বাণী ০১.
আত্মপরিচয়ের মীমাংসার সন্ধানে যাত্রা আদিকাল হতেই বহমান। তারই ক্রমোন্নতির ধারাবাহিকতায় ভাবুক, ধ্যানী, জ্ঞানী, প্রেমিকের বিকাশ মানব সমাজে। পরিশুদ্ধ চিত্তবৃত্তির পরিমন্ডলে সেই জ্ঞান-প্রেমের অনুরণন ঝংকারিত হচ্ছে। অসীম সীমের মধ্যেই/ আপন ভুবনে ঝলক দিচ্ছে, রূপায়িত হচ্ছে, ধরা দিচ্ছে। ধ্যানী, জ্ঞানী, প্রেমিকগণই এ প্রেম সাগরে অবগাহন করছে। এরাই মুক্ত উদার মনের মানুষ, জাতি গোত্রের বাহিরে তাদের অবস্থান। তাদেরকেই নবুয়তে নবী-রাছুল আর বেলায়েতে অলি-আউলিয়া বলে, তাদের পথই ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’।
আত্মপরিচয় বা আধ্যাত্মিক জ্ঞানই ধর্ম জ্ঞান; যা মাদ্রাসার আলেম-মোল্লাগণ অস্বীকার/পরিহার করে নিজেদের প্রবৃত্তির অসার ক্রিয়াকর্ম, বাণীকে ধর্মজ্ঞান বলে লোক সমাজে প্রচার করছে। তাতে নিজেকেই অস্বীকার করা হচ্ছে। মূলত আত্মপরিচয়ের পথেই মানব জাতির আদি উৎসের, মুক্তির সন্ধান জানা সম্ভব; চিরন্তন-শাশ্বত মানব ধর্মকে অর্জন করা যায়। এ পথেই চিত্তবৃত্তির কলুষতা দূরীভূত করে উদার মুক্ত মনের মানুষ সৃষ্টি হয়। তাতে আধ্যাত্মিকতা, মানবতাবাদ ও প্রেমের ভাব-ভাবনা ও বাণী প্রচারিত হয়ে বসন্তের হিন্দোল তানে মানব সমাজ উজ্জীবিত হয়ে শান্তির আলয়ে অবস্থান করবে। কোরানে ইহাকে নফসে মুতমাইন্নাহ বলা হয়েছে।
আপন খবর কাগজটি মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনা বিকাশে গুরুত্বুপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি এবং তার সুদীর্ঘ প্রচার প্রসার কামনা করছি।
হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
মহান মুর্শিদ কেবলা, ঝাউগড়া বেনজীরিয়া চিশতীয়া দরবার শরীফ
আড়াইহাজার, নারায়নগঞ্জ।
বাণী ০২.
উদার সুফিবাদ বাঙালি সমাজের শত শত বছরের বৈশিষ্ট্য। শাস্ত্রীয় ইসলাম এবং লোকায়িত ধর্মমতের সঙ্গে কোনো বিভেদ সৃষ্টি না করে মধ্যযুগের আওলিয়া-দরবেশ ও আধ্যাত্মিক সাধকেরা সুফিবাদি দর্শন প্রচার করেছেন। কঠিন সাধনার মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য পেতে চেয়েছেন, একই সঙ্গে ভালোবেসেছেন তার সৃষ্টিকে। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ করেননি তারা । নানা বর্ণের সমন্বিত সংস্কৃতির বাঙালি সমাজে সুফি সাধকের যোগ করেন এক উদার মদবাদ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ভাষাভাষী নির্বিশেষে সব মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন তারা।
ধর্মীয় মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, সামাজিক অস্থিরতা দিনদিন প্রকট হয়ে উঠছে। সংঘাতময় এই অশান্ত পৃথিবীতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই মতবাদ প্রচার যা মানুষের মধ্যে সম্প্র্রীতি ও ভালোবাসা স্থাপনে সহায়ক। সুফিবাদ বিষয়ক সাময়িকী ‘‘আপন খবর’’ আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে জেনে আমি বিশেষ আনন্দিত। মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন গঠনে এই সাময়িকী ভূমিকা রাখবে এই প্রত্যাশা করি। আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের প্রত্যয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠান করেছি।
‘আপন খবর’ এর মাধ্যমে উদার আধ্যাত্মিক, মানবতাবাদ ও প্রেমের বাণী প্রচারিত হলে আমরা একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবো।
সৈয়দ আবুল মকসুদ
কলামিষ্ট, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।
বাণী ০৩.
জনাব লাবিব মাহফুজের সম্পাদনায় ‘আপন খবর’ নামক সুফি ঘরানার একটি মাসিক পত্রিক প্রকাশ হতে যাচ্ছে জেনে আমি খুশি হয়েছি। সেই ছোটবেলা থেকে মরমী শিল্পী আব্দুল আলিমের দরাজ কন্ঠে একটি গান শুনেছিলাম ‘ও যার আপন খবর আপনার হয়না’। গানটির পরের লাইনেই রয়েছে, ‘একবার আপনারে চিনতে পারলে রে যাবে অচেনারে চেনা’।
অপরদিকে বাউল সাধক রশিদ উদ্দিন বলেন –
‘তোরে দেখলেই তারে মিলে’।
লালন সাঁইজির ভাষায়,
‘ভজ মানুষের চরণ দুটি, নিত্য বস্তু হবে খাঁটি’।
শুদ্ধচিন্তা এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চা সবসময়ই ভালো। যে পত্রিকাটি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, তাতে নিজেকে চেনার ‘উপায় এবংউপকরণ’ হিসেবে বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হবে বলে আমার বিশ্বাস। সকল মানুষকে ভালোবাসার, শ্রদ্ধা করার এবং মানুষের মর্যাদাকে উচ্চকিত করার উদারনৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ লেখাগুলো এই মাসিকে প্রকাশিত হবে বলে ধারণা করি।
তবে এই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশনার সাথে জড়িত অন্যান্যদের খুব সতর্কভাবে খেয়াল রাখতে হবে যেন তাঁদের কোনো প্রকাশনা সরকারি আইন কানুুন এবং প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধ ও বিধি বিধানের লঙ্ঘন না করে এবং কোনো ধর্ম অথবা ধর্মের অভ্যন্তরের কোনো বিশ্বাসকে যেন সরাসরি আঘাত না করে।
‘যে নিজকে চিনল সে আমাকেই চিনল। know thyself, আত্মনাং বিদ্ধি, সোহ্হম, বৈষ্ণবসূফি ঘরানার সাধকের অনুসরণে প্রেম ভালোবাসায় সমৃদ্ধ উদার সমাজ গঠনে ‘আপন খবর’ ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।
আমি এই পত্রিকার প্রকাশ উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট সকলকে শুভেচ্ছা জানাই।
ড. জাকীর হোসেন
নজরুল গবেষক ও লেখক।

