লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
১২ টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এ লেখাটি। তত্ত্বজ্ঞান থেকে ভক্তিমার্গ তথা প্রভূপ্রাপ্তির পথের সম্যক পরিচয় বিধৃত আছে এ লেখায়। তত্ত্বানুসন্ধানী ও জ্ঞানপিপাসুদের কিঞ্চিৎ উপকার হলেও লেখাটি স্বার্থক হবে।
জ্ঞান মার্গ – তত্ত্বজ্ঞানের প্রাসঙ্গিকতা ও মূল্য
স্বভাবত আমরা ইন্দ্রিয়লব্ধ ধারণার প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার অতীত নয়। আর আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান অতিমাত্রায় জাগতিকতা সাপেক্ষ। আমরা যা দেখি, স্বাভাবিক ভাবে তার প্রতিই অতিমাত্রায় বিশ্বাসী হয়ে উঠি। কিন্তু চেতনা কখনো প্রশ্ন তোলে না যে, আমার দেখা বিষয়টি কি সার্বিক ভাবে সত্য? ইন্দ্রিয় আমাদেরকে প্রচুর ফাঁকি দেয়। যা থেকে আমাদের ভিতরে তৈরী হয় নানান অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার আর দূর্বোধ্যতার দেয়াল।
“প্রভুজ্ঞান চিরনিত্য। তিনি স্বয়ং হাইয়্যুল কাইয়্যুম হয়ে চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী জগতে নিত্য আসীন। তাঁর পরিচয় জ্ঞানও তাঁর অস্তিত্বের মতো চিরনিত্য, শাশ্বত তথা চিরন্তন।”
আমরা তখনই ভুলটা করে বসি, যখন আমরা প্রভুজ্ঞান অর্জন করতে যাই আমাদের অর্জিত জ্ঞানের আলোকে। তখনই আমাদের স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস টা হয়ে উঠে সংকীর্ণ আর অন্ধবিশ্বাসে ভরপুর। আর আমরাও সগৌরবে সে অপ্রতুল খোদা বিশ্বাসের বুলি শত সহস্র মুখে আউরিয়ে পথভ্রষ্ট করে তুলি অন্যান্যদের।
খোদাজ্ঞান অর্জন করার বিষয় নয়। জগতের পলে পলে, প্রতি কণা-অনুকণায় সর্বদা অনুরণিত হচ্ছে খোদাজ্ঞানের এক শ্বাশত ফোঁয়াড়া। আমরা আমাদের অর্জিত নানান অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের আবরণে বঞ্চিত হয়ে আছি সে শাশ্বত সংগীত থেকে। যে সংগীত প্রভুপ্রেম আর তাঁর পরিচয় জ্ঞানের নহর হয়ে চিরকালে প্রবাহিত হচ্ছে জগতের প্রতি ধূলিকণায়। যদি আমরা আমাদের আপনাপন অর্জিত বিষয়াদির বৈচিত্রতা আর জ্ঞানের জঞ্জাল অপসারন করে স্থিত হতে পারতার তাঁর শ্বাশত অস্তিত্বের মধ্যে, তবেই আমাদের কর্ণগহ্বরে বেজে উঠতো তাঁর আগমনী সুর। লাভ করতাম তাঁর অস্তিত্বের পরিচয় আমাদের আপনাপন অস্তিত্বের মধ্যে। তখন আমাদের উপলদ্ধি হতো যে, সমস্ত জগত সংসারটাই তাঁর পবিত্র অস্তিত্বের প্রকাশ ও বিকাশ। সমগ্র ব্রহ্মান্ড ব্যাপী তিনিই সর্বদা নিজের অস্তিত্বকে ও সৌন্দর্য কে বিকশিত করে চলেছেন। হৃদয়ে আপনা হতেই জেগে উঠতো প্রভুর মহিমান্বিত স্বরূপের প্রকাশ।
প্রভুজ্ঞান আমাদের সর্বঅস্তিত্বে বিরাজমান। এটি আপনা হতেই জাগরিত হবে যদি আমরা সেই মহিমাময়ের ঐক্যতান সংগীতে নিজেদের সুর সেধে নিতে পারি। তাঁর জ্ঞান তাঁর থেকেই হবে। অন্য কোনো মাধ্যম থেকে আসা অসম্ভব।
“সরাসরি তাঁর থেকে যারা তাঁকে চিনে নিতে পেরেছেন, তারাই তত্ত্বজ্ঞানী।”
আমাদের ইন্দ্রিয়, চিত্তবৃত্তি বা বুদ্ধির দ্বারা আমরা তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণকে সুদূর পরাহত করে তুলতে পারি মাত্র। আমরা সর্বদা নিত্য অনিত্যের ধোঁকায় আবদ্ধ বিধায় সে পবিত্র জ্ঞান আমাদের চিত্তকে আকৃষ্ট করে না।
যখন আমরা আমাদের অর্জিত সকল বোধের অতিতে গিয়ে স্থিত হবো শূন্যতায়, তখনই আমাদের শূণ্যতা ব্যাপী উদ্ভাসিত হবে মহিমাময়ের পূর্ণতম অস্তিত্ব। সে অস্তিত্বের আলোকে তখন আমাদের ভিতব বাহিরে প্রকাশিত হবে তাঁর অনন্ত সৌন্দর্য। তখনই আমরা নিত্য অবগাহন করবো সে সৌন্দর্যের আলোকরশ্নির মধ্যে যা আমাদের স্বরূপ নয় তথা যা নিত্য নয়, বরং ক্ষণকালের জন্য আমাতে অবস্থান করছে মাত্র (রিপুনিচয়, ধারনা ও জাগতিকতা) এসব থেকে মুক্তি লাভ করার নামই তত্ত্বজ্ঞান অর্জন করা।
প্রভুর অস্তিত্বের স্বপক্ষে যুক্তি দাড় করানোটাই সবচাইতে বড় বোকামী। যেখান তাঁর অস্তিত্ব ব্যতিত অন্য কোনো অস্তিত্ব নেই। আমিও অস্তিত্ববান তাঁরই অস্তিত্বে। কিন্তু আমরা সে মহান অস্তিত্বের উৎস হতে বিতাড়িত হয়েছি আমাদের অর্জিত জ্ঞান আর খন্ডিত বুদ্ধিবৃত্তির আত্মবিধ্বংসী আচরণে। যত্ন সহকারে সে পাশবিকতা বা প্রবৃত্তিসমূহকে আপনত্ব হতে দূরীভূত করতে সক্ষম হলেই আমাদের মধ্যে জেগে উঠবে মহাসমুদ্রের বিশালতা। তখন সমুদ্রে পতিত পিপিলিকার মতো সমুদ্রের অস্তিত্ব জানার বা সমুদ্রকে চেনার বাসনাই থাকবেনা। থাকবে শুধু সমুদ্রে ডুবে নিজেই সমুদ্র হয়ে যাওয়ার আকুলতা। তখন সমুদ্র সংক্রান্ত সকল জ্ঞান অবলুপ্ত হবে। কাজে দিবে শুধু সে অনন্ত অস্তিত্বে নিজের অস্তিত্বটাকে রাঙিয়ে নেয়ার সক্ষমতা।
অহং ত্যাগেই পরমের আগমন।
কোনো মতবাদ জানা জ্ঞান নয়। তত্ত্বজ্ঞান হলো প্রভুর স্বরুপ আপন অস্তিত্বে উপলব্ধ করার প্রক্রিয়া। যা সম্ভব হবে অহং তথা আপনত্ব ত্যাগে। আপনত্ব ত্যাগ মানেই হলো আপনাপন মতাদর্শ ত্যাগ, অর্জিত বুদ্ধিবৃত্তি, পূর্ব অভিজ্ঞতা ত্যাগ। যাকে আমরা সংস্কার বলি। সংস্কাররাশিই আমাদের বন্ধন। তত্ত্বজ্ঞান হলো এক সার্বিক উপলব্ধি। যা হৃদয়ে আপনা প্রস্ফুটিত হয়। তত্বজ্ঞান লাভ হওয়ার পূর্ব অবধি সকল প্রাণী বন্দী। বন্দীরাই দুঃখভোগ করবে। মুক্তদের জন্য চির আনন্দ। মুক্তরাই তত্ত্বজ্ঞানী।
“জগতের সকল কিছুতে পরম সৌন্দর্য অনুভূত হওয়ার নাম তত্ত্বজ্ঞান। অর্থাৎ অস্তিত্বকে জানা এবং অনস্তিত্বকে না জানা- এটাই তত্ত্বজ্ঞান।”
ত্যাগেই আসে জ্ঞান। জ্ঞানের প্রকাশ হয় স্বভাবের স্নিগ্ধতায়। “আমিই সত্য – এটিই তত্ত্বজ্ঞানের একমাত্র প্রকাশ।” ধর্মের স্বার্থকতা এখানেই। আপনত্বে তথা স্বরুপে প্রভুর জাগরণে।
জয় হউক জ্ঞানমার্গ এর।
শাশ্বত চেতনার স্ফুরণ; মানবীয় অস্তিত্বের পরিণতি
আমাদের অবশ্যম্ভাবী পরমগতি প্রভু সমীপে উপস্থিত হওয়া। স্রষ্টা তাঁর প্রেম বাসনায় অতি যত্নে আমাদের সৃজন করেছেন, আবার তাঁর বাসনান্তে আমাদের ফিরিয়ে নিবেন তাঁর অন্তহীন প্রেমের আবহে। তাঁর কাছেই ফিরে যাবো আমরা সবাই। ব্যাবধান শুধু এটুকু যে, কেউ আগে যাবো আর কেউ পরে। কিন্তু তাঁঁর সমীপবর্তী হতেই হবে আমাদের। তবে কেনো তাঁর থেকে দূরে থাকার এতো বৃথা আয়োজন? যদি ফিরতেই হবে তাঁর দ্বারে, তবে সে মহিমান্বিত “ফেরা”র জন্য প্রস্তুত হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি?
প্রভু আমাদেরকে বারবার আহ্বান করছেন তাঁর নিকট ফিরে যেতে। তাঁর কাছ থেকেই এসেছি আমরা। এখানে (ধরাতে) এসে ক্ষণিকের মিথ্যা মায়ায় জড়িয়ে ভুলে আছি সেই আমার আদি নিবাসকে। ভুলে আছি সেই পরমাত্মীয় কে, যার নিকট থেকেই এসেছি আমি। জাগতিকতার মোহপাশে বদ্ধ হয়ে আছি আমি। হৃদয় আজ রুদ্ধ! শুনতে পাচ্ছি না পরমপ্রভু সেই প্রেমময় ডাক। মায়া মোহের জঞ্জালতায় ছেঁয়ে আছে চিত্তের তটভূমি। হৃদয়কে শুদ্ধ করা গেলেই শুনতে পারা যাবে সেই মহিমাময়ের প্রেমময় ডাক। শুদ্ধ হৃদয়ে তাঁর দিকে এগোলেই তিনি প্রেমভরে আমাদেরকে গ্রহণ করবেন।
সেইতো প্রকৃত ধার্মিক, যিনি এ মায়া সংসারের সমস্ত বাধ্যবাধকতা ত্যাগ করে আপন হৃদয়কে সমর্পিত করেছেন ঈশ্বর চরণে। জগতের সকল ভোগ বিলাস, মায়া মোহ তথা সকল রিপুনিচয়ের পাশবিকতা পরিহার করে যিনি আপন অস্তিত্বকে সঁপে দিয়েছেন প্রভুর চরণকমলে, তিনিই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ।
প্রতিটি মানবীয় অস্তিত্বে, অস্তিত্বের আদি কারণ হয়ে স্বয়ং পরমাত্মা সদা বিরাজ করেন। সাধক হৃদয় যখন সকল কামনা বাসনা পরিহার করে সে পরমাত্মার শরণ নেয়, তখনই তাঁর সর্বব্যাপী মূর্ত হয়ে উঠে স্বয়ং পরমসত্ত্বা। তখনই তিনিই পরিণত হন স্বয়ং পরমে। তখন আর তাঁর সংসার যাতনা থাকে না।
সংসার সবসময়ই আমাদের তার মোহজালে বেধে রাখে। আমাদের কে সে বন্ধন দেয় পারমার্থিক চেতনা। এ পারমার্থিক চেতনাই আমাদের প্রভু সমীপবর্তী হওয়ার প্রেরণা দেয়। হৃদয়ে যখনি উৎপন্ন হয় সাংসারিক কামনা বাসনা, তখনই ঢাকা পড়ে যায় আত্মায় প্রজ্জলিত পরমের সূর্য। জাগতিকতার মেঘে যখন পরমাত্মা ঢাকা পড়ে তখনই মানুষ হারিয়ে ফেলে হিতাহিত জ্ঞান। জ্ঞানশূণ্য হয়ে তখন সে প্রতিনিয়ত অধর্মের যাতাকলে পিষ্ট হতে থাকে। মানুষটি নিমজ্জিত হয় ভয়ংকর অন্ধকারে। অজ্ঞানতার নাগপাশে আবদ্ধ হয়ে সে প্রতিনিয়ত জুলুম করতে থাকে আপন আত্মার ওপর। তাই এ মানুষকে সবসময় জুলুমকারী রুপে সাব্যাস্ত করা হয়। আপন আত্মা খুইয়ে এই বোধহীন মানুষগুলো জারজ তথা পরিচয়জ্ঞানহীন অবস্থায় নিন্মদেশে অবস্থান করতে থাকে। মৃত্যুর অধীন হয়ে তারা ধ্বংসের করাল গ্রাসে পতিত হয় প্রতিনিয়িত।
“এই ধ্বংসের অতলে নিমজ্জিত মানুষগুলোকেই প্রভু ডেকে ডেকে ফিরছেন শ্বাশত মুক্তির ধামে ফিরে আসার জন্য। নিত্য আনন্দের দেশে ফিরে আসার জন্য। প্রভু সমীপবর্তী হওয়ার জন্য।”
সংসারের পথে চলতে চলতে আমরা অনিত্য জ্ঞানে তথা অনিত্য বস্তুমোহে আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। আমাদের সাথী হয় সংসারের ক্ষণস্থায়ী মোহ। আমরা বিচ্যুত হই নিত্য পরমাত্মা থেকে। ফলে অনিত্যের বন্দীদশায় লীন হয় আমাদের মানবীয় মহত্ত্ব। আমরা বাস করি খন্ডিত চেতনায়। ধ্বংস তথা কেয়ামতের করাল ছোবলের মধ্যে। যদি আমরা সংসারে থেকে সংসারাসক্ত না হয়ে পরমাত্মার পথে চলতাম, তবেই সে মহিমাময় নিত্য পরমাত্মাই হতো আমাদের সাথী। আমরা স্থিত হতাম তাঁর নিত্যলোকে, গোলোকধামে।
সংসারাসক্তির এ রুচি যেদিন আমাদের হৃদয় মন তথা অন্তকরণ হতে বিদায় নিবে সেদিনই আমাদের ভিতর বাহিরে জেগে উঠবে প্রভুপ্রেমের এক অনন্ত প্রেরণা। সেদিনই আমরা মানুষ হবো। প্রভু প্রেমের প্রেমিক হবো। সেদিনই আমরা শুনতে পাবো প্রভুর আকুল আহ্বান।
সংসার তো বাকীর খেলা। এখানে উত্থান পতন দুটোই বাকী। ছেলে ভোলানো এক মিথ্যা কারসাজীর রংবাজার হলো এ জগত সংসার। এখানে আবদ্ধ হলে প্রাপ্তি তো দূরের কথা, সব হারানো ব্যতিত আর কিছুই হয় না। আর পরমাত্মার জগত সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে পৌঁছতে পারলে পতন তো হবেই না, বরং চিরকালে তথা চিরজীবনে উত্থান সাথে সাথেই হবে।
জয় হউক মানবের নিত্য চেতনার।
প্রভুপ্রেম – অনুরাগ সাধনা (গুরু প্রেম)
আমরা স্রষ্টার প্রেমের বহিঃপ্রকাশ। প্রভুর প্রেম তিয়াসা মেটাবার নিমিত্ত জন্ম আমাদের। অনন্ত প্রেমের ভান্ডার স্বরূপ স্বয়ং প্রভু আপন অস্তিত্বে নিহিত ছিলেন। প্রেম প্রকাশের তাড়নায় তিনি সমগ্র জগৎ সংসার সাজাইলেন। তৈরী করলেন তার প্রেমলীলা প্রকাশের ক্ষেত্রস্বরূপ এই মানুষকে।
মানুষের একমাত্র কর্তব্য হচ্চে সেই পরম প্রেমময়ের সাথে প্রেমলীলায় লিপ্ত থাকা। অপার প্রেমের বৃন্দাবন স্বরূপ তিনি জগতকে সাজিয়েছেন। কিন্তু আমরা জগতে এসে জগতের মায়ামোহে বিস্বরণ হয়ে আছি সে মহাপ্রেমিকের প্রেমলীলার কথা। দিব্যি ভুলে আছি তাঁকে। আমাদের সকল ধর্ম চেতনার মূল কথাই হলো প্রভুপ্রেমে নিজেকে সর্বদা নিয়োজিত রাখা।
জাগতিকতা থেকে সম্পূর্ন মোহ দূরীভূত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রভুতে শুদ্ধপ্রেম অসম্ভব। যখনি হৃদয় অবমুক্ত হবে সকল জাগতিকতা থেকে, তখনি হৃদয়ে জন্ম নিবে শুদ্ধপ্রেম, ভক্তি তথা ভগবানে অনুরক্তি। ভগবানে অনুরক্তি জন্মানোর সহজ পন্থা হলো সদা সর্বদা তাকে একান্ত নিজের হৃদয়ে স্বরণ সংযোগে রাখা। যে বস্তু নিজের, সবসময়ই তাঁর প্রতি প্রেম জাগ্রত থাকে। একান্তই আশ্চর্যের কথা, যা আমার, যা চিরকাল আমার, যাতে আমার অস্তিত্ব, যা চিরন্তন – তা আমার প্রিয় হয় না, অথচ প্রিয় হয় যতসব জাগতিক নশ্বর বিষয়াদি। বিনাশী বস্তুমোহে আবদ্ধ থাকা মানেই অবিনশ্বর সত্ত্বা থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
প্রভুর সাথে আত্মিক সংযোগ ব্যতিত সকল জপ তপ, ধ্যান সাধনা, পূজা অর্চনা, ইবাদত বন্দেগী, সব বৃথা। তীর্থে তীর্থে হাজার জনম কাটালেও বিন্দুমাত্র উপকার হবে না যদি না হৃদয়ে বাঁধা হয় স্রষ্টার প্রেমের রশি। তাঁর সাথে সুদৃঢ় একাত্মতা হলে সকল স্থানে, সকল অবস্থাতেই পূজা হবে। জগতের যত তপস্যা, এসকল দ্বারা শক্তি লাভ হতে পারে, কিন্তু যিনি প্রেম লাভ করতে চায়, তাকে ভগবানের সাথে একাত্ম হতে হবে। জ্ঞান বা শক্তি সে অপূর্ব প্রেমমহিমার কাছে নিতান্তই তুচ্ছ। প্রেমে যে অনন্ত মহানুভুতি, জ্ঞান তার ধারে কাছেও যেতে পারে না। জ্ঞান সর্বোচ্চ মানুষ খন্ড থেকে উত্তীর্ণ হয়ে অখন্ড আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু প্রেম আপনাকে দান করবে অনন্ত আনন্দ। জ্ঞানে ভেদাভেদ হতে পারে, প্রেম আপনাকে পৌঁছে দিবে একত্বের মহিমায়।
ভক্তিই প্রেমের সরল বহিঃপ্রকাশ। প্রভুতে দুর্ণিবার আকর্ষণ অনুভূত হওয়াই ভক্তি। ভক্তি এমন এক অনুষঙ্গ যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পাবে।
মানুষ স্বভাবতই মুক্তিতে আশাবাদী। জ্ঞানের মুক্তির চাইতে প্রেমের বন্ধন অনেক বেশি আনন্দের। মুক্তিতে আমরা যে আনন্দ অনুভব করি, স্বয়ং প্রেম সে আনন্দের দাতা। মুক্তি নয়, আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত প্রেমের বাঁধন। প্রেম আমাদের বেঁধে রাখবে মহাপ্রেমে। তবে প্রেমে জ্ঞানের ভূমিকাও কম নয়। জ্ঞান বিনা প্রেম মোহ ডেকে আনে আর প্রেম বিনা জ্ঞান শুধুই শূণ্যতা। ভক্তিকে আশ্রয় করে যারা সাধনা করে শুদ্ধ প্রেমের, প্রভুপ্রেমে যারা আহুতি দেয় নিজেকে, তারাই লাভ করে অনন্ত প্রেমের আনন্দ। সে সচ্চিদানন্দ সুধায় অবগাহন করে সে মহৎ মানুষটি স্থিত হয় মানবীয় স্বর্গে। লাভ করে চির প্রশান্তি। আর যারা প্রেম কে অবহেলা করে দৌঁড়াচ্ছেন অন্যান্য হাজারো মতবাদ বা বহু অনুষঙ্গ এর পেছনে, তারা অবশেষে লাভ করবে শুধুই শূণ্যতা।
যাকে লাভ করা আবশ্যিক, যে সত্ত্বা ব্যাতিত আমাদের অস্তিত্ব অকল্পনীয়, আমরা অজ্ঞানতার বশে তাঁকেই অস্বীকার করে আছি। আর যা একান্তই অলীক, অনস্তিত্ব- সেসকল জঞ্জালতার স্তুপকে আঁকড়ে আছি! কত বড় এ মূর্খতা! পরমাত্মার সাথে প্রেম আমাদের পরম মোক্ষ। যে প্রেম আমাদের অনিত্যতাকে ধুয়ে মুছে আমাদের কে উত্তীর্ণ করবে নিত্যতায়, সে প্রেমলীলা অস্বীকার করেই চলছে আমাদের দিনাতিপাত! বোধের জাগরণ ঘটুক আমাদের। সকল হৃদয়ে প্রজ্জলিত হউক প্রভুপ্রেমের অপূর্ব নূরের বাতি। সে প্রদীপের আলোয় নির্মিত হোক আমাদের ধর্মপথ। আমাদের ভক্তিপথ। জাগতিকতার নাগপাশ চ্ছিন্ন করে উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক নিত্যতা। প্রেমময়তা হোক আমাদের ভূষণ।
অনুরাগ সাধনায় প্রভুপ্রেম অধিষ্ঠিত থাকুক আমাদের সর্ব অস্তিত্বে।
ভক্তি মার্গ – প্রভুপ্রাপ্তির একমাত্র পথ
ধর্ম মানেই অটল নিষ্ঠা ভক্তি। যুগে যুগে ধর্ম প্রতিপালিত হয়েছে ভক্তদের দ্বারা। ভক্তরাই ভক্তিচিত্তে ধারণ করে ভগবানকে। যার হৃদয়ে নেই অচলা ভক্তি, সে তো ধর্ম পথের জঞ্জাল ব্যতিত অন্য কিছু নয়। ভক্তি-বিশ্বাস-প্রেম, এ তিনের সমন্বয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্ম। বৃথা পান্ডিত্যের অহংকার তথা ঔদ্ধত্য নিয়ে যারা ধর্ম বুঝতে চান বা ধর্ম করতে চান, তারা বৃথাই লাফাচ্ছেন। ধর্ম আত্ম নিবেদনের বিষয়। একান্ত চিত্তে ভগবান তথা মানুষ গুরুর চরণকমলে নিজেকে উৎসর্গ করে তার চরণের ধুলি হয়ে যাওয়ার মধ্যেই নিহিতি ধর্মের সকল মর্ম।
যদিও প্রেম আর জ্ঞান সম্পুরক, তবুও ভক্তিমার্গে প্রেমটাই মূখ্য। প্রেমিকের বহু আচরণ, বহু কথাবার্তা এমনকি জ্ঞানীও বুঝতে পারে না। প্রভু কে লাভ করতে হয় প্রেমের আচরণ দিয়ে। আর প্রেমের আচরণ সর্ব অবস্থাতেই প্রেমিককে করে তোলে ভক্তিপ্রবণ। প্রেমাস্পদ এর নিকট চরম সমর্পনই তখন মূখ্য হয়ে উঠে প্রেমিক চিত্তে। সকল অহমিকা বিসর্জন দিয়ে নিজেকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ জ্ঞান করে সে নিজেকে বিলীন করে দেয় ভগবানের তথা মানুষগুরুর চরণে। সে ভক্তটিই গুরুর যথাযথ নির্দেশনায় হয়ে ওঠে প্রকৃত ধার্মিক।
তখন সে ভক্তটি শুধুমাত্র তাঁর ভগবানের তথা মুর্শিদের বা গুরুর সেবা করেই আনন্দ পায়। গুরুপদে নিজের সব বিলিয়ে দিয়ে গুরুময় অস্তিত্বের অধিকারী হয়ে স্বার্থক করে তোলে তাঁর মানব জনম। বলা হয়, গুরুতে নিষ্ঠ তথা সমর্পিত একজন ভক্তের মর্যাদা দেবতা থেকেও বেশি। এ ভক্তই লাভ করে প্রভুর দীদার তথা পরম প্রভুর স্বানিধ্য। তারাই প্রকৃত ধার্মিক।
ধর্মপথে একজন ভক্তের কর্তব্য শুধু গুরুর শ্রীপাদপদ্মে নিজেকে পূর্ণ সমর্পণ করা তথা শরণাগত হওয়া। মানুষ গুরুর শরণ নিলে সে ভক্তের আর ভজনা করতে হয় না। তাঁর ভজনা আপনা আপনিই হয়ে যায়। কারণ, সে তো পরমে আশ্রয়েই আছে। তাঁর সকল কাজই তখন ভজনা। সে ভক্তটি শুধু পূর্ণ নিবেদনে থেকে গুরু সেবায় ব্যাস্ত থাকে। যে ভক্তটি নিজের কোনো বিশেষত্ব না দেখে কেবল নিজেকে দীনহীন জেনে, নিরহংকারী হয়ে একাগ্র চিত্তে পড়ে থাকে দয়ালের চরণে, সে ভক্তটির উপর ই দয়ালের সমস্ত করুণার বিগলিত ঝর্ণা ধারা প্রবাহিত হয়। গুরু হৃদয়ে তার নিবেদিত ভক্তের প্রতি যে ভালোবাসা, কৃপা আর করুণা তা বলে বোঝানো অসম্ভব।
একজন নিবেদিত ভক্ত, সে যেই হোক না কেনো, এ জগতের শ্রেষ্ঠ বিদ্বানের চাইতে সে উত্তম। ধর্মজ্ঞানে পান্ডিত্য অনেকেরই থাকতে পারে, কিন্তু ভগবানের করুণা একমাত্র সেই লাভ করবে যার রয়েছে অচলা ভক্তি, যার রয়েছে শর্তহীন সমর্পণ, যার রয়েছে পূর্ণ আনুগত্য-নিবেদন।
জগত সংসার হতে মুখ ফিরিয়ে একজন খাঁটি ভক্ত সর্বাবস্থায় আপন দৃষ্টি নিবন্ধ রাখে শুধু তার দয়াল তথা পরমের প্রতি। ভগবানের প্রতি। ভক্তটির ধ্যানে, চিন্তনে, মননে শুধু প্রতিফলিত হয় তার ভগবানের শ্রীরুপ। এভাবেই প্রতিনিয়ত ভগবানের অর্চনায় ভক্তটির হৃদয় হয়ে উঠে গুরুকেন্দ্রিক। একটা সময় তাঁর আর ভগবানের ধ্যান চিন্তন ব্যতিত অন্য কিছুতে মন বসে না। এরুপ ভক্তকেই খাঁটি ভক্ত বলা হয়।
বৃথা পান্ডিত্য বা দুনিয়াবি কোনো নিয়ামক দিয়ে নয়, প্রকৃত ধার্মিক চিনতে হবে তাঁর ভক্তির আলোকে। জগতের শ্রেষ্ঠ মানুষ সেই, যার হৃদয় ভরা রয়েছে ভক্তিধন। ভক্তিধনে ধনী মানুষটাই জগতের সেরা ধনী। যার হৃদয় মন সর্বদা গুরুতে তথা ভগবানে লিপ্ত থাকে, তাকে কখনো সাধারন ভাবা যাবে না। সে সরাসরি প্রভুপ্রাপ্ত আর প্রভুতে সমাহিত। সে সদা প্রভুতে বাস করে। সে নিত্যধামের বাসিন্দা। চির সবুজ গোলোকধামের বাসিন্দা। তাঁর প্রতিটি কর্মে পূজা সাধিত হয়। তিনি সর্বদা মহাভাবে লিপ্ত থাকেন। তিনিই জগতের শ্রেষ্ঠ মানুষ।
আমাদের ধর্মচেতনা প্রতিষ্ঠিত হোক প্রেম ভক্তি আর বিশ্বাসের স্তম্ভের ওপর। তবেই আমরা হবো খাঁটি ধার্মিক। নতুবা বৃথা ধর্মজ্ঞানী সেজে কোনো লাভ হবে না। চরম বিনয়, আদব আর ভক্তিনিষ্ঠা পারে একজন মুক্তিকামী কে মুক্তির সন্ধান দিতে।
প্রভুগুরু সকলের সহায় হোক।
প্রভুপ্রেম – পরমপ্রাপ্তির একমাত্র উপায়
জগতের একমাত্র অস্তিত্বশীল সত্ত্বাই হলো প্রভুসত্ত্বা। প্রভুসত্ত্বা বাদে প্রতিনিয়িত আমরা যা ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করি বা প্রত্যক্ষ করি, সবই আমাদের বিকারগ্রস্ত মনের কল্পনাপ্রসূত মিথ্যা আবিষ্কার ব্যতিত অন্য কিছু নয়। সংসারের মোহমায়া আমাদেরকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধে যে, স্বতঃপ্রাপ্ত প্রভুসত্ত্বাকে আমরা পাই না, চিরনিত্য প্রভুসত্ত্বা কে আমরা দেখি না, সদাবর্তমান পরমকে তথা প্রভুপ্রেম কে আমরা উপলব্ধি করতে পারি না। প্রভুগুরুর মহত্ত্ব উপলদ্ধি করতে হলে প্রথমেই আমাদেরকে মুক্ত হতে হবে সকল জাগতিক বন্ধন থেকে। তবেই আমাদের অনুভবের সীমানায় আসবে সে পরম মহিমান্বিত সত্ত্বা।
আমরা জগত থেকে সারাজীবন যা অর্জন করি, তার সব কিছু থেকেই আমাদের ভোগ করতে হয় বিচ্ছেদের যন্ত্রনা। আমাদের জাগতিক সকল প্রাপ্তিই এক একটা বিচ্ছেদের বার্তা নিয়ে আসে। জগত থেকে আমরা যত অর্জন করি, আমরা তত বিচ্ছেদের অনলে পুড়ে মরি। কিন্তু পরম সত্ত্বা তো নিত্যপ্রাপ্ত। তাঁকে অর্জন করা যায় না। তিনি সবসময়ই আমাদের ভিতর বাহির পরিবেষ্টন করে আছেন। কখনো আমরা চিরবর্তমান সে মহিমাময় সত্ত্বাটিকে অনুভব করতে পারি, কখনো পারি না। আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে, পরম সত্ত্বা নিত্যপ্রাপ্ত হওয়ায়, একবার যদি আমরা হৃদয়ের কালিমা দূর করে তাঁর সঙ্গে মিলিত হই, তাহলে তাঁর থেকে আর কখনো আলাদা হতে হবে না। পরমের সঙ্গে কখনো বিচ্ছেদ হবে না। আমাদের ভুল হচ্ছে এটাই যে, আমরা অস্তিত্বকে জাগতিক ভাবে গ্রহণ করে নিয়েছি।
প্রভু প্রাপ্তির পথে সবচাইতে বড় প্রাপ্তি হচ্ছে, প্রভু আপনাকে তাঁর অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবেন। প্রভুর সবচাইতে উদার পুরষ্কার এটিই যে, যদি কেউ তাঁর যথার্থই তাঁর ভক্ত হয়, তবে তিনি সে ভক্ত তে তাঁর অভিভাবক করে নিবেন। আপন অস্তিত্বের সকল মহত্ত্ব কে ফুটিয়ে তুলবেন সেই ভক্তটির মধ্যে। এই উদারতা কেবল প্রভুপ্রেম দ্বারাই সম্ভব।
পরম প্রভু চিরকালে প্রজ্জলিত সূর্য সম দীপ্তিময়। তাই তার উত্থান পতন বা জন্ম মৃত্যু বলে কিছু নেই। শুধু তিনি তাঁর ভক্তের আহ্বানে প্রকট হন মাত্র।
ভগবান চিরন্তন। অভাব কেবল সেই ভক্তের, যে ভক্ত তাঁকে সদা সর্বদা দেখবে। তিনি সদা বর্তমান। অভাব তো তাঁকে গ্রহণ করার মানসিকতার। প্রভু স্থান কাল পাত্রের অতিতে শ্বাশত কালে বিরাজ করেন। মানবীয় অস্তিত্বে তিনি সর্বদা তাঁর রুপ গুণ কে প্রকাশিত ও বিকশিত করে থাকেন। আমরা যদি বিশ্বাসী হই মানবীয় মহত্ত্বে, তবেই আমরা লাভ করতে পারবো সেই নিত্যপ্রাপ্ত পরম সত্ত্বা কে। আর যদি মানুষতত্ত্ব অস্বীকার করে স্রষ্টাকে খুঁজে বেড়াই বিশ্বময়, নিরাশ হওয়া ব্যতিত পথ থাকবে না।
যখন কাম কামনার মেঘে আচ্ছন্ন হয় আমাদের চেতনা, তখনই আমরা হারিয়ে ফেলি সেই জ্যোর্তিচ্ছটা। যখনই নয়ন থেকে অপসারিত হয় জাগতিকতার পর্দা, তখনই আমাদের নয়নে প্রস্ফুটিত হয় সে অনন্ত মহিমা। প্রভুকে খোঁজা একদম অবান্তর। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে হৃদয় মন হতে সমস্ত জঞ্জাল অপসারন করা। নয়নের পর্দা সমূহ দূরীভূত করা। তবেই সে শ্বাশত অস্তিত্ব তথা প্রভুসত্ত্বা এমনিতেই উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে ভিতর বাহিরে। কারণ ভিতর বাহির তথা সর্ব-অস্তিত্বে একমাত্র তিনিই অস্তিত্বশীল।
যখন আমরা ভগবান লাভ করার জন্য সাধনায় লিপ্ত হই, আমাদের মনে হয়, প্রভু কতদূর! যখন ধীরে ধীরে হৃদয় আলোকিত হয়ে উঠে, হৃদয়ের কালিমা দূর হতে থাকে, ধীরে ধীরে আমার অস্তিত্বে নিকটবর্তী হতে থাকে পরম প্রভু। তারপর আমরা আমাদের অস্তিত্বজুড়ে অনুভব করি প্রভুপ্রেম, অনাদীকালের শ্বাশত মহিমা। তারপর আমরা আমাদের সকল ইন্দ্রিয়ে একমাত্র তাঁকেই লাভ করি। চোখে শুধু তাঁকেই দেখতে থাকি, কানে শুধু তাঁরই মনহারিনী সুর শুনতে থাকি। সর্ব উপলব্ধিতে সেই তখন আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
পরাধীনতার নিগঢ় ভেঙে যখন আমরা মুক্ত হতে পারবো, তখনই আমরা প্রভুর মহিমাকে তথা প্রভুপ্রেম কে অঙ্গে ধারণ করার উপযুক্ত হবো। তিনিতো প্রেমের দায়ে ভক্তের ভক্তির নিকট ওতপ্রোতভাবে বাধা। তিনি সকল পারলেও, ভক্তের বাধন চ্ছিন্ন করতে পারেন না। ভক্তির দ্বারে বাঁধা তিনি। ভগবানে একাত্মতা সে প্রেমকে আরো গভীরতা এনে দেয়। বন্ধনকে করে আরো শক্তিশালী।
আমি তাঁর… এ মহান উপলদ্ধিই পারে সকলকে প্রভু সমীপবর্তী করতে। জগত বিমুখতাই পরম প্রাপ্তির একমাত্র উপায়। একাগ্র প্রেম তথা ভক্তি সাধনার মধ্য দিয়ে লাভ করা যেতে পারে মহাপ্রভুকে।
প্রভুগুরু সকলের সহায় হোক।
ঈশ্বর প্রাপ্তি
মানব জিবনের একমাত্র পূর্ণতা ও সফলতা হলো ঈশ্বর প্রাপ্তি তে। যদি কেউ লাভ করে ঈশ্বরকে, তবে জগতের লাভ করার তাঁর আর কিছুই থাকবে না। না থাকবে আর কিছু জানার বা না থাকবে অন্য কোনো নিয়ামকের প্রয়োজনীয়তা। ঈশ্বরকে লাভ করতে সক্ষম হলে আমাদের হৃদয় থাকবে সদা সদ্ভাবে পরিপূর্ণ। সে ঈশ্বরপ্রাপ্ত মানুষটিই হবে ঈশ্বরের প্রতিনিধি। তখন তাঁর মাধ্যমে অন্যরা ও লাভ করবে ঈশ্বরকে।
মাছ যেমন সদা আকুল থাকে জল বিহনে, তেমনি যে হৃদয় ঈশ্বর বিহনে সদা আকুল থাকে, তার পক্ষে ঈশ্বরকে লাভ করা কঠিন কিছু নয়। সংসারের সকল প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির উর্ধ্বে উঠে যিনি সদা নিমগ্ন থাকেন ভগবানের চিন্তায়, সেই আত্মমগ্ন সাধক খুব সহজেই ঈশ্বরকে লাভ করে থাকেন।
প্রকৃত সাধকতো তিনিই, যিনি সংসারের কোনো প্রাপ্তির আশা রাখেন না। কারণ সংসার হলো ক্ষনস্থায়ী। বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনো ক্ষণকালের প্রাপ্তিতে সন্তুষ্ট হতে পারেন না। আর পরমাত্মা শ্বাশত বা চিরন্তন। তাঁকে লাভ করা হলো চিরকালের লাভ। তাই জ্ঞানী সর্বদাই পরমাত্মায় সন্তুষ্ট থাকেন। আর পরমাত্মা থেকে কখনো নিরাশ হতে হয় না।
সাধকের হৃদয়ে ভগবৎ প্রাপ্তির বাসনা যত ব্যাকুলতা লাভ করে, তাঁর ভগবৎ প্রাপ্তির পথ তত সহজ হয়ে আসে। ভগবান ‘আত্ম’তে লুকায়িত। যখন সাধক আপন সাধনার বলে তাঁকে খুঁজে বের করবেন, দেখে ফেলবেন, তখন ভগবান আর লুকিয়ে থাকবেন না। সর্বদিক থেকে সর্বঅবস্থায় প্রতিনিয়ত তিনি প্রকাশিত হবেন।
আর যদি আমরা বিমুখ হই পরম সত্ত্বা থেকে, তবে অনিবার্য ভাবেই আমরা বঞ্চিত হবো আমাদের পরমাত্মীয় আত্মা থেকে। ঈশ্বর প্রাপ্তি থেকে। আপন অন্তর থেকে। যখন আমরা কোনো ক্রিয়াকে নয়, বরং ভগবৎ প্রাপ্তির সহায় অবলম্বন করবো নিখাঁদ প্রেমকে, তখন ভগবান তাঁর স্বরুপ উন্মোচন করতে বাধ্য হবেন।
ভগবান নিত্যপ্রাপ্ত। ভগবান চিরন্তন। ভগবান চিরস্থায়ী। যখন আমরাও জিবন সাধনার বলে নিজেকে চিরন্তন বা শ্বাশত কালে উত্তীর্ণ করতে পারি, তখনই ভগবান আমাদের হবেন। যতক্ষন আমরা বন্দী আছি ক্ষণকালে, যতক্ষন আমরা লিপ্ত আছি অনিত্য মোহে, যতক্ষন আমরা মৃত্যুর অধীন হয়ে আছি – ততক্ষণ আমরা শত চেষ্টা করেও সেই চিরনিত্য ভগবানকে লাভ করতে পারবো না। কারণ অনিত্য পাত্রে নিত্য বস্তুর ধারণ হয় না।
যে উদ্দেশ্যে আমাদের সৃষ্টি, যার জন্য আমাদের জন্ম, সেই প্রভুকে লাভ করাই যদি কঠিন কার্য হয় তাহলে সংসারে সহজ কাজ কোনটি?
ভাব-ব্যাকুলতাই ভগবাৎ প্রাপ্তির পথের পাথেয়। হঠকারিতা কখনোই সেই নিরন্তর মহিমাকে অর্জন করতে পারে। শুদ্ধ প্রেমের আচার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন সেই প্রেমময় সত্ত্বা। এবং সেই পরম সত্ত্বার আগমনে, ভগবৎপ্রাপ্ত মানুষটিও পরিণত স্বয়ং ভগবানে। তখন সর্বদা তাঁর ভিতরে বাহিরে বিরাজ করে মহাপ্রেমভাব। সে জগতের পলে পলে তখন বিলিয়ে বেড়ান প্রেমধন। তখন সে মানুষটির সেবা করলে ভগবানের সেবা করা হয়। সে মানুষটিকে সন্তুষ্ট করলে ভগবানকে সন্তুষ্ট করা হয়।
প্রেমের পথে সবচাইতে মূল্যবান হলো ভাব-ভক্তি-প্রেম-বৈরাগ্য। জগতের আসক্তি ত্যাগ করে ভগবানের আসক্ত হতে হয়। জগতের আসক্তিই হৃদয়কে কঠোর করে তুলে। আমাদেরকে বঞ্চিত করে রাখে মহাপ্রেমভাব থেকে।
এটাই চির সত্য যে, একমাত্র লাভ করার বিষয়টিই হলো পরমাত্মা। কারণ একমাত্র পরমাত্মায় অস্তিত্বশীল বা বর্তমান। আমরা জাগতিকে যে সমস্ত বিষয় বা বস্তু লাভ করার অহমিকা করে থাকি, আসলে তার অস্তিত্ব বলে কিছু নেই। অর্থাৎ তা লাভ করা যায় না। অনিত্য বা অনস্তিত্ব কিছু লাভ করার অহমিকা নিশ্চয়ই বোকামী!
আমরা নিয়ত জগতে বন্দী। জগতের লিপ্সায় বন্দী। কামনা বাসনায় বন্দী। জগতের অনিত্যতায় বন্দী। যদি আমরা যুক্ত হতে পারি চির স্বাধীন তথা সর্ব-অমুখাপেক্ষী ঈশ্বর এর সঙ্গে তবেই আমরাও লাভ করতে পারবো সকল বন্দীত্ব হতে স্বাধীনতা। তবেই আমরা হবো নিত্য। তখনই আমরা হবো প্রকৃত ধার্মিক।
মনে রাখা দরকার, ভগবৎ প্রাপ্তি কর্মের নয়, কৃপার ফল। আমরা আমাদের সুকৃতির দ্বারা যদি অর্জন করতে পারি ভগবানের সন্তুষ্টি, তবেই তিনি দয়াপরবশ হয়ে আমাদেরকে তাঁর স্বানিধ্য দ্বারা সৌভাগ্যবান করবেন। ঈশ্বর প্রাপ্তি ঘটবে। বাস্তবে তিনিই বিদ্যমান। কেবল তাঁর অস্তিত্বই বিদ্যমান। “অজ্ঞানতার অন্ধকার ত্যাগ করে যখন আমরা শরণ নিবো তাঁর, তখন তিনি আমাদের পতিতপাবণ হয়ে উদ্ধার করবেন।” তখনই আমরা হবো মুক্ত।
ভগবান সকলের সহায় হোন। ভগবৎ প্রাপ্তির দ্বারা জ্যোতির্ময় হোক সকলের অন্তকরণ।
মানুষ ও মনুষ্যত্ব – মানুষতত্ত্বের সহজ পাঠ
মানুষ দর্শন বা মানুষতত্ত্ব পাঠই জগতের সার। জগতের সকল রহস্যাবলীর এক সুশৃঙ্খল ভান্ডার এই মানুষ। জগতের সকল রহস্যের সমাধান এই মানুষ। আপনত্বে জগতের সকল তত্ত্ব কে ধারণ করে এই মানুষ। তাই মানব মহত্ত্ব অনন্ত ও অসীম। এই মানবীয় অস্তিত্বের অভ্যন্তরে মহান মহিমাময় সত্ত্বা জাতপাক রাব্বুল আলামিন প্রকাশ করেন তাঁর অনন্ত সৌন্দর্যকে। তিনি স্বয়ং প্রকাশিত ও বিকশিত হন এই মানুষের হৃদয় কমলে। মানুষ ব্যতিত তাঁর প্রকাশিত হওয়ার অন্য কোনো মাধ্যম নেই।
এই মানুষের ভিতরে অহর্নিশী বিরাজ করেন প্রভু। তিনি মানুষকে পরম মমতায় সৃজন করেছেন নিজেকে প্রকাশ করার মানসে। তাই তো মানুষ তাঁর কাছে এতো মূল্যবান। এতো আদরের। মানুষকে তিনি উপাধি দিয়েছেন তাঁর প্রতিনিধি। সকল সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ করেছেন মানুষকে। করেছেন আশরাফুল মাখলুকাত। চরমভাবে মানুষ সাপেক্ষ প্রভু মানুষকে কেন্দ্র করেই নিয়ত আবর্তিত হন তাঁর নির্ধারিত মানবসীমায়।
মানব মহত্ত্বের অনুসন্ধানই প্রকৃত ধর্ম। যারা মানুষ মহত্ত্বে অবিশ্বাসী, মানুষ রেখে নিরাকার কোনো কাল্পনিক প্রভুর ইবাদত করে চলেছে, তারা নিরেট গন্ডমূর্খ। মানুষ কে রেখে অনুমানে তথা কল্পনায় স্রষ্টার উপাসনার করার নামই মৌলবাদ। প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে মানবীয় অস্তিত্বে বিরাজিত প্রভুকে খুঁজে বের করা। তাঁর শরণ নেয়া।
সকল মানুষের ভিতরে প্রভু বিরাজ করলেও সকল মানুষের ভিতরে তিনি জাগ্রত নন। বেশিরভাগ মানুষ মানব মহত্ত্বে অবিশ্বাসী হয়ে অস্বীকার করছে মানুষে বিরাজিত প্রভুকে। তারা বৃথা ইবাদত করে চলেছে আকাশে বাস করা কোনো এক কিম্ভুতকিমাকার বা নিরাকার অদৃশ্য সত্ত্বার। প্রভুজ্ঞানে জ্ঞানী হলে তারা দেখতে পেতো, প্রভু আসমানে নয়, মানবের হৃদাকাশে অধিষ্ঠিত।
অপবিত্র মানুষগণ নোংরামির আবরণে ঢেকে রাখে প্রভুকে। অবিশ্বাসের দেয়াল ভেদ করে উদয় হতে দেয় না বিশ্বাসের সূর্য কে। তারাই ধ্বংস পথের যাত্রী। তারাই চলেছে আসফালাস সাফেলিনের পথে। আর যারা দিব্যজ্ঞানী, অদৃশ্য নিরাকার প্রভুর ইবাদত ছেড়ে করছে মানব মহত্ত্বের আরাধনা, তাঁরাই মুক্তির পথের অভিযাত্রী।
যারা সাধনার বলে আপনত্বে বিরাজিত প্রভুকে জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন, তারাই জ্ঞানী মানুষ। যারা হৃদয়ের দরজা খুলে বাইরে নিয়ে এসেছেন মহিমাময়ের অপূর্ব নূরের কিরণকে, তারাই আল্লাহর ওলী। তাদের ভিতর বাহির তখন প্রভু নূরে নূরান্বিত। তাদের অন্তকরণে সদা বিরাজ করে প্রভুর নূরের স্রোত। আল্লাহর স্বভাবে স্বভাবিত তাঁরা। তাঁরা প্রভুগুণ কে আপনত্বে ধারণ করে নিয়েছেন। প্রভুর স্বভাব আর তাঁদের স্বভাব তখন এক ও অভিন্ন। তখনই তাঁরা প্রভুর প্রতিনিধি। তখন ই তাঁরা অলীআল্লাহ। তখনই তারা মুর্শিদ বা রাসুল। যারা প্রভুগুনে গুণান্বিত হয়ে প্রভুর নাম ধারণ করে পতিত মানুষদেরকে উদ্ধার করে থাকেন।
যে দিব্যজ্ঞানী মানুষটির ভিতর বাহিরে প্রভু বিরাজ করেন, যে নিত্যধামের বাসিন্দা মানুষটি প্রভুর সকল স্বভাবসমূহকে ধারণ করে থাকেন, তখন এই মানুষটিই পরিণত হন প্রভু প্রাপ্তির উছিলায়। প্রভু সন্ধানী যারা, তাদের কর্তব্য হলো এই পবিত্র মানুষটির ইবাদত করা। কারণ, এই মানুষটি তখন প্রভুগুণে গুণান্বিত। প্রভুর এক নাম মুর্শিদ। এই নাম ধারন করে পবিত্র মানুষটি তাঁর ভক্তকূল কে তথা মুসলমানদেরকে উদ্ধার করে থাকেন। যারা এই পবিত্র মানুষের চরণে নিজেকে উৎসর্গ না করে, তারাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাঁরাই মুক্তিপ্রাপ্ত, যারা পবিত্র মানুষের ভজনার মাধ্যমে নিজের স্বভাবে সেই মহিমান্বিত প্রভুর গুণগুলোকে ফুটিয়ে তুলতে পারেন।
মানুষের সেবা করেই মানুষ হওয়া যায়। আমরা তো মনে করি, মানবসুরত ধারী সকলেই মানুষ। আমাদের চিন্তাটি মারাত্মক ভুল। মানবসুরতে আসলে কেউ কেউ মানুষ। যারা সাধনার বলে মানবীয় গুণে তথা প্রভুগুণে গুণান্বিত হয়েছে, শুধু তারাই মানুষ। বাকীরা সবাই মানব সুরতে পশু। সেই পশুরা যদি মানুষের সাধনায় মানুষ হতে পারে তবেই মুক্তি। নচেৎ তাদের আবদ্ধই থাকতে হবে হায়ানাতের দূভের্দ্য কারাগারে। মানুষের সাধনায় মানুষ হওয়াই ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা।
মানুষ, মানুষ হয়ে উঠুক। জয় হোক মনুষ্যত্বের।
প্রভু আশ্রিত ও প্রভুতে সমর্পিত সাধকই মুক্ত
আমরা স্বভাবত মায়া মোহের জালে আটকে পড়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ি সংসারের বিষয় যাতনার মধ্যে। সংসারের কঠিন শৃঙ্খলে জড়িয়ে ফেলি নিজেকে। সংসার কারাগারের দূর্ভেদ্য দেয়াল ভেদ করে আর বাইরে আসা হয়ে ওঠে না। আর লাভ করা হয় না মুক্তির স্বাদ। যতক্ষন আমরা সংসারে থাকি ততক্ষন আমরা পরাধীন। আর সংসারের মায়াত্যাগ করে যখনি আমরা আশ্রয় নেই প্রভুর নিকট তথা আত্মসমর্পন করি প্রভুতে, তখনই আমরা লাভ করি স্বাধীনতা।
সাধকের লক্ষন হচ্ছে, সে একমাত্র ভগবান বিনা অন্য কারো আশ্রয় নিবে না। জগতের সকল আশ্রয়ই পরাধীনতা। ভগবানে আশ্রিত হলেই তথা প্রভুতে আত্মসমর্পন করলেই পূর্ণরুপে জানা যাবে ভগবানকে। ধর্মপথের কামিয়াবি হলো একমাত্র প্রভুতে লিপ্ত থাকা। আর প্রভুতে লিপ্ত থাকা সম্ভব হয় প্রভুতে শরণ নেয়ার মাধ্যমে।
জগতের সকল ঝড়-ঝর্ঞ্ঝাট, সকল বাধা বিপত্তি তো জাগতিক মানুষের জন্য। যখনই সাধন নিজেকে অর্পন করে প্রভুর রাতুল চরণে, তখন সে সমর্পিত ভক্তের আর কোনো দুনিয়াবি চিন্তা, দুনিয়ার ভয় বা দুনিয়ার কোনো বিপত্তি থাকে না। কারণ সে ভগবানে সমর্পিত। যে ভগবানে সমর্পিত হয়, সে স্বয়ং ভগবানে অংশ হয়ে যায়। তখনই সে ভগবানের গুণ এবং রূপে সজ্জিত হয়ে সচ্চিদানন্দ ধামে নিত্যকালে বাস করতে থাকে। তখনই সে হয় প্রকৃত পুরুষ তথা মুক্ত শক্তি। সেই সাধক তখন প্রভুবলে বলীয়ান হয়ে জাগতিকতায় আচ্ছন্ন অন্যান্য জীবদের শিক্ষা দেয়।
জগতের আবশ্যিক নিয়মে আমাদের সঙ্গে সদা সর্বদা বিরাজ করে রিপুনিচয় বা প্রবৃত্তি। বেশ কিছু বাজে প্রবৃত্তি আমাদের নিত্যসঙ্গী। যে প্রবৃত্তি বা রিপু গুলো সবসময়ই আমাদেরকে বাজে কাজে প্ররোচনা দেয়। আমাদেরকে প্রভু হতে ফিরায়ে রাখে এবং সদা সর্বদা আমাদেরকে জাগতিকতায় আচ্ছন্ন রাখার প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। আমাদের সকল খারাপ ইচ্ছার জন্মদাতা হলো সে রিপুসমূহ। প্রভুপ্রাপ্তির পথে সাধককে সকল ধরনের আপন মনোবৃত্তি পরিত্যাগ করতে হয়। যতক্ষন সাধক চিত্তে আপনাপন ইচ্ছা বা প্রবৃত্তি অবশিষ্ট থাকে, ততক্ষন সে হৃদয়ে প্রভুর জ্যোতি বিকশিত হয় না।
যখনই সাধক প্রভুর সমীপবর্তী হওয়ার জন্য আপন ইচ্ছাসমূহকে ত্যাগ করে তখনই প্রভু প্রাপ্তির পথ সুগম হয়ে যায়। নিজ মনোবাঞ্ছা পরিত্যাগ করলেই প্রভুকে লাভ করা সহজ হয়।
আমরা সকলেই কোনো এক সময়ে পরম প্রভুর নিকট ছিলাম। মহৎ কোনো উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্ত আমরা এ জগতে পদার্পন করেছি। আমরা পরমপ্রভু অংশ। যদি আমরা জগতে এসে ভুলে যাই আমাদের আদি সেই আশ্রয়কে, সাময়িক সুখে মত্ত হয়ে যদি অস্বীকার করি আমার সেই চিরকালের আশ্রয় কে, এর চাইতে লজ্জার আর কি হতে পারে? আজ অথবা কাল, আমাকে আবার সেই পরম প্রভুর নিকট ফিরে যেতেই হবে। যে আমাদের আদি আশ্রয়, যার কাছে ছিলাম, যার কাছেই যাবো, তার আশ্রয় লাভ কখনোই কঠিন কিছু হতে পারে না।
যে হৃদয় জগতের সকল খারাপ থেকে অবমুক্ত, যে হৃদয়ে জাগতিক আসক্তি নেই, যে হৃদয় ধর্মপথে ব্যাকুল, সে হৃদয়টির জন্য প্রভুতে আশ্রয় লাভ করা একান্তই সহজ।
আমরা জগতে কত রকম কত বস্তুর আশ্রয় নিয়ে থাকি। যা আমাদের নয়, কখনো আমাদের হবে না, তার আশ্রয় নিয়ে কি লাভ? আর যা আমাদের কে ভিতর বাহিরে ঘিরে আছে, যা সর্বদা আমাদেরকে মোহিত করে রাখে, তার আশ্রয় কতই না আনন্দের, কতই না শান্তির!
একদম নিরহঙ্কারী সত্ত্বাটিই প্রভুর আশ্রয় বা শরণ লাভের জন্য একমাত্র উপযুক্ত। ভক্তি বিশ্বাস প্রেম কে সম্বল করে মাধূর্যপূর্ণ বিনয়ী স্বভাবের দ্বারা অতি সহজেই প্রভুর স্বানিধ্য লাভ করা যায়।
প্রভু চিরন্তন, শ্বাশত। অমর। চিরনিত্য। প্রভুতে যে আশ্রয়প্রাপ্ত, সেও অমর, চিরনিত্য। নিত্যের পরশে অনিত্য জীবসত্ত্বাটিও নিত্যে পরিণত হয়। তখনই নশ্বর জীব লাভ করে অবিনশ্বর রূপ। প্রভুর শরণ লাভ করলেই জন্ম মৃত্যুর অধীন জীবসত্ত্বাটি লাভ করে অমর জীবন।
মানুষের একমাত্র বাসনা হওয়া উচিত আত্মসমর্পন এর মাধ্যমে প্রভুতে আশ্রয় ও চির স্থিতি লাভ করা। ভগবান এর শরণ নেয়া।
আমাদের উচিত প্রভুর আশ্রয়ে বাস করা।
সহজ মানুষ; যাদের অনুসরণেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তি
যুগের পবিত্র মানুষের তথা ওলী মুর্শিদের বা সহজ মানুষ এর অনুকরণ অনুসরণের জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে সকল ধর্মে। মূলত এটিই মুক্তির একমাত্র পথ পদ্ধতি। যদি আমরা সর্বান্তকরণে ধারণ করতে পারি পবিত্রাত্মাদের আদর্শ, তবেই ত্বরান্বিত হবে মুক্তি। মুক্তির পথটা নিতান্তই দুর্জেয়। বিপদসংকুল। নানান বাধা বিঘ্ন ও জাগতিক সংকটে পূর্ণ। যদি সে বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে আমাদের সহায় থাকে একজন পবিত্র ও সিদ্ধ মানুষ, যিনি পথ প্রদর্শন করবেন প্রতি ঘটে, তাহলে মুক্তি পথ টা হয়ে ওঠে একান্তই আনন্দের ও সহজ।
সাধু বা মহাপুরুষ যারা, পবিত্র ও জ্ঞানী মানুষ যারা, তাদের দেখানো পথই সিরাতুল মুস্তাকিম তথা প্রভুর পথ। জ্ঞানীদের পথে চললেই আল্লাহর পথে চলা হয়। জ্ঞানীদের পথে চলতে গেলে জ্ঞানীদের আদর্শকে অন্তকরণে ধারণ করতে হয়। সাধু পুরুষদের কথা মতো না চলে শুধু শুধু ভক্তি করে কোনো লাভ হবে না। প্রকৃত সাধুসেবা বলে সাধুর আদর্শকে ধারণ করাকে।
ত্রিকালদর্শী মহাপুুরুষ বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী বলেছেন, আমার চরণ নয়, আমার আচরণ ধর। মহামানবের আচরণ আঁকড়ে ধরার মাঝেই মানব জীবনের স্বার্থকতা নিহিত। মহামানবের আচরণের মাঝে স্বয়ং প্রভুর আচরণ নিহিত। প্রভুর স্বভাবেই স্বভাবিত হয়ে তাঁরা হয়েছেন মহাপুরুষ। অর্থাৎ সাধু মহাত্মাদের আচরণ অনুসরণ করলে মহাপ্রভুর আচরণ অনুসরণ করা হয়। প্রভুর আচরণ তথা প্রভু গুণ বা প্রভুর রং কে যে ব্যক্তি ধারণ করে দীলে তথা সর্ব-অস্তিত্বে, তখন সেও হয়ে ওঠে মহাপুরুষ।
জগতের সকল কিছু প্রকাশিত হয় সূর্যের আলোক বিকিরণ করার ফলে। সে আলোকে সমস্ত কিছু মূর্ত হয়ে ওঠে। দেখা যায়। ঠিক তেমনি যদি কেউ আলোকিত করতে চায় তার ভিতরকে, তবে অবশ্যই কোনো না কোনো পবিত্র মানুষের সুস্বভাবের নূরে নূরান্বিত করতে হবে অন্তকরণকে। পবিত্র মানুষের সুস্বভাবের নূর ব্যতিত অন্তর্লোক আলোকিত হওয়ার দ্বিতীয় কোনো পদ্ধতি নেই।
স্বয়ং দয়াময়ের দয়া বা করুণা গুণে গুণান্বিত হয়ে একজন পবিত্র মানুষ সকলকে পথ দেখানোর নিমিত্ত মুর্শিদ রূপে বসে আছেন। আমাদের মতো পাপী জীবের পতিতপাবন হয়ে। তিনি কখনো আমাদের থেকে বিমুখ হন না। অপার দয়ায় তিনি আমাদের মুক্তি পথের দেশনা দান করেন। বরং রিপু নিচয়ের তাড়নায় আমরাই পরিত্যাগ করি তাকে। বিমুখ হই তাঁর থেকে।
মহাপুরুষের বা সহজ মানুষ এর প্রদর্শিত পথে অবিরাম ধ্যান সাধনার মধ্য দিয়ে একজন সাধক ধীরে ধীরে উত্তীর্ণ হয় জাগতিক সকল বন্ধন থেকে। সকল রিপু সমুহের দূভেদ্য কারাগার থেকে অবমুক্ত করে নিজেকে। তখন সে সংসারে থেকেও আর সংসারী হয় না। জগতে থেকে সে সদা বাস করে প্রভুর অনন্ত প্রেমের দরিয়ায়। সাধনার জগতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা হলো, “জগতের সঙ্গে সম্পর্ক যত কমতে থাকবে, প্রভুর সাথে সম্পর্ক তত বাড়তে থাকবে।” সেই তো সাধক যিনি তার সকল হাল হাকিকত সম্পর্কে সদা সচেতন।
গুরু মুর্শিদ তথা যুগের আউলিয়া বা রাসুল অবতারের নিকট নিজেকে সমর্পন করেই লাভ করতে হয় চিরমুক্তি। যতদিন অন্তকরণে অবশিষ্ট থাকবে আপন ব্যক্তিত্বের আভাস, ততদিন সাধকে সাধনা পূর্ণ হয় নি। সাধনা পূর্ন হলে সাধকে আমিত্ব ভাব পূর্ণ দূরীভূত হবে। তখন তাঁর ক্ষুদ্র অস্তিত্বের মধ্যে জেগে উঠবে বৃহৎ তথা মহৎ অস্তিত্ব। তখন সে মহৎ অস্তিত্বের বলে বলীয়ান হয়ে সে সাধক পুরুষটিও রূপান্তরিত হবে মহাপুরুষে তথা গুরু বা মুর্শিদ তথা রাসুল বা অবতারে। জগতের নিয়ম হচ্ছে, একজন ধনী অপর সবাইকে চাকর বানায়, আর একজন গুরু সবাইকে গুরু বানায়।
স্বার্থরহিত সত্ত্বাটিই সাধক সত্ত্বা। যে চিত্তে জগতের কোনো লালসা নাই, যে চিত্তে দুনিয়াবী কোনো বাসনা নাই, কোনো স্বার্থ নাই, যে হৃদয়টি জগতের কোনো কিছুর নিকট বন্দী নয়, সে চিত্তটিই প্রভুর সিংহাসন। সে হৃদয়টিতেই প্রভু সদা বসত করেন। স্বার্থশূণ্য মানুষটিই প্রভূকে ধারণ করে। অহংকার বা অর্জিত অবস্থানের অভিমান পরিত্যাগ করে সাদা অন্তকরণে নিয়ে প্রভুর তথা মহাত্মার সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রাখলেই হাসিল হবে সাফল্য।
মহাপুরুষদের দেখানো পথই প্রভুর পথ।
অনুরাগ সাধনা র দ্বারা ভগবৎ প্রাপ্তি (সাধনমার্গ)
সাধনার মূল কথাটিই হলো অনুরাগ। ভক্ত হৃদয়ে যদি থাকে পূর্ণ অনুরাগ তবে সাধনা আপনা আপনিই হবে। আর অনুরাগ না থাকলে সাধনা জোর করে করতে হয় যা কখনোই ফলপ্রসু হয় না। অনুরাগে সাধনা স্বতঃ হয়। যা নিজ থেকে হয়, তাই আসল। আর যা জোর করে করতে হয়, তা অবশ্যই নকল। আমরা সাধনাও করতে চাই, আবার জাগতিক রিপু সমূহের বন্ধনেও আবদ্ধ থাকতে চাই! কাম কামনা, মোহ, লোভ সহ নানাবিধ জাগতিকতা যতক্ষন আমাদের মধ্যে আছে, ততক্ষন আমাদের প্রভুতে অনুরাগ জাগবে না। অর্থাৎ, জগতের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে যত সাধনাই করা হোক না কেনো, সবই বৃথা। কোনো কাজে দিবে না।
হৃদয়ে প্রভুর প্রতি যদি অনুরাগ থাকে তাহলে প্রতিক্ষণে, প্রতিমুহুর্তে প্রভুকে মনে পড়বে। জোর করে স্বরণ করতে হবে না। যদি ভগবানকে প্রচেষ্টার দ্বারা স্বরণ করতে হয়, তবে বুঝতে হবে অনুরাগ পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান নেই। একমাত্র জাগতিকতা আমাদেরকে অনুরাগ সাধনা তথা প্রভুস্বরণ থেকে দূরে নিয়ে যায়। যা আমাদেরকে প্রভু স্বরণ বা প্রভুর সংযোগ হতে বিচ্যূত করে, তার সবই পরিত্যাজ্য।
প্রকৃত সাধনা সেটাই, যেটা নিরন্তর ঘটতে থাকে। আধ্যাত্মিকতা ও জাগতিকতার প্রভেদ সাধক যত বুঝতে পারে, সাধনা তাঁর জন্য তত সহজ হয়ে যায়। সাধনা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের গন্ডীভূত ব্যাপার নয়। এটি চিরন্তন ব্যাপার।
সাধনা তো এমন যে, যতক্ষন আমরা ভগবানের সাধনায় লিপ্ত থাকবো, ততক্ষন আমরা জগত কে কিঞ্চিৎমাত্রও মনে রাখবো না। আর যতক্ষন জগতের কাজের মধ্যে আবদ্ধ থাকবো ততক্ষণ কিঞ্চিৎ সময়ের জন্যের ভগবানকে ভুলবো না। তবেই স্বার্থক হবে আমাদের সাধনা। সকল পরিস্থিতিতে নিজেকে সকল কিছুর উর্দ্ধে রাখার নামই হলো ভজনা। আমাদের সাধনার দ্বারা যখন আমরা কোনো উন্নততর অবস্থা প্রাপ্ত হই, তখনই আমাদের সাধনার প্রতি সন্তোষ চলে আসা উচিত নয়। বরং ক্রমাগত তৃষ্ণা নিয়ে সাধনার পথে পথে এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত সাধকের লক্ষণ। ধীরে ধীরে যখন আমাদের চেতনা থেকে অবলুপ্ত হবে জাগতিক সকল রিপুসম্পৃক্ত বাসনাসমূহ, যখন চিত্ত হতে নিবৃত্ত হবে সকল লোভ ও চাওয়া, তখনই সাধক হৃদয়ে পূর্ণ হবে সাধনা।
ধর্ম দু প্রকার হয়ে থাকে। স্বধর্ম আর পরধর্ম। যে ধর্ম আমাদেরকে নিজেকে চিনতে বা নিজেকে লাভ করতে শেখায়, আত্মমুক্তির বিধানাবলী প্রদান করে, যে ধর্ম আমাদেরকে ভগবৎমুখী করে তাই স্বধর্ম। আর যে ধর্ম আমাদেরকে জগতের মোহে বন্দী করে, সংসারের দিকে নিয়ে যায়, তাই পরধর্ম।
স্বধর্মের সাধনার দ্বারা যখন আমাদের ‘স্ব’ উন্মোচিত হয়, তখনই মূলত আমরা সাধকে পরিণত হই। আমরা দু ধরনের সম্পর্কে লিপ্ত হই। প্রথম সম্পর্কটা হলো আমার স্ব” এর সাথে আমার সম্পর্ক। অন্যটি হলো, যা আমার নয়, সে সব জড়পদার্থের সঙ্গে আমার আসক্তিযুক্ত সম্পর্ক। স্ব’ এর সাথে সম্পর্ক তৈরী হলেই জড়ের সম্পর্ক তিরোহিত হবে। আর যদি আমারা অনিত্য বস্তুর মোহে আবদ্ধ হয়ে পড়ি, তবে আমাদের ভোগ করতে হবে মোহবন্ধনের জ্বালা।
অনিত্য সংসারে থেকেও সংসারে নির্লিপ্ত থাকতে হবে। জগতের সকল কার্যনির্বাহ করা আমার কর্তব্য। কর্তব্য জ্ঞানে সে সকল কর্মাবলী সম্পাদন করতে হবে। কিন্তু পরম এর কাজ করা একান্ত নিজের। এ কাজ নিষ্পন্ন করতে হয় স্ব” এর একান্ত প্রেরণায়।
ভক্ত যদি একান্ত ভক্তিচিত্তে আকুল প্রাণে আহ্বান করে প্রভুকে, প্রভুর সাধ্য নেই দূরে থাকার। যদি কোনো ভক্ত ঈশ্বরপ্রাপ্তির পথে দৃঢ় আকুলতা ও অনুরাগ নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে তবে সে সফল হবেই। হৃদয়ে উদ্দেশ্য যদি হয় খাঁটি, তবে যে কাজটাই করা হোক না কেনো, সকল কাজই ইবাদতে পরিণত হবে।
সাধনা কোনো সাধারণ কর্ম নয়। যে সকল ক্রিয়াকলাপের দ্বারা চিত্তে ভগবানের জন্য আকুলতা তৈরী হয়, তাই সাধনা। যে সমস্ত ক্রিয়াকলাপের কারণে প্রভুতে আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়, তাই সাধনা।
সফল হোক সকলের “স্ব” এর সাধনা। প্রভু মূর্ত হয়ে উঠুক সকলের হৃদয়ে।
স্বরূপ – অখন্ড মহাকালে ব্যাপৃত চিরন্তন স্বরূপ তত্ত্ব
স্বরূপ হলো অখন্ড জগতে স্থিত পরম সত্ত্বার রূপ। যার কোনো লয়, ক্ষয়, পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা বিনাশ নাই। জগতে দুটি অবস্থা নিয়ত অস্তিত্বশীল। একটি শ্বাশত, চিরকালের বা মহাকালের। অন্যটি ক্ষনিকের, ধ্বংসশীল। সাধকের উচিত সর্ব অবস্থাতেই চিরন্তন বা শ্বাশত অস্তিত্বের দিকে তাঁর দৃষ্টি নিবন্ধ রাখা। জগতের মায়া মরিচিকার মোহে আবদ্ধ সাংসারিক জীবেরা সর্বদাই অনিত্য তথা নশ্বর বস্তুমোহে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখা। ফলশ্রুতিতে বন্দীদশাই হয় তাদের পরিণতি। ঘুরপাক খেতে থাকে অনিত্যের অকুল দরিয়ার মধ্যে। সাধক সেই, যে অনিত্য বস্তুমোহ অতিক্রম করে নিজেকে নিত্যের সাধনায় নিয়োজিত রাখে।
পরম প্রভু চিরনিত্য। তিনি একমাত্র নিত্যের দেশেই বাস করেন। অনিত্যের দেশে খুঁজলে প্রভুকে কভূও লাভ করা যাবে না। তাঁকে পেতে হলে আপন অস্তিত্ব হতে ত্যাগ করতে হবে সকল প্রকার অনিত্যের জঞ্জালতা। তবেই দয়াময় আসীন হবে সাধকের হৃদয় পদ্মে।
জগতের সঙ্গে সম্পর্ক আমাদেরকে সবসময় কামবিকারে আবদ্ধ করে। আর পরম সত্ত্বা নিষ্কাম। স্বরূপ সত্ত্বাও নিষ্কাম। সকাম ভাব হৃদয় হতে ত্যাগ করাই সাধকের সাধনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। “জগতের বন্ধন সবসময়ই দুঃখ আনে। আর পরমের বন্ধন সবসময়ই মুক্তি আনে।” আমরা যতক্ষন বিনাশশীল জগতের বন্ধনে আবদ্ধ থাকি তথা আমাদের অস্তিত্বকে ধ্বংসের মোহে ঢেকে রাখি ততক্ষন আমরাও বিনাশশীল জগতের সাথে সাথে বিনাশ হতে থাকি। কিন্তু আমাদের স্বরূপ বিনাশের উর্ধ্বে। আমাদের স্বরূপ সর্বপ্রকার দুঃখভোগ বা সুখভোগের উর্ধ্বে নিত্য লীলায় মগ্ন। আমরা অনিত্য বন্ধনে আবদ্ধ থাকলে বিচ্ছিন্ন থাকি পরম হতে তথা স্বরূপ হতে। আর আমরা স্বরূপ তথা পরমে লিপ্ত থাকলে পৃথক থাকি জগত হতে।
যা চিরকাল থাকবে না তথা যা নশ্বর, তা থেকে পৃথক থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
স্রষ্টা চান যে আমরা তাঁর শরণ নেই। কিন্তু আমরা অজ্ঞানতার মোহে পড়ে প্রতিনিয়ত স্রষ্টা কে ভুলে জাগতিক নশ্বর বস্তুর শরণ নিয়ে নিজের মহত্ত্বকে হেয় করে চলেছি। জগতের সঙ্গে সম্পর্কের আধিক্যই আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে সবচাইতে বড় অন্তরায়।
আমাদের শরীর বস্তুজগতের নিয়মের মুখাপেক্ষী। কিন্তু আমরা স্বয়ং স্বরূপের তথা পরমের অধীন। আমরা নিয়ত যুক্ত পরমাত্মার সাথে। পরমাত্মার সাথে যুক্ত থেকেও তা আমরা জানি না। অজ্ঞতায় আমরা অস্বীকার করছি পরমকে। যখনই আমরা পরমাত্মার সাথে একাত্মতায় লীন হতে পারবো তখনই উপলব্ধ হতে স্বরূপ। আমাদের স্বরূপ হলো অখন্ড সত্ত্বা। আর স্বরূপ ভুলে আমরা যে অস্তিত্বে নিয়ত বাস করছি তা হলো খন্ডিত অহং। অহং ত্যাগেই মুক্তি আর স্বরূপ ত্যাগেই বন্ধন। সাধক সদা সর্বদাই অহং ত্যাগ করে স্থিত হয় স্বরূপে তথা পরমে। পরমে স্থিত হলেই সে সত্ত্বা সুখ দুঃখের উর্দ্ধে উঠে নিত্যকালে স্থিত হয়।
আমাদের সবচাইতে আপন হলো আমাদের স্বরূপ। আত্মপরিচয় লাভ না করার কারণে আমরা স্বরূপতত্ত্ব কে জানি না। স্বরুপ বাদে জগতের সবকিছুই আমাদের পর বা দূরের।আপন বা কাছের স্বরূপকে জানাই যদি কঠিন হয়, তাহলে আমাদের জন্য সহজ হবে কি? পরমের সহিত নিত্য স্থিতির উপলব্ধিই সাধককে নিয়ে যায় চিন্ময় প্রেমের অমর লোকে।
আমাদের অস্তিত্ব অত্যন্ত মহান অস্তিত্বের অংশ। আমরা স্বয়ং পরমাত্মার অংশ। এর চাইতে বড় লজ্জার আর কি থাকতে পারে যখন আমরা ভুলে যাই যে, আমরা পরমাত্মার অংশ! স্বরূপ কে ভুলে যাওয়া মানেই নিজেকে হারিয়ে ফেলা। নিজেকে হারিয়ে মানেই হলো খন্ডিত বা বিনাশশীল হয়ে যাওয়া তথা মৃত্যুর অধীন হয়ে ধ্বংসলোকে বাস করা যা অত্যন্ত অনুতাপের আর যন্ত্রনার।
আমাদের সত্ত্বা চির পবিত্র। জগতের সকল পবিত্রতার আধার সে। স্বরূপের মধ্যে বিন্দুমাত্রও অপবিত্রতা বা নোংরা নেই। আমরা অজ্ঞতার কারণে স্বরূপকে শুধু অস্বীকার করেই ক্ষান্ত হই না, স্বরূপ কে নানা অপবিত্রতা বা নোংরামির দ্বারা ঢেকে রাখি।
মনে রাখা দরকার যে, আমরা দেহের বা জগতের বা জমীনের অধীন নই। দেহ আমাদের স্বরূপের অধীন। দেহসত্ত্বা নির্মিত হয় স্বরূপ সত্ত্বার বাসের জন্য। আমরা দেহে চরমভাবে লিপ্ত হওয়ার ফলে স্বরূপকেই অবহেলা করি। স্বরূপ বিনা দেহসত্ত্বার কোনো অস্তিত্ব হয় না কিন্তু শরীর বিনা স্বরূপ সত্ত্বার কিছুই যায় আসে না। সেই প্রকৃত সাধক, যিনি স্বরূপ কে উন্মোচিত করেন আপন অস্তিত্বের মধ্যে আর নিজে লিপ্ত হন স্বরূপ তথা পরমে। তিনিই বাস করেন অখন্ড গোলোক ধাম তথা নিত্যধামে। থাকে নিত্য আনন্দে।
সাধক মগ্ন থাকেন নিত্যলীলায়।
অমৃতনন্দা (নিত্যমুক্তির পথ ও পাথেয়)
প্রতিটি মানুষ পরম প্রভুর মহান অস্তিত্বের অধিবাসী। প্রভু নিজ অংশ কে পৃথক করে মানুষকে সৃজন করেছেন তথা আপনিই সৃজিত হয়েছেন। মানুষে অবস্থান করে প্রেমলীলা আস্বাদন করবেন বলে। কিন্তু আমরা সাময়িক অস্তিত্বে এসে ভুলে বসেছি সেই পরমের নিত্য বাসনাকে। জাগতিকতায় আবদ্ধ হয়ে ভুলে গেছি যে, আমরা আসলে ভগবৎধামের বাসিন্দা। ভুলে গেছি যে, আমরা ভগবানের সাথে নিত্য সংযুক্ত।
যখনই আমাদের শ্বাশত অস্তিত্ব সংযুক্ত হয়েছে নশ্বর বস্তুর সঙ্গে, তখনই অনিবার্য ভাবে উৎপন্ন হয়েছে অহং এর। অহং থেকে আমরা লাভ করেছি আমাদের ক্ষুদ্র একটি আমিত্বকে, যে আমিত্ব পরমকে অস্বীকার করে জগতে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। আমার এ ক্ষুদ্র আমিত্বটি সদা সর্বদাই অনিত্যের মোহে আবদ্ধ তথা মোহ মমতার অধীন। এই মোহ মমতা থেকেই তৈরী আমাদের যাবতীয় বন্ধন। বন্ধনগুলোই হলো সর্ব অশান্তির মূল কারণ।
যদি আমরা সর্বদা লিপ্ত থাকতাম ভগবানের সঙ্গে, তবে আমাদের জগতের সকল কাজই হতো প্রভুর পূজা উপাসনা। কিন্তু আমরা পরম হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই করছি, সবই হচ্ছে আমাদের বন্ধনের তথা দুঃখের কারণ।
সংসার হতে নিজেকে অবমুক্ত করে নিজেকে চেনা জানার সাধনায় লিপ্ত হওয়াই পরমার্থ। অনুরাগ সাধনা র বলে প্রভুকে হৃদিধামে স্থিত করে তাঁর শরণে থাকাটাই নিত্যধামে বাস করা।
বস্তু সবসময়ই নিরপেক্ষ হয়। খারাপ বিষয়টা হচ্ছে বস্তুর প্রতি মোহ। যদি আমরা মোহ টাকে ত্যাগ করি তাহলে বস্তুটা কখনোই আমাদের বাধতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, একমাত্র আমি ব্যাতিত সংসারে কেউ আমার আপন নয়। যা আমার নয় তা কখনোই আমার হবে না। আর যা আমার তা চিরকাল আমারই থাকবে। জ্ঞানী সেই, যে নিজের প্রতি খেয়াল নিবন্ধ রাখে।
মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব হলো পরমাত্মার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায়। পরমাত্মার সঙ্গে সম্পৃ্ক্ততা মানুষকে উন্নত করে। আর জগতের সাতে সম্পৃক্ততা মানুষকে হেয় করে, পদদলিত করে।
জগতের সকল বস্তুতে, সকল কিছুতে প্রভু ধ্যান করাই হলো সংসারের পাতানো ফাঁদ থেকে বেঁচে থাকার সর্বোৎকৃষ্ট উপায়। সকল কিছুকে প্রভুধ্যানে সমরূপে দেখার মাধে নিহিত সত্যদর্শন। আর আলাদা আলাদা খন্ডিত জ্ঞানে সব কিছুকে পৃথক দেখাই হলো সংসারদর্শন।
পরমাত্মার অংশ হিসেবে মানুষের উচিত নয় সে পৃথক পৃথক ইচ্ছা বা বাসনা পোষণ করবে। বরং তার তো উচিত প্রভুর ইচ্ছাকেই নিজের ইচ্ছায় পরিণত করা। তাহলের পরমাত্মার সঙ্গে তৈরী হবে অভেদত্ব। আর পরমের সাথে অভেদত্ব হলেই উদঘাটিত হবে স্বরূপের রহস্য। তখনই মানুষ বুঝতে পারবে জগত ও জীবনের প্রকৃত হিসাব।
জগতের প্রতি ঘটে ঘটে, প্রতি মুহুর্তে, প্রতি অস্তিত্বে অস্তিত্বে নিত্য সংঘটিত হচ্ছে প্রেমময় প্রভুর প্রেমলীলা। তিনি নিরবচ্ছিন্ন প্রেমলীলায় আবৃত করে রাখেন সকল কিছুকে। আমাদের দৃষ্টির অন্ধত্বের ফলে কখনোই আমরা সে অমৃতের খেলা বা প্রভুর নিত্য প্রেমের লীলা দেখতে পাই না। সংসার আমাদের দৃষ্টিকে ঢেকে রাখে পরম হতে। যদি আমাদের দৃষ্টি উন্মুক্ত হতো, যদি আমরা দৃষ্টি পথের জঞ্জালতা গুলো পরিষ্কার করতে পারতাম তবে দেখতে পেতাম জগতের তিনিই সব। তিনি ব্যাতিত নাই কোনো অস্তিত্ব। তিনি ব্যাতিত নাই কোনো স্থান, নাই কোনো রূপ। সকল রূপের মাঝেই তাঁরই মোহন শ্রীরূপের জ্যোর্তিচ্ছটা আমাদের চোখে ধরা দিতো। সর্বময় তাঁর অপার প্রেমের লীলা দর্শন করে নয়নদ্বয় তৃপ্ত হতো। আমরাও তাঁর অনন্ত প্রেমের ধামে নিত্য অবস্থান করতাম। থাকতাম দিব্য প্রেমানন্দে। প্রেমানন্দে থাকার নামই স্বর্গে থাক। আর প্রভুপ্রেমবিহীন থাকাটাই নরকে থাকা।
আমাদের চারপাশে সকল স্থানে, সকল সময় স্বর্গ বিরাজ করে। কিন্তু আমরা তো অধমের অধম। স্বর্গ পায়ে দলে নিজেরাই তৈরী করে নিচ্ছি নিজেদের নরক! বাস করছি সেই নরকে! যদি জ্ঞান আঁখি উন্মিলিত হতো, তাহলে দেখতাম জগতের পলে পলে স্বর্গ বিরাজিত।
প্রভুপ্রাপ্ত করা ও প্রভুতে লিপ্ত থাকাটাই সকল ধর্মের সকল মানুষের একমাত্র সফলতা। এটাই মুক্তির একমাত্র পথ। ভগবানের সঙ্গে প্রেমময় সম্পর্ক স্থাপন করাই সকল মানুষের একমাত্র পরমার্থ। ভগবানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বজায় রাখাই মানুষের একমাত্র কর্ম। ভগবানের সঙ্গে প্রেমলীলা আস্বাদনই মানুষের একমাত্র আশা।
ভগবানের সাথে মিলিত না হতে পারার যে যন্ত্রনা, তাও জগতের সকল সুখের চাইতে অধিক সুখের।
অবশেষে শুধু প্রভুই থাকবেন। যারা চিরজীবন পেতে চায় তাদের একমাত্র কর্তব্য হলো সেই চিরঞ্জীব প্রভুতে সমর্পিত হওয়া ও তার অস্তিত্বে নিজের অস্তিত্বটা মিলিয়ে নেয়া, তাঁর রঙে নিজে রঞ্জিত হওয়া। তবে প্রভুতে সমর্পিত মানুষটিও হবে অমর তথা চিরঞ্জীব। প্রভু জন্ম মৃত্যুর উর্ধ্বে। প্রভুতে সমর্পিত হলে মানুষও পৌঁছে যাবে জন্ম মৃত্যুর উর্ধ্বে। এটাই মানব জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।
প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে প্রস্ফুটিত হোক মানবীয় মহত্ত্ব। প্রভু সংস্পর্শে পবিত্র ও মহিমাময় হয়ে উঠুক মানুষের সর্ব অস্তিত্ব।
জয় হোক সকলের।
লাবিব মাহফুজ চিশতী
রচনাকাল – 20/10/2020

