লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
বাঙালী মানসে নজরুল দেশনার অবদান সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নাই। বাংলা সাহিতের সবকটি দিকে কাজী নজরুল ইসলাম এর পদচারনা ছিল সবচাইতে সাবলীল এবং জিবনঘনিষ্ঠ। এ যাবত নজরুল কে নিয়ে গবেষণা, পঠন পাঠনও কম হয় নি, বরং নজরুল চর্চা উত্তরোত্তর বাড়ছে।
বাঙালী চেতনায় নজরুল এক অবিস্মরনীয় সংযোজন
বাঙালী চেতনাকে আরো বলিষ্ঠ করার প্রয়োজনে নজরুলকে আরো ব্যাপকভাবে আবিষ্কার করার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আমরা যদি প্রকৃত অর্থেই নজরুল কে জানতে চাই, যথার্থ রুপে মর্ম উদ্ধার করতে চাই নজরুলের সাহিত্যকর্মের, তাহলে আমাদেরকে সবচাইতে গুরুত্বের সাথে জানতে হবে এবং বুঝতে হবে নজরুলে আধ্যাত্মিক জিবন। নজরুলের আধ্যাত্মিকতা হৃদয়ঙ্গম করা ব্যতিত নজরুল কে জানা অসম্ভব, নজরুলের প্রকৃত পাঠোদ্ধার করাও অসম্ভব।
সাধু সন্তদের প্রতি প্রবল দরদ ছিল নজরুল এর
সুফি সাধনা তথা ধর্মীয় মরমীবাদ বা আধ্যাত্মিকতা তথা সুফিবাদ এর প্রতি আজন্ম দরদ ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর। সাধু সন্যাসীদের প্রতি ভক্তিভাব ছিল তাঁর ছোটবেলা থেকেই।
একদম ছোটবেলা থেকেই লাভ করেছেন আধাত্মিক পরিবেশ এবং প্রেরণা। মাজারের খাদেম ছিলেন দীর্ঘদিন। হতে পারে সেখান থেকেই তাঁর ভিতরে জন্ম নেয় পরম যোগী নজরুল। আধ্যাত্ম চেতনার স্ফুরণে তাঁর চাচা বজলে করিমেরও অবদান ছিল প্রচুর।
ছোটবেলা থেকে যখনই শুনতেন কোনো পীর ফকির বা সাধু এসেছেন, তিনি ছুটে যেতেন। সঙ্গ করতেন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। সেই ছোটবেলা থেকে তাঁর অন্তকরণে সুফি স্পৃহা, সেই ঐশী প্রেরণাই তাকে চালিত করেছে সারাটি জিবন ভরে। তাঁর সমগ্র সাহিত্যে কর্মে রয়েছে তারই প্রবল প্রভাব। তাই তাঁর সাহিত্যকর্ম বুঝতে গেলে বুঝতে হবে তাঁর সুফি জিবন।
নজরুল এর সামগ্রিক সাহিত্যকর্মে কখনো সরাসরি, কখনো প্রচ্ছন্ন আধ্যাত্মিকতা
করাচি সেনানিবাস থেকে ফিরে নজরুল শুরু করেন তাঁর সাহিত্যকর্ম। তারপর থেকে বাদবাকী জিবন তার তুমুল দারিদ্র, অপমান, শোক আর অপবাদের ইতিহাস। সকল কিছুর উর্দ্ধে সবসময়ই তিনি আশ্রয় খুঁজতেন মরমী সুর আর সাহিত্যের মধ্যে। সে সময়কার সকল লেখনী থেকে শুরু করে তাঁর সমগ্র জিবনের লেখার মধ্যেই স্ফুরিত হয়েছে আধ্যাত্মিকতার প্রবল আলোকরশ্নি। মাত্র একুশ বছর বয়সে লেখা তাঁর বিদ্রোহী কবিতাটি প্রবলভাবে একটি আধ্যাত্মিক কবিতা।
বিদ্রোহী কবিতাটি বুঝতে হলে অবশ্যই আধ্যাত্মিক জ্ঞান থাকতে হবে। ধর্মীয় নিগুঢ় রহস্যাবলী সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে বিদ্রোহী কবিতাটি শুধু একটি মৌখিক পাঠ হয়ে থেকে যাবে। নজরুলের প্রতিটি সাহিত্যকর্মেই রুপক প্রতীক তথা এ্যালগোরিক্যাল ক্লথিং এর ভেতরে লুকায়িত ধর্মীয় ভাববাদ প্রচ্ছন্ন। ধর্মজ্ঞান সম্পন্ন দের কাছে নজরুল পাঠ একটি অতিমানবীয় ধর্মপাঠ বৈ অন্য কিছু নয়।
কাজী নজরুল ইসলাম সারাজীবন প্রচুর দিব্যজ্ঞানী তথা আধ্যাত্মজ্ঞানীদের সংস্পর্শ পেয়েছেন। যাদের মধ্যে ছিলেন সাধু তারাচরণ, গুরু নিরালম্ব স্বামী, সাধু নিপেন্দ্রনাথ, জগদানন্দ বাজপেয়ী, কাদের বক্স মিয়া, মঞ্জু খাঁ, উমাপদ, নলীনিকান্ত, অবশেষে শ্রী বরদাচরণ মজুমদার। ধীরে ধীরে ধর্মতত্ত্বে সমৃদ্ধ হয়েছেন নজরুল। জাতি ধর্ম নির্বিশেষ তাঁর উদার দৃষ্টিভঙ্গি যে সাধু সন্তদের আদর্শের ফসল, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।
তাঁর প্রতীকি রচনার বাইরেও সরাসরি তিনি আধ্যাত্মিকতা নিয়ে যে ব্যাপক লেখালেখি করেছেন, তাও অগনিত। শ্যামাসংগীত, বৃন্দাবন গীত, মুর্শিদী, আগমনীসংগীত, শিবসংগীত, ভজন, ভক্তিগীতি, কীর্ত্তন, সুফি গান, ভাবগান, তত্ত্বগান সহ নানান আঙ্গিকে তিনি সুফি তত্ত্ব তথা অভেদ মানব তত্ত্ব কে ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে।
যোগীজিবন ও শ্রী বরদাচরণ মজুমদার মহাশয় এর প্রতি অনুরক্ততা
শ্রী বরদাচরণ মজুমদার মহাশয়ের প্রতি প্রবল অনুরক্ত নজরুল গৃহযোগ আরম্ভ করেন। মহাশক্তির আরাধনা শুরু করেন একটা সময়ে। বরদাচরণকে নজরুল তাঁর যোগসাধনার গুরু বলেছেন।
কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সমগ্র জিবন আধ্যাত্মতিকতার অনুশীলনে এবং সুফি তত্ত্বের নিগুঢ় রহস্যাবলীর সন্ধানে ব্যায় করেছেন। যা পরিস্ফুষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর সকল রচনাবলীর মধ্যে। শেষ বয়সে তিনি সাধনায় প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।
গ্রামোফোন কোম্পানিতে প্রবল খাটুনির ফলে স্বাস্থ্যের অবনতি হয় তাঁর। তখনই তিনি শুরু করে যোগ সাধনা। তাঁর বেশির ভাগ ভক্তিগীতি সে সময়কার রচনা।
নজরুল বাংলার আধ্যাত্মিকতার আকাশে অত্যুজ্জল একটি নক্ষত্র। নজরুল কে চিনতে হলে তাঁর আধ্যাত্মিকতা বুঝতে হবে। অপার ধর্মজ্ঞান নজরুল কে আসীন করেছে শুধু শ্রেষ্ঠ সুফি লেখক হিসেবেই নয়, বরং যুগশ্রেষ্ঠ সুফি ও সাধক পুরুষ হিসেবে।
বাংলার আধ্যাত্মিকতার আকাশে নজরুল স্বীয় মহিমায় জ্বাজ্বল্যমান থাকবেন চিরকাল।
নজরুল চর্চা শানিত হোক। উদ্ঘাটিত হোক নজরুল মাহাত্ম্য। নজরুলের ধর্মচেতনা প্রতিষ্ঠিত হোক সর্বময়।
রচনাকাল – 09/03/2022
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী