সংকলন – লাবিব মাহফুজ চিশতী
হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম প্রধান সুফি সাধক (আরিফ)। তিনি ৯ম শতকে ইরানের বোস্তাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাসাউফের জগতে “সুলতানুল আরিফিন” নামে খ্যাত। তাঁর আসল নাম ছিল আবু ইয়াজিদ তাইফুর ইবনে ঈসা বোস্তামী। তিনি ছিলেন অহংবোধহীন আত্মবিসর্জন ও আত্মিক মহাযাত্রার প্রতীক, যিনি “সুবহানি! মা আযামা শানি” (পবিত্র আমি! আমার মর্যাদা কত মহান!) — এই ধরণের উক্তির মাধ্যমে আত্মাবিষ্কারের গহীন অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন, যা বাহ্যিকভাবে বিতর্কিত মনে হলেও অন্তর্গতভাবে ছিল ফানার (আত্মবিলয়) অভিজ্ঞান। তাঁর শিক্ষা আত্মনির্ভরতা, ঈশ্বরমুখীনতা ও পরম প্রেম (ইশক)-এ পরিপূর্ণ, যা পরবর্তীতে সুফিবাদের গভীর ধারা নির্মাণে অসাধারণ প্রভাব রেখেছে। তাঁর অসামান্য আত্মিক মূল্যবোধসম্পন্ন কিছু উক্তি মোবারক –
1. আরিফ সেই, যার চরিত্রে আল্লাহুর গুণাবলি থাকে।
2. উপাসনা ও ধ্যানের তরবারী দিয়ে যিনি কামনা বাসনাকে কেটে ফেলেছেন, তিনিই আরিফ।
3. আরিফের কাছে মারেফাতের তুচ্ছ একটি বিন্দু জান্নাতের লক্ষ লক্ষ বালাখানা থেকেও সহস্রগুণ মুল্যবান।
4. আরিফ যখন নিরব, তখন তাঁর ইচ্ছা হয় আল্লাহর সাথে কথা বলতে। আরিফ যখন মুদিত আঁখি, তখন তাঁর ইচ্ছা হয় আল্লাহর সাথে দেখা করতে। যখন দু হাটুর মাঝখানে মাথা রেখে তিনি চোখ বন্ধ করে থাকেন, তখন তিনি ভাবেন – এখন যদি ইসরাফিল সিংগায় ফুঁ দিত, তাহলে আল্লাহর সাথে দেখা হয়ে যেত।
5. আল্লাহ যেমন একা, তেমনি আরিফ ও একা। আরিফ জনসমাগম পছন্দ করেন না।
6. একজন আরিফকে কেউ প্রভাবিত করতে পারেন না। তার দ্বারা সবাই প্রভাবিত হন।
7. আরিফ নিজেকে নির্বোধ মনে করে আর নির্বোধ রা নিজেকে আরিফ মনে করে।
8. আরিফ হল উড়ন্ত পাখি। আর যারা আরিফ নয় তারা হল চতুষ্পদী।
9. আরিফের অন্তর হল স্বচ্ছ কাঁচে ঘেরা বাতির মতো। তার অত্যুজ্জল আলোয় আলোকিত হয় আলমে আরওয়াহ।
10. আরিফের জন্য যা কর্তব্য তা হলো, বিষয় বিভব থেকে সর্ম্পূর্ন নিস্পৃহ থাকা। জান্নাতের ভরসা ও জাহান্নামের পরওয়া না করা।
11. দুটি জিনিস ধ্বংস ডেকে আনে। তা হলো, আল্লাহর সৃষ্টিকে সম্মান না করা এবং আল্লাহর অবদানকে স্বীকার না করা।
12. আল্লাহকে যারা পেয়েছেন তারা জান্নাতের শোভা বর্ধন করেন ঠিকই, কিন্তু জান্নাত তাদের জন্য এক আযাব ছাড়া কিছুই নয়।
13. আল্লাহ তাঁর প্রিয়জনদের ৩ টি স্বভাব দান করেন। সমুদ্রতূল্য বদান্যতা, সূর্যসম উদারতা, ভূতলতূল্য নম্রতা।
14. আল্লাহ যাকে উপযুক্ত মনে করেন, তার পেছনে এক ফেরাউন লাগিয়ে দেন।
15. সৎ সংসর্গ সৎকার্য থেকে উত্তম এবং কুসংসর্গ কুকার্য থেকেও নিকৃষ্ট।
16. গৌরব ও মর্যাদার লোভে যে বিদ্যার্জন করে তার থেকে দূরে থাকো। কেননা প্রতি মুহুর্তে আল্লাহর রহমত তার থেকে দূরে সরে যায়।
17. জ্ঞান অর্জন করতে হবে জ্ঞানী ব্যক্তির কাছ থেকে।
18. মানুষ যদি নিজেকে চিনতে পারতো তাহলে কতই না ভালো হত। নিজেকে নিজে চিনতে পারলে পূর্ণ মারেফাত অর্জিত হয়।
19. কি এমন মহিমা দুনিয়ার যে মানুষ তাকে ভূলতেই পারে না? আল্লাহ প্রেমিক যারা, দুনিয়াকে ভূলে যাওয়া তাদের জন্য মোটেই কঠিন না।
20. যে আল্লাহকে চিনেছে, মানুষের কাছে তার চাইবার কিছু নেই। আর যে আল্লাহকে চিনেনি, সে অপরের মুখাপেক্ষি এবং মর্যাদাহীন।
21. রিপুর বাসনা যে ত্যাগ করেছে, সে আল্লাহকে পেয়েছে। আর যে আল্লাহকে পেয়েছে, সবি তার নাগালে এসে গেছে।
22. যে শিষ্য চিৎকার করে ও হাহুতাশ করে সে কূপসদৃশ। আর যে মৌনাবলম্বন করে, সে রত্নগর্ভা সমুদ্রের ন্যায়।
23. দুনিয়ার হরকত ও নিরবতা সবই আল্লাহর তরফ থেকে – এ কথা অন্তরে উপলদ্ধি করাই হল মারেফাত।
24. পরোপকারী ও সমব্যথী ব্যক্তি পৃথীবির যে কোনো মানুষের চেয়ে আল্লাহর অধিকতর নিকটবর্তী।
25. আল্লাহকে পেতে হলে অন্ধ, বধির ও মূক হয়ে যাও।
26. দুনিয়াদারদের জন্য দুনিয়া গৌরবের স্থান। পূণ্যবানদের জন্য আখেরাত আনন্দের স্থান। আর আল্লাহপ্রেমিকদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা সাধকগণের জন্য এক নূর ছাড়া আর কিছুই নয়।
27. আল্লাহর দীদার লাভে আগেই যত বাকবিতন্ডা। দীদার ঘটে গেলে যাবতীয় তর্কের অবসান হয়।
28. এমন এক বিদ্যা আছে যা আলেমগণের জ্ঞানেরও বাইরে। এমন এক ত্যাগ আছে যা বিরাগীদেরও জ্ঞানের বাইরে।
29. যে নিজেকে নিজে আরিফ বলে, সে মূর্খ। যে নিজেকে নিজে মূর্খ বলে সে আরিফ বটে।
30. যে মানুষের সম্মান রক্ষা করে চলে সে আল্লাহর নিকটবর্তী। আর যে মানুষের সম্মান নষ্ট করে সে আল্লাহর দূরবর্তী।
31. জ্ঞান মানুষের জীবনীশক্তি। মারেফাত তার হৃদয়ের শান্তি। আর উপাসনা এক আস্বাদ্য বস্তু।
32. মানুষের কুপ্রবৃত্তি প্রবল হলে অন্তর দূর্বল হয়। আর অন্তর সবল হলে কুপ্রবৃত্তি দূর্বল হয়।
33. যে ব্যক্তি অন্তরের অন্তস্থলে ভ্রমণ করে একটি গুপ্তকক্ষের সন্ধান পায়, মোতির সিন্দুক লাভ করে সেই দরবেশ।
34. একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো দিতে ধাবিত না হওয়াই একমাত্র উত্তম কাজ।
35. সৃষ্টিজগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের দোষত্রুটি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করার মাধ্যমেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়।
36. আমি নিজেকে আমার প্রভূর মধ্যে বিলিন করে দিয়ে দেখতে পেলাম জগতের সকল বস্তু আমার অস্তিত্বের মধ্যে সংশ্লিষ্ট।
37. মানুষ জ্ঞান লাভ করছে মরণশীল মানুষের কাছ থেকে। আর আমি জ্ঞান লাভ করেছি চিরঞ্জীব আল্লাহর কাছ থেকে।
38. প্রভু! আপনার অসীম কুদরতে দারিদ্র ও ক্ষুধা আমাকে আপনার নিকটবর্তী করেছে।
39. প্রভু! আমি আপনার অন্ধপ্রেমিক। দূর্বল, অনাথ ও মুখাপেক্ষী। আশ্চর্য এই যে, তবু আপনি আমাকে প্রেম দান করেছেন।
40. সকল আরাম আয়েশ বর্জন করে দুঃখ কষ্ট কে বরণ করাই হল তাসাউফ।