আপন ফাউন্ডেশন

২/৩ বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রা.) ০১

Date:

Share post:

লেখক – মোস্তাক আহমাদ

আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য প্রত্যেক মুমিনের তরিকত সাধনা তথা বায়াত গ্রহণ  ইসলামে অপরিহার্য বিষয় অথচ আমরা অজ্ঞতা ও ধর্মীয় গোড়ামীর কারণে এই মহান নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হয়েছি। আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য যুগে যুগে কালে কালে নবী রাসুল, অলি-আল্লাহ তথা পীর-মুর্শিদের হাতে বায়াত হয়ে লক্ষ লক্ষ মানব আল্লাহর মহান অনুগ্রহধন্য হয়েছেন। বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রা.) সেই তরিকত শিক্ষা ও সাধনারই মহান দিকপাল। সকল কুতুবের শিরোমণি হিসেবে তিনি বড়পীড় ও গাউসে পাক ‘মহিউদ্দীন’ খেতাবে অভিষিক্ত। তিনি বিশ্ব মুসলিম জাতির তরিকত শিক্ষা ও সাধনার পথ দেখিয়েছেন। এই শিক্ষা তিনি স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে লাভ করেছেন এবং প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের মনোনীত যুগপ্রতিনিধি হিসেবে অলি-আবদাল, গাউস-কুতুব, পীর-মাশায়েখদের বেলায়েতি মিশন বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেছেন।      

৫১১ হিজরীর কোন এক শুক্রবার দিন হযরত গাউসে পাক (রা.) নগ্নপদে বাগদাদ শহরের দিকে আসছিলেন। এমন সময় পথিপার্শ্বে একজন জরাজীর্ণ বৃদ্ধকে তিনি শায়িত অবস্থায় দেখতে পেলেন। উক্ত বৃদ্ধ সালাম দিয়ে হযরত গাউসে পাককে বললেন― ‘আমাকে ধরে তুলুন, আমি শক্তিহীন।’ হযরত বড়পীর সাহেব তাকে তুলে বসালেন। তখন উক্ত জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ ধীরে ধীরে জরামুক্ত হতে লাগলো এবং বললো― ‘আমি ইসলাম ধর্ম, লোকের কুসংস্কারে আমি দুর্বল হয়ে পড়েছি। আপনার সাহায্যে আমি নবজীবন লাভ করলাম।’ এ ঘটনার পর হযরত গাউসে পাক বাগদাদে প্রত্যাবর্তন করে কোন এক জামে মসজিদে জুমা পড়ার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করতেই লোকেরা তাঁকে ‘মহিউদ্দীন’ নামে সম্বোধন করতে লাগলো। তখন থেকেই তাঁর এগার নামের মধ্যে এক নাম হয় ‘মহিউদ্দীন’ বা দ্বীনের নবজীবন দানকারী। সত্যিই তাঁর অসংখ্য কারামত ও সংস্কারমূলক কাজই এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

তাঁর জন্মকালীন ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। হযরত গাউসুল আজম বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রা.) ৪৭১ হিজরীতে রমজান মাসের ১লা তারিখে সোব্হে সাদেকের কিছু পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেদিনই প্রথম রোজা পালন করেন। সারাদিন মাতৃদুগ্ধ পান করা থেকে বিরত থাকেন। সূর্যাস্তের পর তিনি মাতৃদুগ্ধ দ্বারাই ইফতার করেন।

গাউসে পাকের পিতা হযরত সৈয়দ আবু সালেহ মুসা জঙ্গী (র.) ও মাতা  সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমা (র.)-এর শুভ বিবাহের পর নিঃসন্তান অবস্থায় বহু বৎসর কেটে যায়। পিতা বৃদ্ধ, মাতাও বৃদ্ধা। সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমার বয়স তখন ৬০ বৎসর। এ বয়সে সাধারণতঃ সন্তান ধারণের ক্ষমতা থাকেনা। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে এ বয়সেই তিনি গর্ভে ধারণ করলেন জগত বিখ্যাত ও সর্বশ্রেষ্ঠ অলী গাউসুল আজম আবদুল কাদের জিলানী (রা.)-কে। হযরত গাউসুল আজম বড়পীর মায়ের গর্ভে আসার পরপরই শুরু হয় কারামতের অপূর্ব খেলা। প্রথম মাসেই বিবি হাওয়া (আ.) স্বপ্নে ধরা দিলেন সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমার সাথে। তিনি বলে গেলেন, তোমার গর্ভে গাউসুল আজমের আগমন হয়েছে। তুমি ধন্য। দ্বিতীয় মাসে বিবি সারাহ (আ.) এসে সুসংবাদ দিলেন তোমার ঘরে মারেফাত এর খনির আগমন হয়েছে।

তৃতীয় মাসে বিবি আছিয়া এসে সুসংবাদ দিলেন; তোমার ঘরে ভেদতত্ত্বের মালিক আগমন করেছেন। চতুর্থ মাসে বিবি মরিয়ম, পঞ্চম মাসে বিবি খাদিজা (রা.), ৬ষ্ঠ মাসে হযরত আয়েশা (রা.) এসে খবর দিলেন― তোমার ঘরে অলীকুল শিরোমণি আগমন করবেন। সপ্তম মাসে নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা (রা.) স্বপ্নে বলে গেলেন― উম্মুল খায়ের! তোমার ঘরে আমার বংশের নয়নমনির আগমন হচ্ছে। অষ্টম মাসে বিবি জয়নব, নবম মাসে বিবি ছকিনা (রা.) স্বপ্নে বলে গেলেন―  তোমার সন্তানের গুনে জিলানভূমি ধন্য হবে। এভাবে শুভ স্বপ্ন দেখতে দেখতে নয় মাস কেটে গেলো। দশম মাসের পহেলা রমজানের রাত্রির শেষভাগে সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ ধরে বিশ্বজগতকে আলোকিত করে ধরার বুকে আগমন করলেন গাউসুল আজম বড়পীর মহিউদ্দীন মুহাম্মদ আবদুল কাদের জিলানী (রা.)। তাঁর আগমনে ইসলাম পুনঃজীবন লাভ করলো।  

নবী করিম (সা.) হাদিসে বলেছেন― ‘শত্রুর সাথে জেহাদ করা হলো ছোট জেহাদ, কিন্তু নফসের বিরুদ্ধে জেহাদ করা হচ্ছে বড় জেহাদ।’ ষড়রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাসর্য) হচ্ছে নফস। একে নফসে আম্মারা বা কু-প্রবৃত্তি বলা হয়। এই রিপুগুলোকে নিয়ন্ত্রণ বা আজ্ঞাধীন করার জন্য যে সাধনা করা হয়, তাই তরিকতের শিক্ষা ও সাধনা। এজন্য একজন পীর বা মুর্শিদের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে সিদ্ধি লাভ করা যায় না। এজন্যই কোরআন মজিদে বার বার অলীদের সংশ্রবে থাকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ঈমান ও আমল ঠিক করার পর মুর্শিদ অনুসন্ধান করা কোরআন এর নির্দেশ ‘ওয়াবতাগু ইলাইহিল ওয়াছিলা’ এবং ‘ওয়া কুনু মাআছ ছাদেকীন’ দুটি আয়াতে পীরের নিকট বাইয়াত হওয়ার প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাছাড়া সুরা কাহাফের ১৭ নং আয়াতে অলী ও মুর্শিদের কথা সরাসরি বলা হয়েছে।   ―তাফসীরে রুহুল বয়ান

ইসলামে তরিকত শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমরা গাউসে পাক বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রা.) থেকে মহান শিক্ষা পাই। কারণ তিনি মাদারজাত অলী হওয়া সত্ত্বেও হযরত আবু ছাঈদ মাখযুমী (রা.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে কঠোর সাধনার মাধ্যমে গাউছিয়তে উজমা (গাউসুল আ’জম) মর্যাদা লাভ করেন। এই বাইয়াত রাসুল করিম (সা.)-এর সুন্নাত। ‘ইরগামুল মুরিদিন’ নামক আরবী গ্রন্থে লিখিত আছে― একজন জীবিত মুর্শিদের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করা সুন্নাত। হযরত গাউসুল আ’জম (রা.) পীরের হাতে বাইয়াত হওয়ার পর কঠোর রিয়াজতে মগ্ন হয়ে পড়েন। যখন উপযুক্ত সময় হলো, তখন তাঁর পীর-মুর্শিদ হযরত আবু ছাঈদ মাখযুখী (রা.) তাঁকে খেরকা (খেলাফতের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ পোষাক) পরিধান করিয়ে দেন এবং নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন। হযরত আবু ছাঈদ মাখযুমী (রা.) ৫১৩ হিজরীর ১লা মুহররম ওফাত প্রাপ্ত হন। কিভাবে তিনি খেলাফাত লাভ করেন তাঁর বর্ণনা তিনি নিজেই দিয়েছেন।

হযরত বড়পীর গাউসুল আ’জম (রা.) বলেন― ‘একদিন আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছিল। এমন সময় আমার পীর হযরত আবু ছাঈদ মাখযুমী (রা.) এসে বললেন― ‘তুমি আমার বাড়ি চলো।’ একথা বলেই তিনি নিজ বাড়িতে চলে গেলেন। কিন্তু আমার লজ্জাবোধ হওয়াতে আমি ইতস্ততঃ করছিলাম। এমন সময় খিজির আলাইহিস সালাম এসে আমাকে যাওয়ার জন্য তাগিদ করলেন। আমি পীরের বাড়ি গিয়ে দেখি― তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমাকে দেখে বললেন― ‘আবদুল কাদের! আমার বলাই কি যথেষ্ঠ ছিল না? আবার খিজির আলাইহিস সালামের বলার প্রয়োজন হলো! একথা বলেই তিনি আমার জন্য খাবার নিয়ে আসলেন এবং নিজ হাতে আমাকে খাওয়াতে লাগলেন। আমার শায়খের হাতের প্রতিটি লোকমায় আমার অন্তরে নূর ভরে যেতো। এরপর তিনি আমাকে খেরকা পরিধান করিয়ে দেন।’

উক্ত খেরকা পরিধান করার পর হযরত গাউসুল আ’জমের ওপর আল্লাহ তায়ালার নানাবিধ রহমত, বরকত ও তাজাল্লী অধিক পরিমাণে প্রকাশ পেতে লাগলো। এখান থেকে গাউসে পাকের তরিকত শিক্ষার সূচনা ও সাধনার পথ শুরু হলো। হযরত গাউসে পাকের পীর হযরত আবু ছাঈদ মাখযুমী (রা.) বাগদাদ শরিফের ‘বাবুশ শাইখ’ নামক স্থানে বাবুল আযাজ নামে একটি উচ্চমানের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইনতিকালের পূর্বে তিনি উক্ত মাদ্রাসার দায়িত্বভার গাউসুল আ’জমের ওপর অর্পণ করে যান। ৫১৩ হিজরী হতে আরম্ভ করে ৫৬১ হিজরীতে ইনতিকাল সময় পর্যন্ত গাউসে পাক উক্ত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত হতে অসংখ্য তালেবে এলেম এসে গাউসে পাকের নিকট কোরআন, হাদিস, তাফসীর, ফিকহ, নাহু ছরফ, আরবী সাহিত্য ও তাসাউফ শিক্ষা করে যুগবরেণ্য আলেম ও আল্লাহর মহান অলীয়ে কামেলে পরিণত হন। উক্ত মাদ্রাসা প্রাঙ্গনেই বর্তমানে গাউসে পাক বড়পীর এর মাযার শরিফ অবস্থিত। সুদীর্ঘ  ৯০ বছর হায়াত পেয়ে ৫৬১ হিজরীর রবিউস সানী মাসের ১১ তারিখে বাগদাদ শরিফে বর্তমান মাজার শরিফ সংলগ্ন খানকায় তিনি ইনতিকাল করেন।  

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

Related articles