকে, ধরা দিবে কুরআন।
পর্ব – ২৬
শাশ্বত এ জগৎ একটি একক সত্ত্বা। এক অখন্ড অস্তিত্ব দিয়ে ঘেরা এ জগৎ। এ অখন্ড সত্ত্বায় অবস্থিত সকল কিছুই একে অপরের সাথে সংযুক্ত। সত্ত্বা বহির্ভূত কিছুর অবস্থিতি নেই এখানে।
আমাদের চিন্তা সর্বদা সক্রিয়। নিরব আলাপচারিতায় মগ্ন আমরা। আমাদের চিন্তা কথা বা কর্ম সকল চিরকালের আয়নায় গচ্ছিত রয়ে যাচ্ছে। অনন্তের সংগ্রহশালায় জমা পরছে আমাদের প্রতিটি কথা। আমাদের জীবনযাত্রার সকল উপাদান ঠিকই আবার অনন্ত হতে ফিরে ফিরে আসবে আমাদের কাছে। সুতরাং, জীবন কে যদি সজ্জিত করি সৌন্দর্য দিয়ে, তাই আবার ফিরে পাবো আমরা।
আমরা জীবন পথে তখনি সফল পথিক হবো, যখন আমাদের আনন্দ ও যন্ত্রনা কে উপলব্ধি করতে পারবো সত্য ও সুন্দরের চেতনা দিয়ে। সেদিনই আমরা হবো অখন্ড কালের মানুষ, যেদিন একজন মানুষের কষ্ট আমাদের সবাইকে কষ্ট দিবে, একজন মানুষের আনন্দ আমাদের সকলের মুখে হাসি ফোটাবে।
আমাদের মহৎ উপলদ্ধি আমাদের জিবনকে মহৎ করে তুলবে।
পর্ব – ২৭
শুভচিন্তার অনুশীলন আমাদের চেতনাকে উদ্দীপিত করে শুভকর্মের দিকে। আর আমাদের চিন্তা যদি হয় কুশ্রী, সে চিন্তার ছায়া আমাদের চেতনার রঙকে কালো করে দেয়। যেটাই করুন আপনি, ভালো বা মন্দ; কোনো না কোনো ভাবে তা আপনার কাছেই ফিরে আসবে। অতএব, আপনার প্রতিটি চিন্তা বা কর্ম, শুভবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত।
আপনি যদি হিংসাত্মক হয়ে ওঠেন এবং অন্যের খারাপ চিন্তা বা কর্মে প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেন, তবে অবশ্যই আপনার শুভচিন্তা ব্যাহত হবে এবং আপনি আটকা পড়ে যাবেন অশুভ শক্তির দুষ্টচক্রে।
জিবনকে সৌন্দর্যমন্ডিত করতে অবশ্যই আপনাকে কায়মনে শুভচিন্তার অনুশীলন করতে হবে। আপনি একটানা চল্লিশ দিন একান্ত মনে শুভচিন্তার অনুশীলন করে দেখুন। এটা নিশ্চিত যে, চল্লিশ দিনেই আপনার জিবনে আমূল পরিবর্তন আসবে। আপনত্ব থেকে বিদায় নিবে সকল কলুষ। কারণ, চল্লিশ দিনে আপনি ভেতর থেকে শুদ্ধ হয়ে উঠবেন।
শুদ্ধতা আগে চিন্তায় আসা জরুরী। ভেতর সুন্দর হলে বাহিরও সুন্দর রঙে সু-সজ্জিত হবে।
চিন্তায় শুভবোধ উদয় হোক আমাদের।
পর্ব – ২৮
মোহলিপ্সা ও মায়াবিভ্রম নিয়ত বন্দী করে রাখে আমাদের ভবিষ্যৎ ও অতীতকে। আমরা ভবিতব্যের নিগঢ়ে বন্দী, চলে যাওয়া স্রোত আমাদেরকে আটকে রাখে কূল থেকে কূলে। চিন্তার মূঢ়তা, বোধের ক্ষুদ্রতা আমাদেরকে আটকে রাখে মায়াজালে। আমরা পড়ে থাকি বোধের অতীত কোনো জিবন নামক গুহায়।
অন্তহীন সর্পিল সময়, যা মূলত সময়হীনতা; আমাদের ভেতর বাহির পরিব্যপ্ত করে বয়ে যায়। আমাদেরকে সম্মোহিত করে রাখে সুদূর স্বপ্নে কিংবা আলোহীন মরিচিকায়। বয়ে চলা সময় আমাদের স্থির করে রাখে বোধের সীমাহীন গহ্বরে। সেখানেই প্রশান্তি খুঁজে আজিবন না পাওয়ার বেদনায় ক্ষত বিক্ষত করতে থাকি আমাদের চির প্রশান্ত আত্মাকে!
যদি আপনি লাভ করতে চান অনন্ত আলোক, অনুভব করতে চান জিবনের সীমাহীন ব্যাপ্তিকে, তাহলে অতীত ও ভবিষ্যত নামক মায়াজাল থেকে বের হয়ে আসুন। মনকে নিমগ্ন করুন বর্তমানে, মানে এই মুহুর্তে। মনে রাখবেন, বর্তমানের একটি মুহুর্তই চিরজিবনের অখন্ড কাল। মহাকাল। সুতরাং বাস করতে হবে বর্তমানে। এই মুহুর্তে।
বর্তমানের একটি মুহুর্তই অখন্ড মহাকাল।
পর্ব – ২৯
মহাবিশ্বের কোনায় কোনায়, প্রতি অনু পরমানু তে প্রতিনিয়ত বাজে এমন এক ঐকতান, মহাজাগতিক ঐকতান, এমন এক ঐশ্বরিক সুর – যার উৎস স্বয়ং প্রভুর অন্তর। সে সুরের আবহে আমরা সকলে নিয়ত ডুবে যাই, আবার ভেসে উঠি। আমাদের জীবন মরণের এ খেলাঘরে আমরা সে সুরেরই আজ্ঞাবহ, সে সুরেরি খেয়ালে বিচিত্র রূপে-রসে মগ্ন থাকি সর্বক্ষণ। জ্ঞানীগণ সে সুরের অনুবর্ত্তী, সে সুরে নিমগ্ন ও সমর্পিত। আর যারা অজ্ঞান, তারা সে সুরকে নিছক প্রকৃতির খেয়াল বলে উপেক্ষা করে।
নিয়তি মানেই এটা নয় যে, আপনার জীবন আগে থেকেই নির্ধারিত। বরং নিয়তি হলো আপনার অন্তরে ঐশ্বরিক গুণাবলির উপস্থিতি ও ক্রিয়াশীলতা। সকল কিছু নিয়তির ওপর ছেড়ে দেয়া জ্ঞানীর কাজ নয়। বরং জ্ঞানী তো তিনি যিনি পূর্ণরূপে অংশগ্রহণ করেন সে মহাজাগতিক সুরের কম্পনে। আপনার অলক্ষ্যে আপনারি দেহমন জুড়ে সে সুরে বেজে চলেছে অবিরাম।
সে সুরে ৪০ টি স্তরে ভেসে বেড়ায়, জগত জুড়ে। যখন যে সুর বাজে, তখন আপনার নিয়তি সেরূপ ক্রিয়া প্রকাশ করে। বাদ্যটি প্রভুর, বাদক তো আপনি। বাদ্য পরিবর্তন করতে হয়তো পারবেন না, কিন্তু কত ভালো বাজাবেন, সেটা আপনার হাতেই।
সঠিক সুর তুলুন আপনার হাতে থাকা ঐশ্বরীক যন্ত্রে।
পর্ব – ৩০
জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ সত্ত্বা হল সুফি, সমগ্র ব্রহ্মান্ডের মুল শক্তি ও সত্ত্বাকে যিনি বুকে ধারণ করেন, জগতের আদি কারণকে যিনি অন্তরে বহন করেন, জগতে যিনি সর্বাপেক্ষা শক্তিমান ও সুন্দরতম প্রকাশের আধার যিনি। তা স্বত্বেও তিনি থাকেন চরমতম নির্বিকার, নির্লিপ্ত, আত্মাভিমানশূণ্য ও নিরুদ্বেগচিত্ত। কোনো কিছুতেই যেনো তার কিছু যায় আসে না।
সত্যিকারের সুফি এমন যে, তিনি যদি কখনো অন্যায় আক্রমণ, দোষারোপ বা পীড়নের শিকার হন, তবু তিনি থাকেন চুড়ান্ত ধীরস্থির ও অটল। চরম ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন তিনি। প্রতিশোধপরায়নতা সুফির বৈশিষ্ট নয়। আত্মসত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে পরমসত্ত্বায় মিলিত সত্ত্বাটি সুফির। যেখানে “স্ব“ নেই, সেখানে বিরোধী, প্রতিদ্বন্দী বা “অন্যান্য” কিভাবে থাকে? যেখানে একই পরমশক্তির প্রকাশ ও বিকাশরূপ এ ধরা, যেখানেই নেই দ্বৈততার বিন্দুমাত্রও, সেখানে প্রতিপক্ষ কি করে থাকতে পারে? যেখানে জগতব্যাপী শুধুই একজন, সেখানে কিভাবে কাউকে দোষারোপ করা যায়?
সুফি চরম আত্মস্থ ও ধ্যানস্থ তথা পরমে সমাহিত শান্ত সৌম্য পরম পুরুষ, জগতে তার শত্রু কেউ নেই।
পর্ব – ৩১
মানবীয় গুণাবলির মধ্যে শ্রেষ্ঠতম গুণ হলো বিশ্বাস, যার ওপরেই মুলত নির্ভর করে গড়ে ওঠে আমার সংস্কার, ধর্ম বা সকল তত্ত্ব। যদি তুমি চাও তোমার বিশ্বাসকে দৃঢ় করতে, তবে তোমাকে ভেতর থেকে স্নিগ্ধ হতে হবে, নরম হতে হবে। ভেতরের মানুষটিকে করতে হবে কোমল ফুলের মত। যদি বিশ্বাসকে করতে চাও পাকাপোক্ত, তোমার হৃদয়কে হতে হবে পালকের মত নম্র।
জীবনের নানান ঘাত প্রতিঘাতময় মুহুর্ত, অসুস্থতা বা দূর্ঘটনা অথবা ভয়, ক্ষতি আমাদেরকে এমন অবস্থার মুখোমুখি দাঁড় করায়, আমরা তখন স্বার্থচিন্তা ও বিচারযুক্ত সংকীর্ণতার অসারড়া টের পাই। আমরা জীবনের অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিরে উদার ও সহানুভূতির মূল্য টের পাই। তখন আমাদের ভেতরে জন্ম নেউ অন্যকে ক্ষমা করা, নিজেকে সহনশীল, উদার করার ঐশী শিক্ষা।
মহাজাগতিক সত্য আমাদেরকে প্রতিনিয়ত শেখায় উদারতা, সহনশীলতা ও সত্যে নিশ্চল থাকা। কেউ কেউ এই মহাপাঠ শিখে নিজেকে শান্ত করতে সক্ষম হয়, কেউ কেউ হয়ে ও ক্রুদ্ধ।
নিজেকে নত, উদার ও সহনশীল করে গোড়া তোলাই মহত্তম কর্ম।
পর্ব – ৩২
ঈশ্বর মানব অন্তরে চির-বিরাজিত। মানুষ আর ঈশ্বর চির-অভিন্ন। একাকার। আপনার এবং আপনার ঈশ্বরের মধ্যে কেউ বা কিছু যেন কখনো প্রতিবন্ধক হয়ে না ওঠে। কোনো ইমাম, পুরোহিত বা মোল্লা যেন আপনার এবং আপনার ঈশ্বরের মধ্যে দূরত্ব তৈরী করতে না পারে। কোনো যাজক, কোনো বিশ্বাসের সংকীর্ণতা যেন আপনাকে উদ্বেলিত করতে না পারে।
আপনি নিষ্ঠাবান হোন আপনার নিজস্ব সত্যে। আপন মাহাত্ম্যকে মূল্য দিতে শিখুন। নিজের বিশ্বাস অন্যের ওপর কখনো চাপাবেন না। কারো হৃদয় ভেঙ্গে দেয়া জগতের সবচেয়ে বড় অন্যায়। যদি আপনার দ্বারা কারো হৃদয় আহত হয়, তবে আপনার দ্বারা কখনো ধর্ম হবে না। বিরত থাকুন সকল মূতির আরাধনা থেকে, যা আপনার দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দেয়। ঈশ্বর এবং শুধু ঈশ্বরকে আপনার পথ প্রদর্শক হতে দিন্য। সত্য জানুন, কিন্তু আপনার সত্যকে অন্ধভাবে পূজা করবেন না, সত্যের স্বরূপ আপনত্বে ধারণ করুন।
আপনিই সত্যের প্রকৃত আশ্রয়।
পর্ব – ৩৩
জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হলো, ঠিকই আমরা একসময় জীবনকে অতিক্রম করবো। জীবন আমাদেরকে ঠিকই ঠেলে দিবে অনন্ত শূণ্যতার পানে, মৃত্যুর পানে। সবকিছু পেছনে ফেলে আমরা রওয়ানা হবো এক অনন্ত যাত্রায়। তবু আমরা সবাই এ পৃথিবীতে কোথাও যেন পৌঁছতে চাই, কি যেন হয়ে উঠতে চাই। কিসের যেন অপূর্ণতা আমাদেরকে তাড়া করে ফেরে প্রতিক্ষণ। তারপর ঠিকই একদিন সব কিছু ভুলে যাই, সব কিছুকে ছাপিয়ে যাই।
যদি তুমি জ্ঞানী হও, তাহলে শূণ্যের মত হালকা হয়ে বাঁচো। বাহিরের সাজসজ্জা নয়, ভেতরের শূণ্যতাই স্থির রাখে আমাদের চেতনাকে। যে শূণ্যতা থেকে আমরা এসেছি, যেদিকেই আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য। আমরা কি অর্জন করতে চাই তা নয়, বরং শূণ্যতার চেতনাই আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যায় সুন্দরের পানে, মুক্তির পানে।
জীবন পূর্ণতায় স্থিত। অপূর্ণচিন্তা রহিত। জীবনের শূণ্যতা অনন্তের শূণ্যতারই প্রকাশ। জীবনে নিষ্ঠাবা হও।
পর্ব – ৩৪
আধ্যাত্মিক পথ পরিক্রমার সবচেয় সুন্দরতম ও গুঢ় বিষয়টি হলো আত্মসমর্পন। আপন অন্তরের সত্যকে পূনরুজ্জীবিত করতে হলে নিজেকে ঐশ্বরিক সত্যের কাছে সমর্পন করতে হয়। এই মহিমান্বিত সমর্পনের মধ্য দিয়েই জারি হয় অন্তরজ্ঞান, ভেতরের পরম সত্ত্বা লাভ করে রূপ। বলা হয়, সমর্পন হলো আধ্যাত্মিক জগতের দরজা।
সমর্পিত হওয়া মানে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয় নয়। দূর্বল হয়ে যাওয়া নয়। সমর্পন হতাশাবাদ বা পরাজয়কে নির্দেশ করে না। সত্যিকার সমর্পনে থাকে এমন এক শক্তি, যা আসে একান্ত ভেতর থেকে। এটি এমন এ ঐশ্বরিক আলো বহন রে যা মূলত মানুষকে প্রভুর দরজায় পৌঁছে দেয়।
যারা নিজেকে সমর্পিত করে জীবনের দিব্য সত্ত্বার কাছে, তারা হয়ে ওঠে ঐশ্বরিক জ্যোতিতে ভরপুর। জগতের শত সহস্র অশান্তি ও ব্যাঘাতের মাঝেও তারা থাকে অটল শান্তিতে। সমগ্র জগতও যদি ঝড়ের কবলে পরে, সমর্পিত মানুষটি থাকে পরমসত্ত্বার কোলে, প্রশান্তিতে।
সমর্পিত হও, তবে লাভ করবে ঐশ্বরিক জ্যোতি।
পর্ব – ৩৫
আমাদের এ জগত এমন এক রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু, যার রয়েছে নিজস্ব নিয়মনীতি। আমরা এ নিয়মগুলোকে বুঝতে সক্ষম হলেই ত্বরান্বিত হয় আধ্যাত্মিক উন্নতি। পৃথীবির সাদৃশ্যসমূহ বা নিয়মানুবর্তিতা আমাদেরকে এ যাত্রাপথে এগিয়ে নেয়না, রবং বিপরীতধর্মিতা স্পষ্টভাবে আমাদেরকে এগিয়ে নেয়, লক্ষ্যপানে। জগতের যত বিপরীতধর্মিতা, তা আমাদের প্রত্যেকের ভেতরের বিদ্যমান। এবং আমাদের উচিত সে স্পষ্ট বিধিবহির্ভূত বৈপরিত্যের দিকে মনোযোগী হওয়া।
আমাদের মধ্যে যিনি বিশ্বাসী, তার উচিত তার অন্তরস্থিত অবিশ্বাসীর সাথে পরিচিত হওয়া। আর যিনি অবিশ্বাসী, তার উচিত অন্তরস্থিত নীরব বিশ্বাসীকে চিনে নেওয়া। তখনই আমরা ইনছানে কামিল বা পূর্ণতম মানব-মহানে পরিণত হই, আমাদের প্রত্যেকের উচিত আমাদের ভেতরকার সকল আপাত বৈপরিত্যকে চিনে নেওয়া। যদিও একটি ধীর প্রক্রিয়া, তবু আমাদের এ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই যেতে হয়।
বিশ্বাসী হবার জন্য আপনার সবচেয়ে বড় কর্তব্য হচ্ছে আপনার ভেতরকার অবিশ্বাসী চিনে নেওয়া।
পর্ব – ৩৬
আমাদের এ জগত সুনির্দিষ্ট কিছু নীতির মাঝে প্রতিষ্ঠিত। কখনো যে নীতিসমূহের বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় ঘটে না। পারস্পারিকতার এ নীতিগুলো চিরন্তন ঐক্যে স্থিত। এখানে কিছুই প্রতিদানহীন বা অসার নয়। প্রতিটি কর্ম বা চিন্তাও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। একফোঁটা দয়া বা এক কণা পরিমাণ মন্দও এখানে প্রতিদানশূণ্য নয়। জগতের অনিবার্য নীতি এটাই যে, এখানে অস্তিত্বের প্রতিটি বিন্দুও এক একটি অর্থবোধক সত্য।
ঈশ্বর তাই করেন, যা আমরা করি। আমরা যখন সবাইকে ভালোবাসি, ঈশ্বর তাই করেন। আমরা যখন চক্রান্ত, ছলনা বা কুটকৌশলের বিন্যাস করি, ঈশ্বরও তাই করেন। যদি ফাঁদ পাতি, ঈশ্বরও তাই করেন। জগতের ঈশ্বরের জ্ঞানের বাইরে একটা পাতাও নড়ে না। তার জ্ঞান জগতের সমগ্রকে বেষ্টন করে রাখে। এ বিশ্বাস জরুরী যে, ঈশ্বর যা কিছু করেন, তা সুন্দর, সূচারু ও পরিপূর্ণ রূপে করেন।
অহেতুক চালাকী বা কৌশল অবলম্বন না করে ঈশ্বরে প্রকৃতই সমর্পিত হোন। সেটাই মঙ্গলজনক।
পর্ব – ৩৭
ঈশ্বরের সমস্ত সৃজন এক নির্ভূল ও নিরবচ্ছিন্ন ছন্দ অনুসারে চলমান। যে ছন্দে কভূও বিন্দুমাত্র ছন্দপতন ঘটে না। অত্যন্ত যত্নে তিনি নির্মাণ করেছেন মহাজাগতিক এই ঐকতানকে। যেখানে, অনাদি এক ঐশ্বরিক নিয়মের আবর্তে সকলি বাঁধা। কারও সাধ্য নেই এই নিয়মের বাহিরে যাওয়ার।
ঈশ্বরের বিধান এতটাই সুনির্দিষ্ট যে, জগতে সকল কিছুই তার নির্ধারিত সময়ে ঘটে। মুহুর্ত কাল পূর্বেও নয়, মুহুর্তকাল বিলম্বেও নয়। কোনোরূপ ব্যাতিক্রম ব্যাতিরেকেই প্রত্যেকের জন্য নিয়মটি চিরকাল চলমান। জগতের এই শাশ্বত ঐক্য নিরবচ্ছিন্ন গতিতে বয়ে চলেছে একদম সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে। প্রতিটি মানুষও সেই ছন্দে ছন্দায়িত। আমাদের ভেতরেও প্রতিনিয়ত বেজে চলে সে তান, যেখানে আমরা খুঁজে পাই আমাদের অতিত বর্তমান ভবিষ্যত, যেখানে মূলত আমাদের শেকড়। সময়ের গহীনে সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয় আমাদের জীবন মৃত্য সহ অনন্ত অস্তিত্বের সকল হিসাব নিকাশ। যেখানে আমাদের জীবনের প্রতিটি কর্মের জন্য নির্ধারিত থাকে সময়। আমাদের প্রত্যেকের জীবনে ভালোবাসার যেমন একটি কাল বর্তমান আছে, তেমনি আছে মৃত্যুরও।
ঈশ্বর যত্নশীল নির্মাতা। তাঁর শাশ্বত নিয়মের কোলেই আমরা বাস করি।
পর্ব – ৩৮
আমরা স্থবিরচিত্তে সন্তুষ্ট থাকি আমাদের বর্তমান জীবনটিকে নিয়ে। জীবনের প্রকৃত প্রসাদ আমরা তখনি পাই, যখন আমাদের জীবনটি প্রতিনিয়ত সময়ের সাথে এগিয়ে যায়। স্থবিরতা কখনো জীবনের প্রকৃত সুখ দিতে পারে না। প্রকৃত সুখ গতিময়তায়, সামনের দিকে নিরবচ্ছিন্ন অগ্রসরতায়।
নিজেকে এই প্রশ্নটি করুন, আপনি কি আপনার জীবনকে বদলানোর জন্য প্রস্তুত? আপনি কি আপনার অভ্যন্তর জগতকে বদলানোর জন্য প্রস্তুত? যদি আপনার দিনগুলো পূর্বেকার মতই হয়, তাহলে তা অর্থশূণ্য। গতকালকের চেয়ে আজকের দিনকে একটু হলেও এগিয়ে নিন। প্রতি মুহুর্তে, প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে নিজেকে জাগিয়ে তুলুন, লাভ করুন নতুন নতুন প্রাণপ্রবাহ। পূর্বের নিজেকে নিজেই অতিক্রম করুন, নতুন আপনত্বে সজ্জিত হোন। পুরাতনকে ধরে রাখা জগতের নীতি নয়। নতুনত্ব কে স্বাগত জানান। প্রতিক্ষন নতুন জীবনে জন্ম নিন।
নতুন জীবনে জন্ম নেওয়ার একটিই পথ আছে। মৃত্যু। মৃত্যুর পর্বেই মরে যাওয়া নব জন্মের একমাত্র দরজা।
পর্ব – ৩৯
নিয়মের ঐক্যতা আমাদেরকে এটাই শিক্ষা দেয় যে, জগতের কোনো অপূর্ণতা কখনোই থাকেনা। প্রকৃতি আপন খেয়ালে অপূর্ণ স্থান পূর্ণ করে তোলে। জগতের অংশবিশেষ কখনো পরিবর্তিত হলেও সমগ্রটা কখনো পরিবর্তিত হয়না। একই থাকে। তারতম্য ঘটে বহিরঙ্গে, ভেতরকার অনন্ত জগতে কখনো, কোথাও কোনো পরিবর্তন হয় না, না ঘটে কোনো ছন্দপতন।
একজন চোর যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, তখনি হয়তো জন্ম হয় আরেকজন নতুন চোরের। একইভাবে যখন একজন সৎলোক জগত ছেড়ে চলে যায়, তখনও আরেকজন সৎলোকের জন্ম হয়। এই ঐশ্বরিক নিয়মের ভেতরে সবকিছু এমনভাবেই সামঞ্জস্যশীল থাকে, ঐক্য বজায় থাকে। সত্যিকার অর্থেই জগতে কোনো পরিবর্তন হয়না। যখন গত হন একজন সুফি, তার অনন্ত সেফাতরাশি বিলুপ্ত হয়না, ঠিকই জন্ম নেন আরেকজন সুফি, যিনি পূর্ববর্তী সুফির গুণাবলি ধারণ করেন, কায়েম করেন। এভাবে মৃদু তরঙ্গে চলতে থাকে জগতের সকল নিয়ম, ঐক্য ও ছন্দ।
জগতে কোনো কিছু শূণ্য হয়না। সৃষ্টির চিরাচরিত স্বাভাবিক ছন্দে সকল কিছু চলতে থাকে পূর্ণতার পথে।
পর্ব – ৪০
ভালোবাসা ব্যতীত জীবনের কোনো মূল্য নেই। জীবনের জন্য একান্ত অপরিহার্য হচ্ছে নিখাদ ভালোবাস, যা আসলে সম্পূর্ণ ঐশ্বরিক, আর এ ভালোবাসাই নিয়ন্ত্রিত করে সকল জীবনের সকল হিসাব। যখন আপনি ভালোবাসা খুঁজবেন, তখন প্রশ্ন করবেন না যে ভালোবাস কি আধ্যাত্মিক না জাগতিক? স্বর্গীয় নাকি পার্থিব? প্রাচ্যের নাকি পাশ্চাত্যের? মনে রাখবেন বিভেদ কেবলি বিভেদের জন্ম দেয়।
ভালোবাসার কোনো নাম নেই, কোনো সংজ্ঞা নেই। এটি যেমন, তেমনই। নিখাদ, সরল। কোনো বর্ণনা ব্যতিতই এটি সুন্দর, কোনো উচ্চারণ ব্যতিতই একটি শ্রুতিমধূর, কোনো রং ব্যতিতই একটি দর্শনীয়, কোনো স্বাদ ব্যতিতই এটি মধূর, কোনো উপমা ব্যতিতই একটি নিখাদ। ভালোবাস হল জীবনের জল। আর প্রেমিক হলো অগ্নির আত্মা। অগ্নি যখন জলকে ভালোবাসে, তখন এমনকি এই মহাবিশ্বের গতিও বদলে যায়।
শুধু ভালোবাসুন, অযথাই, কোনো কারণ ছাড়াই। এটিই আপনার মুক্তির কারণ হবে।
শামস তাবরীজের “ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র” অবলম্বনে এলিফ শাফাক রচিত “ফরটি রুলস অব লাভ” থেকে চল্লিশ নিয়মের ভাবানুবাদ।
ভাবানুবাদ করেছেন – লাবিব মাহফুজ চিশতী
প্রকাশনায় – আপন খবর

