লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
গত কয়েকদিনের অবস্থাদৃষ্টে বেশ কিছু কথা মাথায় ঘুরছিল। বলা হয়ে উঠে নাই। আমাদের ধর্মবোধ যতটা ঠুনকো আর অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে, কথা বলাটাও মুশকিল। কারণ, আপনার বলা কথাটার অর্থ এ সমাজে কোনো মূল্য রাখে না, বরং ইস্যু হয়ে দাড়ায় কথাটার শাব্দিক উচ্চারণ। সেটা হলেও সমস্যা ছিল না, শব্দ বা উচ্চারণকে তো সংশোধন করাই যায়, যুগ যুগের সঞ্চিত বিরাগ ও ধর্মতাত্ত্বিক দলাদলির ইতিহাসকে ঢাকবেন কি করে? ঐ শব্দের গলি বেয়ে যখন যুগ যুগ ধরে বহমান ধর্মীয় বিভাজনের দানাবাঁধা প্রতিহিংসা আর হাজার জমানো ক্ষোভের দীর্ঘ ইতিহাস আপনাকে নাড়া দিবে, তখন আপনার হাতে লাঠি উঠবে, কন্ঠে জবাই করবার স্লোগান উঠবে, তখন কোথায় পালাবেন? সাধারণ মানুষকে দেখানো হবে আল্লাহকে অপমান করার ধোঁয়া, ধোঁয়া সরে গেলেই দেখতে পাবেন ধর্মীয় উগ্রবাদ এস্টাব্লিশমেন্টের কি ভয়ানক চালচিত্র! ধর্মীয় উদারতাকে দমন করে চিন্তাশুণ্য অক্ষরবাদী ধর্মপন্থা কায়েমের কি অপূর্ব মেকানিজম!
এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। লেখা দীর্ঘ হবার ভয়ে পয়েন্ট আকারে কথাগুলো উপস্থাপন করবো। বিচারবোধ-বিযুক্ত পাঠকের মন্তব্য থেকে মহান আল্লাহর দরবারে পানাহ কামনা করি। লেখাটার আর একটি বড় কারণ হচ্ছে, বর্তমান ইস্যুতে আমাদের অবস্থানকে অনেক পন্ডিতই আল্লাহর বিরুদ্ধে ধরে নিচ্ছেন। নাস্তিক, কাফের নানা ফতোয়া দিচ্ছেন। লেখাটি তাদের চর্বিযুক্ত ধমনীর রক্তপ্রবাহকে যেন স্বাভাবিক করে তোলে, সে আশা রাখছি।
মুল সমস্যাটা ইসলামকে নিয়ে। ইসলামের মরমী চর্চার যে সুবৃহৎ ধারা সগৌরবে চলে আসছে আবহমান কাল থেকে, সেটাই মূল সমস্যা। রাসুলে খোদা (সা.) আচরিত ও বর্ণিত ধর্মীয় আধ্যাত্মবাদ ও মরমী পরম্পরা – যা বৈশ্বিক শান্তিপূর্ণ ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করছে যুগ যুগ ধরে, দেশে দেশে – এখানেই সমস্যা। এই মুলধারার বিপরীতে উগ্রবাদী ও অসহিষ্ণু কওম – যারা চায় শুধু তাদের এগ্রেসিভ ধর্মমতই টিকে থাকুক, তাদের প্রচেষ্টা (মাজার ভাঙা থেকে শুরু করে হাজারো অপতৎপরতা) লক্ষ্যণীয় এবং ইদানিং বেশ জোড়েশোরেই চোখে পড়ছে।
বাংলার ধর্ম-মতাদর্শিক উদারতা ও ধর্ম-সংগীত
বাংলাদেশ মতাদর্শিক সহিষ্ণুতা ও উদারতায় ভরপুর এক দেশ। এখানকার ধর্মবোধের উদারতা যে কাউকে অবাক করবে। এদেশের মানুষ তাই ধর্মীয় প্রয়োজনে ইসলামের উদার-মানবতাবাদী ও দর্শন-সমৃদ্ধ মরমী দিকটিকেই গ্রহণ করেছে অবলীলায়। এবং সেই মরমীবাদকে অন্তরের ভালোবাসা নিংড়ে দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে, যুগ যুগ লালন/প্রতিপালন করেছে, এখনো করছে। বাংলার খেটে খাওয়া সাধরণ মানুষ, অক্ষরজ্ঞান শূণ্য ভবঘুড়ে থেকে পথের ফকির – সবাই আকৃষ্ট হয়েছে ধর্মের সেই মধূর মেলবন্ধনে। ইসলামী বিধান মোতাবেক ধর্মচর্চা করেছে আপন আত্মার ও অন্তরের আকুতি মিশিয়ে। এ অন্তরের আকুতি মেশানো ধর্মবোধটাই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে বাংলার নিজস্ব ধর্মবলয় হিসেবে। কিন্তু এ ধর্মচিন্তা ও দর্শন কভুও তার মূল তথা কোরান ও ধর্মীয় যথাযথ শাস্ত্রবিধানের উর্দ্ধে ওঠেনি, অতিক্রম করেনি। বরং প্রণয় মুধূর আবেশে ধর্মকে আরো হৃদয়গ্রাহী ও অনুরাগ মিশ্রিত সত্যের মহার্ঘ্য প্রদান করেছে।
আবহমান কালের বাংলায় তাই ধর্মপ্রচারের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পালাগান, কবি গান, জারী-সারি গান সহ লোকায়ত ধারার সাথে মিলে ধর্মমতের প্রচার ও বর্ণনামূলক নানান আঙ্গিক। এসব গান যারা পরিবেশন করেন তাদের আমরা বয়াতি, কবিয়াল, দেওয়ান, সরকার বা শিল্পী বলি। এসব গানের গভীরতা যে ধর্মীয় কগনিটিভ সত্যকে উন্মুক্ত করে তা অভাবনীয়, এসব পালার এক একটা গান যেন ধর্মজ্ঞানের সমুদ্র মন্থিত এক একটা মণি-মুক্তা। আমাদের বয়াতিগণ সে সত্যকেই সাধারণ ভাষায় গ্রাম্য অশিক্ষিত শ্রোতা থেকে শুরু করে শহর, এমনকি বহির্বিশ্বেও গেয়ে থাকেন।
পালাগানের অতি পরিচিত একটা ফরম্যাট হল – একজন বয়াতি পরম ভূমিকায় অভিনয় করেন ও অন্যজন জীব ভূমিকায়। স্রষ্টা ও বান্দার হৃদয়জ সম্পর্ক, প্রেম, বিচ্ছেদ, মান-অভিমান সবি অন্তর্ভূক্ত থাকে এখানে। কখনো জীব খোদাকে প্রশ্ন করে, কখনো অভিমান করে, কখনো সন্দেহ করে। পরম তখন জীব তথা ভক্তের সন্দেহ, অভিমান বা অনুযোগ দূর করে, ব্যাখা করে। এভাবেই শ্রোতা আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে, আল্লাহর প্রতি অনুগত হয় ও আল্লাহ-বিশ্বাসে দৃঢ়তা আসে।
এমনি এক পালাগানের মঞ্চে, বাংলার বিখ্যাত দুই পালাকার বয়াতি মানিকগঞ্জের আবুল সরকার এবং ফরিদপুরের ফকির আবুল সরকার গান গেয়েছিলেন। তাদের ধর্মজ্ঞান ও দীর্ঘজীবনের ধর্মপ্রচারের অভিজ্ঞতা নেহায়েত কম নয়। জীব ভূমিকায় মানিকগঞ্জের আবুল সরকারের উত্থাপিত প্রশ্ন ঘিরেই কদিন ধরেই চলছে ধর্মীয় গোলযোগ। বিষয়টা সবাই জানেন। আল্লাহ পাক প্রথম কি সৃষ্টি করেছেন সেটি ছিল আলোচ্য বিষয়। লক্ষ্যনীয় – চার ঘন্টার পুরো আসরটি ইসলামের হাকিকত ও ধর্মীয় গুহ্য বিষয়াবলীর আলোচনায় নিমগ্ন। এক পর্যায়ে ছোট আবুল সরকার স্বভাবজাত বৈশিষ্টে এবং বাচনভঙ্গিতে প্রশ্ন তুলে ধরেন পরমের কাছে, আল্লাহপাকের প্রথম সৃষ্টি সম্পর্কে অনেকগুলো মত পাওয়া যায় ধর্মীয় গ্রন্থে, আসলে কোনটা সঠিক? এই প্রশ্ন করার স্টাইল টা ছিল তার নিজস্ব, শব্দচয়ন ছিল তার ঐকান্তিক ব্যক্তিগত রুচি ও স্থানীয় ভাষা-প্রয়োগের বিষয়। যে রুচির সঙ্গে আপনার আমার রুচির অমিল থাকতেই পারে। শুরুতে যেটা বলেছি, সমস্যা টা উচ্চারণ বা শব্দে হলে ক্ষতি ছিল না, সংশোধন হওয়াই যেত – কিন্তু সমস্যাটা অন্যখানে।
কিছু লক্ষ্যণীয় বিষয় :
১. প্রায় চার ঘন্টার একটা মঞ্চ। হাজারো কথার ছড়াছড়ি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহকে চেনা, আল্লাহকে জানা ও আল্লাহর সঙ্গে বান্দার প্রেমের সম্পর্ক স্থাপনের উপায় – এগুলোই চার ঘন্টাব্যাপী আসরের মূল আলোচ্য। কত সুন্দর ধর্মীয় আলাপে ভরপুর ছিল আসরটি আপনি জানেন? জানেন না। কারণ আপনি দেখেছেন জাস্ট তিরিশ সেকেন্ডের একটা টুকরো ভিডিও। এটা দেখেই আপনার সব বোঝা হয়ে গেল! অবাধ তথ্য প্রবাহের এ যুগে এর চেয়ে বড় তথ্য সন্ত্রাস আর হতে পারে কি?
২. আল্লাহকে প্রশ্ন করা বিষয়টা নতুন নয়। যারা নূন্যতম ধর্মজ্ঞান রাখেন, তারা শিকওয়া ও জবাবে শিকওয়া পড়েছেন। কাজী নজরুল ইসলাম তো আরেক কাঠি ওপরে। এসব আপনারা বুঝবেন না। স্রষ্টার সাথে পরমপ্রেমে প্রণত আত্মাটিই জানে এই প্রশ্ন করার সাহস কোথা থেকে আসে।
৩. এতো এতো বিজ্ঞ আলেম সম্প্রদায়, কাউকেই তো দেখলাম না প্রশ্নটির একটা সদুত্তর দিতে! সরাসরি আলাপ থেকে শুরু করে বাহাস বা এ বিষয়ে যেকোনো ধরনের আলাপচারিতার সুযোগকে উপেক্ষা করে বিষয়টিকে জাতীয় অরাজকতায় পরিণত করাটা কি ধর্মীয় মূল্যবোধের ভেতরে পরে?
৪. আল্লাহ পাকের মাহাত্ম্য কারো কথায় যতটুকু নষ্ট হয়, তার হাজার গুণ বেশি নষ্ট হয় জাতিগত অন্ধত্বে, অসহিষ্ণুতায় ও উদারতার অভাবে। সেটি ভেবেছেন?
৫. যখন মুফতি আমির হামজা কোরানে ভূল আছে বলে *৫৩ জায়গায়, মিজানুর রহমান আযহারি আল্লাহ ও রাসুল কে “হালা“ (গালি) সম্বোধন করে (এটা আবুল সরকারের ভাষা থেকেও জঘন্য) , মা খাদিজাতুল কুবরাকে অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করে, তারেক মনোয়ার স্পষ্টত মিথ্যাচার করে, তখন আপনাদের চেতনা কোথায় লুকায়? তাদের ব্যাপারে ফতোয়া কি?
৬. লক্ষণীয় বিষয় হল, আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি কি এই প্রশ্নটির যে যৌক্তিক ও শাস্ত্রীয় উত্তর পরম-ভূমিকার বয়াতি দিয়েছেন, সেটা কি প্রশ্নকর্তা মেনে নিয়েছেন? যদি মেনে না নিতেন তাহলে তাকে নাস্তিক বলা যেত। দুজন বয়াতির উদ্দেশ্য ছিল এই ধর্মশাস্ত্রীয় বিষয়গুলোকে সাধারণের নিকট প্রচার করা। স্রেফ দুটো শব্দ-চয়ন এতো মহৎ ও সুন্দর প্রচেষ্টাকে একদম মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারে?
৭. একজন শিল্পীর কথার ঢং বা ভাষা/শব্দচয়ন কি গোটা কম্যুনিটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে? যদি করে, তাহলে বুঝতেই হবে ষড়যন্ত্র অনেক গভীরে!
৮. সব কিছুর পরও যদি আইনের কথা বলেন, সেখানে উগ্রতা বাদ দিয়ে প্রামাণিক, যৌক্তিক ও শাস্ত্রসিদ্ধ আলাপের মধ্য দিয়ে বিচারকার্য এগিয়ে নেয়ার সুযোগ ছিল। সেখানে মব জাস্টিস ও মব ভায়োলেন্সকে সুযোগ দেয়াটা বাংলার শান্তিপূর্ণ ধর্মাকাশ কে কলুষিত করারই অপচেষ্টা নয় কি?
৯. একজন জনপ্রিয় সংগীতসাধকের কারামুক্তির দাবী নিয়ে জেলা শহরে আসাটা কি অন্যায়? আবুল সরকারের অনুসারীদের ওপর আক্রমণ তথা এই জুলুমের মানসিকতা আমাদেরকে কি বার্তা দেয়? এই মতাদর্শগত অসহিষ্ণুতা আমাদের ভবিষ্যতে কোন দিকে ঠেলে দিচ্ছে, বলতে পারেন?
১০. ধর্ম-সম্প্রদায়ের ওপর প্রকাশ্য হামলা ও মারধোর আমাদেরকে কি ধর্মীয় সংকটে ফেলছে না? মতাদর্শিক দুরত্ব ও দন্দ্ব তৈরী করছে না?
একটা একটা বাউল ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর
বাউল শব্দটির দুরকম প্রয়োগ ইতোমধ্যে আমরা লক্ষ্য করছি। প্রাচীন নদীয়া তথা ভারতের কিছু অংশ এবং বাংলাদেশের বেশ কিছু জেলায় বাউল সম্প্রদায়ের আবাস। তারা সংসারী ও গৃহী উভয়ই হয়ে থাকে। প্রচলিত সকল ধর্মমতের উর্দ্ধে উঠে তারা আত্মসাধনায় মগ্ন থাকে। তাদের নিজস্ব সাধন-ভজনের পদ্ধতি আছে। তাদের রচিত গানগুলোকে বাউল গান বলা হয়।
আমরা যে গান/আধ্যাত্ম সংগীত চর্চা করি বা শুনি সেটা ইসলামী মরমী সংগীত। কাল বিবর্তনে প্রায় সকল প্রকার ধর্মীয় সংগীতই বাউল সংগীত নামে অভিহিত হচ্ছে এবং সংগীত পরিবেশকরা বাউল শিল্পী নামে পরিচিত হচ্ছেন। আদি বাউল সম্প্রদায়ের সাধনপদ্ধতিকে যেমন এই ইসলাম ধর্মীয় সংগীত গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়া অনৈতিক, তেমনি আদি বাউলদের ধর্মীয় উদারতা ও পরমতসহষ্ণিুতা ও নিগুঢ় ধর্মবোধের জায়গাটিকে অস্বীকার করাটাও অনৈতিক। বাংলায় এই উভয় বাউলদের রয়েছে স্বতন্ত্র ধর্মবোধের সমৃদ্ধ ইতিহাস। আর ইসলামের ইতিহাসে এই নব-বাউল তথা ইসলামী মরমী গোষ্ঠী – তাদের অবদান বলে শেষ করা যাবে না। নবুয়ত-বেলায়েত, শরীফত-মারেফত, নবী-রাসুল, জীব-পরম, গুরু-ভক্ত এমন হাজারো পালাগান সহ সকল প্রকারের গানে ধর্ম চর্চা ও ধর্মীয় নিগুঢ় বাণীর প্রচার যতটা হয়েছে, তার তুলনা মেলা ভার। এই বাউল সম্প্রদায় তথা সংগীত ভক্ত ও সংগীত সাধকদের কম্যুনিটি কে অস্বীকার করাটা ইসলামের অনেক বড় ক্ষতির কারণ, যেটা আজ প্রকট। কোরান হাদীস ও ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী এটা প্রমাণিত যে, যে সংগীতে আল্লাহ রাসুলের এশক অন্তরে পয়দা হয়, তা সম্পূর্ণ বৈধ ও ক্ষেত্রবিশেষে অত্যন্ত দরকারী। আর সাধারণ বাংলার গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষের মানসিক গ্রহণশক্তি ও অন্তর্জগতের গভীরতার ওপর ভিত্তি করলে সংগীতের চেয়ে সহজ ও সুন্দর মাধ্যম পাওয়াই যাবে না।
গত কয়েকদিনের ঘটনাবলিতে এটা স্পষ্ট যে, আবুল সরকার ও তার উক্তিকে কেন্দ্র করে একটি উগ্র সম্প্রদায় ধর্ম-সংগীতের এই আবহমানকালের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করতে চাইছে। যেটা স্রেফ ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে একটা পরিকল্পিত আঘাত।
আবুল সরকারকে কেন্দ্র করে যে বিভিন্ন রকম রাজনৈতিক আলাপচারিতা আমাদের কর্ণগোচর হচ্ছে, তা আমাদের বোধগম্যতার বাইরে। নিরিহ এই মানুষগুলোকে রাজনৈতিক মারপ্যাচে ফেলে অহেতুক হয়রানি করার অপসংস্কৃতিকে আমরা ঘৃণা করি।
আমাদের সংগীতানুরাগ : স্রষ্টাপ্রেমে আহুত হয়ে এশক ও জজবায় প্রশান্তি
আমরা ধর্ম সংগীত শ্রবণ করি স্রষ্টাপ্রেমে আহুত হয়ে, হৃদয়কে পরম প্রেমাস্পদ তথা প্রভূর চরণে হাজির করবার অসীম সাহসে, অন্তরের শুভ্রতাকে পুঁজি করে আমরা বসি সুফি গানের আসরে, দু চোখের পবিত্র ধারায় আল্লাহ ও রাসুলের চরণ সিক্ত করবার প্রয়াসে। ধর্ম সংগীত বা সুফি সংগীতের আবেদন এখানে দেশ কালের উর্দ্ধে ও হৃদয়জ ব্যাপার। এখানে আঘাত দিলে আমার ইসলাম ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া হবে।
আমরা সুফি। আল্লাহ ও রাসুলের প্রেমে ও তাদের অনুসরণ অনুকরণের মধ্য দিয়ে বয়ে চলে আমাদের ধর্ম। সকল মত পথকে উদারতার মাধ্যমে বুকে টেনে নেয়াই আমাদের ধর্মচেতনা। আল্লাহর এশক ও রাসুলের এশক আমাদের ধর্মপথের একমাত্র সামান। আমরা সামা কাওয়ালী ও সুফি সংগীতের সুরে স্রষ্টাকে খুঁজে বেড়াই, পেয়ে গেলে নয়ন জলে চরণ ধোয়াই, না পেলে বুকে করাঘাত করে পথে পথে ঘুরি, আমাদেরকে ধর্ম শেখাতে আসবেন না। আপনার নাস্তিক/কাফের ফতোয়া আমাকে আমার প্রেমরাজ্য থেকে বিন্দুমাত্র নড়াতে পারবে না।
আমরা ব্যক্তি আবুল সরকারের চেয়ে বড় করে দেখছি সংগীত ও সংগীতানুরাগীদের ওপর একটা কওমের হিংসা ও কওমগত আক্রমণকে। সেটা আমাদের জন্য ভয়ের, শঙ্কা ও পরিতাপের।
সংগীত সাধক/গায়ক তথা শিল্পীবৃন্দের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান
বাংলার সকল সংগীত সাধক, সংগীত পরিবেশক আমাদের পরম শ্রদ্ধাস্পদ ব্যক্তি। আমরা আপনাদের মুখের কথা, সুর-ছন্দে আমাদের অন্তরের সুন্দর কে খুঁজে পাই। আমরা কায়মনে চাই আপনাদের ভাষা, উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও বর্ণনা শৈলী আরো উন্নত হবে, আপনাদের সুরে আমরা নিয়ত খুঁজে পাবো সেই মদিনার আশেকী জজবা, আপনাদের জীবন-কর্ম-চিন্তা সকলি সেই মহিমান্বিত সুন্দরের অনুসারী হবে, যেন আমরা আপনাদের নিয়ে গর্ব করতে পারি, আপনাদের সুরে আরো প্রশান্তি খুঁজে নিতে পারি।
আজকের এই ঘোর অমানিশা থাকবে না। বাংলার ধর্ম-আকাশে সত্যনিশান উড়বেই। আহলে বাইয়্যেত পাক পাঞ্জাতনের অনুসারীদের জয় হবেই। অগনিত অলী আউলিয়াগণ যে মাটিতে ঘুমিয়ে আছে, সে মাটি এতোটা কলুষিত হতে পারে না। হৃদয়ে সাহস রাখুন। সত্যকে সত্য বলে প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করুন, সে জীবনটিই মহান জীবন। ধর্মের যে জলন্ত শিখা বুকে জ্বেলে রেখেছেন, সেটিকে নিভতে দেয়া যাবে না। মনে রাখবেন, সত্য এবং সুন্দরকে সংগ্রাম করেই অর্জন করতে হয়। আর অত্যাচারী চিরকালই নিক্ষিপ্ত হয় ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে।
লাবিব মাহফুজ চিশতী
সম্পাদক – আপন খবর
পরিচালক – আপন ফাউন্ডেশন
