আপন ফাউন্ডেশন

প্রবন্ধ – সুফিবাদ কী ও কেন? সংজ্ঞা ও সংক্ষিপ্ত আলোচনা

Date:

সাবস্ক্রাইব করুন

লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী

প্রারম্ভিক আলোচনা –

স্রষ্টাকে লাভ করবার শাশ্বত পথ – সুফিবাদ। আমরা শুধু মাটি পানি দ্বারা সৃষ্ট কোনো জাগতিক বস্তু নই, আমরা এমন এক নূরানী সৃজনতন্ত্রের পরিণত রূপ – যার ভেতর লুকিয়ে আছে পরমসত্ত্বার আলোকময় বিভূতি রূপ – রুহ। যা স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জাত তথা অস্তিত্বের মানবীয় রূপ। যে রূপ স্বয়ং খোদার আপন অস্তিত্ব থেকে উৎসারিত। সে রূপ কে দর্শন করা তথা সেই মহিমান্বিত অস্তিত্বের সাথে মিলিত হওয়ার বাসনা মানুষের সহজাত। আমি বরং বলবো যে, এই বাসনাটিই মানুষ জগতের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিতে পরিণত করেছে। প্রভূকে দর্শন করবার, লাভ করবার যে আকুল তিয়াসা, সেই পথ পদ্ধতিকেই বলা হয় সুফিবাদ। যে শিক্ষা মানুষকে প্রভূর সমীপবর্তী করে, তাই সুফিবাদ। যা মানুষকে প্রতিষ্ঠিত করে তাই সুফিবাদ। যা মানুষকে মানুষ করে, তাই সুফিবাদ।

সুফিবাদ এমন এক অন্তর জগতের অভিযাত্রা, যেখানে মানুষ আত্মার গভীর ডুব দেয়। প্রভূর প্রেমে লীন হয়ে চির শান্তি লাভ করে। মানুষ অতিমানুষে পরিণত হয়। সুফিবাদ কখনোই ধর্মদর্শনের বিরোধী কোনো মতবাদ নয়, সুফিবাদ বরং ধর্মের চরম উৎকর্ষিত রূপ, ধর্মের অভ্যন্তরীণ মরমী রূপ। সুফিবাদ ইসলামের প্রাণ, সকল ধর্মের সারবত্তা ও ইসলামী মরমীবাদের অভ্যন্তরীণ দর্শন। বাহ্যিক বিধানাবলী যদি হয় ধর্মের দেহ, সুফিবাদ তাহলে ইসলামের প্রাণ। যে প্রাণ মানুষকে শেখায় ভালোবাসা, জিকির, ধ্যান, তাজকিয়া ও আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে স্রষ্টাকে লাভ করবার অমিয় পন্থা।

সুফিবাদ কী? সংজ্ঞা ও অর্থ –

সুফিবাদ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে অনেকেই অনেক মত দিয়েছেন। কেউ বলেছেন সুফিবাদ শব্দটির উৎপত্তি সাফা হতে, কেউ বলছেন, সুফ হতে, কেউ বলছেন আহলে সুফফা হতে। তবে `সুফ‘ বা উল বা খাস পশম শব্দটি হতে সুফিবাদ শব্দটির উৎপত্তি বলে অধিকাংশ গবেষকের মত পাওয়া যায়। আগের দিনের প্রকৃত ধার্মিকগণ জাগতিকতা হতে মুক্ত হয়ে অহংকার ও গর্বকে মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার জন্য খসখসে উলের বা পশমের পোশাক পরিধান করতেন। তখন থেকেই তাদের সুফি নামে সম্বোধন করা হয়।

আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা, নিজেকে তথা নিজের অহংবোধ ও আমিত্বকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর প্রেমে চিরমগ্ন হয়ে যাওয়াই প্রকৃত সুফিবাদ। সুফিবাদ কোনো কল্পিত তত্ত্ব নয়, একটি বরং এমন এক বাস্তব অভিজ্ঞতা যেখানে আত্মা পরম প্রেমময় খোদার প্রেমের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি লাভ করে।

সুফিবাদের লক্ষ্য –

ধর্মের সাধারণ শিক্ষা যেখানে বাহ্যিক কিছু বিধানাবলী শেখায় সুফিবাদ সেখানে অন্তরকে শুদ্ধ করা হৃদয়ে প্রভূর প্রেম জাগ্রত করার শিক্ষা দিয়ে থাকে। শরিয়তের রীতি-রছম অতিক্রম করে তরিকত, হাকিকত, মারেফাত ও অহেদানিয়াতের জাগরণে ছালেককে পূর্ণ প্রেমিকে পরিণত করে থাকে।

সুফিবাদের উৎপত্তি –

জগতে মানুষের আগমণ ও চেতনার পরিস্ফুটন কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে সুফিবাদের পথ। নিজেকে চেনার মধ্য দিয়ে যুগে যুগে দেশে দেশে কালে কালে সমৃদ্ধ হয়েছে সুফিবাদের পথচলা। আদি পিতা আদম কিংবা মনু থেকে শুরু করে সকল মহামানব গণ তথা নবী রাসুল, সাধু ঋষি, মহৎপ্রাণ ব্যক্তিগণ জগতে মহান হয়েছে আত্মচেতনা ও সুফিবাদের অনুসরণের মাধ্যমে। জগতের সকল মহাপুরুষ তার প্রদত্ত মত/পথের দ্বারা সমৃদ্ধ করেছেন সুফিবাদকে। সুফিবাদ ব্যতীত জগতে কোনো ধর্মদর্শন নাই। জগতে প্রচারিত সকল ধর্মই সুফিবাদের এক একটা সংস্করণ মাত্র। মহাপুরুষের পথই সুফিপথ বা সুফিবাদ।

ইসলাম ধর্মে সুফিবাদের ইতিহাস –

রাসুলে পাক (সা) ছিলেন সর্বকালে সর্বশ্রেষ্ঠ সুফি। তিনার জীবন-কর্ম-চিন্তার প্রতিনিয়ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সুফিবাদ। রাসুলে পাক (সা) এর ওফাতের পর ওনার যোগ্য উত্তরসুরীগণ জগতে প্রচার করেছেন সুফিবাদ। রাসুল পাক (সা) হতে পরবর্তীতে বিভিন্ন ধারার প্রচারিত হয়েছে সুফিবাদ। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেক তরিকা, উপতরিকা। জন্ম নিয়েছে অগনিত আল্লাহওয়ালা ওলী বা সুফি। তাদের দ্বারা জগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে এবং করছে সুফিবাদ।

সুফি দর্শন –

একমাত্র সুফিদর্শন হলো প্রেম। আল্লাহপ্রেম। প্রভূপ্রেম। যে প্রেম আত্মাকে আলোকিত করে, আত্মাকে পরমাত্মার লীন করে। হৃদয় নিয়ত ঐশী নূরের ফোয়াড়া জারী করে। সুফি দর্শনে প্রেম হলো প্রভূতে চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ, আপন সত্ত্বাকে বিলিয়ে দিয়ে মাশুকের অস্তিত্বে অস্তিত্ববান হতে হয়। আত্মবিসর্জনের এ পথই প্রেমিককে পৌঁছে দেয় তার অভিষ্ট মাকামে, তাওহীদে।

সুফিবাদ কেন প্রয়োজন –

নিয়ত অস্থির যান্ত্রিক এ জীবনে শান্তির শীতল-মধূর পরশ বুলিয়ে দিতে পারে একমাত্র সুফিবাদ। অসংখ্য সংকটাপন্ন এ জীবনে হাজারো কোলাহলের মধ্যে মানুষের আত্মিক প্রশান্তি বয়ে আনতে পারে সুফিবাদ। হৃদয়স্থিত সকল রিপুনিচয়ের জঞ্জাল সরিয়ে অন্তরে খোদায়ী নূরের আলো ঝলমল সুন্দরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে সুফিবাদ। সুফিবাদ মানুষতে ভালোবাসা শেখায়। সহিষ্ণুতা শেখায়। তাই এ জগতে সুফিবাদের চর্চার চেয়ে জরুরী আর কিছু নেই।

লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
সম্পাদক – আপন খবর পত্রিকা
পরিচালক – আপন ফাউন্ডেশন

সাবস্ক্রাইব করুন

More Posts