মিলাদ ও কিয়ামের দলিল
মিলাদ ও কিয়াম হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আত্মিক মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ, যা যুগে যুগে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে নবী পাক (সা.) এর স্মৃতিকে জাগ্রত করে রেখেছে। মিলাদ অর্থ নবীর ﷺ জন্ম ও জীবনকে স্মরণ করে প্রশংসা করা, আর কিয়াম হলো দাঁড়িয়ে নবীর রুহানী আগমনকে সম্মান জানানো। কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমার যিকির আমি উচ্চ করেছি” (সূরা ইনশিরাহ), আর নবীর জন্মকে আল্লাহ নিজে “রহমত” বলেছেন (সূরা ইউনুস ৫৮)। সাহাবায়ে কেরাম নবীজির জন্মদিন স্মরণ করতেন, এবং বহু ইমাম ও ওলী আউলিয়া মিলাদ-কিয়ামকে নেক আমল হিসেবে গণ্য করেছেন। সুফি দর্শনে এটি আত্মার প্রেমময় জাগরণ, যেখানে প্রেমিক মুরিদ দাঁড়িয়ে প্রিয় নবীর ﷺ রুহানী সৌরভে মাথা নত করে।
বর্তমানে একশ্রেণীর বকধার্মিক গোষ্ঠী এমন পবিত্রতর আমল মিলাদ ও কিয়াম প্রসঙ্গে উদ্দ্যেশ্যমূলক ভাবে বিষোদ্গার করেই যাচ্ছে। তাদের অবগতির জন্য আমাদের আজকের আয়োজন।
কোরআনের আলোকে মিলাদ –
১. যখন আল্লাহ তায়ালা সমস্ত নবীদের কাছ থেকে ওয়াদা নিলেন যে আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত দান করবো তারপর যখনই আমার রাসুল (সা.) তোমাদের নিকট আসবে তোমার তাঁর প্রতি ঈমান আনবে ও সাহায্য করবে। – আল ইমরান ৮১
২. নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য হতে একজন সম্মানিত রাসুল এসেছেন। – তওবা ১২৮
৩. হে নবী, আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্কতাকারী রূপে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী ও উজ্জল প্রদীপরূপে। – আহযাব ৪৫,৪৬
৪. আমি তো আপনাকে বিশ্বজগতের রহমত রূপে প্রেরণ করেছি। – আম্বিয়া ১০৭
৫. আমিতো আপনাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি। – সাবা ২৮
৬. নবী মোমিনদের নিকট তাঁদের জানের চেয়েও বেশি প্রিয়। – আহযাব ৬
৭. কেউ রাসুলের আনগত্য করল, সে যেন আল্লাহর ই আনগত্য করল। – নিসা ৮০
৮. আর আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত। – কালাম ৪
৯. তিনি (নবী সা.) কখনোই মনগড়া কথা বলেন না, ইহা তো ওহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। – নাজম ৩,৪
১০. যারা আপনার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করল, তারা আল্লাহর হাতেই বাইয়াত গ্রহণ করল, নিশ্চয়ই আল্লাহর হাত আপনার হাতের ওপর রয়েছে। – ফাত্তাহ ১০
আরো আয়াত সমূহ –
১১. সুরা নিসা ৬৪, ৭৯, ৮০, ১০৫, ১৭০
১২. সুরা আরাফ ১৫৮
১৩. সুরা আহযাব ৪০, ৫৬
১৪. সুরা মুহাম্মাদ ২, ৩
১৫. সুরা ইউসুফ ৩
১৬. সুরা কাসাস ৮৬
১৭. সুরা ইবরাহিম ১
১৮. সুরা কিয়ামাহ ১৬, ১৭, ১৮, ১৯
১৯. সুরা আলা ৬, ৭
২০. সুরা আল ইমরান ১৬৪
২১. সুরা জুমুয়া ২
২২. সুরা নাহল ৪৪
২৩. সুরা মায়িদা ৬৭
২৪. সুরা ফুরকান ৫৬, ৫৭
২৫. সুরা মুনাফেকুন ৮
অন্যান্য নবীগণ আখেরী নবী (সা.) এর প্রতি মিলাল কিয়াম করেছেন, তার দলিল –
১. আদি পিতা আদম ও বিবি হাওয়া এর ওপর ৩৪০ বছর কান্নার পর আরাফার ময়দানে রাসুল (সা.) এর প্রতি সালাত সালাম সহ ঐ নামের উঠিলা নিয়ে ক্ষমা চাওয়ায় আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেন।
২. প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর পূর্বে হযরত ইবরাহিম আ. আমাদের নবী করীম সা. এর মিলাদুন্নবী নিয়ে আলোচনা করেন।
৩. ঈসা নবী রাসুলে পাক সা. এর মিলাদুন্নবী নিয়ে আলোচনা করেন।
হাদীসে মিলাদ কিয়াম
১. রাসুলে পাক সা. বলেন, আমি ইবরাহিম আ. এর দোয়া, ঈসা আ. এর সুসংবাদ ও আমার মায়ের চাক্ষুস দরশন। তিনি আমাকে প্রসবকালীন সময় দেখেছিলেন। নিশ্চয়ই তার মধ্য হতে এমন একটি নূর প্রকাশিত হয়েছে যার দ্বারা শাম দেশের বড় বড় দালানগুলোও আলোকিত হয়েছে। তিরমিজি ২০৩, মেশকাত ৫১৩, মেরকাত শরহে মেশকাত ১০খন্ড ৪৩৯ পৃষ্ঠা।
২. আবু হুরায়রা বলেন, রাসুলে পাক (সা.) বলেছেন, সৃষ্টি জগতে আমিই প্রথম নবী, প্রেরিত হয়েছি সবার শেষে। মেরকাত শরহে মেশকাত ১০খন্ড ৪৩৯ পৃ., শিফা শরীফ ১ম জি. ২৬৬পৃ.
৩. ইবনে আব্বাস বলেন, রাসুলে পাক সা. এর মিলাদের কথা বা জন্ম বিবরণী তার ঘরে বসে বর্ণনা করছিলেন। এমন সময় রাসুলে পাক সা. সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন, তোমাদের জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে গেল।
৪. আবু দারদা হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি একদা রাসুলে পাক সা. এর সঙ্গে আমির আনছারী এর ঘরে প্রবেশ করলাম। সে সময় আমির আনছারী তার ঘরে তার সন্তান ও আত্মীয়দের একত্র করে রাসুলে পাক সা. এর মিলাদ তথা জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা করছিলেন। তা দেখে রাসুলে পাক সা. সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, হে আমির! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য রহমতের দরজা খুলে দিয়েছেন এবং সকল ফেরেশতা তোমাদের জন্য রহমত প্রার্থনা করছে।
কিয়াম বা দাঁড়ানো প্রসঙ্গে দলিল
কোরানে আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি ঈমান আনো, তাকে তাজিম করো ও সাহায্য করো। (ফাত্তাহ ৯)।
হাদীস ১ – সাইদ খুদরী হতে বর্ণিত, যখন বনু কুরাইজা হযরত সাদ ইবনে মুয়াজ এর ফায়ছালার সম্মতি প্রকাশ করল তখন রাসুলে পাক সা. তাকে ডাকলেন আর সাদ রাসুলের গৃহের নিকট অবস্থান করছিল। তিনি একটি গাধার ওপর ছওয়ার হয়ে এসেছিলেন। যখন তিনি মসজিদের নিকট পৌঁছালেন তখন রাসুল আনসার সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা তোমাদের সর্দারের প্রতি দাঁড়াও। বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ।
হাদীস ২ – হাছান ইবনে ছাবিত বলেন, দয়াল নবীজির সম্মানে দাঁড়ানো আমার জন্য ফরজ। আর ফরজ তরককারী সঠিক পথের পথিক নয়।
হাদীস ৩ – হযরত আয়েশা বলেন, আচার আচরণ ও চাল চলনে এবং মহত্তম চরিত্রে ফাতেমা অপেক্ষা অন্য কাউকে রাসুলে পাক সা. এর অধিক নিকটবর্তী আমি কাউকে দেখিনি। ফাতেমা যখন নবীজির কাছে আসতেন, তখন নবীপাক দাঁড়িয়ে তার হাত ধরে চুমু খেতেন। আবার যখন রাসুলে পাক সা. ফাতেমার কাছে যাইতেন তখন ফাতেমা দাড়িয়ে নবীজির হাতে চুমু খেতেন ও স্বীয় আসনে বসাতেন। তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মেশকাত ৪০২পৃ. মেরকাত ৮ম খন্ড ৫০৪পৃ.।
হাদীস ৪ – রাসুলে পাক সা. বলেন, আমি মেরাজের রাত্রে কাছিফে আহমের বা লাল বর্ণের উপাত্যকায় হয়রত মুসা আ. এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। এমতবস্থায় আমি তাকে দাড়িয়ে সালাত পাঠ করতে দেখলাম। মুসলিম ২৩৭৫, নাসাই ১৬৩৪। তাফসিরে রুহুল মায়ানী ১৫খন্ড ৪৩৫পৃ.।
ফকিহ, মুজতাহিদ ও মনীষীগণের অভিমত
১. জালালুদ্দিন শিউতী বলেন, রাসুলে পাক সা. এর মিলাদ উপলক্ষ্যে শুকরিয়া আদায় করা মুস্তাহাব। রুহুল বায়ান ৯ খন্ড ৬৪ পৃ., সিরাতে হালবিয়া ১ম খন্ড ১২৪ পৃ., আল হাদীলিল ফাতুয়া ১ম খন্ড ২৫৫ পৃ.।
২. তকীউদ্দিন ছুবুকীর দরবারে একদা রাসুলে পাক সা. এর শানে কাছিদা পাঠ করা হয় ঐ সময় ইমাম ছুবুকী মহব্বতের জোশে দাড়িয়ে গেলেন এবং সকলেই দাড়িয়ে গেলেন। রুহুল বায়ান ৯ খন্ড, সিরাতে হালবিয়া ১ম খন্ড ১২৩ পৃ.।
৩. ইবনে হাজার আসকালানী বলেন, মিলাদ কিয়াম করা ও এর উদ্দেশ্যে লোক জমায়েত করা মুস্তাহছান বা অতিব উত্তম কাজ। মাওলুদুন কবীর।
৪. আব্দুল হক মুহাদ্দেছ দেহলভী এক মোনাজাতে বলেন, হে আল্লাহ মিলাদের অনুষ্ঠানে আমি নবী পাক সা. কে দাঁড়িয়ে সালাম দেই। সেই আমলের উছিলায় তুমি আমাকে কবুল কর। আখবারুল আখিয়ার ৬২৪ পৃ.।
৫. জাওযী ও ইমাম কুস্তলানী বলেন, মিলাদ শরীফের খুছুছিয়াত হল এর উছিলায় লোকেরা ঐ বছর পর্যন্ত নিরাপদ থাকবেন। ইনছানুল উযুন ১ম খন্ড ১২৪ পৃ., রুহুল বায়ান ৬৪ পৃ., মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া ১মখন্ড ১৪৮ পৃ.।
৬. কেরামত আলী জৌনপুরী বলেন, রাসুলে পাক সা. এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন পূর্বক মিলাদ কিয়াম করা হয়। তাই মিলাদ কিয়ামের প্রতি অসম্মান মূলত রাসুলে পাক সা. কেই অসম্মান করা। আল মুলাখখাছ।
৭. শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলভী বলেন, আমার পিতা প্রতি বছর ১২ রবিউল আউয়াল মিলাদ মাহফিল আয়োজন করে লোকেদের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য লোকেদের মধ্যে বিতরণ করতেন। হাকীকতে মুহাম্মদী ৩০১ পৃ.।
৮. এমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মাক্কী বলেন, এ ফকিরের নিয়ম এই যে, আমি মিলাদে মুস্তফায় শরীক হই এবং বরকতের আশায় প্রতি বছর মিলাদের আয়োজন করি। আর কিয়ামে আত্মায় শান্তি পাই। ফায়ছালায়ে হাফতে মাছায়েল।
৯. আশরাফ আলী থানভী বলেন, মিলাদ মাহফিল মুস্তাহাব, আর মুস্তাহাব মাহফিল ছেড়ে দেয়া উচিত নয়। (মাজালিছে হাকিমুল উম্মত ২৩১ পৃ.)
১০. শামছুল হক ফরিদপুরী বলেন, নবী সা. কে বসে বসে সালাম দেয়া বেয়াদবী। তাছাওফ তত্ত্ব ৪১,৪২ পৃ.।
কদমবুছি বা পদচুম্বন বিষয়ক দলিলসমূহ
কদম শব্দের অর্থ পা । আর বুছি শব্দের অর্থ চুমু বা চুম্বন । সুতরাং কদম বুছির পূর্ণ অর্থ হলো পদ চুম্বন বা পায়ে চুমু দেওয়া । দলিলে উল্লেখিত পীর, ওস্তাদ, পিতামাতা, ন্যায় পরায়ন বাদশা, দ্বীনদার পরহেজগার সম্মানিত ব্যক্তিদের পায়ে চুমু দেওয়াকে শরীয়তের পরিভাষায় কদম বুছি বলা হয় । ইসলাম ধর্মে মানব চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন, ন্যায়নীতি, আদব বা শিষ্টাচার এবং সুবিচার ভিত্তিক শান্তি শৃঙ্খলাপূর্ণ গতিশীল সামাজিক পরিবেশ গঠন ও সংরক্ষণের যাবতীয় বিষয় নিহিত রয়েছে । তার মধ্যে আদব বা শিষ্টাচার ইসলাম তথা বিশ্ব মানবতার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় । মানব চরিত্রে আত্মহংকার, অহংবোধ, আমিত্ব ও অহমিকা দুরীকরণের উত্তম পন্থা হলো কদম বুছি । যুগ যুগ ধরে মানুষ আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের জন্য নবী রাসুল ওলী আল্লাহ ও পীর মুর্শিদের সান্নিধ্যে গিয়ে তাদের কদম বুছি করে থাকেন । মহান আল্লাহকে পাবার উছিলা হিসাবে আপন মুর্শীদের প্রতি আদব প্রদর্শন মুরীদের আমিত্ব খর্ব, পূর্ণ আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ এবং তাঁর নেক দোয়া কামনা করার উপায় হিসাবে মুরীদ কর্তৃক পীর কেবলা কে কদম বুছি করা সম্পুর্ণ দলিল সম্মত । ইহা সালেক বা মুরীদের জন্য অত্যান্ত আধ্যাত্মিক উন্নত ও ফজিলতের আমল । পরম করুণাময় আল্লাহতে আত্মহুতি দেওয়া ও পরিপূর্ণ রূপে আত্মসমর্পনের হাকিকত ইহাতে বিদ্যমান । (মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী) ইসলাম ধর্মে আদব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় । রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের আদব শিক্ষা দিয়েছেন । ইসলামী আদর্শ আদব ও শিষ্ট চারিতা অতি চমৎকার যাহা সকলেরই প্রাপ্য অধিকার । স্নেহ মমতা, শ্রদ্ধা সম্মান, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের শিক্ষা ইসলামে দেওয়া হয়েছে । রাসুলে পাক (সঃ) এরশাদ করেন : যে বড়দের সম্মান করেনা এবং ছোটকে স্নেহ করে না সে আমার উম্মতের অন্তর্ভূক্ত নয় । (তিরমিজী ও মেশকাত)
সম্মান প্রদর্শন বিভিন্ন ভাবে করা যেতে পারে । যেমন ছালাম দেওয়া, বয়স্কদের পিছনে চলা, বিনয়ী ও নিম্ন স্বরে কথা বলা, গুরুজনদের আগমনে সম্মানে দাঁড়িয়ে যাওয়া, কাজ কর্মে সহযোগিতা করা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এগিয়ে দেওয়া এবং সাক্ষাতে হাত ও পায়ে চুম্বন করা । আদব ভদ্রতা সভ্যতা বিনয়ী নম্রতা, মানবতা, শ্রদ্ধা ভক্তি প্রেমপ্রীতি ভালবাসা স্নেহ মমতা ইত্যাদি মানব চরিত্রের উত্তম ভূষণ । যার অন্তর্নিহিত স্বরূপটি হলো ইসলাম তথা আল্লাহ প্রদত্ত শান্তি । যখন কোন পরিবারে সমাজে ও রাষ্ট্রে উক্ত গুণাবলী যথা রীতি প্রয়োগ হয়, তখন সেখানে আর অশান্তি অধর্ম বৈষম্য দ্বন্ধ কলহ বিচ্ছেদ কিছুই থাকে না । প্রীতি প্রেমের পুণ্য বাধনে মানব কুল যেন চীর শান্তি ধামে বসবাস করে । কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমানে এক শ্রেণীর লোকেরা কদমবুছি প্রসঙ্গে নানা রকম বিরূপধারনা (সৃষ্টি করছে) সমাজে সমালোচনা, মিথ্যা ফতোয়া ইহা ইসলাম বিরোধী, শিরক বিদয়াত ইত্যাদি বলে সরলমনা মানব মনে ভ্রান্ত ধারনা সৃষ্টি করছেন । ফলে কিছু সংখ্যক মানুষ তাদের ফতোয়ার খপ্পরে পড়ে ওলী আউলিয়া পীর মুর্শিদ পিতা মাতা কে কদম বুছি করা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর রহমত বরকত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। হযরত রাসুলুল্লাহ (সঃ) এরশাদ করেন : আল্লাহর কছম আমার এমন বিষয়ের কোন ভয় নেই যে তোমরা আমার পরে শিরক করবে (বোখারী শরীফ, কিতাবুল জানাযা বাবঃ আসসালাতু আলা শহীদ, হাদিস নং ১২৭৯) প্রিয় পাঠক যেখানে হুজুর (সঃ) কছম করে বলেন যে তার উম্মত শিরক করবেনা সেখানে কিছু সংখ্যক লোক যেখানে সেখানে শিরকের ফতোয়া দিয়ে থাকেন তবে কি ? উনারা উক্ত হাদিস খানা পড়েন নাই ? অথচ উক্ত হাদিসে নবীদের উম্মত শিরক করবে না এ ব্যাপারে নবীজির কোন ভয় ও চিন্তা ও নেই । (ছোবহানাল্লাহ)
প্রমাণ হয়ে গেল দয়াল নবীজির যারা উম্মত তারা কখনও শিরক করে না । আর কদম বুছি কোন শিরক বা নাজায়েয আমল নয় বরং সুন্নতে সাহাবা, অতি উত্তম ছওয়াবের কাজ ইহাতে কোন রূপ সন্দেহের অবকাশ নাই।
কদম বুছির দলিল – হাদিস শরীফ
হাদীস-১ : হযরত ওয়াজি ইবনে আমের (রাঃ) বলেন আমরা যখন মদীনা শরীফে এসে পৌঁছলাম। বলা হলো ইনি আল্লাহর রাসুল আমরা তখন তাঁর হস্তদ্বয় ও পদদ্বয় ধরে চুমু খেলাম (আল আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারী, কিতাবুস সালাম । বাব তাকবীলির রিজাল, হাদিস নং ৯৭৫)
হাদীস-২ : হযরত যারেঈ (রাঃ) যিনি আবদুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধি দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন আমরা যখন মদীনা শরীফে আগমন করলাম তখন আমাদের বাহন হতে তাড়াতাড়ি নেমে পড়লাম এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর হাত মোবারক ও পা মোবারক চুম্বন করলাম । (আবু দাউদ শরীফ, কিতাবুল আদব) সালাম, বাব কুবলাতির রিজাল, এবং মিশকাত শরীফ কিতাবুল আদব বাবঃ মুসাফাওয়া মুয়ানাকা) গ্রন্থে বর্ণিত ২নং হাদিস শরীফটি নিম্নের কয়েকটি হাদিস গ্রন্থে রয়েছে –
যথাঃ
১ । তারীখুল কবীর ইমাম বুখারী ৪র্থ খন্ড ৪৪৭ পৃঃ হাদিস নং ১৪৯৩
২ । আল মুসান্নাফ ইমাম ইবনে আবি শায়রা । ৮/৫৬২ পৃ.
৩ । আবু দাউদ শরীফ কিতাবুল আদব । হাদিস নং ৫২২৫ ।
৪ । মুজামুল কবীর ইমাম তাবরাণী ৫/২৭৫ পৃ. হাদিস নং ৫৩১৩
৫ । আস সুনানে কুবরা, ইমাম বায়হাকী ৭/১০২ পৃ. হাঃ নং ১৩৩৬৫ ৬। মিশকাত শরীফ, খতিব তিরমিজী ৩/১৩২৮ পৃ. হাঃ নং ৪৬৮৮
৭ । শুয়াবুল ইমান, ইমাম বায়হাকী ১১/২৯৪ পৃ. হাঃ নং ৮৫৬০
৮ । তালখীসুল হবির ইবনে হাজর আসকালীন ৪/৯৩ পৃ. হাঃ নং ১৮৩০
৯। আশিয়াতুল লুমআত, শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দেসে দেহলবী ৩/৫০৮ পৃ. হা. নং ৪৬৮৮
আরও অনেক গ্রন্থে উক্ত হাদিস শরীফটি উল্লেখ রয়েছে ভেবে দেখুন এতগুলো হাদিস গ্রন্থে যে হাদিস খানা রয়েছে সে হাদিস কোন দিন ও জইফ হতে পারে না । অবশ্যই হাদিস খানা সহীহ ।
হাদীস- ৩ হযরত যাক ওয়ান বর্ণনা করেন হযরত সুয়াইব (রাঃ) বলেন আমি হযরত আলী (রাঃ) কে (স্বীয়চাচা) হযরত আব্বাস (রাঃ) এর হাত ও দুই পায়ে চুম্বুন করতে দেখেছি । (আল আদাবুল মুফরাদ । ইমাম বুখারী কিতাবুস সালাম বাবঃ তাকবীলির রিজাল হাদিস নং ৯৭৬ ও মিশকাতুল মাসাবীহ কিতাবুল আদব)
হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন সাহাবী এবং হযরত আব্বাস (রাঃ) ও ছিলেন সাহাবী কিন্তু হযরত আব্বাস (রাঃ) ছিলেন হযরত আলী (রাঃ) এর চাচা । তাই মুরব্বী হিসাবে হযরত আলী (রাঃ) তাঁর হাত ও পায়ে চুমু খেয়েছেন । উক্ত হাদিস হতে ইহাই প্রমাণ হলো যে কদম বুছি শুধু রাসুলের জন্য খাস নয় মুরব্বী তথা বয়োজ্যেষ্ঠদের কদম বুছি করা বেলায়েতের সম্রাট মওলা আলী (রাঃ) এর আমল দ্বারা প্রমাণিত ।
হাদীস- ৪ : হযরত সুদ্দী (রাঃ) বলেন, রাসুল (সঃ) একদিন রাগান্বিত অবস্থায় খুতবায় দাঁড়িয়ে বললেন আমাকে জিজ্ঞাসা কর, তোমরা যা যা প্রশ্ন করবে আমি সব কিছুই বলে দিব । অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে হুজাইফা দাঁড়ালেন এবং বললেন ইয়া রাসুলুল্লাহ আমার পিতাকে ? নবীজি বললেন তোমার পিতা অমুক অতঃপর সে তার পিতাকে ডাকলেন তখন হযরত উমর (রাঃ) ভয়ে প্রিয় নবীজির প্রতি দাঁড়ালেন এবং হুজুর (সঃ) এর কদম (পা) মোবারকে চুম্বন করলেন এবং বললেন ইয়া রাসুলুল্লাহ আমরা আল্লাহকে রব হিসাবে আপনাকে নবী হিসাবে ইসলামকে দ্বীন হিসাবে এবং কোরআনকে ইমাম হিসাবে পেয়ে খুশি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন । আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের ক্ষমা করবেন । (তাফসীরে তাবারী শরীফ ৭ম খন্ড ৮৯নং পৃ. হাদিস নং ১২৮০১)
ইবনে কাসীর তার তাফসীরের মধ্যে সুরা মায়িদা ১০১ নং আয়াতের ব্যখ্যায়ও উক্ত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন । (তাফসীরে ইবনে কাসীর ২য় খন্ড ৬২৮ পৃ. জাকারিয়া বুক ডিপো দেওবন্দ, সাহারানপুর ভারত, এবং তাফসীরে দুররে মানসুর ৩য় খন্ড ২০৫ পৃ. বৈরত লেবানন)
হাদীস-৫ : হযরত মুয়াবিয়া ইবনে জাহিমা (রাঃ) রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসুলুল্লাহ আমি যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা করেছি এখন আপনার নিকট পরামর্শ করতে এসেছি । নবীজি বললেন তোমার মা আছে কি ? সে বললো হ্যা তখন নবীজি বললেন তুমি তাঁর খেদমতে লেগে থাক । কেননা জান্নাত তাঁর দুপায়ের নিচে। (সুনানে নাসাই, কিতাবুল জিহাদ, বাবুর রূখসাতি ফীতাখাল্লাফি লিমান লাহু ওয়ালিদা) ।
হাদীস-৬ : একদিন এক লোক রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট আসলেন এবং বললেন তিনি একটি মানত করেছিলেন যে আল্লাহ তায়ালা যদি আপনাকে মক্কা বিজয় দান করেন তবে তিনি কাবা শরীফ যাবেন এবং কাবার দরজা চুমু দিবেন । তখন হুজুর (সঃ) তাকে নির্দেশ দিলেন তুমি বাড়ী যাও এবং তোমার মায়ের পায়ে চুমু দাও । তাহলে তোমার মানত পুরন হয়ে যাবে । (উমদাতুলক্বারী শরহে বুখারী ২য় খন্ড) নীতু চট্যান্ডার
হাদীস-৭ : মেরাজের পূর্বে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে হানির ঘরে বিশ্রামে ছিলেন । এমন সময় জিব্রাইল (আঃ) আসলেন হুজুর (সঃ) এর সাথে যেন বেয়াদবী না হয় সেজন্য জিব্রাইল (আঃ) রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে ডাক দিলেন না তার দুই ঠোট হুজুর (সঃ) এর কদম মুবারকে লাগিয়ে দিলেন অর্থাৎ কদম বুছি করলেন । তখন রাসুলে পাক (সঃ) জিব্রাইল (আঃ) কে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন । জিব্রাইল (আঃ) তখন মেরাজে যাওয়ার সুসংবাদ দিলেন । (সূত্র মুসনাদে আউলিয়া)
কদম বুছির সমর্থনে অনেক হাদিস রয়েছে এ গ্রন্তে মাত্র কয়েকটি হাদিস তুলে ধরলাম । বিস্তারিত জানতে বিজ্ঞ লেখকদের কিতাব সমূহ পড়ার অনুরোধ রইল । আশা করি আসল সত্যটি জানতে পারবেন ।
ফকিহ্ মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিসগণের অভিমত –
অভিমত-ক বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফতহুল বারী শরহে বুখারী এর মধ্যে আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী (রাঃ) বলেন, হাদিস শরীফ দ্বারা হাত বুছি ও কদম বুছির বৈধতা ও অনুমোদন প্রমাণিত । তবে ইমাম মালেক ও ইমাম আবহারী এগুলোকে মাকরুহ বলেছেন যদি বড়ত্ব ও অহমিকা প্রকাশের উদ্দেশ্যে হয় । কিন্তু যদি আল্লাহ তা’লার নৈকট্য বান বান্দা বা জ্ঞানগত সম্মান ও মর্যাদার কারণে হয় তাহলে উহা নিঃসন্দেহে জায়েজ । (ফতহুল বারী শরহে বুখারী ১১তম খন্ড ৫৭ পৃ.)
অভিমত- খ : বুখারী শরীফের মুকাদ্দামায় আল্লামা আহমদ আলী সাহারান পুরী (রঃ) বলেন, একদা ইমাম মুসলিম (রঃ) হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) এর সাক্ষাত লাভে ধন্য হওয়ার জন্য আগমন করে ইমাম বুখারীর উভয় চোখের মাঝ খানে চুম্বন করলেন । অতঃপর তিনি ইমাম বুখারীকে সম্বোধন করে বললেন হে শিক্ষক কুল শিরোমনি মুহাদ্দিসগণের সম্রাট ও হাদিসে রাসুল (সঃ) এর কারণ সমূহ অনুসন্ধানে ডাক্তারের ভূমিকা পালনকারী সম্মানিত ও পবিত্র সত্তা । আমাকে একটু মেহেরবাণী করে আপনার পদ যুগল চুম্বন করে ধন্য হওয়ার সুযোগ দিন। (মুকাদ্দামাতু সহীহ বুখারী ৩ পৃ. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১১/৩৩)
অভিমত গ : মিশকাত শরীফের ব্যাখাকার আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রাঃ) বর্ণনা করেন, চুমু দেয়া মাকরুহ হবে না যখন তা কোন পরহেজগারিতা ইলম বা জ্ঞান ও বয়োজ্যেষ্ঠের কারণ হয় । ইমাম নববী (রহ) বলেন, কদম বুছি যদি ব্যক্তির জ্ঞানগত মর্যাদা খোদাভীরুতা ও ধার্মিকতা ইত্যাদি কারণে হয় তাহলে মাকরুহ তো হবেই না বরং মুস্তাহাব বা উত্তম আমল হিসাবে বিবেচিত হবে। (মিরকাত শরহে মিশকাত ৯ম খন্ড ৭৬ পৃ.)
অভিমত- ঘ : শায়খ মুহাদিস আবদুল হক দেহলভী (রহ) বলেন, পরহেজগার আলেমদের হাত চুম্বন জায়েজ এবং কেহ কেহ বলেন ইনসাফ ও দ্বীনের সম্মানার্থে চুমুদেয়াতে কোন দোষ নেই তবে দুনিয়াবী স্বার্থ সিদ্ধির লক্ষ্যে হলে তা অবশ্যই মাকরুহ ।
হাদিস শরীফে সাহাবায়ে কেরাম কর্তৃক রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কদম বুছি বা কদম মুবারক চুম্বন করার একাধিক বর্ণনা এসেছে। সুতরাং গ্রহণ যোগ্য মত এটাই যে সফর থেকে ফিরে এসে সাক্ষাতের সময় মুয়ানাকা ও চুম্বন করা জায়েজ মাকরুহ নয় (আশি আতুল লুমআত শরহে মিশকাত ৪র্থ খন্ড ৩৩ পৃ. মোজাহিরুল হক্ক ৪র্থ খন্ড ৬০পৃ.)
অভিমত-ঙ : ইমাম নববী (রহ) বলেন কেউ যদি কারো পরহেজগারী ইলম যোগ্যতা ভদ্রতা, সত্যবাদিতা, পুণ্যশীলতা অনুরূপ দ্বীনি কার্যকলাপ দেখে হাত চুম্বন করে তা মাকরুহ নয় বরং মুস্তাহাব । পক্ষান্তরে কেউ যদি কারো জাঁকজমক ধনসম্পদ প্রভাব প্রতিপত্তি ইত্যাদির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে হাত পা চুম্বন করে তাহলে সেটা কঠোর মাকরুহ বরং হারাম । (মিশকাতুল মাসাবীহ এর কিতাবুল আদবের মুসাফা ও মুয়ানাকা পরিচ্ছেদের কদমবুছি বিষয়ক হাদিসের টিকা হাদিস নং ৪৪৮৩) উপরোক্ত দলিলের মাধ্যমে স্পষ্ট প্রমাণ হয়ে গেল যে, বিশ্ব বিখ্যাত মুহাদ্দিসগণের মতে ও কদম বুছি বা পদ চুম্বন জায়েজ ।
দেওবন্দী ওলামাগণের অভিমত
অভিমত-১ : মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর অভিমতঃ দ্বীনদার ব্যক্তির সম্মানে দাঁড়ানো ও তাদের পায়ে চুমু খাওয়া বৈধ এবং তা হাদিসে রাসুল দ্বারা প্রমাণিত । (ফতুয়ায়ে রশীদিয়া ১/৫৪ পৃ.)
অভিমত-২ : মাওলানা আশরাফ আলী থানভির অভিমত-১ ঃ কদম বুছি (পদ চুম্বন) মূলতঃ একটি জায়েজ আমল । (এমদাদুল ফতোয়া, ৫ম খন্ড, ৩৪৫ পৃ)
অভিমত-৩ : থানভী সাহেবের অভিমত:২ : আলেম, পিতা-মাতা ইত্যাদির হাত ও পায়ে চুম্বন করা জায়েজ । (এমদাদুল আহকাম-১ম খন্ড পৃষ্ঠা-১৩৫)
অভিমত-৪ : থানভী সাহেবে অভিমত ৩ঃ থানভী সাহেব আত্তাকাশুফ গ্রন্থে একটি হাদিসের উদ্ধৃতি করে বলেন- এই হাদিসের জ্ঞাতব্য মূল কথা হলো পীরের প্রতি মুরিদগনের অভ্যাস হল স্বীয় পীরের হাত-পা ও কপালে চুম্বন করা, সুতরাং এতে কোন অসুবিধা নেই । তবে খেয়াল রাখতে হবে এ ক্ষেত্রে শরয়ী হুকুমের কোন ব্যত্যয় যাতে না ঘটে । (আত্তাকাশুফ ৪২৪ পৃষ্ঠা) ।
অভিমত-৫ : মুফতি মুহাম্মাদ শফি (পাকিস্তান) এর অভিমত ঃ মুফতি শফি সাহেব বলেন, হযরত মায়খ মুহাম্মদ আবেদ সিনদী বলেছেন, তাকওয়াবান আলেম, ন্যায় পরায়ন বাদশা, ধর্মীয় দৃষ্টিতে সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী শুধুমাত্র এমন লোকদের হাত ও পা চুম্বন করা জায়েজ । (জাওহিরুল ফিকহ্ ৮ম খন্ড, ১৮৫ পৃঃ)
অভিমত-৬ : রশীদ আহমদ গাঙ্গুরীর উস্তাদ আহমদ সাঈদ দেওবন্দীর অভিমত: মিলাদ শরিফ পাঠ করা এবং হুজুর (সঃ) এর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা কালে কিয়াম বা দাঁড়িয়ে যাওয়া জায়েজ । এমনকি দ্বীনদার লোকের সম্মানের জন্য দাঁড়ানো জায়েজ । এরূপ লোকের পদ চুম্বন করাও জায়েজ । ইহা হাদিস দ্বারা স্যাব্যস্ত। (সূত্র : মাকামাতে সাঈদীয়াহ্)
অভিমত-৭ : মাওলানা মহিউদ্দিন খান দেওবন্দীর অভিমত বাংলাদেশে প্রচলিত একটি ইসলামী পত্রিকা ‘মাসিক মদীনা’ যার সম্পাদক হলো মাওলানা মহিউদ্দিন খান- তিনি কদম বুছি সম্পর্কে উল্লেখ করেন “হযরত আবদুল্লা ইবনে যোবাইর (রাঃ) যখন হাজ্জাজ বিন ইউসুফের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রওনা হন, তখন তার মা হযরত আছমা বিনতে আবু বকর (রাঃ) এর নিকট বিদায় নিতে গিয়ে হযরত অবদুল্লাহ ইবনে যোবাইর (রাঃ) উপুর হয়ে হাত ও পা চুমুতে সিক্ত করে দিতে লাগলেন । ( সুত্র: মাসিক মদীনা- মার্চ ২০০৩ সংখ্যা, ৪৩পৃঃ) ভারত বর্ষের (কওমী) দেওবন্দীর শ্রেষ্ঠ আলেমদের অভিমত হতে কদম বুছি বা পদ চুম্বন জায়েজ প্রমাণিত হলো । আহলে বাইত অনুসারী বিশ্বের সকল হক্কানী, রব্বানী, অলী আউলিয়া কেরামগণের দরবারে কদম বুছির প্রচলন ছিল এবং অদ্যাবধী আছে। বিধায় এই সুন্নাতে সাহাবার আমলটি কখনই শিরক হতে পারে না । উপরন্ত প্রতীয়মান হলো কদম বুছি বা পদচুম্বন উত্তম আমল ।
“সুরমাহ কুনদর চশমে খাকে আওলিয়া
তাববীনী যেবতে দাতা ইস্তিহা”
অর্থাৎ : আউলিয়া কেরামের পায়ের ধুলিকে চোখের সুরমা বানাও ফলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তোমার চোখের সামনে উদ্ভাসিত হবে । (মাওঃ জালাল উদ্দিন রূমী)
মানব দেহে পা এমন একটি অঙ্গ যা কাবার দিকে পীর উস্তাদের বাড়ীর দিকে, পিতা-মাতার দিকে এবং জন সমক্ষে লম্বা করে দিয়ে বসা ও শোয়া নিষেধ । ইহা করলে বেয়াদবী ও গুনাহ হয় । কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে এই পায়ের মর্যদাও মূল্য অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি করা হয়েছে ।
যেমন :
(এক) নামাজ আদায়ের মধ্যে রুকু দিয়ে দুপায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলীতে তাঁকিয়ে “ছোবহানা রাব্বিয়াল আজীম” (বিজোড় সংখ্যায়) বলতে হয় । অন্য কোন সময় অন্য কোথাও তাকিয়ে এরূপ বলার হুকুম নাই । শুধুমাত্র নামাজের রুকুর মধ্যে বলতে হয় । যার অর্থ : মহান প্রভু অতিপবিত্র বিচার্য: রুকুতে গিয়ে পায়ের আঙ্গুলী দেখে বেজোড় সংখ্যায় মহান আল্লাহর প্রশংসা করার ভেদ কী? রহস্য উৎঘাটন হলে পায়ের মর্যাদা ও কদম বুছি করার বিষয়টি আরও পরিস্কার হয়ে যাবে ।
(দুই) প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (সঃ) বিশ্ব মানবজাতিকে জানিয়ে দিলেন জান্নাত মায়ের পায়ের নিচে যে মায়ের পদচুম্বন করলো সে যেন জান্নাতের চৌকাঠে চুমু দিল । এ অমীয় বাণী দ্বারা পায়ের মূল্য ও মর্যদা বৃদ্ধি করা হয়েছে । (আল জান্নাতুল তাহতা আকদামিল উম্মুহাত)
(তিন) একজন চাকর তাঁর মুনিবের সাথে বেয়াদবী বা কোন অপরাধ জনিত কাজ করে ফেললো । অথবা যে কোন ব্যক্তি অপর কারোর সাথে অন্যায় বা অপরাধ কাজ করিল যার ফলে অপরাধীর উপর ভীষন রাগান্বিত হয়ে প্রতিশোধ ও শাস্তি দেওয়ার ক্রোধানলে কঠোর হৃদয় তৈরী হলো । এমতাবস্থায় অপরাধী ব্যক্তি যদি প্রতি পক্ষের মাথায় আর বুকে পীঠে হাত দিয়ে অপরাধ ক্ষমা চায় তাহলে ক্ষমা তো করবেইনা বরং রাগ গোস্বা আরও দ্বিগুণ হবে, কিন্তু যখন দুপা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইবে তখন সাথে সাথে কঠোর হৃদয় নরম হবে । রাগ গোস্বা প্রশমিত হবে এবং তৎসঙ্গে অপরাধীর প্রতি দয়া, ক্ষমা ও মায়া মমতায় হৃদয় ভরে যাবে, শত অপরাধ করলেও সে ক্ষমা পাবে । সুতরাং ভেবে দেখুন এক্ষেত্রে ও পায়ের মর্যদা নিহিত আছে। আমার এক জন উস্তাদ বলেছিলেন ‘বাবা’ পাও ধরলেই তো পা ও না ধরলে না পাও । অতএব পায়ে হাত দিলেই মানুষের দিলে রহম পয়দা হয় । ইহা অতীব ভাবিবার বিষয় ।
(চার) পিতা-মাতা উস্তাদ, পীর মুর্শিদ কে যখন আদবের সহিত কদম বুছি করা হয় তখন উনারা উদার মনে আল্লাহপাকের দরবারে নেক দোয়া আশির্বাদ করেন। ফলে সন্তান, মুরিদ, আল্লাহ পাকের অশেষ রহমত ও মুহাব্বত হাসিল করেন । এই নিয়ামত কদম বুছি বা পদ চুম্বন এর মাধ্যমেই প্রাপ্ত হয় । সুতরাং এখানেও পায়ের মূল্য ও মর্যাদা বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেল ।
প্রিয় পাঠক সমাজঃ গ্রন্থের কলেবর না বাড়িয়ে আসুন আমরা মহান প্রভুর দরবারে প্রার্থনা করি, হে মহান রাব্বুল আলামিন যে পথে আপনার নিয়ামত প্রাপ্ত সাহাবায়ে কেরাম, আউলিয়ায়ে কেরাম, হক্কানী, রব্বানী বুজর্গানেদ্বীনেরা চলেছেন তাঁদের তরীকা মতে আমাদেরকে পরিচালিত করুন সহি আমলে জিন্দেগী নছিব করুন ।
তাজিমী সিজদা – কোরআন ও হাদীস হতে দলিল
সিজদা শব্দের অর্থ : ইবাদতের জন্য মস্তক অবনত করা । আনুগত্য স্বীকার করা, নম্রতা ও বশ্যতা স্বীকার করা, আত্মসমার্পন করা, ও কাকুতি মিনতি সহ ষষ্ঠাঙ্গে মাথা নত হওয়া ইত্যাদি অর্থ ও বুঝায় ।
শাস্ত্রবিদগণ সিজদাকে সাধারণতঃ পাঁচ প্রকার উল্লেখ করেছেন । যথা- (১) আবু দিয়াত (২) ফরজিয়াত (৩) এবাহাত (৪) জাওয়াজা ও (৫) তাহিয়াত বা তাজিমী । ইসলামের মধ্যে দু’টি দিক রয়েছে একটি জাহেরী অপরটি বাতেনী সেই লক্ষ্যে কেউ কেউ সিজদাকে মোট দুই ভাগে ভাগ করেছেন । একটি হলো ইবাদতী সেজদা আর অপরটি হলো সম্মানের বা তাজিমী সিজদা । প্রথমত – ইবাদাতী সিজদা। এই সিজদাটি শুধুমাত্র মহান আল্লাহ্ পাকের জন্য নির্দিষ্ট, যা আদায়ের কিছু শর্ত রয়েছে যেমন অজু করা, নিয়ত করা, কিবলামুখী হওয়া, রুকু করা তাশবীহ পাঠ করা এবং ষষ্ঠাঙ্গে মাটিতে কপাল ও নাক রাখা । আর দ্বিতীয় – তাজিমী সিজদা। এই সিজদা আদায়ের কোন অযু কিবলামুখী তাসবীহ পাঠ ইত্যাদি শর্ত থাকে না। ইহা আল্লাহর প্রিয় মোমিন মুত্তাকীন, খাস বান্দাগণের সম্মানের জন্য নির্দিষ্ট । তাজিমী সিজদাটি নিয়ে মুসলিম সমাজে মতভেদ রয়েছে ।
এক শ্রেণীর লোক তাজিমী সিজদাকে শিরক ও হারাম বলে থাকেন, তাদের ফতোয়া হলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে মাথা নত করা যাবে না । বিচার্য, অনেক সময় অনেক কাজের প্রয়োজনেই জাতিধর্ম নির্বিশেষে প্রায় সবাই মাথা নীচু করে বা মাথা নীচু হয় তাই বলে সেটাকে সিজদা বলা হয় না এবং বলা যাবে ও না । কারণ আল্লাহ পাকের জন্য নির্দিষ্ট সিজদার নিয়ত ও নিয়ম কানুন রয়েছে । সুতরাং মাথা নীচু হলেই সেটা সিজদা হবে না এবং শিরিক ও হারাম কার্য্য ও হবে না । “ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়্যাত” । অর্থাৎ সকল কাজের ফলাফল নির্ভর করে নিয়তের উপর (বুখারী শরীফ) উদাহরণ স্বরূপ বলছি । মুসুল্লীগণ যখন মসজিদের ভেতরে নামাজ আদায় করে। তখন পিছনের কাতারের লোকদের সিজদা সামনের কাতারের লোকদের পায়ের পেছনে পড়ে, মসজিদের টাইলস বা মেঝেতে মাথা নত করা হয়, তবে এটা কি শিরক হবে ? অবশ্যই হবে না । কেননা আমাদের নিয়ত হলো আল্লাহকে সিজদা দেওয়া । কাজেই অনুধাবন করতে হবে যে, ইবাদতের জন্যে সিজদা এক মাত্র আল্লাহ্ পাকের প্রাপ্য । আর ইবাদতের জন্যে না হয়ে শুধুমাত্র (দলিল মতে) সম্মান সূচক সিজদা করা হয় উহাই তাজিমী সিজদা । যা অবশ্যই বৈধ ছিল । এখনো তা বৈধ বা জায়েজ আছে । তাজিমী সিজদা সম্পর্কে পবিত্র কোরআন হাদিস, ইমাম মজুতাহিদ ও পীর মাশায়েখগণের দলিল পেশ করছি।
পবিত্র কোরআনের দলিল
(১) সুরা বাকারা-৩৪নং আয়াত
(২) সুরা ইউসুফ- ১০০নং আয়াত
(৩) সুরা- আরাফ ১২০নং আয়াত
(৪) সুরা- হিজর ৩০নং আয়াত
(৫) সুরা বনি ইসরাঈল ৬১ নং আয়াত
(৬) সুরা কাহাফ ৫০নং আয়াত
(৭) সুরা ত্বাহা ১১৬নং আয়াত
(৮) সুরা ছোয়াদ ৭৩নং আয়াত
এখানে স্মর্তব্য, যে উপরিউক্ত আয়াতে যে সব সিজদার কথা বলা হয়েছে তাছিল মহান আল্লাহ্ পাকের আদেশ এবং নিছক সম্মান বা তাজিমী সিজদা ।
প্রিয় পাঠক : কোরআন শরীফের বহু আয়াত দ্বারা তাজিমী সিজদা জায়েজ প্রমাণিত হলো ।
হাদিস শরীফ এর দলিল
কদম বুছি বা পদ চুম্বন এর সপক্ষে যতগুলো হাদিস উল্লেখ করা হইয়াছে সে সকল হাদিস সমূহই তাজিমী সিজদার ক্ষেত্রে বৈধ দলিল কেননা কদম বুছি বা পদ চুম্বন করতে গেলে আদব মহব্বত ও সম্মানের সাথে মাথা নত করতে হয় । যাহা তাজিমী সিজদার অন্তর্গত । তার পরেও কয়েকটি হাদিস পাঠক সমাজে উপস্থাপন করছি।
হাদিস-১ : হযরত ইবনে খোজাইমা ইবনে সাবেত (রাঃ) তাঁর চাচা হতে বর্ণনা করেন যে ঘুমন্ত ব্যক্তি যেভাবে স্বপ্ন দেখে তিনি অনুরূপ স্বপ্ন দেখেছেন যে, তিনি রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর কপাল মোবারকে সিজদা মহানবী (সঃ) কে এ কথাটি বলা হলে, নবীজি বললেন তুমি স্বপ্নটি বাস্তবায়ন করো । এই বলে নবী করিম (সঃ) চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন এবং ইবনে খোজাইমার চাচা আবু খোজাইমা হুজুর (সঃ) এর কপাল মোবারকে সিজদা করলেন । (মেসকাত স্বপ্ন পূর্ব)
হাদিস-২ : একবার মহানবী (সঃ) কয়েকদিন অনাহারে ছিলেন । তিনি মসজিদে এসে উপবেশন করলেন । অতঃপর হযরত আবু বকর (রাঃ) আসলেন এবং বসলেন তারপর হযরত ওমর (রাঃ) এসে বসলেন রাসুলুল্লাহ (সঃ) যখন জানতে পারলেন একই কারণে তারাও ঘর হতে বের হয়েছে । তখন হুজুর (সঃ) বললেন তোমরা আমার সাথে তার নিকট চলো । এই বলে হুজুর (সঃ) তাদেরকে নিয়ে আবুল হুসাইন আনছারী (রাঃ) এর বাড়ীতে গেলেন । রাসুল (সঃ) বললেন আমরা কেন এসেছি জান কী ? তিনি বললেন হুজুর আপনি বলুন । হুজুর (সঃ) বললেন তুমি বলেছিলে যে আমার জন্য খেজুরের শীষ রেখেছো । এখন উহা আন আমরা সকলে খাবো একথা শুনে খুশীতে হযরত আবুল হুসাইন আনছারী (রাঃ) নবীজির কদম মোবারকের উপর লুটে পড়লেন । ( মুকতুবাতে সদী ৩ খন্ড ৬৯-৭০) ।
হাদিস-৩ : একদা রাসুলে করিম (সঃ) হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহর বাড়ীতে দাওয়াত খেতে যাবেন বিধায় । তিনি একটি বকরী জবেহ করেছিলেন ঐ দিনই বকরী জবেহ কিভাবে করেছেন তা দেখাতে গিয়ে হযরত জাবেরের বড় ছেলে ছোট ছেলেকে জবেহ করে মেরে ফেলে । তাঁর মা এ দৃশ্য দেখে দৌড়িয়ে কাছে গেলে বড় ছেলে ভয়ে ছাদে উঠে যায় এবং সেখান থেকে পড়ে গিয়ে সেও মারা যায় । খানা খাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ (সঃ) এ ঘটনা জানতে পেরে ছেলেদের জন্যে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন এবং সাথে সাথে দুই ছেলেকেই আল্লাহ পাক জীবিত করে দিলেন ঐ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে হযরত জাবের এবং তাঁর স্ত্রী হুজুর (সঃ) এর পদ তলে সিজদা করলেন (শাওয়াহেদুন নবুয়ত ১০৮-৯পৃ.)
হাদিস-৪ : আবু দাউদ তায়ালিসী (রহ) বলেছেন । মক্কার বাসিন্দা জাফর ইবনে ওসমান আল কুরাইশী (রহ) বলেন মুহম্মদ ইবনে আব্বাস ইবনে জাফর (রাঃ) কে আমি দেখেছি হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করেছেন এবং তাতে সিজদা করেছেন । তারপর আমাকে বলেছেন তোমার মামা ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে আমি দেখেছি তাকে চুমু খেতে এবং তাতে সিজদা করতে এবং ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) কে আমি দেখিছি তাকে চুমু খেতে এবং তাতে সিজদা করতে (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৫ম খন্ড ২৬২ পৃ.) ।
অত্র হাদিস দৃষ্টিতে প্রতীয়মান হয় যে আল্লাহর নির্দেশিত যেকোন পবিত্র স্থান ও বস্তুকেও তাজিমী সিজদা দেওয়া জায়েজ আছে । “আল্লাহ পাক এরশাদ করেন : অতঃপর বায়তুল মুকাদ্দিসের দরজা দিয়ে সিজদাবনত মস্তকে প্রবেশ কর এবং বল আমাদের গুনাহ মাফ করা হোক (বাকারা ৫৮) এ আয়াত থেকে জানা গেল যে পবিত্র স্থান তথা বায়তুল মোকাদ্দাস এ আল্লাহ পাক মাথা নত করে প্রবেশ করতে নির্দেশ দিয়েছেন । প্রমাণ হলো মাথা নত করলেই সেটা শিরক হবে না । শিরকের সংজ্ঞা জেনে ফতোয়া দেওয়া উচিত ।
ইমাম ও মুজতাহিদগণের তাজিমী সিজদা সপক্ষে মতামত
(১) তাফসীরে হক্কানী ৬ষ্ঠ খন্ড ৪৫ পৃ.
(২) তাফছিরে ফতুহুল আজিজ ১ম খন্ড ২৪৮ পৃ.
(৩) আশয়াতুল লুমাত (মেশকাতের শরার ১ম খন্ড)
(৪) ফতওয়ায়ে কাজী খান ৪র্থ খন্ড ৩৭৮ পৃ.
(৫) ফতওয়ায়ে আলমগীরী ৫ম খন্ড ৩৭৮ পৃ.
(৬) ফতওয়ায়ে আজিজিয়া (১৩২২হিঃ) ২য় খন্ড ২২১ পৃ.
(৭) ফতওয়ায়ে শামী ৪৪৪ পৃ.
(৮) জাওয়াহেরুল বিহার ১ম খন্ড ১৫২ পৃ.
(৯) মাদারেজুন নবুয়াত ১ম খন্ড ৪৪৮ পৃ.
(১০) মেশকাতুল মাসাবিহ ৩৯৬-৪০৮ পৃ.
(১১) তালবীহ ১৭৮ পৃ.
(১২) জামেনুর ৬৩ পৃ.
(১৩) মাদারেজুন নবুয়াত ২য় খন্ড ৩৯৪ পৃ.
(১৪) মমতাজুল ফতওয়া ১১২ পৃ.
(১৫) খাসায়েছুল কোবরা ১ম খন্ড ৩৪৫ পৃ.
(১৬) আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪৩৭/৩৮পৃ.
(১৭) তাফসীরে মোয়ালেমাত তানজীল ২১-২২ পৃষ্টা
(১৮) তাফসীরে মাদারেক ৪১ পৃ.
(১৯) তাফসীরে আবীছ সাউদ ১০৭ পৃ.
এই বর্ণনার সাথে তাফসীরে বাইযাবী ও তাফসীরে কবীর একমত পোষণ করেছেন । উপরোল্লেখিত প্রসিদ্ধ তাফছির ফতওয়া ও সহি গ্রন্থ সমুহে তাজিমী সিজদা বৈধ বা জায়েজ বলেছেন ।
অলীগণ তাজিমী সিজদা দিয়েছেন ও গ্রহণ করেছেন তার দলিল
(১) গুণিয়াতুত তালেবীন ৬৫১ পৃ. (২) বাহজাতুল আসরাব (বাংলায় গাউছুল আযম) ৩৬ পৃ. (৩) আনিসুল আরওয়াহ ১৪-৪৮ (৪) মসনবী শরীফ ২য় খন্ড ৭৪-৭৫ পৃ. (৫) দলিলুল আরেফীন ১২৮-১২৯-১৫২-১৫৩ পৃ. (৬) ফাওয়ায়েদুস সালেকীন ১৯৬ পৃ. (৭)রাহাতুল কুলুব ৯৪ পৃ. (৮) রাহাতুল মহিব্বীন ৭০-১২৮ পৃ. (৯) আনওয়ারে আউলিয়া ১৬৭ হতে ১৭০ পৃ. (১০) ফাওয়ায়েদুল ফাওয়াদ ৪০ পৃ. (১১) লাতায়েফে আশরাফী ২য় খন্ড ২৯ পৃ. (১২) মাকতুবাত ২য় খন্ড ৬৫ পৃ. (১৩) তারিখে ফেরেস্তা ৪২ পৃ. (১৪) তাযকেরাতুল আউলিয়া (শায়খ ফরীদ উদ্দীন আত্তার) ১ম খন্ড ৩৮-৩৯-৪৯-১৩৮ পৃষ্ঠা (১৫) সুফী শব্দকোষ ১০০-১পৃ.)। ভেবে দেখুন, মহান আল্লাহর অলীগণের পক্ষ হতে এ ধরণের হাজারো দলিল পেশ করা যেতে পারে। ইন্শাল্লাহ । তবে যারা মানতে রাজী নন, তাজিমী সিজদা, নাম শুনলে কিংবা দিতে দেখলে শরীরে এলার্জি শুরু হয়ে যায় তাদেরকে বুঝানো মুস্কিল? পবিত্র কোরআন শরীফে হযরত আদম (আঃ) কে ফেরেস্তাগণের সিজদা করার প্রসঙ্গ (সুরা বাকারা ৩৪ নম্বর আয়াত)। হযরত ইউসুফ (আঃ) কে তাঁর পিতা মাতা ও ভাইদের সিজদা করার প্রসঙ্গ (সুরা ইউসুফ ১০০ নং আয়াত) হযরত মুসা (আঃ) কে যাদু করের সিজদা প্রসঙ্গ (সুরা আরাফ ১২০ নং আয়াত) ও জুনদা ইবনে আমর ছয় হাজার অনুসারী সহ হযরত সালেহ (আঃ) কে সিজদা দেওয়ার দলিল (তাফসীরে ফতহল আজিজ ২৮৪ পৃ.) ইত্যাদি স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যারা তাজিমী সিজদা শিরক ফতওয়া দেয় আল্লাহ্ তাদের হেদায়েত দান করুন ।
তাজিমী সিজদার বিপক্ষদের বক্তব্য
মানুষ হয়ে মানুষকে সিজদা করা হারাম, শিরক, কবিরা গুনাহ্ ইত্যাদি । সিজদার পক্ষে যখন কোরআনে উল্লেখিত দলিল গুলো পেশ করা হয়- তখন তারা বলে উহা তখনকার যুগে বৈধ বা জায়েজ ছিল । বর্তমান হুজুর (সঃ) এর শরিয়তে জায়েজ নাই । এই বয়ান যদি সঠিক বলে মেনে নেওয়া হয় তবে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর হুকুমে ফেরেশতা ও পূর্বের নবী রাসূলগণকে তাজিমী সিজদা প্রদান ও গ্রহণ করে শিরক ও কবিরা গুনাহ্ করেছেন (নাউজুবিল্লাহ) । সমস্ত নবী রাসুল গনই মাসুম তথা নিস্পাপ । যুগে যুগে আল্লাহ্ নবী রাসুল গনকে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন সকল প্রকার অন্যায় অবিচার শিরক বিদাত দূরীভূত করে সাম্য শান্তি ও তৌহিদ প্রতিষ্ঠার জন্য আর সেখানে তারাই শিরক করেছেন ? এ কথাটি ভাবাই মস্ত বড় অন্যায় । আল্লাহ পাকের বিধানে সমস্ত নবী রাসুলগণের শরীয়াতে শিরক, কুফর, ঈমান, আকীদার সংজ্ঞা গুলি খন্ডিত বিষয় নয় । আল্লাহ পাক বলেন : ওয়ালান তাজিদা লিসুন্নাতিল্লাহি তাবদিলা অর্থাৎ অতঃপর আল্লাহর বিধানের কোন পরিবর্তন নাই । (সূরা আহযাব ৬২ নং আয়াত) । পূর্বে যাহা জায়েজ ও হালাল ছিল বর্তমান উহা নাজায়েজ ও হারাম হবে এরকম পরিবর্তনশীল বিধান আল্লাহর নয় । পবিত্র কোরআন সূরা আহযাবের ৬২নং আয়াত হতে তাহাই প্রমাণিত হলো ।
আলোচ্য প্রসঙ্গে সঠিক সিদ্ধান্ত এই যে আল্লাহ্ ও তার রাছুল প্রতিবাদহীন ভাবে যে সব রীতিনীতি বা ঘটনা বর্ণনা করেছেন তা মেনে চলা আমাদের জন্য আমাদের রাসুলের শরীয়তের মতোই বাধ্যতামূলক (ইমাম আবু হানিফা) তাফসীরে কাশশাফ, মাদারিক, কবির, খাযেন, বাইযাবী, আহমদী ও মঈনুদ্দীন ইত্যাদি গ্রন্থ সমূহে এবং সকল ফিকাহবিদগণ একমত যে হযরত আদম (আঃ) ও হযরত ইউসুফ (আঃ) এর প্রতি সিজদাটি ছিল “তাজিমী সিজদা” যেহেতু ইহা কোরানে বর্ণিত পূর্ববর্তী নবীদের ঘটনা এবং এ ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা আয়াত নাযিল হয়নি এবং কোন “খবরে মুতাওয়াতির বা হাদিসে মুতাওয়াতার” নেই বিধায় পূর্ব নবীদের তাজিমী সিজদা এখনও জায়েজ রয়ে গেছে । প্রিয় আশেকান অধমের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় তাজিমী সিজদা প্রসঙ্গে যে সকল দলিল আদিল্লা পেশ করলাম । এতে যদি সত্যানু সন্ধানীদের কিঞ্চিত উপকার হয় তবেই শ্রম সার্থক হবে বলে আশা বাদি । পরিশেষে আমার মহাত্মন মুর্শিদ কেবলা জানের রচিত সুফী শব্দকোষ পুস্তকের উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি । সবদিক বিবেচনা করে এই মতামত দেয়া যেতে পারে যে তাজিমী সিজদার বহুল প্রচলন যেহেতু সমাজ স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেয় না বিধায় স্থানকাল পাত্র ভেদে তাজিমী সিজদার প্রচলন সতর্ক ও সীমিত পরিসরে চলতে পারে । (শাহ্সুফী ডক্টর ফকীর আব্দুর রশীদ চিশতী ” সুফী শব্দ কোষ ১০১ পৃ.)
হে আল্লাহ সকলকে সঠিক পথে চলার তৌফিক দিন আমিন । “ওয়া লিল্লাহে ইজ্জাতু ওয়ালি রাসুলিহী ওয়াল্লি মোমেনীনা ওয়া লাকিন্নাল মুনাফেকীনা লাইয়ালামুন”
অর্থাৎ : এবং ইজ্জত আল্লাহর জন্য রাসুলের জন্য এবং মুমিনদের জন্য । কিন্তু মুনাফিকগণ তা বুঝে না (সুরা মুনাফিকুন : ৮ নম্বর আয়াত)
আহলে বাইত এর নামের পাশে (আঃ) ব্যবহার
আহলে বাইত পাক পাঞ্জাতন এর নামের শেষে আলাইহিস সালাম সংক্ষেপে (আঃ) ব্যবহার নিয়ে মতভেদ বিদ্যমান। এক শ্রেণীর লোকদের অভিমত আলাইহিস সালাম কেবল নবী রাসুলগণের নামের শেষে ব্যবহার করা জায়েজ অন্য কারো নামের শেষে ব্যবহার জায়েজ নাই । অপর পক্ষ কোরআন হাদীসের দলিল দ্বারা আহলে বাইতের নামের শেষে (আঃ) ব্যবহার বৈধ বা জায়েজ প্রমাণ করেছেন । নিম্নে প্রমাণিত দলিল দ্বারা আলোকপাত করা হলো । আলোচনার প্রারম্ভে আহলে বাইত পাক পাঞ্জাতন সম্পর্কে কিঞ্চিত ধারণা থাকার দরকার যেমন ‘আহল’ অর্থ অধিবাসী এবং ‘বাইত’ অর্থ ঘর । তাহলে “আহলে বাইত” অর্থ মহানবী (সঃ) এর ঘরের অধিবাসী । ‘পাক’ অর্থ পবিত্র বা পরিশুদ্ধ এবং ‘পাঞ্জাতন’ অর্থ পাঁচটি শরীর ।
কাজেই পাক পাঞ্জাতন মানে পবিত্র পাঁচটি শরীর বা ব্যক্তি তথা (১) হযরত মুহম্মাদ (সঃ) (২) হযরত আলী (আঃ) (৩) হযরত ফাতেমা (আঃ) (৪) হযরত ইমাম হাসান (আঃ) ও (৫) হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) । সুরা আহযাব ৩৩ নাম্বার আয়াতে “তাতহির” মোতাবেক রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর আহলে বাইত আলী ফাতেমা হাসান ও হোসাইন পবিত্র চারজান এবং রাসুলে পাক (সঃ) কে নিয়ে হলো পাক পাঞ্জাতন । সৃষ্টির মূল ধারক বাহক হলো পাক পাঞ্জাতন এবং তাঁর নবুয়তী ছুরত হলো উক্ত পাঁচজন । তাদের বেলায়তীরূপ সমগ্র সৃষ্টিব্যাপী স্থিত আছে এবং তাঁদের সেই স্থিত বস্থা হতে উপস্থিত রূপ হলো নবুয়তী সুরত । যাদেরকে ভাল বাসাই হলো ঈমানের মূল ভিত্তি (সুরা শুরা- ২৩ আয়াত)
“আলাইহিস সালাম” শব্দের অর্থ – তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক । ইহা একটি উত্তম প্রার্থনা । যেমন আমরা (মুসলমান) সবাই একে অপরকে সালাম দিয়ে থাকি । এখন আলাইহিস সালাম যদি শুধুমাত্র নবী রাসুলগণের নামের পাশেই ব্যবহার জায়েজ অন্য কারোর জন্যে জায়েজ না থাকতো তাহলে হযরত হাওয়া (আঃ) হযরত মরিয়ম, হযরত খিজির, হযরত লোকমান, ইমাম মাহাদী এবং জিবরাইল, মিকাইল, ইসরাফিল ও আজরাইল তিনাদের নামের শেষে (আঃ) শব্দটি ব্যবহার করা হতো না, কেননা উনারা কেউই নবী রাসুল নন । প্রমাণ হলো নবী রাসুল ছাড়াও অন্যান্যদের নামের শেষে (আঃ) ব্যবহার বৈধ বা জায়েঝ । পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক, মুমিন, পরহেজগার ও বেহেশতীদের সালাম দিয়েছেন যেমন- সুরা ইয়াসিন ৫৮ নং আয়াত । সুরা ত্বহা ৪৭ নং আয়াত । সুরা আরাফ ৪৬ নং আয়াত দ্রষ্টব্য ।
আমরা সালাতে তাশহুদ বৈঠকে দরূদ শরীফ পাঠকালে আলে মোহাম্মদ অর্থাৎ আহলে বাইত পাক পাঞ্জাতনকে সালাম দিচ্ছি (বুখারী শরীফ কিতাবুত তাফসীর ৪৪৩৪নং হাদিস) সকল মাযহাব অনুসারীগণ ইমাম মাহদী (আঃ) এর নামের শেষে আলাইহিস সালাম লিখা বা বলা জায়েজ এতে একমত পোষণ করেছেন এ ব্যাপারে কারো কোন বাধা নেই । কেন নেই ? তিনিতো নবী বা রাসুল নন । সঠিক উত্তর খুজে নিলেই আহলে বায়েতের নামের সাথে (আঃ) ব্যবহারের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটবে ।
লক্ষ্য করুনঃ (ক) হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যে বলেন, আমরা উম্মে সালামাহ (রাঃ) এর সাথে “ইমাম মাহদী” নিয়ে আলোচনা করছিলাম তিনি বলেন রাসুল (সঃ) এরশাদ করেছেন “মাহদী” হবে ফাতেমার বংশ ধর । (ইবনে মাজাহ হাদিস নং ৪০৮৬)। (খ) হযরত উম্মে সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত । তিনি বলেন আমি মহা নবী (সঃ) কে বলতে শুনেছি যে মাহদী আমার ঔরসজাত ফাতিমার বংশ থেকে হবে (আবু দাউদ শরীফ, কিতাবুল মাহদী) । বিচার্য, ইমাম মাহদী নবী বংশের হওয়ার কারণেই তাঁর নামের শেষে “আলাইহিস সালাম” ব্যবহার করা হয়, তাহলে আহলে বাইতের শানে (আঃ) ব্যবহার হবে না কেন ?
যে সকল ওলামায়ে কেরাম আহলে বাইতের নামের সাথে আলাইহিস সালাম ব্যবহার করেছেন তার কিছু দলিল তুলে ধরছি ।
১। বুখারী শরীফের কিতাবুল ফাজায়েলে সাহাবাহ অধ্যায়ের বাবুল মানাক্কিবে ফাতিমাত্ব শীর্ষক পর্বে (৩৭/৬২নং অধ্যায়) হযরত ফাতিমার নামের শেষে (আঃ) ব্যবহার করা হয়েছে । (পর্ব নাম্বার ৫৯/২৯ ও ৪১/১২) বুখারী শরীফ ।
২। কিতাবুল মানাক্কিবিত তিরমিজি এর ফাজলি ফাতিমাতা বিনতি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিমা ওয়া সাল্লাম উপপর্ব (কিতাব নম্বর ৫০ বাব নম্বর ৬১ তিরমিজী শরীফ) ।
৩। উক্ত তিরমিজি শরিফের ‘মানাকিব আল হাসান ওয়াআল হুসাইণ আলাইহিমা ওয়াসাল্লাম, শীর্ষক আলোচনার শিরোনামেই এই শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে (তিরমিজি শরিফ) ।
৪ । মানাক্কিবে ফাতেমা, আল্লামা ড. তাহেরুল ইসলাম আল কাদরী পৃষ্ঠা নং ৪,৬,৮,১১,১৭,২০,২১ ও ২৪ ।
৫। রাহাতুল কুলুব, শায়েখ আব্দুল হক মোহাদ্দেসে দেহলভী পৃষ্ঠা নং-২৮, ১০৭, ১৬১, ১৮৪ ও ১৯৪ ।
৬। মাদারেজুন নবুওয়াত- ২য় খন্ড ৫৪৫ নং পৃষ্ঠা ।
৭ । ফাতওয়ায়ে আজিজি- ১ম খন্ড ৮৪ ও ২৩৪ নং পৃ ।
৮। তারিখে তাবারী ৬ষ্ঠ খন্ড- ১৯৪, ২১৬, ২৩৩,ও ২৬৯ নং পৃ ।
৯। সহীহ আল বুখারী ( ডাঃ মুহাম্মদ মুহাসিন খান সালাফী) আহলে হাদিস ৫ম খন্ড- হাদিস নং ৫৫ ও ৯১ (ইসলামিক ইউনিভারসিটি আল মদীনা আল মুনাওয়ারা আরবী, ইংরেজি অনুবাদ) ।
১০। সফরনামা (রোম, মিশর, শাম) আল্লামা শিবলী নুমানী দেওবন্দী পৃষ্ঠা নং ১২০, ১৬১, ১৮৪ ও ১৯৪ ।
১১। তাফছিরে মাজহারী ২য় খন্ড ১০৬ পৃষ্ঠায় হযরত আলী (রাঃ) এর নামের সাথে (আঃ) ব্যবহার করা হয়েছে ।
১২। ইমাম হাকেম নিছাপুরী (রঃ) একটি সহি হাদিসের শেষে উল্লেখ করেন হযরত হাসান ইবনে আলী আলায়হুমাছ ছালাম (আল মোস্তাদরাক ৫ম খন্ড ১৭৬৩ পৃ.)
সুতরাং প্রমাণিত হলো যে আহলে বাইতের নামের শেষে আলাইহিস সালাম বলা কোরআন হাদিস দ্বারা বৈধ বা জায়েজ ।
আউলিয়া কেরামের নামে রাদ্বি-আল্লাহ আনহু ব্যাবহার
মহান রাব্বুল আলামিনের বন্ধু হক্কানী রব্বানী বুজুর্গ আউলিয়া গণের নামের পাশে যেমনি রহমাতুল্লাহ আলায়হি লিখা জায়েজ তেমনি রাদ্বি আল্লাহু আনহু লিখাও জায়েজ ইহা হক্ক পন্থি ফকিহ মুজতাহিদ মোজাদ্দেদ ইমাম ও উলামায়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা ও অভিমত । এক শ্রেণী লোকদের মতে যারা রাসুলে পাক (সঃ) কে দেখেছেন অর্থাৎ শুধু সাহাবীগণের নামের সাথেই (রাঃ) লিখা যাবে অন্য কারোও নামের পাশে নয়।
রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর সাহাবীগণ অবশ্যই সম্মানীয় এতে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু ইসলামী সংবিধানে কোথাও এরূপ বলা হয়নি যে, সাহাবীগণ ব্যতীত অন্য কারোও নামের পাশে (রাঃ) লিখা বা বলা যাবে না । বরং পবিত্র কোরআন হাদিস এবং সকল ফকিহ গণের মতে সাহাবীগণ ব্যতীত অন্যান্য হক্কানী পীর মুর্শিদ ওলী আউলিয়া গণের নামের সাথেও রাদ্বি আল্লাহ্ সংক্ষেপে (রাঃ) লিখা ও বলা যাবে । স্বপক্ষে দলিল দেওয়া হলো।
পবিত্র কোরআন –
দলিল-১ : রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া রাদুআনুহ জালিকা লিমান খাশিয়া রাব্বাহু) অর্থাৎ আল্লাহ তা’লা তাদের উপর রাজি এবং তারাও আল্লাহর উপর রাজি । এজন্যে যে তারা আল্লাহকে ভয় করেন । (সুরা বায়্যেনাত ৮নং আয়াত) ।
পবিত্র কোরআনের এই আয়াতে দেখা যায় যারা আল্লাহকে ভয় করেন তাদের সম্পর্কেই আল্লাহ পাক “রাদ্বি আল্লাহু আনহুম” বাক্য ব্যবহার করেছেন । এখানে কাউকে খাছ করা হয়নি । কেননা (লি’মান) অর্থ যে বা যারা শব্দটি দ্বারা খাছ বা নির্দিষ্ট বোঝায় না, সুতরাং যারা আল্লাহকে ভয় করেন তাদের নামের পাশে (রাঃ) লিখা বা বলা যাবে ।
দলিল-২ : ইন্নামা ইয়াখ সাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা- অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাগণের মধ্যে (হক্কানী ওলামা গণই আল্লাহ কে ভয় করেন। (সুরা ফাতির ২৮ আঃ) প্রমাণ হলো আউলিয়া কেরামগণই আল্লাহকে অধিক ভয় করেন । (সুরা ইউনুছ ৬৩ আঃ)
দলিল-৩ : ইয়া আয়্যাতুহান্নাফছুল মৎ মাইন্না তুরজীই ইলা রাব্বিকী রাদ্বিয়াতাম মারদিয়া ফাদখুলি ফি ইবাদি ওয়াদ খুলি জান্নাতী) অর্থাৎ হে প্রসান্ত আত্মা তোমার রবের প্রতি ধাববান হও । তিনি তোমার প্রতি রাজী আছেন, তুমি আমার বিশিষ্ট বান্দাগণের মধ্যে শামিল হয়ে জান্নাতে প্রবেশ কর । (সুরা ফজর ২৭-৩০ নং আঃ) এখানে ‘রাদ্বিয়াতান’ শব্দটি নফছে মতমাইন্নাহ অর্থাৎ পরিশুদ্ধ ও শান্তি প্রাপ্ত আত্মার অন্তর্ভূক্ত লোকদের ব্যাপারে ব্যবহার করা হয়েছে এবং আল্লাহ ঐ সকল লোকদের উপর রাজি আছেন বিধায় প্রতীয়মান হলো নফছে মতমাইন্নাহ্ স্তরে উত্তীর্ণ ওলীগণের নামের সাথে (রাঃ) ব্যবহার কোরআন সম্মত ।
ফকিহ মুহাদ্দিস ও মুজতাহিদগণের মতামত :
মতামত-১ : সাহাবায়ে কেরাম তাবেঈন তাবে তাবেঈন হক্কানী ওলামাগণ ও আল্লাহর নেক বান্দাগণের নাম উচ্চারণ কালে (রাঃ) অথবা (রঃ) এই দুইয়ের যেকোন একটি বলা মুস্তাহাব সুতরাং হযরত আবু বকর ছিদ্দিক ও হযরত আবু হানিফা উভয়ের বেলায় (রাঃ) অথবা (রঃ) বা অনুরূপ শব্দাবলীর যে কোন একটি বলা যাবে । অতএব (রাঃ) শুধু সাহাবীগণের জন্যে খাছ নয় বরং তাঁদের নাম উচ্চারণ কালে (রঃ) ও বলা যাবে । (তাফসীরে রুহুল বয়ান ৭ম খন্ড ২৬১ পৃ.)
মতামত-২ : বিশিষ্ট তাবেঈ হযরত দ্বাহহাক (রাঃ) ও সাঈদ ইবনে যোবায়ের (রাঃ) বলেন, তোমরা আবু বকর ও উমর রহমাতুল্লাহি আলায়হুম্মা এর সঙ্গী হয়ে যাও (তাফসীরে তাবারী শরীফ ১১ জি ৭৩ পৃ.) প্রমাণ হয়ে গেল তাবেয়ীগণ সাহাবীদের নামের সাথে (রহঃ) ও ব্যবহার করতেন ।
মতামত-৩ : বিশুদ্ধ মাজহাব মোতাবেক সালাত বা আলায়হিছ ছালাতু ওয়াছ ছালাম পাঠ করা হবে আম্বিয়া (আঃ) ও ফেরেস্তাদের নামের সাথে। “রাদ্বি আল্লাহু আনহু” খাছ হলো সাহাবী আউলিয়া এবং উলামাগণের নামের জন্যে । এ ছাড়া বাকী মুসল্লীগণের জন্য (রহঃ) পাঠ করা হবে । (তাফসীরে রুহুল বয়ান ৭ম খন্ড ২৬২ পৃ.)
মতামত- ৪ : আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী (রাঃ) ইমাম বুখারীর নাম উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি তা’লাওয়া রাদ্বিআল্লাহু আনহু বলেছেন (ফাতহুল বারী শরহে বুখারী- ১ম খন্ড ৩ পৃ.) লক্ষ্য করুন ইমাম বুখারী সাহাবী নন অথচ আল্লামা ইবনে হাজর আসকালীন (রাঃ) তার নামের সাথে (রহঃ) এবং (রাঃ) উভয় ব্যবহার করেছেন । এমন কি সহি বুখারী শরীফের ভিতরের কভার পৃষ্ঠায় ইমাম বুখারী (রাঃ) এর অনেক গুলো লকব উল্লেখ করার পর এভাবে লিখা আছে “ফা রাদ্বি আল্লাহু তা’লা আনহু”
মতামত-৫ : সহি মুসলীম শরীফের লেখকের নামের সাথে এরূপ লিখা আছে ক্বালা ইমাম আবুল হুছাইন মুসলীম ইবনে হাজ্জাজ রাদ্বি আল্লাহু আনহু (মুসলীম শরীফ ১ম খন্ড ২৬ পৃ.)
মতামত- ৬ : নিশ্চয় ইমাম আবু হানিফা রাদ্বি আল্লাহু আনহু বলেছেন আমি আমার রবকে স্বপ্ন যোগে ৯৯ বার দেখেছি (ফাতুয়ায়ে শামী ১ম খন্ড ১৪৪ পৃ.)
মতামত- ৭ : আল ইমামুশ শাফেয়ী রাদ্বি আল্লাহু তা’লা আনহু ফাতুয়ায়ে শামী কিতাবের লেখক আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রাঃ) ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ী উভয়ের নামের সাথে (রাঃ) ব্যবহার করেছেন অথচ উনারা সাহাবী ছিলেন না ।
মতামত-৮ : আল্লামা ইমাম জালালুদ্দিন ছিয়তী (রাঃ) তদীয় কিতাবে উল্লেখ করেন, ইমাম নব্বী (রাঃ) তার শরহে মাজহাব এ বলেন ইমাম শাফেয়ী ‘রাদ্বি আল্লাহু আনহু’ বলেছেন (আল হাবীলিল ফাতুয়া ১ম খন্ড ৫ পৃ.)
মতামত- ৯ : হেদায়ার লেখক ইমাম কুদুরী (রাঃ) এর নাম উল্লেখ করেছেন এভাবে ইমাম কুদুরী রাদ্বি আল্লাহু আনহু বলেছেন ( হেদায়া ১ম খন্ড ৪৫২ পৃ.)
মতামত-১০ : ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি ওয়া রাদ্বি আল্লাহু আনহু মদীনার রাস্তায় কোন সময় বাহনে চড়তেন না( ফাতহুল কাদির ৩য় খন্ড ১৬৮ পৃ.)
মতামত-১১ : আল্লামা কাজী ছানাউল্লাহ পানি পথী (রাঃ) তার তাফছির কিতাবে উল্লেখ করেন গাউছে ছাকালাইন মহিউদ্দিন আবদুল কাদির জিলানী রাদ্বি আল্লাহু তা’লা আনহু (তাফসীরে মজহারী ২য় খন্ড ১০৬ পৃ.)
মতামত- ১২ : আল্লামা আব্দুল হক মোহাদ্দেছ দেহলভী (রহঃ) তার কিতাবে লিখেছেন শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী রাদ্ধি আল্লাহ আনহু (মাদারেজুন্নবুয়াত ১ম খন্ড ১৬০ পৃ.)
মতামত- ১৩ : শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দেছ দেহলভী (রঃ) উল্লেখ করেন মাশাযেখে জিলানীরা তারা হচ্ছে ইমামুত তরীকত শায়খ আবী মুহম্মদ মহিউদ্দিন আব্দুল কাদের জিলানী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আনহুম আজমাইন এর অনুসারী । (আল্ কাওলুল জামিল ৪র্থ পরিচ্ছেদ)। সুতরাং প্রমাণ হয়ে গেল আল্লাহর ওলীগণের নামের সাথে রাদ্বি আল্লাহু তা’লা আনহু ব্যবহার করা জায়েজ ।
মতামত- ১৪ : ইসমাইল ইবনে খাতিব আবী হাফ্ছ উমর ইবনে কাছির আশ শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি তা’লা ওয়া রাদ্বি আল্লাহু আনহু (তাফসীরে ইবনে কাছির ১ম খন্ড ৭ পৃ.)
মতামত-১৫ : আল্লাতি সালাকুহা শায়খু রাদ্বি আল্লাহু আনহু (মিসকাত শরীফ ১১ পৃ. উনওয়ানুল কিতাব)
এরূপ অসংখ্য দলিল দেওয়া যেতে পারে ইনশাল্লাহ্ । সর্বোপরি প্রতীয়মান হলো যে, ‘রাদ্বি আল্লাহু আনহু’ শব্দটি শুধু সাহাবীগণের জন্যে খাছ বা নির্ধারিত নয় । বরং হক্কানী রব্বানী ফোকাহা ইমাম মুহাদ্দিছ উলামা ও পীর মাশাইখ গণের নামের সাথে লিখা ও বলা নিঃসন্দেহে জায়েজ । আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সকল ফকিহ্ মুজতাহিদ গণ এই ব্যাপারে একমত প্রদান করেছেন ।
রওযা মাজার ও কবর প্রসঙ্গ
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন পাঁচ জাত ও সাত সিফাতের সমন্বয়ে বিশ্বের সকল মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন । সৃষ্টির উপাদান সমান সমান হলেও আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্ঞান ও গুণ ক্ষমতায় সকল মানুষ সমান নয় ।
সঙ্গত কারণে ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে মানব সমাজ তিন ভাগে বিভক্ত যথা-
(১) আল্লাহর প্রেরিত নবী, রাসুলগণ
(২) আল্লাহ পাকের মনোনিত অলি আউলিয়াগণ এবং
(৩) সর্ব সাধারণ মুসলমানগণ ।
কোরআন হাদিস গবেষক ইমাম মুজতাহিদগণ উপরোক্ত তিন শ্রেণীর মানুষের ইন্তেকালের পর তাঁদের দেহ সমাধিস্থলের তিন প্রকার নামে নাম করণ করেছেন যেমন –
(১) রওয়া শরীফ। হযরত আদম (আঃ) হতে ছাইয়েদেনা ওয়া মাওলানা মোহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ (সঃ) পর্যন্ত সকল নবী রাসুলগণের পবিত্র দেহ মোবারক সমাধিস্থান কে রওযা শরীফ বলা হয়। যার অর্থ বেহেস্তের বাগান
(২) অলি আউলিয়া গাউস কুতুব পীর মুর্শিদ গণের দেহ সমাধি স্থানকে বলা হয় মাজার শরীফ, মাজার অর্থ চলমান গমনাগমন ইত্যাদি। ধাতুগত অর্থ দর্শনার্থে গমন করা।
(৩) কবর : সাধারণ মানুষের মৃত দেহের অবস্থান স্থল কে কবর বলা হয় । ব্যক্তির অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও গুণ ক্ষমতার কারণে তার যোগ্যতা ও মান মর্যাদা আল্লাহ পাকই বৃদ্ধি করে থাকেন ।
সে মোতাবেক নবী রাসুল, ও অলি আউলিয়াগণের শান মান ও মর্যাদার সাথে অন্যান্য সাধারণ মানুষের সমতা ও তুলনা ইহকালেও হতে পারে না, পরকালেও হবে না । সুতরাং রওযা মাজার এর মর্যাদার সাথে কবরের বা কবর বাসীর তুলনা করা মারাত্মক ভুল । মাজার ও কবরের মধ্যে যে প্রার্থক্য রয়েছে সেটা না বুঝার কারণে মাজার পাকা করা, ঘর তোলা, গিলাফ চড়ানো, ফুল চন্দন সুগন্ধি দেওয়া, বাতী জালান ইত্যাদি বিষয় নিয়ে উলামায়ে কেরামদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে । কেউ বলে জায়েজ, কেউ বলে ইহা হারাম, মাঝখানে সাধারণ মানুষ পড়েছে বিপাকে যে আসলে কোনটা সঠিক ? আসুন আমরা নিরপেক্ষ ভাবে দেখি কোরআন হাদিস ও ফিকাহ কিতাব সমুহে এই ব্যাপারে কি ফায়সালাহ্ দিয়েছে ।
একটি কথা মনে রাখতে হবে যে সমস্ত নবী রাসুলগণ জন্মগত ভাবেই চীর মাসুম (নিষ্পাপ) এবং সকল প্রকার শিরক বিদয়াত ও যাবতীয় হারাম কার্য হতে মুক্ত । যদি রওযা ও মাজার পাকা করা, ঘর তোলা, গম্বুজ তৈরী করা গিলাফ চড়ানো ইত্যাদি অবৈধ বা হারাম হতো তাহলে বিশ্বের কোন নবী রাসুলগণের রওয়া শরীফ ঐ রকম পাকা করে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হইত না । প্রমাণ স্বরূপ বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ এরশাদুস সারীর মধ্যে উল্লেখ আছে যে, আমাদের শেষ নবী রাসুলে পাক (সঃ) এর পূর্বে যতো নবী রাসুল ছিলেন তাদের রওযা সমূহ পাকা করে তার উপর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে দিতেন যাহা দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পরও পূর্ব স্মৃতিগুলো ঝকঝক করতো । যাহা অদ্যাবধি বিদ্যমান ।
যেমন- বাগদাদ শরীফ হতে ৪৩০ কিঃমিঃ উত্তরে মওসুল শহরের দজলা নদীর দক্ষিণ পার্শ্বে এক পাহাড়ের চূড়ায় হযরত ইউনুছ (আঃ) এর রওযা শরীফ, তার ২ কিঃ মিঃ উত্তরে হযরত শীষ (আঃ) এর রওযা, তার দেড় কিঃ মিঃ উত্তর পশ্চিমে হযরত জারজীজ (আঃ) এর রওযা এবং তার ৪/৫ গজ উত্তর পশ্চিমে হযরত নবী দানিয়েল (আঃ) এর রওযা রয়েছে । বাগদাদে হযরত ইউশা ইবনে নুন (আঃ) রওযা, জর্ডানে আম্মান শহরের অনতিদূরে পাহাড়ের চূড়ায় নবী হযরত শোয়াইব (আঃ) এর রওয়া রয়েছে । সিরিয়ার দামেস্কে হযরত ইয়াহ্ইয়া (আঃ) এর রওযা, বিদ্যমান। বায়তুল মোকাদ্দাসের সীমানার বাইরে কিছুটা পূর্ব দক্ষিণে পাহাড়ের উপর হযরত দাউদ (আঃ) এর বারো হাত লম্বা রওযা শরীফ রয়েছে। বায়তুল মোকাদ্দাস হতে দক্ষিণে গিয়ে প্রধান সড়কের প্রায় ২/৩ কিঃ মিঃ পশ্চিমে হযরত মুসা (আঃ) এর এগারো হাত লম্বা রওযা শরীফ বিদ্যমান ।
বায়তুল মোকাদ্দাস হতে ৫০ কিঃ মিঃ দক্ষিণে হেবরণ শহরে হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসহাক (আঃ) হযরত ইউসুফ (আঃ) সহ কয়েকশ নবীর রওযা শরীফ রয়েছে । ফিলিস্তিনের আল খলীল শহর থেকে ৬ কিঃ মিঃ দূরবর্তী লুত উপসাগরের কুলে হযরত লুত (আঃ) এর রওযা রয়েছে । ইরাকের নজফ শহরে হযরত নূহ (আঃ) হযরত ছালেহ (আঃ) হযরত হুদ (আঃ) ও হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর রওযা শরীফ অদ্যাবধি বিদ্যমান আছে । খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) যখন বায়তুল মোকাদ্দাস বিজয় করেন তখন খলিল শহরের মধ্যে উক্ত স্মৃতিগুলো দেখে বড় আবেগের সাথে রওযাগুলো জিয়ারত করেন । সেখান থেকে মদীনায় ফিরে এসে মহানবী হুজুর (সঃ) এর রওযা মোবারক, আলে রাসুল ও সাহবাগনের মাজারগুলো পাকা করে ছিলেন ।
রাসুলুল্লাহ (সঃ) পশ্চিম দিকে মাথা মোবারক ও পূর্ব দিকে পা মোবারক দিয়ে শায়িত আছেন । কারন সেখান থেকে কাবা শরিফ দক্ষিণ দিকে অবস্থিত । তখন থেকে ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিকের রাজত্বকাল পর্যন্ত রাসুল (সঃ) এর রওজা শরীফ ঐ ভাবেই বিদ্যমান ছিল । এরপর খলিফা ওয়ালিদের নির্দেশে হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ একে ভেঙ্গে চিত্রাঙ্কিত পাথর দ্বারা পুনঃনির্মান করেন । আর এর বাহিরে অপর একটি দালান তৈরি করেন । ৫৫০ হিজরীতে জামাল উদ্দিন ইস্পাহানী নামক এক মহান ব্যক্তি হুজুর (সঃ) এর রওজা শরীফের চারিপাশে চন্দন কাঠের একখানা জালি তৈরী করেছিলেন । এসময় মিশরের উজির ইবনে আবিল হাইজার শরীফ“সাদা দীবা” বা এক প্রকার সুক্ষ রেশমী কাপড়ের তৈরী গিলাফ পাঠান । যার মধ্যে লাল রেশমী ফুল অঙ্কিত ছিলো এবং তার উপর সুরা ইয়াছীন লেখা ছিলো ।
খলিফা মুস্তাজী বিল্লাহর নির্দেশে তিনি এই গিলাফ দয়াল নবীজি (সঃ) এর রওযা শরীফের উপর পড়িয়ে দিয়েছিলেন । ৬৭৮ হিজরীতে “কলাউল ছালেহী” রওযা শরীফের উপর সবুজ গম্বুজ যা মসজিদের ছাদ থেকেও বেশি উচু তামার জালিসহ নির্মাণ করেন । এর পরে শাহ ফয়সল এবং বাদশা ফাহাদের আমলে এক বিরাট কর্মসূচীর মাধ্যমে হেরামাইন শরীফাইন সংস্কার করা হয় । যা বর্তমানে বিদ্যমান আছে । (জজবুল কুলুব ইলাদিয়ারিল মাহবুব) অতএব প্রমাণ হলো বিশ্ব নবী (সঃ) সহ সকল নবী রাসুলগণের রওযাসমূহ পাকা করা গম্বুজ বিশিষ্ট ঘর ও পাশে মসজিদ নির্মিত ও রওযা শরীফে গিলাফ চড়ানো রয়েছে।
অলি আউলিয়াগণের মাজার শরীফ
আল্লাহ তা’য়ালার বন্ধু তথা লামউতের অধিকারী অলিআউলিয়া কেরামগণের দেহ সমাধি স্থানকে মাজার শরীফ বলা হয় । কারণ তারা সাধারণ মানুষের ন্যায় মৃত্যু বরণ করেন না । এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন, “ওয়ালা তাকুলু লিমাই ইউকতালু ফি ছাবিলিল্লাহে আমওয়াতান বাল আহ ইয়াউন ওয়ালাকিন লা তাসউরুন” অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় (সাধনায় প্রবৃত্তি নিবৃত্তির কর্মে) মধ্যে যিনি কতল (আল্লাহতে ফানা) হয়েছেন তাঁকে মৃত বলো না বরং তারা জীবিত এবং তোমরা তা জানতে পারো না। বা অনেকেই তাহার খবর রাখো না (সুরা বাকারা ১৫৪ আয়াত) ধর্ম যুদ্ধে (জিহাদ) যারা শহীদ হয়ে যায় । আল্লাহ পাক তাদের কে জীবিত বলে ঘোষনা করেছেন ।
মহানবী (সঃ) জেহাদকে দুই প্রকার বলেছেন (এক) অস্ত্রের জেহাদ ইহা জেহাদে আসগর বা ছোট জেহাদ (দুই) স্বীয় নফস আম্মারার সাথে জেহাদ-ই জেহাদে আকবর বা বড় জেহাদ । এখন লামউত বা মৃত্যুহীন তথা চিরঞ্জীব জগতে অরুজ করার উত্তম পথই হলো জেহাদে আকবর । আর এ জেহাদে যারা জয় লাভ করেছেন অর্থাৎ স্বীয় প্রবৃত্তি দমন করে আল্লাহ্ ইস্কের খঞ্জরে কতল হয়ে আল্লাহতে ফানা বা লীন হয়েছেন, তাঁরাই হলেন অলি আউলিয়া, পীর মুর্শিদ ।
তাদের সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন : “আলা ইন্না আউলিয়া আল্লাহে লাখাওফুন আলাইহিম ওয়ালাহুম ইয়াহ জানন” অর্থাৎ সাবধান নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুগনের কোন ভয় নেই এবং ইহকাল ও পরকালে তারা কখনো চিন্তিত ও হবে না (সুরা ইউনুছ- ৬২ আয়াত) । কোরআনে আরো বর্ণিত আছে : “ওয়ালা তাাবান্নাল্লাজিনা কুতিলু ফী সাবালিল্লাহে আমওয়াতান বাল্ আহইয়াউন এনদা রাব্বিহীম ইউর জাকুন” অর্থাৎ যারা আল্লাহর রাস্তায় প্রাণ উৎসর্গ করেছেন তোমরা তাদেরকে মৃত বলে ধারণাও করোনা বরং তারা জীবিত । তাদের রবের নিকট হতে রেজেক প্রাপ্ত । (সুরা আল্ ইমরান-১৬৯ আয়াত)
“রবের নিকট হতে রেজেক প্রাপ্ত” এই কথাটি গভীর ভাবে চিন্তা করা উচিৎ সত্য উৎঘাটন হলে নিশ্চিত বুঝা যাবে যে কোন অবস্থাতেই অলিগণ মৃত নন । নবী রাসুল এবং অলি আউলিয়াগণ অবশ্যই জীবিত আছেন একথার বিরোধীতা করা মানেই পবিত্র কোরআনকেই অস্বীকার করা, যা মহাপাপ ও কুফরী । হাদিস শরীফে রাসুলুল্লাহ (সঃ) এরশাদ করেন : “আউলিয়া আল্লাহে লাইয়ামুতুন বাল ইয়ান তাকিলুমিন দারুল ফানা ইলা দারুল বাকা” অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুদের মৃত্যু নেই বরং তারা স্থানান্তরিত হয় ধ্বংশশীল ইহলোক হতে স্থায়ী পরলোকে ।
হুজুর (সঃ) আরো বলেন : “ইন্নাল্লাহা তা’লা কালামান আদালী ওয়ালিয়া ফাকাদ আজানতাহু বিল হারবে” অর্থাৎ আল্লাহ বলেন যে আমার অলি বা বন্ধুর সাথে শত্রুতা করে আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষনা করি (হাদিস, কুদসী, বুখারী ও মেশকাত শরীফ) । সুতরাং প্রতীয়মান হলো সাধারণ মানুষের তুলনা অলি আউলিয়ার সাথে চলে না । হাদিস কুদসীতে আল্লাহ পাক বলেন নিশ্চয়ই আমার আউলিয়া (বন্ধু) গণ আমার সম্মানের চাঁদরের নিচে অবস্থান করেন । বা জুব্বার অন্তরালে লুকায়িত ।
মাজার পাকা, গিলাফ চড়ানো ও গম্বুজের দলিল
প্রমাণ-১ : হযরত মুত্তালিব (রাঃ) বর্ণনা করেন যখন উসমান ইবনে মাজউন (রাঃ) ইন্তেকাল করেন তখন তার লাশ বের করা হয় ও দাফন করা হয় । তখন নবী করিম (দঃ) জনৈক ব্যক্তিকে এক খন্ড পাথর আনতে বলেন কিন্তু সে ইহা বহন করতে অক্ষম হয় । তখন নবী করীম (সঃ) ইহা নিজে বহন করে আনতে অগ্রসর হন ও নিজের জামার আস্তিন গুটিয়ে ফেলেন, মহানবী (সঃ) পাথর বয়ে এনে উসমান ইবনে মাজউনের কবরের শিয়রে রাখেন। রাসুল (সঃ) বলেন এর দ্বারা আমি আমার ভায়ের মাজার চিহ্নিত করছি। (সুনানে আবু দাউদ ১ম জি মেশকাত শরীফ ১৪৯ পৃ. মেরকাত শরহে মেশকাত ৪ খন্ড ১৬৭ পৃ.)।
প্রমাণ-২ : হযরত জাফর ইবনে মুহাম্মদ তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন নবী পাক (সঃ) এক কবরের উপর মুঠ করে তিন মুঠ মাটি দিয়েছিলেন । হুজুর (সঃ) এর পুত্র ইব্রাহীমের মাজারে পানি ছিটিয়েছেন এবং ঐ মাজারের উপর কাঁকর স্থাপন করেছেন । (শরহে মেশকাত ৪র্থ খন্ড ১৬৫ পৃ. মেশকাত ১৪৮ পৃ. শরহে সুন্নাহ হাঃ নং ১৫১৫) এই হাদিস দ্বারা প্রমাণ হয় যে সম্মানিত ব্যক্তির মাজারের উপর কাঁকর বা পাথরের কংক্রিট ব্যবহার করা রাসুল (সঃ) এর সুন্নাত ।
প্রমাণ-৩ : হযরত বুরাইদা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, নবী করিম (সঃ) এর জন্য ‘কবরে লাহদ’ তৈরী করা হয়েছিল এবং তাঁকে কিবলার দিক হতে নামানো হয়েছিল । অতঃপর তাঁর রওয়ার উপর কাঁচা ইট স্থাপন করা হয়েছিল (মুসনাদে ইমামে আজম দালায়েলুন্নবুয়্যাত ৭ম খন্ড ১৯৬ পৃ.
প্রমাণ -৪ : হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই নবী করিম (সঃ) এর জন্য লাহদ কবর তৈরী করা হয়েছিল । অতঃপর তাঁর রওযা শরীফে ইট স্থাপন করা হয়েছিল । (মুছান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৩ খন্ড ৩০৫ পৃ.)।
প্রমাণ- ৫ : হযরত আমের ইবনে সাদ ইবেন আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) হতে বর্ণিত : মৃত্যু কালিন রোগ অবস্থায় বলেছিলেন আমার জন্য লাহদ কবর তৈরী করবেন এবং ইহাতে কাঁচা ইট খাড়া করে দিবেন যেভাবে রাসুল (সঃ) এর রওযায় দেওয়া হয়েছিল । (সহি মুসলিম ৯৬৬ মুসনাদে আহমদ ১৮৪/১, ইবনে মাজাহ্ ১৫৫৬, মেসকাত ১৪৮ পৃ. শরহে ফাতহুল কাদির ২য় খন্ড ১৪৪ পৃ. ও মেরকাত শরহে মেসকাত ৪র্থ খন্ড) এছাড়াও বুখারী শরীফ ১ম খন্ড ৭০ পৃষ্ঠা, মেশকাত শরীফ ১৪৯ পৃ. মেরকাত শরহে মেশকাত ৪র্থ খন্ড ১৬৯ পৃ. দ্রঃ । বর্ণিত হাদিস দলিল দ্বারা প্রমাণিত হলো । মহানবী (সঃ) আবু বকর (রাঃ) ওমর (রাঃ) এবং সাদ ইবনে আস (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণ রাসুল (সঃ) সহ তাদের মাজার পাকা করেছেন । সুতরাং হক্কানী অলি আউলিয়াগণের মাজার পাকা করা রাসুল (সঃ) ও সাহাবীদের সুন্নাত ।
গিলাফ চড়ানো ও ঘর তৈরী –
প্রমাণ-১ : হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন : মহানবী (সঃ) এর রওয়া শরীফের উপর একটি লাল চাঁদর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। (সহি মুসলিম, মেশকাত শরীফ ১৪৮ পৃ. মেরকাত শরহে মেশকাত ও ৪র্থ খন্ড ১৫৩ পৃ. মুসনাদে আহমদ ৩৫৫/১ ও সুনানে নাসাঈ ২০১২)
প্রমাণ- ২ : হযরত আনিস সাবাই হতে সাঈদ ইবনে মালেক (রাঃ) বর্ণনা করেন ঃ নিশ্চয়ই নবী করিম (সঃ) সাইদ ইবনে মুয়াজ (রাঃ) এর কবরে নামলেন সাথে উছামা ইবনে জায়েদ (রাঃ) ও নামলেন এবং তাঁর কবর একটি কাপড় দ্বারা ঢেকে দিলেন । (মুছান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৩ খন্ড ৩২৩ পৃ.)
প্রমাণ-৩ : অলি আউলিয়া ও বজুর্গানে দ্বীনের মাজারের উপর ইমারত তৈরী করা ও কাপড় দ্বারা গিলাফ দেওয়া জায়েজ । যদি মানুষের মনে শ্রেষ্ঠতম ধারণা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হয় । যাতে লোকেরা ঐ কবর বাসীকে নগন্য মনে না করে । (তাফছিরে রুহুল বয়ান ৩ খন্ড ১০ম পারা ৪৮২ পৃ.)
প্রমাণ- ৪ : আল্লামা শেখ আব্দুল হক দেহলভী (রাঃ) বলেন : শেষ জামানায় মানুষ বাহ্যিক বেশ বুষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাবে । তাই মাশাযেখ ও বুজুর্গানে দ্বীনের মাজারের উপর ইমারত তৈরী বিশেষ অভিপ্রায় জোড় দেওয়া হয়েছে। যেন মুসলমানদের আউলিয়া কেরামগণের উপর শ্রদ্ধাভক্তি প্রকাশ পায় । (শরহে শফরুস সাদৎ)
প্রমাণ- ৫ : আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রাঃ) বলেন পুর্বসুরী আলিমগণ পীর মাশায়েখ ও উলামায়ে কেরামের মাজারের উপর ইমারত তৈরী করা জায়েজ বলেছেন । যাতে লোকেরা যেয়ারত করে সেখানে বসে আরাম পায় । ( মেরকাত শরহে মেশকাত ৪র্থ খন্ড ১৫৬ পৃ. জানাযা অধ্যায়)
প্রমাণ- ৬ : যদি মাইয়্যেত উলামা, মাশায়েখ বা সৈয়দ বংশের কেউ হয় তবে তাঁর কবরের উপর ইমারত (ঘর) তৈরী করা মাকরুহ নয় । (ফতোয়ায়ে শামী- ৩ খন্ড ১৪৪ পৃ.)
প্রমাণ-৭ : মশহুর কিতাব রুদ্দুল মোহতাবে রয়েছে যদি বর্তমান কালে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে সম্মান বোধের প্রত্যাশা করা হয় যাতে কবর বাসীর উপর অবজ্ঞা করা না হয় বরং উদাসিন ব্যক্তির মনে আদব ও ভয় সৃষ্টি হয় । তাহলে মাজারে গিলাফ দেওয়া জায়েজ। কেননা সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল । (ফতোয়ায়ে শামী ৫ম খন্ড । কিতাবুল কেরাহিয়া)
প্রমাণ- ৮ : অলি আউলিয়া ও পুন্যাত্মাদের মাজারে ইমারত তৈরী করা । গিলাফ পাগড়ী ও চাঁদর চড়ানো জায়েজ । যদি এর দ্বারা সাধারণ লোকের দৃষ্টিতে তাদের প্রতি সম্মান প্রকাশ পায় এবং লোকেরা যেন তাঁকে নগন্য মনে না করে। (তাফছিরে রুহুল বয়ান ১০ পারা হাদিকায়ে নাদিয়া)
প্রমাণ-৯ : যখন হাসান ইবনে আলী (রাঃ) ইন্তেকাল করে ছিলেন, তখন তাঁর স্ত্রী তাঁর মাজারের উপর একটি তাবু খাটাইলেন এবং এক বৎসর রেখেছিলেন । (সহি বুখারী শরফি, মেশকাত শরীফ ১৫০ পৃ. মেরকাত শরহে মেশকাত ৩য় খন্ড ২০৫ পৃ.) প্রমাণ- ১০ : হযরত উমর (রাঃ) যয়নব বিনতে জাহাসের মাজারের উপর হযরত আয়েশা (রাঃ) স্বীয় ভাই আবদুর রহমান (রাঃ) এর মাজারের উপর, মুহাম্মদ ইবনে হানিফা (রাঃ) যিনি হযরত আলী (রাঃ) এর ছেলে ছিলেন তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর মাজারের উপর গম্বুজ তৈরী করেছিলেন। (শরহে মুয়াত্তয়ে মালেক) ।
প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন, পবিত্র কাবা ঘরে গিলাফ দেওয়া আছে শুধুকি কাবা ঘরের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য ? আসলে তা নয়- মূলত: মানুষের মন ও বিবেক কে সতর্ক করার জন্য, যে এই পবিত্র কাবা ঘর বিশ্বের অন্য কোন মসজিদ বা ঘরের মত নয় । নিশ্চয় ইহা আল্লাহর ঘোষিত পুত পবিত্র ঘর । অনুরূপ কোরআন শরিফের উপর গিলাফ দেওয়া হয় । কেন দেওয়া হয় ? গিলাফ দিলেও কোরআন শরীফ না দিলেও কোরআন শরীফই থাকবে- তবে হ্যা, গিলাফ থাকলে মানুষের মন ও বিবেক সাবধান হয়ে যাবে যে ইহা পৃথিবীর অন্য কোন বই পুস্তক নহে” নিশ্চই মহান আল্লাহর বাণী পবিত্র কোরআন শরীফ ।
বিবেক বলবে এই পবিত্র গ্রন্থ অপবিত্র অবস্থায় স্পর্শ করা যাবে না। অবহেলায় অবজ্ঞায় যেখানে সেখানে ফেলে রাখাও যাবে না, গুনাহ হবে । তাহলে বুঝা গেল গিলাফ থাকার কারনে, পবিত্র কাবা শরীফ ও কোরআন শরীফের প্রতি মানুষের সম্মান শ্রদ্ধা ভক্তি ও আদবের উন্মেষ ঘটে। উপরোল্লেখিত সহি দলিল দ্বারা অলি আউলিয়ার মাজার শরিফে গিলাফ চড়ানো জায়েজের মাধ্যমে ইহা ও প্রতীয়মান হল যে, জিয়ারতকারী যেন গিলাফ চড়ানো দেখে সতর্ক ও সাবধান হয়ে যায় । মাজার শরিফ কে যেন মৃত কবর বাসীর সাথে তুলনা না করে । কোন রূপ অবজ্ঞা, অবহেলা, অসম্মান ও বেয়াদবী প্রকাশ না পায় । কারন আল্লাহর ভাষায় তাঁরা জীবিত ও রবের নিকট হতে রিজিক প্রাপ্ত । (আল ইমরান ১৬৯ আয়াত)
অতএব মাজার পাকা করা, ইমারত ও গম্বুজ তৈরি এবং গিলাফ চড়ানো সুন্নাত। সুন্নতে সাহাবা দলিল দ্বারা প্রমানিত হলো । ইন্নামাল আমালু বেন নিয়াত- নিশ্চয় সমস্ত কাজের ফল নিয়ত অনুসারে হবে । (বুখারী ১ম খন্ড)
মাজারে বাতি, ফুল, চন্দন, মান্নত ও চুম্বনের দলিল
আল্লাহ পাক এরশাদ করেন : “জালিকা ওয়ামাই ইয়্যু আজজিম শায়ায়িরুল্লাহি ফাইন্নাহা মিন তাক্বওয়াল কুলুব”- অর্থাৎ যে ব্যক্তি শায়ায়িরুল্লাহ কে সম্মান করে সেটা তার কলবে অবস্থিত খোদা ভীতি থেকেই নিঃসৃত । (সুরা হজ্ব- ৩২ আয়াত)
এখানে “শায়য়ির” অর্থ হলো আলামত, চিহ্ন বা নিদর্শন । হযরত শায়েখ আবদুল হক মোহাদ্দেস দেহলবী (রঃ) বলছেন যা কিছু মহান আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দেয় তা-ই হলো শায়ায়িরুল্লাহ । শাহ্ ওয়ালি উল্লাহ মোহাদ্দেস দেহলবী (রাঃ) বলেন, শায়ায়িরুল্লাহকে ভাল বাসার অর্থ হচ্ছে মহানবী (সঃ) কে কোরআন ও কাবাকে কিংবা যা কিছু মহান আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দেয় তাকে ভালবাসা । আল্লাহর আউলিয়া কেরাম কে ভালবাসা একই কথা । কেননা নবী করিম (সঃ) বলেন, যখন আউলিয়া কেরামের দর্শন লাভ হয়, তখন আল্লাহকে স্মরণ হয় । (আলতাফ আল কুদুম ৩০পৃ.)
দলিল-১ : মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী (রঃ) বলেন আল-আউলিয়াগণের মাজারে বাতি জ্বালানো সাহেবে মাজারের শান মান প্রকাশার্থে জায়েজ। আর সাধারণ মানুষের কবরে বিনা প্রয়োজনে বাতি জ্বালানো নাজায়েজ । (জা আল হক ২য় খন্ড ১২২ পৃ.)
দলিল-২ : উক্ত কিতাবে জালিকা ওয়ামাই, .কুলুব । এ আয়াতের ফতোয়ায় বলেছেন এ সম্মানের বেলায় কোনো শর্তারোপ করা হয়নি। এক এক দেশে এক এক রীতি প্রচলিত আছে । আউলিয়াগণের মাজার সমূহে ফুল দেয়া, চাঁদর চড়ানো ও বাতি জ্বালানো ইত্যাদির উদ্দেশ্য হলো সম্মান প্রদর্শন । বিধায় এগুলো জায়েজ । ফতোয়ায়ে আলমগীরির কিতাবুল কারাহাত ৫ম খন্ডের সূত্রে (জা আল হক ১১৪ পৃ. ২য় খন্ড)।
দলিল-৩ : হাদিকায়ে নাদিয়া শরহে তরীকায়ে মোহাম্মদীয়ার সূত্রে বর্ণিত আছে অলি আউলিয়ার আত্মার সম্মানের জন্য এবং জনগনের অবগতির জন্য মাজারের বাতি জ্বালানো জায়েজ। এবং ফুল ও সুগন্ধি রাখা উত্তম । (‘জা’ আল হক ২য় খন্ড ১১৭ পৃ) ।
দলিল-৪ : অতএব আউলিয়া কেরাম ও শায়রুল্লাহর অর্ন্তভুক্ত তাঁদের কে তাজিম করাটা মুত্তাকি হওয়ার লক্ষণ । আর যেহেতু আউলিয়া কেরাম গন জীবনেও ওফাতে অমর ও চিরঞ্জীব সেহেতু তাঁদের মাজার সমূহকে তাজিম করাটা তাক্বওয়া বা খোদা ভিতির লক্ষণ ব্যতীত কিছুই নয় । (ওহাবীদের সংশয় নিরশন-৫২ পৃ.)
দলিল-৫ : যদি কেউ আউলিয়া কেরামের মাজারে গিয়ে তাদেরকে আল্লাহ পাকের রহমতের প্রকাশস্থল মনে করে তাঁদেরকে উছিলা বানায় এবং সেই লক্ষ্যে তাদের মাজার শরিফে পশু-পাখি নজরে মান্নত করে কিংবা আতর ও মোম বাতি জ্বালায় বা ফুল, চন্দন, চাদর ইত্যাদি চড়ায় এবং মাজার শরিফ কে চুমো দেয় কিংবা মুখ ঘর্ষণ করে, তবে তাঁর এই কাজকে শরিয়ত সম্মত মোস্তাহাব বলে স্বীকৃত করতে হবে । (ওহাবীদের সংশয় নিরশন-৫৩ পৃ.)
দলিল-৬ : এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললো যে, হে রাসুল, আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে বেহেস্তের চৌকাঠে ও হুরীর ললাটে চুম্বন করবো। কিন্তু আমি অতি পাপী বেহেশতে যাওয়া আমার ভাগ্যে বোধ হয় নাই । এমতাবস্থায় কি করে আমার প্রতিজ্ঞা পালন করি । উত্তরে নবী করিম (সঃ) বললেন তুমি তোমার মায়ের ললাটে ও পিতার পায়ে চুম্বন করো, তবেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা হবে । সে বললো হুজুর তারা তো কেউ জীবিত নেই- হুজুর (সঃ) বললেন তাদের কবরে গিয়ে চুম্বন করো । সে বললো তাদের কবর ও আমার জানা নেই । হুজুর (সঃ) বললেন তাদের উদ্দেশ্যে মাটিতে দাগ কেটে দুটি নকল কবর বানিয়ে তাতেই চুম্বন করো। (ফতোয়ায়ে আলমগীরি, খাজিনাতোল রওজা মাতালেবুন মুমিনিন ও কেফায়া)
দলিল-৭ : উক্ত ফতোয়ায়ে আলমগীরির সুত্রে মুফতি নঈম খান বলেন নিজের মাতা পিতার কবরে চুমু দেয়ায় কোন ক্ষতি নেই বরং বৈধ বা জায়েজ । (জা-আল হক ২০৯পৃ.)
এপ্রসঙ্গে নিম্নের দলিল সমূহ দেখে নিতে পারেন । যথা-
(১) ফাতহুল বারী- ৬ষ্ঠ খন্ড ১৫পৃ.
(২) আহকামূল মাজার- ৫৫পৃ.)
(৩) সেফা উস সাকাম-৩৩পৃ.
(৪) তাফছিরে কানজুল ঈমান ও খাজাইনুল ইরফান ১ম খন্ড-১৭৪পৃ.
(৫) হৃদয়তীর্থ মদীনার পথে ১৫৪ পৃ.
(৬) প্রশ্ন উত্তরে আকায়েদ ও মাসায়েল শিক্ষা ৬১ পৃ.
(৭) আস সায়েক্কাহ- ৬৪-পৃ.
(৮) ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫ম খন্ড ৩৭৮ পৃষ্ঠা ।
সহি দলিল দ্বারা মাজারে বাতি জ্বালানো ফুল চন্দন দেওয়া মান্নত করাও চুমো দেয়া জায়েজ বা বৈধ প্রমাণিত হলো ।
মাজার জিয়ারত ও বরকত হাছিলের দলিল
পবিত্র রওযা বা মাজার শরীফ যিয়ারত করা হলো সুন্নাত। রাসুল পাক (সঃ) আওলাদে রাসুল এবং সাহাবাগণ মাজার যিয়ারত করেছেন এবং যিয়ারতের হুকুম দিয়েছেন । নবী করিম (সঃ) প্রথম দিকে মুসলমানদের আলাদা কবরস্থান না থাকায় এবং আল্লাহর হুকুম না পাওয়ায় কবর বা মাজার যিয়ারত নিষেধ করে ছিলেন । কিন্তু পরবর্তীতে মুসলমানদের পৃথক কবর স্থান যথন হলো তখন যিয়ারতের হুকুম দিলেন। সাধারণ মানুষের কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্য হলো তাদের গুনাহ্ মাফীর মাগফেরাত কামনা করা এবং এ উদ্দেশ্যে দান খয়রাত করা। আর অলি আল্লাহর মাজার যিয়ারতের উদ্দেশ্য হলো তাঁদের সাথে আত্মিক নিসবত ও ফায়েজ বরকত লাভ করা এবং অলিগণের উছিলা নিয়ে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করা । তাতে স্বীয় মুকসুদ পূরণ ও বরকত হাছিল হয় ।
সমস্ত মানুষেরই সতর্কতা ও সাবধানতার সাথে আজিজি নম্রতা ও আদবের মাধ্যমে নবী করিম (সঃ) এর নুরী ফায়েজ বরকত ও দয়া পাওয়ার আকাঙ্খায় রওযা মোবারক যিয়ারত করা উচিত তেমনি অলি আল্লাহ গণের মাজার যিয়ারতের সময়ও আদব মহব্বত ও নম্রতার মাধ্যমে অলিগণের নেসবত ও ফায়েজ বরকত কামনা করতে হবে ।
নিম্নে এ সম্পর্কে কিছু দলিল পেশ করা হলো-
হাদীস-১ : মহানবী (সঃ) বলেছেন আমি প্রথম দিকে তোমাদেরকে কবর যিয়ারত নিষেধ করেছিলাম । এখন তোমরা যিয়ারত করো । কেননা কবর যিয়ারত কলবকে নরম করে চোখে অশ্রু ঝরায় এবং পরকালকে স্মরণ করায় (মুসলিম শরীফ মেশকাত শরীফ ও বায়হাকী)
হাদীস-২ : হযরত ইবনে আবি শাইবাবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত । রাসুলে পাক (সঃ) প্রতি বছর উহুদ যুদ্ধে শহীদানদের মাজারে যিয়ারতের জন্য উপস্থিত হতেন এবং তাদের জন্য দোয়া করতেন । (ফতোয়ায়ে শামী ১ম খন্ড যিয়ারাতুল কবর অধ্যায় । সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ ২য় খন্ড ১৯৩ পৃ.)
হাদীস-৩ : হযরত ফাতিমা (রাঃ) হযরত আমীর হামযা (রাঃ) এর মাজার যিয়ারত করতেন এবং মাজার সংস্কার করতেন । তিনি ২/৩ দিনপর পর শহীদানদের মাজার যিয়ারত করতেন । (জজবুল কুলুব ইলা দিয়ারিল মাহবুব ২য় খন্ড ১৯৮ পৃ.)
হাদীস- ৪ : এক রমণী হযরত আয়েশা (রাঃ) নিকট এসে বললেন দয়া করে একটি বার হুজুর (সঃ) এর রওয়া শরীফের দরজাটি খুলে দিন । আয়েশা (রাঃ) দরজাটি খুলে দিলেন । মেয়ে লোকটি রওযা শরীফ দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন । একটানা কেঁদেই চললেন । তিনি কান্না থামলে দেখা গেল রমনীটি মারা গিয়েছে । (মাদারেজন নবুয়াত ৩য় খন্ড ৯৩ পৃ.)
এই হাদিস দ্বারা প্রমাণ হলো (শর্ত সাপেক্ষে) মহিলারা ও মাজার যিয়ারত করতে পারবে ।
প্রমাণ-১ : মহানবী (সঃ) এর রওযা মোবারক জিয়ারতের সময় নবী করিম (সঃ) এর পবিত্র চেহারা খেয়াল করবে । (ফতোয়ায়ে আলমগীর (একথাটি সাহাবাগণের জন্য প্রযোজ্য) ২য় খন্ড ৫৪৯ পৃ.) এ প্রসঙ্গে মাওলানা আশরাফ আলী থানবীর লিখিত কিতাব “কুছদুছ ছবীল” যার অনুবাদ মাওলানা শামছুল হক করেছেন । থানবী সাহেব উক্ত পুস্তকে কবর যিয়ারত সম্পর্কে বলেছেন আবার ইহাও দরকার যে আউলিয়াদের মাজার ও বুজুর্গদের মাজার যিয়ারত হাছেল করবে এবং সে সময় যেনো দীলের মধ্যে অন্য কোনো চিন্তা না থাকে তখন তাদের রুহের দিকে মন দিয়া তাদের রূহানিয়াতকে নিজের পীরের ছুরতে কল্পনা করে তাদের ফায়জ বরকত হাছিল করবে । এ কথাটি হাজি ইমদাদুল্লাহ মহাজির মক্কী (রাঃ) এর পত্রাবলীতে এবং শায়খ আহমদ ছেরহিন্দী মোজাদ্দেদ (র) তার মকতুবাত শরীফেও উল্লেখ করেছেন ।
প্রমাণ- ২ : খুলাফা-ই-রাশেদাসহ সাহাবা-ই- কেরামগণ ও এরূপ রওযা মোবারক যিয়ারত করতেন বলে তাফসীরে কবির ও দুররে মানসুরে উল্লেখ আছে (ফতোয়ায়ে সফরুচ্ছায়াদাত ১১ পৃ.)
হাদীস- ক : “মান যারা কবরি আজাবাতলাহু শাফায়াতি” । অর্থাৎ- রাসুলে পাক (সঃ) বলেছেন : যে ব্যক্তি আমার রওযা যিয়ারত করেছে তার জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে গেছে ।
হাদীস-খ : “মান যারা কবরি হালাতলাহু শাফায়াতি” অর্থাৎ নবী করিম (সঃ) এরশাদ করেছেন : যে ব্যক্তি আমার রওযা যিয়ারত করলো তার জন্য আমার শাফায়াত হালাল হয়ে গেল ।
হাদীস- গ : “মান যারানি বা’দা মওতি ফাকা আন্নামা যারানি ফি হায়াতি”, অর্থাৎ মহানবী (সঃ) বলেছেন : যে ব্যক্তি আমার ওফাতের পর আমার রওয়া যিয়ারত করলো সে যেন আমার জীবদ্দশাতেই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলো (এ হাদিস গুলো দারে কুতনী তার সুনানে বর্ণনা করেছেন ।)
আশা করি নবী অলি ও বুজুর্গগণের রওযা বা মাজার যিয়ারত প্রসঙ্গে উপরোক্ত হাদিস দলিল দ্বারা অবশ্যই জায়েজ ও সুন্নাত এবং ফায়েজ বরকত হাছিল প্রমাণিত হলো ।
প্রয়োজনে দেখে নিতে পারেন –
(১) আহকামুল মাজার ৩৩ পৃ.
(২) সেফাউস সাকাম ২৬ পৃ.
(৩) হৃদয় তীর্থ মদীনার পথে ১৪৪ পৃ.
(৪) আনোয়ারে আউলিয়া ৩১ পৃ.
(৫) সৌভাগ্যের পরশমনি ৩য় খন্ড ৬৫১ পৃ.
(৬) শাওয়াহেদুন নবুয়াত ২৭২ পৃ. ও
(৭) অন্ধের পথ প্রদর্শন (সম্পূর্ণ বই)
(৮) হিফজুল ঈমান (আঃ থানবী) ৬ পৃ.,
(৯) ইসলাহে বেহেশতী জেওর ৭৪-৭৫ পৃ.
(১০) জাআল হক ১৩৯ পৃ.
(১১) ফতোয়ায়ে আলমগীর ২য় খন্ড ৫৫১ পৃ.
অলী আউলিয়াগণের উছিলা নিয়ে প্রার্থনা করা
দলিল-১ : হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত । রাসুলে পাক (সঃ) এরশাদ করেন । তোমরা আমার রহমদীল উম্মতের (অলি আল্লাহগণের) নিকট তোমাদের মকসুদ পুরণের জন্যে সাহায্য চাও । তাহলে তোমরা রিযিক প্রাপ্ত হবে এবং মকসুদপূর্ণ হবে । (তাবরাণী আউসাত ও মিশকাতুল মাসাবীহ)
দলিল-২ : আল্লাহপাক তাঁর রহমত কে একশত ভাগ করে তার এক ভাগ সমস্ত সৃষ্টিকে দিয়েছেন । আর নিরানব্বই ভাগ তিনি দান করবেন হাশরের দিন” ইলমে তাসাউফ পন্থীদেরকে । সুতরাং যে ব্যক্তির কোনো মনোবাসনা থাকে সে যেনো আল্লাহর অলির মাজারে যায় এবং তাদেরকে উছিলা করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে । কেননা তাঁরা হচ্ছেন আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে মাধ্যম স্বরূপ। (তাফসীরে মাজহারী)
দলিল-৩ : ‘ইয়া আইয়ুহাললাজিনা আমানুত্তাকুল্লাহা ওয়াবতাগু ইলাইহিল উছিলাতা’ অর্থাৎ হে বিশ্বাসীগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবংতাঁর নৈকট্য লাভ করার জন্য উছিলা তালাশ কর । (সুরা মায়েদা-৩৫ আঃ) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত মোহাদ্দেস শাহ্ ওয়ালি উল্লাহ (রাঃ) বলেন । ‘আমানু’ শব্দ দ্বারা ঈমান “ইত্তাক্কু” শব্দ দ্বারা আমল এবং ‘উছিলা’ শব্দ দ্বারা পীর মাশায়েখের মাধ্যমে বা তাদের উছিলা নিয়ে জাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণ অনুসন্ধান করা বুঝানো হয়েছে (আল কাওলুল জামিল ১৮ পৃ.)
দলিল-৪ : মজমউল ফতোয়ায় বর্ণিত আছে- যখনই তোমরা কোনো পেরেশানী মুলক বিষয়ে পতিত হও । তখন মাজারস্থ অলি আল্লাহগণের উছিলা দিয়ে আল্লাহর দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করো- যেনো তাদের বরকতে তোমাদের দোয়া কবুল হয় ৷ (মজমউল ফতোয়া ১৪১ পৃ.)
দলিল-৫ : সাইয়্যেদ জামাল মক্কী (রঃ) বলেন । আমাকে প্রশ্ন করা হলো কোনো ব্যক্তি বিপদে পড়ে যদি বলে হে আল্লাহর রাসুল । অথবা হে শায়খ আব্দুল কাদির আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে সাহায্য করুন । অথবা হে মওলা আলী মদদ করুন তবে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে শরীয়তের হুকুম কী? তদুত্তরে বললাম । এরূপ সাহায্য প্রার্থনা করা শরীয়ত সম্মত খুবই উত্তম ব্যবস্থা । কোন হঠকারী বা অহংকারী ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ এটাকে অস্বীকার করতে পারবে না ৷ যে ব্যক্তি অস্বীকার করবে সে অলি আল্লাহগণের ফয়েজ ও বরকত থেকে অবশ্যই বঞ্চিত হবে। (ফতোয়ায়ে জামাল মক্কীর সূত্রে আহকামল মাজার-৬০ পৃ.)
দলিল-৬ : শায়েখ আবদুল হক মোহাদ্দেস দেহলবী (ঃ) বলেন- অলি আল্লাহগণের মাজারে গিয়ে অলিদের উছিলা দিয়ে প্রার্থনা করা শরীয়ত মতে জায়েজ (আশআতুল লোমআত)
দলিল-৭ : ইমাম ইবনুল হাজ (রাঃ) বলেন, মাজারস্থ অলি যদি এই পর্যায়ের হয় যে তাঁর কাছে বরকত লাভ করা সম্ভব তাহলে প্রথমে নবী করিম (সঃ) কে আল্লাহর দরবারে উছিলা ধরবে । কেননা তিনিই হচ্ছেন সর্বোত্তম ও মূল উছিলা এবং তিনিই উছিলা ধরাকে বৈধ ও জায়েজ করেছেন । তারপর মাজারবাসী এবং কবর স্থানের অন্যান্য নেক বান্দা এবং আউলিয়াগণকে মনোবাসনা পূরণ এবং গুণাহ মাগফিরাতের জন্য উছিলা বানাবে । তাদেরকে বেশি বেশি করে আল্লাহর দরবারে উছিলা বানাবে। কেননা, আল্লাহপাক তাদেরকে নির্বাচিত করেছেন । তাদেরকে মর্যাদা ও সম্মান দান করেছেন । অলিদের মাধ্যমে দুনিয়াতে যতোটুকু কল্যাণ দান করেছেন তার চেয়েও বেশি দান করবেন পরকালে । (ইছলাহে বেহেশতী জেওর ৪১ পৃ.)
দলিল-৮ : আহকামুল মাজার কিতাবে ফতোয়ায়ে শামীর মোকদ্দমায় ইমাম আবু হানিফা (রঃ) মহাত্ম অধ্যায় হতে ইমাম শাফেয়ী (রঃ) একটি বাণী তুলে ধরেছেন। তা, হলো ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন আমি বরকত লাভের উদ্দেশ্যে ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এর মাজারে আগমন করে থাকি । যদি কোনো বিষয়ে সমাধান প্রয়োজন হতো তখন আমি দু’রাকাত নামাজ পড়ে তার মাজারে গিয়ে তার উছিলা ধরে আল্লাহ্র দরবারে প্রার্থনা করতাম সাথে সাথে আমার সেই মকসুদ পূর্ণ হয়ে যেতো। (আহকামুল মাজার+ফতোয়ায়ে শামী ১ম খন্ড ১৪৯ পৃ.)
দলিল-৯ : ইমাম আযম আবু হানিফা (রঃ) বলেন মাজারস্থ ব্যক্তির কাছে কিছু চেয়ে বা তাঁর উছিলা ধরে দোয়া করা সুফিয়ানে কেরাম ও ফিকাহবিদগণের মতে জায়েজ বা বৈধ এবং মহিলাদের জন্যেও জায়েজ । (মুসনাদ ২৩৫ পৃ.)
দলিল-১০ : পশ্চিম দেশের লোকেরা ইমাম মালেক (রঃ) কে উছিলা করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন । (ওহাবীদের সংশয় নিরশন- ৪৩পৃ.)
নিম্নে বর্ণিত দলিল গুলোতেও মাজারস্থ ব্যক্তিকে উছিলা ধরে দোয়া করা বা কিছু চাওয়া বৈধ বলেছেন- যথা –
১) তাফসীরে মাজহারী ৬ষ্ঠ খন্ড ৩৪৮ পৃ.
২) ফায়সালায়ে হাপ্ত মাসায়েল ২৬ পৃ.
৩) ইছলাহে বেহেশতী জেওর ৪৪ পৃ.
৪) ওহবীদের সংশয় নিরশন ২১ পৃ.
৫) অন্ধের পথ প্রদর্শন ১৪৫ পৃ.
সুতরাং অকাট্য সহি দলিল সমূহ দ্বারা চার মাযহাবের ইমাগণের মতেও মাজারস্থ আল্লাহর অলিগণের উছিলা ধরে মনোবাসনা পূরণের জন্য প্রার্থনা করা বৈধ বা জায়েজ প্রমাণিত হলো ।
নারী পুরুষ উভয়ের উছিলা বা বায়াত গ্রহণের দলিল
আল্লাহ পাক অতি মহব্বত করে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে প্রতিনিধিত্বসহ উত্তম সিরাত সুরাতে ধরণীতে আমাদেরকে প্রেরণ করেছেন, উদ্দেশ্য সেই প্রেমময় অনন্ত অসীম সত্ত্বাকে চিনে জেনে প্রভুধ্যানে, তাঁরই প্রেমে যেনো মানব জাতিলীন বা ফানা বা একাকার হয়ে যায় । কিন্তু মানবকুল ভবে এসে জীবাত্মার গুণ খাছিয়তে আসৃত হয়ে আমিত্বের দেয়ালে আটকা পড়ে অসার সংসার মায়ায় আবদ্দ হইয়া করুনাময় আল্লাহকে ভুলে যায় । ষড়রিপুর তাড়নায় কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে মানুষ পাপী তাপী ও পতিত জীবনের বাসিন্দা হয়ে যায় ।
অর্থাৎ তাঁর দেহ রাজ্যে নফস ই আম্মারার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব থাকায় সে অশুদ্ধ অপবিত্র থাকে । জীবাত্মার অধিকারী এহেন পতিত (অশুদ্ধ) মানব জাতিকে কুপথ হতে সু পথে আনায়নে তথা আমিত্বের বেড়াজাল হতে মুক্তি দিতে যুগে যুগে আল্লাহ পাক ইনছানুল কামিল নবী-রাসুল ও পীর মুর্শিদগণকে অবতীর্ণ করেছেন ও করেন। আল্লাহর খাস বান্দা ইনছানুল কামেল গণের (মাধ্যমে) নির্ধারিত পথ ও মতই হলো পতিত মানব জাতির মুক্তির একমাত্র বিধান । পরিশুদ্ধ আত্মা (নফস মত্মাইন্না) অধিকারী কামেল মুর্শিদগণের সোহবতে থেকে নিজ আত্মা কে পরিশুদ্ধ করতে আল্লাহ্পাক এরশাদ করেন ঃ হে ইমানদারগণ । তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্য বাদী (অলি আল্লাহ) গণের সঙ্গী হও (তওবা ১১৯) আয়াতে উল্লেখিত ‘সাদিক’ অর্থ হক্কানী কামেল মোরশেদ । (তাবলীগি কিতাব ফাজায়েলে আমল ১ম খন্ড ৪৬ পৃ.)
পবিত্র কোরানপাকে আল্লাহ বলেন । “ক্বাদ আফলাহা মান যাক্কাহা” অর্থাৎ যে নিজেকে পবিত্র বা পরিশুদ্ধ করবে সেই সফলকাম হবে (সুরা শামছ- ৯ আয়াত। ওয়াক্বাদ খাবামান দাশসাহা” অর্থাৎ এবং যে ব্যর্থ হয়েছে সে নিজেকে কুলষিত করেছে (সুরা শামস ১০ আয়াত)।
সুতরাং প্রমান হলো আত্মশুদ্ধিই সফলতার একমাত্র উপায় । ‘স্মর্তব্য’ যে, আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে হলে প্রথমে আত্মা সম্পর্কে জ্ঞাত হতে হবে তথা আত্ম জ্ঞান অর্জন করতে হবে । কারন আত্মজ্ঞান হলেই আত্মশুদ্ধি হবে । আত্মশুদ্ধি হলে আত্ম চেতনা আসবে আর আত্ম চেতনা বা চৈতন্য হলে হবে আত্ম দর্শন তথা প্ৰভু দর্শন, দর্শনে আসবে প্রেম আর প্রেমেই হবে মিলন । বলা বাহুল্য মানব সৃষ্টির মুলে স্রষ্টার উদ্দেশ্য ইহাই । আর ধর্মের মুল উদ্দেশ্য আত্ম শুদ্ধির মাধ্যমে আত্ম জ্ঞান লাভ । উপরোক্ত স্তর বা মাকামে উপনিত হতে হলে সর্বাগ্রে কর্তব্য আত্মদর্শন বা আত্মসমর্পণ করা অর্থাৎ একজন পরিশুদ্ধ কামেল মোরশেদের হাতে (নারী পুরুষ) সকলের বায়াত গ্রহণ করা । আল্লাহ পাক এরশাদ করেন “ইন্নাল্লাযিনা ইউ বায়উনাকা ইন্নামা ইউ বায়উনাল্লাহা ইয়াদুল্লাহি ফাউকা আইদিহিম” অর্থাৎ নিশ্চই যারা আপনার (রাসুলের) হাতে হাত দিয়ে বায়াত গ্রহণ করেছে তারা নিশ্চই আল্লাহর হাতে বায়াত গ্রহণ করেছে, আল্লাহর হাত তাঁদের হাতের উপর । (সূরা- ফাত্তাহ-১০ আয়াত)
প্রতীয়মান হলো, বায়াত গ্রহণ করার হুকুমটি আল্লাহর । আর সকল মুসলমান গণ অবগত আছেন যে অল্লাহর হুকুম ফরজ । গভীরভাবে বুঝতে হবে যে অন্তর পরিশুদ্ধ বা আত্মশুদ্ধি অর্জন করার জন্য অবশ্যই প্রয়োজন ইলমে তাসাউফ বা ইলমে লাদ্দুনা তথা আধ্যাত্মিক জ্ঞানার্জন । আর এই ইলম বা জ্ঞান কোন স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি ও মাদ্রাসায় শিক্ষা দেওয়া হয়না বা শিক্ষা দেওয়া যায় না । ইহা বাহ্যিক পাঠ্য পুস্তক বহির্ভূত জ্ঞান । যে জ্ঞান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় হাবিব হুজুরে পাক (সঃ) এর পবিত্র সিনা মোবারকে গচ্ছিত রেখেছিলেন (সুরা- আলাক) ।
পরবর্তিতে বেলায়েতের সম্রাট হযরত মওলা আলী (রাঃ) মাধ্যম দিয়ে পীর পরস্পরায় অদ্যাবধি তরীকতে সিল সিলায় চালু আছে এবং অনন্ত কাল চলমান থাকবে- স্বপক্ষে ইমাম মুজতাহিদ, মুফাচ্ছির ও মুহাদ্দিসগণ বলেন, দিলের ইসলাহ তথা আত্ম শুদ্ধি অর্জনের জন্য ইলমে তাসাউফ (বাতেনী) জ্ঞান লাভ করতে একজন কামিল মুর্শিদের নিকট বায়াত হওয়া ফরজ । (কিমিয়ায়ে সায়াদাত ও তাফসীরে মারেফুল কোরান, মকতুবাত শরীফ) অনুরূপ, তাফসীরে রুহুল বয়ান, রুহুল মায়ানী ও তাফসীরে কবীরে উল্লেখ আছে যে, মূলতঃ কামিল মুর্শিদ, মুরীদের অন্তর পরিশুদ্ধ করত : আল্লাহ পাকের খাস নৈকট্য লাভ করানোর এক বিশেষ উছিলা বা মাধ্যম ।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন : হে বিশ্বাসীগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর নৈকট্য লাভ করার জন্য উছিলা অন্বেষন (গ্রহণ) করো (সুরা- মায়েদা ৩৫ আঃ) এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় তাফসীরে রুহুল বয়ানে উল্লেখ আছে যে উছিলা ব্যতীত আল্লাহ্পাক এর নৈকট লাভ করা যায় না । আর উক্ত উছিলা হচ্ছেন তরীকতপন্থী কামিল মুর্শিদগণ । এ সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন- এবং যে ব্যক্তি আমার দিকে রুজু হয়েছে তোমরা তাঁর পথকে অনুসরণ করো (সুরা লুকমান ১৫ আয়াত) একমাত্র অলি আউলিয়াগণই (দুনিয়ার মোহত্যাগ করে) ‘দায়মুচ্ছালাতে’ সারাক্ষন হুজরী দিলে আল্লাহতে রুজু থাকেন অতএব বেলায়েত প্ৰাপ্ত অলি আল্লাহদের সঙ্গ লাভ অনুসরণ ও অনুকরণ করাই একান্ত কর্তব্য। আল্লাহপাক বিশ্বের মানব জাতিকে জানিয়ে দিলেন তোমরা বলো “সিরাতাল্লাজিনা আন আমতা আলাইহিম” অর্থাৎ – তাদের পথে পরিচালনা করো যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ বা নিয়ামত দান করেছ (সুরা ফাতিহা-৬ আয়াত) এ আয়াত দ্বারাও আমরা প্রমাণ পেলাম ।
আল্লাহর নিয়ামত তথা অনুগ্রহ প্রাপ্ত ব্যক্তিদের উছিলা দিয়ে নিজের জীবন সঠিক পথে পরিচালনার প্রার্থনা সুরা ফাতিহার মধ্যে আল্লাহ্ অবতীর্ণ করেছেন । এর পরেও যারা উছিলা বলতে পীর মুর্শিদ না মেনে অন্য কিছু বুঝে বা বুঝতে চায় তাহলে তারা যে কোরান বুঝে না বা মানেনা এটাই প্রমাণিত হয়। তবে পীর মুর্শিদ মানাটাও তকদীর না মানাটাও তকদীর । আল্লাহ এরশাদ করেন : আল্লাহ পাক যাকে হেদায়েত দান করেন সেই মাত্র সঠিক রাস্তাপায় আর যাকে হেদায়েত দান করেন না সে কখনো মুর্শিদ রূপ অলী বা বন্ধু পায়না । (সুরা কাহাফ-১৭ আয়াত) ।
একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে যে একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই সমস্ত ক্ষমতার মালিক কিন্ত তিনি উছিলা বিহীন কিছুই করেনা সুতরাং মুর্শিদ রূপ উছিলা বা বায়াত গ্রহণ ব্যতিরেকে সেই মহান আল্লাহ্ তায়ালার দ্বীদার লাভ কস্মিন কালেও সম্ভব নয় । পবিত্র কোরানে কলেমা, নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত আদায় করার বিষয়ে যেমন নারী পুরুষের জন্য ভিন্ন কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি তেমনি কোরানে বায়াত বিষয়েও একই আয়াত দ্বারা নারী পুরুষের বায়াতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তারপরও সুরা মুমতাহিনার ১২নং আয়াতে মেয়েদের কে বায়াত করার জন্য আল্লাহপাক হুকুম করেছেন। কতগুলো শর্তের মাধ্যমে যেমন, শিরক করবেনা, চুরি করবেনা অন্যের সন্তান গর্ভে ধারণ করে স্বামীর উপর মিথ্যা অপবাদ চাপিয়ে দেবে না এবং দয়াল নবীজির আদেশের অবমাননা করবে না । উক্ত শর্ত সাপেক্ষে মক্কা বিজয়ের দিন পুরুষদের বায়াতের বায়াতের পাশাপাশি চারশত সাতান্নজন মহিলাকেও হুজুর (সঃ) বায়াত করেছিলেন । (আয়াতের শানে নজুল দ্রঃ) তাফসীরে কানজুল ইমান ও খাজাইনুল ইরফান ৩য় খন্ড ৯৯৩ ও পৃ. ও খায়রুল মাজালিস ১১৮ পৃ. পড়ে দেখার অনুরোধ রইলো । সুতরাং নারী পুরুষ উভয়ের বায়াত গ্রহণ করা পবিত্র কোরান দ্বারা ফরজ প্রমাণিত হলো ।
হাদিস শরীফ ও কিতাবের দলিল :
দলিল-১ : নবীজি বলেন : জ্ঞানী (যাহির, বাতিন) ব্যক্তিরাই আমার (আল ওলামাউ ওয়ারেছাতুল আম্বিয়া) একমাত্র ওয়ারিস । (হাদিস)
দলিল-২ : হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন, “উতিহিম আকলিওয়াহিকমি” অর্থাৎঃ আমি আমার অলিদেরকে আমার নিজ হতে জ্ঞান ও বিবেক দান করে থাকি । (মসনবী শরীফ ৪র্থ খন্ড ৫০ পৃ.)
দলিল- ৩ : “আশ শায়খুফি কাওমীহি কান নাবীউফি উম্মাতিহী” অর্থাৎ- নবী তাঁর উম্মতের জন্য যেমন মুর্শিদ তাঁর মুরীদের জন্যে তেমন (মকতুবাতে সদী ১ম খন্ড ১৯৬ পৃ.)
দলিল- ৪ : “মানলা শায়খালাহু ফিস শায়খিস শায়তান” অর্থাৎ যে ব্যক্তির শায়খ বা মুর্শিদ নাই তাঁর শায়খ হলো শয়তান । (বারফুতী শরীফের সুত্রে শানে হাবিবুর রহমান কিতাবের ২০০ পৃ.)
দলিল-৫: হযরত কায়েস (রাঃ) হতে বর্ণিত হুজুর (সঃ) বলেছেন যে ব্যক্তি বায়াত গ্রহণ না করে মৃত্যু বরণ করলো সে যেন জাহেলিয়াতের সাথে মৃত্যু বরণ করলো (বুখারী ২য় খন্ড) ঐ হাদিসটি বুখারীর ৫ম খন্ডের ১২৮ পৃষ্ঠায় মুসলিম শরীফ, মিশরী, ১৮৫১ নং হাদিস এবং মিশকাত শরীফের ৭ম খন্ডের ৪৩৭৮ নং হাদিসেও বর্ণিত আছে । বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর ।
দলিল- ৬ : বায়াত ভঙ্গকারী অপবিত্র যার পরিনাম হলো জাহান্নাম (বুখারী শরীফ ৬ষ্ঠ খন্ড- ৬৭০৩ নং হাদিস)। (সুরা ফাত্তার ১০ আয়াতের শেষ অংশ বায়াত ভঙ্গ এর পরিনাম সম্পর্কে)
দলিল- ৭ : যে ব্যক্তি মুর্শিদের উছিলা ব্যতীত সুলুকের পথে পা বাড়াইল সে শয়তানের চক্রান্তে পথভ্রষ্ট ও অন্ধকুপে পতিত হলো (মসনবী মাওলানা রুমী ৪র্থ খন্ড ৪ পৃ.)
দলিল-৮ : খালেছ অন্তরে একদিন পীরের খেদমত করা হাজার বৎসর নফল ইবাদতের চেয়েও অধিক উত্তম (ইসরারুল আউলিয়া ৫৫ পৃ.) দলিল-৯ : ইমাম আযম আবু হানিফা (রঃ) বলেন, যদি আমি ইমাম জাফর সাদেকের নিকট বায়াত না হতাম তবে আমি নোমান ধ্বংশ হয়ে যেতাম (হানাফি মাযহাবের ইমাম) ।
এধরণের হাজারো প্রমাণ রয়েছে হক্কানী আলেম ও আউলিয়াদের পক্ষ হতে, যা তুলে ধরলে লেখাটি অনেক বড় হয়ে যাবে । মূল কথা হলো বায়াত হয়ে পীরের খেদমত করে ইলমে তাসাউফ বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন না করা পর্যন্ত কেহ নিজ আত্মা পরিশুদ্ধ করতে পারবে না । কেননা এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে ইলমে তাসাউফ অর্জন করার মাধ্যমে অন্তর পরিশুদ্ধ করতঃ বেলায়েতে আমুল খাস হাসিল করা ফরজ। এ ফরজ ততক্ষন পর্যন্ত আদায় করা সম্ভব হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত একজন কামেল মুর্শিদের নিকট বায়াত না হবে । যে কাজ বা আমল ব্যতীত ফরজ সমুহ আদায় হয় না বা পূর্ণ হয় না সে ফরজ পূর্ণ করার জন্য ঐ কাজ বা আমল করাও ফরজ। (তাফসীরে মাযহারী ও দুররুল মুখতার)
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “ইল্লামান আতাল্লাহা বিক্কলবিন ছালিম” অর্থাৎ- পরিশুদ্ধ অন্তর ব্যতীত কেহই আল্লাহর নিকটে যেতে পারবে না (সুরা শুরা-৮৯ আয়াত)
অতএব- আত্মশুদ্ধির জন্য বায়াত গ্রহণ অবশ্যই বাধ্যতামূলক ।
বায়াত গ্রহণ প্রসঙ্গে আরো কিছু দলিল তুলে দিলাম –
(১) সুরা ফাতিহা ৬ আয়াত
(২) সুরা নিসা ৫৯ আয়াত
(৩) সুরা মায়েদা ৩৫ আয়াত
(৪) সুরা ফাত্তাহ্ ১০ ও ১৮ আয়াত
(৫) সুরা তওবা ১১৯ আয়াত
(৬) সুরা বনিইসরাইল ৭১ আয়াত
(৭) সুরা লুকমান ১৫ আয়াত
(৮) সুরা কাহাফ ১৭ আয়াত
(৯) সুরা মুমতাহিনা ১২ আয়াত
(১০) বুখারী শরীফ ২য় খন্ড ১০৩ পৃ.
(১১) বুখারী শরীফ ৩য় খন্ড ১২৪/২৫ পৃ.
(১২) বুখারী ৪র্থ খন্ড ১৫২ পৃ.
(১৩) মুসলীম শরীফ ২য় খন্ড ১৩১ পৃ.
(১৪) বুখারী ৫ম খন্ড ১২৮ পৃ.
(১৫) বুখারী শরীফ ৬ষ্ঠ খন্ড হাদিস নং ৬৭০৩
(১৬) মিশকাত শরীফ ৭ম খন্ড হাদিস নং ৪৩৭৮
আশা করি আমরা কোরআন হাদিসের সহি দলিল সমূহ দ্বারা প্রমাণ পেলাম বায়াত বা উছিলা গ্রহণ করা ফরজ মতান্তরে ওয়াজিব ।
৪০ (চল্লিশ) সংখ্যার মাহাত্ম্য ও ব্যাবহার
গণিত শাস্ত্রের এমন কিছু সংখ্যা আছে যা সাধারন অর্থে ব্যবহৃত হয় । আবার এমন কিছু কিছু সংখ্যা যেমন- ৩, ৫,৭,৯,১২,১৯,২৪,ও ৪০ ইত্যাদি সংখ্যাগুলি অত্যাধিক তাৎপর্যপূর্ন ও ব্যাখ্যা যুক্ত । অনুরূপ ৫,৭,৯,১২ ও ৪০ সংখ্যা গুলো কোন পার্থিব সংখ্যা নয় । এগুলো শাশ্বত চিরন্তন সংখ্যা যা দ্বারা সৃষ্টির উদয়, বিলয়, ভাঙ্গা,গড়া হচ্ছে। এ অধ্যায়ে শুধু চল্লিশ সংখ্যাটি নিয়ে কিঞ্চিত আলোচনা পাঠক সমাজে তুলে ধরার চেষ্টা করছি ।
নবী রাসুলদের শানে চল্লিশ সংখ্যা ব্যাবহারের দলিল –
(১) হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আ) বেহেস্ত হতে জমিনে পতিত হয়ে ৩৪০ বছর গুনাহ মাফ চেয়ে কেঁদেছিলেন ।
(২) হযরত নুহ (আঃ) এর সময় গজবী তুফান হয়ে ছিল ৪০ দিন এবং পৃথিবী হতে চল্লিশ জোড়া প্রাণী কিস্তিতে তুলেছিলেন ।
(৩) হযরত ইবরাহীম (আঃ) নমরূদের অগ্নিকুন্ডে ছিলেন ৪০দিন ।
(৪) হযরত মুসা (আঃ) উপর ৪০দিনে তৌরত শরিফ অবতীর্ন হয় ।
(৫) হযরত ইউনুছ (আঃ) মাছের পেটে ছিলেন ৪০দিন ।
(৬) হযরত ইউসুফ (আঃ) কুয়াতে পড়ে ছিলেন ৪০দিন ।
(৭) হযরত ইউসুফ (আঃ) কে তাঁর পিতা মাতা ও ভ্রাতাগন তাকে সিজদা করেছিলেন, তাদের এক সিজদার মধ্যে ৪০দিন অতিবাহিত হয়েছিল।
(৮) হযরত ঈসা (আঃ) মাত্র ৪০দিন বয়সে কথা বলা শুরু করেছেন ।
(৯) মহানবী (সঃ) ৪০বছর বয়সে আল্লাহর পক্ষ হতে অহী প্রাপ্ত হন । (সুরা আলাক- ৫আয়াত) ।
(১০) প্রথম অহী নাজিলের ৪০ দিন পর দ্বিতীয় বারের অহী নাযিল করেন । সুরা- মুদাচ্ছিরের কিছু অংশ ।
ইসলাম ধর্মে চল্লিশ সংখ্যার ব্যবহার –
(১) শরয়ী বিধান মতে চল্লিশ টাকার এক টাকা যাকাত আদায় করা মুসলমানদের জন্য ফরজ ।
(২) তাসাউফ পন্থীদের মতে সৃষ্টিতত্ত্বে চল্লিশ উপাদানে মানব সৃষ্টি এ চল্লিশের একভাগ যাকাত দিতে হবে ।
(৩) মহানবী (সঃ) বর্ণনা করেন, মৃত ব্যক্তির মরদেহ কবরস্ত করে মানুষ যখন বিদায় নেয় মাত্র চল্লিশ কদম যেতেই ঐ কবরে মনকির, নকীর নামক দুই ফেরেস্তা প্রবেশ করে এবং কবরস্ত ব্যক্তিকে জীবিত করে ছওয়াল জওয়াব শুর করবে ।
(৪) হুজুর (সঃ) বলেন, মেহমান কে বিদায় দিতে কমপক্ষে চল্লিশ কদম এগিয়ে দেওয়া সুন্নাত ।
(৫) পবিত্র হজ যাত্রীদের মক্কা শরীফ হতে মদীনায় পৌছায়ে চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সময় পর্যন্ত অবস্থান করবার হুকুম দেয়া হয়েছে।
(৬) রাসুলুল্লাহ (সঃ) বর্ণনা করেন, কোনো জামাতে (মজলিশে) যদি চল্লিশ জন লোক থাকে তাদের মধ্যে একজনকে অলি বানিয়ে তাঁর উছিলায় অন্য সকলের প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় ।
(৭) আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রঃ) বলেন কোনো মহল্লা বা গ্রাম দিয়ে যদি একজন নায়েবে রাসুল (অলি আল্লাহ) হেঁটে যায় তাঁর ইজ্জতে ৪০ দিন আল্লাহ তা’য়ালা ঐ মহল্লা বা গ্রাম বাসীর সকল প্রকার বালা মুসিবত বিপদ অপোদ থেকে মুক্ত রাখেন এবং কবর বাসীর কবর আজাবও মাফ করেন । চল্লিশ দিন পর্যন্ত। ছোবহানাল্লাহ্ = (মিশকাত শরহে মেরকাত)
(৮) মানুষের ইন্তেকালের পর রুহ বা আত্মা চল্লিশ দিন পর্যন্ত পরিবার পরিজন তথা আপনজনদের নিকটেই থাকে অতঃপর আমল অনুযায়ী ইল্লিন ও ছিজ্জিনে গমন করে, যার কারণে ওলামায়েকেরামগণ চল্লিশ দিনে মৃত ব্যক্তির রুহের মাগফেরাতের উদ্দেশ্যে বিশেষ মিলাদ মাহফিল ও দোয়ার ব্যবস্থা করার প্রতি তাকিদ দিয়েছেন । অনেকে জরুরত ও বলেছেন এই চল্লিশ দিনের মিলাদ মাহফিলকেই“ চেহলাম” বলা হয় ।
(৯) রাসুলুল্লাহ (সঃ) এবং অলি আউলিয়াগণ খোদা প্রাপ্তির জন্যে বিশেষ নিয়মে নির্জনে চল্লিশ দিন ধ্যান মগ্ন মোরাকেবা মোশাহেদা ও বিশেষ ইবাদত বন্দেগী করে আল্লাহ তা’য়ালার সন্তষ্টি অর্জন করেছেন ইহাকে “চেল্লা” বা চেল্লাকুসী বলা হয় । আরোও অনেক ক্ষেত্রেই চল্লিশ সংখ্যাটির ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং প্রতীয়মান হলো যে এই চল্লিশ সংখ্যাটি মহান আল্লাহ ও তাঁর হাবিব রাসুলে করিম (সঃ) অধিক যায়গায় বহুলাংশে ব্যবহার করেছেন । সেহেতু এই চল্লিশ সংখ্যাটি অবশ্যই ভাবিবার বিষয় ।
তাসাউফ ও সৃষ্টিতত্ত্বে চল্লিশ সংখ্যা ব্যবহার –
(১) সুরা মোমেনুন এর ১৪নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে মানব শিশুমাতৃ রেহেমে ৪০ সাপ্তাহ্ বা ৭টি ৪০ (৭x৪০) = ২৮০ দিন অবস্থানের পর জগতে ভুমিষ্ঠ হয় । প্রতি ৪০ দিন পর একটি করিয়া স্তর বা ধাপ অতিক্রম করে দেহ গঠিত হয়েছে ।
(২) চেহেলতন, চল্লিশ অস্থিত্ব বা উপাদানে মানবদেহ গঠনে পুর্নতা লাভ করে এমন কি বিশ্ব জগত ও একই ভাবে প্রকাশিত হয় । মৌলিক অস্থিত্ব নিম্ন রূপ ঃ জাত = ৫ পাঁচ জাতের গুণ ৫ = (৫x৫ = ২৫+৫=৩০) সেফাত = ৭ ও জামাত = ৩ তাহলে সর্বমোট (৩০+৭+৩=৪০) সুতরাং ওয়াজেবুল হইতে এমকান প্রাপ্ত তথা নিত্যধাম হতে লীলা ধামে রূপাকৃতিতে চল্লিশ অস্তিত্ব দ্বারা প্রকাশ হয় । (মোরশেদ কর্তৃক শিক্ষনীয়)
(৩) চিশতীয়া নিজামীয়া তরীকায় উপযুক্ত মুরীদকে চেহেলতন তথা আধ্যাত্মিক পুর্ণ চল্লিশের তালিম প্রদান করা হয় ।
(৪) ঝিটকা শরীফের সুফী সম্রাট দেওয়ান শাহ্ আব্দুর রশীদ আল চিশতী নিজামী (রহঃ) স্বরবর্ণ ও ব্যাঞ্জনবর্ণ হতে ৪০টি বর্ণ, অক্ষর বা হরফ দ্বারা ‘চেহেলতন দেওয়ান’ নামক একখানা বিখ্যাত অনন্য তাসাউফের কিতাব রচনা করেছেন । উক্ত গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে চল্লিশ হরফে লেখা দেওয়ান আমার হরফে হরফে ব্যাখ্যা তৌহিদ ও আল্লার
(৫) অনুরূপ জেন্দা অলি আহম্মদ কাউছার আলী চিশ্তী ওরফে জেন্দাশাহ (রহঃ) নেয়ামতে খোদা নামক কিতাব খানা চল্লিশ পরিচ্ছেদে সমাপ্ত করেছেন । ছোবহানাল্লাহ্
প্রিয় পাঠক সমাজ – উপরোক্ত চল্লিশ সংখ্যাটির দলিল ও আলোচনা দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম এই ৪০ সংখ্যাটি সাধারণ কোনো পার্থিব সংখ্যাই শুধু নয় । ইহাতে নিগুঢ় ভেদ রহস্য তত্ত্ব ও তথ্য রহিয়াছে । বেলায়েত প্রাপ্ত কামেল মোরশেদের খেদমত করে তালিম ও তাসাউফ প্রাপ্ত হলে এই চল্লিশের ভেদতত্ত্ব অনুধাবন করা সম্ভব । কারণ সংখ্যাটি হলো শাশ্বত, চিরন্তন, যা দ্বারা সৃষ্টির অরুজ নজুল, উদয় বিলয় ভাঙা গড়া চলছে।
বারো ইমাম পাকের জন্ম ও শাহাদাতের বিবরণ
(১) মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দে ১২ই রবিউল আওয়াল সোমবার ভোরে মক্কা নগরীতে কোরাইশ বংশে জন্ম গ্রহণ করেন । ৬৩ বছর বয়সে ৬৩২ খ্রীঃ ১০ম হিজরী ১২ই রবিউল আওয়াল সোমবার বিকালে মদীনায় ইহলীলা সংবরণ করেন । রাসুল (সঃ) এর পবিত্র দেহ মোবারক হযরত আব্বাস (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফজল (রাঃ) ও হযরত কাছাম (রাঃ) এ চারজন গোসল করিয়ে ছিলেন। এর মধ্যে হযরত আব্বাস (রাঃ) দেহ মোবারক ডানে বামে ঘুরিয়েছিলেন আর হযরত আলী (রাঃ) গোসল করিয়েছিলেন বাকি দুইজন অন্যান্য কাজে সহায়তা করেছিলেন । আবু তালহা কবর বানিয়েছিল । কবরটি ছিল বোগলা কবর । এরপর ঐ চারজন কবরে নেমে রাসুল (সঃ) গায়ের চাদর মোবারক বিছিয়ে দিয়ে লাশ মোবারক কবরে রাখেন বুধবার দিবাগত রাতে। খাসায়েসুল কুবরা ২য় খন্ড ২৮১ পৃঃ।
(২) হযরত মাওলা আলী কারামাল্লাহু ওয়াজ হাহু ৬০০ খ্রীঃ ১৩ই রজব শুক্রবার পবিত্র কাবা ঘরের মধ্যে ধরণীতে আগমন করেন । ৬৩ বছর বয়সে ৪০ হিজরী ১৮ই রমযান বৃহস্পতিবার রাতের শেষে ফজর নামাজের সুন্নাত নামাজের শেষ রাকাতে সেজদারত অবস্থায় (ইরাক-কুফা জামে মসজিদে) ঘাতক আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম এর তরবারীর আঘাতে প্রচন্ড আহত হয়ে ২১শে রমযান রবিবার শাহাদাত বরণ করেন । ইরাকের নজফ শহরে পবিত্র মাজার শরীফ অবস্থিত । (শাওয়াহেদুন নবুয়ত ২২৬ পৃ.)।
(৩) হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) ৬২৫ খ্রীঃ ৩য় হিজরী ১৫ই রমজান মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেন । ৪৭ বছর বয়সে মোয়াবিয়ার চক্রান্তে বিষপানে ৫০ হিজরী ২৮ শে সফর (৬৭২ খ্রী:) শাহাদাত বরন করেন । পবিত্র মাজার শরীফ জান্নাতুল বাকীতে (বর্তমান নিচিহ্ন অবস্থায়) অবস্থিত ।
(৪) হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) ৪র্থ হিজরী ৩রা শাবান (৬২৬খ্রী:) বৃহ:পতিবার মদীনা শরীফে জন্ম গ্রহণ করেন । ৫৭ বছর বয়সে কুখ্যাত এজিদের নির্দেশ ঘাতক সীমারের হাতে ১০ই মহরম ৬১ হিজরী (৬৮৩ খৃ:) ইরাকে মরু কারবালা ময়দানে শাহাদাত বরণ করেন । কারবালায় পবিত্র মাজার শরিফ বিদ্যমান ।
(৫) ইমাম জয়নুল আবেদীন (রা:) ৫ই শাবান ৩৮ হিজরী (৬৫৯ খ্রীঃ) মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেন । এবং উমাইয়া শাসক ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক এর নির্দেশে (পুত্র) হিশাম বিন আবদুল মালিক বিষপান করান । উক্ত বিষপানে ৫৩ বছর বয়সে ২৫শে মহরম ৯৫হি: (৭১৩খৃ:) ইমাম জয়নুল আবেদীন শাহাদাত বরন করেন ।
(৬) ইমাম বাকের (রা:) ১লা রজব ৫৭হিজরী মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেন (৬৭৬খ্রী:) উমাইয়া শাসক আবদুল মালেকের শাসনামলে বিষ প্রয়োগে ৭ই জিলহজ ১৪৪ হিঃ (৭৩৩খৃ:) শাহাদাত বরণ করেন । (৫৭ বছর বয়সে) ।
(৭) ইমাম জাফর সাদেক (রা:) জন্ম ১৭ই রবিউল আওয়াল ৮৩হি: (৭০২ খৃ:) এবং আব্বাসীয় খলিফা মানছুরের বিষ প্রয়োগে ২৫শে শাওয়াল ১৪৮হি: (৭৬৬খ্রী:) ৬৫ বছর বয়সে শাহাদাতের অমৃত সুধা পান করেন । জন্ম (রা: ) ৭ই সফর।
(৮) ইমাম মুসা কাজিম ১২৯হিজরী (৭৪৬খৃ:)। খলিফা হারুন ওর রশিদের নির্দেশে বাগদাদে সানদি ইবনে শাহাকের কারাগারে বন্দি রাখেন । অতঃপর ঘাতক শাহাক ইমামকে বিষ পান করায় । ২৫ শে রজব ১৮৩ হিজরী (৭৯৯খ্রী:) ৫৪ বছর বয়সে শহিদ হন । বাগদাদে আল কাজিমিয়াতে মাজার শরীফ অবস্থিত । (ইরাক)
(৯) ইমাম আলী রেজা (রা:) জন্ম ১১ই জিলক্বদ ১৪৮হি: (৭৬৫খ্রী:) আব্বাসীয় খলিফা মামুন এর বিষ প্রয়োগে ৫৫বছর বয়সে ১৭ই সফর ২০৩হিঃ (৮২০খ্রীঃ) খোরাসান ইরানের মাসাদে শাহাদাত বরন করেন ।
(১০) ইমাম মুহাম্মদ তকী (রা:) জন্ম ১০ই রজব ১৯৫ হি: (৮১১ খ্রী:) আব্বাসীয় খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর নির্দেশে বিষ প্রয়োগে ৩০ শে জিলক্বদ ২২০ হিঃ (৮৩৬খ্রী:) মাত্র ২৫ বছর বয়সে ইহধাম ত্যাগ করেন । বাগদাদ কাজিমিয়াতে দাদা ইমাম মুসা কাজিমের মাজারের পাশে মাজার শরিফ অবস্থিত ।
(১১) ইমাম আলী নকী (রা:) জন্ম ৫ই রজব ২১২হি: (৮২৭খ্রীঃ) খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর শাসনামলেই বিষ প্রয়োগে ৩রা রজব ২৫৪হি: (৮৬৮খ্রী:) ৪২ বছর বয়সে শাহাদাত বরণ করেন ।
(১২) ইমাম হাসান আসকারী (রা:) জন্ম ৮ই রবি:সানি ২৩২ হিজরী (৮৪৭খ্রী:) মদীনায় । ঘাতক খলিফা মোতামাদ এর বিষ প্রয়োগে ৮ই রবিউল আউয়াল ২৬০ হিঃ (৮৭৫খৃী) ২৮ বছর বয়সে শাহাদাত বরণ করেন । ইরাকের সামারায় মাজার শরিফ অবস্থিত ।
বিদআত প্রসঙ্গ – দালিলিক আলোচনা
বিদআত আরবী শব্দ । ইহা বাদিউন ধাতু হতে উদগত । এর অর্থ নতুনত্ব । নববিধান, নতুন উদ্ভাবন, আমদানী ও নতুন আবিস্কার । ইসলামী পরিভাষায় যা নবীজির যুগে ছিলনা, পরবর্তীতে হয়েছে তাকেই বিদয়াত বলা হয় । বিদয়াতের দুইটি দিক রয়েছে একটি বাহ্যিক বা জাগতিক অপরটি তাত্ত্বিক তথা স্রষ্টার সৃষ্টি বিকাশের চিরন্তন বিধান । বাহ্যিক বিদআত প্রসঙ্গে কিছু আলোচনার প্রয়োজন মনে করছি এই জন্যে যে, মসুলিম সমাজে বিদআত শব্দটির বহুল ব্যবহার চলছে । জনসাধারণ সঠিক অর্থ না জানার কারণে বিদআত কথাটি শোনা মাত্রই চমকে উঠে, মনে ভাবে বিদআত তুল্য আর পাপনাই ।
মুসলমানদের ভ্রান্ত ধারণা অপসারণে যুগ শ্রেষ্ঠ হক্কানী রব্বানী, ফকীহ, মোজতাহিদগণ বিদআতকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন যথা- (এক) বিদআতে হাসানা, তথা উত্তম ও মঙ্গল ময় বিদআত (দুই) বিদয়াতে সাইয়্যেয়া । তথা মন্দ ও পথ ভ্রষ্টতা মূলক বিদআত । আল্লাহর কিতাবে দ্বীনুল কাইয়্যেমায় যত উদ্ভাবন বা আবিস্কার তা সবই বিদআতে হাসানা বা উত্তম বিদআত । সত্য দ্রষ্টা নবী রাসুলগণের শিক্ষার বাইরে দুনিয়া গ্রস্তদের নফস মুখী সকল অবিস্কার তথা আল্লাহর বিধান ও মহানবী (সঃ) এর জীবনাদর্শের বাইরে ব্যক্তি মতই বিদয়াতে সাইয়্যেয়া বা মন্দ ও ভুল উদ্ভাবন ।
আল্লামা ইবনে হাজর আসকালীন (রঃ) বলেন, বিদআত দুই প্রকার । যদি তা শরীয়তে উত্তম আবিষ্কারের মধ্যে পরে তবে ইহা হবে বিদয়াতে হাসানা । আর যদি ইহা অপছন্দনীয় আবিষ্কারের মধ্যে পরে তা হবে বিদয়াতে সাইয়্যেয়া । (ফতহুল বারী শরহে বুখারী ১৩/২৫৩ পৃ. উমদাতুলক্বারী শরহে বুখারী ১১/১২৬ পৃঃ)
বিদয়াতে হাসানা বলা হয় এমন সব কাজকে যার ভিত্তি বা ধ্যান ধারণা কোরআন হাদিস ইজমা ও কিয়াস বিরোধী নয় । বিদয়াতে হাসানা আমল করা জায়েজ এবং ইহা অনেক সময় মুস্তাহাব পর্যায়ে পড়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রাঃ) বলেন, বিদয়াতে হাসানা বরং সুন্নতে মুস্তাহাসান । যেমনটি হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন যে, মুসলমানরা যা ভাল মনে করেন তা আল্লাহ তায়ালার কাছেও ভাল । (মিরকাত ১৩৮৫ নং হাদিসের ব্যাখ্যা) আল্লাহ বলেন : যে একটি ভাল কাজ করবে সে তার দশগুণ পাবে । (সুরা আনফাল ১৬০ নং আয়াত)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি ইসলামে কোন ভালো রীতি পদ্ধতি চালু করবে পরবর্তীতে তার উপর আমল করা হলে যারা তার উপর আমল করবে তাদের সমপরিমাণ সওয়াব তাকেও দেয়া হবে । (মুসলিম শরীফ, কিতাবুয যাকাত, হাদিস নং ১০১৭)
উক্ত কোরআন হাদিস হতে বুঝা গেল নতুন আবিস্কার হওয়া সব জিনিসই খারাপ ও বাতিল নয় । অনেক উত্তম ও ভাল জিনিসও রয়েছে ।
“কুলু বিদয়াতিন দালালাতুন” অর্থাৎ প্রত্যেক বিদয়াতই গোমরাহী বা পথ ভ্রষ্টতা । (মুসলিম শরীফ)। উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় হযরত মোল্লা আলী ক্বারী (রহঃ) বলেন : যে নব উদ্ভাবিত কাজ কোরআন হাদিস, আসার সাহাবীদের আমল বা কওল অথবা ইজমার বিরুদ্ধে বলে প্রমানিত তাই দালালা বা গুমরাহী । আর যে নব উদ্ভাবন উল্লেখিত কোনটির বিপরীত বা বিরুদ্ধ নয় তা মন্দ বা নাজায়েজ নয় । (মিরকাত শারহে মিসকাত ১ম খন্ড, ১৮৯পৃঃ)।
সুতরাং প্রমাণিত হলো যে বিদয়াতে সাইয়্যেয়া বা নিকৃষ্টতম নব উদ্ভাবনই হলো দালালা বা পথভ্রষ্টতা । আর বিদয়াতে হাসানা বা উত্তম নব আবিস্কৃত কাজ কখনও পথভ্রষ্টতা নয় বরং উত্তম । মুসলীম শরীফের একখানা হাদিস দ্বারা সকল নব আবিস্কার কে গবেষনা বিচার বিবেচনা না করে যারা হারাম শিরক, ফতুয়া দিচ্ছেন-তারা নিজেদের জীবন পরিচালনার রকমারী উপাদানের দিকে তাঁকায়ে দেখেন তো । বিদয়াত সমুদ্রে নিমজ্জিত কী-না? নানা রকম খাদ্য সামগ্রী ব্যবহৃত আসবাবপত্র, পোষাক পরিচ্ছেদ, প্রাকৃতিক পরিবেশ, পারিবারিক জীবন, সমাজ জীবন, শিক্ষা সংস্কৃতি সব কিছু মিলায়ে দেখেন বিদয়াতের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছেন কী-না? যদি সকল নব আবিস্কারই পথভ্রষ্টতা হয় তাহলে বলতেই হয়, পবিত্র কোরআন শরীফ এর পঠন পদ্ধতি হেজাজের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর আবিস্কার ।
বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থ যেমন তাফসীরে মাযহারী, তাফসীরে ইবনে কাসীর, কবীর, দুররে মানছুর, বাইজাভী, রহুল বয়ান, তাফসীরে জালালাইন সহ আরও অনেক । অনুরূপ হাদিস গ্রন্থ বুখারী, মুসলীম, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাযাহ্, নাসাই, মিশকাত এবং বিভিন্ন ফতোয়ার কিতাব সমূহ- নাহু, সরফ, বালাগাত, উর্দু, ফার্সি কিতাব ইত্যাদি রাসুলের যমানায় ছিল না । কোরআন হাদিসে এ নাম করণের ব্যাপারে কোন প্রমাণ ও নাই তাহলে উক্ত গ্রন্থ সমূহ প্রণয়ন ও অধ্যায়ন কি খারাপ ? বা গোমরাহীর কাজ ? কি ফতুয়া দিবেন ? সামচুল উলুম, আরশাফুল উলুম, ইমদাদুল উলুম, নিজামুল উলুম, কাসিমুল উলুম, কওমী, আলীয়া, হেফজখানা, দাওরায়ে হাদিস, লিল্লাহ বোর্ডিং এরূপ নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসা নবীজির যুগে ছিল না! সবই নব আবিস্কার ।
মসজিদের কারুকার্য, মাইক, সাউন্ড বক্স, লাইট, ফ্যান, এসি, মসজিদের ভিতরে দাঁড়ায়ে মাইকে আযান, সাউন্ড বক্সে বয়ান, তারাবীর জামাত, টিভির পর্দায় ইসলামী প্রোগ্রাম, পোষ্টার, ব্যানার, চিঠি ও মাইকিং করে ওয়াজ মাহফিল, ডেকোরেটর, জেনারেটর এর রকমারী সাজ সজ্জায় গেইট প্যান্ডেল, তথায় বক্তারা বয়ান শেষে টাকা কালেকশন করেন এবং কোরবাণীর পশুর চামড়া, ধান, পাট, কালেকশন ও করা হয় বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্রদের দ্বারা, জানার বিষয় এগুলোর ব্যাপারে কি ফতুয়া দিবেন ? এসব কি কুরুণে ছালাছায় ছিল ? আর একটি বিষয় হলো হাফেজ, ক্বারী মুফতী, মোহাদ্দেস মোফাচ্ছেরে কোরআন, শায়খুল হাদিস, আল্লামা, হেলালী, বেলালী, জিহাদী, জালালী, জামালী, যুক্তিবাদী এরকম উপাধী রাসুলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর কোন সাহাবায়ে কেরামগণের নামের সাথে ব্যবহৃত হয়েছে বলে কোন প্রমাণ নাই অর্থাৎ এরূপ উপাধীগুলি নবীজির যুগে ছিল না ইহা নব আবিস্কার ।
সম্মানিত আলেম সাহেব যে মঞ্চে বসে যে মাইকে বিদয়াতের ফতুয়া প্রদান করেন ঐ সোফা চেয়ার খানা এবং মাইকটিও বিদয়াত- কারণ এগুলো সবই নব উদ্ভাবন । লক্ষ্য করুন হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী, সালাফী, আহলে হাদিস বর্তমানে ইসলাম ধর্মে জামাতে ইসলাম, মারকাজুল ইসলাম, হেফাজতে ইসলাম, প্রচলিত তাবলীগ জামাত, টঙ্গীর ইজতিমা, এসবও বিদয়াত ।
বরযখ ধ্যান – বরযখ বিষয়ক আলাপ
বারযাখ আরবী শব্দ এর অর্থ পর্দা, আড়াল, অন্তরায় ও পৃথককারী বস্তু । দুই অবস্থা বা দুই বস্তুর মাঝখানে যে বস্তু আড়াল হয় তাকে বরযাখ বলা হয় । (ফতহুল কাদীর)
পবিত্র কোরআনে সুরা আল মুমিনুন এর ১০০ নম্বর আয়াতে আলমে ‘বরযাখ’ ও সুরা আর রহমানের ২০ নম্বর আয়াতে প্রবাহিত দুই দরিয়ার মধ্যে ‘বরযাখ’ এর উল্লেখ রয়েছে, যাহা রহস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা যুক্ত । পবিত্র হাদিস শরীফেও আলমে বরযাখ বিষয়ে বেশ অলোচনা রয়েছে । এ অধ্যায়ে আধ্যাত্মিক পথের পথিক বা সালেক আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছার নিমিত্তে আপন পীর মুর্শিদের সুরাত বা চেহারা ধ্যান বিষয়ক দলিল ভিত্তিক আলোচনা করা হলো । তাছাওরে শায়েখ বা বরযাখ এর আমল একান্তই আল্লহর প্রেমিক সালেক ও খাস বান্দাদের জন্য । আম বা সাধারণের জন্য প্রযোজ্য নয়।
বরযাখ ধ্যানের মৌলিকত্ত হল লক্ষ্য স্থির ও হুজুরী কলব পয়দা করা । বাহ্যিক ভাবে যেমন বিশ্বের সকল মুসলিম নর-নারীর বিচ্ছিন্ন দুরন্ত ও চঞ্চল মনকে একই কেন্দ্র স্থলে কেন্দ্রীভূত করতে পবিত্র কাবা গৃহকে কিবলা বা লক্ষ্য স্থল করা হয়েছে । সকল মুসলমান সালাতে দন্ডায়মান হয়ে কাবা ধ্যানে ‘কাবাতিশ শরীফাতে আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবীরে তাহ্রীমা বাধে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হতে লক্ষ লক্ষ হাজীগণ পবিত্র কাবা গৃহ তাওয়াফ করছে এবং লুটায়ে পড়ছেন প্রভুর উদ্দেশ্যে সিজদায় । বিচার্য : কাবাগৃহতো গায়রুল্লাহ ঐ ঘরে আল্লাহ্ আবদ্ধ ও নয় । তা সত্ত্বেও প্রভুর নির্দেশে পবিত্র কাবা ঘরের শান, মান মর্যদা বিশ্বের সমস্ত ঘর গুলি হতে অনন্য পূত ও পবিত্র । এবং সকল মুসলমানের কিবলা নির্ধারণ করা হয়েছে ।
সুতরাং কাবা ও কিবলার ভেদ তত্ত্ব উৎঘাটন হলেই বরযাখ এর মুল রহস্য বা হাকিকত উম্মোচন হবে । সালাত আদায়ে নিয়তের মধ্যেতো কাবার দিকে মুত্তওয়াজ্জা হওয়ার কথা বলতেই হয় । নুরনবী রাসুলুল্লাহ (সঃ) বর্ণনা করেন পবিত্র কাবার উপর দৃষ্টি করা এবাদত (আল-হাদিস) । অতএব প্রমাণিত হলো, কাবা আল্লাহ নয়, তবুও কাবার ধ্যান শরীয়ত সম্মত এবাদত । মানুষের মন অতি চঞ্চল দুরন্ত অশান্ত অবাধ্য ও অস্থির তদুপরি খান্নাস মনের মনিকোঠায় প্রবেশ করে শিরক, মুক্ত এবাদতের চরম অন্তরায় হয়ে দাড়ায়। মুহূর্তের মধ্যে অতিদ্রুত গায়রুল্লাহর রকমারী বস্তু জগতে মনকে বিচরণ করায় ।
অনেক সময় সালাত আদায় করতে গেলে শুধু দেহ খানাই মসজিদে জায়নামাজে পড়ে থাকে মন চলে যায় হাটে মাঠে দোকান পাটে সামনে ভেষে উঠে জরু গরু কত রকম ছবি এমনকি খান্নাসের ধোকায় কত রাকাত নামাজ পড়া হলো তাহাও ভুল হয়ে যায়। ‘মিন শাররিল ওয়াস ওয়াসিল খান্নাস’ এর মারাত্মক আক্রমন হতে ঈমান রক্ষা এবং রিয়া তাকাব্বরী ও শিরক মুক্ত এবাদত করার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি তাসাউফ পন্থী পীর মাশায়েখগণ ভক্ত মুরীদানদেরকে বিশেষ তালিম ও ছবকের মাধ্যমে দিয়ে থাকেন । তাছাওরে শায়েখ বা বরযাখ তার মধ্যে অন্যতম ছবক।
এ প্রসঙ্গে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী বলেন: শায়েখের মধ্যে যে সমস্ত কামালাত এবং মহৎ গুণাবলী আছে সেই সব এবং উহার প্রকৃতি আকৃতি পর্যন্ত খুব বেশী করিয়া ধ্যান অর্থাৎ গাঢ়ভাবে একাগ্রচিত্তে চিন্তা করিলে শায়েখের সঙ্গে মহব্বত বাড়ে নিছবত মুজবুত হয় । শায়েখের কামালিয়াত মুরীদের ভিতর পয়দা হয় । যিকরের সময় নানা খেয়াল ও ওয়াস ওয়াসা দিলের মধ্যে আসিয়া সালেক কে যে কষ্ট দেয় সে সব দুর হয় । এইরূপে যখন ওয়াস ওয়াসা দুর হইয়া গিয়া এক ছুয়ী হাছিল হয় তখন নামাজের মধ্যে ওযীফার মধ্যে এবং অন্যান্য এবাদতের মধ্যে হুজুরী কলব হাছিল করা এবং একাগ্রতার সহিত নিরাকার খোদার ধ্যান করাও সহজ হইয়া পড়ে । (তালিমুদ্দীন-১৬৫ পৃ.)।
বরযাখ বা পীরের সুরত ধ্যান প্রসঙ্গে হযরত মাওলানা শাহ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দেস দেহলবী (রাঃ) বলেন: মোরশেদের অনুপস্থিত অবস্থায় তাঁহার সুরত মুরীদ নিজ দুই নয়নের মধ্যে প্রেম ও ভক্তি সহকারে ধ্যান করিতে থাকিবে । তাহা হইলে সে তাহার সুরত ধ্যান দ্বারা সেই ফল লাভ করিবে যাহা সে তাঁহার পীরের সঙ্গ ও সোহবত দ্বারা লাভ করিত । (আল কাওলুল জামীল ষষ্ট পরিচ্ছেদ) । প্রমাণিত হলো শয়তানের প্ররোচনা হতে ঈমান রক্ষা ও শিরক মুক্ত এবাদত করতে পীরের সুরত তথা “বরযাখ ধ্যান” বাধ্যতামূলক । আমাদের জান, মাল, সাধনা, আরাধনা, উপাসনা সবই একমাত্র আল্লাহর জন্য । আশেক সমস্ত কিছুর বিনিময়ে আধ্যাত্মিক দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে মাশুক (আল্লাহ) এর সাথে মিলন হতে চায় কিন্তু প্রশ্ন জাগে আল্লাহ কোথায় থাকেন কোন ঠিকানায় কিভাবে পাওয়া যাবে ? আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে এ সম্বন্ধে এরশাদ করেন –
(ক) তোমার ঘাড়ের শাহারগ হতেও আল্লাহ নিকটে আছেন । (ক্কাফ-১৬ আয়াত)
(খ) আমি তোমার নফসের সাথে মিশে আছি কিন্তু তুমি দেখছোনা (সুরা যারীয়াত-২১ নং আয়াত.)
(গ) তুমি যেখানে সেও (আল্লাহ) সেখানে (হাদীদ ৪নং আয়াত) (ঘ) আল্লাহর অবস্থান মানুষ ও তাঁর ক্বলবের মধ্যে (সুরা আনফাল ২৪ নং আয়াত)
উপরোক্ত আয়াত দৃষ্টে প্রতীয়মান হলো । মানুষ হতে আল্লাহ্ পৃথক ও দূরবর্তী নয় । একজন পরিশুদ্ধ মানুষের ‘বরযাখ’ বা অন্তরালে এক মাত্র আল্লাহই বিরাজমান ।
“মরদানে খোদাগর খোদা না বাশদ
ওয়া লেকেন আজ খোদা জুদা না বাশাদ”
অর্থাৎ- মানুষকে খোদা কয়, মানুষ খোদা নয় কিন্তু মানুষ থেকে খোদা পৃথক ও নয় (মাওলানা রুমী)।
মানব জাতি দুই শ্ৰেণী ভুক্ত। যেমন –
(এক) বস্তু মোহে আবদ্ধ অচেতন খান্নাস যুক্ত মানুষ ।
(দুই) মমিন পর্যায়ের লামউতের অধিকারী পরিশুদ্ধ স্বচেতন ও খান্নাস মুক্ত তথা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত মানুষ ।
এ পর্যায়ের মানুষকে কোরআনের ভাষায় মুমিন, মুত্তাক্কিন, সাদেকীন, সালেহীন হাদী ও মুর্শিদ বলা হয়েছে । আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে আমাদেরকে সাদেকীন সালেহীন, মুমিন বান্দাদের মহব্বত করতে এবং সঙ্গী হতে বলেছেন । ‘উলিল আমর’ (হযরত আলী (রাঃ) এর সিলসিলাভুক্ত) নায়েবে রাসুলের অনুগত ও অনুস্মরণের কথাও বলা হয়েছে । (সুরা নিসা-৫৯ নং আঃ ও সুরা তাওবা ১১৯নং আয়াত) । প্রমাণ হলো আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য প্রেম মহব্বত হাসিল করতে হলে নায়েবে রাসুল তথা ‘ওয়ালিয়াম মুর্শিদের’ আনুগত্য প্রেম ভক্তি মহব্বত করা মহান আল্লাহর নির্দেশ । আশেকের দুই নয়নে মাশুক রূপ সর্বদা উদ্ভাসিত থাকে । এতে আশেক ও মাশুকের ‘রাবেতা’ বৃদ্ধি পায় ।
কোন কোন মানুষের সুরত দরশনে এবাদত ও সওয়াব হাসিল হয় । যেমনঃ রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন: তোদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যার চেহারা দরশনে আল্লাহকে স্মরণ হয় । অন্যত্র বলেছেন, সন্তান সুনজরে পিতা মাতার চেহারার দিকে তাঁকালে কবুল হজ্জ্বের সওয়াব প্রাপ্তি হয় । (আল হাদিস) মৌলানা আব্দুল আজিজ মোহাদ্দেস দেহলবী তার তাফসীরে আজিজীর শেষ ভাগে এই হাদিস খানা উল্লেখ করেছেন রাসুলে পাক বলেন: হযরত আলী (রাঃ) এর সুরত দরশন এবাদত । “ছোবাহানাল্লাহ” । মহানবী রাসুলুল্লাহ (স:) এরশাদ করেন “আল মুমিনু মিররাতুল মুমিনিন” । অর্থাৎ এক মুমিন অন্য মুমিনের দর্পন । বিচার্যঃ আয়নায় তাঁকালে অবশ্যই কিছু দেখা যায় তাহলে এক মুমিন অন্য মুমিনের দিকে তাকায়ে কি দেখতে পায়? মুমিন বান্দার ‘বরযাখ’ বা আড়ালে কে রয়েছে ? গবেষণা ও ভাবিবার বিষয় । এ সম্বন্ধে হুজুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন “কুলুবিল মুমিনিনা আরশউল্লাহেতায়ালা” অর্থাৎ বিশ্বাসীর হৃদয়ে আল্লাহর সিংহাসন (হাদিস-ই-কুদসী) সুতরাং প্রমাণিত হলো মুমিন বান্দা তথা “তাছাওরে শায়েখ” বা গুরু বরযাখ ধ্যান আল্লাহ প্রাপ্তির উত্তম সোপান । আল্লাহ বলেন, কোন বান্দা যদি কোন কিছুর মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে যা আমি তার উপর ফরজ করেছি তা আমার নিকট প্রিয় । আর যখন আমার বান্দা নফল এবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে, তখন আমি তাকে ওলী বা বন্ধু বলে গ্রহণ করি । যখন আমি তাকে বন্ধু বলে জানি তখন আমি তার কর্ণ হই যার দ্বারা শোনে । আমি তার চক্ষু হই যার দ্বারা সে দেখে । তার জবান হই যার দ্বারা সে কথা বলে । আমি তার হাত হই যার দ্বারা সে ধরে এবং আমি তার পা হই যার দ্বারা সে চলে (হাদিস কুদসী) অর্থাৎ- সালিক যখন স্বীয় অস্তিত্ববোধ জাতের মধ্যে ফানা করে ফেলেন তখন সেখানে স্বয়ং আল্লাহরই সেফাত বা গুণাবলীর বিকাশ ঘটে । এরকম একজন মুমিন বান্দাকে শয়তান কখনো ধোকা দিতে পারে না । উপরন্ত মুমিন বান্দার উপস্থিতিতে শয়তান সেখান থেকে দ্রুত পলায়ন করে । (সুরা হিজর ৪০/৪২ নং আয়াত ও সুরা সাবা ২০নং আয়াত) । পবিত্র কোরআন হাদিস, ও ফকীহ মুজতাহিদ গণের দলিল দ্বারা প্রমাণিত হলো শয়তানের কুমন্ত্রনা ও প্ররোচনা হতে ঈমান রক্ষা করে, সকল প্রকার শিরিক মুক্ত এবাদত দ্বারা আল্লাহর সহিত “রাবেতা” তথা প্রেম মহব্বত বৃদ্ধি করতে সালিকের ‘বরযাখে ছোগরা বরযাখে কোবরা ছবকটি শিরক, বিদয়াত নয় বরং বৈধ ও গুরুত্ব পূর্ণ আমল । মুমিন বান্দা বা পীর মুর্শিদ আল্লাহ নয় । কিন্তু পৃথক ও নয় জানা চেনার ব্যবধান মাত্র । যেমন বাল্ব এর ভিতর আলো জ্বলছে বাল্বটি আলো নয় । আর আলো ও বাল্ব নয় । এই দুয়ের প্রভেদ জ্ঞান থাকলেই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটবে এবং শিরক হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে না । পরিশেষে বুখারী শরীফের একখানা হাদিস দ্বারা আলোচনা শেষ করছি ‘ইন্নামাল আমালু বিননিয়্যত’ । অর্থাৎ কর্মের ফলাফল নিয়তের উপর । যেমন সালাত আদায়ের নিয়ম কানুন রুকু, সিজদা, তাসবীহ, তাশাহুদ একই রকম হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র নিয়তের কারণে ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, নফল হয়ে থাকে, তাহলে পীর মুর্শিদকে আল্লাহ মনে না করে আল্লাহর বন্ধু বা আল্লাহ পাওয়ার মাধ্যম নিয়তে আনুগত্য প্রেম মহব্বত ও বরযাখ তথা, সুরত ধ্যান অবশ্যই যায়েজ বা বৈধ । শিরক মুক্ত ও ফলপ্রদ।
“হরকি খাহাদ হামনি শীনাদ বা খোদা
তুনিশীনাদ দার হুজুরে আউলিয়া (মাঃ রুমীঃ)
অজানা রহস্য – আল কোরআন
অজানাকে জানার আগ্রহ কম বেশী সকল মানুষের মধ্যেই রয়েছে। সেই আগ্রহ (ইচ্ছা ও আকাঙ্খা) পুরণের জন্য যুগযুগ ধরে মানুষ ছুটে চলেছে দুর্গম গীরি, কানুন ও মরু পথে । কত সাগর মহাসাগর পেড়িয়ে দেশ দেশান্তরে, নভোচারীগণ বিচরণ করছে গ্রহ গ্রহান্তরে । কত যুগ যুগান্তর ধ্যানস্থ ছিলেন যোগী মুনী ঋষীগণ শুধু-ই-মাত্র অজানাকে জানার কারণ । ধর্ম শাস্ত্র অধ্যায়ন ও গবেষণা করতে গেলে অনেক সময় বিভিন্ন বিষয়ে নানা রকম অজানা প্রশ্নের উদয় হয় । তার মধ্য হতে সামান্য কয়েকটি প্রশ্নমূলক বিষয় কোরআন হাদিসের আলোকে পাঠক সমাজে তুলে ধরলাম ।
দলিল : আল্লাহ আসমান ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। তার পর তিনি আরশের উপর উঠেছেন। (সুরা আরাফ- আয়াত নং- ৫৪)।
জানার বিষয় – ১ : যখন আসমান ও যমীন, চন্দ্র, সূর্য্য দিন-রাত কিছুই ছিলনা তখন ছয় দিনের হিসাব কোন কোন দিন ধরে গণনা করা হ’ল?
দলিল : সুরা বাকারা- ১১৭নং আয়াত, সুরা আল কামার- ৫০নং আয়াত, সুরা-ইয়াসিন-৮২নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে আল্লাহ কোন কিছু সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে শুধু “কুন” বললেই হয়ে যায়।
জানার বিষয় – ২ : তাহলে আসমান যমীন সৃষ্টি করতে “ছয় দিনের” দরকার হল কেন? ঐ দিন গুলির নামই বা কী কী?
দলিল : আল্লাহ বলেন, আমাকে উত্তম ঋণ (কর্জে হাসানা) প্রদান কর। আমি তোমাদের পাপ অবশ্যই ক্ষমা করব এবং জান্নাতে প্রবেশ করাব। (সুরা-মায়েদা-১২নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ৩ : সুরা ইখলাছে উল্লেখ করেছেন আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন – তবে বান্দার নিকট উত্তম ঋণ চাইলেন কেন? কর্জে হাসানা কি বস্তু এবং কিভাবে বান্দা আল্লাহকে কর্জে হাসানা প্রদান করবে?
দলিল : আমরা আসমান যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এ – আমানত পেশ করে ছিলাম । কিন্তু তারা এটা বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে শঙ্কিত হল। আর (আদম) মানুষ তা বহন করল। সে অত্যান্ত জালিম, খুবই মুর্খ বা অজ্ঞ। (সুরা আহযাব-৭২ নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ৪ : আমানত বস্তু কি? আসমান যমীন পর্বত কেউ গ্রহণ করলনা একমাত্র আদম তা গ্রহণ করায় কোন দোষে জালিম ও অজ্ঞ বলা হল? খেয়ানত হতে আমানত রক্ষার উপায় কি?
দলিল : তোমরা সালাতকে হেফাজত কর বিশেষ করে মধ্যবর্তী (সালাতে ওছতা) সালাতকে। (সুরা বাকারা-২৩৮নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ৫ : সালাতে ওছতা বা মধ্যবর্তী সালাত কাহাকে বলে এবং কিভাবে আদায় করতে হয়?
দলিল : সালাতে দায়েমুন অর্থাৎ সদা সর্বদা সালাতে মশগুল থাকতে বলা হয়েছে। (সুরা মারিজ ২৩ নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ৬ : দায়েমুচ্ছালাত কাহাকে বলে? এবং কিভাবে সদা সর্বদা মশগুল থাকা যায়?
জানার বিষয় – ৭ : পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজে প্রথম দুই রাকাত সুরা ফাতিহার সাথে অন্য সুরা মিলায়ে পড়তে হয়। শেষের এক/দুই রাকাতে শুধু সুরা ফাতিহা চুপি চুপি পড়তে হয় কেন?
জানার বিষয় – ৮ : দুই ঈদের নামাজে অতিরিক্ত ছয়টি তাকবীর কখন হতে এবং কি কারণে ওয়াজিব হ’ল?
জানার বিষয় – ৯ : জানাযা নামাজে চার তাকবীর হওয়ার শরয়ী কারণ কী? সর্বপ্রথম কে কার জানাযা করেন?
জানার বিষয় – ১০ : কিয়াম, কঊদ, রুকু, সজুদ, তাসবীহ, তাহলিল তথা সালাত আদায়ের নিয়মাবলী একই রকম হওয়া সত্ত্বেও সালাতের ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল নাম করণ করা হল কেন?
জানার বিষয় – ১১ : অযুব মধ্যে নির্দিষ্ট অঙ্গগুলি তিন বার করে ধৌত করা হয় কেন? তিন এর হাকিকত কি?
দলিল : আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সকল নিদর্শন ও স্বীয় চিহ্ন সমূহ বিশ্ব জগতেও মানব দেহে প্রকাশ করেছেন যেন সত্য প্রকাশ পায় গোপন না থাকে। অর্থাৎ যা আছে বিশ্ব ভ্রমান্ডে তা রয়েছে মানব ভান্ডে। (সুরা হামিম সাজদা ৫৩ নং আয়াত)।
জনার বিষয় – ১২ : আরশ, কুরছি, লৌহ কলম, বেহেস্ত, দোজখ, হুর, গেলেমান, খানায়ে কাবা, হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহিম এর নিদর্শন সমূহ মানব দেহে কোন্ কোন্ স্থানে ও কিভাবে রয়েছে?
দলিল : তিনিই (আল্লাহ) প্রথম ও শেষ প্রকাশ্য ও গোপন আর সব কিছুই জানেন। (সুরা হাদীদ ৩নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ১৩ : আল্লাহ যাহের বা প্রকাশ তিনি কি রূপে ও কিভাবে প্রকাশিত? চিনার পদ্ধতি কি?
দলিল : নিশ্চয়ই ইহা মহিমান্বিত কোরআন, যা গুপ্ত কিতাবে সংরক্ষিত আছে। যারা পবিত্র তারা ব্যতীত অন্য কেউ উহা স্পর্শ করতে পারে না। (সুরা ওয়াকিয়াহ্ ৭৭, ৭৮, ৭৯ নং আঃ)।
জানার বিষয় – ১৪ : গুপ্ত কিতাব বলতে আল্লাহ্ কোন্ কিতাব কে বুঝিয়েছেন? উহা কোথায় ও কিভাবে অবস্থিত?
দলিল : আল্লাহ হযরত মুসা (আঃ) কে পাঠালেন হযরত খেজের (আঃ) এর নিকট “ইলমেলাদুন্না” শিক্ষা করতে। (সুরা কাহাফ ৬০ আয়াত হতে ৮২ নং আয়াত পর্যন্ত দ্র:)।
জানার বিষয় – ১৫ : ইলমেলাদুন্না কোন ইলমকে বলে? কোথা হতে কিভাবে ইলমেলাদুন্না শিক্ষা করতে হবে?
দলিল : অতঃপর সালাত শেষ হলে (মসজিদে না বসে) তোমরা যমীনে ছড়িয়ে পড় রিজিক অন্বেষণে, অনুগ্রহ পেতে আল্লাহকে স্মরন কর, যাতে তোমরা সফল কাম হও। (সুরা জুমুয়া-১০ নং)।
জানার বিষয় – ১৬ : উক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা গেল নামাজ শেষে মসজিদে বসে থাকতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন । কিন্তু অনেক মসজিদে দেখা যায় নামাজ শেষে একদল লোক মসজিদে গোল বৈঠক দিয়ে বসে পড়ে বহুত ফায়দা বলে অপরকেও বসতে বলে, এ সকল বয়াণ ও কর্মকান্ড আল্লাহর নির্দেশের বিপরীত কী-না?
জানার বিষয় – ১৭ : পিতা, মাতা, স্ত্রী, পুত্র পরিবারের হক আদায় না করে দেশ দেশান্তর ঘুরে ঘুরে মসজিদে মসজিদে থাকা খাওয়া ও রাত্রী যাপন করা প্রসঙ্গে কোরআন, হাদিস কি বলে?
দলিল : আল্লাহ্ মানুষের ঘাড়ের শিরার চেয়েও নিকটে (ক্বাফ-১৬ নং আয়াত)।
আল্লাহ মানুষের শ্বাস প্রশ্বাসে আসা যাওয়া করেন (যারিয়াত-২১ নং আয়াত)।
তুমি যেখানে তিনি (আল্লাহ) সেখানেই আছেন (হাদীদ-৪ আঃ)।
আল্লাহর অবস্থান মানুষ ও তার ক্বলবের মধ্যে (আনফাল-২৪)।
জানার বিষয় – ১৮ : আল্লাহ এত নিকটে থাকতে মেরাজ রজনীতে মহানবী (সঃ) সাত আসমান পাড়ি দিয়ে উপরে গেলেন কেন? এবং তথায় ২৭ বছর অতিবাহিত হওয়ার রহস্য কি?
দলিল : আল্লাহ্ মানুষকে “কলমের” সাহায্যে শিক্ষা দিলেন। (সুরা আলাক ৪নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ১৯ : বর্তমান ব্যবহৃত কলম আবিস্কারের অনেক পূর্বে মানুষ সৃষ্টি। অতএব আল্লাহর ব্যবহৃত “কলম” কি বস্তু?
দলিল : তিনিই দয়াবান, শিক্ষা দেন কোরআন। (আর রহমান-১,২ নং)।
জানার বিষয় – ২০ : আমরা সাধারণত মসজিদ মাদ্রাসায় গিয়ে মানুষের নিকট হতে কোরআন শিক্ষা করি । তাহলে আল্লাহ্ কোথায় হতে কিভাবে কোরআন শিক্ষা দিচ্ছেন?
দলিল : জায়নামাজে দাড়িয়ে বলা হয়- নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহর মুখের দিকে মুখ ফিরালাম (আনয়াম-৭৯ নং)। সুরা বাকারা-১১৫ আয়াত ও সুরা আর রহমানের ২৭ আয়াত দ্বয়ে আল্লাহর মুখ মন্ডল বা চেহারার কথা উল্লেখ রয়েছে।
জানার বিষয় – ২১ : মহান আল্লাহর মুখ মন্ডল বা চেহারা কিরূপ? এবং কিভাবে দরশন করা যাবে?
দলিল : আল্লাহ আসমান ও যমীন সমূহের ‘নুর’ (সুরা নুর ৩৫ নং আয়াত)।
জানার বিষয় – ২২ : নুরের অর্থ করেছে আলো, তাহলে ঐ ‘নুর’ সত্ত্বা আকার না নিরাকার? কিভাবে দরশন হবে?
দলিল : হাদিস শরীফের বর্ণনা : কোরআন তেলাওয়াতের ফজিলত প্রসঙ্গে একেকটি “হরফ” তেলাওয়াতের বিনিময়ে দশটি করে নেকী পাওয়া যাবে উল্লেখ রয়েছে।
জানার বিষয় – ২৩ : পবিত্র কোরআনে, নমরুদ, ফেরাউন, আবু লাহাব, ইবলিস, শয়তান, মুনাফেক ইত্যাদি নাম গুলি ও আরবী হরফে রয়েছে- কোরআন তেলাওয়াতের সময় ঐ নাম গুলির হরফে ও অনুরূপ নেকী পাওয়া যাবে কী-না? যদি নেকী হয় তাহলে তারা কাফের বা অপরাধী কেন?
দলিল : মৃত দেহ কবরে রেখে চল্লিশ কদম আসার পরই মনকির নকীর নামক দুই ফেরেশতা কবরে প্রবেশ করে মৃতকে জীবিত করে সওয়াল জওয়াব শুরু করবে।
জানার বিষয় – ২৪ : যে সকল মৃত দেহ আগুনে পুড়ে ভষ্ম হয়ে গেল, পানিতে ডুবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল অর্থাৎ যাদের কবর হলনা তাদের ব্যাপারে চল্লিশ কদম এর হিসাব কেমনে হবে এবং সওয়াল জওয়াব কোথায় কিভাবে করবে?
হে আল্লাহ আমাদেরকে অজানাকে জানার জ্ঞান দান করুন।
নূর নবীজি (দঃ) হাজির ও নাজির
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের দৃষ্টিতে আল্লাহর হাবীব হুজুর পুরনূর (দঃ) সারা বিশ্বের সব কিছুই সরাসরি দেখতে পান এবং আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতায় সারা জাহানে রূহানী ভাবে হাজির ও নাজির তথা অদৃশ্য নূরানী দেহ মোবারক নিয়ে উপস্থিত হয়ে সব কিছু দেখেন ও শুনেন । এমন এখতিয়ারও প্রিয় নবীজির দেওয়া আছে যে, জেসমানী ভাবে যেখানে খুশি সেখানে গমন করতে পারেন । ইহাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত তথা হক্কানী উলামায়ে কেরামের আকিদা । এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসে এর অনেক দলিল বিদ্যমান রয়েছে।
দলিল : (আলাম তারা কাইফা ফায়ালা রাব্বুকা বিআছফা বিল ফিল) অর্থাৎ : হে নবী! আপনি কি দেখেননি ? আমি হস্তী বাহিনীর সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছি (সূরা ফিল ১-২ নং আয়াত) আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া এবং তাফছিরে ইবনে কাছিরে উল্লেখ আছে হস্তী বাহিনীর ঘটনা ঘটেছিল প্রিয় নবীজির পৃথিবীতে জন্মের ৫০ দিন পূর্বে । আর এ আয়াতে বলা হচ্ছে নবী করিম (দঃ) ঐ ঘটনাও দেখেছেন । কেননা আল্লাহ পাক নবীজিকে বলছেন: আপনি কি দেখেননি? এখানে (!) হামজায়ে ইছতেফাহামিয়া তথা প্রশ্নবোধক হামজা । অর্থাৎ প্রশ্ন করা হয়েছে “আপিনি কি দেখেননি”? অর্থাৎ প্রিয় নবীজি (দঃ) ঐ ঘটনা সমূহ দেখেছেন ।
এ ব্যাপারে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে :
দলিল : (আলাম তারা কাইফা ফায়ালা রাব্বুকা বি-আদ (সুরা ফজর-৬নং আয়াত)
অর্থাৎ- হে নবী! আমি আদ জাতির সাথে কিরুপ ব্যবহার করেছি তা কি দেখেননি?
এই আয়াতেও প্রমাণ হয়, প্রিয় নবীজির পৃথিবীর জন্মের বহু পূর্বের আদ জাতির ঘটনা দেখেছেন ।
দলিল : অর্থাৎ- হে নবী! আপনি কি দেখেননি? জমীনে যা কিছু আছে ও সমুদ্রে চলমান নৌকা সমূহকে আল্লাহর নিজ আদেশে আমাদের অধীন করে দিয়েছেন (সুরা হাজ্জ-৬৫)
সুতরাং এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় আল্লাহর নবী (দঃ) জমীনে কোথায় কি হয় এবং সমুদ্রের কোথায় কি হয় সবই দেখেন । কেননা আল্লাহ তা’লা বলেছেন- আপনি কি দেখেননি ? এরূপ অনেক আয়াত রয়েছে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, যেই নবী পৃথিবীতে জন্মের আগে সব কিছু দেখতেন সেই নবী (দঃ) কি এখনোও সব কিছু দেখেন ?
দলিল : (জ্বালা ইফরুতুম মিনাল জিন্নি আনা আতিকা বিহি কাব্লা আন তাকুমা মিম মাকামিকা ওয়া ইন্নাহু আলায়হি লাকাবিউন আমীন) ইফরিত নামক জিন বলেন, আপনি যেখানে বসে আছেন সেখান থেকে দাঁড়ানোর পূর্বেই (রাণী বিলকিছের) সিংহাসন এনে দিব । এ ব্যাপারে আমি শক্তিশালীও বটে। (সূরা নমল: ৩৯)
দলিল : অর্থাৎ- নবী (দঃ) মু’মীনের জানের চেয়েও অধিক নিকটে। (সুরা আহযাব, ৬নং আয়াত)
এই আয়াতের তাফছির করতে গিয়ে দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা আবুল কাশেম নানুতুবী সাহেব বলেন “আওলা” অর্থ নিকটে সুতরাং পবিত্র কুরআন দ্বারা প্রমাণ হয়ে গেল যে, আল্লাহর নবী (দঃ) মুমীনের জানের চেয়েও আরোও নিকটে হাজির ।
দলিল : (ইসা আঃ কে আল্লাহ বলছেন) লোকদেরকে বলুন! আমি বলে দিতে পারি তোমরা কি খেয়েছ এবং কি জমা করে রেখেছ এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, উম্মতের ঘরে কি খেয়েছে এবং কি কি জমা করে রেখেছে সবই ঈসা (আঃ) দেখতেন । হযরত ঈসা (আঃ) যদি উম্মতের ঘরে কি খেয়েছে এবং কি জমা রেখেছে সব দেখতে পারেন, তাহলে বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ) যিনি সব নবীদেরও নবী তিনি কেন উম্মতের ঘরে কি খেয়েছে ও জমা রেখেছে তা দেখবেন না ?
দলিল : আমি আপনাকে সারা জাহানের রহমত ব্যতীত পাঠায়নি । (সুরা আম্বিয়া ১০৭ নং আয়াত)
সুতরাং প্রিয় নবীজি (দঃ) হলেন সারা জাহানের রহমত, আর রহমত কিভাবে কোথায় থাকেন সে ব্যাপারে আল্লাহ তা’লা অন্যত্র বলেন অর্থাৎ, আমার রহতম সব কিছুকে বেস্টন করে আছে । সুতরাং আল্লাহর নবী (দঃ) আল্লাহর রহমত হিসেবে সৃষ্টি জগতের সব কিছুকে বেষ্টন করে আছেন । কারণ আল্লাহ হলেন সমস্থ জগতের রব, আর আমাদের নবী (দঃ) হলেন সমস্থ জগতের রহমত । তাই রব হিসেবে আল্লাহর যতটুকু সীমানা, রহমত হিসেবে নবী পাক (দঃ) এরও ততটুকু সীমানা। সুতরাং আল্লাহর নবী (দঃ) সমস্ত জগতে রহমত হিসেবে রুহানীভাবে বেষ্টন করে আছেন ।
দলিল : অর্থঃ হে আমার নবী! আমি আপনাকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে প্রেরণ করেছি । (সুরা ফাতহ ৮নং আয়াত) এই আয়াতে নবী (দঃ) কে শাহিদ বলে আক্ষায়িত করেছেন।
অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন : অর্থাৎ রাসুল (দঃ) ই হবেন তাদের জন্যে সাক্ষী । (সুরা বাকারা ১৪৩নং আয়াত) এই আয়াতে আল্লাহর নবী (দঃ) কে তথা সাক্ষী বা প্রত্যক্ষদর্শী বলা হয়েছে । হিজরী ৫ম শতাব্দির মোজাদ্দেদ, আল্লামা ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী (রাঃ) এ সম্পর্কে বলেন । অর্থাৎ, নিশ্চয় সাক্ষা, প্রত্যক্ষকরণ ও উপস্থিত হওয়া এগুলো স্বীয় দৃষ্টিতে দেখার মাধ্যমে হয়, যখন বলা হয় “আমি উপস্থিত ছিলাম” ইহা তখনই হবে যখন সে ঐ ঘটনা নিজে দেখবে ও অবলোকন করবে । সুতরাং আল্লাহর নবী (দঃ) উপস্থিত হয়ে স্বীয় চক্ষু মোবারক দ্বারা দেখার মাধ্যমে স্বাক্ষী বা প্রত্যক্ষদর্শী।
প্রশ্ন আসে নবীজী কিসের সাক্ষী ? জাবাবে ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী (রহঃ) ও ইমাম কুস্তলানী (রঃ) উল্লেখ করেন অর্থাৎ নিশ্চয় নবী পাক (দঃ) সমস্থ সৃষ্টির সাক্ষী বা প্রত্যক্ষদর্শী।
সুতরাং প্রিয় নবীজি (দঃ) সমস্ত সৃষ্টি জগতের কোথায় কি হয় সব কিছু দেখতেছেন এবং ঐ অনুযায়ী কেয়ামতের দিন প্রত্যক্ষদর্শী তথা সাক্ষী দিবেন । উল্লেখ্য যে, প্রত্যক্ষদর্শী ব্যতীত সাক্ষী হওয়া যায় না । দলিল : নবী করিম (দঃ) আল্লাহর ওয়াহদানিয়াতের উপর সাক্ষী, আল্লাহ তা’লাকে দেখেছেন এজন্যই প্রিয় নবীজি (দঃ) আল্লাহর ওয়াহদানিয়্যাতের উপর সাক্ষী। আখেরাতের জান্নাত-জাহান্নাম, মিজান, পুলছেরাতের উপর দুনিয়াতে সাক্ষী । মেরাজের রাত্রে প্রিয় নবীজি (দঃ) এগুলো প্রত্যক্ষ করেছেন এ কারণে এগুলোর উপর সাক্ষী । দুনিয়ার সকল হাল বা অবস্থা আনুগত্য, অপরাধ, নেক কাজ ও পাপ কাজের সকল অবস্থার প্রত্যক্ষদর্শী বা নিজ চক্ষু দ্বারা দেখতে পান এ কারণেই তিনি সব কিছুর সাক্ষী । (মাওয়াহেবুল্লা দুন্নিয়া ৩য় খন্ড ১৬০ পৃষ্ঠা)।
রসুলে খোদা সা. দুনিয়ার সব দেখেন
দলিল : রাসুল (দঃ) বলেছেন তোমরা মু’মীনের অন্তর দৃষ্টিকে ভয় কর, কেননা তাঁরা নূর দ্বারা সব দেখতে পান । (জামে তিরমিজি ২য় জি ১৪৫ পৃ. তাফসীরে কবির ১ম খন্ড ১২৭ পৃ. তাফসীরে রুহুল বয়ান ১ম খন্ড ৩৯ পৃ. ২য় খন্ড ৪৫৫ পৃ., ৪র্থ খন্ড ৫৯০ পৃ. তাফসীরে তাবারী ১৪ তম খন্ড ৫০ পৃ. তাফসীরে রুহুল মায়ানী ১৪তম খন্ড ৪২৯ পৃ. তাফসীরে খাজেন ৩য় খন্ড ৬০ পৃ. ও তাফসীরে ইবনে কাছির ২য় খন্ড ৬৯২ পৃ.)
দলিল : অর্থাৎ, হযরত ইবনে উমর (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলে পাক (দঃ) বলেন : অবশ্যই আল্লাহ পাক সারাটা দুনিয়া আমার সামনে তুলে ধরেছেন, ফলে দুনিয়ার কোথায় কি হয় এবং কেয়ামত পর্যন্ত কি হবে সব কিছু আমার হাতের তালুর মত দেখি। (তারারানী তার কবীরে আলবানী কৃত ছিলছিলায়ে আহদিছ শরহে মাওয়াহেবুল্লা দুন্নিয়া হুলিয়াতুল আউলিয়া ৪র্থ খন্ড)। সুতরাং আল্লাহর হাবীব (দঃ) সারা দুনিয়ার নাজির বা প্রত্যক্ষদর্শী। কেয়ামত পর্যন্ত যা যা হবে সবই আল্লাহর হাবীব (দঃ) দেখতেছেন ও দেখতে থাকবেন ।
দলিল : অর্থাৎ, হযরত ছাওবান (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলে পাক (দঃ) বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ পাক সারা দুনিয়াকে আমার সামনে সংকুচিত করে দিয়েছেন, ফলে আমি পৃথিবীর পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রাপ্ত পর্যন্ত দেখতে পাই । (সহি মুসলিম, ইবনে মাজাহ ২৯২ পৃ. আবু দাউদ শরীফ ৪৮৪ পৃ. মেসকাত শরীফ ৫১২ পৃ. মুসনাদে আহমদ ২৭৮/৫, মেরকাত ১০ খন্ড ৪২৮ পৃ. তাফসীরে ইবনে কাছির ৩য় খন্ড ৩৬৯ পৃ.)
দলিল : অর্থাৎ, হযরত ইবনে উমর (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলে পাক (দঃ) বলেন : অবশ্যই আল্লাহ পাক সারাটা দুনিয়া আমার সামনে তুলে ধরেছেন, ফলে দুনিয়ার কোথায় কি হয় এবং কেয়ামত পর্যন্ত কি হবে সব কিছু আমার হাতের তালুর মত দেখি । (তারারানী তার কবীরে আলবানী কৃত ছিলছিলায়ে আহদিছ শরহে মাওয়াহেবুল্লা দুন্নিয়া হুলিয়াতুল আউলিয়া ৪র্থ খন্ড)। সুতরাং আল্লাহর হাবীব (দঃ) সারা দুনিয়ার নাজির বা প্রত্যক্ষদর্শী । কেয়ামত পর্যন্ত যা যা হবে সবই আল্লাহর হাবীব (দঃ) দেখতেছেন ও দেখতে থাকবেন ।
দলিল : অর্থাৎ, হযরত ছাওবান (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলে পাক (দঃ) বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ পাক সারা দুনিয়াকে আমার সামনে সংকুচিত করে দিয়েছেন, ফলে আমি পৃথিবীর পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রাপ্ত পর্যন্ত দেখতে পাই । (সহি মুসলিম, ইবনে মাজাহ ২৯২ পৃ. আবু দাউদ শরীফ ৪৮৪ পৃ. মেসকাত শরীফ ৫১২ পৃ. মুসনাদে আহমদ ২৭৮/৫, মেরকাত ১০ খন্ড ৪২৮ পৃ. তাফসীরে ইবনে কাছির ৩য় খন্ড ৩৬৯ পৃ.)
দলিল : অর্থাৎ নবীগণ দৈহিকভাবে মানবীয় গুণপ্রাপ্ত, বাতেনীভাবে ফেরেস্তাদের গুণ প্রাপ্ত । এ জন্যেই তাঁরা পৃথিবীর পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত দেখতে পান । (তাফসীরে কবীর, শিফা শরীফ)
দলিল : হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, নিশ্চয় রাসূলে (দঃ) বলেছেন, তোমরা কি মনে কর আমি শুধু কিবলার দিকে বা সামনের দিকেই দেখি ? আল্লাহর কসম! তোমাদের রুকু ও সেজদা আমার কাছে গোপন থাকেনা । আমি তোমাদেরকে পিছনেও দেখি যেমনিভাবে আমার সামনে দেখতে পাই । ( সহি বুখারী ১ম জি, ৫৯ পৃ. মেসকাত শরীফ সালাত অধ্যায় নাসাঈ শরীফ ১ম জি ৯৩ পৃ. মুসনাদে আহমদ ৯ম খন্ড ৩৩ পৃ. মাওয়াহেবুল্লা দুন্নিয়া ২য় খন্ড ২২৬ পৃ.)
দলিল : হযরত আনাছ (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবী করিম (দঃ) বলতেন, তোমরা বরাবর হয়ে দাঁড়াও, বরাবর হয়ে দাঁড়াও, বরাবর হয়ে দাঁড়াও, যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ! আমি তোমাদেরকে পিছনদিকে দেখি যেমনি ভাবে আমার সামনে দেখতে পাই । (সুনানে নাসাঈ শরীফ ১ম জি. ৯৩ পৃ. মাওয়াহেবুল্লা দুন্নিয়া ২য় খন্ড ২২৭ পৃ.)
দলিল : হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন রাসূলে করিম (দঃ) যেমন ভাবে দিনের আলোতে দেখতেন, তেমন ভাবে রাতের গভীর অন্ধকারেও দেখতেন । (মাওয়াহেবুল্লা দুন্নিয়া ২য় খন্ড ২২৬ পৃ. মাদারেজুন্নবুয়াত)। যে নবী রাতের গভীর অন্ধকারেও দিনের আলোর মত দেখেন, সেই নবী অবশ্যই আমাদেরকে দূরবর্তী অঞ্চলেও দেখতে পান । অন্য এক হাদিসে উল্লেখ আছে ।
দলিল : হযরত আনাছ (রাঃ) বলেন, যায়েদ ইবনে হারেজা, জাফর ইবনে আবু তালিব ও আব্দুল্লাহ ইবনে রাওহার মৃত্যু সংবাদ যুদ্ধের ময়দান হতে আসার পূর্বেই রাসূল (দঃ) লোকদের জানিয়ে দিয়েছেন । রণক্ষেত্রের বিবরণ তিনি এভাবে দিয়েছেন, যায়েদ পতাকা হাতে নিয়েছেন, সে শহীদ হয়েছে । তারপর জাফর পতাকা হাতে নিয়েছে, সেও শহীদ হয়েছে । অতপর আব্দুল্লাহ ইবনে রাওহা পতাকা হাতে নিয়েছে সেও শহীদ হয়েছে । এই সময় রাসূল (দঃ) এর চক্ষুদ্বয় হতে অশ্রুধারা প্রবাহিত হয়েছিল । ইহার পর রাসূল (দঃ) বলেন- আল্লাহর তরবারী সমূহের এক তরবারি (খালেদ ইবনে ওয়ালিদ) ঝান্ডা হাতে তুলে নিয়েছে । অত:পর আল্লাহ তা’লা কাফেরদের উপর মুসলমানদের বিজয় দান করেছেন । (সহি বুখারী, মেসকাত শরীফ ৫৩৩ পৃ. মেরকাত শরহে মেসকত)
দলিল : হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, একদা উমর (রাঃ) একদল সৈন্য (নাহওয়ান্দ) অভিযানে পাঠিয়েছিলেন । ‘ছারিয়া’ নামক এ ব্যক্তিকে সেই দলের সেনাপতি করেছেন । ঐ সময় ওমর (রাঃ) মদিনায় জুময়ার খুতবা দিচ্ছিলেন । খুতবার মাঝে তিনি হঠাৎ চিৎকার করে বললেন: হে ছারিয়া! পাহাড়! পাহাড়! পাহাড়! (এই ডাক মদিনা হতে সিরিয়ার যুদ্ধের ময়দানে গিয়েছিল এবং সাহাবারা শুনেছিল) (মেসকাত শরীফ ৫৪৬ পৃ. মেরকাত শরহে মেসকাত ১১ তম খন্ড ৯৯ পৃ. আশিয়াতুল লুময়াত)
এই হাদিস দ্বারা প্রমাণ হয় হযরত উমর (রাঃ) মদিনা হতে নাহওয়ান্দের যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত দেখেছেন। আচ্ছা নবীর উম্মত যদি মদিনা থেকে এত দূর পর্যন্ত দেখতে পায় তাহলে আল্লাহর নবী (দঃ) কি দেখবেন না?
মহানবী সা. সকল মানুষের কবরে হাজির হন
আল্লাহর নবী (দঃ) প্রত্যেকটি মানুষের কবরে দেখেন ও সেখানে উপস্থিত থাকেন। মনকির নকীরের সাওয়ালের সময় আল্লাহর হাবীব (দঃ) প্রত্যেকের কবরে হাজির হয়ে যায়। (তিরমিজি ১ম জি, ২০৪ পৃ. মেসকাত শরীফ ২৪ পৃ. মেরকাত শারহে মেসকাত ১ম খন্ড ৩১৩ পৃ.)
মাইয়্যেতের চোখের পর্দা সরিয়ে দেওয়া হবে ফলে সে নবী করিম (দঃ) কে সরাসরি দেখতে পাবে। (মেরকাত শরহে মেসকাত ১ম খন্ড ৩১৩ পৃ. মেসকাত শরীফ ২৪ পৃ.)। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির কবর ও প্রিয় নবীজির মাঝের পর্দা উঠিয়ে দেওয়া হবে, ফলে সে প্রিয় নবীজিকে সরাসরি দেখতে পাবে। (আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রঃ) মেরকাত শরহে মেসকাত ১ম খন্ড ৩১৩ পৃ.)
আল্লামা কাজী ছানাউল্লাহ পানিপাথি (রাঃ)উল্লেখ করেন : আজরাইল (আঃ) এর সামনে সারা দুনিয়া একটি থালার পিঠের মত। তিনি যেখানে খুশি সেখান থেকে রুহ কবজ করতেপারেন (হাদিস)। যেমনিভাবে আল্লাহর ওলীদেরও এই ক্ষমতা বিদ্যমান রয়েছে। তাঁরা একই সময়ে একাদিক জায়গায় যাইতে পারে। (তাফসীরে মাজহারী ৩য় খন্ড ২৭৩ পৃ.)
আল্লামা ইসমাইল হাক্কী (রঃ) ও ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী (রঃ) বর্ণনা করেন : মালাকুল মওতের জন্যে সমস্থ ভূমন্ডল থালার পিঠের মত। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সেই থালা থেকে নিতে পারে। (তাফসীরে রুহুল বয়ান, তাফসীরে খাজেন, তাফসীরে কবীর)
আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রঃ) তদীয় কিতাবে উল্লেখ করেন : ওলীগণ একই মুহূর্তে কয়েক জায়গা বিচরণ করতে পারেন এবং একই সময়ে তারা একাধিক শরীরের অধিকারী হতে পারেন। (মেরকাত শরহে মেসকাত )
আল্লামা ইসমাইল হাক্কী (রঃ) বর্ণনা করেন হুজ্জাতুল ইসলাম আল্লামা ইমাম গাজ্জালী (রঃ) বলেন : আল্লাহর রাসুল (দঃ) সাহাবীগণের রুহ সমূহকে সাথে নিয়ে ভূপৃষ্টের যেখানে খুশি সেখানে ভ্রমণ করেন, এ অবস্থায় অনেক আউলিয়াগণ তাকে দেখেছেন। (তাফছিরে রুহুল বয়ান, ১০ম খন্ড, ১১৩ পৃ.)
আল্লামা ইমাম জালালুদ্দিন ছিয়তী (রাঃ) বলেন : নিশ্চয় আল্লাহর নবী (দঃ) দেহ ও রুহ সহকারে জীবিত এবং তাঁর তছররুফ করার ক্ষমতা আছে এমনকি তিনি জমীনের যেখানে খুশি সেখানে ভ্রমণ করতে পারেন (আল হাবী লিল ফাতুয়া, ২য় খন্ড ১৮০ পৃ. তাফছিরে রুহল মায়ানী, ২১তম খন্ড, ২৮৬ পৃ.)
আল্লামা কাজী ছানাউল্লাহ পানিপাথি (রঃ) আরোও বলেন : নিশ্চয় আল্লাহ তা’লা তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে ইন্তেকালের পর কুওয়াতের দেহ দান করেন। ঐ ক্ষমতা দিয়ে তাঁরা পৃথিবীর যেখানে খুশি সেখানে ভ্রমণ করেন, ফলে আপনজনদের সাহায্য করতে পারেন ও শত্রুদেরকে পর্যদুস্ত করতে পারেন (তাফছিরে মাজহারী, ১ম খন্ড ১৬৯ পৃ.)
আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রঃ) আরো বর্ণনা করেন : পবিত্র আত্মার অধিকারীগণের রুহ্ সমূহ তাদের ইন্তেকালের পরে উপরের জগতের সাথে মিশে যায়। ফলে তাঁদের চোখের সামনে কোন পর্দা থাকেনা, অত:পর তারা সব কিছু দেখতে পায় যেমনটি উপস্থিত ব্যক্তিকে দেখা যায় (মেরকাত শরহে মেসকাত ৩য় খন্ড ১১ পৃ.)
আল্লামা ইমাম কুস্তলানী (রঃ) উল্লেখ করেন : আল্লাহর নবী (দঃ) এর হায়াত ও মওতের মাঝে কোন পার্থক্য নেই (মাওয়াহেবুল্লাদুন্নিয়া, ২য় খন্ড, ৩৮৬ পৃ.)
তাই বলা যায় আল্লাহর হাবীব হুজুর (দঃ) আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতায় হাজির-নাজির। আর হুজুর (দঃ) শরিয়তে জীবিত কালিন যেমনি ক্ষমতাবান ছিলেন তেমনি ইন্তেকালের পরেও ক্ষমতাবান।
রাসুল পাক সা. নূর, নূরে মুজাচ্ছাম
নূরে মুজাচ্ছাম, রহমতে আলম, ইমামুল মুরছালিন, ছাইয়্যেদুল কাওনায়েন, আশরাফুল আম্বিয়া, হাবিবুল্লাহ, আহম্মদে মুজতবা মোহাম্মাদ মোস্তফা রাসুলুল্লাহ্ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম মহান আল্লাহ্ পাকের জাতি নূরের জ্যোতি-সৃষ্টির প্রথম সৃষ্ট “নূর” । পরম সত্তা (গঞ্জ মফি) গুপ্ত ধনাগারে একাকী ছিলেন । আপন মহিমা প্রকাশের ইচ্ছায় স্বীয় জাত নূর হতে সর্ব প্রথম নূরে মোহাম্মাদী সৃষ্টি করেন । অতঃপর অন্যান্য মাখলুক নূরে মোহাম্মাদী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে । ইহাই আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত এর সকল উলামা মাশাইখের আকিদা। এ পর্যায়ে বিষয়টি দলিল ভিত্তিক নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হ’ল ।
পবিত্র কোরআনের আলোকে রাসূল (সঃ) – নূর
পবিত্র কোরআনে যে কয়টি জিনিসকে “নূর” বলা হয়েছে তার মধ্যে রাসূলে পাক (সঃ) অন্যতম। হাবিবুল্লাহ্ রাসূল (সঃ) আল্লাহর “নূর” এবং “নূর” হয়েই এসেছেন – যা কোরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ আছে ।
দলিল-১ : ক্বাদ জা’য়াকুম মিনাল্লাহে নুরুন ওয়া কিতাবুম মুবীন ।
অর্থাৎ :- অবশ্যই আল্লাহর নিকট থেকে তোমাদের কাছে এসেছে নূর এবং সুস্পষ্ট কিতাব । (সূরা মায়েদা ১৫ নং আয়াত)। কোরআনের এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায় আল্লাহর তরফ থেকে “নূর” এসেছে । এখন জানতে হবে কে সেই নূর?
দলিল-২ : ইয়া আইয়্যুহান্নাস ক্বাদ জা’য়াকুম বুরহানুন মির রব্বিকুম ওয়াআন ঝালনা ইলাইকুম নুরান মুবীন ।
অর্থাৎ :- হে মানুষ অবশ্যই তোমাদের কাছে রবের তরফ থেকে প্রমাণ এসেছে এবং আমি তোমাদের প্রতি উজ্জ্বল “নূর” প্রেরণ করেছি । (সূরা আন নিসা ১৭৪ নং আয়াত)। পবিত্র কোরআনের এই আয়াত দ্বারাও বুঝা গেল- আল্লাহর তরফ হতে আমাদের কাছে “নূর” এসেছে ।
দলিল-৩ : আল্লাহু নুরুচ্ছামাওয়াতে ওয়াল আরদে মাছালু নুরিহী….. । অর্থাৎ :- আল্লাহ্ আসমান ও জমীনের নুরদাতা, মেছাল হ’ল চেরাগের মত । (সূরা নূর ৩৫ নং আয়াত)। আয়াতে উল্লেখিত “নূর” ও নূরের মেছাল সম্পর্কে হক্কানী রব্বানী ফকিহ্ মুজতাহিদ মুহাদ্দিস ও মুফাচ্ছির গনের অভিমত, নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হ’ল ।
অভিমত-ক : আল্লামা ইমাম জালালদ্দিন ছিয়তী (রঃ) উক্ত আয়াতের তাফছিরে বলেনঃ অবশ্যই তোমাদের কাছে আল্লাহর তরফ থেকে “নূর” এসেছে আর এই “নূর” হলেন নবী মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্ (সঃ) । আর কিতাব হলো সু-স্পষ্ট কোরআন । (তাফছিরে জালালাইন-১৯৭ পৃ: তাফছিরে ছাবীর ১ম খন্ড ৪৫১ পৃঃ)
অভিমত-খ : বিশ্ব বিখ্যাত ইমাম আল্লামা ইমাম বাগভী (রঃ) প্রায় এক হাজার বছর পূর্বে উল্লেখ করেছেন : আল্লাহর তরফ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে “নূর”- অর্থাৎ মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্ (সঃ) (তাফছিরে বাগভী ২য় খন্ড ১৩৮ পৃ:)
অভিমত-গ : ইমাম আল্লামা আবু জাফর তাবারী (রঃ) বলেন :- হে আহলে তাওরাত ও ইঞ্জিল গন । আল্লাহর তরফ হতে তোমাদের নিকট এসেছে “নূর” অর্থাৎ “নূর” দ্বারা অর্থ হচ্ছে মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্ (সঃ) যার মাধ্যমে আল্লাহ্ পাক সত্যকে উজ্জ্বল করেছেন এবং যার মাধ্যমে ইসলামকে প্রকাশ করেছেন । (তাফছিরে তাবারী শরীফ ৬ষ্ঠ খন্ড-১৭৬ পৃ:)
অভিমত-ঘ : আল্লামা মাহমুদ আলুছী বাগদাদী (রঃ) বলেন : নিশ্চয়ই আল্লাহর তরফ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে “নূর” । তিনি সবচেয়ে বড় “নূর” এবং তিনি সকল নূরের “নূর” । তিনি নবী মুখতার মুহাম্মাদ (সঃ) । (তাফছিরে রুহুল মায়ানী ৬ষ্ঠ খন্ড-২৪পৃ:)
অভিমত-ঙ : ইমাম আবু জাফর তাবারী (রঃ) ও আল্লামা আবু মুহাম্মদ আবদুর রহমান ইবনে মহাম্মদ আর রাজী ইবনে আবী হাতেম (রঃ) উল্লেখ করেন- হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) কা’ব আহবার (রাঃ) এর কাছে আসলেন ও বললেন “আল্লাহ্ আসমান জমীনের “নূর” দাতা এবং তার নূরের উদাহরণ (মেছাল) সম্পর্কে আমাকে বলুন । তাঁর নূরের মেছাল বা উদাহরণ হ’ল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর উদাহরণ যেমন “চেরাগ” (তাফছিরে ইবনে আবী হাতেম ৮ম খন্ড-২৫৯৬ পৃ:, হাদীস নং: ১৪৫৭১-তাফছিরে তাবারী ১৭তম খন্ড-২১৭ পৃ:)
প্রিয় পাঠক, এ বিষয়ে অসংখ্য বিশ্ব বিখ্যাত তাফছিরে উক্ত আয়াত সমূহে উল্লেখিত “নূর” দ্বারা নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্ (সঃ) কে ই বুঝানো বা বলা হয়েছে । অতএব প্রমাণ হলো আমাদের দয়াল নবী করীম (সঃ) নিঃসন্দেহে “নূর” বা নূরের তৈরী ।
“ইস্কো মাহবুবে খোদা জিস দিলমে হাছেল নেহী
লাখো মমিন হো মাগার ঈমান মে কামেল নেহী”
সহিহ হাদিস শরীফের আলোকে রাসূল (সঃ) – নূর
হাদিস: হযরত জাবের আল আনছারী (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রাসুলুল্লাহ্ (সঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার পিতা-মাতা আপনার কদমে কোরবানী হউক, ইয়া রাসুলুল্লাহ। আমাকে বলে দিন আল্লাহ্ সর্বপ্রথম কি সৃষ্টি করেছেন? দয়াল নবীজি বললেন হে জাবের নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সব কিছুর পূর্বে তাঁর “নূর” থেকে তোমার নবীর “নূর” সৃষ্টি করেছেন । অতঃপর সে “নূর” আল্লাহর কুদরতে পরিভ্রমণ করতে থাকল যেখানে আল্লাহ্ চেয়েছেন । তখন কোন ওয়াক্ত, লওহ কলম, জান্নাত জাহান্নাম, ফেরেশতা, আসমান জমীন, চন্দ্র সূর্য, জ্বীন ইনছান কোন কিছুই ছিল না ।
এই হাদিস খানা নিম্নলিখিত কিতাব সমূহে রয়েছে –
১। যুযউল মাফকুদ ৬৩ পৃ: (মুছান্নেফ আবদুর রাজ্জাক)
২। আল মাদখাল-১ম খন্ড, ৩২ পৃ: (আল্লামা ইবনুল হাজ্জ)
৩। মাওয়াহিবুল্লাদুন্নিয়া-১ম খন্ড, ৭১ পৃ: (ইমাম কাস্তলানি)
৪। শরহে মাওয়াহেব লিয যুরকানী-১ম খন্ড, ৮৯ পৃ: (ইমাম যুরকানী)
৫। তাফহিমাতে ইলাহিয়্যা- ১৯ পৃ: (শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ দেহলবী)
৬। নশরুত্তিব- ৫ পৃ: (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
৭। ছিরাতে হালাভিয়া- ১ম খন্ড, ৪৭ পৃ: (আল্লাম নুরুদ্দিন হালভী)
নিম্নে উল্লেখিত হাদীস ও কিতাব সমূহে রসূল (সঃ) কে “নূর” বলেছে।
তিরমিজি শরীফ ২য় খন্ড- ২০৩ পৃ:
মেশকাত শরীফ- ৫১৩ পৃ:
মেরকাত শরহে মেশকাত ১০ খন্ড- ৪৩৯ পৃ:
নশরুত্তিব- ২৫ পৃ:
মুসনাদে আহমদ- হাদীস নং: ১৭১৬৩ পৃ:
মুস্তাদরাকে হাকেম হাদীস নং: ৪১৭৫ পৃ:
মুসনাদে বাজ্জার- হাদীস নং: ৪১৯৯ পৃ:
সহীহ্ ইবনে হিব্বান- হাদীস নং: ৬৪০৪ পৃ:
খাছাইছুল কোবরা ১ম খন্ড- ১৬৪ পৃ:
তাফছিরে আজিজি ৩০ পারা- ২১৯ পৃ:
মাওজুয়াতুল কবীর- ৮৬ পৃ:
তাফছিরে রুহুল বয়ান- ২য় খন্ড- ৩৭০ পৃ.
এমদাদুস সুলুক- ৮৫ পৃ.
সিরাতে হালাভীয়া- ১ম খন্ড- ৪৭ পৃ.
ইমাম বুখারীর সূত্রে যাওয়াহিরুল বিহার- ৩য় খন্ড- ৩৩৯ পৃ.
তাফছীরে রুহুল বয়ান- ৩য় খন্ড- ৬৫১ পৃ:, ৭ম খন্ড- ৫৪৩ পৃ.
দালায়ে নুন্নবুয়াত- ১ম খন্ড- ৮৪ পৃ.
প্রিয় পাঠক বৃন্দ, এ বিষয়ে যে পরিমাণ দলিল প্রমাণ আমার সংগ্রহে আছে সেগুলো একত্রিত করলে বড় আকারের একখানা গ্রন্থ হয়ে যাবে ইন্শাল্লাহ্ । এ অধ্যায়ে অল্প কিছু দলিল আদিল্লাহ্ উল্লেখ করে প্রসঙ্গটি শেষ করছি ।
হে পরম করুণাময় আল্লাহ্ আমাদের অন্তরে নূর নবী (সঃ), আহলে বাইত, পাক পাঞ্জাতন ও আউলিয়া কেরামের মহব্বত নসিব করুন । সত্যকে জেনে ও মেনে চলার তাওফীক দান করুন ।
তেলাওয়াতে মিলাদ মাহফিল
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ইন্নাল্লাহা ওয়া মালায়েকাতাহু ইউছালুনা আলান নাবী। ইয়া আইয়্যু হাল্লাজিনা আমানু – ছাল্লু আলাইহে ওয়া ছাল্লিমু তাছলিমা।
আল্লাহুম্মা ছাল্লে য়ালা ছাইয়েদেনা মাওলানা মোহাম্মাদ
ওয়ালা আলে ছাইয়েদেনা শাফিয়ানা মোহাম্মদ
(১) লক্ষ কোটি দরূদ ও সালাম, নুর নবীজির কদমে, দয়া করে দাওহে দেখা, ডাকেরে আশেকানে
(২) কোথায় রইলেন প্রাণের রাসুল, আমাদেরকে ভুলিয়া, আপনি বিনে কি লাভ হবে, এ ধরাতে বাঁচিয়া
(৩) তোমাকে চিনিল যারা, ধন্য তারা জীবনে, ভয় নাই তাদের কোন কালে, ভয় নাই তাদের মরণে
(৪) নিজেই মওলা আশেক হয়ে, দুস্তি করলেন যার সাথে, নামের শনে নাম মিলায়ে, নাজেল করলেন কলমাতে
(৫) নুর নবীজির নুরে মওলা, ভুবন করেছে উজালা, নবীর প্রেমে পড়ন দরুদ, ও আশেকান নিরালা
(৬) পড় পড় দরুদ পড়, নুর নবীজির তরীক ধর, হাশরে করিবে পাড় ও, নুর নবীজি ছাল্লাল্লাহ
(৭) কি হবে মন ধনে জনে, কি লাভ হবে অভিমানে, দয়াল নবীর উছিলা বিনে, নাজাত কেহ পাবে না
বিশ্ব নবীর জীবনী হতে কিছু আলোচনা করিবে – অতঃপর –
উঠ মমিন কর তাজীম দাঁড়াইয়া
প্রেমের সালাম দাও মদীনায় পৌঁছাইয়া – (সকলে দাঁড়ায়ে যাবে)।
ইয়া নবী ছালামো আলাকা, ইয়া রাসুল ছালামু আলাইকা
ইয়া হাবীব ছালামু আলাইকা ছালা ওয়াতুল্লা ওয়ালাইকা
(১) নবীগো তোমাকে সালাম, আহলে বাইত আউলিয়া তামাম, মোহাম্মাদ এত মধুর নাম, যেই নামে পাগল ও জাহান
(২) আশেকান তোমায় ডাকেরে, হাজির হয়ে এই দরবারে, উদয় হও হৃদ মাজারে, দেখিব পরাণ ও ভরে
(৩) এস হে ইস্কের মহারাজ, সাজিয়া মুর্শিদের ও সাজ, কবুল ও কর খোশ নেওয়াজ, দান কর রূহানী ফায়াজ
(৪) তুমি তো রহমতের ভান্ডার, তুমি তো পারেরই কান্ডার, আমরা উম্মত গুনাহগার, হাশরে করিও নিস্তার
(৫) তৌহিদের ইস্কের বাগিচায়, অলীগণ মধুলুটে লয়, আশেকান সুরেতে মাতায়, ডুবিয়া ইস্কের দরিয়ায়
(৬) আমিতো অধম গুনাহগার, নিবেদন চরণে তোমার, কঠিনও সঙ্কট মাজার, পাইযেন তোমারী দীদার
(৭) আমারও মরনের কালে, তোমাকে সামনে পেলে, রবেনা মরণ যন্ত্রণা, অধমকে ভুলে থেকোনা
(৮) আমারও মনের বেদনা, বোঝালে কেহ বোঝেনা, শোনালে কেহ শোনে না, কেবলই শোনেন শাহে মদীনা
সালামে মোস্তফা (সঃ)
মোস্তফা জানে রহমত পে লাখো ছালাম শাময়ে বজমে হেদায়েত পে লাখো ছালাম
১. ছাইয়্যেদি হাবিবী মোহাম্মাদ মোস্তফা নুরে জালোয়া মিল্লাত পে লাখো ছালাম
২. মুশকিল কোশা মওলায়ে আলী মুর্তজা শানে বেলায়েত ওয়া রেসালাত পে লাখো ছালাম
৩. গাউছেল আজম ইমামুত ত্বকা ওয়ান নকা জালোয়ায়ে শানে কুদরত পে লাখো ছালাম
৪. সঞ্জরী আজমেরী খাজা গরীবে নেওয়াজ উচ মঈনদ্দিন আওর তরীকত পে লাখো ছালাম
৫. পীরানে পীর দস্তগীর খাজেগানে চিশতীয়া তামামে আউলিয়ার কদম পে লাখো ছালাম
বালাগাল উলাবি কামালিহী, কাশাফাদদুজাবি জামালিহী, হাসুনাত জামিউ খেসালিহী, ছালু আলাইহি ওয়ালিহী।
ছাল্লিমু ইয়া কাউমু বাল ছালু আলা সাদরিল আমিন, মোস্তফা মা যা ইল্লা রহমাতাল্লিল আলামিন।
ওয়া আখিরি দাওয়ানা আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।
মোনাজাত
ফজল কর ইয়া রব মহাম্মদ মস্তফা কে ওয়াস্তে
ছাইয়েদে কাউনায়েন শাহে আম্বিয়া কি ওয়াস্তে
ইয়া ইলাহিল আলামিন ইয়ে আরোজ হো মেরী কবুল
ইছতে জাব হাজা দোয়ায়ে মস্তফা কি ওয়াস্তে
বার গাহে আলী মে তেরে হায় ইয়ে মেরী এনতেজা
হোবে হাল মশকেল মেরে মশকেল কোশাকি ওয়াস্তে
বুল বুলে বাগে মদীনা কোররাতুল আইনে রছুল
ইয়ানে হযরত ফাতিমা খায়রুন্নেছা কি ওয়াস্তে
দে খুশী দেল কো মেরে ছাড় ছাবজ কার নাখলে মুরাদ
উছ জেগের খাস্তা ইমাম হাছান ছাহেব লাওয়া কি ওয়াস্তে
হার তরফছে ফউজ গমনে আকে ঘেরা হায় মুঝে
দে পানা ইয়া রব শহীদে কারবালা কি ওয়াস্তে
কোন তুঝ বেন দাদ ইছ আজেজ কি দেবে আয় খোদা
জোদ তর ফরিয়াদ রছ জয়নাল আবা কি ওয়াস্তে
মায় বহুত হায়রান হো কার রহম কি মুঝপর নজর
ইমাম বাকের ও জাফর আলী মুসারেজা কি ওয়াস্তে
মুছা ও কাজেম তকী ও বা নকী ও আসকারী
আওর ইমাম মাহদী পীরে খোদা কি ওয়াস্তে
ইয়া ইলাহি ছাব উঠালে দরদো আন্দো কি বঝ
আপনা আপনা পীরও মোরশেদ রাহনোমা কি ওয়াস্তে
ছুম্মা আমীন, বা হক্কে কলেমা লাইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ।

