সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী
বাংলা সাহিত্যে শুধু নয়, বিশ্ব সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। যার দ্রোহ, প্রেম, সাম্যবাদ ও আধ্যাত্মচেতনা উজ্জীবিত করেছিল হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর অব্দি সকল শ্রেণীর মানুষকে। বাঙালী মানসে কাজী নজরুল ইসলাম এক মহীরুহ। আপন খবরের এবারের আয়োজনে থাকছে কাজী নজরুল ইসলাম এর সাহিত্য বিষয়ক কিছু বাণী সংকলন।
১. কবি ও সাহিত্যিকের জীবন ও তাঁর সৃষ্টি যেনো শতদল। তার এক একটি দল জন্ম নিয়েছে দুঃখ-বেদনার আঘাত পেয়ে।
২. কবির আসা ঐ শেফালী পথ বেয়ে আসা। কার বিষাদের শিশির-জলে নেয়ে আসে সে, তা সে জানে না। তার নিজের কাছেই সে একটা বিপুল রহস্য।
৩. কবি-মন হেরেমের কিশোরীর মত বন-মৃগীর মত ভীরু, স্পর্শালু। কঠিন রূঢ় কোনো কিছুর স্পর্শ সে সহিতে পারে না।
৪. কবি, সাহিত্যিক, সুরশিল্পী মানুষের আনন্দলোকের, সৌন্দর্যলোকের বাণী বয়ে আনে। এ জন্য সাহিত্যিক, কবি ও শিল্পীরা মানব-সভ্যতার গৌরব।
৫. আনন্দ ও সৌন্দর্যের তৃষ্ণা মানুষের চিরন্তন। মানুষ অন্নের জন্য ক্ষুধা অনুভব করে, তেমনি করে সৌন্দর্য-পিপাসাকে অনুভব। মানুষের এই সৌন্দর্যক্ষুধা থেকেই কাব্যের সৃষ্টি, কবির জন্ম। মানুষের আনন্দ ও সৌন্দর্য পরিবেশন করার জন্যই কবিরা এসে থাকেন।
৬. জল কমল ফুটায়, জল না থাকলে কমল ফুটতো কি? অকবির সৌন্দর্য-ক্ষুধা মিটাবার জন্যই কবির আগমন।
৭. যারা তিলে তিলে আপনাদের জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিলেন, সেইসব কবি, গায়ক ও সাহিত্যিকদেরকেও সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে হবে।
৮. লক্ষীর ঝাঁপির কড়ি দিয়ে কবিকে অভিবন্দনা করলে কবি তাতে অখুশি হয়ে ওঠে। কবিকে খুশি করতে হলে দিতে হয় অমূল্য ফুলেও সওগাত।
৯. কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলী, কবি চায় প্রীতি, কবি চায় পূজা। কবিত্ব আর দেবত্ব এইখানে এক।
১০. যে সাহিত্য জড়, যার প্রাণ নাই, সে নির্জ্জীব সাহিত্য দিয়া আমাদের কোনো উপকার হইবে না, আর তাহা স্থায়ী সাহিত্যও হইতে পারে না।
১১. সাহিত্য হইতেছে প্রাণের অভিব্যাক্তি। যাহার নিজের প্রাণ নাই, যে নিজে জড় হইয়া গিয়াছে, সে লেখায় প্রাণ দিবে কোথা হইতে? যাহার নিজের বুকে রঙ এর আল্পনা ফুটে নাই, সে চিত্রে রঙ ফুটাইবে কেমন করিয়া?
১২. সাহিত্যের মুক্তধারায় থাকিবে চলার আনন্দ, স্রোতের বেগ এবং ঢেউ এর কলগান ও চঞ্চলতা।
১৩. যাঁহার চিত্ত যত নিরাবিল, নির্ম্মল, উন্মুক্ত, হাস্যমুখর, তাঁহার লেখাও ত নূতন নূতন সম্পদে ভরপুর।
১৪. লেখকের লেখা হইতেছে তাঁহার প্রাণের সত্য অভিব্যক্তি। যেখানে লেখক সত্য, তাঁহার লেখাতেও সে সত্য সত্যভাবেই ফুটিয়া উঠিবে; যেখানে লেখক মিথ্যা, সেখানে সেই মিথ্যাকে তিনি হাজার চেষ্টা করিলেও লুকাইতে পারিবেন না।
১৫. সাহিত্যিকের, কবির, লেখকের প্রাণ হইবে আকাশের মতো উন্মুক্ত উদার, তাহাতে কোনো ধর্মবিদ্বেষ, জাতিবিদ্বেষ, বড়-ছোট জ্ঞান থাকিবে না।
১৬. বাঁধ দেয়া ডোবার জলের মতো যদি সাহিত্যিকের জীবন পঙ্কিল, সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ হয়, তাহা হইলে তাহার সাহিত্য সাধনা সাংঘাতিকভাবে ব্যার্থ হইবে। তাহার সৃষ্ট সাহিত্য আতুড়-ঘরেই মারা যাইবে।
১৭. সাহিত্যিক যতই কোনো সুক্ষতত্ত্বের আলোচনা করুক না, তাহা দেখিয়া যেন বিশ্বের যে কোন লোক বলিতে পারে, ইহা তাহারই অন্তরের অন্তরতম কথা।
১৮. যাহা বিশ্ব সাহিত্যে স্থান পায় না, তাহা স্থায়ী সাহিত্য নয়। খুব জোর দুদিন আদর লাভের পর তাহার মৃত্যু হয়।
১৯. শারাব,সাকী, গোলাপ, বুলবুল কে বাদ দিয়ে যে কবিতা লেখা যায়, তা ইরাণের কবিরা যেন ভাবতেই পারেন না।
২০. আজকাল আমাদের সাহিত্য বা সমাজনীতি, সবই টবের গাছ। মাটির সাথে সংস্পর্শ নেই।
২১. যারা সাহিত্যিক, কবি ও গায়ক তাঁরা মানুষের মনের ক্ষুধা মেটান। বাইরের ক্ষুধা যারা মেটান, আমরা তার দাম দেই। কিন্তু মনের ক্ষুধা যারা মেটান তাদের দাম আমরা দেই না। তাঁরা মানুষের নিকট থেকে তাঁদের প্রাপ্য সম্মান পান না।
২২. প্রতিভা, মনীষা, পান্ডিত্য ও সাধনার মূল্য একদিন সমাজ দেবেই।
২৩. সৌন্দর্যের অমৃত পরিবেশনার ভার কবি ও সাহিত্যিকদের হাতে। এ পথে সাহিত্যিকদের হয়তো দুঃখ-কষ্ট আছে, কিন্তু তাদের ভীত হলে চলবে না।
২৪. বড় বড় কবির কাব্য পড়া এইজন্য দরকার যে, তাতে কল্পনার জট খুলে যায়, চিন্তার বদ্ধ ধারা মুক্তি পায়।
২৫. কবি বাণীর কমল-বনের বনমালী। সে মালা গাঁথে, সে মণি-মাণিক্য বিক্রি করে না।
২৬. কবি কথাকে দামী করতে পারে না, সুন্দর করতে পারে।
২৭. কবি হওয়ার মতো দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে আর নেই। এদেশের কবির কবিতার সব শব্দগুলো পাটকেল হয়ে ফিরে আসে, আর তা আঘাত করে তার বুকে।
২৮. যারা ফুল ফোটায় তাদের মাথাই সবচেয়ে অনিরাপদ।
২৯. পন্ডিত জমায়, সে কৃপণ; কবি বিলোয়, সে দাতা।
৩০. কবি নেয়, কিন্তু সে দান করে, -নদীর মত সে চলে গাইতে গাইতে, দান করে করে, দু’পাশে ফুল ফুটিয়ে।
৩১. একমাত্র সাহিত্যের ভেতর দিয়েই হিন্দু মুসলমানের পরস্পরের প্রতি অশ্রদ্ধা দূর হতে পারে।
৩২. বাঙলা সাহিত্য হিন্দু মুসলমান উভয়েরই সাহিত্য।
৩৩. আমাদের সবচেয়ে বড় অভাব কথা সাহিত্যিকের।
৩৪. কথা-সাহিত্য ছাড়া শুধু কাব্যের মধ্যে আমাদের জীবন, আমাদের আদর্শকে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন না কেউ।
৩৫. কবি আর বুলবুল পাপ করে, তারা পাপের অস্তিত্বিই মানে না বলে। ভুল- ভুলের কাঁটায় ফুল ফোটাতে পারে বলে।
৩৬. পদ্ম তার আনন্দকে শতদলে বিকশিত করতে পারে বলেই কি ওটা পদ্মের বাড়াবাড়ি?
৩৭. অধিকাংশ কবিই জীবিতকালে শুধু লাঞ্ছনা আর বিড়ম্বনাই ভোগ করেছেন।
৩৮. জনসাধারণের যে সমস্যা, তা সাহিত্যিকরাই সমাধান করতে পারবেন।
৩৯. অর্থ দিয়ে মাড়োয়ারীকে, জমিদার-মহাজনকে বা ভিখিরীকে হয়তো খুশি করা যায়, কবিকে খুশি করা যায় না ।
৪০. কবিতা আর দেবতা- সুন্দরের প্রকাশ।
সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী