আপন ফাউন্ডেশন

প্রবন্ধ – জ্ঞান মার্গ – তত্ত্বজ্ঞানের প্রাসঙ্গিকতা ও মূল্য

Date:

Share post:

লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী

স্বভাবত আমরা ইন্দ্রিয়লব্ধ ধারণার প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার অতীত নয়। আর আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান অতিমাত্রায় জাগতিকতা সাপেক্ষ। আমরা যা দেখি, স্বাভাবিক ভাবে তার প্রতিই অতিমাত্রায় বিশ্বাসী হয়ে উঠি। কিন্তু চেতনা কখনো প্রশ্ন তোলে না যে, আমার দেখা বিষয়টি কি সার্বিক ভাবে সত্য? ইন্দ্রিয় আমাদেরকে প্রচুর ফাঁকি দেয়। যা থেকে আমাদের ভিতরে তৈরী হয় নানান অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার আর দূর্বোধ্যতার দেয়াল।

“প্রভুজ্ঞান চিরনিত্য। তিনি স্বয়ং হাইয়্যুল কাইয়্যুম হয়ে চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী জগতে নিত্য আসীন। তাঁর পরিচয় জ্ঞানও তাঁর অস্তিত্বের মতো চিরনিত্য, শাশ্বত তথা চিরন্তন।”

আমরা তখনই ভুলটা করে বসি, যখন আমরা প্রভুজ্ঞান অর্জন করতে যাই আমাদের অর্জিত জ্ঞানের আলোকে। তখনই আমাদের স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস টা হয়ে উঠে সংকীর্ণ আর অন্ধবিশ্বাসে ভরপুর। আর আমরাও সগৌরবে সে অপ্রতুল খোদা বিশ্বাসের বুলি শত সহস্র মুখে আউরিয়ে পথভ্রষ্ট করে তুলি অন্যান্যদের।

খোদাজ্ঞান অর্জন করার বিষয় নয়। জগতের পলে পলে, প্রতি কণা-অনুকণায় সর্বদা অনুরণিত হচ্ছে খোদাজ্ঞানের এক শ্বাশত ফোঁয়াড়া। আমরা আমাদের অর্জিত নানান অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের আবরণে বঞ্চিত হয়ে আছি সে শাশ্বত সংগীত থেকে। যে সংগীত প্রভুপ্রেম আর তাঁর পরিচয় জ্ঞানের নহর হয়ে চিরকালে প্রবাহিত হচ্ছে জগতের প্রতি ধূলিকণায়। যদি আমরা আমাদের আপনাপন অর্জিত বিষয়াদির বৈচিত্রতা আর জ্ঞানের জঞ্জাল অপসারন করে স্থিত হতে পারতার তাঁর শ্বাশত অস্তিত্বের মধ্যে, তবেই আমাদের কর্ণগহ্বরে বেজে উঠতো তাঁর আগমনী সুর। লাভ করতাম তাঁর অস্তিত্বের পরিচয় আমাদের আপনাপন অস্তিত্বের মধ্যে। তখন আমাদের উপলদ্ধি হতো যে, সমস্ত জগত সংসারটাই তাঁর পবিত্র অস্তিত্বের প্রকাশ ও বিকাশ। সমগ্র ব্রহ্মান্ড ব্যাপী তিনিই সর্বদা নিজের অস্তিত্বকে ও সৌন্দর্য কে বিকশিত করে চলেছেন। হৃদয়ে আপনা হতেই জেগে উঠতো প্রভুর মহিমান্বিত স্বরূপের প্রকাশ।

প্রভুজ্ঞান আমাদের সর্বঅস্তিত্বে বিরাজমান। এটি আপনা হতেই জাগরিত হবে যদি আমরা সেই মহিমাময়ের ঐক্যতান সংগীতে নিজেদের সুর সেধে নিতে পারি। তাঁর জ্ঞান তাঁর থেকেই হবে। অন্য কোনো মাধ্যম থেকে আসা অসম্ভব।

“সরাসরি তাঁর থেকে যারা তাঁকে চিনে নিতে পেরেছেন, তারাই তত্ত্বজ্ঞানী।”

আমাদের ইন্দ্রিয়, চিত্তবৃত্তি বা বুদ্ধির দ্বারা আমরা তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণকে সুদূর পরাহত করে তুলতে পারি মাত্র। আমরা সর্বদা নিত্য অনিত্যের ধোঁকায় আবদ্ধ বিধায় সে পবিত্র জ্ঞান আমাদের চিত্তকে আকৃষ্ট করে না।

যখন আমরা আমাদের অর্জিত সকল বোধের অতিতে গিয়ে স্থিত হবো শূন্যতায়, তখনই আমাদের শূণ্যতা ব্যাপী উদ্ভাসিত হবে মহিমাময়ের পূর্ণতম অস্তিত্ব। সে অস্তিত্বের আলোকে তখন আমাদের ভিতব বাহিরে প্রকাশিত হবে তাঁর অনন্ত সৌন্দর্য। তখনই আমরা নিত্য অবগাহন করবো সে সৌন্দর্যের আলোকরশ্নির মধ্যে


যা আমাদের স্বরূপ নয় তথা যা নিত্য নয়, বরং ক্ষণকালের জন্য আমাতে অবস্থান করছে মাত্র (রিপুনিচয়, ধারনা ও জাগতিকতা) এসব থেকে মুক্তি লাভ করার নামই তত্ত্বজ্ঞান অর্জন করা। প্রভুর অস্তিত্বের স্বপক্ষে যুক্তি দাড় করানোটাই সবচাইতে বড় বোকামী। যেখান তাঁর অস্তিত্ব ব্যতিত অন্য কোনো অস্তিত্ব নেই। আমিও অস্তিত্ববান তাঁরই অস্তিত্বে। কিন্তু আমরা সে মহান অস্তিত্বের উৎস হতে বিতাড়িত হয়েছি আমাদের অর্জিত জ্ঞান আর খন্ডিত বুদ্ধিবৃত্তির আত্মবিধ্বংসী আচরণে। যত্ন সহকারে সে পাশবিকতা বা প্রবৃত্তিসমূহকে আপনত্ব হতে দূরীভূত করতে সক্ষম হলেই আমাদের মধ্যে জেগে উঠবে মহাসমুদ্রের বিশালতা। তখন সমুদ্রে পতিত পিপিলিকার মতো সমুদ্রের অস্তিত্ব জানার বা সমুদ্রকে চেনার বাসনাই থাকবেনা। থাকবে শুধু সমুদ্রে ডুবে নিজেই সমুদ্র হয়ে যাওয়ার আকুলতা। তখন সমুদ্র সংক্রান্ত সকল জ্ঞান অবলুপ্ত হবে। কাজে দিবে শুধু সে অনন্ত অস্তিত্বে নিজের অস্তিত্বটাকে রাঙিয়ে নেয়ার সক্ষমতা।

অহং ত্যাগেই পরমের আগমন।

কোনো মতবাদ জানা জ্ঞান নয়। তত্ত্বজ্ঞান হলো প্রভুর স্বরুপ আপন অস্তিত্বে উপলব্ধ করার প্রক্রিয়া। যা সম্ভব হবে অহং তথা আপনত্ব ত্যাগে। আপনত্ব ত্যাগ মানেই হলো আপনাপন মতাদর্শ ত্যাগ, অর্জিত বুদ্ধিবৃত্তি, পূর্ব অভিজ্ঞতা ত্যাগ। যাকে আমরা সংস্কার বলি। সংস্কাররাশিই আমাদের বন্ধন। তত্ত্বজ্ঞান হলো এক সার্বিক উপলব্ধি। যা হৃদয়ে আপনা প্রস্ফুটিত হয়। তত্বজ্ঞান লাভ হওয়ার পূর্ব অবধি সকল প্রাণী বন্দী। বন্দীরাই দুঃখভোগ করবে। মুক্তদের জন্য চির আনন্দ। মুক্তরাই তত্ত্বজ্ঞানী।

“জগতের সকল কিছুতে পরম সৌন্দর্য অনুভূত হওয়ার নাম তত্ত্বজ্ঞান। অর্থাৎ অস্তিত্বকে জানা এবং অনস্তিত্বকে না জানা- এটাই তত্ত্বজ্ঞান।”

ত্যাগেই আসে জ্ঞান। জ্ঞানের প্রকাশ হয় স্বভাবের স্নিগ্ধতায়। “আমিই সত্য – এটিই তত্ত্বজ্ঞানের একমাত্র প্রকাশ।” ধর্মের স্বার্থকতা এখানেই। আপনত্বে তথা স্বরুপে প্রভুর জাগরণে। জয় হউক জ্ঞানমার্গ এর।

রচনাকাল – 20/10/2020
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী

More Posts

সাবস্ক্রাইব করুন

Related articles