লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
একই কথা বা শব্দ স্থান বিশেষে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে তা আগে বুঝতে হবে, নয়তো তার দ্বারা কখনো আসল বিষয়টি বুঝা সম্ভব হবে না। যেমন ‘রব’ কথাটির অর্থ আওয়াজ বা শব্দ, কালামও হয়। আবার ‘রব’ অর্থ প্রতিপালক বা প্রভু। যেমন রাব্বিল আলামিন অর্থাৎ জগতসমূহের প্রতিপালক বা প্রভু ইত্যাদি। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লামই হলেন উম্মতের দ্বীনি বা ধর্ম পিতা; আওলা এবং মাওলা। মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছালামের পরে ধর্ম পিতা,আওলা মাওলা হলেন শেরে খোদা হযরত আলী আলাইহি ওয়াচ্ছালাম। (রাছুল বলেন, মান কুনতুম মাওলাহু, ফাহাজা আলীউন মাওলাহু)।
মুহাম্মদ চিরন্তন শাশ্বত অখন্ড কালে প্রবাহিত এক পবিত্র সত্ত্বা বিধায় চিরবর্তমান। সেই অখন্ডকালে প্রবাহিত মুহাম্মদ রাছুলকে যারা জানেনি, চিনেনি, তারা দ্বীনে মুহাম্মদী বা দ্বীন ইসলামের অন্তর্ভুক্ত নয়। ঈমানদারগণ ব্যাতিত তাকে কেউ চিনবে না, দেখবে না, অন্যেরা দেখলেও চিনবে না (সূরা হিজর)। আসলে বেলায়েতে এক রাছুলই প্রবাহিত হয়ে চলেছে যা চির বর্তমান। বেলায়েতের ধারায় ধর্মপিতা তথা ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করা হয় সমস্ত পরকাল প্রাপ্ত মানুষকে তথা ইনছানি আত্মার অধিকারী মানুষকে এবং এরাই হলো হাকিকতে পিতা বা বাবা তথা আব্বা। ইহা একটি পবিত্র এবং সম্মানিত সম্বোধন। এ ধর্মপিতাকে বা পরকাল প্রাপ্ত মানুষকে ফার্সী ভাষায় ‘পীর’ বাংলা ভাষায় ‘গুরু’ এবং আরবীতে ‘মুর্শিদ’ বলে অভিহিত করা হয়। কেউ বা’জান (বা-জান) বা বাবাজান বলে। কারণ মুর্শিদের আত্মার সাথে ভক্ত বা মুরিদের সম্পর্ক।
কোরানের ঘোষনা, “নবীকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে হবে” (সুরা আহযাব)। নবুয়তে যাদেরকে নবী রাছুল বলা হয় বেলায়েতে তাদেরকেই অলিআল্লাহ বা অলিয়ম মুর্শিদ বলা হয়। সুতরাং প্রত্যেক চেতন মানুষ বা পরকাল প্রাপ্ত মানুষই হলো বা’জান –যার নিকট নিজ আত্মাকে আহুতি করা হয় বা ফানা করে দিয়ে দু’আত্মার মধ্যে একত্ম ঘোষণা করা হয় বা করার সাধনা করা হয়। সেজন্য কেহ কেহ গুরুকে ‘বাজান, বা ‘বাবাজান’ বলে ডাকে। আবার জাগতিক জগতের জন্মদাতা পিতাকেও ‘বাবা’ বা ‘বাবাজান’ বা জনকও বলা হয়। একই কথার বা একই শব্দের ভিন্নার্থ স্বীকার্য এবং তাদের সন্তান বা আওলাদদেরও ভিন্নার্থ-ভাবমর্ম স্বীকার্য। সামাজিক আইনে বা জাগতিক বিধানে তাদের উভয় দেশেই ভিন্নার্থ প্রকাশ করছে। তবে জাগতিক জগতের বিষয়টি ক্ষনস্থায়ী এবং পারলৌকিক বা আধ্যাত্মিক জগতের বিষয়টি বা সম্পর্কটি চিরস্থায়ী। একটি রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়-যা আপেক্ষিক সত্য, ইহা নফসের সৃষ্টি এবং ইহলোকের সাথে সম্পর্ক (এ সম্পর্ক বা আত্মীয়কে ফেৎনাস্বরুপও বিবৃত করা হয়েছে কোরানে ), অপরটি আত্মার (ইনছানি আত্মার) সম্পর্কের আত্মীয়-যা চির সত্য এবং চির বর্তমান। এ সম্পর্ক ইহলোক এবং পরলোকের মুক্তিপ্রাপ্ত বা মুক্তির পথে সাধনাকারীদের সম্পর্ক।
গুরুকে কেউ বলে হুজুর। ‘হুজুর’ হাজির (উপস্থিত) শব্দ হতে আগত – এর মানে যিনি খোদাকে হাজির-নাযির তথা উপস্থিত দেখেন তিনিই হলেন ‘হুজুর’। এজন্যই বলা হচ্ছে, “লা ছালাতা ইল্লা বেহুজুরিল ক্বালব” অর্থাৎ ছালাত নেই খোদাকে উপস্থিত দেখা ব্যতীত। রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লামের কালাম হলো, “তোমরা এমন ভাবে ইবাদাত করো যেনো আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছো” (মেশকাতÑ২ নম্বর হাদিস)। রাছুলের খাস অনুসারী বা উম্মত যারা (যারা জান ও মাল দিয়ে মুর্শিদের প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করেছে, কোরানের ভাষায় ইহাকে বলে এতায়াত করা) তারা খোদাকে দেখেই ইবাদাত করেছে। এজন্যই হাবিবে খোদার উম্মতগণের ছালাতই হলো মেরাজ। সুতরাং যারা খোদাকে চিনে না, দেখে না, তাদেরকে কখনো হুজুর বলা যাবে না, সঙ্গত নয়, তাদেরকে হুজুর বললে তা চরম অন্যায় এবং ধর্ম বিরোধী কথা হবে।
কেউ ‘দয়াল’ বলেও মুর্শিদকে সম্বোধন করছে। এর কারণ, আল্লাহর দয়া-করুণা পতিত মানব জাতির জন্য একমাত্র লাভ হয় মানবগুরু বা ইনছানি আত্মার অধিকারী বা পরকাল প্রাপ্ত মানুষের মাধ্যমেই। এখানেই ঈমান আমান; পতিত মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে আল্লাহ নিজেই। আল্লাহর মতলেক কালাম তার হাবিবের মাধ্যমে কালামে নাতেক হচ্ছে, “হে রাছুল, আমি আপনারই মাধ্যমে দান করি এবং আপনারই মাধ্যমে গ্রহণ করি”। সব কিছুর কর্তা আল্লাহপাকই কিন্তু তার মাধ্যম হলেন হাবিবে পাক মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লাম (ওয়াবতাগু ইলাইহিল ওয়াছিলাতা)। বিমূর্ত আল্লাহর মূর্তরুপ হলেন মুর্শিদ; একজন চেতন বা পরকাল প্রাপ্ত মানুষ। আল্লাহর সদৃশ নেই, তবে সাদৃশ্য আছে; এ সাদৃশ্যই হলেন মানবগুরু মুর্শিদ। আর এ কথাও বুঝতে হবে সদৃশ আর সাদৃশ স্থূল দৃষ্টিতে প্রভেদ দেখালেও সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে বা দিব্যদৃষ্টিতে অভেদ হয়েই আছে। দিব্যদৃষ্টিতে একমাত্র অদ্বৈত লীলারই প্রকাশ ও বিকাশ হয়ে চলছে, ইলমে সীনা হতে তাই জানা যায়। আরো বুঝতে হবে, মুহাম্মদ রাছুলই একমাত্র মুর্শিদ – যা চিরবর্তমানে বিদ্যমান । আল্লাহ আদিতে বা অদৃশ্য জগতে আদম রূপেই ছিলেন তাই আদম রূপেই তিনি ব্যক্ত হলেন (ইন্নাল্লাহা আদামা আলা সুরাতিহি) । এখানেই আদম আল্লাহ হুবাহু। আল্লাহ আদম আর মুহাম্মদ আর মুহাম্মদ এ তিনের প্রভেদ আর অভেদটি না বুঝলে এ আলোচনা বুঝা সম্ভব নয়। কাজেই, জ্ঞানীগণ বা ঈমানদারগণ বিদ্যুতের তার দেখলেও সে তারের মধ্যে বিদ্যুৎই দেখতে পান, আর সে দেখাটি তারের আকৃতিতেই । ঈমাসদারগণ ঈমানের দৃষ্টিতে অদ্বৈত-লীলা দেখতে পান বিধায়ই তাকে দয়াল বলে সম্বোধন করছে। আল্লাহই হলেন দয়াল, পরম দয়ালু; দয়া করা না করা দয়ালেরই ইচ্ছা। কোরানে বলা হচ্ছে “ওয়ামা ইয়ানতিকু আনিল হাওয়া” অর্থাৎ, (হাবিবে খোদা) নিজের প্রবৃত্তি হতে কোনো কথা বলেননি। তাহলে হাবিবে খোদার মাধ্যমে তার জবানে আল্লাহর মতলেক কালাম নাতেক হচ্ছে। তার হস্ত, পদ, চক্ষু, কর্ণে আল্লাহরই এরাদা প্রকাশ হচ্ছে। আল্লাহপাক পরম দয়ালু ক্ষমাশীল রাহমানুর রাহিম, তার হাবিবে খোদার মহব্বতকারীগণকে নিজেরই মহব্বতকারী হিসেবে গণ্য করে তাদের জীবনের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন (সুরা আলে ইমরান-৩১)। তাইতো মুর্শিদ বা গুরু রূপেই ঈমানদারগণ দয়াল কে দেখতে পাচ্ছেন।
‘ কেউ কেউ মাধ্যম বা উছিলা স্বীকার করতে চায় না, সরাসরি আল্লাহকে মানে; এর অর্থ সে বিমূর্ত আল্লাহকে মানে; বিধিকে মানে কিন্তু বিধাতাকে মানে না। এ মত এবং পথটিই ইবলিশ এর আকিদা, এরা হলো মোয়াহেদ -কাফের।’
এজন্যই ইবলিশ অহংকার করে আদমের আনুগত্য করতে রাজি নয় তথা আদমকে সেজদা করতে রাজি নয়; রাজি নয় তার ধর্মে যারা দীক্ষিত হয়ে আছে তারাও। আদমকে সেজদা করতে অস্বীকৃতি মানে মূলতঃ আল্লাহকেই সেজদা করতে অস্বীকার করা হলো। মানুষের বাহিরে সবই শূণ্যকার, প্রয়োগহীন, ক্রিয়াশূণ্য-অভেদ্য জুলমাত। তারই সৃষ্টি মানুষ, বেমেছাল নূরের মেছাল (সুরা নূর ৩৫) তথা হুবাহু প্রকাশ। পরকালপ্রাপ্ত মানুষই হলো পতিত মানুষের বা অচেতন মানুষের বা নিজ আত্মা হারানো লোকের আল্লাহ প্রাপ্তির উছিলা (সুরা মায়েদা ৩৫)। যারা বুঝতে চায় না, জন্মদাতাকে ছাড়া আর কাউকে পিতা বা বাবা বলা যাবে না, তাদের যুক্তিটা একেবারেই খোড়া এবং অজ্ঞতাপ্রসূত। কারণ, তারা ধর্মপিতা বা দ্বীনি পিতা মুর্শিদ বা মানবগুরু আর জন্মদাতা পিতার মধ্যে নিশ্চই প্রভেদ বুঝেনি। যেহেতু মেয়ে, তাই মা আর বউকে একটিই মনে করে ফেলেছে মূর্খরা। এ অজ্ঞতা -মূর্খতার জন্যই মুর্শিদকে বাবা সম্বোধন করাকে জন্মদাতা পিতার মতোই মনে করে থাকে এবং ঈমানদারগণকে (যারা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান এনেছে বা বায়াত গ্রহণ করেছে) নানা রকম টিটকারী, রসিকতা বা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে থাকে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিশেষ এক শ্রেনীর আলেম-মোল্লাগণ এবং সমাজে তাদের অনুসারী অজ্ঞ-মূর্খ কিছু লোক। আসলে আল্লাহর সৃষ্টি জীব ছাগলের তকদিরই এমন যে, তার নাকে আতরের শিশি বা গন্ধরাজ ফুল ধরলেও গন্ধ নিতে পারবে না, হাজার চেষ্টা করলেও। কোনো কোনো জীব ঘি খেলে নাকি গায়ের পশম ঝড়ে যায়, অবস্থা ঠিক তেমন। এ শ্রেনীর লোকগুলোর লিখার ডিগ্রি নেই, তবে মুছে ফেলার ডিগ্রি আছে। ধর্মজ্ঞান সবাইকে বুঝানো যাবে না, যার না; আল্লাহ হেদায়েত না দিলে । তাছাড়া ‘বাবা’ বা বা’জান বললেই যদি জন্মদাতা পিতার মতো হয়ে যায় তবে বাংলাদেশের বাঙালী জাতির পিতা বলা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে, এর অর্থ কি তিনি সব মায়েরই স্বামী? মুসলমানের জাতির পিতা বলা হয় ইবরাহিম নবীকে, তাহলে কি তিনি সব মুসলমান মায়েদের স্বামী? না। তিনি হলেন দ্বীনি পিতা। মানব জাতির আদি পিতা বলা হয় হযরত আদমকে, তাহলে তিনিও কি সব মায়েদের স্বামী?
দু’পাওয়ালা মানব জাতির মধ্যে যিনি প্রথম আত্মপরিচয় জ্ঞান লাভ করেছেন বা নিজকে চিনেছেন তথা খোদাকে চিনেছেন তিনিই মানব, পতিত মানব বা অচেতন, ঘুমন্ত, উলঙ্গ মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম; ইহা দ্বীনি পিতা। নিজকে চেনার শিক্ষার ধারক-বাহক তিনি, তিনিই মুর্শিদ। তাকে কেউ বাবা, বাজান বা আব্বা সম্বোধন করছে। তিনি চিরবর্তমান। কারণ আদম হলেই মৃত্যুঞ্জয়ী হয়, অখন্ডকালে স্থিত হয় বা লা মউতের অধিকারী হয়। আবার ছেলেদেরকেও মা-বাবা ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করে, তাই বলে কি ঐ ছেলে মা বাবার জন্মদাতা? বাবার মার স্বামী? একলক্ষ চব্বিশ হাজার নবী রাছুল যদ লোককে মুসলমান করেছেন বা দ্বীনে মোহাম্মদীতে দাখেল করেছেন, তার চেয়েও বারো গুন বেশি মুসলমান করেছেন যিনি সেই হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীকেও পৃথিবীর সব ঈমানদারগণই ‘খাজা বাবা’ বলে সম্বোধন করছে, তাকে কি তিনি সব মায়েরই স্বামী হয়ে গেলেন! অনেক সময় মেয়েদের তার স্বামীকে বলতে শোনা যায় ‘আরে বাবা, রাখো না’। তাতে কি স্বামী পিতা হয়ে গেলো? ‘বাবা’ শব্দটি যখন কোনো সাধু, দরবেশ, গুরু বা অলী মুর্শিদকে বলা হয় তখন তা হয় চিরন্তন শাশ্বত এক পবিত্র সম্মানসূচক উপাধি। আবার ‘বাবা’ শব্দটি অনুনয়, আদর- ¯েœহ ইত্যাদিসূচক সম্বোধনেও ব্যবহৃত হয়। যেমন ‘বাবা আমার সোনামণি’। বন্ধু-বান্ধবদের পরস্পরের প্রতিও ‘বাবা’ বলা হয়ে থাকে। যেমন ‘এ মেয়ে পুরুষেরও বাবা’। দুঃখ যন্ত্রণা ইত্যাদি সূচক ‘বাবা’ শব্দও ব্যবহার করা হয়। যেমন ‘বাবাগো, মাগো বলে চিৎকার করা হয়। জামাতা বা জামাতৃস্থানীয় ব্যক্তিকেও স¯েœহে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করা হয়। শ্বশুরকেও বাবা বলে ডাকা হয়। ছোট ছেলেদেরকে আদরের দৃষ্টিতে ‘বাবা’ বলা হয়; যেমন ‘বাবা গাছের ফুল ছিঁড়ো না’। আরবে চাচাকেও বাবা বলা হয়, তাই বলে কি জন্মদাতা পিতা হয়ে গেলো? এভাবে বললে অনেক উদাহরণই দেয়া যায়।
যার দ্বারা বুঝা ‘বাবা’ বললেই জন্মদাতা পিতা বা জনক হয়ে যায় না বা জন্মদাতা পিতার মতোও হয় না। গুরুকে বা মুর্শিদকে বাবা বা বা’জান বলে সম্বোধন করাটা অনেক উঁচুস্তরের একটি সম্মানজনক উপাধি; এটাকে যারা জাগতিক জগতের পিতা বা বাবা বলে বুঝে বা বুঝায় তাদেরকে গর্দভ বললেও কিছুই বলা হয় নি। এভাবে জাগতিক জগতে সামাজিক পরিসরে ভাই-বোন, চাচা-চাচী, মামা-মামী, দাদা-দাদী ইত্যাদি আমরা অনেক লোকদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করে থাকি অথচ তারা কেউ রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়তো নয়ই, বরং কোনো আত্মীয়ই নয়, অপরিচিত লোকও হতে পারে। বুঝতে হবে একই শব্দ স্থান বিশেষে ভিন্ন অর্থ হয় – এটা যে না বুঝে তাকে বুঝাতে যাওয়া আর গাধার নাকে গোলাপ ফুল ধরা একই কথা। বুঝতে হবে মানবগুরু হলো বাবারও বাবা, মায়েরও বাবা তথা তিনি পতিত মানবজাতিরই ‘বাবা’ বা পিতা। ‘বাবা’ কথাটির অর্থ অনেক, তার মধ্যে ‘দরজা’ (বাবা) ও বলা হয় (সুরা বাকারা -৫৮)। কিসের দরজা? ইলমে ইলাহী মানবগুরুর মাধ্যমে লাভ হয় বিধায় তিনি ‘বাবা’ ইলমে ইলাহী লাভের মাধ্যম বা দ্বার। ‘দারবেশ বা দরবেশ’ কথার মর্মার্থও এখানে প্রণিধানযোগ্য। এ দরজা দিয়েই শহরে প্রবেশ করে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে কোরানে এবং তাতে তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হবে (সুরা বাকারা ৫৮)। একটি জন্মদাতা পিতা তথা বাবা, আরেকটি কর্মদাতা বা মুক্তির পথপ্রদর্শক পিতা বা বাবা। দুটোই বাবা তবে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করছে, দুয়ের ব্যবধান আকাশ-পাতাল। জন্মদাতা পিতা-মাতা আপেক্ষিক সত্য, কিছু দিনের জন্য। আর ইনছানি আত্মার অধিকারী বা পরকালপ্রাপ্ত মানুষ হাকিকি পিতা, চির দিনের পিতা, মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক। হাবিব খোদার কালাম হতে ‘মাওলা আলী’ হলেন ইলমে ইলাহীর দরজা। (রাছুলের কালাম হলো, “আনা মদিনাতুল ইলমী ওয়া আলীউন বাবুহা”।
বোনের জামাই শ্যালককে ‘শালা’ বলে সম্বোধন করে বা পরিচয় দেয়। তাতে সে সন্তুষ্ট হয়। কিন্তু ঝগড়ার সময় অন্য কোনো লোককে শালা বললে কিন্তু গালি হয়ে যায় আর তাতে মারামারি লেগে যায়। শ্যালককে ‘শালা’ বলা আর ঝগড়ার মধ্যে অন্য লোককে ‘শালা’ বলা এক নয়। একটি বুলি অপরটি গালি, যদিও একই শব্দ উচ্চারণ হচ্ছে তবু ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করছে। আর হাবিবে খোদার স্ত্রীগণ হলেন ‘উম্মুল মুমিনীন’ অর্থাৎ মুমিনগণের মা বা মূল। যদিও এর ভেদ-রহস্য অনেক গভীরে নিহিত রয়েছে। মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লাম স্বয়ংই ইসলাম এবং মুসলমান (মুক্ত, স্বাধীন, মৃত্যুঞ্জয়ী) তথা তিনি নিজেই ধর্ম এবং ধর্মের সুরত, ঈমান এবং ঈমান দেনেওয়ালা। সুতরাং দ্বীনি পিতা হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুল সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামের প্রতি যারা ঈমান এনেছে (বায়াত গ্রহণ করেছে) এবং তার নীতি আদর্শকে ধারন করেছে বা করার সাধনা করছে তারাই হলো একমাত্র ঈমানদার এবং মুসলমান, তার আওলাদ। ওলী-মুর্শিদ বা গুরুর ক্ষেত্রেও তাই সম্বোধন হবে। কারণ, নবুয়তের নবী-রাছুলই হলো বেলায়েতের ওলী মুর্শিদ, একই কাজ শুধু উপাধি ভিন্ন।
মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই, তাই বলে এ কথা হাবিবে খোদা বা ওলী-মুর্শিদের ক্ষেত্রে বলার অবকাশ নেই। কারণ, হাবিবে খোদা মুহাম্মদ রাছুল জাগতিক জগতের সম্পূর্ণ বাহিরে মোকামে মাহ্মুদায় স্থিত আছেন, যেখানে সৃষ্টির কোনো অপবিত্রতা প্রবেশ করে না। সেখানে জাগতিক জগতের কোনো সম্বোধন প্রযোজ্য নয়, যদিও তিনি মানবলীলায় সাংসারিক জীবন যাপন করেছেন। তিনি মুক্ত, স্বাধীন সত্ত্বা। আর আল্লাহ নিজেই তার স্ত্রীগণকে উম্মতের মা বলে ঘোষণা করেছেন, বিধায় হাবিবে খোদা উম্মতের পিতা হয়ে গেলেন, তাকে এবং তার স্ত্রীদেরকে অন্যদের মতো জাগতিক জগতের সম্বোধন থেকেও আলাদা করে দেয়া হয়েছে। যারাই তার স্ত্রী হবে তারাই উম্মুল মু’মিনিন বা উম্মতের জননী বলে সাব্যস্ত হয়ে যাবে, তাই বলে উম্মতের জাগতিক জগতের জন্মদাত্রী জননী বা মা নয়।
মৌলবাদী সংগঠন ‘হেফাজতে শফীর’ আলেম- মোল্লারাও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমী জননী’ উপাধি দিয়েছে; তাই বলে কি তিনি তাদের জন্মদাত্রী জননী বা মা হয়ে গেলেন? না, এটা তাদের পক্ষ থেকে একটি সম্মানসূচক উপাধি; যেহেতু তিনি নারী তাই। পুরুষ হলে বলতেন কওমী পিতা । যদিও হাবিবে খোদার স্ত্রীগণ তারই ভক্ত বা মুরিদ তথা রাছুলের নিকট বায়াত বা আনুগত্য স্বীকার করে ঈমানদার হয়েছেন তথা মুসলমান হয়েছেন, আর এ কথা চিরন্তন-শাশ্বত কালের বিষয়। কোরানে ঘোষিত পিতা বা মাতা সম্বোধনটি ধর্ম সম্পর্কের বা দ্বীনি পিতা বা মাতা তথা বাবা বা মা, ইহা জাগতিক জগতের অবশ্যই নয়। ইহা একটি বিশেষ সম্মানিত উপাধি আল্লাহর পক্ষ হতে। দ্বীনি ভাই- বোন যেমন কোরানে ঘোষণা করছে (সুরা আযহাব – ৫) তেমনি হাবিবে খোদার স্ত্রীগণকে মাতাস্বরূপ ঘোষণা (আযহাব – ৬) করে হাবিবে খোদাকে পিতা সাব্যস্ত করে দিলেন। কোরানে আরো বলা হয়েছে, “মুমিন পুরুষ এবং মুমিন নারী, তারা পরস্পর একে অপরের বন্ধু”। এ ঘোষণা ইনছানি আত্মার অধিকারী বা পরকাল প্রাপ্ত প্রত্যেকটি মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। কারন, তারা বহু হয়েও এক, ঐক্যতায় প্রতিষ্ঠিত তথা হিজবুল্লাহয় দাখেল হয়ে আছে। কাজেই, মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই একথা বলে রাছুলের স্ত্রীগণকে জাগতিক জগতের ভাবী সম্বোধন করার কোনো পথ খোলা নেই। যারা এ ধরনের জাগতিক সম্বোধন বুঝে এবং বুঝাতে চায় তারা অজ্ঞ-মূর্খ। বুঝতে হবে একটি ইহলোকের আত্মীয় অপরটি পরলোকের আত্মীয়। ইহলোকের আত্মীয় যা শুধু রক্তের সম্পর্ক, এ আত্মীয়তা আপেক্ষিক সত্য, চিরসত্য নয়, পরলোকের আত্মীয় নয়। বরং এ আত্মীয়তা পরলোকের জন্য ফেৎনাস্বরূপ, কোরানে ঘোষণা করছে।
আত্মীয়কে ফার্সী ভাষায় ‘এগানা’ ও বলে। আত্মীয় কথাটির দুটি অর্থ বা ভাবমর্ম প্রকাশ করছে একটি ইহলৌকিক অপরটি পারলৌকিক। ইহলৌকিকের আত্মীয় রক্তের সাথে জড়িত– যা নফস থেকে আগত। এ ধরনের আত্মীয়তা পারলৌকিক জগতে কোনোই কাজে আসবে না, যদি ইহজগতের গুরু ভজন না হয়ে থাকে। কারণ কর্মফলে যার যার আবাস্থল হবে – কেউ জান্নাতি কেউ জাহান্নামী। আর আত্মার আত্মীয় রুহের সাথে জড়িত বা ইনছানি আত্মার সাথে সম্পর্কিত বা জড়িত। এরা একজন পরকাল প্রাপ্ত মানুষের বা মুর্শিদের বা গুরুর আত্মার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে তারা অনুসারী বা বংশধর হয়ে যায় তথা আত্মীয় হয়ে যায় তথা ইনছানী আত্মার অধিকারী মানুষ ঐক্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে আত্মীয়তার বন্ধনের আবদ্ধ হয়ে থাকে। তারা একে অন্যের সাথে জাগতিক জগতের নয় পারলৌকিক জগতের বা পবিত্র আত্মার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আত্মীয় হয়ে যায় – এরাই হলো জান্নাতি মানুষ। এ ধরনের মানুষগুলোই একে অন্যের আত্মীয় এবং তা চিরদিনের জন্য আত্মীয় তথা তারা হলো জান্নাতি মানুষ – নফস মুতমাইন্নার অধিকারী। এরাই সত্যিকারের মুসলমান এবং পরস্পর ভাই ভাই। এরা যেহেতু মোহমুক্ত হয়ে স্বাধীন হয়ে যায়, মুক্ত মানুষ হয়ে যায় তথা মুসলমান হয়ে যায় তাই তারা পুরুষ বলে সাব্যস্ত হয়। আবার মেহমান বা আত্মীয়কে ‘অতিথি’ ও বলা হয়। অতিথি হলো সাক্ষাৎ ভগবান। আল্লাহ খোদা হলো, ঈশ্বর ভগবান হলো মানে মানুষ রুপে অবতার হলো। ‘অতিথি’ মানে যার মধ্যে কোনো তিথি নেই অর্থাৎ মোহমুক্ত একজন মানুষ বা দুনিয়া বিবর্জিত একজন চেতন মানুষ। এ আমিত্বশূণ্য বা মোহমুক্ত একজন চেতন মানুষই হলো “ওয়াজহুল্লাহ’র অধিকারী যিনি অবতার বা প্রেরিত পুরুষ। এখানে দৈহিক নারী বা দৈহিক পুরুষের কোনো কথা নেই।
যারা আমিত্বের আবরণে আবৃত হয়ে আছে বা নফস আম্মারার ফেলে আবৃত হয়ে আছে বা দুনিয়ার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছে হাকিকতের জগতে তারাই হলো নারী। এ দুনিয়াকে মায়াময় নারী হিসেবে দেখানো হয়েছে রাছুল মেরাজে যাবার সময়। “তালিবুদ্দুনিয়া মুয়ান্নাছ”। অর্থাৎ দুনিয়ার সন্ধানীগণ নারী। হযরত ইমান জয়নুল আবেদীন আলাইহিস সালামের কালাম হলো ‘দুনিয়ার সন্ধানীগণ কুকুর সদৃশ’। এ নারী পুরুষ দেহগত নয়, প্রকৃতিগত। নারীত্ব কেটে গেলেই পুরুষত্বের জাগরণ ঘটে। দেহগত নারী বা পুরুষ যার মধ্যেই পুরুষত্বের জাগরণ ঘটবে হাকিকতে সেই পুরুষ, এরা মাওলার প্রেমিক (তালিবুল মাওলা মুজাককার) । যারা মুসলমান তথা স্বাধীন বা মুক্ত মানুষ বা পরকাল প্রাপ্ত বা প্রেরিত মানুষ তারা পরস্পর ঐক্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে বা সমগ্রোত্রিয় হয়ে আছে বিধায় এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই, এরা মুমিন। ‘আল মুমিনীনা মিররাতুল মুমিনীন’ অর্থাৎ এক মুমিন অপর মুমিনের আয়না। এক মুমিন অপর মুমিনকে দেখলে সে নিজেকেই দেখলো, তাতে দৈহিক নারী পুরুষের কোনো প্রশ্ন নেই। “আত্মীয়তা ছিন্নকারী জাহান্নামী” – কোরান এবং রাছুলের কালামের মর্মভেদ এখানেই। ইহা জাগতিক জগতের আত্মীয়তা নয়। মানব সমাজের মধ্যে সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করার জন্য, পরস্পর পরস্পরের সাথে সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব ভাব, আদব-ন¤্রতা, শালীনতা রক্ষা করে চলার জন্য হাকিকতকে লক্ষ্য করে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বসবাস করা হয়, যাতে সমাজের মধ্যে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়। ইহা জাগতিক জগতের সম্পর্ক – যা আপেক্ষিক সত্য বা কিছু দিনের জন্য সত্য।
‘যারা মুর্শিদের সাথে আত্মার পবিত্র সম্পর্ক স্থাপন করেছে তথা বায়াত বা আনুগত্য স্বীকার করেছে কোরান মতে তারাই হলো ঈমানদার।’
তারা অবশ্যই সাজের মুসলমান নয়, তারা সিরাতে সুরতে ঐক্যতায় এসে বা খান্নাছমুক্ত হয়ে মুসলমান হয়েছে। এ দিকে লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে, “মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই”। এখানে নারী পুরুষকে আলাদা করে দেখানো হয় নি, বুঝানো হয়নি অর্থাৎ এরা হলো দ্বীনি ভাই-বোন। এ আত্মীয়তা চিরদিনের সম্পর্ক এবং এখানেই সুরা কাওসারের মর্মভেদ নিহিত আছে, হাকিকতে এরাই হলো কাওসারের বংশধর বা নূরের বংশধর।
রাছুলের বংশধরই চিরস্থায়ী; কাফের-মুনাফেকদের বংশ চিরস্থায়ী নয়। এ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়া জাগতিক জগতের সমস্ত আত্মীয়তার (যারা নবী বা ওলী-মুর্শিদের আনুগত্যের বায়াত গ্রহণ করে তার প্রচারিত দ্বীনকে স্বীকার করে নেয়নি) বন্ধন সেদিন ছিন্ন হয়ে যাবে। যেমন নূহ নবীর চার সন্তানের মধ্যে কেনানকে আল্লাহপাক নূহ নবীর সন্তান বলে স্বীকৃতি দেননি (সুরা হুদ ৪৫)। কারণ, সে নবীর নিকট আনুগত্যের বায়াত এবং তার প্রচারিত দ্বীনকে স্বীকার করেননি। নূহ নবীর সাথে তার পুত্র কেনানের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে, আল্লাহপাকই তা ঘোষণা করলেন। জাগতিক জগতের সবাই জানে কেনান নূহ নবীর সন্তান। বংশী হতে বংশ। যে যার নীতি আদর্শ ধারণ করেছে সে তারই বংশধর। ফার্সী ভাষায় বলা হয় ‘এগানো’, জান্নাতি মানুষ বা নফস মুতমাইন্নার অধিকারী মানুষ।
হাকিকতে ওলী-মুর্শিদের ভক্ত অনুসারীগণই হলো একমাত্র চিরন্তন-শ্বাশত আত্মীয় বা এগানা বা আর বাকী সমস্তই হলো বেগানা। এরা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হয়ে গেছে বা সিবগাতাল্লাহয় সিক্ত হয়ে আছে তথা রাছুলের ভাষায় ‘তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লাহ’ তে স্থিত হয়ে আছেন। এরাই হলো আওলাদুননবী বা ওলী মুর্শিদের বংশধর। এ জগতের আত্মীয়তার যত সম্পর্কই থাকুক হাশরের দিন কোনোই কাজে আসবে না, তাদের বাসস্থান হবে কর্ম বা আমলনামা অনুসারে (সুরা মুমতাহিনাহ ৩); যদি না একজন আল্লাহ পরিষদের বা পরকাল প্রাপ্ত বা মুক্তিপ্রাপ্ত মানুষের নিকট বায়াত গ্রহণ করে তার প্রচারিত দ্বীনকে গ্রহণ করা হয়। কর্মফল অনুসারে কেউ বাস করবে অন্ধকার কবরে, কেউ বাস করবে মাজার বা ‘রওজায়’। জাগতিক জগতের আত্মীয়তার জন্য যদি পরকাল (চৈতন্যের জগত) ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা আল্লাহর জিকির (স্মরণ বা ধ্যান) থেকে কেউ গাফেল হয়, জাহান্নাম নিশ্চিত (সুরা মুনাফেকুন-৯)। সেদিন মাতা-পিতা, ভগ্নি-ভ্রাতা একে অন্যের থেকে হারিয়ে যাবে। কাজেই ধর্ম জগতে বা কোরান মতে ওলী-মুর্শিদের খাঁটি অনুসারীগণই হলো ‘এগানা’ বাকি সবাই বেগানা, যদিও জাগতিক জগতে তারা এগানা বা আত্মীয় বলে স্বীকৃত। ইহা কিছু দিনের সত্য তথা আপেক্ষিক সত্য, চির সত্য নয়। সুতরাং (ওলী-মুর্শিদের সাথে) সম্পর্ক ছিন্নকারী মুরতাদ হয়ে যাবে তথা ধর্মত্যাগী বলে স্বীকৃত হবে, জাহান্নামে যাবে-ইহাই হাবিবে খোদার কালামের মর্ম। এ আত্মীয় জাগতিক জগতের নয়, আধ্যাত্মিক জগতের বা আত্মা জগতের। কারণ মানুষের এক নামও হলো আত্মা। আখেরাতে রক্ত সম্পর্ক বা জাগতিক জগতের আত্মীয়তার কোনো মর্যাদা নেই।
রাছুলের চাচা আবু লাহাব, আবু জাহেল কাফের, হযরত ওমরের পিতা খাত্তাব কাফের, ইবরাহিম নবীর পিতা মাতা কাফের, নুহনবীর ছেলে কাফের, কাফের ফেরাআউনের স্ত্রী আছিয়া মুসলমান ইত্যাদি শত শত উদাহরণ তুলে ধরা যায়। আবু লাহাব, আবু জাহেলের হাশর হবে কাফেরদের সঙ্গে, নূহনবীর ছেলে কেনানের হাশর হবে কাফেরদের সঙ্গে – আবার হযরত আছিয়ার হাশর হবে মূসা নবীর সাথে। নমরুদের মেয়ে ‘অরগেজার’ হাশর হবে ইবরাহিম নবীর সঙ্গে, অথচ তাদের আত্মীয়তা সম্পর্কটি হাশরের দিন কোনো কাজেই আসবে না। বাদশাহ হারুন অর রশিদ এবং তার স্ত্রী জোবায়দা খাতুনের (যিনি বিখ্যাত মজ্জুব ওলী বাহালুুল দানার নিকট হতে এক লক্ষ দিরহাম দিয়ে জান্নাতের টিকিট ক্রয় করেছিলেন, এ বাহালুল দানার শিষ্যই ছিল শিখ ধর্মের গুরু নানক) ঘটনা হতেও জানা যায়, জাগতিক জগতের আত্মীয়তা হাশরের দিন কোনো কাজেই আসবে না। বাদশাহ বিশ্বাস করেনি কিন্তু জোবায়দা খাতুন জান্নাতে অবস্থান করছে কিন্তু শত আকুতি মিনতি করেও হারুন অর রশিদ তাতে প্রবেশ করতে পারেননি, স্ত্রীর নিকট যেতে পারেননি। কারণ, তার নিকট জান্নাতের টিকিট নেই। এরপরই ঘুম থেকে জেগে বাহালুুল দানার সন্ধানে গেলেন। আর টিকিট নেই বলে তাকে জানিয়ে দেয়া হলো। কাজেই একটি মেজাজি ‘এগানা’ বা আত্মীয় আর অপরটি হাকিকি এগানা বা আত্মীয়। এজন্যই জাহেরী কাবা ঘর তাওয়াফ করার সময় নারী পুরুষের কোনো প্রভেদ নেই; এক সাথেই তাওয়াফ করা হয়। ইশারা দেয়া হয়েছে আল্লাহর নিকট জাগতিক জগতের ছেলে-মেয়ের কোনো প্রভেদ নেই। রাছুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামের সময়ও তাই ছিল।
ইতিহাস খুঁজে দেখুন ইসলামের বিধি বিধান চৌদ্দ আনাই বিকৃত করা হয়েছে। তেমনি হাকিকি কাবা-কেবলা মুর্শিদের জিয়ারতের ক্ষেত্রেও নারী পুরুষ কোনো প্রভেদ নেই। আল্লাহ দেখবেন আত্মার আত্মীয়, জাগতিক জগতের আত্মীয় অবশ্যই নয়। আর হাকিকি কাবা-কেবলা হলো পরকাল প্রাপ্ত মানুষ বা ইনছানি আত্মার অধিকারী মানুষ বা প্রেরিত পুরুষগণ – যাকে মুর্শিদ কেবলা বলে সম্বোধন করা হয়, তারা বহু হয়েও এক। কোরানের ঘোষণা হলো, “হাশরের দিন প্রত্যেককে তার ইমামের সাথে ডাকা হবে”। এ ইমামই হলো দ্বীনি পিতা, বাবা বা আব্বা। তার অনুসারীদের হাশর তার সাথেই হবে। তারা বহু হয়েও এক এবং হিজবুল্লাহ। তাদের নিকট ও নারী পুরুষ সবাই জিয়ারতের জন্য আগমন করছে। এখানে কোনো প্রভেদ নেই, সবাই সমান। যেহেতু আদব, ন¤্রতা, ভদ্রতার সাথে সবাই অবস্থান করে, প্রত্যেকের ইজ্জত সম্মানের দিকে সতর্ক দৃষ্টি আছে বা রাখা হচ্ছে এবং এ অবস্থায় মুর্শিদ কেবলাকে জিয়ারতে তাওয়াফ করছে। কাজেই তাদের এই শালীনতা, ভদ্রতাই হলো পর্দা। মেজাজি কাবা ঘরেও (যা আরবে অবস্থিত) নারী-পুরুষ কেউ কারো দিকে দৃষ্টি না দিয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করছে আর বলছে ‘আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ – হে আল্লাহ, আমি তোমার দরবারে হাজির। যেখানে ন¤্রতা-ভদ্রতা নেই, শালীনতা নেই, ইজ্জত-সম্মান রক্ষা হয় না, সেখানে পর্দাও নেই; হাজারো কাপড়ে সমস্ত শরীর আবৃত থাকলেও পর্দা নেই। এ জন্যই আফগানিস্তানে এক মেয়ে লোহার ব্রা এবং অন্তর্বাস পড়ে (স্বীয় জামার ওপরেই পড়েছে) রাস্তায় নেমে আসলো এবং বুঝালো যে, “আমরা তো পর্দার ভিতর থেকেও ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করতে পারছি না, তাহলে কি লোহার পোশাক পড়ে থাকতে হবে?” এ ইজ্জত-সম্মান, নারী নির্যাতন কারা করছে?
শুনে আশ্চর্য হবেন যারা ইসলামী বিধি বিধান বা ইসলামী সমাজ গঠন করার জন্য এবং নারীদেরকে পর্দার ভিতর থাকার জন্য জেহাদের না ভয়ংকর সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদীতে রতো হয়ে মানুষ হত্যা করে চলেছে সেই তালেবানরাই শত শত মেয়েদের ইজ্জত সম্মান লুটে নিচ্ছে (আফগানিস্তানের নারী)। আই এস বা আল কায়দার জঙ্গিরা তার চেয়ে ভয়ংকর পথে ধাবিত হচ্ছে। বিশ থেকে পঁচিশ জন পুরুষের অধীনে একজন মেয়েকে ব্যবহার করছে। আই এসের পুরুষ জঙ্গি সন্ত্রাসীদের যৌনদাসী হতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে দুইশত তিয়াত্তর জন মেয়েকে শিরোচ্ছেদ করা হয়েছে। আফ্রিকা ‘বোকো হারাম’ জঙ্গি সংগঠন স্কুল হতে তেরো চৌদ্দ বৎসরের একশত চুয়াত্তর জন মেয়েকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করছে। বৎসরখানেক পরে কয়েকজন মেয়ে কোলে ছোট শিশু নিয়ে ফিরে আসে। আর মাদ্রাসার কথা কি বলবো, তা সবাই জানেন [যেহেতু ধর্ম শিক্ষালয় (?) বলা হচ্ছে, তাই সামান্য তুলে ধরলাম]। তাছাড়া বিভিন্ন ভাবেও মেয়েরা নির্যাতিত হচ্ছে। মনের পর্দা ঠিক না থাকলে কাপড়ের পর্দায় কতটুকু রক্ষা পাবে তা বোধসম্পন্ন লোকের পক্ষে বোঝা কোনো দুবোর্ধ বিষয় নয়, যদিও পোষাকের শালীনতাও অবশ্যই স্বীকার্য। মনের পশুত্বকে কোরবান করতে পারলে নারী-পুরুষ সবাই বাঁচে, বাঁচে সমাজ – প্রতিষ্ঠিত হয় শান্তি, যেখানে আছে ইসলাম।
বংশী হতে বংশ, যে যার নীতি আদর্শ গ্রহণ করে হাকিকতে সে তারই বংশধর। জাগতিক জগতের আত্মীয় নফসের সাথে সম্পর্ক আর হাকিকি আত্মীয় হলো রুহের সাথে সম্পর্ক আর রুহ হলো প্রভু সত্ত্বা। এরাই হলো আল্লাহর বান্দা, হাবিবে খোদার উম্মত।
সুতরাং পীর-মুর্শিদ বা গুরুকে ‘বাবা, বা’জান, দয়াল বা হুজুর বলা ধর্ম বিধানে একটি উৎকৃষ্ট বা পবিত্র সম্মানিত সম্বোধন। আবার মুর্শিদই হলো মূলতঃ ভক্তের বা ঈমানদারগণের ‘মাওলা’ (প্রভু)। অনেক ওলী-মুর্শিদকেই তাদের ভক্ত – অনুসারীগণ ‘মাওলানা’ (আমাদের প্রভু) বলে সম্বোধন করেছেন। যেমন, জালালদ্দিন রুমী তার মুর্শিদকে মাওলানা বলে সম্বোধন করেছেন। এ মাওলানা মাদ্রাসার উপাধি নয়, আধ্যাত্মিক জগতের বিষয়। মাদ্রাসার শিক্ষায় কখনো ‘মাওলানা হতে পারবে না, হতে পারবে ইলমে সীনা বা ইলমে ইলাহীর অধিকারী হলে। যারা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান এনেছে একমাত্র তারাই হলো ঈমানদার এবং এ সম্বোধনগুলো একমাত্র ঈমানদারগণের জন্যই। যারা অজ্ঞ-মূর্খ এবং পিতৃধর্মের দোহাই দিয়ে ঈমানের দাবিদার বা ঈমানদার সেজেছে তাদের জন্য নয়। আর এ ধরণের ঈমানকে কোরানে ঈমানদার বলে স্বীকৃতি দেয়া হয় নি।
কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
মহান মুর্শিদ কেবলা, ঝাউগড়া বেনজীরিয়া চিশতীয়া দরবার শরীফ,
আড়াইহাজার, নারায়নগঞ্জ

