আপন ফাউন্ডেশন

Date:

ফেসবুক
ইউটিউব

আপন খবর – ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা ২০১৮

মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির ত্রৈমাসিক আপন খবর, প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল ২০১৮ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও হযরত খাজা হিমেল শাহ চিশতী নিজামী কর্তৃক সম্পাদিত

শুভেচ্ছা বাণী

বিশিষ্ট কলামিষ্ট, প্রাবন্ধিক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন –
উদার সুফিবাদ বাঙ্গালী সমাজের শত শত বছরের বৈশিষ্ট। শাস্ত্রীয় ইসলাম এবং লোকায়তিক ধর্মমতের সঙ্গে কোনো বিভেদ সৃষ্টি না করে মধ্যযুগে আওলিয়া দরবেশ এবং আধ্যাত্মিক সাধকেরা সুফিবাদী দর্শন প্রচার করেছেন। কঠিন সাধনার মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য পেতে চেয়েছেন, একই সঙ্গে ভালোবেসেছেন তার সৃষ্টিকে। মানুষে মানুষে কোনো বিভেদ করেননি তারা। নানা ধর্মের সমন্বিত সংস্কৃতির বাঙ্গালী সমাজে সুফি সাধকেরা যোগ করেন এক উদার মানবতা। জাতি ধর্ম বর্ণ ভাষাভাষি নির্বিশেষে সব মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন তারা।
ধর্মীয় মৌলবাদ ধর্মান্ধতা, সামাজিক অস্থিরতা দিনদিন প্রকট হয়ে উঠছে। সংঘাতময় এই অশান্ত পৃথিবীতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই মতবাদ প্রচার যা মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও ভালোবাসা স্থাপনে সহায়ক। সুফিবাদ বিষয়ক সাময়িকী আপন খবর আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে জেনে আমি বিশেষ আনন্দিত। মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন গঠনে এই সাময়িকী ভুমিকা রাখবে এই প্রত্যাশা করি। আমরা একটি উদার অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের প্রত্যয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। আপন খবর এর মাধ্যমে উদার আধ্যাত্মিকতা, মানবতাবাদ ও প্রেমের বাণী প্রচারিত হলে আমরা একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবো।

আশীর্বাদ বাণী

ঝাউগড়া দরবার শরীফের মহান মুর্শিদ কেবলা হযরত খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী বলেন –
আপন খবর মানে স্বীয় পরিচয়ের সংবাদ বা খবর, তথা সেই আমিকে এই আমিতে খুঁজে পাওয়ার সংবাদ যাকে বলে ঈদ পূণর্মিলনী। যারা স্বীয় পরিচয় লাভ করেছেন এবং সেই চিরন্তন ও শাশ্বত সংবাদ অচেতন বা ঘুমন্ত মানুষকে দিয়ে যাচ্ছেন তারা হলেন চেতন মানুষ বা জাগ্রত বা জ্ঞানী মানুষ তথা মুর্শিদ। আর সেজন্য বলা হয়েছে “লাহুমুল বুশরা ফীল হায়াতিদ্দুনিয়া ওয়াফিল আখিরাহ”। সম্মিলিত তরিকত এ আহলে বাইয়াত বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত আপন খবর কাগজটি নিয়মিত প্রকাশিত হলে পাঠকদের আধ্যাত্মিক চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমি প্রত্যাশা করছি। আমি এ মহৎ প্রচেষ্টার অমরত্ব আশা করছি।

সম্পাদকীয় – আপন খবর ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা

আপন খবর পত্রিকার সম্পাদক হযরত খাজা হিমেল শাহ আল চিশতী নিজামী বলেন –
কে আমি? এ আদিম আত্মজিজ্ঞাসার মীমাংসায় মানুষকে চলতে হয়েছে সূদীর্ঘ পথ। জীবন কে তুচ্ছ জ্ঞান করে আমি’র সন্ধানে বেড়িয়ে পড়া মানুষেরাই পেরেছে মহাসত্যের রস আস্বাদন করতে।
আধ্যাত্মিক জীবন চেতনার উন্মেষ যদি প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের মনন ক্রিয়ায় জায়গা করে নিতে সক্ষম হয় তাহলে ধর্মের নামে অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষেরা খুঁজে পাবে প্রকৃত মনুষত্বের সরল সুপথ তথা আপন খবর। ধর্মের শাশ্বত মর্মমূলে প্রোথিত আহ্বান কে প্রতিনিয়ত অস্বীকারের মধ্য দিয়ে মানুষকে মূলত চিন্তাশুণ্য এক চেতনাহীন প্রাণীতে পরিণত করা হয়েছে। অলীক ও অবাস্তব কল্পনাশ্রয়ী ধর্ম, মানবতাকে করেছে মূমুর্ষ, অবদমিত।
আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে মানুষকে বাধাগ্রস্থ করা হয়েছে এজিদ মুয়াবিয়া প্রবর্তিত ওহাবী মার্কা অসার ধর্মকে উপজীব্য করে। দ্বীনে মোহাম্মদীর শ্বাশত ভিত্তি হোসাইনি ইসলামের সুমহান আত্মত্যাগের গৌরব গাথা ভুলে অধিকাংশ মানুষ ধর্মের নামে ওহাবী এজিদী প্রতারণাকে ধরতে না পেরে নিজেদের শামিল করছে পথভ্রষ্টতায়।
সময় হয়েছে সত্যকে জানবার। নিজের পরিচয় খুঁজে পাবার। প্রতিদিনের অসংখ্য খবরের ভিড়ে যদি আপন খবর টিই চাপা পড়ে যায় তাহলে জিবনের স্বার্থকতা কি?
নিজেকে জানা-বোঝা-চেনার প্রবল বাসনায় যারা চেতনার আর্শীতে অবলোকন করতে চায় স্বরুপের সন্ধান, মুর্শিদ চরণে আশ্রয়ই হোক তাদের একমাত্র আরাধ্য ঠিকানা।
আর তাই এ মহাসত্য উজ্জীবনের প্রয়াসে সুফি দর্শনের ভাবধারায় প্রকাশিত ত্রৈমাসিক আপন খবর কাগজটি মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির চর্চাকে শাণিত করবে এ প্রত্যাশা আমাদের।
পরিশেষে মহামতি সাঁইজি লালনের আধ্যাত্মিক আহ্বানের সুরে সুর মিলিয়ে বলি…
এ বেলা তোরআপন খবর, জেনে নেরে মন।

প্রবন্ধ – দ্বীনে মোহাম্মদী ও আহলে বাইয়্যেত

লেখক – কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী

দ্বীনে মুহাম্মদী ও আহলে বাইয়্যেত অবিচ্ছিন্নভাবে আছে। আহলে বাইয়্যেতের মাধ্যম ছাড়া দ্বীনে মুহাম্মদী প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। আর দ্বীনে মুহাম্মদী কায়েম না হলে মানব সুরত ভেঙ্গে জাহান্নামী সুরত নিয়ে দোযখে বাস করতে হবে। শাস্ত্রে বর্ণিত কালাম হলো- অন্যান্য নবীদের অনেক উম্মতের চেহারা পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু উম্মতে মুহাম্মদীর সুরত পরিবর্তন বা বিকৃত হবে না। এর কারণ কি? কারণ, যারা উম্মতে মুহাম্মদী তারা মুহাম্মদী দ্বীনকে ধারণ করেছে তথা স্বীয় সত্তায় কায়েম করেছে বিধায় তাদের চেহারা পরিবর্তন হবে না। অর্থাৎ তারা আল্লাহর সুরতে কায়েম হয়ে আছে। “দ্বীনে মুহাম্মদী হলো যে দ্বীনকে ধারণ করলে মানব সুরত কায়েম থাকে।” অর্থাৎ হায়ানী আত্মার জগত থেকে বের হয়ে ইনসানী আত্মাতে কায়েম হয়ে যাওয়া। দ্বীনে মুহাম্মদীই হলো ইসলাম। এজন্যই বলা হচ্ছে- “ইয়া আইউহাল্লাজিনা আমানুদ্খুলু ফিসসিলমি কাফফাতান” অর্থাৎ- হে তোমরা যারা ঈমান এনেছ! ইসলামের মধ্যে পরিপূর্ণ রূপে দাখেল হও তথা প্রবেশ করো বা ইসলামে কায়েম থাকো (সুরা বাকারা- ২০৮)।

‘মানুষের এক নাম মুহাম্মদ।’ মুহাম্মদের দ্বীনের ভিত্তি হলো মিল্লাতে ইবরাহীম। “মিল্লাতে ইবরাহীম হলো আল্লাহকে দেখে বিশ্বাস করা।” কাজেই যারা আল্লাহর অনুমতি নিয়ে ঈমান আনে নি তারা ঈমানদার নয়, মুসলিম নয়। আর ঈমানদার না হলে দ্বীনে মুহাম্মদীর মধ্যে দাখেল হওয়ার কোনো সিষ্টেম নেই। যারা আল্লাহর অনুমতি নিয়ে ঈমান এনেছে তাদের প্রথম কাজই হলো আগুন বস্তুর নফস আম্মারার ফেলগুলো তথা শয়তানের গুণখাছিয়ত হতে বের হয়ে যাওয়া (সুরা বাকারা- ২০৮)। আগুন বস্তুর আত্মা হায়ানী। পশু আত্মার সিরাতের মাঝে অসংখ্য সুরত নিহিত আছে যারা ঐ সিরাত ধারণ করছে মৃত্যুর পর তাদের মানব সুরতকে পরিবর্তন করে দোযখী সুরতে তথা পশুর সুরতে কায়েম করে দেয়া হবে অর্থাৎ সুরত বদল করে দিবে।

উম্মতে মুহাম্মদীগণ সেই শয়তানের ফেল হতে মুক্ত হওয়ার সাধনায় কামিয়াবী বিধায় উম্মতে মুহাম্মদীগণের সুরত পরিবর্তন হবে না। আল্লাহর সিরাত হতে মানুষের সুরত সৃষ্টি আবার হায়ানী সিরাতের কারণে সুরত বদল হয়ে যাবে তথা আসফালাস্ সাফলিন হবে (সুরা তীন)। সুতরাং বলা যায় যারা হায়ানী আত্মার ফেলগুলো মনের মধ্য হতে দূর করে দিয়ে ইনসানীয়াত কায়েম করেছে বা করার সাধনা করছে একমাত্র তারাই হলো উম্মতে মুহাম্মদী এবং তারাই দ্বীনে মুহাম্মদীতে কায়েম আছে। কারণ, ইসলাম হলো স্বভাব ধর্ম (আল ইসলামু দ্বীনুল ফেৎরাত)। হায়ানীয়াত হতে ইনসানীয়াতে কায়েম হওয়া মানব ধর্ম তথা ইসলাম বা দ্বীনে মুহাম্মদী। যারা দ্বীনে মুহাম্মদীতে কায়েম আছে তারাই খফির ঘর মুহাম্মদ এবং সে ঘরের বাসিন্দা চারজনকে ধারণ করেছে তথা মানব সুরত কায়েম করেছে তথা আল্লাহর সুরতে কায়েম হয়ে আছে।

কোরানের কালাম হলো “সিফ্গাতাল্লাহ্” অর্থাৎ আল্লাহর রং তথা ঈশ্বরের রং (সুরা বাকারা- ১৩৮)। এ রং হলো আল্লাহর ফেৎরাত বা সিরাত- যা আল্লাহর রহমতপূর্ণ সপ্তগুণ। ইহাই ফেৎরাতে আহসান এবং আল্লাহর ফেৎরাত বা সিরাত হতেই মানুষ সৃষ্টি। আল্লাহর সিরাত আল্লাহরই সুরত প্রকাশ করে। যেহেতু সৃষ্টি মানেই অবিকল প্রকাশ আর মানুষ হলো আল্লাহর সৃষ্টি, কাজেই মানুষ আল্লাহর অবিকল প্রকাশ। ইহাই হলো আহসান সুরত। এই সুরত হেফাজত করাই মানুষের সাধনা। এজন্য কোরানের কালাম হলো- “ফেৎরাতাল্ লাহিল্লাতি ফাতারান্ নাসা আলাইহা” (সুরা রুম- ৩০) অর্থাৎ আল্লাহ যেই প্রকৃতির (ফেৎরাতের) উপর মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন, তা-ই তো তাদের জন্য আল্লাহর একমাত্র ফেৎরাত। আল্লাহর সেই ফেৎরাত হারানোই পাপ আর সেই ফেৎরাত ধারণ করাই হলো পুন্য, ধর্ম। পুণ্যের ফল মানব সুরতে কায়েম থাকা তথা ইল্লিনে বাস করা। ইল্লিন এবং সিজ্জিন মুর্কারাবুন ব্যক্তিগণ দেখতে পাবে (সুরা মুতাফ্ফিফিন- ২১)।

যারা দ্বীনে মুহাম্মদীতে দাখেল হয় নি বা উম্মতে মুহাম্মদী নয় তারা ইল্লিন-সিজ্জিনের পরিচয় পাবে না, শুধু অনুমান-কল্পনায় একটি ধারণা রাখবে। ইল্লিন হলো জান্নাতী জীবন এবং এরাই নগদ বা বর্তমান জান্নাতে বাস করছে (ইয়া আইউহাতুন্নাফসুল মুৎমাইন্নাহ্- সুরা ফজর- ২৭)। মুহাম্মদের সাথেই তার আহলে বাইয়্যেত আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইন কায়েম আছেন- এদেরকে আঁকড়ে থাকাই ধর্ম-কর্ম (সুরা ইমরান- ১০৩)। মুহাম্মদের আহলে বাইয়্যেত ছাড়া সৃষ্টির অস্তিত্ব সম্ভব নয়, আল্লাহর কালাম প্রকাশও সম্ভব নয়। দ্বীনে মুহাম্মদীতে কায়েম না হলে আহলে বাইয়্যেত হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হবে এবং আল্লাহর কালামও নাজিল হবে না বা কালিমুন প্রকাশ হবে না। কারণ, আল্লাহর মতলেক কালাম হুসাইনের জলিতে প্রতিঘাত হয়ে নাতেক হচ্ছে।

মানব সুরতকে কায়েম করতে না পারলে মানুষ প্রথমেই যা হারাবে তা হলো আল্লাহর কালাম বা বাকশক্তি তথা স্বরসতী মানুষের সাথে থাকবে না তথা স্বরসতী উঠে যাবে। মুহাম্মদ হতে হুসাইন এবং হুসাইন আছেন মুহাম্মদী সুরতে। শেষে মুহাম্মদ-হুসাইন এক অজুদ। এজন্যই রাছুলের কালাম হলো- “হুসাইন মিন্নি ওয়া আনা মিনাল হুসাইন” অর্থাৎ হুসাইন আমা হতে এবং আমি হুসাইন হতে। প্রথম মুহাম্মদ হতে হুসাইন পরে হুসাইন হতে মুহাম্মদ। মুহাম্মদ এবং হুসাইনের অপূর্ব মিলন ঘটে মানুষ মোহনায় এসে এবং সেই পাক মানুষে আল্লাহর কালাম জারি আছে। আল্লাহপাক যা দেখতে চেয়েছেন মুহাম্মদের (সাঃ)-এর মাঝে তা দেখার সাথে সাথে নবুয়ত খতম করলেন তথা সৃষ্টির বিবর্তন থেমে গেলো।

হাদিসের কালাম হলো- রাছুল (সাঃ) দু’টি জিনিস রেখেছেন। এক আল্লাহর কালাম- যা কোরান, দ্বিতীয়ত তার পবিত্র আহলে বাইয়্যেত। এরা কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না (মেশকাত- ৫৮৯২-৯৩ নম্বর হাদিস) এবং তা চিরবর্তমান। যারা কোরান আর সুন্নাহ্ বুঝাচ্ছে তারা দ্বীনে মুহাম্মদীর লোক তথা উম্মতে মুহাম্মদী নয়। এরা কোরান থেকে আহলে বাইয়্যেতকে আলাদা করছে তথা খন্ডন করছে। অন্ধ-মূর্খরা বুঝে নি কোরান আর আহলে বাইয়্যেত অবিচ্ছিন্ন অবস্থায় চিরবর্তমানে বিদ্যমান। যারা কোরান খন্ডন করেছে তারা আহলে বাইয়্যেত হতে বিচ্ছন্ন হয়ে গেছে এবং এর পরিণাম হলো দোযখ ভোগ করার জন্য কর্ম লেবাস বদল হয়ে যাবে। যারা আল্লাহর কালামের খন্ডন করেছে তারাই আল্লাহর কৌফিয়তের সম্মুখীন হবে তথা দোযখগামী হবে (সুরা হিজর- ৯৭)।

এই কোরান নবীর আহলে বাইয়্যেত যোগে নাজিল হচ্ছে। এই কোরান কাগজে থাকে না। ইহা আল্লাহর নাজিলকৃত নুরী কোরান তথা আরবী কোরান (সুরা জুখরুফ- ৩)। আর কাগজে লিখিত কোরান- যা কিসসা কোরান বলে বিধৃত আছে তা আল্লাহপাক নিজেই খন্ড খন্ড করে তেইশ বৎসরে নাজিল করেছেন (সুরা দাহর- ২৩)। সুতরাং কোরান খন্ড করা মানে আহলে বাইয়্যেত হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া তথা নিজেকে হারিয়ে ফেলা বা দোযখে নিক্ষেপ করা। কাজেই যে মানুষ দোযখী হবে তার কর্ম লেবাস বদলের কারণে আল্লাহর পাক কালাম তথা আল্লাহু কালিমুন উঠে যাবে। যার দীলে আল্লাহর কালাম আছে সে কখনো দোযখে যাবে না।

এটা মাদ্রাসা হতে কোরান মুখস্তকারী নয়, যাদেরকে তথাকথিত মুসলিম সমাজ কোরানে হাফেজ বলে জানে। এই ধরণের আড়াইশত কোরানে হাফেজ (মুখস্তকারী) ইয়াজিদের দলেও ছিল। এখন আছে লক্ষ লক্ষ। তারা মুসলমান কি না, জারজ কি না (হায়ানী আত্মার অধিকারী) তা জানা বুঝা দরকার। আরবী কোরান আল্লাহপাক নিজেই শিক্ষা দেন (সুরা রহমান)। এই কোরান কোনো মাদ্রাসায় শিক্ষা দেয়া হয় না, তারা এই কোরানের খবরও জানে না। “ফী কিতাবুম্ মাকনুনিন” এর মধ্যে সাতটি নুরের ফলকে ঐ কিতাব লিপিবদ্ধ আছে।

যারা পবিত্র তারা ব্যতীত ঐ কিতাব কেহ পাঠ করতে পারে না, স্পর্শও করতে পারবে না (ওয়াকিয়া- ৭৯)। নবীর আহলে বাইয়্যেত যোগে ঐ কিতাব নাজিল হচ্ছে। “নাজিল হচ্ছে নূরী সাত অক্ষরে আর তা লেখা হচ্ছে নুরী তিরিশ অক্ষরে।” আল্লাহ যাকে কোরান শিক্ষা দেন তখন তাঁর সে বান্দা আল্লাহকে চিনতে পারে এবং একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করে, সেজদা করে। চোখ খুলে দেখো রব রহমান আল্লাহ কিভাবে তার বান্দাদেরকে তাঁর পাক কালাম শুনাচ্ছেন। সে কালাম শ্রবণে ঈমানদারগণ খাঁটি ইনসানে পরিণত হচ্ছেন (সুরা রহমান- ৩)।

আল্লাহর সে বান্দাগণই একমাত্র বলতে পারেন- “ইয়্যাকানাবুদু ওয়া ইয়্যাকানাস্তায়িনু।” অর্থাৎ আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং একমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থণা করি (সুরা ফাতেহা- ৪)। ইয়াজিদ আল্লাহর এ কালাম শুনতে পাবে না, বরং সে এ কালামের অস্বীকারকারী হবে। কারণ, সে আহলে বাইয়্যেত হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যারা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান এনেছে (সুরা ইউনুছ- ১০০) তারাই দ্বীনে মুহাম্মদীতে দাখেল হয়েছে, যারা দ্বীনে মুহাম্মদীতে দাখেল হয়েছে তারাই আহলে বাইয়্যেতকে ধারণ করে মুক্তি লাভ করছে। যারা আহলে বাইয়্যেত হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তারা আল্লাহর কালাম কোরান শ্রবণ করতে পারবে না। যারা আল্লাহর কালামের শ্রবণ হতে দূরে থাকবে তারা অবশ্যই দোযখগামী হবে। সুতরাং মানব জাতির মুক্তির জন্য মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তাঁর পাক আহলে বাইয়্যেতকে ধারণ করতেই হবে। দ্বীনে মুহাম্মদী তথা ইসলামই একমাত্র মানব মুক্তির ধর্ম।

এই ইসলাম গন্ডীভূত কোনো ধর্ম নয়, ইহা মানব জাতির মুক্তির বিধান। রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, ঈসা, মুসা যতো আছে সবার অস্তিত্বে এক মুহাম্মদই আছে এবং এক মুহাম্মদকে ধারণ করেই এই মানব মুক্তির বিধান তথা দ্বীনে মুহাম্মদী প্রচার করছে। প্রত্যেক মানুষের সাথেই পবিত্র আহলে বাইয়্যেত জড়িত আছে।

তারা দ্বীনে মুহাম্মদীতে কায়েম হয়েই মানবরূপে প্রেরিত বা অবতার হচ্ছে। একই পবিত্র সত্তার প্রবাহিত রূপ এরা। পাক মানুষ তথা প্রেরিত বা অবতার বহু হয়ে এক অখন্ডকালে স্থিত হয়ে আছে। প্রেরিত বা অবতার যারা তারা এখন-তখন নয় তারা অখন্ডকালে স্থিত আছে, যুগে যুগেই তারা বর্তমান। তারা বহু হয়েও এক হয়ে অখন্ডকালে অবস্থান করছে। অখন্ডকালে স্থিত হচ্ছে আহলে বাইয়্যেতকে ধারণ করেই। অন্ধ-মূর্খদের দ্বারা যুগে যুগে ধর্ম এবং ধর্ম শাস্ত্রের অপব্যাখ্যা করা হয়েছে তথা মুতাশাবেহাত বা রূপক-কাঠামো দ্বারা ধর্ম প্রচার করা হয়েছে, ধর্ম কিতাবের মুহকামাত বুঝে নি। মুহকামাত বুঝলে দ্বন্দ্ব নিরসন হতো, ঐক্যতায় পৌঁছতে পারতো। মুহকামাত না বুঝার ফলে ধর্ম বিভক্ত হচ্ছে এবং ধর্মশাস্ত্র জাতি-গোত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ হচ্ছে এবং শত শত দল উপদলে মানুষ বিভক্ত হয়ে শেষে ধর্মের নামে অত্যাচার-নির্যাতন, ফতোয়াবাজি, মানুষ হত্যা চালাচ্ছে।

হুসাইনের প্রতিপক্ষ ইয়াজিদ। হুসাইন আর ইয়াজিদের দ্বন্ধ- এটা কোনো অতীত ঘটনা নয়। যেহেতু ধর্ম জ্ঞান হলো আত্মার জ্ঞান তথা আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং সমস্ত ধর্মশাস্ত্র আত্মার জ্ঞান হতেই আগত। কাজেই আধ্যাত্মিক জ্ঞান বা আত্মার জ্ঞানে জ্ঞানী ছাড়া ধর্মশাস্ত্র আর কারো বুঝার সাধ্য মোটেও নেই। এজন্যই আলেম-মোল্লাগণ ধর্ম জ্ঞানী নয়, বরং শাস্ত্র বিদ্যায় অন্ধ-মূর্খ। মহররম মাস কোনো অতীত-ভবিষ্যতের বিষয় অবশ্যই নয়, তা চিরবর্তমান। মহররম হতেই আগত মহররমের দশ। এখানেই হুসাইনের শহীদের স্থান। এই দশই আশারায়ে মোবাশ্শারা।

মহররম মাস হতেই হয় সৃষ্টির সূচনা। কোরানে বর্ণিত বারো মাস চিরন্তণ, শাশ্বত মাস এবং এই বারো মাস মিলে এক বৎসর। এই বৎসরের সুরত-শেকেল আছে। ইহা জাগতিক কোনো মাস নয়। কোরানের মুহকামাত বুঝলে তা জানা যায়। যারা হুসাইনকে চিনে তারা ইয়াজিদকেও চিনে। তবে দ্বীনে মুহাম্মদীতে যারা আছে তারাই একমাত্র চিনবে হুসাইনকে এবং ইয়াজিদকে। ইয়াজিদের অনুসারী হলে কভু হুসাইনকে চিনা সম্ভব নয়। আর হুসাইনকে না চিনলে আল্লাহর কালামকে ধারণ করা মোটেও সম্ভব নয়। যারা আল্লাহর কালামের হেফাজতকারী নয় তারা মানব সুরত হারাবে মানে দোযখী হবে। আর দোযখীদেরকে তাদের চেহারা দেখে চিনা যাবে অর্থাৎ তাদের মানব সুরত পরিবর্তন হয়ে যাবে (সুরা রহমান- ৪১)। আল্লাহর কালামের হেফাজতকারীগণই হলেন কোরানে হাফেজ। আর কোরানে হাফেজগণ জান্নাতী মানুষ। তারা বহু হয়ে এক মানে “হিজবুল্লাহ”।

রাছুল (সাঃ)-এর কালাম- “তোমাদের মধ্যে ঐক্যতা সৃষ্টি করা নামাজ, রোজা, সদকার চেয়েও উত্তম”। এই ঐক্যতা সৃষ্টিকারীগণই হলো “হিজবুল্লাহ” তথা আল্লাহর দল। এই হিজবুল্লাহগণই আল্লাহর রজ্জু তথা আহলে বাইয়্যেতকে ধারণ করে চির মুক্তির দেশে অবস্থান করছে। যারা আহলে বাইয়্যেতকে অস্বীকার করছে তারা মূলতঃ নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছে এবং কোরানের মুহকামাত তারা মোটেও বুঝে নি। যে কোরানের মুহকামাত বুঝে নি সে আল্লাহর কালামের কিছই বুঝে নি। যারা কোরানের মুহকামাত বুঝে তারা আহলে বাইয়্যেতকে বর্তমান চিনতে পারবে।

কোরান বিশ্বাস করা ফরজ, আহলে বাইয়্যেতকে বিশ্বাস করাও ফরজ। কোরান বিশ্বাস করলো আহলে বাইয়্যেত বিশ্বাস করলো না, তারা কুফরী করলো। আমাদের অধিকাংশ আলেম সমাজ এই কুফরীতেই লিপ্ত আছে। ইহাই তাদের অন্ধত্বের পরিচয়, মূর্খতার পরিচয়। এই সমস্ত মূর্খদের বিষবাষ্পে আক্রান্ত আজ মুসলিম সমাজ। পাকিস্তানের জাতীয় কবি আল্লামা ইকবাল বলছেন- “সবাই বলে মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছে। আমি বলি কোথায়? সব দেখি মুসলিম বেশে বানর নৃত্য করছে!”

এ কথা অতীত নয়, বর্তমান। চোখ খুলে তাকালেই দেখা যাবে ধর্মের ছদ্মাবরণে বাহাত্তর কাতারই মুসলিম বেশে উলঙ্গ বানর নৃত্য করছে। এরাই হুসাইনের মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে আছে। একবার মাওলা আলীকে নিয়ে খেজুর বাগানে হাটতে গিয়ে রাছুল (সাঃ) চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। মাওলা আলী (আঃ) কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলে রাছুল (সাঃ) বললেন- “আলী আমি যখন থাকবো না তখন তোমাদের উপর অনেক অত্যাচার নির্যাতন আসবে। তুমি ধৈর্যের সাথে তার মোকাবেলা করিও। মাওলা আলী বললেন- ইয়া রাছুলুল্লাহ! এরা কি নিরাপত্তাসহকারে থাকবে? রাছুল (সাঃ) বললেন, হ্যাঁ! এরা ধর্মীয় নিরাপত্তা সহকারে বাস করবে” অর্থাৎ তারা ধর্মের ছদ্মাবরণে বাস করবে।

বুঝা দরকার রাছুলুল্লাহ (সাঃ) ওফাত লাভের সাথে সাথেই সেই ভবিষ্যত বাণী বাস্তবায়ন হয়েছিল। কারা রাছুল (সাঃ)-এর আহলে বাইয়্যেতের উপর অত্যাচার-নির্যাতন করেছিল! এই ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব কে কে দিয়েছিল! ইতিহাসে তার যথেষ্ট নজীর রয়েছে। এই ধর্মের ছদ্মাবরণে বাস করা এবং তাদের দ্বারা ধর্ম জ্ঞানীদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানোর কার্যটিও বর্তমান। ধর্ম জ্ঞানীরা নির্বাসিত, অন্ধ-মূর্খদের রাজত্ব চলছে মুসলিম সমাজে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান এবং মুসলমান সবার মাঝেই এই অন্ধ-মূর্খ জঙ্গী জঞ্জালগুলো ধর্মের ছদ্মাবরণে বাস করছে। এরা তখন আর এখন মিলে যুগে যুগেই বর্তমান বাস করছে। তুরস্কের জাতির পিতা কামাল পাশা এই ধরণের ধর্মান্ধ- মূর্খ মৌলবাদীদের দাওয়াত করে নিয়ে জাহাজে করে সমুদ্রের হাজার মাইল ভিতর নিয়ে নির্বাসন দিয়েছিলেন আর ঘোষণা করেছিলেন ঐ দ্বীপের কয়েকশত মাইলের মধ্যে যেনো কোনো জাহাজ না ঢুকে, তাহলে জাহাজ ধ্বংস করে দেয়া হবে। এভাবে তিনি ধর্মান্ধদের বিভ্রান্তি ও কুসংস্কার থেকে দেশকে রক্ষা করেছিলেন।

মাওলানা রুমী ঐ সমস্ত অন্ধ-মুর্খদের, মুর্দাদের, উলঙ্গদের পথ হতে বের হয়ে জিন্দা মানুষ শামছ তাবরীজের গোলামী করে জিন্দা হয়ে উঠলেন। জিন্দা হওয়ার আনন্দের বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ তিনি সর্বক্ষণ সঙ্গীত আর নৃত্যের মধ্যেই দিন কাটিয়েছেন। তিনি বলছেন- “ইবাদতের বিভিন্ন পথ রয়েছে, আমি বেছে নিয়েছি গান আর নৃত্য”। যে গান-বাজনাকে তিনি এক সময় হারাম জানতেন, হারাম ফতোয়া দিতেন, চোখ খোলার পর, জিন্দা হওয়ার পর, মাওলানা হওয়ার পর, নিজেকে ফিরে পাবার পর তথা ঈদ পূণর্মিলনের পর তিনি সেই গান-বাজনা আর নৃত্যকেই তার ইবাদত হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছেন। যদিও উলঙ্গ অন্ধ-মূর্খদের তা মোটেও পছন্দ হয় নি, এখনো হয় না অর্থাৎ এরা যুগে যুগে বর্তমান এবং জ্ঞানীদের মোকাবেলায় অবস্থান করছে। এরা জ্ঞানী নয়, অন্ধ-মূর্খ-বধির এই জন্যই জ্ঞানীদের বিরোধীতা করছে।

বুঝা দরকার যখন তিনি ‘ওয়াহেদ আল্লাহ্’ তখন তিনি ‘আমি’। যখন ওয়াহেদ হতে পাকপাঞ্জাতনস্বরূপ হাস্তিতে বিকশিত হন তখন তিনি ‘আমরা’। কোরানের বহু জায়গায় এই ‘আমরা’ কথাটি আল্লাহপাক ব্যবহার করেছেন। ‘আমরা’ বহু বচন হলেও বহু নয়। মুহাম্মদসহ পাকপাঞ্জাতন। অর্থাৎ আল্লাহর হাস্তি পাকপাঞ্জাতন আর পাকপাঞ্জাতনের নাস্তি আল্লাহ। একই বহু এবং বহুই এক। যারা পাকপাঞ্জাতন চিনে না বা মানে না তারা মূলতঃ আল্লাহকেই অস্বীকারকারী এবং জাহান্নামী। কোরানুল করিম সমস্তটাই মুহাম্মদ এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইয়্যেতের পরিচয় তুলে ধরছে- এ ভেদ-রহস্য একজন জ্ঞানীর নিকট বুঝে নিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। যখন নিজেকে চিনতে যাবে তখন পাকপাঞ্জাতন চিনতে পাবে, যখন পাকপাঞ্জাতন চিনবে তখন আল্লাহকেই চিনতে পারবে।

আর আল্লাহকে দেখাই উম্মতে মুহাম্মদীর ছালাত। আর খফির ঘর মুহাম্মদের মাঝে তথা বাকি চারজন তার ঘরের অধিবাসী তথা আহলে বাইয়্যেত। এখানেই ছালাতে খফি ধারাবাহিকতায় এসে হুসাইনী অজুদে মুহাম্মদী সুরতে, ছালাত আহসান সুরত নিয়ে জহুর হচ্ছে। এই জন্যই মুহাম্মদ পাঁচটি ছালাতের অধিকারী এবং মুহাম্মদী সুরতে ছালাত রয়েছে। এই হিজাবে মুহাম্মদীর মাঝেই আল্লাহ আছেন। রাছুলের সতের সুন্নাতের একটি হলো “জুয়িলাত র্কুরাতু আইনী ফিস্সালাত” অর্থাৎ ছালাতে আমার চক্ষু শীতল হয় অর্থাৎ ছালাতটি দেখে শান্তি পাই। পাকপাঞ্জাতনস্বরূপ পাঁচটি ছালাত প্রতিষ্ঠিত আছে মুহাম্মদী অজুদের মাঝে। সেই ছালাতগুলো হেফাজত করার হুকুম আসছে কোরানে (সুরা বাকারা- ২৩৮)। বেলায়েতের আহলে বাইয়্যেতের নবুয়তী রূপই হলো আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইন (আঃ)। এরা হলো উম্মতে মুহাম্মদীর কান্ডারী, নূহ নবীর নৌকা বা নাজাতের কিস্তি। বোখারীর হাদিস হতেও ইহা প্রমাণিত। এজন্যই রাছুল মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর পবিত্র আহলে বাইয়্যেতকে আঁকড়িয়ে ধরার নির্দেশ দিচ্ছেন তার উম্মতদেরকে।

যারা তার পাক আহলে বাইয়্যেতকে আঁকড়িয়ে ধরেছে তারাই মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে, অন্যেরা পথভ্রষ্ট। একদিন হুসাইন আঃ রাছুলের জুব্বা গায়ে দিয়ে দেখলেন বিশাল এক অগ্নি সাগর। সে অগ্নি সাগরের মাঝে অসংখ্য লোক পড়ে মারা যাচ্ছে। আর কিছু সংখ্যক লোক একটি নৌকায় চড়ে নির্বিঘ্নে সাগর পাড়ি দিচ্ছে। সে নৌকাটিই হলো পাকপাঞ্জাতনের নৌকা। যারা এ নৌকায় আরোহণ করছে একমাত্র তারাই নাজাত পাচ্ছে। এজন্যই রাছুল (সাঃ) বলছেন- “মাছালা আহলে বাইয়্যেতী কামাছালা সাফিনাতুন্ নূহ, মান দাখালা ফানাজ্জী” অর্থাৎ আহলে বাইয়্যেতের মাছাল বা উদারহণ হলো নূহনবীর নৌকার মতো, যে এই নৌকাতে আরোহণ করবে সে-ই নাজাত পাবে।

ইয়াজিদের দল কখনো এ নৌকায় আরোহণ করতে পারবে না, নৌকায় আরোহণ করতে হলে দ্বীনে মুহাম্মদীতে দাখেল হতে হবে তথা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান আনতে হবে, আহলে বাইয়্যেতের সাথে অবিচ্ছিন্ন থাকতে হবে। যারা আল্লাহ পরিষদের একজন মানুষের নিকট বা পরকাল প্রাপ্ত একজন মানুষের নিকট তথা অবতার বা প্রেরিত রাছুলের নিকট আনুগত্য বা বায়াত গ্রহণ করলো তারাই আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ঈমান আনলো। মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কালো চাদরের নীচে বাস করছে তাঁর আহলে বাইয়্যেত।

আল্লাহপাক তাদেরকে পবিত্র বলে ঘোষণা দিয়ে সুরা আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াতটি নাজিল করেছেন বিধায় রাছুল (সাঃ)-সহ তাদেরকে পাকপাঞ্জাতন বলা হয়। আয়াতটি হলো- “ইন্নামা ইউরিদুল্লাহা লে ইউজহেবা আনকুমুর রেজসা আহলাল বাইয়্যেতি ওয়া ইউ তাহ্হেরাকুম তাত্হিরা” অর্থাৎ অবশ্যই আল্লাহর ইচ্ছা যে, আহলে বাইয়্যেত হতে সকল প্রকার অপবিত্রতা দূর করতে এবং পরিপূর্ণরূপে পুত পবিত্র রাখতে যতোটুকু রাখার হক তার আছে। এই আয়াতকে “আয়াতে তাত্হির” বা পবিত্রতার আয়াত বলা হয়। এই নৌকা এবং চাঁদর যারা উম্মতে মুহাম্মদী হবে তারা চিনবে এবং ঐ নৌকাতে আরোহণ করে মুক্তিপ্রাপ্ত হবে বা নাজাত লাভ করবে, ভবিষ্যতে (মৃত্যুর পরে) নয় বর্তমানে।

যারা নবীর স্ত্রীগণকে আহলে বাইয়্যেতে গণ্য করে এরা অন্ধ-মূর্খ। দ্বীনে মুহাম্মদী কি জিনিস তা তারা বুঝেই নি। দ্বীনে মুহাম্মদীই একমাত্র ধর্ম এবং ইহা মানব জাতির জন্য বাস্তব মুক্তি বিধান। কোনো গন্ডীভূত জাতি-গোত্রের ধর্ম ইহা অবশ্যই নয়। কারণ, মানুষ মুহাম্মদ সুরতে তৈরী- এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, মুসলমানের কথা বলা হয় নি। কাজেই যারা দ্বীনে মুহাম্মদীর অনুসারী তথা মানব ধর্মের অনুসারী তথা হায়ানীয়াত হতে বের হয়ে ইনসানীয়াতের মাঝে কায়েম হচ্ছে তারাই খাঁটি মুসলমান বা খাঁটি হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান- মূলতঃ এক ধর্মকেই ধারণ করছে তথা এক আল্লাহর ফেৎরাতকেই ধারণ করে চির মুক্তির দেশে অবস্থান করছে, একত্বের ভিতর বাস করছে। ধর্ম ত্যাগ বলতেও কিছু নেই, যা আছে তা হলো হায়ানী আত্মার ধর্ম ত্যাগ করে ইনসানী আত্মার ধর্মকে ধারণ করা, নফসে মুৎমাইন্নাহ্ অর্জন করা। এখানে জাতিগত মুসলমানের নফসের কথা বলা হয় নি বা জাতিগত হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টানকেও বলা হয় নি।

মানুষের নফসের কথা বলা হয়েছে কোরানে। কারণ, কোরান কোনো জাতিগত ধার্মিকদের নয়, কোরান বিশ্ব মানব জাতির জন্য প্রেরিত। গীতা, বাইবেল, তাওরাত, যাবুর ইত্যাদি ধর্মশাস্ত্র মানব জাতির জন্য প্রেরিত। অন্ধ-মূর্খ বধিরগণ ধর্মশাস্ত্রকে জাতি-গোত্রে বিভক্ত করেছে ব্যক্তিস্বার্থের কুমতলবটি বাস্তবায়ন করার জন্য। তারা ধর্ম শাস্ত্রের মুহকামাত বুঝেনি, বুঝেছে মুতাশাবেহাত তথা রূপক, কাঠামো। এজন্যই ধর্ম এবং ধর্মশাস্ত্র নিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদের অন্ত নেই। সেই মতভেদের বেড়াজালে পড়ে হুঁশ-আক্কেল সব হারিয়ে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, ফতোয়াবাজি, জোড়-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন, মানুষ হত্যা চালাচ্ছে। অর্থাৎ মানুষরূপে শয়তানই (ইন্নাহু লাকুম আদুউ্যুম মুবীনুন) ধর্মের ছদ্মাবরণে এসব করে যাচ্ছে। এরাই হলো অসভ্য জাতি, বর্বর জাতি, আহলে বাইয়্যেত হতে বিচ্ছিন্ন জাতি ইয়াজিদ, হায়ানীয়াত হলো এদের চরিত্র। কাজেই মানব জাতির ঐক্যতার প্রশ্নে তথা মুক্তির জন্য আহলে বাইয়্যেতকে ধারণ করে দ্বীনে মুহাম্মদীতে দাখেল হতে হবে। এ ছাড়া মানব জাতির মুক্তি মিলবে না। কারণ, প্রত্যেকটি মানুষের সাথেই আহলে বাইয়্যেত ঐক্যতার নিদর্শনস্বরূপ রয়েছে এবং এই আহলে বাইয়্যেতকে ধারণ করেই মুক্তি লাভ করতে হবে।

প্রবন্ধ – আধ্যাত্মিকতা’র বিকশিত পথ কি?

লেখক – শাহ্ এস এম বাহরায়েন হক ওয়ায়েছী

মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ, এ শ্রেষ্ঠত্ব এসেছে তার মেধা, গঠন ও সুরত শৈলীর কল্যাণে। সে সৃষ্টিকে এমন করে সৃজন করে কুল আলমকে করেছে সুশৃঙ্খল, প্রাধান্য পেয়েছে প্রভুত্বের। মহান আল্লাহ পাক এই মানুষের মননে ছাবেত হয়ে তার প্রশংসার সবটুকু কুড়িয়ে নিয়েছেন। তাই মানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নিজেকে নিংড়ে, মহান আল্লাহ তায়ালার রুপায়নকে অবলোকন করেছেন নির্জন হেরাগুহায় ধ্যানমগ্নতার মধ্য দিয়ে। সেখানে আপন পরিবারের সমন্বয়ে দেখতে পেয়েছিলেন সুন্দর বিশ্বলয় (পাকপাঞ্জাতন)। দূরীভূত হয়েছিল অমানিশা। পেয়েছিল প্রেমময়তায় পরিপূর্ণ নির্ভেজাল এক জীবনদর্শন।

কিন্তু অযাচিতের দুষ্ট থাবা থেকে রেহাই মেলেনি তাদের। হয়তো বা রেহাই চাননি। যদিও আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা সত্য সব সময়ই প্রতিষ্ঠা পাবেই। তবে সংগ্রাম বিহীন নয়। ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা সে বাদ। কর্মময়তা তকদিরের উৎস মূল। সে সত্যকে সঙ্গী করে স্বজনদের সহ নিজকে উৎসর্গ করে দিয়ে আধ্যাত্মিকতা দেখিয়ে গেছেন হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ)। তার আত্ম শুদ্ধিতে ছিলনা কোন ব্যক্তির স্বার্থ। যারা সেই আত্মশুদ্ধিতে নিবেদিত, তারা সব সময় সরলমনা জীবন যাপন করে। মনুষ্যত্ব কি তা তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন। আদি অনাদি কালের মানুষেরা সে আদর্শে লীন হয়ে অহিংস মনোভাব দেখিয়ে দিয়েছেন। আর দেখিয়ে দিয়েছেন সুন্দর আদৌ কি?

সে সুন্দর লাছানী মনের পরিতৃপ্ততার এক বিরল দৃষ্টান্ত। আজ সমাজ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে ভোগবাদীকে পুঁজি করে পশুত্বের আচরণকে সহনীয় করে যে তুষ্টতা, তা কেবল মনুষ্যত্ব হত্যা ছাড়া কিছু নয়। বস্তু মানব সৃষ্ট, আর মানুষ আল্লাহ সৃষ্ট। বস্তু রক্ষা করে মানুষ ধ্বংস এটা কোন ধর্মেই গ্রহণযোগ্য নয়। (ইন্নাদ্বীনা ইনদাল্লাহিল ইসলাম) আর পরিপূর্ণ ধর্মে তো নয়ই। মানুষ হলো নিরাপত্তার পূর্ণ এক প্রহরী। তার দায়িত্ব সকল সৃষ্টিকে লালন করে নিজকে খুঁজে ফেরা। তার কর্তব্য যথাযথ পালন করা। আমরা মানুষ সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র ওয়াকেফহাল হচ্ছি না।

আমাদের উচিত নিজ দোষ থেকে কলুষমুক্ত থাকার প্রয়োজনীয়তায় ওলীয়াম মুর্শিদকে সহায়ক করে আত্মার নির্ভেজাল শুদ্ধতায় এসে মান আরাফায় পৌঁছানো। কিন্তু এখানে এসেও নানা রং বেরংয়ের নীতি কথায় সত্যকে বিশেষণ করে মেরাজ করা বড়ই কঠিন। কারও কারও জীবনে এমনও ঘটে সত্য রাহাতে পৌছাতে (পথভূল হলে) গিয়ে নিজের সর্বস্ব হারিয়ে কূলহীনা হতে হয়। তখনই সত্যপন্থীরা আড়ালে থেকে যায়। চলে যায় তারা একলা চলার নীতিতে। তাই সন্ধানেষু মানুষের দায়িত্ব মোড়কের পরিচ্ছন্নতা দেখে নয়, অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা যেখানে আছে সেখানে গিয়ে আত্মসমর্পণ করা। তাহলে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ কি তা দৃষ্টিতে ধরা পড়বে।

সাগর সম চিন্তাকে আকড়ে ধরে সার্বজনীন প্রতিভার অবলোকনে মানুষ যখন নিবেদিত প্রাণ, তখন অন্যের দোষ ধরা নাগালের বাইরে চলে যাবে (মোশাহেদায় থাকলে)। সেই সময়ই তাকে খুঁজে ফিরবে মানুষ, একটু চিন্তামুক্ত থাকার জন্য। কোথায় একটু নিরাপদ স্থান। যখন কোন পেশীশক্তি বা অর্থশক্তিতে বলিয়ান হয়ে মানুষ তার চালাকি সভ্যতাকে বিকশিত করতে চাইবে (ভালবাসাবিহীন) সেখানে অনাড়ম্বর বিলাস বহুলতা থাকবে কিন্তু বিশ্বাস থাকবে না। আর বিশ্বাসী হতে হলে তাকে হেকমত ওয়ালা হতে হবে। হেকমতওয়ালা কভু জুলুমবাজী করে সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। ইনছানী সভ্যতা মমত্ববোধের সমন্বয়ে তার হৃদে সকলের আসন গড়ে ওঠে, হয়ে যায় সে মোহিত আলমে ঐশীপূর্ণ আলোয় আলোকিত।

তার স্মৃতি কখনো ম্লান বা বিনাশ হয় না। তার সুন্দর মোহনীয় আস্থায়, প্রত্যেকেই খুঁজে পায় স্বতন্ত্র এক মর্যাদা। ভক্তিভরে ঢেলে দেয় জানা-অজানা সমস্ত কথা। পাপ-পুণ্য আলাদা হয়ে ধরা দেয় নির্ভেজাল এক সত্তা। ভয় হীন হয়ে ওঠে মমতার নিগুড়ে রহস্য, প্রভাবিত করেনা, তখন কোন অযাচিত মোহে গৌরবান্বিত হয়ে দেখতে পায় প্রশান্তির পরশতা। লুটিয়ে পড়ে কত শির আদর্শিক সেই পদযুগলে আপনা আপনিই।

একসময় মনে হতো কতই না দূরে? আসলে সে দূর হতেই সর্বদাই থাকে কাছে, অতীব কাছে। এমন নিগুঢ়ত্ব দেখেছি কেবলা ছিল প্রথম জেরুজালেম (রুপক) ঘুরে গিয়ে (সালাতেই) কাবা এলো কেবলা হয়ে (সম্মুখে দুই ধনুকের বাকের সন্নিকটে)। এমন সুন্দরতম মেরাজ কবে হবে? তবে জীবন দাসত্বে চেষ্টা করলে অবশ্যই আয়নাল একিনে ধরা দিবে। আপন চেতনায় অর্জিত হয়ে মধুময়তায় তন্ময় হলেই মসৃণ পথ প্রশস্ত হয়ে যাবে-মিলবে বান্দার অস্তিত্ব নগদ মওলার বাহুডোর। আশেক মাশুক দেখে নিবে এলমে লাদুন্নির জাদুর মূর্ছনা। পেয়ে যাবে কোরানিক ভুবনে রক্ষিত ফলক আপন আপন অস্তিত্বে। ফতোয়া দিয়ে নয়, আদর্শিক এস্কের জোয়ারে উদ্ভাসিত হয়ে দৌড়াবে এস্কের ঘোড়া কারবালার ময়দানে একজন সঠিক মানুষের অন্বেষায়। আলাইছাফি মুসলেমুন হওয়ার জন্য। আমার এ লেখা কথাগুলো সার্থক হবে, আমার ভুলগুলো শুধরে দিলে। হয়তো আরও কিছু সুন্দর কথা অবতারণা করতে পারবো আগামী লেখায়। নিজ দোষ সহসা চোখে পড়েনা, নচেৎ পাশ কাটিয়ে যাই ভালো মানুষের অভিনবতায়। সবার মঙ্গল কামনায় আগামী লেখার প্রেরণার প্রত্যাশ্যায়।

প্রবন্ধ – মহামতি লালন দেশনার উপযোগিতা এবং বর্তমান প্রেক্ষিত

লেখক – আহমেদ কামরুল মোর্শেদ

বস্তুবাদী সমাজ যখন পারিবারিক পরিমন্ডল, আত্মীয়তার বন্ধন, সামাজিক দায়-দায়িত্ব সব ছুড়ে ফেলে আত্মরমণে বুঁদ হয়ে থাকে, তখনও আত্মপরিচয় অনুসন্ধানী চিন্তাশীল যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম হয় না। সভ্যতার বিকাশের পথে সর্বযুগেই এ কথাটি কমবেশি সত্য বলে প্রযোজ্য।

কিন্তু অনাদিকাল থেকেই সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো পথ, সমুন্নত মতাদর্শের কোনো দর্শন তথা লোকোত্তর দর্শন কোনো অবস্থায় কখনোই যেনো কোনো সমাজের পূর্ণ আস্থা, দৃঢ় বিশ্বাসকে সংহত অবস্থায় ধারাবাহিক ভাবে দীর্ঘকাল একত্রিত করে ধরে রাখতে সক্ষমতা অর্জন করছে না।

কারন কায়েমি স্বার্থ বিবিধ পন্থায় অপরিনামদর্শী আত্মকেন্দ্রিক নীতিহীন ভোগবাদিতাকে সুকৌশলে মুখোশের অন্তরালে অথবা প্রকাশ্য বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সামাজিক তথা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নিজস্ব হীনস্বার্থকে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে বারবার সফল হয়েছে এবং মানবমন্ডলীর পরিশুদ্ধ চিন্তাশীলতাকে সর্বদাই এক প্রকার গ্রাস করে ফেলেছে। এরই কুফল এখন মহামারীর মতো ব্যক্তিগত চিন্তা চেতনাকে পর্যন্ত সর্বত্রই প্রায় সমভাবে যেন গ্রাস করে চলেছে।

অথচ মহাকালের স্রোতে মানব সভ্যতার বিকাশের ধারাটি এখন এক তীক্ষ্ণ বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। বস্তুত বস্তবাদী বিজ্ঞানের বিস্তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া দ্বারা এখন গোটা বিশ্ব প্রকৃতিকে বিশাল হুমকির মুখে এনে ফেলেছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্যতা সর্বত্রই বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছে। পারমাণবিক মরনাস্ত্র বিশ্ব মানবতাকে জিম্মি করে ফেলেছে।

অন্যবিচারে পৃথিবি এখন বর্ধিত জনসংখ্যায় ভারবাহনে নাভিশ্বাস তুলছে। বিকল্প ঠিকানা খুঁজতে বিজ্ঞান যখন মহাকাশ অভিযাত্রার প্রতি মনোনিবেশ করেছে, তখনও মানুষ নিজ মনোদৈহিক বিজ্ঞানকে পূর্ণাঙ্গ অথবা বিকশিতভাবে বুঝতে অক্ষম অবস্থাতেই পড়ে আছে।

মহাকাশকে জয় করতে আগ্রহী মানবসভ্যতা নিজ মনাকাশকেই এখনো তেমন একটা বুঝতেই পারেনি। যদিও দেহের কর্তৃত্ব প্রকৃতপক্ষে মনের নিকট, অথচ দেহই যেন মনকে করায়ত্ব করে রেখেছে। আবার দেহের কারাতুল্য সীমাবদ্ধতা এবং দেহধারনের অবমাননাকর বাধ্যবাধকতাকে অতিক্রম করার চিন্তা – চেতনা কখনোই তেমন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে না।

আমরা জানি দেহকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘ বিবর্তনে মানবসত্তার বর্তমান মানসিক উৎকর্ষতাটি বিকশিত হয়েছে। মানবীয় ইন্দ্রিয়সমুহ দেহপাঠ সাপেক্ষে অতীন্দ্রিয়তায় উদ্ভাসিত হবার সক্ষমতাকে সংরক্ষন করে। দেহকে পাঠ করার প্রয়াসে দৈহিক চাহিদাসুহকে সূক্ষ পরিণামদর্শী মন দ্বারা বিচার করা প্রয়োজন হয়।

অর্থাৎ নিমগ্ন মনে দেহের মধ্যে ভ্রমন করার অভ্যাসকে অর্জন করতে হয়। মনোদৈহিক সুসাম্যতাকে প্রতিষ্ঠা করা এবং নিবিড় আত্ম-অনুসন্ধান করা ব্যাতিত মানবসত্তার দেহ ধারন কখনো অর্থপূর্ন হতে পারে না।

বিগত কয়েক হাজার বছর যাবত উপরোক্ত প্রসঙ্গে মহামতি লালন এবং সমমানের অন্যান্যরা বাংলা তথা ভারতবর্ষ ও সংলগ্ন ভৌগলিক পরিমন্ডলে তাঁদের অসামান্য দেশনার আলোকে যথেষ্ট সমৃদ্ধ করে রেখেছেন। অবশ্য বিগত কয়েকশত বছর জুড়েই এর বিপরীতে বিশ্বব্যাপী যন্ত্রসভ্যতার পুঁজিবাদী ভোগবাদিতা প্রবল গতিতে গোটা মানবসভ্যতাকে যেন কার্যত গ্রাস করে রেখেছে। যার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া উপনিবেশবাদী শক্তিদের দ্বারা ভারতবর্ষেও বিস্তার লাভ করেছে।

পুঁজিবাদী ভোগবাদিতা আজকে যখন পরিণামে মানব সভ্যতাকে যাবতীয় ভোগান্তিতে প্রানান্তকর করে তুলেছে, আত্মপরিচিতি তথা অধ্যাত্মবিদ্যার প্রয়োজনিয়তাকে তখন নিরেট বস্তুবাদীরাও স্বীকার করে নিতে একপ্রকার বাধ্য হচ্ছেন। যদিও তাদের চিন্তার পরিধি কেবল ঐহিক সীমানায় সীমাবদ্ধ, তথাপিও শ্রেণিহীন মানবতাবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার চিন্তায় কেউ কেউ পারত্রিক তাৎপর্যকেও এখন কমবেশি বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছেন।

উপর্যুক্ত প্রেক্ষাপটে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-শ্রেণি ইত্যাদি বিভাজনে বিভক্ত গোটা মানব সভ্যতাকে একটি কাঙ্খিত সাম্যতার ভিত্তিতে সুষ্ঠ পরিণতি প্রদানের মাধ্যমে মহামতি লালন প্রদত্ত দেশনাবলী খুবই কার্যকর একটি পথ-পদ্ধতি বলে প্রতীয়মান হতে পারে।

উল্লেখ্য যে, মহামতি লালন দেশনায় দৃশ্যত আত্মদর্শন, নিজ দেহমনকে পাঠ বা নিজেকে পরিপূর্ন জানার মাধ্যমে প্রকৃতার্থে বিশ্ব-ব্রম্মান্ডের সৃষ্টিরহস্য এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্কটিও নিরুপনের দিকনির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। লালন গীতিকবিতার সামগ্রিক একটি রুপরেখার নিবিড় পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে তা সুস্পষ্ট ভাবে প্রতিভাত হয়ে ওঠে।

আরো উল্লেখ্য যে, উনিশ শতকে অবহেলিত গ্রামীন বা সমগ্র বাংলায় লালন গীতিকবিতার মর্মার্থকে সম্যকভাবে উপলব্ধি এবং আত্মস্থ করার সংকুচিত পেক্ষাপটটি একুশ শতকের তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের কারনে বিপুলভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী অনুসন্ধানী পাঠকমাত্রই আজ লালন চেতনাকে সম্যকভাবে উপলদ্ধি করার জন্য সমগ্র বিশ্বের বিজ্ঞানভিত্তিক অগ্রবর্তী ধ্যান ধারনার আলোকে বিচার-বিশ্লেশনের সুযোগ লাভ করেছে।

ফলে লালন দেশনার নিগূঢ় মমার্থটি উদ্ধারের ক্ষেত্রে একটি ব্যাপক সুযোগের সৃষ্টি হয়েছে। লালন গীতিকবিতার নিবিড় পর্যবেক্ষণে আবহমান বাংলার প্রবাহিত মরমিধারা বা সুফিবাদী ধ্যান ধারনার একটি বিকশিত ক্ষেত্রও তাই উন্মোচিত হয়েছে। বলা বাহুল্য যে, নিরাকার থেকে সাকারের প্রলম্বিত পরিভ্রমনটি যে পরিশেষে নিরাকারেই প্রত্যাবর্তনের একটি সুনির্দিষ্ট বিধান এবং এটি সৃষ্টিতত্বের বিকাশ বিজ্ঞান দ্বারা বিশ্ব প্রকৃতিতেই বিরামহীন ভাবে বিধৃত, এরকমটা অনেকেই এখন খোলামেলা ভাবেই বলেছেন।

মানব সত্তার মনোদৈহিক প্রকৃতিতে সম্যক পাঠের মাধ্যমে কার্যত গোটা বিশ্বপ্রকৃতিকেই পাঠ করা সম্ভবপর, এটাও ইদানিং কেউ কেউ বলছেন। অথবা এসব কথা এখন অধ্যাত্মবাদীদের কাছে অন্তত মোটেই নতুন কিছু নয়। বস্তুবাদ এবং অধ্যাত্মবাদ এই সমন্বিত চিন্তা যেন মহামতি লালন দেশনায় বেশ স্পষ্টভাবেই দৃশ্যমান। লালন পন্থি সাধকরা এখন সেরকমটাই প্রকাশ্যে অথবা প্রকারন্তে বলছেন। মহাত্মা লালন ফকির দেশনা হৃদয়ঙ্গমে মানবসত্তার প্রতি বিশ্বপ্রকৃতিতে প্রযুক্ত নিজ দায়িত্বটিও যেন সম্যকভাবে পরিফুষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রবন্ধ – বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও বাউল-ফকির চেতনা

লেখক – আজহার ফরহাদ

বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রথমেই হোঁচট খেতে হবে ধর্ম-আধুনিকতা-প্রগতিশীলতার একটি অপরিণত সহাবস্থানে। যেখানে দাঁড়িয়ে ‘না ধর্মে না জিরাফে’ এমন একটি ভ্রান্তিমূলক সংস্কৃতি-পরিচয় মেলে যার ভেতর অসংখ্য স্ববিরোধিতা ও শেকড়হীনতা বিদ্যমান।

সংস্কৃতির স্বভাবের ভেতর অভাব থাকতে পারে। যে কোনো অভাবের ওপর ভর করে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল কেন? সাংস্কৃতিক স্বভাবের ভেতর আত্মপরিচয়ের অভাববোধের কারণে। এই অভাব একটা সংকটের নাম; না পাওয়া বেদনার হতাশা নয়। এটিকে আরো একটু গভীরে বলা যেতে পারে ‘স্বভাবের অভাব’; অভাবের স্বভাব নয়!

এই ‘স্বভাবের অভাব’ হতে জেগে উঠেছে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনা। এটিকে কেবল আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ‘ডিসকোর্স’ দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। রাষ্ট্র ও জনপদের লোকমানসে প্রবাহিত দীর্ঘ এক ধারাবাহিক জীবন-পরম্পরা যখন আঘাত পেতে থাকে তখনই ব্যাপারটি ঘটে। আমাদের মুক্তির সংগ্রাম তারই ফলশ্রুতি। কিন্তু দেশ-কাল-সময়ের স্বাধীনতাকে আমরা কেন মুক্তি বলবো? এখানে মানুষ কোথায়? প্রকৃতঅর্থে মানুষের মুক্তি কতখানি সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাবে রাজনৈতিক সংগ্রাম ও স্বাধীনতার মূলে সাংস্কৃতিক শক্তিমত্তাকে অনুধাবন করতে পারলে। সংস্কৃতিচর্চা আর সাংস্কৃতিক চেতনা এক নয় মোটেও। চেতনাহীন সংস্কৃতিচর্চার ভেতর চিত্ত-বিনোদন থাকতে পারে, জাগরণ সম্ভব নয়। আর কোনো জাগরণই জেগে ওঠা বা সচেতনতা নয়, যতক্ষণ না আত্মজাগরণ ঘটাতে পারছে। আমরা এখন এই আত্মজাগরণের পথ ও পরম্পরাটিকেই আমাদের আলোচনার মূলাধার হিসেবে দেখতে পারি।

মানুষের আচরণ ও চরিত্রের ভেতর দিয়ে সভ্যতার স্বভাব গড়ে ওঠে। এ স্বভাবের ভেতর যেসব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকে তা যেমন সভ্যতার সম্ভাবনা তেমনি সংকটও। সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলকে থিতিয়ে ওঠা মাখনের মতো বিবেচনা করলে পচে যাওয়া দুধের ছানার ভয়ও থাকে। এখানেই সংস্কৃতির সংকট। বড় বড় সভ্যতার সুবর্ণ সময়েও ভেতরে ভেতরে ঘটেছে অমানবিক, নিষ্প্রাণ, আত্মজাগরণহীন সমৃদ্ধি; যার তলে শেষে মানুষই হারিয়ে গেছে।

উনিশ শতকের পশ্চিমা চিন্তাকাঠামোর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ছিল ‘ঈশ্বরের মৃত্যু’। মানবসত্তার বিকাশে কাল্পনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঈশ্বরভাবনা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এসেছিল। বিজ্ঞানের সত্যানুসন্ধান, ধর্মের জিজ্ঞাসাহীন প্রচলিত কাঠামোকে ভেঙে দিতে তৎপর হয়েছিল। মানুষ চাঁদের আলোয় মুগ্ধ না হয়ে চাঁদকে ছুঁয়ে দেখবার স্বপ্ন দেখেছে। যার ফলে বিশশতকে মহাকাশযাত্রা বা চাঁদে অবতরণের মতো বিস্ময়কর ঘটনা সম্ভব হয়েছিল। উনিশ শতকের বিজ্ঞানমনষ্কতা এবং প্রচলিত ধর্ম-প্রাতিষ্ঠানিকতার আধিপত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে পরবর্তীতে গড়ে ওঠা বিংশ শতাব্দীকে মানুষ পেয়েছে সংগ্রাম ও মুক্তির শতক হিসেবে।

বিশ শতকে এসে বিজ্ঞানচেতনা প্রযুক্তির চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নিজেই যেন ঈশ্বরের স্থান দখল করে বসে। ঈশ্বরচেতনা ও আধ্যাত্মিকতা যেমন ধর্মকাঠামোর ভেতর হারিয়ে যায় তেমনি বিজ্ঞানচেতনাও প্রযুক্তির অমানবিক উন্নয়নে কোথায় আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। বিশ শতকে দেখা যায় ‘মানুষই মৃত’। মানুষের মুক্তি ধর্মের বদলে বিজ্ঞান দিয়েও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আজকের একবিংশ শতক আমার কাছে উনিশ শতকের ‘মৃত ঈশ্বর’ ও বিশ শতকের ‘মৃত মানুষের’ পুনর্জাগরণের সময় হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

চার্চ, পুরোহিত, মোল্লাতন্ত্রে বন্দী যে ঈশ্বরকে আধুনিক মানুষ মৃতজ্ঞান করেছে; পুঁজি, বাজার অর্থনীতি, প্রযুক্তিবিদ্যার অমানবিক সমৃদ্ধিতে যেখানে ব্যক্তিসত্তা গৌণ ও মূল্যহীন কর্পোরেট দাসে পরিণত হয়েছে, মৃতবৎ সে মানুষকে যৌথভাবে জেগে ওঠা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এই প্রয়োজন মানুষের ভেতর আত্মবিশ্বাস ও আত্মসংগ্রামের। মানুষ যে অর্থহীনভাবে ধর্ম ও বিজ্ঞানচিন্তার সংঘর্ষে ক্ষত-বিক্ষত অসহায় প্রাণীতে পরিণত হচ্ছে সেখান থেকে তার মুক্তির প্রয়োজন। এ উভয়সংকট হতে না বেরুতে পারলে তার জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমৃদ্ধি কোনো সফলতা বয়ে আনবে বলে মনে করতে পারি না।

পশ্চিমা সভ্যতার এই উন্নয়ন প্রকল্প যে সংকটকে সঙ্গী করে বেড়ে উঠেছে সেখান থেকে সহজে বের হওয়া তার জন্য সম্ভব হয়ে ওঠেনি। অনগ্রসর ও প্রান্তিক বিশ্বেও এর প্রভাব স্বভাবতই পড়েছে, সেখানে ঘটনাটি ঘটেছে আরোপিতভাবে। রাষ্ট্র ও সমাজপ্রকল্পের বিভিন্ন মডেল অনুসরণ করতে গিয়ে একদিকে ধর্মান্ধতা অপরদিকে অন্ধ-প্রগতিশীলতা মানুষকে ভেতরে ভেতরে রসহীন, অনুভবহীন, দুরন্ত রোবটে পরিণত করেছে। আমরা দেখছি নিষ্প্রাণ রোবটদের আদর্শ ও মতবাদের সংঘাত, মানুষের পায়ের আওয়াজ যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্তর্গত সভ্যতার দিকে না গিয়ে মতাদর্শিক সংঘাতময় অপসংস্কৃতির সংকট তৈরি করছি। পশ্চিমের নিজস্ব বিকাশের পথটিকে পোশাকের মতো পরিধান করে অগভীর সভ্য হয়ে ওঠা–একে সংস্কৃতির সংকট না বললে আর কী বলবো?

মানবিক পৃথিবীর জন্য সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল কতখানি জরুরি তা বিবেকবান মানুষমাত্রেই উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু সংস্কৃতি বলতে আমরা কী বোঝাচ্ছি; তা কি কেবল উপভোগ করে সময় কাটাবার বস্তু নাকি এগিয়ে যাবার, উদ্বুদ্ধ হবার অনুপ্রেরণামূলক তৎপরতা সেটি বোঝা দরকার। সংস্কৃতির অন্তঃধর্মকে না চিনতে পারলে সভ্যতার মর্মে পৌঁছানো যায় না। বিরাট সব সভ্যতাকে মানুষ চিনতে পেরেছে, মর্ম উপলব্ধি করতে পেরেছে সংস্কৃতির ধ্যান-ধরন-ধারাবাহিকতা দিয়ে। এটিই সংস্কৃতির ধর্ম, যা মৌলিক জীবনবোধ ও দর্শনের ছায়াস্বরূপ দেশ-কাল-সমাজে প্রতিফলিত হয়। যাকে পারলৌকিক ধর্মকাঠামোর মতো নির্দ্দিষ্ট একটি গন্ডীর ভেতর আবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়, এই তার সৌন্দর্য। মানবসভ্যতার উত্থান-পতনেও এই সৌন্দর্য হারিয়ে যায় না; পৃথিবীর আদিতম সুর হয়ে গেঁথে বসে অপরিবর্তনীয় বিবর্তনের গভীরে।

কিন্তু কথা হলো সংস্কৃতির এই মৌলিকত্ব আসলে কি? কোথা হতে এটি জন্মলাভ করে? ক্ষেত্রভেদে ধর্মের সাথে তার দ্বন্দ্ব ও প্রীতির কারণ কি? কখনো দেখা যায় ধর্মীয় সংস্কৃতির ভেতর তার ঢুকে পড়া, কখনো প্রবল বিরোধ। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকাঠামো যখনই অমানবিক ও আগ্রাসী হয়ে উঠতে চেয়েছে ঠিক তখনই দেখা গেছে কোনো না কোনো সাংস্কৃতিক শক্তি তাকে রুখে দাঁড়িয়েছে। এই শক্তিটি কী?

আমাদের আলোচ্য বিষয় বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বাউল-ফকির সমাজ ও তার গভীর মানবতাবাদী জীবনদর্শনকে মুখ্য ধরা হয়েছে। যার পরিচয় না পেলে সংস্কৃতির নিজস্ব ধর্মকে চিনতে ভুল হবে। আমরা এমন এক জাতি যার রয়েছে বিস্তৃত সাঙ্গীতিক ঐতিহ্য, ভেতরে প্রচ্ছন্ন লোকায়ত ও লোকোত্তর চেতনার সুদীর্ঘ পরম্পরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার একটি আড্ডায় বলেছিলেন, ‘মানবপন্থী বাংলাদেশ প্রাচীনকালেও ভারতের শাস্ত্রপন্থী সমাজ-নেতাদের কাছে নিন্দনীয় ছিল ‘ তার মানে বাংলাদেশ চিরদিনই শাস্ত্রগত-সংস্কারমুক্ত। বৈষ্ণব ও বাউলদের মধ্যেও দেখা যায় সেই স্বাধীনতা। তাদের সাহিত্যে ও গানে অলঙ্কার বা শাস্ত্রের গুরুভার তারা কখনও সইতে পারে নি। শাস্ত্রের বিপুল ভার নেই অথচ কি গভীর কি উদার তার ব্যঞ্জনা। এদেশের কীর্তন-বাউল-ভাটিয়ালি প্রভৃতি গানে খুব সাদা কথায় এমন অপূর্ব মানবীয় ভাব ও রস সাধকেরা ফুটিয়ে তুলে গেছেন যে কোথাও তার তল মেলে না, কূল মেলে না। অপার মানবীয় ভাবের কোথায় সীমা কোথায় শেষ? প্রাণের মতোই তা সর্বভারমুক্ত ও সহজ তার অতল অপারতার রহস্য।’—ক্ষিতিমোহন সেন; বাংলার সাধনা।

মুহম্মদ মনসুর উদ্দিনের ‘হারামণি’ গ্রন্থের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ আরো বলছেন–
‘আমাদের দেশে যাঁরা নিজেদের শিক্ষিত বলেন তাঁরা প্রয়োজনের তাড়নায় হিন্দু-মুসলমানের মিলনের নানা কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অন্য দেশের ঐতিহাসিক স্কুলে তাঁদের শিক্ষা। কিন্তু, আমাদের দেশের ইতিহাস আজ পর্যন্ত, প্রয়োজনের মধ্যে নয়, পরন্তু মানুষের অন্তরতর গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এসেছে। বাউল-সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের সেই সাধনা দেখি। এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই; একত্র হয়েছে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করে নি। এই মিলনে সভাসমিতির প্রতিষ্ঠা হয় নি; এই মিলনে গান জেগেছে, সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্যে সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলেছে, কোরান পুরাণে ঝগড়া বাধে নি। এই মিলনেই ভারতের সভ্যতার সত্য পরিচয়, বিবাদে বিরোধে বর্বরতা। বাংলাদেশের গ্রামের গভীর চিত্তে উচ্চ সভ্যতার প্রেরণা ইস্কুল-কলেজের অগোচরে আপনা-আপন। কিরকম কাজ করে এসেছে, হিন্দু-মুসলমানের জন্য এক আসন রচনার চেষ্টা করেছে, এই বাউল গানে তারই পরিচয় পাওয়া যায়।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সময়ে, যে কালে এই কথাগুলি বলেছিলেন সেই সময়কাল ও বাস্তবতা আজ নেই কিন্তু বাউলসাধকগণ রয়েছেন স্বমহিমায়। তিনি বাউলসাধকদের শক্তিমত্তা ও বিশেষত্ব সম্পর্কে যে মূল্যায়ন করেছেন তা কেবল ভারতবর্ষ নয় সমগ্র পৃথিবীর বিবেচনায় অত্যন্ত মূল্যবান। বাউল-ফকির সমাজ সময়ের হাল-হকিকতকে কতখানি সমঝদারিত্বের সাথে মোকাবেলা করেন এবং মানুষকে মহত্ত্বর জীবনবোধ ও উপলব্ধির আত্মসংগ্রামে টেনে নিতে চান তা আজকের প্রযুক্তিদাসত্ব ও পুঁজিকৈবল্যর যুগে দাঁড়িয়েও আমরা অনুধাবন করতে পারি।

সূক্ষ্মতম জীবনবোধের সাথে সরস দার্শনিকতা যে পরিমাণ সমৃদ্ধ করেছে বাউল গানকে তা বিরল। বাঙালির এতবড় জাগরণের পরম্পরাটিকে পশ্চিমের দার্শনিক পরাকাষ্ঠার সাথে তুলনাযোগ্য করে তোলেন অনেকেই। কিন্তু এই দর্শনচর্চা কেতাবী নয়, মানুষের অন্তর্গত বিশ্বাস ও উপলব্ধির সাথে মিলিত পরমসত্যের অনুসন্ধানী হয়ে ওঠা, মানুষেরই জয়গান গেয়ে। মনে রাখতে হবে এখানে দেবতার চেয়ে, কল্পিত ঈশ্বরের চেয়ে মানুষই মুখ্য। বাউলের ধর্ম তাই মানুষের আরাধনা করে। যে মানুষকে বাউল সজ্ঞানভাবে ঈশ্বরের প্রতিরূপ ভাবেন, আদমসুরত এখানে স্রষ্টার আদল।

ক্ষিতিমোহন সেন বলছেন,
‘দার্শনিক সব গভীর তত্ত্ব এদেশে প্রচারিত হয়েছে কবিতায় ও গানে। দর্শনে-সঙ্গীতে যে বিবাদ তা এদেশে নেই। বাংলাদেশের বাউলেরা সুরে তালে যে-সব গভীর তত্ত্বগান করেছেন তা আর কোনো ভাষায় বা আর কোনো প্রকারে প্রকাশ করাই অসম্ভব। কাজেই এদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান-কাব্য-সঙ্গীত পরস্পরে পরস্পরকে আশ্রয় করে এগিয়ে চলেছে। ধর্মে ও জ্ঞানে এদেশে বিরোধ ঘটে নি। এই দুয়ের মধ্যে বিরোধ ঘটলে দুঃখের আর অন্ত থাকে না।’ —বাংলার সাধনা; পৃ.২০।

কিন্তু ধর্মে ও জ্ঞানে এখন বিরোধ বিস্তর। এই বিরোধ যত না ধর্মের কারণে তারচেয়ে বেশি অজ্ঞানতা ও সংস্কৃতিহীনতার জন্যে। এত সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরও কেমন করে ঘটে এমন দুর্ঘটনা, তা বিশেষ চিন্তার বিষয়। তবে কি মানুষ এগোয়নি একটুও, পেছনের সংস্কার ও কূপমন্ডুকতাকে আগলে ধরে আছে! ঠিক তা নয়। সময় এগিয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। সময়ই তার সমসাময়িকতার ভেতর থেকে বের করে আনে দারুণ সব স্বর্ণশস্য। আমাদের কেবল তার বাঁক-বদল ও দিকপরিবর্তনকে ধরতে হয়। বাংলার বাউলধর্ম তা সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করে থাকে। বাউল কতখানি সমসাময়িক তা একটি গানে টের পাওয়ার চেষ্টা করি।

ও দেশে মোবাইল এসেছে, চিঠি বন্ধ হইয়াছে
ভালোবাসার কথা এখন আসে বাতাসে।।
আমার অভাবের সংসার
বন্ধুর সনে প্রেম করিলে মোবাইলের দরকার,
ওরে বন্ধে বলছে বেইল নাই আমার মোবাইল না লইলে।।
আমার বন্ধুয়া শোনাইছে
মোবাইল একটা লইলাম হাতে হালের বলদ বেঁচিয়ে,
ওরে মাসে মাসে কার্ড ভরিয়া ঘরবাড়ি গেছে।।
আমার বন্ধু কালাচাঁন
একমাত্র মোবাইল না হইলে বাঁচে না পরাণ
ওরে বন্দে বলছে পোস্ট অফিসতো বন্ধ হইয়াছে।।

সমসাময়িকতার অনবদ্য এই উপলব্ধি সম্প্রতি রচিত বাংলাদেশের খ্যাতিমান কবি নির্মলেন্দু গুণের মুঠোফোন কাব্যের চাইতে অনেক অনেক বেশি সমসাময়িক, দার্শনিকভাবে উপলব্ধ এবং সাধারণ মানুষের নিকটবর্তী। বাউল-ফকির সাধক ও শিল্পীগণ কোনো মতেই জনবিচ্ছিন্ন নন, গণমানুষের উচ্ছ্বাস-আবেগ-ফুর্তিকে উসকে দেবার বদলে তাদের ভেতর একটা গভীরতর জীবনবোধ অনুসন্ধানের চেষ্টা সবসময়ই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। শোনামাত্রই গানটিকে চটুল মনে হলেও ভাল করে শুনতে গেলে সে গভীরের স্পর্শ অনুভব করা মোটেও কঠিন কিছু নয়। এখানেই বাউলের সমসাময়িকতা এবং শক্তিমত্তা। যার পক্ষে সময়ের সকল অভিব্যক্তিকে ধরে ফেলা সম্ভব এবং আখেরে সে সম্ভাবনার দিকে মানবসত্তাকে এমন একটি পথে টেনে নিয়ে যাওয়া যেখানে তার অচেতনা কাটে, আত্মচেতনা জাগ্রত হয়।

কথা বলতে পারাতেই ভাষার জন্ম নয়। ভাষা গড়ে ওঠে মনের ভাব প্রকাশে। বর্ণ ও শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন ভাষায় পরিচয় না, ভাষা তাকেই বলে যা জীবনভাষ্য হয়ে উঠবার কলকব্জা। বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেছে ভাষাভিত্তিক আত্মপরিচয়ের দৃঢ় অবস্থান থেকে। এমন এক জাতি বিশ্বে বিরল। ভাষাতো সকলেরই রয়েছে। বহু ভাষাই আগ্রাসনের করালগর্ভে বিলীন হয়েছে। পৃথিবীর অনেক বড় বড় ভাষার মানুষজন নানানভাবে সমঝোতা করেছেন সে আগ্রাসনের সঙ্গে। কিন্তু বাংলাদেশে তা হয় নি কেন? আমরা ভাষাগত বিশেষত্বের ভেতর দিয়ে অস্তিত্বরক্ষার জন্য জীবনদান করেছি, এ কি শুধুই ভাষার প্রতি প্রেম বা আচ্ছন্নতা? তা নয়।

বাংলা ভাষা যে গড়েপিঠে তৈরি হয়েছে সাধকের হাতে। আদি হতে আদিতম রূপটিকে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় তার সমৃদ্ধি। ছন্দময়, কাব্যময়, গভীর অনুসন্ধানের গূঢ় হতে গূঢ় দার্শনিকতার চর্চা হয়েছে এই ভাষায়। অথচ তা গানের সুরেই। এ ভাষায় প্রাচীনতম ইতিহাস পাওয়া যাবে গানের ভেতর। এখানে ভাষা-গান-সুর একসূত্রে গাথা। তাই আমাদের লিপিবদ্ধ ইতিহাস দুর্বল কিন্তু মৌখিক ইতিহাস সমৃদ্ধ।

মুখে মুখে বয়ে চলা গীতিময় এ ইতিহাস সুগভীর ও আত্মানুসন্ধানী। আমাদের নাথসাহিত্য, চর্যাগান, বৈষ্ণবগীতি এ ধারাবাহিকতার ফসল। কিন্তু যে ভাষার ভেতর এত ঐতিহ্যমন্ডিত দর্শনপাঠ ও জীবনজিজ্ঞাসা রয়েছে গানের মাধ্যমে, তা কেন শিক্ষিত বাঙালি জীবনকে নাড়া দিতে পারে নি? কারণ, এ শিক্ষালাভ আরোপিত ও অনুকৃতিময়। বাঙালির আত্মপরিচয়ের উদাসীনতার এ এক ভিন্ন নজীর। অধিকাংশের কাছে বাউল-ফকিরগণ আত্মভোলা উদাসীন শিল্পীমাত্র। জীবন বহির্ভূত প্রান্তিক উপজীবী। মধ্যবিত্তের বৃহৎ শিক্ষিত সমাজ এই ঐতিহ্য সম্পর্কে মূলত উদাসীন, তার আত্মসংকটের অন্যতম কারণও এটি।

কিন্তু বাউল-ফকির সমাজ প্রান্তিক হয়েও কতখানি অগ্রসর আমরা তা জানি না। তার সাধনা নিছক ব্যক্তিগত সাধনা নয়। তারা মানবজীবন ও মানুষকেই প্রধান অবলম্বন মনে করেন। শাস্ত্র ও ধর্মীয় জটিল ও কুটিলতর আচারসর্বস্বতা হতে মুক্ত মানবতাবাদী দার্শনিক, প্রেমিক, ভক্ত ও দাস। এরা মানুষের দাসত্ব করেন, যে মানুষের ভেতর মনের মানুষের দেখা মেলে। সে মনের মানুষ কোনো বিমূর্ত চরিত্র নয়, ক্ষুদ্র ‘আমি’র ভেতর সুপ্ত থাকা ‘পরম-আমি’; যে ‘আমি’ আমার ভেতর সীমাবদ্ধ নই, সর্ব-আমি’র ঐকতান। সে ঐকতানে একটা বিশ্বময় বিরাট মনুষ্যত্বের অভিন্ন পরিচয় পাওয়া যায়। এ পরিচয়ই বাউলের আরাধ্য, তার ধর্ম। এ কারণে বাউল পরম্পরাকে ‘মানবধর্ম’ আখ্যা দেওয়া হয়।

বাউল আর ফকির একটু আলাদা। বাউল বলে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মাচার, সম্প্রদায় আছে বলে আমি মনে করি না; এ হলো নানান ধর্ম ও মতের মানুষের উচ্চতর আত্মানুভবের মিলনস্থল। এরা পরমতসহিষ্ণু ও লোকায়ত। যেমন করে একজন বৈষ্ণব বাউল হন, একজন শাক্ত বা শৈব বাউল হতে পারেন; এমনকি খুঁজে দেখলে খ্রিস্টানদের ভেতরেও বাউল পাওয়া যাবে, তেমনি একজন ফকির লালন শাহও বাউল। মধ্যযুগের সন্তমত, সুফিবাদ কিংবা বৌদ্ধদের ভেতর বাউল ছিল। বাউলিয়ানা নির্দিষ্ট কোনো আচরণ নয়, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মরমীবোধের বহুবর্ণিল চিহ্নপরিচয় যা মূলত দমসাধনা ও মানুষগুরুর আরাধনানির্ভর বিষয়-বিরাগী সঙ্গীতমুখী পরম্পরা।

রবীন্দ্রনাথ এই বাউলচেতনাকে ‘মানুষের সহজধর্ম’ বলে মত দিয়েছেন। এই চেতনাই বাংলার সবচেয়ে জোরালো ও জনভিত্তিপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক শক্তিমত্তার ভিত্তিমূল। ইসলামের সুফি-ফকিরী পরম্পরার মানবতাবাদী দর্শনের যে প্রভাব বাংলাদেশে সুদীর্ঘকাল হতে বিদ্যমান তার ভেতর দিয়ে সে একই বাউলিয়ানাই প্রকাশ পায়। চরম সাম্প্রদায়িক ও আচারসর্বস্ব ধর্মান্ধতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাউল-ফকিররাই প্রশ্ন করতে ও উত্তর দিতে সক্ষম। তাদের এই সওয়াল-জওয়াব কখনো শাস্ত্রানুগত হলেও যুক্তিপ্রবণ।

বাউল-ফকির পরম্পরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, তা প্রাতিষ্ঠানিকতা দোষে দুষ্ট নয়। বাংলার প্রতিষ্ঠানবিরোধী একমাত্র পূর্ণাঙ্গ শক্তিই এটি। সুদীর্ঘকাল ধরে বাউল-ফকিররা আধুনিক সভ্যতা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের নানান চাপান-উতোর প্রচেষ্টা হতে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছেন। সমসাময়িক জীবন ও জগত সম্পর্কে অংশগ্রহণমুলক ভাবনা রেখেও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নয় কেবল, প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রচিন্তা ও সামাজিকতার সাথেও বিনয়ের সাথে একই দূরত্ব রক্ষা করে থাকেন। কিছুকাল আগে বাংলাদেশের বিদ্বৎসমাজে এমন একটি ভাবনা প্রচলিত ছিল যে বাউলরা বিশেষ করে ফকির লালনের গান সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে; একেবারেই সাধকের সাধনসঙ্গীত।

কিন্তু এ ধারণা নিতান্ত অজ্ঞানমুলক। লোকসমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আত্মিক ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞানতাই এ ধারণার মূলে। এমন চিন্তা আমাদের লোকজীবনের অত্যন্ত সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আঘাত করে এবং গ্রামীন জনপদ ও প্রান্তিক মানুষদের অবমূল্যায়িত করে। আজকের এই পুঁজিবাদী ও কর্পোরেট আগ্রাসনের ভেতর দিয়ে খুব কমসংখ্যক শিক্ষিত মানুষ রয়েছেন যারা বাউল-ফকিরদের তথাকথিত সাধনসঙ্গীতকে সর্বব্যাপকতা দিয়ে দেখতে পান। এর অধিকাংশই নিম্নআয় ও শ্রেণীর। যাদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা সুখকর নয়।

গ্রন্থগত বিদ্যাকে চরম পরাকাষ্ঠা হিসেবে দেখছি বলে লোকজীবনের সুদীর্ঘ সঙ্গীতময় চিন্তা ও জ্ঞানপরম্পরাকে উপেক্ষা করবার ধৃষ্টতা। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা ও গবেষণার পর দেখতে পাওয়া যায় একাডেমিক জ্ঞানচর্চার মাপকাঠিতে দর্জির এক কাপড় বহুবার কাটবার গল্পের মতো গৌণ হয়ে পড়ে বাউল চেতনা। আমরা নিজেরা বিভ্রান্ত ও স্ববিরোধী হয়ে উঠি; না বর্তমান, না অতীত, না ভবিষ্যৎ, না ধর্ম, না আধুনিকতা, না উত্তরাধুনিক ভাবনাপ্রকল্পনা বিশ্বব্যাপী চালু হওয়া কর্পোরেট ধ্যান-বাণিজ্য, না আরব জাতীয়তাবাদী উগ্র ওহাবী মতবাদ, কোনটিই ভালো করে বোঝাপড়া হয়ে ওঠে না। কিন্তু আমরা সাংস্কৃতিক চেতনাকে ধারণ করতে চাই, যে সংস্কৃতির সাথে আমাদের বিস্তর দূরত্ব।

সংস্কৃতির ঘনীভূত হওয়া নিছক কিছু উপাদানকে মন্ডমিঠাইয়ের মতো উপভোগ করতে উদগ্রীব হই কিন্তু দুধেল গাভীটি কোথায় আছে? কি খাচ্ছে? তার প্রতি উদাসীন। রূপকথার ডিমপাড়া হাঁসের মতোই বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিচার করছি। যেন চিরকালই আমাদের সোনার ডিম উপহার দেবে। কিন্তু সে হাঁস যে রক্তমাংসের এবং লোকজীবনের খোয়াড়েই বসত করছে, সে জ্ঞান আমাদের আজও হলো না।

প্রথাগত কিংবা প্রথাবিরুদ্ধ, যে কোনো অর্জনের একটা ধর্ম থাকে। ধর্মহীন কোনো অস্তিত্ব নেই। ধর্ম হলো স্বভাব, ধারণ-আচরণ। তা যখন বৈচিত্র্যকে দমন করতে চায়, সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে। বাউল-ফকিররা ধার্মিক কিন্তু সাম্প্রদায়িক নন। তারা বৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধা করেন, সময়কে ধারণ করেন এবং সামনের দিকে এগিয়ে চলেন। এই সামনের দিকে এগিয়ে চলা মানে সমসাময়িক হয়ে ওঠা, বর্তমান নিয়ে বাঁচা; অতীত বা ভবিষ্যতের কল্পনা-জল্পনা দিয়ে নয়। বর্তমানের মুখোমুখি হওয়া, প্রশ্ন করা এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। তার কাছে দুনিয়াই সারবস্ত্র; এখানেই স্বর্গ-নরক, এখানেই বিচার ও মুক্তি। গৃহ ও সংসারত্যাগী বাউল হওয়া হয়তো সহজ কিন্তু গৃহে ও সংসারে যার বাউলমন সদাজাগ্রত তাঁর পথ বড় কঠিন। পালিয়ে বেড়াবার সুযোগ কই? যুদ্ধই তাঁর নির্বাণের শহীদানা পরিণতি।

আজকের বিশ্বব্যাপী সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ইসলাম ও ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মহড়া ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। বোদ্ধাগণ যতই একে সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক অপশক্তির খেলাচ্ছল হিসেবে দেখুক না কেন, এতো সত্য, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির চরম পরাকাষ্ঠার যুগে বিপুল পরিমাণ মানুষ ধার্মিকতার নামে ধর্মান্ধ এক অপতৎপরতায় যুক্ত হচ্ছে। একদিকে অপরিণত ও আরোপিত ইয়োরোপীয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ অন্যদিকে অচেতন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ধর্মচিন্তার নতুন বিন্যাস আমাদেরকে শঙ্কিত করছে। না বুঝতে পারছি ধর্মনিরপেক্ষতা, না ধারণ করতে পারছি প্রকৃত ধর্মবোধ। অথচ আমাদের নিজেদেরই রয়েছে বোঝাপড়ার লোকায়ত ও লোকোত্তর দেশনা।

ধর্মে ও প্রগতিশীলতায় আমরা এমনই প্রশ্নহীন বোবায় পরিণত হয়েছি যে কথা বলার অন্তর্গত শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছি। লোকসমাজের প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাউল-ফকিরগণ এখনও পর্যন্ত জিইয়ে রেখেছেন সে পরম্পরা, যেখানে আত্মিক ও পারমার্থিক অনুপ্রেরণার মাধ্যমে জীবন ও জগতকে প্রেম ও আত্মজিজ্ঞাসাময় সম্ভাবনার দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া। দার্শনিকভাবে সমাজ ও জীবনকে মূল্যায়ন করা। জীবনের গভীরতা ও অর্থবহতা অনুসন্ধানে বাংলার প্রকৃত বরপূত্র এরাই। বাঙালির সাংস্কৃতিক ধর্মকে চিনতে হলে এর ভেতর দিয়ে যেতে হবেই।

সমাজসচেতনতার রাজনৈতিক ভূমিকায় বাউল-ফকিরদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ। মূঢ় সামাজিকতা ও ধর্মান্ধতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ফকির লালন যে যুগান্তকারী বৈপ্ল­বিক মানবতাবাদী আত্মদর্শনের প্রচার করেছেন তাকে কেবলমাত্র গুহ্য সাধনতন্ত্রের একজন সাধক হিসেবে বিবেচনা করা নির্বুদ্ধিতা। লালন ফকির সেই শিরদাঁড়া খাড়া করবার চেষ্টা করেছেন যা নুয়ে পড়েছিল সমাজ-সভ্যতা-মতাদর্শ-প্রাতিষ্ঠানিকতার ছায়াতলে। এর আগে ফকির মজনু শাহ তৈরি করেছিলেন বাংলার মানুষের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক আত্মসংগ্রামের ভিত। তার আগে কোনো বিদ্রোহ বা সংগ্রাম ভারতবর্ষকে এতটা আন্দোলিত করতে পারে নি। ১৭৬০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪০ বছরের এই ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহই ভারতবর্ষকে বিশেষ করে বাংলার সাধারণ মানুষের মনে আত্মজাগরণের রাজনৈতিক সূচনা ঘটাতে পেরেছিল।

মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা সংগ্রাম, তার সাথে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সেই পুরনো আত্মসচেতন বিদ্রোহচেতনা হতেই আসা। বাংলাদেশের মানুষের লড়াই করবার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য তার সংগ্রামী জীবনকে এতটাই মহত্ত্বপূর্ণ করে তুলেছে যে একটি জাতি একসাথে একটি যোগে যুক্ত হতে বেশি সময়ের প্রয়োজন পড়েনি। সুযোগ্য নেতৃত্ব ও অনুপ্রেরণায় তাকে একতাবদ্ধ করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়নি। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ফকিররা ছিলেন মাদারিয়া সিলসিলার সুফিসাধক।

সমাজকাঠামোর অগ্রহণযোগ্য পরিবর্তন ও বিভেদ-রাজনীতির মূলোৎপাটনে যে সমাজসচেতনার ভিত তারা গড়ে দিয়েছিলেন তা অদ্যাবধি বিদ্যমান। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের লোকজীবনে সুফি-ফকির প্রভাবিত মূল্যবোধের সংস্কৃতি বিরাজমান। আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও আত্মনির্ভরতার হাতেখড়ি এখানেই। এ পরম্পরাটি তারও আগে নাথযোগীদের হাতে তৈরি করা। গোরক্ষনাথ ও মীননাথের চারণভূমি এই বাংলা। নাথযোগী ও সুফি ফকিরীমত এতটাই নিকটতর হয়ে এসেছিল যে পরবর্তীতে গড়ে ওঠা দিগম্বর ফকির বা লেংটা ফকিররা বিশেষ করে সোলায়মান শাহ লেংটার সাধনজীবনকে এরই ধারাবাহিকতা বলে ধারণা করা যায়।

বাংলার আত্মশক্তি অনুধাবণে বাউলচেতনা কতভাবে নানান সাধনা ও জ্ঞানমার্গকে আত্মস্থ করে টিকে আছে আজ পর্যন্ত তা বড় বিস্ময়কর! কিন্তু এই বিস্ময় আমাদের কাছে রহস্যময় এক ধোঁয়াশা অধ্যায় বলে মনে হয়। আমাদের সাংস্কৃতিক শক্তিমত্তার প্রতিকৃতি অঙ্কনে আর কোন কোন চেহারাকে আঁকতে পারি যা এতটা বিবর্তনের ভেতর দিয়েও বর্তমান! পাঞ্জাবে বুল্লে শাহ প্রগতিশীলদের কাছে মহান বিপ্লবী, বাংলায় ফকির লালন বাউলমাত্র। সংখ্যালঘুর প্রগতিচেতনা দিয়ে সংখ্যাগুরুর প্রতিনিধিত্ব হলো অংশীদারিত্বহীন সমাজচিন্তা। যার খেসারত আমরা দিনের পর দিন দিয়ে যাচ্ছি। মত ও পথের সংঘাত যতখানি বড় হয়েছে ততখানি অনুসন্ধানী হতে পারেনি মানুষের মন।

কাল পরিবর্তন ছাড়া মহাকালকে ধরতে পারে না। প্রতিটি কালই একেকটি পরিবর্তনের মাধ্যমে মহাকালে যুক্ত হয়। এই যেমন একটা ছোট পুকুর কতকাল আর টিকে থাকে; কিন্তু বড় বিলের মাঝখানে যেসব ছোট ছোট জলাশয় থাকে তা কখনও মরে না। ওতে সংযোগ থাকে নদীর। কালকে অবশ্যই কোন বৃহত্তর অর্থবহতার সাথে যুক্ত হতে হয় নইলে তা মরে যায়, মহাকালের মহানদী-সঙ্গমে যুক্ত হতে পারে না।

আত্মময়তার সবচাইতে বড় সমস্যাটি হলো তা অত্যন্ত গভীর হতে বাস্তবতাকে ঝাপসা দেখে। কিন্তু যে আত্মসচেতন, সে সমাজ-কাঠামোর সাথে একটি যৌক্তিক সম্পর্ক রাখতে জানে, বুঝতে পারে ঠিক কোন দিক দিয়ে গল্পটা শেষ হবে আর শুরু হবে নতুন কোনো গল্পের। বাউল-ফকিররা কালপর্বের পরিবর্তন সম্পর্কে খুব সতর্ক। এই পরিবর্তন কীভাবে ঘটবে, কে ঘটাবে এসব বিষয়ও তারা আলোচনা করেন। ওদের সমাজবিশ্লেষণের রয়েছে নিজস্ব পদ্ধতি, যা তাঁরা অত্যন্ত সহজভাবে করতে জানেন। পৃথিবীজুড়ে যে অস্থিরতা ও সংকট তার পরিবর্তন কিভাবে ঘটবে সে ফর্মূলা তাঁরা জানেন না কিন্তু এটুকু বুঝতে পারেন যে কাল ঠিক কোনসময়ে তার দিক বদলায়, মহা পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়।

আমরা এমনই এক পরিবর্তনের মহাকাল-দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছি যেখান থেকে সরে যাবার উপায় নেই। কিন্তু খুব কম মানুষই এই পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন।
এখন প্রস্তুতি নেবার সময়। যার পক্ষে যতখানি সম্ভব ঠিক ততখানি নিয়ে রাখা। কিন্তু কথা হলো এটা তো বুঝতে হবে আসলে কি ঘটতে যাচ্ছে। কেউ যদি নাই বুঝতে পারে তবে কি করে ঠিক করবে, সে আসলে কি চাইছে? ধরা যাক, কেউ একজন বললো, আমি মিষ্টি খুব পছন্দ করি; এই কথায় এটা ঠিক পরিষ্কার হয় না যে তা চিনি, না মধু, নাকি মিষ্টান্ন? কেউ মিষ্টি খুব পছন্দ করতে পারেন আবার পায়েসটা নাও করতে পারেন, কারো হয়তো খেজুরের রস ভাল লাগে না আবার তালের রস পেলে কেউ কিছুতেই না খেয়ে থাকতে পারেন না। এটা একটা বিন্দু, যেখান থেকে নানান দিকে তিনি রেখা টানতে পারেন। এই বিন্দুরেখাটি হলো একেকটি মত, যা ওই মূলবিন্দু হতে সৃষ্ট। তাই লালনশাহী ফকিররা যা ভাবছেন, নাথসাধুরা যা ভাবেন, বৈষ্ণবসাধকরা যা ভাবেন, কপ্টিক খ্রিস্টান সাধু কিংবা সুফি ফকিররা যেমন করে ভেবে থাকেন তার ভেতর ওই রেখার পার্থক্যটি থাকবেই কিন্তু বিন্দুটি এক।

এই বিন্দু সম্পর্কে যদি আমরা জানতে চাই; এটি কি আসলেই সমস্ত রেখাগুলিকে উৎসমূলে ধরে টান দিতে পারবে?

কেন নয়? এটাইতো কাল নিয়ে মহাকালের খেলা। এর কেন্দ্রে যা ঘটে, সেখানে এমন একজন এসে দাঁড়ান যখন তার আপনা হতেই সকল গ্রন্থি খুলে যায়। এরকম ঠিক সবসময় হয় না। যখনই কোনো মহামানবের আগমন ঘটেছে যিনি কালপর্বকে যুক্ত করেছেন মহাপরিবর্তনের সাপেক্ষে তিনি হয়ে ওঠেন সেই কেন্দ্রবিন্দুর কর্তা। কালে কালে নানান জাতিতে ঘটেছে এমন ধারা। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটটি ভিন্ন। আজ পৃথিবী এতটাই ছোট হয়ে এসেছে, মানুষ এতকিছু জেনেছে, একে অপরের প্রতি অনধিকার চর্চা এতটাই বেড়েছে যে এখনকার পরিবর্তনটি আর কেবল নির্দিষ্ট জাতির ভেতর সীমাবদ্ধ রইবে না, এটি হয়ে উঠবে সমগ্র পৃথিবীরই পরিবর্তন।

আমরা কি এই পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে? দুয়ারটি খুললো বলে…

প্রবন্ধ – তরিকত চর্চায় মানিকগঞ্জ : প্রেক্ষিত বাঠইমুড়ি শাহী মঞ্জিল

লেখক – শওকত ফরিদ উদ্দিন মাসুদ ইরান

বহুকাল ধরে শুনে এসেছি তরিকত চর্চা তথা আধ্যাত্মিকতার চারণভুমি মানিকগঞ্জ। বাস্তবে সে বিষয়টি জানতে ও বুঝতে পারলাম অতিসম্প্রতি। মানিকগঞ্জ জেলার বিশেষ করে ঝিটকা শরীফকে কেন্দ্র করে গুরুবাদের যে চর্চা শুরু হয়েছিল তার প্রভাব এখন বাংলাদেশের সর্বত্রই লক্ষ্য করা যায়। আর তাই ঝিটকা শরীফ তথা পবিত্র এ আউলিয়া ভূমির প্রতি আমি অবনত মস্তকে ভক্তি ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি।

আমি আমার মুর্শিদের সাথে একাধিকবার ওরশের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছি সিংগাইর এর আজিমপুর ফকির মওলা দরবার শরীফে। রশিদ সরকার দাদার আমন্ত্রণে গুরুজীর সাথে আমরা বেশ কয়েক বছর মানিকগঞ্জের এই দরবারের অনুষ্ঠান উপভোগের সুযোগ লাভ করেছি (তরিকত চর্চায় মানিকগঞ্জ)। আজও তা স্মৃতির পাতায় জ্বলজ্বল করছে। মঈন ভাই (আমার গুরুভাই) এবং আমি ঝিটকা শরীফের মহিউদ্দিন পীর সাহেব হুজুরের কাছে বেশ কিছুদিন যাতায়াত করি। অসাধারন মানুষ ছিলেন তিনি। তার প্রতি জানাই ভক্তি এবং শ্রদ্ধা।

অতি সম্প্রতি যে মহান আউলিয়ার দরবারে উপস্থিত হয়ে আমি অভিভূত হয়েছি সে প্রসঙ্গে বলি। দয়াল বাবা হারুন শাহ প্রতিষ্ঠিত বাঠইমুড়ি শাহী মঞ্জিল দরবার শরীফে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে নিজেকে ধন্য মনে করছি। ভক্ত স্বভাবের যে উন্নত নিদর্শন এ দরবারের ভক্তদের মাঝে আমি প্রত্যক্ষ করেছি তা অন্য কোথাও সচরাচর চোখে পড়েনা। আদব, তমিজ, নম্রতার এক ধারাবাহিক চিত্রই যেন আমি একের পর এক দেখতে  পেলাম। গুরু নির্দেশনার বাইরে এখানে কোনো কাজ সম্পাদিত হওয়ার সুযোগ নেই। এত সুশৃঙ্খল ভাবে সবকিছু সম্পন্ন হচ্ছে অথচ আশ্চর্যের বিষয় এখানে দরবার পরিচালনার কোনো কমিটি নেই। সকল কাজের আদেশ মুর্শিদ প্রদান করেন। ভক্তরা সে কাজ এবাদত মনে করে যথাযথ ভাবে সম্পন্ন করে। যার যে কাজ গুরু নির্ধারন করে দিয়েছেন সে কেবল সে কাজেই মনোনিবেশ করেছে। এত আদব নিয়ে দরবারের গোলামী করতে আমি খুব কম দরবারের ভক্তদেরই দেখেছি।

দরবারের বর্তমান মুর্শিদ হযরত আজাদ ইবনে হারুন। আমি তাকে ভাই বলে সম্বোধন করেছি। অমায়িক স্বভাবের এই মানুষটির রয়েছে সবাই কে আপন করে নেবার এক জাদুকরি ক্ষমতা। আহলে বাইয়াত তথা পাক পাঞ্জাতন এর পরিপূর্ণ অনুসরণ আমি লক্ষ্য করেছি এ দরবারের ভক্তদের মধ্যে। হুসাইনি ইসলামের পতাকা উচ্চে তুলে ধরে, মানুষকে বিষাদময় কারবালার কাহিনী স্বরন করিয়ে দিতে আশুরা পর্ব উদযাপন এ দরবারের অন্যতম ধর্মীয় আয়োজন। হাজার হাজার মানুষ এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করে থাকে। মহররম পর্ব উদযাপনের সময় এ দরবার ও তার ভক্তরা এমন ভাবে সেজে ওঠে দেখলে মনে হয় যেনো এই বুঝি সেই একখন্ড ঐতিহাসিক কারবালা। এখানে ভক্তদের মধ্যে তত্বজ্ঞান নিয়ে তর্কে লিপ্ত হতে দেখলাম না। যা দেখলাম দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো। প্রতিটি ভক্ত নিশ্চল গাছের মত দাড়িয়ে আছে গুরুর আদেশ নির্দেশ পালনের অপেক্ষায়।

আলোচনা ও ফাতেহা পর্ব শেষে যখন তোবারক বিতরন শুরু হলো। আমি বিস্ময়েরে সাথে লক্ষ্য করলাম, কাসেদ লেখা সেবকদের মধ্য থেকে দায়িত্ব প্রাপ্ত যারা, তারা তোবারক বিতরন শুরুর আগে পরম ভক্তিভরে গুরুর হুকুম নিয়ে তোবারব বিতরণ শুরু করলেন। এত আদবের সাথে তোবারক বিতরণ ও গ্রহন আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে হয় না। অতি উচ্চ স্তরের আউলিয়া বাবা হারুন শাহ এর রওজা জিয়ারত করে আমার অন্য রকম এক অনুভুতি হয়েছে, যা বলে বোঝাতে পারবো না। এখানে হিন্দু মুসলমান এসে এক মোহানায় মিলিত হয়েছে। আমার দেখার বাইরেও হয়তো এমন অনেক অদেখা বিষয় রয়ে গেছে যা আমি এত অল্প সময়ের মধ্যে অনুধাবন করতে পারি নি। বিদায় নেয়ার পুর্বমুহুর্তে আজাদ ভাই ভিতরে ডেকে নিয়ে তোবারক হিসেবে কিছু ফলমুল সাথে দিগন্তজোড়া হাসি দিয়ে বলল ‘আবার আসবেন’।

আমি বিদায় নিলাম। কিন্তু বাঠুইমুড়ি শাহী মঞ্জিল রয়ে গেলো আমার মনের মণিকোঠায়।

প্রবন্ধ – সময় দর্শন, আত্মদর্শন ও সত্যদর্শনের পথে

লেখক – মোজাম্মেল হোসেন লুলু

দু’জন কাঠুরিয়া কাঠ কাটার জন্য বনে গেলেন। একজন সকাল থেকে বিরামহীনভাবে কাঠ কাটা শুরু করলেন। অন্যজন কিছুক্ষণ কাঠ কেটে একটু বিশ্রাম নিলেন, আবার কাঠ কাটলেন। কিছুক্ষণ পর খাবার খেয়ে আবার বিশ্রাম নিলেন, তারপর আবারো কাঠ কাটতে শুরু করলেন। প্রথম জন খাবার না খেয়ে, কোনো প্রকার বিশ্রাম না নিয়ে, একটানা কাঠ কাটলেন। বেলাশেষে দেখা গেলো, যে কাঠুরিয়া বিশ্রাম নিয়ে খাবার খেয়ে কাঠ কাটলেন, বিরামহীনভাবে যিনি কাঠ কাটলেন, তার কাঠের ওজন অন্যজনের চাইতে বেশী।

এ ঘটনায় অবাক হয়ে প্রথম কাঠুরিয়া দ্বিতীয় কাঠুরিয়ার কাছে জানতে চাইলেন, “তোমাকে শুধু বসে থাকতে দেখলাম, কাঠ কাটতে দেখলাম কম সময়, আর আমি বিরামহীনভাবে কাঠ কাটলাম কিন্তু তোমার কাঠ বেশী হলো কিভাবে ?” তখন দ্বিতীয় কাঠুরিয়া বললেন, “তুমি কি আমাকে কেবলমাত্র বসে থাকতেই দেখেছো? তুমি কি কখনো দেখনি যে, পরিশ্রম করার ফাঁকে ফাঁকে আমি থেমে কিছুক্ষণ দম নিয়েছি, পাশাপাশি আমি আমার কুড়ালে ধার দিয়েছি। আবার কাঠ কাটার ফাঁকে খাবার খেয়ে নিয়েছি এবং মূহুর্তেই চাঙ্গা হয়েছি।”

আমরা যদি দুই কাঠুরিয়ার এই গল্পের মর্মার্থকে নিগূঢ়ভাবে অনুধাবন করি, তাহলে দেখবো যে, এর মধ্যে আমাদের জন্য মূলবান শিক্ষা রয়েছে। দ্বিতীয় কাঠুরিয়া পরিশ্রম করেছেন কিন্তু ক্লান্ত হননি এবং তার কাটা কাঠের ওজনও প্রথম কাঠুরিয়ার কাটা কাঠের চেয়ে ওজনে অনেক বেশি। প্রথম কাঠুরিয়া শুধুমাত্র কাঠ কাটেননি, ‘সময়দর্শন’কে তিনি নিবিড় মমতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন।

অন্য আর একটা গল্প থেকে আমরা আমাদের জীবনের মূলধনের বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, গল্পটি হচ্ছে: এক ব্যক্তি উঁচু পাহাড়ে আরোহণ করে অনেক কষ্ট করে ঐ পাহাড়ের চূড়া থেকে কিছু বরফ সংগ্রহ করে নিয়ে এলেন বাজারে বিক্রি করার জন্য । লোকটি বাজারে বসে আছেন ক্রেতার উদ্দেশ্যে কিন্তু ক্রেতা মিলছে না, ধীরে ধীরে সূর্যের তাপ বাড়ছে। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। সূর্যের তাপে বরফ গলতে শুরু করেছে, এমন সময় লোকটি ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষন করছে-এইভাবে যে, “হে লোকসকল তোমরা কেউ কি আছো! তোমরা কি দেখছো না যে, কোন একজনের মূলধন গলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।”

পৃথিবীতে “বেঁচে থাকা’র সময়টুকুই আমাদের জীবনের মূলধন। যার এই মূলধন ঠিক থাকবে, সে কখনো পরাজিত হবে না, কখনো দুঃখিত হবে না। জীবনের এই মূলধন ঠিক রাখার কাজে যারাই ব্যস্ত, তারাই সত্যিকারের সাধক, তারাই সত্যিকারের ধার্মিক। সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহারকারীগণই সত্যিকারের জ্ঞানী। আর সময়কে সৎপথে এবং সৎকর্মের মাধ্যমে স্রষ্টার সংযোগের নিমিত্তে সাধনার নামই এবাদত বা বন্দেগী। সুফী সাধকগণ উপলব্ধি করেছেন যে, “সময়দর্শনই জীবনদর্শনের প্রথম সোপান।” আর এ জন্যই মরমী সাধক বাবা লালন শাহ্ ফকির তার গানে বলেছেন, ‘সময় গেলে সাধন হবেনা’।

একশ্রেণীর মানুষ পরকালে বেহেশতে যাওয়ার জন্য ‘ধর্মকর্ম’ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন সারাক্ষণ। অর্থাৎ একশ্রেণীর মানুষ সত্যিকারভাবে আল্লাহকে পাওয়ার জন্য নয়, কেবলমাত্র পারলৌকিক মুক্তির ‘লোভ’ এর কারণে সারাক্ষণ ধর্মকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকেন । অর্থাৎ তারা নিজের জন্যেই সারাক্ষণ ব্যস্ত। তারা এক ধরনের আত্মকেন্দ্রিকতার মধ্যে, বিভ্রান্তির মধ্যে ডুবে আছেন। আত্মকেন্দ্রিকতা নিয়ে জীবনদর্শনের পথে কখনই যাওয়া যায় না। আর এজন্যই সাধকরা মনে করেন, “আত্মদর্শনই জীবনদর্শনের দ্বিতীয় সোপান।”

কোরআনকে যদি আমরা দুইভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তবে তা আমাদের জন্য বুঝতে সহজ হয়ে যাবে। অর্থাৎ মূল কোরআন আর কপি কোরআন। মূল কোরআন অবশ্যই জ্ঞানীদের জন্য। আর কপি কোরআন থেকেই মূল কোরআনের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। এই প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআন মাজিদের সূরা ওয়াকিয়া’র ৭৭-৭৯ নম্বর আয়াতে কোরআন নিজেই নিজের পরিচয় ব্যক্ত করেছে: “ উহা লৌহ মাহফুজে সুরক্ষিত রয়েছে, আর পূতঃ পবিত্রতা ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করতে পারে না”।

যিনি কপি কোরআন সঠিকভাবে বুঝবেন, তার জন্য নিঃসন্দেহে মূল কোরআনের সন্ধান পাওয়ার পথ সহজ হয়ে যাবে। কোরআনের মধ্যেই বলা আছে, কোরআনে: “জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষণীয় নিদর্শন রয়েছে।” যদি কোরআন জ্ঞানীদের জন্য্ই হয়ে থাকে, তবে আগে নিজেকে অবশ্যই সত্যিকারের জ্ঞানী হতে হবে। আর জ্ঞানী হতে হলে একজন জ্ঞানীর কাছেই যেতে হবে এবং এইরূপ জ্ঞানীই হবেন সম্যক পথ নির্দেশক ও সম্যক দিক নির্দেশক ’। আর তিনিই হবেন কোরআনের সত্যিকার নিদর্শন। এমন একজন ‘জ্ঞানী’র সঙ্গে ‘সম্মিলন’ ঘটলেই অহর্নিশি ‘জ্ঞান’ আসতে থাকবে নিজ ভান্ডারে।

আর এজন্যেই সুফী সাধকগণ বলেন, “যিনি জ্ঞান কান্ডারী, তিনিই হবেন জ্ঞান ভান্ডারী।” যিনি জ্ঞানভান্ডারী তিনিই সত্যদর্শনের পথে থাকবেন, আর সত্যদর্শনই জীবনদর্শনের চূড়ান্ত সোপান। প্রকৃত জ্ঞানীর নির্দেশ মেনে সময়কে সৎকর্মে ব্যয় করাই সময়দর্শন, আত্মদর্শন ও সত্যদর্শনের একমাত্র পথ। আর এটাই সত্যিকারের জীবনদর্শন, এটাই সত্যিকারের রিয়াজতী সাধনা, এটাই সত্যিকারের বন্দেগী।

প্রবন্ধ – ত্যাগের অনুশীলনে মোহাম্মদী দ্বীন

লেখক – লাবিব মাহফুজ চিশতী

পৃথিবিতে প্রতিটি ধর্মের বা ধর্ম প্রচারকের আগমন একটি কারণে। আর তা হলো বিশ্ব-মানবতার মুক্তি প্রদান। মানুষ তার আপনত্বে নিহিত পাপবীজ বা কুসংস্কারে স্বভাবতই নিয়ত আবদ্ধ হয়। বদ্ধ-দৃষ্টিতে সে সকল কিছু উপলব্ধি করতে থাকে অন্যায়-অসত্য বা অনাচারের আদলে বা রঙে। মানব সত্তায় নিহিত এ সকল অপবিত্রতা বা খান্নাছকে দূর করে প্রতিটি মানুষ যাতে লাভ করতে পারে সচ্চিদানন্দ, অর্জন করতে পারে নিত্যময় পবিত্র জীবন- সেই লক্ষেই মানুষকে চির মুক্তির পথ দেখাতে যুগে-যুগে ধরাধামে আগমন করেছেন অসংখ্য জ্ঞানী-গুণী, নবী-রাছুল, মুনি-ঋষি সহ সকল মহামানবগণ।

দেশ-ভেদে, জাতি-ভেদে, আচার-আচরন, কৃষ্টি-কালচার  বা জীবনাচার বিভিন্ন রকম হলেও প্রতিটি ধর্ম মুলত একই বীণার সুর। প্রতিটি ধর্মের বাহ্যিক সাজসজ্জা স্বাভাবিক কারণেই বিভিন্ন রকম হলেও বিধান, নিয়ম বা নির্দেশনা একই। আর তা হলো সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, সুন্দর-অসুন্দরের লীলাভূমিতে আসীন হয়ে শয়তান বা খান্নাছ বা স্রষ্টার স্বভাব বিরুদ্ধ ধারণায় আড়ষ্ট রিপুময় মানুষ কি করে মুক্তি লাভ করবে? কি করে মানুষ অনিত্য এ ধ্বংসস্তুপ বা কিয়ামতের করাল ছোবল এড়িয়ে জরা-ব্যাধি-মৃত্যু তথা মানবসত্তার বিপরীত বন্ধত্বের নিয়ামক সমুহের ভয়াল থাবা অতিক্রম করে পৌঁছতে পারে চুড়ান্ত মঞ্জিল বা চির মুক্তি বা চির শান্তির দেশে।

নিছক পোষাক-আশাক বা ঢিলা-কুলুখের ব্যবহার শিখানোর জন্য ধর্মের আগমন ঘটে নাই। ধর্ম শ্বাশত মুক্তি-বিধান। যে মুক্তি হাসিল হবে যুগে-যুগে, দেশে-দেশে, জাতিতে-জাতিতে, প্রেরিত মহামানবের প্রদর্শিত উপায়ে। মোহাম্মদী সত্ত্বায় স্থিত সকল প্রশংসিত পুরুষ জড় স্বভাব ত্যাগ করে ইনছানিয়াতে অধিষ্ঠিত হওয়ার যে শিক্ষা আমাদের দিয়েছেন, তা অনুসরণেই আসবে কাঙ্খিত শান্তি, প্রতিষ্ঠিত হবে দ্বীনে ফিৎরাত, স্ব-মহিমায় মানব-সত্তায় প্রতিষ্ঠিত হবে সেই মোহন বংশীধারী, মানব সমাজের প্রতিটি সংস্কারে আবর্তিত হবে মহান বিধি দর্পহারি, এই মানবে বিরাজিত মতি-মুক্তা শোভিত ময়ূর সিংহাসনে ত্রিভঙ্গে নৃত্য করবে শঙ্খ-পদ্ম-গদা-চক্র চতুর্ভুজধারী মুকুন্দ মুরারী।

বিশ্ব মানবতার এক ক্রান্তিকালে, যখন মানব সমাজ, মনুষত্ব-কে বিকিয়ে দিয়ে খরিদ করে নিয়েছিল অন্ধত্ব বা পশুত্ব- ঠিক তখনই ধর্মের বিজয় কেতন আবার পতপত করে উড়ে উঠল মরু-সাহারার বুকে। যুগ-বিবর্তনে পশুত্বকে তাড়িয়ে চলা রাখালের অলৌকিক প্রেমভঙ্গিতে। সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে যুগে যুগে আবর্তিত সকল মহামানুষে অবস্থিত এক মানুষ গেয়ে উঠলেন অনাদি কালের হৃদয় উৎসের গভীরতম সংগীত, মৃত্যুর ভাগাড়ে বেজে উঠল মনমোহিনী সুর, বিশ্ববীণায় নব-স্পন্দনে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল ব্রজ-চারিণীর সপ্তসুরের মুর্চ্ছনা, প্রতিষ্ঠিত হলো স্রষ্টার স্বভাব-বিধান বা দ্বীনে হানিফা, আরব মরু-প্রান্তর হতে জগৎব্যাপি প্রকাশিত হলো মিল্লাতে ইব্রাহিম, বিশ্ববিধাতার  অপরূপ লীলায় সকল কুসংস্কার-বন্ধনের অবসান-কল্পে শেষ জামানায় আরব দুলাল মোহাম্মদ (সা), তাঁর অনুসারি তথা তাঁর আদর্শের গৃহে বসবাসকারি বা আহলে বাইয়াত-দের সমন্বয়ে জারি করলেন নুরুন-আলা-নুর, বাস্তবায়িত হতে লাগল পিতা পুত্র ও পবিত্র আত্মার (ট্রিনিটি, ত্রিত্ববাদ) এর সীমাহীন অপরূপ লীলা, বিশ্বময় প্রতিটি কন্ঠে-কন্ঠে ধ্বনিত হতে লাগলো মহান বেদজ্ঞান-  ঈসা, মুসা, দাউদ, ইব্রাহিম, বুদ্ধ, কৃষ্ণ, কবীর, নানক সকলে মিলে এক আসনে অধিষ্ঠিত করলেন চির সত্যকে। প্রতিষ্ঠিত হলো সহজাত মানব-ধর্ম।

বিধিবদ্ধ পথপ্রদর্শনের ক্রমতালিকায় সমাপ্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করলেন সহজাত প্রেমধর্মকে। সকলে মিলে মানব সত্ত্বার সহজাত ধর্ম মানব-ধর্মের জয়গান গাওয়ার জন্য এক দলে, এক কাতারে, এসে এক সুরে সুর মিলিয়ে নিখিল বিশ্ব-বীণায় ফুটিয়ে তুললেন বেলায়েত বা প্রেমধর্মকে। যেখানে অতিত-বর্তমান-ভবিষ্যতের বন্ধন ভুলে স্বয়ং হেদায়েতকারি শক্তি প্রশংসিত মহামানব মুক্তিকামীর ঘরে ঘরে বিলিয়ে দিতে লাগলেন প্রেম। পশুত্বের সংস্কারে আবদ্ধ জাতিকে টেনে তুলতে লাগলেন আপন তরীতে। প্রতিটি মোহাম্মদী নুরী সত্তা বা আলে মোহাম্মদ বা মোহাম্মদের নুরী বংশধর খাতামিয়াতে নবুয়তের পর অবিরাম চলমান হেদায়েতকারি রসুল রূপে উদ্ধার করতে লাগলেন মানব সমাজকে।

দ্বীনে মোহাম্মদী বা স্বতঃসিদ্ধ মানবধর্ম যা প্রচলিত সকল ধর্মের সার এবং অখন্ড রূপ, যেখানে দেওয়া হলো নিশ্চিত ক্ষতিতে আবদ্ধ পতিত মানব-জাতির মুক্তির দিশা। সর্বাঙ্গীন সুন্দর এবং পরিপুর্ণ রূপে সহজসাধ্য করা হলো মুক্তিপথের আবহমান কালের পরিক্রমাকে। দুনিয়ার প্রতিটা মানুষ নফসানিয়াতের সমন্বয়ে আমিত্ব বা দুনিয়ার রিপুময় সংস্পর্শে জন্মগত মনুষ্যত্ব হারিয়ে দাখিল হচ্ছে পশুত্বে। পশুত্ব  বা নফসানিয়াত প্রতিটি মানব সত্ত্বায় অনিবার্য ভাবে প্রোথিত বিধায় প্রতিটি ব্যক্তিমানুষের অভ্যন্তরস্থিত পশুত্ব বা আমিত্ব কাটিয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না শান্তি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সারা বিশ্বের বৈশ্বিক রাজনীতিতে সভ্যতার শুরু থেকেই তুমুল প্রতিযোগিতা চলছে সঠিক রাষ্ট্রব্যাবস্থা কায়েম করে শান্তি স্থাপন করার। কিন্তু আফসোছ, বিশ্বময় মহান মহান সকল নীতিনির্ধারক, এতো বড় বড় মহামানব, চিন্তাবিদ, গবেষক আজ পর্যন্ত এমন কোনো ব্যাবস্থাই প্রনয়ণ করতে পারলেন না, যেটা সকলকে শান্তি দিতে পারে! সকলকে শান্তি দিতে না পারলেও অন্তত একটা রাষ্ট্রে তো শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে পারে? মুক্তচিন্তার অধিকারী মানুষ বার বার রাষ্ট্রব্যাবস্থা  পাল্টিয়েছে, একনায়কতন্ত্র থেকে শুরু করে রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, পূজিবাদ, ধনতন্ত্র, গনতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র, কোনো তন্ত্রই বাদ দেয়নি কিন্তু মানুষ তার কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছতে পারে নি। সবাই যার যার মতো আপন আপন তন্ত্রকে সঠিক বলে ব্যাঙের মতো কূয়োয় বসে লাফাচ্ছে কিন্তু বিবেকের অধিকারী মানুষ মুক্তমনা উপাধি গ্রহণ করে আজও কুপমন্ডুকই রয়ে গেছে। সারা জীবন কঠোর তপস্যা করে কোনো তন্ত্র উদ্ভাবনকারি ব্যক্তি বা দল মানব জাতিকে তাদের অসাধারন মেধা ও ত্যাগের বিনিময়ে অরাজকতা ছাড়া আর কি’ই বা দিতে পেরেছে? তাদের অবদান আকাশচুম্বি হলেও মানব জাতি শান্তি পায়নি। তার প্রমান আজ পৃথিবির রন্ধ্রে-রন্ধ্রে। মানবজাতি মুখে শান্তিপ্রিয় হলেও বাস্তবে তার উল্টো। তাই হয়তো এই ব্যার্থতা। কি আর করার! মানব সমাজ মুখে যতই শান্তি চা’ক, তার হৃদয় যদি শান্তির জন্য উন্মুক্ত না হয় তবে কে তাকে শান্তি দেবে? মানুষকে বোধ হয় এমন করেই তৈরী করা!

বিধান প্রণেতাদের গর্ধপনা এতদূর যে তারা মুখে শান্তির বোল বললেও জানেনা অশান্তি কোথায়! রাজধানিতে অশান্তি হতে পারে না, রাজপথে কখনো বিদ্রোহ হতে পারেনা, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, মায়ানমারে অশান্তি হতে পারে না। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নীতি নির্ধারকদের এতটুকু বোঝা উচিত – স্থান-কাল-বস্তু নিরপেক্ষ। অশান্তি বিদ্রোহ হানাহানির উৎপত্তি একমাত্র পশুত্ব স্বভাব বিশিষ্ট মানব সত্ত্বায়। যেখান থেকে কলঙ্কিত করা হচ্ছে মানব জাতিকে, দেশকে। প্রতিটি ব্যক্তি সত্ত্বাকে যদি পুতঃপবিত্র রূপে তৈরী করা না যায়, তবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। এই বুঝটুকুই যদি আমাদের না থাকে তাহলে কি করে আমরা বিশ্বকে উপহার দিবো শান্তি, নিরাপত্তা? এ জ্ঞান মানুষের হবার কথা না কারণ, মানুষ মুখে শান্তিপ্রিয় হলেও বাস্তবে সে নিজেই অশান্তির উৎস। প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা হোক- এ কামনা থাকলে প্রতিটি মানুষ ব্যাস্ত থাকতো আপন আপন শুদ্ধিকর্মে। সবাইকে উৎসাহিত করত আপন আপন শুদ্ধির জন্য। কিন্তু নফসানিয়াত সম্বলিত মানব সত্ত্বায় এ রকম হবার কথা নয়। কারন শকুন তো আর পোলাও কোর্মা খায় না, ওর খাবার পচা গোশত।

মানব সত্ত্বায় স্থিত পশুত্বকে ত্যাগ করলেই প্রতিটি মানুষ অর্জন করবে তার চুড়ান্ত লক্ষ্য এবং পাশাপাশি অনিবার্য ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে সামাজিক শান্তি। প্রতিটি ধর্ম মানুষকে যথাযথ নির্দেশনা দিয়ে আসছে কি করে  মানুষ লাভ করবে আত্মিক প্রশান্তি। পরিশুদ্ধ করতে পারবে নিজেকে। মানবতার সংরক্ষণকারী সম্প্রদায় মুসলমানদের ধর্মীয় বিধান ইসলামে রূপক প্রতীক বা আলংকারিক এর সাহায্যে মানবজীবনের প্রতিটি পলে-পলে কিভাবে আন্তশুদ্ধি অর্জন করা যায় তারই পথনির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বভাব সিদ্ধ আচরণেই মানবজাতি ঐশি প্রেমের পথ বা স্বর্গীয় বিধান পরিত্যাগ করে মহান মুক্তির দিশারি মোহাম্মদ (সা) এর দেখানো সিরাতুল মুস্তাকিম কে অস্বীকার করে তাগুত নির্দেশিত এমন এক ভারসাম্যহীন গাজাখুরি মতবাদ কে ইসলাম বলে চালাচ্ছে তা শুধু বিধ্বংসীই নয় বরং মানবতার বিরুদ্ধবাদী। একশ্রেনীর ধার্মিক নামধারি অতিবোদ্ধারাই করছে এহেন বিকৃতি সাধন। যারা বরাবরই মানবতার শত্রু এবং তাদের পৈশাচিক কর্মকান্ডের ফলেই সহজাত মানব ধর্ম ইসলাম সমাজে পেয়েছে এক নিন্দনীয় আসন। ধর্মের ছদ্মাবরনে বাস করা লেবেল-লেবাছ ধারি এসব গন্ডমুর্খ দের জন্যই ইসলামের পরিচিতির স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে ভিন্ন দিকে । লজ্জাহীন এ জাতিটির ধর্মের নামে অপকর্ম করার জন্যই আজ মানবতার কান্ডারি মোহাম্মদ (সা) বিবেচ্য হচ্ছেন বর্বর ক্ষমতালোভীরূপে, মানব ধর্ম ইসলাম পরিণত হয়েছে জঙ্গীবাদ, মৌলবাদ, ত্রাস সৃষ্টিকারি মধ্যযুগীয় বর্বরতারূপে।

প্রতিটি যুগে যুগে প্রেরিত সকল মহামানবগণ মুক্তির শান্তির যে বিধান বাস্তবায়িত করেছেন, অজ্ঞ মানব সমাজ চিরাচরিত নিয়মেই তার বিরোধিতা করেছেন। সকল ধর্ম প্রচারকগণই মুখোমুখি হয়েছেন সমসাময়িক তীব্র বিরোধিতার। কোনোযুগেই সত্যের পূজারি কে মানবসমাজ সহজভাবে মেনে নেয়নি। অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়েছে তাদের ওপর। যুগে যুগে হত্যা করা হয়েছে মহামানবদের। কারণ, মানব সমাজ জন্মগত ভাবেই জিবাত্মা তথা রিপুসমুহ বা পশুত্বের গুণ খাছিয়তে আবৃত। যখনই কোনো নবী রাছুল বা কোনো মহামানব হায়ানাতের দেওয়াল ভেঙ্গে মানুষকে ডাক দিয়েছেন ইনছিনিয়াতের দিকে, তখনই তা অজ্ঞতায় আবদ্ধ মানব জাতির কাছে নেহাত হাস্যকর ব্যাপার বা পাগলামী বলে বিবেচিত হয়েছে। চলেছে তুমুল বিরোধিতা। কারণ রিপুময় মানুষের কাছে জিতেন্দ্রিয়ের ডাক শুধু খাপছাড়াই নয়, বিবেচিত হয়েছে তাদের মুর্খতার রাজ্যে হুমকি-স্বরুপ। ফলে দলবদ্ধ ভাবে বিরোধিতার তীব্র স্রোত প্রবাহিত হয়েছে সত্যের ওপর।

সর্বশেষ প্রেরিত মুক্তির কান্ডারি মোহাম্মদ (সা) মানব জাতিকে উপহার দিয়েছেন চিরশান্তির মহা-বিধান। যেখানে মানুষকে পথ দেখানো হয়েছে কিভাবে মানবসমাজ পশুত্ব বা হায়ানাত এর উর্দ্ধে উঠে অধিষ্ঠিত হবে ইনছানিয়াতে। দ্য প্রফেট মোহাম্মদ (সা) তাঁর সারা জীবনের চেষ্টা, পরিশ্রম এবং ত্যাগের বিনিময়ে আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন কি করে আমরা আমাদের সঙ্গে বাস করা খান্নাছটিকে দূরে সরিয়ে দিয়ে পান করতে পারবো মুক্তির অমৃত। দ্বীনে ফিৎরাত তথা দ্বীন ইসলামের প্রতিটি বিধানই মানবজাতির আত্মশুদ্ধি ও আত্মশুদ্ধির ফলে বিরাজিত মহিমা ময় আত্মিক অবস্থানের স্বানিধ্য বা আত্মপরিচয়ের বিধান। যেমন-

কালেমা – মুক্তিপথের এক শ্রেষ্ঠ নিয়ামক যেখানে মানুষ ইন্দ্রিয় শক্তির মাধ্যমে লাভ করবে অতিন্দ্রিয় সত্ত্বা। অমূর্তের মাঝে ফুঁটিয়ে তুলবে মূর্তমান মনোমোহিনী রূপ। বস্তুগুণের সম্মিলিত শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত নিত্য জগতে নিজেকে অধিষ্ঠিত করা।

সালাত – যার সাধনায় প্রতিটি মানুষ আপন সত্ত্বাস্থিত সকল আবর্জনা, ময়লা, কুসংস্কার এর উর্দ্ধে উঠে অবস্থান করবে শ্বাশত নিত্যধামে। সার্বক্ষণিক ধ্যান-সাধনার মাধ্যমে নিজেকে জিকির তথা স্বরন-সংযোগ এর উপযুক্ত করা।

সাওম – মানব সত্ত্বাস্থিত সকল রিপুনিচয়, যা মানুষকে ক্রমাগত উৎসাহিত করে ইন্দ্রিয় ভোগের পথে, সে সমস্ত পরাশক্তির বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ জিহাদ হলো সাওম। যাতে করে মানুষ নিজেকে পরিপুর্ণ রূপে পবিত্র করতে সক্ষম হয়। দেহস্থিত খান্নাছকে বিতাড়ন করে একাকিত্ব অর্জন করা।

হাজ্জ – মানব সত্ত্বায় বিরাজিত পরম সত্ত্বার সঙ্গে মধুর আলিঙ্গণ তথা স্বানিধ্য লাভ । নুরে মোহাম্মদির রৌশনে উদ্ভাসিত গৃহ প্রদক্ষিন করে প্রেমময় এর সাথে মিলিত হওয়া।

যাকাত – মানব সত্ত্বায় বিরাজিত সকল অপবিত্রতা হতে মুক্ত হওয়া । ৭ জন মিসকিন পরিবেষ্টিত মানব দেহের চল্লিশ গঞ্জ মাল হতে এক গঞ্জ বিলিয়ে দেয়া।

“মোহাম্মদী দর্শন ভোগের নয়, ত্যাগের অনুশীলন।” যুগে যুগে এ দর্শন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বস্তুবাদিদের, জড়বাদিদের দ্বারা। কারণ, পশুত্ব স্বভাব বিশিষ্ট অন্তকরণে এ দর্শন গ্রহণযোগ্য হবার কথা না। তাই বারবার আত্মশুদ্ধি বা আত্মমুক্তির এ দর্শন ( যে দর্শন গ্রহণ করলে প্রতিটি মানুষ অধিষ্ঠিত হবে নিত্যময় স্থান বা মোকামে মাহমুদায়, ফলে প্রতি মানব-সত্তায় বিরাজ করবে প্রশান্তি, অনিবার্য রূপে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে ইসলাম বা চিরশান্তি) গুটিকতক সত্যানুসন্ধানীর সাথে বাধ্য হয়ে নির্বাসিত হয়েছে নির্জনে। পশুত্বের গুণ-খাছিয়তে মানব সমাজ এ দর্শন গ্রহণ তো দুরে থাক, এর কবর রচনা করার জন্য মরিয়া ছিল সর্বদাই। ফলে ত্যাগের অনুশীলন সমাজে অনেকটা অপরিচিতই রয়ে গেছে। বিস্তার লাভ করেছে বস্তুবাদি জড়বাদি জঘন্য সব মানবতার ধ্বংস সাধনকারি মতবাদ। যাতে সিংহভাগ মানুষ লিপ্ত।

অহী কালাম মানুষকে সৎপথ দেখানোর জন্য নাযিল হলেও মানব সমাজ তা হতে সঠিক পথের সন্ধান পাচ্ছে না। কারণ, অহী কালাম রূপক প্রতীক বা আলংকারিক এর পর্দায় আবৃত। গন্ড-মুর্খ মানবজাতি স্রষ্টার স্পষ্ট নিদের্শনা, রাছুলের জীবন বিধান সত্ত্বেও প্রতীকের অভ্যন্তরস্থিত সত্যকে গ্রহণ না করে মুল্যহীন রূপক প্রতীকের অনুসরণ করে যাচ্ছে। কারণ প্রকৃত ধর্মবিধান তো ত্যাগের অনুশীলন। ত্যাগের অনুশীলন তো সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা না। ফলে অতিবোদ্ধা মানবজাতি প্রকৃত ধর্ম বিধানকে মাটিচাপা দিয়ে নিছক প্রতিকী আচার-অনুষ্ঠান, চলা-ফেরা, খাবার-দাবার, ঘর-সংসার, ঢিলা-কুলুখ, মেসওয়াককে’ই ধর্মীয় বিধান বলে চালিয়ে দিচ্ছে। বস্তুবাদি সমাজে যা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। সংস্কারের অতল-তলে নিক্ষিপ্ত করেছে ধর্মের মুল বিধান বা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পরম-সত্ত্বার স্বানিধ্য লাভ করে নিজেকে, দেশকে, জাতিকে মহান নিত্যময়তায় অধিষ্ঠিত করার শিক্ষাকে।

দ্বীনে মোহাম্মদী বা পবিত্র ইসলাম হলো মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মুক্তির বিধান- তাই স্বাভাবিক ভাবেই দ্বীনে মোহাম্মদীর ওপর করা হয়েছে সর্বাধিক বিরোধিতা। দ্বীনের প্রতিটি বিধানের ওপর চালানো হয়েছে অত্যাচারের, অপশিক্ষার, অপব্যাখ্যার স্টিম রোলার। শুধু বিধানের ওপরেই নয়, মানবজাতির একমাত্র পরম মুক্তি-কান্ডারি, বিশ্ব মানবতার মহান শিক্ষক, মানুষকে ভালোবেসে কাছে টেনে নেওয়াই ছিল যার জীবনের একমাত্র ব্রত, (অমুসলমানরাও যার প্রশংসা করে শেষ করতে পারেনি) , তাঁর নিজের ওপর ও তাঁর পরিবারের ওপর চালানো হয়েছে বিশ্বের ইতিহাসের সবচাইতে জঘন্যতম বর্বরতা। দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে তাঁকে। বারবার আঘাতের পর আঘাতে রক্তাক্ত করা হয়েছে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবকে। তার সবচাইতে কাছের আহলে বাইয়াত বা স্ব-গৃহের অধিবাসীদের এতটা নিকৃষ্ট, নির্দয় ভাবে হত্যা করা হয়েছে যা বিশ্বের যে কোনো নির্দয়তাকে হার মানায়। হত্যা করা হয়েছে মেয়েকে, মেয়ের জামাইকে। প্রানের চাইতে অধিক প্রিয় আদরের নাতিকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে। আর এক নাতি ইমাম হুসাইন এর মাথা কেটে নেওয়ার পর তার নিথর দেহের ওপর ঘোড়া চালিয়ে দেহ মোবারককেও মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। পরপর ১১ জন বংশধরকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে। দ্বীনে মুহাম্মদীর প্রকৃত আদর্শে বিশ্বাসী গুটিকতক পবিত্র ব্যক্তিদেরকেও রেহাই দেয়া হয়নি। হত্যা করা হয়েছে নিষ্ঠুরভাবে। বাধ্য করা হয়েছে দেশত্যাগে। ত্যাগের অনুশীলনে নিত্যময়তার প্রাপ্তির পথকে ধরার বুক থেকে চিরদিনের জন্য বিলীন করে দেয়ার জন্য এমন কোনো পাঁয়তারা নেই যা করা হয়নি।

সমগ্র বিশ্বে মোহাম্মদী উম্মতদের (তথাকথিত) বিরোধিতা ছিল সবচাইতে ভয়ংকর। মানবজাতির মুক্তির বিধান দ্বীনে মোহাম্মদীর শেষ প্রাণশক্তিকেও অক্ষত রাখা হয়নি। অক্ষত রাখা হয়নি পবিত্রতম মানব-ধর্ম বা সহজাত স্বভাব-ধর্মের কোনো একটি বিধানকে। ভোগবাদীদের দ্বারা যুগে-যুগে পবিত্রাত্মাদের ওপর আপতিত হয়েছে ঘোরতর বিরোধিতা। সকল মহামানবকে’ই বার বার যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি হতে হয়েছে অসুর শক্তির সাথে। সকল নবী-রাছুলই ছিলেন যে পথের পথিক। শত শত বৎসর কাঁদতে হয়েছে নুহ নবীকে, অগ্নিকুন্ডে ফেলা হয়েছে ইব্রাহিম নবীকে, দেশত্যাগ করে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে মুসা নবীকে, জীবন দিতে হয়েছে ঈসা নবীকে, রাম, কৃষ্ণ, চৈতন্যদেব সহ সকল মহামানবকে মুখোমুখি হতে হয়েছে তীব্র বিরোধিতার, জীবন দিতে হয়েছে সক্রেটিস কে। হাজারো অত্যাচার নির্যাতন জুলুমের বন্যা বইয়ে দেয়া হয়েছে সকল মুক্তি পথের কান্ডারীর ওপর। সর্বশেষ যখন সকল মহামানবে অবস্থিত এক মানুষ আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলেন দ্বীনে মোহাম্মদীর আদলে, তখন সম্মিলিত বিরোধিতার তীব্র-স্রোত প্রবাহিত হতে লাগলো দ্বীনে মোহাম্মদীর ওপর। হাজারবার রক্তাক্ত হতে হলো সকল রঙ, সকল রুপে বিরাজিত একমাত্র রসশক্তি মোহাম্মদ (সা) কে। ইব্রাহিম-নমরুদ, মুসা-ফেরাউন, রাম-রাবন, কৌরব-পান্ডব, শেষ যুগে ভোগবাদি-ভাববাদীদের মতোই দ্বীনে মোহাম্মদীকেও মুখোমুখি হতে হলো ওহুদ, বদর, খন্দক, খাইবার সহ হাজারো সমরাঙ্গনে। ভোগী-আত্মা ও ত্যাগী-আত্মার শ্বাশত লড়াই প্রস্ফুটিত হতে লাগলো জঙ্গে-জামাল ও সিফফিনে।

মানব সৃষ্টির হাজার বছর পর যখন মরু-সাহারায় যখন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হলো দ্বীনে ফিৎরাত, অতএব অনিবার্য ভাবেই প্রয়োজন দেখা দিলো দ্বীনে ফিৎরাতকে সকল কলংঙ্কমুক্ত করে আপন মহিমায় স্থিত করার। মুখোশধারী সকল ভন্ডদের চিহ্নিত করা ছিলো দ্বীনে মোহাম্মদী টিকিয়ে রাখার জন্য অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ। যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মোহাম্মদের অনুসারী বা আদর্শের গৃহে বসবাসকারি মহামানবদের বিলিয়ে দিতে হয়েছে আপন আপন জীবন, উৎসর্গ করতে হয়েছে আপন বুকের তাজা রক্ত। পৃথক করতে হয়েছে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, পবিত্রতা-অপবিত্রতা কে। যারই ক্রমধারায় অনুষ্ঠিত হয় বিষাদময় কারবালা। যেখান থেকে আহলে বাইয়াতের পবিত্র রক্ত দিয়ে চিরতরে দেয়াল তোলা হয় পবিত্রতা এবং অপবিত্রতার মধ্যে, ন্যায় এবং অন্যায়ের মধ্যে, ধর্ম এবং অধর্মের মধ্যে। সকল ভন্ডামী, অপবিত্রতা, অন্যায় এবং মুখোশধারী শয়তান চক্রকে চিনিয়ে দেয়া হলো জগৎবাসীকে। সারা জাহান উপলব্ধি করলো “ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালাকে বাদ”। আপন জীবন, সন্তান, পরিবার ও সঙ্গীদের জীবন উৎসর্গ করে নূরে মোহাম্মদ, মোহাম্মদ (সা) এর কলিজার টুকরা, বেলায়েতের দরজা হযরত আলী – জগৎ জননী মা ফাতেমার দুলাল, প্রেমধর্মের কান্ডারী ইমাম হুসাইন পরিপূর্ণ রূপে প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন দ্বীনে মোহাম্মদী কে।

কবিতা – আমি, আকার ও নিরাকার

আমি – আজহার ফরহাদ
আমি কোথাও নেই, আমি আমার ভেতরেই
আমি কোথাও থাকিনা, আমি তোমাতেই থাকি।
আমার থাকা না থাকা তোমারই থাকা ও না থাকা,
আমি ও তুমি যুক্ত নই বিচ্ছিন্ন ও নই,
তুমি যখন তুমি নও, আমিও নই,
আমার হওয়া না হওয়া তোমার হওয়াতেই,
আমার কোনো শক্তি নেই তুমি ছাড়া,
তোমার নেই সামান্যতম উপায় আমি ছাড়া।
আমি ও তুমি আমরা হয়ে উঠতে পারি না,
আমি ও তুমি কেবলই না আমি হয়ে,
একটাই আমিতে বিলুপ্ত হতে পারি।

আকার ও নিরাকার – আজহার ফরহাদ
কেউ তারে আকারে ভজে কেউ নিরাকারে,
যে ভাবে ভজে সেও কি তার কল্পমুর্তি গড়ে না?
নিরাকার আকারে মেশে ডুবঘরে ডুব দিলে,
আকার নিরাকারে গুপ্ত হয় ভেসে উঠলে।
চাকা নয়, গাড়িকে ঠেলে গতি,
চাকাই যেন মুর্তিমান সচলায়তন, আকারে তিনি,
প্রপঞ্চময়, নিরাকারে তিনি বাঙ্ময়।

কবিতা – ঐকতান

লেখক – দাউদ আহমেদ চিশতী

সন্ধি হলো সর্বভুতে বন্দী হব এক সাথে
সাবাশ আজি বন্দি হয়ে চলছি মোরা এক সাথে।
ভিন্ন বলেও গুনের সিমা অভিন্নতা এক দেহ,
চলছি মোরা আপন গৃহে লক্ষ্য হারা নই কেহ।

লক্ষ্য সবার সসীম হতে অসীম পানে করতে ধাই,
বন্দি হলাম সসীম মাঝে অসীম প্রাপ্তির অভিপ্রায়।
সাধ্য কাহার করতে পারে ধর্ম হতে ব্যাবধান,
সসীম দেহে ধর্মকথা অসীম যোগে প্রণিধান।

ভিন্ন ভিন্ন ধর্মকথা একটি দেহে বন্দি হয়,
ধর্মবানী শ্রেষ্ঠ ইহা করো আপন পরিচয়।
ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গখানি মিল হয়েছে এক দেহ,
বেমিল বলে অঙ্গহানি করেছে কি আজ কেহ।

হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান কাকে কেবা করতে হীন,
ধর্ম ত্যাগের অপরাধে বহন করতে হবে ঋণ।
নিখিল বিশ্ব একটি দেহ সর্বধর্ম তাতে রয়,
ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম পথ সব ইন্দ্রিয়েরই পরিচয়।

কবিতা – গঞ্জমুখফির গোপন ঘর

লেখক – শাহ্ ফরহাদ চিশতী

গঞ্জ মুখফির গোপন ঘরে
মুর্শিদ নামের আছে টাওয়ার,
খেয়াল করে থাকলে বসে
ভক্তি রসে আসবে পাওয়ার।

বিশ্বাসের পারমিট নিয়া
নিরিখ তরঙ্গ ইথার দিয়া,
দেখ খেয়াল তমিজ হইয়া
এলমলের সমি জ্ঞানরে তার।

মোতাস্রেফের গোপন ঘরে
সফটওয়্যার তার ভেতরে,
নামাইয়া লও ভক্তির জোরে
যখন যাহা হয় দরকার।

মানব দেহের স্মার্ট ফোনে
সিম লাগাও দেমাগ পানে,
হাল-বেদারি কানেকশনে
শেকে ফানা চমৎকার।

আজিজি স্বভাব যখন হবে
আশেক ফানা মাশুক ভাবে,
সামিউনে সব শুনতে পারে
দেখবে বাছির বারংবার।

বার সংখ্যা সংযোগ দিলে
গাইবি এলেম আসবে চলে,
লিস্ট থাকলে ডায়াল কলে
ফায়াজ যোগে হবে দীদার।

ফায়েজি হাল যখন হবে
খাজা সালাম সংযোগ দিবে,
উপরি খবর এলমে পাবে
থাইকো ফরহাদ হুঁশিয়ার।

কবিতা – আপন ঘর

লেখক – আনোয়ার হোসেন আরজু

জেনে লও মুর্শিদের কাছে আপনার খবর
যে খবর ইরাদায় তোমার প্রকাশ নিরন্তর।
মুর্শিদ ধরে তৌহিদ করে আপনি চেতন হও
আর কতকাল থাকবি ভ্রমে, ভ্রমের পর্দা তুলে লও।

গঞ্জে ছিলো গঞ্জজাতে গঞ্জেরি আকার
এমকান হইলে তুমি জানিতে নিজের সমাচার,
সাত পাচ বারো দিয়ে বানাইলে ঘর চমৎকার
গোপন ঘরে বসেরে মন খেলছে খেলা কারিগর।

আপন নফসে মিশে আছে মাওলা পরোয়ার
নফস মাঝে তৌহিদ করলে মিলবে সমাচার,
আপন ঘরে আছে তোমার রুহ নফস দেল
মুর্শিদের পায়রবি করে চিনে লও তার ফেল।

চেনা হলে রুহ নফস দেলের সমাচার
একাল সেকাল অন্ধ তুমি থাকিবেনা আর,
অন্ধের জগত হায়ান যেথা চেনা জানা নাই
আশরাফুল মাখলুকাত তুমি ভেবে দেখ তাই।

দেলেতে তাকিয়ে দেখো নুরুন আলা নুুর
আপন সুরতে মাওলা হয়েছে জহুর।

আউলিয়ায়ে কেরামগণের পবিত্র বাণী মুবারক

1. এই দেল-কাবা ব্যতীত খোদাকে আর কোথাও দেখিতে পারিবে না। যিনি এই দেলকাবায় হজ্জ করিয়াছেন, তাহার হজ্জ সর্বতীর্থে আদায় হইবে।
আহমদ কওসার আলী শাহ (র) (জিন্দাশাহ)

2. চল্লিশ হরফে লেখা দেওয়ান আমার
হরফে হরফে ব্যাখ্যা তৌহিদ আল্লাহর।
আপন ঘর খুজলে পরে যায় তারে চেনা
আপন অজুদ না চিনিয়া হইয়াছিস দিন কানা।
সাত পাচ বারোর ঘরে সাই আমার বিরাজ করে
কেমন করে চিনবি তারে
মর্শিদ ধরে করগে চিনার ঠিকানা।
দেওয়ান খাজা শাহ আব্দুর রশিদ চিশতী নিজামী

3. আল্লাহ যাহাকে যে অবস্থায় রাখেন
সেই অবস্থায় শুকরিয়া আদায় করুন।
শুকুর-সবুর-ধৈর্য্য
চোখ কান খোলা রাখুন – দেখবেন শুনবেন বলবেন না।
আপনা কাজ করুন
আল্লাহ বাজান বলেন, ভালো থাইকেন, আল্লাহ ভালো রাখবেন।
হযরত লোকমান শাহ দরবেশ (র) (আল্লাবাজান)

4. সাধক যদি হতে চাও, কম খাও, অল্প ঘুমাও।
সাধু সেজো না, সাধু হও।
হযরত হারুন অর রশিদ শোভা মিয়া (র) (হারুন শাহ)

5. সত্য কইতে মারা যায়
মিথ্যা কইতে মানা
এই পাপে গোমরাহ হয়ে আছে কত জনা।
দেখা আছে কইতে নাই, সেই কেমন জন
জবান থাকিতে নারে কইতে বারন।
হযরত ইসমাইল ক্বারী (র)

6. তুমি চাও যদি মানুষে
ভক্তিরসের বাদাম দিয়া যাওনা সরল দেশে।
হযরত ইয়ার উদ্দিন ওরফে ইয়ার আলম চিশতী (র)

7. তোমার অঙ্গে অঙ্গরে তারই
আছেরে সাঁই নিরাকারে
গুরুকে চিহ্ন করে চিনো তারে।
হযরত খাজা গওহার শাহ আল চিশতী নিজামী (র)

8. অচেতন রইলে সতি, পালাইবে প্রাণপতি, অসতি করিবে এসে যমদূত হায়,
যার ঘর সেহি হরে, নিজে মাল চুরি করে, অনর্থক আজরাইলে দোষী প্রমানয় ।
শাহ আব্দুর রহিম ওয়ায়েসী (র)

9. প্রতি কর্মে থাকতে হবে সুন্দর রেসালাত
যার নিকট পরাজিত সকল মাখলুকাত।
মানুষের পদতলে যাহার বাসস্থান
সে একদিন লাভ করবে দেবতার সম্মান।
হযরত শাহ পাগল হাসেম আলী আল ওয়ায়েসী (র)

10. মাওলা আলীর প্রতি ভালোবাসাই ঈমান এবং তাঁর শত্রুতাই ‍মুনাফেকী।

11. একশত বৎসর নির্জন এবাদত হতে ছামা বা গানে বেশি ফল লাভ হয়। (হযরত খাজা নাসিরউদ্দিন আবু ইউসুফ আল হুসাইনী র.)

12. যার অন্তরকে ছামা বা গান আকৃষ্ট করতে পারে না সে নিশ্চয়ই পতিত স্বভাবের এবং যাবতীয় পশু হতেও ঘৃণিত। (ইমাম গাজ্জালী র.)

13. আল্লাহকে বিস্মৃত হওয়াই পৃথিবী এবং তার স্বরণই ধর্ম। (মাওলানা রুমী র.)

14. জীবন্ত ঈশ্বর তোমাদের সঙ্গে রয়েছে, তথাপি তোমরা মসজিদ, মন্দির, গীর্জা নির্মাণ করিতেছো ও সর্বপ্রকার মিথ্যা বস্তুতে বিশ্বাস করিতেছো! (স্বামী বিবেকানন্দ)

15. যারা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত তথা সিবগাতাল্লাহ এ ভূষিত তথা প্রভূসত্ত্বার বৃত্তিতে সিক্ত, তারাই ধার্মিক। (খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী র.)

16. ঐ ব্যাক্তিই প্রকৃত প্রেমিক যে ইহকাল ও পরকালের সকল আশা ত্যাগ করে একমাত্র মহান রবের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ রেখেছে। (খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী র.)

17. গাফেল হৃদয় কিভাবে বন্ধুর দয়া ও ভালোবাসার আলো জ্বালবে? চেতন হৃদয় ব্যতিত সে নূরের অবরোহন স্থল নেই। (খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী র.)

18. এশকের শান দিয়ে দেহের মরিচা দূরিভূত করো, তারপর প্রাণবন্ধুর আয়নায় প্রাণবন্ধুর সৌন্দর্য দেখ। (খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী র.)

19. যদি তুমি আসমান ও জমিনতূল্য এবাদত করো, কিন্তু আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি যদি দৃঢ় বিশ্বাস না থাকে, তবে তা কবুল হবে না। (হযরত খাজা ওয়ায়েস করণী র.)

20. যতদিন পর্যন্ত তোমার লালসার মুখ খোলা থাকিবে, ততদিন পর্যন্ত খোদার তরফ থেকে তোমার অন্তকরণে কোনো ভেদ কথা প্রবেশ করিবে না। (শেখ সাদী র.)

21. আমি কোরআনের মূলবস্তু তুলিয়া নিয়েছি, অস্থিচর্ম কুকুরের জন্য ফেলে দিয়েছি। (মাওলানা রুমী র.)

22. সৃষ্টির সেবা ব্যতিত ইবাদত নাই। তসবিহ ও জায়নামাজ খোদা প্রাপ্তির নিয়ামক নয়। (শেখ সাদী র.)

23. পীরকে খোদা হইতে দুই জানিও না, দুই দেখিও না, দুই ভাবিও না। (মাওলানা রুমী র.)

24. মূর্খেরা সব শোনো, মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো। (কাজী নজরুল ইসলাম র.)

25. সত্য বল, সুপথে চল ওরে আমার মন। (ফকির লালন শাহ)

26. মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি। (ফকির লালন শাহ)

27. নিরিখ বান্ধরে দুই নয়নে, ভুইলো না মন তাহারে। ঐ নাম ভূল করিলে যাবিরে মারা, পড়বিরে বিষম ফেরে। (ফকির কালু শাহ)

28. মুহাম্মদ, ঈসা, মুসা, ইব্রাহিম প্রমুখ নবীগণকে, ওলী আউলিয়াগণকে কৃষ্ণ-বুদ্ধ-মুনি-ঋষি-সাধুপুরুষ গণকে পৃথক পৃথক চিন্তা করা, তারা পূর্বে ছিল এখন নাই এরূপ মনে করা মূর্তি পূজারই নামান্তর। (ফকির চিশতী নিজামী র.)

29. আমি আমাকে সম্পূর্ণ রূপে উজাড় করে দিয়েছি হুসাইনের পদতলে। আমি তো তারই গোলাম যে হয়েছে হোসাইনের গোলাম। (হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী র.)

30. প্রেমহীন ইবাদতকারী যে স্থানে হাজার রাকাত নামাজ দ্বারা পৌঁছবে, প্রেম মাদকতায় মত্ত ব্যক্তি সে স্থানে এক হুংকারেই পৌছে যাবে। (হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী র.)

31. যদি আল্লাহকে দেখতে চাও, তাহলে আমার চেহারার দিকে তাকাও। আমি তাঁর আয়না, সে আমার থেকে পৃথক না। (হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী র.)

32. মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চাইতে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই। (কাজী নজরুল ইসলাম র.)

33. আল্লাহর প্রকৃত বন্ধু এক মুহূর্তও তাঁর স্বরণ থেকে বিচ্যূত হয় না। (হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক র.)

34. বেদ কোরান বাইবেল গীতা, সকলের মূল মুর্শিদ তোমার, ভজন করো তাঁর রে মন, ভজন করো তাঁর। (খাজা কাজী বেনজীর হক চিশতী র.)

35. মুসলমান শব্দের অর্থ আত্মসমর্পণকারী। তিনি যে কোনো ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের লোক হতে পারেন। এই মুসলমান হওয়ার জন্য কাউকে ধর্ম ত্যাগ করে নাম পাল্টাতে হয় না। (সদর উদ্দিন আহমদ চিশতী র.)

36. দেহ-আত্মা অবিচ্ছিন্ন, ইহকাল-পরকাল অবিচ্ছিন্ন, মোহকামাতুন আয়াতের নূরের কোরান আর আহলে বাইয়াত অবিচ্ছিন্ন। (ফকির চিশতী নিজামী র.)

37. যদি নিত্যধামে যেতে থাকে বাসনা, তোমার অনিত্য দেহ থাকিতে নিত্যের করণ হবে না। (খাজা দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী চিশতী নিজামী র.)

38. যদি তোমার খোদা জ্ঞান তোমার অস্তিত্বকে ভূলাইয়া না দেয়, তবে সে জ্ঞান হতে অজ্ঞানতাই শ্রেয়। (হাকিম সানায়ী র.)

39. যদি তাওহীদ সাগরে নিজেকে ফানা করে ডুব দিতে পারো তবেই তুমি চিরজীবনের মতো তোমার মাশুক আল্লাহকে পাবে। (জালালউদ্দিন রুমী র.)

40. এশক হলো সমস্ত এবাদতের মূল। যার মুর্শিদ নেই তার মুর্শিদ হলো শয়তান। (হযরত জুনায়েদ বাগদাদী র.)

41. দুনিয়া পচা লাশ। এর অনুসন্ধানীগণ কুকুর। (হযরত জয়নাল আবেদীন র.)

42. না চিনিয়া আপনারে, রইলি রে মন অন্ধকারে, আপন ঘরে ডুবলে পরে যায় তারে চেনা। (হযরত মেছের শাহ র.)

43. যে সর্বভূতে অবস্থিত আমাকে উপেক্ষা করিয়া প্রতিমার ভজনা করে, সে যেন ভস্মে ঘৃতাহুতি দেয়। (শ্রী কৃষ্ণ) ভাগবত গীতা 29-21।

44. কামনা-বাসনা দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে, তারাই তাদের স্বভাব অনুযায়ী বিভিন্ন কল্পিত দেব দেবীর অর্চনা করে। (শ্রী কৃষ্ণ) ভাগবত গীতা ৭ম অধ্যায়।

45. খোদা তোর হাজির নাজির জান মুছাফির সদায় বর্তমান। (খাজা দেওয়ান শাহ রজ্জব আলী চিশতী র.)

46. আমি তুমি হলাম, তুমি আমি হলে। আমি দেহ তুমি প্রাণ। এরপর যেনো কেউ আর বলতে না পারে আমি একজন আর তুমি আর একজন। (হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী র.)

47. মাওলা আলী স্বরণ ইবাদত তূল্য।

মুক্তিচেতনা ও আত্মোপলব্ধির ত্রৈমাসিক আপন খবর, প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল ২০১৮ খ্রি.
এশকে মাওলা চিশতীয়া দরবার শরীফ হতে প্রকাশিত ও হযরত খাজা হিমেল শাহ চিশতী নিজামী কর্তৃক সম্পাদিত












Others Post

আপন খবর - Apon Khobor

লাবিব মাহফুজ চিশতী
ফেসবুক পেজ
ইউটিউব
হোয়াটসএপ গ্রুপ
টেলিগ্রাম গ্রুপ