মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ১ম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত
প্রেরণা বাণী
হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী বলেন –
আত্মপরিচয়ের মীমাংসার সন্ধানে যাত্রা আদিকাল হতেই বহমান। তারই ক্রমোন্নতির ধারাবাহিকতায় ভাবুক, ধ্যানী, জ্ঞানী, প্রেমিকের বিকাশ মানব সমাজে। পরিশুদ্ধ চিত্তবৃত্তির পরিমন্ডলে সেই জ্ঞান-প্রেমের অনুরণন ঝংকারিত হচ্ছে। অসীম সীমের মধ্যেই/ আপন ভুবনে ঝলক দিচ্ছে, রূপায়িত হচ্ছে, ধরা দিচ্ছে। ধ্যানী, জ্ঞানী, প্রেমিকগণই এ প্রেম সাগরে অবগাহন করছে। এরাই মুক্ত উদার মনের মানুষ, জাতি গোত্রের বাহিরে তাদের অবস্থান। তাদেরকেই নবুয়তে নবী-রাছুল আর বেলায়েতে অলি-আউলিয়া বলে, তাদের পথই ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’।
আত্মপরিচয় বা আধ্যাত্মিক জ্ঞানই ধর্ম জ্ঞান; যা মাদ্রাসার আলেম-মোল্লাগণ অস্বীকার/পরিহার করে নিজেদের প্রবৃত্তির অসার ক্রিয়াকর্ম, বাণীকে ধর্মজ্ঞান বলে লোক সমাজে প্রচার করছে। তাতে নিজেকেই অস্বীকার করা হচ্ছে। মূলত আত্মপরিচয়ের পথেই মানব জাতির আদি উৎসের, মুক্তির সন্ধান জানা সম্ভব; চিরন্তন-শাশ্বত মানব ধর্মকে অর্জন করা যায়। এ পথেই চিত্তবৃত্তির কলুষতা দূরীভূত করে উদার মুক্ত মনের মানুষ সৃষ্টি হয়। তাতে আধ্যাত্মিকতা, মানবতাবাদ ও প্রেমের ভাব-ভাবনা ও বাণী প্রচারিত হয়ে বসন্তের হিন্দোল তানে মানব সমাজ উজ্জীবিত হয়ে শান্তির আলয়ে অবস্থান করবে। কোরানে ইহাকে নফসে মুতমাইন্নাহ বলা হয়েছে।
আপন খবর কাগজটি মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনা বিকাশে গুরুত্বুপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি এবং তার সুদীর্ঘ প্রচার প্রসার কামনা করছি।
শুভেচ্ছা বাণী
বিশিষ্ট কলামিস্ট, দার্শনিক, গবেষক সৈয়দ আবুল মুকসুদ বলেন –
উদার সুফিবাদ বাঙালি সমাজের শত শত বছরের বৈশিষ্ট্য। শাস্ত্রীয় ইসলাম এবং লোকায়িত ধর্মমতের সঙ্গে কোনো বিভেদ সৃষ্টি না করে মধ্যযুগের আওলিয়া-দরবেশ ও আধ্যাত্মিক সাধকেরা সুফিবাদি দর্শন প্রচার করেছেন। কঠিন সাধনার মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য পেতে চেয়েছেন, একই সঙ্গে ভালোবেসেছেন তার সৃষ্টিকে। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ করেননি তারা । নানা বর্ণের সমন্বিত সংস্কৃতির বাঙালি সমাজে সুফি সাধকের যোগ করেন এক উদার মদবাদ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ভাষাভাষী নির্বিশেষে সব মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন তারা।
ধর্মীয় মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, সামাজিক অস্থিরতা দিনদিন প্রকট হয়ে উঠছে। সংঘাতময় এই অশান্ত পৃথিবীতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই মতবাদ প্রচার যা মানুষের মধ্যে সম্প্র্রীতি ও ভালোবাসা স্থাপনে সহায়ক। সুফিবাদ বিষয়ক সাময়িকী ‘‘আপন খবর’’ আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে জেনে আমি বিশেষ আনন্দিত। মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন গঠনে এই সাময়িকী ভূমিকা রাখবে এই প্রত্যাশা করি। আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের প্রত্যয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠান করেছি।
‘আপন খবর’ এর মাধ্যমে উদার আধ্যাত্মিক, মানবতাবাদ ও প্রেমের বাণী প্রচারিত হলে আমরা একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবো।
শুভেচ্ছা বাণী
বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ড. জাকির হোসেন বলেন –
জনাব লাবিব মাহফুজের সম্পাদনায় ‘আপন খবর’ নামক সুফি ঘরানার একটি মাসিক পত্রিক প্রকাশ হতে যাচ্ছে জেনে আমি খুশি হয়েছি। সেই ছোটবেলা থেকে মরমী শিল্পী আব্দুল আলিমের দরাজ কন্ঠে একটি গান শুনেছিলাম ‘ও যার আপন খবর আপনার হয়না’। গানটির পরের লাইনেই রয়েছে, ‘একবার আপনারে চিনতে পারলে রে যাবে অচেনারে চেনা’।
অপরদিকে বাউল সাধক রশিদ উদ্দিন বলেন –
‘তোরে দেখলেই তারে মিলে’।
লালন সাঁইজির ভাষায়,
‘ভজ মানুষের চরণ দুটি, নিত্য বস্তু হবে খাঁটি’।
শুদ্ধচিন্তা এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চা সবসময়ই ভালো। যে পত্রিকাটি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, তাতে নিজেকে চেনার ‘উপায় এবংউপকরণ’ হিসেবে বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হবে বলে আমার বিশ্বাস। সকল মানুষকে ভালোবাসার, শ্রদ্ধা করার এবং মানুষের মর্যাদাকে উচ্চকিত করার উদারনৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ লেখাগুলো এই মাসিকে প্রকাশিত হবে বলে ধারণা করি।
তবে এই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশনার সাথে জড়িত অন্যান্যদের খুব সতর্কভাবে খেয়াল রাখতে হবে যেন তাঁদের কোনো প্রকাশনা সরকারি আইন কানুুন এবং প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধ ও বিধি বিধানের লঙ্ঘন না করে এবং কোনো ধর্ম অথবা ধর্মের অভ্যন্তরের কোনো বিশ্বাসকে যেন সরাসরি আঘাত না করে।
‘যে নিজকে চিনল সে আমাকেই চিনল। know thyself, আত্মনাং বিদ্ধি, সোহ্হম, বৈষ্ণবসূফি ঘরানার সাধকের অনুসরণে প্রেম ভালোবাসায় সমৃদ্ধ উদার সমাজ গঠনে ‘আপন খবর’ ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।
আমি এই পত্রিকার প্রকাশ উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট সকলকে শুভেচ্ছা জানাই।
প্রবন্ধ – মানুষগুরুকে বাবা, বা’জান বা দয়াল সম্বোধন
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
একই কথা বা শব্দ স্থান বিশেষে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে তা আগে বুঝতে হবে, নয়তো তার দ্বারা কখনো আসল বিষয়টি বুঝা সম্ভব হবে না। যেমন ‘রব’ কথাটির অর্থ আওয়াজ বা শব্দ, কালামও হয়। আবার ‘রব’ অর্থ প্রতিপালক বা প্রভু। যেমন রাব্বিল আলামিন অর্থাৎ জগতসমূহের প্রতিপালক বা প্রভু ইত্যাদি। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লামই হলেন উম্মতের দ্বীনি বা ধর্ম পিতা; আওলা এবং মাওলা। মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের পরে ধর্ম পিতা,আওলা মাওলা হলেন শেরে খোদা হযরত আলী আলাইহি ওয়াচ্ছালাম। (রাছুল বলেন, মান কুনতুম মাওলাহু, ফাহাজা আলীউন মাওলাহু)।
মুহাম্মদ চিরন্তন শাশ্বত অখন্ড কালে প্রবাহিত এক পবিত্র সত্ত্বা বিধায় চিরবর্তমান। সেই অখন্ডকালে প্রবাহিত মুহাম্মদ রাছুলকে যারা জানেনি, চিনেনি, তারা দ্বীনে মুহাম্মদী বা দ্বীন ইসলামের অন্তর্ভুক্ত নয়। ঈমানদারগণ ব্যাতিত তাকে কেউ চিনবে না, দেখবে না, অন্যেরা দেখলেও চিনবে না (সূরা হিজর)। আসলে বেলায়েতে এক রাছুলই প্রবাহিত হয়ে চলেছে যা চির বর্তমান। বেলায়েতের ধারায় ধর্মপিতা তথা ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করা হয় সমস্ত পরকাল প্রাপ্ত মানুষকে তথা ইনছানি আত্মার অধিকারী মানুষকে এবং এরাই হলো হাকিকতে পিতা বা বাবা তথা আব্বা। ইহা একটি পবিত্র এবং সম্মানিত সম্বোধন। এ ধর্মপিতাকে বা পরকাল প্রাপ্ত মানুষকে ফার্সী ভাষায় ‘পীর’ বাংলা ভাষায় ‘গুরু’ এবং আরবীতে ‘মুর্শিদ’ বলে অভিহিত করা হয়। কেউ বা’জান (বা-জান) বা বাবাজান বলে। কারণ মুর্শিদের আত্মার সাথে ভক্ত বা মুরিদের সম্পর্ক।
কোরানের ঘোষনা, “নবীকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে হবে” (সুরা আহযাব)। নবুয়তে যাদেরকে নবী রাছুল বলা হয় বেলায়েতে তাদেরকেই অলিআল্লাহ বা অলিয়ম মুর্শিদ বলা হয়। সুতরাং প্রত্যেক চেতন মানুষ বা পরকাল প্রাপ্ত মানুষই হলো বা’জান –যার নিকট নিজ আত্মাকে আহুতি করা হয় বা ফানা করে দিয়ে দু’আত্মার মধ্যে একত্ম ঘোষণা করা হয় বা করার সাধনা করা হয়। সেজন্য কেহ কেহ গুরুকে ‘বাজান, বা ‘বাবাজান’ বলে ডাকে। আবার জাগতিক জগতের জন্মদাতা পিতাকেও ‘বাবা’ বা ‘বাবাজান’ বা জনকও বলা হয়। একই কথার বা একই শব্দের ভিন্নার্থ স্বীকার্য এবং তাদের সন্তান বা আওলাদদেরও ভিন্নার্থ-ভাবমর্ম স্বীকার্য। সামাজিক আইনে বা জাগতিক বিধানে তাদের উভয় দেশেই ভিন্নার্থ প্রকাশ করছে। তবে জাগতিক জগতের বিষয়টি ক্ষনস্থায়ী এবং পারলৌকিক বা আধ্যাত্মিক জগতের বিষয়টি বা সম্পর্কটি চিরস্থায়ী। একটি রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়-যা আপেক্ষিক সত্য, ইহা নফসের সৃষ্টি এবং ইহলোকের সাথে সম্পর্ক (এ সম্পর্ক বা আত্মীয়কে ফেৎনাস্বরুপও বিবৃত করা হয়েছে কোরানে ), অপরটি আত্মার (ইনছানি আত্মার) সম্পর্কের আত্মীয়-যা চির সত্য এবং চির বর্তমান। এ সম্পর্ক ইহলোক এবং পরলোকের মুক্তিপ্রাপ্ত বা মুক্তির পথে সাধনাকারীদের সম্পর্ক।
গুরুকে কেউ বলে হুজুর। ‘হুজুর’ হাজির (উপস্থিত) শব্দ হতে আগত – এর মানে যিনি খোদাকে হাজির-নাযির তথা উপস্থিত দেখেন তিনিই হলেন ‘হুজুর’। এজন্যই বলা হচ্ছে, “লা ছালাতা ইল্লা বেহুজুরিল ক্বালব” অর্থাৎ ছালাত নেই খোদাকে উপস্থিত দেখা ব্যতীত। রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লামের কালাম হলো, “তোমরা এমন ভাবে ইবাদাত করো যেনো আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছো” (মেশকাত -২ নম্বর হাদিস)। রাছুলের খাস অনুসারী বা উম্মত যারা (যারা জান ও মাল দিয়ে মুর্শিদের প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করেছে, কোরানের ভাষায় ইহাকে বলে এতায়াত করা) তারা খোদাকে দেখেই ইবাদাত করেছে। এজন্যই হাবিবে খোদার উম্মতগণের ছালাতই হলো মেরাজ। সুতরাং যারা খোদাকে চিনে না, দেখে না, তাদেরকে কখনো হুজুর বলা যাবে না, সঙ্গত নয়, তাদেরকে হুজুর বললে তা চরম অন্যায় এবং ধর্ম বিরোধী কথা হবে।
কেউ ‘দয়াল’ বলেও মুর্শিদকে সম্বোধন করছে। এর কারণ, আল্লাহর দয়া-করুণা পতিত মানব জাতির জন্য একমাত্র লাভ হয় মানবগুরু বা ইনছানি আত্মার অধিকারী বা পরকাল প্রাপ্ত মানুষের মাধ্যমেই। এখানেই ঈমান আমান; পতিত মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে আল্লাহ নিজেই। আল্লাহর মতলেক কালাম তার হাবিবের মাধ্যমে কালামে নাতেক হচ্ছে, “হে রাছুল, আমি আপনারই মাধ্যমে দান করি এবং আপনারই মাধ্যমে গ্রহণ করি”। সব কিছুর কর্তা আল্লাহপাকই কিন্তু তার মাধ্যম হলেন হাবিবে পাক মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লাম (ওয়াবতাগু ইলাইহিল ওয়াছিলাতা)। বিমূর্ত আল্লাহর মূর্তরুপ হলেন মুর্শিদ; একজন চেতন বা পরকাল প্রাপ্ত মানুষ। আল্লাহর সদৃশ নেই, তবে সাদৃশ্য আছে; এ সাদৃশ্যই হলেন মানবগুরু মুর্শিদ। আর এ কথাও বুঝতে হবে সদৃশ আর সাদৃশ স্থূল দৃষ্টিতে প্রভেদ দেখালেও সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে বা দিব্যদৃষ্টিতে অভেদ হয়েই আছে। দিব্যদৃষ্টিতে একমাত্র অদ্বৈত লীলারই প্রকাশ ও বিকাশ হয়ে চলছে, ইলমে সীনা হতে তাই জানা যায়। আরো বুঝতে হবে, মুহাম্মদ রাছুলই একমাত্র মুর্শিদ – যা চিরবর্তমানে বিদ্যমান । আল্লাহ আদিতে বা অদৃশ্য জগতে আদম রূপেই ছিলেন তাই আদম রূপেই তিনি ব্যক্ত হলেন (ইন্নাল্লাহা আদামা আলা সুরাতিহি) । এখানেই আদম আল্লাহ হুবাহু। আল্লাহ আদম আর মুহাম্মদ আর মুহাম্মদ এ তিনের প্রভেদ আর অভেদটি না বুঝলে এ আলোচনা বুঝা সম্ভব নয়। কাজেই, জ্ঞানীগণ বা ঈমানদারগণ বিদ্যুতের তার দেখলেও সে তারের মধ্যে বিদ্যুৎই দেখতে পান, আর সে দেখাটি তারের আকৃতিতেই । ঈমাসদারগণ ঈমানের দৃষ্টিতে অদ্বৈত-লীলা দেখতে পান বিধায়ই তাকে দয়াল বলে সম্বোধন করছে। আল্লাহই হলেন দয়াল, পরম দয়ালু; দয়া করা না করা দয়ালেরই ইচ্ছা। কোরানে বলা হচ্ছে “ওয়ামা ইয়ানতিকু আনিল হাওয়া” অর্থাৎ, (হাবিবে খোদা) নিজের প্রবৃত্তি হতে কোনো কথা বলেননি। তাহলে হাবিবে খোদার মাধ্যমে তার জবানে আল্লাহর মতলেক কালাম নাতেক হচ্ছে। তার হস্ত, পদ, চক্ষু, কর্ণে আল্লাহরই এরাদা প্রকাশ হচ্ছে। আল্লাহপাক পরম দয়ালু ক্ষমাশীল রাহমানুর রাহিম, তার হাবিবে খোদার মহব্বতকারীগণকে নিজেরই মহব্বতকারী হিসেবে গণ্য করে তাদের জীবনের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন (সুরা আলে ইমরান-৩১)। তাইতো মুর্শিদ বা গুরু রূপেই ঈমানদারগণ দয়াল কে দেখতে পাচ্ছেন।
‘ কেউ কেউ মাধ্যম বা উছিলা স্বীকার করতে চায় না, সরাসরি আল্লাহকে মানে; এর অর্থ সে বিমূর্ত আল্লাহকে মানে; বিধিকে মানে কিন্তু বিধাতাকে মানে না। এ মত এবং পথটিই ইবলিশ এর আকিদা, এরা হলো মোয়াহেদ -কাফের।’
এজন্যই ইবলিশ অহংকার করে আদমের আনুগত্য করতে রাজি নয় তথা আদমকে সেজদা করতে রাজি নয়; রাজি নয় তার ধর্মে যারা দীক্ষিত হয়ে আছে তারাও। আদমকে সেজদা করতে অস্বীকৃতি মানে মূলতঃ আল্লাহকেই সেজদা করতে অস্বীকার করা হলো। মানুষের বাহিরে সবই শূণ্যকার, প্রয়োগহীন, ক্রিয়াশূণ্য-অভেদ্য জুলমাত। তারই সৃষ্টি মানুষ, বেমেছাল নূরের মেছাল (সুরা নূর ৩৫) তথা হুবাহু প্রকাশ। পরকালপ্রাপ্ত মানুষই হলো পতিত মানুষের বা অচেতন মানুষের বা নিজ আত্মা হারানো লোকের আল্লাহ প্রাপ্তির উছিলা (সুরা মায়েদা ৩৫)। যারা বুঝতে চায় না, জন্মদাতাকে ছাড়া আর কাউকে পিতা বা বাবা বলা যাবে না, তাদের যুক্তিটা একেবারেই খোড়া এবং অজ্ঞতাপ্রসূত। কারণ, তারা ধর্মপিতা বা দ্বীনি পিতা মুর্শিদ বা মানবগুরু আর জন্মদাতা পিতার মধ্যে নিশ্চই প্রভেদ বুঝেনি। যেহেতু মেয়ে, তাই মা আর বউকে একটিই মনে করে ফেলেছে মূর্খরা। এ অজ্ঞতা -মূর্খতার জন্যই মুর্শিদকে বাবা সম্বোধন করাকে জন্মদাতা পিতার মতোই মনে করে থাকে এবং ঈমানদারগণকে (যারা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান এনেছে বা বায়াত গ্রহণ করেছে) নানা রকম টিটকারী, রসিকতা বা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে থাকে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিশেষ এক শ্রেনীর আলেম-মোল্লাগণ এবং সমাজে তাদের অনুসারী অজ্ঞ-মূর্খ কিছু লোক। আসলে আল্লাহর সৃষ্টি জীব ছাগলের তকদিরই এমন যে, তার নাকে আতরের শিশি বা গন্ধরাজ ফুল ধরলেও গন্ধ নিতে পারবে না, হাজার চেষ্টা করলেও। কোনো কোনো জীব ঘি খেলে নাকি গায়ের পশম ঝড়ে যায়, অবস্থা ঠিক তেমন। এ শ্রেনীর লোকগুলোর লিখার ডিগ্রি নেই, তবে মুছে ফেলার ডিগ্রি আছে। ধর্মজ্ঞান সবাইকে বুঝানো যাবে না, যার না; আল্লাহ হেদায়েত না দিলে । তাছাড়া ‘বাবা’ বা বা’জান বললেই যদি জন্মদাতা পিতার মতো হয়ে যায় তবে বাংলাদেশের বাঙালী জাতির পিতা বলা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে, এর অর্থ কি তিনি সব মায়েরই স্বামী? মুসলমানের জাতির পিতা বলা হয় ইবরাহিম নবীকে, তাহলে কি তিনি সব মুসলমান মায়েদের স্বামী? না। তিনি হলেন দ্বীনি পিতা। মানব জাতির আদি পিতা বলা হয় হযরত আদমকে, তাহলে তিনিও কি সব মায়েদের স্বামী?
দু’পাওয়ালা মানব জাতির মধ্যে যিনি প্রথম আত্মপরিচয় জ্ঞান লাভ করেছেন বা নিজকে চিনেছেন তথা খোদাকে চিনেছেন তিনিই মানব, পতিত মানব বা অচেতন, ঘুমন্ত, উলঙ্গ মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম; ইহা দ্বীনি পিতা। নিজকে চেনার শিক্ষার ধারক-বাহক তিনি, তিনিই মুর্শিদ। তাকে কেউ বাবা, বাজান বা আব্বা সম্বোধন করছে। তিনি চিরবর্তমান। কারণ আদম হলেই মৃত্যুঞ্জয়ী হয়, অখন্ডকালে স্থিত হয় বা লা মউতের অধিকারী হয়। আবার ছেলেদেরকেও মা-বাবা ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করে, তাই বলে কি ঐ ছেলে মা বাবার জন্মদাতা? বাবার মার স্বামী? একলক্ষ চব্বিশ হাজার নবী রাছুল যদ লোককে মুসলমান করেছেন বা দ্বীনে মোহাম্মদীতে দাখেল করেছেন, তার চেয়েও বারো গুন বেশি মুসলমান করেছেন যিনি সেই হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীকেও পৃথিবীর সব ঈমানদারগণই ‘খাজা বাবা’ বলে সম্বোধন করছে, তাকে কি তিনি সব মায়েরই স্বামী হয়ে গেলেন! অনেক সময় মেয়েদের তার স্বামীকে বলতে শোনা যায় ‘আরে বাবা, রাখো না’। তাতে কি স্বামী পিতা হয়ে গেলো? ‘বাবা’ শব্দটি যখন কোনো সাধু, দরবেশ, গুরু বা অলী মুর্শিদকে বলা হয় তখন তা হয় চিরন্তন শাশ্বত এক পবিত্র সম্মানসূচক উপাধি। আবার ‘বাবা’ শব্দটি অনুনয়, আদর- ¯েœহ ইত্যাদিসূচক সম্বোধনেও ব্যবহৃত হয়। যেমন ‘বাবা আমার সোনামণি’। বন্ধু-বান্ধবদের পরস্পরের প্রতিও ‘বাবা’ বলা হয়ে থাকে। যেমন ‘এ মেয়ে পুরুষেরও বাবা’। দুঃখ যন্ত্রণা ইত্যাদি সূচক ‘বাবা’ শব্দও ব্যবহার করা হয়। যেমন ‘বাবাগো, মাগো বলে চিৎকার করা হয়। জামাতা বা জামাতৃস্থানীয় ব্যক্তিকেও সস্নেহে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করা হয়। শ্বশুরকেও বাবা বলে ডাকা হয়। ছোট ছেলেদেরকে আদরের দৃষ্টিতে ‘বাবা’ বলা হয়; যেমন ‘বাবা গাছের ফুল ছিঁড়ো না’। আরবে চাচাকেও বাবা বলা হয়, তাই বলে কি জন্মদাতা পিতা হয়ে গেলো? এভাবে বললে অনেক উদাহরণই দেয়া যায়।
যার দ্বারা বুঝা ‘বাবা’ বললেই জন্মদাতা পিতা বা জনক হয়ে যায় না বা জন্মদাতা পিতার মতোও হয় না। গুরুকে বা মুর্শিদকে বাবা বা বা’জান বলে সম্বোধন করাটা অনেক উঁচুস্তরের একটি সম্মানজনক উপাধি; এটাকে যারা জাগতিক জগতের পিতা বা বাবা বলে বুঝে বা বুঝায় তাদেরকে গর্দভ বললেও কিছুই বলা হয় নি। এভাবে জাগতিক জগতে সামাজিক পরিসরে ভাই-বোন, চাচা-চাচী, মামা-মামী, দাদা-দাদী ইত্যাদি আমরা অনেক লোকদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করে থাকি অথচ তারা কেউ রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়তো নয়ই, বরং কোনো আত্মীয়ই নয়, অপরিচিত লোকও হতে পারে। বুঝতে হবে একই শব্দ স্থান বিশেষে ভিন্ন অর্থ হয় – এটা যে না বুঝে তাকে বুঝাতে যাওয়া আর গাধার নাকে গোলাপ ফুল ধরা একই কথা। বুঝতে হবে মানবগুরু হলো বাবারও বাবা, মায়েরও বাবা তথা তিনি পতিত মানবজাতিরই ‘বাবা’ বা পিতা। ‘বাবা’ কথাটির অর্থ অনেক, তার মধ্যে ‘দরজা’ (বাবা) ও বলা হয় (সুরা বাকারা -৫৮)। কিসের দরজা? ইলমে ইলাহী মানবগুরুর মাধ্যমে লাভ হয় বিধায় তিনি ‘বাবা’ ইলমে ইলাহী লাভের মাধ্যম বা দ্বার। ‘দারবেশ বা দরবেশ’ কথার মর্মার্থও এখানে প্রণিধানযোগ্য। এ দরজা দিয়েই শহরে প্রবেশ করে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে কোরানে এবং তাতে তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হবে (সুরা বাকারা ৫৮)। একটি জন্মদাতা পিতা তথা বাবা, আরেকটি কর্মদাতা বা মুক্তির পথপ্রদর্শক পিতা বা বাবা। দুটোই বাবা তবে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করছে, দুয়ের ব্যবধান আকাশ-পাতাল। জন্মদাতা পিতা-মাতা আপেক্ষিক সত্য, কিছু দিনের জন্য। আর ইনছানি আত্মার অধিকারী বা পরকালপ্রাপ্ত মানুষ হাকিকি পিতা, চির দিনের পিতা, মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক। হাবিব খোদার কালাম হতে ‘মাওলা আলী’ হলেন ইলমে ইলাহীর দরজা। (রাছুলের কালাম হলো, “আনা মদিনাতুল ইলমী ওয়া আলীউন বাবুহা”।
বোনের জামাই শ্যালককে ‘শালা’ বলে সম্বোধন করে বা পরিচয় দেয়। তাতে সে সন্তুষ্ট হয়। কিন্তু ঝগড়ার সময় অন্য কোনো লোককে শালা বললে কিন্তু গালি হয়ে যায় আর তাতে মারামারি লেগে যায়। শ্যালককে ‘শালা’ বলা আর ঝগড়ার মধ্যে অন্য লোককে ‘শালা’ বলা এক নয়। একটি বুলি অপরটি গালি, যদিও একই শব্দ উচ্চারণ হচ্ছে তবু ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করছে। আর হাবিবে খোদার স্ত্রীগণ হলেন ‘উম্মুল মুমিনীন’ অর্থাৎ মুমিনগণের মা বা মূল। যদিও এর ভেদ-রহস্য অনেক গভীরে নিহিত রয়েছে। মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লাম স্বয়ংই ইসলাম এবং মুসলমান (মুক্ত, স্বাধীন, মৃত্যুঞ্জয়ী) তথা তিনি নিজেই ধর্ম এবং ধর্মের সুরত, ঈমান এবং ঈমান দেনেওয়ালা। সুতরাং দ্বীনি পিতা হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামের প্রতি যারা ঈমান এনেছে (বায়াত গ্রহণ করেছে) এবং তার নীতি আদর্শকে ধারন করেছে বা করার সাধনা করছে তারাই হলো একমাত্র ঈমানদার এবং মুসলমান, তার আওলাদ। ওলী-মুর্শিদ বা গুরুর ক্ষেত্রেও তাই সম্বোধন হবে। কারণ, নবুয়তের নবী-রাছুলই হলো বেলায়েতের ওলী মুর্শিদ, একই কাজ শুধু উপাধি ভিন্ন।
মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই, তাই বলে এ কথা হাবিবে খোদা বা ওলী-মুর্শিদের ক্ষেত্রে বলার অবকাশ নেই। কারণ, হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুল জাগতিক জগতের সম্পূর্ণ বাহিরে মোকামে মাহ্মুদায় স্থিত আছেন, যেখানে সৃষ্টির কোনো অপবিত্রতা প্রবেশ করে না। সেখানে জাগতিক জগতের কোনো সম্বোধন প্রযোজ্য নয়, যদিও তিনি মানবলীলায় সাংসারিক জীবন যাপন করেছেন। তিনি মুক্ত, স্বাধীন সত্ত্বা। আর আল্লাহ নিজেই তার স্ত্রীগণকে উম্মতের মা বলে ঘোষণা করেছেন, বিধায় হাবিবে খোদা উম্মতের পিতা হয়ে গেলেন, তাকে এবং তার স্ত্রীদেরকে অন্যদের মতো জাগতিক জগতের সম্বোধন থেকেও আলাদা করে দেয়া হয়েছে। যারাই তার স্ত্রী হবে তারাই উম্মুল মু’মিনিন বা উম্মতের জননী বলে সাব্যস্ত হয়ে যাবে, তাই বলে উম্মতের জাগতিক জগতের জন্মদাত্রী জননী বা মা নয়।
মৌলবাদী সংগঠন ‘হেফাজতে শফীর’ আলেম- মোল্লারাও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমী জননী’ উপাধি দিয়েছে; তাই বলে কি তিনি তাদের জন্মদাত্রী জননী বা মা হয়ে গেলেন? না, এটা তাদের পক্ষ থেকে একটি সম্মানসূচক উপাধি; যেহেতু তিনি নারী তাই। পুরুষ হলে বলতেন কওমী পিতা । যদিও হাবিবে খোদার স্ত্রীগণ তারই ভক্ত বা মুরিদ তথা রাছুলের নিকট বায়াত বা আনুগত্য স্বীকার করে ঈমানদার হয়েছেন তথা মুসলমান হয়েছেন, আর এ কথা চিরন্তন-শাশ্বত কালের বিষয়। কোরানে ঘোষিত পিতা বা মাতা সম্বোধনটি ধর্ম সম্পর্কের বা দ্বীনি পিতা বা মাতা তথা বাবা বা মা, ইহা জাগতিক জগতের অবশ্যই নয়। ইহা একটি বিশেষ সম্মানিত উপাধি আল্লাহর পক্ষ হতে। দ্বীনি ভাই- বোন যেমন কোরানে ঘোষণা করছে (সুরা আযহাব – ৫) তেমনি হাবিবে খোদার স্ত্রীগণকে মাতাস্বরূপ ঘোষণা (আযহাব – ৬) করে হাবিবে খোদাকে পিতা সাব্যস্ত করে দিলেন। কোরানে আরো বলা হয়েছে, “মুমিন পুরুষ এবং মুমিন নারী, তারা পরস্পর একে অপরের বন্ধু”। এ ঘোষণা ইনছানি আত্মার অধিকারী বা পরকাল প্রাপ্ত প্রত্যেকটি মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। কারন, তারা বহু হয়েও এক, ঐক্যতায় প্রতিষ্ঠিত তথা হিজবুল্লাহয় দাখেল হয়ে আছে। কাজেই, মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই একথা বলে রাছুলের স্ত্রীগণকে জাগতিক জগতের ভাবী সম্বোধন করার কোনো পথ খোলা নেই। যারা এ ধরনের জাগতিক সম্বোধন বুঝে এবং বুঝাতে চায় তারা অজ্ঞ-মূর্খ। বুঝতে হবে একটি ইহলোকের আত্মীয় অপরটি পরলোকের আত্মীয়। ইহলোকের আত্মীয় যা শুধু রক্তের সম্পর্ক, এ আত্মীয়তা আপেক্ষিক সত্য, চিরসত্য নয়, পরলোকের আত্মীয় নয়। বরং এ আত্মীয়তা পরলোকের জন্য ফেৎনাস্বরূপ, কোরানে ঘোষণা করছে।
আত্মীয়কে ফার্সী ভাষায় ‘এগানা’ ও বলে। আত্মীয় কথাটির দুটি অর্থ বা ভাবমর্ম প্রকাশ করছে একটি ইহলৌকিক অপরটি পারলৌকিক। ইহলৌকিকের আত্মীয় রক্তের সাথে জড়িত– যা নফস থেকে আগত। এ ধরনের আত্মীয়তা পারলৌকিক জগতে কোনোই কাজে আসবে না, যদি ইহজগতের গুরু ভজন না হয়ে থাকে। কারণ কর্মফলে যার যার আবাস্থল হবে – কেউ জান্নাতি কেউ জাহান্নামী। আর আত্মার আত্মীয় রুহের সাথে জড়িত বা ইনছানি আত্মার সাথে সম্পর্কিত বা জড়িত। এরা একজন পরকাল প্রাপ্ত মানুষের বা মুর্শিদের বা গুরুর আত্মার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে তারা অনুসারী বা বংশধর হয়ে যায় তথা আত্মীয় হয়ে যায় তথা ইনছানী আত্মার অধিকারী মানুষ ঐক্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে আত্মীয়তার বন্ধনের আবদ্ধ হয়ে থাকে। তারা একে অন্যের সাথে জাগতিক জগতের নয় পারলৌকিক জগতের বা পবিত্র আত্মার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আত্মীয় হয়ে যায় – এরাই হলো জান্নাতি মানুষ। এ ধরনের মানুষগুলোই একে অন্যের আত্মীয় এবং তা চিরদিনের জন্য আত্মীয় তথা তারা হলো জান্নাতি মানুষ – নফস মুতমাইন্নার অধিকারী। এরাই সত্যিকারের মুসলমান এবং পরস্পর ভাই ভাই। এরা যেহেতু মোহমুক্ত হয়ে স্বাধীন হয়ে যায়, মুক্ত মানুষ হয়ে যায় তথা মুসলমান হয়ে যায় তাই তারা পুরুষ বলে সাব্যস্ত হয়। আবার মেহমান বা আত্মীয়কে ‘অতিথি’ ও বলা হয়। অতিথি হলো সাক্ষাৎ ভগবান। আল্লাহ খোদা হলো, ঈশ্বর ভগবান হলো মানে মানুষ রুপে অবতার হলো। ‘অতিথি’ মানে যার মধ্যে কোনো তিথি নেই অর্থাৎ মোহমুক্ত একজন মানুষ বা দুনিয়া বিবর্জিত একজন চেতন মানুষ। এ আমিত্বশূণ্য বা মোহমুক্ত একজন চেতন মানুষই হলো “ওয়াজহুল্লাহ’র অধিকারী যিনি অবতার বা প্রেরিত পুরুষ। এখানে দৈহিক নারী বা দৈহিক পুরুষের কোনো কথা নেই।
যারা আমিত্বের আবরণে আবৃত হয়ে আছে বা নফস আম্মারার ফেলে আবৃত হয়ে আছে বা দুনিয়ার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছে হাকিকতের জগতে তারাই হলো নারী। এ দুনিয়াকে মায়াময় নারী হিসেবে দেখানো হয়েছে রাছুল মেরাজে যাবার সময়। “তালিবুদ্দুনিয়া মুয়ান্নাছ”। অর্থাৎ দুনিয়ার সন্ধানীগণ নারী। হযরত ইমান জয়নুল আবেদীন আলাইহিস সালামের কালাম হলো ‘দুনিয়ার সন্ধানীগণ কুকুর সদৃশ’। এ নারী পুরুষ দেহগত নয়, প্রকৃতিগত। নারীত্ব কেটে গেলেই পুরুষত্বের জাগরণ ঘটে। দেহগত নারী বা পুরুষ যার মধ্যেই পুরুষত্বের জাগরণ ঘটবে হাকিকতে সেই পুরুষ, এরা মাওলার প্রেমিক (তালিবুল মাওলা মুজাককার) । যারা মুসলমান তথা স্বাধীন বা মুক্ত মানুষ বা পরকাল প্রাপ্ত বা প্রেরিত মানুষ তারা পরস্পর ঐক্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে বা সমগ্রোত্রিয় হয়ে আছে বিধায় এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই, এরা মুমিন। ‘আল মুমিনীনা মিররাতুল মুমিনীন’ অর্থাৎ এক মুমিন অপর মুমিনের আয়না। এক মুমিন অপর মুমিনকে দেখলে সে নিজেকেই দেখলো, তাতে দৈহিক নারী পুরুষের কোনো প্রশ্ন নেই। “আত্মীয়তা ছিন্নকারী জাহান্নামী” – কোরান এবং রাছুলের কালামের মর্মভেদ এখানেই। ইহা জাগতিক জগতের আত্মীয়তা নয়। মানব সমাজের মধ্যে সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করার জন্য, পরস্পর পরস্পরের সাথে সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব ভাব, আদব-নম্রতা, শালীনতা রক্ষা করে চলার জন্য হাকিকতকে লক্ষ্য করে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বসবাস করা হয়, যাতে সমাজের মধ্যে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়। ইহা জাগতিক জগতের সম্পর্ক – যা আপেক্ষিক সত্য বা কিছু দিনের জন্য সত্য।
‘যারা মুর্শিদের সাথে আত্মার পবিত্র সম্পর্ক স্থাপন করেছে তথা বায়াত বা আনুগত্য স্বীকার করেছে কোরান মতে তারাই হলো ঈমানদার।’
তারা অবশ্যই সাজের মুসলমান নয়, তারা সিরাতে সুরতে ঐক্যতায় এসে বা খান্নাছমুক্ত হয়ে মুসলমান হয়েছে। এ দিকে লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে, “মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই”। এখানে নারী পুরুষকে আলাদা করে দেখানো হয় নি, বুঝানো হয়নি অর্থাৎ এরা হলো দ্বীনি ভাই-বোন। এ আত্মীয়তা চিরদিনের সম্পর্ক এবং এখানেই সুরা কাওসারের মর্মভেদ নিহিত আছে, হাকিকতে এরাই হলো কাওসারের বংশধর বা নূরের বংশধর।
রাছুলের বংশধরই চিরস্থায়ী; কাফের-মুনাফেকদের বংশ চিরস্থায়ী নয়। এ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়া জাগতিক জগতের সমস্ত আত্মীয়তার (যারা নবী বা ওলী-মুর্শিদের আনুগত্যের বায়াত গ্রহণ করে তার প্রচারিত দ্বীনকে স্বীকার করে নেয়নি) বন্ধন সেদিন ছিন্ন হয়ে যাবে। যেমন নূহ নবীর চার সন্তানের মধ্যে কেনানকে আল্লাহপাক নূহ নবীর সন্তান বলে স্বীকৃতি দেননি (সুরা হুদ ৪৫)। কারণ, সে নবীর নিকট আনুগত্যের বায়াত এবং তার প্রচারিত দ্বীনকে স্বীকার করেননি। নূহ নবীর সাথে তার পুত্র কেনানের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে, আল্লাহপাকই তা ঘোষণা করলেন। জাগতিক জগতের সবাই জানে কেনান নূহ নবীর সন্তান। বংশী হতে বংশ। যে যার নীতি আদর্শ ধারণ করেছে সে তারই বংশধর। ফার্সী ভাষায় বলা হয় ‘এগানো’, জান্নাতি মানুষ বা নফস মুতমাইন্নার অধিকারী মানুষ।
হাকিকতে ওলী-মুর্শিদের ভক্ত অনুসারীগণই হলো একমাত্র চিরন্তন-শ্বাশত আত্মীয় বা এগানা বা আর বাকী সমস্তই হলো বেগানা। এরা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হয়ে গেছে বা সিবগাতাল্লাহয় সিক্ত হয়ে আছে তথা রাছুলের ভাষায় ‘তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লাহ’ তে স্থিত হয়ে আছেন। এরাই হলো আওলাদুননবী বা ওলী মুর্শিদের বংশধর। এ জগতের আত্মীয়তার যত সম্পর্কই থাকুক হাশরের দিন কোনোই কাজে আসবে না, তাদের বাসস্থান হবে কর্ম বা আমলনামা অনুসারে (সুরা মুমতাহিনাহ ৩); যদি না একজন আল্লাহ পরিষদের বা পরকাল প্রাপ্ত বা মুক্তিপ্রাপ্ত মানুষের নিকট বায়াত গ্রহণ করে তার প্রচারিত দ্বীনকে গ্রহণ করা হয়। কর্মফল অনুসারে কেউ বাস করবে অন্ধকার কবরে, কেউ বাস করবে মাজার বা ‘রওজায়’। জাগতিক জগতের আত্মীয়তার জন্য যদি পরকাল (চৈতন্যের জগত) ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা আল্লাহর জিকির (স্মরণ বা ধ্যান) থেকে কেউ গাফেল হয়, জাহান্নাম নিশ্চিত (সুরা মুনাফেকুন-৯)। সেদিন মাতা-পিতা, ভগ্নি-ভ্রাতা একে অন্যের থেকে হারিয়ে যাবে। কাজেই ধর্ম জগতে বা কোরান মতে ওলী-মুর্শিদের খাঁটি অনুসারীগণই হলো ‘এগানা’ বাকি সবাই বেগানা, যদিও জাগতিক জগতে তারা এগানা বা আত্মীয় বলে স্বীকৃত। ইহা কিছু দিনের সত্য তথা আপেক্ষিক সত্য, চির সত্য নয়। সুতরাং (ওলী-মুর্শিদের সাথে) সম্পর্ক ছিন্নকারী মুরতাদ হয়ে যাবে তথা ধর্মত্যাগী বলে স্বীকৃত হবে, জাহান্নামে যাবে-ইহাই হাবিবে খোদার কালামের মর্ম। এ আত্মীয় জাগতিক জগতের নয়, আধ্যাত্মিক জগতের বা আত্মা জগতের। কারণ মানুষের এক নামও হলো আত্মা। আখেরাতে রক্ত সম্পর্ক বা জাগতিক জগতের আত্মীয়তার কোনো মর্যাদা নেই।
রাছুলের চাচা আবু লাহাব, আবু জাহেল কাফের, হযরত ওমরের পিতা খাত্তাব কাফের, ইবরাহিম নবীর পিতা মাতা কাফের, নুহনবীর ছেলে কাফের, কাফের ফেরাআউনের স্ত্রী আছিয়া মুসলমান ইত্যাদি শত শত উদাহরণ তুলে ধরা যায়। আবু লাহাব, আবু জাহেলের হাশর হবে কাফেরদের সঙ্গে, নূহনবীর ছেলে কেনানের হাশর হবে কাফেরদের সঙ্গে – আবার হযরত আছিয়ার হাশর হবে মূসা নবীর সাথে। নমরুদের মেয়ে ‘অরগেজার’ হাশর হবে ইবরাহিম নবীর সঙ্গে, অথচ তাদের আত্মীয়তা সম্পর্কটি হাশরের দিন কোনো কাজেই আসবে না। বাদশাহ হারুন অর রশিদ এবং তার স্ত্রী জোবায়দা খাতুনের (যিনি বিখ্যাত মজ্জুব ওলী বাহালুুল দানার নিকট হতে এক লক্ষ দিরহাম দিয়ে জান্নাতের টিকিট ক্রয় করেছিলেন, এ বাহালুল দানার শিষ্যই ছিল শিখ ধর্মের গুরু নানক) ঘটনা হতেও জানা যায়, জাগতিক জগতের আত্মীয়তা হাশরের দিন কোনো কাজেই আসবে না। বাদশাহ বিশ্বাস করেনি কিন্তু জোবায়দা খাতুন জান্নাতে অবস্থান করছে কিন্তু শত আকুতি মিনতি করেও হারুন অর রশিদ তাতে প্রবেশ করতে পারেননি, স্ত্রীর নিকট যেতে পারেননি। কারণ, তার নিকট জান্নাতের টিকিট নেই। এরপরই ঘুম থেকে জেগে বাহালুুল দানার সন্ধানে গেলেন। আর টিকিট নেই বলে তাকে জানিয়ে দেয়া হলো। কাজেই একটি মেজাজি ‘এগানা’ বা আত্মীয় আর অপরটি হাকিকি এগানা বা আত্মীয়। এজন্যই জাহেরী কাবা ঘর তাওয়াফ করার সময় নারী পুরুষের কোনো প্রভেদ নেই; এক সাথেই তাওয়াফ করা হয়। ইশারা দেয়া হয়েছে আল্লাহর নিকট জাগতিক জগতের ছেলে-মেয়ের কোনো প্রভেদ নেই। রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামের সময়ও তাই ছিল।
ইতিহাস খুঁজে দেখুন ইসলামের বিধি বিধান চৌদ্দ আনাই বিকৃত করা হয়েছে। তেমনি হাকিকি কাবা-কেবলা মুর্শিদের জিয়ারতের ক্ষেত্রেও নারী পুরুষ কোনো প্রভেদ নেই। আল্লাহ দেখবেন আত্মার আত্মীয়, জাগতিক জগতের আত্মীয় অবশ্যই নয়। আর হাকিকি কাবা-কেবলা হলো পরকাল প্রাপ্ত মানুষ বা ইনছানি আত্মার অধিকারী মানুষ বা প্রেরিত পুরুষগণ – যাকে মুর্শিদ কেবলা বলে সম্বোধন করা হয়, তারা বহু হয়েও এক। কোরানের ঘোষণা হলো, “হাশরের দিন প্রত্যেককে তার ইমামের সাথে ডাকা হবে”। এ ইমামই হলো দ্বীনি পিতা, বাবা বা আব্বা। তার অনুসারীদের হাশর তার সাথেই হবে। তারা বহু হয়েও এক এবং হিজবুল্লাহ। তাদের নিকট ও নারী পুরুষ সবাই জিয়ারতের জন্য আগমন করছে। এখানে কোনো প্রভেদ নেই, সবাই সমান। যেহেতু আদব, ন¤্রতা, ভদ্রতার সাথে সবাই অবস্থান করে, প্রত্যেকের ইজ্জত সম্মানের দিকে সতর্ক দৃষ্টি আছে বা রাখা হচ্ছে এবং এ অবস্থায় মুর্শিদ কেবলাকে জিয়ারতে তাওয়াফ করছে। কাজেই তাদের এই শালীনতা, ভদ্রতাই হলো পর্দা। মেজাজি কাবা ঘরেও (যা আরবে অবস্থিত) নারী-পুরুষ কেউ কারো দিকে দৃষ্টি না দিয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করছে আর বলছে ‘আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ – হে আল্লাহ, আমি তোমার দরবারে হাজির। যেখানে ন¤্রতা-ভদ্রতা নেই, শালীনতা নেই, ইজ্জত-সম্মান রক্ষা হয় না, সেখানে পর্দাও নেই; হাজারো কাপড়ে সমস্ত শরীর আবৃত থাকলেও পর্দা নেই। এ জন্যই আফগানিস্তানে এক মেয়ে লোহার ব্রা এবং অন্তর্বাস পড়ে (স্বীয় জামার ওপরেই পড়েছে) রাস্তায় নেমে আসলো এবং বুঝালো যে, “আমরা তো পর্দার ভিতর থেকেও ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করতে পারছি না, তাহলে কি লোহার পোশাক পড়ে থাকতে হবে?” এ ইজ্জত-সম্মান, নারী নির্যাতন কারা করছে?
শুনে আশ্চর্য হবেন যারা ইসলামী বিধি বিধান বা ইসলামী সমাজ গঠন করার জন্য এবং নারীদেরকে পর্দার ভিতর থাকার জন্য জেহাদের না ভয়ংকর সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদীতে রতো হয়ে মানুষ হত্যা করে চলেছে সেই তালেবানরাই শত শত মেয়েদের ইজ্জত সম্মান লুটে নিচ্ছে (আফগানিস্তানের নারী)। আই এস বা আল কায়দার জঙ্গিরা তার চেয়ে ভয়ংকর পথে ধাবিত হচ্ছে। বিশ থেকে পঁচিশ জন পুরুষের অধীনে একজন মেয়েকে ব্যবহার করছে। আই এসের পুরুষ জঙ্গি সন্ত্রাসীদের যৌনদাসী হতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে দুইশত তিয়াত্তর জন মেয়েকে শিরোচ্ছেদ করা হয়েছে। আফ্রিকা ‘বোকো হারাম’ জঙ্গি সংগঠন স্কুল হতে তেরো চৌদ্দ বৎসরের একশত চুয়াত্তর জন মেয়েকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করছে। বৎসরখানেক পরে কয়েকজন মেয়ে কোলে ছোট শিশু নিয়ে ফিরে আসে। আর মাদ্রাসার কথা কি বলবো, তা সবাই জানেন [যেহেতু ধর্ম শিক্ষালয় (?) বলা হচ্ছে, তাই সামান্য তুলে ধরলাম]। তাছাড়া বিভিন্ন ভাবেও মেয়েরা নির্যাতিত হচ্ছে। মনের পর্দা ঠিক না থাকলে কাপড়ের পর্দায় কতটুকু রক্ষা পাবে তা বোধসম্পন্ন লোকের পক্ষে বোঝা কোনো দুবোর্ধ বিষয় নয়, যদিও পোষাকের শালীনতাও অবশ্যই স্বীকার্য। মনের পশুত্বকে কোরবান করতে পারলে নারী-পুরুষ সবাই বাঁচে, বাঁচে সমাজ – প্রতিষ্ঠিত হয় শান্তি, যেখানে আছে ইসলাম।
বংশী হতে বংশ, যে যার নীতি আদর্শ গ্রহণ করে হাকিকতে সে তারই বংশধর। জাগতিক জগতের আত্মীয় নফসের সাথে সম্পর্ক আর হাকিকি আত্মীয় হলো রুহের সাথে সম্পর্ক আর রুহ হলো প্রভু সত্ত্বা। এরাই হলো আল্লাহর বান্দা, হাবিবে খোদার উম্মত।
সুতরাং পীর-মুর্শিদ বা গুরুকে ‘বাবা, বা’জান, দয়াল বা হুজুর বলা ধর্ম বিধানে একটি উৎকৃষ্ট বা পবিত্র সম্মানিত সম্বোধন। আবার মুর্শিদই হলো মূলতঃ ভক্তের বা ঈমানদারগণের ‘মাওলা’ (প্রভু)। অনেক ওলী-মুর্শিদকেই তাদের ভক্ত – অনুসারীগণ ‘মাওলানা’ (আমাদের প্রভু) বলে সম্বোধন করেছেন। যেমন, জালালদ্দিন রুমী তার মুর্শিদকে মাওলানা বলে সম্বোধন করেছেন। এ মাওলানা মাদ্রাসার উপাধি নয়, আধ্যাত্মিক জগতের বিষয়। মাদ্রাসার শিক্ষায় কখনো ‘মাওলানা হতে পারবে না, হতে পারবে ইলমে সীনা বা ইলমে ইলাহীর অধিকারী হলে। যারা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান এনেছে একমাত্র তারাই হলো ঈমানদার এবং এ সম্বোধনগুলো একমাত্র ঈমানদারগণের জন্যই। যারা অজ্ঞ-মূর্খ এবং পিতৃধর্মের দোহাই দিয়ে ঈমানের দাবিদার বা ঈমানদার সেজেছে তাদের জন্য নয়। আর এ ধরণের ঈমানকে কোরানে ঈমানদার বলে স্বীকৃতি দেয়া হয় নি।
অনুবাদ – ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র, ১ম ও ২য় পর্ব
মুল – এলিফ শাফাক হতে
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী
পর্ব ০১
প্রভু দর্শন চাও? নিমার্ণ করো তোমার দৃষ্টি। তোমার প্রভু তো তুমি যা দেখো তারই প্রতিচ্ছবি! প্রভু কেমন সেটি মূখ্য বিষয় নয়, প্রকৃত বিষয় হচ্ছে তুমি কেমটি দেখছো তাকে!
প্রভু, সেতো পরম প্রেমময়তায় তোমার অন্তরাত্মায় অহর্নিশী বিরাজ করে। যদি তুমি তাকে রূপে রসে রূপায়িত করতে চাও তবে সে রূপকে আঁকতে হবে তোমার হৃদয়ের মাধুরী মিশিয়ে। যেমনটি চাইবে তোমার হৃদয়, তেমন রূপেই প্রস্ফুটিত হবে তোমার প্রভু। যেমনটি তোমার অন্তর, তেমন রূপটিই প্রকটিত হবে তোমার নয়নে, তোমার প্রভু রূপে। প্রভু তো বাহ্যিক কোনো কাঠামোবদ্ধ আকৃতি নয়। সে তোমার প্রাণের প্রাণময় পরম সত্ত্বা। যদি তোমার আত্মা হয় পরিশুদ্ধ, জঞ্জালমুক্ত, নিষ্কলুষ, সেই তো পরম। সে রূপটিই তো পরম প্রভুর রুপ।
প্রভুর দর্শন চাও? নির্মাণ করো আপনত্বকে। আপনার রূপ কে করো নির্ভেজাল। জেনে রাখো, সে রুপটিই তোমার প্রভুরূপ।
যদি তুমি হও পাপী বা কুৎসিত, তোমার প্রভুটিও পাপী বা কুৎসিত। মমতাবান বা প্রেমময় ঈশ্বর চাও? নিজে পরিণত হও ভালোবাসাময় বা মায়াময় মানুষে।
‘তুমি যেমন, তেমনটি তোমার ঈশ্বর’
পর্ব ০২
প্রেমময় হও। নিজের পরিচালক নিযুক্ত করো নিজের হৃদয়কে। কোনো যুক্তি-বুদ্ধি বা মস্তিষ্ক দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করো মহাপ্রেমময়ের প্রেমকে। হৃদয়ই কেবল সেই অনন্ত প্রেমের মহিমাকে ধারণ করতে পারে।
সবাইতো অনুসরণ করে মস্তিষ্ককে। নিজের বুদ্ধিকে। তুমি না হয় বোকাই হও। বিসর্জন দাও নিজের সমস্ত জ্ঞানকে। হয়ে উঠো উন্মাদ। আরো উন্মাদনাময়। কথা বলতে দাও তোমার হৃদয়কে। সেই তোমায় যথার্থ পথ দেখাবে। হৃদয়তীর্থের অনুসরণেই আসবে কাঙ্খিত প্রেমময়ের স্বান্নিধ্য। সেতো হৃদয়েই বিরাজিত।
হৃদয়ের প্রেমবলেই বিজয়ী হও প্রবৃত্তিসমূহের উপর, যে কুপ্রবৃত্তিগুলো তোমায় ফিরিয়ে রাখে হৃদয় হতে। হৃদয়ের অনুভূতি দ্বারা জেনে নাও তোমার অস্তিত্বকে, আপনত্বকে। যা তোমাকে পরিচালিত করবে মহান প্রভুর দিকে।
‘হৃদয়েই তোমার যথার্থ পথ প্রদর্শক’
প্রবন্ধ – আসরারে পাঞ্জাতন – ১ম পর্ব
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
সমস্ত প্রশংসা সেই মহান জাতপাক আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি যিনি সৃজন করেছেন এ বিশ্ব মহিমন্ডল এবং দরুদ ও ছালাত ছালাম তাঁর হাবিব, রাহমাতুল্লিল আলামিন ইমামুল মুরছালিন হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম ও তাঁর আহলে বাইয়েত তথা-
– হযরত মাওলা আলী আলাইহিস সালাম
– খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমাতুজ্জাহরা আলাইহিস সালাম
– হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম
– হযরত ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের ওপর।
কোরানুল কারীমে আল্লাহপাক বলেছেন, “কুললা আছআলুকুম আলাইহি আজরান ইল্লাল মা-আদ্দাতা ফিল কুরবা। অমাঈ ইয়াক তারিফ হাছানাতান নাযিদ লাহু ফীহা হুছনা” অর্থাৎ বলে দিন [হে প্রিয় রাছুল] আমি চাইনা তোমাদের কাছে এই [নবুয়তের] বিষয়ে কোনো পারিশ্রমিক আমার নিকটবর্তীগণের [আহলে বাইয়েত] মা আদ্দাতা [ভালোবাসা] ব্যাতিত। যে ব্যক্তি ইহার [এই আদেশের] সদ্ব্যাবহার করে আমি [আল্লাহ] তার শ্রীবৃদ্ধি [বরকত] করে থাকি। [সুরা শুরা – ২৩ আয়াত]। উক্ত আয়াত দ্বারা আল্লাহপাক আহলে বাইয়েত এর প্রতি মহব্বত ওয়াজিব করে দিয়েছেন। সাহাবাগণ উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামকে প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম! কারা আপনার নিকটবর্তী জন, যাদের প্রতি ভালোবাসা আল্লাহপাক আমাদের জন্য ওয়াজিব করে দিয়েছেন? উত্তরে রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম বললেন, “আলী, ফাতেমা, ইমাম হাসান ও হোসাইন” হলো আমার নিকটবর্তী জন। উক্ত আয়াতকে বলা হয় আয়াতে মাআদ্দাত বা প্রাণাধিক ভালোবাসার নিদর্শন।
কোরানুল করিমে সুরা আল ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াতটিকে বলা হয় ‘আয়াতে মুবাহেলা’ বা চ্যালেঞ্জের নিদর্শন। এ আয়াতের শানে নযুল হলো হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে ধারাবাহিক ভাবে শাবী, দাউদ ইবনে হিন্দ, মোহাম্মদ ইবনে দীনার, বাশার ইবনে মিহরান, আহমদ ইবনে দাউদ মক্কী, সোলায়মান ইবনে আহমদ ও আবু বকর ইবনে মুরদিয়া বর্ণনা করেছেন, একদা আবিদ ও সাঈদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের কাছে গিয়ে তাদের সাথে মুবাহিলা (চ্যালেঞ্জ) করার জন্য আহ্বান করলেন। এতে রাছুল করিম সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম বাধ্য হয়ে তাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। পরদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম তাঁর আহলে বাইয়েত তথা হযরত মাওলা আলী, ফাতেমাতুজ্জাহরা, ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামকে সাথে নিয়ে মুবাহেলার জন্য বের হলেন। কিন্তু খ্রিষ্টানদেরকে মুবাহেলা করার জন্য খবর দিলে তারা ভীত হয়ে মুবাহেলার জন্য আসতে অস্বীকৃতি জানায়। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নাযিল হয় আয়াতে মুবাহেলা। আয়াতটি হলো “ফাকুল তা আলাউ নাদউ আবনা আনা ওয়া আবনা আকুম, অ নিছা অ-নিছাকুম, ওয়া আনফুসানা অ আনফুসানাকুম” অর্থাৎ বলে দিন হে রাছুল, এসো একত্রিত করি, তোমাদের ও আমাদের পুত্রগণকে, আমাদের ও তোমাদের স্ত্রীগণকে এবং আমাদের ও তোমাদের নিজেদেরকে, অতঃপর আমরা শফত পাঠ করি, মিথ্যুকদের ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক। তাফসীরে ইবনে কাসির ২য় খন্ডের ৪৭৭ পৃষ্ঠায় এবং তাফসীরে মাজহারী ৯ম খন্ডের ৪৯২-৯৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, উক্ত আয়াতে মুবাহেলার বিষয়ে হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু বলেন,
‘আনফুসানা’ শব্দ দ্বারা রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম ও মাওলা আলী আল্ইহিস সালামকে,
‘অ নিছা আনা’ শব্দ দ্বারা মা ফাতেমাতুজ্জাহরা আলাইহিস সালামকে এবং
‘ওয়া আবনা আনা’ শব্দ দ্বারা ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামকে বুঝানো হয়েছে।
‘আসরারে পাঞ্জাতন’ অধ্যায়ে পাক পাঞ্জাতনের ধারাবাহিক বর্ণনা দেয়া হবে। বর্ণনাটি হবে –
প্রথম – রাছুলে পাক হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম
দ্বিতীয় – হযরত মাওলা আলী আলাইহিস সালাম
তৃতীয় – খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমাতুজ্জাহরা আলাইহিস সালাম
চতুর্থ – হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম
পঞ্চম – হযরত ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের ওপর।
এ ধারায় থাকবে তার তত্ত্ব ও তথ্য সম্বলিত আলোচনা যা হবে সত্য সন্ধানীদের জন্য পথ নির্দেশিকা, বাতিলের চারিদেয়ালে চরম আঘাত।
সত্য সব সময়ই ‘যালযালার’ মতো প্রকাশ হয়, সত্যনিষ্ঠ লোক ছাড়া সত্যকে ধারণ করার মতো সাহস কারো থাকে না। আধ্যাত্মিক জ্ঞানে বা ধর্মজ্ঞানে হয় সৎ চিন্তার উদয়, সৎ চিন্তায় সৎকর্ম, সৎকর্মে হয় সৎ সাহসদ; তাতে সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হয়। অজ্ঞ-মূর্খরা না বুঝেই প্রতিবাদ-সমালোচনা করে, গোঁড়ামী করে, জোর জুলুম করে, আর জ্ঞানীরা বিচার-বিশ্লেশণ করে সত্যকে স্বীকার বা প্রতিবাদ করে, কিন্তু জোর জুলুম করে না। ধর্ম শাস্ত্রের মুতাশাবেহাত বা রুপক-প্রতীক অলংকারিক ভেদ করে সত্যকে তথা মুহকামাতকে বুঝে নিতে হয়। ইলমে এলাহী বা আত্মার জ্ঞান যখন ওহী হয় তখনই তা রূপক-প্রতীক বা আলংকারিক রুপ ধরে প্রকাশিত হয়, সেই রুপক-প্রতীকের আড়ালেই রয়েছে চরম সত্য মুহকামাত-যাতে নিহিত আছে ধর্মজ্ঞান বা ইলমে এলাহী। যাক, কিছু আয়াত পেশ করা হলো পাক পাঞ্জাতন ও রাছুল সম্পর্কে- “ওয়া আরছাল্নাকা লিন্নাছে রাছুলান ওয়া কাফাঁ বিল্লাহি শাহিদান, মাইয়েতের রাছুলা ফাকাদ আতাল্লাহ” অর্থাৎ – এবং আমরা তোমাকে মানুষদের জন্য প্রেরণ করেছি রাছুল রুপে, এবং সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট ; (যদি) কোনো ব্যক্তি রাছুলের আনুগত্য করলো, সুতরাং অবশ্যই সে আল্লাহরই আনুগত্য করলো (সুরা নেছা ৭৯-৮০ আয়াত)। এ আয়াত দ্বারা বুঝা গেল রাছুলের আনুগত্য, অনুসরণ এবং মহব্বতই হলো আল্লাহর আনুগত্য বা অনুসরণ বা মহব্বত – এ বিষয়টি নিয়ে কোনো দ্বিমত পোষন করার কোনো অবকাশ নেই। কারণ, আয়াতে ‘অবশ্যই’ কথাটি রয়েছে যেনো কেউ তাতে কোনো প্রকার সন্দেহ-দ্বিমত পোষন না করে।
রাছুলকে ছেড়ে যারা আল্লাহর অনুসরণ করছে বা আল্লাহর আনুগত্য করছে বলে দাবী করছে তারা পথভ্রষ্ট। আল্লাহ, রাছুল ও মুমিনগনকে ভালোবাসার মধ্যে মুক্তির শর্ত নিহিত [সুরা মায়েদা-৫৬ আয়াত]। এ ব্যাপারে বিতর্ক করলে কাফের [সুরা ইমরান-৩২ আয়াত]। আল্লাহ, রাছুল ও মুর্শিদের (উলিল আমরের) আদেশ মান্য করা ফরজ [সুরা নেছা-৫৯ আয়াত]। রাছুলের হাত আল্লাহরই হাত এবং রাছুলের হাতে বায়াত মানে আল্লাহরই হাতে বায়াতই বলে বিশ্বাস করা ফরজ [সুরা ফাত্তাহ-১০ আয়াত]। রাছুলের ওপর ঈমান না থাকলে দোযখে ঠিকানা [সুরা ফাতাহ-১০ আয়াত]। রাছুলেন আনুগত্য হলেই দয়া প্রাপ্ত হবে [সুরা নূর-৫৬ আয়াত]। মুমিনের নিকট নবী মোহাম্মদ রাছুল নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় [সুরা আহযাব-০৬ আয়াত]। সমস্ত সম্মান আল্লাহর, তাঁর রাছুলের এবং মুমিনগনের, কিন্তু মুনাফিকগন তা বুঝে না [সুরা মুনাফেকুন-০৮ আয়াত]। আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ রাছুলের ওপর দরুদ প্রেরণ করেন তথা তাঁর হাবিবের সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে দায়েমীতে কায়েম আছে ফেরেশতাসহ [সুরা আহযাব-৫৬ আয়াত]। নিশ্চই আল্লাহ চাহেন যে, তিনি তোমাদের [আহলে বাইয়েতের] অপবিত্রতা দূর করেন এবং তোমাদেরকে পাক সাফ রাখেন [সুরা আহযাব-৩৩ আয়াত]। বলো আহ্বানের উজরত হিসেবে আত্মীয়দের [আহলে বাইয়াতের] সৌহার্দ্য ছাড়া আর কোনো প্রতিদান চাই না [সুরা শুরা-২৩ আয়াত]। হে নবী পরিবার [আহলে বাইয়াত] তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ [সুরা হুদ-৭৩ আয়াত]। এবং আল্লাহর রজ্জুকে [আহলে বাইয়েতকে] দৃঢ়ভাবে ধরো [সুরা ইমরান-১৩০ আয়াত]। এখানে অনেক ক্ষেত্রে আয়াতের ভাবার্থও উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরো অনেক আয়াত এ বিষয়ে কোরানে বিধৃত আছে।
‘পাক পাঞ্জাতন’ কথাটি আমাদের সাধারন সমাজে এমনকি চৌদ্দ আনা আলেম (?) সমাজেও পরিচিত নয়। এর কারণ হলো, রাছুলে করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের ওফাত লাভের পরে মুনাফিক মুয়াবিয়ার আমল হতে রাছুলে পাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের আহলে বাইয়েতের বিরুদ্ধে তথা দ্বীনে মোহাম্মদী বা দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের ধারা বর্তমান কাল পর্যন্ত চালু আছে এক শ্রেণীর আলেম নামধারী জালেমদের দ্বারা, সংখ্যায় তারা এবং তাদের অনুসারীগণ বাহাত্তুর কাতার। যার পরিপূর্ণ সূচনা হয় মুয়াবিয়া ও তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী পুত্র ইয়াজিদ এবং তার পোষা বেতনভুক্ত আলেম-মোল্লাদের দ্বারা, যাদের বংশধর অদ্যাবধি বিদ্যমান। যার ইতিহাস বর্ণনা সামনে দেয়া হবে। ‘পাক’ অর্থ পবিত্র বা পরিশুদ্ধ বা সাফা, ‘পাঞ্জাতন’ অর্থ পাঁচটি তন অর্থাৎ পাঁচটি শরীর বা অস্তিত্ব। কাজেই পাক পাঞ্জাতন মানে পবিত্র পাঁচটি শরীর বা ব্যক্তি তথা হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম, মাওলা আলী হযরত ফাতেমাতুজ্জাহরা, ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম। “আয়াতে তাৎহির” মোতাবেক রাছুলে পাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের আহলে বাইয়েত বা আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন পবিত্র চারজন এবং হাবিবে খোদাকে নিয়ে হলো পাক পাঞ্জাতন। “সৃষ্টির মূল ধারক-বাহক হলো পাক পাঞ্জাতন এবং তাঁর নবুয়তী সুরত হলো উক্ত পাঁচজন। তাঁদের বেলায়েতী রূপ সমগ্র সৃষ্টিব্যাপী স্থিত আছে এবং তাদের সেই স্থিতবস্থা হতে উপস্থিত রূপ হলো নবুয়তী সুরত।”
রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালাম তাঁর আহলে বাইয়েত সম্পর্কে তথা তাদের শান, মান-মর্যাদা বা ফজিলত সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কালাম বলে গেছেন। যদিও নবীজির ওফাতের (ওফাতের বিপরীত কোনো শব্দ নেই অর্থাৎ যেমন ছিলেন তেমনই আছেন) পর তাঁর অনেক কালাম (হাদিস) বিকৃত করা হয়েছে যা ছিল আহলে বাইয়েতের শানে বর্ণিত।
“আন্না আলিউন মাওলাল মু’মিনিন” অর্থাৎ আলী মুমিনদের প্রভু এ কথাটি সূরা মায়েদার ৬৭ নম্বর আয়াতে যুক্ত ছিল বলে ইবনে আবি হাতেম রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু বর্ণনা করেছেন আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ত’য়ালা আনহু হতে। ইবনে মারদূইয়া ইবনে ওমরু রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন যে, আমরা নবীজির সময় সুরা মায়েদার ৬৭ আয়াতে “আন্না আলীউন মাওলাল মুমিনিন” এ অংশটি পড়তাম। হযরত ওসমান যখন কোরআন সংকলন করেন সে সময় অনেক আয়াতেরই আংশিক বাদ দেয়া হয়েছিল। কোনো কোনো মুফাচ্ছেরগণ বলেছেন এ ধরনের আয়াতের সংখ্যা প্রায় তিনশতের মতো হবে। “আসরারুল কোরআন” বইটিতে এ বিষয়ে আলোচনা করা আছে। আয়াতের সংখ্যা নিয়েও পরবর্তীতে বিস্তর মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। হযরত আলী, আবু হুরায়রা, হযরত আয়েশা আরো কয়েকজন হতে বর্ণিত কোরানের আয়াত সংখ্যার মধ্যে অনেক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কেউ স্বীকার না করলেও ইহা চরম সত্য যে, কোরান সংকলনের বিষয়ে ব্যক্তিস্বার্থ, প্রতিহিংসা, নিজেদের মধ্যে মতভেদ এবং স্বীয় পছন্দ-অপছন্দের বেশ প্রভাব পড়েছিল, ইতিহাসে বা তাফসীর গ্রন্থসমূহে তার যথেষ্ট নজীর রয়েছে। আল্লাহপাক মানুষকে নিজেই কোরান শিক্ষা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠাচ্ছেন সেই আল্লাহ কর্তৃক শিক্ষা দেয়া কোরান হতে মানুষ বিম্মৃত রয়েছে।
প্রবন্ধ – বাইয়াত প্রসঙ্গ
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
কালের পরিক্রমায় অন্যান্য সকল ধর্মের মতোই মোহাম্মদী ইসলামের ওপরও পতিত হয়েছে ধর্মহীন অসুরচক্রের কালো হাত। যারা ধর্মের অভ্যন্তরে বাস করে ধার্মিক সেজে বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে ধর্মের। মহানবী (সা) এর জীবৎকালে পরাজয়ের নিদারুন জ্বালা বুকে লুকিয়ে রেখে বিষ-জিহ্বা মুখে পুরে যারা শামিল হয়েছিল ইসলামের পতাকাতলে, তারা নবী (সা) এর দেহত্যাগের মুহুর্ত হতেই শুরু করে দেয় তাদের বৈরী আচরণ। পর্দার অন্তরাল থেকে বেড়িয়ে আসে তাদের চিরাচরিত কদর্য রূপ। তখন থেকেই তারা মেকী ধার্মিকতার আড়ালে শুরু করে ইসলামকে জীবন্ত কবর দেয়ার দূরভিসন্ধি। রাষ্টীয় ক্ষমতা বরাবরই ছিল তাদের দখলে। মূল ইসলামকে জগৎ হতে চির বিসর্জন দেয়ার নিমিত্তে সেই মুনাফিক গোষ্ঠী (যারা বরাবরই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ) ইসলামের প্রতিটি পবিত্র সার্বজনীন এবং মানব মুক্তির বিধান কে করেছে রদবদল। প্রকৃত ইসলামকে লুকিয়ে প্রচার করেছে তাদের তৈরী এক ইমিটেশন মার্কা অপ-ইসলাম।
তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময়ে উদ্ভুত ধর্মের ছদ্মাবরণে বাস করা বিভিন্ন অপশক্তি বার বার ইসলামের তথা চিরমুক্তির পবিত্রতম বিধান আত্মসমর্পন তথা বাইয়াতের বিধান নিয়ে তৈরী করে যাচ্ছে নানা রকম বিতর্ক।
দ্বীন ইসলাম একটি সার্বজনীন বিধান। চিরন্তন এবং শ্বাশত কালের ধর্ম। যেখানে স্বয়ং খোদা প্রতিটি যুগে যুগে প্রতিটি কওম বা জাতিতে প্রতিটি ভাষায় রাছুল পাঠাচ্ছেন পতিত মানব সমাজকে সত্য সুপথ দেখানোর জন্য। যারা যুগের রাছুল বা ইমাম কে লাভ করতে সক্ষম হচ্ছেন তারাই পাচ্ছেন সত্য সুপথ আর যারা শয়তানের প্ররোচনায় প্রেরিত মানুষ গুরু তথা রাছুলদেরকে অস্বীকার করে মিথ্যা কল্পনায় শূণ্যে অবস্থিত কোনো অদৃশ্য সত্ত্বার ইবাদত করছেন তারাই হচ্ছেন পথভ্রষ্ট। এক শ্রেণীর মোল্লা-মৌলবীগন তাদের অপশিক্ষার জোরে সমাজে প্রচার করে বেড়াচ্ছেন যুগের রাছুলকে অস্বীকার করে অদৃশ্য আল্লাহর ইবাদত করলে নাকি জান্নাত লাভ করা যাবে। এরা ইবশিলের যোগ্য উত্তরসূরী। যুগে যুগে ধর্মবিধান প্রচার হচ্ছে আল্লাহ প্রেরিত অবতার বা মুক্ত পুরুষদের মাধ্যমে। যাদের আমরা বলি শুরু বা মুর্শিদ বা পীর। এদের দেখানো পথে চলাই ধর্ম। বাকী সব অধর্ম।
গুরু,মুর্শিদ বা পীর যিনি যুগে যুগে আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি বলে মানুষকে পথ দেখায় তার অনুসরণকারীকে বলা হয় মুসলমান। বাকীদেরকে মুসলমান হতে বলা হচ্ছে মুর্শিদের অনুসরণ করে।
প্রতিটি মুসলমানের প্রতিদিনের অবশ্যপাঠ্য কালাম সুরা ফাতেহায় সে প্রার্থনাই করা হচ্ছে “তোমার নিয়ামত প্রাপ্ত যারা তাদের পথে আমায় পরিচালিত করো” বলে।
জেনে রাখা দরকার, ইসলাম কোনো পৈত্রিক ধর্ম নয়। বাপ দাদার দেখাদেখি ধর্ম করলে সেটাকে ধর্ম বলা যাবে না। ইসলামে প্রবেশ করতে হবে আল্লাহর অনুমতি নিয়ে আল্লাহর দেখানো পথে অর্থাৎ পীর মুর্শিদ বা গুরু তথা রাছুল সত্ত্বার অধিকারী মুক্ত ও পবিত্র মানুষের হাতে হাত রেখে বাইয়াত তথা অঙ্গীকার গ্রহণ করে নিজেকে সমর্পন তথা বিলীন করে দিয়ে। নতুবা তাকে মুসলিম বলে স্বীকৃতি দেয়া যাবে না।
জেনে রাখা দরকার-বাইয়াত শব্দের আভিধানিক অর্থ বিক্রি হওয়া। আনুগত্য স্বীকার করা, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া ইত্যাদি। ব্যবহারিক অর্থে “বাইয়াত মানে হলো রাছুলের নিকট তথা ইনছানুল কামেল বা ওলী, মুর্শিদের নিকট আমিত্ব সমর্পন করে সম্পূর্ণরুপে ধর্মে দাখিল হওয়া।”
যুগের রাছুল বা প্রেরিত মুর্শিদ গুরুর অনুসরণেই আসবে কাক্সিক্ষত মুক্তি ও প্রতিপালিত হবে ধর্ম। মানবমুক্তির বিধান কোরআনে এর বারংবার স্পষ্ট আদেশ থাকলেও এক শ্রেণীর স্বার্থান্ধ বা তথাকথিত মোল্লা-মৌলবী নামধারী গোঁয়ার গোবিন্দদের অপপ্রচারের ফলে বাইয়াত এর স্পষ্ট বিধানটি জনসম্মুখে বিতর্কিত বলে উপস্থাপিত হচ্ছে।
চলুন, কোরআনের আয়াতগুলো দেখে আসা যাক-
সুরা নাহল ৩৬, সুরা ইব্রাহিম ০৪, সুরা রাদ ০৭, সুরা ফাত্তাহ ১৯,২৯, সুরা নিসা ১৩, ৮০, ১৫০,১৫১, সুরা ইমরান ৩১, ৩২, ১৩২, সুরা হুজরাত ০২, সুরা তওবা ৬৯, সুরা আহযাব ৩৬, ০৬, ৫৬, সুরা নূর ৩৫, ৬২, ৬৩, সুরা মুমিনুন ২৪, সুরা ফুরকান ৫৯, সুরা ইউনুস ৪৭,১০০, সুরা কাহাফ ৭০, সুরা বাকারা ১৫৪, সুরা আরাফ ১৮১, ১৯৮ ইত্যাদি।
ইসলাম ধর্ম আত্মসমর্পনের ধর্ম। যেখানে নিজের আমিত্বকে পুরোপুরি ত্যাগ করে ওলী, গুরু, মুর্শিদ বা পীরের নিকট বাইয়াত গ্রহন করে নফসানিয়াতের খায়েশমুক্ত পবিত্র জীবন যাপন করতে হয়। সমগ্র কোরআন জুড়েই যার স্পষ্ট বিধানাবলী এবং দলিল উপস্তিত। যেমন-আল্লাহপাক রাছুল (সা) কে বলছেন, হে রাসুল আপনার হাতে হাত দিয়ে যারা বায়াত গ্রহন করে তারা নিশ্চয়ই আল্লাহর হাতে হাত দিয়ে বায়াত হয়। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর। (ফাত্তাহ ১০)। এবং এ বায়াত যারা ভঙ্গ করে তাদের জন্য আল্লাহ উচ্চারণ করেছে কঠোর হুশিয়ারী। বাইয়াত গ্রহণকারীদের ওপর আল্লাহ সন্তষ্ট বলে জানিয়ে দিচ্ছেন (সুরা ফাত্তাহ ১৮) নং আয়াতে।
আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য উসিলা অন্বেষণের আদেশ দেয়া হচ্ছে কোরআনে। (সুরা মায়েদা ৩৫) আয়াত।
আল্লাহর রাব্বুল আলামিন মুসা নবীকে বেলায়েতের গোপন রহস্য/ইলমে লাদুন্নী জানার জন্য পাঠালেন হযরত খিজিরের নিকট এবং নবী হযরত খিজিরের নিকট বাইয়াত হলেন। (সুরা কাহাফ ৬৬-৬৯)।
(সুরা নিসা ৫৯) আয়াত আল্লাহ স্পষ্ট বলছেন যুগের কামেলীন পীরের তথা উলিল আমরের আনুগত্য করতে। কামেলীনদের স্বান্নিধ্যকে উত্তম বলা হয়েছে কোরানে। (নিসা ৬৯)।
আল্লাহ পাক তাদের অনুসরণ করতে বলছে যারা মানুষের নিকট কোনো বিনিময় কামনা করে না অথচ তারা সুপথ প্রাপ্ত (সুরা ইয়াসিন ২১)। বিশুদ্ধ চিত্তে যে সকল মহাপুরুষ আল্লাহর অভিমুখি হয় তথা ওলী আউলিয়া হয় তাদের অনুসরণ করার জোর করার তাগিদ দেয়া হচ্ছে কোরানে (সুরা লোকমান ১৫)।
হাশরের মাঠে যখন প্রত্যেককে তাদের নেতাসহ আহ্বান করা হবে (সুরা বনী ইসরাইল ৭১) তখন আপনাপন মুর্শিদের পতাকা তলেই দাড়াবে ঈমানদারগণ। অনুমান কল্পনা সেদিন কোনো কাজেই আসবে না।
আল্লাহ যাকে পথহারা করেন সে মুর্শিদের সন্ধান পায় না (সুরা কাহাফ ১৭)।
প্রতিশ্রুতি প্রাপ্তরা হাশরের সুপারিশ করতে পারবে (সুরা মারঈয়াম ৮৭)। তোমরা যদি না জানো তবে যে/যারা জানেন তাদের নিকট হতে জেনে নাও (আম্বিয়া ৭)। হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সাদেকিন/সত্যবাদীদের সঙ্গী হও (তাওবা ১১৯)। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক এর রহমতে আউলিয়া কেরামের নিকটবর্তী (আরাফ ৫৬)।
সাবধান, আল্লাহর অলিগনের ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও নহে (ইউনুস ৬২)। হে নবী, আপনার নিকট যদি নারীরা এ শর্তে বাইয়াত হতে আসে যে তারা শিরক করবে না, চুরি, যিনা, সন্তান হত্যা করবে না, অপবাদ রচনা করবে না, ন্যায্য ব্যাপারে আপনার অবাধ্যতা করবে না, তা হলে আপনি তাদের বাইয়াত কবুল করুন (মুমতাহিনা ১২)।
পীর কে আরবীতে বলা হয় মুর্শিদ যার অর্থ পথপ্রদর্শক। এদেরকেই উম্মতের শ্রেষ্ঠ দল বলা হচ্ছে সুরা আরাফের ১৮১ নং আয়াতে । যাদের অনুসরণের মাধ্যমেই প্রত্যেককে পূর্নরূপে ইসলামে দাখেল হতে বলা হচ্ছে কোরানে। যার পথপ্রদর্শক নেই তার পথপ্রদর্শক হলো শয়তান। এবং চিরকাল ধরে শয়তানের অনুসারীরাই মুক্তিদাতা মুর্শিদের তথা বাইয়াতের বিরুদ্ধে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অপপ্রচার।
মকতুবাতে সাদী কিতাবে বলা হয়েছে “উম্মতের জন্য যেমন নবী, কওম বা জাতির জন্য তেমন শায়েখ বা মুর্শিদ”।
বাইয়াতবিহিন ব্যক্তির মৃত্যুকে জাহিলিয়াতের মৃত্যু বলা হয়েছে পবিত্র হাদিস শরীফে বোখারী এবং মেশকাত)। আরো বলা হয়েছে বায়াত ভঙ্গকারীর পরিণাম জাহান্নাম (বোখারী )। বায়াত ভঙ্গকারীর দিকে আল্লাহ তাকাবেন না (বোখারী)। শত শত হাদিসে উল্লেখ রয়েছে সাহাবীদের বাইয়াতের নজীর। উম্মতের সকল গাউস কুতুব পীর মাশায়েখ ওলী আউলিয়া সকলেই বাইয়াত গ্রহণ করেছেন ও উম্মতের থেকে বাইয়াত নিয়েছেন। বাইয়াত প্রসঙ্গে তাদের বাণীসমূহ উল্লেখ করলে রীতিমতো একটা কিতাব হয়ে যাবে।
উম্মতের মধ্যে একদল মুনাফিক যারা মূলতঃ মুয়াবিয়া এজিদ বা আবু জাহেল আবু লাহাবের প্রেতাত্মা তারাই দ্বীন ইসলামের শাশ্বত বিধান বাইয়াতের শানে জাল হাদিসের সম্ভার সাজিয়ে বিভিন্ন ভাবে কু-প্ররোচণামূলক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য দিয়ে থাকে। এরা ধর্মবিরোধী চক্র যারা ধর্মের প্রকৃত চিরন্তন শান্তির রূপকে কদর্যমন্ডিত করার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার নিমিত্তে বাইয়াতের তথা ওলী মুর্শিদ বা পীর গুরুদের বিরুদ্ধে হীন অপপ্রচার চালাচ্ছে।
দেশ ও জাতিকে তাদের অপপ্রচার থেকে সাবধান থাকার জন্য অনুরোধ করা হলো।
কবিতা – সাম্যবাদী
কাজী নজরুল ইসলাম
গাহি সাম্যের গান –
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান!
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান।
গাহি সাম্যের গান!
কে তুমি?-পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল গারো?
কন্ফুসিয়াস? চার্বআখ চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!
বন্ধু, যা-খুশি হও,
পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,
কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-
জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, যত সখ-
কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?
দোকানে কেন এ দর কষাকষি? – পথে ফুটে তাজা ফুল
তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ!
তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,
তোমার হৃদয় বিশ্ব-দেউল সকল দেবতার।
কেন খুঁজে ফের’ দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি-কঙ্কালে?
হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে!
বন্ধু, বলিনি ঝুট,
এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।
এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুয়া, বৃন্দাবন,
বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
মস্জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়
এইখানে ব’সে ঈষা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
এই রণ-ভূমে বাঁশীর কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,
এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।
এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি’।
এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহ্বান,
এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!
কবিতা – রূপ-নারানের কূলে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রূপ-নারানের কূলে
জেগে উঠিলাম,
জানিলাম এ জগৎ
স্বপ্ন নয়-
রক্তের অক্ষেরে দেখিলাম
আপনার রূপ,
চিনিলাম আপনারে
আঘাতে আঘাতে
বেদনায় বেদনায়;
সত্য যে কঠিন,
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,
সে কখনো করে না বঞ্চনা।
আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন,
সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করিবারে,
মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ ক’রে দিতে।
সংগীত – গোলোকধাম
লেখক – ফকীর আতিকুর রহমান
অখন্ড গোলকের হাল বর্ণনা কি হয়
গোলে গোলমাল সবই বেসামাল
অসীম কে সীমায় কি বলা যায়।
অখন্ড গোলকধামে স্থান-কাল নাই
শুধুই শূন্য অনন্ত শক্তিময়
যেন নিঃশব্দ সিন্ধু, তাতে অনন্ত বিন্দু
হরকতে শব্দ কুন নূর জালালী হয়।
প্রেমচক্রেতে দুই অক্ষরে দুই দরিয়া বহে
আধা অক্ষর মাঝখানে বরযোখ বরাবরে
গেলে সুবাতাস ধরে, ঐ উজানী নগরে
গোলকের গোসাই তারে সালাম জানায়।
গোলকের জ্যোতিতে জাহান গুলে গোলজার
জাহানী সৃষ্টি যত সবই গোলাকার
ফকীর আতিক বলে গোলবাজারে, বললে কথা বুঝেনারে
মোহমুক্ত অখন্ডধাম গোলক মৃত্যুঞ্জয়।
কবিতা – আপন খবর
লেখক – দাউদ আহমেদ চিশতী
আপন খবর প্রকাশিতে প্রভুর হলো অভিলাষ
আপন খবর আপনি জেনে, ফুকেন আপন নভঃশ্বাস।
আপন খবর স্বীকৃতি দেয় দান করে আপন দম
আপন খবর জানতে হলে, হুশ রাখিও দম কদম।
আপন খবর জানলো প্রভু মান আরাফায় করে ধ্যান
আপন খবর আপনি জেনে, হারায় প্রভু নাছুত জ্ঞান।
আপন খবর লা ইলাহা বস্তুবাদী এই অজুদ
আপন খবর ইল্লাল্লাহ, লা ইলাহাতেই রয় মজুদ।
আপন খবর পাঠায় প্রভু, বারো হরফ জাত সিফাত
আপন খবর জানলো যেজন, জাতে মিশে হয় ওফাত।
কবিতা – সবুজ শতদল
লেখক – আরিফুল ইসলাম
মহাকাল চক্র, সতত বক্র গতিতে ধায়,
ওরে অগ্নিঋষি দানি পুষ্পের হাসি
হিয়াতলে বসি, চির চাওয়া শশী, সবুজে শুধায়।
দে না প্রাচীন চূর্ণি, বায়ু ঘূর্ণি-ঘন যৌবনে,
গড় নব বিশ্ব, চির অবনত শীর ওঠাক, বাচুক নিঃস্ব
মরু বাদলে সবুজ শতদলে, সিনাম মশগুল মৌ-বনে।
শের-এ-খোদার লভিয়া দ্বার, ছোটাস বিজলী তরবারি,
আসুক অন্ধ অরিজনা নরকের কীট আবর্জনা
আজি নিঙড়ে আগুন, আনলি দ্বিগুন বারি।
হে সবুজ দুর্বাসা, বাধলি বাসা, রুদ্র তড়িৎ বৈশাখে
চকিতে কোন আনলি বেণু ব্রজের রাখাল চড়ায় ধেনু
তিমির নাশি, ওঠোনি ত্রাসি, জাগিছ কদম্বের শাখে শাখে।
অসহায় ধরনী গিরি সঙ্কট, বজ্র-বহ্নি বহে বিকট ঐ,
জাগো দুর্বল ভাঙ প্রাচীর তরুণ ধরালো গগনে চিড়।
আয় ছুটে সবে, যৌবন উৎসবে, উল্কার গল্কার মাভৈ মাভৈ।
এস অরন্দিম, এস হরদম, এস তনু বাগে,
তব পূণ্য অভিযাত্রা জগতে জাগে নব মাত্রা
দেখ প্রাণ খুুলে, সজ্জিত ফুলে ফুলে, বিশ্ব বিধি জাগে।
গগন ডোবানো ভূবন ভাবানো সৃষ্টির মাঝে তিনি,
মহাসবুজের চির অভিযান হৃদ-হেরাতে হাকিছে আযান
ছিন্ন কন্ঠে কাঁদি, নাহি অন্ত আদি, চিনিগো তোমা আজি চিনি।
সংগীত – আমাকে পাবো বলে
লেখক – মাওলানা মোফাজ্জল হোসাইন চিশতী
আমাকে পাবো বলে খুজে বেড়াই আমায় আমি
আপন ইস্কে আশেক হয়ে, সদায় থাকি পেরেশানি।
গুপ্তগঞ্জে শান্ত মনে, ছিলাম আমি হু এর সনে
এরাদায় ঘুরে নয় বতুনে, জহুর হই বদন এমকানি।
আমি হই গোপনের গোপন, আমা হতে সকল সৃজন
আমার নূরে সব নূরীতন, আলো আধার দিবস যামী।
জাত সেফাতে হয়ে মিলন, আমি করি প্রেম আস্বাদন
অন্ধে না পেল অন্বেষণ, আত্মতত্ত্বে যে জন ভ্রমি।
হযরত রশীদ শাহ কয় মোফাজ্জলরে, খুদি বদি দাওগা ছেড়ে
ডুবে দেখো রুপ সাগরে, কেবা আমি কেবা তুমি।
সংগীত – সাজাও নিজেরে
লেখক – হান্নান শাহ চিশতী
সাজাও নিজেওে কামেল মুর্শিদেও মতে
হইয়া একমত, রুজু হও, মুর্শিদেও সাথে।
গুরুধ্যানে সদা থাকো নিরিখ নিরুপনে
বরযখ ধওে রহো ধ্যানে সদা সর্বক্ষণে।
আধার মাঝে রুপের বাতি জ্বালে দয়াময়
ঐ রুপেতে আঁখি দিয়া, হওগো নিত্যময়।
গুরুধ্যানে থাকে যেজন সফল জনম তার
গুরু অজ্ঞে অজ্ঞ দিয়া, রহে অনিবার।
উানাফিশ শায়েখে ধরো সদা পীরের ধ্যান
রাছুল আল্লায় ফানা হয়ে হওগো সমর্পন।
কবিতা – জীবন নদীর মাঝি
লেখক – আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস
আমার জিবন নৌকার মাঝি
খুঁজি আমি খুঁজি রে,
তাঁরে আমি খুঁজতে গিয়ে
পথে পথে ঘুরিরে।
আকাশ পাতাল মর্ত লই
খুঁজতে খুঁজতে পাথার পেরুই,
দমে দমে ডাকি দয়াময়
জীবন নৌকার মাঝি কোথায়?
অতল সাগওে ডুবি উঠি
ঢেউয়ের তোড়ে না পাই দিঠি,
জীবন নৌকার মাঝি কইওে
ত্বরাও আমায় অকূল সাগরে।
হৃদয় হতে যেন শুনি –
জীবন সিন্ধু তীরে বাজে ধ্বনি,
যার হাতে এ ভুবনের ভার
সেই তো করবে পারাপার।
সম্পাদকীয় – পরমপ্রাপ্তির বাসনা
লাবিব মাহফুজ চিশতী
পরমপ্রাপ্তির বাসনা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। সংবেদনশীল মানুষের হৃদয়ে তাই সর্বদাই অনুরণিত হয় প্রভুসত্ত্বার চিত্তগ্রাহী সুরধ্বনি। সে সুওে আবিষ্ট হয়ে কেউ কেউ শুরু করে সেই পূর্ণতম সত্ত্বাকে জানার, চেনার, লাভ করার দুর্গম পথে অভিযাত্রা।
জ্ঞানীগণ তাকে চিনে থাকেন নিজেকে চেনার মধ্যে দিয়ে। কারণ, মানুষেই প্রভুর সম্যক পরিচয় নিহিত। মানুষ সত্ত্বার জাগরণেই উন্মোচিত হয় প্রভুসত্ত্বার আগমনের দ্বায়। মানুষ মোহনাতেই মূর্ত হয়ে উঠেন পরম প্রেমোময়। তাই নিজেকে চিনলেই হয় প্রভুকে চেনা। নিজের পরিশুদ্ধ আপনত্বকে প্রাপ্ত করলেই হয় পরমপ্রাপ্তি।‘আপন খবর’ লাভ করলেই পাওয়া যায় মহিমাময় প্রভুর খবর।
যুগে যুগে এ প্রাপ্তি সম্ভব হয়েছে প্রভুপ্রাপ্ত তথা পূর্ণতম অস্তিত্বেও অধিকারী অবতার-রাছুল বা মহাপুরুষদেও প্রদর্শিত পথে। যাদেরকে আমরা গুরু বা মুর্শিদ বলে থাকি। তাদের দেখানো পথেই রয়েছে সেই চিরনিত্য পরমসত্ত্বা এবং তাদের মাধ্যমেই মানুষ স্থিত হবে চির শান্তি, চির মুক্তির, নিত্যপ্রেমের অমর লোকে।
নিত্যময়তা প্রাপ্তির পথের দিশারী ‘আপন খবর’ স্ব-মহিমায় চির ভাস্বও থাকুক চিরকাল, প্রতিটি পরম-প্রত্যাশী অনুরাগীর ধ্যানে, চিন্তনে ও মননে।
বাণী সংকলন
1. বেশি পরিমাণে ইবাদাত থাকার চেয়ে বেশি পরিমাণে জ্ঞান থাকা ভাল। আর তোমাদের ধর্মের সবচেয়ে ভাল অংশটুকু হল, করুণা, সহমর্মিতা, মায়া, আত্মনিয়ন্ত্রণ।
– মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)
2. হে মানুষ! ওঠো! দাড়াও! পতিত হওয়া তোমার স্বভাবজাত নয়। জ্ঞানের আলোকবর্তিকা শুধুমাত্র তোমাকেই দেওয়া হয়েছে যা দিয়ে তুমি সকল অন্ধকূপ এড়িয়ে যেতে পারো।
– অথর্ববেদঃ ৮.১.৬
3. আমি আছি তোমার সঙ্গে চিন্তা কেনো তোমার, একবার ডাকো, দেখবে সারা পাবে আমার।
– হযরত ঈসা (আ)
4. যে ব্যক্তি মানুষকে ভালোবাসে, সে দুঃখের দ্বারা ঘিওে থাকে এবং যে কাউকে ভালোবাসেনা, তার কোনো সংকট নেই।
– গৌতম বুদ্ধ
5. আল্লাহর জিকিরের অর্থ হলো, তাকে স্মরণ করতে করতে অন্য যে কোনো বস্তুকে একদম ভুলে যাওয়া।
– ইমাম জাফর সাদিক (র)
6. যে লোক আল্লাহকে চিনছে, তার কাছে কোনো কিছুই গোপন নেই। আর তার মাধ্যমেই আল্লাহকে জানা সম্ভব।
– খাজা ওয়ায়েস করণী (র)
7. বহিরঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা দ্বারা জান্নাত লাভ করা যায় না। দরকার মনের একাগ্রতা ও কঠোর সাধনা।
– হযরত খাজা হাসান বসরী (রা)
8. প্রেমিকের কাছে মারেফতের ছোট একটি বিন্দুও জান্নাতের লক্ষ লক্ষ বালাখানার থেকেও উত্তম।
– হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (র)
9. সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী তিনিই, যিনি আল্লাহর সত্ত্বা বিষয়ে জ্ঞান রাখেন।
– হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (র)
10. যদি সহস্র কিতাবও পাঠ করা থাকে তবু তাকে আলেম বলা যাবে না যদি তার ইলমে মারেফত জানা না থাকে ।
– বড়পির হযরত আবদুল কাদিও জিলানী (র)
11. মানুষ যখন আমিত্বেও খোলস ত্যাগ করে, তখন নিগুঢ় ভাবে চিন্তা করলে দেখবে প্রেম, প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ সবই এক।
– হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র)
12. হে মানবগণ, শীঘ্রই অন্তর্বাহ্যে পবিত্র হইতে চেষ্টা করো।
– হযরত কওসার আলী শাহ (র) (জিন্দাশাহ)
13. সদা চৈতন্য যারা, বেঁহুশে রয় না তারা, সদা দেয় রুপের পাহারা সাধু যারা।
– দেওয়ান শাহ আব্দুর রশিদ চিশতী (র)
14. আল্লাহ যাহাকে যে অবস্থায় রাখেন সেই অবস্থায় শুকরিয়া আদায় করুন। শুকর সবর ধৈর্য। চোখ-কান খোলা রাখুন-দেখবেন, শুনবেন, বলবেন না। আপনা কাজ করুন। আল্লাহ বাজান বলেন, ভালো থাইকেন, আল্লাহ ভালো রাখবেন।
– হযরত লোকমান শাহ দরবেশ (র)
15. শারাব পিয়ো, কিতাব রাখো, কাবার ঘওে তালা দাও, তুমি দেবালয়ে বাস করো গিয়ে, যদি, মাওলার দীদার চাও।
– হযরত হারুন-অর-রশিদ (র) (হারুন শাহ)
16. তুমি চাও যদি মানুষে, ভক্তি রসের বাদাম দিয়া যাওনা সরল দেশে।
– হযরত ইয়ার আলম চিশতী (র)
17. কাবকাওসিন নসিরাতে নূরের ঝলক দেয় তিনি, মানব দেহ খুজলে পাবি নিশানী।
– হযরত গওহার শাহ চিশতী (র)
18. অচেতন রইলে সতী, পালাইবে প্রাণপতি
অসতী করিবে এসে যমদূত হায়,
যার ঘর সেই হওে নিজে মাল চুরি করে
অনর্থক আজরাইলে দোষী প্রমাণ হয়।
– হযরত শাহ আব্দুর রহিম ওয়ায়েসী (র)
19. পশুর আচরণ যদি মানুষেতে আসে
তবে তারে শ্রেষ্ঠ বলবে কি মানুষে?
কার্য্যে ও কথায় যখন না থাকিবে ভুল,
পরিগনিত তখনই মাখলুকাত আশরাফুল।
– হযরত শাহ পাগল হাসেম আল ওয়ায়েসী (র)
20. জ্ঞান মানুষের মধ্যে ঘেরা-
জাগাইলে জাগিবে জ্ঞান, জাগেনা তপস্যা ছাড়া।
– হযরত দেওয়ান সাদেক আলী চিশতী (রঃ)
21. যিনি পরকালের খবর ইহলোকের মানুষদের দিতে পারেন, তিনিই মুর্শিদ।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী
22. চির মুক্তি পাবি যদি, কায়মনে তুই মানুষ হ।
– হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী
23. যদি নিত্যধামে যেতে থাকে বাসনা, অনিত্য দেহ থাকিতে নিত্যের করণ হবে না।
– হযরত খাজা রজ্জব দেওয়ান আল চিশতী নিজামী
24. অচেনারে চিনতে হলে রে, বসো চেনা লোকের সনে
আল্লাহর আশেকান, বসো অলী আল্লাহর ধ্যানে।
– হযরত খাজা রজ্জব দেওয়ান আল চিশতী নিজামী
25. বেদ কোরান বাইবেল গীতা, সকলের মূল মুর্শিদ তোমার
ভজন করো তার রে মন, ভজন করো তার।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
26. মানুষ নিজেকে চিনতে পারলে তার স্রষ্ঠাকে চিনতে পারতো।
– হযরত মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবী
27. যদি তাওহীদ সাগরে নিজেকে ফানা করে ডুব দিতে পারো, তবেই সারাজিবনের মতো তুমি সেই মাশুক আল্লাহকে পাবে।
– হযরত জালালউদ্দিন রুমী
28. ইশকের বেদনা, জ্বালা যন্ত্রণা হাসিমুখে বরণ করে নিতে না পারলে পরমের দর্শন হয় না।
– হযরত আমীর খসরু
29. মুহাম্মাদ এবং আহাম্মদ দুটি নামে প্রভুর গোপন ভেদ নিহিত আছে। প্রভুর ভালোবাসায় তুমি সদা সিক্ত। তোমার অস্তিত্বের জন্যই সকল সৃষ্টি।
– নূরুদ্দিন মুহাম্মদ জামি
30. যারা আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করছে তারাই আল্লাহর বান্দা। তাদের সেজদাই কবুল হচ্ছে।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী
31. যদি তোমার খোদা জ্ঞান তোমার অস্তিত্বকে ভুলাইয়া না দেয়, তবে সে জ্ঞান হতে অজ্ঞানতাই শ্রেয়।
– হযরত হাকীম সানায়ী
32. কে ভগবান? আত্মজ্ঞান!
– কাজী নজরুল ইসলাম
মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ১ম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

