মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ২য় সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত
প্রবন্ধ – যাদের কোনো ধর্ম নাই
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
“মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব” এ কথাটির মধ্যে কোনো জাত-ভেদ নেই, সমস্ত মানুষই এ কথার লক্ষ্য। এখানে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ইত্যাদি প্রভেদ করা মূর্খতার পরিচয়। কোরানুল করিমেও সমস্ত মানুষকে এক এবং এক নফস হতেই (নফসে ওয়াহাদাতান) সৃষ্টি বলে ঘোষণা করছে। কেবল স্বভাবের কর্মানুসারে মানুষের শ্রেণিভাগ নির্ণয় হয় এবং সে মতে ধর্ম ও অধর্মের পার্থক্য সূচিত হয়। আমাদের এ পৃথিবী নামক গ্রহটিতে বহু ধর্ম ও মতবাদ প্রচলিত আছে। তার মধ্যে ইসলাম, খ্রিষ্টান, ইহুদী-নাছারা, হিন্দু, বৌদ্ধ ইত্যাদি ধর্মের অনুসারীগণ সংখ্যাধিক্য বলে সাব্যস্ত আছে। যতো ধর্মই আছে, সংখ্যায় কম বা বেশী, কোনো ধর্মের মহাপুরুষগণ এবং তাদের আনিত কিতাবাদিতে অন্যায়, অত্যাচার, জোর-জুলুম, মিথ্যা, প্রবঞ্চনা ইত্যাদি স্বীকার করেনি বা সমর্থন দেয়নি। প্রতিটি ধর্মে মানুষ ও অন্যান্য জীবের প্রতি মঙ্গল করা ও মঙ্গল কামনা করার কথাই বিধৃত আছে, অন্যথায় তা ধর্ম ও ধর্মশাস্ত্র হতে পারে না। অন্যায়, অত্যাচার, জোর- জুলুম, উশৃঙ্খল কর্মকান্ডকে প্রতিহত করে ধর্মভাব এবং ¯্রষ্টার ধর্মরাজ্য বিস্তারের কথা আছে। ধর্মরাজ্য বলতে জোর করে অন্য দেশ দখল করে তাতে স্বীয় ধর্মের আইন প্রয়োগ করা নয়। তাতে দেশ দখল করা যায় সহজে কিন্তু ধর্ম প্রচার সহজে হয় না। কঠিন হলেও কথাটি সত্য যে, হযরত ওমরের রাজ্য বিজয় এবং পরবর্তীতে তা আবার হাত ছাড়া হওয়ার ইতিহাসটি দেখে নিলেই হবে।
মূলতঃ ধর্ম ত্যাগ কথাটিই অবান্তর। কারণ, মানব-ধর্ম একটিই, তার দুই হয় না।
মানবাত্মার মানব ধর্মে যারা আছে তারাই হলো হিজবুল্লাহ, মুমিন, তাদের মধ্যে ঐক্যতা, প্রেম-মহব্বত সৃষ্টি হয়, যা নামাজ, রোজা এবং সদকার চেয়েও উত্তম বলে রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম জানিয়ে দিয়েছেন। আর হায়ানী আত্মার বা জীবাত্মার জীব প্রাণী মানুষের ধর্ম বহু। এরা বহু-ই থেকে যায় আর বহু মতবাদে আক্রান্ত হয়ে এরা হিজবুশ্ শায়াতিনের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়, তারা যতো রকমের উপাসনা বা নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদিই করুক না কেনো। নামাজ, রোজা (আনুষ্ঠানিক) করা এক জিনিস আর মানুষ হওয়া আরেক জিনিস।
‘নামাজের মূল মাহাত্ম্য মনের আমিত্বটিকে দূর করে দেয়া।’
কোরানের নির্দেশিত এ নামাজ কেউ স্বীয় জীবনে কায়েম করে না, কেউ করলে তথাকথিত ধর্মান্ধ নামাজিরা তাদেরকে বেনামাজি হিসেবেই দেখে।’
আসলে তথাকথিত নামাজিরাই যে বে-নামাজি, এ কথা তথাকথিত মুসলিম সমাজ মোটেও বুঝে না, বুঝতেও চায় না এবং বুঝতে দেয়ও না। যারা মানবাত্মার মানব-ধর্ম (যা সব মানুষের একমাত্র মুক্তির বিধান) তা আদায় করে, তারা অবশ্যই কোরানিক ছালাত আদায় করছে। ধর্মের নামে সন্ত্রাস, মানুষ হত্যা, প্রতারণা করা হায়ানী আত্মার বা পশু আত্মার কাজ। এ ধরনের লোকগুলো সুরতে মানুষ আর স্বভাবে হয় জানোয়ার। ‘যার নিজের বুকে মানবাত্মার রঙের আলপনা ফুটেনি, সে চিত্রে রঙ ফুটাবে কেমন করে?’ এমনি ভাবে অন্যান্য ধর্ম এবং সে ধর্মের অন্ধ-মৌলবাদী ধার্মিকদের বেলায়ও তাই হয়েছে। আসলে এ ধরনের মানসিকতার লোকজন হলো মানসিক বিকারগ্রস্ত। কারণ, এরা হায়ানী আত্মার গুণ-খাছিয়তে আবৃত হয়ে আছে। এরা ধর্ম কি জিনিস তা বুঝেনি এবং তারা ধার্মিকও নয়। যদিও বাহ্যিকভাবে এরা অনেক উপাসনা করে থাকে এবং বেশ-ভূষণেও ধার্মিক সেজেছে। আসলে এরা আলমে নাছুতের জীবমানুষ। এরা দীলে পশুত্বের-রাজ্য কায়েম করে রেখেছে বিধায় তারা ধর্মের নামে অন্যায়-অত্যাচার, জোর-জুলুম, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ফেলে, মানুষ হত্যা করে চলে। ধর্মরাজ্য বিস্তার মানে মানুষকে দয়া, মায়া, প্রেম, ভালোবাসা দান করা তথা সৎস্বভাব যোগে চৈতন্য ভাব জাগ্রত করা তথা মানবতা বা ইনছানিয়াত প্রতিষ্ঠা করা এবং স্রষ্টা বা খোদাকে চেনা। তাহলে যে সমস্ত মুসলমান বা হিন্দু বা ইহুদী-নাছারা বা খ্রিষ্টান, বৌদ্ধগণ একে অন্যকে ব্যক্তি স্বার্থের জন্য বা দলীয় স্বার্থের বা ধর্মের দোহাই দিয়ে জোর, জুলুম নির্যাতন করছে, হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করছে, পুড়িয়ে মারছে, একে অন্যের মসজিদ, মন্দির, গির্জা, খানকাহ ইত্যাদি ভেঙ্গে ফেলছে তারা কোন ধর্মের বাণী অনুসারে এ কাজ করছে? কোনো ধর্মেই এ সমস্ত পশুত্বের আচরণ সমর্থন করেনি। যদিও তথাকথিত হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান, ইহুদী, নাছারাগণ ধর্মানুসারী বলে খ্যাত। ইহা তাদের ছদ্মাবরণ, আসলে এদের কোনো ধর্ম নেই। তারা ধর্মের বোরখা পড়ে সমাজে বিরাজ করে এবং ধর্ম বলতে কিছুই বুঝেনি। এরা ধর্মশাস্ত্রকে আক্ষরিক অর্থে বিশ্লেষণ করে (যা কোরানে নিষেধ করা হয়েছে- সুরা বনী ইসরাঈল দ্রঃ) কূপমন্ডুকতার পরিচয় দিচ্ছে, বিশ্বজনীন মানবধর্ম ইসলামকে চারি দেয়ালে আবদ্ধ করে রেখেছে এবং মানুষকে পথভ্রষ্ট করে চলেছে। তারা হায়ানী আত্মার অধিকারী দু’পাওয়ালা ভয়ংকর নরপশু। ধর্ম বলতে তাদের বুঝ হলো শুধু বাহ্যিক কিছুু আনুষ্ঠানিক ক্রিয়া কর্ম তথা কপালে তিলক ফোঁটা ধারণ, টিকলি, গলে পৈতা, মৃন্ময় মূর্তির পূজা, কিছু মন্ত্র জপ করা, দাঁড়ি, টুপী, লম্বা জুব্বা, শুধু আনুষ্ঠানিক নামাজ, রোজা, তাসবিহ জপ, সপ্তাহে একবার গির্জায় বা উপাসনালয়ে গিয়ে হাজিরা দেয়া, জোর করে বা অর্থের লোভ দেখিয়ে বা সন্ত্রাসের মাধ্যমে ধর্মান্তরিত করা ইত্যাদি। সাথে যার যার ধর্মের সাইনবোর্ড উঁচু করে তুলে ধরে প্রত্যেকেই একে অন্যের ধর্মকে, ধার্মিককে নিন্দা করছে, আক্রমণ করছে, বাড়িঘর ভেঙ্গে দিচ্ছে, পুড়িয়ে দিচ্ছে, ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করছে, বোমাবাজি বা গ্রেনেড হামলা করছে, কাফের-ফাসেক বা বিধর্মী বলে গালাগালি করছে- এই হলো তথাকথিত বকধার্মীকদের ধর্মের এবং ধার্মিকতার স্বরূপ। এরা হায়ানী আত্মার অধিকারী নিছক জীব মানুষ মানে বাহিরে মানুষ ভিতরে পশুত্বের সিরাত। ধর্মের ছদ্মাবরণে বাস করতে এরাই পছন্দ করে বেশী। কারন, ভিতরের দৈন্যতা ঢেকে রাখার জন্যই সাজের এতো ঘটা তাদের।
এরা ধর্মশাস্ত্রকে আক্ষরিক অর্থে বিশ্লেষণ করে শত মতভেদ সৃষ্টি করছে এবং সে মতভেদের বেড়াজালে নিজেরা তো আবদ্ধ হচ্ছেই এবং সাধারণ মানুষগুলোকেও মতভেদের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে পথভ্রষ্ট করছে। তাতে যখন তথাকথিত ধার্মিকদের ভিতরে লালিত-পালিত পশুত্বটি জাগ্রত হয়ে উঠে তখন অন্য জাতিকে ধর্মের দোহাই দিয়ে নির্লজ্জভাবে আক্রমন করা বা হত্যা করা, মেয়েদেরকে ধর্ষণ করা তাদের নিকট জায়েজ হয়ে যায়। ধর্মের দোহাই দিয়ে আমাদের দেশে এমনি একটি জঘন্য কাজ করেছে জামায়াতি নেতা মৌলবী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং অন্যান্য মৌলবী সাহেবগণও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। বহু মেয়েকে ধর্ষণের জন্য মৌলবী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাপ্লাই দিয়েছিলো পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন আজিজের কাছে। এভাবে এদেশের মেয়েদেরকে পাকিস্তানীদের দ্বারা ধর্ষণ করিয়ে, নির্যাতন করিয়ে এবং নিজেরাও নির্যাতন করে সাঈদী গং-রা অনেক ছোয়াব(!) অর্জন করেছিলো! অন্যান্য সমমনা মৌলবাদীগণও তাই করেছিলো। এরা এদেশের মেয়েদেরকে গণিমতের মাল হিসেবে গণ্য করে ধর্ষণ করেছিলো। যে সাঈদীর ধর্মই হলো অলি-আউলিয়াদের বিরোধীতা করা, দ্বীন-এ-মুহাম্মদী বা দ্বীন-ই-মিল্লাতের বিরোধীতা করা, ইয়াজিদের ধর্মকে বাস্তবায়ন করা, সে কি করে একজন ভালো মুসলমান হতে পারে? অন্ধ-বধির মূর্খরা এ সাঈদীর ধর্মকথার, ওয়াজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে আছে। সামান্যতম হুঁশ-আক্কেল থাকলে এ ধরনের গর্ধপনার পরিচয় দিতো না।
‘জ্ঞানীর কাছে জেনে নিলে একটি বিষয় পরিষ্কার হবে যে, নবুয়তে যাদেরকে নবী-রাছুল বলা হয়, বেলায়েতে তাদেরকে অলি-আউলিয়া বলা হয়। ’
নবী-রাছুলদের বিরোধীতা করতো কাফের-মুনাফেকরা, আর এখন অলি-আউলিয়া বা পীর-মুর্শিদের বিরোধীতা করে জঙ্গি মৌলবাদী মোল্লা-মৌলবীরা। সিরাতে আবু জাহেল, আবু লাহাব, মুয়াবিয়া, ইয়াজিদের ছড়াছড়ি, বিশেষ করে মাদ্রাসাগুলোতে ইয়াজিদের অনুসারী চৌদ্দআনা। নবী রাছুলদের বিরোধীতা যেমন কুফরী অলি আউলিয়াদের বিরোধীতা করাও তেমনি কুফরী। আবু জাহেল, আবু লাহাব যেমন রাছুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের বিরোধীতা করেছে নিজেদেরকে সত্যপথের পথিক জেনে, তেমনি অন্ধ-বধির মোল্লারাও অলি-আউলিয়া বা পীর-মুর্শিদের বিরোধীতা করছে নিজেদেরকে সঠিক মনে করে। আসলে এরা যে কতো ধর্মান্ধ, অজ্ঞ-মূর্খ তা যদি কিঞ্চিৎ জানতো, লজ্জায় গর্তে প্রবেশ করতো। জ্ঞানীদের বিরোধীতা করাই তাদের ধর্ম। কাজেই অলি-আউলিয়াদের বিরোধীতা করে সাঈদী গং-রা কুফরী করছে, আর কুফরী-তে কায়েম যারা তারা কাফের হয়ে যায়। এখনো তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে কোরানের বয়ান শোনায় তাদের স্বজাতি ভাইদেরকে এবং দাঁড়ী-টুপি, পাগড়ী পড়ে ধর্মের ওয়াজ নামক আওয়াজ তুলে নিজেদেরকে পুত-পবিত্র বলে নাকিকান্নার সুর বাজিয়ে বেড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষ এদেরকে ধার্মিক বলেই মনে করে। করবে না কেনো? যে বেশ ধরেছে, কার বুকের এমন পাটা আছে যে, তাদেরকে ধার্মিক বলবে না? আর তারাও জানে যে, সাধারন মানুষ কাজের চেয়ে সাজের মর্যাদাই বেশী দেয়। তাই ধর্ম এবং ধার্মিকের বেশ ধারণ করা হলো তাদের কুকীর্তি ঢাকার সুন্দর একটি হাতিয়ার।
একটি দাঁড়ীর মধ্যে সত্তরজন ফেরেশতা থাকে- এটা মোল্লাদেরই বয়ান। কিন্তু চুল, পশম বা মোচের মধ্যে কোনো ফেরেশতা থাকে না তার কারনটি বুঝা গেলো না ! তবে আবু জাহেল এবং আবু লাহাবেরও লম্বা দাঁড়ী ছিলো এবং অন্যান্য ধর্মের বহু লোকদের মুখেও দাঁড়ী আছে, সেই দাঁড়িতেও ফেরেশতা আছে কিনা বয়ানে তার কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। ফরিদপুরের বাচ্চু রাজাকার (মাওলানা আবুল কালাম আজাদ) টিভি চ্যানেলে কোরানের অনেক বয়ান মানুষকে শুনিয়েছে। ১৯৭১ সালে সে যে সমস্ত কুকীর্তি করেছে তার জন্য বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে বিধায় সে গোপনে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। কারন, তার অপরাধের শাস্তি কি হবে নিশ্চয়ই সে বুঝতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে তাঁর ফাঁসির রায় হয়েছে। গোলাম আযমের গোলমালে পড়ে জামায়াতের হাতে বস্ত্রহরণ হয়েছিলো সাঈদী সাহেবের (মাসিক মানবতা- ২৯ পৃষ্ঠা)। তথাকথিত জামায়েতে মওদুদীর গঠিত আল বদর, আল শামস্ ইত্যাদি নতুন সাইনবোর্ডওয়ালাদের নির্লজ্জ, জঘণ্য ঘটনাবলীর ইতিহাস দেখলে গা শিহরিয়া উঠে, যা এক কলঙ্কজনক ইতিহাস।
শয়তান যে ধর্মের ছদ্মাবরণেই জঘন্য কাজ করে ফিরে অধ্যাপক গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা ইউসুফ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী গং-দের ইতিহাসটি দেখলেই তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। বাংলার স্বাধীনতার বিরোধীতা করে এরা ইয়াহিয়া খান এবং টিক্কা খানের সাথে গোপনে বৈঠকে মিলিত হয়ে এ দেশে গণহত্যা, নারী ধর্ষণের মতো ছোয়াবের(!) কাজগুলো করেছিলো। এখন সে ইতিহাস বিকৃত করে নব্য মুনাফেক জামায়াতে মওদুদীদের কাছে নির্দোষীর করুণ বয়ান শুনানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধে সাঈদীরও ফাঁসির রায় হয়েছে (পরবর্তীতে আপিলের রায়ে আমৃত্যু সাজা দেয়া হয়েছে)। এ ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে জামায়াতিরা হত্যা, লুটপাট, হিন্দুদের প্রায় দেড় হাজার ঘরবাড়ি পুড়ে দিয়েছে এবং তাদের অনেক মন্দির ভেঙ্গে ফেলেছে (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৫ই মার্চ/২০১৩) এবং তাতে অনেক ছোয়াবও কামিয়েছে! তাতেও কুল না পেয়ে শেষে তাকে বাঁচানোর কৌশল হিসেবে জামায়াতি এবং অন্যান্য ধর্মান্ধরা সাঈদীকে চাঁদে দেখেছে বলে গুজব ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের ধর্মানুভুতিতে আঘাত করার এক জঘন্য প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে এবং ধর্মের নামে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড-কে আরো উস্কানী দিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে বুঝাতেও পেরেছে যে সাঈদী অনেক ধার্মিক এবং ভালো মৌলবী। যদিও এ ধরনের ধর্মের নামে প্রতারণা করা তাদের নতুন কিছু নয়।
আবার জামায়াতের ভাড়াটিয়া সংগঠন হিসেবে ডিগবাজি দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে “হেফাজতে ইসলাম” নামে আরো একটি ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠন, যা তাদেরই অর্থে পরিচালিত হচ্ছে। নতুন নামে এ দলটির পিছনে ১০ কোটি বা আরো বেশী টাকা খরচ করেছে জামায়াতে মওদুদীরা (যুগান্তর- ১৯ মার্চ/২০১৩)। পত্রিকা হতে জানা যায় তাদের সমাবেশ করতে ৮৫ কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে। পরে আবার হাতে তসবিহ, জায়নামাজ নিয়ে (মোল্লা শফির নির্দেশে) ৫ই মে/২০১৩ এ হেফাজতিরা এবং অন্যান্য মৌলবাদীরা যে ভয়ংকর তান্ডব চালিয়েছিলো তা আফ্রিকার বন্যপশুকেও হার মানিয়েছিলো। কি সুন্দর প্রতারণা- হাতে তসবিহ আর জায়নামাজ। আর তাদের চেহারার মাঝেও ফুটে উঠেছিলো আদিম হিংস্রতার চিহ্ন। কওমী মাদ্রাসার লোকগুলো আসলেই আদিম জাতি, আধারের জীব, অথচ বাস করছে আধুনিক যুগে। ইয়াজিদ মোল্লা যেমন তথাকথিত মুসলমানদেরকে বুঝাতে পেরেছিলো যে, ইয়াজিদ সত্য পথে আছে এবং সে সাচ্চা মুসলমান, অনেক নামাজ রোজা করে, ইমামতি করে, হযরত ইমাম হুসাইন আলায়হিস সালামই ভুল পথে আছে এবং তাকে হত্যা করা জায়েজ। এ ফতোয়াই ইয়াজিদের আলেম-মোল্লারা দিয়েছিলো- যে ফতোয়া শীমার তার পাগড়ীর নিচে নিয়েই ইমাম হুসাইনকে হত্যা করেছিলো।
দিল্লীর বাদশাহ মহামতি আকবরও ছিলেন তার পিতা-পিতামহের মতোই আদর্শবাদী। তিনি শিয়া-সুন্নী কোনো মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি জানতেন এসব মতবাদ, ফেরকাবাজি-ফতোয়াবাজি ইসলামকে দুর্বল করেছে। সম্রাট আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহীর সঠিক ইতিহাস আজো আমাদের সমাজে পৌঁছেনি ধর্মান্ধ আলেম-মোল্লাদের কারনে। এ ধরাধামে আমরা সবাই মানুষ- এ বিশ্বাসই তার ছিলো, বিধায় তিনি মৌলবাদের উর্দ্ধে ছিলেন। কিন্তু এক দল আলেম-মোল্লারা তার এ নীতির বিরোধীতা করেছে। বিশেষ করে শায়েখ আহামদ শেরহিন্দি সাহেবই এ সমস্তের নাটের গুরু ছিলেন, এজন্য তিনি জেলও খেটেছেন। তিনি জাতে বাহাত নামক এক কল্পিত স্থানে আল্লাহকে রাখলেন আর বললেন, সৃষ্টিতে ¯্রষ্টা নেই। আল্লাহ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে আর সমস্ত সৃষ্টি হলো আল্লাহরই প্রতিবিম্ব। এ ধরনের কল্পিত স্থানে আল্লাহ সাব্যস্ত করাই যে এক প্রকার মূর্তি পূজা তা অধিকাংশ আলেম সমাজ বুঝেনি। তিনি জিল্লিয়াতবাদ বা প্রতিবিম্ববাদ প্রবর্তন করে স্বীয় পীরের নীতিরও বিরোধীতা করলেন। যাক, ঠিক তেমনি আমাদের দেশের ওহাবী জঙ্গি মৌলবাদীরাও সাধারণ মানুষকে বুঝাতে পেরেছে যে, তারাই খাঁটি বা সাচ্চা মুসলমান।
“ইয়াজিদ ধ্বংশ হলেও তার পেতাত্মা সহস্র-লক্ষ ভাগে এখন বিস্তার লাভ করে, জঙ্গি ওহাবী মৌলবাদী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আছে ধর্মের ছদ্মাবরণে।”
যুগে যুগে এরা যে কতো রকমের বাহারী চটকদার নামের আশ্রয় নিয়ে সউদিদের লেবাছের আবরণে থেকে তাদের কুৎসিত মতবাদগুলো প্রচার করে চলেছে এবং মাদ্রাসায় সরলমনা শিশুদেরকে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে তা ইয়ত্তা নেই। যদিও এই অজ্ঞ-মূর্খরা সাধারণ মানুষকে বুঝাতে পেরেছে যে, ইহাই ইসলাম ধর্মের শিক্ষা। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম এদের বিষয়েই মাওলা আলী ইবনে আবি তালিব আলায়হিস সালামের নিকট ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে, “এরা ধর্মীয় ছদ্মাবরণে এবং নিরাপত্তা সহকারেই বাস করবে”। ইমাম গাযযালী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি কে এক লোক বললো, হুজুর আমাকে একটি ফতোয়া লিখে দিন। ইমাম গাযযালী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি ঐ লোকটিকে বললেন ঃ তুমি কি আমাকে সেই বাতিলকৃত দিনগুলোর দিকে ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছ ? আমি যতদিন মাদ্রাসায় পড়েছি এবং পড়িয়েছি সেই সময়টিই আমার বরবাদ হয়ে গেছে। ঠিক তেমনি মাওলানা রুমী, হাফেজ সিরাজি, মাওলানা শরাফুদ্দিন (বু-আলী কলন্দর) সহ আরো বহু সত্যপথ প্রাপ্তদের বেলায়ও তাই ঘটেছে। যখনই কেউ সত্য সঠিক জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছেন, তখনই এ ধরনের চরমসত্য কথাটি তাঁরা প্রকাশ করেছেন। আর তখনই অজ্ঞ-মূর্খরা তাদের বিরোধীতা করেছে। যারা নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের বিরুদ্ধে কটুক্তি করেছে তারা হলো মানসিক বিকারগ্রস্থ লোক এবং তাদের শাস্তি প্রদান করার সুন্দর পথ থাকা সত্ত্বেও ওহাবী আলেম- মোল্লারা যে পথ বেঁছে নিয়েছে তা নাস্তিকদের চেয়েও বেশী অসুস্থতার প্রমাণ দিয়েছে, এ বিষয়ে রাজ-সরকারও কম ভূল করেনি। যার যার স্বার্থোদ্ধারের জন্য যুগে যুগে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে এবং বিকৃত করা হয়েছে মানবধর্ম ইসলামকে। সবচেয়ে বেশী বিকৃত করা হয়েছে ধর্মের নামে রাজনৈতিক (?) দলের দ্বারা। তাছাড়া ঐ সমস্ত আলেম-মোল্লাদের লেখার মাঝেও তো নবীজিকে এবং অলি-আউলিয়াদেরকে খাটো করার বা অপমান করার জন্য বহু কথাবার্তা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষ জানেই না। এ সমস্ত ওহাবী মোল্লাদের শাস্তি দিবে কে ? তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন কোথায় ? তাদের ইতিহাস জানার জন্য পড়ুন “পরহেজগারীর আড়ালে ওরা কারা !!!” বইটি। তাদের মাঝে জাগ্রত আছে হায়ানী আত্মা, তা তাদের ভয়ংকর হিংস্রতা দেখেই প্রমাণ হচ্ছে। রাজনীতির নামে হিংস্রতার নীতি দেশের এবং ধর্মের ক্ষতি ব্যতীত আর কিছুই হচ্ছে না। হায়ানী আত্মার কাজই হলো ধ্বংশ করা, অন্যায়-অত্যাচার, জোর-জুলুম করা আর ইনছানি আত্মার কাজ হলো রক্ষা করা। হায়ানী আত্মার অধিকারী মানুষই হলো জারজ, তার কোনো পিতৃপরিচয় নেই। তাদের আত্মা বদল হয়ে গেছে। মানুষের হলো ইনছানি আত্মা-যা মানুষকে, সৃষ্টিকে রক্ষা করে, দয়া-মায়া, প্রেম-ভালোবাসা, ঐক্যতা, ভ্রাতৃত্বভাব বজায় রেখে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করে। ইহা চিরন্তন-শাশ্বত পবিত্রতম আত্মা মানে রুহুলুল্লাহ। এ আত্মার কোনো জাত-ভেদ নেই বিধায় এ আত্মার অধিকারী মানুষই হলো খাঁটি মুসলমান, খাঁটি হিন্দু, খাঁটি খ্রিষ্টান ইত্যাদি। এ রুহুলুল্লাহ-ই হলো ইসলাম- যা আল্লাহর হেফাজতে আছে। মানুষের সাধ্য নেই তাকে বিকৃত করা বা পরিবর্তন-রূপান্তর করা। ঈমানের মাধ্যমে সেই ইসলামকে লাভ করতে হয়।
‘বিশ্বাস-ভক্তি-প্রেম এ তিন তত্ত্বে ইসলামের ভিত্তি।’
এ তিন তত্ত্বের প্রয়োগক্ষেত্র হলো মুর্শিদ। সমস্ত নবী-রাছুল, অলি-আউলিয়াগণই হলেন মুর্শিদ। যারা চিনে তারা অবশ্যই জানে আল্লাহ-ই হলেন মুর্শিদ। আঠার হাজার মাখলুকাতের মধ্যে একমাত্র জিন- ইনছানের জন্য ইবাদতের নির্দেশ। সে ইবাদত হলো নিজকে চেনা মানে খোদাকে চেনা এবং তাঁর পাক গুণ-খাছিয়তে ভূষিত হয়ে যাওয়া। মানুষ সাধনার বলে বা ইবাদতের মাধ্যমে ইসলামকে ধারণ করে মুসলমান হয়ে যায়। তার জন্য পাঁচটি বিধান কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্জ এবং যাকাত রয়েছে- যার ভিত্তি হলো পাক-পাঞ্জাতন। ঐ পাক-পাঞ্জাতন-ই হাকিকতে পাঞ্জেগানা। এ কথা তথাকথিত মুসলিম-সমাজ ভুলে আছে মুনাফেক মুয়াবিয়া, ইয়াজিদ মোল্লা এবং তার অনুসারী মোল্লা-মৌলবীদের কারনে। পাঁচটি বিধানের মাধ্যমেই ইসলামে পৌঁছা যায়। রুহ্ কুদসির ‘মেহের’ গুণ-খাছিয়ত হতে তার প্রকাশ। কোরান এবং ইসলাম রয়েছে আল্লাহর হেফাজতে- এটা যারা বুঝে না তারাই ধর্মের নামে, ধর্মের ছদ্মাবরণে অন্যায়-অত্যাচার, জোর- জুলুম, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, অলি-আউলিয়াগণের খানকাহ বা দরবার, মাজার শরীফে আক্রমণ করা, মানুষ হত্যা ইত্যাদি জঘণ্য ক্রিয়া-কর্মে রতো হয়ে পড়ে। এ সমস্ত ধর্মান্ধ অজ্ঞ-মূর্খরা কোরান কি জিনিস তা চিনেইনি। কোরান নাজিলের শেষ পর্যায় হলো আলমে জবরুত। এখানেই আল্লাহর নিঃশব্দ কালাম (আল্লাহর কালামের কোনো ভাষা নেই, কারন তা নিঃশব্দ) শব্দায়িত হচ্ছে এবং আলমে লাহুতের মাধ্যমে আবার আসমানে পৌঁছে যাচ্ছে। আল্লাহর বান্দাগণ আলমে জবরুত হতে আল্লাহর কালাম কোরান শ্রবণ করে সঠিক জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়ে ইসলামে দাখেল হয়ে মুক্তির জগতে অধিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে। যিনিই ইসলামে দাখেল হবেন তিনিই আখেরাতে মুক্তি লাভ করবেন। আল ইসলামু দ্বীনুল ফিতরাত, ইসলাম হলো স্বভাব ধর্ম। আলো বলা হয়েছে, তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লাহ, বা সিবগাতাল্লাহ। আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হয়ে যাওয়া বা আল্লাহর গুণে ভূষিত হওয়া মানেই হলো ইসলামে দাখেল হওয়া।
হাকিকতে লক্ষ্য করলে জানা যায় ইসলাম আঠার হাজার মাখলুকের গুণ-খাছিয়তের বাহিরে অবস্থান করছে এবং তা আল্লাহর হেফাজতেই আছে। কাজেই ইসলাম হেফাজতের ধূয়া তুলে যারা ধর্মের ছদ্মাবরণে অন্যায়, অত্যাচার, জোর-জুলুম বা মানুষ হত্যা করে চলেছে তারা খাঁটি মুনাফেক, প্রতারক তথা দাজ্জাল। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লাম বলছেন ঃ “আলেমদের ভিতর হতে দাজ্জাল বের হবে এবং তারা ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের ঈমান নষ্ট করবে”। ইলমে নব্বী বা ইলমে এলাহী হলো আত্মার জ্ঞান তথা নিজকে চেনার জ্ঞান। যারা নিজকে চিনেনি তারা আলেম নয়, জালেম। এরাই হলো ধর্মান্ধ জঙ্গি মৌলবাদী, ধর্মের নামে জোর-জুলুমই হলো তাদের ধর্ম। লা ইকরাহা ফীদ্দ্বীন- আল্লাহর এ কালামের তোয়াক্কা এরা মোটেও করে না। এ জন্য ধর্ম নিরপেক্ষতা কথাটিও তারা স্বীকার করতে রাজি নয়। কারন, তাহলে ধর্মের নামে তাদের জোর-জুলুম, অন্যায়-অত্যাচার ইত্যাদি পশুত্বের আচরণ বন্ধ হয়ে যাবে যে! আসলে এরা ইসলামের নামে হেফাজত করছে দাঁড়ী, টুপি, জুব্বা, পাগড়ী এবং তাদের ব্যক্তিস্বার্থের কুৎসিত কিছু মতবাদ- যা তাদের ওস্তাদ কুখ্যাত মুনাফেক সউদি সরকারের। তাদের দ্বিতীয় ঘাঁটি হলো দেওবন্দ মাদ্রাসা। সুন্নী আলেম-ওলামার সম্মেলনে এবং ইসলামী ফ্রন্টের সমাবেশে সরাসরি অভিযোগ হলো “হেফাজতে ইসলামের” চেয়ারম্যান মৌলবী আহামদ শফি ছিলেন একাত্তরে মুজাহিদ বাহিনীর কমান্ডার। তিনি ধর্ম নিরপেক্ষতাকে নাস্তিকতা বলে অভিহিত করেছেন (যুগান্তর, ২৯শে মার্চ/২০১৩)। তার মতে নিরপেক্ষতা মানে হলো ধর্মহীনতা বা যার যে ধর্ম মনে চায় পালন করতে পারে অথবা এও হতে পারে মনে চাইলে ধর্ম মানবো, পালন করবো অথবা পালন করবো না ইত্যাদি। মূর্খতা কাকে বলে! আল্লাহ হলেন সামাদ বা মহা নিরপেক্ষ তথা সবার জন্য প্রযোজ্য, তাঁর কালাম বা বাণীগুলোও হলো নিরপেক্ষ এবং তাঁর ধর্মও নিরপেক্ষ। মানব ধর্ম হলো আল্লাহর ফেৎরাত- যা মহানিরপেক্ষ, এর মধ্যে কোনো জাত-ভেদ নেই।
মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের মদিনা সনদটিও ধর্ম-নিরপেক্ষতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। অথচ একদল অজ্ঞ-মূর্খরা তার বিকৃত ব্যাখ্যা তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে ভুল পথে ধাবিত করছে এবং ধর্মের নামে অন্যায়-অত্যাচার, জোর-জুলুম, মানুষ হত্যা করে চলেছে। আসলে তেঁতুলতত্ত্বের আবিষ্কারক যিনি, তিনিতো গাধার পৃষ্ঠে আরোহণ করে বেড়াচ্ছেন এবং তার ডান চক্ষু অন্ধ বিধায় এ ধরনের প্রলাপ বকছেন। কিন্তু ধর্ম-নিরপেক্ষতা বলতে বুঝায় প্রতিটি ধর্মের ধার্মিকগণ যার যার নিজধর্ম পালন করবে শান্তিপূর্ণভাবে, তাতে কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না। এক ধর্মের বিরুদ্ধে আরেক ধর্মের লোকজন কটুক্তি বা কারো ধর্মানুভূতিতে আঘাত করতে পারবে না বা ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্যায়- অত্যাচার, জোর-জুলুম করতে পারবে না। আসলে ইসলাম হলো স্বভাবজাত ধর্ম (আল ইসলামু দ্বীনুল ফেৎরাত)।
ইনছানি আত্মার অধিকারী মানুষই হলো ধার্মিক (খাঁটি মুসলমান, খাঁটি হিন্দু, খাঁটি বৌদ্ধ, খাঁটি খ্রিষ্টান)। মুসলমান মানে মুর্শিদের নিকট তথা আল্লাহর নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী আর পূর্ণ আত্মসমর্পণকারীই হলো পূর্ণ শান্তিপ্রাপ্ত (নফসে মুৎমাইন্নাহ)। আর শান্তিপ্রাপ্ত মানুষের মধ্যেই সৃষ্টি হয় ঐক্যতা। মানবাত্মার মানব-ধর্ম ইসলামে যে দাখেল হয়েছে তার থেকে মানুষ সর্বদাই নিরাপত্তাবোধ লাভ করবে, শান্তিপ্রাপ্ত হবে। সেজন্যই ইসলামে পরিপূর্ণভাবে দাখেল হওয়ার জন্য কোরানের ঘোষণা এসেছে। এর মানে দাঁড়ী, টুপি, জুব্বা, পাগড়ী বা আক্ষরিক অর্থে কোরান-হাদিসের বয়ান নয়। যেমন, পিতা পুত্রকে বললো তুমি এবার নিজের পায়ে দাঁড়াও। “নিজের পাও” কথাটি হলো রূপক, প্রতীক, আক্ষরিক বা মুতাশাবেহাত। তার সমুজ্জ্বল অর্থ হলো কাজ-কর্ম করে স্বাবলম্বী হয়ে যাওয়া- এটা হলো মুহকামাত। “নারী শয়তানের বাহন”-এটা হাদিস। এখানে “নারী” বলতে আমাদের মাতৃজাতিকে বুঝানো আক্ষরিক অর্থ বা রূপকের অর্থ করা- যা মুতাশাবেহাত। কোরানে এ ধরনের অর্থ করার নিষেধাজ্ঞা আছে। এর মুহকামাত হলো নফসে আম্মারা বা বস্তুমোহে আক্রান্ত লোকটিই হলো নারী (তালিবুদ্দুনিয়া মোয়ান্নাছ)। এটাই হলো হাদিসের মুহকামাত। কোরান-হাদিসের কালাম হলো রূপক, প্রতীক- যার সরাসরি অর্থ করা নিষেধ। আলেম-মোল্লারা তাদের শিক্ষায় সেই আক্ষরিক বিদ্যাই শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, ফলে ধর্মজ্ঞান এবং ধর্মের মধ্যে শত শত দ্বন্দ্ব-বিভেদ, ফেরকাবাজি এবং ফতোয়াবাজির সৃষ্টি হয়ে জঘণ্য ক্রিয়া-কর্মে মানুষ জড়িয়ে পড়ছে এবং পথভ্রষ্ট হচ্ছে। মুতাশাবেহাত হলো বাহ্যিক-কাঠামো আর মুহকামাত হলো আত্মার জ্ঞান, মানুষতত্ত্ব- যা নিজকে চিনলে জানা যায়।
আর নিজকে চিনলে খোদা চেনা যায়, তাওহীদে পৌছা যায়। তাতে কোনো দ্বন্দ্ব-বিভেদ নেই- ঐক্যতায় স্থিত হওয়া যায়, যা নামাজ, রোজা এবং সদকার চেয়েও উত্তম বলে নবীজি জানিয়ে দিয়েছেন। যতো দিন মানুষ আলেম-মোল্লাদের কোরান-হাদিসের আক্ষরিক বিদ্যা বা ইলমুল কালামকেই কোরান-হাদিসের জ্ঞান বা ধর্মজ্ঞান বলে জানবে, মানবে ততোদিন মানুষ দ্বীন-এ-মুহাম্মদী বা মিল্লাতে ইবরাহীম হতে দূরেই অবস্থান করবে এবং শত মতভেদের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে ফেরকাবাজি, ফতোয়াবাজি, জোর-জুলুম, অন্যায়-অত্যাচার, মানুষ হত্যা ইত্যাদি চলবেই এবং চরম পথভ্রষ্ট হবে। অন্য জাতির মধ্যেও যারা নিজ ধর্মের মর্ম বুঝেনি, মানবাত্মার ধর্মে দাখেল হতে পারেনি, কেবল বাহ্যিক কাঠামো বা রূপকটি নিয়েই আছে তারাও পথভ্রষ্ট এবং তাদের দ্বারাই ধর্মের দোহাই দিয়ে যতো রকম অন্যায়-অতাচার, জোর-জুলুম, মানুষ হত্যা ইত্যাদি জঘন্য কাজগুলো সংঘটিত হয়ে থাকে। আলেম-মোল্লারা নিজ হাতে লিখিত কোরানকে আল্লাহর তরফের কোরান বলছে, অথচ আল্লাহর নূরে মানুষ- কোরানকে ঘৃণা করা হচ্ছে। ইহুদীরা তাওরাতের বাণী কাগজে লিখে বলতো- এটা আল্লাহর তরফের কিতাব। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহপাক তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন (সুরা বাকারা-৭৯ আয়াত)। মুসলিম জাতির আরবী বিদ্বানেরাও তাই বলছে। তারাও আল্লাহর অভিসম্পাতপ্রাপ্ত। ধর্মশাস্ত্র মানুষের আনিত, ধর্মশাস্ত্র মানুষকে আনেনি। আশরাফুল মাখলুকাত হলো মানুষ, কোনো ধর্মশাস্ত্র নয়। আসল নূরী কোরানকে ভুলে যারা কাগজের কোরানকে আসল কোরান বুঝাচ্ছে তারা কি করে সৎপথপ্রাপ্ত হবে! কাগজের কোরান রুসমী কোরান মানে খোসা, বাহ্যিক আবরণ, প্রতীক। এর ভিতর আরেকটা সমুজ্জ্বল অর্থ আছে, তার থেকে জানা যাবে মুহকামাত আয়াতের সন্ধান। এর মানে আল্লাহ নূরী কোরান মানুষ মানে মানুষই হলো কোরানের মুহকামাত আয়াত। এটা যারা বুঝেনি, চিনেনি তারা এখনো পথভ্রষ্টই হয়ে আছে। কোরানের মুহকামাতেই রয়েছে মানুষের জন্য হেদায়েতের বাণী- যার মাধ্যমে মানুষ সৎপথপ্রাপ্ত হবে, মানব মুক্তির পথ পাবে, ইসলামে দাখেল হবে। আমিত্ব নাস্তি করে স্বীয় জীবনে ইনছানিয়াতের জাগরণ ঘটানোই হলো পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখেল হওয়া। এটা সার্বজনীন কথা, কোরানের কথা।
ইসলামে দাখেল হলেই তিন জমাতের গুণ-খাছিয়ত আর থাকে না এবং ঐ মানুষটিই হলো আল্লাহর অলি। ইসলামে দাখেল হওয়ার পথে মুসলমান, আমানু, মুত্তাকিন এবং মুমিন বলে সাব্যস্ত আছে। আর মুমিনগণই আল্লাহর দিদারে থাকেন। মুমিনের সাথে আলেম-মোল্লাদের বিরোধ চিরকালের। কাজেই ইসলামে দাখেল হওয়ার পর যার যার জীবনে সেই ইসলামকে ধারণ করে কায়েম থাকাই হলো মুক্তির শর্ত। ইসলাম ছাড়া মুক্তির কোনো পথ নেই এবং ইহাই হলো আল্লাহর একমাত্র বিধান ইসলাম- যাকে দ্বীন-এ-মুহাম্মদী বলা হয়। ইসলামকে হেফাজত করা নয়, ইসলাম-ই আমাকে হেফাজত করবে, যদি আমি ইসলামে দাখেল হয়ে যাই। যেমন, ছালাত আমাকে সমস্ত অন্যায়-অশ্লীলতা হতে রক্ষা করবে, যদি মুছুল্লি ছালাতকে স্বীয় জীবনে কায়েম করে নেয়। নামাজ পড়া আর কায়েম করা আকাশ-জমিন প্রভেদ। যিনি নামাজ কায়েম করবে তাকেই নামাজ রক্ষা করবে, যিনি পড়বে তাকে নয়। কাজেই যারা ইসলাম হেফাজত করার ধূয়া তুলছে তাদের মধ্যে ইসলামের কিছুই নেই। তারা পথভ্রষ্ট। তাদের ধর্ম ইয়াজিদের প্রবর্তন করা একটি বিকৃত মতবাদ মাত্র। তা সার্বজনীন নয়, হতে পারে না। ইসলাম হতে বিচ্যুত হলেই সিরাতানুসারে পুনরুত্থিত হয়ে দোযখে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। মানুষের মানবাত্মা কোনো সাম্প্রদায়িক বিষয় নয়, কোনো জাতি- গোত্রের নয়, ইহা হলো চিরন্তন-শাশ্বত, চিরসত্য পবিত্রতম একটি সিরাত-যাকে কোরানে সিবগাতাল্লাহ বলা হয়েছে। হাদিসে আখলাকিল্লাহ বলা হয়েছে বা আল্ ইসলামু দ্বীনুল ফেৎরাত বলা হয়েছে। ইসলাম কোনো লৌকিক ধর্ম সৃষ্টি করে না, ভেদাভেদ বা দ্বন্দ্ব-বিভেদ সৃষ্টি করে না। কারন, মানবাত্মা মানুষের মূল এবং চরম নিরপেক্ষ একটি সত্ত্বা।
‘কাজেই যার মধ্যে মানবাত্মার জাগরণ ঘটেছে তিনিই খাঁটি মুসলমান বা হিন্দু বা খ্রিষ্টান বা বৌদ্ধ ইত্যাদি, কেবল ভাষার বিভেদ। যারা সেই চিরন্তন-শাশ্বত মানবধর্ম ইসলামকে লাভ করতে পারেনি, আক্ষরিক অর্থে ধর্মকে বুঝেছে তাদের দ্বারাই ধর্মের নামে, ধর্মের ছদ্মাবরণে ঘটে যতো অঘটন।’
যারা ধর্মের হাকিকত বুঝে তারা অখন্ড-ই দেখতে পায়, তাদের মধ্যে প্রভেদ দৃষ্ট না হয়ে কেবল অভেদ-ই দৃষ্ট হয়। আর অভেদ সুন্দরের দৃষ্টি তখনই হয় যখন ইনছানি আত্মার জাগরণ ঘটে এবং তাদেরকেই বলা হয় “হিজবুল্লাহ” বা আল্লাহর দল। এরা কালেমার মাঝেই বাস করে। আল্লাহর দল যারা তাদেরকেই নবুয়তে বলা হয় নবী-রাছুল আর বেলায়েতে বলা হয় অলি-আউলিয়া। সেজন্যই যারা ইসলামে দাখেল হয়েছে বা হওয়ার সাধনা করছে তাদের মধ্যে ঐক্যতা, দয়া-মায়া, প্রেম- মহব্বত, ভ্রাতৃত্ববোধ থাকবে। এই জন্যই মানুষের মাঝে ঐক্যতা সৃষ্টি করা নামাজ, রোজা, সদকার চেয়েও উত্তম বলে তিরমিজের বর্ণিত হাদিস হতে জানা যায়। আর এ ঐক্যতা তখনই হবে এবং তাদের মধ্যেই হবে যারা স্বীয় সত্ত্বায় ইনছানি আত্মার জাগরণ ঘটিয়েছে। পুরোহিত, পাদ্রী, মোল্লা-মৌলবীরা করেছে লৌকিক ধর্মের অবতারণ। এরা বহু দল-উপদলে বিভক্ত আর ভুল অংকের ফল বহুই হয়। যারা আসলে ধার্মিক তথা দ্বীন-এ-মুহাম্মদীর অধিকারী তারা কখনো ধর্মের নামে ফেরকাবাজি, অন্যায়-অত্যাচার, জোর-জুলুম, সন্ত্রাস বা মানুষ হত্যা ইত্যাদি করে না। এ সমস্ত অপরাধগুলো করা হলো হায়ানী আত্মা বা নফসে আম্মারার অধিকারী জীব মানুষের কাজ।
হায়ানী আত্মার অধিকারী মানুষের কোনো ধর্মই নেই, সে যতো রকম ইবাদত-বন্দেগী, পূজা-উপাসনাই করুক না কেনো বা যে ধর্মেরই হোক না কেনো। ইসলামের নামে ৩৪ টি দল বাংলাদেশে, ঐক্যতা কোথায় ? ডিগবাজি খেতে খেতে আরো যে বহু দলের সৃষ্টি হবে তা তাদের বিগত ইতিহাসই প্রমাণ। মৌলবী শাহ আহামদ শফি নামের সাথে বর্তমানে ‘পীরে কামেল’ লেবেলটিও যোগ করে নিয়েছেন। কি সুন্দর বাহারী লেবেল! বিষের বোতলে মধুর লেবেল! কারবালার শিক্ষা হতে যারা সত্যকে বুঝে নিতে পারেনি, উদ্ধার করতে পারেনি, তারা ধর্মান্ধ মৌলবাদীদেরকেও চিনতে পারবে না। রাছুলের কালাম হলো “এরা ধর্মীয় নিরাপত্তাসহকারেই থাকবে”। এটা বুঝা দরকার কাফের-নাস্তিকদের-কে চিনা সহজ কিন্তু ধর্মের ছদ্মাবরণে বাস করে যারা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যার বয়ান শুনান তাদেরকে চিনা সহজ নয়। এরাই হলো মুয়াবিয়া-ইয়াজিদ মোল্লার অনুসারী। তাদের দীলের দৈন্যতা ঢাকার জন্যই বেশ- ভূষণের এতো ঘটা। ধর্মের নামে ফেরকাবাজি, ফতোয়াবাজি, অন্যায়-অত্যাচার, জোর-জুলুম এবং মানুষ হত্যা করে মূলতঃ পৃথিবীকে ধর্মশুন্য করার পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে ধর্মান্ধরা। চট্টগ্রামের হাটহাজারী এবং পটিয়াকেন্দ্রিক মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত হচ্ছে সউদি আরবের অর্থায়নে। মুনাফেক সউদি সরকারের কারণে দ্বীন-এ-মুহাম্মদীর কি করুন অবস্থা তা জ্ঞানীগণ অবশ্যই জানেন। ২০০৪ সালের যুগান্তরের রিপোর্টে জানা যায়, হাটহাজারীর অর্ধশতাধিক মাদ্রাসার মধ্যে অন্ততঃ ৩০/৩৫টি মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন যাবৎ জঙ্গি মৌলবাদী সংগঠন ‘হরকতুল জেহাদ’ কাজ করছে। তৎসঙ্গে আরো বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাতে তাদের প্রশিক্ষণ কাজ চালাচ্ছে। দূর্গম পাহাড়ী এলাকায় তারা গড়ে তুলেছে জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। কেন্দ্রিয় নেতারা প্রতি দু’মাস অন্তর গোপনে গিয়ে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেখে আসে। লিবিয়া, আফগানিস্তানের সাথে তাদের যোগসূত্র রয়েছে। বলা যায় ধর্মের ছদ্মাবরণে ঐ সমস্ত মাদ্রাসাগুলো হলো জঙ্গি মৌলবাদী সৃষ্টির প্রজনন খামার, যেখানে সরলমনা শিশুদেরকে ধর্মের নামে জঙ্গি মৌলবাদী শিক্ষা দিয়ে পথভ্রষ্ট করে চলেছে। নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোডে মদনী নগরেও (যা কুখ্যাত ওহাবী হুসাইন আহামদ মদনীর নামে রাখা হয়েছে। এ ওহাবীই আল্লামা ইকবালকে প্রথম কাফের ফতোয়া দিয়েছিলো) তাদের আরো একটি জঙ্গিবাদ শিক্ষার ঘাঁটি রয়েছে। যাদের মূল হলো মুনাফেক সউদি সরকার এবং তাদের দ্বিতীয় ঘাঁটি দেওবন্দ মাদ্রাসা।
১৯৭৭ সাল হতে ব্যাপকভাবে সউদিদের আর্থিক সহায়তায় সুপরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশে নতুন নতুন কওমী-খারেজি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা শুরু হয় এবং সে সমস্ত মাদ্রাসায় ধর্মের নামে সউদি সরকারের ওহাবী মতবাদ প্রচার শুরু করে। যার মূল হলো ধর্মের নামে জঙ্গি মৌলবাদ সৃষ্টি করা এবং নবী-রাছুল, অলি- আউলিয়াদের, তাদের মাজার বা রঁওযা শরীফের এবং তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বিরোধীতা করা, তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা। যদিও মুখে মুখে তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামকে স্বীকার করে, বাস্তবে তাঁকে তারা একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশী কিছু মনে করে না। তার যথেষ্ট প্রমাণ তাদের লেখাগুলোতেই রয়েছে। তাদের যতো ভয় দ্বীন-এ-মুহাম্মদীকে নিয়ে। এ সত্যটি তুলে ধরলেই ঐ সমস্ত ধর্মান্ধদের আদিম চরিত্রটি প্রকাশ করে গোঁয়ার-গোবিন্দের প্রেত নৃত্য শুরু করে দেয়। সউদিদের লেবাছে বাস করা এ সমস্ত মৌলবাদী ওহাবীরা নাস্তিকদের চেয়েও ভয়ংকর। জঙ্গি মৌলবাদীরা ধর্মের দোহাই দিয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ১০ কিঃ মিঃ দূরে ভুজপুর থানার কাজিরহাট এলাকায় যে ধরনের বিভীষিকাময় তান্ডব চালিয়েছে তা আফ্রিকার বন্য পশুদেরকেও হার মানিয়েছে। মানুষ হত্যা, ৭৯টি মোটরসাইকেল, জিপ, মাইক্রোবাস, মিনিট্রাক মিলে ১০টি গাড়ী পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। মসজিদে গিয়ে মিথ্যা মাইকিং করে এ ধরনের জঘণ্য ক্রিয়া-কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মৌলবাদীগণ (১৩ই এপ্রিল/২০১৩ কালের কন্ঠসহ সব জাতীয় পত্রিকাতেই এ সংবাদটি এসেছে)। নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলায়হি ওয়াছাল্লামের বাণী হলো – “যার হাত ও জবান থেকে প্রতিবেশীর মান-ইজ্জত, ধন-সম্পদ নিরাপদ নয় সে মুসলমান নয়”। আরো বলেছেন – “সেই ব্যক্তি মুসলমান যার উপর অন্য কারো কোনো ভয় নেই, সন্দেহ নেই, অবিশ্বাস নেই।”
কাজেই জঙ্গি ওহাবী মৌলবাদীগণ কি করে মুসলমান? মুসলমান নয়। মুনাফেক ওহাবী সউদি সরকার আরো পূর্ব হতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধীতা করে আসছে এবং জামায়াতিদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও রয়েছে। এ জামায়াতিরা টাকা দিয়ে তাদের দোসর কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে রাস্তায় মিছিল করার জন্য নিয়ে আসে (দৈনিক যুগান্তর, ১৯শে মার্চ/২০১৩)। যা তাদের চিরাচরিত নিয়ম। এ সমস্ত কওমী মাদ্রাসায় ধর্মের নামে নিছক কতোগুলো আক্ষরিক বিদ্যা এবং জঙ্গিবাদ শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। এ সমস্ত জঙ্গি মৌলবাদীরা যুগে যুগে এক এক ডিগবাজিতে এক এক নাম ধরে বিরাজ করে বিধায় সাধারণ মানুষ তাদেরকে চিনতে ভুল করে তাদের মতানুসারী হয়ে দ্বীন-এ-মুহাম্মদী বা ইসলাম হতে অনেক দূরে সরে যায়। এ সমস্ত অন্ধ-বধিরগণ ভাবে এটাই সঠিক পথ। পাকিস্তানে মওদুদীর সময় যতো বড় বড় গন্ডগোল হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই হয়েছে মওদুদীর কারণে (মওলানা আবদুল আউয়ালের রচিত “জামায়াতের আসল চেহারা”)। সাঈদীর ভুল তাফসিরের প্রতিবাদ করায় চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকার জামিয়া আহমেদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসার ১০জন বিশিষ্ট আলেমকে হত্যার পরিকল্পনা করে জামায়াতিরা (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৫ই মার্চ/২০১৩, যুগান্তরসহ অন্যান্য সব জাতীয় পত্রিকাই এ খবর এসেছিলো) এবং হত্যার পরিকল্পনাকারীরা শেষে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরাও পড়েছে। আসলে এটাই হলো তাদের ধর্ম। এরা কখনো কুকুরে চড়ে বেড়ায়, কখনো বাঘ-ভাল্লুকে চড়ে বেড়ায়, কখনো গাধার পৃষ্ঠে চড়ে বেড়ায় আর ধর্মের নামে, ধর্মের ছদ্মাবরণে জঘণ্য ক্রিয়া-কর্ম করে চলে, যদিও তারা আকৃতিতে মানুষের মতো। এখন তাদের হাতে তেমন কোনো অস্ত্র নেই, পাকিস্তানী সৈন্যগণও নেই যে তাদের পক্ষ নিয়ে কাজ করবে, তাতেই জামায়াতিরা সমস্ত দেশজুড়ে যে ধরনের জঘণ্যতম বিভীষিকাময় তান্ডব চালাচ্ছে, শহীদ মিনার ভেঙ্গে, হত্যা, লুটপাট আর হিন্দুদের ঘরবাড়ি-মন্দিরে অগ্নি সংযোগ করে তা ভাবনার বিষয়। আর ৭১-এর স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় যখন তাদের হাতে অস্ত্র ছিলো এবং তাদের দোসর পাকিস্তানী সৈন্যগণও তাদের পক্ষে ছিলো তখন তারা কি ধরনের জঘণ্য লঙ্কাকান্ড ঘটিয়েছিলো আশা করি নতুন প্রজন্ম কিছুটা হলেও উপলদ্ধি করতে পারবে।
জামায়াতে মওদুদীরা বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তারা কতটা নির্লজ্জ, ভয়ংকর, নিষ্ঠুর এবং মানবতাবিরোধী। ধর্ম হলো তাদের ছদ্মাবরণের একমাত্র হাতিয়ার। এটা দিয়ে সাধারণ মানুষকে পোষ মানিয়ে নেয়। চাঁদে দেখা যাবার সংস্কৃতিটা চন্দ্রপাড়ার পীর সুলতান ফজল সাহেবের প্রথম স্ত্রীর মেয়ের জামাই মাহাবুব- যিনি নারায়ণগঞ্জের দেওয়ানবাগ গ্রামে খানকা তৈরী করেছেন, এখন তিনি থাকেন ঢাকার আরামবাগে। তার ভক্তগণও প্রচার করেছিলো এবং পত্রিকায় লিখেছিলো যে, চাঁদের মধ্যে নাকি দেওয়ানবাগীকে (মাহাবুবকে) দেখা গেছে। আশ্চর্য হতে হয় যে, মানুষ কতোটুকু ধর্মান্ধ এবং নির্বোধ হলে এ সমস্ত উদ্ভট কথাবার্তার আমদানী করতে পারে। দলীয় নেতাকে অলি-বুযুর্গ বানানোর কতো ফন্দি-ফিকির যে এ ধরনের ধর্মান্ধরা করে চলেছে তার ইয়ত্তা নেই। কেরামতের হাকিকত বুঝতে না পেরে ধান্ধাবাজির কতো ফন্দি-ফিকির যে এরা করে চলছে তা ভাবলে আশ্চর্য্য হতে হয়।
হযরত গাউছে পাক আবদুল কাদির জিলানী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি বলছেন – “কেরামত হলো পুরুষের হায়েজের মতো”। এখন হায়েজওয়ালা পীর সাহেবের আর অভাব নেই। কিছুদিন পরপরই তাদের হায়েজ শুরু হয়। আর সাঈদী বা সাঈদীর সংগঠন জামায়াতে মওদুদী হলো দ্বীন-এ-মুহাম্মদী এবং অলি আউলিয়াদের ঘোর বিরোধী। তারপরও তাকে ফাঁসির রায় হতে বাঁচানোর জন্য এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে তার দিকে আকৃষ্ট করার জন্য চাঁদে দেখা গেছে বলে জঘণ্যতম ধোঁকার আশ্রয় নিয়েছে। তবে শীতকাল আসলে তাদেরকে হয়তো সূর্যেও দেখা যেতে পারে ! কারণ, তখন সূর্যের তাপ কম থাকবে তো তাই। এজন্যই বাংলার একটি প্রবাদ হলো “হুজুগে বাঙালী”! তথাকথিত ধার্মিকেরা আরবী, ফার্সী, সংস্কৃত বিভিন্ন ভাষার দখলদারিত্ব প্রদর্শন করে বা লাইসেন্স নিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে থাকে এবং ধর্মের বাণীর আক্ষরিক ব্যাখ্যা করে বা কালাম শাস্ত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করে ধর্মের মূল হাকিকত ও উদ্দেশ্য হতে মানুষকে দূরে সরিয়ে ফেলছে তথা পথভ্রষ্ট করে চলেছে। তাদের এই সমস্ত আক্ষরিক ব্যাখ্যার কারণে ঐক্যতার পরিবর্তে বহু মতভেদ, দ্বন্দ্ব-বিভেদ, ফতোয়ার বিচিত্র ডিগবাজি, ধর্মের নামে প্রতারণা শুরু হয় এবং নাস্তিকদের মাঝেও শত-সহস্র বিকৃত চিন্তার ফসল জন্ম নিচ্ছে, ফলে তারা ধর্মের বিরুদ্ধে নানা কুৎসা রটনা শুরু করার সুযোগ পাচ্ছে।
বলা হয়, নাস্তিকরা ধর্ম এবং আল্লাহ মানে না। না মানাটা ধর্মান্ধদের চেয়ে শত-সহস্রগুণে ভালো। কারন, ধর্মের সঠিক জ্ঞান পেলে অবশ্যই তারা মানবে এবং মানতে বাধ্য। কিন্তু যারা না বুঝে, না জেনেই জ্বী হুজুর, জ্বী হুজুর করছে, কোরান-হাদিসের আক্ষরিক বিদ্যাকেই ধর্মজ্ঞান বলে বুঝাচ্ছে কোরানে তাদেরকে নির্বোধ বলছে। এরাই হয় অন্ধ-বধির এবং গোঁড়া মৌলবাদী-মোয়াহেদ কাফের। তারা সত্য হতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে এবং সত্যটিকে দেখিয়ে দিলেও মানবে না। কারন, এরা অন্ধ-বধির বিধায় বোবা। অথচ কোরানের নির্দেশ হলো, যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সে বিষয়ে তুমি অনুসরণ করো না (সুরা বনী ইসরাঈল- ৩৬ আয়াত)। কাজেই নাস্তিকদের জন্য পথ খোলা আছে। তারা মানে না, সত্য সঠিক জ্ঞান পেলে মানবে। এরা বাস করছে কালেমার প্রথমাংশ লা ইলাহার মাঝে। এর উর্ধ্বে আরোহণ করার সাধ্য তাদের নেই বিধায় নাস্তিক স্তরে আবদ্ধ আছে। যদি খোদাকে চিনতে পারে তবে অবশ্যই কালেমার দ্বিতীয় স্তরে ইল্লাল্লাহ-তে আরোহণ করে খোদাকে স্বীকার করে নিয়ে আস্তিকতায় স্থিত হবে। নেগেটিভ হতে পজেটিভে চলে এসে আল্লাহকে স্বীকার করে নিবে। আর যারা না জেনে না বুঝেই সব বুঝে গেছে এ ভাব ধরে আছে ঐ সমস্ত অন্ধদেরকে বুঝানো যাবে না এবং এরাই হলো ধর্মান্ধ গোঁড়া জঙ্গি মৌলবাদী। এর জন্য মৌলবীদের কোরান-হাদিসের আক্ষরিক ব্যাখ্যা গুলো দায়ী। যেমন, কোরানে প্রত্যেকটি আয়াতের একটি মুতাশাবেহাতুন (অষষবধমড়ৎরপধষ গবধহরহম) আরেকটি মুহকামাতুন অর্থ (ঊংঃধনষরংযবফ গবধহরহম) আছে। মুহকামাতুন বা গূঢ়ার্থ জানা হলে ধর্ম-বাণীর মূল হাকিকতটি পাওয়া যাবে। বকধার্মিকেরা ব্যাখ্যা করে তার বিপরীত অর্থ মানে আক্ষরিক। তারা ব্যাখ্যা করে কোরানের কিছু আয়াত হলো মুতাশাবেহাতুন এবং কিছু আয়াত হলো মুহকামাতুন। ফলে কোরানের আক্ষরিক ব্যাখ্যা করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। আসলে একই আয়াতের মুতাশাবেহাতুন বা রূপকের পর্দা ভেদ করে কোরানের মুহকামাতুন বা সমুজ্জল বা গূঢ়ার্থ বের করলে তখনই হলো কোরান বুঝা এবং তা বর্তমানই পাওয়া যায়। এজন্যই মাওলানা রুমী রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলায়হি বলছেন – “আমি কোরানের মগজ (আসল অর্থ) উঠিয়ে নিয়েছি, আর হাড্ডী গোশত (রূপক কাঠামো) কুকুরের জন্য ফেলে রেখেছি”।
প্রবন্ধ – আসরারে পাঞ্জাতন – ২য় পর্ব
লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
পাক পাঞ্জাতনের প্রথম এবং শেষ ও বিশিষ্ট নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের নূর সৃষ্টি সম্পর্কে হাদিসের বর্ণনা দেয়া হলো – জাবের রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে, একদিন আমি (জাবের) হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাছুল! আমার পিতা-মাতা আপনার উদ্দেশ্যে কোরবান হউক! আপনি এই খবরটি আমাকে জানিয়ে দিতে মর্জি ফরমাইবেন যে, আল্লাহপাক সর্বপ্রথম কোন্ বস্তু সৃষ্টি করেছেন? উত্তরে নবীজি বললেন, হে জাবের! আল্লাহ তা’য়ালা সমস্ত কিছু সৃষ্টি করার পূর্বে তার নিজের নূর হতে নবীর নূর সৃষ্টি করেছেন। তারপর আল্লাহ তা’য়ালা এই নূরকে এমন শক্তি দান করলেন যে, সেই নূর আল্লাহর হুকুমে আল্লাহর ইচ্ছায় যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতে পারতো। ঐ সময় আরশ, কুরশী, লওহ, কলম, মানব-দানব ইত্যাদি কিছুই ছিল না [নূরে মোহাম্মদী ৩৭ পৃষ্ঠা, মাওয়াহিব ১ম খন্ড- ৯ পৃষ্ঠা]। পাক পাঞ্জাতন ।
‘মুসলিম শরীফে’ হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, একদিন হযরত জিবরাইল আলাইহিস্ সালামকে কথা প্রসঙ্গে নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম তাঁর বয়স সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, তদুত্তরে হযরত জিবরাইল আলাইহিস্ সালাম বললেন, আমি শুধু এতোটুকু জানি যে, চতুর্থ আকাশে বা চতুর্থ হিজাবে একটি উজ্জল তারকা সত্তর হাজার বছর পর পর একবার উদয় হতো। অর্থাৎ সত্তর হাজার বৎসর উদিত অবস্থায় এবং সত্তর হাজার বছর অস্তমিত অবস্থায় ঐ তারকাটি বিরাজমান ছিল। আমি ঐ তারকাটিকে বাহাত্তর হাজার বার উদয় হতে দেখেছি। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বললেন, খোদার শপথ, আমিই ছিলাম ঐ তারকা। এ হাদিসটি তাফসীরে রুহুল বায়ানের ৩য় খন্ডে সুরা তাওবার ১২৮ নম্বর ‘লাকাদ জাআকুম মিন আনফুসিকুম’ এ আয়াতের তাফসীরে এবং সীরাতে হলবিয়া ২য় খন্ডে বর্ণিত আছে।
হাকেম বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম নবীজির নাম আরশ মোয়াল্লার উপর লিপিবদ্ধ দেখেছেন। আর আল্লাহপাক আদম আলাইহিস সালামকে এরশাদ করছেন, ‘যদি মোহাম্মদকে সৃষ্টি না করতাম তবে তোমাকেও সৃষ্টি করতাম না।’ আবার তিরমিযীর বর্ণনায় রয়েছে, ‘লাওলাকা লা’মা খালাকতুল আফলাক’ অর্থাৎ (হে রাছুল) যদি আপনি সৃষ্টি না হতেন তবে আমি কিছুই সৃষ্টি করতাম না। পাক পাঞ্জাতন ।
হযরত আলী ইবনে হুসাইন ইবনে আলী আলাইহিস সালাম তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, “আমি (নবী) আদম সৃষ্টির চৌদ্দ হাজার বৎসর পূর্বে আমার প্রতিপালকের নিকট নূর হিসেবে বিদ্যমান ছিলাম”। (‘আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া’ এবং ‘আনোয়ারে মোহাম্মদী’ গ্রন্থসূত্রে বর্ণিত)
হাকেম ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (হাকেম) একে সহীহ বলে সাব্যস্ত করেছেন – আল্লাহপাক ঈসা আলাইহিস্ সালামের প্রতি ওহী করলেন, নিশ্চয়ই আমি আরশকে পানির উপর সৃষ্টি করলাম। অতঃপর তা দুলতে থাকলো। অনন্তর আমি তার উপরে লিখে দিলাম “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাছুলুল্লাহ” ; অতঃপর তা স্থির হয়ে গেল। সৃষ্টির আদিতেই তাঁর নবুয়ত ঘোষণা হলো আলমে মলকুতে। নূরের কালিতে নূরের কলমে কালেমা আরশ মোয়াল্লায় অঙ্কিত আছে। পাক পাঞ্জাতন ।
ইবনে যানজভীহ্ কাসীর ইবনে মুররা হাযরামী হতে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, “হাশরের দিন হযরত বেলাল রাদিয়াল্লাহ তা’য়ালা আনহুকে বেহেশতের উষ্ট্রীগুলোর মধ্যে একটি উষ্ট্রীর উপর পুনরুত্থিত করা হবে। সে ঐ উষ্ট্রীর পৃষ্ঠ থেকে আযান ফুঁকতে থাকবে। যখন নবীগণ ও তাঁদের উম্মতগণ “আশহাদু আন-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মোহাম্মাদুর রাছুলুল্লাহ” ধ্বনি শুনতে থাকবে, তখন তারা বলবে- আমরাও ঐ সম্বন্ধে সাক্ষ্য দান করি যে, নিশ্চয়ই মোহাম্মদ আল্লাহর রাছুল।” সমস্ত নবী ও তাঁদের উম্মতগণ একত্রে সাক্ষি দিবে যে, নিশ্চয়ই মোহাম্মদই আল্লাহর রাছুল ; এ কথার ভেদ রহস্য জানা দরকার। ভেদ বুঝতে পারলে এ কথার সত্যতা বর্তমানেই পাওয়া যাবে।
‘আহমদ’ ও ‘বায়হাকীতে’ হযরত এরবাজ ইবনে সারিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহপাকের নিকট আমি তখন খাতামান্ নাবীয়্যিন নির্বাচিত হয়েছিলাম, যখন আদম আলাইহিস্ সালাম পয়দাও হয়নি।” পাক পাঞ্জাতন ।
‘রাহমার্তু রাহীম’ কিতাবে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহপাক হযরত জিবরাইলকে নির্দেশ দিলেন, তুমি হযরত ইসরাফিল কে নিয়ে জমিনে যাও এবং মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের নূরে শামিল করার জন্য এক মুষ্ঠি মাটি আহরণ করে নিয়ে আসো। জমিন রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের নাম শুনা মাত্র বিদীর্ণ হয়ে গেলো এবং কর্পূরের ন্যায় এক প্রকার শুভ্র পংক বা মাটি প্রকাশ হয়ে পড়লো। ঐ স্থানটি হলো যেখানে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লামের ‘রঁওজা-ই-আতহার’ অবস্থিত। জিবরাইল সে মাটি নিয়ে নূরের সাথে মিশিয়ে দিলেন। তারপর তা দিয়ে খামির প্রস্তুত করে মেশক, জাফরান, সাম্বল, মায়ে-মায়ীন (পরিদৃশ্যমান প্রবাহিত পানি) ও বেহেশতের কর্পূর মিশ্রিত করলেন। তিনি পবিত্র অস্তিত্বের উপাদানকে মুক্তার ন্যায় স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল করলেন। এরপর তাকে ডুবালেন বেহেশতের নহরে। তারপর তিনি তা দেখালেন সমুদয় আসমান, ফেরেশতা, বেহেশত, জমিন, নদী, নদী-সাগর ও পর্বতমালা-কে। এরপর সবাইকে সম্বোধন করে বললেন, তোমরা সকলে তোমাদের রাব্বুল আলামিনের মাহাবুবের উপাদানকে চিনে লও, তিনি গুনাহগারের শাফায়াতকারী এবং আদমের সর্দার (নূরে মুজাসসাম- ১৪৬ পৃষ্ঠা)
মৌলবী আশরাফ আলী থানবী তার ‘নশরুত্তীব’ গ্রন্থের ১২ পৃষ্ঠায় হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত একটি হাদিস তুলে ধরেছেন তা হলো, হযরত জাবের আরজ করলো, ইয়া রাছুলুল্লাহ! কবে আপনি নবী নির্বাচিত হয়েছেন? নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বললেন, আদম আলাইহিস্ সালাম যখন রুহ এবং দেহের মাঝখানে ছিলেন, তখন আমার নিকট হতে নবুয়তের শপথ নেয়া হয়েছে। তিরমিযীর মধ্যে হযরত মায়ছারার বর্ণনায় এভাবে এসেছে যে, “আদম যখন কাঁদা এবং পানিতে মিশ্রিত ছিল তখনো আমি নবী ছিলাম।” পাক পাঞ্জাতন ।
হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহপাক যখন সমস্ত মাখলুকাত সৃষ্টি করলেন এবং পৃথিবীকে নীচু ও আকাশকে উচু করার ইচ্ছা করলেন; তখন তিনি তাঁর সৃষ্টি করা নূর হতে কিছু নূর নিয়ে বললেন – হে নূর, তুমি আমার হাবীব মোহাম্মদ হয়ে যাও। অতঃপর এই নূরে মোহাম্মদী হযরত আদম আলাইহিস্ সালামের সৃষ্টির পাঁচশত বৎসর পূর্বে আরশ মোয়াল্লায় প্রদক্ষিণ করেছিল এবং বলতেছিল ‘আলহামদুলিল্লাহ’। তখন আল্লাহপাক বললেন- হে দোস্ত, এই জন্যইতো আমি আপনার নাম মোহাম্মদ রেখেছি [নূরে মোহাম্মদী- ৪৬ পৃষ্ঠা, নুজহাতুল মাজালিশ]
রাছুলপাক সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে যে, “আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু নূরী” অর্থাৎ আল্লাহপাক প্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেছেন। এ হাদিসটি আবদুল্লাহ ফারেস মাক্কী বরযালজী তার ‘কিস্সাতুল মাওলুদ’ কিতাবের শরাহ-তে বর্ণনা করেছেন। এ নূর হলো আল-কাদীম। সকল সৃষ্টির আদি হলো এ নূর। সৃষ্টির প্রথম অস্তিত্ব প্রকাশ হিসেবে এ নূর প্রকাশ। আর এ জন্য তা হলো সর্ব পুরাতন তথা কাদীম। এ নূর হতেই সৃষ্টি হলো মোহাম্মদ এবং এ নামের অংকনে অংকিত হলো মানুষের সুরত। তাঁর আসমানী নাম ‘আহামদ’ (মুজতবা) এবং জমিনে তাঁর নাম মোহাম্মদ (মোস্তফা)। তিনি আল্লাহর নিকটই মোহাম্মদ তথা আল্লাহপাক নিজেই তাঁর প্রশংসাকারী। যখন তিনি ‘আহামদ’ তখন তিনি প্রশংসাকারী। কারন, নূরের জগতে যখন তাঁর অস্তিত্ব প্রকাশ পায়, তখনই তিনি আল্লাহপাকের শুকরিয়া আদায় এবং প্রশংসা করে বলেছেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’। এ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ দ্বারাই আল্লাহপাকের আঠার হাজার মাখলুকাত সৃজন হয়ে চলছে এবং তিনিও তাঁর সৃজনের মাঝেই স্থিত। ওয়াহেদ আল্লাহ, আহাদ, আহামদ এবং মোহাম্মদ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ তেই নিহিত আছে। ‘তানাজ্জুলাত-ই-খামছা’ আলহামদুলিল্লাহর-ই গোপন ভেদ-রমুজাত এবং বিশেষ এক অবস্থায় তিনিই মোহাম্মদ তথা প্রশংসিত। এ জন্যই হাশরের দিন তাঁর পতাকার নাম হবে ‘লেওয়া-ই-হামদ’ এবং তিনিই হলেন ‘মাহমুদ’।
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাছুল করিম সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম বলছেন, “তোমরা কি আশ্চর্যান্বিত হও না যে, কি প্রকারে আল্লাহ আমাকে কোরাইশগনের গাল (গালিগালাজ) ও লানত হতে মুক্ত রেখেছেন। তারা গাল দিয়ে থাকে ‘মুজাম্মাম’ (অতি নিন্দিত) কে, তারা লানত করে থাকে ‘মুজাম্মাম’কে। অথচ (আল্লাহর নিকট) আমি মোহাম্মদ।” মোহাম্মদী স্তরকেই বলা হয় ‘মাকামে মাহমুদ’ তথা প্রশংসিত স্তর বা মাকাম। দ্বীনে মোহাম্মদী হলো তা-ই যে দ্বীনের মাধ্যমে ‘মাকামে মাহমুদে’ অধিষ্ঠিত হওয়া যায়। আর মোহাম্মদ ব্যতিত এ মাকামে কারো প্রবেশাধিকার নেই। এ স্তরে আল্লাহপাকের পরিচয় এবং দিদার লাভ হয়। এ জন্যই দ্বীন ইসলাম মিল্লাতে ইব্রাহীমের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে। মিল্লাতে ইব্রাহীম হলো খোদাকে দেখে বিশ^াস করা। যাদের দিব্যদৃষ্টি আছে তাঁরা চিনে কে মোহাম্মদ রাছুল। যিনি আসমানে ‘আহামদ’ এবং তিনিই শেষে জমিনে মোহাম্মদ এবং এ মোহাম্মদের মাঝেই গোপন আছে খোদার মহিমাময় নাম তথা ‘ইসমে আজম’। হাদিস কুদসীতে আল্লাহপাক বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আমার ওপর কসম করেছি যে, যার নাম ‘আহামদ’ তাকে আমি দোযখে দাখিল করবো না এবং যার নাম ‘মোহাম্মদ’ তাকেও না।” মনে রাখতে হবে কোনো মানুষের নাম আহামদ বা মোহাম্মদ রাখলো তার সেজন্যই আল্লাহপাক তাকে জান্নাতে দিয়ে দেবেন তা অবশ্যই নয়। ‘আহামদ’ আর ‘মোহাম্মদ’ এর ভেদ জানলে উক্ত হাদিসের মর্ম বুঝা যাবে। আর উক্ত হাদিসের ভেদ তারাই জানতে পারে যারা দ্বীনে মোহাম্মদীতে দাখেল হয়েছে বা দ্বীন ইসলামে দাখেল হয়েছে তথা ওলীয়ম্ মুর্শিদের নিকট আনুগত্য স্বীকার করছে।
হাদিস কুদসীতে আল্লাহপাক বলছেন, “খালাকতু মোহাম্মাদান মিন নূরে ওয়াজিহিয়ান্” অর্থাৎ আমি মোহাম্মদকে সৃষ্টি করেছি আমার চেহারার নূর হতে, সিররুল আসরার – ৩ পৃষ্ঠা।
প্রবন্ধ – বাইয়াত প্রসঙ্গে আলোচনা
লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী
দ্বীনে মোহাম্মদীর শাশ্বত বিধান হলো বায়াত গ্রহণ করা তথা যুগের ওলী মুর্শিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে তাঁর নির্দেশিত পথে চলা। যুগে যুগে প্রেরিত পুরুষগণ তথা অবতার/রাছুল বা ওলী মুর্শিদগণ বায়াতের মাধ্যমে আপনাপন অনুসারীগণকে পথ প্রদর্শন করে থাকেন। এ পথেই মুক্তি। আর যারা এজিদি ওহাবী তথা খান্নাছ কবলিত অপবিশ্বাসের অনুসারী, তারাই এ শাশ্বত বিধানটিকে অস্বীকার করে বদ্ধ হয়ে আছে অন্ধবিশ্বাসের চারিদেয়ালের মধ্যে। যুগে যুগে তারাই রচনা করছে অপধর্মের ইতিহাস। তাদের দ্বারাই কলঙ্কিত/কলুষিত হচ্ছে ধর্ম। নিগৃহীত হচ্ছে প্রকৃত ধার্মিকগণ। বায়াত তথা মানুষে আত্মসমর্পণের বিধান কে অস্বীকারকারী বকধার্মিকদের মুখোশ উন্মোচনের জন্যই “আপন খবর” এর (পূর্ব প্রকাশের পর) বর্তমান সংখ্যাতেও থাকছে বায়াত প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা।
এক নজরে দেখে নেই গত পর্বে প্রদত্ত বায়াত বিষয়ক দলিলগুলো –
সুরা ফাতেহা ০৭; সুরা নাহল ৩৬; সুরা ইব্রাহিম ০৪; সুরা রাদ ০৭; সুরা ফাত্তাহ ১০, ১৮; সুরা নিসা ১৩, ৫৯, ৬৯, ৮০, ১৫০, ১৫১; সুরা আল ইমরান ৩১, ৩২, ৭৬, ১৩২; সুরা হুজরাত ০২; সুরা আহযাব ০৬, ৩১, ৩৩, ৩৬, ৫৬; সুরা নূর ৩৫, ৬২, ৬৩; সুরা মুমিনুন ২৪; সুরা ফুরকান ৫৯; সুরা ইউনুস ৪৭, ৬২, ১০০; সুরা কাহাফ ১৭, ৬৬-৭০; সুরা বাকারা ১৫৪; সুরা আরাফ ৫৬, ১৮১, ১৯৮; সুরা মায়েদা ৩৫; সুরা ইয়াসিন ২১; সুরা লোকমান ১৫; সুরা বণী ইসরাইল ৭১; সুরা মরঈয়ম ৮৭; সুরা আম্বিয়া ০৭; সুরা তওবা ১১৯; সুরা মুমতাহিনা ১২; সুরা হাশর ০৭; ইত্যাদি।
মূলতঃ সমগ্র কুরআন ব্যাপিই বায়াতের কথা তথা মানুষগুরু তথা রাছুল বা অলী মুর্শিদগণের আনুগত্য তাবেদারীর মাধ্যমে ধর্মে স্থিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইসলাম চিরঞ্জীব জগতে অধিষ্ঠিত হওয়ার ধর্ম। যার মাধ্যমে একজন ধার্মিক অধিষ্ঠিত হয় নিত্যপ্রেমের অমর লোকে। যেখানে নেই কোনো ক্ষয়িষ্ণু চিন্তা চেতনা, অন্ধবিশ্বাস বা অনুমান কল্পনা, নেই বিভেদ বৈষম্য বা কোনো সংশয়। চিরঞ্জীব জগতে অধিষ্ঠিত হওয়ার মূলমন্ত্রই হলো একজন চিরঞ্জীব মানুষের অনুকরণ অনুসরণ করে তাঁর আদলে নিজের রূপকে রূপায়িত করে নেয়া। যারা ছিবাগাতাল্লাহ প্রাপ্ত তথা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত তথা ওয়াজহুল্লার অধিকারী তাঁরাই ধর্ম দানের মালিক তথা বায়াত করানোর মালিক। যারা তাঁদের অনুসরণে নিজেকে সেই প্রভূরঙে রঞ্জিত করে নিতে সক্ষম তাঁরাই লাভ করবে চিরমুক্তির নিত্য পথ। যারা বা যে সমস্ত মানুষ কোনো পরকাল প্রাপ্ত বা মুক্ত মানুষের নিকট বায়াত মুরিদ হয়ে তাঁর নির্দেশিত পথে ধ্যান সাধনায় রতো আছেন তাকে বলা হয় আমানু (যারা ঈমান এনেছে)। আর যারা গুরু বা মুর্শিদের নিকট বায়াত মুরিদ হয় নি তাকে আমানু বলা যাবে না। বায়াত গ্রহণ করে গুরুপথে একান্ত ভক্তিভরে যদি স্থিত থেকে হাছিল করে নেয়া যায় মুক্তি, তখন তাঁকে বলা হবে মুমিন। এই মুমিন ব্যাক্তি তখন অন্য আমানুদের পথের সন্ধান দিবে। এটাই চিরবর্তমান ইসলামের শাশ^ত বিধান। মহান রব তার গুনে গুণান্বিত পবিত্র সত্ত্বাদের মধ্যেই চিরঞ্জীব রূপে প্রকাশিত এবং প্রবাহিত হয়ে চলেছেন সিনা-ব-সিনা পবিত্র মানুষদের মধ্য দিয়ে। সেই অনাদী কালের মহাস্রোতে শামিল হয় যারা তথা পবিত্র মানুষের চরণে নিজেকে উৎসর্গ (ফানা) বা বিলীন করে দিয়ে তার অনন্ত অখন্ড দিব্য জ্যোতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলে তাঁর হয়ে যায় তারাই হয় অমর লোকের বাসিন্দা তথা জান্নাতি মানুষ। “মনে রাখা দরকার, একজন পবিত্র মানুষের শ্রীচরণে নিজেকে উৎসর্গ না করলে এবং তাঁর দেখানো পথে না চললে কোনোভাবেই মুক্তি সম্ভব নয়।”
ইসলাম ধর্মে কোনো অনুমান কল্পনায় খোদা বিশ্বাসের জায়গা নেই। অনুমান বা কল্পনায় খোদার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে শয়তান। এখনো যারা আল্লাহকে অন্ধঅনুমানে কল্পনা করে থাকে তারা শয়তানের অনুসারী। খোদার ভেদ পরিচয় সম্যকরূপে জেনে তারপর তাঁর ভজনা করতে হবে। তবেই লাভ করা যাবে তাঁকে। ইনছানুল কামেলগণ তথা ওলী মুর্শিদগণই তার ভেদ পরিচয় জানেন। তাঁরা নিত্য আল্লাহতেই বাস করেন এবং আল্লাহতেই মত্ত থাকেন। অতএব তাঁরাই আল্লাহ পাবার একমাত্র উছিলা। তাঁরাই প্রভুর খবরদাতা। তাঁদের মাধ্যমেই লাভ করতে হবে পরমপ্রভুকে। এটাই দ্বীন ইসলাম বা মিল্লাতে ইবরাহিম বা খোদাকে দেখে বিশ্বাস করার ধর্ম। খোদাপ্রাপ্তির একমাত্র পথ হলো ইনসানুল কামেল বা ওলী মুর্শিদের চরণে নিজেকে সমর্পিত করে বা মুরিদ হয়ে তাঁর ভক্ত হয়ে যাওয়া। তবেই সাধনাবলে প্রকটিত হবেন তিনি।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’য়ালা আলাইহি ওয়াচ্ছাল্লাম তাঁর সমগ্র জীবনে বায়াত মুরিদের মাধ্যমে চিরমুক্তির জগতে স্থিত হওয়ার শিক্ষাটিই প্রচার করেছেন। জ্ঞানীগণ তথা আমানু মুমিনগণ তাঁর দেখানো এই সিরাতুল মুস্তাকিম গ্রহন করে সমর্পিত হয়ে মুক্তি পাচ্ছেন আর অজ্ঞানী হায়ানী আত্মার অধিকারী মূর্খরা শাশ্বত এ বিধানকে অস্বীকার করে পতিত হচ্ছেন জাহান্নামের অতলে তথা চির বন্দীত্বে তথা তারা ধাবিত হচ্ছে ধ্বংসের দিকে।
‘মুর্শিদের অনুকরণ অনুসরণেই আসবে কাক্সিক্ষত মুক্তি। কারন, তাঁরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত ও আল্লাহর জ্ঞানে জ্ঞানবান। আল্লাহ তাঁর ওলী বন্ধুদেরকে তাঁর নিজ জ্ঞান থেকে জ্ঞান ও বিবেক দান করেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।’
আলমে নাছুত এর পথ অতিক্রম করে চির সবুজ, চির শান্তির দেশ ইনছানিয়াতের দিকে সাধকের যে অগ্রযাত্রা তার একমাত্র পথ হচ্ছে গুরু মুর্শিদের পায়রবী তথা দাসত্বে থেকে তার খোদায়ী গুনে নিজেকে গুণান্বিত করে তোলা। আর যেসব লেবাছধারী অতিপন্ডিতের দল গুরু ব্যাতিত সাধনার পথে অগ্রসর হয় তারা অচিরেই নিক্ষিপ্ত হবে নিন্ম থেকে নিন্মে।
মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী (রহ.) বলেন,
‘যে ব্যক্তি মুর্শিদের উছিলা ব্যতিত সুলূকের পথে পা বাড়ালো সে শয়তানের চক্রান্তে পথভ্রষ্ট ও অন্ধকূপে পতিত হলো।’
‘ঐ মুর্শিদে কামেলের উছিলায় আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভ করো, তাঁর পায়রবী ও অনুকরণ হতে কোনো সময় বিরত থাকিও না।’
‘যদি তুমি কোনো পীরের নিকট মুরিদ হও, তবে সাবধান! তাঁর কদমে পুরোপুরি আত্মসমর্পন করো। হযরত মুসা (আ) এর ন্যায় খিজিরের আদেশ মোতাবেক চলো।’
‘মোল্লা রোম নিজে নিজে কামেল হতে পারেনি যতক্ষন না সে শামস তাবরিজের গোলামী করেছে।’
তাই ইনছানুল কামেলের পূর্ণ আনুগত্য অনুসরণ তথা দাসত্বের মধ্যেই নিহিত মুক্তির পথ।
হাফিজ সিরাজী তার কাব্যে বলেন,
জায়নামাজে শারাব রঙিন কর
মুর্শিদ বলেন যদি,
পথ দেখায় যে সেইতো জানে
পথের কোথায় অন্ত-আদি!
গাউছে পাক আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) বলেন,
‘খোদার কসম, ওলী এবং নবীদের অবস্থা একই প্রকার, শুধু নাম ও উপাধি ভিন্ন।’
‘ইনছানুল কামেলগন মুরিদ ও সন্ধানীদের কাবায় পরিণত হন যে, চারিদিক হতে দলে দলে লোক আগমন করতে থাকে।’
‘যে ব্যাক্তি মুক্তিকামী তার উচিত পীরের পায়ের তলার ধুলিতে পরিণত হওয়া।’
গরীবে নেওয়াজ হযরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতী (রহ.) বলেন,
‘হে মঈন, তোমার মুর্শিদকে খোঁজো জাগতিক মোহকে বিসর্জন দিয়ে। হতে পারে যদি তুমি দু’য়ের মাঝে অবস্থান করো তাহলে উভয়ই হারাতে হবে।’
‘হে সাকী! তুমি আমাকে একত্ববাদের এ কি শারাব পান করালে যার ফলে আমি প্রতি মুহূর্তে হৃদয়ে হা-হুতাশের শব্দ শুনতে পাই।’
মূলত মুর্শিদ প্রেমে আত্মহারা তথা মুর্শিদে সমর্পিত চিত্তটিই চরমভাবে তৌহিদ সাগরে নিমজ্জিত হয়। সেখানে সে উপলদ্ধি করতে পারে পরম সচ্চিদানন্দ। সে অভিন্ন দেখে মুর্শিদ রাছুল আল্লাহকে। এখানেই মুক্তি। আর যারা সমর্পিত নয় গুরুতে, তারা চিরকাল আবদ্ধ-ই থাকবে রুহে হায়ানীর নিকৃষ্ট জগতে।
তাদের জন্যই বলা হয়েছে – যার পীর নাই তার পীর হলো শয়তান।
- খারফুতী শরীফের সূত্রে শানে হাবিবুর রহমান, ২০০ পৃ.
- ওহাবীদের নেতা আশরাফ আলী থানভীর রুহে তাসাউফের ১৬০ পৃ.
- তাফসীরে রুহুল বায়ান ৯ম খন্ড, – ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন ৫ম খন্ড
- আওয়ারেফুল মাওয়ারেফ ৭৮ পৃ. – দাওয়াত তাবলীগ ও পীর মুরিদি ২১৯ পৃ.
- বাইয়াত ও খেলাফতের বিধান ৪৬ পৃ ইত্যাদি।
মোহাম্মদী ইসলামে অন্ধ গোঁড়ামীর কোনো স্থান নাই। পৃথীবির সকল মহামানব বায়াত হয়েছেন এবং পতিত মানুষদের মুরিদ করেই মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। যাকে বলা হয় সিরাতুল মুস্তাকিম। সরল সঠিক পথ। ধর্মের সঠিক দেশনা মুর্শিদ আমাদের সকলকে দান করুন।
কবিতা – ঈশ্বর
কাজী নজরুল ইসলাম
কে তুমি খুঁজিছ জগদীশ ভাই আকাশ পাতাল জুড়ে?
কে তুমি ফিরিছো বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে?
হায় ঋষি দরবেশ –
বুকের মানিকে বুকে ধ’রে তুমি, খোঁজো তারে দেশ-দেশ!
সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে, তুমি আছো চোখ বুঁজে,
স্রষ্টারে খোঁজো? আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে!
ইচ্ছা-অন্ধ! আঁখি খোলো, দেখো দর্পণে নিজ-কায়া,
দেখিবে, তোমারি সব অবয়বে, প’ড়েছে তাঁহার ছায়া।
শিহরি উঠো না শাস্ত্রবিদেরে, ক’রো না’ক বীর-ভয়
তাহারা খোদার খোদ প্রাইভেট সেক্রেটারী তো নয়!
সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি
আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি!
রত্ন লইয়া বেচা-কেনা করে বণিক সিন্ধু-কূলে
রত্নাকরের খবর তা ব’লে, পুছো না ওদের ভুলে’!
উহারা রত্ন বেনে,
রত্ন চিনিয়া মনে করে ওরা রত্নাকরেও চেনে!
ডুবে নাই তা’রা অতল গভীর রত্ন-সিন্ধুতলে,
শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে।
কবিতা – আছি আমি বিন্দুরূপে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আছি আমি বিন্দুরূপে, হে অন্তর্যামী
আছি আমি বিশ্বকেন্দ্রস্থলে! ‘আছি আমি’!
এ কথা স্মরিলে মনে মহান বিস্ময়,
আকুল করিয়া দেয়, স্তব্ধ এ হৃদয় –
প্রকান্ড রহস্যভারে! আছি আর আছে’
অন্তহীন আদি প্রহেলিকা, কার কাছে –
শুধাইব অর্থ এর! তত্ত্ববিদ তাই
কহিতেছে, ‘এ নিখিলে আর কিছু নাই।
শুধু এক আছে।’ করে তারা একাকার
অস্তিত্বরহস্যরাশি করি অস্বীকার।
একমাত্র তুমি জান এ ভবসংসারে
যে আদি গোপন তত্ত্ব, আমি কবি তারে –
চিরকাল সবিনয়ে স্বীকার করিয়া
অপার বিস্ময়ে চিত্ত রাখিব ভরিয়া।
সংগীত – বসে ধ্যানে দীলের টানে
লেখক – হযরত খাজা রজ্জব আলী দেওয়ান আল চিশতী নিজামী
বসে ধ্যানে দীলের টানে, দূরের বস্তু সামনে কর
স্বচক্ষে দেখে শুনে, দীল হুজুরী নামাজ পড়।
কাবা অর্থ সুন্দর বস্তু, কেবলা অর্থ সামনে তোর
মন তোর হুজুরে হাজির থাকিলে, দেখবে নামাজ কি সুন্দর।
ভেদ বিষয় জেনে শুনে, যাকাত ছালাত আদায় কর
কায়েম অর্থ দাঁড়া করা, (নামাজ) কে আয়না রুপে সামনে ধর।
এই নামাজ মমিনের মেরাজ, বলছেন দীনের পয়গম্বর
আচ্ছালাতু মেরাজুল মুমেনীন বলে, হাদিসে দিলেন খবর।
আত্তাহিয়্যাতু পড়ে, আত্মাকে আহুতি কর
হবে আত্মার শান্তি, পাবি মুক্তি, পূর্ণ নামাজ হবে তোর।
রজ্জব কয় নামাজে বসে, আপনাকে বিলীন কর
হবে এই নামাজেই মিশামিশি, জন্ম মৃত্যু বারণ তোর।
সংগীত – দম নহে বাতাস
লেখক – ফকীর আতিকুর রহমান চিশতী
দম নহে এই বাতাসের নাম
দমের টানেই বায়ু চলে,
হাইউন দমে পরোয়ারে
খেলছে খেলা সরোবরে।
নিস্তি হতে হাইউনের দম
দরিয়াতে হয় সিন্ধু দম,
মৌজ হোবাবে হয় বিন্দু দম
বোরখায় আদম চেতন করে।
ইদম দমে টানিল দম
বায়ু চালায় চঞ্চলা দম,
জাহানী অজুদে হরদম
বইছে বাতাস ‘হু’ এর সুরে।
আগুন পানি মাটির ভাগ তার
আট ভাগে তা চব্বিশ হাজার,
বায়ুতে হয় খেলাফত যার
দম সাধনা সেই তো করে।
ফকীর আতিক বলে ভাঙনের পাড়
এক দম হলো চারটি আকার,
অখন্ড দম সিদ্ধি হয় যার
সে কি মরার দেশে ঘুরে।
কবিতা – উন্মোচন
লেখক -দাউদ আহমেদ চিশতী
শিকড় হতে শাখা যত, দেখনা করে বিচরণ
দেখতে মানা এমন কথা, নাই কোথাও বিবরণ।
হয়তো কেহ থাকতে পারে, নাই ইহাতে পরিচয়
তাই বলে তো হাটছে যারা, ভয় দেখানো সঠিক নয়।
ফকির হতে সাধ যাহাদের, করতে ছাফার উন্মোচন
সুফিবাদে আপন খবর, জানতে কেহ নির্বাসন!
আকাশ বাণীর অসীম রূপ, সসীম দেহে সর্বদায়
সসীম রূপের ধ্যান করে যে, অসীম প্রাপ্তির অভিপ্রায়।
অসীম দেহ প্রকাশ হল, পঞ্চ ভাগে চেহেলতন
শিকড় হতে শাখা যতো, দেখনা করে উন্মোচন।
হয়তো কেহ বলতে পারে, আপন খবর কি’বা হয়
বলতে মানা নাই তাহাদের, মান-আরাফার পরিচয়।
শুদ্ধ জ্ঞানে ভক্তি ধ্যানে, স্বরূপেতে যার আঁখি
চিনতে পারে সেই মহাজন, সসীম দেহের প্রাণপাখি।
অনিত্য সংসার বিনে, নিত্যের জ্ঞান হয়কি আর
কলেমা রূপী বৃক্ষ আমি, শিকড় শাখা সবি তার।
সংগীত – মরণের আগে মরে
লেখক -জসীম উদ্দিন চিশতী
মরণের আগে মরে, খোদার যত আশেকান
মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে তারা, হয়রে খাঁটি মুসলমান।
মরার আগে যেজন মরে, হিসাব তার নাই কবরে
সিরাত ও মিজান হাশরে, থাকবে না সে পেরেশান।
হজ্জ যাকাত আর নামাজ রোজা, আশেক বান্দার হয় না ক্বাজা,
নফসের তারা করে সাজা, কলেমায় রেখে ঈমান।
হয়না তাদের মরণ জ্বালা, তারা আগেই পুড়ে হয়েছে কালা
আশেক ও মাশুকের খেলা, বুঝবে নারে যে অজ্ঞান।
জসিমের মরতে বাসনা, ষড়-রিপুর দোষে হয়না
মুর্শিদ লতিফ দয়া করবে কিনা, হইয়া কিঞ্চিৎ মেহেরবান।
অনুবাদ – ভালোবাসার চল্লিশ সূত্র, ৩য় ও ৪র্থ পর্ব
মূল – এলিফ শাফাক হতে
অনুবাদ – লাবিব মাহফুজ চিশতী
পর্ব ০৩
কি করে তাঁকে আবদ্ধ করো ইট পাথরের জঞ্জালতায়? যিনি সর্বত্র বিরাজিত! যার কৃপাদৃষ্টি তলেই প্রবাহিত হয় অনন্ত জগত। ধরার প্রতিটি অনুতে অনুতে যার মন্দির! জগতের সকল কিছুর মধ্যে তুমি ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতে পারো। তিনি কোথাও সীমাবদ্ধ নন। প্রেম ভক্তি ও বিশ্বাস দ্বারা নির্মিত একটি দৃষ্টি তাঁকে সর্বদাই দেখে থাকে। প্রভুতো পরম প্রেমোময়। পরম প্রেমোধনে ধনী তিনি প্রেম বিলাতে ব্যাকুল। অনুভূতির তীক্ষèতা দ্বারা বাধো তাঁকে, তোমার হৃদয় মঞ্জরে।
জানতে চাও তাঁর বাসস্থান কোথায়? জেনে রেখো, তাঁকে সন্ধানের কেবলমাত্র একটি জায়গাই আছে। সেথায় তিনি নিত্য বসত করেন। যদি সেথায় খুঁজতে পারো তাকে তবে তিনি অবশ্যই সাড়া দেবেন।
প্রভু বাস করেন সত্যিকার প্রেমিকের হৃদয়ে। তিনি পূর্ণরূপে বিকশিত হন শুধু প্রেমসিক্ত হৃদয়ে। হৃদয় ব্যতিত অন্য কিছু খোদাকে পূর্ণরূপে ধারন করতে পারে না।
ঈশ্বর, একমাত্র বাস করেন প্রেমিকের হৃদয়ে।
পর্ব ০৪
বুদ্ধি ও প্রেমের দ্বন্দ্ব চিরকালের। আমাদের অর্জিত জ্ঞান ও সতর্ক বুদ্ধিবৃত্তি চিরকাল-ই আমাদেরকে জ্ঞানের ও সচেতনতার দেয়ালে আবদ্ধ করে রাখে। চিরমুক্তির পথে তৈরী করে অতীব সুক্ষ বাধা। আমিত্বকে সংরক্ষণ করে চাতুর্যতার সাথে এবং সযতনে। তাই বুদ্ধিবৃত্তিক আচরণ কে অতিক্রম করেই হতে হয় উন্মাদ। হিতাহিত জ্ঞানশুন্য। তখনই হৃদয় হয়ে ওঠে উন্মুক্ত, ভালোবাসাকে গ্রহন করার মতো উদার।
উন্মাদ হও। ভুলে যাও সমস্ত বন্ধন। প্রাণের উন্মত্ততাকে করো তোমার অনন্ত রথ সারথী। শুধু অনুভব করো তোমার হৃদয়ের অনুরাগকে। দয়াময়ের প্রেমকে।
আচরনকে বুদ্ধি দিয়ে নিয়ন্ত্রন করার চাইতে প্রেম দিয়ে উন্মুক্ত করে দেয়াই প্রেমিকের কাজ। দরিয়া যদি হয় ভালোবাসার, সেক্ষেত্রে নিশ্চিতই ডুবে যাও। জীবনকে পরিণত করো অনিশ্চয়তার মরূভূমিতে, সুখের গৃহকোনে নয়।
অনুরাগ দিয়ে বেঁধে রাখো নিজেকে। হ্যাঁ, বার বার ঠকে যাও। চূর্ণ বিচূর্ণ হোক হৃদয় । প্রেমকে ধারন করার জন্য ক্ষত বিক্ষত হৃদয়ই উপযুক্ত। ভাঙা হৃদয়েই বিরাজিত সকল ধন।
বুদ্ধি করে নয়, স্বতঃস্ফুর্ত প্রাণের আবেগ কে করো অবলম্বন, ডুবে থাকো শুধু প্রেমে।
সম্পাদকীয় – মানুষ তত্ত্ব
লাবিব মাহফুজ চিশতী
সৃষ্টির এক অপার বিস্ময় এই মানুষ। জগতের সকল মৌল রহস্যের এক কেন্দ্রিভূত আধার এই মানুষ (ইনছান)। যেখানে পরম পুরুষ তার সকল পারমার্থিক লীলার প্রকাশ ঘটান। স্বয়ং তিনি প্রকাশিত ও বিকশিত হয়ে ওঠেন এই মানুষকে কেন্দ্র করে। প্রেমলীলা প্রকাশের ক্ষেত্র স্বরুপ প্রেমের চাদরে আবৃত করে তিনি স্বয়ং আপনার রুপে রসে পরম মমতায় নিজ হাতে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন এই মানুষকে। মানুষ দর্পনে আপনার রূপ প্রতিভাত হবে বলে।
জগত যেখানে মগ্ন প্রভুপ্রেমে সেখানে স্বয়ং প্রভু মত্ত মানুষ প্রেমে। প্রবলভাবে মানুষ সাপেক্ষ প্রভু মানুষতত্ত্বে নিহিত রেখেছেন তার স্বরুপ তথা স্ব-পরিচয় বা এলমে মারেফত বা এলমে লাদুন্নী যাকে আমরা বলি সিনার এলেম তথা মানুষের জ্ঞান। অর্থাৎ – মানুষেই নিহিত খোদা। খোদাকে জানা কেনো জ্ঞান নয় বরং প্রকৃত আল্লাহর মারেফত হলো মানুষকে জানা। মানুষ চেনা হলেই হবে আল্লাহকে চেনা যাকে বলা হয়েছে মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু; আরিফ নাফসাকা তাইরিফ রাব্বাকা; আত্মনং বিদ্ধি; know thyself; ইত্যাদি।
মানুষতত্ত্বেই নিহিত প্রকৃত সত্য। মানুষ; মানুষ হয়ে উদ্ঘাটন করে সেই মহাসত্যের দ্বার। যাকে বলা হয় ‘ফাতিহাতুল কিতাব’। কামনা বাসনা বিবর্জিত মোহমুক্ত চরম নিরপেক্ষ একজন শুদ্ধ ও পবিত্র মানুষই হলো মহান আল্লাহর হাকিকত। যার মাধ্যমে উন্মোচিত হয় প্রভুর আসরার তথা রহস্য। তাই বলা হয়েছে “আল ইনসানু সিররি ওয়া আনা সিররুহি”। সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র মানুষই পূর্ণাঙ্গ সৃষ্টি যার মাধ্যমে মহান প্রভু যথার্থরুপে নিজেকে প্রস্ফুটিত করতে সক্ষম। আর এই মানুষের তাফসির তথা বিস্তারিত ব্যাখারুপে নির্মাণ করা হয়ছে সমগ্র জগত।
মানুষকে জানাই হলো প্রভুকে জানা। মানুষের খবর নেয়াই হলো প্রভুর খবর নেয়া। যাকে বলা হয় আপন খবর। আপন খবর প্রাপ্ত হলেই মানুষ স্থিত হবে চিরমুক্তির, চির শান্তির, নিত্যপ্রেমের চির সবুজ অমর লোকে। আর তা অবশ্যই প্রভূগুণে গুণান্বিত ইনছানুল কামেল তথা প্রভুগুরুর চরণে নিজেকে পূর্নরূপে সমর্পন করার মাধ্যমে। প্রভুগুরু সকলের সহায় হোক।
তরিকতের পবিত্র বাণী সমূহ
1.
আমিত্ব রূপ অপসারিত হলে অন্তরে খোদার নূর প্রতিফলিত হয়।
– বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র)
2.
আরেফ ঐ ব্যক্তি, যিনি নিজের হৃদয়কে দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের আকর্ষণ থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আর প্রতি মুহুর্তে আল্লাহর হাজার হাজার তাজাল্লি তার মাঝে বিকাশিত হয়।
– হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (র)
3.
আল্লাহ প্রেমিকেরা, আল্লাহ প্রেমে মত্ত থেকে নিজেকে ভুলে প্রভূর অনন্ত রূপের ধ্যানে মগ্ন হয়ে যাও।
– হযরত শেখ সাদী (র)
4.
সবটুকু মন সম্পূর্ণ উৎসর্গ করার পর দেখি পরম আপনরূপে মূর্তমান আমারই মাঝে।
– হযরত আমির খসরু (র)
5.
খুদিকে এইরুপ উন্নত করো যে, তোমার প্রতিটি ভাগ্যলিপি লেখার পূর্বে খোদা যেনো তোমায় শুধান, কি তোমার অভিপ্রায়?
– আল্লামা ইকবাল (র)
6.
জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজনালয়,
ওই এক খানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়।
– কাজী নজরুল ইসলাম (র)
7.
খোদপ্রাপ্তি মুল সাধনা, রাসুল বিনে কেউ জানে না
জাহের বাতেন উপাসনা, রাছুল দ্বারা প্রকাশিলে।
– লালন শাহ ফকির (র)
8.
নিরিখ বান্ধরে দুই নয়নে, ভুইলো না মন তাহারে
ঐ নাম ভুল করিলে যাবিরে মারা, পড়বি রে বিষম ফেরে।
– ফকির কালু শাহ (র)
9.
কি সুরত বানাইলে খোদা রূপ মিশায়ে আপনার
এই ছুরত দোজখে যাবে, যে বলে সে গোনাহগার।
– জালাল উদ্দিন খাঁ (র)
10.
যদি নিত্যধামে যেতে থাকে বাসনা, অনিত্য দেহ থাকিতে নিত্যের করন হবে না।
– দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী চিশতী নিজামী (র)
11.
দেহ-আত্মা অবিচ্ছিন্ন, ইহকাল-পরকাল অবিচ্ছিন্ন
মোহকামাতুন আয়াতের নূরের কোরান আর আহলে বায়াত অবিচ্ছিন্ন।
– ফকির চিশতী নিজামী (র)
12.
নির্জনে থাকিলে হয় ঈশ্বরত্ব বোধ
নির্জনে সাধনা করো পাইবে প্রবোধ।
– মহর্ষি মনমোহন দত্ত
13.
যারা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত তথা সিবগাতাল্লাহ এ ভূষিত তথা প্রভুসত্ত্বার বৃত্তিতে সিক্ত, তারাই ধার্মিক।
– হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী
14.
আপন সত্ত্বায় সেই পরম সুন্দরকে যেদিন তুমি জাগিয়ে তুলতে পারবে, সেদিন তুমি ইনছান হবে।
– হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী
15.
আল্লাহ পাকের গভীর রহস্য তার বন্ধগণের অন্তরে নিহিত থাকে।
– হযরত জুনায়েদ বাগদাদী
16.
বেশি বিদ্যার্জন অপেক্ষা কম আদব শিক্ষাও অনেক ভালো।
– হযরত আব্দল্লাহ ইবনে মুবরক
17.
আরশ থেকে যমিন পর্যন্ত বিশ্বাসী মানুষের হৃদয় অপেক্ষা অন্য কোনো শ্রেষ্ঠ স্থান আল্লাহ সৃষ্টি করেন নি।
– সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ আল তাশতারী
18.
যে আল্লাহকে চিনেছে তার কাছে কোনো কিছুই গোপন নেই।
– হযরত খাজা ওয়ায়েস করনী
19.
যে কারো বন্দীশালায় বন্দী নয় এবং তার বন্দীশালায় কেউ বন্দী নয়, সেই প্রকৃত সুফি।
– হযরত আবুল হাসান নূরী বাগদাদী
20.
পৃথীবি ছাড়িয়ে দূরতম আকাশের ওপারে আমি স্বর্গ নরক খোঁজার চেষ্টা করি। তারপর আমি একটা গম্ভীর কন্ঠ শুনি, “স্বর্গ নরক তোমার ভেতরেই আছে”।
– হযরত ওমর খৈয়াম।
মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির মাসিক আপন খবর, ২য় সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২১ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও লাবিব মাহফুজ চিশতী কর্তৃক সম্পাদিত

