লেখক – মোস্তাক আহমাদ
আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য প্রত্যেক মুমিনের তরিকত সাধনা তথা বায়াত গ্রহণ ইসলামে অপরিহার্য বিষয় অথচ আমরা অজ্ঞতা ও ধর্মীয় গোড়ামীর কারণে এই মহান নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হয়েছি। আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য যুগে যুগে কালে কালে নবী রাসুল, অলি-আল্লাহ তথা পীর-মুর্শিদের হাতে বায়াত হয়ে লক্ষ লক্ষ মানব আল্লাহর মহান অনুগ্রহধন্য হয়েছেন। বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রা.) সেই তরিকত শিক্ষা ও সাধনারই মহান দিকপাল। সকল কুতুবের শিরোমণি হিসেবে তিনি বড়পীড় ও গাউসে পাক ‘মহিউদ্দীন’ খেতাবে অভিষিক্ত। তিনি বিশ্ব মুসলিম জাতির তরিকত শিক্ষা ও সাধনার পথ দেখিয়েছেন। এই শিক্ষা তিনি স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে লাভ করেছেন এবং প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের মনোনীত যুগপ্রতিনিধি হিসেবে অলি-আবদাল, গাউস-কুতুব, পীর-মাশায়েখদের বেলায়েতি মিশন বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেছেন।
৫১১ হিজরীর কোন এক শুক্রবার দিন হযরত গাউসে পাক (রা.) নগ্নপদে বাগদাদ শহরের দিকে আসছিলেন। এমন সময় পথিপার্শ্বে একজন জরাজীর্ণ বৃদ্ধকে তিনি শায়িত অবস্থায় দেখতে পেলেন। উক্ত বৃদ্ধ সালাম দিয়ে হযরত গাউসে পাককে বললেন― ‘আমাকে ধরে তুলুন, আমি শক্তিহীন।’ হযরত বড়পীর সাহেব তাকে তুলে বসালেন। তখন উক্ত জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ ধীরে ধীরে জরামুক্ত হতে লাগলো এবং বললো― ‘আমি ইসলাম ধর্ম, লোকের কুসংস্কারে আমি দুর্বল হয়ে পড়েছি। আপনার সাহায্যে আমি নবজীবন লাভ করলাম।’ এ ঘটনার পর হযরত গাউসে পাক বাগদাদে প্রত্যাবর্তন করে কোন এক জামে মসজিদে জুমা পড়ার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করতেই লোকেরা তাঁকে ‘মহিউদ্দীন’ নামে সম্বোধন করতে লাগলো। তখন থেকেই তাঁর এগার নামের মধ্যে এক নাম হয় ‘মহিউদ্দীন’ বা দ্বীনের নবজীবন দানকারী। সত্যিই তাঁর অসংখ্য কারামত ও সংস্কারমূলক কাজই এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
তাঁর জন্মকালীন ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। হযরত গাউসুল আজম বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রা.) ৪৭১ হিজরীতে রমজান মাসের ১লা তারিখে সোব্হে সাদেকের কিছু পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেদিনই প্রথম রোজা পালন করেন। সারাদিন মাতৃদুগ্ধ পান করা থেকে বিরত থাকেন। সূর্যাস্তের পর তিনি মাতৃদুগ্ধ দ্বারাই ইফতার করেন।
গাউসে পাকের পিতা হযরত সৈয়দ আবু সালেহ মুসা জঙ্গী (র.) ও মাতা সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমা (র.)-এর শুভ বিবাহের পর নিঃসন্তান অবস্থায় বহু বৎসর কেটে যায়। পিতা বৃদ্ধ, মাতাও বৃদ্ধা। সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমার বয়স তখন ৬০ বৎসর। এ বয়সে সাধারণতঃ সন্তান ধারণের ক্ষমতা থাকেনা। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে এ বয়সেই তিনি গর্ভে ধারণ করলেন জগত বিখ্যাত ও সর্বশ্রেষ্ঠ অলী গাউসুল আজম আবদুল কাদের জিলানী (রা.)-কে। হযরত গাউসুল আজম বড়পীর মায়ের গর্ভে আসার পরপরই শুরু হয় কারামতের অপূর্ব খেলা। প্রথম মাসেই বিবি হাওয়া (আ.) স্বপ্নে ধরা দিলেন সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমার সাথে। তিনি বলে গেলেন, তোমার গর্ভে গাউসুল আজমের আগমন হয়েছে। তুমি ধন্য। দ্বিতীয় মাসে বিবি সারাহ (আ.) এসে সুসংবাদ দিলেন তোমার ঘরে মারেফাত এর খনির আগমন হয়েছে।
তৃতীয় মাসে বিবি আছিয়া এসে সুসংবাদ দিলেন; তোমার ঘরে ভেদতত্ত্বের মালিক আগমন করেছেন। চতুর্থ মাসে বিবি মরিয়ম, পঞ্চম মাসে বিবি খাদিজা (রা.), ৬ষ্ঠ মাসে হযরত আয়েশা (রা.) এসে খবর দিলেন― তোমার ঘরে অলীকুল শিরোমণি আগমন করবেন। সপ্তম মাসে নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা (রা.) স্বপ্নে বলে গেলেন― উম্মুল খায়ের! তোমার ঘরে আমার বংশের নয়নমনির আগমন হচ্ছে। অষ্টম মাসে বিবি জয়নব, নবম মাসে বিবি ছকিনা (রা.) স্বপ্নে বলে গেলেন― তোমার সন্তানের গুনে জিলানভূমি ধন্য হবে। এভাবে শুভ স্বপ্ন দেখতে দেখতে নয় মাস কেটে গেলো। দশম মাসের পহেলা রমজানের রাত্রির শেষভাগে সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ ধরে বিশ্বজগতকে আলোকিত করে ধরার বুকে আগমন করলেন গাউসুল আজম বড়পীর মহিউদ্দীন মুহাম্মদ আবদুল কাদের জিলানী (রা.)। তাঁর আগমনে ইসলাম পুনঃজীবন লাভ করলো।
নবী করিম (সা.) হাদিসে বলেছেন― ‘শত্রুর সাথে জেহাদ করা হলো ছোট জেহাদ, কিন্তু নফসের বিরুদ্ধে জেহাদ করা হচ্ছে বড় জেহাদ।’ ষড়রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাসর্য) হচ্ছে নফস। একে নফসে আম্মারা বা কু-প্রবৃত্তি বলা হয়। এই রিপুগুলোকে নিয়ন্ত্রণ বা আজ্ঞাধীন করার জন্য যে সাধনা করা হয়, তাই তরিকতের শিক্ষা ও সাধনা। এজন্য একজন পীর বা মুর্শিদের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে সিদ্ধি লাভ করা যায় না। এজন্যই কোরআন মজিদে বার বার অলীদের সংশ্রবে থাকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ঈমান ও আমল ঠিক করার পর মুর্শিদ অনুসন্ধান করা কোরআন এর নির্দেশ ‘ওয়াবতাগু ইলাইহিল ওয়াছিলা’ এবং ‘ওয়া কুনু মাআছ ছাদেকীন’ দুটি আয়াতে পীরের নিকট বাইয়াত হওয়ার প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাছাড়া সুরা কাহাফের ১৭ নং আয়াতে অলী ও মুর্শিদের কথা সরাসরি বলা হয়েছে। ―তাফসীরে রুহুল বয়ান
ইসলামে তরিকত শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমরা গাউসে পাক বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রা.) থেকে মহান শিক্ষা পাই। কারণ তিনি মাদারজাত অলী হওয়া সত্ত্বেও হযরত আবু ছাঈদ মাখযুমী (রা.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে কঠোর সাধনার মাধ্যমে গাউছিয়তে উজমা (গাউসুল আ’জম) মর্যাদা লাভ করেন। এই বাইয়াত রাসুল করিম (সা.)-এর সুন্নাত। ‘ইরগামুল মুরিদিন’ নামক আরবী গ্রন্থে লিখিত আছে― একজন জীবিত মুর্শিদের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করা সুন্নাত। হযরত গাউসুল আ’জম (রা.) পীরের হাতে বাইয়াত হওয়ার পর কঠোর রিয়াজতে মগ্ন হয়ে পড়েন। যখন উপযুক্ত সময় হলো, তখন তাঁর পীর-মুর্শিদ হযরত আবু ছাঈদ মাখযুখী (রা.) তাঁকে খেরকা (খেলাফতের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ পোষাক) পরিধান করিয়ে দেন এবং নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন। হযরত আবু ছাঈদ মাখযুমী (রা.) ৫১৩ হিজরীর ১লা মুহররম ওফাত প্রাপ্ত হন। কিভাবে তিনি খেলাফাত লাভ করেন তাঁর বর্ণনা তিনি নিজেই দিয়েছেন।
হযরত বড়পীর গাউসুল আ’জম (রা.) বলেন― ‘একদিন আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছিল। এমন সময় আমার পীর হযরত আবু ছাঈদ মাখযুমী (রা.) এসে বললেন― ‘তুমি আমার বাড়ি চলো।’ একথা বলেই তিনি নিজ বাড়িতে চলে গেলেন। কিন্তু আমার লজ্জাবোধ হওয়াতে আমি ইতস্ততঃ করছিলাম। এমন সময় খিজির আলাইহিস সালাম এসে আমাকে যাওয়ার জন্য তাগিদ করলেন। আমি পীরের বাড়ি গিয়ে দেখি― তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমাকে দেখে বললেন― ‘আবদুল কাদের! আমার বলাই কি যথেষ্ঠ ছিল না? আবার খিজির আলাইহিস সালামের বলার প্রয়োজন হলো! একথা বলেই তিনি আমার জন্য খাবার নিয়ে আসলেন এবং নিজ হাতে আমাকে খাওয়াতে লাগলেন। আমার শায়খের হাতের প্রতিটি লোকমায় আমার অন্তরে নূর ভরে যেতো। এরপর তিনি আমাকে খেরকা পরিধান করিয়ে দেন।’
উক্ত খেরকা পরিধান করার পর হযরত গাউসুল আ’জমের ওপর আল্লাহ তায়ালার নানাবিধ রহমত, বরকত ও তাজাল্লী অধিক পরিমাণে প্রকাশ পেতে লাগলো। এখান থেকে গাউসে পাকের তরিকত শিক্ষার সূচনা ও সাধনার পথ শুরু হলো। হযরত গাউসে পাকের পীর হযরত আবু ছাঈদ মাখযুমী (রা.) বাগদাদ শরিফের ‘বাবুশ শাইখ’ নামক স্থানে বাবুল আযাজ নামে একটি উচ্চমানের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইনতিকালের পূর্বে তিনি উক্ত মাদ্রাসার দায়িত্বভার গাউসুল আ’জমের ওপর অর্পণ করে যান। ৫১৩ হিজরী হতে আরম্ভ করে ৫৬১ হিজরীতে ইনতিকাল সময় পর্যন্ত গাউসে পাক উক্ত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত হতে অসংখ্য তালেবে এলেম এসে গাউসে পাকের নিকট কোরআন, হাদিস, তাফসীর, ফিকহ, নাহু ছরফ, আরবী সাহিত্য ও তাসাউফ শিক্ষা করে যুগবরেণ্য আলেম ও আল্লাহর মহান অলীয়ে কামেলে পরিণত হন। উক্ত মাদ্রাসা প্রাঙ্গনেই বর্তমানে গাউসে পাক বড়পীর এর মাযার শরিফ অবস্থিত। সুদীর্ঘ ৯০ বছর হায়াত পেয়ে ৫৬১ হিজরীর রবিউস সানী মাসের ১১ তারিখে বাগদাদ শরিফে বর্তমান মাজার শরিফ সংলগ্ন খানকায় তিনি ইনতিকাল করেন।
হযরত গাউসে পাক (রা.) ৫২১ হিজরীতে ৫০ বছর বয়সক্রমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রূহানি নির্দেশে বিবাহিত জীবনে প্রবেশের পরপরই সে বৎসরই তিনি ওয়াজ নসিহত ও হেদায়াতের কাজের জন্য নির্দেশিত হোন। রাসুল করিম (সা.) ঐ বৎসর ১৬ই শাওয়াল রাত্রে স্বপ্নে হযরত গাউসে পাককে ওয়াজ নসিহত করার নির্দেশ দেন। হযরত গাউসে পাক পারস্যবাসী বলে আরবী উচ্চারণে আরবদের সমকক্ষ ছিলেন না বলে জানালে নবী করিম (সা.) স্বপ্নে সামান্য থুথু মোবারক তাঁর জিহ্বায় ঢেলে দেন। এই থুথু মোবারকের বরকতে গাউসে পাকের জবান খুলে যায় এবং তিনি বেলায়াতের গুপ্তদ্বারের সন্ধান লাভ করেন। পরদিন থেকে তিনি ওয়াজ নসিহত শুরু করেন।
তাঁর ভাষার লালিত্বে, বাচনভঙ্গিতে এবং ভাবের গভীরতায় ওয়াজ মজলিশে দুচারজন করে লোক বেঁহুশ হয়ে মারা যেত। হুজুর (সা.)-এর বেলায়াত জ্ঞান দানের বরকতে তাঁর ওয়াজ মজলিশে লক্ষাধিক লোকের সমাগম হতো। প্রায় চারশত পন্ডিত ব্যক্তি তাঁর ওয়াজ লিখে রাখতেন। এভাবে জগতময় গাউসে পাকের নাম ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় তাঁর একটি কারামত প্রকাশ হয়ে পড়ে। মজলিশের সবচেয়ে পিছনের লোকটিও সামনের লোকের মত সমান আওয়াজে গাউসে পাকের ওয়াজ শুনতেন। এমনকি বাগদাদ থেকে ৫০০ কি. মি. দূরের শহর মোসেলে বসেও অনেক লোক বাগদাদ শরিফে গাউসে পাকের প্রদত্ত ওয়াজ শুনতেন। বর্তমান যুগে ইথারের তরঙ্গের মাধ্যমে মানুষের মুখের কথা পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ছে। ঐ যুগে গাউসে পাকের বাণী বহন করে নিয়ে যেতো ইথারের তরঙ্গরাজী। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহপাকই আপন অলীদেরকে এই অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী করে থাকেন। ইহা গাউসে পাকের খাস কারামত।
এ প্রসঙ্গে মোসেল নিবাসী বিখ্যাত পীর ও গাউসে পাকের মুরিদ হযরত আদি বিন মুসাফির (র.)-এর একটি ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য। আদি বিন মুসাফির (র.) বাগদাদ শরিফে হযরত গাউসে পাকের ওয়াজ মজলিশে সবসময় উপস্থিত থাকতেন এবং ওয়াজ শুনতেন। গাউসে পাক শুক্র, শনি ও রবি এই তিনদিন তিন জায়গায় ওয়াজ করতেন। একদিন আদি বিন মুসাফির (র.) আরজ করলেন― ‘ইয়া গাউসে পাক! আমার মন আপনাকে ছেড়ে যেতে চায় না। তবুও দেশে যেতে হয় কিন্তু দুর্ভাগ্য, আপনার এই মূল্যবান ওয়াজ থেকে আমি বঞ্চিত হবো।’ গাউসে পাক (রা.) বললেন― ‘তুমি আমার ওয়াজের নির্ধারিত সময়ে মোসেল বাসীদের নিয়ে কোন পাহাড়ের পাদদেশে একটি বৃত্ত এঁকে তার মধ্যে সকলকে নিয়ে বসে যাবে। ইনশাআল্লাহ তোমরা সকলেই সেখানে বসে আমার ওয়াজ নসিহত শুনতে পাবে।’
উপদেশ মোতাবেক আদি বিন মুসাফির (র.) তাই করলেন। তিনি বলেন― ‘আমাদের মনে হতো যেন আমাদের মাথার ওপরে মেঘের মিনারে বসে হযরত গাউসে পাক বক্তৃতা দিচ্ছেন, আর আমরা শুনছি।’ এখানে দেখা যায়, বার্তা প্রেরক একজন অলী এবং বার্তা ধারকও আর একজন অলী। আর বার্তাবাহক হচ্ছেন আল্লাহর ইথার তরঙ্গ। আল্লাহ আপন প্রিয় ও মাহবুব বান্দার খেদমতে এমনিভাবেই তার সৃষ্টিজগতকে বশীভূত করে দেন। হযরত শেখ সাদীর একটি বায়েতের অনুবাদ খুবই হৃদয়গ্রাহী―
এক সিজদা কর যদি মহা প্রভুর দ্বারে,
নত হবে শত শীর তব পদতলে।
তিনি কাছিদা গাউছিয়ায় বলেন― ‘ওয়া ওয়াল্লানী আলাল আক্তাবে জাম্আন, ফা-হুক্মী নাফিজুন ফি কুল্লি হালী’ অর্থাৎ ‘আল্লাহপাক আমাকে সকল কুতুবের ওপর কর্তৃত্ব দান করেছেন। আমার আদেশ সর্বাবস্থায়ই কার্যকর থাকবে।’ মূলকথা হলো : হযরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রা.) সর্বযুগের শ্রেষ্ঠতম অলী এবং সকল অলীদের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব বহাল থাকবে। হযরত গাউসুল আ’জম (রা.)-কে মহিউদ্দীন মুহাম্মদ বিন-নাজজার তাঁর ইতিহাসে যুগের শ্রেষ্ঠতম ইমাম বলে উল্লেখ করে বলেছেন― ‘ফিকহ ও হাদিসে গাউসে পাকের জ্ঞান ছিল অসাধারণ। তিনি নির্জন স্থানে পড়াশুনা করতে ভালবাসতেন। অধিকাংশ সময় তাইগ্রীস (দজলা) নদীর তীরে, বনে জঙ্গলে, কখনও বা নির্জন প্রান্তরে বসে বসে তিনি ফিকাহ শাস্ত্র অধ্যয়ন করতেন। তিনি বেলায়েতের শাহানশাহ হযরত মাওলা আলী মুর্তজা (ক.) থেকে বেলায়েতের গুপ্তজ্ঞানের ভান্ডার থেকে সকল প্রকার জ্ঞানের অমৃতসুধা পান করে গাউসে পাকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
আল্লাহর মহান অলীদের কারামত নবীগণের মোজেজার ন্যায় সত্য ও আল্লাহ কর্তৃক বিশেষ কুদরতের সাক্ষরস্বরূপ। নবীদের ক্ষেত্রে যা মোজেজা অলীদের ক্ষেত্রে তা কারামত। গাউসে পাকের কারামত বেলায়াতের উচ্চতর মাকামের পরিচায়ক ও অলীদের গুপ্তজ্ঞানের ভেদরহস্যের উজ্জল সাক্ষর বহনকারী। সমস্ত অলীগণের গুপ্তজ্ঞানের বিকাশস্থল হলেন গাউসে পাক (রা.)। আর গাউসে পাকসহ সকল কুতুবগণের গুপ্তজ্ঞান ও বেলায়াতের কেন্দ্রবিন্দু হল শেরে খোদা মাওলা আলী মুরতাজা মুশকিল কুশা (ক. ওয়াজহাহু)।
মহান আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার পর মক্কা শরিফের অদূরে নোমান পাহাড়ের পাদদেশে, মতান্তরে বেহেস্তে তাঁর পৃষ্ঠদেশ হতে কেয়ামত পর্যন্ত আগমনশীল সমস্ত সন্তানগণের রূহকে মর্তবা অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে দলবদ্ধভাবে দাঁড় করালেন। আম্বিয়ায়ে কেরামের শ্রেণি, আউলিয়ায়ে কেরামের শ্রেণি, ওলামায়ে কেরামের শ্রেণি, সাধারণ মুমিনগণের শ্রেণি ও কাফেরদের শ্রেণি পৃথক পৃথকভাবে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেলো। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাঁর একত্ববাদ স¤পর্কে সকলকে জিজ্ঞাসা করলেন― ‘আলাস্তু বিরাব্বিকুম’ আমি কি তোমাদের রব নই? তদুত্তরে সকলে একের পর এক বলতে লাগলো― ‘কালু বালা’― ‘হ্যাঁ’; ‘আপনি আমাদের প্রভু।’ এই অঙ্গীকারকে রোজে আজলের অঙ্গীকার বলা হয়।
হযরত আদম (আ.) অবাক বিস্ময়ে আরজ করলেন― ‘হে আল্লাহ! এরা কারা?’ মহান আল্লাহপাক বললেন― ‘এরা তোমার আওলাদ।’ হযরত আদম (আ.) লক্ষ করলেন― আউলিয়ায়ে কেরামের সারি হতে একজন লোক আম্বিয়ায়ে কেরামের দলে শামিল হওয়ার জন্য অগ্রসর হতে চায়, আর ফেরেস্তারা বার বার তাঁকে আউলিয়ায়ে কেরামের দলে ধরে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু ধরে রাখতে পারছিলেন না। অবশেষে গায়েবী আওয়াজ হলো― ‘হে মুহিউদ্দীন! স্থির হও। তোমার মধ্যে নবীগণের দলভুক্ত হওয়ার মত যোগ্যতা আছে বটে। কিন্তু তোমাকে সর্বশেষ নবীর উম্মত করেই প্রেরণ করা হবে। তবে জেনে রেখো, তোমাকে আউলিয়াকূলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হবে। তোমার পদযুগল আউলিয়াগণের কাঁধের ওপর হবে। অতঃপর তিনি শান্ত হয়ে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করলেন।’ ―সূত্র : হযরত গাউসুল আজম : মাওলানা নূরুর রহমান
এমন আলেমে হক্কানী রাব্বানী ও আউলিয়ায়ে কেরাম সম্পর্কেই হুজুর আকরাম (সা.) এরশাদ করেছেন― ‘উলামায়ু উম্মাতি কাআন্নাবিয়্যি বানি ইসরাঈল’ অর্থাৎ ‘আমার উম্মতের জাহেরি-বাতেনি ওলামাগণ জ্ঞান ও ধ্যানের ক্ষেত্রে বণী ইসরাইলের নবীগণের ন্যায়।’ ―সূত্র : তাফসীরে নাঈমী- মুফতী আহমদ ইয়ার খান
প্রকাশ থাকে যে, নবী করিম (সা.) যেদিন মেরাজে গমন করেন, সেদিন হযরত জিবরাঈল (আ.), মিকাঈল (আ.) ও ইসরাফিল (আ.) ৭০ হাজার ফেরেস্তাসহ বোরাক নিয়ে মক্কা মোয়াজ্জমায় বিবি উম্মে হানির ঘরের সামনে হাজির হয়ে নবী করিম (সা.)-কে উর্ধ্বজগতে ভ্রমণের জন্য প্রস্তুত করে বোরাকে আরোহণের অনুরোধ করেন। কিন্তু বোরাক একটু নাজ ও নখ্রা করে দুলছিল। নবী করিম (সা.) আরোহণ করতে একটু অসুবিধা বোধ করছিলেন। এমন সময় হযরত গাউসুল আজমের রূহ মোবারক সুরত ধারণ করে নিজের কাঁধ পেতে দিলেন। নবী করিম (সা.) তাঁর কাঁধে পা রেখে বোরাকে সওয়ার হয়ে বললেন― ‘যেভাবে এখন আমি আমার পা তোমার কাঁধের ওপর স্থাপন করলাম, সেভাবে আমার উম্মতের অলীগণের কাঁধের ওপরও তোমার পা স্থান পাবে।’
―সূত্র : গাউসুল আজমের জীবনী ও কারামত : মাওলানা নূরুর রহমান।
হযরত গাউসুল আজম তো নবী পাকের আহলে বায়েত। সুতরাং নবী পাকের সাথে তাঁর স¤পর্ক খুবই ঘনিষ্ট― রূহানী ও জিসমানী উভয় দিক থেকে। গাউসে পাকের বেলায়াতের জ্ঞান ও ভেদরহস্য শেরে খোদা মাওলা আলী মুশকিল কুশা (ক. ওয়াজহাহু) জ্ঞানরাজ্যের গুপ্তভান্ডার থেকে উৎসারিত। কাশ্ফের মাধ্যমে অবগত বিষয়কে অস্বীকার করা যায় না। এ ঘটনাটি বেলায়াতের জ্ঞানবৃক্ষের সবুজ পাতা থেকে মুক্তার দানা ছড়িয়ে গাউসে পাকের রূহানী জগতকে আন্দোলিত করেছে। যে জগতের বিস্তৃতি ব্যাপক ও অসীম খোদা তালার জ্ঞানরাজ্যের সামান্য নিদর্শনমাত্র।
মাওলানা নূরুর রহমান তাঁর সংকলিত গাউসুল আজম বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী গ্রন্থে লিখেছেন― ‘হযরত গাউসে পাক স্বয়ং বলেন, মিরাজ শরিফের রাত্রে যখন হুজুর (সা.) সিদরাতুল মুন্তাহা নামক স্থানে তশরীফ নিলেন, তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) থেমে গেলেন এবং বললেন― ‘আমি যদি আর এক কেশাগ্র পরিমাণ অগ্রসর হই, তাহলে আল্লাহর নূরের তাজাল্লীতে আমার নূরের পাখা জ্বলে যাবে।’ তখন আল্লাহ তায়ালা আমার (আবদুল কাদের) রূহকে হুজুরে আকরাম (সা.)-এর দরবারে হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন এবং আমি হুজুরের কদমবুচী করার সৌভাগ্য অর্জন করলাম। হুজুর (সা.) আমাকে বললেন― ‘হে প্রিয় বৎস! আজ আমার কদম তোমার কাঁধের ওপর, তোমার কদমও সমস্ত আউলিয়া দের কাঁদের ওপর হবে।’
কোন কোন মাশায়েখ আরও রেওয়ায়াত করেছেন যে, মিরাজ শরিফ এ যখন নবী করিম (সা.) আরশ মোয়াল্লায় গমন করলেন, তখন আরশকে উচু দেখতে পেলেন। কিভাবে আরশে আরোহণ করবেন, সে বিষয়ে তিনি চিন্তা করলেন। এমন সময় এক নূরানী যুবক সামনে এসে কাঁধ পেতে দিলেন। হুজুর (সা.) তাঁর কাঁধে পা মোবারক রেখে আরশে আরোহণ করলেন। এমন সময় গায়েবী আওয়াজ ভেসে আসলো― ‘হে হাবীব! ইনি আপনার বংশের সন্তান। তাঁর নাম হবে মুহিউদ্দীন আবদুল কাদের।’ নবী করিম (সা.) এবারও খুশী হয়ে বললেন― ‘আমার কদম তোমার কাঁধে, তোমার কদম অলীদের কাঁধে হবে।’ উপরে বর্ণিত ঘটনাগুলো বেলায়াতের উচ্চতর মাকামের অন্তর্ভুক্ত কাশ্ফের দ্বারা উদ্ঘাটিত।
হযরত গাউসুল আজমের আম্মাজান সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমা (র.) বলেন― ‘যেদিন আমার সন্তান ভূমিষ্ট হয়, সেদিন আমার স্বামী সৈয়দ আবু সালেহ মুসা জঙ্গী স্বপ্নে দেখেন, নবী করিম (সা.) প্রধান সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে আমাদের ঘরে তশরীফ আনলেন এবং আমার স্বামীকে বললেন― ‘ইয়া আবু সালেহ্ আ’তাকল্লাাহু ইব্নান ছলিহান ওয়াহুয়া ওয়ালাদী ওয়া মাহ্বুবি ওয়া মাহ্বুবুল্লাহি সুব্হানাহু ওয়াতা‘আলা ওয়া সাইয়াকুনু লাহু শানুন ফীল আউলিয়ায়ি ওয়াল আক্তাবি কাশানি বাইনাল আন্বিয়ায়ি ওয়ার রাসুলি।’
অর্থাৎ ‘হে আবু সালেহ! আল্লাহপাক তোমাকে একজন নেক্কার ছেলে সন্তান দান করেছেন। সে আমার বংশধর, আমার প্রিয় এবং আল্লাহ সুবহানাহুরও প্রিয়। সে শীঘ্রই আউলিয়া ও কুতুবগণের মধ্যে এমন মর্যাদা লাভ করবেন, যেমন আম্বিয়া ও রাসুলগণের মধ্যে আমার মর্যাদা।’―সূত্র : গাউসুল আজম : মাওলানা নূরুর রহমান
হযরত বড়পীর (রা.) মাতৃগর্ভে থাকাকালীন অলৌকিক ক্ষমতাবলে ব্যাঘ্ররূপ ধারণ করে এক ভন্ড ফকিরকে হত্যা করে মায়ের আবরু রক্ষা করেছিলেন। সে ঘটনাটি ছিল এরূপ―
একদিন এক ভিক্ষুক ভিক্ষার উদ্দেশ্যে হযরত সৈয়দ আবু সালেহ মুসা জঙ্গী (র.)-এর বাড়িতে এসে ভিক্ষা চাইতে লাগলো। ঘটনাক্রমে সেদিন বাড়িতে পুরুষ লোক কেউ ছিলেন না। ভিক্ষুক ক্ষুধার তাড়নায় কাকুতি মিনতি করতে লাগলো। পুণ্যবতী সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমা (র.) দয়া পরবশ হয়ে পর্দার আড়াল থেকে কিছু খানা ভিক্ষুককে বাড়িয়ে দিলেন। খানা খেয়ে ভিক্ষুক খালী বাড়ি দেখে অন্দর মহলে প্রবেশ করতে উদ্যত হলো। সৈয়দা উম্মুল খায়ের দিশেহারা হয়ে ভিক্ষুকের হাত থেকে বাঁচবার জন্য খোদার কাছে ফরিয়াদ করতে লাগলেন। আল্লাহর কুদরতে জননীর এই চরম বিপদের সময় হযরত আবদুল কাদের জিলানীর রূহ মোবারক মাতৃগর্ভ হতে বের হয়ে একটি বাঘের রূপ ধারণ করে মুহূর্তের মধ্যে ভিক্ষুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তাকে হত্যা করে পুনরায় মাতৃগর্ভে প্রবেশ করলেন। জননী কিছু টের করতে পারলেন না। তিনি শুধু এতটুকুই দেখতে পেলেন যে, কোথা হতে একটি বাঘ এসে ভিক্ষুককে হত্যা করে আবার কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
পরবর্তীতে কোন এক সময় গাউসুল আজমের আম্মাজান কোন কারণে একটু রাগ করে বলেছিলেন, ‘আবদুল কাদের! তোমার জন্য তোমার শিশুকালে কত কষ্ট করেছি― মনে আছে কি? এটা ছিল সন্তানের প্রতি মায়ের আদরের শাসন।’ হযরত বড়পীর সাহেবও বলে ফেললেন― ‘আমিও তো গর্ভকালীন সময়ে আপনার একটি উপকার করেছিলাম। সে কথা কি আপনার মনে নেই?’ এ কথা শুনে মাতা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন― ‘সেটা কি?’ হযরত বড়পীর সাহেব (রা.) বললেন― ‘ভিক্ষুককে যে বাঘটি হত্যা করে আপনার আবরু রক্ষা করেছিল, সে তো আমিই ছিলাম।’ একথা শুনে সৈয়দা উম্মুল খায়ের অবাক বিস্ময়ে মনে মনে ভাবলেন― ‘আমার এ সন্তান কোন সাধারণ সন্তান নন সে কালে আল্লাহর পরম বন্ধুরূপে গণ্য হবে।’ এরপর থেকে তিনি আর কোন দিন পুত্রের প্রতি বিরক্ত হননি।―সূত্র : মানাক্বেবে গাউসিয়া
হযরত গাউসুল আজমের জন্ম ছিল আধ্যাত্মিক ও রূহানী জগতে মুসলিম মিল্লাতের নবজাগরণ স্বরূপ। মুসলমানগণ যখন নানা ভ্রান্ত আক্বিদা ও মতবাদে জর্জরিত সেই ক্রান্তিকালে তৎকালীন পারস্য, বর্তমান কালের ইরাক দেশের অন্তর্গত জিলান বা গীলান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন হাসান বংশীয় এবং মাতা হোসাইন বংশীয়। উভয় দিক থেকে তিনি সৈয়দ ও আওলাদে রাসুল (সা.)। নবী করিম (সা.)-এর পবিত্র রক্তধারা গাউসে পাকের শরীরে প্রবাহমান। সকল অলীগণের গর্দানে তাঁর পবিত্র কদম মুবারক স্থাপিত। এজন্যই তাঁর লকব ‘মালিকুর রিকাব’। ‘মানাক্বেবে গাউছিয়া’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, হযরত গাউসুল আ’জমের আম্মাজান সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতেমা (র.) বর্ণনা করেছেন― ‘আবদুল কাদের রমজান শরিফের প্রথম রাত্রে জন্মগ্রহণ করেছেন। জন্মদিন থেকেই দিনের বেলায় তিনি আমার দুধ পান করেননি। ইফতারের সময় থেকে সোব্হে সাদেক পর্যন্ত সারারাত্র তিনি দুধ পান করতেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর এ কারামত সারা জিলান শহরে রাষ্ট্রময় ছড়িয়ে যায়।’
৪৭১ হিজরীর শাবান মাসের ২৯ তারিখ জিলানের আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। লোকেরা রমজানের চাঁদ দেখতে না পেয়ে পরদিন সাবধানতাবশতঃ সেহেরি খেয়ে নিলেন এ আশায় যে, হয়তো অন্য কোন স্থান থেকে চাঁদ দেখার সংবাদ আসতে পারে। পরদিন একজন আল্লাহওয়ালা দরবেশের নিকট চাঁদের বিষয়ে জানতে চাইলে উক্ত দরবেশ বললেন― ‘আবু সালেহ মুসা জঙ্গীকে জিজ্ঞাসা করো; তাঁর নবজাত সন্তান আজকে সোব্হে সাদেক থেকে মায়ের দুধ পান করেছে কিনা।’ খবর নিয়ে দেখা গেল― নবশিশু সোব্হে সাদেক থেকে দুধ পানে বিরত রয়েছেন। এমন সময়ই খবর হলো― গতকাল চাঁদ দেখার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
জিলান শহরের লোকেরা এই সংবাদ জেনে হযরত গাউসুল আজম বড়পীর এর প্রথম রোজা রাখার কারামত দর্শনে হতবাক হয়ে গেল। দেশের জাহেরি আলেম উলামাগণ আকাশের নবচাঁদ দর্শনে বিফল হলেও বাতেনি শক্তির অধিকারী গাউসে পাক (রা.) ঠিকই চাঁদ দর্শন করে প্রথম রোজা পালন করেছিলেন। এখানে এসেই প্রকৃত নায়েবে নবীর পরিচয় পাওয়া যায়। শিশুকালে গাউসে পাকের জেকের-আজকার ও দোলনায় থাকাকালীন তাঁর রোজা রাখার প্রতি ইঙ্গিত করেই পরবর্তীকালে তিনি নিজেই একটি কাছিদায় একথা উল্লেখ করেছেন। ‘তারগীবুল মানাজির’ নামক গ্রন্থে উক্ত কাছিদার সংশ্লিষ্ট পঙতি উল্লেখ করা হয়েছে। কবিতাংশটি নিম্নরূপ―
‘বিদা‘আতু আম্রি জিক্রুহু মালাআ ফাযা ওয়া সাওমি ফী মাহ্দিবিহী কানা’
অর্থ― ‘আমার শৈশবকালের জিকির-আজকারে সমগ্র জগত পরিপূর্ণ হয়ে আছে। আর শৈশবের দোলনায় আমার রোজা পালনের ব্যাপারটি তো প্রসিদ্ধিই লাভ করেছে।’ ―সূত্র : তারগীবুল মানাজির
‘তাফরিহুল খাতির ফি মানাকিবে শেখ আবদুল কাদের’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে।
৫০৯ হিজরী সনে ৩৮ বৎসর বয়সে হযরত গাউসুল আজম (রা.) হজ্ব পালন উপলক্ষে মদিনা মোনাওয়ারায় গমন করে নবী করিম (সা.)-এর রওজা মোবারকের পাশে দাঁড়িয়ে নিম্নের দুখানা শের আবৃত্তি করলেন―
‘ফী হালাতিল বা’দি রূহী কুনতু য়ুরসিলুহা
তুকাব্বালুল আরদা আন্নি ওয়া হিয়া নায়িবাতি
ওয়া হাজিহী নাওইয়াতুল আসবায়ি ক্বাদ হাদারাত
ফামদুদ ইয়ামিনাকা কাই তুহ্জা বিহা সাফাতি।’
অর্থাৎ ‘দূরে অবস্থানকালে আমি আমার রূহকে উপস্থিত করতাম, আর সে আমার পক্ষ হতে প্রতিনিধি হয়ে এই পবিত্র জমিন চুম্বন করতো। এখন স্বশরীরের পালা। আমি নিজে স্বশরীরে উপস্থিত হয়েছি। ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি অনুগ্রহ করে ডানহাত মোবারক ওপরে তুলে দিন। (চুম্বন করে) আমার ঠোঁট দুটি ধন্য হোক।’
উক্ত কবিতা পঙ্তি আবৃত্তি করার সাথে সাথে নবী করিম (সা.) আপন ডানহাত মোবারক বের করে দেন। হযরত গাউসুল আজম (রা.) উক্ত হাত মোবারক চুম্বন করে ধন্য হন।―সূত্র : তাফরিহুল খাতির
সুতরাং আল্লাহপাক আমাদের ভ্রান্তবাদী আক্বিদা ও ফেরকাবাজীর মতপার্থক্যের বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করে আউলিয়ায়ে কেরামদের অনুসরণীয় আল্লাহ ও নবীর মনোনীত সিরাতুল মুস্তাকীমের পথে দাখিল করুন। আমীন। আমরা যেন অলি-আল্লাহ ও পীর-মুর্শিদ এর হাতে বায়াত হয়ে আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক আকা মওলা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি অধিকহারে দরুদ ও সালতোচ্ছালাম পাঠ করার মাধ্যমে পীর-মুর্শিদের দামান ধরে ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তি লাভ করতে পারি। আমীন।
তথ্যসূত্র :
১. নুজহাতুল খাতিরিল ফাতির-ফি তারজিমাতে সাইয়েদীশ শরীফ আবদুল কাদের জিলানী (রা.) : মোল্লা আলী কারী (র.)।
২. বাহজাতুল আসরার : বড়পীর গাউসুল আযম দস্তগীর হযরত সৈয়্যেদেনা আব্দুল কাদের জিলানী (রা.) : ইমাম নূরুদ্দীন আবুল হাসান শাতনুফী লাখমী মিশরী (র.)।
৩. সিররুল আসরার: বড়পীর গাউসুল আযম দস্তগীর হযরত সৈয়্যেদেনা আব্দুল কাদের জিলানী (রা.)
৪. কাউলুল জামীল বা উর্দু শেফা-উল আলীল : হযরত শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী (র.)।
৫. গাউসুল আজম (রা.) এর জীবনী : মাওলানা নূরুর রহমান
৬. মোজেজায়ে আম্বিয়া ও কারামাতে আউলিয়া : অধ্যক্ষ হাফেজ এম এ জলিল (র.)
